মুজিবের হাতপাখা : ইমরোজ সোহেল

ক্রোড়পত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

শোকাঞ্জলি

ইমরোজ সোহেল

মুজিবের হাতপাখা

কেমন ছিলেন আমার পিতা শেখ মুজিব পরিত্যক্ত তিক্ত কারাগারে? এখন কি  ভেঙে গেছে সেই লালঘর না হয়ে গেছে লুট? খসে গেছে নাকি তার শতচ্ছিন্ন  ইট? যেমন খসে যায় পাখা বৃদ্ধ হলে অবসন্ন কীট।

একদিন  তসবিহর দানার মতো একটা একটা করে গুনেছি ইটের গাঁথুনি। ফুরিয়ে গেছে  রাত। তবু সময় থামেনি। হামাগুড়ি দিয়ে এসেছে সূর্য। দেখতে পেয়েছি আমি। প্রতিটি ইটের শরীরে মুজিবের নাম আদ্যপ্রান্ত লেখা। যেনো  পাবলো পিকাসোর তুলিতে অতি যত্নে আঁকা।

অত ইট একা আমি কেমন করে হৃদয়ে পুষবো? সব মাটি এখন কেবলি  পাথর। কেমন করে পাথরে ছিটাবো হৃদয়ের বীজ? তাই নিজ হাতে রহস্যের জল দিয়ে ভিজিয়ে দিই মাটি। জেগে ওঠে আবার মুজিব। মুজিব মা ও মাটি ভালোবাসে। তাই প্রতিদিন হাতে পায়ে চোখে মুখে  মাখে  মাটির গন্ধ। যেনো অন্ধ প্রেমিক। যেনো হেঁটে যাওয়া ক্লান্ত পথিক। মাঝে মাঝে ধূলায় গড়ায়।

যারা ভেঙে ফেলে  ঘর, তারা মুজিব চেনে না। মুজিব যেখানে ঘুমাতো ভাঙাচোরা সেই বিছানা দেখে নি তারা। কতটুকু তূলা ছিলো বালিশ ও তোষকে, কতটুকু কাসা ছিলো গ্লাস ও বাটিতে, থালাটা কিসের ছিলো? কাঁচের না এলুমিনিয়ামে পুড়িয়ে পুড়িয়ে গড়া?  জায়নামাজে জমা হয়েছিলো কতটুকু অশ্রুদল? কে বলতে পারে? ভেসে ওঠা লবণের দাগ মুছে ফেলেছিলো কোন সে উন্মাদ? সে কি জানে লবণের স্বাদ?

কার জন্যে কেঁদেছিলো আমার মুজিব? সাত কোটি মানুষ কি শুনেছিলো সেই কান্নার নিরীহ শব্দ? না সেই ঘরে একফোটা বাতাসও ঢোকে নি? কে না জানে, বাতাসই শব্দের প্রকৃত বাহক। তবে কে চুরি করে নিয়ে গেলো মুজিবের যত্নে রাখা হাত পাখা? বাতাস কি কেঁপেছিলো সেই রাতে, রক্ত চক্ষু দেখে যেমন কেঁপে ওঠে দুগ্ধপোষ্য শিশু!

মুজিবের হাত থেকে পড়ে যাওয়া অর্বাচীন কোটে লেগেছিলো কতটুকু ধূসর রঙের ধূলা? ধূলার কি গন্ধ থাকে? যখন সে ওড়ে? তুলার কি গন্ধ থাকে যখন সে পোড়ে? কে মুছে দিতো মুজিবের ঘাম যখন শ্রান্ত? কূপ থেকে কে তুলে দিতো বিচিত্র দামে কেনা স্নান-জল? সাবানের ফেনাও কি ছিলো সমুদ্রের মতো? ঢেউয়ে ঢেউয়ে শব্দ বাজতো? মুজিবের কন্ঠে যেমন বাজতো ঝংকার। যেনো বেহালার নীলকন্ঠ তার।

অপরূপা আলনা কি ছিলো সেই ঘরে? থরে থরে কোথায় রাখতো লুঙ্গি ও সাদা পিরহান? কে ধুয়ে দিতো পবিত্র অন্তর্বাস? সেই ঘরে আয়না কি ছিলো? কি দিয়ে আঁচড়াতো চুল? চিরুনির ভাঙা দাঁতে খাবি খেয়ে ব্যথা পেতো কতগুলো চুল? যেনো কেউ নরম জমিন পেয়ে ঢুকিয়েছে শূল।

ফুরিয়ে গেলে চুরুটের ঝাঁজালো তামাক, কে দিতো

যোগান? কে এনে দিতো ম্যাচ শেষ হলে আরকের কাঠি? আদ্র আরক  কি জ্বলতো ঠোকায় ঠোকায়?

আঙুলে ব্যাথা পেলে কে দিতো মলম? সেই তুই বেঁচে থাক জনম জনম।

একবার কারাগারে জ্বর হয়েছিলো তাঁর। একশত তিন। কে ঢেলেছিলো পানি মাথার তালুতে? কে মুছে দিয়েছিলো গা ও গতর? রুমাল কি ছিলো তাঁর সাথে?  কি দিয়ে মুছতো সে সর্দির জল? টুথব্রাশ ক্ষয়ে গেলে দাঁত কি কষ্ট পেতো তাঁর? রক্ত ঝরতো তখন  কতটুকু আর। কতটুকু পবিত্র  রক্ত চুষেছিলো প্রমত্ত ছারপোকা? মশারির ছিদ্র দিয়ে ঢুকতো কয়লক্ষ মশা? তখন কি ডেক্সগু জ্বর ছিলো এখন যেমন?

সপ্তাহ শেষে দেখতে যেতো যখন রাসেল, হাসিনা রেহানা কারাগার গেটে।  তখন কি ফেলতো জল তাহাদের বাবা? জলচোখে দেখতে কি পেতো.আত্মজ- আত্মজার মলিন মুখশ্রী। মুজিব কি শান্তনা দিতো,  আবেগে হতো আপ্লুত?

কিছু জানি, কিছু আমি জানিনি কক্ষনো? শুধু এটুকুই জানতে ভুলিনি, তাঁকে কষ্ট দিতো সাত কোটি মাটির মানুষ। যেনো হারিয়ে ফেলতো জ্ঞান? তাঁকে কি কষ্ট দিতো জনতার বুকে পিঠে বিদ্ধ হওয়া বেজন্মা বুলেট? যেনো তারা হারিয়েছে হুঁস। যেনো আগুনে পোড়ানো তুষ।

আমি দেখিনি কখনও, সেই কষ্টে কয় ফোটা অশ্রু ঝরতো বালিশে, কয়টা নিমগ্ন  স্বপ্ন রোজ রাতে মরে যেতো ইঁদুরের মতো। বিড়ালের তীব্র থাবায়। যে কিনা নিতান্ত অসহায়।

আজও জেগে আছে মুজিবের হাতপাখা হয়তো সেই লালঘরে। ছিলোনা বিদ্যুৎ তাই নিজ হাতে লাটিমের মতো ঘোরাতো সেই পাখা যুবক মুজিব। আদরের সিঁদুর দিয়ে  রাঙাতো লক্ষ মানুষ। মানুষের প্রাণ। যেভাবে চরাতো মানুষ চরকির মতো নিজস্ব  বৈভবে। সেই ভাবে পাখার হাতল। হাতপাখা ঘুরতে পাগল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares