তরুণ প্রজন্মের মনোজগতে বঙ্গবন্ধু : চৌধুরী শহীদ কাদের

ক্রোড়পত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

শোকাঞ্জলি

তরুণ প্রজন্মের মনোজগতে বঙ্গবন্ধু

চৌধুরী শহীদ কাদের

আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন আরাধ্য পুরুষ। অনমনীয় ও অনন্য সংগ্রামী বঙ্গবন্ধু সারা বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত জনতার মুক্তির ইতিহাসে এক কিংবদন্তি। আমাদের কাছে বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু মানেই আমাদের শেকড়, আমাদের অস্তিত্ব। ইতিহাসের অগ্নিপুরুষ হিসেবে তিনি ২৩ বছর নিরলস, নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে জাতিকে সংগঠিত করেছেন। বাঙালির মনে প্রজ্বলন করেছেন স্বাধীনতার অনির্বাণ শিখা। সংগ্রামী জীবনের অধিকাংশ সময় বাঙালির অধিকার আদায়ে ছিলেন কারা প্রকোষ্ঠে। বাকি সময়টায় আন্দোলনকে সংঘটিত করতে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালি নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মুক্ত করে স্বদেশকে। এরপর বঙ্গবন্ধু প্রায় সাড়ে তিন বছর যুদ্ধবিধস্ত এই দেশ পুনর্গঠনে নিজেকে নিয়োজিত করেন। মন-মানসিকতায় ও চিন্তা-চেতনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অত্যন্ত উঁচু মনের একজন মানুষ। মানুষের জন্য তাঁর আবেগ-অনুভূতি দেশের ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবন ও রাজনীতি গ্রন্থে মোনায়েম সরকার লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর মনের ঐশ্বর্য, চিত্তের উদারতা, নিরহঙ্কারতা এসব বৈশিষ্ট্য তুলনাহীন। দেশবাসীর ওপর তাঁর প্রভাব ছিল অমোচনীয়। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ একদিন তাঁর কথায় অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে, প্রাণ দিয়েছে। কারণ তারা জানত এই মানুষটি দেশের মানুষের ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই চান না। না পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব, না প্রভুত্বের গৌরব, না ধনৈশ্বর্যের আড়ম্বরপুষ্ট মূঢ়তার সহচর্য। বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার গৌরব ব্যতীত তার আর কোনো স্বপ্ন ছিল না।’

আমার জন্ম বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রায় এক দশক পরে। বঙ্গবন্ধুকে আমি দেখিনি। খুব বেশি জানার সুযোগও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার ছিল না। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে বঙ্গবন্ধুকে ঠিক যেভাবে পাওয়ার কথা ছিল, সেভাবে পাইনি। পাঠ্যপুস্তকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আলোচনা খুবই সীমিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বঙ্গবন্ধুর নাম সেখানে শুধুই শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের (তখনকার পাঠ্যপুস্তকে স্বাধীনতা যুদ্ধের) বর্ণনা দিতে গিয়ে অষ্টম শ্রেণির সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে (১৯৯৫ সালের) লেখা হচ্ছে- ‘… ২৫শে মার্চের কালরাতে পাকবাহিনী শুরু করে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হন। বাঙালি জাতি দিগ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এই দিগ্ভ্রান্ত জাতিকে দিকনির্দেশনা দিতে সে সময় এগিয়ে আসেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেন।’

এ ধরনের একটি মিথ্যা, ভ্রান্ত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইতিহাস পড়ে আমাদের প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে। স্কুল, কলেজ পেরিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি। তখনও যে বঙ্গবন্ধুকে খুব বেশি জানার সুযোগ পেয়েছি তা নয়। আমাদের প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে সুপরিকল্পিতভাবে ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুকে বাদ দেওয়ার যে সময়, সেটাতে। গণমাধ্যমেও বঙ্গবন্ধু ছিল নিষিদ্ধ একটি বিষয়। বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা এই সময় প্রায় নিষিদ্ধ একটি বিষয় ছিল। পঁচাত্তর সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে প্রায় দুই দশক ধরে বাঙালির মনোজগৎ থেকে বঙ্গবন্ধুকে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছে। নেওয়া হয়েছে নানা ধরনের উদ্যোগ। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধু নির্বাসনের পরিকল্পনা। ১৯৭৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক বিশ্লেষণ করলে আমরা এর সত্যতা খুঁজে পাব এবং অনুধাবন করা সহজ হবে- কেন মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করছে, এমন একটি প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। ইতিহাস নিয়ে দ্বন্দ্ব কীভাবে আমাদের রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করেছে। জাতিকে বিভক্ত করেছে, ইতিহাসহীনতা কীভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করতে শিখিয়েছে।

কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমাদের প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ ছিল। বঙ্গবন্ধু এমন একজন ব্যক্তিত্ব, পাঠ্যপুস্তক কিংবা টিভির পর্দা থেকে সরিয়ে দিলেই, বাঙালির মানস জগৎ থেকে তাকে সরানো যাবে না। সমসাময়িক অনেকের লেখায় সেই দুঃসময়ে আমরা বঙ্গবন্ধুকে চিনেছি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পড়া আমার প্রথম বই মুজিবরের বাড়ি। সময়টা সম্ভবত ১৯৯৫। সেই গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মুনতাসীর মামুন লিখেছিলেন, ‘শতচেষ্টা করেও বাঙালির মন থেকে দু’জন বাঙালির নাম মুছে ফেলা যাবে না। এমনই শক্তি ও-দুটি নামের। এদের একজন হলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যিনি বাংলা ভাষাকে পরিচিত করেছিলেন বিশ্ব দরবারে। যাঁর গান আমাদের জাতীয় সংগীত। আরেকজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁর নেতৃত্বে বাঙালি প্রথম আলাদা একটি ভূখণ্ড নির্মাণ করতে পেরেছিল।’

বাংলাদেশের ইতিহাস, বাঙালিত্ব এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এগুলো যেন অবিচ্ছিন্ন সত্তা। একটিকে ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ। ব্যক্তিগত জীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বিনম্র ও কোমল স্বভাবের  অধিকারী। তাঁর সহৃদয়তার পরিচয় প্রবাদের মতো ছড়িয়ে আছে। তিনি যে বাংলার মানুষকে কত গভীরভাবে ভালোবাসতেন সে কথার প্রমাণ ইতিহাসের পরতে পরতে প্রতিফলিত হয়েছে। এক বিদেশি সাংবাদিক একবার  বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন What is your Qualification  আপনার যোগ্যতা কী?  বঙ্গবন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন I love my people.  চট করে বিদেশি অভিজ্ঞ সাংবাদিক অন্য একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, What is your disqualification?  বঙ্গবন্ধু শান্তস্বরে জবাব দিলেন  ও I love them too much. সত্যিই বঙ্গবন্ধুর বাংলার মানুষকে বড় বেশি ভালোবাসতেন আর তার হৃদয়ের এ দুর্বলতার পরিচয় বাংলার মানুষ মাত্রই জানেন এবং জানেন বলেই আর্তপীড়িত ও অসহায় মানুষ তার কাছে নিশ্চিন্তে দাঁড়াতে ভরসা পেত।

বাংলাদেশ যে মানুষটির চির ভালোবাসা, অমর কাব্য, যিনি মিশে আছেন এর প্রতিটি ধূলিকণায়, এর অস্তিত্বমূলে সেই চিরঞ্জয়ী মুজিব আমাদের বর্তমান প্রজন্মের মনোজগতে কতটা আধিপত্য বিস্তার করছে? ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম এলাকা লংগদু খিয়াংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে যাই। দ্বিতীয় শ্রেণির ক্লাসে ঢুকে জনাপঞ্চাশেক শিক্ষার্থীর কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, তোমরা কি বঙ্গবন্ধুর নাম শুনেছ? আমি অভিভূত হয়েছিলাম সবার সমস্বরে হ্যাঁ শুনে। এক আদিবাসী মেয়েকে বললাম, বলো তো উনি কে? বাইরে বাঁশের মাথায় জাতীয় পতাকাটি দেখিয়ে বলল, ওই যে ওটা বঙ্গবন্ধু। আমি আবেগতাড়িত হয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু ঠিক এভাবেই মিশে আছেন আমাদের মননে চিন্তায়, আত্মার গভীরতায় কিংবা বিশ্বাসে।

আমাদের প্রজন্মের একটি বড় অংশ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দীক্ষিত। তাঁর নেতৃত্বও গুণাবলিতে উজ্জীবিত। বঙ্গবন্ধু তাদের কাছে পরম পূজনীয়, নায়কের আসনে অধিষ্ঠিত। যে বঙ্গবন্ধুকে বিস্মৃত করতে, ইতিহাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ’৭৫-পরবর্তী সরকারগুলো নিয়েছে নানা ধরনের পরিকল্পনা, সেই বঙ্গবন্ধুই আজ পুরো বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে রূপান্তরিত হয়েছে। মোনায়েম সরকার হয়তো তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবন ও রাজনীতি গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ইতিহাস যেমন নেতৃত্বের সৃষ্টি করে, নেতৃত্বও তেমনি ইতিহাস সৃষ্টি করে।’

ছোট ছোট বাচ্চারা যাদের সবার বয়স ১২ বছরের নিচে, বঙ্গবন্ধুর ওপর আঁকা এমন একটি চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় গিয়ে অবাক হয়েছি। এই ছোট ছোট বাচ্চাদের মনোজগতে বঙ্গবন্ধুর এত আধিপত্য, যা প্রকাশিত হয়েছে তাদের রঙ ও তুলির জলরঙে।

 বাঙালি, বাংলা ভাষা, বাংলার কৃষ্টি, বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন, তার ভাষায়, ‘সেন্টিমেন্টালি অ্যাটাচড’। তিনি বলেন, ‘আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ, বাংলার মাটি আমার প্রাণের মাটি, বাংলার মাটিতে আমি মরব। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা আমার কৃষ্টি ও সভ্যতা।

দি আটলান্টিক মান্থলি নামের একটি পত্রিকায় হোয়াট সিক্স এ গুড লিডার প্রবন্ধে লেখক গ্যারি উইলস্ বলেছেন, নেতৃত্বের যে বৃত্ত তার উপাদান তিনটি : Leader, Followers, Goals। একটু ঘুরিয়ে বললে দাঁড়াবে, নেতৃত্ব নির্ভর করছে যদি নেতা কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করেন এবং সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন এমন আস্থা নেতার ওপর থাকে বলেই অনুসারী সৃষ্টি হওয়ার ওপর। উদ্ধৃতিগুলোর ভিত্তিতে নেতৃত্ব সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে নেতার প্রয়োজনীয় গুণাবলি হলো : ব্যক্তিত্বের সম্মোহনী ক্ষমতা, জনগণের সামনে স্পষ্ট এমন একটি লক্ষ্য তুলে ধরা এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যম ও উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো নেতার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। এমন গুণাবলিসমৃদ্ধ নেতাকে প্রায়শই ‘কারিশমা’সম্পন্ন নেতাও বলা হয়, উপরন্তু একজন নেতা তখনই তার অনুসারীদের জন্য সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেন যখন তিনি ত্রিকালদর্শী হন। অর্থাৎ নেতা অতীত সম্পর্কে অভিজ্ঞ, বর্তমানকে অনুধাবন করেন এবং ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী নেতৃত্বের মধ্যে উল্লিখিত সব উপাদান পরিলক্ষিত হয়।  আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর এই নেতৃত্বের গুণাবলি প্রত্যেকটি নাগরিকের ধারণ করা উচিত। যারা রাজনীতির সাথে জড়িত, তাদের ধারণ করা উচিত এ গুণাবলি। বঙ্গবন্ধু প্রকৃষ্ট রাজনীতিবিদের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু লিখছেন, ‘আওয়ামী লীগ, শ্রমিক, ছাত্র ও যুব কর্মীরা হরতালকে সমর্থন করে পথসভা করে চলেছে। মশাল শোভাযাত্রাও একটি বের করেছে। শত অত্যাচার ও নির্যাতনে কর্মীরা ভেঙ্গে পড়ে নাই। আন্দোলন চালাইয়া চলেছে। নিশ্চয় আদায় হবে জনগণের দাবি।’

বঙ্গবন্ধু রাজপথ থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব, কর্মী থেকে নেতা হওয়া, তিনি সব সময় রাজপথে ভরসা রাখতেন, ভরসা রাখতেন আন্দোলনে। যেটা আজকের ছাত্র আন্দোলনে কিংবা নেতৃত্বে অনুপস্থিত।

১৮ জানুয়ারি ১৯৭৪ আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলের উদ্বোধনী বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলছিলেন, ‘দেশ শাসন করতে হলে নিঃস্বার্থ কর্মীর প্রয়োজন। হাওয়া কথায় চলে না। সেদিন ছাত্ররা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। তাদের বলেছিলাম, আত্মসমালোচনা করো। মনে রেখো, আত্মসমালোচনা করতে না পারলে নিজকে চিনতে পারবা না। তারপর আত্মসংযম করো, আর আত্মশুদ্ধি করো। তাহলেই দেশের মঙ্গল করতে পারবা।’

১৯ জুন ১৯৭৫ বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক, বঙ্গবন্ধু বাকশালের তরুণ নেতৃত্বকে উদ্দেশ করে আবারও  আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম আর আত্মশুদ্ধির কথা বললেন- ‘আজকে এই যে নতুন এবং পুরান যে সমস্ত সিস্টেমে আমাদের দেশ চলছে, আমাদের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন আছে। আত্মসমালোচনা না করলে আত্মশুদ্ধি করা যায় না। আমরা ভুল করেছিলাম, আমাদের বলতে হয় যে, ভুল করেছি। আমি যদি ভুল করে না শিখি, ভুল করে শিখব না, সে জন্য আমি সবই ভুল করলে আর সকলেই খারাপ কাজ করবে, তা হতে পারে না। আমি ভুল নিশ্চয়ই করব, আমি ফেরেশতা নই, শয়তানও নই, আমি মানুষ, আমি ভুল করবই। আমি ভুল করলে আমার মনে থাকতে হবে, আই ক্যান রেকটিফাই মাইসেলফ। আমি যদি রেকটিফাই করতে পারি, সেখানেই আমার বাহাদুরি। আর যদি গোঁ ধরে বসে থাকি যে, না আমি যেটা করেছি, সেটাই ভালো। দ্যাট ক্যান নট বি হিউম্যান বিইং।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা কিংবা সিক্রেট ডকুমেন্ট অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ (আইবি) অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম দুটি খণ্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারুণ্যের ওপর বঙ্গবন্ধুর অগাধ বিশ্বাস ছিল। তরুণদের তিনি নির্ভরতার প্রতীক মনে করতেন।

বঙ্গবন্ধুর তরুণ জীবনের একটি চিত্রও এই গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়। যেখানে একজন আপোসহীন, দৃপ্ত ছাত্রনেতার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো, অভয় মানো, যেখানে অন্যায়-অবিচার সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তোলো।’

বঙ্গবন্ধু একদিকে ছিলেন তরুণদের অন্য আদর্শ, দিক নির্দেশক, আবার অন্যদিকে তরুণ বঙ্গবন্ধুর অনমনীয়, সাহসী চারিত্রিক দৃঢ়তা তরুণদের জন্য  অবশ্যই অনুকরণীয় চরিত্র।

বঙ্গবন্ধুর বৈশিষ্ট্যে ছিল চূড়ান্ত ত্যাগ, সততা, নিষ্ঠা, দৃঢ়তা, সময়োচিত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আপোসহীন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, তীব্র আত্মমর্যাদাবোধ, যুক্তিযুক্ত অধিকার সচেতনতা, নির্লোভ, সাংগঠনিক রীতিনীতি অনুসরণ, সিদ্ধান্তে অটল, কর্মীবান্ধব, ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে না রাখার প্রবণতা। বঙ্গবন্ধু  নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে ছাত্রলীগকে গড়ে তুলেছেন।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির পতাকাবাহী ছাত্রলীগ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং রক্ষার প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থেকেছে নিয়ামক শক্তি হিসেবে। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা, ১১ দফা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, সর্বোপরি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের চালিকা শক্তির ভূমিকায় রচিত হয়েছে দেশ ও জাতির সকল গৌরব গাথা। সামরিক শাসনের কঠোরতার মধ্যে একটি ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের এই অর্জন সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্বে। 

১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ ঢাকায় ছাত্রলীগের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলছিলেন, আমি দেখতে চাই যে, ছাত্রলীগের ছেলেরা যেন ফার্স্টক্লাস বেশি পায়। আমি দেখতে চাই, ছাত্রলীগের ছেলেরা যেন ওই যে কী কয়- নকল, ওই পরীক্ষা না দিয়া পাস করা, এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলো।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তরুণদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ‘তরুণদের বঙ্গবন্ধু’ নিবন্ধে লিখছেন, তারুণ্যের স্বপ্ন এবং প্রত্যাশাকে তিনি নিজের ভেতর ধারণ করতেন, তারুণ্যের ক্ষোভ এবং দ্রোহের সঙ্গে একটা তাৎক্ষণিক সংযোগ তিনি ঘটাতে পারতেন। তাঁর সক্রিয়তা তিনি তরুণদের ভেতর সঞ্চারিত করতে পারতেন। তরুণ রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করার তাঁর যে ক্ষমতা ছিল, তা ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের পতন ঘটানোর পেছনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতি থেকে শক্তি নিয়ে তিনি এগোতেন, সে জন্য তিনি পথ ভুল করেননি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচন তরুণদের বিশাল সমাবেশ ঘটিয়েছিল।

১৯৫৮ সালে যখন পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয় এবং বাঙালিদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হয়, বঙ্গবন্ধু এসবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার জন্য তরুণদেরই সংগঠিত করেন; তিনি কারান্তরীণ থাকলে তাঁর তরুণ সহকর্মীদের সেই কাজ করার দায়িত্ব দেন। ষাটের দশকে একটির পর একটি ছাত্র আন্দোলন যে পাকিস্তানের সেনাশাসকের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়, তার পেছনে ছিল তারুণ্যের জাগরণ।

এক অসামান্য সাফল্যের রাজনীতিবিদ তিনি। তাঁর নেতৃত্বের গুণাবলিতেই তিনি একাত্ম হয়ে উঠেছিলেন বাঙালি মানস ও বঙ্গের মাটির সঙ্গে, তাদের দীর্ঘলালিত আশা ও আকাঙক্ষার সঙ্গে। আমাদের দুর্ভাগ্য, সে ইতিহাস কেউ জানিতে চাই, কেউ চাই ঢাকতে, কেউ-বা মুছে দিতে। অথচ বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিনই প্রাসঙ্গিক ও বেঁচে থাকবেন শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ তিনি জেগে উঠলেই উগ্র-ধর্মবাদী, উগ্র-তত্ত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে, তাঁর হত্যাকাণ্ডের কয়েক যুগ পরও তিনি সেক্যুলার সমাজ শক্তির মুখ্য নেতা হয়ে ওঠেন।

বঙ্গবন্ধু গোপন রাজনীতি পছন্দ করতেন না। পছন্দ করতেন না পালিয়ে থাকা কিংবা জ্বালাও পোড়াও। গণসমর্থনের পথই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির পথ। জনগণের শক্তিতে তিনি ছিলেন পূর্ণ আস্থাশীল। কোনোরূপ শর্টকার্ট পন্থা বা হটকারিতায় তিনি আদৌ বিশ্বাসী ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু এক ভাষণে বলেন, ‘যারা মনে করেন রাতের অন্ধকারে গুলি করে কিংবা একা রেললাইন তুলে নিয়ে টেররিজম করে বিপ্লব হয়, তারা জানেন না … এ পন্থা দিয়ে দেশের মানুষের কোনো মঙ্গল করা যায় না।… জনগণকে ছাড়া, জনগণকে সংঘবদ্ধ না করে, জনগণকে আন্দোলনমুখী না করে এবং পরিষ্কার আদর্শ সামনে না রেখে কোনোরকম গণআন্দোলন হতে পারে না।’

 ১৯৪৯ সালে পুলিশ খুঁজছে মুজিবকে। মুজিবের শরীর খুব খরাপ কিন্তু এর মধ্যে ভাসানী মুজিবকে খবর দিলেন গ্রেফতার হওয়া যাবে না। নিজের অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে মুজিব লিখছেন, ‘তখন মাওলানা ভাসানী ইয়ার মোহাম্মদ খানের বাড়িতে থাকতেন। তাঁর সাথে আমার দেখা করা দরকার। কারণ তাকে তখনও গ্রেফতার করা হয় নাই। তাঁকে জিজ্ঞেস করা দরকার। তিনি কেন, আমাকে গ্রেপ্তার হতে নিষেধ করেছেন? আমি পালিয়ে থাকার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কারণ, আমি গোপন রাজনীতি পছন্দ করি না। আর বিশ্বাসও করি না।’ এই গোপন রাজনীতি পছন্দ করেন না দেখেই ২৫ মার্চের কালরাতে ধানমন্ডির নিজ বাসভবনে অবস্থান করছিলেন বঙ্গবন্ধু ।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে বঙ্গবন্ধুকে পাড়ি দিতে হয়েছে একটি দীর্ঘ পথ। আমাদের অনেকের ধারণা স্বাধীনতা রাতারাতি চলে এসেছে। কিংবা এর জন্য বঙ্গবন্ধুর সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না। এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলছিলেন, ‘আমি জাম্প করার মানুষ নই। আমি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখি ১৯৪৭-৪৮ সালে। কিন্তু ২৭ বছর পর্যন্ত স্টেপ বাই স্টেপ মুভ করেছি। আমি ইম্পেসেন্ট হই না। আমি অ্যাডভেনচারিস্টও নই।’

সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার পেছনে কঠোর পরিশ্রম আর ত্যাগ আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে- বঙ্গবন্ধু চরিত্রের এটাই বড় দর্শন। বঙ্গবন্ধু সারা বিশ্বের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের জন্য সহমর্মী ছিলেন। বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের কাছে ছিলেন মুক্তির প্রতীক। এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের জণগণের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রতি বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন। এ প্রসঙ্গে এক বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছি। এ স্বাধীনতা আমরা আলোচনা করে বা রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স করে আনি নাই। সেই জন্য আজ আমাদের পরিষ্কার কথা… যেখানে মানুষ শোষিত, যেখানে মানুষ অত্যাচারিত, যেখানে মানুষ দুঃখী, যেখানে মানুষ সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা নির্যাতিত, আমরা বাংলার মানুষ সেই দুঃখী মানুষের সাথে আছি এবং থাকব।

বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বের আর একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, তার আজীবনের সংগ্রাম- সাধনা-স্বপ্ন-রাজনীতি ছিল গরিব-দুঃখী মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে। তিনি তাদের মুখে হাসি ফোটানোর কথা বলতেন। অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলতেন, শোষিতের গণতন্ত্রের কথা বলতেন; দ্বিতীয় বিপ্লবের কথা বলতেন; তার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ কায়েমের কথা বলতেন। ১৯৭৩ সালে বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘…আমরা রাজনৈতিক মুক্তি অর্জন করেছি। কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে পারিনি। আমাদের এবারের সংগ্রাম অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের সংগ্রাম। আমি যে সুখী ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, সংগ্রাম করেছি এবং দুঃখ নির্যাতন বরণ করেছি সেই বাংলাদেশ এখনও আমার স্বপ্ন রয়ে গেছে। গরিব কৃষক ও শ্রমিকের মুখে যতদিন হাসি না ফুটবে, ততদিন আমার মনে শান্তি নেই। এই স্বাধীনতা তখনই আমার কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠবে যেদিন বাংলাদেশের কৃষক-মজুর ও দুঃখী মানুষের সকল দুঃখের অবসান হবে। তাই আসুন, এই দিনে অভাব, দারিদ্র্য, রোগ, শোক ও জরার বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম ঘোষণা করি।’

বঙ্গবন্ধু চরিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক-অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ দুই দশক ধরে সংগ্রাম করেছেন পাকিস্তানিদের ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে।

পল্লীকবি জসিমউদ্দীন শ্রদ্ধায় লিখেছেন :

‘শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী- জীবন করিয়া দান,

 মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান।

তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর,

জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাংলার।’

বঙ্গবন্ধু চরিত্রের উদারতা, অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, নেতৃত্বের গুণাবলি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি আদর্শিক রূপরেখা। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবন হতে পারে তরুণ প্রজন্মের কাছে অবশ্য পাঠ্য একটি গ্রন্থ, রাজনীতি শিক্ষার প্রথম পাঠ।

বঙ্গবন্ধুর তরুণ জীবন নিয়ে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ‘বঙ্গবন্ধুর জীবন, ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি (১৯২০-১৯৪৯)’ শিরোনামে অনবদ্য একটি বই লিখেছেন। অধ্যাপক মামুন লিখছেন,  ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তাঁর জীবন, বয়স তখন তাঁর ৩০-ও হয়নি। কিন্তু, তিনি ইতোমধ্যে রাজনীতিতে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। কয়েক দফা জেলও খেটেছেন। পূর্ববঙ্গে ওই সময় তিনি পরিচিত এক নাম।

এর কারণ কী? কারণ একটিই- বিশ্বাস ও নিষ্ঠা। স্কুল-কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই রাজনীতিতে এত সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন যে তাঁকে হোল টাইমার হিসেবেও উল্লেখ করা যায়। মুসলিম লীগ করেছেন। সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, সম্প্রদায় হিসেবে মুসলমানদের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে।

কিন্তু ১৯৪৮ সালেই দেখলেন ঘটনা বিপরীত, তখনই তিনি অবস্থান নিলেন এবং সে অবস্থান থেকে তিনি আর নড়েননি।

আদর্শের চাইতে দৈনন্দিন জীবনের পক্ষে প্রয়োজনীয় বিষয়ের প্রতি তাঁর দৃষ্টি ছিল বেশি। শেখ সাহেব তত্ত্বের বা মতবাদ প্রচারের চেয়ে বাস্তব জীবনের সংগ্রামে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন। তাত্ত্বিক আলোচনায় সময় ব্যয় না করে কর্মরত থাকায় বিশ্বাস করতেন। তাঁর চোখেমুখে একটা দীপ্তি ছিল। কর্মীদের মধ্যে, ভবিষ্যতে যে তাঁর মুঠোর মধ্যে আসতে বাধ্য, সে বিশ্বাস জন্মাবার ক্ষমতা ছিল, যেসব কর্মীরা তাঁর সান্নিধ্যে যেত তাদের মনে একটা কল্পনার সুখী সমাজের স্বপ্ন সৃষ্টি করার শক্তি ছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক নেতৃত্বে ওঠার জন্য অন্য যেসব পন্থা শামছুল হক সাহেব গ্রহণ করেছিলেন, তাও ঢাকায় এসে তিনি রপ্ত করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর জবানবন্দিতে লিখেছিলেন, ‘আমার যদি কোনো ভুল হয় বা অন্যায় করে থাকি, তা স্বীকার করতে আমার কোনোদিন কষ্ট হয় নাই। ভুল হলে সংশোধন করে নেব। ভুল তো মানুষের হয়েই থাকে। আমার নিজেরও একটা দোষ ছিল। হঠাৎ করে রাগ করে ফেলতাম। তবে রাগ আমার বেশি সময় থাকত না। আমি অনেকের মধ্যে একটা জিনিস দেখেছি, কোনো কাজ করতে গেলে শুধু চিন্তাই করে। চিন্তা করতে করতে সময় পার হয়ে যায়। কাজ আর হয়ে ওঠে না। অনেক সময় করব কি করব না- এইভাবে সময় নষ্ট করে এবং জীবনে কোনো কাজই করতে পারে না। আমি চিন্তাভাবনা করে যে কাজটা করব ঠিক করি, তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয়, সংশোধন করে নিই। কারণ, যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে। যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না।’

তিনি একটি কাজ ঠিক করে নিয়েছিলেন, কখনও পিছিয়েছেন কখনও এগিয়েছেন, কিন্তু লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি, কাজ থেকেও না। তাই তিনি তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছেছিলেন। তাই তিনি জাতির পিতা। তাই তিনি বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম একটি জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। যে যুদ্ধে রাষ্ট্রের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিল। একটি মানচিত্র কিংবা একটি ভূখণ্ডের জন্য বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে সমবেত করেনি কিংবা জনগণ যুদ্ধ করেনি। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল একটি স্বপ্নের জন্য। সে স্বপ্ন হলো জাতি হিসেবে নিজেদের জন্য একটি রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি। যে রাষ্ট্রকাঠামো কতকগুলো সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে তৈরি। পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোয় যেসব আদর্শ ও মূল্যবোধ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, বঙ্গবন্ধু সেসব প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে বাঙালিদের সমবেত করেছিলেন।

আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বুঝতে হবে কী ছিল সেসব আদর্শ আর মূল্যবোধ। যার জন্য আমরা আন্দোলন করেছি, জীবন বাজি রেখে অস্ত্র ধরেছি। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় সে আদর্শিক সংগ্রামের রূপরেখা। যার জন্য আমরা তার ডাকে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর জীবন মানে, অসাধারণ নেতৃত্বে এক সাধারণ ছাত্রনেতার আমাদের জাতীয় জীবনের স্বপ্ন সারথি হওয়ার গল্প।

তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটির প্রথমেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত নোট বইয়ের একটি উদ্ধৃতি রয়েছে, যা তিনি ১৯৭৩ সালের ৩০ মে লিখেছিলেন। উদ্ধৃতিটি আমাদের সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো; কারণ মাত্র তিনটি বাক্যে ওই উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি তার আত্মপরিচিতি ও মূল্যবোধ অতি পরিষ্কার করেছেন। তিনি লিখেছেন, একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে স¤পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।

তরুণ প্রজন্মের মনোজগতে বঙ্গবন্ধু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনো ব্যক্তিত্ব নয়। কিংবা জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার কোনো বিষয়ও নয়। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস একটি অবিচ্ছিন্ন অধ্যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রত্যেকটি বাঁকে মিশে আছে জাতির পিতার আত্মত্যাগ, নেতৃত্ব ও গৌরবের ইতিহাস। বর্তমানে যে প্রজন্ম বেড়ে উঠছে তাদের মনোজগতে বঙ্গবন্ধুর আধিপত্য বিস্তারের জন্য মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস চর্চা জরুরি। যে তরুণ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস জানবে, আত্মত্যাগের গল্প শুনবে, দুই লক্ষ নারীর ধর্ষিত হওয়ার ইতিহাস জেনে বড় হবে, আমাদের গণহত্যার বর্বরতা জানবে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে চেনানোর প্রয়োজন হবে না।

মনোজগতে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আধিপত্য বিস্তারের জন্য পাঠ্যপুস্তুকে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের পাশাপাশি বাঙালির আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে আনা জরুরি। স্নাতক পর্যায়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অুভ্যদয়ের ইতিহাস কোর্সটি সকল বিষয়ের সকল শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করা উচিত। কারণ যে ছাত্রটি চিকিৎসক হবে কিংবা প্রকৌশলী, রাষ্ট্রের গৌরবময় অভ্যুদয়ের ইতিহাস না জানলে রাষ্ট্রের প্রতি তার দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হবে না।

বঙ্গবন্ধু আমাদের এই এক বিরাট অর্জন। আর আমাদের যত অর্জন সবগুলোর পেছনেই বঙ্গবন্ধু। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হাজার তরুণ খুঁজে পাবেন উদ্দীপ্ত হওয়ার প্রেরণা বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে। বঙ্গবন্ধুর চিরঞ্জীব আদর্শ হয়ে বেঁচে থাকবে হৃদয়ের মণিকোঠায় কোটি বাঙালির।

তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বদরবারে নতুন পরিচয়ে পরিচিত। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার পথে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি খাদ্য রফতানি হচ্ছে বিদেশে। পোশাক ও জনসংখ্যা রফতানিতে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের কাছে মডেল। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ও মানব উন্নয়ন সূচকের ক্রম অগ্রগতি, গড় আয়ু বৃদ্ধি বাংলাদেশকে নতুন রূপে পরিচিতি দিয়েছে। বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে, এই এগিয়ে চলায় বাংলা ও বাঙালিকে উদ্দীপিত করছে তার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আর নীরবে পাথেয় হয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। তিনি যে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বার বার বলে গিয়েছিলেন, আজ আমরা সেই মুক্তি অর্জনের পথে। 

বলতে দ্বিধা নেই, এখনও তরুণ সম্প্রদায়ের একটি অংশ ঠিকমতো অন্তরে বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাদের আন্দোলিত করে না। এটা আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। রাষ্ট্র তার এই নাগরিকদের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে, একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী কিংবা তাদের এদেশীয় সহযোগী গোলাম আযম, সাকা চৌধুরী, নিজামী গং একাত্তরে কী করেছিল। আমি শুধু এসব তরুণদের উদ্দেশে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই- মুক্তিযুদ্ধে যদি আপনার প্রিয় বোনটি নির্যাতিত হতো কিংবা আপনার মাকে যদি আপনার সামনে ধর্ষণ করা হতো, তাহলে কী করতেন? যদি আপনার বাবা কিংবা ভাইকে হারাতেন তাহলেই বুঝতেন শহীদ পরিবারের যন্ত্রণা। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের পাশাপাশি মর্মন্তুদ বিষয় তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।

আসুন, আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নতুন বাংলাদেশ গঠনে নিজেদের নিয়োজিত করি। তরুণ প্রজন্মের মনোজগতে বঙ্গবন্ধুর আধিপত্য যত বেশি হবে, তত বেশি উজ্জ্বল হবে অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়া।

 চৌধুরী শহীদ কাদের : সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়

প্রতিকৃতি : আলপ্তগীন তুষার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares