কচুপাতায় করমচা : ঝর্না রহমান

গল্প

কচুপাতায় করমচা

ঝর্না রহমান

ফটকের ভেতরে পা দিয়ে নিগার থামেন। পেছনে পড়ে গেছেন মাহফুজুল। বেচারা। রিকশা থেকে নেমে মিনিট পাঁচেকের মতো হেঁটে আসতেই কাহিল। নিগার হাতটা বাড়িয়ে ঘুরে দাঁড়ান। যেন মাহফুজুল কাছে এলেই তাকে শিশুদের মতো হাত ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যাবেন।

‘অস্তাচল’ নামের ফটক দিয়ে ঢুকেছিলেন তাঁরা। নিগার সুলতানা আর মাহফুজুল কবির। নিগার সুলতানার ইচ্ছা ছিল তিনি যাবেন উদয়াচলের দিকে। ‘উদয়াচল’ নামে রমনা পার্কের কোনো ফটক নেই। নিগার সুলতানা উদয়াচল ভেবেছেন ভাবার্থে। কারণ নিগার সুলতানা আর তাঁর স্বামী মাহফুজুল কবির তো এখন অস্তাচলেরই যাত্রী। নিগার ষাট পেরোলেন এ বছর আর মাহফুজুল কবির একাত্তর ছুঁই ছুঁই।

তবে স্বামীর চেয়ে দশ বছরের ছোট হলেও নিগার ভেবেছেন, এ যাত্রায়, মানে আজকের আউটিংয়ে তিনিই পেছনে থাকবেন। কারণ নিগারের এখন ঠ্যাঙে জোর নেই। এভাবেই বলেন নিগার। ভাবার্থে নয়, আসলেই তার পায়ে জোর নেই। কয়েক মাস আগে সিঁড়ি থেকে পিছলে পড়ে ডান পা মচকেছে তাঁর। পুরো আড়াই মাস খোঁড়া হয়ে থাকতে হয়েছে। তবে এখন না খোঁড়ালেও ডান পা-টাকে একটু জমা-খরচ দিয়েই হাঁটতে হচ্ছে। এ হাঁটা দেখলে লোকজনের নিগারকে খোঁড়া বলার উপায় নেই। বরং ভাববে গজেন্দ্রগামিনী নারী। গায়ে-গতরে চওড়া হয়ে যাওয়া মহিলারা তো এভাবেই হাঁটে। তারা তো আর সুতন্বী ললনার মতো হরিণাগামিনী হতে পারে না!  তবে এখনও নিগার প্রত্যেকবার ডান পায়ের পাতা মাটি থেকে আলগা করতে গিয়ে বোঝেন ‘কিছু লিগামেন্ট ফেঁসে’ গেলে কত ধানে কত চাল হয়।

ডাক্তারের ভাষ্য ছিল এটি। এক্স-রের ফটোটি কপালের ওপর তুলে ধরে বলেছিলেন, ‘আপনার লিগামেন্ট ছেঁড়েনি, কিন্তু কিছু লিগামেন্ট বাজেভাবে ফেঁসে গেছে, সেটা ছেঁড়ার চেয়ে কম না।’

নিগার সুলতানা ব্যথায় কোঁকাতে কোঁকাতে ঝাঁঝালো গলায় বলেছিলেন, ‘লিগামেন্ট কি রেশমি কাপড় নাকি? ফেঁসে যাবে?’

ডাক্তার হাসেন। ‘কাপড় না, রেশমি সুতো বলতে পারেন। ঠিক হতে সময় লাগবে।’

নিগার কল্পনা করেন, তাঁর পায়ের গোড়ালিতে কিছু রেশমি সুতার বুননে ওলটপালট জট লেগে গেছে। এই জট আর খোলা যাবে না। ব্যথার কষ্টে চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ে।

প্রায় এক সপ্তাহ পায়ের পাতা এক সেন্টিমিটার তুলতে পারেননি। জান বের হয়ে যেতো ব্যথায়। ডাক্তার এক মাস বেডরেস্ট আর তিন মাস ধরে অ্যাঙ্কলেট পরে চলাফেরার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু চার মাস পার হওয়ার পরেও পুরোপুরি সেরে ওঠেননি তিনি। গোড়ালির জয়েন্টে এখনও খোঁচা মারা ব্যথা। একেবারে গজাল ফুটো ঘাই। সিঁড়ির দুই ধাপ ওপর থেকে পল্টি খেলে যে এমন হবে কে জানত! বপুটাই যত নন্দ ঘোষ। নায়লাদের মতো তরুণী হলে এক ঘূর্ণি দিয়েই পতন সামলে নিতে পারতেন।

নিগার সুলতানা ডক্টরস শু পরেছেন। মচকানো পায়ে হলুদ রঙের অ্যাঙ্কলেট। শাড়ির তলায় ওই কিম্ভূত জিনিসটি হাঁটতে গেলেই বেরিয়ে আসে।

বেরোবার আগে আয়নার সামনে একটু হেঁটে দেখেও নেন। আঙুরলতা নকশাপাড়ের নতুন শাড়িটাতে নিগারকে বেশ লাগছিল। শরীরখানা নাদুসনুদুস হলেও নিগারের ফিগারের ভাঁজ এখনও একেবারে মজে যায়নি। পরিপাটি করে শাড়িটাড়ি পরলে ফুড়ুৎ করে দশ বছর বয়স উড়ে যায়।

পার্কে ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাবটা পাস হতেই মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠেছিল।

নাশতার টেবিলে নায়লার সামনেই নিগার প্রস্তাব করেছিলেন।

কাল তো আর বেরোনো হলো না। আজকে যাবে নাকি? নায়লা শখ করে আমাদের জন্য শাড়ি পাঞ্জাবি কিনল, পরে একটু বাসি নববর্ষ করে আসি!

মাহফুজুল বেশ খুশিভরা গলায় বলেন, ‘যাওয়া যায়। চল। কখন যাবে?’

বিকেলে! একটু আগে আগেই বের হয়েন। তা হলে ভালো করে ঘোরাঘুরি করতে পারবেন।

পুত্রবধু নায়লাই উত্তর দেয়। খুশি হয়ে শাশুড়ির দিকে চেয়ে হাসে।

এই বস্তা ব্যান্ডেজটা পরা আজকে বাদ দেব নাকি বলো তো? হাঁটতে গেলেই শাড়ির তলা থেকে গোবদা পা বেরিয়ে আসে! কেমন বিশ্রী লাগবে বলো তো?

আয়নায় দাঁড়িয়ে ভ্রু উঁচিয়ে মাহফুজুলকে ইশারা করেন নিগার।

মাহফুজুল কথাটাকে অতটা গুরুত্ব দেন না। পাজামায় পা ঢোকাতে ঢোকাতে বলেন, ‘কে তোমার পা দেখবে? মানুষ দেখে মুখ! মুখ তো তোমার সুন্দরই! ওখান থেকে লোকের চোখ আর নিম্নগামী হবে না!’

হুম! তোমাদের পুরুষদের চোখ তো কেবল নিম্নগামী হওয়ার তালেই থাকে, তাই ভাবোও তেমন।

নিগার তরুণীর লাস্যে মাহফুজুলের দিকে চেয়ে ভ্রু নাচান, ঠোঁট টিপে হাসেন।

নিজেকে কেমন তরুণীই মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, স্বামী নয় প্রেমিকের সাথে ডেট করতে বেরোচ্ছে নিগার।

প্রেমিকের সাথে? এক মুহূর্তের ভাবনা।

আয়নার স্বচ্ছ মসৃণতায় ফয়সালের মুখটা হঠাৎ একটা ছায়া ফেলে মিলিয়ে যায়।

ফয়সাল নিগারকে রমনা পার্কে লেকের পাড়ে বসে গল্প করার একটি অপরূপ সন্ধ্যা দিয়েছিল। সে কতকাল আগের কথা! ফয়সাল ছিল নিগারের সহপাঠী। কলেজ পালিয়ে হুড তোলা রিকশায় চেপে ওরা দু’জনে রমনায় নেমেছিল। নিগারের কাছে রমনা পার্ক তখন দারুণ রোমাঞ্চভরা এক স্বপ্নকাননের নাম। নতুন একটা শাড়ি পরেছিল। আনকোরা সুতোর গন্ধ নিগারকে কেমন আবিষ্ট করে দিচ্ছিল। সবকিছু সুন্দর লাগছিল। ভয়ও লাগছিল খুব। বাসা থেকে মায়ের কাছে মিথ্যে কথা বলে বেরিয়েছে। আবার বাসায় ফিরে গিয়ে কী কী বানানো কথা বলে মিথ্যেটাকে সত্যি করে তুলতে হবে সে ভাবনাতেও চুপসে যাচ্ছিল। কিন্তু পার্কের ভেতরে ঢুকতেই শরীর কেমন পাখির মতো হালকা হয়ে এলো। 

তখন লেকের পানির ওপর মধুর মতো ঘন হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল রোদ। পাশাপাশি বসে ফয়সাল মাঝে মাঝেই নিগারের দেহের সাথে ঘনিষ্ঠতায় নিজেকে একটু করে চাপ দিচ্ছিল। আর প্রতিবার নিগারের রক্তের ভেতরে ঝংকার দিয়ে উঠছিল তীব্র রোমাঞ্চ। কিন্তু ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল। পরিচিত কেউ যদি ওদের দেখে ফেলে!

ফয়সাল নিগারের হাতের পাতা মুঠোয় নিয়ে চমকে উঠেছিল।

আরে এত ঠাণ্ডা কেন, মারা গেছ নাকি নিগার?

নিগার কিছু বলার আগেই ফয়সাল তার হাত তুলে নিয়ে ঠোঁটে চেপে ধরেছিল। বলেছিল, ‘দাও, হাত গরম করে দিই!’ তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফয়সাল দ্রুত মুখ নামিয়ে আনে। দুটো জ্বলন্ত কয়লা যেন ঠোঁটে ছ্যাঁকা দিয়ে যায়।

প্রথমে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে ছিটকে দূরে সরে গিয়েছিল। ভীত চোখে চারপাশে দেখে। কে দেখে ফেলল?

পার্কের চারপাশে ছিল মোটা গ্রিলের বাউন্ডারি। তার ফাঁক দিয়ে রাস্তা দেখা যায়। লাইটপোস্টের কাছে একটি বাস তখন যাত্রী তুলে আবার স্টার্ট নিয়েছে। নিগারের মনে হলো বাসের জানালার পাশে যেন বাবা বসে আছেন। ঠিক নিগারের দিকেই চেয়ে আছেন।

পর মুহূর্তেই মনে হয়েছে, বাবা অফিসের কাজে দু’দিন আগে চট্টগ্রাম গিয়েছেন।

তবে ঘটনার আকস্মিকতায় খুব রাগ করেছিল নিগার। চোখ ভরে উঠেছিল পানিতে। কোনোমতে বলেছিল, ‘উঠব। বাসায় যাবো।’

ফয়সাল এক হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরেছিল নিগারকে।

এখনই? আর একটু বসি!

না, এক মুহূর্তও না। তুমি একটা… বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল।

নিগারের অবস্থা দেখে ফয়সাল ভড়কে গিয়েছিল। চোখে চোখ রেখে বলেছিল, ‘আমি কি কোনো অন্যায় করেছি?’

চুপ করে থাকে নিগার।

তারপর ঝট করে মুখ তুলে বলে, ‘এমন খোলা জায়গায়, এসব ঠিক না! ছিঃ’

হেসেছিল ফয়সাল।

তা হলে একদিন কি আমরা নির্জন কোনো রুমে বসতে পারি? তুমি চাইলে ব্যবস্থা করব।

ফয়সালের চোখে কেমন একটা অচেনা আলো।

ভয়ের একটা নেকড়ে যেন নিগারের গলা কামড়ে ধরে। মনে মনে সতর্ক হয়ে গিয়েছিল।

ফেরার পথে ওরা পার্কের ঝোপেঝাড়ে ঘনিষ্ঠভাবে বসা কয়েক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা দেখেছিল।

ফয়সাল বলেছিল, ‘দেখো, ওদের দেখো। এই বয়সে ছেলেমেয়েরা পার্কে প্রেম করতেই আসে। বিদ্যাচর্চা করতে আসে না।’

পাশাপাশি হাঁটতে গিয়ে ফয়সালের হাতের মুঠোয় কখন নিগারের হাত আটকা পড়েছিল বুঝতে পারেনি। তখন আশপাশে লোক চলাচল দেখেও নিগার আর হাত ছাড়িয়ে নিতে ব্যস্ত হয়নি। ভালো লাগছিলো খুব।

বাস্তবতার নিষ্পেষণে তরুণ বয়সের সেই গোপন রোমাঞ্চ মিলিয়ে যেতে সময় লাগেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার আগেই মাহফুজুলের সাথে বিয়ে হয়ে গেল নিগারের। রোমাঞ্চ টোমাঞ্চ সব সাবানের ফেনার মতো জলে ভেসে গেল। ফয়সালও হারিয়ে গেল। দু-তিন বছর ওর খবরাখবর জানত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিটিক্যাল সায়েন্সে ভর্তি হয়েছিল ফয়সাল। পরে ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল। সন্ত্রাসী মামলাটামলাও ছিল ওর নামে। পরে যেন বিদেশে কোথায় চলে গিয়েছিল। নিগারও স্বামী-সন্তান আত্মীয়স্বজন নিয়ে সংসার জীবনের ঘূর্ণিতে ঘুরপাক খেতে লাগলেন। ধীরে ধীরে নিগারের মনের মধ্যে ফয়সাল নামে একটু রঙের ফোঁটা ছাড়া আর কোনো ছাপই রইল না।

পাঞ্জাবিটা গায়ে চাপিয়ে নিগারের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে আয়নায় দেখেন মাহফুজুল।

ধুর! বুড়ো মানুষের জন্য এমন কড়া রঙের পাঞ্জাবি কেউ কেনে?

নিগার মাহফুজুলকে এপাশ ওপাশ থেকে দেখেন।

কেন, তোমাকে তো ভালো লাগছে! দশ বছর বয়স কমে গেছে! নায়লা তো ঠিকই বলেছে!

মাহফুজুল দু’গালে দাড়ি হাতড়িয়ে মুখ বাঁকা করে বলেন, ‘হুম, ভালো! সার্কাসের ক্লাউন! সাদা দাড়ি লাল পাঞ্জাবি! পারফেক্ট বৈশাখি সাজ!’

আহা! এভাবে বলছ কেন? নায়লা শুনলে মাইন্ড করবে!

আজকাল অনলাইন শপিং চালু হয়েছে। তরুণ-তরুণীরা সারাক্ষণই স্মার্টফোন হাতে নিয়ে থাকে। নিগার সুলতানার পুত্রবধূ নায়লা সারাক্ষণই স্মার্টফোন হাতে নিয়ে শপলিংকগুলো ভিজিট করে। প্রতি মাসেই দু-চারটা করে নানা ডিজাইনের শাড়ি আর পোশাকের অর্ডার দিয়ে ফেলে। নিগার সুলতানার শাড়িটাও নববর্ষের সপ্তাহখানেক আগে অনলাইনে কেনা। নায়লা ফোনের স্ক্রিনে দু’দিকে টেনে শাড়ির পাড়গুলো বড় করে দেখিয়ে বলেছিল, ‘এটা কেনেন আম্মা। ট্রাডিশনাল ডিজাইন। এক প্যাঁচ দিয়ে পরলে আপনাকে আগের দিনের জমিদার গিন্নিদের মতো দেখাবে!

হুম, আমার বপু দেখে বলছ? তবে তোমার তনুদেহেও এ শাড়ি মানাবে।

নায়লা এ যুগের মেয়ে। শাশুড়ির কথায় মোটেই অপ্রস্তুত হয় না। বলে, ‘হ্যাঁ, বয়সীদের স্বাস্থ্য একটু ভারী হলেই ভালো দেখায়। ব্যক্তিত্ব আসে। আর আমি তো একদিন পরবোই! খুব পছন্দ হয়েছে আমার।’

অর্ডার দিয়ে দেওয়া হলো। একই সাথে নায়লা শ^শুরের জন্যও একটা মেরুনলাল পাঞ্জাবির অর্ডার দেয়। পাঞ্জাবির হাতা আর আর বুকে কারচুপির কাজ।

মাহফুজুল বলেছেন, ‘ধুর! এটা আমি পরবো না। আমি কি বাচ্চা না কি?’

কিচ্ছু হবে না। বিদেশে দেখেন, পুরুষদের যত বয়স বাড়ে তত তারা রঙচঙে জামাকাপড় পরে। তাতে মন চাঙ্গা থাকে।

নায়লা মোটামুটি শ্বশুর-শাশুড়িকে কড়াল করিয়ে ফেলে, এই সাজে এবার পয়লা বৈশাখে রমনার বটমূলে যেতেই হবে। নিগার চোখ সরু করে কয়েক পলক স্বামীর দিকে তাকিয়েছিলেন, কারণ মাহফুজুল দিব্যি স্বাভাবিক গলায় বলছেন, ‘হ্যাঁ যাবে। এখন তো নববর্ষে শুধু রমনার বটমূলেই না, আশপাশেও অনেক অনুষ্ঠান থাকে। তবে, তোমার শাশুড়ি কি বের হতে পারবে? অনেক হাঁটতে হবে। সে তো খোঁড়া! রাস্তায় গাড়িটাড়ি চলবে না। হাঁটা ছাড়া তো গতি নাই।’

না, আম্মার পা তো এখন ভালো হয়ে গেছে, তাই না?

নিগার হাসেন!

কী জানি! দিব্যি তো ছোটাছুটি করে ঘর-সংসার করছি! কিন্তু দেখো, তাও খোঁড়া বদনাম ঘুচল না।

আম্মা হাঁটতে পারবেন বাবা! অল্প হাঁটবেন। তারপর দু’জন কাছাকাছি কোথাও বসে পড়বেন। চটপটি ফুচকা বাদামটাদাম খাবেন। ফেরিওলাদের কাছ থেকে পাখা কিনে হাওয়া খাবেন। আম্মাকে বেলি ফুলের মালা কিনে দেবেন। আম্মা আপনাকে ভুভুজেলা বাঁশি কিনে দেবেন। হাঁটতে হাঁটতে ফুঁ দিয়ে বাজাতেও পারেন!

দুষ্টু দুষ্টু চোখে শ্বশুরের সাথে কুটুস কুটুস কথা বলে নায়লা। নিগার হাসি চাপতে পারেন না। বলেন, ‘তোমার শ্বশুর ভুভুজেলা বাঁশি বাজাতে পারলে আমিও ফুটপাতের ব্লকে কুতকুত খেলতে পারব!’

পয়লা বৈশাখের দিন সকালে ছেলেপুলেরা বেরিয়ে গেলে নিগার স্বামীকে বলেন, ‘কী গো, কী করবে? বেরুবে?’

মাহফুজুল টিভির রিমোট টিপতে টিপতে আলসেমিভরা গলায় বলেন, ‘ঘরে বসে বসেই তো সারা শহরের নববর্ষ অনুষ্ঠান দেখা যাচ্ছে, শোনা যাচ্ছে! এই রোদের মধ্যে পুড়তে বাইরে যাওয়ার কোনো দরকার আছে? বের হওয়া মাত্র মাথা ধরে যাবে। সাইনাস চরমে উঠবে। তুমি যাবে? যেতে চাইলে চলো, আমার আপত্তি নেই!’

মাথার ভেতর একটা সমস্যা পাঞ্চ করে নিজের অনিচ্ছাটা বুঝিয়ে দিয়ে নিগারের ইচ্ছেপূরণের এই কৌশলী প্রস্তাবের ঢং মাহফুজুলের খুব পুরোনো। মাহফুজ নিগার দু’জনই জানেন এর পরে আর যাওয়ার প্রশ্ন আসে না।

ছেলে-বউমা বটমূল টটমূল ঘুরে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায় হেঁটে-টেটে যখন বাসায় ফিরে আসে, তখন ওদের মুখ রোদে পুড়ে ঝামা।

ও রে বাবা কী রোদ! মগজ গলে ঘি হয়ে গেছে! না গিয়ে ভালো করেছেন আপনারা।

বলতে বলতে নায়লা একটা পলিথিনের ছোট প্যাকেট বাড়িয়ে দেয়, ‘আম্মা, আপনার জন্য এনেছি। বেলি ফুলের মালা। বিকেলে বেরোবেন না আপনারা? ফ্রিজে রেখে দিলে তাজা থাকবে।’

নিগার সহজ গলায় বলেন, ‘নাহ, আজ আর যাবো না। বিকেলে অনেক ভিড় হবে। আবার নাকি পাঁচটার মধ্যে ঘরে ফেরার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।’

তা হলে মালাগুলো?

নায়লা মালার প্যাকেটটা হাতে নিয়ে কী করবে বুঝতে পারে না।

নিগার অলস হাতে প্যাকেটটা তুলে নিয়ে টেবিলে রাখেন।

মাহফুজুল সব দেখেও কিছু বলেন না।

পার্কের ভেতরে ঢুকে নিগার আর মাহফুজুল চারপাশে তাকান।

কাল এলে নিশ্চয়ই এখানে হাঁটার জায়গা পাওয়া যেত না। আর আজ দেখো, কী সুনসান!

নিগার চঞ্চল ভঙ্গিতে ভ্যানিটি ব্যাগটা অনেকখানি দুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলেন।

মাহফুজুল একটু আতঙ্কিত গলায় বলেন, ‘কেমন বেশি নীরব। আজেবাজে লোকজন আছে নাকি কে জানে!’

আচ্ছা, প্রথমেই কেন খারাপ ভাবনা ভেবে নিচ্ছ?

কথায় আছে না, সাবধানের মার নেই!

দেখ, কী সুন্দর সবুজ হয়ে আছে সব! কাল সন্ধ্যায় এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল মনে আছে?

দেখো ঘাসের তলায় কিন্তু পানি জমে থাকে। তোমার সাধের শাড়ি যাবে!

গেলে যাবে! চল ঐ মাঠটায় বসি। একেবারে সবুজ গালিচা।

মাথা খারাপ? বসলেই পাছা ভিজে উঠবে। জোঁক টোকও ঢুকে যেতে পারে!

ধুর! কী যে আজাইরা কথা বলো! তোমরা পুরুষেরা বোধ হয় নোংরা কথা বলার জন্য তৈরিই থাকো!

আরে! নোংরা মানে কী! বাস্তব সম্ভাবনার কথা বললাম!

বাস্তব না আণ্ডা! এই খটখটে শহরের মাটিতে জোঁক?

জোঁক না হলেও পিঁপড়া, চ্যাল্লা, অন্য পোকা টোকা!

রাগ লেগে যায় নিগারের। তবে খোঁপায় জড়িয়ে রাখা বেলি ফুলের মালার গোছাটা ততক্ষণে অনেকটা ঝাঁকড়া হয়ে গেছে। পলিথিনটার ভেতরে একটু পানি ছিটিয়ে ফ্রিজে রেখেছিলেন। জল পেয়ে ফুলগুলো সব ফুটে মালাটা ভারী হয় উঠেছে। ঘন গন্ধের একটা ধাক্কা বারবার নিগারের গালটাকে আলতো ছুঁয়ে দিচ্ছে। রাগ আর হালে পানি পায় না। রাগ নিজেই পানি হয়ে যায়। মন তরল।

নিগার তরল গলায় বলেন, ‘অসুবিধা নেই। আজ পোকার কামড় খাবো।’

মাহফুজুল হাসতে হাসতে এদিক ওদিক দেখেন।

পোকার কামড় বোধ হয় খেতে পারবে না। চারপাশ দেখো, নিঝঝুম। মনে হচ্ছে একটা মশাও নেই!

ভালোই তো। তা হলে তোমার কামড় খাবো। মাহফুজুলের কানের কাছে মুখ এনে নিগার একটু ফিসফিস করেন।

একটু অপ্রস্তুত হয়ে চারপাশে আবার চোখ বুলান মাহফুজুল।

আমি মশাও নই, পিঁপড়াও নই। মানুষকে কামড়াই না।

মানুষ না সাহেব! মেয়ে মানুষ! নারী! কামড়াও না, না? মনে নেই, সেই বিয়ের পরে বড় আপাদের বাসায় বেড়াতে গিয়ে..?

চোখ মটকে একটা মারাত্মক ভ্রƒভঙ্গি করেন নিগার। মাহফুজুলের একটা হাতও এর মধ্যে বগলদাবা করে নিয়েছেন। মাহফুজুলের বুকে দু-একবার মাথাটা একটু এলিয়ে দিচ্ছেন।

সতর্ক হয়ে যান মাহফুজুল।

আরে! নিগারের হলো কী? মহিলার তো বুড়ো বয়সে ভিমরতি হয়েছে! চুলে ফুল দিলে আর পার্কে এলে বুঝি কচি ছুঁড়ি হয়ে যেতে হয়?

দূরে গল্প করতে করতে দু’জন লোককে হেঁটে আসতে দেখা গেল। ওদের পেছনে, আর একটু দূরে একটা বৈকালিক হাঁটা দল দেখা যাচ্ছে। হনহন করে এগিয়ে আসছে।

মাহফুজুল হঠাৎ হাঁটার গতি থামান। আলতো করে নিগারকে ছাড়িয়ে দেন।

একটু দম নিই। হাঁপিয়ে গেছি। তুমি এগোও।

নিগার তটস্থ। ‘কী হলো? খারাপ লাগছে নাকি?’

নাহ! খারাপ লাগবে কেন? চলো এই বেঞ্চে বসি।

সামনে একটা সিমেন্টের স্ল্যাব। তেরছা হয়ে রোদ পড়েছে। তার ওপর কালো পিঁপড়ের সারি হেঁটে যাচ্ছে।

হেসে ফেলেন নিগার। ‘জোঁকের ভয়ে ঘাসে বসবে না বলে এখন পিঁপড়ার কামড় খাওয়াবার তাল করেছ?’

মাহফুজুল পকেট থেকে রুমাল বের করে স্ল্যাবটা ঝাড়তে শুরু করেন।

নিগার উৎফুল্ল মুখে চারদিক দেখেন। দারুণ লাগছে আজ দু’জনে পার্কে ঘুরতে। আসলে মাঝে মাঝে নিজেদের জন্য একটু কোয়ালিটি টাইম রাখতে হয়। সংসার জীবনের নিত্যদিনের ঘানি ঘুরোনো কাজ থামিয়ে একটু অন্যরকম করে সময় কাটানোটা জরুরিই। মাহফুজুল অবশ্য ঠেলায় পড়ে সাথে এসেছেন। নিগার সেটা খুব ভালোই জানেন। বেচারা! একটু হেঁটেই হাঁপিয়ে পড়েছে। তবুও ভালো লাগছে। ব্যাগের ভেতরে খোসা ছাড়ানো বাদামের প্যাকেট নিয়ে এসেছেন নিগার। ভাঁজ করা পুরোনো পেপারও আছে। কোথাও পেপার বিছিয়ে বসে পড়বেন। বাদাম খাবেন। বাদামদানা ভেঙে পাতলা খোসা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে মাহফুজুলের হাতে তুলে দেবেন!

মনে মনে গানের কলিও ভাঁজছেন নিগার। ‘আমার মনের কোণে বাইরে, আমি জানলা খুলে ক্ষণে ক্ষণে চাই রে!’

কিন্তু এই গানটাই কেন মনে মনে ভাঁজছেন। কতকাল আগের গান! ফয়সাল এই একটি গানের প্রথম দুটি লাইনই জানত। যখন তখন চোখমুখ ঘুরিয়ে গেয়ে উঠত। ফয়সালকে তখন মনে হতো সতেজ একটা চারাগাছ। হাওয়ার দোলায় দুলছে। কেমন করে মনের গোপন কোণে ঘাপটি মেরে বসেছিল দুটি লাইন?

সবুজ ঘাসে ঢাকা বড় একটা চত্বরে নিগার পেপার পেতে বসে পড়েন। ইশারা করে মাহফুজুলকে ডাকেন। চারপাশে বিশাল উঁচু উঁচু কড়ই আর গগনশিরীষ গাছ সৈনিকের মতো সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে।

মাহফুজুল অনেকটা দূরে। নাক ঝাড়ছে। ফোঁৎ ফোঁৎ শব্দ উঠছে। আঙুল দিয়ে তরল সিকনি ফেলে গাছের গায়ে হাত মুছছেন। নিগার মুখ বিকৃত করে চোখ ফিরিয়ে নেন। শিরীষ গাছের মাথার দিকে চেয়ে থাকেন। আহ! কী সুন্দর! ছোট ছোট পাতা আর ডালে সারা আকাশ ঢাকা। ফোন বের করে ছবি তোলেন। হালকা একটা সুবাস। কীসের? ঘাসের ওপর একটা ফুল। সেলফোনে ছবি তুলে ফুলটা হাতে তুলে নেন নিগার। কী ফুল এটা? কাকে জিজ্ঞেস করবেন? মাহফুজুল একটা বাদামওয়ালার কাছ থেকে বাদাম কিনছেন। কী দরকার ছিল। নিগারের ব্যাগে তো বাদামের প্যাকেট আছে। অবশ্য মাহফুজুল জানেন না।

নিগার একটু গলা চড়িয়ে মাহফুজুলকে ডাকেন, ‘অ্যাই, বাদাম লাগবে না।’

কিন্তু মাহফুজুল শুনতে পান না। নিগারের মনে হয় এখনই ফুলটার নাম না জানতে পারলে যেন কিছু একটা হারিয়ে যাবে! ফুলটা হাতে নিয়ে নিগার মাহফুজুলকে ইশারা করতে থাকেন।

নাগালিঙ্গম। দারুণ ফুল না?

কে? চমকে ওঠেন নিগার!

নিগারের ডান দিকে হাত কয়েক দূরে বিশাল গাছটার নিচে উবু হয়ে এক তরুণ একটি ঝরা ফুল তুলে নিতে নিতে কথা বলে!

খেজুরগাছের কাঁদির মতো ফুলের কাঁদি বের হয়। আর ফল হয় বেলের মতো। হাতিরা খুব খেতে পছন্দ করে।

ফয়সাল?

চট করে তরুণ উঠে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকায়।

নিগার খেয়াল করেননি সামনের বড় গাছটির গোড়ার দিকটা ঢালু হয়ে যেখান দিয়ে নিচে নেমে গেছে, তার আড়ালে এক তরুণীও উবু হয়ে ঝরা ফুল কুড়াচ্ছিল। তাকে উদ্দেশ্য করেই ছেলেটি কথা বলছিল। দু’জনেই নিগারের কাছে আসে।

আপনি আমাদের চেনেন?

নিগার অচেনা চোখে ওদের দেখেন। না তো!

পেছন থেকে যুবককে তখন ঠিক ফয়সাল মনে হয়েছিল। ফয়সাল কীভাবে এখানে আসবে, আর এতকাল পরে যে ফয়সাল আর সেই তরুণ থাকবে না, এসব যুক্তি মাথায় আসেনি। কেন এলো না? কেন এমন মনে হলো!

নিজেকেই অচেনা ঠেকে নিগারের। তার মানে ফয়সালের অবয়ব তার স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট!

নিগার তাড়াতাড়ি বলেন, ‘না না, দূর থেকে আপনাকে আমার পরিচিত এক আত্মীয়ের মতো লাগছিল। ওর নাম ফয়সাল।’

তাই? আশ্চর্য! আমার নামও ফয়সাল। আর ও হলো…

নিগারের কান তীক্ষè হয়ে ওঠে। তার মনে হয় এখুনি বলবে, ‘ও হলো নিগার!’

কিন্তু মেয়েটি ফয়সালকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘আমার নাম ইন্দ্রাণী। ইনসেক্টোলজি নিয়ে পড়ছি। ক্যামোফ্লোজড ইনসেক্টস নিয়ে আমরা একটা কাজ করছি।’ ঘাসে পাতায় ফুলে বাকলে মাটিতে পাথরে রঙ মিলিয়ে যে সব পোকামাকড় থাকে…

মাহফুজুল এসে নিগারের পাশে দাঁড়ান।

ফয়সাল আর ইন্দ্রাণী চোখাচোখি করে। চলো যাই।

আচ্ছা, আসি। স্লামালেকুম। ইন্দ্রাণীও দু’হাতের পাতা জোড় করে সালাম দেয়।

ওরা কারা?

চিনি না। পোকামাকড়ের গবেষক। ফুলের ভেতরে কীট খুঁজছিল। এই যে এই ফুল। নাগালিঙ্গম। ওই যে গাছ। আমি তো ফুল পেয়েছিলাম, কিন্তু বুঝতে পারিনি এখানেই গাছ আছে! ওই দেখো। বিশাল গাছ। কি মিষ্টি গন্ধ! দেখো।

মাহফজুল ফুলটা হাতে তুলে নিয়ে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকেন। নানান দিকে ঘোরান। গন্ধ নেন না।

কী দেখো?

দেখি পোকা আছে কি না!

থাক পোকা বাছতে হবে না তোমার।

ফুলটা মাহফুজুলের হাত থেকে একরকম কেড়ে নিয়ে ব্যাগের চেন খুলে ভেতরে ঢুকিয়ে রাখেন নিগার।

মাহফুজুল ওপরে তাকিয়ে আপন মনে বলেন, ফুলের নাম আর খুঁজে পেল না! নাগালিঙ্গম! ভাবনাটা মাথায় আসতে না আসতেই হঠাৎ মাহফুজুলের নিম্নাঙ্গে একটু চিন চিন করে ওঠে। এদিকে কাছে পিঠে বাথরুম টাথরুম আছে কিনা কে জানে!

নাগালিঙ্গম গাছটার লম্বা লম্বা বড় পাতার ওপর মরা বিকেলের আলোছায়া। কুচকুচ করে কী একটা পাখি ডেকে ওঠে। ঢালু জায়গাটা জুড়ে একরকম হলুদ ফুলের ঝোপ। ঘাসের ভেতরে সর সর করে কী যেন হেঁটে যায়। লাফ মেরে ঝোপের ভেতরে ঢুকে পড়ে। পশ্চিম আকাশটায় পাতলা একটা কমলা রঙের প্রলেপ। তার সাথে ঝিলিক দিয়ে উঠছে ধূসর নীল। হালকা ম্রিয়মাণ একটা পটের ওপর কবেকার একটা সন্ধ্যা গাঢ় রঙে ফুটে উঠতে থাকে।

নিগার মাহফুজুলের ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে। হাতের ভেতর আলতো করে হাত ঢুকিয়ে দেয়। মাথাটাও এলিয়ে দেয় মাহফজুলের বুকে। ফিসফিস করে বলেন, ‘আমাকে একটু ধরো না।’

মাহফুজুল হাঁটা থামিয়ে চট করে দাঁড়িয়ে পড়েন।

শরীর খারাপ লাগছে নাকি? এই বেঞ্চটাতে বসো একটু।

নিগার আরও জোরে চেপে ধরেন মাহফুজুলকে। গালের মধ্যে গাল ঘষতে থাকেন। আলতো করে ছুঁইয়ে দেন ঠোঁট।

মাহফুজুল ত্রস্তে এদিক ওদিক তাকিয়ে সাবধানে নিগারের হাত ছাড়িয়ে হেসে ওঠেন।

কী করছ? দাড়িওয়ালা বুড়োকে চুমু খেতে দেখলে লোকে কী ভাববে?

মাহফুজুলের বিব্রত হাসিটা কান্নার মতো দেখায়।

নিগার ঘুরে দাঁড়িয়ে সহজ গলায় মাহফুজুলকে বলেন, ‘চলো তো, নাগালিঙ্গম গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে কয়েকটা ছবি তুলি!’

কে তুলবে? কেউ তো এখানে নেই! তার চেয়ে তুমি দাঁড়াও। আমি তুলে দিই। ফুলগাছের পাশে তোমাকেই মানাবে।

নিগার হঠাৎ মাহফুজুলকে বলেন, ‘তুমি দাঁড়াও। ঐ যে দু’জন ছেলে ওদিকে যাচ্ছে। একটু ডাক দিই। ছবি তুলে দেবে!’

নিগারের আদেখলেপনায় বিরক্ত হয়ে ওঠেন মাহফুজুল। কিন্তু কিছু বলার আগেই নিগার দ্রুত পায়ে ছেলে দুটিকে লক্ষ করে হাঁটা দিয়েছেন। আর হাত তিনেক যেতে না যেতেই কিছু একটাতে হোঁচট খেয়ে ধড়াম করে ছিটকে পড়েন। ভাঙা পা আঁকড়ে ধরে ব্যথায় কাতরাতে থাকেন নিগার।

মাহফুজুল কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। নিগারের কাছাকাছি হওয়ার আগেই দেখেন যুবকদ্বয় এগিয়ে এসেছে। ওরা নিগারকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে।

মাহফুজুলকে দেখে বলে, ‘আঙ্কেল, আপনি আন্টির ব্যাগটা ধরেন।’

মাহফুজুল ব্যাগ হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিছু খোঁজেন।

ওরা বলে, এখানে তো কোনো রিকশাটিকশা ঢোকে না। গেটের বাইরে বের হতে হবে।

মাহফুজুলের তখন ব্লাডারে প্রচণ্ড চাপ। বছর কয়েক হলো ব্লাডার কন্ট্রোল করতে পারেন না মাহফুজুল। চাপ টের পাওয়া মাত্র বাথরুমে যেতে হয়। নইলে সমস্যা হয়ে যায়। আর মানসিক চাপের সাথে ব্লাডারের চাপেরও একটা যোগসূত্র আছে। অস্থির হলেই বার বার বাথরুমে যেতে হয় তাঁকে।

মাহফুজুল দ্রুত নাগালিঙ্গমের ঢালে হলুদ ফুলের ঝোপের দিকে নামতে থাকেন।

নিগার ব্যথায় কাতর ধ্বনি করতে করতে চেঁচান, কোথায় যাচ্ছ, এই?

ঝোপের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মাহফুজুলের ইচ্ছে করে হাতের ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে দেন কোথাও।

ঝর্না রহমান : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares