রশীদ করীমের গল্প : চিরকেলে অনুভূতির বয়ান : হামিদ কায়সার

শ্রদ্ধার্ঘ্য

রশীদ করীমের গল্প :

চিরকেলে অনুভূতির বয়ান

হামিদ কায়সার

একটা সত্যি কথা বলব? গল্প লিখতে যতটুকু ভালো লাগে, গল্পের ওপর আলোচনা বা সমালোচনা যা-ই বলি না কেন, তা লিখতে ততটুকুই নিরাসক্তি আমার। একজন গল্পকার খেটেখুটে কত পরিশ্রম করে একটা গল্প নিজের ভেতর থেকে নামান, সেটা কলমের এক কোপে নস্যাৎ করে দেওয়াটা কোনো কাজের কাজ না। তবে কোনো গল্প যদি ভালো লেগে যায়, সে-কথাটা ঢাকঢোল পিটিয়ে বলার মধ্যে দারুণ একটা সুখের ক্রিয়া আছে বটেÑ সে গল্প নিয়ে গালগল্পও করা চলে! তেমনি একটা গল্প রশীদ করীম-এর ‘প্রথম প্রেম’। গল্পটি পড়ে সত্যিকার অর্থেই আমি ঈদের আনন্দ লাভ করেছিলাম। গল্পটি বেরিয়েও ছিল কোনো এক ঈদসংখ্যায়!

হ্যাঁ, ঈদসংখ্যা বিচিত্রায়, ১৯৮৩ সালে। বড়ো বর্ণাঢ্য আর সমৃদ্ধ ছিল সে-সংখ্যা। ড. নওয়াজেশ আহমেদের নারীমুখ ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছিল প্রচ্ছদপট। শামসুর রাহমানের উপন্যাস অদ্ভুত আঁধার এক, সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস স্তব্ধতার অনুবাদ ছিল। দিলারা হাশেমের মিউর‌্যালও ছিল সম্ভবত। আরও তিন-চারটা উপন্যাস ছিল, কার কার স্মরণ নেই। গল্প ছিল অনেকগুলো। তার মধ্যে শুধু মনে আছে আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘ফেরেশতা’ এবং রশীদ করীমের ‘প্রথম প্রেম’-এর কথা।

‘প্রথম প্রেম’ পড়ার আগেই অবশ্যি রশীদ করীমের সাহিত্যের সঙ্গে আমার পূর্ব-পরিচয় ঘটে গিয়েছিল! সেই যে আমার আলাভোলা শৈশবে এক বর্ষণ-মুখর দিনে নাওয়া-খাওয়া ভুলে পড়েছিলাম তার ক্ল্যাসিক উপন্যাস উত্তম পুরুষ। তারপর, যখন আমি কলেজ-আঙিনায় যাই-যাই করছি, তখনই পড়ার সুযোগ হয় প্রেম একটি লাল গোলাপ উপন্যাস। কিন্তু তখনও তার কোনো গল্প পড়া হয়নি, তিনি যে আদৌ গল্প লেখেন এ ব্যাপারটাও জানা ছিল না। স্বভাবতই ঈদসংখ্যা বিচিত্রায় প্রকাশিত ‘প্রথম প্রেম’ গল্পটি পড়ে রীতিমতো চমকে উঠলাম। কেননা আমি এতদিন বাংলাদেশের যে-সমস্ত গল্প পড়েছি, তা থেকে উপস্থাপনা, বিষয়ে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতের। এর মধ্যে একটা অন্তরঙ্গ স্মৃতিতাড়ানিয়ার মোচড় ছিল, আত্মজৈবনিকতার গাঢ় রঙের প্রলেপ ছিল, প্রেম-মাহাত্ম্যের অনন্য এক ভিন্নতার উন্মোচন ছিল এবং ছিল ঝকঝকে স্মার্ট গদ্যভাষা। আর আলাদা বলছি কেন, বাংলাদেশের তখনকার ছোটোগল্প মানেই সিরিয়াস সাহিত্য, জীবনের দগদগে কঠিন বাস্তবতা সেখানে অনেকটাই রসকষহীনভাবে উপস্থিত। ‘প্রথম প্রেম’ যেন তা থেকে ভিন্ন, সে যেন বলতে চাইলো, শোনো রুদ্র কঠিন বাস্তব জীবনেও মানুষের হৃদয়ে কিছু চিরন্তন অনুভূতি কাজ করে। সেসবকে এড়িয়ে যাওয়াটা কাজের কথা নয়।

গল্পের ঘটনাকাল ১৯৪১ সালের সাতই আগস্ট, যেদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মারা যান, লেখক তখন ক্লাস টেনের ছাত্র। ঘটনাস্থান কলকাতা শহরের কেন্দ্রভূমি। আমরা জানি, রশীদ করীম তখনও কলকাতায় ছিলেন সেই একচল্লিশ সালে। তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি জমান তারও ছয় বছর পর ১৯৪৭ সালে দেশভাগের উন্মাতাল সময়ে। তবে পটভূমি কলকাতা হলেও গল্পটি তার জীবনের প্রথমদিককার লেখা নয়, যখন তিনি ছোটোগল্প রচনার মধ্য দিয়ে সাহিত্য জগতে অনুপ্রবেশ করেছেন। গল্পটি ঢাকায় বসেই লেখা এবং অনেক পরিণত বয়সে। ধরে নিতে পারি ঈদসংখ্যাটি যখন প্রকাশিত হয় সেই ১৯৮১ সালের আগে-পরে।

গল্পটির বিষয় প্রেম হলেও প্রচলিত মোটা দাগের হৃদয়সর্বস্বতা বা দু’জন নারী-পুরুষের শরীরী আকর্ষণ-বিকর্ষণ কিছুই নেই এখানে, আছে তারচেয়েও তাৎপর্যময় সুগভীর এক ব্যঞ্জনা। উত্তম পুরুষে লেখা চরিত্রটিকে স্কুলে যেতে হয় তিন মাইল পথ হেঁটে হেঁটে। স্কুলে যাওয়া-আসার নামে অন্যান্য নানা কাজকর্মেও সংলগ্ন থাকে সে। কখনও কোথাও উধাও হয়ে মজে থাকে খাওয়ার দোকানে, কখনও-বা বউবাজারের কাছে রূপম সিনেমা হলে ম্যাটিনিতে। তো সেদিনও সিনেমা দেখতে গিয়ে ওকে ধাক্কা খেতে হলো। শুনল যে আজ প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ। কেন কেন! লোহার গেটের কাছে পিচবোর্ডের ওপর সাদা কাগজে লেখা রয়েছে, ‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে আজ সকল শো বন্ধ থাকিবে।’ এরপর লেখক লক্ষ্য করেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সর্বত্রই ফিসফিসানি, আলোচনা। সকলের মুখই মলিন। চমৎকার একটা প্রামাণ্য ছবি যেন ফুটে ওঠে সেদিনকার গল্পের বর্ণনার মধ্য দিয়ে। তবে চরম সত্যটা হলো, লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণে যতটা না কষ্ট পেয়েছেন, তারচেয়েও বেশি যন্ত্রণা পেয়েছেন সিনেমা হল বন্ধ থাকায়।

ক’দিন পরের কথা। তখন বিশ্বযুদ্ধের সময়। চারদিকে আতংকের ছায়া। অল্প কথায় সে পরিবেশের বর্ণনা আছে। তো, সেদিন কীভাবে কীভাবে লেখক পৌঁছে গেছেন টাউন হলে রবীন্দ্রনাথের শোকসভায়। যদুনাথ সরকার সভাপতি। কাজী নজরুল ইসলাম, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এরাও আছেন। কিন্তু এত ভিড়, লেখক কাউকেই দেখতে পাচ্ছেন না, যেতেই পারছেন না অনুষ্ঠানস্থলের ধারেকাছে। থই থই করছে লোক। শত শত লোক ফিরে গিয়ে সিঁড়ির ওপর রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

কিছু মেয়ে স্বেচ্ছাসেবিকার কাজ করছে। সেখানে একটা মেয়ে ছিল। খুব ফর্সা। গায়ে কালো রঙের সিল্কের হাতকাটা ব্লাউজ। আভিজাত্য ঠিকরে পড়ছে, পরমাসুন্দরী। লেখক কাঙালের মতো দাঁড়িয়ে আছে রেলিংয়ের এই পাশটায়। প্রবেশাধিকার নেই। ফর্সা মেয়েটির অনেক কাজ। কাউকে বসতে বলছে, কাউকে সরিয়ে দিচ্ছে, কাউকে করছে অভ্যর্থনা। মাঝে মাঝে মঞ্চ থেকে বড় অতিথিরা তাকে ডেকে কিছু বলছেন। মেয়েটি দু-একবার লেখককে দেখেছে। দৃষ্টি তার অন্যমনস্ক, সামান্য কৌতূহলী। সভার কাজ শুরু হবে। হঠাৎ ব্যস্ততা বেড়ে গেল। মেয়েটি দরোজার কাছে এসে দাঁড়াল। না, সে কাউকে ঢুকতে দেবে না। অল্পক্ষণের জন্য দরজাটির কাছে লোক বলতে নেই-ই। সুইং ডোর এক মুহূর্তের জন্য খুলে ধরলো মেয়েটি। চলে এসো।

কাকে বলছে? লেখক নিজের দুটি কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

দেরি করো না, অন্যরা ঢুকে পড়বে।

সেই একচল্লিশ সালের স্মৃতি অনেক অনেকদিন পর লেখকের মনে পড়ে জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও, তার কাছে এটা প্রেমের এক বিশাল মহীরুহ মনে হয়, এতদিন পরও তিনি স্মরণ করে স্বর্গীয় অনুভূতি পান, ‘তুমি মেয়ে কে ছিলে আমি জানি না। কিন্তু মৃত্যুদিন পর্যন্ত তোমাকে ভুলব না। তুমি আমাকে জায়গা দিয়েছিলে।’

ছোট্ট একটি ঘটনা লেখকের সরস বর্ণনার গুণে যেমন অসামান্য তাৎপর্যবাহী হয়ে উঠেছে, তেমনি এটি একটি সার্থক ছোটগল্প হয়ে শিল্পের শর্তকেও ধারণ করেছে নতুন প্রেক্ষিতে।

এরপর রশীদ করীমের আরেকটি গল্প আমি পড়ার সুযোগ পাই কলেজ জীবনেÑ ‘জোড়াতালি দিয়ে গল্প’। কীভাবে কীভাবে একটি পুরনো বিজয় দিবস সংখ্যা নাকি স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা রোববার আমার হাতে এসেছিল! বলিই তাহলে খুলে, কোনো এক আত্মীয়-বাড়ি থেকে না বলে নিয়ে এসেছিলাম আর কি! সেটার জন্য বোধহয় আমাকে দায়ী করা যাবে না, দোষ ওই ‘জোড়াতালি দিয়ে গল্পের’ই। সে কেন এত দীর্ঘ ছিল? আত্মীয়র বাসায় পড়ে শেষ করতে পারিনি, ওটা যে না-পড়ে অর্ধেক রেখে ছেড়ে আসবÑ সেও ছিল আমার পক্ষে এক দুঃসাধ্য ব্যাপার! কারণ একটা গল্প পড়ে যে এত আনন্দ পাওয়া যায়, তা আমার এর আগে জানা ছিল না।

সত্যি, কী যে ভালো লেগেছিল গল্পটিÑ সে-আমার পক্ষে বর্ণনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। রোববারের সেই সংখ্যাটা আত্মীয়বাড়ি থেকে নিজের বাড়িতে এনে রাতে তো পড়েইছি, পরদিন কলেজেও নিয়ে গিয়েছিলাম। ওই যে বললাম, অনেক দীর্ঘ গল্প! শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছাড়তে পারিনি। শেষ হওয়ার পরও ভালো লাগার ঘোরে অনেকক্ষণ আচ্ছন্ন ছিলাম। কলেজে গল্পটি বন্ধুদেরকেও দেখিয়েছিলাম। উত্তম পুরুষের সুবাদে দু-একজন রশীদ করীমকেও চিনত।

গল্পটি পড়ে এতটা আনন্দ পাওয়ার কারণ কী ছিল? তখন বুঝিনি, কারণও খুঁজিনি। আজ অবশ্যি অনুমান করতে পারি, সেটা আসলে গল্পের আদলে ছিল অপূর্ব এক ভ্রমণকাহিনি, কিন্তু গল্পের শর্ত ধারণ করেছিল পুরোপুরিই! তা, সে-ভ্রমণকাহিনিই বলি আর গল্পই বলি, চরিত্রগুলো সবই ছিল জীবন্ত রক্তমাংসের মানুষ এবং শুধু চেনাজানাই নয়; তখনই কবি হওয়ার স্বপ্নবিভোর আমার মনের এক একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বÑ শামসুর রাহমান, আবুল হোসেন, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসান, হাসান আজিজুল হক, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অভিনেতা গোলাম মুস্তাফা, সর্বোপরি রশীদ করীমÑ এদেরকে ঘিরেই ছিল কাহিনির বয়ান এবং ঘটনার প্রবাহ! আর বর্ণনায় ছিল এতটাই উইট, কখনও-বা এতটাই দারুণ রসিকতাপূর্ণ যে, আমার কাছে মনে হয়েছে আনন্দের ডেপো। আর গল্পের প্রথাগত আদল তো ভেঙেইছে। পদে পদে ছিল বুদ্ধিমত্তার খেলা।

সংক্ষেপে গল্পের কাহিনিটা হলো, কাহিনি না বলে ঘটনাক্রম বলা ভালো- লেখক জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে নিমন্ত্রণ পেয়েছেন রাজশাহীতে বইমেলা উপলক্ষে আয়োজিত একটি সাহিত্য সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যোগদানের। তো, সেই নিমন্ত্রণকে ঘিরে পূর্বের উত্তরবঙ্গকে ঘিরে তার যে ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা ও রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি যেমন নাটোর-পর্ব, তা চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে প্রথমেই, তারপর ঢাকা থেকে কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে বিমানযোগে ঈশ্বরদী যাত্রাপথের সুদীর্ঘ বর্ণনাও অতি মনোজ্ঞ হয়ে উঠেছে, প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে অন্যান্য দেশেরও বিমানযাত্রার বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা। তারপর রাজশাহীতে গিয়ে যে ডাকবাংলোয় ছিলেন সেখানকার দু’দিনের দিনযাপন এবং সাহিত্যানুষ্ঠানের পর্বটি সবকিছু নিয়েই সহজের মধ্যে কঠিন প্রাসাদগুণ এবং বাস্তবতার মধ্যেই গল্পের মায়াজালের বুনন ঘটাতে তিনি সার্থকভাবেই সমর্থ হয়েছেন।

উপরন্তু, পাঠককে এক ধাঁধার মধ্যে রেখে, শুধু পাঠকালে নয়, আমার মনে হয় সারাজীবনের জন্য গল্পটির কথা মনে রাখতে তিনি বাধ্য করেছেন। গল্পের শুরুতেই তিনি পাঠকের উদ্দেশে ছুড়ে দিয়েছেন এই ধাঁধা, এই লেখাটিকে গল্প বলা যায় কি না জানি না; কারণ একটি বাক্য ছাড়া বাদবাকি সমস্তটাই যাকে বলে সত্য ঘটনা, তাই। সেই গল্পাংশটি কোন বাক্যে লুকিয়ে আছে তা আপনাদের বলব না- আপনাদেরকেই বুঝে নিতে হবে। এমন হবে কি না জানি না যে এক-একজন পাঠক লেখাটির এক-একটি অংশকে সেই গল্পাংশ মনে করবেন। যদি তাই হয়, তাহলে বুঝতে হবে জীবনের সত্য ঘটনার মধ্যেও গল্প থাকে, আবার গল্পের মধ্যেও সত্য থাকে। গল্পের একেবারে শেষ প্যারায় লেখক আবারও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই লেখাটির শুরুতে বলেছি যে মাত্র একটি বাক্যেই গল্পাংশ আছে, বাদবাকিটা সবই সত্য ঘটনা। সেই গল্পাংশ কোন বাক্যটিতে আছে নিশ্চয়ই আপনারা জেনে ফেলেছেন? ভালো! আমার তো মনে হয় লেখক এই শেষ প্যারাটার আগেই যে ঘটনাটির বর্ণনা দিয়েছেন সেটাই সেই গল্পাংশ! কোন ঘটনা, আমি আর বলছি না। তা জানার জন্য আপনার সামনে সবচেয়ে বড় যে উপায়টি আছে, তা হলো, গল্পটির পাঠ নেওয়া! তাতে আপনার লাভের পাল্লা ভারী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আজও ১০০% বিমল আনন্দ জুটবে। বাংলা সাহিত্যের আর কোনো গল্পে শুরু আর শেষটা ধাঁধার এমন অপূর্ব শিল্পিত বন্ধনে বাঁধা রয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

যখন প্রকাশিত হয় ‘জোড়াতালি দিয়ে গল্প’, তখনও বাংলাদেশের সাহিত্যের সার্বিক দিক অনেকটাই সুস্থ ছিল। সম্পাদক বা সাহিত্য সম্পাদক প্রকৃত লেখক খুঁজতেন, কোন্ লেখককে দিয়ে কোন্ ধরনের লেখা বের করানো যাবে, সে ব্যাপারে সচেতন থাকতেন। এতটা সিন্ডিকেটসর্বস্ব হয়ে ওঠেনি প্রায় সব জায়গা। কবি-লেখকরাও শুদ্ধ সাহিত্য-চর্চায় বিশ^াসী ছিলেন। পরশ্রীকাতরতা আর ঈর্ষাপরায়ণতা বুকে পুষে এক ধরনের আত্মহননে প্রবৃত্ত হতেন না। একঝাঁক কবিসাহিত্যিকের রাজশাহী ভ্রমণের দিনলিপি এঁকে রশীদ করীম যেন সেই প্রমাণপঞ্জিই হাজির করেছেন।

গল্পটির মধ্যে সাহিত্যের সেই সমাবেশে রশীদ করীমের বক্তব্য প্রদানের একটি অংশ রয়েছে। যেখানে ধরা পড়েছে তার সেই চিরাচরিত বৈদগ্ধ্যভরা সারল্য এবং অনুপম উইট-নির্ভর স্বভাব-মাধুর্য, ‘ঠিক করেছিলাম, এমন এক বক্তৃতা উপহার দেব, রাজশাহীর লোকেরা দীর্ঘকাল মনে রাখবেন। শুরুও করেছিলাম মন্দ না। মাইকে গলার আওয়াজটা খুলেছে সুন্দর। মুখের ভাষাও সহজ স্রোতের মতো আসছে ভেসে। রসিকতাগুলো ঠিকমতো জায়গা করে নিচ্ছে। শ্রোতারাও উদগ্রীব- আমার সঙ্গে হাসছেন, আমার সঙ্গেই গম্ভীর হচ্ছেন। এমন সময় হঠাৎ সব বন্ধ হয়ে গেল। একটি আলোকোজ্জ্বল কক্ষ হঠাৎই অন্ধকার হয়ে গেল। অদূরে হঠাৎ ঢাকঢোল বাজতে শুরু করল। লোকে আমার বক্তব্য শুনবে কী করে সকলের কান সেই ঢাকের বাদ্যির দিকে। কী হলো? কেউ জানে না। আমার খেই হারিয়ে গেল। সামনের সারিতে বসে শামসুর রাহমান, হাসান আজিজুল হক, কায়সুল হক- তাদের তিন জোড়া চোখের দৃষ্টি দিয়ে আমাকে খুব উৎসাহিত করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সুর গেছে কেটে। কোনোমতো দু-চারটি সাধারণ উক্তি সেরে বসে পড়লাম।’

আমি যেদিন রশীদ করীমের বক্তব্য শুনেছিলাম, সেদিন কিন্তু এমন হয়নি। অর্থাৎ সুর কেটে যায়নি তার। তিনি ঠিকঠাকমতোই মঞ্চে বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন। হ্যাঁ, রশীদ করীমকে সেই আমি প্রথম দেখি, জাতীয় কবিতা পরিষদের উৎসব মঞ্চে। টিএসসির বিশাল সেই মঞ্চে তিনি একঝাক নবীন-প্রবীন কবিদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। পরনে ছিল ছাপা শার্ট। আমি উত্তম পুরুষের লেখককে অবাক হয়ে দেখছিলাম। চেহারায় আভিজাত্যের সঙ্গে ছিল ঝকঝকে স্মার্টনেসের ছাপ। সেই তাকে আমার প্রথম দেখা এবং সুস্থ অবস্থায় শেষ দেখা। সেদিন সেই ফেব্রুয়ারির বিকেলে তিনি ছিলেন সে-অধিবেশনের  সভাপতি। একজন কথাশিল্পী হিসেবে এত বড়ো বিশাল কবিতাসভার পৌরোহিত্যের দায়িত্ব তিনি কেন লাভ করেছিলেন, তার প্রমাণ ঝলকিত হচ্ছিল কবিতার ওপর তার জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যের প্রতিটি শব্দপুঞ্জে। কিন্তু আশ্চর্য যে, তার ভঙ্গিমায় ছিল না সামান্যও পাণ্ডিত্যের গরিমা। সহজ সরল ভঙ্গিতে সরস উপস্থাপনার মাধ্যমে নিজের কথাগুলো তিনি বলছিলেন প্রাণচাঞ্চল্য ছড়িয়ে। আমি তখন বোধহয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড ইয়ার বা থার্ড ইয়ারে পড়ি।

এই কবিতা উৎসবে রশীদ করীমকে প্রথম দেখলে কী হবে, ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই, বিভিন্নভাবে সাহিত্য-সংশ্লিষ্ট হওয়ার সুবাদে রশীদ করীম সম্পর্কে আমি ভালোভাবেই অবহিত হতে থাকি। জানতে পারি যে, কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে রশীদ করীমের একটা সুন্দর অমলিন এবং গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আর এ-দুজন মানুষের সঙ্গে পরিবৃত হয়ে আছেন আরও কয়েকজন বিদগ্ধ মানুষÑ কবি আবুল হোসেন, খান সারওয়ার মুরশিদ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ইতিহাসবিদ সালাহউদ্দিন আহমেদ। দুঃখের ব্যাপার যে, এদের মধ্যে কেউ একজনও আজ জীবিত নেই। স্নিগ্ধ রুচিবান বিদগ্ধ মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে একবারেই। আজকাল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাটা ভীষণ গোত্রবদ্ধ এবং সংকীর্ণ বলয়ে চলে এসেছে। বুদ্ধিজীবীরা নিজস্ব স্বার্থে গা-ঢাকা থাকেন ব্যবসায়ী-বৃত্তে এবং দুর্জন-বেষ্টনে।

এরপর সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়েই আবুল হাসনাত সম্পাদিত বাংলাদেশের ছোটগল্প বইটির সৌজন্যে পড়া হয়ে যায় রশীদ করীমের আরেকটি গল্প ‘গাছে আটকা ঘুড়ি’। একটি সাধারণ বিষয়ও যে কত বড় একটি দার্শনিক সত্যকে প্রতীকী তাৎপর্যে তুলে ধরতে পারে, এ গল্পটি তার উদাহরণ। প্রত্যেকটি মানুষের ভেতর একটা বেসিক চাওয়া আছে, সেটা কখনও বড় হতে পারে আবারও ছোটও হতে পারে। যেমন এই গল্পের কিশোর চরিত্রটি। যাকে লেখক চারতলার একটি ফ্ল্যাট বাসা থেকে দেখছেন। খুব সকালবেলা, যখন, তখনও সূর্য ওঠেনি। পাঁচিলের কাছেই একটি আমগাছে একটি ঘুড়ি আটকে আছে। সেই ঘুড়ির ওপরই ছেলেটির চোখ। হাতে একটা লম্বা বাঁশের লগি। লগিটা ঘুড়ি পর্যন্ত পৌঁছায় ঠিকই, কিন্তু খুব লিকলিকে বলে নুয়ে নুয়ে পড়ে। তাই ছেলেটা কিছুতেই সুতো পেঁচাতে পারে  না। কিশোরটি প্রাণান্ত চেষ্টা করেও ঘুড়িটি নিতে পারেনি।

লেখকের মাধ্যমে আমরা বাসাটার চারপাশের পরিবেশ এবং লোকজন সম্পর্কেও ধারণা পাই। তাতে করে মনে হয় যে, ঢাকার নগর বিকাশের একটি চিত্রও ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে স্বাধীনতা-পরবর্তী নাগরিক নব্য ধনীশ্রেণির মানসিকতা বিভিন্নভাবে শনাক্ত হচ্ছে বর্ণনাক্রমে। দিন দশেক পর আবারও কিশোরটিকে দেখা গেল আরেকটা গাছে আটকা ঘুড়ি ধরতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিশোরটির জন্য লেখকের মায়া আগেই তৈরি হয়েছিল। সেদিন ছেলেটিকে দেখে ঘুড়ি কেনার জন্য টাকা দিতে চাইলো। ছেলেটি সামান্যও আগ্রহ দেখাল না। টাকার ওপর ছেলেটির লোভ নেই, দোকানের ঘুড়িও চায় না। সে শুধু চায় গাছে আটকা ঘুড়ি। যা অর্জনে মাঝে মধ্যে ব্যর্থও হতে হয়, আবার যখন তা অনেক কষ্টের পর সংগ্রহ করা যায়, তার আনন্দই আলাদা। বাংলা সাহিত্যেরই অন্যতম সেরা গল্প বলব ‘গাছে আটকা ঘুড়ি’কে।

যারা ছোটোগল্প লেখেন একটা নির্দিষ্ট বয়সে আসার পর বোধহয় ছোটোগল্প লেখার প্রতি স্পৃহাটা ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে। হয়তো একটু বিগ ক্যানভাসে জীবনকে ধরতে চান। মনোযোগী হন উপন্যাস এবং আত্মজীবনীর দিকে। রশীদ করীমের বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি পরিণত বয়সে উপন্যাস লেখার প্রতিই জোর দেন। যে-তিনটি গল্পের উল্লেখ করলাম, এর বাইরে বোধহয় আর মাত্র দুটি গল্প তিনি লিখেছিলেন পরিণত বয়সে- ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ এবং ‘মৃত্যু সংবাদের পর দু-ঘণ্টা’। ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ পড়ার সুযোগ হয় ২০০০ সালে। রশীদ করীম স্বহস্তে যখন তার একমাত্র গল্পের বই প্রথম প্রেম আমাকে উপহার দেন।

হ্যাঁ, যে-মানুষটি একদিন তার আলাভোলা কৈশোরে রশীদ করীমের উত্তম পুরুষ পাঠ করতে গিয়ে নাওয়া-খাওয়া ভুলে গিয়েছিল, সে-যখন নিজের জীবনে পিতৃত্বের স্বাদ এবং একই সঙ্গে প্রথম ছোটোগল্প গ্রন্থের জনক হওয়ার দুর্লভ অভিজ্ঞতা লাভ করল, সেই কালজয়ী ১৯৯৯ সালেই, সুযোগ পেল রশীদ করীমের গভীর সান্নিধ্য-লাভের। শুধু কি সান্নিধ্য-লাভ! রশীদ করীম জীবনের শেষ লেখাটিই যে লিখে গিয়েছেন আমার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থের ওপর, তাও আবার অসুস্থ অবস্থায়, যখন লিখতে গেলে তার হাত কাঁপে, মস্তিষ্ক করে ওঠে বিদ্রোহ ঘোষণা। সে গল্প আজ থাক, আজ শুধু গল্প হবে রশীদ করীমের গল্প নিয়ে।

রশীদ করীমের একমাত্র গল্পের বই প্রথম প্রেম-এর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এর প্রচ্ছদে রয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের স্কেচ। রশীদ করীমের প্রথম জীবনে লেখা কাহিনি নয় গল্পটি যখন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, সে-গল্পের হেড পেইসে ছিল এ-স্কেচ। শিল্পী অশোক কর্মকার প্রথম প্রেম-এর  প্রচ্ছদে এই স্কেচ ব্যবহার করেছেন।

প্রথম প্রেম বইতে গল্প আছে আটটি- ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’, ‘জোড়াতালি দিয়ে গল্প’, ‘মৃত্যু সংবাদের পর দু-ঘণ্টা;, ‘গাছে আটকা ঘুড়ি’, ‘প্রথম প্রেম’, ‘চা খানার গল্প’ এবং ‘কাহিনী নয়’।

প্রেম একটি লাল গোলাপ তার একই নামের একটি উপন্যাসের অনুভাবনাই বলা চলে। ড্যাম স্মার্ট গল্প। স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও যে একজন আধুনিক মানুষ অন্যের স্ত্রী নিয়ে ভাবে এবং তাকে শারীরিকভাবে পেতে চায় এ-থিমটিকেই তিনি অনন্যসাধারণ ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। গল্পটি পড়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, দেশ পত্রিকায় এ-নিয়ে একটি লেখাও লিখে ফেলেছিলেন। পাঠক, আমি আর এ-গল্পটি নিয়ে বলছি না। চলুন না, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই লেখাটিরই আরেকবার পাঠ নেওয়া যাক! একটু সংক্ষেপিত, কেমন?

‘সাদা গোলাপ আর লাল গোলাপের পাপড়িগুলো ছিঁড়ে যদি একটি লাল-সাদা গোলাপ তৈরি করা সম্ভব হতো, তা হলেই তুলনা চলতো এই মহিলার সঙ্গে। রশীদ করীমের একটি সাম্প্রতিক গল্পের কয়েকটি লাইন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত জনপদ পত্রিকার একটি সংখ্যায় পড়লাম। … প্রেম একটি লাল গোলাপ সার্থক প্রেমের গল্প। লেখার ভঙ্গিটা খুব পাকা নয়, অর্থাৎ খুব কায়দা-কানুন জানা অভিজ্ঞ লেখকের মতন নয়Ñ সেই জন্যই পুরো ঘটনাটিই সত্যি মনে হয়। বস্তুত, প্রেমের গল্পের সার্থকতার এইটাই সবচেয়ে বড় উপায় এবং এটাই পাকা কৌশল।

গল্পের নায়ক যে, নায়কও সে, অর্থাৎ আমি, যার বয়স পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ- গাড়ি চালিয়ে রোজ অফিসে যায়। প্রায় প্রতিদিনই একটি ট্র্যাফিক সিগন্যালের কাছে চোখে পড়ে আর একটি গাড়ি, যেটি চালাচ্ছেন একজন মহিলা- যার বয়েস চল্লিশের কাছাকাছি। … দুজনেই বিবাহিত, শুধুমাত্র মোটরগাড়ির জানালা দিয়ে দেখা- এদের মধ্যে প্রেম ঘটিয়ে দেওয়ার জন্য অলৌকিক কৃতিত্বের দরকার। লেখক কোনো ঘটনা ঘটাননি। নায়ক-নায়িকার সঙ্গে একদিনও বাক্য বিনিময় হয়নি পর্যন্ত। শুধু কল্পনার অগাধ সৌন্দর্য।

আর একটা কথা। দুশ্চরিত্র বা পাষণ্ডদের নিয়ে গল্প লেখার অনেক সুবিধে আছে- কারণ তাদের জীবনে অনেক ঘটনা, অনেক রোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। কিন্তু সৎ, সুস্থ মানুষদের বাইরের জীবন সাদামাটা। সুতরাং বিবাহিত একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক নিয়মিত এক গাড়ির আরোহিণীকে দেখলেও কিই-বা করতে পারেন, কিছুই না। শুধু দু-এক পলক চাহনিÑ তারপর শুধুই রঙে রসে জাল বোনা।

… আর একটা কথা, এমন কি, একদিন নায়ক দেখলেন, নায়িকার গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে। এই সব ক্ষেত্রে নায়কের আলাপ জমাবার এক স্বর্ণ-সুযোগ। নায়ক তো মোটরগাড়ির কলকব্জার ব্যাপারে সর্বজ্ঞ হতে পারত। এখানে তাও হলো না। আরও কিছু রাস্তার লোক ইতিমধ্যেই গাড়িটিকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে- তাই নায়ক আর সেদিকে এগোল না। পরে তার আফসোস হলো, গাড়িটিকে অন্তত একবার ছুঁয়ে দেখলেই বা কি ক্ষতি ছিল! আর একদিন অনেক ভরসা করে নায়ক এক দোকানের সামনে গাড়ি থামিয়ে রয়েছে। মহিলাটি দোকানের মধ্যে। এমন সময় একজন পরিচিত লোক, যার সঙ্গে দশ বছরের মধ্যে দেখা হয়নি, ঠিক এই সময়েই উপস্থিত। এই রকমই তো হয়। নায়ক লজ্জা পেয়ে গেল, সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে বিরস মুখে চলে যেতে হলো।

… নায়ক একদিন সস্ত্রীক বেরিয়েছে, অকস্মাৎ আবার সেই গাড়ি। ওই গাড়িতে সেই নারীর সঙ্গে তার স্বামী ও সন্তান। দু’পক্ষেরই দাম্পত্য সন্ধ্যা। নায়ক বা নায়িকা কেউ কারোর দিকে আজ তেমনভাবে তাকালো না। দুজনেরই মুখে ফুটে উঠল সূক্ষ্ম লজ্জাÑ দুজনেরই বুকের মধ্যে রিন-রিন করতে লাগলো একটু বেদনা। আর কিছু না। … লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রসাদগুণে গল্পটি মনে স্থায়ী দাগ রেখে যায়।’ 

এই যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রশীদ করীমের ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ পড়ে মুগ্ধ হয়ে লিখে ফেলেছিলেন একটি লেখা, তিনি নিজেও কিন্তু রশীদ করীমের ‘জোড়াতালি দিয়ে গল্প’তে প্রবলভাবেই উপস্থিত আছেন অনেকাংশ জুড়ে। সেখান থেকে সামান্য অংশ উদ্ধৃত করার লোভ কিছুতেই সংবরণ করতে পারলাম না। ‘এক সময় সুনীল বললো, জানো রশীদ করীম, আমি আমার এক উপন্যাসে তোমার এক নায়িকার নাম ব্যবহার করেছি।

আমি জানতাম। ‘প্রসন্ন পাষাণ-এর নায়িকা তিশনার নামটি সুনীল ব্যবহার করেছে। (খুব সম্ভব সারা বইয়ে ওই একটি জিনিসই তার ভালো লেগেছে!)। কিন্তু একবার নয়। আমার যদ্দুর মনে পড়ে, দুটি উপন্যাসে সে তিশনা নামটি ব্যবহার করেছে। আমি তাই বললাম।

সুনীল বললো, দুবার? বোধহয় না।

এই নিয়ে আমরা বাজি ধরলাম।’

রশীদ করীমের তিশনা নামটি শুধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায়ই বেঁচে থাকবে না, নামটি জীবন্ত সত্তা পেয়েছে রশীদ করীমের একমাত্র নাতনির নাম ধারণ করে।

প্রথম প্রেম-এর বাদবাকি তিনটি গল্প চা খানার গল্প, চিঠি, কাহিনি নয় লেখকের প্রথম জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। ছোটোগল্প মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল তার লেখক-অভিযাত্রা। তিনি কীভাবে গল্পকার হলেন সে-কথাও তুলে ধরেছেন বইয়ের ভূমিকায় চমৎকার এক গল্প ঢঙে। রশীদ করীম-অনুরাগীমাত্রই জেনে থাকবেন সে-কাহিনি, কেননা একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি তা বলেছেন। তবু যারা নতুন প্রজন্মের লেখালেখির যোগসূত্রে আছেন তাদের জন্য সেখান থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি।

লেখক যখন ক্লাস এইটের ছাত্র তখন একদিন ভিন্ন স্কুলের ছেলেদের বের করা হাতে লেখা একটি পত্রিকা দেখে ক্লাসের ফার্স্ট বয় অরুণ বালক রশীদ করীমকে বললো, আমরা ওটির চাইতেও ভালো হাতের লেখা পত্রিকা বের করবো, তুই একটা গল্প দিবি। রশীদ করীম ঘাবড়ে গিয়ে বললো, আমি জীবনে গল্প লিখেছি? অরুণ উৎসাহ জুগিয়ে বলল, সব কিছুরই একটা শুরু আছে। চেষ্টা না করলে কি না পারা যায়!

বাড়ি ফিরেই রশীদ করীম গল্প লিখতে বসে গেলেন। ‘আমার ওপর অরুণের আস্থা যে অকারণ নয়, তরতর করে পাতা চারেক লিখে তা প্রমাণ করে দিলাম। কিন্তু তারপরই গেলাম ঠেকে। আমি জানতাম, গল্পের শেষে একটি বিস্ময়-টিস্ময় থাকতে হবে। কিন্তু সেই বিস্ময়টিই তৈরি করতে পারছি না। লেখাটা পড়ে থাকল টেবিলে। শেষ করবার কথা ভুলেই গেলাম।

আর এক বাল্যসখী ছিলÑ বয়সে দু-বছরের ছোট; কিন্তু মাথায় অনেক বুদ্ধি রাখত। কাছাকাছি একটি বাড়িতেই তারা থাকত এবং মেয়েটির আর একটি গুণ ছিলÑ যে গুণটি আমাদের অনেকের জন্য বিপজ্জনক প্রমাণিত হয়েছিল- সে দেখতে ছিল সুন্দরী! সেই বয়সেই আমরা অনেকগুলো ছেলে একসঙ্গে তার প্রেমে পড়েছিলাম। কিন্তু সে নিজে যে কার- এমনকি আদৌ কারও প্রেমে পড়েছে কি না, একেবারেই বোঝা যেত না।… সেই গল্পের খাতাটি যে কি করে একদিন সেই হৃদয়হীন মেয়েটির কাছে পৌঁছালো তা জানি না। সে বলল, লেখাটি যে ফেলে রেখে দিয়েছ? আমি বললাম, ক্লাসের হাতে লেখা পত্রিকার জন্য লিখছিলাম। কী করে যে শেষ করব বুঝতে পারছি না। এবার মেয়েটি বলল, আর কীভাবে শেষ করবে! গল্পটি তো শেষ হয়েই গেছে! আমি দ্বিতীয়বার লেখাটি পড়লাম। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছে! এ-ভাবেও তো শেষ হতে পারে। সেই শুরু হলো আমার গল্প লেখা।’

এবং এই শুরুটা শুরু থেকেই খুঁজে পেয়েছিল সার্থকতা। ১৯৪২ সালে যে-বছর তিনি মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে ফলের আশায় বসে আছেন, তখনই সওগাত-এ প্রকাশ পায় আয়েশা। ‘বলা বাহুল্য সেই মেয়েটিই গল্পের নায়িকা। কবি ফররুখ আহমদ গল্পটির জন্য লেখকের পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন। কারণ, গল্পটির মধ্যে মুসলিম সমাজের খাঁটি চিত্র ছিল। কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন লেখকের অগ্রজ আবু রুশদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কে না জানে, বাংলাদেশের গল্পের আধুনিকতার যাত্রা শুরু হয়েছিল এই আবু রুশদের হাত ধরে। আবু রুশদ যেমন আয়শা গল্পটি পড়ে খুশি হয়েছিলেন সেই মেয়েটিও খুশি হয়েছিল।

এরপর সওগাত, মাসিক মোহাম্মদী, নবযুগ, ইত্তেহাদ, সাপ্তাহিক মিল্লাত, পূর্বাশা, সাপ্তাহিক মোহাম্মদী, নবযুগ পত্রপত্রিকা এবং সাময়িকী ঘিরে রশীদ করীম গল্প লিখতে থাকেন সমানে। গল্পের জন্য প্রশংসিতও হতে থাকেন বিভিন্ন মহলে। ১৯৪৫ সালের নবযুগ ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত একটি মেয়ের আত্মকাহিনি গল্পটির জন্য প্রশংসা লাভ পান বুদ্ধদেব বসু, আবু সয়ীদ আইয়ুব, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, সিগনেট প্রেসের নীলিমা দেবীর কাছ থেকে। গল্পের জন্য আরও উৎসাহ লাভ করেন চতুরঙ্গ সম্পাদক আতোয়ার রহমান, কবি আবুল হোসেন, কবি আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান, কাজী আফসার উদ্দীন আহমদের মতো জ্ঞানী-গুণীর। রেডিও থেকেও গল্প পাঠের নিমন্ত্রণও জুটেছিল। কিন্তু তার এই গল্প লেখার ইতি ঘটল ১৯৪৬ সালে। কেন? লেখকের জবানিতেই শুনুন, ‘সেই সময় সেই মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেল। আমার গল্প লেখার প্রয়োজনও ফুরালো।’

আসলেই কি তাই? শুধুই কি ওই মেয়েটির বিয়ে হওয়ার কারণে ছেদ পড়ল তার গল্প লেখায়? আমার তো মনে হয় আরও অনেক কারণ আছে। আমরা যারা গল্প লিখি, ভেতর-প্রেরণাতেই লিখি। আর প্রেরণাটা আসে কোথা থেকে? হয়তো কোনো নারী, হয়তো কোনো ঘটনা, হয়তো দেশ ও সময়ের কোনো ব্যাপার আমাদের অবচেতনকে তাড়িত করে পীড়িত করে, ক্লান্ত করে, উদ্বুদ্ধ করে, উদ্বেল করে- তারই ক্রিয়াতে আমরা গল্প লিখি, উপন্যাসের ডালি সাজাই।

১৯৪৬ সালটা ইতিহাসের এক অগ্নিগর্ভ সময়। একদিকে যেমন ইংরেজ শাসনের পতন ঘটতে যাচ্ছে, আরেকদিকে তেমনি দেশভাগের বিভাজনে শুরু হয়ে গেছে নানা ঘটনাক্রম। অস্থির একটা সময়। হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের ভয়াবহ পতনে অশান্তির আগুন চারদিকে, হচ্ছে দাঙ্গা খুন-জখম। সে-ঘটনার শিকার তো ব্যক্তি রশীদ করীমও। তাকেও তার পরিবারসমেত নিজেদের ভিটেবাড়ি ছেড়েছুড়ে চলে আসতে হয়েছে নতুন জায়গায়, নতুন পটভূমিতে।

সেই সঙ্গে নিজের জীবনের একটা পর্যায়ও তিনি অতিক্রম করতে যাচ্ছেন তখন। কী হবে কর্মজীবন, কী হবে ভবিষ্যত- ইত্যাকার ভাবনাগুলো যে কোনো মানুষকেই প্রভাবিত করে থাকে। বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতও যে তার গল্পলেখাকে তখন থামিয়ে দিয়েছিল, তাতেও বোধহয় কোনো সন্দেহ নেই। তবে গল্প লেখা থেমে গেলে কী হবে, তিনি লেখাকেই আঁকড়ে ছিলেন! কলকাতার সঞ্চিত জীবনাভিজ্ঞতাকে সাশ্রয় করে লিখে যাচ্ছিলেন অমর উপন্যাস উত্তম পুরুষ। যা ১৯৬১ সালে প্রকাশমাত্রই লাভ করে তখনকার সবচেয়ে বিখ্যাত পুরস্কার আদমজী আর বাংলা সাহিত্যে তার আসন হয়ে ওঠে পাকাপোক্ত।

এখন একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে, এই যে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি এতসব ছোটোগল্প যে লিখেছেনÑ সেসব গেল কোথায়? আমারও রশীদ করীমের একাধিক সাক্ষাৎকার গ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছিল। আমিও তাকে ঠিক এ-প্রশ্নটি করেছিলাম। রশীদ করীম জানিয়েছেন, কিছু গল্প তার প্রথমদিককার উপন্যাস উত্তম পুরুষে ঢুকে গেছে, কিছু গল্প ইচ্ছে করেই গ্রন্থভুক্ত করেননি, কিছু গল্প খুঁজেও পাওয়া যায়নি। আমাদের সৌভাগ্য যে, সে-সময়ের অন্তত তিনটি গল্প তার একমাত্র গল্পগ্রন্থ প্রথম প্রেম-এ রয়েছেÑ ‘চা-খানার গল্প’, ‘চিঠি’, ‘কাহিনি নয়’।

চা খানার গল্প প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ফাল্গুন ১৩৬০ সনের মাসিক মোহাম্মদীতে। চিঠি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৪৫ সালের সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর কোনো এক বিশেষ সংখ্যায়। কাহিনি নয় প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৪৫ সালের সাপ্তাহিক মিল্লাত-এর ঈদসংখ্যায়। একটা জিনিস ভাবলে রোমাঞ্চিত হতে হয়, এ-তিনটি গল্পের সময়কাল ইংরেজ রাজত্বকাল! সে-সময়ে কেমন ছিল কলকাতার বাঙালি মুসলিম সমাজজীবন? কেমন ছিল মানুষের জীবনযাত্রার চালচিত্র? দারুণ একটা প্রামাণ্যছবি কিন্তু মেলে তিনটি গল্পের মধ্যেই। সে-হিসেবে তিনটি গল্পই বাংলা সাহিত্যেরর দুর্লভ সম্পদ। কেননা, রশীদ করীম, কথাটা বারবারই জোর দিয়ে বলতেন, জীবনে কখনও তিনি বানোয়াট গল্প লেখেননি। চোখের সামনে যা দেখেছেন, সেই বাস্তব ঘটনাগুলোকেই রস দিয়ে রং দিয়ে শিল্পে ঘিয়েভাজা করে তোলার চেষ্টা করে গিয়েছেন শুধু।

কেন বললাম, শিল্পবিচারে এ তিনটি গল্প যেমন বাংলা-সাহিত্যের ধারাবাহিকতায় উতরে গেছে, তেমনি ইতিহাস ও সময়ের চালচিত্র হিসেবে আরও বেশি মূল্যবান। যেমন ধরুন কাহিনি নয় গল্পের কথাই, সেখানে এক জায়গায় আছে, ‘রহিমকে বারবার করে ‘ফেরাজিনি’ থেকে স্যান্ডউইচ কিনে আনতে বলেছিল কিন্তু ফাজিল ছেলেটি এনেছে ফ্লুরির অ্যান্ড ট্রিংকা থেকে। কেন বাপু ফ্লুরির অ্যান্ড ট্রিংকা তোমাকে কমিশন দেবে না কি? এই অপরাধে রহিম কানমলা খেলো।’

এই যে কলকাতা শহরে এক সময় ‘ফেরাজিনি’ নামে ফ্লুরি অ্যান্ড ট্রিংকা নামে স্যান্ডউইচের দোকান ছিল, সেসব কি এখন আছে? যদি না থেকে থাকে, তাহলে রশীদ করীমের এ-গল্পটি শব্দ-জাদুঘর হয়ে গেল। এ রকম আরও বহু দৃষ্টান্ত এবং উদাহরণ তুলে ধরা যাবে তিনটি গল্প থেকেই। তিনটি গল্পের শিল্পবিচারও আরও বিস্তৃতভাবে করার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু আমার লেখাটা এর মধ্যেই এতটাই দীর্ঘ হয়ে উঠেছে যে, রাশ টানতেই হচ্ছে- নইলে শব্দঘরের সম্পাদক মোহিত কামাল হয়তো ভ্রু কুঁচকে বলতে পারেন, হামিদই তো দেখছি এ-সংখ্যার সব পৃষ্ঠা খেয়ে ফেলল। তাই ক্ষান্ত দেওয়াই ভালো।

হামিদ কায়সার : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares