মুনতাসীর মামুনের রাজাকারের মন : প্রামাণ্য বিশ্লেষণ : মনি হায়দার

প্রচ্ছদ রচনা : সেরা ১২ বইয়ের ডালি

মুনতাসীর মামুনের রাজাকারের মন : প্রামাণ্য বিশ্লেষণ

মনি হায়দার

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন কত বিচিত্র বীক্ষণে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন নিজে এবং আরও অনেক মেধাবী তরুণদের অনুপ্রাণিত করে মুক্তিযুদ্ধের গবেষণায় নিয়োজিত করে চলেছেন, তুলনা করলে, বিশ^গবেষণার ইতিহাসেও বিরল। তিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হায়েনাদের সহযোগী এ দেশীয় নিম্নশ্রেণির অকৃতজ্ঞ ভূমিপুত্র রাজাকারদের মানস জগতের হাড়গোড় নিয়ে যে বিশ্লেষণ তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন, এক কথায় অতুলনীয়। মুক্তিযুদ্ধের বিচিত্র বিষয় ও প্রসঙ্গ নিয়ে নিরন্তর কাজ করছেন তিনি। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের বইয়ের তালিকার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, গবেষণার বিশাল পরিধি।

বীরাঙ্গনা ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১, ইয়াহিয়া খান ও মুক্তিযুদ্ধ, শান্তিকমিটি ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধের ছিন্ন দলিলপত্র, গণমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মানবতাবিরোধী অপরাধÑ বিচার ও রাজনীতি,  পাকিস্তানি জেনারেলদের মন, একাত্তরের বিজয়গাথা, পরাজিত পাকিস্তানি জেনারেলদের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ, কবির অনশন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, যেসব হত্যার বিচার হয়নি, বারো খণ্ডে সম্পাদনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধ কোষ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশসহ আরও অনেক বইয়ের প্রণেতা তিনি।

মানুষের  অস্তিত্বের প্রধান অধিষ্ঠান ‘মন’। মনের মধ্যেই বসত করে যাবতীয় সুখ ও সর্বনাশ, মনের মধ্যে বসত করে গোপন ইচ্ছার তরবারি। রাজাকার, যারা এই মাটিতে জন্মগ্রহণ করে, এই মাটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় পনেরোশ’ কিলোমিটার দূরের পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল কেন? প্রশ্নটা আমরা সরল জায়গা থেকে করলেও জবাব ভয়ংকরভাবে জটিল, মনস্তাত্ত্বিক তো বটেই। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এই জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নের জবাব খুঁজেছেন, অনবদ্য বিশ্লেষণী বই রাজাকারের মন-এ।

মুক্তিযুদ্ধের আলোয় রাজাকারের মন মুনতাসীর মামুনের আর একটি অনবদ্য প্রকাশনা। বইটি একটি খণ্ডে শেষ হয়েছে। ‘শেষ হয়েছে’ বললেই শেষ হয় না- রাজাকারদের মনমানসিকতা, কাজ কখনও শেষ হবে না, চলতেই থাকবে, তখন মুনতাসীর মামুন বেঁচে না থাকলেও অন্য কেউ নিশ্চয়ই ইতিহাসের পথ ধরে নতুন বিন্যাসে লিখবেনÑ ‘নতুন রাজাকারের মন’। রাজাকারের মন ফ্লাপে বইটি সম্পর্কে লিখেছেন ‘রাজাকার বলে সম্বোধন করি আমরা অনেককে, বুঝিও যে কে রাজাকার বা কে রাজাকার নয়; কিন্তু রাজাকারের মন কেমন, তা নিয়ে কখনও ভাবিনি।’ ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন রাজাকারদের রচনা দিয়েই বিশ্লেষণ করেছেন- রাজাকারের মন, তাদের ভাবনা, চিন্তা, দর্শন। দেখিয়েছেন তারা কীভাবে কৌশলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতি ঘটায় আর কীভাবেই বা সাধারণের মনোজগতে আধিপত্য বিস্তারের সচেষ্ট থাকে। আরও দেখিয়েছেন, একবার যে রাজাকার সব সময়েই সে রাজাকার। রাজাকারের মনোজগৎ নিয়ে বাংলা ভাষায় এর আগে এত চমৎকার বিশ্লেষণ আর কোনো লেখক করেননি।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গত তিন দশকে নানা ধরনের বই প্রকাশিত হয়েছে; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী দু’পক্ষ প্রায় অনালোচিত থেকে গেছে। ড মুনতাসীর মামুন ১৬ জন রাজাকারের মন ও মানসিকতার  গভীর অনুসন্ধান করে বিশ্লেষণপূর্ণ দৃষ্টিতে  ব্যবচ্ছেদ করেছেন। দেখিয়েছেন, ওইসব আত্মবিসর্জিত রাজাকাররা নিজেদের লেখায় কীভাবে আত্মপ্রতারণা করেছেন, আত্মগ্লানিকে কীভাবে আত্মপ্রতারণায় পরিণত করেছেন, তারই অনুপুঙ্খ জারক। ড. মুনতাসীর মামুন রাজাকার হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসায়েন, মুসলিম লীগ নেতা আয়েন উদ্দিন, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারের হত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত কিন্তু হাইকোর্টের রায়ে মুক্ত খালেক মজুমদার, জামায়াত নেতা আব্বাস আলী খান, মহিউদ্দিন চৌধুরীর আত্মজীবনী ভিত্তি করে প্রামাণ্য দলিলপত্রের সাহায্যে রচনা করেছেন রাজাকারের মন।

রাজাকারের মন বাংলা ভাষা ও পৃথিবীতে একটি অভিনব বই। সাধারণ অর্থে মানুষ মনে করে দালালদের আবার বিশ্লেষণ! সময়, কাগজের খরচ; কিন্তু মুনতাসীর মামুনের রাজাকারের মন পাঠ করলে অনুধাবন করা যাবে, রাজাকারেরা কতটা নৃশংস, প্রতারক, ভণ্ড। আমরা সব কিছু সাদা চোখে দেখি, সাদা কলমে লেখি কিন্তু রাজাকার এবং ওই গোষ্ঠী দেখে সম্পূর্ণ নব্বই ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে, উল্টিয়ে, নিজেদের মতো করে, মানুষের মতো করে নয়। মানুষকে ওরা তো মানুষ মনে করে না, মনে করে মুসলমান। ফলে, ধর্মীয় বোধে যে অন্ধত্ব, যে পাশবিকতার রক্তখেলা থাকে, একাত্তরে নিজ দেশের সাধারণ নারী-পুরুষ ও শিশুদের ওপর সেটাই চালিয়েছে, উল্লাসের সঙ্গে, আনন্দের সঙ্গে। এমনকি একাত্তরে নির্মম পরাজয়ের পরও রাজাকারেরা সেই হত্যার উৎসব থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়নি বরং আশি ও নব্বই দশকে পুনর্বার রক্তের হোলিখেলায় মেতে উঠেছিল ওরা। কেন নিজেদের মাতৃভূমির নিরীহ মানুষদের ওপর এই উৎপীড়ন- হত্যাযজ্ঞ, তারই মানসিক অস্ত্রোপচার করেছেন ড. মুনতাসীর মামুন, রাজাকারের মন বইয়ে।

রাজাকাররা মরে যাবে; কিন্তু মানসিকতার বিষাক্ত বিষ ছড়িয়ে রেখে যাবে। যার রেশ স্বাধীনতার এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও দেখতে পাই বাংলাদেশে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাধীন বাংলাদেশে অকৃতজ্ঞ সারমেয়দের মতো বসবাস করেও তারা একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত বা দুঃখিত তো নয়ই; বরং সগৌরবে ঘোষণা করছে একাত্তরে আমরা ভুল করিনি। যেমন রাজাকারদের বুকের পাটা, তেমন তাদের মন।

রাজাকারের মন বইয়ে একাত্তরের পর বিভিন্ন স্থানে পরাজিত রাজাকাররা নানা সময়ে নিজেদের পাপের পুকুরে সততা ও ন্যায়ের শ্যাওলা ভাসানোর জন্য অথবা ইসলামের প্রতি কিংবা নিজের সন্তানদের কাছে সর্বদাই খাওয়ার জন্য যে আত্মজীবনী লিখেছে সে আত্মজীবনী বিশ্লেষণ করে মুনতাসীর মামুন দেখিয়েছেন যে, ‘রাজাকার মাত্রই আমৃত্যু রাজাকার’। অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, পূর্ণ শিক্ষিত সব রাজাকারই তাদের আত্মজীবনে জন্মভূমি থেকে প্রায় বারো শ’ মাইল দূরের তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি প্রভুদের প্রতি এক অলীক বন্ধনে বাঁধা ছিল। সে বাঁধার কারণে পশ্চিম পাকিস্তানিরা যদি ক্রোধে লাথি মারত, রাজাকাররা মনে করত প্রভুদের লাথি মারার অধিকার আছে। রাজাকারদের লাথি খাওয়া এবং লাথির স্বাদ নিয়ে পৌনঃপুনিক বিশ্লেষণে রাজাকারের মন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় অসামান্য ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে।

 রাজাকারের যেসব বই বিশ্লেষণ করা হয়েছে- সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন-দি ওয়েসটেস অব টাইম, রিফ্লেকশন অন দা ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অব ইস্ট পাকিস্তান, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন একাত্তরের স্মৃতি, হামিদুল হক চৌধুরী- মেমোয়ার্স,  এ. কে. এম. খালেক মজুমদার- শিকল পরা দিনগুলো, মহম্মদ আয়েন উদ-দীন- স্বদেশ সময় ও রাজনীতি,  কে এম আমিনুল হক- আমি আলবদর বলছি, সা’দ আহমেদের শেখ মুজিবের কারাগারে পৌনে সাতশ’ দিন,  আব্বাস আলী খান- স্মৃতি সাগরের ঢেউ,  ডা. আবদুল বাসেত গায়ের নাম মিঠাখালী, হৃদয় আমার কাঁদে রে, মতিউর রহমানের সেকেন্ড থট ইন বাংলাদেশ, আখতারউদ্দিনের  ন্যাশনালিজম অর ইসলাম : ইন্দো পাকিস্তান এপিসোড, মো. মিছিরউল্লার স্মৃতির প্রেক্ষাপটে, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বাঙালি অধ্যাপক মহিউদ্দিন চৌধুরী।

প্রতিজন রাজাকার কায়মনোবাক্যে পাকিস্তানি ধারণায় নিষ্ঠ, অবিচল আস্থায় নিবেদিত। বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিব, মুক্তিযোদ্ধা তাদের কাছে অসহ্যপীড়ন, ক্ষতবিশেষ। প্রত্যেকে ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুগত কিছু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা বাংলাদেশে সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ লুটপাট সম্বন্ধে চমৎকারভাবে উদাসীন। রাজাকারদের মানসিকতায় সব সময় দ্বৈত সত্তা কাজ করে- তারা থাকে বাংলাদেশে; কিন্তু মাতৃভূমি হিসেবে সম্পন্ন বা ভালোবাসা জানায় পাকিস্তানকে। কোন পাকিস্তানকে? যে পাকিস্তানে চলছে এখনও সীমান্ত যুদ্ধ, বছরের পর বছর সামরিক শাসন। যদিও গণতন্ত্রের একটা মোড়ক পরিধান করেছে পাকিস্তান কিন্তু পিছন থেকে গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে সেই সেনাবাহিনী। আর সাম্প্রতিককালে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচারপতিরা। দুনিয়ায় অভিনব রাষ্ট্র পাকিস্তান। যে রাষ্ট্রের কোনো আদর্শ নেই, যে রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের কোনো অধিকার নেই, যে রাষ্ট্রে প্রতিদিন কোনো না কোনো প্রান্তে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায় না নৃশংস তালেবান গোষ্ঠী।  সেই রাষ্ট্রের কাছে এখনও দায়বদ্ধ সেই রাজাকারেরা, যারা নির্মমভাবে পরাজিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের কাছে, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, শেখ মুজিবের কাছে।

অধিকাংশ রাজাকার বুদ্ধিবৃত্তির দিক দিয়ে ১৯৭১ সালে ছিল নিম্নস্তরের। যে ক’জন বুদ্ধিবৃত্তির দৃষ্টিকোণে উচ্চ পর্যায়ের ছিল, তাদের মধ্যে ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন অন্যতম। ড. সাজ্জাদ সাধারণ রাজাকারদের মধ্যে থ্রি নট থ্রি রাইফেল, তরবারি নিয়ে রাস্তায় নামেনি ঠিকই, তার পক্ষে তা সম্ভবও ছিল না; কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তির কৌশলে সে তার আজন্ম লালিত রাজাকারতন্ত্র প্রকাশ করেছে ওপরে উল্লিখিত বই দুটিতে। রাজাকারের মন বইয়ের ২৬ নম্বর পাতায় তার বইয়ের আলোকে মুনতাসীর মামুন লিখেছেন- ‘শহিদ মিনারের নকশা করেছিলেন শিল্পী হামিদুর রহমান। সাজ্জাদ হোসায়েনের মতে, হামিদুরের শিল্পজ্ঞান তেমন ছিল না। কল্পনা হয়তো তার ছিল; কিন্তু শিল্পে তা রূপান্তরিত করার বোধ বা ক্ষমতা ছিল না। সরকারি প্রতিনিধি মুসা প্রস্তাব করেছিলেন- শহীদ মিনারের জায়গায় একটি সুন্দর স্থাপত্যের মসজিদ বা মিনার শোভিত কিছু নির্মাণ করার। প্রস্তাবটি সাজ্জাদের পছন্দ হয়েছিল; কিন্তু বাধা দিলেন জয়নুল। বললেন, এ ধরনের কিছু করলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে এবং বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠবে। শহিদ মিনারের ফ্রেসকোন্ডলি ড. মাহমুদ হুসাইনের পছন্দ ছিল না। কারণ তা তুলে ধরেছিল ‘Scence of Unrelieved barbarity’ কিন্তু কেউ এসবের প্রতিবাদ জানাল না। হামিদুর রহমানের পরিকল্পনাই গৃহীত হলো। এ জন্য আক্ষেপ ছিল তার মনে। মন্তব্য করেছেন তিনি, ‘পৃথিবীর কোথাও এত কুৎসিত নিদর্শন তিনি দেখেননি।’

আরও আশ্চর্য! ড. সাজ্জাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-সহকর্মীদের নামের তালিকা তৈরি করে পাঠায় টিক্কা খানের কাছে। সাজ্জাদ তার দুটি বইয়ে প্রচুর মিথ্যার মিশেলে এক অলৌকিক ধাঁধাঁর জগৎ তৈরি করেছে। মিথ্যার সঙ্গে মিথ্যার, ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনাবিলাসী মনের গল্প, মুক্তির সোপানতলে বলি হওয়ার জন্য কোটি বাঙালি নর-নারীর প্রাণদানকে যে বা যারা উপহাস করে, ঘৃণা ছড়ায় তাদের সম্পর্কে যত কম বলা যায়, সভ্যতার জন্য ততটাই ভালো; কিন্তু ইতিহাস এমন এক অমোঘ নিয়তির পাতা- বেদনাখরায় আক্রান্ত হয়ে রক্তাক্ত চোখে হলেও তা প্রতিজন সচেতন মানুষের পাঠ করা জরুরি।

‘একাত্তরে পাকিস্তানি হায়েনা বাহিনীর পরাজয়ের বেদনা ধারণ করে যেসব রাজাকার পুস্তক রচনা করেছে, সেইসব মোনাফেকের উৎপত্তি কোথা থেকে, তার একটা রিপোর্টও রেখেছেন মুনতাসীর মামুন, রাজাকারের মন পুস্তকে। তিনি লেখেন, ‘একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য। যেসব রাজাকার আত্মজীবনী লিখেছেন, তাদের প্রায় সবাই মাদ্রাসার ছাত্র। শুধু তাই নয়, রাজাকারি আদর্শের প্রতি যেসব শিক্ষিত অনুগত তাদের প্রায় সবাই মাদ্রাসার ছাত্র। এ কারণে রাজাকাররা মাদ্রাসা ছাত্রদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা আগে যা ছিল, এখনও তা-ই আছে। এবং তা আধুনিক যুগের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। কিন্তু সব সময়ে একে সমর্থন করা হয় এবং এ সমীকরণটি তুলে ধরা হয়, ইসলাম = মাদ্রাসা।’

এই যখন অবস্থা, তখন কীই-বা করার থাকে সাধারণ মানুষের? মাদ্রাসাকে ব্যবহার করে, নিরন্ন, ক্ষুৎপিপাসায় কাতর কিন্তু বেহেস্তের জন্য লালায়িত থাকে, তখন সত্যিই মুশকিল এসব মানুষকে ফিরিয়ে আনা। আর এ সুযোগটাই গ্রহণ করে রাজকার গোষ্ঠী এবং এই ধারণার অন্যরা।

সা’দ আহমদ পেশায় অ্যাডভোকেট। এখন তার নামডাক শোনা যায় না বটে কিন্তু ১৯৭১ সালে কুষ্টিয়ার রাজাকার হিসেবে মশহুর ছিলেন তিনি। শান্তি কমিটির প্রধান হিসেবে কুষ্টিয়া অঞ্চলে যা যা করার, তা করেছিলেন। স্বাধীনতার পর গ্রেফতার হন, কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, তারপর সাধারণ ক্ষমায় ছাড়া পেয়ে যান। ১৯৯০ সালে তার লেখা একটি বই প্রকাশিত হয়, নাম মুজিবের কারাগারে পৌনে সাতশ’ দিন।  কী বলতে চেয়েছেন তিনি? তার ভাষায় ‘এই বইতে কারাজীবনের কাহিনিই শুধু ভাষায় রূপ পায়নি, এতে স্থান পেয়েছে এই দেশের একটি অধ্যায়ের ভাঙাগড়ার ইতিহাস, একটি নতুন রাজনৈতিক ভূখণ্ডে সর্বগ্রাসী ভাঙনের করুণ আর্তনাদ, সর্বনাশা বিভেদ ও অনৈক্যে সয়লাব এবং নব্য শাসক ও শোষকের ‘পৌনে সাতশ’ দিনের সীমাহীন লুণ্ঠন ও নির্যাতনের কাহিনী।’

সা’দ আহমদের লেখার পর অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের বিশ্লেষণ : “এবার শব্দগুলো অনুগ্রহ করে লক্ষ্য করুন। তিনি স্বাধীনতার পর দুই বছরের কাহিনী মূলত বিধৃত করতে চান, যেখানে শাসক ছিলেন ‘শোষক’। এবং সে সময়টা ছিল ‘সীমাহীন লুণ্ঠন ও নির্যাতনের’ সময়। যখন বাংলাদেশে খালি শোনা গেছে ‘সর্বগ্রাসী ভাঙনের করুণ আর্তনাদ।’ এর আগে বা ঠিক ১৯৭০-৭১ এ সময়টা কী ছিল? নিশ্চয় সুসময়, তাই বলতে চান সা’দ আহমদ।”

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা এভাবেই রাজাকারদের মন ও মনের অতলে লুক্কায়িত শয়তানী জাল তুলে ধরেছেন।

আব্বাস আলী খান ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রথম সারির নেতা। স্বাধীন বাংলাদেশের জেনারেল জিয়াউর রহমানের রাজাকারীয় শাসনের সুযোগে আব্বাস আলীরা গর্ত থেকে মুখ বের করে ইঁদুরের মতো এবং ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা বাংলার মাটিতে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। সেই সুযোগের ব্যবহার করে আব্বাস একটা বইও লিখেছেন। বইটির নাম :  স্মৃতি সাগরের ঢেউ।

মুনতাসীর মামুনের তীক্ষè চোখ সেই বইয়ের ওপর আলোকপাত করেছে। তিনি বইটির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে লিখেছেন- ‘গ্রন্থের পটভূমিতে তিনি লিখেছেন’- ‘একাত্তরের চৌদ্দই ডিসেম্বর আমরা দশজন ফ্যামিলিসহ ইন্টারকন্টিনেন্টালে হোটেলে উঠলুম। এটাকে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের নিউট্রাল জোন [নিরপেক্ষ এলাকা] ঘোষণা করা হয়েছিল কিছুদিন আগে। সারাদেশে তখন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে। ঢাকা পতনোন্মুখ। দিবালোকে রাশিয়ান মিগ ২১ এর উপর্যুপরি হামলায় ঢাকাবাসীদের এক প্রাণান্তকর অবস্থা।’ 

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন নিজস্ব বিশ্লেষণে লেখেন :

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আব্বাস আলী খান কেন ইন্টারকন্টিনেন্টালে উঠলেন? তিনি জানাননি। আমরা জানি, সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী কেষ্ট-বিষ্টুরা। এখান থেকে আমরা বুঝে নিতে পারি আব্বাস আলী খান ছিলেন হানাদারদের সহযোগী। এই কয়েক লাইনেই কিন্তু আবার বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন- মিগ ২১ এর হামলায় ঢাকাবাসীর প্রাণান্তকর অবস্থা। না, ঢাকাবাসীর নয়, প্রাণান্তকর অবস্থা ছিল হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকারদের। ঢাকাবাসীরা দিব্যি ছাদের উপর দাঁড়িয়ে সে অবস্থা উপভোগ করেছে মাত্র।’

এই হলো রাজাকারীয় মন ও মানসিকতার সামান্য উদাহরণের উপকরণ। বইটি বিশাল, প্রায়  চার’শ পৃষ্ঠার। বইটির পরতে পরতে রাজাকারদের অকৃতজ্ঞতা, অপরিণামদর্শী জীবনের নোনতা ঘটনার বিষ পান করতে করতে রাজাকারদের তুলে ধরেছেন, তাদের সেইসব বই থেকে বিবরণ উপস্থাপন করে অধ্যাপক মামুন প্রমাণ করেছেন রাজাকাররা কখনওই বিশ্বাসঘাতকতার পথ ছাড়বে না।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের অনবদ্য বই রাজাকারের মন বইটি পাঠ করতে করতে মুক্তিযুদ্ধের এক অবাক জগতে প্রবেশ করতে হয়। কত অজানা রহস্য আর ঘটনার সমাবেশ বইটিতে আছে, পাঠ না করলে অনুভব করা দুঃসাধ্য। বইটির আলোচনা শেষ করার আগে মুনতাসীর মামুনের ব্যক্তিগত আখ্যানের বিবরণ দিয়ে শেষ করতে চাই। তিনি লিখেছেনÑ ‘খুব সম্ভব আশির দশকের কোনো এক সময়ে মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন একটি ব্যাংকে গেছি। ম্যানেজার সাগ্রহে স্যুট পরা এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলেন। ওই ভদ্রলোকের কাছে আমার পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘ইনি সাজ্জাদ হোসায়েন’।

‘কোন সাজ্জাদ হোসায়েন?’ আমি জিজ্ঞেস করি।

‘ওই যে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন।’

 সাজ্জাদ হোসায়েন স্মিত মুখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। না, আমি সালামও দিইনি, করমর্দনের জন্য হাতও বাড়াইনি। শুধু বললাম, ও। তারপর ঘাড় ফিরিয়ে নিলাম।

সাজ্জাদ হোসায়েনের নামটা শোনামাত্র আমার ক্রোধ হচ্ছিল। আরও মনে পড়ল, বেয়নেটবিদ্ধ হওয়ার পর ঘরে এসে নাকি তিনি বলেছিলেন, একটি আদর্শের জন্য এতগুলো লোক প্রাণ বিসর্জন দিতে পারে, আর পাকিস্তানের জন্য সাত কোটি লোকও এগিয়ে আসতে পারে না?’

এই হচ্ছে পাকিস্তানি আত্মা। বাস করছে বাংলাদেশে কিন্তু প্রাণ পড়ে থাকে পাকিস্তানে। এসব বদমাইশ আর নেমকহারামদের আত্মপ্রতারণার খতিয়ান তুলে ধরেছেন নিজস্ব বিশ্লেষনের শৈলী আর সৌকর্যে, রাজাকারের মন বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়।

অনুসন্ধিৎসু, নিজেকে জানতে আগ্রহী, বাংলাদেশের জন্মঠিকুজি বিষয়ে নিবেদিত, তাদের এটি অবশ্যই পাঠ করা দরকার।  বইটি পাঠ করলে একই সঙ্গে রাজাকারের মন ও  একাত্তরের হত্যা ও লুণ্ঠন সম্পর্কে অবাক নির্লিপ্ততার একটা বিবরণ পেতে পারেন। ইতিহাস বড় নির্মম। দিন যত যাচ্ছে, রাজাকারের ইতিহাস আরও বিস্তৃত হচ্ছে বাংলাদেশ জুড়ে। সেই বিস্তৃত ইতিহাসের অন্যতম ইতিহাসবেত্তা অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। তার হাতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিচিত্র মাত্রায় বেগবান হচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

মনি হায়দার : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares