আণবিক আঁধার : পাঠপ্রতিক্রিয়া : মোজাম্মেল হক নিয়োগী

প্রচ্ছদ রচনা : সেরা ১২ বইয়ের ডালি

আণবিক আঁধার : পাঠপ্রতিক্রিয়া

মোজাম্মেল হক নিয়োগী

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনকে বাংলাভাষী সাহিত্যানুরাগীদের কাছে পরিচয় করে দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না; বরং বাহুল্য। আমাদের কাছে সেলিনা হোসেন একটি সম্মানের নাম, একটি মর্যাদার নাম। দীপ্তিমান প্রতিভার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম ও নিরলস অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে তিনি অনেক উঁচু স্থানে পৌঁছেছেন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে একমাত্র সেলিনা হোসেনেরই কয়েকটি বই দেশের বাইরে বিশে^র কয়েকটি দেশের বিশ^বিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়েছে যা শুধু লেখিকার নয়, এদেশের নাগরিক হিসেবে এবং সাহিত্যকর্মী হিসেবে আমাদেরও গর্বের বিষয়। স্বভাবে নিরহঙ্কারী, বিনয়ী ও সাদা মনের মানুষ হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদী এবং মাথা না নত না করার মানুষ তিনি। নানা মাত্রিক লেখার প্রাচুর্য : উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, চিত্রনাট্য ও  শিশুসাহিত্য। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও পদকে তাঁর ঝুড়ি পরিপূর্ণ। এত সম্মাননা কয়জন লেখকের ভাগ্যে জোটে!    

সেলিনা হোসেনের সব লেখা পড়া না হলেও খুব কমও পড়া হয়নি। উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধ পাঠ করার সুযোগ হয়েছে প্রচুর, মন্ত্রমুগ্ধের মতো টান অনুভব করেছি। নিজের অক্ষমতা স্বীকার করেই বলছি, কোনো বই নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছে থাকলেও দ্বিধা ছিল যে, যথার্থ আলোচনা করতে পারব কি-না। আণবিক আঁধার পড়ার পর মনে হলো পাঠপ্রতিক্রিয়া প্রকাশ করার জন্য সেই দ্বিধার বৃত্তটি ভাঙা প্রয়োজন; বের হয়ে আসতে পারলাম।

যদি বলা হয় আণবিক আঁধার উপন্যাসটিকে একটি বাক্যে প্রকাশ করতে তাহলে এভাবে প্রকাশ করা যায় যে, উইপোকার ডিবির মতো অন্তঃসারশূন্য ও ভালোবাসাহীন উচ্চবিত্ত এক দম্পতির জীবনকে ঘিরে বাংলাদেশসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশের নারী নির্যাতন ও মর্ষকামিতার বিভিন্ন প্যাটার্ন শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় নিখুঁত চিত্র বিষাদের ধূসর ক্যানভাসে উৎকীর্ণ বেদনাসিক্ত এক নারীর ঋজু হয়ে দাঁড়াবার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যাপৃত।       

ঔপন্যাসিক এটি নির্মাণ করেছেন অত্যন্ত দরদ, মমতা ও আবেগের উত্তাপে যা চরিত্রগুলোর নামের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে। চরিত্রগুলোর নামের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখা যাক : প্রশান্তি, অনুপম, মেঘরাশি, আলোকরশ্মি, লতামঞ্জরি, ফুলমতি, দুলিবরণ, প্রীতিরাখী, কাঞ্চনময়ী, নৃকান্তি, বাণীঅর্চি, জুঁইফুল, দীপ্তরাজ, জয়িতা, টিপুরণি, সূর্যরথী, তৃণাঋতু ইত্যাদি। চরিত্রগুলোর প্রতিটি নামেই রয়েছে আধুনিকতা এবং কল্পনার মাধুরী মেশানো রং। এ ছাড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এবং উপন্যাসের একটি বড় স্থান জুড়ে রয়েছে জাকার্তার চিত্রশিল্পী তাতিয়ান। প্রশান্তির জীবনকে ঘিরেই উপন্যাসের অন্য চরিত্রগুলো আবর্তিত হয়েছে। চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রশান্তির স্বামী বহুগামী ও সংসার উদাসী অনুপম, স্কুলগামী কন্যা মেঘারাশি, মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলে দীপ্তরাজ, বালি দ্বীপের সঙ্গী তাতিয়ান, কাজের মেয়ে বাণীঅর্চি, কাজের ছেলে টিপুরণি ও কাজের বুয়ার ফুলমতির মেয়ে জুঁইফুল, বান্ধবী আলোকরশ্মি, বোন নৃকান্তি ও বন্ধু শুভদেব ইত্যাদি। অন্যান্য চরিত্র ছোট হলেও কাহিনিবিন্যাস ও উপন্যাসের প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণভাবে খোদিত হয়েছে। 

উপন্যাসের শুরুতে রামপুরায় বাবার কোলে শিশু নওশিনের গুলিবদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া এবং শেষের দিকে শামসুন্নাহার হলের ছাত্রীদের ওপর পুলিশের হামলার মধ্য দিয়ে সময়ের সীমারেখা টানলে এক বছরের মধ্যেই উপন্যাসের কাহিনির বিস্তার লক্ষ করা যায়। এই সময়ব্যাপ্তি ২০০২ সাল। কাণ্ডের শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে প্রশান্তির জীবনের শৈশবের স্মৃতিমন্থনেও নিজের অভিজ্ঞতায় দূরসম্পর্কীয় মামা মঞ্জুর এলাহির দ্বারা আক্রান্ত হওয়া এবং নানার বাড়ির চাকর সাহাবালির অপরিণত ও অপাপ ভালোলাগার প্রেক্ষাপটে সাহাবালিকে গাছে বেঁধে পিটানোর ঘটনাটি প্রশান্তির মনে দাগ কেটে থাকে আজীবন।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সাহিত্যের নবপর্যায়ের পদ্ধতি হচ্ছে ঘটনাপরম্পরার বিবরণ দেওয়া নয়, বিশ্লেষণ করে তাদের আঁতের কথা বের করে দেখানো।’ আণবিক আঁধার উপন্যাসেও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা অন্তরের হাহাকার, আঁতের ভেতরের বিষবাষ্প, মানুষের অস্তিত্বের শিকড় ধরে টান দিয়েছেন লেখক অত্যন্ত যত্নে, মমতায়। শুধু বাংলাদেশের সমাজের নারীর অবস্থান, সামাজিক-মানসিক-যৌন নির্যাতনসহ ধর্ষণের মতো ধিক্কৃত কথনেই তিনি ক্ষান্ত হননি, প্রাসঙ্গিক বর্ণনায় টেনে এনেছে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, জাপানের নারীদের যৌন নির্যাতন ও শোষণের বর্বরোচিত সংস্কার ও ঘটনা। শুধু ধর্ষণই নয়; বরং ছেলেদের ওপর বলাৎকারের ঘটনা উপন্যাসের কাহিনিকে ঋদ্ধ করেছে। একটি উপন্যাসের চালজোড়ায় যেসব খাপ, কুরু, খড় ও গেঁরোর প্রয়োজন হয়, এগুলোর সবই এই উপন্যাসে জোরালোভাবে উপস্থিত।

প্রশান্তি ও অনুপমের সংসার যেন সুদৃশ্য উই ডিবি যার ঝুরঝুরে খোড়ল, বিরামহীন হাহাকার, বিষাদের অন্তহীন নহর, সংকট ও দ্বন্দ্বের ভাঙনের পাড়ে খড়ের কুটির। এখানে অস্তিত্ব ও চেতনার দ্যোতনা, সমাজ তথা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, শূলবিদ্ধ মানবাধিকার, প্রত্যাশা ও অপ্রাপ্তির নিরন্তর হাহাকার প্রতিধ্বনিত উপন্যাসের পাতায় পাতায়। প্রশান্তি চরিত্রটি নিদারুণ মমতা ও শিল্পিত চিন্তনের সৃষ্টি। স্বভাবে একরোখা ও সাহসী, নিজে মানবাধিকারের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, সমাজের নিপীড়িত মানুষের সাহায্যের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে, নিয়ন্ত্রণহীন স্বামীর বহুগামিতার কারণে দু’জনের দূরত্ব যোজন যোজন দূর, ধর্ষণ যৌনতার বিরুদ্ধে লড়াকু নারী নিজেই ধরা দেয় বালি দ্বীপে বন্ধু তাতিয়ানের বাহুবন্ধনে।   

এখানেই ঔপন্যাসিক সময়কে শব্দবন্দি করেছেন কয়েকটি ঘটনার মধ্য দিয়ে, যেমন সাইবার ক্যাফে, নওশিনের মৃত্যু, ভারতের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নারী ও আব্দুল কালাম আজাদের প্রার্থিতাকে প্রাসঙ্গিক করে। এভাবে উপন্যাসের সময়বন্দি কিংবা কোনো সময়ে উপন্যাসের কাহিনি রজ্জু হতে দেখা যায় অনেক উপন্যাসেই, যেমনÑ নাগিব মাহফুজের কায়রো ট্রিলজিতে সাধারণ কিছু সংলাপ ও অস্ট্রেলিয়ান সৈনিকদের অল্প দৃশ্যকল্পে প্রথম বিশ^যুদ্ধের সময়ের প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে। সময়ের প্রতিফলন পাঠকের ভাবতে সহজ হয়, প্রাসঙ্গিক হয়, কল্পনায় সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট চিন্তার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়। উপন্যাসের বা গল্পের বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে পাঠক অবশ্যই সময়কে বুঝতে পারেন, তদুপরি কোনো ঘটনা বা ঐতিহাসিক বিষয় পাঠককে সহজ করে দেয় সেই সময়ে চলে যাওয়ার জন্য। 

উপন্যাসের শুরুটাই নাটকীয়। অন্তর্দহনে বাষ্পরুদ্ধ প্রশান্তি বুদ্ধমূর্তি হাতে নিয়ে বুদ্ধের মতো প্রশান্তি খুঁজে বেড়ায় স্পেস ও টাইমে। মানুষের জীবন স্পেস ও টাইমের সঙ্গে নিগূঢ় বন্ধনের সত্যানুসন্ধান করেন লেখিকা উপন্যাসের বিভিন্ন স্থানে। প্রকৃত অর্থে, এই দর্শনকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন ও পেরেছেন যে, জীবন হলো স্পেস ও টাইমের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। নির্ভার জীবনের জন্য আপন দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকার জন্য নিজস্ব স্পেস ও টাইম বড় প্রয়োজন। সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, মানসিক, পারিবারিক ইত্যাদি নানা রকম শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে মানুষ যখন নিঃশ^াস নিতে পারে না, উৎপীড়ন ও দহনে মানুষ যখন ক্লান্ত হয়, তখন তার একান্ত স্পেস প্রয়োজন যেখানে স্বস্তির নিঃশ^াস নেওয়া যায় নিজের মতো করে। এই উপন্যাসে এমনই একটি গুমোট পরিবেশ থেকে প্রশান্তির জন্য ঔপন্যাসিক একটি স্পেস ও কিছুদিন সময় তৈরি করেছেন বালি দ্বীপে।      

উচ্চবিত্ত পরিবারে স্বামীর ভালোবাসাবঞ্চিত ও অবহেলিত প্রশান্তি ও বহুগামী নারীঘেঁষা অনুপমের সংসারজীবনের অর্থনৈতিক কোনো সংকট না থাকলেও দু’জনের মনের সাকিন যেন দুই মেরুতে। অনুপমের বহুগামিতার অভ্যাস প্রশান্তির কাছে সুস্পষ্ট এবং নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা প্রশান্তি মানবাধিকারের কনসালটেন্সি করে। অথচ নিজের ঘরেই মানবাধিকার প্রতিনিয়ত দ্বান্দ্বিক ও বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে চলা এই চরিত্রটিই উপন্যাসের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রশান্তিকে একক আধিপত্যে প্রতিষ্ঠিত করেছেন লেখিকাÑ কখনও টানটান উত্তেজনায়, কখনও বেদনায় সিক্ত পরিবেশে।  

পরিবারের অশান্তির আরেকটি কারণ প্রতিবন্ধী পুত্রসন্তান দীপ্তরাজ। দীপ্তরাজের মানসিক প্রতিবন্ধিতার জন্যও প্রশান্তিকে লাঞ্ছনা সইতে হয়, অনুপম দায়ী করে প্রশান্তিকে। অথচ কোনো প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য মা কখনওই দায়ী হতে পারে না। একমাত্র মেয়ে মেঘরাশি সেও দার্জিলিংয়ে থেকে স্কুলে পড়ে। এক বিশাল শূন্যবাড়িতে প্রশান্তির জীবনকে সচল রাখে কাজের বুয়া, কাজের মেয়ে বাণীঅর্চি, কাজের ছেলে টিপুরণি। টিপুরণি দীপ্তরাজকে দেখভাল করে। দীপ্তরাজের দিকে তাকালে প্রশান্তির অন্তরের শূন্যতা হু হু করে কাঁদে। প্রশান্তির সেবাধর্মী কাজ ও উদারতার পরিচয় পাওয়া যায় বাণীঅর্চিকে স্কুলে ভর্তি করানো, জয়িতার বাবার মৃত্যুতে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাওয়া, নয় বছর বয়সী শিশু জুঁইফুলের ধর্ষণের মামলা করা, জিতে আসা এবং কুড়িগ্রামের অগ্নিদগ্ধ কিশোরীকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। শূন্য সংসারে মাঝে মাঝে কলেজ জীবনের বন্ধু আলোকরশ্মি ও বোন বৃকান্তিসহ আরও কিছু বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় পূর্ণতা খোঁজে প্রশান্তি। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ুয়া নৃকান্তি বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই। সমাজ ও সংস্কারের ধার ধারে না নৃকান্তি।

দীপ্তরাজের প্রতি বাবার নিষ্ঠুরতা থাকলেও মায়ের মমতার বাঁধন আলগা হয়নি কখনও। মায়ের বুকজুড়ে আশার স্পন্দন, চোখজুড়ে স্বপ্নের ছায়া সর্বক্ষণই খেলা করে। দীপ্তরাজকে মা দেখতে চায় স্টিফেন হকিংয়ের মতো। অনেক স্বপ্ন দীপ্তরাজকে নিয়ে যা আপন মনেই মুদ্রিত হয়, প্রকৃতপক্ষে নিজের স্বপ্নের কথাগুলো ওর সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে উচ্চারিত হয় :

‘হ্যাঁ, তুমি রাজকন্যা খুঁজতে যাবে। তুমি একটি অসাধারণ রাজকন্যা খুঁজে পাবে। সে তোমার ওপর ভালোবাসার বৃষ্টি দেবে। ভালোবাসার জ্যোৎস্না দেবে। তুমি ওর হাত ধরে বলবে, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি ছাড়া আমার জীবনে আর কেউ থাকবে না। মেয়েটি তোমার চোখে চোখ রাখবে। তুমি তখন দেখতে পাবে সেই চোখে লক্ষ তারার ঝিকিমিকি। দু’জনে মিলে তারার দেশে ঘুরে আসবে। পৃথিবীতে নেমে ঘুড়ি ওড়াবে। তোমাদের অপেক্ষায় বসে থাকবে সাতরঙা রঙধনু। তোমাদের ডেকে বলবে, দীপ্তরাজ, এসো, আমাদের ঘরে ঘুরে যাও। লক্ষ কোটি তারার রাজ্যের লোকেরা তোমাদের জন্য দরজা খুলে দেবে। তোমরা ওদের সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াবে।’

কারও কারও মতে স্থানও উপন্যাসের চরিত্র। এই মতামতের দিক থেকে এই উপন্যাসের বালিদ্বীপ একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। উপন্যাসের বিশাল ক্যানভাসজুড়ে বালি দ্বীপে প্রশান্তির দু’সপ্তাহের ভ্রমণ। নিখুঁত বর্ণনায় বইয়ের পাতায় পাতায় বসন্তের ফুলের মতো উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে সম্পূর্ণ বালিদ্বীপটি। বালিদ্বীপে না গিয়েও মনে হয় উপন্যাসটির পাতা থেকে সেখানকার খাবারের ঘ্রাণ, সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন, আদিবাসীদের জীবনাচার, সৈকতে ঘুরে বেড়ানো বিচবয়, ফ্রেশগার্লদের ছবি, ম্যাসাজের আনন্দ, পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো, ভাস্কর্য, ছবির গ্রাম, সুইমিং পুলের কলকেলি সবই উপভোগ করা যায়।    

বালিদ্বীপের রাজধানী ডেনপাসার বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সি ভাগাভাগি করে আসার সময় চিত্রশিল্পী তাতিয়ানের সঙ্গে গড়ে ওঠে দু’জনের বন্ধুত্ব। তাতিয়ান বছরে একবার আসে বালিদ্বীপে জীবনকে উপভোগ করার জন্য। আর প্রশান্তি জীবনের স্পেস ও টাইমের জন্য সেখানে বেড়াতে যায়, খুঁজে ফেরে হাহাকার করা জীবনের স্বস্তির নিঃশ^াস। প্রশান্তি দু’সপ্তাহের জন্য বালিদ্বীপে বেড়াতে যায়, বিস্ময়করভাবে অনুপমও সেখানে বেড়াতে যায় অথচ দু’জনই জানে তারা বালিতে। অনুপম প্রশান্তির কাছে স্বীকার করে সে বন্ধু চায়নি, প্রতিদিনই ফ্রেশ মেয়ের সঙ্গ নিচ্ছে। আর প্রশান্তি পুরনোকেই আঁকড়ে ধরে বন্ধুত্বের নিগড়ে বেঁধে রাখে তাতিয়ানকে। শরীর থেকে কি মন বিচ্ছিন্ন? অবিচ্ছিন্ন নয়। তাই প্রশান্তিও হার মেনে তাতিয়ানের বাহুবন্ধনে ধরা দেয়। দুঃখতাপিত জীবনের কথা ভাগাভাগি করার সময় অশ্রুসিক্ত ও বেদনার্ত প্রশান্তি তাতিয়ানের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে।

‘এসো আমরা দুঃখ ভাগ করে নেই।

তাতিয়ান ওকে বুকে টেনে নেয়। ঠোঁট দিয়ে প্রশান্তির চোখের জল মুছে দেয়। সমুদ্রটা প্রবল ঢেউ নিয়ে এই ঘরে এসে ঢুকেছে। নিজের বিশালকায় কাণ্ড নিয়ে গাছটা এই ঘরে এসে ঢুকেছে। এখনই সময় পৃথিবীর পথ হেঁটে যাওয়ার। প্রশান্তি দু’হাতে তাতিয়ানকে জড়িয়ে ধরে।

অনেক রাতে তাতিয়ান যখন ঘর থেকে বিদায় নেয় তখন দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, তোমার ছেলেটিকে এই গানটি তুমি শুনিও প্রশান্তি।’

বালিতে প্রশান্তির টাইম অ্যান্ড স্পেস পাওয়ার বাসনা ও অনুপমের নিতান্তই ফ্রেশ মেয়েদের সঙ্গে যৌনলালসা  মেটানোর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য টানা হয়েছে। কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় সংস্কার-কুসংস্কারের কোনো সীমায় বন্দি করা হয়নি প্রশান্তি ও অনুপমকে। কারও জীবনই অগোচরে থাকেনি। এই ভ্রমণের সময়ই অনুপম ফোন করে বলছে সে কোথায় আছে কী করছে, প্রশান্তিও বলছে কিন্তু দু’জন কখনই মুখোমুখি হতে চায়নি। প্রকৃতপক্ষে প্রশান্তিই চায়নি অনুপমের সঙ্গ। সে তাতিয়ানের দেওয়া সুখেই আচ্ছন্ন। 

তাতিয়ানের উজ্জ্বল চোখের মুগ্ধতায় প্রশান্তি দৃষ্টি নত করে। ওর ভেতরটা থরথর করে কাঁপে। ভাবে, এভাবেই হেরে যাওয়া, এভাবেই নিজেকে উজাড় করে দেওয়া। এটুকু আছে বলেই টিকে আছে মানব-মানবীর আবেগের গভীরতম বোধ। এটুকু দিয়েই বেঁচে আছে প্রকৃতি।

অনুপমও ছাড় দিতে নারাজ। সে অন্তত স্বামীত্ব ফলাতে চায়, তাই একই ফ্লাইটে ঢাকায় ফেরার প্রস্তাব দিলে প্রশান্তি ফিরতি টিকিট দু’দিন পিছিয়ে দেয়। প্রশান্তি বিমানবন্দরে গিয়ে দেখে অনুপম দাঁড়িয়ে আছে, স্বামীত্ব ও কর্তৃত্ব এবং তাতিয়ানকে নিজের অবস্থান বোঝানোর জন্যই সেও দু’দিন পিছিয়ে টিকিট নিয়েছে সজ্ঞাতে। প্রশান্তি হকচকিয়ে গেলেও অনুপমকে পাত্তা না দিয়েই তাতিয়ানের কাছ থেকে স্বাভাবিক বিদায় নেয়। বন্ধুত্বের নিবিড় বন্ধনে যা হয় তারই একটি উপহার ক্যাসেটে একটি গানের কথা মনে করিয়ে দেয় তাতিয়ান। আবেগে বিগলতি হয়নি কেউই। বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই স্বাভাবিকভাবে বালি’র বন্ধুত্বের বিচ্ছেদের রেখা টানে দু’জনই।

নারীকে মানুষ হিসেবে নয়; বরং পুরুষের সেবা ও যৌনদাসী হিসেবেই কয়েকটি দেশের ঘটনা প্রসঙ্গক্রমে উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে। পাকিস্তানের একটি উপজাতি নারীকে ধর্ষণ করার প্রহসনের সালিশ মনে দাগ কাটে। ভারতের এমন লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। জাপানি সৈন্যদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রশান্তি জেন্ডার বিষয়ক কাজ করে, নারীর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে। ছুটে যায় নিগৃহীত ও লাঞ্ছিত নারীদের কাছে। এর ভেতরেও আশার আলো দেখা যায় তুরস্কে যেখানে নারীর বৈষম্য দূর করে অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ঘোষণা করে।   

তুরস্কের ইসলাম ধর্মগুরু মেহমেত নুরি ইলজাম ও সেখানকার সর্বোচ্চ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হাই রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্স বোর্ড এক সংস্কারের কথা ঘোষণা করেছেন। তারা জানিয়েছেন, নারী ও পুরুষে কোনো বৈষম্য নেই। তাদের অবস্থান এক। তারা পরস্পরের পরিপূরক। এখন থেকে মহিলাদের মসজিদে যাওয়ার কোনো বাধা থাকবে না। তারা প্রার্থনার সময় পুরুষদের সঙ্গে একত্রে অংশ নিতে পারবে। একই সঙ্গে ধর্মতাত্ত্বিক ইয়াসার নুরি ওজটারক জানিয়েছেন যে, আবহমান কাল থেকে নারীকে তাদের ঋতুকালে অপবিত্র বলে গণ্য করা হয়েছে। এই সময়ে নারীদের কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হতো না। এটি একটি কুসংস্কার। এই কুসংস্কার দূর করা উচিত। এখন থেকে এই কুসংস্কার গ্রাহ্য করা হবে না। মহিলারা ঋতুকালেও মাসের যেকোনো সময়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারবে। হাই রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্স বোর্ড তুরস্কের সত্তর হাজার মসজিদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং মহিলাদের মসজিদে যাওয়ায় বাধা দিলে বোর্ডের ক্ষমতা আছে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অবিশ্য সূচনায় এই সিদ্ধান্ত কোথাও কোথাও বাধা পেয়েছে।     

কষ্ট যেন প্রশান্তির পায়ের বেড়ি আর পায়ে পায়েই চলে। প্রশান্তি যেন বারবার ডুবে যায় অতল আঁধারের ভুবনে। মেঘরাশির মধ্যে নিজের জীবনের সুখ খুঁজত প্রশান্তি। কিন্তু মেঘরাশিও শেষ পর্যন্ত নিজের স্পেস কি খুঁজতে চলল, যে স্পেস মানুষের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই। এক পরাক্রমশালী শক্তি সেই স্পেস নিয়ন্ত্রণ করে। মেঘরাশি লিউকোমিয়া আক্রান্ত। সে পারবে কি বেঁচে থাকতে? ঔপন্যাসিক মেঘরাশির অসুখের পরিণতি না দেখিয়ে প্রশান্তির দৃঢ় মানসিক শক্তিকে ‘হার না মানা’ স্পেসে এনে দাঁড় করিয়েছেন। আর উপন্যাসের শেষ প্রান্তে দেখা যায় বিষাদের অতলে সমুদ্রে না ডুবে প্রশান্তি দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করে :

‘আমি চেয়েছিলাম আমার ছেলেটি স্টিফেন হকিং হবে। ঈশ্বর তুমি এখনও পারো আমার ইচ্ছাটি পূরণ করতে। একবার তোমার অলৌকিক স্পর্শে বদলে দাও আমার ছেলেটির মস্তিষ্ক। ও আবিষ্কার করুক এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনো অজানা দিক। বিশ্ববাসী ফিরে তাকাক ওর দিকে।

আমি বেঁচে থাকার পূর্ণতা দেখতে চাই ঈশ্বর। আমি পরাজিত মানুষ হবো না। তুমি ভুলে যেয়ো না ঈশ্বর যে আমি লড়াই করতে শিখেছি। লড়াই করা ছাড়া মানুষের জীবন পূর্ণ হয় বলে আমি বিশ্বাস করি না। এই বিশ্বাস নিয়ে এখন আমার বেঁচে থাকা।’

এক অভাবনীয় ভাবাচ্ছন্ন তার মধ্যে পাঠক আটকে থাকে উপন্যাসের শেষ বাক্যটি পর্যন্ত।

মোজাম্মেল হক নিয়োগী : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares