জাগরণের কালের কথা : শিল্পীর স্কেচ খাতা : রেহানা পারভীন

প্রচ্ছদ রচনা : সেরা ১২ বইয়ের ডালি

জাগরণের কালের কথা : শিল্পীর স্কেচ খাতা

রেহানা পারভীন

সম্প্রতি প্রকাশিত হলো শিল্পী হাশেম খানের বই শিল্পীর স্কেচ খাতা। কবি ও শিল্পী তারিক সুজাতের চমৎকার প্রচ্ছদে মোড়ানো এবং হাশেম খানের গোটা চল্লিশেক স্কেচে সজ্জিত বইটি প্রকাশনা সৌকর্য ও নান্দনিকতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ৬৪ পৃষ্ঠার বইটির এক পৃষ্ঠায় শিল্পীর স্কেচ অপর পৃষ্ঠায় লেখা এভাবে সাজানো রয়েছে। লেখার বিষয় শিল্পী হাশেম খানের গর্ভনমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউটের (বর্তমান চারুকলা) শিক্ষাজীবনের স্মৃতিচারণ। বইটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ চর্চা।

হাশেম খান বাংলাদেশের তৃতীয় প্রজন্মের শিল্পী ও শিক্ষক। তবে এখানেই তার পরিচয় ফুরিয়ে যায় না। একজন শুদ্ধ চিত্রকর হয়েও তিনি বই-নকশা, পোস্টার, লোগো ইত্যাদি নির্মাণে একটি রুচিশীল ধারা তৈরি করেছেন। কেবল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নয় জাতীয় রাজনীতির যেকোনো সংকটাপন্ন সময়ে হাশেম খান সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। আগামী প্রজন্মের হাতে একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার তুলে দিতে তিনি জীবনভর শিশু-কিশোর সংস্কৃতির সংগঠক হিসেবে কাজ করে চলেছেন। ১৯৯২ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।

মুনতাসীর মামুন-ফাতেমা ট্রাস্ট আয়োজিত মিসবাহউদ্দিন খান স্মারক বক্তৃতা ২০১৯ প্রদানের জন্য এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি বক্তৃতার বিষয় হিসেবে বেছে নেন তাঁর দিনপঞ্জি বা স্কেচ খাতা থেকে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিল্পী জীবনের শুরুর দিকটিকে। অর্থাৎ আর্ট কলেজে পড়ার স্মৃতি। শিল্পী হাশেম খান এখানেও অন্যদের চেয়ে ভিন্ন। আর্ট কলেজের স্মৃতি থেকে বেছে এমন কিছু মুহূর্তকে তুলে এনেছেন যা তার শিল্পীসত্তা ও জাতীয় সত্তাকে উদ্ভাসিত করেছে। এ বক্তৃতার গ্রন্থরূপ শিল্পীর স্কেচ খাতা।

স্মৃতিচারণ শুরুর আগে নিবেদন অংশে স্কেচ কী, কেন এবং জীবনের নানা স্তরে এর গুরুত্ব সংক্ষেপে বিবৃত করেছেন। শিল্পী কৈফিয়ত দেন কেন তিনি শিল্পী হলেন, বলেন :

‘সব সময় আমার একটা চেষ্টা ছিলÑ আমার চিত্রকলার সঙ্গে, আমার চার পাশের মানুষ যেন সম্পৃক্ত হয়। আমার চিত্রচর্চা তাদের কাজে সাহায্য করে। এমন একটি অভিলাষের কারণেই আমি শুধু ক্যানভাসে ও কাগজে চিত্র নির্মাণ করে ক্ষান্ত হইনি। জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমার শিল্পভাবনাকে নিয়ে গিয়েছি।… পঞ্চাশের দশক ও ষাটের দশকে পূর্ব-পাকিস্তানের গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজের শিল্পকলা নিয়ে সহযোগী যোদ্ধার ভূমিকায় কাজ করেছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা আন্দোলনে, ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনে এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে আমার শিল্পসত্তা নিয়ে, আমার রঙতুলি, চিত্র, ড্রইং স্কেচকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছি।’

ফলে  মুক্তিযুদ্ধের সময় হাশেম খান ও তাঁর পরিবার পাকিস্তানিদের অত্যাচারের শিকার হয়। তাঁর বড় ভাই ডা. সুলেমান খানকে হত্যা করে, তিনি এবং পরিবারের অনেকেই আহত হন।

স্বাধীন দেশেও শিল্পী হাশেম খানের তুলি সংস্কৃতির সুস্থ ও প্রগতিশীল ধারা বিনির্মাণে সদা ব্যাপৃত রয়েছে। এর সূত্রপাত হাশেম খানের ছাত্রজীবন থেকে। সেটা ছিল জাগরণের কাল যখন রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধের নিগড় ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার নেতৃত্বে ছিলেন তাঁরা। তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে যেখানে ছবি আঁকার ওপর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নানা বিপত্তি আরোপিত, আর্ট কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হাশেম খান সে সময় একটি দুঃসাহসী অগ্রগামী পরিকল্পনা করেন ও তার বাস্তবায়ন করেন।

চিত্রকলা ও আনুষাঙ্গিক শিল্পকলার প্রথম প্রতিষ্ঠান গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট, ঢাকা প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৪৮ সালে। হাশেম খান এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন ১৯৫৬ সালে। আর্ট কলেজে প্রথম ছাত্রী ভর্তি হয় ১৯৫৪ সালে পাঁচজন। হাশেম খানের বর্ষেও তিনজন ছাত্রী ভর্তি হন। ছাত্রছাত্রীরা তখন পৃথক কক্ষে ক্লাস করত। হাশেম খানের পরিকল্পনায় তার সহপাঠীরা সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা ছাত্রছাত্রী একত্রে ক্লাস করবেন। ১৯৫৭ সালে এমন সিদ্ধান্ত কতটা দুঃসাহসী ছিল বলার অপেক্ষা রাখে না। একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য ছিল পৃথক কমনরুম। ছাত্রীরা শিক্ষকদের সাথে ক্লাসকক্ষে যেতেন আবার ক্লাস শেষে শিক্ষকদের অনুসরণ করে কমনরুমে ফিরে আসতেন।

১৯৫৭ সালে চারুকলার বর্তমান অবস্থানে স্থপতি মাযহারুল ইসলামের নকশা করা নতুন ভবনে ক্লাস শুরু হলে একটি বড় কক্ষে ব্ল্যাকবোর্ড দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বসার স্থানকে পৃথক করা হয়। একই বোর্ডে বিপরীত দিক থেকে কাজ করতে গিয়ে তাদের বেশ সমস্যা হতো। হাশেম খান তখন এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি নেন। অন্যান্য সহপাঠীকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে ছাত্রীদের উৎসাহ ও সমর্থনে ব্ল্যাকবোর্ডের আড়াল সরিয়ে শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীরা একত্রে বসে কাজ করতে থাকেন। তখন ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল জয়নুল আবেদিন। শ্রেণিশিক্ষক ছিলেন শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া। ছাত্রদের প্রতি স্নেহপ্রবণ হলেও এমন একটি পরিস্থিতির জন্য তিনি তৈরি ছিলেন না। ফলে শ্রেণিকক্ষে এসে ছাত্রছাত্রীদের একত্রে ক্লাস করতে দেখে তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে অফিস কক্ষে ফিরে যান। ইনস্টিটিউটের জন্য এটি ছিল একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। তবে আর্ট কলেজ আজকের মতো সেদিনও প্রগতিশীলতার নেতৃত্বে ছিল। তাই ছাত্রদের এমন সিদ্ধান্তে শুরুতে কঠোর মনোভাব দেখালেও সেদিন থেকেই চারুকলায় কো-এডুকেশন চালু হয়। বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল এটি যার পরিকল্পনায় ছিলেন আজকের শিল্পী হাশেম খান। ছাত্রদের বিরুদ্ধে ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ’ এনে শিক্ষকরা যে শাস্তি দিয়েছিলেন তাও দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী। শাস্তি ছিল সপ্তাহের প্রথম ক্লাসে প্রত্যেক ছাত্রকে স্কেচ খাতায় তিনটি করে স্কেচ দেখাতে হবে। এ শিক্ষকরাই ছিলেন আমাদের পথ প্রদর্শক। হাশেম খান তাঁদের উত্তরাধিকার বহন করছেন।

একবিংশ শতকের এ পর্যায়ে এসে যখন দেশে কো-এডুকেশনের মতো প্রয়োজনীয় ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা কঠিন হয়ে উঠেছে। ১৯৫৭ সালেই তা প্রবর্তন করে শিল্পী হাশেম খান যে প্রগতিশীলতার পরিচয় দিয়েছে সমগ্র জীবনে সে পথ থেকে তিনি বিচ্যুত হয়নি। তাঁর স্কেচ খাতা তাই একই সাথে হাশেম খানের দিনলিপি বাঙালির প্রগতিশীলতার দলিল।

রেহানা পারভীন : গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares