দাবি : সাঈদ আজাদ

গল্প

দাবি

সাঈদ আজাদ

ক.

তুই কি আজই যাবি, সাগর?

জবাব জানা। তাহলেও উত্তরের জন্য জোছনা সাগ্রহে ছেলের মুখের দিকে তাকায়।

আগেঅই তো কইছি, আজই যামু। আবার জিগাও কিয়ারে! সাগর চৌকির নিচে উঁকি দিয়ে কী যেন খুঁজতে খুঁজতে বলে।

না জানি তো যে আজকে যাবি। …আকাশে মেঘ জমতাছে, মনে হয় বৃষ্টি হইব। বৈশাখ মাস, ঝড়টড় আইলে পথে গাছ ভাইঙ্গা যদি গায়ে পড়ে! এই সময় বাজ-টাজ বেশি পড়ে। একটু দেইখ্যা গেলে হইত না। তর তো আবার গায়ে একটু বৃষ্টির পানি লাগলেই জ্বরজারি হয়।

যামু সিএনজি কইরা। বৃষ্টির পানি গায়ে পড়ব ক্যামনে। খামোখা দেরি করাইয়া দিও না তো। সাগর কর্কশ স্বরে বলে।

জোছনা ব্যথিত চোখে তাকায় সাগরের দিকে। ছেলেটা কেমন চোখ-মুখ কঠিন করে ব্যাগ গোছাচ্ছে। দেখতে দেখতে কখন বড় হয়ে গেল সাগর! কখন যে ছেলেটার মধ্যে একটা পুরুষালি ভাব এসেছে। কেমন গম্ভীর দেখাচ্ছে এখন। ছোটবেলায় কী নরম-সরম ছিল ছেলে। একটা মুরগির বাচ্চা দেখলেও ভয়ে পেয়ে দৌড়ে জোছনার কোলে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ত। পিঁপড়া দেখলে ভয়ে লাফাত। এখন সাগরকে দেখে জোছনাই ভয় পাচ্ছে। অথচ জোছনা সাগরের মা। না, সাগরকে পেটে ধরেনি জোছনা। তবে জন্মের মাসখানেক পর থেকেই নিজের বুকের দুধ খাইয়ে সন্তানের স্নেহে মানুষ করেছে। নিজের সন্তানদের সাথে সাগরকে কখনও আলাদা চোখে দেখেনি।

চৌকির নিচে কী খুঁজিস বাপ। আমারে ক। আমি বাইর কইরা দেই। মাত্র গোসল কইরা আইলি। যাওয়ার আগে মাথায় মুখে আবার না ময়লা লাগে। চৌকির নিচটাতো মাকড়ের জালে ঠাসা। 

যা খুঁজতাছি, তা তুমি পাইবা না। তুমি যাও মা, নিজের কী কাজ আছে করো। সকাল থাইক্যাই পিছনে পিছনে ঘুরতাছো আর ঘ্যানঘ্যান করতাছো। বিরক্ত লাগে।

জোছনা করুণ চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ কেমন কড়কড় করে ওঠে তার। খানিকক্ষণ পরে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হয়ে যায় জোছনা।

সাগর যখন মাসখানেক বয়সের, তখন তার মাকে তালাক দিয়ে সাগরের বাপ বিয়ে করেছে জোছনাকে। কী কারণে তালাক দিয়েছে, ঠিক জানে না জোছনা। তারপর থেকেই সাগর জোছনার কোলে। সাগরকে কোলেপিঠে করতে করতেই জোছনার আরও দুই মেয়ে হয়েছে। সাগরের বাপ জলিল সাপের কামড়ে মরেছে যখন, তখন সাগরের সাত বছর বয়স। স্বামীর মৃত্যুর পর সাগর আর দুই মেয়েকে নিয়ে স্বামীর ভিটা আঁকড়ে, মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে ছেলে-মেয়েদের বড় করেছে জোছনা।

স্বামী মরার পর ভাইয়েরা তাকে বাপের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছিল। তা জোছনাও চেয়েছিল চলে যেতে। স্বামী নেই। দেওর, ভাসুররাও তার থাকাটা কেমন যেন ভালো চোখে দেখছিল না। আর চার চারটা পেট চালানোও কম কথা নয়। কিন্তু যাওয়ার সময় ভাই বলল, সাথে সাগরকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। জোছনার মেয়েরা তাদের আপন। সাগর না। সাগরের আপনজন হলো তার চাচারা। সে থাক চাচাদের সাথেই। জোছনা পড়ল দোটানায়। সাগরকে তো নিজের সন্তানই ভাবে, তাকে ছেড়ে যেতে মন চাইছে না। আবার এখানে থাকলে সে ছোট ছোট বাচ্চাকে নিয়ে খাবে কী?

সাগরের দুই চাচা। তারা সাগরের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে ভালো-মন্দ কিছু বলছে না। এদিকে সাগরও শুরু করেছে কান্না। সে জোছনার আঁচল ছাড়ছে না কিছুতেই। শেষে, জোছনা ঠিক করল, সে শ^শুরবাড়িতেই থেকে যাবে। ভাই তাকে অনেক বুঝিয়েছে, পরের সন্তানের জন্য কেন নিজের জীবন নষ্ট করবে জোছনা। ভাইদের কাছে থাকলে দেখেশুনে আবার বিয়ে দিতে পারবে বোনের। তা জোছনাও বোঝে, থাকা-খাওয়া ছাড়াও মানুষের আরও কিছু লাগে। তার বয়সতো কমই। ত্রিশও হয়নি। ঘাটে কি বাজারে গেলে পুরুষ মানুষেরা কেমন চোখে তাকায়। ওই সুন্দরী মেয়েরা অল্প বয়সে বিধবা হলে যা হয় আরকি। কিন্তু জোছনা পারেনি, ছেলেকে ফেলে চলে যেতে। সাগরের করুণ মুখ আর চোখের পানি তাকে থেকে যেতে বাধ্য করেছিল। অসহায় সাগর জোছনাকে নিজের সিদ্ধান্ত বদলাতে দেয়নি। ভেতর থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ^াসটা ভেতরেই আটকে রেখে সেদিন জোছনা বুঝেছিল, মানুষ আসলে এক জীবনে সব পায় না। 

সে ছেলে এখন আপন মায়ের খোঁজ পেয়ে জোছনাকে ছেড়ে যাচ্ছে। লোকের কথা মনে হয় ঠিকই। পর কখনও আপন হয় না।

স্যান্ডেল হাতে সাগর বাইরে এসেছে।

জোছনা ছেলেকে দেখে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে যায়। এই রইদের মইধ্যে না গেলে হয় না? খাওনটাও খাইলি না ঠিকমতো। রইদটা মরুক। বিকালের দিকে যা।

যামু যখন দেরি করার দরকার কী। হাঁইট্টাতো আর যাইতাছি না। সাগর ন্যাকড়ায় স্যান্ডেলের কাদা মুছতে থাকে। শুকিয়ে সাদা হয়ে আছে কাদা। সহজে উঠছে না।

আমার কাছে দে বাপ। মুইচ্ছা দেই। জোছনা সাগরের কাছ থেকে স্যান্ডেল নিতে গেলে সাগর দেয় না। বলে, থাক। আমিই মুছতে পারমু। মুছতে চাইলে আগে মুছলা না কিয়ারে? জানতা না আমি আজ যামু।

বাপরে, তুই চিরতরে বাড়ি ছাইড়া যাবিগা আজকে। বিষয়টা চিন্তা কইরা আমার মাথা কেমন আউলাইয়্যা গেছে। জোতা সাফ করার কতা মনেই আছিল না। বিশ্বাসঅই অয় নাই তুই আসলেই যাবি।…কয়েকটা পিঠা বানাইতে বইছিলাম। তেলের পিঠা তুই কত পছন্দ করস। সকাল থাইক্যা শইলডা ভালা না আমার। না হইলে সকালেই বানাইতাম পিঠা।

এমন গরমের দিনে কেউ পিঠা বানায়। তুমি পাগল নাকি! বলতে বলতে সাগর ফের ঘরে ঢুকে। জোছনা সাগরের পিছে পিছে যায়।

সাগর খাটের এক কোনায় রাখা পুরনো গেঞ্জি দুটো নিয়ে ব্যাগের ভিতর ঠেসতে থাকে। ফোলা ব্যাগে একটুও জায়গা নেই। হলে কী হবে, সাগর ঠেসেই যাচ্ছে। শেষে ধুত্তুরি বলে একসময় মাটিতে ছুড়ে ফেলে দেয় গেঞ্জি।

ব্যাগটা ছিঁড়ব তো। পুরানা বইল্যাইতো গেঞ্জি দুইটা দেই নাই। রাইখ্যা যাস না। নিজের কিছুতো রাইখ্যা গেলি না।

পুরানা গেঞ্জিদা করবা কী?

কী আর করমু। তর একটা চিহ্ন রইল। গেঞ্জিডি দেখলে মনে অইব তুই এই গেঞ্জি গায়ে দিয়া ঘুরতি।…একছড়া কলা আর কয়টা পেয়ারা দিছি আলাদা ব্যাগে। পথে খাইস। পেট ভইরাত খাইলি না।

কোনখানে যাওনের সময় আমার খিদা লাগে না। ফল বাইর কইরা রাখ। রুবিরে দিও।

মার কাছে গিয়া বইনগ কথা মনে থাকব তর সাগর?

হুম। সাগর ছোট করে বলে।

আসল মারে পাবি। আমার কথা আর মনে থাকব না, না? জোছনা হাসে।

হুম থাকব। তোমার কথাও মনে থাকব। সাগর ব্যাগের চেন লাগাতে লাগাতে বলে।

সাগর, তর কি একটুও মায়া লাগতো না আঙ্গ লাইগ্যা।

মায়া কা লাগতো না।  মায়া লাগলেই কী। আপন মায়ের কাছে যামু না!

আপন মা! হ, যে মায় জন্ম দিছে সেই মায়ইতো আপন। …আইচ্ছা সাগর, আমি যে তরে পাললাম, আমার একটা দাবি আছে না? জোছনা নিচু স্বরে বলে। যেন জোছনা চাইছে সাগর তার কথাটা না শুনুক। কিন্তু সাগর ঠিকই শোনে।

ছেলে বইল্যাই এত আদর কইরা পালছ। মেয়ে হইলে কি পালতা। নিজের দুই দুইটা মেয়ে তোমার। কই তাগ লাইগ্যাতো এত মায়া দেখাইতে দেখি নাই। একজনরে বিয়া দিছ বছর অইয়্যা আইল। একদিন গিয়া খোঁজও নিলা না।

খোঁজ!… সময় করতে পারি না। আর খালি হাতে কি মেয়ের শ^শুরবাড়ি যাওন যায়! …মায়ের কাছে সব সন্তানই আপনরে বাপ। ছেলে কী মেয়ে কী- সব সমান। পেটে না ধরলেঅ আমি তরে অন্য সন্তানের মতো এক চোখেই দেখি। পেটে না ধরলে কি মা হয় না?

অইত না কিয়ারে! তুমি কি আমার মা না?

ছাইড়াতো যাইতাছস।

দেখ মা, যে আমারে পেটে ধরছে তার কাছে গিয়া থাকতে মন চায় না? তোমার কাছেতো ছিলাম এতদিন। মায়ের যখন খোঁজ পাইছি এতদিন পরে, যাই তার কাছে। তোমার কাছে কি আসমু না। সময় সুযোগে আসমু। আমিতো আর দুনিয়া ছাইড়া যাইতাছি না।

এমন অলক্ষুণে কথা কইস না বাপ। দুনিয়া ছাইড়া কা যাইতি। আমার মাথাত যত চুল আছে, তুই এতদিন বাঁচ। এই দোয়া করি।

সাগর যখন রওনা হয় আকাশে তখন মেঘ ডাকছে। জোছনা উদ্বিগ্ন স্বরে বলে, কইছিলাম না সাগর, আসমানে মেঘ জমছে। বৃষ্টি হইব। এই সময় বেশি বেশি বাজ পড়ে। শেষের দিকে গলায় উদ্বেগের বদলে চাপা খুশির ভাব লুকিয়ে রাখতে পারে না জোছনা। ভাবে, বৃষ্টিটা এলো যদি ছেলে এখন না যায়।  

কিন্তু সাগর ততক্ষণে সিএনজিতে উঠে বসেছে। বলে, যাইতাছি সিএনজি কইরা। বৃষ্টিতে কী অইব। খামোখা তুমি এত চিন্তা কইরোনা তো।

ঠিক আছে যা। ফি আমানিল্লাহ। সময় পাইলে মারে বইনরে দেখতে আইস বাজান।

আমু। ঘরে যাও তুমি। বৃষ্টি পড়া শুরু অইছে।

সিএনজি চলা শুরু করে। সবুজ গাড়িটা যতক্ষণ দেখা যায় তাকিয়ে থাকে জোছনা। কখন যে দুই  চোখ বেয়ে পানি পড়তে শুরু করেছে জোছনার! জোরেশোরে বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে।

খ.

জোছনা উঠানে বসে তরকারি কুটছিল। এমন সময় আয়েশা আসে। 

আসেন বুজি। বন। পিঁড়ি এগিয়ে দিতে দিতে বলে জোছনা। চেঁচিয়ে ছোট মেয়েকে বলে, রুবিগো তর ফুপুর লাইগ্যা ঘর থেকে একটা চেয়ার দিয়ে যা মা।

আরে চেয়ার লাগত না। পিঁড়িতে বইছি ভালা লাগছে। চেয়ারে বসলে কেমন জানি পরপর লাগে। মনে অয় এই বাড়ির মেহমান। … আচ্ছা জোছনা, সাগর কি আর যোগাযোগ করছে তোমার লগে?

না। গেলতো তিন দিন হয়েছে। এর মধ্যে কী আর যোগাযোগ করব! আর কেমনে-ই-বা করব।

এখন যোগাযোগ করা কী এমন কঠিন কাজ। একটা মোবাইল করলেইতো হয়। আয়েশা পানের বাটা খুলে যত্ন করে পান সাজাতে থাকে।

আমার কি মোবাইল আছে, যে মোবাইলে আমার লগে কথা কইব?

আরে তোমার না থাক, তোমার ভাশুরের ঘরেইতো আছে। সাগর কি আর তার নাম্বার জানে না। তোমার ঘরের লগে ভাসুরের ঘর। দূরতো আর না। খাইবা নাকি একটা পান? চাচার কাছে করলেই তো হয়। আসল কথা হল, সে তোমারে ভুইল্যা গেছে। কোকিলে ছাও কি আর কাকের বাসায় থাকে! আসল মায়ের খোঁজ পাইছে। ডানা গজাইছে, উড়ালত দিবই। এই পোলার জন্য না তুমি সাপের কামড়ে মরতে গেছিলা? মনে আছে জোছনা তোমার?

মনে আছে বুজি। সাজাইছেন যহন, দেন একটা পান।

সময়মতো আমরা না দেখলে, মরতা সেইদিনই।

কপালে যদি মরণ থাকত মরতাম। তাই বইল্যা অমন কচি ছেলেটারে বাঁচামু না!

যদিও বলে আয়েশাকে, কিন্তু সেদিনে ঘটনা মনে করে শিউরে উঠে জোছনা।  সন্ধ্যার মুখে ছেলেটা বাড়ির নামায় পায়খানা করতে বসেছিল। সাপটা বোধহয় প্রতিদিন অই পথেই যাতায়াত করে। পথে বাধা পেয়ে অথবা সাগরইকে দেখেই বোধহয় সাপটা ফোঁস করে উঠে। ফণা তুলে দুলতে থাকে সাগরের মাথা বরাবর। অইটুক ছেলের কাছে সাপই কী, বিড়ালই কী। সাপ দেখেই বোধহয় হেসে উঠল ছেলেটা। হাসির শব্দেই ফিরে তাকায় জোছনা। তাকিয়ে ভয়ে যেন মূর্ছা যাবে। কিছু ভাবেনি আর। দৌড়ে এসে ছো মেরে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। সাপটা কিন্তু বিষ ঠিকই উগরে দেয়, জোছনার পায়ের গোড়ালিতে ছোবল দিয়ে। ভাসুরের বড় ছেলে দেখতে পেয়ে, পায়ে বাঁধ দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল বলে বেঁচে গেছে জোছনা। 

কিন্তু সে প্রসঙ্গে আর যেতে চায় না জোছনা। বলে, থাক বুজি। আমার কথা বাদ দেন। আপনের কথা কন। আপনের পুতের কথা কন হুনি। পুতে আপনের বিরাট বিদ্বান। হুনছি বিদেশে বলে বিরাট চাকরিঅ করে। আপনেরতো এখন সুখের সময়!

হ গো বইন। সুখের সময়ইতো অওনের কথা। কিন্তু মনেতো কোন সুখ নাই আমার।

কিয়ারে, দুলাল বিদেশ থাইক্যা টাকা পইসা পাঠায় না? এই যে আপনেরা বাড়িত বিল্ডিং দিতাছেন?

বিল্ডিং দিতাছি ঠিকই। আর টাকাপয়সাও পাঠায় বিস্তর। টাকাপয়সা দিয়া কি মানুষের অভাব পূরণ অয়। বিল্ডিংঅ থাকব কে! এতবড় বিল্ডিংঅ আমরা দুইজন মানুষ, থাকতো ডর লাগে। মুখ ঘুরিয়ে উঠানের কোণে পানের পিক ফেলে আয়েশা।

নাহ ঠিকই কইছেন বুজি, জোছনা আনমনে বলে। মানুষের অভাব কোনো কিছু দিয়াঅই পূরণ অয় না। এই কথা আমার চেয়ে আর বেশি কে বুঝে। দুলাল বিদেশ থাইক্যা নাতির ছবি পাঠায় না? মোবাইলেই নাকি পাঠানো যায়।

 আয়েশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, মোবাইলে ছবি দেখলে কি আর মন ভরে বইন। চোখের দেখার একটা আলাদা আনন্দ আছে না! কোলে বসাইয়্যা আদর করার একটা সুখ আছে না। ছেলেটা গেছে দেখতে দেখতে ছয় বছর অইয়্যা আইল। জন্মের পরতো নাতিরে চোখেও দেখলাম না। খালি মোবাইলেই দেখি। তা নাঅয় দেখলাম। কথা যে কমু তার কি কোন উপায় আছে। ইংরাজিতে কী না কী কয় বুঝতে পারি না। নাতিও আমার কথা কিছু বুঝে না।

একটা কথা কমু বুজি? অনেকদিনই ভাবছি কমু। আবার রাগ করেন কিনা এই ভাইব্যা কওয়া অয় না। আমার কি মনে অয় জানেন? মনে অয়, দুলালরে এত বেশি পড়ালেখা করানো ঠিক অয় নাই। বেশি পইড়া ছেলে আপনার পর হইয়্যা গেছে।

না, রাগ আর কী। রাগ করনের কথাকি আর কইছো! আমারঅ মাঝে মাঝে মনে অয়, বেশি বিদ্যান অইয়্যাই, বিদ্যান বউ বিয়া কইরাই ছেরাডা আমার পর অইছে। এর চেয়ে হানিফের মতন কম পড়ালেখা কইরা, ফেইল কইরা যদি গেরামেই থাকত, আমার কাছে থাকত, তাইলেই মনে অয় ভালা আছিল। এমন কথা কয়দিন আগে দুলালের বাপেঅ কইতাছিল।

কিন্তু এইডাঅ মিছা না যে  দুলাল খালি আপনেগ না, এই গেরামের মুখঅ উজ্জ্বল করছে।

হগ বইন, বলতে বলতে আয়েশার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হেইসব কতা ভাইব্যাইতো মনরে বুঝ দেই। … সাগর গেছে গা। অনে তোমার বাজার সদাই কে কইরা দেয় জোছনা?

করি আমি নিজেই। বেশি কিছু অইলে ভাসুরের পুতরে কই। দুইজন মানুষ, কী আর লাগে খাওন? কোন রকম শাক শুঁটকি খাইয়্যা দিন পার করণ আরকি।

আমি যাইগ বইন। কাজ কাম রইছে বাড়িত।

আবার আইয়্যেন বুজি।

সাগর গেছে আজ নিয়ে নয়দিন হলো। প্রতিটা দিনই গোনা আছে জোছনার। বাড়িটা কেমন জানি শূন্য শূন্য লাগে এখন। একই বাড়ি, একই ঘর, মেয়েটাও আছে। আছে আশপাশের সব মানুষই। তাহলেও জোছনার মনে হয় কী যেন নেই। কী যেন নেই। বাড়িটাতে যেন কোন শব্দ নেই। আগে ভাত খেতে বসতে যে আনন্দ ছিল, এখন যেন সেটা নেই। আগে ভালো কোন খাবার রান্না করতে যে সুখ ছিল, এখন যেন সেটা নেই। মাঝে মাঝে জোছনার নিজের উপরই রাগ লাগে। সাগরতো আর মারা যায়নি। বেঁচে আছে, ভালো আছে। আপনজনের কাছেই আছে। হয়তো দেখতেও আসবে তাকে। বলেতো গেছে, তাই।

আচ্ছা, সাগর যাওয়ার আগে যা বলে গেল, তাই-ই কি সত্যি? নিজের মনকে প্রশ্ন করে জোছনা। সাগরকে কি জোছনা তার অবলম্বন হিসেবে ভেবেছিল? তাই অত যত্ন করত সাগরকে? তাই এখন এত মনে পড়ে সাগরকে?

বাড়ির নামায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল জোছনা । আকাশে কী মেঘ জমছে! আবার বৃষ্টি হয় কি না। দিন তিনেক আগে বড় মেয়েটা শ^শুরবাড়ি থেকে চাচার কাছে মোবাইল করেছিল। বলেছিল, আজকে আসতে পারে। দিন গিয়ে সন্ধ্যা হচ্ছে। মেয়েটাতো আজকে এলো না। মেয়ের অপেক্ষায়ই জোছনা সড়কের দিকে তাকিয়ে ছিল। কারা যেন আসছে। আবছাভাবে দেখা যায়। … আচ্ছা, রুবি যেমন ফোন করল চাচার কাছে, সাগর কি পারত না একবার ফোন করতে? কতদিন ছেলেটার মুখ দেখা হয় না!

জোছনা ভালোভাবে দেখার জন্য এগিয়ে যায়। ঘোমটা মাথায় একজনের পাশে পুরুষ কে যেন। মনে হয় মেয়েটাই এলো। শ^শুরবাড়ি গিয়ে বোধহয় মাথায় ঘোমটা দেওয়ার অভ্যাস হয়েছে মেয়ের। কতদিন পরে আসছে মেয়েটা। তার জন্য যে ভালো-মন্দ কিছু রান্না করবে সে উপায়ও নেই। টাকাপয়সা নেই। হাত খালি। ঘরে যা ছিল তাই রাঁধতে হয়েছে। পেয়াজ দিয়ে হাঁসের ডিম ভুনা আর কলমি শাক ভাজি। এখন জামাই নিয়ে এসেছে মেয়ে। লজ্জায় না পড়তে হয় জামাইকে খেতে দিয়ে।

জোছনা হেঁটে হেঁটে সড়কের উপর চলে আসে। আবছা মানুষগুলো কাছাকাছি হতে দেখেÑ মেয়েরা নয়, সাগর এসেছে। সাথে একজন মহিলা। জোছনার বুকের ভেতরে ছলাৎ করে ওঠে। সাগরকে এত তাড়াতাড়ি আবার দেখতে পাবে ভাবনাতেও আসেনি। যদিও সারাদিনই উঠতে-বসতে- খেতে-শুতে ছেলের কথা ভেবেছে। কিন্তু সাগর হঠাৎ এলো কেন? সাথে কাকে আবার নিয়ে এলো?

দুপুরের খাবার খেয়েই ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে রাবেয়া। বলে, এখন যে বিদায় নেওন লাগে বইন। দেরি করলে আবার ফিরতে রাইত অইয়্যা যাইব। বেলা পইড়া আইল।

এখই যাইবেন গা! জোছনা সাগরের আসন্ন বিচ্ছেদে শংকিত হয়। সে জন্য যাওয়াটা বিলম্বিত করার জন্য বলে, চিন্তা করছিলাম পিঠা বানামু। থাকেন না রাইতটা অন্তত। আমিতো ভাবছি সাগররে লইয়্যা আইছেন, কয়ডা দিন বেড়াইবেন। থাকেন না কয়ডা দিন বইন। কতদিন পরে সাগররে দেখলাম।  

সাগররেতো রাইখ্যা যাইতাছি তোমার কাছেই। দেইখ্যো যত ইচ্ছা মনে চায়। তারে আমি তোমার কাছে ফিরাইয়্যা দিয়া গেলাম।

কী কন আপা! সাগররে এই বাড়িত দিয়া গেলেন আপনে?

আমি অনেক ভাইব্যা দেখলাম, সাগরের দাবিদার হইলা তুমি। আমি না। তারে তোমার কাছে দিয়া গেলাম। জন্ম আমি দিলেও তার মা হইলা তুমি। … তুমি কইরাঅই কইয়্যা যাইতাছি বইন। বয়সেতো তুমি ছোটই।

তুমি কইরাইতো কইবেন আপা। আমি আপনার কত ছোট!

এরপর, কথা আরও আছে বইন। সাগরের উপ্রে আমার কিন্তু কোনো মায়া নাই। জন্মের পর থাইক্যা যারে  দেখি নাই, বিশ বছর পর তারে দেখলে তার প্রতি মায়া কেইমনে জন্মাইব! এত বছর পর কেউ গিয়া হুট কইরা মা ডাকলেই তার মা হওয়া যায়! আমার আরও তিন ছেলে আছেগো বইন। তাগো লইয়্যাই আমার দিন চলব। তোমার ছেলেরে তোমার কাছেই রাইখ্যা গেলাম। তোমারে ছাইড়া যাইতে চাইছে বইল্যা তার উপ্রে রাগ কইর না। ছেলে কি আর কোনোকিছু ভাইব্যা গেছে?

সাগর কাছে বসেই ওদের কথা শুনছিল। রাবেয়ার কথা শুনে সে রাগ করে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। যদিও রাবেয়া আগেই এসব কথা বলে তাকে এ বাড়িতে ফিরিয়ে দিতে এসেছে। দরজার কাছে একটা বিড়ালছানা বসে ছিল চুপ করে। যেতে যেতে সাগর নিজের রাগটা বিড়ালটার ওপর ঝাড়ে। লাথি দিয়ে বিড়ালটাকে উঠানে ফেলে দেয়। দিয়ে, দৌড়ে বাড়ির নামার দিকে চলে যায়।

এমন কইরা কইতে হয় আপা! ছেলেটা মনে দুঃখ পাইল। সাগরের গমন পথের দিকে তাকিয়ে জোছনা বলে।

পাক। দুঃখ পাইলেই ভুলতে পারবো আমারে। আমারে মনে রাখলে, তোমারে যে ভুলতে শুরু করবো বইন। বলতে বলতে হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠে রাবেয়া। মিছা কইলামেগো বইন। মিছা কইলাম। চোখের আড়ালে থাকলেই কি আর সন্তানরে ভুলা যায়! যারে কষ্ট কইরা পেটে ধরছি, যন্ত্রণা সইয়্যা জন্ম দিছি, তারে কাছে পাইয়্যাঅ ভুইল্যা থাকা যায়? সন্তান হইল কলিজার অংশ। তুমি মা, তুমিও জানো তা। বলতে বলতে চুপ হয়ে যায় রাবেয়া। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, কিন্তু আমার চেয়ে সাগরের উপর তোমার দাবিই বেশি। তারে তুমি বুকের দুধ খাওইয়্যা, মায়ের মমতা দিয়া বড় করছ। এতদিন পরে তার উপ্রে আমার দাবি খাটে না। তোমার কাছেই সাগরের থাকা উচিত। তোমার অবলম্বন সে। … এখন আমি যাইগো বোন। সাগরের লগে আর দেখা না হওয়াই ভালো।

গ.

সাগর চুপচাপ বসে আছে ধানক্ষেতের আইলে। কেটে নেওয়া ধানের গোড়ার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। ক’দিন আগেও শীষে শীষে ভরাট ছিল ক্ষেতটা। ধানের লোভে তখন বুলবুলি, চড়াই আর বাবুই পাখিরা উড়াউড়ি করত ক্ষেতের ওপর। এখন কেমন শূন্য শূন্য লাগছে চারপাশটা। আজ পাখিরাও নেই। যেখানে পাওয়ার নেই সেখানে বোধহয় কেউ যেতে চায় না। কী মানুষ, কী পাখি। সাগর কি জোছনাকে ছেড়ে চলে গিয়ে ভুল করল? রাবেয়া কেনই-বা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে এলো? যে সন্তানকে পেটে ধরেছে, তাকে কোনো মা আরেকজনের কাছে দিয়ে যায়?

রাবেয়ার ওপর চাপা একটা ক্ষোভ ক্রমশ চেপে বসছিল সাগরের বুকের ওপর। কেমন একটা রাগ হচ্ছিল জোছনার উপরও।

রাবেয়া বোধহয় চলে যাচ্ছে। আসার সময় সাগরকে বলছিল রাবেয়া, তাকে এই বাড়িতে দিয়েই ফিরে যাবে।

মাকে দেখার জন্য একটু এগিয়ে সড়কে গিয়ে দাঁড়ায় সাগর। একটা ঝোপের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। মনের ভেতরে মায়ের প্রতি ভালোবাসার চেয়ে ঘৃণার মতো কিছু একটা যেন দানা বাঁধছে। নিজ সন্তানকে যে এভাবে ভুলে যায়, তাকে কি শ্রদ্ধা করা যায় ? না ভালোবাসা যায়? দূর থেকে রাবেয়া ক্রমশ কাছাকাছি হচ্ছিল। কেমন করে যেন হাঁটছে রাবেয়া। হাঁটছে আস্তেই, কিন্তু শরীরে যেন জোরই পাচ্ছে না। কে জানে এতটা পথ এসে আবার ফিরে যাওয়ার কারণে শরীর খারাপ হলো কি না।

রাবেয়া সাগরের হাত কয়েক দূর দিয়ে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। ঘোমটা সরে গিয়ে মাথার কাঁচাপাকা চুল দেখা যাচ্ছে। কেমন যেন আনমনে পা ফেলছে রাবেয়া। চোখের দৃষ্টি ভাবলেশহীন। সামনে তাকিয়ে হাঁটছে ঠিকই, কিন্তু কিছু যেন দেখছে না। একেবারে কাছাকাছি হতে সাগর দেখে রাবেয়ার দুই চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। সাগরের একবার মনে হয়, ঝোপ থেকে বের হয়ে রাবেয়াকে থামায়। থামিয়ে রাবেয়ার চোখের পানি মুছে দেয়। কিন্তু সাগর নড়ে না। ওর মনে হয়, রাবেয়াকে থামিয়ে লাভ নেই। যে চলে যেতে চায়, তাকে চলে যেতে দেওয়া উচিত। মায়ের চোখে যেন না পড়তে হয়, সেজন্য সাগর ঝোপের আরও আড়ালে সরে যেতে থাকে।

সাগরকে অতিক্রম করতে করতে কে যেন কথা বলে ওঠে রাবেয়ার সাথে।

আরে তুমি রাবেয়া না? দূর থাইক্যা দেইখ্যাই আমার কেমন সন্দেহ অইছিল। তুমি কই থাইক্যা? পোলার খোঁজে আইছো বুঝি?

পোলায় আমার কাছে গেছিল। এই গেরাম ছাইড়া।

তা সাগর কই?

তারে তার মায়ের কাছে রাইখ্যা গেলাম।

মা! মানে জোছনার কাছে? তুমি পোলারে ফিরাইয়্যা দিয়া গেলা নাকি!

হগো খালা, যার সন্তান তার কাছেই দিয়া গেলাম। দুই দিন কাছে রাইখ্যাই বুজ্জি, জন্মদিলেই মা অওন যায় না। পোলার চোখ মুখ দেইখ্যাই বুজ্জি পোলায় এই বাড়ি ছাইড়া গিয়া, মারে ছাইড়া গিয়া আমার কাছে থাকতে পারব না।

এইডা কী কইলা! নিজের মার কাছে থাকতে পারব না কিয়ারে!

আমি তারে পেডে ধরছি, জন্ম দিছি ঠিকই। কিন্তু আমি তার মা না। মা অইল জোছনা। যাইগো খালা। বেশি দেরি অইলে পৌঁছতে রাইত অইব। বাস পাইতেও সমস্যা অইব। বহুত দূরে যাইতে অইব আমারে।

সাগরের একবার মনে হয়, রাবেয়ার পিছে পিছে চলে যায়। পা বাড়াতে গিয়ে পরক্ষণেই জোছনার মুখ মনে পড়ে। যখন বাড়ি ছেড়ে গেল সাগর, কী করুণ মুখে দাঁড়িয়ে ছিল জোছনা। সিএনজিতে যেতে যেতে একবার পেছনে ফিরে দেখেছিল সাগর। চোখ দুইটা জলে ভরে উঠেছিল তারও। সেই জল কি দেখতে পেয়েছিল রাবেয়া? রাবেয়ার কাছে গিয়েতো কাঁদেনি সাগর! তাহলে তার চোখেই-বা দুঃখ কোত্থেকে দেখবে রাবেয়া!

কিন্তু না, না কাঁদলেও রাবেয়া সাগরের চোখের অতলে ঠিকই জলের ঢেউ দেখতে পেরেছিল। মায়েরা হয়তো পারে অমন। তাই বোধহয় আজ তাকে জন্মের ঋণ থেকে মুক্ত করে গেল রাবেয়া।

সাগর ঝোপ থেকে বের হয়ে আসে। রাবেয়া কেমন এলোমেলো পায়ে সড়ক ধরে হেঁটে যাচ্ছে। পেছন থেকে জন্মদাত্রীকে দেখতে দেখতে সাগরের মন থেকে, বুক থেকে ঘৃণা ঘৃণা ভাবটা কোথায় চলে যায়। তার বদলে কী একটা কষ্ট বুকজুড়ে দাপাদাপি করতে থাকে।

সাঈদ আজাদ : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares