যে কারণে আনোয়ারা সৈয়দ হক প্রাসঙ্গিক : লিটন মহন্ত

লিটল ম্যাগ

যে কারণে আনোয়ারা সৈয়দ হক প্রাসঙ্গিক

লিটন মহন্ত

একজন আলোকিত মানুষ ও বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী আনোয়ারা সৈয়দ হক, তিনি আমাদের অবশ্যই পাঠ্য এবং এই মর্মে প্রাসঙ্গিক যে, তিনি এক অনন্য জগৎ তৈরি করেছেন- যে অভিজ্ঞতা আমাদের চেতনাকে শানিত করে। প্রসঙ্গক্রমে প্রথমেই পাঠক হিসেবে স্বীকার করতে চাই যে, তাঁর সৃষ্টিকর্ম যেভাবে সাধারণ পাঠক দ্বারা পঠিত হওয়ার কথা ছিল, সেই তুলনায় হয়নি, এ ব্যর্থতার দায়ভার আমাদের,  কিন্তু তিনি একদিন ব্যাপকভাবে পঠিত হবেন এবং আলোচিত হবেন- এই প্রত্যাশা আমি শতভাগ করছি। যতদিন যাবে, তিনি ততই ক্রমশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন, কেননা তাঁর সাহিত্য শুধু সাহিত্য নয়, ব্যাপক অর্থে বাঙালির জাতীয় ও ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন পর্বের আখ্যান। তিনি তার সাহিত্যে যেমন মুক্তিযুদ্ধ, নারী স্বাধীনতা, বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, বিদেশি সাহিত্যর আলোকধারা, শিশুদের বিকাশ তত্ত্ব প্রভৃতি এনেছেন বিচিত্র ভাবনায়, যা ইতিপূর্বে বাঙালি সাহিত্যে তেমন ভাবে চোখে পড়ে না। সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক কাগজ পাতাদের সংসার দেরি হলেও আনোয়ারা সৈয়দ হককে নিয়ে যে অসাধারণ সংখ্যা করেছেন, এই জন্য সম্পাদক হারুন পাশা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। এই অমূল্য সংখ্যাটি করার জন্য আমি আন্তরিকভাবে হারুন পাশাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি। এই সংখ্যাটি মূলত এগারটি অধ্যায়ে বিভক্ত; প্রথমে আনোয়ারা সৈয়দ হক সম্পর্কে সামগ্রিক মূল্যায়ন করা হয়েছে, এখানে যারা লিখেছেন তারা হলেন- সনৎকুমার সাহা, মফিদুল হক, জাহিদুল হক, সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ, হুমায়ূন ইসলাম চৌধুরী, বেনজীন খান, ফজলুল হক সৈকত, মনি হায়দার, পিয়াস মজিদ ও তাকির হোসাইন। তাদের উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধে আনোয়ারা সৈয়দ হকের ভাবনা, চিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধ বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে, যেখানে আমরা তাঁকে এক অসামান্য লেখক ও মহীয়সী নারী হিসেবে দেখতে পাই। প্রাবন্ধিক সনৎকুমার সাহা তাঁর লেখায় বলছেন :

‘সম্প্রতি পড়ছিলাম আনোয়ারা সৈয়দ হকর শৈশবস্মৃতির অনবদ্য আলেখ্য, নরক ও ফুলের কাহিনী। পড়তে পড়তে এই ভেবে আফসোস হচ্ছিল যে, অকারণ ঢঙ্কনিনাদে পূর্ণ ও অকপটতার নামে আত্মপ্রচারসর্বস্ব বহু আত্মজীবনী এখানে বহুলপঠিত বলে গণ্য হয়। বাজারে জনপ্রিয়ও হয়। কিন্তু এই অসামান্য লেখনীঋদ্ধ, আত্মপ্রচারবিহীন অথচ সম্পূর্ণ অকপট আত্মজীবনী নিয়ে এখানে তেমন কোনো আলোচনা আমি সেভাবে দেখিনি। বইটির প্রথম প্রকাশ ২০০৭ সালে, এরপর আরও দশ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু এক মফিদুল হক বাদে তেমন কেউ এই বইটি নিয়ে লেখেননি। আনোয়ারা সৈয়দ হক এ গ্রন্থে যেমন নিজের শৈশবকে তুলে ধরেন অকুণ্ঠ-অলজ্জ কথামালায়, তেমনি কাটাছেঁড়া করতে ছাড়েন না নিজের পারিবারিক ইতিহাসকেও। ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ দারিদ্র্যময় জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত ক্ষোভ-হিংসার নানা প্রসঙ্গ এসেছে, ছোটবেলার হাসি-আনন্দ থেকে শুরু করে গ্লানি-অপ্রাপ্তির কথা কিছুই তিনি বলতে ভোলেননি। তাঁর পিতা-মাতার পরিবারে ধর্মীয়-আর্থিক পার্থক্য ছাড়াও নানা সাংস্কৃতিক তফাতও উপস্থিত ছিল। কিন্তু সেই সব ব্যবধানকে কীভাবে তিনি নিজের জীবনে গৌণ করে সমন্বয়ের মাধ্যমে আপন প্রতিভায় মানবিকতার পথে পা বাড়ান, সেই প্রস্তুতিপর্বের কথা বইটির ছত্রে ছত্রে পরিস্ফূট।’

আনোয়ারা সৈয়দ হক আমাদের দেশের একজন পথিকৃৎ মনোচিকিৎসক, দেশে এবং বিদেশে তিনি তাঁর পেশাগত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, এই ব্যস্ততার মাঝেও চলেছে নীরবে-নিভৃতে তাঁর সাহিত্যচর্চা। খুব কম মানুষের পক্ষে এ ধরনের অন্য ঘরানার মানুষ হয়ে লেখার জগতে আত্মনিয়োগ করা বেশ জটিল একটি কাজ। আমরা সকলে জানি তিনি হলেন প্রয়াত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের সহধর্মিণী, এক সাহিত্যের মহীরুহকে তৈরি করতে তার ব্যক্তিজীবন কতটা সাবলীল থাকা দরকার সেটা আমরা বিভিন্ন আলোচনায় দেখতে পাই; কীভাবে একজন স্ত্রী তার স্বামীর জীবনকে বাক্সময় করে তুলেছেন বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ থেকে, এখানেও আনোয়ারা সৈয়দ হক একজন সার্থক নারী। মূলত আনোয়ারা সৈয়দ হক একজন গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসেবে পাঠকদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। এই সংখ্যায় তাঁর উপন্যাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশ্লেষণমূলক লেখা লিখেছেন আবু রুশদ, সন্তোষ গুপ্ত, মোহিত কামাল, দিলারা হাফিজ, ঝর্না রহমান, মণিকা চক্রবর্তী, শাহনাজ নাসরীন, ইশরাত তানিয়া, প্লাবন ইমদাদ, সাদিয়া জাফরিন এবং শাহমুব জুয়েল। আনোয়ারা সৈয়দ হকের ছোটোগল্পের ধারা বিচিত্র এবং বহুপথগামী। যেখানে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন নারীবাদী এবং সমাজের দ্বারা নিগৃহীত নারী চরিত্রকে, যারা আমাদের চেতনাকে জারিত করে শুদ্ধ মানবসত্তা তৈরিতে সাহায্য করে। তাঁর গল্পের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট ও বয়ানধারা নিয়ে লিখেছেন- পবিত্র সরকার, আহমেদ মাওলা, আনোয়ারুল হক ও রেহানা পারভীন। লেখক মোহিত কামাল তাঁর তৃষিতা : জীবন তৃষ্ণার মূল্যবান এক আকরগ্রন্থ- প্রবন্ধে বলছেন ‘শারীরিক গড়ন, কামতৃষ্ণা ছাড়াও রোমান্টিক আবেগ-অনুভূতির সঙ্গেও রয়েছে ইস্ট্রোজেন এবং টেস্টোস্টেরনের গোপন খেলা। রাসায়নিক উপাদানের বিক্রিয়ার ফলে প্রেম, ভালোবাসা এবং মানবিক অনুভূতি নিয়ন্ত্রিত হয়।’ এই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টা আমরা লক্ষ করেছি তুলি ও মুশতাকের জীবনসত্তায়; সম্পর্কের গভীরতায়। মুশতাক আগ্রাসী ঔদ্ধত্য নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। তুলিকে উপদেশ দিয়েছে নিজেকে স্থির রাখার; আবেগের প্লাবন রোধ করে বুদ্ধি খরচ করে পথ চলার। এখানে আমরা দেখেছি মুশতাকের অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। আর আবেগের টানে চলতে গিয়ে বুদ্ধির ধার চলে গেছে তুলির, তাও দেখেছি সমগ্র উপন্যাসে। তৃষিতা উপন্যাসের গভীর তলে মনস্তাত্ত্বিক এক চেতনাপ্রবাহও রয়েছে নিয়তই বর্তমান। যা উপন্যাসটিকে অনন্য মর্যাদার আসনে তুলে ধরে রাখতে পেরেছে বলে বিশ^াস। আনোয়ারা সৈয়দ হকের গল্প সম্পর্কে আহমেদ মাওলা তার প্রবন্ধে বলছেন ‘পুরুষবেষ্টিত সমাজে নারীর নিজস্ব সত্তাগত দৃষ্টিকোণ থেকে শৈল্পিক পরিচর্যা, সচরাচর দেখা যায় না। আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘শূন্যতার সাথে নৃত্য’ গ্রন্থটি এদিক থেকে ব্যতিক্রম। গ্রন্থ শিরোনামের গল্পটি দিয়েই আলোচনার সূত্রপাত করা যায়, এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বোরকাপরা, মুখ নেকাব দিয়ে ঢাকা ফিরোজা। স্থান চলন্ত স্টিমার। ফিরোজা যখন স্টিমারের ভেতরের রহস্য খুঁজতে গিয়ে কৌতূহলী চোখ বুলিয়ে চারিদিকে দেখছিল, তখন তার পরহেজগার স্বামী আবুল বাশার নেকাব টেনে ধরে ব্যাকুলস্বরে বলে- ‘পরপুরুষের দিকে এত নজর দাও কেন গো?’ স্ত্রী ফিরোজার প্রতি ছুড়ে দেওয়া এই প্রশ্নবোধক বাক্যটি থেকেই স্পষ্ট হয় পুরুষের কর্তৃত্ব, প্রবল প্রতাপ- যা ফিরোজার নারীসত্তাকে পরাধীন, অবগুণ্ঠিত রাখতে বাধ্য করেছে। ‘শূন্যতার সাথে নৃত্য’ গ্রন্থের গল্পগুলোতে আনোয়ারা সৈয়দ হক এভাবে নারীর-সত্তার লাঞ্ছনা, নিপীড়নকে শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন। নারীত্বের অচরিতার্থ আকাক্সক্ষা, অবদমিত মনকে বিশ্লেষণ করেছেন নিপুণ হাতে- ‘পৃথিবীর মেয়েদের হয়তো অন্য ধাতু দিয়ে তৈরি করে পাঠান আল্লাহ। যেন পুরুষের শত অত্যাচারেও তারা না মরে।’ গল্পের ভাষ্য থেকেই পুরুষতন্ত্রের গ্র্যান্ডন্যারেটিভের দীর্ঘ ছায়ার নিচ থেকে পারুলী, নাসিমা, দৌলত আরা, ফিরোজারা নিজস্ব কণ্ঠস্বর ‘ভয়েজ’ আওয়াজ তোলে, জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতো পুরুষতন্ত্রের মুখোমুখি হয়। কেবল দলিত, নির্যাতিত, করুণ, অশ্রুসজল মুখ দিয়ে নয়- দৃঢ়, বলিষ্ঠ প্রতিবাদী চেতনা নিয়েও সামনে দাঁড়ায়। এখানেই আনোয়ারা সৈয়দ হকের গল্পের স্বাতন্ত্র্য। লেখক গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও শিশুসাহিত্যের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের মনোবিশ্লেষণ জগৎ নিয়ে বই লিখেছেন, এই বইগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন সৈয়দ শামসুল হক, ফারহানা মিঠু ও শাহ হেলাল উদ্দিন। ‘একটি অবশ্যপাঠ্য বই’ নিবন্ধে সৈয়দ হক লিখেছেনÑ ‘আসলে মনের অসুখ, দেহের অসুখের মতোই, যত্নে এবং কিছু নিয়ম প্রতিপালনের মাধ্যমে সারে।’ মানসিক সমস্যা সম্পর্কে আমাদের দেশে যে সচেতনতা বাড়ছে তার একটি প্রমাণ কিছুদিন আগে পাইÑ অধ্যাপক আনোয়ারা সৈয়দ হকের কাছে এক শ্রদ্ধেয় পির সাহেব তার স্ত্রীকে পাঠান মানসিক ব্যাধির চিকিৎসার জন্য, সেই পির সাহেব কিন্তু নিজেই ঝাড়ফুঁক বা তাবিজের ওপর নির্ভর করেননি। এই ধরনের উদাহরণ ক্রমশ বাড়ছে এবং বাড়ছে আনোয়ারা সৈয়দ হকের মতো চিকিৎসকের চেষ্টায়। আমি মনে করি, আমাদের দেশে এই ধরনের কেস হিস্ট্রি লিখে অধ্যাপক আনোয়ারা সৈয়দ হক এক বড় সামাজিক দায়িত্ব পালন করছেন। আবার একই সঙ্গে যেহেতু তিনি একজন প্রতিভাবান সাহিত্যিক, তার কলমের গুণে কেস হিস্ট্রিগুলো হয়ে উঠেছে সাহিত্য মূল্যসম্পন্ন রচনা। মানুষের মন, পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তার ভেতর সবচেয়ে বিচিত্র, সবচেয়ে দ্রুতগামী এবং সবচেয়ে ভঙ্গুর এই অর্থে যে, অত্যন্ত সামান্য সাধারণ কারণেই মনের ওপর বিরাট এক বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। মনের বিস্ময়কর দিক সম্পর্কে লেখক আমাদের সচেতন করেছেন অত্যন্ত সুন্দর এবং বাংলাদেশে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের মানসিক সমস্যার গল্পগুলো শীর্ষক এই বইয়ের মাধ্যমে। মন নেই, এমন মানুষ নেই। তাই প্রতিটি মানুষের এই বই অবশ্যই পাঠ্য তার নিজেকে জানার জন্য, অপরকে জানাবার জন্য।  কোমল মনের গভীর কথা- তুমি এখন বড় হচ্ছো প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক ফারহানা মিঠু লিখেছেন- ‘বইটি কোনো গল্পের বই নয়, উপন্যাসও নয়। আঠারোটি ছোটো ছোটো প্রবন্ধ রয়েছে বইটিতে। যে বিষয় নিয়ে প্রবন্ধগুলো লেখা তা গল্প-উপন্যাসের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। মানব-সন্তানের বেড়ে ওঠার সময়ের কথা-বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর-কিশোরীদের শরীর ও মন নিয়ে কিছু কঠিন সত্য। আমরা সাধারণ যা নিয়ে ভাবি না কিন্তু সকলই সেই কঠিন সত্যের মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠি। একটি ছেলে একটি মেয়ে তার শৈশব থেকে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে তার কৈশোরে। কিশোর কিশোরীর বয়ঃসন্ধিকাল। এই যাত্রা পথে কত যে প্রশ্ন , কত যে কৌতূহল, কত যে ভয়-ভীতি, অন্ধ সংস্কার, কত যে অভিমান, কত যে রাগ ভিড় করে মনের চারপাশে তা এক কথায় বলে শেষ করার নয়। তাই আঠারোটি ছোট ছোট প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে এই জটিল মানসিক সমস্যার সূত্রপাত ও সমাধানের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন লেখক আনোয়ারা সৈয়দ হক। শৈশব থেকে কৈশোরের নানান শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে কিশোর-কিশোরীরা বেড়ে উঠছে। বয়ঃসন্ধিকালের আবেগময় টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে তারা পথ চলছে। তাই প্রতি পদেই তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন- তুমি এখন বড়ো হচ্ছো। আনোয়ারা সৈয়দ হক চমৎকার নামকরণ করেছেন তার বইটির তুমি এখন বড়ো হচ্ছো। এটি একটি খুব প্রয়োজনীয় একটি বই।’  আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথার আলোয় লেখকের যে বইগুলো রয়েছে সেই সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখেছেন- সুশীল সাহা, জাকির তালুকদার, আলতাফ শাহনেওয়াজ, আফরিন শাহনাজ ও ইসমাইল সাদী। জনপ্রিয় গল্পকার ও ঔপন্যাসিক জাকির তালুকদার তাঁর ‘বহুমাত্রিক আনোয়ারা সৈয়দ হক : তাঁর অবরুদ্ধ’ প্রবন্ধে লিখেছেন- ‘তাঁর যুগপৎ সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য যে, তিনি ছিলেন সৈয়দ শামসুল হকের জীবনসঙ্গী। সৌভাগ্যের কথা থাকুক। আমরা বরং আনোয়ারা সৈয়দ হকের বিড়ম্বনার কথাই একটু ভাবতে চাই। নিজে প্রায় সার্বক্ষণিক লেখক তিনি। সাহিত্যের সব শাখায় কাজ করেছেন ব্যস্ততম চিকিৎসকদের একজন হয়েও। করছেনও। গল্প-উপন্যাস- কবিতা-প্রবন্ধ- কলাম-শিশুসাহিত্য সবকিছুতেই তার সিদ্ধি শিল্পের মানদণ্ডে পরীক্ষিত। কিন্তু তার পরেও তাঁকে ঢাকা পড়ে থাকতে হয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের কর্মকাণ্ডের ছায়ায়। আর তিনিও সেটা মেনে নিয়েছেন। চিকিৎসা ও লেখালেখির পাশাপাশি সামলে গেছেন এবং যাচ্ছেন সংসার-পরিবার। আর সেইসঙ্গে প্রিয়তম স্বামীর সকল অর্জনে সহযোগিতা করেছেন সম্পূর্ণ সামর্থ্য দিয়ে। নিজের লেখাগুলো লিখে গেছেন নীরবে। তবে সেগুলোকে প্রচারের আলোয় বা আলোচনায় আনার জন্য কোনোদিন ব্যতিব্যস্ত হননি। আর আমাদের হ্রস্বদৃষ্টির সাহিত্যবোদ্ধাদের দৃষ্টি যেহেতু সবসময় সীমাবদ্ধ থাকে নিজেদের নাকের ডগায় বসে থাকা মাছিটিকে দেখার মধ্যেই, তাই আনোয়ারা সৈয়দ হক রয়ে গেছেন তাদের আলোচনাসীমার বাইরেই। অনেকগুলো স্মরণীয় গল্প লিখেছেন তিনি। উপন্যাসেও আনতে চেষ্টা করেছেন নতুন মাত্রা। শিশুসাহিত্যে ছানার নানাবাড়ি তো একটি অসাধারণ সংযোজন।’ প্রাবন্ধিক এখানে লেখকের অবরুদ্ধ বইটি নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত, এখান লেখক এবং তার স্বামী সৈয়দ শামসুল হক কীভাবে ঢাকায় অবরুদ্ধ ছিল তারই ইতিহাস পাওয়া যায়। আনোয়ারা সৈয়দ হক বলছেন- ‘এই যুদ্ধে আমার তেমন কোনো অবদান নাই, তবে আছে অনেক অবমাননা।’ লেখকের বিভিন্ন প্রবন্ধ এবং গবেষণাধর্মী বই নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়, জাকির তালুকদার এবং মারুফা আখতার। প্রসঙ্গক্রমে জাকির তালুকদারের লেখা প্রবন্ধ ‘ল্যু সালোমে নিয়ে আনোয়ারা সৈয়দ হক’ একটি অসাধারণ লেখা যেখানে আনোয়ারা সৈয়দ হকের এক অনন্য নারীসত্তাকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন ভিন্ন ব্যাঞ্জনায়। আসুন পড়া যাক জাকির তালুকদারের ভাষায় ল্যু সালোমে কে ছিলেন- ‘দার্শনিক ফ্রেডরিখ নিৎসের সঙ্গে যাঁর ছিল গভীর চৈতন্যবোধে আলোড়িত এক আত্মিক সম্পর্ক, কবি রাইনার মারিয়া রিলকের সাথে যাঁর প্রেম ছিল, সুরস্রষ্টা ভাগনার ছিলেন যার বন্ধু, দার্শনিক পলরি ছিলেন যাঁর পেটোনিক ভালোবাসা এবং পেটোনিক বিবাহের সঙ্গী, ডাক্তার সিগমুন্ড ফ্রয়েড ছিলেন যাঁর পিতৃতুল্য কিন্তু গভীর এক রহস্যময় সম্পর্কে সম্পর্কিত, বহু ভাষাবিদ অধ্যাপক ফ্রেডরিখ কার্ল অ্যান্ড্রিয়াস ছিলেন যাঁর দীর্ঘদিনের স্বামী কিন্তু যাঁর সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি জীবনেও’ যে ল্যু ভন সালোমে পুরো ঊনবিংশ শতকে, অর্থাৎ তাঁর জীবনদ্দশাতে ইউরোপজুড়ে একটি মিথ, তিনি বাঙালি পাঠকের কাছে প্রথম উপস্থাপিত হয়েছিলেন আনোয়ারা সৈয়দ হকের মাধ্যমে।’ এই কাজটি করে লেখক এক ভিনদেশি বিদুষী নারীকে বাঙালি বোদ্ধা পাঠকের সামনে তুলে ধরে চেতনার প্রবাহে যে কুঠারাঘাত করেন, যা তাঁর গবেষণাধর্মী একটি মনস্তাত্ত্বিক লেখক সত্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই সংখ্যায় লেখকের ভ্রমণকাহিনি নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন আমিনুর রহমান সুলতান এবং পাপড়ি রহমান। আনোয়ারা সৈয়দ হকের শিশুসাহিত্য সত্যি অতুলনীয়, যা শিশুসাহিত্যের ভুবনে এক নবদিগন্তের সূচনা করেছে। এখানে তাঁর শিশুসাহিত্য নিয়ে মূল্যবান লেখা লিখেছেনÑ দিলারা মেসবাহ, হামিদ কায়সার, তাহমিনা কোরাইশী, ইমরুল ইউসুফ, আফরিদা জাহিন এবং নাদমান আরীব। আনোয়ারা সৈয়দ হক গদ্য সাহিত্যের পাশাপাশি কবিতা ও ছড়াও লিখেছেন।

তাঁর কবিতা সম্পর্কে কবি আসাদ মান্নান লিখেছেন- ‘তাঁর কবিতার মধ্যে আলাদা এক স্বাদ ও রস পাওয়া যায়।’  অন্য আর এক প্রাবন্ধিক সাবেরা তাবাসসুম লেখেন ‘আনোয়ারা সৈয়দ হকের কবিতা একই সাথে উচ্চকিত এবং গভীর। বিষয়ের প্রয়োজনে কখন গলা চড়াচ্ছেন, আবার গভীর বোধের জায়গায় মন্দ্রস্বরে বেদনার্ত গানটি শুনিয়ে যাচ্ছেন।’ এ ছাড়াও তার কবিতা নিয়ে মূল্যায়ন করেছেন মাহবুবা রহমান ও মজনু বিশদ। লিটলম্যাগটির শেষে রয়েছে আনোয়ারা সৈয়দ হকের একান্ত সাক্ষাৎকার, যা সম্পাদক নিজে নিয়েছেন এবং এখানে আলাপচারিতায় লেখকের ব্যক্তিজীবন ও লেখক জীবন, নারীবাদী সত্তা, মুক্তিযুদ্ধ, ল্যু সালেমো প্রভৃতি প্রসঙ্গ চলে এসেছে। এর পরেই রয়েছে লেখকের জীবন ও গ্রন্থপঞ্জি। লেখাটির শিরোনামেই আনোয়ারা সৈয়দ হকের প্রাসঙ্গিকতার বিষয়টি উল্লেখ করেছি, কারণ আমার ব্যাক্তিগত মূল্যায়ন হচ্ছেÑ এই বর্তমান অস্থির সময়ে তাঁর বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী লেখা যা মানুষের মন সম্পর্কিত এবং চেতন ও অবচেতনের চিত্র সংবলিত, যা নিজেকে জানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম, এখানে লেখক হিসেবে তিনি সার্থক এবং অদ্বিতীয়।

লিটন মহন্ত : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares