স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু : শ্রদ্ধা নিবেদন : মালেকা বেগম

ক্রোড়পত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

শোকাঞ্জলি

স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু : শ্রদ্ধা নিবেদন

মালেকা বেগম

পরম শ্রদ্ধাভাজন বঙ্গবন্ধু,

আগস্ট মাস আর শ্রাবণের ধারা আমাদের কাঁদায়। বাংলাদেশ কাঁদে। ১৫ আগস্ট (১৯৭৫) আপনার নৃশংস হত্যকাণ্ড, আপনার পরিবারের হৃদয়ের প্রতিটি তন্ত্রীতে তীব্র বেদনার দাহ জ্বালিয়ে দিয়েছিল- আজও সেই আগুন জ্বলছে। শ্রাবণের ধারায় তা নিভে যায় না। বরং সমুদ্র তৈরি করে।

প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে বাংলাদেশের মানুষ সেই আগস্টের (১৯৭৫) দিনগুলোতে শুধু নয়; বছরের পর বছর, আজ পর্যন্ত। আন্দোলন সংগ্রামে আপনার আমাদের ভালোবাসায় বাংলাদেশকে আবার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এদেশের গণমানুষ। এখনও নানা বাধা নানা প্রতিকূল পরিবেশ আপনার স্বপ্নের বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত হতে দিচ্ছে না। রাজনৈতিক সরকারের স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠায় কৃতী আপনার সুযোগ্য কন্যা আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তবে রাজনীতির কৃতিত্বই সব সাফল্য আনে না- সেটা আপনি জীবন উৎসর্গ করে জেনেছেন। আজও আমরা প্রতিপদে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বাধা পাচ্ছি। সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমি- আমরা স্বপ্ন দেখছি ‘সোনার বাংলা’র।

আপনার ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন আমাদেরও স্বাপ্নিক করে তুলেছে। আমরা পড়ছি আপনার লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী। ‘১৯৫৫ সাল পর্যন্ত’ আপনার লেখা এই অসমাপ্ত আত্মজীবনী ১৯৬৬-৬৯ সালে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দি থাকার সময়ে রচিত।

(সূত্র : শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত ০৭. ০৮. ২০০৭ সাব-জেল শেরেবাংলা নগর ঢাকা। বইটির ভূমিকা)

আপনার কন্যা, আমাদের প্রধানমন্ত্রী মাননীয় শেখ হাসিনার উদ্যোগে ও বহুজনের পরিশ্রমে-সহায়তায় বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ সালে।

যাঁর তাগাদায় প্রচেষ্টায় আপনি আত্মজীবনী লেখা শুরু করেছিলেন, তিনি আপনার প্রিয়তম স্ত্রী রেণু, ‘বেগম ফজিলাতুন্নেছা’। আপনার লেখনীতে ইতিহাস উজ্জীবিত হয়েছে তো বটেই সেই সাথে সহধর্মিণীর প্রতি আপনার কৃতজ্ঞতাও ঝরে পড়েছে। আপনি লিখেছেন : ‘আমার সহধর্মিণী একদিন জেল গেটে এসে বলল, ‘বসেই তো আছ লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।’… ‘আমার স্ত্রী যার ডাকনাম রেণু- আমাকে কয়েকটি খাতাও কিনে জেল গেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন।  রেণু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।’  বইটিতে উল্লেখিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৯৬৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে রচনা শুরু করেছেন।

আপনার আত্মজীবনী অসমাপ্ত রয়ে গেল। জীবনই মাঝপথে থামিয়ে দিল, ধ্বংস করে দিল সামরিক আততায়ী বাহিনী। ষড়যন্ত্র করে মুশতাক আহমেদ ও জিয়াউর রহমান সামরিক শাসন শুরু করল।

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ আপনার জন্ম হয়েছিল তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। গোপালগঞ্জ এখন জেলা হয়েছে। আপনার স্মৃতিতে মধুমতী নদীর জল কল্লোল আনন্দ ধ্বনি তুলছে। দাদা, নানা, বাবা, মায়ের কথা লিখেছেন বিস্তারিত শব্দচয়নে। গুরুত্ব দিয়েছেন নিজের বাল্যবিবাহের কারণ উল্লেখ করে বিস্তারিত লেখার বিষয়ে।  ১২/১৩ বছর বয়সে অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয় তিন বছর বয়সের ‘রেণু’র সঙ্গে আপনার বিয়ে হয়েছিল। ফুলশয্যা হয়েছিল ১৯৪২ সালে।

পারিবারিক সেই আকস্মিক বাল্যবিবাহের বিশদ এক বর্ণনার মধ্যে আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন যে, মুসলিম আইন অনুযায়ী বাবা জীবিত অবস্থায় ছেলে সন্তান মারা গেলে তাঁর সন্তানেরা সম্পত্তি পায় না। বাবা হারা স্ত্রী রেণু যেন সম্পত্তি পান সেই ব্যবস্থা করতে তাঁর দাদা সম্পত্তি লিখে দিয়েছিলেন।

পৈতৃক সম্পত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে মেয়েদের অনেক বাধা এখনও রয়েছে। বাবার সম্পত্তি মেয়েরা ‘এক- তৃতীয়াংশ’ পাবেন, ছেলেরা পাবেন অবশিষ্ট সম্পত্তি। আপনার ‘স্ত্রী’কে তাঁর দাদা সম্পত্তি লিখে দিয়েছিলেন।

‘বাল্যবিবাহ’ বিষয়টি তখনও আইনের বাধাস্বরূপ ছিল না।

মা সায়েরা খাতুন থাকতেন গ্রামে। সমস্ত সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন। আপনি থাকতেন বাবার কাছে। তাঁর গলা ধরে ঘুমাতেন। বাবা-মায়ের স্নেহ মমতার কথা গুরুত্বের সাথে লিখেছেন আত্মজীবনীতে।

ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হয়ে গেলেন আপনি ১৯৪১ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করে ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময়ে। ১৯৪২ সালে হয়েছে বিয়ে- ফুলশয্যা। এদিকে রূপকথার শব্দচয়ন; অন্যদিকে লেখাপড়া, ছাত্ররাজনীতির কঠিন সংগ্রামের কথা। ১৯৪৬ সালের রাজনীতির মধ্যে তখন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাধার সংকট ঘনিয়ে  এসেছিল। সেই সময়ও ‘১৫ আগস্ট’ আপনার কর্মকাণ্ডের ইতিহাসে (পৃ. ৬৩) স্থান পেয়েছিল রাজনৈতিক ঘনঘটার সূত্রে। সেটা ছিল দেশ ভাগের আন্দোলন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আঘাতে আপনি জর্জরিত হয়েছিলেন।

সেই স্মৃতির বর্ণনায় পূর্ব বাংলার ছাত্রদের সহযোগিতার কথা লিখেছেন আপনি। এই বর্ণনা নারী আন্দোলনের যোগসূত্র তৈরি করতে সাহায্য করেছে। মন্নুজান হোস্টেল থেকে কয়েকজন ছাত্রলীগের মুসলিম ছাত্রী বেকার হোস্টেলে গিয়েছিলেন। আপনার মনে ছিল তাঁদের মধ্যে হাজেরা বেগম (মাহমুদ), হালিমা খাতুন (মিসেস নুরুদ্দিন), জয়নাব (বেগম মিসেস জলিল), সাদেকা বেগম (মিসেস সামাদ), দাঙ্গায় আহত ছাত্রদের ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছিলেন নিজেদের ওড়না ছিঁড়ে, শাড়ির আঁচল কেটে কাপড় সংগ্রহ করে।

লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে আশ্রিত রিফিউজিদের পাশেও ছিলেন নারীরা, ছাত্রীরা। কবি সুফিয়া কামাল, হোসনে আরা ইসলাম বেবী পরবর্তী সময়ে মিসেস মাযহারুল ইসলাম (স্থপতি); নরুন্নাহার ফায়জুন্নেসা এবং আরও অনেকের সাক্ষাৎকারে জানা যায় তাঁরা স্বেচ্ছাসেবীরূপে দুর্গত নারীদের সাহায্য করেছিলেন।

আপনি তথ্য দিয়েছেন কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় মহিলাদের সাহায্যে এগিয়ে গিয়েছিলেন জনাব সোহরাওয়ার্দীর মেয়ে মিসেস সোলায়মান, নবাবজাদা নসরুল্লাহর মেয়ে ইফফাত নসরুল্লাহ, বেগম আক্তার আতাহার আলী, সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদিকা নূরজাহান বেগম, বেগম রশিদ, রোকেয়া কবির। মন্নুজান হোস্টেলের ও ব্রাবোর্ন কলেজের মেয়েরা রাত-দিন কাজ করেছেন।

‘পাকিস্তান মুসলিম লীগ’-এর সদস্য আনোয়ারা খাতুনের ভূমিকার কথা জানতে পারছি আপনার স্মৃতিচারণে।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি’  দিবস ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ’ থেকে। কয়েকজন ছাত্রী সেই আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পুলিশের লাঠিচার্জের শিকার হয়েছিল।

আপনার ‘আত্মজীবনী’ থেকে তথ্য জানছি যে, আপনারা যখন জেলের ভিতরে বন্দি ছিলেন- রাজবন্দি ছিলেন (১৯৪৮); তখন দেয়ালের বাইরেই অবস্থিত মুসলিম গার্লস স্কুলের ছোট ছোট মেয়েরা স্লোগান দিত ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই,’ ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’ ইত্যাদি।

আপনি এই প্রসঙ্গে লিখেছেন :

‘এই সময়ে শামসুল হক সাহেবকে আমি বললাম, হক সাহেব ঐ দেখুন, আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছেন। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না।’ (পৃ. ৯৫)

বাংলা ভাষা যে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেয়েছে বাঙালি ছাত্রসমাজের রক্তের উৎসর্গে- সেটা প্রচারিত শ্রদ্ধা নিবেদনে, শোকদিবসে মেয়েরা- কিশোরীরা-তরুণ ছাত্রীরা যে কতটা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে তা আপনি আত্মপ্রত্যয়ে উদ্ভাসিত হয়ে বলেছিলেন।

নানা সূত্রে লিখেছেন এমএলএ আনোয়ারা খাতুন ও ক্যাপ্টেন শাহজাহানের স্ত্রী বেগম নূরজাহানের আবদানের কথা।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের নিম্নবেতনভোগী কর্মচারীদের ধর্মঘটের সমর্থনে আপনার নেতৃত্বে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্ররা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল। আপনিসহ সাতাশ জন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শর্তসহ বানুকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। মেয়েদের মধ্যে লুলু বিলকিস বানুকে বহিষ্কার এবং নাদেরা বেগমকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

একদিকে রাজনীতির স্মৃতিচারণ, অন্যদিকে স্ত্রী-সন্তানদের ত্যাগ ও কষ্টের স্মৃতি অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পাতায় পাতায় লিখেছেন- আপনার সংগ্রামী অসমাপ্ত জীবন ফুটে উঠেছে।

বইটি হাতে নিয়ে মনে হাতে পারে ১৯৭৫এ আপনাকে হত্যা করার কারণে বুঝি-বা আত্মকাহিনি অসমাপ্ত রয়ে গেছে। বই পড়ে শেষ করলে জানা যায় ১৯৫৪ পর্যন্ত পূর্ববাংলার রাজনীতি নিয়ে লেখার পর আর লেখা হয়নি আপনার। সেই অর্থে এই আত্মজীবনী অসমাপ্ত।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনার সে সময়ের  রেসকোর্সের ময়াদানে- বঙ্গবন্ধু, আপনার ভাষণ শোনার জন্য দশ লক্ষাধিক (?) জনতার মধ্যে আমরা মহিলা পরিষদ সংগঠনের সভানেত্রী কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে সমবেত হয়েছিলাম। পাড়া-মহল্লা থেকে শত শত মহিলা মিছিল করে যোগ দিয়েছিলেন সেই সভায়। নারী শ্রোতাদের মধ্যে তীব্র আবেগ ও সংগ্রাম দৃঢ় হয়ে উঠেছিল যখন আমরা শুনলাম আপনি বলছিলেন…

‘আমি আগে বলে দিয়েছি, কোনো গোলটেবিল বৈঠক হবে না।… যারা আমরা মা-বোনের কোল শূন্য করেছে, তাদের সাথে বসব আমি গোলটেবিল বৈঠকে; আর যদি একটি গুলি চলে, তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো- যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। … এবারের  সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ (-দৈনিক পূর্বদেশ, ঢাকা। ৮ মার্চ) ঐতিহাসিক সেই ভাষণে আপনি নারী সমাজের সংগ্রামী অংশগ্রহণের স্বীকৃতি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকাকে দৃশ্যমান করে তুলেছিলেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের নাগরিক সমাজের প্রায় অর্ধাংশ নারীসমাজ গণ-আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় সার্বিক ভূমিকা পালনে সক্রিয় ও দৃশ্যমান হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু, আপনিই তাদের প্রতি প্রথম এই আহ্বান জানালেন।

সে সময় অন্যকোনো সামাজিক, রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকাকে এভাবে চিহ্নিত করেননি। বাম রাজনৈতিক-ছাত্র দলে নারীদের ভূমিকা ছিল। সামাজিকীকরণের প্রভাব তাদের রাজপথে-সংগ্রামে ও সশস্ত্র আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণের গুরুত্বকে বুঝতে শেখায়নি। সমাজ কেবল শিখিয়েছে নারী ঘরে থাকবে, বাইরে বেরিয়ে আসবে ছাত্র-জনতা।

আমরা নারী সমাজ আপনার আহ্বানে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আন্দোলনে বলীয়ান হয়েছিলাম। ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে’- আপনার এই আহ্বানকে নারী সমাজ আক্ষরিক অর্থেই গুরুত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

আপনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নেত্রীরা বেগম বদরুন্নেসা আহমেদ, নূরজাহান মুরশিদ, সাজেদা চৌধুরী, আইভি রহমান, মমতাজ বেগম, রাফিয়া আখতার ডলি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন।

বঙ্গবন্ধু, আপনি যেদিন ধানমণ্ডি  ৩২ নম্বরের বাসায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন- কোথাও যাবেন না, আত্মগোপন করবেন না, কারণ দেশের মানুষের ওপর তাহলে নির্মম আঘাত নামবে। পাকবাহিনী আক্রমণ চালাবে। আপনাকে পাকবাহিনী বাসা থেকে গ্রেফতার করেছিল। শুরু হয়ে গিয়েছিল মানুষের ওপর অস্ত্রচালনা।

১৯৭১-এর মার্চ মাসে দেশের সেই যুদ্ধবিধ্বস্ত সময়ে আপনি বন্দি থাকার কারণে ‘মুজিবনগর সরকার’ গঠন করে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল স্বাধীনতা সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধু আপনি ছিলেন আমাদের জাতীয় নেতা। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মাহুতির বিনিময়ে পাকসেনাদের অত্যাচার-নির্যাতনে নারীদের জর্জরিত জীবন যন্ত্রণার বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ২০১৯ সালে নতুন নতুন বাধা সংকট উত্তরণের পরীক্ষা দিচ্ছে।

স্বাধীনতার পরে আপনি যখন পাকিস্তান থেকে মুক্তি অর্জন করে দেশে ফিরেছিলেন, দেশের সকলের সঙ্গে আমরা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ থেকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিলাম। আপনি পাকিস্তানের বন্দিশালা থেকে মুক্তি অর্জন করে ফিরেছিলেন দেশের প্রধান শাসনতান্ত্রিক নেতা হিসেবে। জনগণের অবিসংবাদিত নেতা তো ছিলেনই আপনি। আপনার কাছে ১৯৭৩ সালে নারীসমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে একটি স্মারকলিপি দিয়েছিলাম।  আমাদের নেত্রী সুফিয়া কামাল এবং বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, মহিলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন মহিলা সমিতির নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধভাবে স্মারকলিপি তৈরি করেছিলেন।

আমরা বলেছিলাম নারী সমাজের সমমর্যাদার জন্য সরকারি পদক্ষেপ প্রয়োজন। নারীর পেশা ও চাকরির সুযোগ বাড়াবার দাবি জানিয়েছিলাম আমরা। সকল এলাকার সামাজিক নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে নারীদের মুক্ত করার দাবি জানিয়েছিলাম আমরা। সামাজিক নিপীড়ন বন্ধে যৌতুক প্রথা নিষিদ্ধ করার আইন, বিবাহবিচ্ছেদ মেয়েদের সমান অধিকার, বাল্যবিবাহ বন্ধের আইন, শিশুশ্রম বন্ধে ব্যবস্থা, চা শ্রমিকদের শ্রম লাঘব ও নানা সমস্যা বন্ধ করা, নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর চলাফেরাসহ সকল কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার ব্যবস্থা ইত্যাদি বহু দাবি জানিয়ে স্মারকলিপিতে নারীর রাজনৈতিক অধিকারের দাবিও জানিয়েছিলাম আমরা।

মহিলাদের সংরক্ষিত ১৫টি আসনে সে সময়ের পরোক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা বাতিল, জনগণের  প্রত্যক্ষ ভোটে আসন সংখ্যা আরও বাড়িয়ে ভোটের দাবি জানানো হয়েছিল।

আপনি আমাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন আলোচনার জন্য। সুফিয়া কামাল, নীলিমা, ইব্রাহিম, সাজেদা চৌধুরী, নূরজাহান মুরশিদ, ‘বেগম সম্পাদিকা নূরজাহান বেগমসহ সমবেত আমাদের সকলকে বলেছিলেন : ‘নারীর প্রগতি দ্রুত হবার নয়। ধীরে ধীরে সব হবে। আগের সমাজ বদলাচ্ছে। নতুন সমাজে নতুন ভাবে সব হবে।’ রাজনৈতিক স্বাধীনতার আপনি ছিলেন বিপ্লবী নেতা। নারী স্বাধীনতার বিষয়ে ধীরে অগ্রসর হওয়ার কথা বলেছিলেন বলে আমি-আমরা যথেষ্ট মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলাম।

সমাজ আজও নারীর জন্য অনুকূল অবস্থার ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি। রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশে আপনার সুকন্যা শেখ হাসিনা তিনবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বিএনপি, জাতীয় দলসহ আরও বিভিন্ন দল থেকে নারীর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

কিন্তু সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্য দিয়ে দেশের নারী সমাজকে অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

আমরা বাংলাদেশে অনেক উন্নতি যেমন দেখতে পাচ্ছি; তেমনি বহু সমস্যার মধ্য দিয়ে নারীদের জীবনও সংকটাপন্ন হচ্ছে।

এ রকম সময়ে আপনার প্রয়োজনীয়তা আমরা সকলেই অনুভব করি। কিন্তু আপনি মাত্র তিনটি বছর বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় ছিলেন। আজ আপনার নির্মম হত্যাকাণ্ডের শোক জানাতে গিয়ে নানা কথা মনে হলো। বাংলাদেশেকে সুন্দর-সমৃদ্ধ করতে হবে আমাদেরই।

মালেকা বেগম : লেখক, শিক্ষাবিদ

প্রতিকৃতি : আলপ্তগীন তুষার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares