কবিতা : শামীম রফিক

প্রবন্ধ

কবিতা

শামীম রফিক

কবিতা কী বা কোথা থেকে আসে সে বিতর্ক যেমন চিরকালের, ঠিক তেমনি সবচেয়ে আদি সাহিত্য কী সে বিতর্কও অমূলক নয়। কবিতার জন্মকথা নিয়ে নানান কথকতা রয়েছে। কবিদের কল্পনা-প্রভা কোথা থেকে আসে তা কেউ জানেন না। অথচ সবচেয়ে প্রাচীন সাহিত্য প্রকরণ হচ্ছে কবিতা। শুধু বাংলা ভাষায় নয়, পৃথিবীর সকল ভাষায়-ই কবিতা হচ্ছে সবচেয়ে প্রাচীন সাহিত্য প্রকরণ। আর পদ্য হচ্ছে সাহিত্য প্রকাশের একটা মাধ্যমমাত্র। কাজেই কবিতা এবং পদ্য এক জিনিস নয়। কবিতা পদ্য ও গদ্য উভয় মাধ্যমেই রচিত হতে পারে। আধুনিক কাব্যভাষ্য ছন্দের চেয়ে বিষয়বস্তুর প্রতি বেশি সচেতন।

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) বিবিধ প্রবন্ধ (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থের ‘গীতিকাব্য’ প্রবন্ধে বলেছেন : ‘বক্তার ভাবোচ্ছ্বাসের পরিস্ফুটতামাত্র যাহার উদ্দেশ্য, সেই কাব্যই গীতিকাব্য’ (১৩৯৩ বঙ্গাব্দ : ১৮৭)। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তাঁর সোনার তরী কাব্যের ‘মানসসুন্দরী’ কবিতায় লিখেছেন : ‘কবিতা, কল্পনা-লতা’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩৯৩ বঙ্গাব্দ : ৫১)। আর রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) এর কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধ ‘কবিতার কথা’-র প্রথম দুুটি লাইন ‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি’ (২০০০ ; ১১);  কবিÑ যারা কল্পনাপ্রবণ হৃদয়ের ধারক, সেই কল্পনায় জুড়ে থাকে অভিজ্ঞতা আর চিন্তার গভীর ফল্গুধারা। তাদের এই বহমানতায় যুক্ত হয় বিগত কালের ঘটনাপ্রবাহ, সাম্প্রতিক বিষয়াবলি এবং আধুনিক জগতের নানা বর্ণিল কাব্য-বিকিরণ ও বিচ্ছুরণ। এ বিকিরণ সকলকে সমভাবে আলোকিত ও আলোড়িত করতে পারে না। শুধু যারা কল্পনাপ্রবণ হৃদয়ের অধিকারী এবং সে হৃদয়ে রয়েছে অভিজ্ঞতাপ্রসূত চেতনার নানা চাষবাস তারাই এর সাহায্যপ্রাপ্ত হয় এবং কবিতা সৃষ্টির অবকাশ পায়। এই কল্পনা কোনো অলীক কল্পনা নয়, হতে পারে বাস্তবের সাথে কল্পনার কাব্যিক-মিশ্রণ। অবশ্যই এটা Creative Imagination  এবং কবিতা সৃষ্টির জন্য অনিবার্য সত্য। ইন্দ্রিয়ভেদ্য জাগতিক সকল বিষয়ের সাথে বঞ্চিত ও অবহেলিত বিষয়ে কবিমনের কল্পনাজাত অনুভূতির কৌশলগত বহিঃপ্রকাশই কবিতা। বিচিত্রমুখী ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে সত্যের অনুসন্ধানে কবিরা যে কল্পনার বিজারণ ঘটান তাই তো কবিতা। কবিরা মূলত ব্যক্তিগত অনুভূতি বা বক্তব্যকে সার্বজনীন করার চেষ্টায় সচেষ্ট থাকেন। অবশ্য ইচ্ছে করলেই কবিতা লেখা যায় না, শুধু কষ্ট করলেও না কিন্তু সাধনার বিষয়। কবিতা আসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কিন্তু তার জন্য লাগে সাধনা ও চর্চা। কেননা কবিতার আলাদা ভাষা থাকে, ছন্দ থাকে, লয় থাকে, অলংকরণ থাকে, প্রকরণ থাকে, শব্দের প্রায়োগিক ও বহুমুখিন ব্যবহারের দক্ষতা থাকে। একটি আদর্শ কবিতায় মূলত তিনটি বিষয় থাকা বাঞ্ছনীয়, যেমন : অর্থ (Sense), ধ্বনি (Sound) ও ব্যঞ্জনা (Suggestion) ইত্যাদি। তার সাথে অন্য কোনো শিল্পের তুলনা হয় না।

কোনো কোনো সময় আপনা থেকেই, কোনো চেষ্টা ছাড়াই একটা লাইন বা আইডিয়া চলে আসে। আর তাকে কেন্দ্র করেই কবি একটি কবিতা সৃষ্টি করেন। কবিতার লাইন বা কল্পনার সৃষ্টসুধা আত্মস্থ করে রাখা দুরূহ কাজ। সে কারণেই কত অসংখ্য আইডিয়া বা লাইন অবচেতনে হারিয়ে যায় তার কোনো হিসাব নেই। সে লাইনটা কে পাঠাল বা কী করে এলো তা কবি নিজেও সর্বদা জানেন না। তবে তা কবির সচেতন মনের অবচেতন বহিঃপ্রকাশ। আবার সচেতনভাবেও তা হতে পারে। তবে অবচেতনভাবে কবিতায় প্রবেশ না করলেও প্রবেশের পর কবিরা অবচেতন হয়ে পড়েন। এটা তো ঠিক, কবিতা লিখতে গিয়ে কবি যে-বিষয় নিয়ে লেখেন তা ছাড়া অন্যসব বিষয় তার কাছে গৌণ হয়ে পড়ে, অর্থাৎ তিনি অবচেতন হয়ে পড়েন। এই অবচেতনতাই কবিতা লেখার জন্য সচেতনতা। অবচেতন মস্তিষ্ক এবং বাস্তব ঘটনাবলির সম্মিলন ঘটানোই কবির প্রধান কাজ। আর সে কাজ করতে গিয়ে তিনি চিত্রকল্প, উপমা, রঙ, ছন্দ, সমান্তরালতা, সমাসোক্তি, শব্দচয়ন-গঠনবিন্যাস, বিষয়গত ও শৈলীগত বহুমুখিনতাসহ নানা বিষয়ে কৌশলী হয়ে পড়েন। চিত্রিত করেন তাঁর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও অন্তর্ভেদী ভাবনার নান্দনিক বহুমাত্রিকতা। এ প্রসঙ্গে জুলফিকার হায়দার লেখেন :

নিজস্ব কালের গর্ভ থেকে জন্ম নিতে হয় প্রতিটি কবিকে, বারবার তাকে প্রত্যাবর্তন করতে হয় কালের কাছে, শিখে নিতে হয় সময়ের সমস্ত পরিভাষা। যুগ ও কালের বন্ধন থেকে কোনো কবিই মুক্ত নন। দেশ কাল ভূগোল ইতিহাস, সমকালীন ঘটনাপ্রবাহ কবির চেতনাকে আলোড়িত করে, পাল্টে যায় কবিতার ভাষা, প্রসঙ্গ-প্রকরণ, বদলে যায় জীবন অনুভবের মহৎ উচ্চারণ। Every age is in age of transition- তাই কালান্তরের চাপে সচেতন কবির হাতে বদলে যায় কবিতার অবয়ব, অন্তরজগৎ। তৈরি হয় কবিতার নতুন ইতিহাস।

(জুলফিকার হায়দার ২০১৩ : ১৮৬)

কবিরা যেমন কল্পনার পাখায় ভর করে অতীতে যেতে পারেন তেমনি বর্তমান ও ভবিষ্যতেও যেতে পারেন অনায়াসে। এই বিচরণ সবাই করতে পারেন না। কল্পনাই কাব্যিকতার আঁতুড়ঘর। সবাই কি কবিতা লিখতে পারেন? সব লেখাই কি কবিতা? কবিতা আসলে কী তা নিয়ে সংশয় ও ধূম্রজাল চিরকালের। যদিও এ ধূম্রজালের রহস্যভেদ করার প্রচেষ্টা বিভিন্নকালে ও বিভিন্ন দেশে কম হয়নি। কিন্তু অভিজ্ঞ ও সুচতুর কবি ছাড়া অন্যের পক্ষে সে রহস্যভেদ অবশ্যই সুকঠিন। বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে কবি যে কল্পনার বহুরঙা বৃত্ত সৃষ্টি করেন, তাতে যে কুহেলিকা সৃষ্টি হয় তা ভেদ করতে হলে সে দক্ষতা থাকা চাই। সে দক্ষতা তো সবার থাকে না, তাই কবিতাকে দুর্বোধ্য ভেবে অবহেলা করে থাকেন অনেকে।

আদি গ্রিক মহাকবি হোমার কবিতা লেখার জন্য মিউজ-এর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছেন, প্লেটো বলেছেন, এক ‘স্বর্গীয় উন্মাদনা’ এলেই কবিতা রচনা করা সম্ভব, আবার আমাদের আদিকবি বাল্মীকি সংস্কৃত সাহিত্যের প্রথম শ্লোক ‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ’ ইত্যাদি উচ্চারণ করার পরমুহূর্তেই বিস্ময়ে বলে উঠেছেন ‘কিমিদং ব্যাহৃতং ময়া।’ অর্থাৎ আমার মুখ থেকে এই যে অপূর্ব বস্তু প্রকাশিত হলো, সেটি কী! (হীরেন চট্টোপাধ্যায় ১৪১৬ : ৩৩)

প্লেটো ভাবতেন সব বড় কবিই দৈবের অধীন। পাশ্চাত্য কবিরাও কবিতাকে মনে করতেন উচ্চতর কোনো স্থান থেকে উৎসারিত অলৌকিক বাণী। ওয়ার্ডসওয়ার্থ (১৭৭০-১৮৫০) কবিতাকে মনে করতেন, ‘ÔThe breath and finer spirit of all knowledge’, শেলীর (১৭৯২-১৮২২) মতে, ‘Poetry is indeed something devine’, আর এমারসন (১৮০৩-১৮৮২) বলেছেন, ‘Poetry is …God’s wine’. জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘কবিতা প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধে লিখেছেন :

মহাবিশ্বলোকের ইশারার থেকে উৎসারিত সময়চেতনা আমার কাব্যে একটি সঙ্গতিসাধক অপরিহার্য সত্যের মতো; কবিতা লিখবার পথে কিছুদূর অগ্রসর হয়েই এই আমি বুঝেছি, গ্রহণ করেছি। এর থেকে বিচ্যুতির কোনো মানে নেই আমার কাছে। তবে সময়চেতনার নতুন মূলে আবিষ্কৃত হতে পারে।

(জীবনানন্দ দাশ ২০০০ : ৪১)

কবিতা কীভাবে জন্ম হয়, সে প্রসঙ্গে নব্য হেগেলীয় ইতালীয় দার্শনিক বেনেদেত্তো ক্রোচে কবিতার এই রূপান্তর-প্রক্রিয়াকে এভাবে দেখেছেন :

‘Poetic idealisation is not a frivolous embellishment, but a profound penetration in virtue of which we pass from troublous emotion to the serenity of contemplation. ’                                                                                                              

(কুন্তল চট্টোপাধ্যায় ১৯৯৫ : ২১)

হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪) মনে করেন : ‘কবিতা হচ্ছে সৌন্দর্যের বিরামহীন বিস্তার, ইন্দ্রিয়ের অনন্ত আলোড়ন, জীবাশ্মের মতো মহর্ষির প্রাজ্ঞতা, ধ্যানের অবিচল উৎসারণ, জীবনের আদিম উজ্জ্বল উৎসব, রূপক, প্রতীক, চিত্রকল্পের নির্বাণহীন অঙ্গার’। (১৯৭৬ : ২১)

কবিতা হলো সত্য-সন্ধানী এক বহুমাত্রিক যুদ্ধক্ষেত্র, বিপ্লবের প্ল্যাটফর্ম। যেখানে সর্বদা সচেতনভাবে অবচেতনের সাথে যুদ্ধ করা যায় না। যুদ্ধ করতে হয় কাব্যিক ছলা-কলায় ও কৌশলে। কবিতা হয়ে ওঠে মিছিলের স্লোগান, বিপ্লবের মন্ত্র, গানের অন্তরা, হৃদয়ের ছান্দিক প্রকাশ। স্বপ্নের মৌমাছিগুলো সারাক্ষণ গুনগুন করে আর সত্য সন্ধানে চারদিকে নিরলস ঘুরে বেড়ায়। যা সত্য তাই কবিতা। ধর্ষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন, প্রতারণা, দরিদ্রতা উপেক্ষা করেও প্রেমের মন্ত্রে কবিতাই প্রাণ। বিপ্লবীর আত্মগোপন থেকে শিহরিত ভালোবাসার গোপন অভিসার সর্বত্র প্রেমের অবস্থান। কবিতা মূর্তিমান ও প্রবল প্রাণময়। তার অবয়ব আছে, মন আছে, স্বপ্ন আছে, শক্তি আছে, রূপ-মাধুরী আছে। সে সময় থেকে সময়ান্তে, দেশ থেকে দেশান্তে ঘুরে বেড়ায় অবলীলায়। যেখানেই অবিচার অনিয়ম সেখানেই কবিতা প্রবল প্রাণময়। প্রয়োজনে সে যেমন অগ্নিরূপ ধারণ করতে পারে, তেমনি প্রেমময়তার আবেশ ছড়াতেও পটীয়সী। কবিতা শুধু কবি নয়, পাঠক-শ্রোতাকেও আলোড়িত ও শিহরিত করে। কবিতা ঠিক কি বস্তু, এ প্রসঙ্গে সন্তু অগাস্টাইন বলেছেন, If not asked, I know : If you ask me, I know not. (কুন্তল চট্টোপাধ্যায় ১৯৯৫ : ২৩)

কবিতা হলো প্রবল অনুভূতিপ্রবণ এক রঙিন দুঃস্বপ্ন, নীলবর্ণ অসুখÑ যাতে কবিমাত্রই আক্রান্ত। নতুবা বুড়ো বটের ডালে ঝুলে পড়া কবিদের আইডিয়া আর বোধ বিবেচনামণ্ডিত উপদেশবাণী। নিঃসন্দেহে কবিতা জীবনকেন্দ্রিক। কিন্তু তার প্রকাশসৌন্দর্য নির্ভর করে কল্পনাশক্তির দৃঢ়তায় নির্মিত চিত্রকল্প এবং উপমার অপরূপ সন্নিবেশের ওপর। যদিও তা কবির দক্ষতায় আরও রহস্যময় ও কুহেলিকাময় হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে নান্দনিক ও কাব্যিক সৌন্দর্যমণ্ডিত। সত্য প্রতিষ্ঠাই কবিতার উদ্দেশ্য এবং কবি হলেন তার পেছনের নীরব প্রকৌশলী।

এ দেশের কবিদের হাতে এ যাবত যে কবিতা রচিত হয়েছে, তার মানবিক পটভূমি, মননশীলতা এবং চিন্তা-চেতনা কোন ধারায় প্রবাহিত, কবিতার তুল্যমূল্য বিচারে কি তার ভবিষ্যৎ, তার যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। কবি যে কবিতা রচনা করেছেন, তার ঐতিহ্য সামাজিক এবং রাষ্ট্রিক চেতনা, চেতনা জগতে তার সম্পৃক্তি এবং প্রবহমানতা বিশ্লেষণধর্মী সমালোচনার মাধ্যমে তুলে না ধরলে আমরা কবিতার স্থিতি, অবস্থা, অগ্রযাত্রা বা প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং তার শিল্পোত্তীর্ণ মানদণ্ডের বিচার করতে পারব না।

(মুনীর সিরাজ ২০০৩ : ১৭)

ভিকটোরীয় যুগের কবি-সমালোচক ম্যাথু আরনল্ডের বিবেচনায় কবিতা হলো, ‘জীবনের সমালোচনা’-‘Poetry is at bottom a criticism of life under the conditions fixed for such a criticism by the laws of poetic truth and poetic beauty’.

(কুন্তল চট্টোপাধ্যায় ১৯৯৫ : ২২)

ছোট কন্যার আঁকিবুঁকি থেকে বউয়ের চোখ রাঙানি, কর্পোরেট রক্তারক্তির সার্বক্ষণিক লালচোখ ও টার্গেট নামক পাগলাঘোড়া, পদোন্নতির নান্দনিক মুলা, পুঁজিবাদী লিপ্সা, দুরন্ত উপহাস, ঘৃণা, কী পেলাম, কী পাইনি, কীসের জন্য আকুলিবিকুলি, নির্ভয়ে আঙুল উঁচিয়ে আলতু আলতু করে সব বলা যায় কবিতায়। আসলে পরিচিত হাতের আদরে ভেসে বেড়ানো শব্দরাজিই কবিতা। কবিতায় রফবধ এবং অপঃঁধষরঃু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দু’য়ের সমন্বয় না হলে কবিতা শুধু অধরাই থেকে যায়। শব্দচয়ন ও ব্যবহারেও থাকতে হয় সুগভীর দক্ষতা। নন্দনবাদী লেখক ও কবি এডগার অ্যালান পো কবিতা বলতে বুঝেছিলেন : ‘সৌন্দর্যের ছন্দিত সৃজন’ (the rhythmic creation of beauty)। (কুন্তল চট্টোপাধ্যায় ১৯৯৫ : ২২)

কবিতা হলো : ফুল-ফল, প্রাচীন গুহা, রূপকথার রাজকন্যা, প্রেমিকার অনুযোগ-দায়িত্ববোধ, সুঠাম সৈনিক, মনি-মুক্তার ভাণ্ডার, বিবেকবান বাউল, নিপীড়িত পথিক, চঞ্চল প্রজাপতি, ঝমঝম বৃষ্টি, ঝর্ণার কলতান, পাখিদের কোলাহল, মায়াবী আকাশ, রাত্রির নীরবতা, কুয়াশাঢাকা রাত্রির নীরবতা, শাসকের অবিচার, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, হত্যা, শিশু নির্যাতন, অবহেলিত প্রবীণ, ধর্মীয় হানাহানিÑ সবকিছু। কবিতার বিষয় নয় এমন কিছু কি আছে পৃথিবীতে!

মার্কসীয় দর্শনের একটি নীতি হচ্ছে- কোনো কিছুই স্থির শাশ্বত নয়। অতীতে যা ছিল বর্তমানে তা নেই, বর্তমানে যা আছে ভবিষ্যতে তা থাকবে না। চেতনা ও সংবেদনশীলতাও তাই অস্থির। হেরাক্লিটাসের একটি অসাধারণ উক্তি আছে, ‘এই বিশ্বপ্রকৃতি এতই পরিবর্তনশীল যে, একই নদীতে কেউ দুবার স্নান করতে পারে না; প্রথম ও দ্বিতীয় বার স্নান করার মধ্যে নদী এক নেই, বদলে গেছে।’ এ হলো গতি। রূপান্তরের মাধ্যমে যার দ্যোতনা, গতি বস্তুর থেকে চেতনায়, চেতনা থেকে মননে সংক্রমিত হয়। কবি চেতনাকে শব্দের ভর তথা ধ্বনির মধ্যে সংস্থিত করেন। এ সংস্থানটি যে লক্ষ্যে তিনি করেন তা হচ্ছে তাঁর দর্শন। কবির লক্ষ্য ও চেতনা যদি পরস্পরকে ভাঁজ করতে পারে তবেই তৈরি হবে গতি। আর কবির ক্ষমতাটি ঠিক এখানে। (গাজী রফিক ২০১৩ : ৩৪৪)

এ ছাড়াও ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোল্রিজ, শেলি, কিটস প্রমুখ কবি কবিতা সম্পর্কে নানা সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। আসলে কবিতা হলো এক আশ্চর্যদীপ্তি, যার মহিমায় উৎকীর্ণ হয়ে ধূলিকণাও অগ্নিরূপ ধারণ করতে পারে।

কবিতার রহস্যভেদ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সোনারতরী কাব্যের ‘পুরস্কার’ কবিতায় লেখেন :

অন্তর হতে আহরি বচন

আনন্দলোক করি বিরচন

গীতরসধারা করি সিঞ্চন

সংসার-ধূলিজালে।

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩৯৩ বঙ্গাব্দ: ৯৫)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যের যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন তাকে প্রায় কবিতার সংজ্ঞা হিসেবেই অভিহিত করা যায়। তিনি সাহিত্য গ্রন্থের ‘সাহিত্যের তাৎপর্য’ প্রবন্ধে বলেছেন : ‘বস্তুত বহিঃপ্রকৃতি এবং মানবচরিত্র মানুষের হৃদয়ের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে সংগীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষারচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।’

(১৩৯৪ বঙ্গাব্দ : ৬২১)

কবি হেলাল হাফিজ তাঁর যে জলে আগুন জ্বলে কাব্যগ্রন্থের ‘কবি ও কবিতা’য় লিখেছেন :

কবির জীবন খেয়ে জীবন ধারণ করে

কবিতা এমন এক পিতৃঘাতী শব্দের শরীর,

কবি তবু সযত্নে কবিতাকে লালন করেন,

যেমন যত্নে রাখে তীর

জনে-শুনে সব জল ভয়াল নদীর।

(হেলাল হাফিজ ১৯৮৬ : ৪১)

কল্পনা ও চিন্তা যখন সমন্বিত হয়ে মহাকালকে একই রেখায় আবদ্ধ করে তখনই তা কবিতা হয়ে ওঠে। কবি বোধের স্রষ্টা, আর কবিতা হলো রিয়েলিটির নিরিখে বোধের সিনক্রোনাইজ। কবিতা কোনো শর্তাধীন ঘটনাপ্রবাহের স্নায়বিক সমাবেশ নয়, মুক্তপ্রাণ চিন্তার ঈশ্বর। অথবা অলৌকিক কোনো বিকিরণ নয়। বরং বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ চেতনাপ্রবাহের বিকিরণকে বহুরঙা রংধনু বানিয়ে বিচিত্র আকাশের গায়ে শর্তহীনভাবে লেপে দেন একজন কবি মানবিক কল্যাণবোধের নিমিত্তে স্বপ্রণোদিত হয়ে। কবিমস্তিষ্ক সদা স্বপ্নগ্রস্ত কিন্তু বাস্তবতা বিবর্জিত নয়। বাস্তবতাকে আত্মস্থ করে বহুমাত্রিক নিয়মতান্ত্রিকতায় স্বপ্নের মিশেল ঘটিয়ে সৃষ্টি করেন এক বর্ণিল প্রভা। নানা ঘটনাপ্রবাহের সংস্পর্শে এসে কবির মনে উঁকি দেয় নানা সিনট্যাক্স, রূপকল্প এবং চিন্তা ও স্বপ্নের ধ্রুপদী কম্পাঙ্ক।

একজন আধুনিক কবির সংজ্ঞা অনুযায়ী : ‘কবিতা হচ্ছে মুহূর্তের অগ্নি, তন্ময় জন্মক্ষণের দ্রুত বিদ্যুৎ, ক্ষণকালীন সমকালীন অস্থির ভাষ্য, স্বপ্নের ভগ্নাংশ, ভাবনার আকস্মিক ফেটে পড়া, শূন্যে জ্বলা হঠাৎ আলোর ঝলকানি।’

(মুনীর সিরাজ ২০০৩ : ২১)

কবিতা সময়ের সাথে সাথে বাঁক পরিবর্তন করে হয়ে ওঠে সাম্প্রতিক। যেমন : ১৯০৫-এর প্রেক্ষাপট, ১৯৪৭-এর প্রেক্ষাপট, ১৯৫২-এর প্রেক্ষাপট, ১৯৬৬-এর প্রেক্ষাপট, ১৯৬৯-এর প্রেক্ষাপট, ১৯৭১-এর প্রেক্ষাপট, ১৯৭৪-এর প্রেক্ষাপট, ১৯৭৬-এর প্রেক্ষাপট, ১৯৮৪-এর প্রেক্ষাপট, ১৯৯০-এর প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এক রকম নয়। কাজেই কবিতাও পেয়েছে ভিন্নতর অভিজ্ঞতা, চেতনা ও বাঁকের সন্ধান। কবিতাকে কবিতার মতোই থাকতে দিতে হয়, স্বাধীন, পবিত্র আর অস্পষ্ট। প্রয়োজনে সে যেমন মমতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে, তেমনি প্রয়োজনে সে হয়ে উঠতে পারে হাল ধরার জন্য বলিষ্ঠ কব্জির অধিকারী, আবার প্রয়োজনে হয়ে উঠতে পারে পাহাড়ে ওঠার জন্য সাহসী শেরপা।      

তথ্যপঞ্জি:

১. কুন্তল চট্টোপাধ্যায় (১৯৯৫), সাহিত্যের রূপ-রীতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, রত্নাবলী, কলকাতা

২. গাজী রফিক (২০১৩), ‘ভূমিকা : রূপান্তর আশি দশকের কবিতা’, নান্দীপাঠ, সংখ্যা-৫, (সম্পাদক : সাজ্জাদ আরেফিন), ফেব্রুয়ারি, ঢাকা

৩.           জীবনানন্দ দাশ (২০০০), জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধসমগ্র, (সম্পাদক : দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়), গতিধারা, ঢাকা

৪.           জুলফিকার হায়দার (২০১৩), ‘ষাটের কবিতা : সন্ত্রস্ত সময়ের শিল্প’, নান্দীপাঠ, (সম্পাদক : সাজ্জাদ আরেফিন), ফেব্রুয়ারি, ঢাকা

৫.           বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৩৯৩ বঙ্গাব্দ), বঙ্কিম রচনাবলী সাহিত্য সমগ্র, (সম্পাদক : বিষ্ণু বসু), তুলি-কলম, কলকাতা

৬.           হেলাল হাফিজ (১৯৮৬), যে জলে আগুন জ্বলে , দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা

৭.           হীরেন চট্টোপাধ্যায় (১৪১৬), সাহিত্য প্রকরণ, বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ, কলকাতা

৮.           হুমায়ুন আজাদ (১৯৭৬), লাল নীল দীপাবলি, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা

৯.           মুনীর সিরাজ (২০০৩), ‘কবিতা এবং সমাজ-চেতনা’, অরিত্র, ঢাকা

১০.         রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৩৯৩ বঙ্গাব্দ), রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড), বিশ্বভারতী, কলিকাতা

                (১৩৯৪ বঙ্গাব্দ), রবীন্দ্র-রচনাবলী (চতুর্থ খণ্ড), বিশ্বভারতী, কলিকাতা

১১.         দীপ্তি ত্রিপাঠী (২০১১) পুনর্মুদ্রণ, আধুনিক বাংলা কাব্য পরিচয়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা

শামীম রফিক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares