তিমির বিদার উদার অভ্যুদয় : ড. কানাই সেন

প্রচ্ছদ রচনা : সেরা ১২ বইয়ের ডালি

তিমির বিদার উদার অভ্যুদয়

ড. কানাই সেন

আবদুস সামাদ ফারুক বাংলাদেশের সাহিত্য ক্ষেত্রে পরিচিত নাম। মূলত কবি হিসেবেই তাঁর মান্যতা, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু প্রবন্ধমূলক লেখা লিখেছেন। তাঁর প্রথম বড়ো গদ্য লেখা সম্ভবত ‘জল জ্যোৎস্নায় নাজমুল’। আশ্চর্য সুন্দর ভাষায় তিনি শহিদ নাজমুলের মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানের ইতিহাস উপস্থাপন করেছেন। ভাষার অপরূপ রম্যতা বইটির সম্পদ। রক্তাক্ত ইতিহাসকে কীভাবে শান্ত সৌন্দর্যে তুলে ধরা যায় বইটি তার সার্থক অভিজ্ঞান। এখানে ব্যক্তি এবং জাতীয় ইতিহাস বাঁধা হয়েছে একই ফ্রেমে। লেখকের মুনশিয়ানা নিঃসন্দেহে প্রশংসার্হ। তাঁর অন্য একটি সম্পাদিত বই ‘আলো হাতে আঁধারের যাত্রী’ সম্প্রতি পেয়েছি। বইটি পড়ার পর স্বাভাবিকভাবে যে প্রশ্ন প্রথম উঠে এসেছে তা হলো- ‘আলো হাতে আঁধারের যাত্রী’কে ব্যক্তিমানুষের জীবন-কথা বলব, না জাতীয় ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এক বিশ্রুত কীর্তি মানুষের সার্বিক উপস্থাপনা বলব।

আমার মনে হয় এই সংকলন-গ্রন্থে অবিভক্ত বাংলার পূর্ববঙ্গের (অধুনা বাংলাদেশ) বিশ শতকের প্রথম পর্বের ঐতিহাসিক পটভূমিতে একজন সৎ, নিষ্ঠাবান, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব, জনসেবায় আত্মনিবেদিত মানুষের কথা বলা হয়েছে; যিনি চরিত্রের বহুমুখী প্রকাশের মধ্য দিয়ে অনন্য গৌরবে অধরা উচ্চতায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি যথার্থই ইতিহাসের মানুষ হয়ে উঠেছেন।

‘শাজাহান’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- ‘তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ/তাই তব জীবনের রথ/পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার/বারংবার’- মানুষ নিশ্চয় তার সৃষ্ট কীর্তির চেয়ে বড়ো- অনেক বড়ো, অনেক মহান। কারণ মানুষই কীর্তির স্রষ্টা। তবে এ কথা অস্বীকার করা যায় না, কীর্তি মানুষকে অমরতা দেয়। যাঁর কীর্তি আছে তিনিই বেঁচে থাকেন, এটাই সত্য। তাজমহল দেখেই মানুষ এর স্রষ্টা শাজাহানকে স্মরণ করে। কীর্তি মানুষকে যশস্বী করে। মৃত্যুর পরও স্মরণের মধ্য দিয়ে তিনি বারবার অমৃতকে স্পর্শ করেন। গৌরবময় কীর্তির পদচিহ্ন অনুসরণ করে অনুবর্তীরা গৌরবান্বিত হয়, অনুপ্রাণিত হয়, দিশাহীন অন্ধকার পথে চলার আলো দেখতে পায়। কীর্তি তখন অলৌকিক বাতিঘর। যেসব অভিযাত্রী আলো হাতে জাতীয় জীবনের সুদীর্ঘকালের জমাট অন্ধকার দূর করতে কৃতসংকল্প ছিলেন, যাঁদের জীবন পরার্থে উৎসর্গীকৃত, দেশের মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অক্লান্ত সৈনিক, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবনের জয়গানে যাঁরা উচ্চকণ্ঠ, যাঁরা মুক্ত ভাবনার পথিকÑ স্বাধীন চিন্তা-চেতনার ধারক ও বাহক, দেশ ও জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে তাদের অবিনশ্বর কীর্তিকথা। ‘আলো হাতে আঁধারের যাত্রী’র উদ্দিষ্ট ব্যক্তিত্ব বহুমুখী প্রতিভাধর ডা. মো. হামিদ তেমনি এক বর্ণময় চরিত্র।

ডা. মো. আবদুল হামিদ সাহেবের জন্ম অজ পাড়াগাঁ রানীগাঁয়ে ১৯২১ সালে (মতান্তরে ১৯২০ সালে)। ডা. হামিদ তাঁর দিনলিপিতে তাঁর শৈশব এবং ছাত্রাবস্থার বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। শিক্ষার আলোহীন গ্রাম। চাষবাস জীবিকা। আলস্যভরা গতানুগতিক জীবন। অন্ধ কুসংস্কারের ছায়ায় বেড়ে ওঠা। রোগীর চিকিৎসার অবলম্বন ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবজ। জলপড়া, তেলপড়া। আধুনিক চিকিৎসা ভাবনা সুদূরপরাহত। যুগ যুগ সঞ্চিত অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন বদ্ধ জলাশয়ে কূপমণ্ডূক ভাবনায় বাঁধা। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ। এই অন্ধকার অচলায়তন ভেঙে সেখানে নতুন প্রগতিশীল ভাবনা ছিল দুঃসাধ্য এবং অভাবনীয়। প্রবল ইচ্ছাশক্তি, অপ্রতিরোধ্য সাহস এবং দুর্নিবার বিশ্বাসে ঋদ্ধ ডা. আবদুল হামিদ তিনি অসাধ্য সাধন করেছিলেন। অন্ধকার দূর করার প্রতিজ্ঞায় তিনি তুলে নিয়েছিলেন জ্ঞানলোকের বর্তিকা। তিনি আলো হাতে অন্ধকার অপসারণের নিত্য অভিযাত্রী। তিনি প্রতিনিয়ত অবিচল সংকল্পে নিষেধের পাহাড় ভেঙেছেন আধুনিক মননশক্তিতে। এ এক আশ্চর্য উত্তরণ। সমকালের সমাজ পরিস্থিতিতে ডা. হামিদের যাত্রাপথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ঐকান্তিক চেষ্টা আর অধ্যবসায় সম্বল করে তিনি স্পর্শ করেছিলেন যথার্থ শিক্ষার মান্য উচ্চতা। তাঁর দু’চোখে ছিল উজ্জ্বল সমাজ গড়ার স্বপ্ন। তিনি ছিলেন যথার্থই স্বপ্নসন্ধানী। সেই স্বপ্ন ছড়াতে চেয়েছেন সমাজের প্রতিটি স্তরে।

ডা. মো. আবদুল হামিদ ময়মনসিংহের লিটন মেডিকেল কলেজ থেকে এলএমএফ ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৪১ সালে। ১৯৪২ সালে তাঁর কর্মজীবন শুরু চিকিৎসক হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে ময়মনসিংহ সদর হসপিটালে। ১৯৪৩ সালে ঢাকা মিটফোর্ড হসপিটালে হাউজ সার্জনের দায়িত্ব পান। স্বদেশপ্রাণ ডা. হামিদ ভাই সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দেন ১৯৪৩ সালে। ফিরে আসেন নালিতাবাড়িতে। এরপর তারাগঞ্জ বাজারে নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘ফিরোজ মেডিকেল হল’কে কেন্দ্র করে শুরু হয় তার স্বাধীন চিকিৎসা পরিসেবার ব্রত। অল্পদিনের মধ্যেই ‘ফিরোজ মেডিকেল হল’ চিকিৎসার আদর্শ ঠিকানা হয়ে উঠল। সন্নিহিত বিস্তৃত অঞ্চলের মানুষের কাছে তিনিই সর্বজনপ্রিয় ডাক্তার। অভিষিক্ত হলেন অগণিত মানুষের বিশ্বাস আর ভালোবাসায়। ডাক্তার ভাই হয়ে উঠলেন সবার নয়নের মণি।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের অনুরাগী এবং একনিষ্ঠ কর্মী। দুই দশকের বেশি সময় থানা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের (পার্টির) সম্পাদকের দায়িত্বভারও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। পার্টির কর্মসূচির সূত্রে তিনি ঘনিষ্ঠ হয়েছেন জাতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান প্রমুখের সঙ্গে। রাজনৈতিক যোগসূত্র এবং ক্রিয়াকর্মের কারণে পাকিস্তান আর্মির হাতে বন্দি হয়ে তাঁকে কারা অন্তরালে থাকতে হয়েছে।

ডা. মো. আবদুল হামিদ ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাবিদ। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন প্রাণপুরুষ। স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিকতা এবং সক্রিয় ভূমিকার কথা সর্বজনবিদিত। নারীশিক্ষা বিস্তারে তিনি সর্বতোভাবে এগিয়ে এসেছেন। স্কুলের আর্থিক অনটনের সময় ‘ফিরোজ মেডিকেল হল’ থেকে টাকার জোগান দেওয়া, এমনকি সময় বিশেষে শিক্ষকের অভাব পূরণের জন্য বিনা বেতনে হাইস্কুলে শিক্ষাদানের দায়িত্বও পালন করেছেন।

উত্তর জীবনে মো. আবদুল হামিদ ধর্মচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। ধর্মাচরণ এবং জীবনাচরণের মধ্য দিয়ে যথার্থ নিষ্ঠাবান মুসলমান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সততা, সাহস, পরিশ্রম, স্পষ্টবাদিতা ছিল তাঁর পালনীয় আদর্শ। মিথ্যার সঙ্গে তিনি কখনও আপস করেননি। সত্য সন্ধান ও প্রতিষ্ঠার জন্য মিথ্যার সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধের মধ্য দিয়েই বিচ্ছুরিত হয়েছে তাঁর অনন্য ব্যক্তিত্বের দীপ্তি। অসাম্প্রদায়িক উদারতা মো. আবদুল হামিদের চরিত্রের উজ্জ্বল দিক। সমাজ সংস্কারমূলক কাজের মধ্য দিয়ে জাতীয় জীবনের দীর্ঘকাল সঞ্চিত অন্ধকার দূর করাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। মানুষের সেবাই ছিল তাঁর জীবনের আদর্শ। এই সেবা তাঁর ধর্মাচারণেরও অঙ্গ। এর মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন অন্তরের পবিত্র প্রশান্তি। সব মানুষই তাঁর আপন- সবাই তাঁর প্রিয়।

আলো হাতে আঁধারের যাত্রী ডা. মো. আবদুল হামিদের স্মৃতিচারণা এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নিবেদনমূলক রচনা সংকলন। মোট লেখার সংখ্যা ৩৫। রচনাগুলো চারটি পর্বে বিন্যস্ত। বিভাগগুলো বিষয়নির্ভর শিরোনামে চিহ্নিত। লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে ডা. আবদুল হামিদের চরিত্রের ভিন্নমুখী  বৈশিষ্ট্য। লেখকদের মধ্যে যেমন আছেন পরিবারের সদস্য ডা. হামিদের সন্তানসন্ততি, আত্মীয়-পরিজন, তেমনি আছেন শুভাকাক্সক্ষী সুধীজন, তাঁর শিক্ষক প্রমুখ।

এই বইয়ের সংকলক এবং সম্পাদক আবদুস সামাদ ফারুক, ডা. আবদুল হামিদের নিকটাত্মীয়-প্রিয়জন, খুব কাছ থেকে তিনি ডা. হামিদকে দেখেছেন। তিনি তাঁকে দেখেছেন হৃদমাঝারে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসার আত্মজনকে তিনি উদ্ঘাটন করেছেন নিষ্ঠায়। ইতিহাসের মানুষ বিম্বিত হয়েছেন আত্ম-দর্পণে, ব্যক্তি এখানে সার্বজনীন উচ্চতায় পৌঁছেছে। মননধর্মী, আবেগঋদ্ধ লেখাটি কবি সামাদ ফারুককে মনে করায়। এক প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বের বহুমুখী পরিচয়ের উজ্জ্বল উদ্ধার আলো হাতে আঁধারের যাত্রী। সংকলিত বইটি নিছক ব্যক্তিবন্দনা নয়।

অধুনা বাংলাদেশ এবং বিশ্বের সমস্ত বাঙালির অনালোকিত ব্যক্তিত্বের গৌরবময় ইতিহাস অনুসন্ধান। বহুমুখী মনীষা- প্রোজ্জ্বল, নিরংহকার, প্রচারবিমুখ সবার প্রিয় ডা. মো. আবদুল হামিদের জীবনকথা আসলে ইতিহাসের কথকতা। তিনি স্বীয় গৌরবে ভাস্বর- ‘নক্ষত্রপুরুষ’।

ড. কানাই সেন : লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares