ধা রা বা হি ক  : অষ্টম  প র্ব

আত্মজীবনী

দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়ি

রিজিয়া রহমান

সতের

বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির বয়স কম তো  হলো না! পঁচাত্তর সালের কলঙ্কিত রক্তপাতের পর থেকে এই পর্যন্ত আমাদের সেই অবিস্মরণীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ’৭১-কে বেদনার্ত মোড়কে জড়িয়ে রেখেছিলাম আমরা- তারাই, যারা একাত্তরের গৌরবে গৌরবান্বিত হয়েছিলাম, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের কালজয়ী সেই ভাষণটিকেও আগলে রেখেছিলাম, লুণ্ঠিত-মানুষের শেষ রত্ন সম্বলটির মতো, যেন যেকোনো সময়ে দুর্বৃত্তরা সেটা লুটে নিতে না পারে।

সেই কলঙ্কিত বিস্মৃতির দিনেই কখনো কখনো রিকশায় যাওয়ার সময় পথে শুনেছি, ফুটপাতে কোনো রাজনৈতিক উপ-সংগঠনের অস্থায়ী আপিসে বেজে চলেছে সেই মহান ভাষণের ঘোষণা- ‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

কখনো বা শান্তিনগর বাজারে বাজার করতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছি, বাজারের সামনেই ভ্যানগাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের লটারির টিকিট বিক্রির বিজ্ঞাপন। ত্রুটিপূর্ণ মাইকে বিচিত্র শোরগোলে বাজছে ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি…’ উপসংহারে রয়েছে একাত্তরের যুদ্ধ ঘোষকের কণ্ঠ- ‘রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেব’, বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে কেঁদে উঠেছে একাত্তরের বাংলাদেশ। অথবা যখন দেখেছি ৭ই মার্চের মহান ভাষণটি ব্যবহৃত হয়েছে নিতান্তই নির্বাচনমুখী দলীয় স্লোগান হিসেবে- নিঃসন্দেহে বিষণ্ন হয়েছি, ভেজা চোখে ভেসে উঠেছে একাত্তরের দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়িটি। তাকে এমন ক্ষুদ্র গণ্ডিতে কোনোদিন যে আবদ্ধ হয়ে যেতে হবে, একাত্তরের সেই মার্চে আমরা ভাবতেও পারিনি।

আসলে আমরা কখনোই ‘একাত্তরকে’ নিয়ে, ৭ই  মার্চের ভাষণ’ নিয়ে গভীর আন্তরিক বিশ্লেষণে সম্ভবত যাইনি। যাইনি বলেই সোনালি গৌরবের সিংহদ্বার ‘একাত্তর’ আর জাতিত্বের পূর্ণতার বিস্ফোরণÑ সেই ৭ই মার্চের ভাষণকে উপলব্ধির অজ্ঞতায় অতি সাধারণ আনুষ্ঠানিকতায় প্রাণহীন ও মর্যাদাহীন করে তুলবার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছি।

হয় তো এই অবহেলা আর অজ্ঞতার কারণেই একাত্তরকে তার মহত্ত্বের আসন থেকে নামিয়ে দিতেও দ্বিধা করিনি। একাত্তর তাই বন্দি হয়ে যায় কখনো কখনো মুক্তিযুদ্ধের কথিত পক্ষ-বিপক্ষের বিভাজনে, ইতিহাস আর ইতিহাস বিকৃতির হট্টরোলে। যখন ‘ডিম্ব মস্তিষ্ক’ (egg headed) বুদ্ধিজীবী আর উচ্চকণ্ঠ রাজনীতিবিদদের কুক্ষিগত সীমাবদ্ধ ‘একাত্তর’ প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতায় হয়ে যায় ‘একাত্তরের চেতনা বা মুক্তিযুদ্ধের’ নিরর্থক নিষ্প্রাণ শব্দমালা। নিরুপায় একাত্তর কাঁদে মানুষের বুকের গভীরে। তাকে আঁকড়ে থাকে তারাই যারা একাত্তরের স্বাধীনতার জন্য নিঃশেষে দান করেছেন স্বজনের প্রাণ, বিসর্জন দিয়েছেন নারীত্বের সম্ভ্রম, সয়েছেন নৃশংস হানাদারের নির্মম নির্যাতন।

আজকের প্রজন্ম, আজকের রাজনীতি বা আজ যারা স্বাধীনতার সংজ্ঞা নির্ধারক, তারা যদি একবার ফিরে যায় স্বাধনিতাকামী সাত কোটি মানুষের একাত্তরের আবেগের কাছে, স্বাধীনতা নামক স্বপ্নের সিঁড়িটির বাহক সেই মহান নেতার নেতৃত্বের সঠিক মূল্যায়নের সততায়, অবধারিতভাবেই একাত্তরের মার্চ মাস হাজার বছরের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে পৌঁছে দেবে তাদের। অবশ্যই তখন স্বীকার করতে হবে, বাঙালির সুসংগঠিত জাতি হয়ে ওঠার এবং স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতির পর্ব, চলেছিল হাজার বছর ধরেই, আর এই প্রস্তুতিটি সম্পন্ন হয়েছিল একাত্তর সালের মার্চ মাসে, যাকে সাহিত্যের ভাষায় বলা যায় মাহেন্দ্রক্ষণ।

বাঙালির এই স্বাধীনতার মূলমন্ত্রকে যদিও বলা হয়েছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের কথা, তবু নিঃসন্দেহে মেনে নিতে হয় একাত্তর ছিল প্রকৃত অর্থে একটি জাতির আত্মপরিচয় (আইডেনটিটি) ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিস্ফোরণ। এই বিস্ফোরণকে সঠিক লক্ষ্যে প্রবাহিত করার জন্য প্রয়োজন ছিল সঠিক, যোগ্য আত্মনিবেদিত নেতৃত্বের। প্রশ্ন আসে একটি আধুনিক জাতির আত্ম-প্রতিষ্ঠার জন্য কেন অপেক্ষা করতে হয়েছিল দীর্ঘকাল? কেন আসেনি জাতিকে স্বাধীনতার মর্যাদায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব? উত্তরে হয় তো বলা যায়, সুসংগঠিত জাতি তার লক্ষ্য অর্জনের প্রস্তুতি পূর্ণ না করলে, যোগ্য নেতৃত্বও তৈরি হয় না।

এ প্রসঙ্গটি বিশ্লেষণ করতে গেলে, প্রথমেই আসে বাঙালির জাতিসত্তার গঠন প্রক্রিয়া ও তার সামাজিক, রাজনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের কথা। বাঙালি জাতি-গঠন সম্পর্কে আমি আমার আত্মজীবনীর প্রথম দু’টি খণ্ডে (অভিবাসী আমি ও প্রাচীন নগরীতে যাত্রা) কিছুটা আলোকপাত করতে চেষ্টা করেছি। এছাড়া আমার বং থেকে বাঙলা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসটি সম্পূর্ণই বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি এবং বাংলা ভাষার বিবর্তনের ধারাবাহিকতা অন্তে একটি জাতির উত্থান ও সুদীর্ঘকালের শোষণ-নির্যাতনের গরাদ ভেঙে মুক্তির প্রান্তে এসে দাঁড়ানোর ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে লেখা। এ উপন্যাসেই আমি বলবার প্রয়াস পেয়েছি নিজস্ব স্বাধীন ভূ-খণ্ডে একটি স্বাধীন জাতির মর্যাদায় এসে দাঁড়াতে বাঙালির সংগ্রাম করতে হয়েছে হাজার হাজার বছরেরও বেশি সময়।

একাত্তরের মার্চে এসেই সমুদ্র উপকূলবর্তী বদ্বীপ অঞ্চলে ইতিহাস তার দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় যতি টানলÑ জাতিত্বের অহঙ্কারে মাথা তুলে দাঁড়াল বাঙালি। ইতিহাসের অমোঘ বাস্তবতার নির্দেশেই নেতৃত্বের আসনটি গ্রহণ করতে হলো ভারত উপমহাদেশে একক দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেই একাত্তরের নেতৃত্বই হাতে তুলে নিয়েছিল স্বাধীনতা-উন্মুখ জাতিকে মুক্তির গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব, সঠিক সময়ে সঠিক নেতৃত্বদানের যোগ্যতাই শেখ মুজিবুর রহমানকে কালজয়ী করে তুলতে পেরেছিল। স্বাধীনতাকামী জাতির মুক্তির দাবিকে তিনি যথাযোগ্য মর্যাদায় গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, রাজনীতিবিদ থেকে নেতা হয়ে ওঠার এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে উত্তীর্ণ করেছে পৃথিবীর মহান নেতৃত্বের সারিতে। তখনই এদেশে গুরুত্ব পেয়েছিল ‘সেক্যুলারিজিম’ বা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিতটি। (ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভক্তিতে বাঙালি মুসলমানের প্রকৃত আকাক্সক্ষার অবমূল্যায়নেই ‘অসম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার’ দাবি উত্থিত হতে শুরু করে।)

নানা ধর্ম বিশ্বাস ও আচার-আচরণ নিয়ে পৃথিবীর সঙ্গে লোকজ ধর্ম-বিশ্বাস ও সংস্কৃতি, সংস্কারের আত্তীকরণে পরমতসহিষ্ণু সহঅবস্থানের যে ‘জিন’ প্রবাহিত হয়েছিল মিশ্রিত জাতি বাঙালির রক্ত প্রবাহে, সেক্যুলারিজিমের ভ্রƒণটির জন্ম সেখানেই। উপরন্তু সুফি মতাবলম্বী ইসলামের প্রচার ও অহিংস বৌদ্ধ ধর্মাচার বাঙালিকে উদার এক ধর্ম বিশ্বাসে অভ্যস্ত করেছিল। কালের প্রবাহে এই শান্তিপূর্ণ উদার সহাবস্থানের বোধটিতে আরো পরিপুষ্টি ঘটেছিল। পরিণত আত্মপ্রকাশ তার একাত্তরেই। এই নৃতাত্ত্বিক-সামাজিক ও ধর্মবোধ সত্যটি ’৪৭ এর দ্বিজাতিতত্ত্বে উপেক্ষিত হলেও মহান বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এই সত্যকে জাতি-সংজ্ঞার মূল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করতে ভুল করেননি। এক্ষেত্রে বলার অপেক্ষা রাখে না, একটি জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য তিনিই হতে পারেন, যিনি জাতিটির নৃ-তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ধর্ম-সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানকে একান্তভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন, পথ নির্দেশনায় মানষের দাবিকে ধারণ করতে ভুল করেন না। আসলে, মানুষের দাবির প্রেক্ষিতেই নেতৃত্বের উত্থান ঘটে। বলা বাহুল্য, বাঙালি জাতি যখন আত্ম-বিস্ফোরণে প্রস্তুত, সময়োপযোগী নেতৃত্বের প্রয়োজনে তখনই শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থান। বাঙালি জাতির ইতিহাসে একাত্তরের ৭ই মার্চ তাই এক অবিস্মরণীয় সত্য প্রকাশিত হওয়ার কাল, জাতির ভাগ্য নির্ধারণের উল্লেখযোগ্য বাঁকবদল।

আঠার

একাত্তরের ৭ই মার্চে শেখ মুজিবর রহমানের অবিস্মরণীয় ভাষণটির পর বদলে গেল সব কিছু। বদলে গেল ছয় দফা, এগার দফা নিয়ে দাবি এবং আশা-নিরাশার দিনগুলো। শুরু হলো নানামুখি ঘটনা প্রবাহ। শুরু হলো সঠিক গন্তব্যমুখি যাত্রা, এদিকে চলেছে ইয়াহিয়া-শেখ মুজিবুর-ভুট্টোর বৈঠক সিরিজ, সেই সঙ্গে ঢাকা, জয়দেবপুর ও চট্টগ্রামে পাকিস্তানি সৈন্যদের নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর গুলিবর্ষণÑ ঢাকায়, জয়দেবপুরে, চট্টগ্রামে। করাচি ও লাহোর থেকে বেসামরিক পোশাকে পিআইএ-এর (পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস্) যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ বোঝাই হয়ে ঢাকায় এসে নামতে থাকল, বেসামরিক আর সামরিক পোশাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সৈনিকেরা। মারণাস্ত্র বোঝাই জাহাজ এমভি সোয়াত করাচি থেকে এসে ভিড়ল চট্টগ্রাম বন্দরে। বাঙালি নিধনের ষড়যন্ত্রÑ এইসব আলামত আমাদের চিন্তিত করছিল নিঃসন্দেহে, কিন্তু দুর্ভাবনার বিভ্রান্তি ছাপিয়ে বিস্ফোরিত হচ্ছিল ক্ষোভ, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের দুর্মর আবেগ। শহরজুড়ে উড়ছে নিরীহ নাগরিক হত্যার প্রতিবাদে কালো পতাকা।

এরপরই আমরা হাতে তুলে নিলাম স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতীকী পতাকা। প্রতিটি বাড়ি, অফিস, শিক্ষালয় সরকারি-বেসরকারি ভবন থেকে মানুষের হাতে হাতে, রিকশায়-গাড়িতে সগর্বে উড়তে থাকল স্বাধীনতার গর্বিত পতাকা।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, আধুনিক অস্ত্রশক্তিতে শক্তিমত্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আসন্ন আক্রমণ মোকাবিলায় আমরা কি প্রস্তুত ছিলাম? সোজা জবাবে, বলতে হয়, হয় তো ছিলাম না। (পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত ঢাকা, যশোর, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে অবস্থানরত বাঙালি সৈনিক এবং সেনা কর্মকর্তারা হয় তো পাকস্তিান সেনাবাহিনীর জেনারেলদের মনোভাব আঁচ করতে পেরেছিলেন। হয় তো তারা করণীয় পরিকল্পনা কিছুটা গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। ৭ই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণায় (‘এবারের সংগ্রামÑ স্বাধীনতার সংগ্রাম … ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল … যার যা আছে, তাই নিয়ে’…) প্রচ্ছন্ন সিদ্ধান্তটি সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালিরা উপলব্ধি করতে ভুল করেননি সম্ভবত। আর এদিকে আবেগে ভাসছিলাম আমরা দেশবাসী। লাঠি-মিছিল কিংবা বন্দুক কাঁধে তরুণ-তরুণীদের ময়দানে ‘লেফট-রাইট’ আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত প্রশিক্ষিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে নেহাতই অর্বাচীনতা মনে হলেও হতে পারত অনেকের, তবে আমরা কিন্তু তা একেবারেই মনে করিনি। আমাদের মন তখন চরম সমাধানের জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। সেই একাত্তরে, অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তি কোথা থেকে এসেছিল আমরা জানি না, ভয়কে জয় করবার আশ্চর্য প্রেরণা ছিল দেশজুড়ে। আমরা হয়তো ভাবিনি, সামনে এগিয়ে আসছে কলঙ্কিত গণহত্যা, রক্তস্নাত পথের শেষে অপেক্ষা করছে বাঙালির হাজার বছরের আকাক্সিক্ষত স্বপ্নÑ স্বাধীনতা। শেখ মুজিব পাকিস্তানি অস্ত্রবাজদের উদ্দেশে বলেছিলেনÑ ‘তোমরা আমাকে বন্দি করতে পার, গুলি করে মেরে ফেলতে পার, কিন্তু আমার সাত কোটি বাঙালিকে শেষ করতে পারবে না।’ সেই মহান নেতাই ছিলেন আমাদের নির্ভীক হয়ে উঠবার প্রেরণা।

 সে সময়ে ঢাকায় অবস্থানরত কোনো কোনো বিদেশি সাংবাদিক একাত্তরের বিস্ফোরণকে বাঙালির আবেগ প্রবণতার উচ্ছ্বাস আখ্যা দিয়েছিলেন। অভিজ্ঞতার বৈদগ্ধ থাকলে তাঁরা হয়তো উপলব্ধি করতেন, আবেগই যেকোনো গণঅভ্যুত্থানের প্রধান উপাদান। এমনকি বড় বড় যুদ্ধকেও পরিচালিত করে এক ধরনের আবেগ। বিশেষ করে পৃথিবীখ্যাত স্বাধীনতার যুদ্ধে শক্তি জুগিয়েছে আবেগই। আজ নিঃসন্দেহে স্বীকার করি, একাত্তরে আবেগের শক্তিই ছিল আমাদের সাহসী অস্ত্র।

চব্বিশে মার্চের সন্ধ্যায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গণহত্যার সাজ-সজ্জা যখন সমাপ্ত, তার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান খুবই গোপনে পৌঁছেছেন ঢাকা এয়ারপোর্টে, এদিকে গভর্নর হাউস থেকে জুলফিকর আলী ভুট্টোকে নিয়েও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হ্যালিকপ্টার আমাদের বাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে উড়ে পৌঁছে গেছে বিমানবন্দরে। করাচিগামী বিমানের নিরাপত্তায় নিশ্চিন্ত ভুট্টো, বাংলাদেশের আকাশসীমা অতিক্রম করতে করতে গণহত্যার দৃশ্যটি কল্পনায় এনে উল্লসিত হচ্ছেন। করাচি বিমানবন্দরে নেমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবটি হয় তো তখনই তৈরি করে ফেলেছেন (আহ্ এ যাত্রা বেঁচে গেল পাকিস্তান?) আর সেই অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের সিংহাসনটি যে তারই অপেক্ষায় রয়েছে, এই সুখস্বপ্নে তিনি সেই মুহূর্তে ভুলেই গেলেন বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ন্যায্য অধিকারের দাবিকে গোলন্দাজ ট্যাংকের চাকায় গুঁড়িয়ে দিতে আর দেরি নেই। ভুলে গেলেন, পৃথিবীর ‘বেস্ট সোলজার’ আখ্যায়িত পাকিস্তান সেনাবাহিনী জঘন্যতম এক গণহত্যার অপরাধে কলঙ্কিত হতে চলেছে। যে বুটের তলায় দাবিয়ে রাখা পূর্বাঞ্চলীয় অংশটি ফিরে যাচ্ছে নিজ ঠিকানায়।

 সেই সন্ধ্যায় আমাদের বসার ঘরে, আমরা সবাই একান্ত কাম্য স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে তুমুল আবেগে ভাসছি। কোনো দুশ্চিন্তাই আমাদের স্পর্শ করেনি, বরং তখন আমরা এমন উৎফুল্ল ছিলাম, যেন স্বাধীনতা এসে গেছে আমাদের দ্বারপ্রান্তে। বিকাল থেকে মেহমানদের আসা যাওয়া চলছেই। এর মধ্যেই কয়েক দফা চা-নাশতা হয়ে গেছে। ওদিকে রান্নাঘরে কার্তিকের মা গজ গজ করে চলেছেÑ ‘রাইতে কি খাওন-দাওন নাই? রান্ধা-বাড়ি কী হইবÑ আফায় তো কয়ও না, চাইয়াও দ্যাহে না কিছু। সারাদিন ধইর‌্যা মিডিং করতাছে।’

আমি তাকে নিরস্ত করিÑ ‘রাখো তো তোমার প্যাঁচাল, দেশ স্বাধীন হতে চলেছে, তুমি আছ রাতের রান্না নিয়ে।’ হাসে কার্তিকের মাÑ ‘স্বাধীন হইলে কি ভাত খাওন লাগ্ত না?’

আমি হাসি।

অতিথিরা রাত আটটার মধ্যে বিদায় নিলেন। সাইদুজ্জামান সাহেব গাড়ির চাবি ফেলে গিয়েছিলেন, মীজানুর রহমানের মতো তিনিও অফিস থেকে ‘কার-লোন নিয়ে গাড়ি কিনেছেন। নতুন গাড়ি, কিন্তু প্রায়ই টুকটাক ঝামেলা বাধাচ্ছে। এদিকে প্রতিমাসে ধারের টাকার কিস্তি দিতে হচ্ছে। গাড়িটা নিয়ে খুবই বিরক্ত জামান সাহেব, চাবি নিতে এলে মীজানুর রহমানই জিগ্যেস করল- ‘কী ব্যাপার, গাড়ি নষ্ট হয়েছে বুঝি আবার!’

অন্য সময় হলে জামান সাহেব রোগাক্রান্ত গাড়িটির বাপান্ত করতেন, কিন্তু আজ তিনি বিন্দুমাত্র ক্ষুব্ধ হলেন না, হাসি মুখেই বললেন, “আরে সাহেব! গাড়ি নিয়ে এখন কে মাথা ঘামায়! দেশ স্বাধীন হোক, দেখে নেবেন আমরা কোথায় উঠে যাই, পাকিস্তানি বুটের লাথি খাওয়া ‘ভুখা বাঙালি’ আর থাকব না। জাপানের মতো উন্নত দেশ হবে আমাদের এই বাংলাদেশ। আমরা নিজেরাই তখন গাড়ি তৈরি করব।”

সময়টা যেমন ছিল অস্থির উত্তাল, তেমনি ছিল বোধহয় স্বপ্ন দেখারও। স্বাধীন উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নকে মনে-প্রাণে সত্য বলে ধরে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছিল না আমাদের।

রাত দশটার আগেই আমাদের ওপরতলার প্রতিবেশী- মীজানুর রহমানের সহকর্মী মেজবাহ উদ্দীন দরোজার বেল টিপলেন, বাইরে থেকেই মুখ বাড়িয়ে বলে গেলেন- ‘গলির মুখে পাড়ার ছেলেরা ইট দিয়ে আর গাছের ডাল ফেলে ব্যারিকেড দিচ্ছে, শোনা যাচ্ছে শহরে আর্মি নামানো হবে।’ মেজবাহউদ্দীন সতর্ক করে গেলেনÑ ‘বাড়ির দরোজা-জানালা বন্ধ রাখবেন, বাইরে যাবেন না কেউ।’

খবরটায় তেমন বিচলিত হই না আমরা। দশ বছর ধরেই তো শহরে আর্মি নামতে দেখে আসছি, দেখেছি বেলুচিস্তানে থাকবার সময় থেকেই। মার্শাল ল, ধরপাকড়, আর্মি জিপের টহল, গোলাগুলি এসব কি আমাদের আর দমাতে পারবে? বেলুচিস্তানকে কি পেরেছিল! আজো তো সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বার বার বিদ্রোহে মাথা তুলছে বেলুচিস্তান। চব্বিশে মার্চের সেই রাতে জানি না কেন যুদ্ধ বিধ্বস্ত পরাজিত স্বাধীনতাকামী বেলুচিস্তানের কালাত শহর পলকের জন্য ঝলক দিয়ে উঠেছিল মনে। দ্বিধান্বিত হয়েছিলাম কি নিজেদের ভাগ্য নিয়ে? সম্ভবত না।

উনিশ

কোয়েটা থেকে মাসুতংযে এসে শুরু হলো আকাশছোঁয়া পাহাড়ের ভেতর দিয়ে দুর্গম বোলান গিরিপিথের ভিন্ন বাঁক। কান্দাহার সীমান্ত অতিক্রম করে কোয়েটার উত্তরে চমন থেকেই এই বোলান গিরিপথের যাত্রা শুরু হয়েছে। কোয়েটা হয়ে অগ্রসর হয়েছে পূর্ব-দক্ষিণে। ককন বাঁক নিয়েছে উত্তরে। একদিকে বোলান গিরিপথকে ঢেকে রাখা পর্বত-শ্রেণি, আর একদিকে মরুময় সমতল ভূমি। অসরল আঁকাবাঁকা চিলতান রেঞ্জকে সঙ্গে নিয়ে অমসৃণ পথে দাদার অফিসের উইলি জিপ লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে। এই জিপেই দাদার সঙ্গে চলেছি কালাতে, সঙ্গে মীজানুর রহমানও আছে। অফিস থেকে সাত দিনের ছুটি নিতে হয়েছে তাকে। আমাকে কালাতে দাদার বাসায় রেখেই সে ফিরে যাবে তার কর্মস্থল মারিগে। দাদা আর মীজানুর রহমান সদ্য শেষ হওয়া কালাতের যুদ্ধ নিয়েই গল্প করছে। দাদা মনে করে যুদ্ধটা মোটেই পাঠানদের পাখতুনিস্তানের জন্য যুদ্ধ নয়। লাহোর প্রস্তাবের পর থেকেই পাঠানরা মনে করেছে তাদের আফগানিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ব্রিটিশ চক্রান্তই পাকিস্তান অনুসরণ করেছে। পাঞ্জাব ভাগ করেছ, বঙ্গদেশ ভাগ চলবে না, তারা চায় অখণ্ড পাখতুনিস্তান।

কালাতের যুদ্ধের পইে সেখানে পাকিস্তান মেডিকেল সার্ভিসের ডাক্তার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে দাদা অর্থাৎ আমার বড় ভাই এবং বড় ভাবিও। বড় ভাবি তো আসবার আগে আর্মি মেডিকেল কোরের ডাক্তার হিসেবে কুমিল্লার ময়নামতী ক্যান্টনমেন্টের হাসপাতালে কাজ করছিলেন কালাতে এসে কাজ করতে তার তেমন অসুবিধা হচ্ছে না। দাদা কিছুটা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ (এক সময় ভালো ছবি আঁকতেন, ছোটগল্পও লিখেছেন), ছোটকাল থেকেই ভুগোল তার প্রিয় বিষয়। বিশ্ব মানচিত্র থেকে পৃথিবীর যত নগর-বন্দর, নদ-নদী, সাগর-মহাসাগর, পর্বতমালা খুঁজে বের করা ছিল তার প্রিয় একটি খেলা। এ খেলায় তার হুকুমে বাধ্যতামূলকভাবে আমাকেও অংশ নিতে হতো। কিন্তু ইচ্ছার বিরুদ্ধের খেলায় অংশ নেওয়াটা আমার জন্য নির্যাতনমূলকই হয়ে উঠত। ফলে দশ মিনিট বরাদ্দ সময়ে মানচিত্র দেখে বৈকাল হ্রদ, কিংবা ব্লু নাইল, হোয়াইট নাইলের উৎপত্তিস্থল খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হতাম। দাদা আমার স্কোরের খাতায় বড় একটা আকারের গোল্লা দিয়ে তার প্রিয় শব্দে বকুনি দিয়ে বলত- তুই একটা অপদার্থ। ব্লাডিভস্টক, হোক্কাইডো কোথাকার।

ব্লাডিভক্টক বা হোক্কাইডো বকুনি খুবই অপমানজনক মনে হতো আমার। ক্ষেপে যেতাম, বলতামÑ ওসব কাজে খেলা আমি খেলি না।

যদিও দাদা বলতÑ এটা ভূগোলের জ্ঞান বাড়ানোর খেলা, কিন্তু ভূগোল নিয়ে মাথা ঘামাতে আমি একেবারে রাজি ছিলাম না। ভূগোলে গোল্লা পেতে আমার কোনো আপত্তিও ছিল না। দাদা কিন্তু তার প্রিয় বিষয় ভূগোলের জ্ঞান বাড়াতেই থাকে। ডাক্তারি পাস করবার পরও ভূ-মানচিত্রের প্রতি আকর্ষণ তার বিন্দুমাত্র কমেনি। কালাতে কিছুদিন কাজ করবার পরে চলে গেলেন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (বর্তমানের খাইবার পাখতুনখোয়া) রাজধানী পেশাওয়ারে, ছিলেন আফগানিস্তান অভিমুখি খাইবার গিরিপথে পশ্চিম পাঞ্জাবের ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত ওয়াগার কাছে বাটাপুরে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কাজ করেছেন, (ছোটকাল থেকেই আফ্রিকা ছিল তার প্রিয় মহাদেশ।) ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রায় সবগুলো মহাদেশেই। পাপুয়া নিউ গিনি ছিল তার পর্যটন তালিকার শীর্ষে। (ছোটকালে আমাদের প্রতি ‘পাপুয়া নিউগিনি’র নামটি প্রয়োগ ছিল দাদার প্রশংসাসূচক)। দাদার অভ্যাস ছিল, কোনো দেশে যাওয়ার আগে সে দেশের ভৌগোলিক বিবরণ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস প্রকৃতি মানুষজন ইত্যাদি বিষয়ে যথেষ্ট পড়াশোনা করে নেওয়া। (পড়ার অভ্যাসটি তার এখনো রয়েছে।)

কালাতের যুদ্ধের সময় এ দেশে না থাকলেও যুদ্ধটি সম্পর্কে তিনি যে আমার চেয়েও বেশি জ্ঞান অর্জন করে ফেলেছেন, যুদ্ধ নিয়ে মীজানুর রহমানের সঙ্গে তার আলোচনায় বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না আমার। এই যুদ্ধ সম্পর্কে দাদার ধারণা বেলুচিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষি নানা গোত্রের মানুষের বৈপরীত্যের কারণেই যুদ্ধে সাফল্য আসেনি।

সমতল ছাড়িয়ে জিপ বাঁক নিল পর্বতশ্রেণির দিকে। তারপর ক্রমাগতই দুর্গম পাহাড়ের আঁকাবাঁকা অসরল বিপজ্জনক পথ অতিক্রম করে ওপরে উঠতে থাকা। এক সময় গৈরিক পাহাড়ের দৃশ্য শেষ হয়। জিপ আরো ওপরে উঠে এলে, শুরু হয় দু’পাশে ঘন পাইন বনে ঢাকা সবুজ পাহাড়ের সারি। পাহাড়ের শরীর কেটেই তৈরি হয়েছে গাড়ি চলাচলের রাস্তা। রাস্তাটা এমনই ভয়াবহ যে অসাবধানে গাড়ির চাকা একটু পিছলে গেলেই পড়তে হবে অনেক নিচে গভীর খাদে। পাহাড়ি পথে চলায় অভিজ্ঞ জিপের ড্রাইভার। তাই খুব একটা ভয় আমাদের ছিল না। বরং বোলান গিরিপথের শাখাপথটি বেশ উপভোগ করছিলাম। পাহাড়ের শরীরে পেঁচিয়ে ওঠা পথ বেয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মডেলের উইলি জিপ গোঁ গোঁ শব্দে উঠতে থাকে ওপরে। বাতাস ক্রমে শীতল হয়ে আসে, বাইরের দৃশ্যাবলীও চমৎকার। একদিকে আকাশ রুদ্ধ করা পাহাড়ের দেয়াল। আর একদিকে গভীর খাদ। অনেক নিচে বয়ে চলেছে স্বচ্ছ তোয়া পাহাড়ি নদী। পিছে পড়ে যায় মাইলের পর মাইলব্যাপী আপেল বাগান, কিছু গ্রাম, যাযাবরদের তাঁবু। মনেই হয় না, এই নিস্তব্ধ শান্ত ভুবনে কিছুদিন আগেই ট্যাংক মেশিনগান নিয়ে স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে পাকিস্তানি সেনারা।

স্নিগ্ধ প্রকৃতি এখন তার নিজস্ব রূপটি নিয়ে নির্বিঘ্ন শান্তঘুমে নিমগ্ন। অপ্রশস্ত পথ ধরে পিঠে কাঠের বোঝা নিয়ে খুট খুট করে নির্বিঘ্নে হেঁটে চলেছে গাধার সারি। উটের কাফেলাও চোখে পড়ে। মাঝে মাঝে জিপের পাশ কাটিয়ে সমতলের দিকে নেমে যাচ্ছে ফলের ট্রাক, কখনো চড়া হর্ন বাজায়ে আর্মির জিপ। সংকীর্ণ গিরিপথ ছাড়িয়ে আমাদের জিপের পেরিয়ে যায় ছোট ছোট মালভূমি, ঝাউয়ের বনের আড়ালে কিছু গ্রাম- মাটির দুর্গের মতো দেয়ালঘেরা ঘর-বাড়ি। ঝলমলে কাচ বসান টুপি আর কোটি পরা বেলুচ শিশুরা সবুজ ঘাসের গালিচার উপর ছুটোছুটি খেলছে বাগিচার সামনে। ভাবাই যায় না, এই শান্ত সবুজ ভুবনটিতে মৃত্যুর বিভীষিকা হয়ে উড়ে এসেছিল পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বোমারু বিমান, নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করে গেছে।

কালাতের শ্যামল প্রকৃতির স্নিগ্ধতা মুছে যুদ্ধের কদর্য ক্ষত সামনে এসে গেল আরো কিছুটা পথ অতিক্রমের পরই। বিধ্বস্ত গ্রাম, ঘর-বাড়ি, পোড়া বৃক্ষ ভেঙে পড়া ব্রিজ, ভারি ট্যাংকের চাকার নিষ্ঠুর পদচিহ্ন মনে পড়িয়ে দেয় কিছুদিন আগে এখানে সত্যিই একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে। বুঝে নিতে হলো- যুদ্ধ শেষ হলেও যুদ্ধের চিহ্নটি প্রকৃতি আর মানুষের জীবন থেকে সহজে মুছে যায় না। একাত্তরের যুদ্ধের পরে বিজয়ী বাংলাদেশের বুকের ক্ষতটি মুছে ফেলতে সময় লেগেছিল। বিধ্বস্ত পোড়া দেশটির আংশিক দৃশ্য আজো রয়ে গেছে সম্ভবত ’৭৪ সালে মীজানুর রহমানকে লাইমস্টোন সংক্রান্ত মিটিংয়ে অংশ নেওয়ার জন্য যেতে হয়েছিল মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে। সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম। বাংলাদেশ থেকে খুব কাছের ভারতীয় রাজ্যটিতে যাওয়া তখন কঠিন ব্যাপার। অভ্যন্তরীণ ও বাইরের জগতের সঙ্গে জলপথ, স্থলপথ প্রায় বিচ্ছিন্ন। মুক্তিযুদ্ধ সবে শেষ হয়ে দেশজুড়ে তখনও রয়ে গেছে যুদ্ধের দগদগে ক্ষত। তার ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরাজয়ের শেষ মুহূর্তে প্রতিহিংসা বশতই ধ্বংস করে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বোমা দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে গেছে দেশের ছোট-বড় অনেক ব্রিজ। তামাবিল-ডাহুকি হয়ে শিলংয়ের দূরত্ব বাংলাদেশ থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটারের মতো।

শিলং থেকে ফেরার সময় মীজানুর রহমানের আপিসের ড্রাইভার টয়োটা ফোর হুইলার জিপ নিয়ে খুব অল্প সময়েই সুনামগঞ্জের টেকেরহাটে ‘লাইমস্টোন কোয়ারীর’ বাংলোতে পৌঁছে দিয়েছিল। সন্ধ্যায় শিলং থেকে রওনা হয়ে দুর্ভেদ্য জঙ্গলঘেরা বিপজ্জনক পাহাড়ি পথ আর দুরন্ত গতির পাহাড়ি নদীর নড়বড়ে ফেরিতে পার হয়েছিলাম গুমাঘাট। তবুও শিলং থেকে বাংলাদেশ-সীমান্তবর্তী ‘বাংলাদেশ’ মিনারালস এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের প্রজেক্টটিতে পৌঁছে রাত পৌনে দশটার মধ্যে আমরা রাতের খাবার খেতে পেরেছিলাম।

ঢাকা থেকে সিলেটের তামাবিল হয়ে, শিলংয়ে যাওয়ার পথে ছোট ব্রিজগুলো বিকল্প কাঁচা পথ তৈরি হলেও, বড় বড় বিজ্রগুলো তখনো ভাঙাই ছিল। ঢাকা থেকে করিমগঞ্জ, শিলচর, কাছাড় ঘুরে বরাক নদী পেরিয়ে মেঘালয় অতিক্রম করে শিলংয়ে পৌঁছতে আমাদের প্রায় বারশ’ মাইল পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল। বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর ইয়োরোপ কেমন ছিল জানি না, তবে এলিয়টের ‘পোড়ামাটি’র সত্যতা উপলব্ধি করেছিলাম যুদ্ধে পোড়া সেই বাংলাদেশটিকে মিলিয়ে নিতে, গৃহীত, স্বজনহীন, অন্নহীন নির্যাতিত মানুষের জন্য তখন ‘পোড়া মাটি’ বা ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কতখানি বাস্তব ছিল, আজ যারা রাজনীতির ময়দানে বাতিল আদর্শ ফিরিয়ে আনতে উদগ্রীব, তারা নিশ্চয়ই সেই ‘পোড়ামাটি’ বাংলাদেশের চিত্রটি ভুলে যাননি। আজকের প্রজন্ম যারা এখন দ্রুত উন্নয়নশীল বাংলাদেশের (ফার্স্ট গ্রোয়িং কান্ট্রি) গর্বিত নাগরিক, তাদের জানা উচিত, যে উন্নত আয়ের দেশের প্রত্যাশায় আমরা রয়েছি, সেই দেশ সত্তরের দশকের পোড়ামাটি থেকে আজ উঠে দাঁড়িয়েছে। আর এই উঠে দাঁড়ানোর জন্য প্রথম পরিকল্পনার উদ্বোধনটি করেছিলেন আমাদের প্রিয় নেতা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। যুদ্ধে প্রায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া পোড়া দেশটির বেদনা সেদিন মুছে দিয়েছিল সবুজ মেঘালয়ের ঢেউ, ঝুলন্ত ব্রিজ, অনেক ওপর থেকে গভীর খাদে ঝরে পড়া অসংখ্য জলপ্রপাত আর উপলে-পাথরে শব্দ-তরঙ্গ তুলে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি নদী আশ্চর্য এক ভাষা সৃষ্টি করেছিল। সে ভাষাই স্নিগ্ধ স্নেহের পরশে মুছে দিয়েছিল বিধ্বস্ত মনের শূন্যতা। মন ভরে উঠেছিল অনাবিল আনন্দে। কালাতের পথে দৃশ্যমান প্রকৃতির ছিল সেই একই ভাষা।

অবশেষে যুদ্ধের ক্ষত চিহ্ন পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম সমুদ্র সমতল থেকে আট হাজার ফিট উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা যুদ্ধাহত কালাত শহরের দ্বারপ্রান্তে। সুরক্ষা-প্রাচীরে ঘেরা কালাত শহরকে বেষ্টন করে আছে গভীর পরিখা। সুরক্ষা দেয়ালে কিছুটা ব্যবধানেই রয়েছে ছোট ঘুলঘুলি দেয়া প্রহরা কক্ষ বা ‘ওয়াচ টাওয়ার’। দাদা বললেন, ওই সব ঘর অর্থাৎ ওয়াচ টাওয়ারের ঘুলঘুলি থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর গোলা বর্ষণ চলেছিল যুদ্ধের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত। খান-ই-আজম ইয়ার মহম্মদ খানের ছোটভাই প্রিন্স করিম খান নাকি কালাত শহরের যুদ্ধের কমান্ডে ছিলেন। কালাতের পতনের পর দুর্গম পাহাড়ে আত্মগোপন করেন, সেখান থেকে চলে যান আফগানিস্তানে। প্রিন্স করিম ছিলেন লাসবেলার নবাব পবিরারের মেজ মেয়ের স্বামী। কোয়েটায় জাম সাহেবের পরিবারেই আমি প্রিন্স করিমের যুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং কান্দাহার চলে যাওয়ার গল্প শুনেছি। কালাতের যুদ্ধ নিয়ে অনেক গল্প শুনেছিলাম আমার বেলুচ পড়শিদের কাছে। কালাতের যুদ্ধ নিয়ে বেলুচিন্তানের মানুষ বিশেষ করে বেলুচরা ছিল যেমন দুঃখিত তেমনি গর্বিত। যুদ্ধের অনেক গল্প করত। আমাদের বাড়ির হাম্মাম ভরত যে লালু নামের ভিশতী ছেলেটি, যুদ্ধের গল্প সে করত রোজ আমার কাছে। খানের পরাজয়ের পর কিছুটা বোকাটে ধরনের গরিব এই লালু আগুনের মতো জ্বলে উঠে বলেছিল হাম খোদ আভি লড়েঙ্গে, হামলোগোকো লিয়ে হামারি ওয়াতানকো লিয়ে। বাদশা-হামারি খানকো কয়েদখানা সে জরুর আজাদ করেঙ্গে। আয়ি তুম দেখ্ না।

কালাত শহরটির প্রবেশ মুখে তখন রয়েছে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর কড়া পাহারা। দাদার পরিচয়পত্রটিই আমাদের প্রবেশ সহজ করে দিল। শহরের সিংহদুয়ার খুলে দেওয়া হল। প্রবেশ করলাম কালাত শহরে। পরিখাবেষ্টিত শহরটিকে বাইরে থেকে দেখে আমার মনে হয়েছিল মধ্যযুগীয় কোনো ক্ষমতাশালী নৃ-পতির রাজধানীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। সেই ষাটের দশকে আধুনিক নগরী, কলকাতা, ঢাকা, করাচি, কোয়েটার মতো শহরে বাস করবার অভিজ্ঞতার কাছে কালাত যেন ছিল ইতিহাসের পুরোনো পৃষ্ঠা থেকে উঠে আসা কোনো প্রাচীন শহর। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম কালাত একটি পরিকল্পিত, আধুনিক পরিচ্ছন্ন শহর। প্রথমেই চোখে পড়ল শাহী প্রাসাদের মসজিদের মিনারটি, তার ভেঙে পড়া গম্বুজের অবশিষ্টাংশে দখলদারিত্বের প্রতীক হয়ে সগর্বে উড়ছে পাকিস্তানি পতাকা। দাদা বললেন, ওখানে ছিল ‘খানের গ্রেটার বেলুচিস্তানের’ স্বাধীন পতাকা। ট্যাংকের শেলিংয়ে সেটা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মসজিদের মিনারে গোলা বর্ষণের দাম্ভিক চিহ্নটি সেই মুহূর্তে জানি না কেন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ওপর ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল আমাকে। বলে ফেলেছিলাম- ফ্ল্যাগ নামানোর জন্য কামানের গোলা ছুড়বার কী দরকার ছিল, ওটা কি অন্যভাবে নামিয়ে ফেলা যেত না। দাদা গম্ভীর জবাব দিলেন- পাকিস্তান আর্মির হাই কমান্ডের অর্ডার ছিল মসজিদে কামার দাগার। এটা যে ইসলামিক স্টেট।’ দাদার কথার ভঙ্গিতে হেসে ফেললাম আমরা। কালাতকে দমাবার জন্য যদি নিরীহ গ্রামবাসী- নারী-শিশুদের ওপর পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বীর যোদ্ধারা নির্বিচারে বোমা বর্ষণের বীরত্ব দেখাতে পারে, তাহলে কামানের গোলায় মসজিদ ভাঙবার দম্ভ তারা দেখাবেই।

(তখন জানতাম না, এক সময় বাংলাদেশেও পাকিস্তানি সৈন্যরা ইসলামের নামে বাংলাদেশে পতাকায় গোলা বর্ষণ করবে, মসজিদে ঢুকে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করবে, আগুন দেবে।)

পরে শুনেছিলাম খানের শাহী প্রাসাদেও কামানের গোলা বর্ষণ করা হয়েছিল। সিংহদ্বার ভেঙ্গে শহরে ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তান আর্টিলারি বাহিনী শহরে প্রবেশ করবার পরও মহামান্য খান তার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাননি। শেলিং করতে করতে ট্যাংকের বহর যখন এগিয়ে আসছে, তিনি তখন নামাজে দাঁড়িয়ে ছিলেন শীশ মহলের কাচের দেয়ালের পাশে। তিনি না কি নামাজ শেষ করে সেখান থেকে ডেকে বলেছিলেনÑ তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলতে চাও, এস। যদি বন্দি করতে চাও কর। কিন্তু কসম-খোদা-ই, অস্ত্র নামাও, তোমরা যদি মুসলমান হও, অনুগ্রহ করে আল্লাহর ঘরে গোলা ছুড়ে ইসলামকে অপবিত্র করো না।’

পাকিস্তানি ট্যাংকের গোলায় শীশ মহলের কাচ ভেঙে পড়ছিল, গোলার আঘাতে আহত হয়েছিলেন খান। রক্ত পড়ছিল তার বাহু থেকে। রক্তে ভিজে উঠেছিল জায়নামাজ। এসব কাহিনি আমার সে দেশের বেলুচদের কাছেই শোনা। খানকে বন্দি করবার পরে বেলুচ ব্রোহীরা অনেকে তাদের প্রিয় খান-ই-খানানের জন্য অঝোরে কেঁদেছিল। তরুণ, যুবকেরা অস্ত্র ছুয়ে কসম খেয়েছিল এর বদলা তারা নেবেই। নিরক্ষর পাগলাটে ভিশতী লালু হাতের পানির মশক আমার উঠোনে ছুড়ে ফেলে চিৎকার করে বলে উঠেছিলÑ ‘থুক্ দেই পাকিস্তানি হুকুমাতে। লাথ্ মারি পাঞ্জাবিদের মুখে, তুমি দেখে নিও আয়ি, এর বদলা আমরা নেবই।’

পরে তাদেরই দমন করতে এসেছিল কুখ্যাত পাকিস্তানি জেনারেল টিক্কা খান। সেদিন থেকে হয় তো আজো বন্ধ হয়নি, বেলুচদের বদলা নেওয়ার যুদ্ধ বন্ধ হয়নি বেলুচিস্তানের রক্তক্ষরণ।

আমাদের জিপ এসে থামল পাকিস্তান সেনাবাহিনী অধিকৃত কালাত শহরে। চারদিকে সেনাবাহিনীর লোকদের আনাগোনা। স্বাধীন খানের শহর নয়, যেন এসে পড়েছি যুদ্ধের ফ্রন্টের কোনো আর্মি ক্যাম্পে। সেখানেই দেখা হলো বাঙালি সেনা কর্মকর্তা আর্টিলারি বাহিনীর ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে (পরে কর্নেল মুস্তাফিজুর রহমান অব. এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বিএনপি-র মন্ত্রী) মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে দাদার বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। প্রায়ই আসেন তিনি দাদার কোয়ার্টারে। তার কাছেই শুনি যুদ্ধের গল্প। তিনিই হাই কমান্ডের আদেশে মসজিদে কামান দেগেছিলেন।

শান্ত শহর কালাতে বসে সেদিন কিন্তু ভাবতেও পারিনি, পাকিস্তান আর্টিলারি বাহিনীর তুমুল গোলা বর্ষণে উনিশ শ একাত্তরের পঁচিশে মার্চের মধ্যরাতে আচমকা ঘুম ভেঙে উঠে বসব। উ™£ান্তের মতো বলে উঠবÑ এসব কী হচ্ছে! (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares