স্বয়ং সমূহ : রাবেয়া রব্বানী

গল্প

স্বয়ং সমূহ

রাবেয়া রব্বানী

জনাব ছায়া

তিন পেগ মেরে ঝিম ধরে বসে আছি। জনাব ছায়া একটু মিইয়ে গেছে। ক্লান্ত কাকগুলো কার্নিশে চুপচাপ। কিছু শামুক শরীরী মেঘ দক্ষিণে যাচ্ছে। পেট ভরে খেয়ে নড়তে পারছে না রেস্ট হাউজের কুকুরটা। প্লেন টেক-অফের গুম গুম শব্দ নিশ্চয়ই আশপাশের গৃহিণীদের ভাতঘুমকে আশকারা দিচ্ছে। শুধু সুইমিং পুলে মেয়েগুলো সতেজ, সটান। ফুলেল ছাপা বিকিনিগুলো ভিজে ইতিমধ্যে গাঢ়।

বস তার মোটা পেটের নিচে নিরুপায় আন্ডারপ্যান্টটা আরও একটু উপরে টেনে বললেন, আজকের মেয়েগুলো বেশ মোটাতাজা! বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং ধনকুবের জনাব আলতাফ বিন ইয়াসিন এবার দু’হাত জোরে জোরে দোলাচ্ছেন। আমি টাই ঠিক করে, গলা পরিষ্কার করে কিছু বলার আগেই তিনি পানিতে ঝাঁপ দিয়েছেন।

রেস্টহাউজে বস মানুষজন পছন্দ করেন, বিশেষ করে অবিবাহিতদের। করতে না পারা লোকদের করতে পারা দেখানো, ব্যাপারটার মধ্যে একটা সবলতা আছে হয়ত। তবে যাই হোক, এই সময় জনাব ছায়া আমার মুখোশের বারোটা বাজাতে চায়। যেভাবে সে মুখোশটা ধরে টানাটানি করে তাতে তার জিভ থেকে লালা ঝরে চেহারাটা সহজেই বের হয়ে পড়তে পারে। তাই এই সময় আমি দৌড়ে রেস্ট হাউজটার বারে যাই। কয়েক পেগ গিলিয়ে তাকে অবশ করতে চাই। আলাদা নিরাপত্তা হিসেবে রেহানাকে খুঁজি। না পেলে, অন্তত একটা অফলাইন দিয়ে রাখি, রেহানা কাপড় খোল।  

রেস্ট হাউজের কেয়ারটেকার, কুক, দু’জন ড্রাইভার, বাগানের মালি সবাই এখন প্রেতের মতো হাঁটাচলা করছে। সবার চেহারায় আলগা গাম্ভীর্য আর রূঢ়তা। আসলে যে যেভাবে পারছে যার যার মুখোশ বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।

কেয়ারটেকার মন্টু একটা ঢাউশ সাইজের কফির মগ হাতে ধরিয়ে দিল। ধুর! কয়েক চুমুক দিতেই জনাব ছায়া আবার চাঙ্গা। মন্টু গলা নামিয়ে কানের কাছে বলল, ভাই, চলেন একটারে আজকা অফার দিয়া রাইখা দেই। সবাই মিল্লা জিল্লা… জনাব ছায়ার উল্লাস দেখে কে?  সে এখন আমার জিভে সুড়সুড়ি দিচ্ছে যাতে আমি হ্যাঁ বলে ফেলি। জানেনই তো মুখোশ খুলে গেলে কি জঘন্য অনুভূতি হয়। হাইস্কুলে মানিব্যাগে পর্নো ছবির কাটিং রেখে মায়ের কাছে ধরা পড়েছিলাম। মায়ের সাদা হয়ে যাওয়া ভীত চেহারা দেখে বুঝেছিলাম জনাব ছায়া কত কুৎসিত! মরে যেতে ইচ্ছে করেছিল! এরপর আর একবার দিলারি হলে দুপুরের ব্লুফিল্ম দেখতে গিয়ে রীতিমতো পুলিশের হাতে ধরা। আমাকে ছাড়িয়ে আনতে গিয়ে চাচারা অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন মুখোশ খুলে যাওয়া সেই মুখটার দিকে। অনেকদিন আর তাকাতে পারেননি তারা। এরপর থেকে আমি বেশ সাবধান। সকল শক্তি দিয়ে লড়ে যাই। আজও পারব ঠিক। মন্টুর কথায় উত্তর না দিয়ে আমি রেহানাকে লিখলাম, কোথায় তুই? কাপড় খোল বলতাছি।

কিন্তু আপনারা তো জানেনই জনাব ছায়া সহজ কেউ না। বাসে মহিলা দেখলে সে ঘেঁষে যেতে পীড়াপীড়ি করে। গ্রামের পুকুরে স্নান করতে থাকা মেয়েদের দেখলে পায়ের গতি শ্লথ করে দেয়, অবুঝ কিশোরীকে কাছেপিঠে এলে তাদের শরীরে আদরের ছলে হাত দিতে শেখায়। মুখোশে চাপ পড়ে, আলগা আলগা লাগে। যদিও আমি রেহানাকে ভালোবাসি তবু জনাব ছায়াকে শান্ত করতে রেহানাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। রেহানাকে বলতে হয়, রেহানা কাপড় খোল।

রেহানার স্বামী আছে, বাচ্চা আছে, সামাজিক আচার অনুষ্ঠান আছে। মাঝে মাঝে আমার ওপর অভিমান আছে, নিস্পৃহতা আছে। তাই বলা যাচ্ছে না তাকে আজ ঠিক পাওয়া যাবে কিনা। বা পাওয়া গেলেও সে সমান তালে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করবে কিনা।

ইতিমধ্যে সুইমিং পুল থেকে দুটো মেয়ে বগলদাবা করে উঠে গেছেন বস। তারা এখন যাচ্ছে বেডরুমের দিকে। এখন বেডরুমের দরজা থাকবে খোলা। নানান শব্দ আসবে। জনাব ছায়াকে ঠেকাব কীভাবে!  রেহানা কি আজ আসবে না? আর আমি তাকে বলতে পারব না, রেহানা কাপড় খোল। নাইলে চড় মারব।

মুখোশ, দ্য পারসোনা

আপনাকে এর আগে আমি কোথায় দেখেছি?

ব্যাপারটা খুবই হাস্যকর যে, সাংবাদিক ছেলেটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে দেখলেও আমাকে ঠিক দেখতে পাচ্ছে না। সে আসলে দেখতে পাচ্ছে আমার মুখোশকে। মুখোশটার দম আছে বাবা! চটপট মিথ্যা বলতে জানে, লাথি খেলেও হাসতে জানে, যে কোনো পরিস্থিতিতে বিকারহীন, একটা ধৈর্যের কাঠি।

আমি বললাম, পাঁচ বছর আগে। প্রতিমন্ত্রী ইয়াকুব আলি নোমানির বাসায়। একটা সাক্ষাৎকারে আমি তার সাথে ছিলাম।

হ্যাঁ হ্যাঁ আপনি উনার পারসোনাল সেক্রেটারি ছিলেন। মনে পড়েছে। 

আচ্ছা তাহলে আপনার বর্তমান বস, আলতাফ বিন ইয়াসিন সম্পর্কে কিছু বলুন।

স্যারের কাছে অনেক কিছু শেখার আছে। এখনও শিখছি। পৃথিবীর কোথায় কী ঘটছে সবই তার নখদর্পণে। কীভাবে সময় ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে একজন বড় মানুষ হওয়া যায় উনি তার উদাহরণ।

তাই? তাহলে ওনার সাথে সব সময় এতগুলো বডিগার্ড কেন থাকে? উনি নিজেকে এতটা অনিরাপদ কেন ভাবেন? কী ধরনের কাজ করেন উনি যে, তার নিরাপত্তায় এত লোক থাকে?

দেশের উন্নতি ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা ক্ষেত্রে তিনি যে কাউকে ছাড় দেন না তাই এই অবস্থা। পুঁজিবাদী অবস্থায় নীতির শত্রু বেশি।

সাংবাদিক লোকটা শব্দ করে হেসে ফেলল। আমার মুখোশ কিছুটা বিব্রত হয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা জারি করে শক্ত হয়ে গেল। এখন একে হটায় সাধ্য কার! লোকটা আবার বলল, আচ্ছা, শোনা যায় উনি সব সময় মেয়েদের নিয়ে থাকেন?

খোঁজ নিয়ে দেখেন হয়ত এও শোনা যায় যে, আপনি সাক্ষাৎকার নিতে এসে টেবিলের তলা দিয়ে উপহার নেন। আপনার বাসায় মধুমাসের ফলাহার যায়।

লোকটার নিজের মুখোশ এখন নড়ে গেছে বোধহয়। এখন সে কিছুক্ষণ তা ঠিক করতে ব্যয় করবে। ঠিক তাই, একটু অপ্রস্তুত হয়ে সে একটি কাগজের দিকে জরুরি প্রশ্ন করার ভান করল তারপর অন্য কামরায় চলে গেল। 

ইন্টারকম বেজে উঠল।

আজ বস মেরুন সাটিনের শার্ট পরে আছেন। সোনালি হাতঘড়ি,  পিস্তলের কোমরবন্ধনীসহ তাকে তামিল সিনেমার ভিলেনের মতো লাগছে। এই ভরদুপুরে তার হাতে ব্লাডি মেরি। না না ভিলেন না, লাল পপি ফুল দেখার মতো মুগ্ধতা এখন মুখোশে।

বাহ আপনাকে খুব ভালো দেখাচ্ছে স্যার।

বসো তাশরিফ। আজ কিছু এলিট ডিলিংস আছে, বিকেলে অফিসেই আসবে। আজকের পত্রিকাগুলোর টপিকস শুনব না। এমন কিছু বলো যা লোকগুলো শুনলে শুনতেই থাকবে। একেবারে মনোযোগ দিয়ে শুধু আমার কথাই শুনবে।

উ ম ম… আপনি এখন যে পানীয়টা খাচ্ছেন তারা এলে এটাই পরিবেশন করা যেতে পারে। আর সে সময় আপনি এটা নিয়ে কিছু বলতে শুরু করবেন।

ব্লাডি মেরি?

হ্যাঁ। প্রথমে পেয়ালা উঁচিয়ে বলবেন, এ টোস্ট টু মাই কোম্পানিস হেলথ। তারপর এই পানীয়টার নাম কেন ব্লাডি মেরি হলো তা জিজ্ঞেস করবেন। আশা করি কেউ তেমন জুতসই উত্তর দিতে পারবে না। তখন আপনি বলবেন, ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির মেয়ে মেরি টিউডরের কথা। কমফোর্ট জোনের মানুষ আসলে সর্বোচ্চ কী পরিমাণ ট্র্যাজেডির শিকার হতে পারে কুইন মেরি যেন তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

যেমন?

মেরি মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়ায় রাজা হেনরী কখনওই খুশি হন নি। ছোটবেলাতেই বাবা হেনরি তার মা ক্যাথরিন দি আরাগনের সাথে বিয়ে বাতিল করতে চান এবং এন বোলেন নামক একজনকে বিয়ে করে তাকে রানি ঘোষণা করেন। এন বোলেনের মেয়ে এলিজাবেথ হওয়ার পর মেরিকে সিংহাসনের পরবর্তী দাবিদারের আসন থেকে সরিয়ে এলিজাবেথের নাম যুক্ত করেন। এবং মেরিকে তার মায়ের কাছ থেকেও দূরে পাঠিয়ে দেন, সেখানে তার সেবায়ও কাউকে দেয়া হয় না। সাধারণ মানুষের মতো মেরি নিজের কাজ করে খেটে খায়, পড়াশোনা করে। এভাবে বৈধ সন্তান হিসাবে প্রাপ্য সম্মানের আসন থেকে নিজের বাবা কর্তৃক সরানোর ব্যাপারটা  বাবার সাথে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। নিসঙ্গ বৃক্ষের মতো মেরি বেড়ে উঠে।

সে সময় ক্যাথলিক আর প্রটেস্টানদের মধ্যে পুনর্গঠন সংক্রান্ত ঝামেলা চলছে। এন বোলিনের মৃত্যুদণ্ডের পর এবং রাজা হেনরির তৃতীয় স্ত্রীর ছেলে-সন্তান মরে যাবার পর সিংহাসনের অপেক্ষমাণ সারি আবার বদল হয়। এবং মেরি বেশ ঝামেলা সয়ে সিংহাসনে বসতে পারেন। চার বছরের ক্ষমতায় সে তার বাবার পথ অনুসরণ করে প্রায় তিনশো জন প্রটেস্টান পুড়িয়ে মারে। মেরি মনে করে খ্রিস্টান ধর্ম পুনর্গঠন করতে সে ইশ্বরের ইচ্ছারই  প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। প্রটেস্টানরা তাকে ঘৃণা করে নাম দেয় ব্লাডি মেরি। মেরির বিয়ে হয় স্পেনের রাজা ফিলিপের সাথে কিন্তু সেখানেও ভালোবাসা থাকে অধরা। জরায়ুর জটিল রোগে সে বাচ্চা জন্মদানেও অসমর্থ হয়। জরায়ুর অসুস্থতায় নিসঙ্গ মেরি মারা যায়। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালে টোম্যাটো আর ভদকা মিশ্রিত এই পানীয়টা আবিষ্কার হয় তখন। ব্লাড মেরির নাম অনুসারে এই পানীয়ের নাম ব্লাড মেরি। কারণ পানীয়টা দেখতে রক্তের মতোই। ব্লাডি মেরি নামে যে গেমসটা আছে সেটাও এই রানির নাম থেকেই ইন্সপায়ার্ড।

বাহ। চমৎকার।

আর কিছু।

আফিম সম্পর্কে কিছু বলতে পারেন।

সর্বনাশ! আমি জানি বসের মুখোশ পাতলা। একটুতেই ঝুলে যায় এর মধ্যে আফিম প্রসঙ্গ! হেরোইনের ব্যবসা যে তিনি করেন, আমরা সবাই তা জানলেও কখনও সরাসরি এই বিষয়ে বস কারও সাথে কথা বলেন না। বস তার মুখোশ শক্ত করতে ক্রুদ্ধ গলায় বললেন, বুঝলাম না, আফিম আসলো কোথা থেকে?

মুখোশ এবার স্পর্ধাকে বোকামি হিসেবে প্রমাণ করতে বার বার চোখের পলক ফেলতে লাগল, লম্বা একটা হাই দিল, পিঠ চুলকে বলল, মানে আফিম ফুলের গাছ পপি নিয়ে বলতে পারেন স্যার। কাগজে দেখলাম এই আফিমের চাষ লিগ্যালাইজেশন নিয়ে কত যুক্তি-তর্ক যে চলছে।

এটা কোনো বলার বিষয় হইল? মাথায় চর্বি জইমা গেছে? কোথায় কী বলতে হবে বুঝো না?

মুখোশ-রাগ-অহংকার সব চেপেচুপে দুঃখ ফোটাল। জীবনের যাবতীয় দুঃখের ব্যাপারগুলো সে হাতড়ে মুখের অভিব্যক্তিতে জড়ো করতে লাগল। বস তাতে সন্তুষ্ট হয়ে বলল, শোনো তাশরিফ, এ মাসেও তোমাদের বেতন হচ্ছে না। আগামী মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করো। তবে কোনো বিশেষ সমস্যা থাকলে তুমি কিন্তু আমার কাছ থেকে হাজার দুয়েক টাকা নিয়ে যেও।

মুখোশের চামচা হাসি নিয়ে বলল, জি স্যার। আসি স্যার।

এই মাসেও বেতন হবে না! তাহলে এই মেস আর পোষাবে না। জমানো টাকা প্রায় শেষ। ওয়েটিংরুমে সাংবাদিক লোকটাকে বিরিয়ানি দেওয়া হয়েছে। গন্ধেই খিদে নাড়িভুঁড়ি টেনে ধরছে। লোকটাকে এখন একজন লেজ গুটানো কুকুরের মতো লাগছে। লোকটা আমাকে দেখে বলল, লাঞ্চ করবেন আসুন।

চটপট মুখোশ অরুচি জাগিয়ে বলল, সকালে বসের সাথে র‌্যাডিসনে নাশতা করেছিলাম। পেট ভরা।

কি ডাহা মিথ্যা দেখুন! আসলে সকালে খেয়েছি চিড়া আর চিনি। আচ্ছা নিচে শিঙ্গাড়ার দোকানগুলো খোলা আছে তো? তা না হলে আজ উপোস দিতে হবে।

আয়না

জুন মাস, এখনও পুকুর মজে আছে। হাঁসগুলো দলবেঁধে কাঁদাপানিতে খাবার খুঁজছে। পুকুরের গভীর সরু গর্তটা নদীর মতো এঁকেবেঁকে গেছে। তার ওপর ধর্মজালটা বেহুদা রকম ঝুলে আছে। বানের পানি এলে এখন মাছ মারা যেত। বহুদিন উত্তেজনাময় কিছু করা হয় না। অফিসের কাজ ভয়াবহরকম কমে গেছে এখন। বিদেশিদের নিয়ে আমার ব্যস্ততা নেই আর। কিছু পেপার আর ম্যাগাজিন পড়া এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো সম্পর্কে বসকে ভাসা ভাসা সহজ ধারণা দেওয়া, বিকেলে ফিরে কাঁচা ছোলা চিবানো, রাতে হোস্টেলের কড়কড়া শক্ত ভাত, এই চলছে। পকেট খালি বলে বাইরেও যাওয়া হয় না বিশেষ। এখন এই খোলা আকাশ কেমন অদ্ভুত লাগছে। ঈদ না হলে বাড়ি আসতাম না। বাবা-মায়ের সামনে আজকাল মুখোশটা কাজ করতে চায় না। তাই নানান ছুতোয় বাইরে থাকি। সকালে রেজার আর আয়না নিয়ে বড়  পুকুরপাড়ে চলে আসি। গোঁফ আর থুতনির জায়গাটা বাদ রেখে দু’গালের দাড়ি কামাই। তারপর শুয়ে থাকি এই বেঞ্চে, উবু হয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছটা তার অবশিষ্ট ফুল মাঝে মাঝে ঝরিয়ে দেয়।

মাইনুল এসে আমার ঊরুতে চাপড় দেয়, দোস্ত! খালি আরাম করবার চাও, না?

কী কস বেটা?

ফেসবুকে দেহি তো ইয়াসিন সাহেবের লগে কেম্বা গুইরা বেড়াও। বিদেশি গো লগে কাবাব চাবাও। তোমার দোস্ত তোমারে হিংসা করি যে। আচ্ছা দোস্ত? তুমিও কোটিপতি  অওনের বাও কইরালছ?

কেমুন?

এই যে এত বড় চাকরি করো হের ফরেও ঈদের দিন চাচায় পুরান ফাঞ্জাবি ফইড়া মাডত যায়। গরে বালা কোনো রান্ধন নাই। তোমার মায় কয় পোলা কারবারি অইয়ালছে। খালি টেহা জমায়। হাছাই?

হ। সারা জীবন কি কামামুরে বেডা। জমাই লই দুইল্লা। একটা দলান দিতে অইব না। যা বিকালে বাজারে আইমুনে। এহন দাড়ি কাডি।

মাইনুলকে পিছনে রেখে আমি ব্যস্ত ভাব করি। পুকুরের পাড়ে নেমে যাই। অল্প পানিতেই গাল ভিজিয়ে সাবান ডলি। এ মুখ আর দেখানো যাবে না। মুখোশ সরে গেছে। কান্নার জন্য মুখ বেঁকে বেঁকে যাচ্ছে। আমি অপ্রস্তুত হাতে রেজার চালাই। জিলেটের ব্লেডে গোঁফ আর থুতনির কিছু অকালপক্ব দাড়ির সাথে রক্তও উঠে আসে। মাইনুল চলে যেতে যেতে মুখ গড়ের মাঠ। ঘোরের মধ্যে সব কেটে ফেলেছি!

নাইনে প্রথম সাময়িকে অংকে ফেল করেছিলাম। কাঁদছিলাম। নানি এসে বলেছিল, এল্লা, মার মুখ পাইছ, এর মধ্যে কাজল পড়া চোখ। কারও সামনে আর জানি কাইন্দোনা যে। মাইনসে মাইজ্ঞা বেডা কইব। আসলে আমার চেহারায় মেয়েলি ভাব কমাতেই আমি ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি রাখি জানেন? আজ অনেকদিন পর দাড়ি ছাড়া মুখ। বিচ্ছিরি নাকি-কান্নার সুরও আমি চাপাতে পারছি না। ভেতর থেকে লাভার মতো পানি আর আওয়াজগুলো বের হয়ে আসছে। আয়নায় আমার মুখের মসৃণ ডান পাশ, বাম পাশ কি জঘন্য ন্যাকা! এই চেহারা বদলাই কীভাবে! রেহানাকে দরকার। রেহানাকে পেলে জনাব ছায়া বের হয়ে আসবে। এসব মেয়েলি দুঃখ-টুঃখর জনাব ছায়া ধার ধারে না। সে প্রবলভাবেই পুরুষ।

রেহানা

আজকা এত সকালে কেন?

এমনি।

তুমি কই?

বাসায়।

বাসায় মানে কোন বাসা, শহর না গ্রাম রেহানা জিজ্ঞেস করে না। তাকে আমি আমার সঠিক জায়গা, আমার পারিবারিক, অর্থনৈতিক অবস্থা কিছু জানাই না। এমনকি ভিডিও কলও দিই না কখনও। রেহানার কাছে আমি কেবল জনাব ছায়া, যে মহা শক্তিধর, অবাধ্য, নিয়ম ভঙ্গ্য আর আত্মবিশ্বাসী। যে রেহানার সমস্যার সময় তাকে সাহস দিতে জানে। তবে আমার সম্পূর্ণ নিজ থেকে শুধু জনাব ছায়াকে দেখানোর মধ্যে যে ফাঁকি তা রেহানা এতদিনে ধরে ফেলেছে। তাই আগের মতো আর অনুগত নেই। তবু আয়নার চেহারা বদলাতে আমি  চেষ্টা করে যাই।

সেক্সি রেহানা।

সকাল বেলা এইসব কী বল?

পিরিতের সকাল আর রাত কী?

পিরিত কার সাথে? তোমারে তো দেখলামই না এখন পর্যন্ত। ফাঁকির পিরিত এইগুলি। অনলাইন পার্ভাটিজম।

দেখা ব্যাপারটা একটা ফাঁকি। সরাসরি কেউ কাউরে দেখতে পারে না। দেখতে পারে শুধু মুখোশটাকে দা পারসোনাকে।

হইছে। আমার এখন কাজ আছে।

আমি আসলেই খালি কাজ।

এইসব আজাইরা। কেন আসো কি দেখতে আসো আমি জানি।

হ। যা দেখতে চাই তা দেখাও তাইলে।

না কাম আছে।

না কোনো কাম নাই। বেশি বুঝছ, যা কইছি তা করো। নাইলে থাপ্পড় খাবি হারামজাদি।

রেহানা কিসিং ইমো দেয়।

হ্যাঁ এইতো, আয়নায় চোয়াল এবার শক্ত হচ্ছে।

নিজ

শুক্রবার, অফিস বন্ধ। দুপুরে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বিকেলে উঠে দেখি এটা একমাত্র জনাব ছায়ার কাজ। মুখোশ এ নিয়ে হাপিত্যেশ শুরু করেছে। ‘লোকে কী ভাববে!’ ‘ওয়ান্ট টু ফাক দ্য ওয়ার্ল্ড’ এমন একটা স্ট্যাটাস দেওয়া কি ঠিক হলো? জনাব ছায়া, মেয়েলি ন্যাকামি কিংবা উটকো অহংকার এসব সোশ্যাল সাইটেই কেমন করে যেন মুখোশের ফাঁক গলে বের হতে পারে। জানেন আমি তাৎক্ষণিক টেরও পাই না! এমন অনেক হচ্ছে। না এর একটা দফারফা চায় মুখোশ। এভাবে নিজের ইমেজের তেরোটা বাজানো যাবে না। কিন্তু মুছতে যেতেই জনাব ছায়া চিৎকার করে, ‘কোনো সাহস নাই? মাইগ্যা নাকি?’ মেয়েলি আমিটা তর্ক করে, ‘স্ট্যাটাস কি যুগান্তকারী কিছু, না হয় লিখেছেই ছায়া’ এর মধ্যে আবার অহং এসে বায়না ধরছে, ‘স্ট্যাটাস দিয়ে কেটে দেওয়াটা আরও অসম্মানের। বরং একটা কাজ করা যায় আরও কিছু স্ট্যাটাস দিয়ে ওটাকে ম্লান করে দেওয়া যায়।’ মুখোশ বলছে আবার, ‘এভাবে আমাকে ফাঁকি দিয়ে বের হয়ে গেলে এদের নিয়ন্ত্রণ করব কীভাবে? সমাজে মুখোশটাই তো আসলে ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য হয়। তাহলে কি ব্যক্তিত্বহীন হয়ে যেতে হবে?’

উফ্ আমি পড়েছি জ্বালায় কার কথা শুনব, বলেন? এর চেয়ে ভালো একটা সিগারেট এবং তার চেয়েও ভালো রেহানা।

রেহানা গাভী আমার।

টুং করে শব্দ হয়,

অই। গাভী কে? তাইলে তুমি গরু।

হ আমি তোমার গরু।

এইসব কী?

এইসব প্রেম। যে প্রেম একসাথে মাঠে চরে। ঘাস খায়।

হা হা।

রেহানা দাঁত বের করা হাসির ইমো দেয়।

মন শান্ত হচ্ছে। আমি আবার চট করে স্ট্যাটাসটা দেখে নিই। না পুরা পৃথিবীকে ‘ফাক’ করার কিছু নাই। এখানে অনেক মা-বোন, ভাই, আত্মীয় আছেন, আছেন গরু-ছাগলও। এদিকে কাঁচা ছোলা ভিজে ঢোল হয়ে আছে। খেতে ইচ্ছে করছে না। এক টাকাও নেই হাতে। কাল মা বিকাশ করে দুই হাজার টাকা পাঠাবে বলেছে। কোথা থেকে পাঠাবে তা জানতেও চাইনি। যা খুশি ভাবুক, কৃপণ ছেলের মুখোশ, ব্যর্থ ছেলের মুখের চেয়ে তো অন্তত ভালো। শালার দাড়িগুলো এখনও ভালোভাবে বড় হয়নি। আয়নায় তাকালেই এখনও এক মুখ বেদনা দেখা লাগে। না না। এসব পোষা যাবে না। রেহানা আছে না?

রেহানা!

আমার আসলে কাজ আছে।

কোনো কাজ নেই। আমি যা কমু তাই শুনবা।

না শুনমু না। আমার ঠেকা পড়ছে?

তর ঘাড়ে শুনব। আমার মন মেজাজ ভালো না, তুই থাক। মনটা খারাপ বুঝছ না?

রেহানা  ভালোবাসার ইমো দেয়।

মুখোশ, ছায়া, মেয়েলি ন্যাকামো, অহং সব মিলে একাকার হয়ে যায়। আমার স্বয়ং সমূহ লাল কিছু ভালোবাসা পাঠিয়ে দিই।  রেহানার স্ক্রিন-জুড়ে এখন সেগুলো উড়ছে।

রাবেয়া রব্বানী : কথাসাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares