উত্তরাধিকার : মিলা মাহফুজা

গল্প

উত্তরাধিকার

মিলা মাহফুজা

টাইলস কাটা মেশিনের একটানা তীক্ষ্ণ আওয়াজে কানের ভেতরটা ভোঁতা এখন। সেই সকাল থেকে চলছে টাইলস কাটা, দু-চার মিনিটের জন্য থামে, আবার শুরু হয়। তিন-চার জন মিস্ত্রি ব্যস্ত হয়ে কাজ করছে। একজন গজ ফিতা দিয়ে মেপে দাগ কেটে দিচ্ছে, একজন মেশিন চালিয়ে সাইজমতো কাটছে, একজন টাইলস নিয়ে আসছে আবার কাটা টাইলস ভেতরে রেখে আসছে। বেশ  মনোযোগের কাজ। মাপ ঠিকমতো দিতে হয়, কাটার সময়ও খেয়াল রাখতে হয় যেন লাইন ঠিক থাকে। তোলাপাড়াতেও সাবধানতা লাগে। সব মিলিয়ে সময়ের কাজ। ইচ্ছে করলেও তাড়াতাড়ি শেষ করার নয়।

প্রথমে কিছুক্ষণ চেয়ার পেতে কাছে বসে কাজ দেখছিলেন রোকসানা। পরে উঠে ছাদে গিয়ে বসেছিলেন, কিন্তু সেখানেও শব্দের অত্যাচার থেকে নিস্তার পাননি। আশপাশের বাড়িগুলোর জানালা বন্ধ করে রেখেছে বাসিন্দারা। কিন্তু রোকসানার সে উপায় নেই। জানালায় এখনও থাই কাচ ধরানো হয়নি। তাছাড়া মিস্ত্রিদের ওপর ছেড়ে দিয়ে সরে যাওয়া মানে কাজে ঢিল পড়া। কাজ শেষ হতে আরও বেশিদিন অপেক্ষা করা।

এমনিতেই যেমন যেমন ভেবেছিলেন তার প্রায় কোনোটাই হয়নি। ডেভেলপারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট বুঝে পেতেই পেরিয়ে গেছে পুরো পাঁচ বছর। তাও ভেতরের ফিটিংস তারা কিছু করে দেয়নি। সেটা অবশ্যি রোকসানারই পছন্দ। বাইরের কাঠামো ছাড়া ফ্ল্যাটের ভেতরের যাবতীয় কাজ নিজের মতো করে করাবেনÑ চুক্তির সময় এই কথা পরিষ্কার করে নিয়েছিলেন। ডেভেলপার কোম্পানি সে জন্য তাকে কিছু টাকা বাড়তি ধরে দিয়েছে। খরচের তুলনায় সেই টাকা খুবই কম। তাছাড়া সেই টাকা দিয়ে তিনি আরও আধখানা ফ্ল্যাট কিনে তিনটে পুরো ফ্ল্যাটের মালিকানা পেয়েছেন। সেই তিনটে ফ্ল্যাটের কাজ করাতে হিমশিম দশা। তবু নিজের বাড়ি তৈরির বহুকালের ইচ্ছের কিছুটা তো পূরণ হচ্ছে!

ইচ্ছে ছিল নিজের, একদম নিজের একটা বাড়ি হবে। তেমন বড় নয়, ছোট্ট তবে দোতলা বাড়ি। সামনে একটু খোলা জায়গা। ঘাসে ঢাকা থাকবে। প্রাচীরের ধারে গন্ধরাজ আর শিউলি ফুল আর একটা কাগজি লেবুর গাছ থাকবে। একটা দোলনাও। ছোটবেলায় টিএনও বাবার সরকারি কোয়ার্টারের বাগানে একটা দোলনা ছিল। প্রায় সারাদিন তাতে ঝুলে থাকত ছোট রোকসানা। বড় হয়েও বাংলোর চৌহদ্দিতে একটা দোলনা পেয়েছিল কিশোরী রোকসানা, বন্ধুদের নিয়ে ঝুল খেতে খেতে হতো রাজ্যের গল্প। সেই সময়গুলোই ছিল তার জীবনের একমাত্র একদম নিরুদ্বেগ আনন্দময় কাল। তাই বোধহয় দোলনার প্রতি দুর্বলতা রয়ে গেছে। কিন্তু দোলনা হোক না হোক গাছগুলো তো করাই যেত। কিন্তু সেই নিজের বাড়ি করা আর হলো না। বাড়ি করার জন্য কিছু লোন-টোন যা পাওয়া যায় তার সবই বাড়ি তৈরির প্রাথমিক খরচগুলো করার পর। সে খরচও, মানে ওই ভিত-টিত গাঁথা- হিসেব-টিসেব নিয়ে দেখা গেল, অনেক। রোকসানা ভরসা করেছিলেন ছেলের উপর। কিন্তু রাকিব এক কথায় জানিয়ে  দেয়, ‘আমার পক্ষে কোনো টাকা-পয়সা খরচ করা সম্ভব না। অল্পদিনের মধ্যেই আমি বিয়ে করব আর বিয়ের খরচ জোগাড় করছি এখন, অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সময় নেই আমার।’ এরপর আর জমি ডেভেলপার কোম্পানির হাতে দিয়ে আড়াইখানা ফ্ল্যাটের মালিকানা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় রোকসানার ছিল না।

জমি-বাড়ি এসব নিয়ে রাকিবের কোনো আগ্রহই নেই। সেই যেদিন হঠাৎ করে জমিটা খুঁজে পেয়েছিলেন, সেদিন রোকসানা উত্তেজিত হয়ে রাকিবকে বলতে গেলে সে একদম নিরুত্তাপ গলায় কেবল জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ভূমি অফিস থেকে কী বলেছে? জমি এখনও তোমারই আছে তো?’

রোকসানা রাকিবের ঠান্ডাভাব টের পেয়েও নিজের আনন্দ বিভোরতায় কোনো ছাপ ফেলতে না দিয়ে বলেছিলেন, ‘তবে আর এতদিন ধরে ছোটাছুটি কি করলাম? সব ঠিক আছে, নাদের লোকটা খুবই ভালো মানুষ। খাজনা-টাজনা দিয়েছে এতদিন ঠিকঠাক মতো। ও না হয়ে আর কেউ হলে পাওয়া যেত কিনা সন্দেহ।’

তারপরেও রাকিব কোনো রকমে বলেছিল, ‘ভালো। তোমার একটা সম্পত্তি হলো।’

রোকসানা আঘাতটা তখন টের পান। তোমার সম্পত্তি হলো এ কথার মানে কী? রোকসানার সম্পত্তি কি রাকিবেরও নয়?

সরে এসেছিলেন রোকসানা। অসংখ্য বারের মতো আবারও একবার মনে হয় তার শুধু রাকিবের জন্যই জীবনটা একঘেয়ে আনন্দহীন হয়ে কেটে চলেছে। মায়ের প্রতি রাকিবের অদ্ভুত রকমের উদাসীনতার কোনো উৎস খুঁজে পান না রোকসানা। বরং উল্টোটাই হওয়ার কথা ছিল। অল্প বয়সে মা হওয়ায় রোকসানা লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। অথচ এইচএসসিতে কত ভালো ফল হয়েছিল। ইচ্ছে ছিল ডাক্তারি পড়বেন। হয়নি, সাধারণ গ্রাজুয়েশন করে এনজিও’র মাঠ পর্যায়ের কর্মী হয়ে কর্মজীবন শুরু করতে হয়েছিল। সঙ্গে ছিল রোগাভোগা দিনরাত কেঁদে কেঁদে পাগল করা রাকিব। জন্মের পর অবুঝ বয়স থেকেই রাকিব কারও কাছে একদণ্ড থাকবে না। মা ছাড়া অন্য কেউ কোলে নিলেই তার তারস্বরে কান্না শুরু হয়ে যেত। ওর কান্নায় অতিষ্ঠ রোকসানা কোনোদিন যদি কোলে ফিরিয়ে নিতে দেরি করত তবে মুখে ফেনা তুলে চোখ উল্টে মরে যাওয়ার অবস্থা হতো।

অথচ সময়টা কোনো দিক থেকেই রোকসানার অনুকূলে ছিল না তখন। বিয়ের মাত্র বছর দুয়েকের মাথায় দুম করে একদিন অফিস থেকে লাশ হয়ে ফেরে রোকসানার স্বামী রাহাত হোসেন। তখনও পেটের ছেলের খবর জানা ছিল না রোকসানার। যখন তখন মাথা ঘুরে ওঠাটা স্বামীর মৃত্যুশোকের ধকল বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু মাস না যেতেই বোঝা যায় আসল ব্যাপার। কী করে রোকসানা তখন? হতভম্ব হয়ে কয়েকদিন কাটে। মাত্র দু’বছর আগে বিধবা হয়ে তিন নাবালক ভাইকে নিয়ে মায়ের তখন পাগলপারা দশা, দেখে মাকে বলতেও বেঁধেছিল খুব। তবে না বললেও গোপন বেশিদিন থাকেনি। মা বিরসমুখে তাকিয়ে ছিল রোকসানার দিকে। মুখে কিছু বলেনি।

তখনও রোকসানার জানা ছিল না কষ্টের আরও কত কঠিন চেহারা পৃথিবীতে আছে। কোনো দাঁড়িপাল্লায় যদি মাপা যেত তবে রোকসানার কষ্টের পরিমাপ কি করতে পারত রাকিব? কথাটা মনে পড়ায় রোকসানা জোরে শ্বাস ফেললেন। মিস্ত্রি কী যেন জিজ্ঞেস করতে এসেছিল, সে বলল, ‘আপনার কি শরীর খারাপ লাগতাছে? যেমবা আওয়াজ হইতাছে, সইয্য করা কঠিন।’

রোকসানা বললেন, ‘না, ঠিক আছি। কিছু বলবে?’

মিস্ত্রি কেনাকাটার একটা লিস্ট দিল। হেডমিস্ত্রিকে বারবার বলেন- অন্তত এক সপ্তাহে যা যা দরকার হতে পারে ভেবেচিন্তে তার লিস্ট  তৈরি করতে, একবারে কিনতে যেতে। কিন্তু মিস্ত্রি তা কখনই করে না। একটু পর পরই এটা লাগবে ওটা লাগবে বলে ছোটখাটো জিনিসের একটু খুচরা কেনাকাটা লাগিয়েই রাখে। আর একবার কেনার নামে বেরোলে ফিরে আসতে লাগে একবেলা। আসলে মিস্ত্রিগুলো তাকে একা পেয়ে সবসময় চেষ্টা করে খসিয়ে নিতে। কাজ শুরুর প্রথম দিকে বেশ কয়েকদিন দোকানে দোকানে ঘুরে ঘুরে, আর এর-ওর কাছে শুনে ফিটিংসের জিনিসপত্রের একটা তালিকা করে বিভিন্ন কোম্পানির দামি আর মাঝারি দামি- দু’ধরনের একটা মূল্য তালিকা তৈরি করে নিয়েছিলেন। কিন্তু এদের সে তালিকা মতো জিনিস আনতে বললে অবলীলায় বলে দেয়- ‘দোকানে ওই কোম্পানির মাল নাইকা।’ এখন সারাক্ষণ কে দোকানে যাবে সত্যিই মাল আছে কিনা তা যাচাই করতে। মিস্ত্রিদের এইসব আচরণ এখন মোটামুটি সহ্য হয়ে গেছে। তিনি নির্লিপ্ত মুখে ফর্দটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। অন্তত ডবল কিনছে কিনা তা যদি বোঝা যায়। মিস্ত্রিকে টাকা দিয়ে টিফিনবক্স খুলে বসেন। সকালে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় রুটি-সবজি, মাঝে মাঝে মিষ্টি বা মিষ্টি জাতীয় কিছু টিফিন বক্সে করে নিয়ে আসেন। পানির বোতল আর এক ফ্লাস্ক চা।  সারাদিন থাকা, মাঝে মাঝে অল্প করে খান খাবারগুলো। মিস্ত্রিরা নিচে রান্না করে খায়। গ্যাস আসেনি, কাঠের চুলোয় রান্না করে। মোটা চালের ভাত। আর কোনোদিন ডাল নয়ত দু-তিনপদ মিলিয়ে নিরামিষ। চোখে পড়েছে বড় তৃপ্তির সাথে খাবার খায় লোকগুলো, যেন সুস্বাদু কোনো খাবার খাচ্ছে। অথচ কড়া ঝালের কড়া গন্ধ ছাড়া আর কোনো ঘ্রাণই পাওয়া যায় না রান্না থেকে। প্রথম দিন ওরা রোকসানাকেও খেতে ডেকেছিল। রোকসানার ইচ্ছে আছে কাজ শেষ হলে একদিন নিজে ওদের জন্য ভালো কিছু রান্না করে এনে খাওয়াবেন। দিনের পর দিন লোকগুলোর সঙ্গে সারাটা দিন কাটছে, একটা মায়ার জায়গা তৈরি হয়েছে মনে। মায়ার কথাটা মনে পড়ায় নিজের মনে হাসলেন। মায়া বলে কি সত্যি কিছু আছে? বিকেলের দিকে নাদের আলি এসে জানালার কার্নিশে বসে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আম্মা, কোনো অসুবিধা হইতাছে না তো?’

নাদের আলি প্রতিদিনই আসে। ডেভেলপার কোম্পানি জমি দখল নেবার পর নাদের আলি তার কোনো ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠেছে বউ নিয়ে। এখন সে এ বাড়ির দারোয়ানের কাজ পাওয়ার অপেক্ষা করছে। তবে ঠিক কাজের খোঁজেই যে নাদের আলি আসে তা রোকসানার মনে হয় না। নাদের আলি লোকটাই অন্যরকম। অন্যরকম না হলে কবে কে তাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছিল তা পালন করার জন্য একদম অনিশ্চিতভাবে অপেক্ষা করতে পারে কেউ? যে জমি একদিন নিজের ছিল সেটা বেচে দিয়ে ক্রেতার সম্পত্তি দেখে রাখার দায় এভাবে বহনের নজির হয়ত খুব বেশি নেই।

জমিটা নাদের আলি নাকি পেয়েছিল উত্তরাধিকার সূত্রে। নিতান্ত মাঠান জমি। ধান-পাটের চাষ হতো। পাশের বড় রাস্তার অস্তিত্ব ছিল না। চারদিকেই চাষের জমি। রাহাত হোসেন কি ভেবে এ জমি কিনেছিল সেটা তার মনেই ছিল, রোকসানার জানার সুযোগ হয়নি। জমি কিনে সে জমি দেখাশোনার দায়িত্ব নাদের আলিকেই দিয়েছিলেন রাহাত হোসেন। বেচতে বেচতে একসময় ভিটা বেচার পর রাহাত হোসেনের কেনা জমিতেই ঘর তুলে বাস করত, রোকসানা খুঁজে পাওয়ার আগ পর্যন্ত। রোকসানা টের পান লোকটার ভেতরে এক ধরনের মায়া আছে তার প্রতি। কথায় কথায় বলে, ‘স্যাররে বেশি দেখি নাই কিন্তুক তিনারে খুব ভালো জানছি, আম্মা। তারে এত তাড়াতাড়ি আল্লাহ কেন যে তুইলা নিলেন!

নাদের আলি এখন বলল, আরও মাস খানিক লাগব মনে অয়। আম্মা আপনের কষ্ট ফুরাইব। আপনে কি এইহানেই থাকবেন আম্মা?

রোকসানা হাসেন। ‘নিশ্চয় এখানে থাকব। সারাজীবন পরের বাড়িতে কাটিয়েছি, এখন একটু নিজের বাড়িতে থাকব।’

‘তাতো ঠিকই, পরের বাড়ি হইল পরের বাড়ি, নিজের বাড়িত থাকনের সুক কি আর সেইহানে থাহে?’

হঠাৎ যেদিন তিনি নাদের আলিকে খুঁজে পেয়েছিলেন সেদিন এতটুকু ভরসা ছিল না মনে। লোকটাকে আগে কখনও দেখেননি। তার সম্পর্কে কিছু শোনেনওনি। শুধু স্মৃতির উপর নির্ভর আর সামান্য কটা কাগজ সম্বল করে খুঁজতে এসেছিলেন। একটুও বিশ্বাস ছিল না জমি পাওয়ার। বহু বছর আগে কেনা জমি, না আছে দেখাশোনা, না আছে খাজনাপাতি দেওয়া। রাহাত হোসেন কয়েকবার নাদের আলির নামটা বলেছিল। অজানা অচেনা যে জায়গায়  জমি কিনেছে তার হদিস একমাত্র রাহাত হোসেনেরই জানা ছিল। হয়ত রোকসানাকে কিছু জানানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু রোকসানার তখন মন কোথায় জমির খবর রাখার। অভাবিতভাবে বিয়ে, বাবার হঠাৎ মৃত্যু আর পরীক্ষার চাপ নিয়ে রোকসানা পৃথিবীর কিছুতেই মনোযোগ দেবার অবস্থায় ছিল না। সত্যি বলতে কী স্বামীর দিকেও ভালো করে কোনোদিন তাকিয়েছিল বলে মনে পড়ে না। তাই বোধহয় রাহাত হোসেনের মুখচ্ছবিটা কোনোদিন পরিষ্কারভাবে মনের পর্দায় ফোটে না। অথচ লোকটা যারপরনাই ভালো মানুষ ছিল, রোকসানাকে, রোকসানার পরিবারের দুর্বিপাকে কি শান্তভাবে দারুণ দক্ষতায় চারদিক সামলে দিয়েছিল! টিএনও’র মেয়ে হয়ে জন্মে ডিসির মেয়ে হয়ে যখন ক্লাস টেনের ফার্স্ট গার্ল রোকসানা, স্বপ্ন ডাক্তার হওয়ার, বাবা বড় যত্ন নেয় মেয়ের স্বপ্নপূরণে- সেই সময় আচমকা একদিন বাবার বুকের ব্যথা হলো। বিদেশে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে ফিরে এসেই বাবা রোকসানাকে রাহাত হোসেনের হাতে তুলে দেবার কথা বলেছিল। বাবার কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যে, রোকসানার সাধ্য হয়নি আপত্তি করার। রাহাত হোসেন নামে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক ভূমি কর্মকর্তাকে রোকসানা দেখেছিল বাবার কাছে কাজ নিয়ে আসতে। সাধারণ বোকা বোকা চেহারার লোকটা কয়েকদিনের মধ্যে রোকসানার স্বামী হয়ে যায়। বাবাকে না বলতে পারলেও রোকসানার ভেতরে ক্ষোভের যে বাষ্প জমে ছিল তা টের পেত বেচারা রাহাত হোসেন। কিন্তু বোকা বোকা দেখতে লোকটা আসলে বোকা ছিল না। রোকসানাকে ধাক্কা সামলাতে সময় দিচ্ছিল নীরব থেকে। কিন্তু রোকসানার কপালে দুর্ভাগ্য একা আসেনি। বিয়ের পরে কোনোমতে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করতেই বাবা এক সকালে আর জাগল না। এ সময়ও রাহাত হোসেনের ধৈর্য আর সহিষ্ণুতা দেখার মতোই হলো। সবাই বলাবলি করত, ডিসি স্যারের ভাগ্য যে, এমন জামাই পেয়েছিলেন।

কিন্তু জামাইটাও যে আরও অকালে পৃথিবী ছেড়ে যাবে তা কারও কল্পনাতেও ছিল না। ঘটল তাই। রোকসানার এইচএসসি শেষ হয়েছে। পিতৃশোকের প্রবাল্যও কমে এসেছে এ সময়। বিবাহিত জীবন নিয়ে একটু ভাবার সময় হলো। ঠিক সেই সময় একদিন শান্ত সরল রাহাত হোসেনের মৃত্যু রোকসানার জীবন গভীর অন্ধকারে ডুবিয়ে দিল।

রাহাত হোসেনের মৃত্যুর পর রোকসানা দেখে মায়ের অন্য চেহারা। মা যেন রোকসানার দিক থেকে একদম মুখ ফিরিয়ে নিল। তার যত কিছু ভাবনা সব তিন ছেলেকে নিয়ে। রোকসানা যে একটা বাড়তি বোঝা সেটা বোঝাতে মা এতটুকু সংকোচ করল না। তবু উপায় ছিল না বলেই পড়ে থাকা। ডিগ্রি পাস করে চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত। তারপর শুধু দূরে সরেই যায়নি, বরং যতটুকু সম্ভব অর্থ সাহায্য করেও মায়ের মন আর পাননি রোকসানা। ছিঁচকাঁদুনে রোগাভোগা ছেলেটা নিয়ে চাকরি করতে বিষম কষ্ট হলেও মা একদিনের জন্যও বলেনি, ‘ক’দিন আমার কাছে এসে থেকে যাও।’ মায়ের এই অদ্ভুত মনোভাবের কারণ যে কী তা কোনোদিন আবিষ্কার করতে পারেননি রোকসানা। 

প্রায় ছয়-সাত বছর পর্যন্ত ছিঁচকাঁদুনে থাকার পর রাকিব স্বভাব বদলাতে শুরু করে। শুধু কান্নাই থামে না, বেশ স্বনির্ভরও হয়ে ওঠে। নিজের কাজ নিজে করে নেওয়া, নিয়মিত স্কুলে যাওয়া, একা একাই পড়াশোনা করতে শুরু করে। ছেলের স্বাভাবিকতায় রোকসানা স্বস্তির দেখা পেয়েছিলেন। তাতেই যেন তার না ফোটা রূপ ফুটতে শুরু করেছিল। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ভরা যৌবনকালের সে-রূপে অনেকেই আকৃষ্ট হয়েছিলেন। রোকসানার একজন সহকর্মী জামিল আহমেদ তো বেশ খানিকটা এগিয়েই এসেছিলেন রোকসানাকে নতুন জীবন দিতে। রাকিবের দায়িত্ব নিতেও রাজি ছিলেন তিনি। কিন্তু রাকিব ব্যাপারটা টের পেতেই তার আরেক রূপ দেখা গেল। তার রাগের তাণ্ডবে বাড়ির জিনিসপত্র অক্ষত থাকাই দায় হলো। শেষপর্যন্ত সহকর্মীই পিছিয়ে গেলেন।

অথচ রাকিব সেভাবে মায়ের ঘনিষ্ঠও হয়নি কখনও। নিজের খেয়ালেই চলেছে বরাবর। রোকসানার কোন ভালোলাগার কোনো প্রয়োজনের খোঁজ রাকিব জানে না। জানতে চায়ওনি কখনও। এখন বিয়ে করে দূরে চলে গেছে। তার স্ত্রী রায়না উঁচুতলার নাকতোলা মেয়ে, মধ্যবিত্ত মানসিকতার সাথে খাপ খাওয়াতে পারবে না বলে। রোকসানা বুঝেছেন তার ভাগ্যই এ রকম।  রিটায়ার করার পর নিঃসঙ্গতায় কাতর হয়ে পড়েছিলেন। জমি খোঁজা দিয়ে শুরু করে এ পর্যন্ত ব্যস্ততা তাই ভালোই লাগে। রোজ অনেকটা পথ ভেঙে আসতে হয়। তাই দুপুরে বিশ্রাম নিতে বাসায় যেতে পারেন না। একবারে সন্ধ্যায় ফিরে যান।

বাসায় ফিরে সে-রাতে আর কিছু খেতে ইচ্ছে করল না। মাঝরাতে টের পেলেন বুকের বাম দিকে একটু চাপ ব্যথা। উঠে বসে জোরে জোরে শ্বাস টানলেন। ঘাড় ম্যাসাজ করলেন। তারপর ঘাড়ে মাথায় পানি দেওয়ার পর একটু একটু করে স্বস্তি ফিরে আসে।

পরদিন ঘুম ভাঙল দেরিতে। রাতের ব্যথাটা স্বপ্নের মতো অবাস্তব মনে হলো। গোসল সেরে তৈরি হয়ে নিলেন। পৌঁছে দেখেন মিস্ত্রিরা চায়ের খালি কাপ হাতে গল্প করছে জমিয়ে। কিন্তু আজ কেন যেন কিছু বলতে ইচ্ছে করল না। একটা বই এনেছিলেন সেটা খুলে বসলেন। বইটা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়লেন। জাগলেন, আবার ঘুমালেন করে দিনটা ফুরাল। বাসায় ফিরে নামাজ পড়েই শুয়ে পড়লেন। সারারাত অঘোরে ঘুমিয়ে কাটল। সকালে রোকসানার মনে হলো তিনি  বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। সেদিন আর কাজ দেখতে গেলেন না। নাদের আলিকে ফোন করে অনুরোধ করলেন সম্ভব হলে যেন সে একবার দেখে আসে।

পরের কয়েকটা দিনও শরীর ম্যাজমেজে ভাবটা গেল না। নাদের আলি খোঁজ নিয়ে বলল, তাইলে আপনের আহনের দরকার নাই। আমিই  দেখুমনে। আপনে চিন্তা কইরেন না। ডাক্তার দেখাইয়া চিকিচ্ছা করান।

রোকসানা যেন চিন্তিতও হতে পারছেন না এমনই আলাভোলা দশা তার। সত্যি কয়েকদিন বাড়িতে শুয়ে শুয়ে কাটালেন। ডাক্তারের কাছেও যেতে আগ্রহ হলো না। রাকিবকে খুব দেখতে ইচ্ছে করল। ফ্ল্যাটের কাজ শেষের পথে ওর একবার দেখে রাখা দরকার। পরে না আবার রোকসানার মতো ঘুরে ঘুরে খুঁজে বেড়াতে হয়।

পরে ভাবলেন পুরোপুরি শেষ হোক, দেখে ভালো লাগতেও পারে। যদি তার ইচ্ছে হয় ওখানে বসবাসে! এত কষ্ট মানে পেত।

কয়েকদিন যেতে আস্তে আস্তে শরীর ঠিক হলো। রোকসানা সকাল সকাল তৈরি হয়ে নিলেন। এ ক’দিন নাদের আলি ধারে জিনিস এনে দিয়েছে মিস্ত্রিদের। সে টাকাগুলোও দেওয়া দরকার।

ফ্ল্যাটে পৌঁছে রোকসানা অবাক কাজ বেশ ভালোভাবেই হয়েছে। নাদের আলির খোঁজ করতে মিস্ত্রি জানাল, নাদের আলি রোজই সকালে এসে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের সাথে থাকে। তাদের কাজে অনেক সাহায্য করে। আজ তার আসতে একটু দেরি হবে জানিয়ে গেছে।

নাদের আলির গায়ে একশ’ তিন জ্বর। তাই নিয়েই সে হাজির। রোকসানাকে দেখে বলল, আপনারে তো এহনও কাহিল লাগতাছে আইলেন ক্যান?

আমি ঠিক আছি, তুমি জ্বর নিয়ে আসলে কেন?

নাদের আলি লজ্জিতভাবে হাসে। রোকসানা অবাক হন। লজ্জা পাবার কোনো কারণ খোঁজেন, নাদের আলি নিজেই বলে, মিস্ত্রি গো কাজ কাম দ্যাখতে আইসা মনে হইত বাড়িটা যেন আমার। বউ-মাইয়া আজ আইতে না করছিল কিন্তু আমি থাকতে পারলাম না। আমার তো কোনোদিন বাড়ি বানানো হইব না। আপনের বাড়ির কাজ কইরা সেই হাউস মিটাইতে পারতাছি কিছুটা।

এতে লজ্জার কি আছে? আমার জন্য তো খুবই ভালো হয়েছে, তুমি দেখভাল করেছ বলেই না কাজ এতটা এগিয়েছে। অনেক কষ্ট করেছ তুমি।

এখন হিসাব-টিসাব দাও কি কিনেছ আর কত টাকা দিতে হবে। তারপর বাড়ি চলে যাও, আজ আমি আছি।

নাদের আলি পকেট থেকে কাগজপত্র বের করে বুঝিয়ে দেয় রোকসানাকে। প্রত্যেকটা জিনিসই কিছু হলেও কম দামে কেনা। নাদের আলির হাতে বাড়তি কিছু টাকা দেন রোকসানা। এতদিন তোমার আয়-রোজগারের অনেক ক্ষতি হয়েছে নিশ্চয়।

নাদের আলি ছিটকে সরে যায়। বলে, এমুন কথা কইয়েন না, আম্মা। মায়ের অসুখের চিকিচ্ছার লাইগা জমিটা বেইচা দিছিলাম। আপনেরা দখল লন নাই। ঘর তুইলা অনেক কাল থাকছি।

একটু থেমে বলে, ভিটির মায়া আলাদা। ভিটি টান আলাদা। ভাগ্য দোষে বারবার ভিটি ছাড়া হইছি আম্মা। তবু ভিটির টান যায় নাই।

রোকসানাও তো ভিটাবাড়িই চেয়েছিলেন। এখন যদি এই ফ্ল্যাটটায়ও শেষ পর্যন্ত বাস করার ভাগ্য হয়।

ফ্ল্যাটের কাজ শেষ হলো। রোকসানা পুরোনো বাস তুলে নতুন ফ্ল্যাটে যাওয়ার উদ্যোগ নিলেন। নাদের আলি সাহায্য করল তাকে। রাকিবকে জানালেন। রাকিব এসে দেখা করে গেল। নতুন ফ্ল্যাট দেখতে যাওয়ার সময় নেই তার। পরে যাবে সময় পেলে।

নতুন ফ্ল্যাটে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে কিছু দিন লাগল। অদ্ভুত আনন্দ হলো রোকসানার। জীবনে বহু না পাওয়ার খেরো খাতা বন্ধ করে নতুন প্রাপ্তি উপভোগ করতে লাগলেন।

নাদের আলি মাঝে মাঝে আসে, নিছক খোঁজ খবর নিতে। রোকসানা টের পান ভিটির টানেই শুধু নয়, তার প্রতি স্বআরোপিত দায়িত্ববোধও নাদের আলিকে নিয়ে আসে।

আসে না রাকিব। রোকসানা প্রতিদিন প্রতীক্ষা করেন। ফাঁকা ফ্ল্যাট দুটো পড়ে থাকে রাকিবের অপেক্ষায়। সে এসব ফ্ল্যাটের উত্তরাধিকারী। তাকেই বুঝিয়ে দিতে চান রোকসানা।

কিছুদিন পরের কথা। রোকসানা কয়দিন ছোটাছুটি করলেন চেনাজানা অ্যাডভোকেটের কাছে। সব আইনগত ঝামেলা চুকিয়ে একদিন নাদের আলির হাতে একটা ফ্ল্যাটের চাবি দিয়ে বললেন, তোমার ভিটা ফিরিয়ে দিতে পারব না। তবে এই ফ্ল্যাটটা এখন থেকে তোমার।

নাদের আলির বিস্ময় কাটার আগে বললেন, আর একটা অনুরোধ বাকি দুটো ফ্ল্যাট আমি মারা গেলে দেখে রেখো। কোনোদিন যদি আমার ছেলে আসে তাকে বুঝিয়ে দিও।

মিলা মাহফুজা : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : কাব্য কারিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares