নাটাই ঘুড়ি ইঁদুর এবং নৈঃশব্দ্য : কাজী মোহাম্মদ আলমগীর

গল্প

নাটাই ঘুড়ি ইঁদুর এবং নৈঃশব্দ্য

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর

কইতুরি জলার আশপাশের গ্রামগুলোতে তখন ঘুড়ি ওড়ানোর খুব চল ছিল। রোববার স্কুল বন্ধ থাকে। শুক্রবারে হাফ। সপ্তায়  দেড় দিনের মেলা।  নানা রকম ঘুড়ির মেলা। লাল নীল হলুদ সবুজ কমলা রঙের ঘুড়ি। সেদিন ছিল শুক্রবার। স্কুল ছুটি পেয়ে দরগা বাড়ির সুমন এক দৌড়ে বাড়িতে ঢুকে বগলতলের বই কোথায় রাখবে বুঝতে পারছিল না। ঘরের সিঁড়িতে নাকি খাটের উপর…। না, শেষ পর্যন্ত রেখেছিল পড়ার ঘরের টেবিলের উপর। খোঁজও নিয়েছিল মায়ের। মা তখন পুকুরে। গৃহশিক্ষক মোতালেব মাস্টারের হদিসও পায়নি। ঘুড়ি এবং নাটাই নিয়ে মাঠের দিকে পালানোর সঠিক সময় সুমনকে তাড়া করছিল। সুমন দৌড়ালো দুপুরের খাবার না খেয়ে, আর মাঠে হাজির হলো বর্ষায় ধেয়ে চলা নদীর বেগে। তার স্কুলশিক্ষক বাবা বলেছিল, চোখ- কান খোলা রাইখা চম্পট দিও। মা দেখলে শাস্তি পাইবা। তখন বাঁচাতে পারব না।  আর স্কুলের প্যান্ট খুলে লুঙ্গি পরে যাও।

সুমনের বাবা দরগাবাড়ির চাতাল নিয়ে চিন্তিত ছিল। বাড়ির হিস্যাদাররা চাতাল বিক্রি করে দেবে যে কোনো সময়। তা না হলে ছেলেকে সে এত সহজে ছেড়ে দিত না। সুমন তার বাপের বলা চম্পট দেওয়া সুযোগের নৌকায় পাল খাটায়।

সেদিন বাতাস ছিল উত্তর-পুব কোণে।

এতদিন মোতালেব মাস্টার আকাশে ঘুড়ি তুলে তার হাতে নাটাই দিত। সুমন বোকার মতো সুতা ছাড়ত অথবা সুতা বটতো। মোতালেব মাস্টার সুতা এবং ঘুড়ির মালিক। নাটাইয়ের মালিক সুমন। হিল বরাকের গোড়া দিয়ে তৈরি নাটাই। অন্যরকম নাটাই। কইতুরি জলার গ্রামগুলোতে আর কারও এমন নাটাই নেই।

সুমনদের বাড়ির সবচেয়ে উঁচু আমগাছ এবং সোনালু গাছের মগডাল পার হয়ে ঘুড়ি যখন আরও উপরে চলে গেল, তখন তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত শিহরণ বয়ে গেল। সুমনের মনে হলো দরগাতলার দরগায় যিনি শায়িত, তিনি শুয়ে শুয়ে এই ঘুড়ি দেখছেন। তার বাপ তো বলে, তিনি দেখেন।

নীল রঙা ঘুড়ি সুতা টেনে টেনে ডানে-বাঁয়ে চরকি ঘুরে উড়তে লাগল। নাটাইয়ের মধ্যে পরী মার্কা চার রিল সুতা সাগু দিয়ে মাঞ্জা দেওয়া। তিন দিন আগে সুতার আড় ভাঙা হয়েছিল। তখনও অন্য কোনো ঘুড়ির সঙ্গে প্যাঁচ খেলা হয়নি। সুমন সুতা ছাড়ে আর ভাবে যদি মোতালেব স্যার দেখে কানে ধরে মায়ের কাছে নিয়ে যাবে, বলবে, দেখেন আপনার ছেলে রইদের মধ্যে ঘুড্ডি ওড়ায়। মা হয়তো তখন মারতে দেরি করবে না।

নীল রঙের ঘুড়ি শকুন হয়ে ওড়ে, এখন চিল হয়ে চৌথা আসমানে সুলেমানের সিংহাসন পেতেছে। তবু সুমন সুতা ছাড়ে।

মাঠের পাশে রাস্তায় যেতে যেতে বয়স্ক একজন, বলে- ‘আরে বাপরে! ঈশান কোণের বাতাস! ঈশান কোণে তো বাতাস বয়না রে খাদেমের পুত, এ অঞ্চলে বাতাস বয় উত্তরে দক্ষিণে! ঈশানে তো বয় না।’ সুমনের মাথায় ঈশান কোণের কোনো বালাই নেই।

নাটাই থেকে কমপক্ষে তিন ভাগের দুই ভাগ সুতা বের হয়ে গেছে। সুমন আরও কিছুক্ষণ ঘুড়ি উড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিল, ঘুড়ি নামিয়ে ফেলবে, কারও সঙ্গে প্যাঁচ খেলবে না। আর তখনই বিপত্তি ঘটল। মেঘ-বাদল ছাড়া বাজ পড়ার মতো হঠাৎ নাটাইয়ের গোড়া থেকে সুতা ছুটে গেল। ঠিক ছিঁড়ে যায়নি, আপসে চলে গেল। সুতার প্রান্ত লাফ দিয়ে উপরে উঠে পরিচিত বর্ণমালার শেষ কোনো বর্ণের মতো হয়ে আবার সড় সড় করে নামল। কিন্তু এই নেমে আসাও অনেক উপরে, নাচন দেখাল। সুমন সুতা ধরতে শূন্যে দু’বার লাফ দিল। ঘুড়ি চলে গেল তার স্বপ্নের চেয়ে বেশি সুতা নিয়ে মনের ভেতর হাহাকার তুলে।

তারপর সুমন মাটিতে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ পর দাঁড়াল। সুমনের লুঙ্গি খুলে গেল, আবার পরিধান করল। চোখ মোছার মতো করে হাত দিয়ে মুখ মুছল। কে যেন মরে গেল। কাকে যেন খুঁজল। খুঁজল তার বেইমান ঘুড়িটাকে। খুঁজল সুতার সম্পর্ক টুটে যাওয়ার কারণ। খুঁজল বৃদ্ধের বলা তার না বুঝা সেই ‘ঈশান’ কোণের কথা কয়টিকে। না, সুমন কিছুই পেল না।

বাড়িতে ঢুকে সুমন মায়ের সামনেই পড়েছিল। মা সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিল, কী রে তোর কী হইছে? সুমন কোনো জবাব দিতে পারে না। মা নাছোড়বান্দা। আবার বলে, কী হইছে তোর! কথা কস না ক্যা? সুমন তার পরও কথার জবাব দিতে পারে না। মা তার মাথার পেছনের চুল ধরে টেনে খাবারঘরের দিকে নিতে চাইলে সে মায়ের হাত ছাড়িয়ে নাটাই নিয়ে বড় ঘরে ঢোকে। নাটাইটা খাটের নিচে রেখে সিঁড়ির উপর বোবার মতো বসে থাকে। মা আবার এগিয়ে এলে সুমন পড়ার ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়।

সুমন টেবিলে মাথা রেখে মাকে নিয়ে ভাবে, তুমি কি বুঝবে আমার ঘুড়িটা কীভাবে চলে গেছে। শয়তান আমার জন্য মাইরের ব্যবস্থা করেছে। এখন তোমরা আমারে মারবে। মোতালেব স্যার, বাবা কেউ আমারে বাঁচাবে না। আমারে যদি খুব মারো তাহলে আমিও বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।

গত বছরও সুমন তার বাবার হাতে মার খেয়েছিল। বাপ তাকে বলেছিল বেহালার তারে রজন মাখতে। সুমন দরগাতলার চাতাল থেকে বাদি গাছের শুকনো কষ এনে মেখেছিল। মাইরের খবর প্রধান শিক্ষকও জেনেছিলেন। প্রধান শিক্ষক সুমনের সামনে তার বাপকে বলেছিলেন, বাদির কষ আর রজন একসঙ্গে রাখলে আমিও তো ফারাক বুঝব না। বেহালা বাজিয়ে দেখতে জিয়ল গাছের কষে সুর ওঠে কি-না। তুমি তো দু’দিন পর আবার লাপাত্তা হইবা। কোথায় গিয়া ডুব দিবা কে জানে। স্কুল সামলাইতে হয় আমাকে। এভাবে যে মারলা, ছেলে যদি মতিগতি পাল্টায়।

পুরাতন কথায় চোখ বুলাতে বুলাতে সুমন ঘুমিয়ে যায়।

কিন্তু সন্ধ্যার সময় সুমনকে সম্ভাব্য সকল প্রকার যুক্তি-বুদ্ধিতে পাকড়াও করা হলো। মা তাকে ধুলায় লুটাল। সব শেষে বাপ এবং মোতালেব মাস্টারের চিন্তার সীমা পর্যন্ত  আঘাত পৌঁছালে সুমনকে রেহাই দিয়ে ঘোষণা করা হলো, আজ রাতে তাকে ভাত দেওয়া হবে না। তাকে শুতে হবে মাটিতে।

বেদম মার এবং শরীর-মন উভয় অবশ থাকায় মাটির বিছানায় সুমন দ্রুত ঘুমিয়ে গেল। তার মুখের সামনে ও সমান্তরালে নাটাইটিও তখন খাটের নিচে। প্রাণহীন এই বস্তু এবং প্রাণযুক্ত মানুষের সম্পর্কের মাঝে তখন শুধু শ্বাসপ্রশ্বাসের আসা-যাওয়া, তাও এক পক্ষের।  

খাটে বিচারক মা, চোখ তার ঘুমহীন, মনের ভেতর কথা, ‘এভাবে না মারলে মোতালেব স্যার সন্তুষ্ট হতেন না।’

গভীর রাতে সুমনের ঘুম চলে গেল। সারা শরীরে ব্যথা। ব্যথারা তাকে উঠতে দেয় না। গিরায় গিরায় ধরে রাখে। মুখের হাঁ করা বাতাস ডান হাতের পিঠে লাগলে গরম অনুভূত হয়। খুব গরম। ভেতরটা যেন পুড়ে চলছে। অন্যদিন ঘরে ডিমলাইট জ্বালানো থাকত। আজ সুমনের কথা মনে রেখে ষাট পাওয়ারের বাল্ব জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। সুমনের দৃষ্টি সোজাসুজি খাটের নিচের নাটাইয়ের উপর । সুমন তখন দেখে একটা নেংটি ইঁদুর নাটাইয়ের সঙ্গে যেন কথায় লিপ্ত। এত মনোযোগী ইঁদুর, নাটাইয়ের সঙ্গে নাক লাগিয়ে কী যেন খোঁজে। খুঁজতে খুঁজতে একবার নাটাইয়ের ডাঁট বেয়ে বামে যায়, আবার বাম থেকে ডানে আসে। ইঁদুরের যেন কোনো কাজ নেই। অথবা এমন করে শুঁকে শুঁকে দেখাই ইঁদুরের কাজ।

সুমন হাত বাড়িয়ে নাটাইটিকে খাটের নিচ থেকে তার বুকের সঙ্গে চেপে ধরে।  থুতনির সঙ্গে লেগে থাকা ডাঁটটিকে বেশ কিছুটা নিচে নামিয়ে ধরলে নাটাইটা তার বুকের সঙ্গে সমান মিশে যায়। 

তারপর সকাল বেলা সবার আগে ঘুম থেকে ওঠে তার বাপ। বাপ তাকে এমন করে ঘুমাতে দেখে অবাক। ছেলেটা এমন মমতায় নাটাই ধরে ঘুমিয়ে আছে। সুমনের মাকে ছেলের এ দশা দেখানোর জন্য জাগানো হয়।

মা জেগে সুমনকে বিস্ময় নিয়ে দেখে।

মা এবং বাপ দু’জন সুমনের দু’পাশে বসলে সুমনেরও ঘুম ভেঙে যায়। সুমন ঘুম থেকে সোজা উঠে বসে। আসন করে বসে থাকা সুমনের দুই ঊরুর ওপর নাটাই। বাপ তাকে বলে, তুমি নাটাই নিয়ে ঘুমিয়েছিলে? এভাবে সারা রাত বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছিলে?

তখন সে ইঁদুরটাকে আবার দেখে। সুমন ইঁদুরের বর্ণনা দেয়।

ইঁদুরের বর্ণনা শুনে সুমনের বাপের দু-চোখ যেন তার অক্ষিগোলক থেকে ছিটকে বের হয়ে আসবে। বাপ তাকে চট করে পাশের চেয়ারের ওপর দাঁড় করায়। তারপর বিপুল আবেগে জড়িয়ে ধরে ছেলের সমস্ত শরীর চুমুতে ভরিয়ে দেয়। সুমনের শরীরের যত জায়গায় আঘাত লেগে ফুলে গেছে অথবা ফুলে যায়নি বাপ যেন সেসব মুছে দেবার জন্য তার শরীরে আরও চুমু দিতে থাকে।

সুমন তখন আনন্দে লজ্জায় কুঁকড়ে যায়।

সুমনের বাপ নতুন করে সুমনকে নিয়ে ব্যস্ত হয়। বাপ-পুত দুজনে মিলে আরও চার রিল সুতা মাঞ্জা দিয়ে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রস্তুতি নেয়। কে ঘুড়ি উড়াবে সুমন জানে না। মোতালেব মাস্টারকে গোপনে বলা হয়, মাস্টার তুমি সুমনকে কিছু বলো না। তুমি কয়েকদিন পড়াতে এসো না।

সুমনকে ঘুড়ি ওড়ানোর নতুন আয়োজন গভীরভাবে আকর্ষণ করে । কিন্তু কইতুরি জলার উপর শামিয়ানার মতো আকাশে ঘুড়ি তুলে সুমন সেদিনের মতো আর কোনো দুঃখ পায় না। সুমন অপেক্ষায় থাকে, কখন আবার ঘুড়িটা কোন বার্তা না দিয়ে চলে যাবে।

সুমনের মা বলে,  মাস্টার আর  আপনি দু’জন মিলে আমার ছেলেকে কী করতে চান? সুমন কি দরগা বাড়ির গরু? সুমনের বাপ বলে, কী করতে চাই তা তো তুমি জানো না। আমিও জানি না। মোতালেব মাস্টার বোকার মতো বলে, দেখেন না কী হয়।

ক্লান্ত সুমন রাতে নিজে মাটিতে বিছানা পেতে নিদ্রা যায়। খাটের উপর ঘুমাতে বললে সুমন আগ্রহী হয় না। তার মনে হয় পৃথক  থাকাই ভালো।

গভীর নিদ্রার ভিতর এক রাতে নাটাই সুতা ঘুড়ি ইঁদুর লুঙ্গি নিয়ে সুমনের বাপ তার মগজ ছিদ্র করে ঢুকে পড়ে।

সুমন দেখে তার বাপ হাজির। দু’জনের বয়স সমান। দু’জন দেখতে একই রকম। সুমনের বাপ সুমনকে বলে, বাবা কেমন আছ?

বাপতো তাকে বাবাই বলে। যাক এর মধ্যে নতুন কিছু নেই।

সুমনের বাপ এবার বলে, চলো আমরা খেলি।

তার বাবা তাকে খেলার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তার  বাবা তো মাঠ ছেড়েছে অনেক আগে। আগে যা জানত নিশ্চয় ভুলে গেছে। তবু সুমন জানতে চায়, কী খেলব বাবা?

তুমি যা চাইবে তাই খেলব। পৃৃথিবীর সবকিছুই খেলা।

সুমন বিদ্যুৎ ঝাঁকি খায়, বলে, কী বলছো বাবা, পৃথিবীর সবকিছু খেলা?

সুমনের বাপ বলে, হাঁ বাবা, তোমার সঙ্গে আমি মিথ্যা বলব কেন! সুতা ধরতে লাফ দেওয়া, লাফ দিতে গিয়ে পড়ে যাওয়া, ঘুড়ি কেটে যাওয়া অথবা ঘুড়ির সুতা দাঁতে কর্তন করা সবই খেলা। এই যে দেখছ তোমার আমার শরীরে কোনো কাপড় নেই তাও খেলা। আবার কাপড় পরিধান করাও খেলা।  দরগাবাড়ির চাতাল দখল করাও খেলা। চাতালের মালিকানা হারিয়ে ফেলাও খেলা।

সুমন তখন বলে, বাবা আমার ভয় লাগছে, আমার কান্না আসছে।

তাও খেলা। তুমি ইচ্ছা করলে হাসতে পারো। সাহসী হতে পারো। কাটাকাটি করতে পারো। কাটাকাটিও খেলা। ইঁদুর কাটে আমিও কাটি। তোমাকে কাটি। তোমার মাকে কাটি। তোমার মাস্টারকে কাটি। তোমার কৈশোর কাটি।

কী বলছ বাবা?

এই যে তুমি আর আমি এখন এক বয়সী। এই দেখো তোমার আর আমার নন্টু একই রকম। মাঝখান থেকে আমাদের সম্পর্কের সময় কেটে গেছে। মোতালেব মাস্টারকে কেটে দিলাম। তোমার মায়ের শরীর কেটে তোমাকে পৃথিবীতে নিয়ে এলাম।

বাবা আমার লজ্জা লাগছে।

তোমার শৈশব কেটে গেল বলে লজ্জা পাচ্ছ। ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটির নাম বলতে পারবে?

বাবা সব মেয়ে তো সুন্দর।

তুমি কারও দিকে এখনও বিশেষভাবে তাকাওনি। ভালো, বেশ ভালো।

একজনের  কথা মনে পড়ছে বাবা।

কেন মনে পড়ছে?

ও মেয়ে বলেছিল আমি নাকি তোমার মতো। কিন্তু তুমি বলছ তোমার নন্টু আমার নন্টু একই রকম। মেয়েটি শুনলে আমি মরে যাব।

তুমি ঠিক বলেছ। কিন্তু জানো, তুমি আমি সারাদিন কথাটি বলি, লুঙ্গি কী জানো, লুঙ্গি হলো লিঙ্গ আবরণ করে যে বস্ত্র । আগে আমাদের মানুষেরা ল্যাঙট পরিধান করত। এই নামধামও শরীর থেকে নেওয়া। নিশ্চয় তোমার এখন খারাপ লাগছে না। একদিন সেও বুঝবে আমি কী বলছি। তখন তোমার সঙ্গে হয়তো কোনো সম্পর্ক থাকবে না। অথবা সে কোনোদিন তোমাকে কল্পনাও করতে পারবে না।

বাবা আমি কষ্ট পাচ্ছি।

কার জন্য কষ্ট পাচ্ছ? আমার জন্য নাকি মেয়েটির জন্য?

কার জন্য পাচ্ছি বলতে পারব না।

বাহ! বেশ তো। তুমি সাবালক হচ্ছ। এসো আমরা খেলি।

বাবা তুমি বার বার বলছো এসো খেলি। কী খেলব?

তোমার শরীরের যত জায়গায় আঘাত লেগেছিল তত জায়গায় আমি চুম্বন করেছি। এখন তুমি আমার তত জায়গায় চুম্বন করবে। তোমার আদর পেতে আমার পিতৃমনে মনে হাহাকার উঠছে।

তখন সুমনের সমস্ত শরীর গুলিয়ে ওঠে। তার মনে হয় সে তার বাবাকে ঘৃণা করছে। কিন্তু সে মুখ খুলে বলতে পারে না, বাবা আমি তোমাকে ঘৃণা করি। সুমন বলে, বাবা হাহাকার নিয়ে খেলা যায় কি?

পিতা বলে, খেলা যায়।

তখন পিতা-পুত্র দু’জনে কৈতুরি জলার শামিয়ানার মতো আকাশে প্রথমে একটা সাদা রঙের ঘুড়ি তুলে নাটাইয়ের ডাঁটের দু’দিক ধরে বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর কালো রঙের ঘুড়ি তুলে একইভাবে ডাঁটের দু’দিক ধরে বসে থাকলে কেউই হাহাকার অনুভব করে না।

সুমন বলে, বাবা দু’জনে এক ঘুড়ি ওড়ানো যায় না। একজনের জন্য এক ঘুড়ি। বাবা তুমি আসলে বোকা।

সুুমনের বাবা  বলে, ঠিক বলেছ বাপ।  আমি আসলে বোকা। সে জন্যই তোমার সঙ্গে আমার কতশত মিলের কথা না বলে শুধু লুঙ্গি আবরিত অঙ্গের কথা বললাম! আমি কালকে একটা নাটাই কিনব। চার রিল পরী মার্কা সুতা মাঞ্জা দিয়ে আকাশে তুলে বসে থাকব তোমার অপেক্ষায়। তুমি যদি সত্যি আমাকে ঘৃণা করে থাকো, আমার কারণে লজ্জা পেয়ে থাকো, তোমার কান্নার কারণ আমি হয়ে থাকি, আমি তোমার অন্তরে অজ্ঞাত কষ্টের জন্ম দিয়ে থাকি, তাহলে  আমাকে পরাজিত করার জন্য আমার ঘুড়ির সঙ্গে প্যাঁচ খেলবে। তুমি আমাকে পরাজিত করবে। যে পরাজয়ে আমার মনে হাহাকার উঠবে। আমি বুঝব তখন তুমি বড় হয়েছ। তখন তুমি দরগাবাড়ির চাতাল রক্ষায় কথা বলবে।

আজ থেকে তুমি আমার সঙ্গে আর কোনো কথা বলবে না। আমিও তোমার সঙ্গে কোনো কথা বলব না বলে প্রতিজ্ঞা করলাম।

তারপর সময় এভাবে কর্তিত হয়- সোনালু গাছ কেটে বাড়ির অন্য হিস্যাদাররা টেবিল-চেয়ার তৈরি করে। রয়না বীজের মতো বা লিচুর দানার মতো চকচকে টেবিল চেয়ার। দালানের আকৃতি বড় করতে গিয়ে মালদাইয়া আমগাছটাকে হত্যা করা হয়। তখন  দেখা যায় এলাকার একটা লোকের অনেক কিছু আছে, টাকা আছে, হোন্ডা আছে, অনেক বন্ধু আছে, অনেক লোক তাকে মান্য করে, এসব থেকে সৃষ্ট একটা গরম আছে, গরমে তার শরীরের জামা খুলে রাখতে হয়। জামাবিহীন শরীরে তাকে বেশ শক্তিশালী মনে হয়। তার পায়ের নিচে পড়ে অনেক অনেক বস্তু চূর্ণ হয়।  চূর্ণবস্তু থেকে নিঃসৃত শব্দ মানুষের ভয় জাগাতে রক্তের ভেতর হরমোন ছড়ায়। মানুষের ঘুম কমে যায়। কম ঘুম হয় এমন লোকজনের সকালের মুখ খুব কৃশ দেখায়। তখন নির্ঘুম মুখেরা পরস্পরকে চিনে নেয়। তারপর তারা বলে, দরগাতলার জমিন নাকি বিক্রি হয়ে যাবে?

শক্তিমানকে দেখলে ঘুম কাতুরে মানুষগুলো একটু কেমন যেন হয়ে যায়। নড়ে যায়। সরে যায়। সহে যায়। বিব্রত হয়। কখনও হেসে ফেলে। কখনও টুক করে সালাম দিয়ে বসে। জিজ্ঞেস করে, ভালো আছেন ভাই। ভালো আছেন জিজ্ঞেস করে মনে মনে পুড়তে থাকে। সালামটা মন থেকে দেয়নি। মনের ভেতর খসখসে একটা যন্ত্রণা নিয়ে রাতে খেতে বসে আনমনা হতে থাকে। ঘুমাতে গিয়ে আবার কৃশ হয়। রাতে বুকের ভেতর চাপ অনুভব হয়। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়। ভাবে, দু’রকম ব্যবহার মানুষের কাজ না। মুনাফেকের কাজ। আবার একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করে, দরগাতলার জমিন নাকি বিক্রি হয়ে যাবে?

তারপর একদিন শোনা যায় জামাহীন স্বাস্থ্যবান লম্বা হাতের লোকটার মন খারাপ।

তাই তো একটা লোক সারাজীবন সুস্থ থাকতে পারে না। কোনো লোক সবসময় পায়ের নিচে কোনো বস্তু  চূর্ণ করতে পারে না। তখন তারা আড়মোড়া ভাঙে। শনি রবি সোম-  যেকোনো দিন যে যার মতো ভাঙে। ভাঙার অন্তরালে জিজ্ঞাসা লুকিয়ে থাকে। এমন ম্লানমুখ দেখার মধ্যে কোনো অন্যায় আছে কি? না নেই। সরাসরি বলা উচিত, তোমার স্বাস্থ্য তো অনেক ভালো। তাহলে তোমার মনও ভালো কিন্তু তোমাকে এমন পরাজিত দেখাচ্ছে কেন?

প্রশ্নটি সবার মনে ঘুরপাক খায়। কিন্তু মানুষের মুখের অভ্যন্তরে বিমূর্তরূপের একটা দৃশ্যগ্রাহ্য ছবি থাকে। সে ছবি সহজে লুকানো যায় না। খুব চালাক হলে লুকানো যায়। কিন্তু এ মাটির এমন এক তাসির সে তার সন্তানের সহজ-সরল রূপ খুব ভালোবাসে।

তখন দম্ভকারী, সবকিছু চূর্ণকারী  নিজ থেকে বলে, আমার এত এত সম্পদ, শত শত অনুসারী, আমার কত দাপট, আমি ইচ্ছে করলে তাকে, দরগাবাড়ির স্কুলশিক্ষকের ছেলেটিকে মুহূর্তে ধুলায় মিশিয়ে দিতে পারি। সে আমাকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে রাখে। তার স্পর্ধা কত। আমি দরগাবাড়ির চাতাল দখল করলে সে ফিরাতে পারবে?

 এবার স্পষ্ট প্রশ্ন ওঠে, সুমন এত সাহস কোত্থেকে পায়? প্রশ্ন নিজেই প্রশ্ন তৈরির ছাপাখানা খুলে বসে। হৃৎপিণ্ডের ভিতর ছপাছপ শব্দ চলতে থাকে। আহা হৃৎপিণ্ডও আরেক ছাপাখানা। সুমনকে পেয়ে যাবেÑ এ প্রত্যাশায় সকলে নেমে পড়ে। আহা কতদিন সকলে মিলে একজনকে এভাবে খোঁজা হয়নি। খুঁজতে খুঁজতে কইতুরি জলার চারপাশ দেখা। গ্রামগুলোর শেষ প্রান্ত দেখা। দরগাবাড়ির আঙিনা দেখা। শীতকালের বাতাসে মিশে থাকা জিকিরের শব্দ খোঁজা। মাষকলাই ডালের বড়ি বিক্রি করতে আসা সাহা পাড়ার কালি মাসির গলার সুর শোনা। দরগাতলায় ওরসের  বয়ান শুনে রোদন করা, সারা রাত শামিয়ানার তলে বসে হিমের স্বাদ নেওয়া, এসব কতদিন খোঁজ করা হয় না। খোঁজ করতে গেলে কেন এসব চলে আসে। এগুলো কী খোঁজার বস্তু? সুমনকে পেয়ে গেলে জানা যাবে, একজন ব্যক্তি কী করে এসব বস্তু-অবস্তুর কথা মনে করিয়ে দেয় তাকে বলতে হবে।

সকলে খোঁজে। শেষে সকলে শুনতে পায়, শক্তিমানের লোকেরা সুমনকে ধরে নিয়ে এসেছে মসজিদের আঙিনায়। সকলে মসজিদের দিকে ছোটে। কেউ ধীরে ছোটে, কেউ জোরে ছোটে। সুমনকে ধরে নিয়ে এসেছে নাকি সুমন নিজে এসেছে কে বলবে!

লোকজন জড়ো করার জন্য জামাহীন স্বাস্থ্যবান বস্তু চূর্ণকারী লোকটি বিশাল ভূমিকা রেখে প্রশ্ন পর্বে প্রবেশ করে। লোকজনের কর্ণ জাগ্রত। সুমন কী বলে তাদের জানতে হবে। কী এমন শক্তির বলে সুমন এমন শক্তিশালী লোকটিকে প্রায় পরাজিত করে বসে আছে। পিনপতনের শব্দ নেই। জামাহীন স্বাস্থ্যবান লোকটি প্রশ্ন করছে। কিন্তু সুমন একটি প্রশ্নেরও উত্তর না দিয়ে নির্ভীকচিত্তে প্রশ্নকারীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুখে হাসি নেই, ক্রোধ নেই, জিজ্ঞাসা নেই, জিঘাংসা নেই, লোভ নেই। গভীর এক নিস্পৃহতায় তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে আছে।

তখন ভিড়ের ভিতর থেকে প্রশ্ন ওঠে- এই ছেলে পাহাড়ের মতো থ ধরে আছে ক্যা?

মোতালেব মাস্টার তখন চিৎকার দিয়ে বলে, তার বাপরে জিগান।

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : কাব্য কারিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares