ভাঙনের গোলকধাঁধায় : মশিউল আলম

গল্প

ভাঙনের গোলকধাঁধায়

মশিউল আলম

আমাকে এখানে আটকে রাখা হয়েছে কেন?’

‘তোমার একটু বিশ্রাম দরকার।’

‘কেন?’

‘তুমি ক্লান্ত।’

‘বাজে কথা। আমি মোটেও ক্লান্ত না। বরং আমাকে ক্লান্ত করার জন্যই উল্টাপাল্টা ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছে।’

‘উল্টাপাল্টা নয়, বেটা। তোমার মন উত্তেজিত হয়েছে। তোমার শান্ত হওয়া দরকার।’

‘তাই বলে এমন ঘুমের ওষুধ দিতে হবে যে, টানা তিন দিন বিছানা থেকে মাথাই তুলতে পারব না? দিন-তারিখ, বার-টার সব ভুলে যাব?’

‘তুমি তো মারপিট করেছিলে। ভালো ছেলেরা কি মারপিট করে? লোকজনের মাথা ফাটায়?’

‘সে জন্য আমি লজ্জিত।’

‘আচ্ছা। আর কী কী কাজের জন্য তোমার এ রকম খারাপ লাগে? অনুশোচনা হয়?’

‘সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন ঠেকাতে পারলাম না।’

‘সত্যি?’

‘হ্যাঁ।’

‘সোভিয়েত ইউনিয়ন কি ভালো ছিল?’

‘আপনিও ওদের দলেই?’

‘কাদের দলে?’

‘যারা গ্রেট কান্ট্রিটাকে ভেঙে টুকরা টুকরা করে ফেলল? সব শয়তানকে আমি খুন করব।’

‘তুমি যদি এভাবে খুনোখুনি-মারামারির কথা বলতেই থাকো, তাহলে কিন্তু এখান থেকে বেরোতে পারবে না।’

‘আচ্ছা। আর বলব না।’

‘শোনো রাখমান, এ রকম চিন্তা করা ঠিক নয়। তোমাকে সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে। গালাগালি-মারামারি বন্ধ করতে হবে।’

‘তাহলে হোস্টেলে ফিরে যেতে পারব?’

‘নিশ্চয়ই। ভালো ছেলেদের এখানে আটকে রাখা হয় না। এটা খুব ব্যয়বহুল জায়গা। অনেক মানুষ এখানে ভর্তি হওয়ার জন্য লাইন দিয়ে আছে। তাদের আসলেই চিকিৎসা দরকার। কিন্তু তাদের এখানে জায়গা দেওয়া যাচ্ছে না।’

‘তাহলে আজই আমার হোস্টেলে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। অন্তত একটা সিট খালি হোক।’

‘তুমি যদি সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো, তাহলে শিগগিরই তোমাকে রিলিজ দেওয়া হবে।’

‘তারপর হাতে প্লেনের টিকিট ধরিয়ে দিয়ে বলা হবে, বাড়ি চলে যাও? পড়াশোনা শেষ না করেই আমাকে দেশে ফিরে যেতে হবে?’

‘না। কে বলেছে তোমাকে এসব কথা? তুমি আবার পড়াশোনা করবে, পরীক্ষা দেবে।’

‘ঠিক বলছেন? না মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছেন?’

‘যারা মারামারি করে, ভার্সিটি তাদের বের করে দেয়। কিন্তু তোমাকে বের করে দেওয়া হয়নি। ভার্সিটি তোমার যত্ন নিচ্ছে।’

‘এই দুর্দিনেও?’

‘কিসের দুর্দিন?’

‘কিসের দুর্দিন মানে? নাতালিয়া ইভানোভনা, সব তো শেষ হয়ে গেছে!’

‘কী? কী শেষ হয়ে গেছে?’

‘সব স্বপ্ন লণ্ডভণ্ড! গোটা পৃথিবীরই আজ ভীষণ দুর্দিন! মানব সভ্যতা বিপন্ন!’

‘তাই মনে হচ্ছে তোমার?’

‘অবশ্যই।’

‘মদ একটু কম খেতে হয়…’

‘ইয়ার্কি করবেন না, প্লিজ! নাতালিয়া ইভানোভনা, সভ্যতার আজ সাংঘাতিক ক্রাইসিস।’

‘সেই ক্রাইসিস থেকে সভ্যতাকে উদ্ধার করতে হবে?’

‘নিশ্চয়ই!

‘সে দায়িত্ব তোমার একার?’

‘অবশ্যই। আর কেউ তো কিছুই ভাবছে না, কেউ কিছুই ফিল করছে না। ফিল করবে কেন? কেউ কি মানুষ আছে? সবাই তো স্পেকুলান্ত হয়ে গেছে। স্পেকুলান্তেরা শুধু নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। ওরা কালেক্টিভের কথা ভাবে না। কালেক্টিভের কথা পুরাপুরি ভুলে গেছে। কিন্তু এই এক্সট্রিম ইনডিভিজুয়ালিজম তো মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করবে।’

‘রাখমান, পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে, তারাও ঠিক তোমার মতোই ভাবছে যে মানব সভ্যতা আজ গুরুতর সংকটের মুখোমুখি।’

‘নাতালিয়া ইভানোভনা, আমাকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিতে আসবেন না, প্লিজ। যারা বলছে এন্ড অব হিস্টোরি, ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটেছে, ক্যাপিটালিজমের বিজয় চূড়ান্ত হয়েছে, তারা তো আমাদের স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে খুশিতে বগল বাজাচ্ছে আর ধেই ধেই করে নাচছে। এটা পিশাচনৃত্য। হ্যাঁ, আমি দেখতে পাচ্ছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিধবা বাবুশকাদের লাশের পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে ড্রাম-বিউগল বাজিয়ে নেচে নেচে উল্লাস করছে পিশাচের দল। তাদের সরদার ইয়েলৎসিন, সুকিন সিন, কুত্তার বাচ্চা একটা!’

‘রাখমান!’

‘কী হলো?’

‘ভাষা ঠিক করো। নইলে তোমার এখানকার জীবন অনেক লম্বা হতে পারে।’

‘কোন কথাটা খারাপ বললাম আমি?’

‘বরিস নিকোলাইচ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট। আমি তোমাকে সাবধান না করে পারছি না, বাছা!’

‘ইয়েলৎসিনের শাস্তি হওয়া দরকার।’

‘চুপ, চুপ! এমন কথা আর কখনও মুখে আনবে না।’

‘আপনি কেজিবির এজেন্ট?’

‘তোমার তাই মনে হচ্ছে?’

‘অবশ্যই। আপনারা প্রত্যেকে একেকজন স্পাই।’

‘তাই যদি হয়, তাহলে তোমাকে তো সাবধানে কথাবার্তা বলতে হবে। প্রেসিডেন্টকে গালি দেওয়া চলবে না। শুধু প্রেসিডেন্ট কেন, কাউকেই গালি দেওয়া যাবে না।’

‘গালি এসে গেলে আমি কী করব?’

‘জিব সামলাবে। নিজেকে সংবরণ করবে।’

‘পারব না। গুল্লি মারি আপনার সংবরণ। আমার ইচ্ছা করে ক্রেমলিনের চূড়ায় উঠে সারা দিনরাত চিৎকার করে সবাইকে গালাগালি করি। সব শুয়োরের বাচ্চা!’

‘থামো রাখমান, থামো! শান্ত হও, হুঁশে ফিরে আসো।’

‘কেন? আমি কি হুঁশ হারিয়ে ফেলেছি?’

‘না, ঠিক সেই অর্থে বলিনি। তোমার হুঁশ ঠিক আছে। এখন বলো তো, তুমি কি গায়েবি কণ্ঠস্বর শুনতে পাও?’

‘গায়েবি বলে কিছু নাই।’

‘মাথার ভিতরে কথা শুনতে পাও?’

‘পাই।’

‘কে কথা বলে?’

‘লোকজন।’

‘অনেক লোক?’

‘কখনো অনেক লোক। কখনো একজন।’

‘অনেক লোক এক সঙ্গে কী কথা বলে?’

‘একজন এক কথা বলে, তার কথা শেষ হতে না হতেই আরেকজন বলে আরেক কথা, একজন প্রতিবাদ করে, অন্যজন পাল্টা প্রতিবাদ করে। ঝগড়া লেগে যায়, গালাগালি, চিৎকার, ভীষণ খিস্তি-খেউড়! ওদের মুখ আমার চেয়েও খারাপ, বাপ-মা তুলে গালাগাল দেয়।’

‘কী নিয়ে ওরা এত ঝগড়া করে?’

‘সবকিছু নিয়ে।  দেশ নিয়ে, গর্বাচভকে নিয়ে, ইয়েলৎসিনকে নিয়ে, স্তালিনকে নিয়ে।’

‘আর যখন একজন কথা বলে?’

‘আমাকে দেশে চলে যেতে বলে। বলে, আমরাই খেতে-পরতে পাই না, আর আমাদের সরকার তোদেরকে স্টাইপেন্ড দিচ্ছে। তোরা রাজার হালে আছিস, আমাদের মেয়েদের সঙ্গে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছিস। রুশ মেয়েরা আমাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে বলে ওর খুব হিংসা। বলে, কালকের মধ্যেই নিজের দেশে চলে যাবি। নইলে একদম মেরে ফেলব।’

‘তুমি ভয় পাও?’

‘নাহ! কেন ভয় পাব?। এটা তো আমারও দেশ। উ মিনিয়া রুস্কায়া দুশা!’

‘তাই-ই তো দেখতে পাচ্ছি। শোনো রাখমান, এসব কথা কেউই তোমাকে বলেনি। এগুলো তোমার কল্পনা, সব কল্পনা।’

‘আপনি দেখতে ঠিক ক্রুপস্কায়ার মতো।’

ভদ্রমহিলা হেসে ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সব গাম্ভীর্য ফুলের পাপড়ির মতো ঝরে গেল। সহজ-সরল সাধারণ রুশি একটা চরিত্র আমার সামনে বসে আছে এখন। পাগলের ডাক্তার নয়, আমার মাথা কতটা বিগড়েছে তা পরখ করে দেখতে আসেনি।

হ্যাঁ, আমার মাথায় নাকি সমস্যা। তাই আমাকে ধরে-বেঁধে রেখে যাওয়া হয়েছে এখানে। এটা মস্কোর ১৪ নাম্বার হাসপাতাল। এখানে পাগলদের চিকিৎসা করা হয়। আমাকে এখানে রেখে যাওয়ার পর থেকে ভাবছি, আসলেই মাথাটা আউলে গেছে কি না। ভাবতে ভাবতে পাগল হওয়ার দশা হলো।

‘নাতালিয়া ইভানোভনা, সত্যি করে বলবেন, প্লিজ, আমার অবস্থাটা আসলে কী?’

‘তোমাকে এখানে কিছুদিন থাকতে হবে।’

‘কেন?’

‘বিশ্রামের জন্য। তোমার শুশ্রুষা দরকার।’

‘আপনারা আমাকে কড়া ডোজের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়াবেন? পাগল-ছাগলদের যেসব ওষুধ খাওয়ান, আমাকেও সেগুলা খাওয়াবেন?’

‘শোনো রাখমান, তোমাকে এখানে আনা হয়েছে তোমারই ভালোর জন্য। এটা খুবই ব্যয়বহুল হাসপাতাল; তুমি এখানে জায়গা পেয়েছ তোমাদের ভার্সিটির রেক্টরের বিশেষ অনুরোধে। আর তুমি খুবই ভাগ্যবান যে এই ওয়ার্ডে জায়গা পেয়েছ…।’

‘কেন? এই ওয়ার্ডের বিশেষত্ব কী? এটা ভিআইপি পাগলদের জন্য সংরক্ষিত ওয়ার্ড?’

‘এই হাসপাতালে এমন ওয়ার্ডও আছে যেখানে বারোটা বেড; বারোজন মানুষকে গাদাগাদি করে থাকতে হয়, নো প্রাইভেসি…।’

‘আর চারজনকে একসঙ্গে থাকতে হলে প্রাইভেসি রক্ষা পায়?’

‘বারোজনের তুলনায় চারজন, তোমরা তো ভিআইপি পেশেন্ট!’

‘পেশেন্ট? কিসের পেশেন্ট? আমি পেশেন্ট? মানসিক রোগী? থামেন! আমি সব জানি। কীভাবে কী হলো, কেন হলো, সামনে কী হতে যাচ্ছে, আমি এখন সবকিছু জানি। সব পানির মতো পরিষ্কার। নাতালিয়া ইভানোভনা, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভালো ছিল, খারাপ ছিল, কিন্তু ছিল তো। ক্যাপিটালিস্ট ওয়ার্ল্ডের নাকের ডগায় দুর্দান্ত দাপটের সঙ্গেই তো ছিল। ছিল বলেই আমার দেশ স্বাধীন হয়েছিল।  তৃতীয় বিশে^র কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, সেই স্বপ্নের ভিতরে দুঃস্বপ্নও ছিল। কিন্তু ছিল তো। কেন ভেঙে টুকরা টুকরা করতে হলো?’

‘রাখমান, সোভিয়েত ইউনিয়ন কেউ ভাঙেনি, আপনা-আপনিই ভেঙে গেছে।’

‘বাজে বকবেন না। আমি সব জানি।’

‘সবাই কি সবকিছু জানতে পারে? সবকিছু জানার দরকারই-বা কী?’

‘নাতালিয়া ইভানোভনা, আপনার সঙ্গে কথা বলতে আর ভালো লাগছে না।’

‘বেশ, আমি তাহলে এখন যাই?’

‘দাঁড়ান, প্লিজ। একটা কথা বলে যান।’

‘কী কথা?’

‘সত্যি করে বলেন তো, আপনি কি সত্যিই আমার সঙ্গে এতক্ষণ ধরে কথা বলছেন? যা ঘটছে, তা কী সত্যিই ঘটছে? আপনি কি আসলেই আপনি? না আমি স্বপ্ন দেখছি?’

‘তাহলে এবার ভেবে দ্যাখো বাছা, তোমার চিকিৎসার দরকার আছে না নাই?’

‘আপনি এখন যান।’

‘আমি চলে যাওয়ার পরেও তো তুমি আমার সঙ্গেই কথা বলতে থাকবে।’

‘মানে?’

‘আমি যে এই মুহূর্তে তোমার সঙ্গে কথা বলছি এটাই তো সত্য না।’

‘আঁ?’

খিলখিল করে হেসে উঠলেন প্রফেসর নাতালিয়া ইভানোভনা। অবাক কাণ্ড! এটা তাঁর হাসি নয়, হতে পারে না। তরুণীদের মতো খিলখিল করে হাসতে তিনি পারেন না। কারণ তিনি একজন গণ্যমান্য ভদ্রমহিলা, বয়স কমপক্ষে ৫০। খিলখিল করে হাসা তাঁর সাজে না।

জানালার বাইরে একটা পুরুষকণ্ঠ চিৎকার করে ডেকে উঠল- ‘নাতাশা!’ কিন্তু উত্তরে কোনো মেয়েকণ্ঠ ভেসে এলো না। ভারী গলায় ঘেউ ঘেউ করে উঠল একটা কুকুর।

‘কুকুরওয়ালা তার বান্ধবীকে হারিয়ে ফেলেছে। বান্ধবীটার নাম নাতাশা। নাতাশার হারিয়ে যাওয়ারই কথা ছিল। হারিয়ে গেছে বলে আফসোস করার কিছু নেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে বলেও আফসোস করার কিছু নাই। কারণ সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের টিকে থাকার কথা ছিল না।’

‘এটা তুমি বিশ্বাস করো?’

‘আপনাকে বলব না। কাউকেই বলব না। এলিসোন্দো জেনে ফেলেছে।’

‘এলিসোন্দো কে?’

 ‘সালভাদর এলিসোন্দো। মেক্সিকোর ছেলে। গল্প-উপন্যাস লেখে।’

‘কী জেনে ফেলেছে সে?’

‘দেখেন, ও কী লিখেছে: আমি লিখি। আমি লিখি যে আমি লিখছি। মনের চোখে আমি দেখতে পাই যে আমি লিখছি এবং নিজেকে দেখতে পাই যে আমি দেখছি যে আমি লিখছি। আমার মনে পড়ে আমি লিখছিলাম এবং আমি আমাকে দেখছিলাম যে আমি লিখছি…।’

‘মানে?’

‘বুঝলেন না? এই কথাগুলা আমার মনের কথা। আমি সব সময় ভাবতাম আমি লিখব, লেখাই হবে আমার একমাত্র কাজ। আমি বিশ্বাস করতাম, আমার জন্ম হয়েছে শুধু লেখারই জন্য। আর কোনো কিছু আমি পারব না। অন্য কোনো কিছু আমি শিখব না।’

‘আচ্ছা?’

‘যদি সব ঠিক থাকত, আমি ইসাবেলার সঙ্গে এলিসোন্দোর বাড়িতে যেতাম।’

‘ইসাবেলা কে?’

‘আমার বন্ধু। আমাদের ভার্সিটিতে পড়ে। ওর বাড়ি মেক্সিকো সিটিতে। এলিসোন্দোও মেক্সিকো সিটিতেই থাকে।’

‘খুব সুন্দরী?’

‘ইসাবেলা খুব ভালো। কত যে ভালো আমি আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। আমি ওকে বলেছিলাম, বনিতা, তুই আমাকে ভালোবাসবি? ইসাবেলা হাসতে হাসতে বলেছিল, ভালো তো বাসিই। ওর হাসিটা মে মাসের দুপুরের মতো ঝলমলে। আমি ওকে বলেছিলাম, এ রকম ভালোবাসা না। প্রেমিকের মতো। বাসবি? ইসাবেলা আবার খিলখিল করে হেসে উঠেছিল, হাসতে হাসতে মরে যেতে যেতে বলেছিল, ওকে, ইউ আর মাই লাভার। কিন্তু ওর লাভার ছিল মিগেল। মিগেলটা সারক্ষণ গিটার বাজিয়ে গান গাইত আর শুধু হাসত। একবার এক নাচের আসরে ইসাবেলাকে আমার দিকে ঠেলে দিয়ে মিগেল বলেছিল, নে, আমার প্রেমিকাকে দিয়ে দিলাম তোকে। ইসাবেলা তো হাসতে হাসতে খুন। বাম হাতে আমার ডান হাতটা টেনে নিয়ে আমার সব আঙুলের ফাঁকে ওর সবগুলো আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে আঁকশির মতো করে চেপে ধরে আমাদের জোড়াহাত একসঙ্গে কাঁধ বরাবর তুলে ডান হাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে গানের তালে তালে নাচাচ্ছিল আমাকে, আর আমি সুরের তালে তালে ওর পায়ের সঙ্গে পা মেলাতে পারছিলাম না বলে ও কেবলই এভাবে না, এভাবে না বলতে বলতে হেসে মরে যাচ্ছিল।’

আমার খুব স্বপ্ন ছিল, ইসাবেলার সঙ্গে লাতিন আমেরিকা বেড়াতে যাব। সত্যিই যদি যাওয়া হতো, মেক্সিকো সিটিতে গিয়ে হানা দিতাম এলিসোন্দোর বাড়িতে। ওকে বলতাম: ‘আমিগো গ্রাফোগ্রাফার, শব্দ নিয়ে খেলা করতে ওস্তাদ বটে তুমি! কিন্তু আমার মনের কথা তুমি জানতে পেলে কীভাবে?’

আমি সব সময় ভাবতাম লেখক হব, আমার জন্ম হয়েছে লেখার জন্যই। সত্যি সত্যি যদি না লিখি, মনে মনে লিখি, আর স্বপ্ন দেখি যে একদিন ভালো একটা বই লিখব। ভালো বই মানে কেমন বই তা অবশ্যি আগে থেকে বলা যায় না।

কিন্তু এই ধরনের চিন্তাভাবনা, মানে, আমি কী করব তা নিয়ে কেবলই ভাবা, কেবলই স্বপ্ন দেখা কি একটা অসুখের মতো ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে না? পারে। যারা সুস্থ আর কাজের মানুষ, তারা কাজ করে। এত ভাবে না, এত স্বপ্ন দেখে না।

না। যারা কাজের মানুষ, তারাও স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নকে তারা বাস্তব করে, সে জন্য কাজ করতে হয়, তারা কাজ করে। আমি করি না। লিখি না, কিন্তু স্বপ্ন দেখি যে আমি লিখব। আবার এই কথা সবাইকে বলেও বেড়াই। ব্যাপারটা হাস্যকর পর্যায়ে চলে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুতি অনুষদের হোস্টেলে আমার পাশের ঘরে থাকত উত্তর ককেশাসের রুশি কসাক ছেলে পাভেল বাগদানোভ। প্রথম বর্ষে উঠে সে চলে যায় মেডিকেল হোস্টেলে, তার বিষয় ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞান। তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল। সে আমাকে ডাকত পিসাতেল বলে। রুশ এই শব্দটার মানে লেখক।

মস্কোতে আমার প্রথম শরতে… তখন সমাজতন্ত্র ছিল… সমাজতন্ত্রের এক রোদঝলমল পাতাঝরা হিমেল শারদ বিকেলে আমি আর পাভেল লেনিন্স্কি প্রসপেক্ত ধরে অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিলাম। সে আমাকে বলেছিল, ডাক্তার হয়ে সে যাবে বাংলাদেশে; আমার দেশের এক অজপাড়াগাঁয়ে গড়ে তুলবে একটি হাসপাতাল, সেবা করবে আমাদের দরিদ্র শিশুদের। সমাজতান্ত্রিক সেই বিকেলে সে লেনিন্স্কি প্রসপেক্তের এক দোকান থেকে তিন রুবল খরচ করে আমাকে কিনে দিয়েছিল পাঁচশ’ পাতা অফসেট কাগজ- প্রথম তুষারের মতো সাদা। বলেছিল, তুই গল্প লিখবি। গোর্কির মতো, নিকোলাই অস্ত্রোফ্স্কির মতো লিখতে হবে তোকে। বাংলাদেশে বিপ্লব করতে হলে গোর্কি-অস্ত্রোফ্স্কির মতো লেখক দরকার।

তার তিন বছর পরে আমি দেখলাম, মস্কোর রাস্তায় সে হাঁকিয়ে চলেছে বিএমডব্লিউ গাড়ি। আমাকে আর চেনে না, যেন কোনো কালেই চিনত না।

এখন আমি ভাবি, পাভেল বাগ্দানোভ গল্প হয়ে গেছে, সেই গল্প আমাকে লিখতে হবে।

পাভেলের বিএমডব্লিউ গাড়ি প্রায় তখনকার কথা, যখন গ্রিগরি খিঝ্নিয়াক নামে এক রুশ ছেলে কিছুদিন আমার রুমমেট ছিল। পেট পুরে খাবার কেনার মতো পয়সা ওর ছিল না, কিন্তু ছিল পেটভর্তি ক্ষুধা, কারণ ওর বয়স ছিল ১৮ বছর, উচ্চতা ৬ ফুট- ঢ্যাঙা একটা হাড়ের কাঠামো, অক্টোবরের হিম বাতাসের তোড়ে যেন উড়ে যাবে…। হ্যাঁ, অক্টোবরেই তো সে এসেছিল আমার রুমমেট হয়ে, ছিল বোধ হয় ডিসেম্বর পর্যন্ত। একবার সে টানা তিন দিন কাটিয়ে দিয়েছিল শুধু ঘুমিয়ে, কারণ এক টুকরা রুটি কেনার পয়সাও তার অবশিষ্ট ছিল না।

গ্রিগরি খিঝ্নিয়াক জেগে উঠেছিল সেইদিন সকালে, যেদিন ওর স্টাইপেন্ডের টাকা পাওয়ার কথা ছিল। টাকা তুলে ক্যান্টিনে গিয়ে এক বৈঠকে সাবাড় করেছিল নয় রুবলের খাবার। ওই পরিমাণ খাবার খেতে আমার মতো ছয়জনের পেট দরকার।

পাভেল বাগ্দানোভ আর গ্রিগরি খিঝ্নিয়াক একই গল্পে জায়গা পেতে পারে।

প্রস্তুতি অনুষদে আমার রুমমেট ছিল তিনজন- লেবাননের মহাম্মাদ হার্ব, নিকারাগুয়ার ফ্রানসিস্কো গন্সালেস আর সোভিয়েত আরমেনিয়া প্রজাতন্ত্রের গ্রিগরি আতাসুন্সেফ। গ্রিগরি ছিল কমসোমলের সদস্য, তিন দেশ থেকে আসা তিন রুমমেটের দেখভাল করার দায়িত্ব বর্তেছিল তার কাঁধে। মহাম্মদ যখন নামাজ পড়তে বসত, তখন ফ্রানসিস্কো তার ক্যাসেট প্লেয়ারে ফুল ভলিউমে গান ছেড়ে দিয়ে নাচতÑ ‘ও বানানা, বানানা!’

জানেন, নিকারাগুয়ার কমিউনিস্টের ছেলে ইয়াং কমিউনিস্ট ফ্রানসিস্কো গোপনে ছিল পরহেজগার ক্যাথোলিক। রাতে ঘুমানোর আগে সে কোত্থেকে বের করত একটা রুপার ক্রুশ, চুপি চুপি চুমু খেত তাতে। আমি দেখে ফেললে সে লজ্জা পেয়ে হেসেছিল। হেসেছিল মহাম্মাদও, উদার সমর্থনের হাসি।

গ্রিগরি একদিন রাগ করে ফ্রানসিস্কোর ক্যাসেট প্লেয়ারটা জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু চারতলা থেকে নিচে পড়েও ওটা ভাঙেনি। মালটা ছিল মেড ইন সোভিয়েত ইউনিয়ন, আর পড়েছিল ভেজা নরম তুষারের স্তূপের ওপর।

আমরা মস্কো পৌঁছার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের শীতের পোশাক দিয়েছিল- ওভারকোট, সোয়েটার, জ্যাকেট, মাফলার, শীতের টুপি, হাতমোজা এবং গরম জুতা, শীতকালে আর যা যা দরকার হয় সব কিছু। সারা মস্কোর সব জুতার দোকান ঢুঁড়ে আমার পায়ের মাপমতো শীতের জুতা পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু উত্তর মেরু থেকে হি হি করে তেড়ে আসছিল শীত। আমাদের সিনিয়র টিচার মাহমুদজান নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে মস্কো থেকে পাঁচ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তাসখন্দ গিয়ে কিনে এনেছিলেন আমার জন্য শীতের জুতা।

এক বুড়াকে জানতাম, কারখানার শ্রমিক ছিল, কারখানায় লালবাতি জ্বলে ওঠার ফলে যখন সে গরিব হয়ে গেল, আমার এক বোতল আফটারশেভ লোশন ঢক ঢক করে খেয়ে ফেলেছিল। ওর পয়সা ছিল না যে ভোদকা কিনে খাবে।

এই সমস্ত কিছু ঘটেছিল। বাস্তবে, চোখের সামনে ও পেছনে, আমার স্বপ্নে ও দুঃস্বপ্নে…

রামভদ্রপুরের সাঁওতাল বৃদ্ধ নাইকি হেমব্রম আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমরা যখন আসিছেন, তখন ওডা হোবেই!’

আমরা সে-সময় ভূমিহীন খেতমজুরদের মধ্যে খাস জমি বণ্টনের দাবিতে উত্তরবঙ্গের গ্রামে গ্রামে আন্দোলন করছিলাম। কিন্তু নাইকি ‘ওডা’ বলতে বুঝিয়েছিলেন বিপ্লব, খাস জমি নয়। আমি মস্কো আসার আগে তিনি আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, ‘মহামতি লেনিনের দেশত্ যাওছেন কমরেড, ফিরে অ্যাসে কিন্তুক্ ওডা করাই লাগবে।’

‘ওডা’ মানে বিপ্লব।

আমি বিপ্লবের সূতিকাগারে পৌঁছে দেখি বিপ্লব বুড়া হয়ে গেছে, নবীন প্রাণ সঞ্চারের চেষ্টা চলছে তার অথর্ব শরীরে। সে জন্য আবিষ্কার করা হয়েছে দুইটা মহৌষধ- গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ত্রোইকা। কবিরাজের নাম মিখাইল গর্বাচভ। গর্বাচভকে নিয়ে বলা শুরু করলে আর থামতে পারব না, বকবক করতে করতে মুখে ফেনা উঠে যাবে। তখন সত্যিই পাগল মনে হবে আমাকে।

পাগল হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের এক দরিদ্র কবি। সে কলকাতা থেকে এসেছিল পড়তে নয়, আদম হয়ে- রাশিয়া থেকে পোল্যান্ড-রোমানিয়া পেরিয়ে ইতালির দিকে পাচার হয়ে যাওয়ার আশায়। কিন্তু প্রতারক দালালের কাছে ডলার-পাসপোর্ট খুইয়ে উন্মাদ।

তার আগে, যখন তার মাথা ঠিক ছিল, অথবা ছিল না, তখন এই ছড়াটা সে লিখেছিল-

আমরা খই খাই তোরাও খই খা

পিরি স্ত্রৈকা পিরি স্ত্রৈকা।

তনুশ্রীও কলকাতার মেয়ে। সাতচল্লিশে দেশভাগের সময় পূর্ববঙ্গ থেকে বিতাড়িত ব্রাহ্মণগোষ্ঠীর উত্তরাধিকার। ওর ঠাকুরদা ওকে সাবধান করে দিয়েছিল- খবরদার, বাংলাদেশের কোনো ছেলের প্রেমে পড়বি না!

তনুশ্রী আমার প্রেমে পড়েনি। কিন্তু আমার সঙ্গে ওর এক অসম্ভব দুর্ঘটনা ঘটেছিল। কেমন করে তা ঘটেছিল, সে এক গবেষণার বিষয়, যেমন গবেষণার বিষয় কার্ল মার্ক্সের শিল্পোন্নত পুঁজিতান্ত্রিক জার্মানিকে রেহাই দিয়ে কী করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটেছিল লেনিনের কৃষিতান্ত্রিক সামন্ত রাশিয়ায়।

তনুশ্রীর কোষ্ঠীতে লেখা ছিলÑ যবন কর্তৃক আক্রান্ত হইবে, কুলটা হইবে।

কিন্তু তনুশ্রী কুলটা হয়নি; কোষ্ঠীর দৈববাণীকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে, যেমন করে মিখাইল গর্বাচভ মিথ্যা প্রমাণ করেছেন লিওনেদ ব্রেজনেভের এই ঘোষণাকে- ১৯৮০ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়নে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে।

গর্বাচভকে নিয়ে একটা গল্প লেখার চেষ্টা করেছিলাম। বাংলায় চিন্তা করে কাঁচা, আনাড়ি রুশিতে দুই পাতা লেখার পর পড়তে দিয়েছিলাম এক রুশি বন্ধুকে। সে পড়ে আমাকে বলেছিল, ‘তোমার লেখায় সোভিয়েত ব্যবস্থার জন্য যত বেশি আবেগ প্রকাশ পাবে, ততই স্টুপিড মনে হবে তোমাকে। লেখা উচিত এমনভাবে যেন তা পড়ে পাঠকদের মনে হয় তুমি আরেকটু কম স্টুপিড।’

তারপর আমি আর গর্বাচভকে নিয়ে গল্প লেখার চেষ্টা করিনি। শুধু গর্বাচভকে নিয়ে কেন, কোনো গল্পই আর লিখিনি। লেখার কথা ভাবলেই মনে হতো, লোকে আমার লেখা পড়ে বলবে আমি একটা স্টুপিড।

ভিক্তর আমাকে আরও বলেছিল, ‘তোমার লেখায় তো উইট-হিউমার বলতে কিচ্ছু নাই।’

ওকে বলেছিলাম আমি একজন সিরিয়াস মানুষ।

ভিক্তর হেসে বলেছিল, ‘সিরিয়াসনেস একটা হাস্যকর ব্যাপার। সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টি-লিডাররা সব সিরিয়াস লোক, তাদের নিয়ে জনগণ কীরকম হাসাহাসি করে তুমি দেখনি? যদি শুধু খেয়াল করে শোন লোকজন কী ধরনের চুটকি বলছে, প্রতিদিন কী কী নতুন চুটকি তৈরি হচ্ছে, তাহলেই দেখতে পাবে সোভিয়েত জনগণ সারাক্ষণ কী হাসাই না হেসে চলেছে। আসলে, এটা একটা হাস্যকর ব্যবস্থা, মস্ত এক কেরিক্যাচার।’

গর্বাচভের পেরেস্ত্রোইকাও কি একটা কেরিক্যাচার? আমি ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ভিক্তর আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলেছিল, ‘গর্বাচভও একজন র্পাতিন্নি চেলাভিয়েক…আ পার্টিম্যান। তারও আদর্শ সেই লেনিন, সেই রেডিকুলাস এক্সপেরিমেন্টালিস্ট, যে গড়তে চেয়েছিল একটা ঈশ্বরহীন সমাজ। কিন্তু লেনিন জানত না, ঈশ্বর যদি নাও থেকে থাকে, তবু রুশিরা একজন ঈশ্বর তৈরি করে নেবে, কারণ ঈশ্বর ছাড়া রুশিদের একদমই চলে না।’

আমি বলেছিলাম, ‘কিন্তু গর্বাচভ তো সেটা বুঝতে পেরেছে। তার গ্লাসনস্ত কর্মসূচির দুই নম্বর এজেন্ডাই হলো ধর্মপালনের স্বাধীনতা। তাহলে লেনিন কী করে গর্বাচভের আদর্শ হতে পারে?’

ভিক্তরের উত্তর ছিল, ‘এটাই তো গর্বাচভের ভণ্ডামি। সে নিজেকে একজন কমিউনিস্ট বলে দাবি করে, প্রকাশ্যেই বলে বেড়ায় যে, সে কমিউনিস্ট হিসেবে গর্ববোধ করে। কিন্তু আবার একই সঙ্গে বলে ব্যক্তির বিকাশের কথা। স্টুপিডটা জানে না যে, কমিউনিজম শব্দটার মধ্যে ব্যক্তির কোনো জায়গাই নেই, আছে কেবলই সমষ্টি, কমিউন…।’

ভিক্তর ছিল কমসোমলের নেতা। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত- মার্কিন ছাত্র বিনিময় শুরু হলে চলে গছে আমেরিকা। আর ফিরে আসেনি।।

এক আমেরিকান সাংবাদিক এসেছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মতবিনিময় করা ছিল তার ঘোষিত উদ্দেশ্য। আমাদের শিক্ষিকা নাতালিয়া বাজানোভা তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এই বলে- ‘আমেরিকান জার্নালিস্ট, কিন্তু এটা জন রিড নয়, এটা মাইকেল স্লোন্নিক!’

স্লোন্নিক আমাদের জিজ্ঞাসা করেছিল, আমরা গ্লাসনস্ত সমর্থন করি কি না। ক্লাসের সব ছেলেমেয়ে বুঝতে পারছিল, সে আমাদের মুখে কী উত্তর শুনতে চায়। অধিকাংশ ছেলেমেয়েই গ্লাসনস্তের পক্ষে কথা বলছিল, গর্বাচভের প্রশংসা করছিল। কিন্তু কঙ্গোর ছেলে কেইতা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘বলতে পারেন মিস্টার স্লোন্নিক, পাত্রিস লুমুম্বাকে কেন খুন করা হয়েছিল?’ কেইতা ছিল আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে ভোলাভালা ছেলে। ওর মুখে ওই প্রশ্ন শুনে ক্লাসের সব ছেলেমেয়ে অবাক হয়ে মুখ চাওয়া-চাউয়ি করেছিল।

আমেরিকান সাংবাদিকটা বলেছিল, পাত্রিস লুমুম্বাকে হত্যা করেছিল আসলে তাঁরই স্বদেশের মানুষেরা। তখন কেইতা ঠোঁট শক্ত করে বলেছিল- ‘উই আর নট স্টুপিড, ইউ নো, মিস্টার স্লোন্নিক?’

বলিভিয়ার ছেলে ভিলসের স্লোন্নিককে বলেছিল, ‘তোমরা কেন চে গেভারাকে খুন করেছিলে?’

কেইতা আর ভিলসের ছিল আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে গবেট দুই ছেলে।

 পেরেস্ত্রোইকা শেষ হয়েছে। পৃথিবীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে কোনো দেশের অস্তিত্ব আজ আর নাই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থেকে পাত্রিস লুমুম্বার নাম ছেঁটে ফেলে দেওয়া হয়েছে। যারা তাঁকে মেরেছিল, তারা আজ ক্রেমলিনের নেতাদের বন্ধু।

আমার এক নানার চেহারা ছিল পাত্রিস লুমুম্বার মতো। নানা কালো মোটা ফ্রেমের চশমা পরতেন, ঠিক পাত্রিস লুমুম্বার মতোই তাঁরও থুতনিতে ছিল এক রত্তি দাড়ি।

বাবা আমাকে বলেছিলেন, ‘ওরা যে বছর প্যাট্রিস লুমুম্বাকে খুন করে, তখন তুমি নেগেটিভ ফাইভ ইয়ার্স সিক্স মান্থস্। আর যখন চেকে মারে, তখন প্লাস ফিফটিন মান্থস্।’

আমি বাবাকে বলেছিলাম, ‘আপনি প্যাট্রিস লুমুম্বা আর চে গুয়েভারার ভক্ত হয়ে আমার নাম কেন রেখেছেন হাবিবুর রহমান? হাবিব একটা নাম হলো?’

বাবা হেসেছিলেন। বাবা উনিশ শ’ ষাটের দশকে কমিউনিস্ট হওয়ার আগে নাস্তিক ছিলেন, কমিউনিস্ট হওয়ার পরে হয়েছিলেন ধার্মিক।

একটু দাঁড়ান। ধার্মিক কথাটা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার।

আমার এক দূরসম্পর্কের দাদু ব্রিটিশদের আন্দামানে কয়েদ খেটেছিলেন। তার আগে তিনি হয়েছিলেন অনুশীলন সমিতির সদস্য। সদস্য হওয়ার জন্য তিনি গেছেন সেই গুপ্ত বিপ্লবী সংঘের নেতাদের কাছে। প্রবল উৎসাহের সঙ্গে বললেন, তিনি সদস্য হতে চান।

ভালো কথা। কিন্তু পরীক্ষা দিতে হবে।

কী পরীক্ষা?

সান্তাহার থেকে রেললাইন ধরে হেঁটে হেঁটে যেতে হবে পাবর্তীপুর। ফ্রম সান্তাহার জংশন টু পার্বতীপুর জংশন রেললাইনে কতগুলো স্লিপার আছে তা একটা একটা করে গুনে এসে বলতে হবে। বানিয়ে একটা সংখ্যা বলে দিলেই চলবে না, কারণ স্লিপারের সংখ্যা পরীক্ষক নেতাদের জানা আছে।

সেই কঠিন পরীক্ষায় পাস করে আমার সেই দাদু অনুশীলন সমিতির সদস্য হয়েছিলেন।

আমার বাবা কমিউনিস্ট হওয়ার পর ধার্মিক হয়েছিলেন- পার্টির নেতারা যা বলতেন, কেন্দ্রীয় কমিটিতে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, তিনি সব বিনাবাক্যে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। সাপ্তাহিক একতা, মাসিক সোভিয়েত ইউনিয়ন, সোভিয়েত নারী, উদয়ন, সোভিয়েত লিটারেচার, স্পুৎনিক ইত্যাদি পত্রিকা, প্রগতি ও রাদুগা প্রকাশনীর সমস্ত বইপত্রে যা কিছু লেখা হতো তিনি সবই বিশ্বাস করতেন সেইভাবে।

আমি সেই বাবা আর ওই রকম এক দাদুর বংশধর। কী রকম হতে পারি আমি?

তাহলে আরও বলি।

সোভিয়েত ইউনিয়নে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ওরফে সিপিবির একটা গোপন শাখা ছিল। কেন গোপন, আমি জানি না। বাংলাদেশে পুঁজিবাদ, সামরিক স্বৈরতন্ত্র, অথচ সেখানেই সিপিবি গোপন কোনো পার্টি নয়, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নে আনুষ্ঠানিক সমাজতন্ত্র, এখানে কেন একটা কমিউনিস্ট পার্টিকে গোপনে কাজ করতে হবে… এই প্রশ্নের সদুত্তর কেউ আমাকে দেয়নি।

যা হোক, সেই সিপিবির সোভিয়েত ইউনিয়ন শাখার এক নেতা ছিল। অজর অমর অক্ষয় নেতাÑ সেই ১৯৭২ সালে সোভিয়েত সরকারের বৃত্তি নিয়ে পড়তে এসেছে মস্কো শহরে, ১৯৯০ সালেও শুনি, তার পড়া শেষ হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের বাঙালি মহলে তাকে নিয়ে নানা কেচ্ছাকাহিনি আছে। পাভেল বাগদানোভ আর গ্রিগরি খিঝনিয়াকের গল্পে তাকেও জায়গা দিতে হবে। কারণ ১৯৮৮ সালে তার অসুস্থ মাকে দেখার জন্য দেশে যাওয়ার সময় তাকে আমরা আয়েরোফ্লতের টিকিট কিনে দিয়েছিলাম চাঁদা তুলে, আর ১৯৯১ সালে সে মালিক হয়েছে একটা দাচার, কমপক্ষে তিনটা বিএমডব্লিউ গাড়ির এবং আরও যে কত কিছুর, আমরা জানতে পারিনি। শুধু জেনেছি, তার টাকা-পয়সার শেষ নাই, এবং এখন টাকাই তার ঈশ্বর।

…তো, সে ছিল আমাদের নেতা, কার্ল মার্ক্সের মতো দাড়িগোঁফ লালনপালন করত। আমরা তার সামনে ভক্তিতে গলে গলে শেষ হয়ে যেতাম। আপনারা যারা বামপন্থি রাজনৈতিক সংগঠন করেননি, তারা বুঝবেন না, ‘ক্যাডারভিত্তিক’ এসব দলে নেতা ও কর্মীদের মধ্যেকার সম্পর্ক ঠিক কিসের মতো। আমি অনেক ভেবেচিন্তে দেখেছি, সম্পর্কটা ঠিক পির ও মুরিদের মতো।

মনে করুন ভয়ঙ্কর শীতকাল, ধরুন ডিসেম্বরের পনেরো তারিখ রাত বারোটা, তাপমাত্রা নেমে গেছে শূন্যের পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে, আমার সেই নেতা আমাকে বলল, ‘হাবিব, যাও, রাস্তায় গিয়ে সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকো,’ আমি সত্যিই গিয়ে দাঁড়াতাম রাস্তায়, খোলা আকাশের নিচে। তুষার ঝরছে, না তুষারঝড় বইছেÑ কিছুই ভ্রুক্ষেপ করতাম না। কনকনে শীতে বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতাম ভোর পর্যন্ত। একবারও জানতে চাইতাম না কেন, কী যুক্তিতে সেটা করতে হবে, করলে কীভাবে পার্টি উপকৃত হবে। এটা আমার কোনো অজানা অপরাধের শাস্তি কি না, বা গোপন কোনো কৃতিত্বের পুরস্কার কি না… এসবের কিছুই জিজ্ঞাসা না করে বিনাবাক্যব্যয়ে আমি গিয়ে দাঁড়াতাম রাস্তায়, খোলা আকাশের নিচে। ভয়ঙ্কর ঠান্ডায় দাঁতকপাটি লেগে বরফের ওপর ধপ করে পড়ে মরে থাকতে পারি… এরকম চিন্তা মনে এলে আনন্দ পেতাম এই ভেবে যে পার্টির জন্য শহিদ হয়ে যাচ্ছি।

আপনারা তাহলে বুঝতে পারছেন, ধার্মিক বলতে আমি কী বুঝি এবং বোঝাতে চাই।

এবং আমার ধারণা, প্রাচ্যের কমিউনিস্টদের মন আসলে ধার্মিকের মন।

কিন্তু আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, আমি এখন আর ওই রকমের ধার্মিক নই। আমার বাবাও অন্ধবিশ্বাসের আরামদায়ক গুহা থেকে সম্ভবত বেরিয়ে পড়েছেন। গত শীতে তিনি আমাকে এক চিঠিতে লিখেছিলেনÑ বেশি ইমোশন ক্ষতিকর। চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। চিন্তা করতে হবে। ‘ইউ নিড টু কিপ ইয়োর রিজন সাউন্ড।’

সাউন্ড রিজন! ফুহ্! ভারসাম্যপূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কের কথা ভাবতে ভাবতে চলে এলাম পাগলাগারদে! 

হাসবেন না, প্লিজ! এটা মস্কোর বাল্নিৎসা চিতিরনাৎসায়া। ১৪ নম্বর হাসপাতাল। এই হাসপাতাল সারা সোভিয়েত ইউনিয়নে বিখ্যাত। ভদ্রলোকেরা বলে মানসিক হাসপাতাল, কিন্তু সোজা কথায় এটা একটা বদ্ধ পাগলাগারদ। আমার বন্ধুরা আমাকে পাগল ঠাউরে এখানে রেখে গেছে।

একদিন আমাদের ফ্যাকাল্টির ডিনকে একটা গালি দিয়েছিলাম। রুশ ভাষায় অনেক খারাপ গালি আছে, বাংলার চেয়েও খারাপ। একদিন অনেক শিক্ষক আর ছাত্রছাত্রীর সামনে রাশিয়ার মহামান্য প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন সম্পর্কে খুব খারাপ গালি উচ্চারণ করেছিলাম। সেদিনই সন্ধ্যার পরে অনেক মদ খেয়ে মারপিট করেছিলাম। মনে আছে, আমাকে চ্যাংদোলা করে গাড়িতে তোলা হচ্ছিল, তারপর সব অন্ধকার। মাঝে একবার হুঁশ ফিরে পেয়ে দেখি আমার মুখের ভিতরে পাইপ, স্টমাক ওয়াশ করা হচ্ছে। আমি পাইপটা আমের আঁটির মতো কামড়াচ্ছিলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর ভøাদিমির স্তানিস সোভিয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতির সভাপতি; বাংলাদেশের প্রাণের বন্ধু। আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়নি তাঁরই দয়ায়। কিন্তু তিনিও নাকি বলেছেন আমি পাগল হয়ে গেছি। পাগলকে দিয়ে তো লেখাপড়া হয় না, আমাকে দেশে ফেরত পাঠানোর কথা উঠেছিল। কিন্তু প্রফেসর স্তানিস স্নেহবশত সেটা করতে দেননি। কিছুদিনের জন্য আমাকে এই হাসপাতালে রেখে যাওয়া হয়েছে।

ঠিক আছে, মেনে নিলাম। এ ছাড়া আর উপায় কী?

এই হাসপাতালের যে ওয়ার্ডে আমাকে ভর্তি করা হয়েছে, সেটা অবিপজ্জনক রোগীদের ওয়ার্ড। কিন্তু আমি একজন পাকিস্তানির মাথা ফাটিয়েছিলাম, আমাকে এই হাসপাতালে পাঠানোর চূড়ান্ত কারণ, আমার ধারণা, সেটাই। এবং হিংস্র আচরণ করেছিলাম বলে আমাকে বিপজ্জনক রোগীদের বিভাগেই ভর্তি করানোর কথা। কিন্তু তা করা হয়নি নিশ্চয়ই অধ্যাপক স্তানিসের হস্তক্ষেপে। শুধু তাই নয়, তিনি আমার জন্য সিঙ্গেল রুমের ব্যবস্থা করেছেন।

ভøাদিমির ফ্রান্সোভিচ, এই ফাঁকে আপনাকে ধন্যবাদ। এবং কথা দিচ্ছি, আমি আর ইহজীবনে কারও মাথা ফাটাব না।

ওই পাকিস্তানিটাকেও আক্রমণ করতাম না, যদি সে আমাকে ছুরি মারার চেষ্টা না করত।

আপনারা কি জানতে চান কী ঘটেছিল সেই রাতে?

বলছি তাহলে।

না, তার আগে আরও কিছু কথা বলতে হবে। কারণ সে একজন পাকিস্তানি। তার কারণেই আজ আমার জায়গা হয়েছে এই পাগলাগারদে।

আমার বাবা কমিউনিস্ট, আমি কমিউনিস্টের ছেলে কমিউনিস্ট, ছিলাম, আমার এক বড়ভাইও তাই। পাকিস্তান কেন, খোদ আমেরিকাসুদ্ধ পৃথিবীর কোনো দেশ বা জাতির প্রতিই আমাদের ঘৃণা থাকার কথা ছিল না। কারণ, আমাদের মনে করার কথা পৃথিবীর প্রতিটা দেশই ভবিষ্যৎ বিপ্লবের একেকটা ক্ষেত্র, কেননা প্রত্যেক দেশেই বেশির ভাগ মানুষ শোষিত হচ্ছে।

কিন্তু পাকিস্তানের প্রতি আমাদের ঘৃণা ছিল। কারণ, কমিউনিস্ট হয়েও আমরা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠতে পারিনি, হতে পারিনি সত্যিকারের আন্তর্জাতিকতাবাদী। উপরন্তু শেখ সাহেবের প্রতি আমার বাবার ছিল বিশেষ দুর্বলতা; তাঁর কাছে কমরেড মণি সিংহের চেয়েও বেশি প্রিয় ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বলা চলে, উত্তরাধিকার সূত্রেই আমি মনেপ্রাণে ঘৃণা করতাম পাকিস্তান নামের দেশটাকে। ঘৃণাটা এতই প্রচণ্ড ছিল যে, আই কুডনট হেল্প; যেন ওটা একটা দুরারোগ্য ব্যাধি। এ রকম ঘৃণাকেই বুঝি বলা হয় প্যাথলজিক্যাল হেট্রেড।

আয়েরোফ্লতের যে-বিমানে চড়ে আমরা মস্কো আসছিলাম, সেটা করাচি বিমানবন্দরে নেমেছিল। কিন্তু আমাদের বিমান থেকে নামার অনুমতি ছিল না। আমার সিটটা ছিল জানালার পাশে। বাইরে তাকিয়ে দেখি, কারবাইন হাতে সৈন্যরা দাঁড়িয়ে আছে, কারবাইনগুলো তাক করে আছে আমাদের বিমানের দিকে। রাগে আমার পিত্তি জ্বলে গেল। দাঁতে দাঁত পিষে বিড়বিড় করে গালি দিলাম- শালা হানাদারের বাচ্চারা!

তখনও আফগানিস্তানে সোভিয়েত ‘আগ্রাসন’ চলছিল। কিন্তু এটা এখানে অপ্রাসঙ্গিক… ভুলে গেলাম কী বলতে চেয়েছিলাম, কেন পাকিস্তান নিয়ে এত বকবক করছি… পাগলাগারদের বাতাসে নিশ্চয়ই কিছু সমস্যা আছে, নইলে এখানে সবাই এত বকবক করে কেন? কথা বলতে শুরু করলে আর থামতে পারে না কেন? মুখে ফেনা উঠে যাবে, কেউ একটা কথাও শুনবে না, তবু আমি থামব না, বকেই চলব…কী হচ্ছে এসব?

না, মহোদয়গণ, আমি ঠিক আছি। ভাবনাগুলো গুছিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আমাকে অবশ্যই লিখতে হবে, কারণ অনেক কথা বলার আছে আমার। সব কথা আপনাদের শুনতে হবে, অবশ্যই, যদি আপনারা এই মানব সভ্যতার অংশ হয়ে থাকেন, এই বিশ শতকের পয়দা হয়ে থাকেন। কারণ, কমিউনিজমের গল্পই বিশ শতকের সবচেয়ে বড় গল্প।

সো, ইন স্পাইট অব এভরিথিং অ্যান্ড এভরিবডি ইনক্লুডিং মিখাইল গর্বাচভ অ্যান্ড ইয়েলৎসিন দ্য সুকিন সিন, আমাকে লিখতেই হবে। লিখতে হবে যা-কিছু ঘটেছিল- বাস্তবে, দৃষ্টির সামনে ও পেছনে, আমার স্বপ্নে ও দুঃস্বপ্নে…

মশিউল আলম : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares