প্রচ্ছদ রচনা

h1

প্রচ্ছদ রচনা

শুভতালগ্ন উপন্যাস : ঘরজামাই

হরিশংকর জলদাস

 

‘শ্বশুড় মধুর হাঁড়ি, দুদিন থেকে তিন দিন হলে ঝাঁটার বাড়ি’- এই কথাটির বেশ প্রচলন ছিল আমাদের সমাজে। ছেলেবেলায় আকসার শুনেছি মা-পিসি-দিদিমাদের মুখে। বিশেষ করে সুদিনে এই কথাটি খুব শোনা যেত। সুদিন মানে বোশেখ-জষ্টি। নদী-নালা-খাল-বিল এই সময়ে শুকিয়ে যেত। সমুদ্রও তখন নিষ্ফলা। কূলের জলে লবণ বেড়ে যেত বলে মাছগুলো গহিন গাঙে পাড়ি জমাত। সকল মৎস্যাধার তখন জলশস্য শূন্য। ঘরে ঘরে অভাব ঢুকে যেত। জেলেরা তখন দিশেহারা। জামাইরা তখন চালাকির আশ্রয় নিত। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে উঠত। শ্বশুরপক্ষেরও তো একই অবস্থা। তার পরও জামাই বলে কথা! মুখে হাসি ঝুলিয়ে জামাইকুলকে স্বাগত জানাত শ্বশুরপক্ষ। এক দুইদিনে নিজেদের জমানো টাকা শেষ হয়ে যেত। তারপর ধারকর্য। দিনকয়েক গড়িয়ে যায়, তারপরও জামাই সপরিবারে যাওয়ার নাম করে না। তরকারির অবস্থাও গরিবিহালে নেমে আসে; জামাই দেখেও না দেখার ভান করে। শ্বশুর-পরিবারে কী অবস্থা দাঁড়ায়, বুঝুন। ঠিক এরকম সংকটকালেই বোধহয় জেলেসমাজে ওই মারাত্মক ছড়াটি তৈরি হয়েছে। কখন হয়েছে জানি না। তবে এখনও ছড়াটি প্রচলিত, সতেজে ব্যবহৃত প্রচলিত।

তিনদিনের ঠেলা সইতে পারে না শ্বশুরবাড়ি, তাতে কেউ ঘরজামাই হয়ে এলে ঘরজামাইয়ের কী দুরবস্থা দাঁড়ায়, সহজে অনুমেয়।

ব্যক্তিগত একটা প্রসঙ্গের অবতারণা করি। ঘরজামাই না হয়েও ঘরজামাইয়ের যাতনা ভোগ করতে হয়েছে আমাকে। বিয়ের ৩৬ বছর পরও এই ঘরজামাই-যন্ত্রণা ভোগ করে যাচ্ছি আমি। শ্বশুর গোবিন্দচন্দ্র দাশের আবেগের খেসারত দিয়ে যাচ্ছি এই ৬৪ বছর বয়সেও। কাহিনিটি এরকম।

করতাম স্কুলে হেডমাস্টারি। এমএ পাস করেছি তখন। পাশের গ্রাম দক্ষিণ হালিশহরে একটা হাইস্কুল হবে। একজন হেডমাস্টার দরকার। বেতন ৪০০ টাকা। অত কম বেতনে কে চাকরি করবে? কেন হরিশংকর জলদাস! আমার এক প্রাক্তন হেডস্যারের মধ্যস্থতায় চাকরিতে যোগদান করলাম। চাকরিটা পেয়েই আমি যেন স্বর্গ পেলাম হাতে। আমার অন্যান্য সহপাঠীরা পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে নানা সরকারি কাজে যোগদান করে দিব্যি জীবনযাপন করে যাচ্ছে তখন। ওসবের খোঁজ রাখি না আমি। মনে মনে ভাবি- হেডমাস্টারি ক-ত উচ্চ মার্গীয় পদ! হোক না বেতন চারশ টাকা।

এই সময় বাবা যুধিষ্ঠির আমাকে বিয়ে করাবার জন্য উতলা হয়ে উঠল। বয়স আমার তখন ২৫/২৬। কনে খুঁজতে বেরোল বাবা। এ-গ্রাম ও-গ্রাম, এ-পাড়া ও-পাড়া খুঁজতে খুঁজতে নাভিশ্বাস বাবার। বাবা আমার গোঁ ধরেছে, স্বজাতের মেয়ে ছাড়া ছেলেকে বিয়ে করাবে না। স্বজাত মানে জেলেসম্প্রদায়। কিন্তু জেলেসম্প্রদায়ে বাবা মেয়ে পাবে কোথায়? এই সমাজে যে মেয়েদের বাল্যবিয়ের প্রচলন। রবীন্দ্রপরিবারে যেমন কুমারী থাকতে থাকতে বউ আনা হতো বা মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো, জেলেসমাজেও সেই প্রথা প্রচলিত। দশ থেকে তেরোর মধ্যে মেয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় এই সমাজে। সেই অবস্থায় ২৬ বছরের ধাড়ি হরিশংকরের জন্য মেয়ে পাওয়া দায় হয়ে গেল।

কিন্তু যুধিষ্ঠির জলদাস নাছোড়। শিক্ষিত মেয়ে ঘরে আনবে এবং তাকে জেলেসমাজেরও হতে হবে। ওই যে বলে না-একবার না পারিলে দেখ শতবার, নাছোড় যুধিষ্ঠিরও শতগ্রাম বিছারি মেয়ে একটার সন্ধান পেল। চট্টগ্রাম শহরে গুর্খা ডাক্তার লেইন নামে একটা জায়গা আছে। তো ওই গুর্খা ডাক্তার লেইনের গোবিন্দচন্দ্র দাশ তাঁর মেয়েকে বাল্যবয়সে বিয়ে না দিয়ে কলেজ পর্যন্ত পড়াচ্ছেন। মেয়েকে বিএ পাস করিয়ে বিয়ে দেবেন এই তাঁর বাসনা। উল্লেখ্য, শহরাঞ্চলের কৈবর্তরা তাদের পদবি জলদাস না লিখে ‘দাশ’ লিখে। ‘দাশ’-এ যে বর্ণহিন্দু বর্ণহিন্দু গন্ধ! গোবিন্দ দাশ ব্রিটিশ যুগের মেট্রিক। একটা সিনেমা হলের ক্যাসিয়ার। গায়ে-পোশাকে আধুনিকতা চকচক করে।

আমার অনাধুনিক বাপকে দেখে তিনি এক ঝটকায় উড়িয়ে দিলেন। বাবা গোবিন্দবাবুর বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার আগে খোঁজ পাত্তা করেছিলেন। গোবিন্দবাবু যে উন্নাসিক প্রকৃতির, তারও সন্ধান পেয়ে গিয়েছিল বাবা। যথাসম্ভব ভালো বেশভূষা নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গোবিন্দবাবুর চোখে যে ওসব গাঁইয়াদের ড্রেস। আমার এক দূর-সম্পর্কের পিসিকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল বাবা। গোবিন্দাবাবুর ভাবসাব দেখে বাবা তো মাথা নিচু করে বসে আছে। পিসি কিন্তু নাছোড়। তাঁর তূণ থেকে শেষ অস্ত্রটা বের করলেন পিসি। বললেন, ছেলে কিন্তু এমএ পাস। শুধু এমএ পাস নয় বিএবিএ…। অ জুষ্টি বল না, হরিশংকর বিএ কী যেন!

বাবা বলল, বিএ অনার্স, এমএ।

গোবিন্দবাবুর মুখ দিয়ে ‘ফুঃ’ জাতীয় একটা শব্দ বেরোল। উপহাসের ভঙ্গিতে বললেন, বিএ অনার্স এমএ! জেলেসমাজে!! চালাকিটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না? কৈবর্তসমাজে যেখানে আইএ পাস ছেলে নাই, সেখানে বিএ অনার্স এমএ!

এবার বাবা কোমরে জোর খুঁজে পেল। বললো, হরিশংকর অসুরকুলে প্রহ্লাদ। আমি গরিব বটে, কিন্তু মিথ্যে বলি না। নামের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করবার জন্য কিনা জানি না, বাবা পুরাণ-মহাভারত বেশি বেশি পড়তো। তাই কথায় কথায় পৌরাণিক অভিজ্ঞান হাজির করতো। গোবিন্দবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, প্রমাণ কী?

বাবা বলল, পাসের অভিজ্ঞান আছে। শকুন্তলা যেমন দুষ্মন্তের দরবারে আংটির অভিজ্ঞান দেখিয়ে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছিল, যুধিষ্ঠিরও তেমনি ছেলের বিএএমএ পাসের সার্টিফিকেট দেখিয়ে ছেলেকে বিদ্বান বলে প্রমাণ করতে চাইল। গোবিন্দবাবু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেছিলেন, নিয়ে আসেন একদিন। দেখি- নকল না খাঁটি।

বাবা আমাকে জানাতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিলাম আমি। বাবাকে বললাম, বাবা, আমি কি অন্য মেয়ের সঙ্গে পালিয়ে যাচ্ছি। তোমাকে কি কলঙ্কসাগরে ডুববার ব্যবস্থা করছি? সার্টিফিকেট দেখিয়ে বিয়ে করব!

বাবা সেবেলা চুপ মেরে থেকেছিল। গোবিন্দবাবু সস্ত্রীক একদিন পতেঙ্গা গাঁয়ে আমাকে দেখতে এসেছিলেন। আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, আমার বাবা আমার অজান্তে আমার পাসের সার্টিফিকেটগুলো গোবিন্দবাবুকে দেখিয়ে এসেছিল।

আমাদের গরিবিহাল দেখেও গোবিন্দবাবু তার একমাত্র কলেজপড়ুয়া মেয়েকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলেন। হয়তো আমাকে দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন, যেমন করে মুগ্ধ হয়েছিল শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ঘরজামাই উপন্যাসের শ্বশুর হরপ্রসন্ন জামাই বিষ্ণুপদকে দেখে। যাক ওই প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।

আমার ভাবি-স্ত্রীকে আমি চোখে দেখিনি। বাবার ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে নির্ভার ছিলাম। তখন আমার ধ্যানজ্ঞান দক্ষিণ হালিশহর স্কুলের হেডমাস্টারি। বাপের ওপর আস্থা ছিল আমার। আমি ঠকব না। কনে দেখার আসরে দেখলাম- সুনীতার চেয়ে সুনীতার চুল অনেক লম্বা।

যাক, বিয়ে হয়ে গেল। এবং বছরখানেকের মধ্যে আমার হেডমাস্টারিও গেল। স্কুলটা তখন বেশ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। গভর্নিংবডির মানুষরা মনে করল- স্কুল তো দাঁড়িয়ে গেছে, এখন নিচুজাতের একটা ছেলেকে স্কুলের হেডমাস্টার রাখবার প্রয়োজন নেই। জেলের ছেলে হরিশংকর দক্ষিণ হালিশহর হাইস্কুলের হেডমাস্টার থাকলে স্কুলটা আর জাতে উঠতে পারবে না।

প্রসঙ্গটি কানে আসায় রিজাইন দিয়েছিলাম আমি। তারপর পথে পথে ঘোরা। বাড়িবাড়ি টিউশনি করা। ঘরে ঢুকতে লজ্জা করে, শিক্ষিত বউটি যে মুখটা বড্ড করুণ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

শ্বশুরেরও তখন মাথায় হাত। কী ভুলটা না করেছেন তিনি। সার্টিফিকেটে ভুলেছেন। এই ভুলের জন্য তার এত আদরের মেয়েটিরে দুবেলার ভাতের টান পড়ে, কাপড়চোপড়ও জীর্ণতার দিকে। হায় হায় কী করলাম! কী ভুলটাই না করলাম!

আমি সুনীতার দিকে তাকিয়ে থাকি। সুনীতা আমাকে আশ্বস্ত করে-একদিন মেঘ কেটে যাবে। সূর্যের আলো দেখতে পাবে তুমি। ভেঙে পড়ো না।

একদিন শ্বশুর সূর্য-আলোর বার্তা নিয়ে এলেন আমাদের বাড়িতে। হাতে পুরনো পেপারের একটি পৃষ্ঠা। তাতে একটা বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে সরকারি কলেজের শিক্ষক নিয়োগের তথ্য।

হতাশ সুরে শ্বশুর বললেন, দেখ কিছু একটা হয় কিনা!

কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলাম-সরকারি কলেজে লেকচারার নিয়োগ দেওয়া হবে। বয়স ২৭ পুরায়নি যাদের, শুধু তারাই দরখাস্ত করতে পারবে। হিসেব করে দেখলাম ২৭ পুরাতে তখনও ১১ দিন বাকি আমার।

দিলাম দরখাস্ত, পরীক্ষাও পাস করলাম। ১৯৮২ সালের বিসিএস। নিয়োগ পেলাম নীলফামারি সরকারি কলেজে।

মা-বাবা তো বিসিএস টিসিএস বোঝে না। বোঝে, হরিশংকর একটা চাকরি পেয়েছে, মস্তবড় স্কুলের চাকরি।

শ্বশুর বিসিএসের মর্মার্থ বোঝেন। তিনি ভীষণভাবে আবেগায়িত হলেন। তার এবং তার মেয়ের একটা ইজ্জতের জায়গা তৈরি হয়েছে। পরম যত্নে তিনি একটা সাইনবোর্ড লিখালেন। তাতে লেখা- হরিশংকর জলদাস বিএ (অনার্স) এমএ, বিসিএস। প্রভাষক, নীলফামারি সরকারি কলেজ। লিখিয়ে তিনি ক্ষান্ত হলেন না। গলির মুখে লাইটপোস্টের সবচাইতে উঁচু গায়ে সাইনবোর্ডটি টাঙিয়ে দিলেন। এই সাইনবোর্ডটি আমার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াল।

আঠারো মাস পরে আমি নীলফামারি থেকে ট্রান্সফার নিয়ে চট্টগ্রামে এলাম। চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে আমার পোস্টিং। পতেঙ্গা থেকে আসা যাওয়া করে কলেজ করি।

কিন্তু শহুরে দুচারজন বন্ধুবান্ধব জিজ্ঞেস করা শুরু করল, বাসা তো গুর্খা ডাক্তার লেইনে হরিশংকরবাবু?

আমি বললাম, কেন? আমার বাসা গুর্খা ডাক্তার লেইনে হতে যাবে কেন? পতেঙ্গায় আমার পৈতৃক বাড়ি। ওখানেই তো থাকি আমি। বন্ধুরা সহাস্যে বলল, না গলির মুখে আপনার নামে ইয়া বড় একটা সাইনবোর্ড দেখলাম তো! ভাবলাম-গোবিন্দবাবুর একমাত্র কন্যার জামাতা আপনি, হয়তো শ্বশুরবাড়িতেই এসে উঠেছেন। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো শেষের দিকে ওরা যোগ করে, ওদেরও তো অন্যকোনো ছেলেমেয়ে নাই। বুড়োবয়সে কন্যা আর জামাতা হাতের কাছে থাকলে কতই না সুবিধা।

ওরা যে ইঙ্গিতে আমাকে ঘরজামাই বলছে, সেটা বোঝার ক্ষমতা তো আমার ছিল। ওদেরকে আমার শ্বশুরের আবেগায়িত কীর্তি মানে সাইনবোর্ড টাঙানো-রহস্য খুলে বলি। ওরা মৃদু হেসে মাথা নাড়ে।

আমার জীবনে এই যে বিড়ম্বনা শুরু হলো, এখন অবধি তার সমাপ্তি ঘটেনি। অথচ আমি শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে আসা ছাড়া, অন্যান্য জামাইরা যেভাবে আসে, স্থায়ীভাবে কখনও থাকিনি। তারপরও ঘরজামাইয়ের কলঙ্ক কাবুলিওয়ালার মতো আমাকে এখনও তাড়িয়ে বেড়ায়।

h2এই তাড়িয়ে বেড়ানোর ব্যাপারটি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ঘরজামাই উপন্যাসের বিষ্ণুপদের জীবনেও ঘটেছিল। বাপের বাড়িতে হেলা-অবহেলার জীবন বিষ্ণুপদের। বাপের বড় সংসার, অনেক ছেলেপুলে। গ্যাঁড়াপোতার বাড়িতে বিষ্ণুপদের কানাকড়ি দাম নেই। আয় রোজগারের দিকেও যে তার মন আছে, এমন নয়। চেহারাখানা খুবই ভালো। শরীরটাও গাট্টাগোট্টা। তারপরও জোয়ান শক্তিমান বিষ্ণুপদ কোনো কাজকাম করে না। অকম্মার ঢেঁকিকে কে আর পছন্দ করে। হাজার বাপ-ভাই হলেও। মায়ের টান বিষ্ণুপদের দিকে। কিন্তু বাপ-ভাইয়ের লাল চোখের সামনে স্নেহ-বাৎসল্য দেখাতে পারে না মা। এদিকে আবার বিয়ে করার জন্য বিষ্ণুপদের মনে হাহাকার। দুবেলা দুমুঠো ভাত দেয়া না, তা-য় আবার বিয়ে!

কিন্তু কুসুমপুরের হরপ্রসন্নের চোখ পড়ল বিষ্ণুপদের ওপর। হরপ্রসন্ন বনেদি কৃষক। একমাত্র মেয়ে পাপিয়ার জন্য ঘরজামাই খুঁজছে হরপ্রসন্ন। প্রস্তাব শুনে বিষ্ণুপদের বাবা-ভাইবোনেরা ক্ষেপে গেল। তারা বিষ্ণুপদকে বলল, ‘ঘরজামাই থাকা মানে জানিস? শ্বশুরবাড়িতে মাথা উঁচু করে থাকতে পারবি ভেবেছিস? তারা তোকে দিয়ে চাকরের অধম খাটাবে। দিনরাত বউয়ের মন জুগিয়ে চলতে হবে। এ যে বংশের মুখে চুনকালি দেওয়া।’

কিন্তু আত্মীয়ের এই মন্তব্যে বিষ্ণুপদ কান দেয় না। তার ওই সময়ের জীবনচিত্র শীর্ষেন্দু অসাধারণ বাক্যবন্ধে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বিষ্ণুপদ ছিল হেলাফেলার ছেলে। স্পষ্টই বুঝত এ বাড়িতে তার কদর নেই। কদর জিনিসটা সবাই চায়, নিতান্ত ন্যালা-খ্যাপারও কদরের লোভ থাকে। দুবেলা দুটো ভাত আর মেলা গঞ্জনা জুটত। কাজ-টাজের চেষ্টা নেই। নানা গঞ্জনায় জীবনটা ভারি তেতো হয়ে যাচ্ছিল।’

এই অবস্থায় বিষ্ণুপদ সিদ্ধান্ত নিল-সে ঘরজামাই হবে। হরপ্রসন্নবাবুর মেয়ে পাপিয়াকে বিয়ে করে কুসুমপুর গ্রামের ঘরজামাই-ই হবে সে।

মা-বাবা-ভাইবোনকে ছেড়ে একদিন বিষ্ণুপদ কুসুমপুরের হরপ্রসন্নের ঘরজামাই হয়ে চলে এল। চলে আসার পর আর একবারের জন্যও গ্যাঁড়াপোতামুখী হলো না বিষ্ণুপদ। সবাই বিষ্ণুপদকে ভুলল, তার প্রসঙ্গ এলেই মুখ খারাপ করে সবাই। কিন্তু মা-টির অন্তরটা আগের মতোই নরম-কোমল রইল। যে যা-ই বলুক, বিষ্ণুপদ তো তারই আত্মজ। তার মনের ভেতর বিষ্ণুপদকে দেখার হাহাকার তিল তিল করে জমা হতে থাকল।

এদিকে হরপ্রসন্ন ঘরজামাই বিষ্ণুপদকে বুকে টেনে নিল। বিষ্ণুপদও একটা ছায়াময় আশ্রয় পেয়ে বর্তে গেল। সারাদিন শ্বশুরের সঙ্গে সঙ্গে থাকে। হরপ্রসন্নও ঘরজামাইটিকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে শুরু করল। কাজ কারবার, মামলা-মোকদ্দমা, চাষবাস, ধানকল- সবকিছু চেনাতে লাগল হরপ্রসন্ন।

সম্বন্ধীরা যে ব্যাপারটিকে ভালো চোখে দেখেছে, এমন নয়। কিন্তু বাপের মুখের ওপর কথা বলতে সাহস করল না ওরা। হরপ্রসন্ন একরোখা। একদিন সবাইকে ডেকে ঠান্ডা মাথায় বলল- দেখ বাবারা, যাকে যা দেওয়ার বণ্টন করে দিলাম। বিষ্ণুপদও বাদ যায়নি। ওর প্রাপ্য আছে আমার সম্পত্তিতে। তোদের আপত্তি থাকলে দশজনকে ডাক। বাপের কথা মেনে নিয়েছিল হরপ্রসন্নের ছেলেরা।

সেই থেকে বিষ্ণুপদের নাড়িটা শ্বশুরের গাঁ কুসুমপুরে পোতা হয়ে গেল।

অনেক স্থায়ী সম্পত্তি হলো বিষ্ণুপদের, ছেলেপুলে হলো। গাঁয়ে একটু প্রতিপত্তিও বাড়ল। কিন্তু মানুষের মুখ কি আর বন্ধ করা যায়? প্রত্যেক গাঁয়ে তো হককথা বলার লোকের অভাব নেই। এখন বিষ্ণুপদের অঢেল সহায়সম্পত্তি বটে। কিন্তু একদিন তো এই বিষ্ণুপদই এই গাঁয়ে ঘরজামাই হয়ে এসেছিল। প্রথম যৌবনে মনে না হলেও এখন বিষ্ণুপদের মনে খোঁটাটা বড্ড পীড়া দেয়। ছেলে বড় হলো, মেয়ে মুক্তিকে বিয়ে দিল, বিরাট বাড়ি হলো, এধার ওধার কানি কানি ধানি জমি হলো তারপরও বিষ্ণুপদের মনে সুখ নেই। ও যে ঘরজামাই। ও যে ঘরজামাই সেই খোঁচাটা মেয়ের জামাই গোবিন্দ কারণে অকারণে দেয়। শ্যালক ছানু এসব খোঁচা গায়ে মাখে না। কিন্তু একদিন গায়ে না মেখে পারল না। কুসুমপুর গাঁয়ের পাগলা কৃষ্ণকান্তকে বেধড়ক পিটাল ছানু। কেন? ও যে ‘ঘরজামাই রাখবে, ঘরজামাই রাখবে’ বলে গোটা গাঁ মাথায় তুলতে শুরু করেছে। কৃষ্ণকান্ত বলেছে আপন খেয়ালে। ছানু বুঝেছে তার বাবাকে বুঝি খোঁটা দিয়েছে। এই অপরাধে পাগলাকে ভীষণ মারল ছানু।

ওইদিন গোবিন্দ শ্বশুর বাড়িতে ছিল। পাগলাটাকে আগলাতে আগলাতে বলল, ওতো মিথ্যে বলেনি। তোমার বাবা তো ঘরজামাই-ই ছিল। ও তো তোমার বাপকে অপমান করে কথা বলেনি। তোমার বাপের সুখ প্রতিপত্তি দেখে ওই পাগলাটারও ঘরজামাই হবার লোভ হয়েছে। লোভী হওয়া তো অপরাধের না। যদি তোমার বাপ অপরাধী না হয়ে থাকে, তাহলে কৃষ্ণকান্ত শাস্তি পাবে কেন?

একদা কৃষ্ণকান্ত পাগলার সঙ্গে বিষ্ণুপদের রাস্তার ওপর দেখা হয়। কৃষ্ণকান্ত বিড়ি চেয়ে বসে একটা বিষ্ণুপদের কাছে। বিষ্ণুপদ জানায়- ও বিড়ি সিগারেট কিছুই খায় না।

‘কৃষ্ণকান্ত একটু অবাক হয়ে বলে- বিড়ি খাও না? কেন বল তো ঘরজামাই? বিড়ি তো খুব ভালো জিনিস।

‘ঘরজামাই!- বলে খেঁকিয়ে ওঠে বিষ্ণুপদ, ঘরজামাইটা আবার কী রে? তোর তো দেখি বেশ মুখ হয়েছে।’

কৃষ্ণকান্ত গম্ভীর হয়ে বলে, ‘খারাপটা কী বললুম শুনি! তুমি হরপ্রসন্নবাবুর ঘরজামাই হয়ে এসেছিলে না এ গাঁয়ে?’

মুখের ওপর কৃষ্ণকান্তের এই খোঁচাটায় বিষ্ণুপদ উতলা হয়ে উঠল। ওর চঞ্চলতা আরও বেড়ে গেল, যেদিন মেয়েজামাই গোবিন্দ বলল, ‘গ্যাঁড়াপোতায় আপনার বুড়ি মা অভাবে লাঞ্ছনায় খাবি খাচ্ছেন।’

বহুদিনের ধূলিময় একটা পৃষ্ঠা যেন চোখের সামনে খুলে ধরল মেয়েজামাই গোবিন্দ। তার মা! হায়, তার মাকে তো এতদিন দিব্যি ভুলে ছিল বিষ্ণুপদ। বাপ মারা গেছে, যায়নি বিষ্ণুপদ। ভেবেছিল ভাইয়েরা আছে- বুড়িমাটার অযতœ হবে না। কিন্তু জামাইয়ের মুখে মায়ের লাঞ্ছনার সংবাদ পেয়ে মনটা আনচান করে উঠল বিষ্ণুপদের।

সমাজ-সংসার- সবই অসার মনে হতে লাগল তার। ঘর ছেড়ে সে নিজের বর্গাচাষী সতীশের বাড়িতে শান্তি খুঁজে পেতে চাইল।

গ্যাঁড়াপোতায় দিদির বাড়িতে গেলে গোবিন্দ বুড়ি ঠাকুরমার সঙ্গে দেখা করে। নাতজামাই বলে পরিচয় দেয়। নিজের পুত্রের খবর, নাতিনাতনির খবর জানবার জন্য আর্তনাদ করে। নিজে যে হোগলায় ঢাকা দাওয়ায় শোয়, দু’কদম হাঁটতে গিয়ে যে সে নীরক্ত হয়ে পড়ে, পুত্রবধূরা যে তাকে ঘেন্নার দুমুঠো বাসিভাত তার দিকে এগিয়ে ধরে, পুত্ররা যে তাকে দাওয়া থেকে গোয়ালে চালান দেওয়ার পাঁয়তারা করছে- সবকিছু ভুলে যায় বুড়ি। শুধু বিষ্ণুপদকে একটা বার দেখার বাসনা জাহির করে যায় নাতজামাই গোবিন্দর কাছে।

মাতাপুত্রের দেখা হয় একরাতে। বুড়িমা তখন হুঁশে-বেহুঁশে। গুমুতের জীবন তার। টর্চ জ্বেলে বিষ্ণুপদ জননীকে দেখে। মা বলিরেখাময় হাতটি বিষ্ণুপদের হাতের ওপর রেখে বলে, ‘পালাবি না তো ঘুমোলে? ও বিষ্ণু।’

বিষ্ণুপদের বুকের ভেতর অপরাধবোধের ঝড় ওঠে। সেই ঝড় উত্তরোত্তর বাড়ে থামতে চায় না।

একটা সত্যি কথা বলি- শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস আমি তেমন একটা পড়তে চাই না। কেন চাই না?

কারণ তাঁর লেখা আমার ভেতরের হিংসা, কাম, কামনা, লোভ- এসবের ক্ষতি করে ভীষণ। এগুলো নিয়েই তো জাগতিক মানুষ। কাম-কামনা নিয়েই আমার জীবন যাপন। কিন্তু শীর্ষেন্দুর লেখা আমার ভেতরের এসবকে ধ্বংস করবার পাঁয়তারা করে। সমস্ত মনে এবার এক ধরনের অসীম শুভতা ছড়িয়ে পড়ে। এই শুভতা আমাকে ভালো মানুষ করে তুলতে চায়। আমার ভেতরের লোভ-মোহ-মদ-মাৎসর্য বারবার খেই হারিয়ে ফেলে। আমার মনে হয় তার উপন্যাসগুলো পড়তে থাকলে একদিন আমি শুভতায় আবৃত একজন নির্লোভ মানুষে রূপান্তরিত হয়ে যাব।

একজন লেখকের কলমে কতটুকু শক্তি থাকলে পাঠকের মনে একরকম নিবিড় ভালোত্বের গভীর একটা রেখা আঁকতে পারেন? যে দু’একজন পারেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় অবশ্যই স্মরণীয়।

নিন্দার যে ঘরজামাই, তার মধ্যে কী অসাধারণভাবে মানববোধের ব্যাপারটিকে স্পষ্ট করে তুলেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ঘরজামাই না হয়েও ঘরজামাইয়ের যে নিন্দাটুকু আমি এতদিন বয়ে বেড়াচ্ছি, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ঘরজামাই উপন্যাসটি পড়ে, আমার গ্লানি আজ তিরোহিত হয়ে গেছে। ঘরজামাই বিষ্ণুপদ শেষ পর্যন্ত একজন মাতৃবৎসল পুত্রে রূপান্তিত হয়ে যায় ঘরজামাই উপন্যাসে। বিষ্ণুপদের জন্য আমরা একধরনের ভালোবাসা পোষণ করতে বাধ্য হই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares