চিত্রকলা : হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি-৩ : নাজিব তারেক

চিত্রকলা

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি-৩

নাজিব তারেক

আপেল, ইউরোপ গন্দম ফল চেনে না, আপেল চেনে। অ্যাডাম বা আদম আপেল খেয়ে পৃথিবীতে রাজ্য অভিষেকের বন্দিত্বে ফেঁসে গেলেন। গেরস্তরা বলেন নির্বাসিত হলেন। একা মানুষ নিউটনের মাথায় আপেল পড়লে তিনি সেটা খেয়েছেন কি খাননি আমরা জানি না, তবে এটা জানি আকাশ থেকে মাটিতে পড়ার সূত্র আবিষ্কার করলেন বা মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে খুঁজে পেলেন। এই দুই আপেলের সাথে বণিক দুনিয়া আরও এক আপেলকে বিখ্যাত বলে জানে, সেটি হচ্ছে অ্যাপল কোম্পানির লোগো। আরও এক আপেল আছে যা সাধারণে তেমন আলোচিত নয়, এমনকি চিত্রকলার দুনিয়াতেও যতখানি আলোচিত হওয়ার কথা ততখানি নয়। সে হচ্ছে সেজানের জড়জীবনের (stillife)  আপেল। মফস্সল শহরের একটু বড়োলোক বাসায় ডাইনিং টেবিল তখন একটু একটু করে জায়গা করে নিচ্ছে, সঙ্গে ফলমূলের ছবিওয়ালা পোস্টার। সময়টা বড়দের চায়ের আড্ডায় সামরিক শাসক মেজর কি জেনারেলের হেলিকপ্টার ও মুজিব হত্যার পর আওয়ামী লীগের কাণ্ডারি কে হবেন সে বিষয়ক আলোচনা-কালের।  সে সময়ে ঢাকায় বেড়াতে এলো এক শিশু-কিশোর। তাদের বাসার সমান এক বাসার বসবার ঘরের সোফার পেছনে ঝোলানো ফলমূলের ছবি তাকে বিপন্ন করে তুলল। এখানে কেন ফলমূলের ছবি? আবার এ ছবিটা আগে দেখা কোনো ফলমূলের ছবির মতোও নয়, এমনকি শহরের আর্ট গ্যালারি নামক ছবি ও সাইনবোর্ড আঁকবার দোকানে দেখা ছবিগুলোর মতোও নয়। তবে হাতে আঁকা তা বোঝা যায়।

সোফা থেকে উঠে গিয়ে উল্টোদিকের চেয়ারে গিয়ে বসে কিশোর, আহা কি ভদ্র ছেলে, বড়দের জন্য আসন ছেড়ে দিলো! টেবিলে দেওয়া বিস্কুট চিবুতে চিবুতে কিশোর ছবিটা দেখে আর দেখে।

আট বছর পর, কিশোর তখন চারুকলার ছাত্র, তখনও পাঠাগারটি চেনা হয়নি। এক বড়োভাই তাকে একটি বই উপহার দিলে jb An invitation to see, 125 paintings from MOMA, এক পৃষ্ঠায় এসে দৃষ্টি আটকে গেল কিশোরের। সেই ফলমূলের ছবিটি। কিশোর এখন জানে এ রকম ছবিকে জড়জীবন (stillife) বলে।

মানুষ গল্প খোঁজে। গল্পহীন এ রকম জড়জীবন ইউরোপীয় চিত্রচর্চায় শিল্পীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রেনেসাঁকালে। নিজস্ব করণকৌশলের উৎকর্ষ বৃদ্ধির অনুশীলন যা অভিনেতাদের মহড়া, গায়কদের রেওয়াজ, ক্রিকেটারদের নেট প্রাকটিসের মতো। খুব শিগগিরই রসিকেরা এসব অনুশীলন (study) থেকে আবিষ্কার করলেন শিল্পীর শিল্প- ভাবনাকে। রসিকেরা কেউ কেউ ছবি আঁকার মুজরা দেওয়ার পাশাপাশি শিল্পীর স্কেচবুক এবং এসব চিত্রকর্মও সংগ্রহে নিতে থাকলেন। ফলে জড়জীবন শুধুই অনুশীলন রইল না।

সেজানের জড়জীবন তাঁর চিত্রভাবনার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। অনুশীলন প্রশ্নেও সেজান কঠোর, এ ছবিটিই এঁকেছেন তিন বছর ধরে। সেজান প্রকৃতিকে অনুকরণ করতে চাননি, পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছেন। তিনি তাই উপলব্ধি করেন- বস্তুর উপরিতলে যতটুকু  দেখা যায় তাই সব নয়, গভীরেই আছে সবটুকু। উপরিতলের রঙের যে ছোটো ছোটো কম্পন তা এই গভীরের প্রকাশ। তার ছবির বস্তু পরিচিতি নির্মাণকারী রেখাসমূহ (contour) তাই ভাঙা ভাঙা। বিশ্লেষণে, অনুশীলনে তিনি এতই আত্মবিশ্বাসী যে, তিনি বলেন- প্যারিসকে মুগ্ধ ও চমৎকৃত করতে একটি আপেলই যথেষ্ট।

যে ভোরের সূর্যোদয়ে পুড়ে গেল ল্যুভর

ক্যামেরা বাজারে এসে গেছে, নিউটনও বেনীআসহকলা বা রঙধনুর রহস্য বিষয়ক চার্জশিট প্রকাশ করেছেন।  ইউরোপের বাজারে জাপানিজ ছাপচিত্র বিকোচ্ছে দেদার, কলকাতা থেকেও মুঘল, রাজপুত চিত্রকলা ও কালীঘাটের পট লন্ডনে জমা হচ্ছে। এ রকম এক সময়ে ফরাসি রয়েল একাডেমির প্রর্দশনীতে স্থান হলো না যে তরুণ আঁকিয়েদের, সেই তরুণেরা প্রদর্শনশালার বাইরে তাঁদের ছবি নিয়ে বসে গেল। ইউরোপের রাস্তায় চিত্রকররা ছবি নিয়ে বসে থাকে সেই গ্রিক রোমানকাল থেকেই, তাই এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। নতুন যা তা হলো তারা স্রেফ বসে গেল তা নয়, তারা একটি ঘোষণাপত্রও (manifesto) রচনা করল। সেখানে তারা জানিয়ে দিলো- তারা আঁকবে নিত্যজীবন বা সাধারণ জীবন, এটা হতে পারে মুহূর্তের কোনো দৃশ্য এবং সেটাই গল্প, যা কোনো পুরাণ বা কাব্যের, গল্পের বা বাণীর চিত্রায়ণ নয়। সেটা তারা আঁকবে সূর্যের আলোর বেনীআসহকলা বুঝে। তারা এটাও জানাল, তারা এসব ছবির অনুপ্রেরণা নিচ্ছে জাপান ও উপনিবেশ থেকে আসা চিত্রকলা থেকে বা ফোক (Folk Art) থেকে। ঘোষণাপত্র ও ক্যাটালগ প্রকাশনার সুবাদে রাস্তায় বসে পড়া এ ছবির ভাণ্ডার প্রদর্শনীর মর্যাদা পেল এপ্রিল, ১৮৭৪-এ আলোকচিত্রী নাদারের বুলভার্ডের পুরনো স্টুডিওর ঠিকানায়। ৩৫ চিত্রীর ১৬৫ ছবি নিয়ে সে প্রদর্শনীর অন্যতম জনপ্রিয় চিত্র ‘সূর্যোদয়ের প্রতিচ্ছায়া’ (Impression, Sunrise) আর ফরাসি ভাষার পত্রিকা Le Charivari-শিল্প আলোচক লুইস লেরয় এই প্রদর্শনীকে  প্রতিচ্ছায়াবাদী (Impressionist)প্রদর্শনী বলে উল্লেখ করলেন।

১৮৭২ সালের হার্ভে বন্দরের এক সকালের দৃশ্য ‘সূর্যোদয়ের প্রতিচ্ছায়া’। কুয়াশাচ্ছন্ন বন্দরের জাহাজ ও অন্যান্য কাঠামো তেমন স্পষ্ট নয়, ছায়া ছায়া অবয়বে ভোরের আকাশের পটে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। দর্শক কিংবা চিত্রকরের নিকটবর্তী নৌকাগুলো কিছুটা গাঢ় রঙে উপস্থিত। সূর্য রাতের খোলস থেকে বেরিয়ে এখনও ডিমের কুসুমের মতোই গোল ও লাল। সেই লাল ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে, সমুদ্রজলের ঢেউয়ের মাথায় নাচছে টুকরো টুকরো সূর্য লাল। সূর্য ও দুই নৌকার অবস্থান তৈরি করেছে এক ত্রিভুজাকৃতি। যা এই চিত্রের মূল ‘টেনশন’। যা আবার ছড়িয়ে পড়ে আকাশ ও সমুদ্রে সূর্য-লালের সাথে ছবিতে ও দর্শক মনে। বন্দরের আড়মোড়া ভাঙার আলস্য দর্শক অনুভব করেন নিজ মস্তিষ্কে ও মনে। সাধারণ খুব সাধারণ, দক্ষতার যান্ত্রিকতাবিহীন এক ওস্তাদিতে দর্শক আপ্লুত হন। প্রতিচ্ছায়াবাদীদের দাবি- ‘ল্যুভর পরিয়ে দাও’ ঘটে যায় দর্শক অন্তরে। বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটে যায় কোনোরূপ রক্তপাত ছাড়াই।

জটায়ু বধ, কেন নয় সীতা হরণ?

অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝখানে ঢুকে পড়েছে যে বর্তমান, তাকে বুঝতে পারাই শিল্প। রাজা রবি বর্মা ও অবন ঠাকুরের যে পার্থক্য তা এই বর্তমানের ব্যবধান। সিপাহি বিদ্রোহ সমগ্র ভারতকেই নাড়িয়ে দিয়েছে অনেক অর্থেই। দীর্ঘ পাঠান-মোগল শাসন ভারতীয় সমাজকে খুব বদলে দেয়নি, সাধারণভাবে বদল যা হওয়ার ছিল তাও ‘নিজস্ব’তার অচলায়তনে আটকে রইল ‘ধর্ম ও জাতপাতের’ ঘেরাটোপে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ভারতের সমাজকেই বদলে দিচ্ছিল ভেতরে ভেতরে (যা আজও চলমান)।

রবি বর্মার ছবিটি যে বয়সে আমি দেখি, সে-বয়সে রবি বর্মা সিপাহি বিদ্রোহ দেখছেন। হয়তো সে-দেখা আমার ১৫ আগস্টের দেখার মতোই সুদূর উত্তরে এক নিস্তরঙ্গ শহরে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া আতঙ্কের মতোই। ১৫ আগস্টের সেই আতঙ্ক থেকে বেরোতেই আমি ইতিহাসের কাছে গিয়েছি বারবার। রবি বর্মাও সে পথের পথিক কিনা আমার জানা নেই; কিন্তু রবি বর্মার এ ছবিই আমাকে ধর্মীয় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতীয় পুরাণ ও তার গল্পগুলোতে বিশ্বাস আনতে সহায়তা করেছে। যাকে আধুনিক চেতনায় মিথ বলে। অংকন, ছায়াতপ, রঙ ও বিন্যাসের কৌশলে রবি বর্মার এ ছবি বিশ্বশিল্পেরই এক অমর সৃজন, তা বুঝতে চারুকলা পাঠ পেরোতে হয়েছে এটা ঠিক, তবে আজ লিখতে বসে, রবি বর্মার অন্যান্য ছবি দেখতে দেখতে একটি প্রশ্ন বারবার মনে উঁকি দিচ্ছে- কেন তিনি তার প্রতিষ্ঠিত বিন্যাস থেকে বেরিয়ে এ চিত্র আঁকলেন?

যেখানে তার সব ছবির মধ্যভাগ বিষয় বা ‘ফিগার’ দিয়ে ভরা। সেখানে এ ছবির মধ্যভাগ শূন্যতার সুদূরপ্রসারী। গল্পটা তো সীতা হরণের, গল্পে বর্ণিত রাবণের রথ কোথায়? তবে কি ইংরেজ শাসনকেই রবি বর্মা আঁকছেন? যে ভাবনাতেই আঁকুন ইউরোপীয় চিত্রকৌশলকে তিনি আত্মস্থ করেছিলেন ‘অপর’ ভাবনা থেকেই, দাস-প্রভু ভাবনা থেকে নয়।

শিশু প্রতিভা ও অস্থিরতার আশা

প্যারিসে ল্যুভর পুড়ে গেল তথা ছিঁড়ে গেল ইউরোপের চিত্রকলার প্রাতিষ্ঠানিকতার বাঁধন যে সূর্যোদয়ে, সেদিনের ইতিহাসে ইউরোপকে সগর্বেই উপস্থিত রাখলেন যে বখাটে, তার নাম টার্নার, জোসেফ ম্যালর্ড উইলিয়াম টার্নার (Joseph Mallord William Turner)। ব্রিটিশ শিশুপ্রতিভা।

চৌদ্দ বছর বয়সে রয়েল একাডেমির ছাত্র। ১৫ বছর বয়সে স্থাপত্য নকশাবিদ। ২৯ বছর বয়সে পরিপ্রেক্ষিত বিষয়ক অধ্যাপক। খ্যাতির সাথে সাথে আসে অর্থ। বিগড়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। ‘পোতাশ্রয়ের মুখে তুষারঝড়ের কবলে যন্ত্রচালিত জাহাজ’ অবশ্যি ১৮৪২ সালে, যখন তাঁর বয়স ৬৭ বছর।  প্যারিসে সূর্যোদয় ঘটে এর ত্রিশ বছর পর। এ ছবিটি শুধু প্রতিচ্ছায়াবাদীদের রক্ষাকবজ কিংবা অনুপ্রেরণা নয়, পরবর্তী বিমূর্ত প্রকাশবাদীদেরও প্রেরণা যেমন, তেমনি ব্রিটিশ চিত্রকর বেকন, সার্বিয়ার চিত্রকর ভøাদিমির ভালিকোভিচ কিংবা বাংলাদেশের শাহাবুদ্দিন আহমদের মতো নয়- বিমূর্ত চিত্রকরদেরও প্রেরণা, বিষয়ে না হলেও করণকৌশলে।

ছবিতে কোনো কিছুই স্পষ্ট নয়। ঝড় যেন সমস্ত ভেদরেখা মুছে দিচ্ছে, সমুদ্র ও আকাশ জল ও বাতাস হয়ে পরস্পরের সাথে একাকার। অন্ধকার ও আলো মিলেমিশে এক ধূসরতা চারদিকে। সেখানে যেটুকু আলো, আশা ও সম্ভাবনার, তা স্টিম চালিত নৌযান ঘিরেই। তা ছড়িয়ে পড়ে পট বা চিত্রের সীমানা পেরিয়ে সর্বত্রই।

শিল্প-বিপ্লবের ধাক্কায় ইউরোপীয় সমাজ টালমাটাল। ভেঙে যাচ্ছে এতদিনের সামন্ত গঠন, গণ বা গণতন্ত্রের উত্থান ঘটছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি তথা যন্ত্র সেখানে সম্ভাবনার আলো ছড়াচ্ছে।

বাংলাদেশের এক মফস্সল শহরের এক বাসার বৈঠকখানার দেয়ালে এ ছবির অনুলিপি ঝুলছে। নানাবাড়ি গেলে এ বৈঠকখানা সাত বছরের এক শিশুর খেলার জায়গা, সেখানে এ ছবি ছাড়াও আরও কিছু ছবি আছে, আছে কিছু খেলনা, যাকে ভাস্কর্য অভিধায় চিনেছে সে- শিশু যখন তরুণ। কিন্তু অন্তরের যে- শিশু সে খুঁজে চলছে এ ছবির ভেতরের স্টিমার ও তার ভেতরের মানুষগুলোকে। সে মানুষগুলো অসহায় না যোদ্ধা?

নাজিব তারেক : চিত্রকর ও লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares