প্রত্যয়ী স্মৃতির অনুভবের অন্তরালে : সৌভিক রেজা

প্রচ্ছদ রচনা : সেরা ১২ বইয়ের ডালি

প্রত্যয়ী স্মৃতির অনুভবের অন্তরালে

সৌভিক রেজা

১৯৫১ সালের ১৯ শে অক্টোবর তারিখে নরেশ গুহকে লেখা এক চিঠিতে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকতা সাহিত্যের শত্রু। সাবধান!’ এই চিঠি যখন লিখছেন বুদ্ধদেব, তখন তিনি স্টেটসম্যান পত্রিকায় নিয়মিত সম্পাদকীয় লেখার কাজ করছেন। সে-কাজটিও তিনি তখন ছেড়ে দেবার কথা চিন্তা করছেন, ছেড়ে দিয়েওছিলেন পরে। সাহিত্যের প্রতি তীব্র-এক ভালোবাসা থেকেই তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। তবে সাংবাদিকতার পেশা  যে সাহিত্যের শত্রু—এরকম কথা কেউ-কেউ আবার স্বীকার করতে চাননি। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কথা আমরা জানি, যিনি পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকেই আজীবন গ্রহণ করেছিলেন; তিনি মনে করতেন : ‘সম্পূর্ণ পৃথক একটা সৃজনক্ষেত্রে নিজের ব্যর্থতার দায় নিজের পেশার ওপর চাপিয়ে দেওয়া মোটেই শোভন না কোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে। এটা একেবারেই ন্যায্য না।’ কেন ন্যায্য নয়—তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেছিলেন, ‘কবি হিসেবে যদি আমি ব্যর্থ হয়ে থাকি তবে সে দোষ একান্তই আমার। সেইসঙ্গে তিনি আরও যোগ করে বলেছেন, ‘বস্তুত সাংবাদিকের পেশা যদি কখনো আমার কাব্যসৃষ্টির পথে বাধা মনে হত, সেক্ষেত্রে সাংবাদিকতাকে দোষ না দিয়ে আমি তো বরং আমার পেশাটাই বদলে নিতে পারতাম।’ অবশ্যি এটিও ঠিক যে আমাদের মতো দেশগুলোতে বারবার পেশা বদলের সক্ষমতা সব লেখকের থাকে না। এখানে সে সুযোগ তো নানাভাবেই সীমিত।

২.

আবুল হাসনাত দীর্ঘদিন ধরে পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীকে তিনি যে-উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তার ইতিহাস এখনও লেখা হয়নি। একদিন নিশ্চয়ই কেউ তা লিখবেন। বর্তমানে তিনি যুক্ত আছেন মাসিক কালি ও কলমের সঙ্গে। তাঁর পরিশ্রম ও দক্ষতার গুণে যে-মাসিকপত্রের সুনাম এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।

সম্পাদনার পাশাপাশি আবুল হাসনাত কবিতা, শিল্পকলা সমালোচনা, শিশুসাহিত্যসহ সাহিত্যের নানা শাখায় দীর্ঘদিন ধরে তাঁর কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রবন্ধের সংকলন— প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য। যেখানে শম্ভু মিত্র, অশোক মিত্র, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, খালেদ চৌধুরী থেকে শুরু করে রেহমান সোবহান, হাসান আজিজুল হক, সন্জীদা খাতুন, শামসুর রাহমান, দ্বিজেন শর্মা, মতিউর রহমানসহ আরও কয়েকজন গুণী মানুষ ও তাঁদের বইপত্র নিয়ে স্বাদু ও উপভোগ্য আলোচনা রয়েছে।

৩.

এই বইয়ের লেখাগুলোর একটি বড়ো বৈশিষ্ট্য যে এখানে আবুল হাসনাত অযথা পণ্ডিতিপনা করেননি; বরং শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে, সহানুভূতির সঙ্গে আবেগ ও মননকে মিশিয়ে ব্যক্তি ও তাঁর কৃতি-সাধনার নিবিড় মূল্যায়নে সচেষ্ট থেকেছেন। নিজস্ব মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার চরমতাকে প্রশ্রয় দেননি। শম্ভু মিত্র সম্পর্কে আবুল হাসনাত বলেছেন, ‘বাংলা নাটকে আধুনিকতার পথ নির্মাণ ও সৃজনে বহুমাত্রিকতা ও ঐতিহ্যভাবনার কথা যখন ওঠে তখন খুব শ্রদ্ধাভরে আমরা শম্ভু মিত্রকে স্মরণ করি। কতভাবেই না তিনি বাংলা নাট্যমঞ্চকে করে তুলেছিলেন ঐতিহ্যিক প্রবাহের সঙ্গে ঐশ্বর্যবান ও আধুনিক।’ মঞ্চে শম্ভু মিত্রের অবদান কোথায়?—এ-সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানাচ্ছেন :

‘মঞ্চে প্রাণশক্তি সঞ্চারে নবধারার প্রবর্তক তিনি।…নির্দেশনা ও অভিনয়ের গুণে তিনি দর্শক-হৃদয়ের নানাস্তরে পরিশীলিতভাবে জীবন সম্পর্কে এমনভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন, যা ছিল শুধু শম্ভু মিত্রের একক অবদান। ধরা যাক, রাজা অয়দিপাউসে তাঁর অভিনয়ের গুণে দর্শক-হৃদয়ে যে টানটান উত্তেজনা, অভিনয়ে যে-গ্রিক আবহের সৃষ্টি অয়দিপাউসের আর্ত হাহাকার কিংবা রাজা নাটকে স্বরের ওঠানামা, অন্ধকারের মধ্যে শুধু গলার ভেতর দিয়ে উচ্চারণ, যা বুকের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। এ উচ্চারণ কখনো কখনো মৃদু, তীব্র ও সূক্ষ্ম অভিনয়গুণের দিক থেকে সেখানে তিনি নিঃসঙ্গ, একক ব্যক্তিত্ব, তুলনারহিত।’

শম্ভু মিত্রের আরেকটি অবদানের কথা বলতে গিয়ে আবুল হাসনাত জানাচ্ছেন—‘দীর্ঘদিন এমত ধারণা ছিল যে রবীন্দ্রনাটক মঞ্চ-উপযোগী নয়। মঞ্চায়নের জন্য যা প্রয়োজন তা রবীন্দ্রনাটকে নেই। শম্ভু মিত্রের রক্তকরবী প্রযোজনা নানা দিক থেকে স্মরণীয়তার মূল্য পেয়েছে শুধু জীবনের অনুষঙ্গের সাযুজ্যের জন্য নয়, তিনিই রবীন্দ্রনাথের নাটক মঞ্চায়নকে সহজ করে তুলেছিলেন।… রবীন্দ্রনাথের নাটক তাঁরই নির্দেশনায় হয়ে উঠেছিল প্রাণের আবেগে দীপ্ত।’

খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদ অশোক মিত্রের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে আবুল হাসনাত বলেছেন, ‘আদ্যন্ত মার্কসবাদী, অর্থনীতিতে তুখোড়, মেধাবী ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কবিতার প্রতি ভালোবাসা এবং রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতার পরিচর্যা যে কত গভীর ছিল…আমরা তা বহুপূর্বেই উপলব্ধি করেছিলাম।…যুবা বয়স থেকে কবিতা তাঁর ধমনিতে মিশে গিয়েছিল। একদা কবিতাচর্চাও করেছেন।… বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দের বহু কবিতা তাঁর মুখস্থ ছিল। বামপন্থিরা জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বিমুখ ছিলেন দীর্ঘদিন; অশোক মিত্র এটা সমর্থন করেননি।’ অশোক মিত্রের সারাজীবনের কর্মপ্রচেষ্টার নানান দিক সামগ্রিকভাবে তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন আবুল হাসনাত। পরিশেষে তাঁর চরিত্রের কয়েকটি প্রবণতার কথা তুলে ধরে বলেছেন, ‘অশোক মিত্র স্পষ্টভাষী, নীতিতেও অবিচল ছিলেন। সেই যে যৌবনে কমিউনিস্ট আদর্শের ঝরনাতলায় অবগাহন করেছিলেন, আমৃত্যু সে-আদর্শ লালন করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও চীনের সমাজতন্ত্র থেকে সরে আসায় বিষণ্নবোধ করেছেন। কিন্তু হতাশায় ভেঙে পড়েননি। মার্কসবাদ মানবমুক্তিতে এখনো প্রাসঙ্গিক— একথা বারংবার উচ্চারিত হয়েছে তাঁর শেষ জীবনের লেখনীতে। এখানেই একক ও নিঃসঙ্গ ছিলেন তিনি।’

অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আবুল হাসনাত অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘রেহমান সোবহানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকাল থেকে দূর থেকে শ্রদ্ধা করে এসেছি। তাঁর সঙ্গে কোনোদিন আলাপ হয়নি। সুযোগ হয়েছিল দু-একবার। কিন্তু আমার সাহসে কুলোয়নি।’ সেইসঙ্গে তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘ষাটের দশকের মধ্য পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রদ্ধা-জাগানিয়া যে-কয়েকজন অধ্যাপককে করিডরে হাঁটতে দেখেছি তার মধ্যে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ বিরল এক ব্যক্তি; মুখে কৌতুক ও স্মিত হাসি। কিন্তু সেটুকুও সব নয়, আরো কিছু এবং গভীর।’ এরপর এসে আবুল হাসনাত তাঁর বক্তব্যকে খানিকটা বিস্তৃত করে বলেছেন, ‘ব্যক্তিত্ব, অধ্যয়ন-প্রীতি, অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে দৃষ্টিভঙ্গি, অধ্যাপনার গুণাবলি, শিক্ষার্থীদের প্রতি অপার স্নেহ, জ্ঞানী ও তর্কপ্রিয় এবং জিজ্ঞাসা-উন্মুখ শিক্ষাব্রতী তৈরিতে সর্বদা প্রয়াস, রেহমান সোবহানকে বুদ্ধির দীপ্তিতে উজ্জ্বল চেতনাসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী হিসেবে সারস্বত সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এছাড়া তাঁর নানামুখীন কর্ম এই অঞ্চলের বাঙালির শোষণ এবং মুক্তির সংগ্রাম ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন ও কল্যাণকর এক সমাজ নির্মাণে বিরতিহীন প্রেরণা ও প্রর্বতনা, অর্থনৈতিক দৃষ্টি রেহমান সোবহানকে এদেশের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলেও বিশিষ্ট তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিতি দান করেছে।’ আর এসবই তিনি বলেছেন রেহমান সোবহানের স্মৃতিকথা ‘Untranquil Recollections : The Years of Fulfilment’ (Sage : 2016) বইটির আলোচনার সূত্র ধরে। আবুল হাসনাতের মতে, ‘এই বইটি পড়ার পর একই সঙ্গে উপলব্ধি করা যায় এ-অঞ্চলের বাঙালির বা বাংলাদেশ সন্ধান ও নির্মাণের ঐতিহাসিক তাগিদ ও গুরুত্ব।’ সেইসঙ্গে আবুল হাসনাত বইটি সম্পর্কে আরও বলেছেন, ‘ভাবতেও ভালো লাগে তাঁর (রেহমান সোবহান) এই জায়মান স্মৃতিলেখা, এই অঞ্চলের বাঙালির স্বরূপ সন্ধানের উদ্দীপনাময় যে-ছবি তুলে ধরেছে, আমাদের জন্য তা সত্যিকার অর্থেই চেতনাময় হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে যাদের দ্বিধার অন্ত নেই, কখনো সখনো তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ভূমিকা নিয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধে বেসামরিক মানুষের অংশগ্রহণ নিয়ে যেসব মন্তব্য করা হয়, রেহমান সোবহান লিখিত বইটি যদি তারা পাঠ করেন, আশা করি অনেক বিভ্রান্তির নিরসন হবে।’ তবে যে-বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন রেহমান সোবহান, সেই বাংলাদেশ যে গড়ে উঠতে পারেনি সেইটি তাঁর নানান বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার ২৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘স্বাধীনতার ২৮ বছর পরেও যে এমন একটা বাংলাদেশ হবে সেটা আমি আশা করতে পারিনি। বেশিরভাগ মানুষের প্রত্যাশায় এরকম বাংলাদেশ ছিল না। সেই অর্থে আমরা এখনো সেই বাংলাদেশের অপেক্ষায় আছি যে বাংলাদেশের জন্য আমরা যুদ্ধ করেছিলাম।’

৪.

কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক সম্পর্কে আবুল হাসনাত বলেছেন, ‘হাসান আজিজুল হক বাংলা কথাসাহিত্যের ব্যাপক বিস্তৃত ভুবনকে তাঁর বহুমুখীন সৃজন ও বহুভাবনার দ্বারা যেভাবে আলোকিত করে চলেছেন তা সত্যিকার অর্থেই বিরল। বাংলাদেশের সাহিত্যে এর কোনো তুলনা নেই।’ কেন তুলনা নেই তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আবুল হাসনাত জানাচ্ছেন, ‘ ষাটের দশকে যখন তাঁর (হাসান আজিজুল হক) আবির্ভাব, এই সময়েই বাংলাদেশের সাহিত্য সংকটে দীর্ণ এবং সংকট উত্তরণের জন্য কবি ও লেখকেরা প্রবলভাবে প্রয়াসী হয়েছিলেন।…এই সময়ে স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত গদ্য নিয়ে বিষয় ও প্রকরণে পঞ্চাশের দশকের সৃজনধারা থেকে ভিন্ন এক আদল নিয়ে হাসান আজিজুল হকের আবির্ভাব। তাঁর শকুন গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা সমকালে। অনেক পাঠক এর বিষয় ও প্রকরণে চমৎকৃত হয়েছিলেন। এই গল্প প্রকাশিত হবার পরে আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

কবি সমর সেন সম্পর্কে আবুল হাসনাত লিখেছেন, ‘তাঁর আত্মজীবনী বাবু বৃত্তান্ত-এ নিজেকে নিয়ে, তাঁর পরিপার্শ্ব নিয়ে যে তীক্ষ্ণ পরিহাস ও কটাক্ষের পরিচয় পাই বাংলা সাহিত্যে এ-বিরল। এর সঙ্গে তাঁর কবিতা ও ডায়েরি পাঠের পর আমার তো কেবলই মনে হয়, রোমান্টিক হাহাকার, নারীর প্রতি অকৃত্রিম প্রেম, কাউকে পাওয়ার জন্য তাঁর রক্তে যে-বাসনার বীজ এবং এক সম্পূর্ণ ভিন্ন বলয় থেকে জীবনকে প্রত্যক্ষণ তাঁকে অতুলনীয় এক কবি করে তুলেছিল। সেইসঙ্গে সমর সেনের ‘ধমনীতে…সমাজের প্রতি অঙ্গীকার অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে গিয়েছিল’ সেইটও উল্লেখ করতে আবুল হাসনাত ভোলেননি।

কবি শামসুর রাহমান সম্পর্কে আবুল হাসনাত দীর্ঘ ও মর্মগ্রাহী একটি আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ‘ষাটের দশক থেকে মানুষের সংগ্রামী-চেতনা যে-পরিপ্রক্ষিতে ঋদ্ধ হয়েছে, তারই যেন আশ্চর্য রূপকার হয়েছিলেন শামসুর রাহমান। বিশেষত নিরালোকে দিব্যরথ কাব্যগ্রন্থে তাঁর মানবিক চেতনা প্রখর রূপ নিয়ে উন্মেচিত হয়েছিল। এতদিন তিনি ছিলেন মৃদুকণ্ঠ। এই কাব্যগ্রন্থ থেকেই তিনি বোধকরি প্রবল এক অঙ্গীকার নিয়ে জীবনানন্দীয় ছায়া ও বোধ থেকে বাঁক ফিরলেন। নিম্নকণ্ঠের খোলস ভেঙে যেন বেরিয়ে এলেন বৃহত্তর জগৎ-সংসারে।’

৫.

সমালোচকের যে-মাত্রাচেতনার কথা আমরা নানাভাবেই শুনে থাকি, ‘প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য’ গ্রন্থটি তার এক অপরূপ নিদর্শন। এই বইয়ের ‘ভূমিকা’য় (‘ভূমিকা নয়’) লেখক জানাচ্ছেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে সম্পাদনা কাজে যুক্ত থাকবার ফলে নিজের লেখালেখি অব্যাহত রাখা ছিল কষ্টকর।…তবু আমি লেখার ব্যাপারে উদ্যম হারাইনি। বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয়ে লিখেছি। যখনই কোনো কিছু ভালো লেগেছে তা নিয়ে লেখার চেষ্টা করেছি। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে স্থির থাকিনি।’ এই যে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে স্থির না-থাকা, যাকে অন্যভাবে বলতে পারি— রুচির সামগ্রিকতা, সেইটি আবুল হাসনাত নানাভাবে তাঁর সমালোচক-প্রবণতার মধ্যে আত্মস্থ করে নিয়েছেন। এইখানেই তিনি ব্যতিক্রম ও স্বতন্ত্র। এই বইটিতেও তাঁর প্রমাণ আমরা পাই।

সৌভিক রেজা : কবি, অধ্যাপক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares