পড়ন্ত বিকেল : মুনিয়া মুন

গল্প

পড়ন্ত বিকেল

মুনিয়া মুন

আকাশটা কেমন মেঘলা মেঘলা, সূর্যটা দেখা যাচ্ছে না। সূর্য দেখা না গেলে কী হবে সে তার কাজ করেই যাচ্ছে। সূর্য তো আর মানুষের মতো অলস না যে, সে তার সকল কাজ ফেলে রেখে ঘুমিয়ে পড়বে। বরং সে তার কাজ করেই চলেছে ক্রমে- এমন তাপ দিচ্ছে যে, সবাই এখন হাফ সিদ্ধ। এভাবে যদি আর কিছুক্ষণ তাপ দেয়, তাহলে সবাই পুরো সিদ্ধ হয়ে যাবে। এমন গরমের মধ্যে ভরদুপুরে ছোটমামা এসে হাজির, অন্য কেউ হলে এই অসময়ে ছোটমামাকে দেখে আঁতকে উঠত। কিন্তু আমি আঁতকে উঠলাম না। কারণ কথায় কথায় আতঙ্কিত হওয়াটা আমার একদম পছন্দ না। ছোটমামাকে দেখে আমি কিছু না বলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম।

ছোটমামা ঝংকার মেরে বলে উঠলেন, এমন হাঁ করে দেখছিস কী। দেখছিস না আমি কেমন ঘেমে গেছি। যা তাড়াতাড়ি ফ্রিজের পানি দিয়ে আমার জন্য এক গ্লাস লেবুর শরবত বানিয়ে নিয়ে আয়, আর শোন শরবতে লেবু কম দিবি; তুই তো আবার সব কিছুতেই বেশি বেশি। এই তোদের  জন্যই দেশটার আজ এই হাল। যতদিন না পর্যন্ত তোদের মতো মানুষগুলোকে মিতব্যয়ী না করতে পারছি। ততদিন পর্যন্ত আমরা মাছে ভাতে বাঙালিই থেকে যাব। মাংসে ভাতে বাঙালি হতে পারব না কখনওই।

বাসার সবাই দুপুরে একটা ছোটখাটো ভাতঘুম দেয়। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না। ছোটমামার চিৎকার চেঁচামেচিতে সবাই ছুটে এসেছে। কী হয়েছে তা দেখার জন্য আম্মু ছোটমামাকে দেখে কিছুটা ভড়কে গেল। তার পরও নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল কী রে তুই এই ভরদুপুরে? না মানে একটা মিটিং করতে ঢাকায় এসেছিলাম। তাই ভাবলাম তোদের একটু দেখে যাই।

এসেছিস ভালো করেছিস কিন্তু এমন চিৎকার চেঁচামেচি কেন? তোর অপচয়কারী ছেলেটাকে মিতব্যয়ী হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি। এরপর ছোটমামা তার সেই পুরোনো রেওয়াজ অনুসারে শুরু করলেন তার শ্রীহীন লেকচার; ওনাকে দেখে মনে হবে এইমাত্র উনি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে মিটিং করে এসেছেন। সেইসঙ্গে ওবামার আবদারে তার কথা রক্ষা করতে গিয়ে হোয়াইট হাউসে দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে এসেছেন।

ছোটমামা কিছুক্ষণ লেকচার মেরে বাথরুমে ঢুকলেন ফ্রেশ হওয়ার জন্য। আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ছোটমামা যখন লেকচার দেন, তখন আমার আর ভাইয়ার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার লেকচার শোনা লাগে। একটু অন্যমনস্ক হলেই শুনতে হয় তার বকা। আর শাস্তি হিসেবে তার লেকচার আরও বিশ মিনিট লম্বা হবে। মামা বাথরুমে ঢোকার পর যে যার যার মতো চলে গেল। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি আর ভাইয়া। ভাইয়ার মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। ছোটমামার অত্যাচারের টার্গেট হলো আমি আর ভাইয়া। আমি একটু ছোট হওয়ার কারণে আমাকে একটু কম হেনস্তা করে। কিন্তু ভাইয়া কোনো উপায়েই পার পায় না। ছোটমামা আমাদের বাসায় আসা মানে আমাদের আগামী কয়েকদিনের আরামের ঘুম হারাম। কে জানে এবার কয়দিনে বিদায় হবে এই আপদ।

ছোটমামা বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখেন আমরা হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। তিনি বললেন, কী রে অপদার্থের ঝুলি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? ভাইয়া বলল, না মানে ইয়ে। আবার কথা বলে, যা ভাগ এখান থেকে। ছোটমামার কথা শুনে আমরা হুড়মুড় ছুটতে লাগলাম, মনে মনে বললাম, যাক আপদটা শরবতের কথা ভুলে গেছেন।

গরম কিছুটা কমেছে, আস্তে আস্তে সূর্যটা লাল হয়ে যাচ্ছে। আছরের আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ভাইয়া বাথরুমে ঢুকল ওজু করতে। অন্য কোনোদিন ভাইয়াকে বলেও নামাজ পড়ানো যায় না। কিন্তু আজ ভাইয়া আপনা আপনিই নামাজ পড়তে যাচ্ছে। আজব ব্যাপার! ভাইয়া বাথরুম থেকে বের হয়ে হাত-মুখ মুছতে মুছতে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল। আমি কী নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করছি তার কিছুটা আঁচ করে ভাইয়া বলে উঠল, অবাক হওয়ার কিছু নেই। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে, ছোটমামার যেন জ্বর হয়। জ্বরের তাপে উনি যেন আধমরা হয়ে যান। যেন উনি বাকরুদ্ধ হয়ে যান। এভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে তুইও ওজু করে আয়।

তুই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবি ছোটমামা যেন কানা হয়ে যান। ওনার একটা পা যেন খোঁড়া হয়ে যায়। একা একা আমি আল্লাহর কাছে তো একেবারেই এতগুলো জিনিস চাইতে পারি না। তাই ভাগে নিলাম বুঝেছিস। যা তাড়াতাড়ি যা।  নামাজ শেষ করে আমি আর ভাইয়া বসে অছি ব্যালকনিতে। ভাইয়ায়ও কিছু বলছে না। আমিও কিছু বলছি না। ভাইয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। তাকে দেখে মনে হবে, সে চোখের ইশারায় আকাশের কাছে মামার অত্যাচারের বর্ণনা দিচ্ছে। আর কী করে ছোটমামার জুলুম থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় তার জন্য সাহায্য চাইছে। প্রতিদিন এই সময়ে আমি আর ভাইয়া টেলিভিশন দেখি। কিন্তু আজকে টেলিভিশনের রুমটা ছোটমামা দখল করে আছেন। মামা জানেন এই সময়ে আমরা টেলিভিশন দেখি।

তাই অন্য রুম থাকা সত্যেও উনি টেলিভিশনের রুমে বসে আছেন। তার উদ্দেশ্য- আমাকে আর ভাইয়াকে টেলিভিশন দেখতে দেবেন না। টেলিভিশন দেখলে নাকি আমি আর ভাইয়া বখে যাব। আর আছেই বা কী ওই টেলিভিশনে। শুধু শুধু কারেন্ট নষ্ট হয়। দেশের অর্থনীতি দুর্বল করার পেছনে আমরা নাকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করি। ছোটমামার চিৎকারে আমরা ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম কখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে সেদিকে আমাদের কোনো খেয়ালই নেই। আমি ভাইয়াকে বললাম, ভাইয়া মামা ডাকছেন যাবে?

ভাইয়া আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে মামার কণ্ঠস্বর ধরে এগিয়ে গেলেন। আমি ভাইয়ার পেছন পেছন ধীর পদক্ষেপে হাজির হলাম।

মামা আমাদের  দেখে বললেন, তোদের মুখটা এমন পাঁচের মতো কেন? ভাইয়া বলল, কই আমাদের মুখ পাঁচের মতো না তো।

আবার কথা বলিস, আমাকে তুই পাঁচ চিনাচ্ছিস। আমি বলেছি ওই কথা আমাকে কোনো কথা স্পষ্ট করে বলা লাগে না। আমি এমনিতেই সাইকোলজির ছাত্র। আমাদের ডিপার্টমেন্টে আমি হাইস্কোর করেছি বুঝেছিস। যতসব অপদার্থের দল। এ কথা শোনার পরে ভাইয়া আর কিছুই না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তাকে দেখেই বোঝা যায়, তার মনের ভিতর সাইক্লোন হচ্ছে আর যদি সেই সাইক্লোনের বহিঃপ্রকাশ হতো, তাহলে ছোটমামাকে উড়িয়ে নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে ডুবিয়ে মারত।

ছোটমামা আমার দিকে তাকিয়ে ঝংকার দিয়ে বলে উঠলেন। এভাবে হাবলুর মতো তাকিয়ে দেখছিস কী। যা টেলিভিশনটা অন কর। সব কি আমাকেই বলে দিতে হবে। নিজের জ্ঞান খাটিয়ে কিছু করতে পারিস না। এদের কমনসেন্স বলে কিছুই নেই।

আমার এখন উচিত দৌড়ে গিয়ে টেলিভিশনটা অন করা আর যদি আমি টেলিভিশন অন করার আগে কারেন্ট চলে যায়, তাহলে এখনই ঢাকার মেয়রকে ফোন করে ধমকের স্বরে বলতে হবে, এই কারণে আপনাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছি? জানেন আমাদের বাড়িতে এখন ছোটমামা আছেন। যিনি আজ দুপুরে বারাক ওবামার সাথে মিটিং করে এসেছেন। আর তিনি এখন টেলিভিশন দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু কারেন্ট নেই। তাড়াতাড়ি আপনি বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করেন না। হলে মামার একটা ফোনই আপনাকে মেয়র থেকে মাকড়সা বানাবে। কিন্তু আমি তার কিছুই করলাম না। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মামার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম।

ছোটমামা আমার দিকে বাঁকাচোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কী রে আমার কথা কানে যাচ্ছে না। আমার বাংলা কথা তুই বুঝিস না। তাহলে আমি কি এখন হিন্দিতে বলব, এই যে অপদার্থের ফ্যাক্টরি তাড়াতাড়ি যাচ্ছে। আর টেলিভিশনটা অন করছে।

আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, মামা তুমি তো জ্ঞানের ভাণ্ডার তাই না।

কেন তোর কোনো সন্দেহ  আছে?

না। তা নেই। তাহলে, আচ্ছা মামা, তুমি তো নিজেই মিতব্যয়ী হতে শিক্ষা দাও। তাই না, হু তাহলে তুমি এখন কেন খালি খালি কারেন্ট অপচয় করছ?

মামা আশ্চর্য হয়ে বললেন, আমি কারেন্ট অপচয় করি। হ্যাঁ কোনদিক দিয়ে অপচয় করি শুনি?

এই যে, তুমি বলেছিলে টেলিভিশন দেখা একটা ফালতু কাজ। শুধু শুধু কারেন্ট নষ্ট হয়। আমার কথা শুনে মনে হয় মামার মাথা হ্যাং হয়ে গেছে। তিনি কী বলবেন বুঝতে পারছিলেন না। কিছুক্ষণ ভেবে বললেন আমি কি টেলিভিশনে তোদের মতো আজেবাজে জিনিস দেখি। আমি সংবাদ ছাড়া আর কিছুই দেখি না। আমি কি তোদের মতো যে দেশে থাকব, সেই দেশে থাকব। যে দেশের খাবো। আর সেই দেশেরই কোনো খোঁজখবর রাখব না। যতসব ভিজা দেশলাই। মামার মতে আমি তাকে মিতব্যয়ী হওয়ার জ্ঞান দিয়ে অনেক বড় ধরনের অপরাধ করেছি। আর সেই অপরাধের শাস্তিস্বরূপ মামা এখন থেকে আর ফ্যান চালিয়ে শরীর ঠান্ডা করবেন না। যখনই মামার গরম লাগবে, তখনই আমি হাতপাখা দিয়ে বাতাস করব। এতে নাকি অনেক কারেন্ট বেচে যাবে।

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর দীর্ঘ দুই ঘণ্টা সময় ধরে ছোটমামাকে বাতাস করে ক্লান্ত শরীরে যখন বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম, তখনই শুনতে পেলাম মামা ভাইয়াকে কী নিয়ে যেন ধমকাচ্ছেন। কী হয়েছে তা বুঝে ওঠার আগেই দেখি ভাইয়া গোমড়া মুখে আমার রুমে এসে হাজির। আমি কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই ভাইয়া বলে উঠল, নবাব সিরাজউদ্দৌলা এসেছে আমাদের বাসায়। উনি নাকি গেস্টরুমে ঘুমাবেন না। কারণ সেখানে নাকি ইলেকট্রিক ফ্যান আস্তে আস্তে ঘোরে। রুমটা নাকি কেমন অন্ধকার অন্ধকার দেখতে ভুতুড়ে মনে হয়। তার ওপর আবার অনেক মশা। এ কারণে নবাব আমার ঘরে আশ্রয় নিয়ে আমাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিলেন। ভাইয়া একনাগাড়ে কথাগুলো বলে দড়াম করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। দেখে মনে হয়, ভাইয়ার মেজাজটা বেশ চড়ে আছে। তাই আমি আর কিছু না বলে ভাইয়ার পাশে চুপটি মেরে শুয়ে পড়লাম। দু’জন নীরবতা পালন করছি। হঠাৎ করে ভাইয়া বলল, শহীদুল্লাহ হলে ফোন করতে হবে। কথাটা শুনেই রাহাত ভাইয়ার কথা মনে পড়ে গেল। রাহাত হলো মেজ খালার একমাত্র ছেলে। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রিতে অনার্স করছে। যাকে নিয়ে শহীদুল্লাহ্ হলে অনেক অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় মানুষ সারাবছর ভ্রমণ করে বেড়ায়। এই সুন্দরবন তো এই বান্দরবান। আমি আর ভাইয়া সবসময় রাহাত ভাইয়ার ভ্রমণের সাথি হতে চাই। কিন্তু আমাকে নেয় না আমি ছোট বলে। আর ভাইয়াকে বলে এবার আমি একা যাই। এর পরের বার যদি কোথায়ও যাই নিশ্চয়ই তোকে নিয়ে যাব। পরের বার বলে আর পরের বার। এভাবে ভাইয়া আর আমার কারও ভ্রমণে যাওয়া হয় না। আমি ভাইয়াকে বললাম, কিন্তু রাহাত ভাইয়া হলে আছে না আবার ভ্রমণে বেরিয়েছে। তা তো জানতে হবে, আমার কথা শুনে ভাইয়াকে কিছুটা চিন্তাগ্রস্ত মনে হলো। কী যেন ভেবে বলল, রাহাত ভাইয়াই পারে আমাদের ছোটমামার অত্যাচার থেকে মুক্ত করতে।

আমি আর ভাইয়া কিছুক্ষণ ছোটমামাকে কীভাবে আমাদের বাড়ি থেকে তাড়ানো যায় তার চিন্তা করলাম। ভাইয়া চিৎকার করে বললÑ আমার এখন কী হতে ইচ্ছে করে জানিস? ভাইয়ার চিৎকার শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। না জানি ছোটমামা ভাইয়ার কথা শুনে ফেলে। আমি কিছুটা কাঁপা গলায় বললাম জানি না। আমার এখন ইচ্ছে  করছে আমি একজন পুলিশ অফিসার হতে। আর পুলিশ হয়ে আমি সবার আগে ছোটমামাকে খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে যাবজ্জীবন অথবা মৃত্যুদণ্ড দেব।

কিন্তু ভাইয়া খুনের অপরাধের শাস্তি তো পুলিশ দেয় না। দেয় যদি ম্যাজিস্ট্রেটে তাহলে আমি মামাকে জেলের মধ্যে ক্রসফায়ার করে মেরে ট্রেনের মধ্যে ফেলে দেবে। তার পরে কয়দিন পরে লাশ পচে যখন দুর্গন্ধ বের হবে, তখন ব্যাপারটা জানাজানি হলে তোমরই যাবজ্জীবন কিংবা ফাঁসি হয়ে যাবে।

আরে বোকা ঢাকা শহরের ট্রেনের ময়লা-আবর্জনার যে ভ্যাপসা গন্ধ। সেখানে পচা লাশের গন্ধকে গন্ধ বলে না। বলে সুগন্ধ।

আমি মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিলাম ভাইয়ার কথাটা যুক্তিসঙ্গত। ভাইয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমাকে বলে তোর মাথায় মামাকে তাড়ানোর কোনো বুদ্ধি আছে। আমি কতক্ষণ ভেবে বললাম, ভাইয়া যদি আমার একটা আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপ থাকত। তাহলে কী হতো জানো? ভাইয়া মাথা নেড়ে বলল, সে জানে না, আমি বললাম যদি আমার একটা আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপ থাকত তাহলে আমি মামার রূপ ধারণ করে রমনা থানায় গিয়ে দারোগার সামনে তার জেলের ভেতরের সব আসামিকে গুলি করে খুলি উড়িয়ে দিয়ে চলে আসতাম। আর আমাকে অনুসরণ করে নিশ্চয়ই অনেক পুলিশ আমাদের বাসায় আসবে। তখন তারা মামাকে আমি মনে করে ধরে নিয়ে যাবে। আমি এতক্ষণে আমার আগের রূপে ফিরে আসব। মামাকে পুলিশ ধরে নিয়ে আচ্ছা করে একটা ধোলাই দেবে। আর এতগুলো মানুষ মার্ডার করার শাস্তি তো আর কম না। হয়তো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নয়তো ফাঁসি। বাস কেল্লা খতম। তাতে কারও ধরা পড়ার কোনো ভয় নেই।

আমার কথাটা মনে হয় ভাইয়ারও মনে ধরেছে। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তুই ঠিক বলেছিস। কিন্তু তা তো আর সত্যি সত্যি হবে না। আমরা আলাউদ্দিনের আশ্চার্য প্রদীপ পাবই-বা কোথায়?

আমরা পরের দিন সকালের অপেক্ষায় কথা বলতে বলতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি তা টেরই পাইনি।

সকালে ঘুম ভাঙল ভাইয়ার ডাকে। ভাইয়াকে আজ বেশ তরতাজা মনে হচ্ছে। গতকালের বৈরী ভাবটা আজকে কিছুটা কমে আসছে। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে ভাইয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম কী হয়েছে? ভাইয়া অত্যন্ত  উৎফুল্ল, বলল, রাহাত ভাইয়াকে ফোন করেছিলাম। তিনি হলেই ছিলেন। দু-তিন দিন পরে নাকি রাঙামাটি যাবে। আমি ভাইয়াকে সব কথা খুলে বলতে পারিনি। ভাইয়াকে শুধু বলেছি খুব দরকারি একটা কাজ আছে তাড়াতাড়ি আসতে।

ভাইয়ার কথাটা শুনে আমার মনটাও ফুরফুরে হয়ে গেল। যাক এবার তাহলে ছোটমামার অত্যাচার থেকে পরিত্রাণের সময় এসেছে। ভাইয়াকে উৎকণ্ঠিত হয়ে বললাম, রাহাত ভাইয়া আসবে বলেছে তো?

আর বলেছে মানে, আজ সকাল ৯টার আগেই ভাইয়া আমাদের বাসায় পদার্পণ করবে। ভাইয়ার কথায় কিছুটা স্বস্তিবোধ করছি।

আমি আর ভাইয়া আর একবারও রুম থেকে বের হলাম না। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম ৯টা বাজার। কিন্তু আমাদের ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো না। তার আগেই রাহাত ভাইয়া এসে হাজির। আম্মু দরজা খুলে দিল। রাহাত ভাইয়ার কণ্ঠ শুনে আমাদের আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো আনন্দ হলো।

আমরা রুম থেকে বের হয়ে বীরদর্পে রাহাত ভাইয়ার দিকে এগিয়ে গেলাম। এই মুহূর্তে কেউ আমাদের দেখলে মনে হবে আমরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে হ্যান্ডসেক করতে যাচ্ছি।

রাহাত ভাইয়াকে কোনো রকমে টেনেহিঁচড়ে আমাদের রুমে এনে ছোটমামার যাবতীয় অত্যাচারের বর্ণনা দিলাম। সব শুনে রাহাত ভাইয়া যতটা সম্ভব মুখটা গম্ভীর করে দার্শনিকের মতো বলল, তোদের অবস্থা তো তাহলে বেগতিক। ভাইয়া রাহাত ভাইয়ার কথাকে সায় দিয়ে বলল, হু বড়ই বেগতিক। তুমি কিছু একটা করো ভাইয়া। তা আমি কী করতে পারি শুনি।

তোমার যা ইচ্ছা তাই করো। তোমার যদি ইচ্ছা হয় ছোটমামার হাত-পা বেঁধে তার প্যান্টের মধ্যে মৌচাক ভেঙে দিতে। অথবা তাকে বস্তার মধ্যে ভরে আটলান্টিক মহাসাগরে ফেলে দিতে। তাহলে তাই করো। আমাদের কোনো আপত্তি নেই। ভাইয়া আমাকে লক্ষ্য করে বলল, কীরে তোর কোনো আপত্তি আছে।

আমি মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলাম আমার কোনো আপত্তি নেই।

ছোটমামা সম্পর্কে আলোচনার একপর্যায়ে রাহাত ভাইয়া বলল, আগে আমাকে বলো ছোটমামা কোথা থেকে উদয় হয়েছে। ছোটমামা তো কারও বাসায় তেমন একটা আসে না। হঠাৎ করে তাহলে তোদের বাসায় এলো কেন? নিশ্চয়ই এর কোনো একটা হেতু আছে।

ভাইয়াও কিছুটা চিন্তিত মুখে বলল, ঠিক বলেছ ভাইয়া। মামা থাকে চিটাগাং। মামাকে একশ’ বার ফোন করেও ঢাকায় আনা যায় না। এই ধরোই না, মাহী আপুর বিয়েতে সবাই মিলে সাত দিন ধরে কেমন হৈ-হুল্লোড় করলাম। আমরা পুরো গুষ্টি মিলে মামাকে দিনে ৫০ বার ফোন করেও ঢাকায় আনতে পারলাম না। আর আজ হঠাৎ ছোটমামা কাউকে কিছু না বলে সোজা চিটাগাং থেকে ঢাকায়।

হু কিছুটা সন্দেহের ব্যাপারÑ মামা কোথা থেকে এসেছেন তার কিছুই কি বলেছেন। হ্যাঁ বলেছেন। কোথায় একটা মিটিং না ফিটিং ছিল। তা শেষ করেই এখানে এসেছেন। আচ্ছা মামা তো সেই কবেই ইউনিভার্সিটির পাট চুকিয়ে এখন রাজনীতির খাতায় নাম লিখিয়েছে।

তাইতো শুনেছি।

চল আমরা ছোটমামার সাথে একটু গল্প করে আসি।

তোমার তো সাহস কম না ইচ্ছা করে সাপের গর্তে পা ঢোকাও।

প্রথমে আমরা কেউ ছোটমামার কাছে যেতে রাজি হলাম না। কিন্তু রাহাত ভাইয়ার জোরাজুরিতে গেলাম। শর্ত হলো আমরা ছোটমামার সাথে সকল ধরনের কথাবার্তা থেকে বিরত থাকব।

আমাদের বিশেষ করে রাহাত ভাইয়াকে দেখেই মামা বলে উঠলেন, কী ব্যাপার অপদার্থের দল দেখি আস্তে আস্তে বড় হচ্ছ। তা নেতাজির চামচারা, তোমরা নিশ্চয়ই খবর দিয়ে নেতাজিকে ডেকে পাঠিয়েছ। ছোটমামার কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে রাহাত ভাইয়া বলল, কী যে বলেন মামা আমি নেতাজি হতে যাব কেন? আর এরাই আমাকে ফোন করবে কেন?

তা আমি আসার পরের দিনই কী মনে করে আপনার উদয় হলো।

এমনি এসেছি। অনেক দিন হলো কোথাও যাইনি। তাই ভাবলাম একটু ঘুরে আসি।

হয়েছে হয়েছে। আমাকে বোকা বানাতে হবে না। তুই ভাবছিস আমি কিছু বুঝি না। আমি সবার চেহারা দেখেই বুঝতে পারি কে কী করে। আমি হলাম গিয়ে সাইক্লোজিস্ট। আমাদের ডিপার্টমেন্টে আমি হাইস্কোর করেছি। সাইক্লোজি ডিপার্টমেন্টে আমি ৫০ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছি।

রাহাত ভাইয়া মামার কথাগুলো আগ্রহভরে শোনার ভঙ্গিতে বলল, ও আচ্ছা।

তা তুই তো কী সব কেমিস্ট্রি না ফেমিস্ট্রি পড়ছিস। ওটা কোনো সাবজেক্ট হলো। খালি খালি সময় নষ্ট। যত সব পুকুর ভরা কাদা।

এ কথা শুনে রাহাত ভাইয়ার রেগে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি রাগ করলেন না। বরং মুখটা হাসি হাসি করে বললেন, ঠিক বলেছ মামা। আমরা তো তোমার মতো এত ভেলিয়েন্ট স্টুডেন্ট না। পেয়েছি একটা যাচ্ছেতাই সাবজেক্ট। আর তাই আঁকড়ে আছি।

এখন আর আফসোস করে লাভ নেই। যখন সময় ছিল তখন তো আমার কাছ থেকে একবারও জিজ্ঞাসা করতে এলি না।

তা মামা আপনি হঠাৎ কী মনে করে কাউকে কিছু না বলে সোজা ঢাকা ফ্রম চিটাগাং।

রাহাত ভাইয়ার কথা শুনে মামা প্রায় আঁতকে উঠলেন। তার পরও নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, তুই আমার দিকে এমন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছিস কেন? আমি কি আমার বোনের বাসায় আসতে পারি না। না তা পারেন।

কিন্তু…

কিন্তু কীসের রে। দু’দিনের পোলাপান এসেছে আমার স্বীকারোক্তি নিতে। ইডিয়ট কোথাকার। মামা মনে হয় রেগে আছে। পুরো মুখ লাল হয়ে গেছে। রাগে তার দাঁতগুলো কিড়মিড় করছে। কী ব্যাপার মামা এমন সামান্য কথা নিয়ে এমন রেগে গেলেন। অবস্থা কিছুটা নরমাল করার জন্য রাহাত ভাইয়া মামার সবচেয়ে প্রিয় প্রসঙ্গ সম্পর্কে কথা বলা শুরু করল।

আচ্ছা মামা তুমিতো অনেক বড় পলিটিশিয়ান। তাই না?

কেন আমাকে কি সায়েন্টিস্টদের মতো লাগছে। মামা আমরা তো রাজনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ। তুমি যদি অনুগ্রহ করে একটু রাজনীতির আলোচনা করতে। তাহলে বড়ই উপকৃত হতাম। রাহাত ভাইয়া আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, কী বলিস তোরা।

আমরা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা রাজনীতি সম্পর্কে কিছুই জানি না। মামাকে এখন কিছুটা আনন্দিত মনে হচ্ছে। ওনার মুখে সূক্ষ্ম হাসির ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। পাগুলো ছড়িয়ে বসতে বসতে মুখটা দার্শনিক প্লেটোর মতো করে বললেন, তোদের আর নতুন করে কী বলব, তোরা তো আমার অতি মূল্যবান কথাগুলো এক কান দিয়ে শুনবি অন্য কান দিয়ে বের করে দিবি। আমি তো সেই ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছি। নীতির রাজা হলো রাজনীতি। রাজনীতির সথে জড়িত হলে অন্তর পরিসুদ্ধ হয়। রাজনীতি করে দেশের জন্য জীবন দিলেই প্রকৃত সুখের সন্ধান পাওয়া যায়। একটা দেশের সর্বাধিক উন্নতির জন্য রাজনীতিবিদরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

মামার এমন একঘেয়ে লেকচার শুনতে শুনতে আমাদের প্রায় তন্দ্রা লেগে গিয়েছিল। তার পরও নিজেকে যতটা সম্ভব আগ্রহী করে মামার লেকচার শুনতে লাগলাম।

তোরা তো নিজের চোখের সামনে কাউকে অত্যাচারিত হতে দেখলেও কিছু বলিস না। মুখ বুজে কাপুরুষের মতো সহ্য করিস। আর আমি সেই ভার্সিটি লাইফে কেমন ছিলাম। আহা দুর্দান্ত একটা যুবক। কখনও অন্যায় সহ্য করতে পারতাম না। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার একটাই টার্গেট থাকত। অত্যাচারীকে বধ করা। আর অত্যাচারিতকে সাহায্য করা।

রাহাত ভাইয়া ঘুমের ঘোর কিছুটা কাটিয়ে উঠে বলল, মামা একটু মিছিল, ধর্মঘট, হরতালের কথা বলেন। ছোটমামার মুখটা হঠাৎ করে একশ’ ওয়াটের বাল্বের মতো জ্বলে উঠল। কিছুটা উদাস ভঙ্গিতে বলল, সে আর কী বলব, এমন কোনো মিছিল ছিল না, যেখানে তোদের এই ছোটমামা অনুপস্থিত। আর হরতালের কথা কী বলব, হরতালের দিন আমার একটাই কাজ ছিল কোনোরকম ভাংচুর না করে শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন করা। একদিনের কথা এখনও মনে পড়ে। সেদিন হরতাল পালন করতে গিয়ে যা একট কাণ্ড ঘটেছিল। আমরা হরতাল পালন করব তাতে ওই পুলিশ বেটাদের কী আসে যায়। খালি খালি আমাদের ডিস্টার্ব করে। তাই একদিন পুলিশগুলোকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য ওদের রাইফেলগুলো কেড়ে নিয়ে ইচ্ছামতো ধোলাই দিলাম।

এতক্ষণ পর্যন্ত আগের শর্ত মতে আমি আর ভাইয়া একটা কথাও বলিনি। কিন্তু আর চুপ করে থাকা যায় না। তাই ভাইয়া বলেই ফেলল, কী বল মামা, তোমরা পুলিশদের থেকে তাদের রাইফেল কেড়ে নিয়ে তাদেরই আবার ধোলাই দিয়েছ।

ছোটমামা এবার আনন্দে আটখানার জায়গায় ষোলোখানা হয়ে বলল, তোরা মাত্র একটা কাহিনি শুনেই এমন অবাক হাচ্ছিস। তোদের মতো আমি ঘরের কোনায় বসে থাকিনি। তোরা তো নন্দলালের উত্তরাধিকারী। রাহাত ভাইয়া এতক্ষণ কী যেন ভাবছিল। হঠাৎ কী মনে করে যেন তাকে কিছুটা আনন্দিত মনে হলো। রাহাত ভাইয়া কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ছোটমামাকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার মনে আছে মামা, তখন তুমি নতুন ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছ। একদিন কিসের যেন একটা সমস্যা হয়েছিল। তখন তোমরা ভার্সিটিতে ধর্মঘট ঘোষণা করে একটা মিছিল নিয়ে বের হয়েছিলে। মিছিল কিছুটা এগোতেই পুলিশ এসে বাধা দিল। কিন্তু তবুও মিছিল থামল না। পুলিশকে উপেক্ষা করে মিছিল এগোতেই থাকল। অবস্থা বেগতিক দেখে পুলিশ গুলি করতে শুরু করল। পুলিশের গুলিতে তোমার পাশের একটা ছাত্র সাথে সাথেই মারা গেল। তা দেখে তুমি তো অনেক ভয় পেয়ে গেছ। তার ওপর একটা পুলিশ তোমাকে লক্ষ্য করে একটা গুলি ছুড়ল।

কিন্তু ভাগ্যক্রমে বোকা পুলিশটার হাতের নিশানা ভালো ছিল না। তাই গুলিটা তোমার গায়ে না লেগে তোমার পাশের একটা ছাত্রের গায়ে লেগে সে ইহলোক ত্যাগ করল। আর তা দেখে তুমি অজ্ঞান হয়ে গেলে। সাত দিন পরও যখন তোমার জ্ঞান ফিরল না, তখন আমরা ভাবলাম তুমি আর সুস্থ হবে না। এবার নিশ্চয়ই তুমি পটল তুলবে। এদিকে আম্মু খালাদের সে কী কান্না।

রাহাত ভাইয়ার কথা শুনে আমরা সেখানে ছোটমামার উপস্থিতি ভুলে গিয়ে হা-হা-হা করে হেসে উঠলাম। কিছুক্ষণ পরে আমাদের মনে হলো এখানে ছোটমামা বসে আছেন। কিন্তু ততক্ষণ অনেক দেরি হয়ে গেছে। যা হওয়ার তাই হয়ে গেছে। ছোটমামা রাগে প্রায় ফেটে পড়ছেন। চোখগুলো লাল হয়ে আছে। জোরে জোরে ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছেন।

ছোটমামার মতে আমরা একটা দুর্ঘটনাকে তামাশা করে অনেক বড় ধরনের অন্যায় করেছি। এর জন্য শাস্তি অনিবার্য। গুলি মিস যাবে কিন্তু তোদের ছোটমামার কথা মিস হবে না।

রাহাত ভাইয়া তার মোবাইল ছাড়া এক মিনিট চলতে পারে না। প্রতি সেকেন্ডে তার কাছে তিনটা কল আসে। তা ছাড়া সাথে ফেসবুক, গুগল, টুইটার ইত্যাদি তো আছেই। আর রাহাত ভাইয়ার সেই মোবাইলটা ছোটমামা অনির্দিষ্টকালের জন্য বাজেয়াপ্ত করলেন। এটাই হলো রাহাত ভাইয়ার শাস্তি।

ছোটমামা অনেকক্ষণ ভেবেও ভাইয়াকে বাজেয়াপ্ত করার মতো কোনো শাস্তি খুঁজে পেলেন না। অবশেষে বিকেলে ভাইয়ার বাড়ি থেকে বেরোনো আর সেই সাথে ভাইয়ার জন্য ফুটবল খেলা হারাম করে দিলেন।

আর আমার সেই পুরোনো বাতাস করা শাস্তির সাথে নতুন শাস্তি যোগ হয়েছে। আর তা হলো আমি তিন বেলা ভাত খাওয়ার পর একবিন্দু পানি খেতে পারব না। যদি ভাত গলায় আটকে মরে যাওয়ার উপক্রম হয়, তা হলেও আমার জন্য পানি খাওয়া নিষেধ।

এখন আমাদের লোকেশন হলো আমার রুম। সবার মনে ভূমিকম্প হচ্ছে। যদি আমার কাছে একটা রিখটার স্কেল থাকত তাহলে মেপে দেখতাম কত রিখটার স্কেলে ভূমিকম্প হচ্ছে। শাস্তি অনুযায়ী রাহাত ভাইয়া তার মোবাইলটা ছোটমামার কাছে জমা রেখে এসেছে। ভাইয়ার আজ উত্তর গলি বনাম দক্ষিণ গলি ফাইনাল খেলা ছিল। ভাইয়া হলো উত্তর গলি টিমের অধিনায়ক। আর আজ তার সেই খেলাটাই বরবাদ। ভাইয়ার মুখের দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারছি না।

আর আমি দীর্ঘ এক ঘণ্টা করে মামাকে বাতাস করে ক্লান্ত হয়ে এসেছি। ভাবছি দুপুরবেলা ভাত খাব না। মামা তো শুধু ভাত খেয়ে পানি খেতে নিষেধ করেছেন। অন্যকিছু খেয়ে পানি খেতে তো নিষেধ করেননি।

অনেকক্ষণ তর্কবিতর্ক করে অনেক আলোচনা করলাম। রাহাত ভাইয়ার একটাই কথা- যে করেই হোক তার মোবাইল চাই-ই চাই।

ভাইয়া বলল ছাদের থেকে লাফ দিয়ে মরব যদি আমাকে আজ বিকেলে ফুটবল খেলতে যেতে না দেন। সবাই একমত হলাম, ছোটমামাকে নিয়ে ছবি তুলব এবং তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে আবেদন করব। আমরা সবাই উঠে ছোটমামার রুমের সামনে আসতেই শুনলাম ছোটমামা কার সাথে যেন নিচু গলায় কথা বলছেন। প্রথমে ভাবলাম রুমের মধ্যে কেউ আছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবিষ্কার করলাম না রুমের মধ্যে কেউ নেই। রাহাত ভাইয়ার মোবাইল দিয়ে ছোটমামা কার সাথে যেন কথা বলছেন। আরেকটু ভালো করে শোনার জন্য আমরা কান খাড়া করলাম। ছোটমামা বলছেন, না না না আমার মোবাইলটা ভুল করে রেখে এসেছি। তাই কোনো যোগাযোগ করতে পারছি না। হ্যাঁ, না এখানে কেউ কিছু জানতে পারেনি, হু আমি ভালো আছি। আমি এখন চিটাগাং থেকে অনেক দূরে পুলিশ খুঁজলেও এখন আর আমাকে পাবে না। আচ্ছা আমি এখন রাখি। কেউ আমার কথা শুনতে পাবে। এটুকু বলেই মামা ফোন রেখে দিলেন। আমরা আর মামার কাছে ছবি তুলতে গেলাম না। পুনরায় আমার রুমে চলে এলাম। কারও মুখে কোনো কথা নেই। নীরবতা ভেঙে ভাইয়া বলল, আচ্ছা রাহাত ভাইয়া ছোটমামা পুলিশের কথা বললেন কেন? শুধু কি পুলিশের কথা। আমার মনে হচ্ছে মামা পুলিশের ভয়ে এখানে আত্মগোপন করে আছেন। আমারও তাই মনে হয়।

কিন্তু কেন?

ভাইয়া উদাস কণ্ঠে বলল, জানি না।

আমাদের কথার ফাঁকে কে যেন দরজায় কলিং বেল টিপল। আম্মু বাড়িতে আছে তিনিই দরজাটা খুলবে। আমাদের কারও মুখে কোনো কথা নেই। কে এসেছে তা দেখার জন্য। কান খাড়া করে বসে আছি। দরজা খোলার সাথে সাথে অনেক লোকের ঘরে প্রবেশ করার পদধ্বনি শুনতে পেলাম। কী হয়েছে তা দেখার জন্য আমরা পড়িমরি করে উঠে দরজার কাছে আসতেই ছোটমামার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। তিনি কাতরস্বরে বলছেন, আমি কিছু করিনি। আমাকে ছেড়ে দাও। আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন। ছোটমামাকে হাতকড়া পরিয়ে কয়েকজন পুলিশ নিয়ে গেল। আব্বু আম্মু আর আমরা থ মেরে দাঁড়িয়ে আছি। কী ঘটছিল তার কিছুই আমরা বুঝতে পারছিলাম না। সবাই যেন সম্মোহিত হয়ে গেছি। আমাদের অবস্থা বুঝতে পেরে মোটা করে একজন পুলিশ আমাদের কাছে এগিয়ে এসে বললেন। এই লোকটা আপনাদের কে হয়? আম্মু অস্থির হয়ে বলল, আমার ভাই হয়, কী করেছে ও? কেন ওকে এভাবে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন? আম্মুকে অনেকটা উদ্বিগ্ন দেখাল। মোটা করে পুলিশটা বলল, এই লোকটা গত তিন দিন আগে একটা সমাবেশে বিরোধী দলের কিছু লোক হইচই করলে তাদের মধ্য থেকে একজনকে চাপাতি দিয়ে কোপালে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে লোকটি ইহলোক ত্যাগ করে। আর আপনার ভাইয়ের নামে তার স্বজনরা খুনের মামলা দায়ের করেছে। এই যে দেখুন আমাদের কাছে তার নামে অ্যারেস্ট ওয়ার্নিং পেপার আছে। পুলিশের কথা শুনে আমাদের মাথায় মনে হলো বাজ পড়ছে। বলে কী! ওনার মাথা ঠিক আছে তো।

পুলিশটা পেপার বের করে আমাদের দেখাতে চাইল। কিন্তু আম্মু আর আব্বুকে তেমন আগ্রহী মনে হলো না। মোটা করে পুলিশটা তা বুঝতে পেরে পেপারটা পকেটে রেখে হন হন করে হেঁটে চলে গেল। কে জানে।

পুলিশটাও মনে হয় মামার মতো সাইকোলজির ছাত্র। তিনি ওনাদের ডিপার্টমেন্টেও মনে হয় হাইস্কোর করেছিলেন। আমরা মামার জন্য উপরে উপরে খুব দুঃখ প্রকাশ করলাম। কিন্তু ভিতরে দারুন মজা পাচ্ছি। যাক আমাদের শাস্তিটা- তাহলে ছোটমামা পুলিশের হাতে আচ্ছা করে একটা ধোলাই খাবেন। রাহাত ভাইয়া তার মোবাইলটা ফিরে পেল। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর আমরা অনেকক্ষণ ছোটমামাকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করলাম। বিকেলে রাহাত ভাইয়া হলে ফিরে গেল ফুটবল খেলতে। আমি টেলিভিশনটা অন করে তিনবার বললাম ওঁম শান্তি শান্তি শান্তি।

মুনিয়া মুন : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares