১৯৭১ : রক্তে জেগে ওঠে : স্বপন নাথ

প্রচ্ছদ রচনা : সেরা ১২ বইয়ের ডালি

১৯৭১ : রক্তে জেগে ওঠে

স্বপন নাথ

কালিক প্রয়োজনে সম্প্রতি আঞ্চলিক, প্রান্তিক শিরোনামে অনেক গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আঞ্চলিক ইতিহাস বোঝাতে কেন্দ্র ও প্রান্তের মধ্যে মার্জিন রাখার প্রচেষ্টা রয়েছে কি না জানি না। কেন্দ্র বা প্রান্ত বলে কিছু কি আদৌ আছে? আবার প্রান্তবিহীন কেন্দ্র হয় না। ইতোমধ্যে আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক গবেষণা এবং তথ্য সংগ্রহের কাজ হয়েছে ও হচ্ছে। মূলত, গবেষকরা সব বিষয়ে গভীরে যাবার প্রচেষ্টারত। এ সুযোগে গবেষকগণ এক সময়ের অগ্রাহ্য ও উদাসীনতায় থাকা তথ্য তুলে আনার প্রয়াস পেয়েছেন। লেখক, গবেষক ইমতিয়ার শামীমও সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেন্দ্রিক একটি গবেষণা উপস্থাপন করেছেন তাঁর রক্তে জেগে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস : সিরাজগঞ্জ (২০১৭) গ্রন্থে। এরূপ আঞ্চলিক ইতিহাসের সূত্রেও ১৯৭১ সালে সংঘটিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অনুধাবন করা সম্ভব। সকল প্রান্তীয় তথ্যে-উপাত্তে তৈরি করা সম্ভব আমাদের জাতি গঠনের ইতিহাস। কারণ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এদেশের জনগণের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। বিশেষত, এ জনযুদ্ধে সারাদেশের সাধারণ মানুষের সংশ্লিষ্টতা বিস্ময়কর।

যদিও কিছু লোক আলবদর-আলশামস-রাজাকার পরিচয়ে বিপক্ষে ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইমতিয়ার শামীম এ-গবেষণা প্রতিবেদনকে গ্রন্থাকারে উপস্থাপনায় বিভিন্ন অধ্যায়ভিত্তিক শিরোনামায় যেমন :  ভূগোল ও মানুষ : মুক্তির অনুপ্রাণন; বিদ্রোহ যুগে যুগে : জলে ও সমতলে; সাতচল্লিশ থেকে সত্তর : মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রাকপর্ব; স্বাধীনতার প্রস্তুতি ও অসহযোগের দিনরাত্রি; পাকিস্তানি সেনামুক্ত এক মাস; সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি; সম্মুখ ও গেরিলা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা; গণমাধ্যম : আরেক রণাঙ্গন; পাকিস্তানি প্রশাসন ও দালালদের ভূমিকা; গণহত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অপরাধ; মুক্ত সিরাজগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসন ও তারপর প্রভৃতি এগারো অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। পরিশিষ্টাংশে শহিদ ও গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের তালিকা; সংবাদপত্রে প্রকাশিত দালাল-রাজাকারদের তালিকা; অভিযুক্ত দালালদের তালিকা; এবং নির্ঘণ্টে ব্যক্তি, স্থান, নদী ও বিষয়পঞ্জির নাম উল্লেখ করেছেন। সবশেষে সংযোজিত হয়েছে সহায়ক গ্রন্থ ও আলোকচিত্র। মূলত, তিনি অধ্যায়গুলোতে ইতিহাসের কালক্রম অনুযায়ী ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। আন্দোলন সংগ্রামের পরম্পরা বিনির্মাণ করেছেন। এর ফলে পাঠক সহজেই গড়ে ওঠা বিদ্রোহের ক্রম বুঝে নিতে সক্ষম হবেন। উপস্থাপিত তথ্য থেকে আমরা জেনে নিই যে, একাত্তর একদিনে আসেনি। শুধু সিরাজগঞ্জ নয়, আমরা যদি বাংলাদেশের সকল অঞ্চলের ইতিহাস আলাদা আলাদা পাঠ করি, তা হলে একই অবয়ব লক্ষ করা যাবে। দীর্ঘ সময়ের আন্দোলন-সংগ্রাম-দ্রোহের চূড়ান্ত পরিণতি হলো একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বলা বাহুল্য যে, এ মহামুহূর্তের নির্মাতা হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রাম ও এর পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া আকাক্সক্ষা সম্পর্কে এ-গ্রন্থের প্রথম ফ্ল্যাপের ক্ষুদ্র কথন অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য বলে মনে করি :

‘অনন্তকাল আমাদের রক্তে জেগে থাকবে সেই সময়। স্বপ্নদেখা বিদ্রোহী মানুষেরা তখন ভালবেসে যুদ্ধে গিয়েছিল, স্বদেশকে মুক্ত করেছিল। এ এক মহাআখ্যান। প্রায়-ঔপনিবেশিক শাসন, অর্থনৈতিক- সামাজিক বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষায় সারাদেশের মতো সিরাজগঞ্জের জনগণও ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পথে হেঁটেছিল। সিরাজগঞ্জে এই মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিত কী করে গড়ে উঠেছিল, কীভাবে সংগঠিত হয়েছিল, বাঁধন ছেড়ার প্রত্যয়ে জনগণকে জাগিয়ে তুলতে রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো দিনের পর দিন কী প্রস্তুতি নিয়েছিল, সাহসের মুখগুলো জীবনকে তুচ্ছ করে কোথায় কী যুদ্ধ করেছিল আর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কী ভয়ংকর নৃশংসতায় এ অঞ্চলের মানুষকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল নির্মোহ গবেষণার মাধ্যমে তা তুলে ধরা হয়েছে এ গ্রন্থটিতে। মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাসে এটি এক অনন্য সংযোজন।’ 

ইমতিয়ার শামীম পরিকল্পিতভাবে এ গবেষণাকর্মটি সম্পাদন করেছেন। ফলে, বিবরণে ও তথ্য উপস্থাপনে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ও নিষ্ঠাবান ছিলেন বলেই মনে হয়েছে। আমরা লক্ষ করি আঞ্চলিক ইতিহাস রচনায় অনেকের মধ্যে দ্রুততার সাথে সম্পন্নের প্রবণতা। এখানে লেখক এ গবেষণায় খুব নিবিড় ও তথ্যের যথার্থতা নিরূপণের প্রয়াস পেয়েছেন। এ লক্ষে পূর্বাপর ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয়াবলি তিনি তুলে এনেছেন। লক্ষণীয়, এ প্রতিবেদন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হলেও এ ভূগোলের মানুষ ও তার উত্থানের নানা ঘাত-প্রতিঘাত; ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি; এ ভূখণ্ডের মানুষের মুক্ত হওয়ার আকাক্সক্ষা বিবৃত করেছেন। এ দেশে ও সিরাজগঞ্জে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষক আন্দোলন হয়েছে। এসব আন্দোলনের প্রভাবে মানুষের মনে-মননে মুক্তি ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা জেগেছে, ইতিবাচক পর্বান্তর ও রূপান্তর ঘটেছে। এসব তিনি পৌনঃপুনিক উপস্থাপন করেছেন। বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ সাহসী হয়ে ওঠে। স্বীয় অভিজ্ঞতা অর্জন একটি পর্যায়ে নিয়ে যায়। ফলে, নিজেদের মাঝে একপ্রকার প্রস্তুতি ও সংগ্রামের প্রেরণা জেগে ওঠে। 

এ ছাড়া একটি অঞ্চলে শুধুই যে এমনিতে সংগ্রামের ইতিহাস তৈরি হয় তা নয়; এ অঞ্চলের মাটি, পরিবেশ ও প্রতিবেশ মানুষের মনোজগৎ গঠনে বিশাল ভূমিকা রাখে। আমরা জানি অন্যান্য নদী ও যমুনাবিধৌত এলাকা হচ্ছে সিরাজগঞ্জ। ফলে, যমুনা নদীর উত্তাল ঢেউ, জোয়ার-ভাটা, এর পলিমাটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবনাচার গঠনে বিশেষ অবদান ও ভূমিকা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সাথে প্রতিবেশ-সংলগ্নতা বিশ্লেষণ এবং লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিবেচনায় রাখতে হয়। অন্তত পাঠক হিসেবে আমার কাছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যা সচরাচর এড়িয়ে যান অনেকেই। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যেমন প্রতিটি ঘটনাকে তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, তেমনি পর্যবেক্ষণ প্রচেষ্টাও লক্ষণীয়। লেখক খুব অপ্রিয় একটি বিষয়Ñ ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণে বস্তুনিরপেক্ষ থেকেছেন। সর্বোপরি ব্যক্তিকে উহ্য রেখে সমষ্টিকে পর্যবেক্ষণ ও প্রাধান্য দিয়েছেন। যা এ গবেষণার ব্যতিক্রম ও অনন্য একটি দৃষিকোণ বলে মনে করি।

বস্তুত, ইমতিয়ার শামীম বাংলা একাডেমির মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি প্রকল্পের জন্য এ কাজটি শুরু করেছিলেন। কিন্তু নিকট অতীতের এক পর্বে রাষ্ট্রযন্ত্রের উপেক্ষায় এ গবেষণাকর্ম সম্পাদিত হয়নি। বিষয়টি পিছিয়ে গেলেও মন্দ হয়নি। বরং লেখক এ সময়ের মধ্যে তাঁর গবেষণাকে আরও বেশি তথ্যসমৃদ্ধ করতে পেরেছেন। পরিমার্জন ও প্রয়োজনীয় সংশোধন করেছেন। প্রাক-কথনে তাঁর নিজের ভাষ্য,Ñ ‘২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে। সরকারের হস্তক্ষেপে বাংলা একাডেমি তখন এ প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করে এবং প্রকল্পের সব পাণ্ডুলিপি ও দলিল পাঠিয়ে দেওয়া হয় মন্ত্রণালয়ে নবগঠিত মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে…। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এসব পাণ্ডুলিপি প্রকাশ দূরে থাক, গুদামে আটকে রাখে।’

[প্রাক-কথন, পৃ. ৮]

লেখক শামীমের কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ-পরববর্তী বিচ্যুতি এবং বিভিন্ন সরকার ও রাষ্ট্রীয় কৌশলের পরিণাম। নিয়তির প্রভাব মিলিয়ে আমাদের দেখতে হয় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে। অর্থাৎ, মুক্তিযুদ্ধ সর্বজনীন অর্জনের বিষয় হলেও ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একাত্তরের পরাজিত ও ক্রম-সুপ্ত থাকা বিরোধীশক্তি আবার সামনে চলে আসে। এমনকি ক্ষমতার কেন্দ্রে আসীন হয়। ক্ষমতার এমন বিরূপ রূপান্তর আমাদের চেতনাকে অনেক দূরে ঠেলে দেয়। আমরা প্রতিনিয়ত বিচ্যুত হতে থাকি। এ সংকটের মধ্যে ইমতিয়ার শামীমকৃত গবেষণার মতো কাজ যত বেশি হবে ততই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক। আমরা জেনে নিতে পারি একাত্তরে সারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও বাস্তবতা। প্রসঙ্গত, বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উল্টো কথা কম বলা হয়নি। একাত্তর-পরবর্তী রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে অনেকের মধ্যে বিশ্লেষণের পথপদ্ধতি ভিন্ন থাকতে পারে; কিন্তু কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, পঁচাত্তর ট্র্যাজেডির পর আমরা মূলত অন্ধকারে প্রবেশ করি। এ সুযোগে ইচ্ছেমতো ইতিহাসের বয়ান রচনা শুরু হয়। দীর্ঘদিন মিথ্যা বলা ও শোনা থেকে সমূহ বিচ্যুতির সূত্রপাত। এ কারণে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও জাতিগঠনের ইতিহাস পাঠ জরুরি। সেক্ষেত্রে ইমতিয়ার শামীম লিখিত রক্তে জেগে ওঠে অনন্য সংযোজন।

আগেও উল্লেখ করা হয়েছে লেখক সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার শুরুতেই সেখানের প্রতিবেশ, জলবায়ু ও মানুষের রেখাচিত্র বিশ্লেষণ করেছেন। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বলেই আমাদের মনে হয়েছে। বলাবাহুল্য যে, লেখক কাজ করতে তাঁর পঠন-পাঠন ও তথ্য সংগ্রহের অভিজ্ঞতা মনে রেখেছেন। আমরা জানি, সিরাজগঞ্জে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের পরম্পরা রয়েছে। ফলে, ওই চেতনা আন্দোলিত করেছে এ ভূমির মানুষকে। এ আলোকে লেখক সিরাজগঞ্জের প্রকৃতি, ভূমি ও মানুষকে যথাযথ বিশ্লেষণ করেছেন। এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন বিখ্যাত অনেক ব্যক্তি। পঞ্চকবির একজন রজনীকান্ত সেনও রয়েছেন। যাঁর দেশাত্মবোধক গান এ-দেশের মানুষকে দেশপ্রেমে প্রেরণা জুগিয়েছে। এখানে রজনীকান্তের একটি কবিতার পঙ্ক্তি লেখক উল্লেখ করেছেন। উল্লেখযোগ্য যে :

‘সমতল ভূমি ও বিভঙ্গময় নদী প্রকৃতিময় সিরাজগঞ্জের মানুষ তাই একইসঙ্গে সহজিয়া ও বিদ্রোহী বোধসম্পন্ন। …রজনীকান্তের সারিতে রয়েছেন গগনহরকরাÑ যাঁর সুরের প্রভাব মিশে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ সঙ্গীতে। যা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছে এ দেশের জাতীয় সঙ্গীত। …একাত্তরের সিরাজগঞ্জেও আমরা দেখতে পাই এ রকম হাজার হাজার সৃজনশীল আর বিদ্রোহী মানুষকে। তাঁরা ছড়িয়ে পড়েন সারা দেশে যোদ্ধা ও গেরিলা হয়ে। এ জনপদের সমতল ভূমি ও নদীপ্রকৃতিময় পরিবেশকে ভিত্তি করে যুদ্ধের রণকৌশল ও রণপদ্ধতি নির্ধারণ করেন তাঁরা।’

[পৃ. ২৮-২৯]

অনেক গুণীজনের মধ্যে কয়েকজন হলেন : ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, অমূল্যনাথ লাহিড়ী, আবদুল মমিন তালুকদার, হোসেন তওফিক ইমাম, আমির হোসেন ভুলু, আবদুল লতিফ মির্জা, আবদুল আজিজ মির্জা, কুয়াত ইল ইসলাম, ড. মযহারুল ইসলাম, কবি জুলফিকার মতিন প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁদের অবদান জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। লেখক আরও অনেকের নাম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এখানে এত দীর্ঘ তালিকা উল্লেখ করা হলো না। কোনো পাঠক ইচ্ছে করলে মূল পাঠে সেগুলো দেখে নিতে পারেন। 

লেখক এ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে বলেছেন, ‘সমৃদ্ধ অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী মুক্তিসংগ্রামে নিবিড় রাজনৈতিক- সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পৃক্তি এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা সিরাজগঞ্জের মানুষকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও অনন্য ভূমিকা রাখার শক্তি জুগিয়েছে। কারণ প্রতিবেশ প্রকৃতি আর জনপদবাসীর অতীত ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয় জনমানুষের জীবনযাপনে তার শক্তি সাহস, উদ্যমের, প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের বিশেষ ধরন।’ [পৃ. ২৪] বস্তুত, নদী-বিধৌত ও বেষ্টিত হওয়ার ফলে এ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য আর কোনো এলাকার সাথে মেলানো যায় না। আর এ জলের স্রোতধারাই এ জনপদের জন্ম দিয়েছে ও আলাদা করেছে অন্য অঞ্চল থেকে। এ জনপদ খুব পুরনো না হলেও এ যেন বাংলাদেশের ভেতরে একের ভেতরে আরেকটি একক ও আলাদা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে অনিবার্যভাবে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন এ অঞ্চলের সে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে। এর বিবরণে তিনি সিরাজগঞ্জের ভূ-মানচিত্রের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন নদীর গতিপথ ব্রহ্মপুত্রে মিলনের ফলে যমুনা বিশালত্ব ধারণ করেছে এ সিরাজগঞ্জে। স্বভাবতই যমুনার গুরুত্ব রয়েছে এ পরিবেশের ভাঙা-গড়ায়। তিনি লিখেছেন,-‘অনেক বড় বড় বালিয়াড়ি এই যমুনা নদীকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও ঢাকা জেলার সঙ্গে সিরাজগঞ্জ জেলার সঠিক সীমারেখা তৈরি আজও সম্ভব হয়নি। কেননা চর আর বালিয়াড়িগুলো একেক জায়গায় জেগে ওঠে। আবার ডুবে যায় বর্ষাকালে। চরের জমির মালিকানা নিয়ে ঝগড়া, হাঙ্গামা আর মারামারি ও মামলা গত কয়েক দশকেও ছিল এ অঞ্চলের মানুষের নিত্যসহচর। তবে সঠিক সীমারেখা তৈরি করা না গেলেও লেখা যায়, সিরাজগঞ্জ জেলার পূর্বদিক দিয়ে প্রায় আশি মাইল জায়গাজুড়ে বিস্তৃত যমুনা নদী ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও ঢাকা জেলার সঙ্গে সিরাজগঞ্জের সীমারেখা তৈরি করেছে। … জনপদবাসীর সংস্কৃতিতেও প্রভাব ফেলেছে যমুনা নদী। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ উত্তাল যমুনাও প্রাকৃতিক এক যোদ্ধা হয়ে ওঠে, মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে এ নদীর সখ্য পাকিস্তানিদের ঠেলে দেয় অনিবার্য পরাজয়ের দিকে। [পৃ. ২৭-২৮] ফলত, মুক্তিযুদ্ধের সময় সৃজিত স্লোগান- ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’ বাস্তব হয়ে ওঠে সিরাজগঞ্জের নদী, প্রতিবেশ ও মানুষের ঐক্যে।

বস্তুত, বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শাসনের বিপক্ষে এবং মানুষের মুক্তির জন্য যেসব আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, সবগুলোতেই এ অঞ্চলের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ইতিহাসের বিভিন্ন ধাপে অনেক সংগ্রামীর জন্ম হয়েছে এ অঞ্চলে। বিশেষত, কৃষক আন্দোলনের কথা স্মরণীয়। কওমি জুট মিল স্থাপনের পর কৃষক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয় শ্রমিক আন্দোলন। বিভিন্ন পর্বে ভারতবর্ষের অন্য অঞ্চলের সাথে সিরাজগঞ্জে সংঘটিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আন্দোলনের কথা লেখক উল্লেখ করেছেন। বলা বাহুল্য যে, এসব আন্দোলন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের সংবেদনা তৈরিতে অবদান রাখে। এর মধ্যে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, কৃষক-প্রজা বিদ্রোহ, তেভাগা ও সলঙ্গা বিদ্রোহ ইত্যাদি। সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা বিদ্রোহের বিবরণ কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস পাঠেও জানার সুযোগ আছে। এ সলঙ্গা বিদ্রোহ সমগ্র ব্রিটিশ-ভারতকে আন্দোলিত করে। ১৯২২ সালের ২৭ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনির নির্বিচারে এমন গণহত্যা ভারতবর্ষ ও সারা পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দেয়। সলঙ্গা বিদ্রোহের নায়ক ছিলেন সেকালের তরুণ মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। ওই দিন সলঙ্গায় প্রায় চার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়।

দেশভাগ, ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়া এবং উপনিবেশমুক্ত হয়ে আবার পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা। এমন হবে তা অবশ্যি এদেশের মানুষ ভাবতে পারেনি। দিন না যেতেই পাকিস্তানের উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হয়। সাধারণ মানুষের কোনো বিরাম নেই। অর্থাৎ, মুক্তি আন্দোলনের পর্যায়ক্রমে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত পুনরায় অবিরাম সংগ্রামের পথেই জীবন চালাতে হয় সিরাজগঞ্জবাসীকে। তা অবশ্যি বিচ্ছিন্নভাবে নয়। সারাদেশেই এ প্রক্রিয়া চলমান ছিল। সেকালে এ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তির আশায় যে ভূমিকা রেখেছিল, ফলে কিছুই পেল না। যে কারণে ওই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ছিল প্রতিটি বাঙালির কর্তব্য। লেখকের বর্ণনা থেকেই জানতে পারি, দেশভাগের পরপরই এখানে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, সাধারণ মানুষ অন্তরে, চিন্তা-ভাবনায় বুঝে নেয় পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে একধরনের রাজনৈতিক খাদে পড়ে যায় পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা। ফলে, এ বেদনা নিয়েই মহান ভাষা আন্দোলনে সিরাজগঞ্জবাসী অংশগ্রহণ করে। ১৯৫১ সালে তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের জনসভা অনুষ্ঠিত হয় এখানে। এ জনসভায় যোগ দেওয়া একজন কর্মীর লেখা ও গাওয়া একটি গান লেখক উল্লেখ করেছেন। বস্তুত, এ গানটি একটি ভিন্নচিন্তাকে স্পষ্ট করে দেয় :

পাষাণ নুরুল আমীন তুমি বিনা বিচারে

জেলে দিয়েছ কারে?

ভাসানীরে দিয়ে জেলে

ঘুমের মানুষ জাগাইলে।

আপন হাতে আগুন দিলে

আপনার ঘরে

জেলে দিয়েছ কারে?

কাছে নিয়ে শেখ মুজিবকে বলছে ভাসানী

কর্মপথে মনে রেখো আমার এই বাণী

সাধুবেশে তোমার পাশে, মোনাফেকও জুটবে এসে

এই মোনাফেক মীরজাফরে রাখিও দূরে

জেলে দিয়েছ কারে?…

[পৃ. ৪৯]

এভাবে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে পৌঁছায় সিরাজগঞ্জবাসী। এ আন্দোলনগুলোর বাইরে স্থানীয় কিছু সমস্যা নিয়েও তারা আন্দোলন করেছে। মূলত, সকল আন্দোলনের স্রোত অবশেষে একই মোহনায় মিলিত হয়েছে। লেখক এসব তথ্য যথাসম্ভব উল্লেখে সচেষ্ট ছিলেন। এ ছাড়াও ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। স্থানীয়ভাবে ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত বিড়ি শ্রমিকদের আন্দোলন এবং খাদ্যসংকটে সাধারণ মানুষের গণবিক্ষোভের কথা উল্লেখযোগ্য। একদিকে আন্দোলন হলেও মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন বন্ধ হয়নি। ভাগ্য পরিবর্তনের কথা বললেও পাকিস্তান রাষ্ট্র আসলে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। এ বাস্তবতায় আন্দোলন ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না বাংলাদেশের মানুষের কাছে। তা ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানিরা এদেশের মানুষের ভাষা, আবহাওয়া, বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করেনি। রাষ্ট্র দখল করেছিল শুধু শোষণ ও শাসনের স্বার্থে।

পাকিস্তান সরকার শুধু বৈষম্য তৈরি করেছে; জনগণের কল্যাণে কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। এক্ষেত্রে অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। এ বিষয়ে সারা পূর্ববাংলার যদি হিসাব করা যায়, তা আর সীমিত সংখ্যার মধ্যে থাকবে না। ফলে, যে কোনো অঞ্চলের ক্ষেত্রেই এমন অন্যায় আচরণে মানুষের দ্রোহী হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। ১৯৬৩ সালের এমন প্রাসঙ্গিক একটি ঘটনার কথা উত্থাপন করেছেন লেখক। ‘ওয়াপদা বাঁধ নির্মাণের জন্য সিরাজগঞ্জ শহরের উত্তর অঞ্চলের চিথুলিয়া, কুড়িপাড়া, ঘুরকা, কাওয়াখোলাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের কৃষক-সাধারণ মানুষের বসতভিটা ও আবাদি জমি হুকুমদখল করা হয়। …অথচ তাদের মাত্র এক বছরের শস্যের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। এসব কারণে এসব অঞ্চলে কৃষকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ কৃষক পরিবারই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে থাকে। কৃষক সমিতি এদের নিয়ে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আন্দোলন গড়ে তোলে।’ [পৃ. ৭৫]  লেখক আরও কিছু স্থানীয় আন্দোলনের ঘটনা আলাদাভাবে তুলে ধরেছেন। যেমন : খাদ্যসংকট, বন্যা, নদীভাঙনে করণীয় কর্মসূচি সংক্রান্ত দাবি ইত্যাদি।

 এসব ছোট ছোট আন্দোলন যুক্ত হয় জাতীয় আন্দোলনের সাথে। ফলে, কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয় প্রান্তীয় মানুষের চেতনাগত বিবেচনা। এ জন্যই বলা হয় মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ একদিনে শুরু হয়নি। এর দীর্ঘ পথপরিক্রমা রয়েছে। ১৯৭১ পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাবলি, সংগঠন, সংগ্রাম, আন্দোলন সবই আসলে একসূত্রে গাঁথা। রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন, কৃষক, শ্রমিকসহ সকলেই তখন আন্দোলনমুখী। আমরা জানি রাজনীতির সাথে লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীদের বিশাল অবদান রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে। সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই সংস্কৃতিকর্মীরা যূথবদ্ধ হতে থাকেন। স্মরণীয়, ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ করা হয়। সিরাজগঞ্জ রবীন্দ্র-প্রভাবিত একটি অঞ্চল, আমরা সকলেই জানি। ওই বিষয়টি শুধু সংস্কৃতিকর্মী নয়, এলাকার সাধারণ মানুষও স্মরণ রাখে। হঠাৎ রাষ্ট্রের উদ্যোগে রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ, তা মেনে নিতে পারেনি কেউ। এ নিষেধের বিষয়টি আরও গতিময়তা দান করে আন্দোলনে। লেখকের বরাতে আমরা সেখানে ব্যতিক্রমী কিছু ঘটনা ও বিষয় লক্ষ করি। প্রতিবাদে, প্রতিক্রিয়ায় সে-সময় সিরাজগঞ্জের গ্রামে গ্রামে রবীন্দ্র- নজরুলজয়ন্তী উদ্যাপন করা হয়। 

ভাষা আন্দোলনে রাজনীতি ছিল, কিন্তু সংস্কৃতিকর্মীরা মূল কাজটি এগিয়ে দেন। এরপর সব আন্দোলন সংগ্রামে সারা দেশের মতো সিরাজগঞ্জের লেখক শিল্পীরাও সাহসী ভূমিকা পালন করেন। যা হয়তো একসময় কেউ ভাবেনি। এরকম একটি প্রতিবাদের ঘটনা উল্লেখ করেছেন লেখক,Ñ “১৯ এপ্রিল ১৯৭০-এ জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া মুক্তি পাবার কথা ছিল। কিন্তু সরকার ছায়াছবিটি নিষিদ্ধ করলে সিরাজগঞ্জের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীরা তার প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। পরে সরকার বাধ্য হয়ে এটি প্রদর্শনের অনুমতি দেয়। সিরাজগঞ্জের সিনেমা হল থেকে এ সিনেমা দেখে দর্শকরা বের হতেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে।’’ [পৃ. ১৩৭] 

সে সময় গণমাধ্যম সীমিত হলেও এর বিশাল ভূমিকা রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে। গণমাধ্যম ও সংস্কৃতিকর্মীরা একই সাথে কণ্ঠ, কলম, কাগজ দিয়ে ও অস্ত্রহাতে লড়াই করেছেন। এ প্রসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করেছেন লেখক। একটি হলো :

মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার, রাকসু নেতা কুয়াত ইল ইসলাম ও তাঁর যোদ্ধা দল বাংলার মুখ নামে পত্রিকা প্রকাশের সিন্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সিরাজগঞ্জ মহুকুমার বেলুকুচি থানার প্রত্যন্ত গ্রাম দৌলতপুরে একটি মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপন করে। এই পত্রিকা প্রকাশের সার্বিক কর্মকাণ্ড ও সম্পাদক হিসেবে অসীম সাহসী দায়িত্ব পালন করেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক কবি জুলফিকার মতিন। দ্বিতীয়টি হলো : উলিপুর গ্রাম থেকে আবদুস সোবহান মণ্ডলের স্ব-উদ্যোগে বেতারকেন্দ্র পরিচালনা।

এক্ষেত্রে মুক্তিযাদ্ধা ও সাহিত্যকর্মীদের সাহসী কর্মকাণ্ডের অনেক ঘটনা উল্লেখ করেছেন ইমতিয়ার শামীম। ‘‘প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের পর রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য সাজ্জাদ হোসায়েনের কর্মস্থলে তিনটি তালিকা পাওয়া যায়। এগুলো ছিল গুরুত্ব অনুসারে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী হত্যা ও নির্যাতনের পরিকল্পনার তালিকা। ধারণা করা হয়, এই তালিকা প্রণয়নে তারও সক্রিয় ভূমিকা ছিল। প্রথম কালো তালিকায় ছিল ‘দ্রুত হত্যা করা প্রয়াজন’ এমন শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের নাম। এই প্রথম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানার ড. মযহারুল ইসলাম এবং উল্লাপাড়া থানার জুলফিকার মতিনের নাম।’’ [পৃ. ৩৬৩-৩৬৪] 

 রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে একসময় রাজপথে নেমে আসেন। এর মাঝে গণঅভ্যুত্থান হয়ে গেল। ফলে, মানুষ আত্মবিশ^াসে আরও সাহসী হয়ে ওঠে। এদেশের মুক্তি ও স্বাধীনতা ভিন্ন অন্য কোনো মীমাংসা তাদের সামনে নেই। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক সহ্যক্ষমতাও মানুষের  কমে আসে। চারিদিকে শিক্ষার্থী ও জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও দ্রোহের উত্তেজনা। এর মধ্যে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাও ঘটতে থাকে। তখন পাকিস্তানি মিলিটারির ক্ষমতার অপব্যবহার আর জনগণ সহ্য করতে পারছে না। এমন সময় জামতৈল রেলস্টেশনে পাকিস্তানি মিলিটারি ও ছাত্র-জনতার হাতাহাতি ও সামরিক আদালতে মামলা উল্লেখযোগ্য। চলে আসে সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচন। এ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জের চারটি আসনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। পাকিস্তান জুড়েই প্রতিফলন ঘটে জনমানুষের অভিব্যক্তির।

বস্তুত, ছয় দফার পর অসহযোগ আন্দোলনেও সিরাজগঞ্জের অবদান স্মরণীয়। ছয় দফা আন্দোলনের প্রেরণায় সকলে উদ্বুদ্ধ হয়। সিরাজগঞ্জের মানুষ বিশ^াস রাখতে শুরু করে যে, এদেশ একদিন স্বাধীন হবে, এর বিকল্প নেই। উল্লেখযোগ্য যে, মুক্তিযোদ্ধা আমীর হোসেন ভুলু যেমন মাঠে ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাতেও। কত যে সাহসী ঘটনা, কত আর উদাহরণ দেওয়া সম্ভব। তবে লেখক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলিকে এড়িয়ে যাননি বলেই আমাদের ধারণা। এ প্রসঙ্গে আমীর হোসেন ভুলুর একটি সাহসী ঘটনা লেখক উল্লেখ করেছেন। ‘‘একটি কনভোকেশনে পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে তিনি আপত্তিকর বক্তৃতা দেন এবং তাদের রোষানালে পড়েন। ওই কনভোকেশনে ফাউন্ডেশেন অব পাকিস্তান শিরোনামে একটি সেমিনার ছিল, যাতে সব প্রদেশ থেকে একজন করে বক্তা ছিলেন। সেমিনারপত্রের ওপর আলোচনার সময় একজন বক্তা ছয় দফা আন্দোলন সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেন। তখন আমীর হোসেন ভুলুও উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘মাই ফেলোস, এ ডে উইল কাম হোয়েন এ স্টেট উইল এমার্জ ইন দ্য ইস্ট উইং।’ তাঁর এ মন্তব্যে সেখানে হইচই পড়ে যায়। হলের আলো নিভিয়ে তাঁর ওপর হামলা করে পাকিস্তানিরা। তিনি গুরুতরভাবে ছুরিকাহত হলেও খানিকটা খর্বাকৃতি হওয়ায় উঁচু লম্বা পাঞ্জাবিদের হাত ও পায়ের ফাঁক গলিয়ে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। এরপর কিছুদিন তিনি করাচির জাহাঙ্গীর রোডে পালিয়ে থাকেন। ওই সময়েই তিনি জানতে পারেন, তাঁর নামে হুলিয়া জারি হয়েছে। কিন্তু জাহাঙ্গীর রোডে বসবাসরত বিমানে কর্মরত বাঙালিদের সহায়তায় তিনি অন্যের নামে টিকিটে নাম গোপন করে করাচি থেকে সিরাজগঞ্জে পালিয়ে আসেন।’’ [পৃ. ১৪৪]  ছয় দফায় খুবই আশ্বস্ত ছিলেন ভুলু। কারণ বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেছিলেনÑ ‘ছয় দফা হলো জাস্ট লাইক ওভারব্রিজ’।

নানা তৎপরতার সমন্বিত যোগফলে সিরাজগঞ্জে গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও সংগ্রাম পরিষদ। একে একে সকলে সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণ ও নিয়োজিত হতে থাকেন। ২৫ মার্চের পর থেকেই সংগ্রাম পরিষদের সংগঠকরা অস্ত্র সংগ্রহ করতে শুরু করেন। অস্ত্র সংকট তো ছিলই। এ অবস্থায় সিরাজগঞ্জের কয়েকজন ছাত্র সংগঠক কামান ও গোলাবারুদ তৈরির উদ্যাগ গ্রহণ করেন ও সফল হন। তাঁরা স্থানীয়ভাবে নির্মিত এসব অস্ত্র ব্যবহার করতেও সক্ষম হন। বলা বাহুল্য যে, সব কালে ও দেশে যুদ্ধে যোগদান করবে কি করবে না এ নিয়ে কারও কারও মনে দোদুল্যমানতা থাকে। তা এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এরকম একজন সে সময়ের মহকুমা প্রশাসক এ কে শামসুদ্দিন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। এ দ্বিধার মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধে তিনি অবদান রাখেন। কিন্তু তাঁর আত্মীয়স্বজনের নিরুৎসাহ ও ব্যক্তিগত দ্বিধার কারণে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। নিকটাত্মীয়দের পরামর্শে আবার তিনি তাঁর কর্মস্থলে ফিরে আসেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁকে গ্রেফতার ও প্রচুর নির্যাতন করে। এ নির্যাতনে অবশেষে তিনি মারা যান।

পর্যায়ক্রমে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সিরাজগঞ্জের সাধারণ মানুষ। সারা মহকুমায় কেবল যুদ্ধ আর প্রতিরোধ। অনেকেই ভারতে চলে যান নিরাপত্তা বিবেচনায়। সেখানে প্রশিক্ষণ শেষে আবার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের ময়দানে আমরা এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎ পাই। তাঁর নাম দেবেশ সান্যাল। তিনি সে সময় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। বারো বছর বয়সে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর নেতৃত্বে একটি উপদল বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করে। সর্বাত্মক যুদ্ধে সিরাজগঞ্জের প্রতিটি এলাকার প্রতিরোধ যুদ্ধকে ছোট করে বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। তার পরও নওগাঁর যুদ্ধকে ভিন্ন বিবেচনায় লেখক বলেছেন- গণযুদ্ধ। লেখকের উপস্থাপিত যুদ্ধের বিবরণ থেকে বোঝাই যায় একাত্তরে সারাদেশে সর্বাত্মক জনযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে সাধারণ মানুষ, বঙ্গবন্ধুর ভাষায়Ñ ‘যার যা আছে’ তা নিয়েই। তা কিন্তু একটি মাত্র ঘটনা নয়।  সারাদেশে প্রচুর ঘটনা রয়েছে নিরস্ত্র বাঙালির। যেমন নওগাঁ যুদ্ধের বিবরণে সাধারণ মানুষের যুদ্ধগাথা সম্পর্কে জানাচ্ছেন লেখক, -‘যুদ্ধ চলার সময় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণকারী গ্রামবাসী ধানের খড় নাড়া দেয়ার কারাইল দিয়ে পিটিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের পিছু ধাওয়া করে পেটাতে পেটাতে পানিতে নামিয়ে চুবিয়ে মারে। ওই সময় নিহত হয় ১৫৩ জন পাকিস্তানি সৈনিক। ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লুৎফর রহমান অরুণ জানান, এ যুদ্ধে এক কোম্পানি পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়, গ্রামবাসীর হাতে নিহত হন ৫০ থেকে ৭০ জন রাজাকারও। … নওগাঁ যুদ্ধের পর আবদুল লতিফ মির্জার নাম যেমন আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমগুলোতে গুরুত্ব পায়, তেমনি সাধারণ মানুষের মুখে মুখেও ফিরতে থাকে।’ [পৃ. ৩০৫-৩০৬]

লেখকের লেখা থেকেই জানা যায় পর্যাপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ না থাকা ও যুদ্ধকৌশল না জানার কারণে কিছু ট্রাজিক ঘটনার শিকার হন মুক্তিযোদ্ধারা। এর ফলে কিছু ভুল বোঝাবুঝির ঘটনাও ঘটে। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এক দল অন্য দলের গতিবিধি না বোঝা, অপারেশনের তথ্য বিভ্রান্তি ইত্যাদি কারণে মাঝে মাঝে দুঃখজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমনই অন্তর্দ্বন্দ্বে নিহত হন জনৈক রফিকুল ইসলাম। এ ছাড়াও কয়েকটি সফল গেরিলা আক্রমণ, সেতু যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করা, মুখোমুখি যুদ্ধসহ যুদ্ধজয়ের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ডিসেম্বরের শুরুতে যখন আঁচ করা যাচ্ছে যে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পথে, তখন পাকিস্তানি সেনা-রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনী ব্যাপকভাবে গণহত্যা শুরু করে। প্রহসনমূলক বিচার ও মিথ্যে প্রচার কার্যক্রম শুরু করে। অর্থাৎ, পাকিস্তান টিকে গেলে এবং যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা হলে এমন বিচারের নামে ইচ্ছেমতো হত্যা কার্যক্রম পরিচালনা করাই ছিল তাদের লক্ষ। উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন যে, যুদ্ধের সময়ে প্রচুর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে এ দেশীয় দালাল ও পাকিস্তানি সেনারা। ইমতিয়ার শামীম তাঁর উপাত্ত বিশ্লেষণে বলেছেন,Ñ ‘গণহত্যার পর লাশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পৃথিবীর অন্য যেকোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও এসব ক্ষেত্রে তাই সংখ্যা ও নামভিত্তিক পরিসংখ্যানচিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়। আবার মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় আংশিক তালিকাও যথাযথভাবে শুরু করা যায়নি। স্বাধীনতার পরপরই এক সাংবাদিক সিরাজগঞ্জের কয়েকটি এলাকা ঘুরে লেখা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিলেন, যমুনা নদীর বিভিন্ন চরগুলোতে তখনও প্রায় ৭০০ ধর্ষিতা ও মৃত নারীর লাশ পড়ে আছে। প্রায় ৪ হাজার নরনারী ও শিশুকে পাকিস্তানিরা হত্যা করেছে, প্রায় ৫ হাজার ঘরবাড়ি জ¦ালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদন পূর্ণাঙ্গ চালচিত্র নয়- নদীবাহিত সিরাজগঞ্জে বিভিন্ন বহতা নদীর কারণে নয় মাসজুড়ে গণহত্যার শিকার মানুষ ভাসতে ভাসতে দ্রুতই চিহ্নহীন হয়ে পড়েছেন। এ কারণে বোধ করি অনায়াসেই লেখা যায় যে, যমুনা নদীই হলো সিরাজগঞ্জের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি।’ [পৃ. ৩৮৪] এ গ্রন্থে লেখক তাঁর সাধ্য অনুযায়ী তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকটি গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের বিবরণ দিয়েছেন। যা থেকে সহজেই আমরা বুঝে নিতে পারি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তর, স্বাধীনতা বলতে কী বোঝায়। গ্রন্থের পরিশিষ্টে শহিদ ও গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের অসম্পূর্ণ একটি তালিকা রয়েছে। [পৃ. ৪৪১-৪৭৯] সারাদেশে পাকিস্তানি সেনা ও দালালদের দ্বারা সংঘটিত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের সাক্ষ্য বহন করে এ তালিকা।

সারাদেশের মতোই সিরাজগঞ্জে নারী নির্যাতনের ঘটনা ছিল ব্যাপক। যা পৃথিবীর অন্য কোথাও এভাবে হয়েছে কি না আমাদের জানা নেই। স্বাধীনতা উত্তরকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেষ্টা করেছেন নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনে। তিনি তাঁদের ‘বীরাঙ্গনা’ বলে সম্বোধন করেছেন। জাতি মর্যাদা দিয়েছে; কিন্তু আমাদের মূল্যবোধশাসিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বীরাঙ্গনা নারীদের যথার্থ মর্যাদা দিতে পারিনি। তাঁরা সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়েই বেঁচে আছেন। তবে, ‘১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সিরাজগঞ্জ এসে তাঁদের নিয়ে জনসভার মঞ্চে ওঠেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন তাঁদের। দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় সিরাজগঞ্জের ৩৫ জন নারীর এই দৃপ্ত পদক্ষেপ একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।’ এর পরও এ সমাজ তাঁদের জন্য তেমন কিছু করেনি। এমনকি মর্যাদার প্রশ্নেও না। তাঁরা একাত্তরে ত্যাগ করেছেন সবকিছু স্বাধীন দেশের আশায়, উন্নত জীবনে স্বপ্নে। অনেক নারীর নির্যাতনের কাহিনি লেখক তুলে ধরেছেন। কিন্তু অনেকের নাম, পরিচয়, চিহ্ন সব মুছে গেছে। এক্ষেত্রে উল্লেখিত বিবরণ থেকে অজ্ঞাত সেসব নির্যাতিত মানুষের পরিণতি কী হতে পারে আমরা শুধু অনুমান করতে পারি। লক্ষণীয়, দেশ স্বাধীন হলেও নির্যাতন যেন নির্যাতিতদের পিছু ছাড়েনি। এখানে দু-একটি উল্লেখ করা যেতে পারে। লেখক ‘কামারখন্দের রাজুবালার পাশে কেউ নেই’ শিরোনামার বিবরণে লিখেছেন :

(ক) ‘পাকিস্তানি মিলিটারি কামারখন্দে এসে ক্যাম্প করার পর গ্রামের সবাই পালাতে থাকে। কিন্তু কামারখন্দ গ্রামের হরিপদ ও রাজুবালা ঠিক করতে পারেন না, দুই কন্যাকে নিয়ে তাঁরা কোথায় যাবেন। এরই মধ্যে গড়ে ওঠে রাজাকার বাহিনী।… হরিপদকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করতে থাকে তারা। ভীত রাজুবালা আর্তচিৎকার করতে করতে বাধা দিতে যায় তাদের। মিলিটারিরা তার মাথা ফাটিয়ে দেয়। অজ্ঞান রাজুবালাকেই ধর্ষণ করে তারা। এরপর থেকে সামাজিকভাবে এমনকি শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে উপেক্ষিত হলেও স্বামী হরিপদ বরাবরই রাজুবালার পাশে ছিলেন। কিন্তু ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনার পর বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর নির্যাতন শুরু হলে কীর্তন করার জন্য বরিশাল যাওয়ার পথে মৌলবাদীদের হামলায় হরিপদ তলিয়ে যান মেঘনা নদীতে।’ [পৃ. ৪২০]  এবং ‘আউনদাউনে সাত মাসের শিশুকে হত্যার পর মাকে ধর্ষণ’-এর বিবরণে লিখেছেন :  

(২) ‘পাকিস্তানি সেনারা তাঁর দরজা ভেঙে ফেলে, তাঁর কাছ থেকে সাত মাসের শিশুটিকে কেড়ে নিয়ে সজোরে মাটির ওপর আছড়ে ফেলে হত্যা করে। এরপর পাকিস্তানি সেনারা এক-একজন করে ধর্ষণ করে তাঁকে। রহিমা খাতুন একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। …আউনদাউনের ওই ভয়াবহ ঘটনায় কেবল রহিমা খাতুনই নন, ধর্ষিতা হন আরও ১০-১২ জন। এ ছাড়া আরও ৭-৮ জন নারীকে ক্যাম্পে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। বেশ কয়েকদিন চিকিৎসার পর খানিকটা সুস্থ হয়ে ওঠেন রহিমা খাতুন।’ [পৃ. ৪২২]

এখানে শুধুই নির্যাতনের মাত্রা বোঝার জন্য দুটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো। পাঠকের পক্ষে এখানেই সীমাবদ্ধ হলে চলে না। সামগ্রিক তথ্য সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে যে-কোনো লেখকেরও সীমাবদ্ধতা রয়ে যায়। একজনের পক্ষে সার্বিক বিষয়ে লক্ষ রাখা কঠিন। কারণ, তিনি কয়টি ঘটনার কেসস্টাডি তুলে ধরতে পারবেন। একজন গবেষকের পক্ষে সকল ঘটনার বিবরণও দেওয়া সম্ভব নয়। আরও কত মানুষ নির্যাতনে হারিয়ে গেছে অজান্তে। লেখক নিজেও বলেছেন এবং আমরাও স্বীকার করি, যমুনা ও অন্য নদীগুলো যেখানে বিশাল বিশাল বধ্যভূমি সেখানে অসংখ্য মানুষের লাশ বা কোনো চিহ্ন খুঁজে না পাওয়াই সত্য। ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় সিরাজগঞ্জের জনগণ, বিশেষ করে তরুণ ও নারীরা নদী ও লঞ্চঘাটগুলোকে এড়িয়ে চলতেন। সিরাজগঞ্জের লঞ্চঘাটে তরুণ বন্দিদের জবাই করা হতো।’ বলতে গেলে পুরো বাংলাদেশই এক বধ্যভূমি। লেখক যৌক্তিকভাবেই এ গ্রন্থের পরিশিষ্টে সংবাদপত্রে প্রকাশিত দালাল রাজাকার এবং অভিযুক্ত দালালদের নাম-ঠিকানাসহ একটি অসম্পূর্ণ তালিকা সংযোজন করেছেন। [পৃ. ৪৮০-৫০৩] যা থেকে সহজেই তাদের শনাক্তকরণ সম্ভব।

মূলত, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী লোকজন ছাড়া বহু গল্প রয়েছে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘর ও মানুষের। অনেক কষ্ট, যন্ত্রণা, নির্যাতন ও দহনের কাহিনি রয়েছে। অনেক মানুষের জীবনের কোনো তথ্যই জানা যায়নি। তাঁরা শুধু অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন দেশের জন্য। অনেক ভয়ানক কাহিনি রয়েছে, সেগুলো পাঠ করা যায় না, চোখ, চিন্তা, ভাবনা আটকে যায়। যেগুলো গ্রন্থের ভাষায় প্রকাশ ও উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তারপরও যেসব বিবরণ আমরা পাঠ করি তা থেকে উপলব্ধি করতে হয় একাত্তরের গাথা। সেক্ষেত্রে লেখক ইমতিয়ার শামীম ওই অনুভূতির জায়গায় আমাদের পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

গবেষণা এলাকা, পরিধি, তথ্য-উপাত্ত ও নামকরণ ইত্যাদির পরিমাপে আঞ্চলিক ইতিহাস বলা যেতে পারে।  তবে, পাঠক হিসেবে আমাদের মনে হয়নি এটি একটি আঞ্চলিক ইতিহাস। এ যেন বাংলাদেশের ইতিহাস সিরাজগঞ্জের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। এ ধরনের গবেষণাকর্ম প্রতুল হওয়া জরুরি কর্তব্য বলে মনে করি। এক্ষেত্রে ইমতিয়ার শামীম লেখক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। একাত্তর উত্তরকালে যে ধরনের সমস্যা ও স্ববিরোধিতায় আমরা আক্রান্ত হয়েছি, সেখানে এ ধরনের গবেষণা অনেক প্রশ্নের মীমাংসা দিতে পারে।  একাত্তরের রক্তস্নাত ইতিহাস ও উত্তরাধিকার নিয়ত আমাদের পরিস্রুত ও পরিশীলিত করে। লেখক এ গবেষণার যেভাবে ইতি টেনেছেন তাঁর বক্তব্য ও সূত্রে, এর সাথে আমরা সহমত পোষণ করি। ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষকে মুক্ত করে বিচ্ছিন্নতা, দৈন্য ও ভীরুতা থেকে। মানুষের সাহসিকতার ও সৃষ্টিশীলতার উদ্বোধন ঘটে স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। মানুষ তখন সংঘবদ্ধ হয়ে যাত্রা করে উজানস্রোতে, নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনেতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির মধ্যে মুক্ত জীবনযাপন ও মুক্তচিন্তা করার সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশা নিয়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের গড়ে তোলা মাত্র কয়েক সপ্তাহের প্রশাসন জনমনে সাড়া জাগালেও স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁরা সরকারি প্রশাসনের কাছে দায়িত্ব ও অস্ত্র সমর্পণ করে ফিরে গেছেন ঘরে। তারপর মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মারক গড়ে উঠেছে বটে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা রাজনৈতিক কারণে এখনও অধরাই রয়েছে সাধারণ মানুষের কাছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলো প্রকারান্তরে প্রতিনিয়ত নীরবে মনে করিয়ে দিচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। [পৃ. ৪৩৮]    

স্বপন নাথ : কবি, গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares