বেলাল চৌধুরীর কবিতা : বইটি হাতে পেলে সংগ্রহ থেকে কেউ তাড়াতে চাইবেন না : তপন বাগচী

প্রচ্ছদ রচনা : সেরা ১২ বইয়ের ডালি

বেলাল চৌধুরীর কবিতা : বইটি হাতে পেলে সংগ্রহ থেকে কেউ তাড়াতে চাইবেন না

তপন বাগচী

বেলাল চৌধুরীর কবিতা বেরিয়েছিল ১৯৬৮ সালে, ষাটের দশকের শেষপাদে। এর আগেই বেরিয়েছিল তাঁর প্রথম কাব্য নিষাদ প্রদেশে (১৯৬৪)। ষাটের দশকের কবি হিসেবে বেলাল চৌধুরী কলকাতায় শক্ত অবস্থান করে নিয়েছেন। কিন্তু দ্বিতীয় গ্রন্থেই নিজের নামাঙ্কন যেন প্রথাবিরোধিতার অন্যতর রূপ। যেন কবিরূপে নিজের অধিষ্ঠানের প্রতি প্রবল আত্মবিশ্বাস ও অহঙ্কারের প্রকাশ। সেই বেলাল চৌধুরীর কবিতা (২০১৯) আবার বেরোল তাঁর প্রয়াণের পরে। কবি তারিক সুজাত ও কবি পিয়াস মজিদের সম্পাদনাধন্য হয়ে। নবতর সংস্করণ বটে! তবে বেলাল চৌধুরীর সব কবিতা এতে নেই। এই খামতির কথা সম্পাদকদ্বয় অকপটে স্বীকার করেছেন। বেলালের প্রথম বইটি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আরও কবিতা হয়তো রয়ে গেছে। সম্পাদকদ্বয়ের অনুসন্ধানে ক্লান্তি ছিল না, বোঝা যায়, কিন্তু অপেক্ষা করেই বা লাভ কী! একসময় হয়তো আরও কবিতা পাওয়া যাবে, তাঁদের এই আশার সঙ্গে পাঠকের কোনো দ্বিমত নেই।
ভূমিকায় সম্পাদকদ্বয় তাঁদের সীমাবদ্ধতা ও পরিধির কথা জানিয়েছেন বিনয়ী ভাষায়। বেলাল চৌধুরীর কবিতার সামগ্রিক পরিচয় দেওয়ার চেষ্টাও তাঁরা করেছেন। সম্পাদনাগ্রন্থে যা অবশ্যকরণীয়। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমাদের ক্ষুধা রয়ে যায় পরিশিষ্টে কবি পরিচিতি বা জীবনপঞ্জি না পেয়ে। গ্রন্থ পরিচিতি দেওয়া হয়েছে প্রতিটি গ্রন্থের শুরুতে। সেখানেও কিছু প্রশ্ন জেগে থাকে। যেমন ভালবাসার কবিতা গ্রন্থটি ১৯৮৩ এবং ১৯৯৭ সালে দু’বার প্রকাশ পায়।  কিন্তু এই সংকলনে ওই গ্রন্থভুক্ত কবিতা আছে ‘নিঃশব্দ শব্দ’ নামের এক পৃষ্ঠার একটি কবিতা মাত্র। তাহলে একটি কবিতা দিয়ে এক পৃষ্ঠার কাব্য ছিল ওটি। একই রকম প্রশ্ন জাগে সেলাই করা ছায়া (২০১০) নামের কাব্য সম্পর্কে। এটিও কি চার পৃষ্ঠার কাব্য ছিল? এসব প্রশ্ন জাগার আগেই জবাব দেওয়ার দায়িত্ব ছিল সম্পাদকদের। আর এই রচনার পাঠকদের মনে রাখতে আমরা এখন বেলাল চৌধুরীর কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে বসিনি, বসেছি তারিক সুজাত ও পিয়াস মজিদ সম্পাদিত বেলাল চৌধুরীর কবিতা নিয়ে আলোচনা করার জন্য। এই সংকলনের যা কিছু কৃতিত্ব সম্পাদকের, কবির নয়।
বেলাল চৌধুরীর কবিতা পড়ব মূলত তাঁর যথাপ্রাপ্য কবিতার সর্বাধিক সংকলন বলে। তিনশ’র বেশি কবিতা আছে এতে। খুব কি বেশি এই সংখ্যা? ষাটের দশকের কবিদের মধ্যে তিনিই সম্ভবত বয়োজ্যেষ্ঠ। আর কবিতার সংখ্যা বিচারে মনে হচ্ছে সবচেয়ে কম লিখেছেন হেলাল হাফিজ, আর তার পরের অবস্থানেই বোধহয় বেলাল চৌধুরী। বেলাল  চৌধুরী অবশ্যি প্রবন্ধ, কলাম, অনুবাদ ও শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন। আর তাঁর জীবিকার বড় অংশ জুড়ে ছিল সম্পাদনা। সেই সূত্রেও অনেক রচনা রয়েছে নামে-বেনামে। অনেক সম্পাদকীয়ও লিখতে হয়েছে তাঁকে। অর্থাৎ রচনাসমগ্র হিসাব করলে একেবারে কম নয় সেই ভাণ্ডার। তাঁর মূল পরিচয় কবি বলেই তাঁর কবিতার সংকলনের প্রতি আমাদের ব্যাপক আগ্রহ। তাঁর কবিতাসংখ্যার চেহারা নিয়ে কবি শামসুর রাহমান একবার বলেছিলেন :
‘বেলাল চৌধুরী কখনও খুব বেশি লেখেন না, কিন্তু যখনই লেখেন তখনই তিনি কাব্যানুরাগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি কখনও কবিতার বাঁধা সড়কে হাঁটেন না, একটু অন্যরকম লিখতে চেষ্টা করেন তিনি এবং তাঁর কবিতার কথাচ্ছলে ফুটে ওঠে স্বকালের বিচূণিত রূপ, তার মর্মমূল ছেঁড়া আর্তনাদ।’ 
 
বেলাল চৌধুরীর জলবিষুবের পূর্ণিমার (১৯৮৫) বইয়ের শেষ প্রচ্ছদে মুদ্রিত কবি শামসুর রাহমানের এই কথা ভূমিকা তুলে ধরে সম্পাদকদ্বয় খুব ভালো একটি কাজ করলেন। কলকাতার সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় ১৯৭৩ সালে পঞ্চাশের আর এক খ্যাতিমান কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন : 
‘বেলাল চৌধুরীর কবিতা অত্যন্ত নাগরিক গুণসম্পন্ন এবং সাহসী।.. কখনও তাঁর চিন্তাকে মনে হয় সুররিয়ালিস্টিক।… বেলাল চৌধুরীর প্রতিটি কবিতাই বাধাবন্ধনহীন এবং আলাদা ধরনের স্বাদ দেয়।’ 

আবার ষাটের দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন : 
‘কলকাতার ষাটের কবিদেরই একান্ত সহবাসী বেলাল, সতীর্থ-পারিবেশিক প্রভাব যে জীবনে ও সাহিত্যে কি বিপুল ভূমিকা উদযাপন করে, তা আর একবার প্রমাণিত হয় বেলালের কবিতায়! বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, শমশের আনোয়ার, দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়, তুষার রায়Ñ এঁদের কবিতার সঙ্গে বেলালের কবিতার একটি সামান্য সাযুজ্য ও সাধর্ম আছেÑ তা হচ্ছে গদ্যকেই কবিতা করে তোলা, ব্যক্তিগত বহুবর্ণ স্ফূরণ ও বিস্ফোরণ ঘটানো, যেকোনো তুচ্ছ দিনানুদৈনিকের জিনিসকে কবিতায় উত্তীর্ণ করা।’ (করতলে মহাদেশ, ১৯৯৩)। 
এই যে বেলালের কবিতা সম্পর্কে তিনটি উদ্ধৃতি- এর বাইরে আরও মন্তব্য, শংসা ও সমালোচনা রয়েছে। সম্পাদকদ্বয় তা থেকে মাত্র তিনটি মন্তব্য বেলালের কবিতার চরিত্র অনুধাবনে সহায়ক মনে করেছেন।  শামসুর রাহমানের মন্তব্য বেলালের জলবিষুবের পূর্ণিমা কাব্য পর্যন্ত বিস্তৃত। এর পরের কবিতায় কি আমরা ‘স্বকালের বিচূর্ণিত রূপ’ কি শনাক্তযোগ্যভাবে লক্ষ করি? তবে ‘তার মর্মমূল ছেঁড়া আর্তনাদ’ আমরা টের পাই শেষ কবিতাটি পর্যন্ত। সুনীলের মন্তব্য অনেকটাই কৌশলী। ‘প্রতিটি কবিতাই বাধাবন্ধহীন’ কি কোনো শংসাবচন? ‘আলাদা ধরনের স্বাদ দেয়’ মানে কী? ভালো নাকি মন্দ? তা সুনীল স্পষ্ট করে বলেননি। বেলালের কবিতার ধোঁয়াশার মতোই সুনীলের এই মন্তব্য। আর মান্নান সৈয়দ তাঁকে তুলনা করেছেন কলকাতার ষাটের কবিদের সঙ্গে। এঁদের সকলে কি বেলালের মতো আলোচিত হয়েছেন শেষতক! মূল প্রশংসা হলো ‘গদ্যকেই কবিতা করে তোলা’। মান্নান সৈয়দ বেলালকে কেন ঢাকার কোনো কবির সঙ্গে তুলনা করেননি। কলকাতায় বেলালের কবিসত্তার বিকাশ বলেই কি ঢাকার কবিদের কাতারে তাঁকে দাঁড় করিয়ে বিচারের সুযোগ নেননি? এসব প্রশ্ন মনে রেখেও বলা যায়Ñ সে বেলাল ঢাকা-কলকাতা আর পঞ্চাশ-ষাটের মিশ্রকলায় কিছুটা হলেও অবমূল্যায়িত হয়েছেন। বেলাল অবশ্য এসব কূটকাচালতে কান দেননি। কেবলই লিখে গেছেন আয়েশী ভঙ্গিতে। যখন যা মনে এসেছে, লিখেছেন। দৈনিক জনকণ্ঠে যে কলামটি লিখতেন ‘বল্লাল সেন’ ছদ্মনামে, তা পড়ে তো মনে হয় তিনি কাব্যভাষা দিয়েই গদ্যকলাম লিখেছেন। বেলাল অন্যসব পরিচয় ছাপিয়ে শেষতক কবি। বেলাল চৌধুরী কবি হিসেবে সকল বোদ্ধা মহলে স্বীকৃত হলেও সাধারণ পাঠকের দরবারে একটা দূরত্ব রেখেই চলেছেন যেন। ষাটের কবিতায় আসাদ চৌধুরী, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, অসীম সাহা যতটা পাঠক রায় পেয়েছেন, বেলাল চৌধুরী তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এর একটা কারণ হতে পারে, তিনি কবি হয়ে-ওঠার সময়ে দেশে ছিলেন না। আরেকটা কারণ হতে পারে- ঢাকায় ফিরে লেখা কবিতাও ঠিক ঢাকার রক্ত গ্রহণ করতে পারেনি। কলকাতার ষাটের কবিতা পড়তে আমরা বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, উত্তম দাশ, মৃণাল বসুচৌধুরী, তুষার রায়, শমসের আনোয়ার, শামসুল হক, কবিরুল ইসলাম, কবিতা সিংহ কিংবা মঞ্জুষ দাশগুপ্তের কবিতা পড়েছি। বেলাল চৌধুরী হয়ে পড়লেন না-ঢাকা, না-কলকাতা। আবার মনস্বী পাঠক বেলালের কবিতার দুই দেশের স্বাদই পেলেন। তাঁর কবিতার বই ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। সম্পাদকদ্বয় যেমন অনেক চেষ্টা করেও তাঁর প্রথম কবিতার বই উদ্ধার করতে পারেননি। এসব কারণেও বেলাল চৌধুরী কবি হিসেবে তেমন আলোচিত হতে পারেননি। এই দৈন্য ও সীমাবদ্ধতা আমাদের কবিতাভুবনের। এবার তারিক সুজাত ও পিয়াস মজিদ তাঁর কবিতার সংকলন করে পাঠকদের উপকার করলেন, উপকার করলেন সমালোচকদেরও। এবার বেলাল চৌধুরীর কবিতা  পাঠের দরজা উন্মুক্ত হলো, সমালোচনার পথ প্রশস্ত হলো। এই কারণে দুই প্রিয় সম্পাদককে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারা যাবে না। আমাদের আলোচনার বিষয় উদ্দিষ্ট গ্রন্থ, বেলাল চৌধুরীর কবিতার ব্যবচ্ছেদ নয়। সেটি বারান্তরে করা যাবে।
বেলাল চৌধুরীর কবিতা গ্রন্থের প্রকাশনামান উন্নত। বারবার পাতা উল্টাচ্ছি আর মনে হচ্ছে আহা, জীবদ্দশায় যদি তিনি এমন সুন্দর গ্রন্থনা দেখে যেতে পারতেন? উন্নত কাগজ, রুচিসম্মত পৃষ্ঠাবিন্যাস আর শক্ত বাঁধাই! বইটি হাতে পেলে সংগ্রহ থেকে কেউ তাড়াতে চাইবেন না! প্রকাশক জার্নিম্যান বুকসকে তাই অভিবাদন জানাই।
তপন বাগচী : কবি, গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares