ধা রা বা হি ক  : সপ্তম  প র্ব

আত্মজীবনী

দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়ি

রিজিয়া রহমান

চৌদ্দ

এবারে আমার কৈশোরের ঘটনার কিছু উদ্ধৃতি আনতে হচ্ছে সঙ্গত কারণেই। ইসকুলে পড়বার সময় থেকেই (ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়ি তখন সম্ভবত) তৈরি হয়েছিল আমার ডায়েরি লেখার অভ্যাসটি। সে সময়ের লেখা ডায়েরির বিবর্ণ কিছু পৃষ্ঠা এখনো রয়ে গেছে আমার সঞ্চয়ে, মাঝে মাঝে উল্টে-পাল্টে দেখি, অপোক্ত হাতের লেখায়, পঞ্চাশ দশকের এক কিশোরীকেই খুঁজে পাই। তার জগৎটিকে আবিষ্কার করি, যে জগতটিতে প্রাধান্য ছিল, তার ইসকুল আর ইসকুলের বন্ধুদেরই বেশি।

এমনি এক পৃষ্ঠায় আছে সন, তারিখ ছিঁড়ে যাওয়া কিছুটা বিবরণ- ‘আজ আমাদের গ্রীষ্মের ছুটি হয়ে গেল। আজ ইস্কুলে খুব আনন্দে সময় কাটল। আজ কোনো পড়ালেখা ছিল না। কোনো ক্লাসই হয়নি। আমরাÑ ক্লাসের মেয়েরা বাগানের ফুল তুলে মালা গেঁথেছি। ক্লাসরুম সাজিয়েছি। টিচারদের ফুল আর ফুলের মালা দিয়েছি। বাগানের ফুল ছেঁড়ার জন্য আজ বড় আপার বকুনি খেতে হয়নি।’

এরপর লেখা অস্পষ্ট। পরের পৃষ্ঠার শেষের দিকে আছেÑ ‘আজ ছিল মর্নিং স্কুল। দশটায় ছুটি। ছুটির আগে আমরা ক্লাসের সবাই কোরাস গেয়েছি

আজ আমাদের ছুটি

ও ভাই আজ আমাদের ছুটি।

তারপর বেঞ্চে উঠে লাফালাফি, নাচানাচি, গলা ছেড়ে চেঁচামেচি। মুঠো মুঠো ফুল নিয়ে এ ওর গায়ে ছুড়ে মারা, হাসাহাসির হুল্লোড়। রওশনটা বেঞ্চে উঠে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ে পায়ে ব্যথা পেল। সবাই ওকে নিয়ে খুব হাসাহাসি করল। রওশন রাগ করে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল, বলল- ‘তোদের সবার সঙ্গে আমার আড়ি। সবাই গিয়ে রওশনকে সাধাসাধি করে আবার ক্লাসে নিয়ে এল, তারপর…।’

তারপর আর নেই, পরের কয়েকটি পৃষ্ঠা, হারিয়ে গেছে? আরেক পৃষ্ঠায় আছে ইস্কুলে রবীন্দ্র জয়ন্তী উদ্যাপনের বিবরণÑ ‘আজ ইস্কুলে রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠান হলো। আমাদের ক্লাসের সবাই ঠিক করেছিল, আজ সবাই শাড়ি পরবো, লালপাড় সাদা শাড়ি পরতে হবে সবাইকে। আমি লালপাড় সাদা শাড়ি পরতে পারি নি, আমার মুর্শিদাবাদী সিলকের ছাপা শাড়িটা পরেছিলাম। সবাই রাগ করল আমার সঙ্গে। খুব মন খারাপ হলো আমার। মাহবুবা বলল- তোর শাড়িটাই সবচেয়ে সুন্দর। হলরুমে স্টেজ তৈরি করা হয়েছে। লায়লা আপা হারমোনিয়াম বাজালেন স্টেজে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গানের মেয়েরা গাইলÑ

হে নতুন

দেখা দিক আর বার

জন্মেরও প্রথম শুভক্ষণ…

আমাদের ক্লাসের খালেদা খুব ভালো রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে পারে। ও ছিল গানের দলে। ফাংশন শেষ হলে আমরা ক্লাসের বন্ধুরা মাঠে গোল হয়ে বসে গল্প করলাম। শুক্লা বলল, ‘চল এবার আমরাই গান গাই।’ মর্জিনা বললÑ ধর না, গান একবার! দেখিস বড় আপা এসে কেমন বকা দেয়।

আমরা হৈ চৈ করে মর্জিনাকে থামিয়ে দিই। কেন বকবেন বড় আপা! আজ তো রবীন্দ্র জয়ন্তী। আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইব। শুনে খুশি হবেন বড় আপা। শুক্লা গান ধরলÑ ‘এসো হে বৈশাখ … তাপস নিঃশ্বাস বায়ে…’

সবাই হো হো করে হেসে ওঠে, মাহবুবা বলে-

এই! এই শুক্লা তুই তো পয়লা বৈশাখের গান ধরেছিস! আজ তো পঁচিশে বৈশাখ। আবার হৈ চৈ হাসাহাসির ধুম। টিচারদের বাংলো থেকে সুফিয়া আপা বেরিয়ে এলেন। আমাদের বললেনÑ এই মেয়েরা! তোমরা কী করছ? দেখছ না ঝড় আসছে- যাও, তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাও।’ আমরা উঠে সবাই দৌড় লাগাই। ঝড়ের আগেই আমি বাড়ি ফিরেছি। আকাশ ভীষণ কালো হয়েছিল। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল খুব। তারপর শুরু হলো ঝড়। সে কী ঝড়! তারপর শিল, আর তুমুল বৃষ্টি। বৈশাখী ঝড় আমার কী যে ভালো লাগে। …

আমার কৈশোরের সেই ইসকুলের দুষ্টুমির একটা দিনকেই খুঁজে পাই ডায়েরির পৃষ্ঠায়…

‘… আজ স্কুলে ‘রেইনি ডে’র ছুটি হয়ে গেল। আজ যে কী মজা হল। ভোর থেকেই আজ বৃষ্টি। ছাতা মাথায় ইস্কুলে গিয়েছি। তবুও ভিজে গেছি। আজ সূর্যের দেখাই নেই। আকাশ মেঘে ঢাকা। ফার্স্ট পিরিয়ডে আমরা যখন অংক করছি, চারদিক আঁধার হয়ে এলো। গুম গুম মেঘের ডাক, বিদ্যুৎও চমকাচ্ছিল খুব। ভীষণ ভাল লাগছিল আমার। অংক ফেলে আমার ডেস্কের পাশের জানালা দিয়ে দেখছিলাম। বেল গাছের ডালে বসে ভিজছে দু’টি কাক। বৃষ্টি আরো জোরে নামল। পানি জমে গেছে ইসকুলের মাঠে। আজ আমাদের ক্লাসের অনেক ছাত্রী আসতে পারেনি। এসেছি মাত্র আমরা চারজন। আমাদের অংকের শিক্ষক গিয়াসউদ্দীন স্যারও আসতে পারেননি। অংকের ক্লাস নিতে এসেছেন কল্পনাদি। অংকের ক্লাসের পরে বাংলা ক্লাস হলো না, সুনীলাদি আসেননি। মহা আনন্দ তাই আমাদের। শুক্লা আর মৈত্রী খাতার পৃষ্ঠা ছিঁড়ে কাগজের নৌকা বানাল। আমরা ক্লাস থেকে বেরিয়ে এলাম। বারান্দা থেকে থেকে মাঠে নেমে পানির স্রোতে নৌকা ভাসাতে গিয়ে ভেজা কাক হলাম। পাশের ক্লাস থেকে বেরিয়ে এলেন রাজিয়া আপা। বকা দিয়ে ক্লাসে ঢুকিয়ে দিলেন সবাইকে আবাবার।

চারদিক অন্ধকার করে আরো জোরে বৃষ্টি নামল। আমরা সবাই কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছি। এ নিয়ে খুব হাসাহাসি হলো। ছুটির ঘণ্টা বেজে গেল সেকেন্ড পিরিয়ডেই। রাজিয়া আপা আমাদের ক্লাসরুমের সামনে এসে বললেন- বৃষ্টি একটু কমলেই তোমরা বাড়ি চলে যেও। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, ‘রেইনি-ডে-র ছুটি’। আবার খুশির হুল্লোড়। বৃষ্টি একটু ধরে এলেই আমরা ‘রেইনি- ডে’ রেইনি ডে’ বলতে বলতে গেটের দিকে ছুটতে লাগলাম। মজা হলো রাস্তায় এসে। আমাদের ক্লাসের আছিয়া বললÑ চল, ছাতা ওড়ানোর খেলা খেলি। খুব জোরে বাতাস ঝাপটা দিচ্ছে, ছাতাগুলো উড়িয়ে নিতে পারবে। আমরা তিনজন হাতের ছাতা বাতাসে ছেড়ে দিই, বাতাস ছাতা উড়িয়ে নেয়। আমরা যার যার ছাতার পেছনে ছুটি। লাফিয়ে লাফিয়ে ধরে ফেলি ছাতা। আবার ছাতা ওড়াই। আবার ছুটি ছাতার পেছনে। ছাতা ধরে ফেলবার জন্য লাফালাফি করতে করতে রাস্তা পার হই। আছিয়ার ছাতা দমকা হাওয়া হঠাৎ এক ঝাপটায় উড়িয়ে নিয়ে ফেলল রাস্তার ধারে পানি জমে যাওয়া গর্তে। বৃষ্টির পানি জমে গর্তটা ছোট ডোবার মতো হয়ে গেছে। আছিয়া কান্না শুরু করল। ছাতা হারালে ওর আম্মা ওকে বকাবকি করবেন। রাস্তার একজন লোক আছিয়ার ছাতাটা তুলে দিল। তারপর আমাদের বলল এমন ছাতা নিয়ে দুষ্টুমি করবে না, যাও, বাড়ি চলে যাও। বৃষ্টিতে জামা কাপড় ভিজিয়ে ভেজা ছাতা মুড়ি দিয়ে বাসায় এসেছি। আমার ইস্কুল ব্যাগটা ভিজে একাকার। সেগুলো চুলোর পাশে ধরে শুকিয়ে দিয়েছে নান্নুভাই। আম্মা জিজ্ঞেস করলেন- এমন বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে স্কুল থেকে চলে এলে কেন? আম্মাকে বলি- আজ তো ‘রেইনি ডে’। সেকেন্ড পিরিয়ডেই ছুটি হয়ে গেল। ‘রেইনি-ডে’ খুব মজার …’

আমার কৈশোরের এমন অনেক টুকরো ছবি রয়ে গেছে হারিয়ে ফেলা আর খুঁজে পাওয়া ডায়েরির পৃষ্ঠাগুলোতে।

 সেই কিশোরকাল থেকেই নিয়মিত ও অনিয়মিত ডায়েরি লেখার অভ্যাসটি আমার থেকেই গিয়েছিল। বছর বছর নানা জনের কাছ থেকে উপহার পাওয়া বাঁধানো ডায়েরির বইগুলো হাতে পেলেই লিখতে বসতাম। কখনো কখনো আঁকতাম ছবি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে লিখে রাখতাম কিছু কবিতা অথবা কোনো বিজ্ঞবাণীর উদ্ধৃতি। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার প্রিয় কয়েক পঙ্ক্তিও খুঁজে পাওয়া যায় আমার শেষ কৈশোর ও সদ্য যৌবনের দিনলিপির পৃষ্ঠাগুলোতে।

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই হারায়। হারিয়েছি আমার দিনলিপির অনেকটাই। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত আর বিচ্ছিন্নভাবে রয়ে গেছে কিছু খণ্ডিত অংশমাত্র। আশ্চর্যভাবে রয়ে গেছে একাত্তরের দিনলিপির দু’চারটি পুরোন পৃষ্ঠাও। সেগুলোর উদ্ধৃতি আমার এই আত্মকথায় সম্ভবত প্রাসঙ্গিকই হবে।

‘…৩০ শে জানুয়ারি ১৯৭১-ঢাকা

ক’দিন থেকেই মনটা ভালো নেই। শুধু আমার একার নয়, সম্ভবত সবারই। কেমন অস্থির উ™£ান্তিতে ভুগছি সবাই। কী যে হতে যাচ্ছে দেশে বুঝে উঠছি না। শেখ মুজিবর রহমান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে বলেছেন, আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লির ঘোষণা দিতে। প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে কিছুই জানানো হচ্ছে না। এদিকে ইয়াহিয়া আর ভুট্টো শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক করে গেছে। আওয়ামী লীগের ছয় দফা নিয়েই এখন চলছে তাদের নিত্য নতুন তাল-বাহানা।

 সেদিন মীজানুর রহমান বলছিল, মনে হয় এরা কোনো ষড়যন্ত্র করছে বাঙালিদের বিরুদ্ধে। শেখ মুজিবও সম্ভবত সেটা বুঝতে পারছেন।

উদ্বিগ্ন হয়ে বলি- তাহলে কী হবে? শেখ মুজিবর রহমান কী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না? মীজানুর রহমান চিন্তিতভাবে বলে- দেখা যাক।

‘…আজ বিকেলে জামান সাহেব আর সফিনা ভাবি এসেছিলেন। জামান সাহেব অর্থনীতিতে লেখাপড়া করেছেন, ‘ছয় দফার’ দাবিগুলো ভালো বোঝেন বলেই তার কড়া সমর্থক। রাজনৈতিক অঙ্গনের হালচালে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে আছেন, যতক্ষণ ছিলেন, কেবল ইয়াহিয়া আর ভুট্টোকে গালাগালি করেছেন। যাবার সময় বলে গেছেনÑ এবার আর ছয় দফা নয়, এখন এক দফাÑ স্বাধীনতা। ওই বেইমানদের সঙ্গে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। ওদের আমরা ছুঁড়ে ফেলে দেব।

মীজানুর রহমান হাসেÑ দেখা যাক না ১৫ ফেব্রুয়ারিতে কী হয়!

রাতে খেতে বসে মীজানুর রহমান বলল, পাকিস্তান হওয়ার পর থেকে এই পর্যন্ত কি কোনো নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকতে পেরেছে! পাকিস্তানে সব ক্ষমতা তো আর্মিরই হাতে। ইয়াহিয়া তো তাদেরই লোক অবাক হই আমি- জনসাধারণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দিতে আর্মির কী করবার আছে। অ্যাসেমব্লী ডাকবে প্রেসিডেন্ট, আর্মি কী করবে এখানে? মীজানুর রহমান বেশ চিন্তিতই, বলেÑ পশ্চিম পাকিস্তানি আর্মির শাসন তো দশ বছর ধরে দেখেছ! বেলুচিস্তানে ওরা কী করেছে দেখো নি? সেখানেই তো ছিলে।

রাতে আমার ভালো ঘুম হয় না। বার বার ঘুম ভেঙে যায়। অজানা কোনো আশঙ্কা কেবল ভয় দেখায়। মনে মনে বলিÑ আল্লাহ শেখ মুজিব যেন দেশের প্রধানমন্ত্রী হন।

‘পিটিভি-র খবরে শুনেছিলাম দু’জন কাশ্মিরি গেরিলা ভারতের একটা প্লেন হাইজ্যাক করে লাহোর এয়ারপোর্টে নামিয়েছে। কাল হাইজ্যাকাররা ইন্ডিয়ান প্লেনটাকে গ্রেনেড ছুড়ে ধ্বংস করে দিল। আজকের খবরের কাগজে পড়লাম হাইজ্যাকার দু’জনকে ফুলের মালা দিয়ে সম্মান জানান হয়েছে, লাহোরের রাস্তায় আনন্দে মিছিল হয়েছে। কী বর্বর ঘটনা!

‘… শেখ মুজিবর রহমান হাইজ্যাক করা ভারতীয় প্লেনটিকে এভাবে গ্রেনেড ছুড়ে ধ্বংস করা সমর্থন করেননি। তিনি তদন্ত দাবি করেছেন।’

… খবরের কাগজে পড়লাম, শেখ মুজিবুর রহমান তদন্ত দাবি করায় পশ্চিম পাকিস্তানিরা তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। তারা লাহোরে আওয়ামী লীগের অফিসে আগুন দিয়েছে। শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহী, ভারতীয় চর ইত্যাদি বলে স্লোগান দিয়েছে।’

… ভারত তার আকাশসীমায় পাকিস্তানের প্লেনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। ভারতীয় সিদ্ধান্তে জানি না কেন, খুশিই হই। যেমন কর্ম তার তেমন ফল। এখন পাকিস্তানি বেসামরিক এয়ার লাইন্সের বিখ্যাত পি.আই.এ-কে সিংহল ঘুরে ঢাকায় আসতে হচ্ছে।

আজ সকালে পাশের বাড়ির গুপ্তদা এসেছিলেন। অনেক্ষণ গল্প করেছেন মীজানুর রহমানের সঙ্গে। ছুটির দিনের সকালে রান্নার ঝামেলা আমার অন্য দিনের চাইতে বেশি ছিল, আমি তাদের গল্পে অংশ নিতে পারিনি। রান্নাঘর থেকেই গুপ্তবাবু আর মীজানুর রহমানের আলাপ শুনতে পাচ্ছিলাম। প্লেন হাইজ্যাকের ঘটনা আর শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে লাহোরের বিক্ষোভ নিয়েই আলোচনা করছেন তারা। গুপ্তদা ইদানিং প্রায় রোজই আসছেন আমাদের বাড়িতে। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন তিনি। বলছেনÑ ১৫ ফেব্রুয়ারিতে অ্যাসেমব্লি বসতে যাচ্ছে তখনি এই ঘটনা, এটা কোনো ষড়যন্ত্র নয় তো?

মীজানুর রহমান জবাব দিল- অসম্ভব নয়, আগরতলা ষড়যন্ত্রের মতো শেখ মুজিবের ওপরে দেশদ্রোহিতার দোষ চাপানোর মতলব হতে পারে। বাঙালির হাতে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা তুলে দিতে সহজে কি আর ইয়াহিয়া খান পারে! শেখ সাহেবের চেয়ে ভুট্টোর প্রভাবই তার ওপরে, বেশি। তার ওপর আর্মি জেনারেলরা তো রয়েছেন।

তাদের আলোচনা ছয় ফার দাবি, ফেডারেল ফরম অব গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা থেকে স্বায়ত্তশাসনের যৌক্তিকতা অবশেষে আর্মি শাসন, মার্শাল ল ইত্যাদিতে ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। শুনলাম মীজানুর রহমান বলছে, শেখ মুজিবের ছয় দফায় ‘ওয়ান ইউনিট’ নাকচ করা হয়েছে। বেলুচিস্তানের বিদ্রোহের সূত্রপাতও হয়েছিল এই ‘ওয়ান ইউনিট’ তুলে দেওয়ার দাবি নিয়েই। বেলুচদের বিরুদ্ধে এখনো চলছে গোপনে ও প্রকাশ্যে পাকিস্তান আর্মির অপারেশন। জেনারেল টিক্কা খানকে দেওয়া হয়েছিল বেলুচ দমনের ভার। বেলুচদের রক্ত এখনো ওর হাত থেকে মুছে যায়নি।

-এখানে কি তেমন হতে পারে?

গুপ্তবাবুর প্রশ্নে মীজানুর রহমানের জবাব,

– হতে পারে। তবে সুবিধা করতে পারবে না। বাংলাদেশ বেলুচিস্তানের চেয়ে ভৌগোলিক দিক দিয়ে আয়তনে ছোট হলেও এর জনসংখ্যা সে দেশের চেয়ে অনেক বেশি। তাছাড়া খোদ পাকিস্তান থেকেও শুধু বিচ্ছিন্নই নয়, অনেক দূরেও। মনে হয় এমন ভুল ইয়াহিয়া খান করবে না। করা উচিতও নয়। ছয় দফা দাবি তাকে মেনে নিতেই হবে। মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় আমার। যে আনন্দে কিছুদিন আগেই ভাসছিলাম আমরা, ভাসছিল সারাদেশ, সেই আনন্দের স্রোত ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে, মরীচিকা হয়ে অন্ধকারে হারাতে বসেছে। খুবই উদ্বেগ, আশঙ্কা আর নিরানন্দে দিন কাটছে। তবু কেন মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটবে নিশ্চয়ই। যেন অচেনা অজানা কিছুই ঘটতেই চলেছে। কিন্তু কী সেটা কিছুতেই বুঝে উঠছি না।’…

‘… আমাদের রান্নার বুয়া কার্তিকের মায়ের যথেষ্ট বয়স হয়েছে, মাথার চুল সব সাদা, তবু রান্নায় এখনো যথেষ্ট পারদর্শী। বেশ দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাশভারি মানুষ সে। দিনে আমার চার পাঁচ কাপ চা খাওয়া নিয়ে ভীষণ আপত্তি তার। চা দিতে বললেই গজ গজ করে- খালি চা আর চা। ঘণ্টায় ঘণ্টায় এমন চা খাওনই ভালা! রাগারাগি করলেও চায়ের পেয়ালাটি ধরিয়ে দেয় আমার হাতে ঠিকই।

কার্তিকের মা দাউদকান্দির গ্রামের মানুষ। স্বামী নেই, ঘর বাড়িও নেই। স্বামী থাকতেই দেনার দায়ে মহাজনের কাছে বাঁধা পড়েছে, নিঃসন্তান কার্তিকের মায়ের এসব নিয়ে খেদ নেই। বলে, প্যাটে এক মুঠ ভাত, পিন্দনে দুইখান কাপড়, আর রাইতে একটু শোওনের জায়গা পাইলে, আর কী লাগে গো আফা? সেই কার্তিকের মায়ের এখন দেশ নিয়ে যথেষ্ট মাথাব্যথা। রোজই আমার কাছে জানতে চায়Ñ খবরের কাগজে কী খবর দিল? শ্যাখ সাবেরে র্পধান মন্তিরি বানাইব কবে?

জিজ্ঞেস করেÑ টেলিভিশনে বইসা শ্যাখ সাবে কী কইল পেসিডিন্রে? পেসিডিন্ রাজি নি ছয় দফা মানতে?

 লেখাপড়া না জানলে কী হবে, দেশের চলমান রাজনৈতিক জটিলতা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত আমাদের কার্তিকের মা। দু’দিন আগেই আমার কাছে জানতে চেয়েছিল ছয় দফা আসলে কী! যতটা সম্ভব সহজ করে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি। কার্তিকের মা কী বুঝল সেই জানে, বলল-আমাগো শ্যাখ সাবের অন্তরডা দ্যাশের লাইগা, দ্যাশের গরিব-দুঃখী মানুষের লাইগাই কান্দে। এইডার লাইগাই তো আমরা ব্যাক গরিব মানুষ হ্যারেই ভোট দিছি। আল্লায় তারে পাস করাইছে। আল্লাহই তারে দ্যাশের র্পধান মন্তিরি বানাইব।

আজ সকালেই শুনলাম রান্নাঘরে আমাদের ছুটা বুয়া হালিমার মাকে ছয় দফার বিশ্লেষণ দিচ্ছে কার্তিকের মা। বলছে- আমাগো শ্যাখ সাব হইল গরিবের বন্ধু। ছয় দফা দিয়া কইছে আমার গরিবের ভাত কাপড়ের ব্যবস্থাই আগে, দ্যাশের মানুষরে বাঁচাইতে হইব- তা নাইলে র্পধান মনতিরি হইবার ছাই না। শ্যাখ হইল আসল বাপের ব্যাটা, হ্যায় পান্জাবিগো ডরায় না।’

‘ ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১

আজ বিকেলে আমাদের বসার ঘরটি সরগরম হয়ে উঠেছিল। মীজানুর রহমানের সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধব অনেকেই এসেছিলেন। সবাই খুব উত্তেজিত ছিলেন। রান্নাঘরে চা-নাশ্তার প্লেট সাজাতে সাজাতে শুনলাম, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লির তারিখ বদলান নিয়ে তুমুল আলোচনা চলেছে। জুলফিকার আলী ভুট্টোই এটা বাতিল করিয়েছে। ঢাকায় এসে অ্যাসেমব্লিতে যোগ দিতে রাজী নয় সে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ভুট্টোর কথাই গুরুত্ব দিয়েছে। ভুট্টো বলে বেড়িয়েছে অন্যান্য পার্টির নির্বাচিত সদস্যরা যদি ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লিতে যোগ দিতে ঢাকায় যায়, প্রাণ নিয়ে কেউ আর ফিরতে পারবে না, সবাইকে খুন করা হবে। অ্যাসেমব্লি নয়, ওটা হবে ঢাকার ‘কসাই খানা’। জিওলজিক্যাল সার্ভের সিনিয়র জিওলজিস্ট আবদুল্লাহ সাহেব, আবু বকর সাহেব, মুজিবর রহমান খানও রয়েছে বসার ঘরে। আবদুল্লাহ সাহেবের উত্তেজিত কথা শুনলাম- পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবার এরপরে আর প্রশ্নই ওঠে না। ছয় দফা আর নয়, এখন একটাই দফা, হয় স্বাধীকার, স্বাধীন স্বায়ত্তশাসন নয় স্বাধীনতা, বাংলাদেশ। শেখ মুজিবের উচিত, এখন স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া, বসার ঘরে তর্ক-বিতর্ক তুমুল হয়ে উঠল। চায়ের ট্রে বসার ঘরে পৌঁছে দিতে ভুলেই গেলাম। স্বাধীনতা শব্দটি আমাকে আশ্চর্যভাবে রোমাঞ্চিত করল। নিষিদ্ধ কোনো স্বপ্নকেই জাগিয়ে তুলল। যেন স্বপ্নের সিঁড়ির কাছে পৌঁছে দিল কিছুক্ষণের জন্য। আলী হোসেনের ডাকে ফিরে এলাম সমস্যার মেঘ ঘনিয়ে আসা ঢাকার এক বাড়ির রান্নাঘরে। আলী হোসেন বলছে- ট্রে দ্যান আপা। ভাইজান চা চাইতাছে।

আলী হোসেন চা-নাশতার ট্রে নিয়ে চলে গেল। নিজেকে স্বাভাবিক চিন্তায় ফিরিয়ে আনলাম। আবদুল্লাহ সাহেব কিছুটা চড়া চিন্তার মানুষ। অ্যাসেমব্লি নাকচ হওয়ায় ক্ষেপে গিয়ে চরম সিদ্ধান্তের ঘোষণাই দিয়ে ফেলেছেন।

স্বাধীন বাংলাদেশ ভাবনাটা এই সময়ে হয় তো কোনো স্বপ্নের সুতো দিয়ে রূপকথার প্রাসাদ তৈরি করার মতোই অবাস্তব। কিন্তু এমন স্বপ্ন কি সাধ্য হতে পারে না! দেশের মানুষ এখন দেখতে চাইছে নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন ক্ষমতায়। দাবি করেছে বৈদেশিক বাণিজ্য, রাজস্ব …, নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বৈদেশিক অনুদান এবং অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার নিয়ন্ত্রণ। সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত ফেডারেল সরকারের শাসনপদ্ধতি, স্বাধিকারের দাবিতো আসলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতারই দাবি। কিন্তু যদি এই দাবিগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়, তখন? কিন্তু স্বাধীনতা, কি যেন কোন পথে তার আসা সম্ভব!

তবু দোদুল দোলায় দোলে মন। কেমন হয় যদি বাংলাদেশ হয় একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র।…

পনের

এরপরে ডায়েরির কিছু পৃষ্ঠা ছিঁড়ে গেছে। কয়েক পৃষ্ঠা হালকা কালিতে লেখার ফলে প্রায় অস্পষ্টই। পাঠোদ্ধার সম্ভব হয় না। উদ্ধার করি মার্চের প্রথম দিনটির লেখাটুকু। তাও অসম্পূর্ণ কিছুটা ভগ্নাংশ মাত্র।

১লা মার্চ, ৭১

… আজ ঢাকার জীবনে ছিল যেন এক অগ্নিগর্ভ দিন।

দুটি মাস ধরে একটু একটু করে আমাদের স্বপ্নগুলোকে জবরদস্তি কেড়ে নিতে শুরু করেছে ইয়াহিয়া-ভুট্টো। আশা-নিরাশার রৌদ্র-ছায়ার খেলায় আমরা কখনো আশায় উদ্বেল, কখনো হতাশ, ক্ষুব্ধ উত্তেজিত। ভেতরে জমে উঠছিল ক্ষোভের মেঘ। কখন যেন শুরু হয় ঝড়- শঙ্কিত অনেকেই। প্রিয় নেতা শেখ মুজিবর রহমানই এখন আমাদের স্বপ্নের কাণ্ডারি। স্বপ্নের সিঁড়িটি যেন রয়েছে তারই আয়ত্তে।

 শেখ মুজিবের নির্দেশের অপেক্ষাতেই যেন রয়েছি আমরা। তার সিদ্ধান্তের ওপর রয়েছে আমাদের বিশ্বাস আর নির্ভরতা। নিশ্চয়ই তিনি বিজয়ী হবেন, জয় ছিনিয়ে আনবেন আমাদের জন্য। কিন্তু আমরা কেউ কি ভেবেছিলাম, আজই নাটকীয়ভাবে সব কিছু পাল্টে যাবে! আজ দুপুরেই রেডিও পাকিস্তানের খবরে জানান হলো, নির্বাচনী ফলাফলের প্রেক্ষিতে ন্যাশনাল অ্যাসেম্ব্লীর উদ্বোধনী বাতিল ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান।

গত দু’টি মাসের আশা-নিরাশা, আলাপ-আলোচনা, উদ্বেগ উৎকণ্ঠা, ষড়যন্ত্র আর প্রতারণার ধোঁয়াশ পদদলিত করে রাজপথে নেমে এলো হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল। অধিকার আদায়ের দাবিরত কণ্ঠ সমুদ্র গর্জনে আছড়ে পড়ল ঢাকার রাজপথে।…

৩ মার্চ ’৭১

মার্চের এই তারিখেই ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি বসবার কথা ছিল। আজই শুরু হওয়ার কথা ছিল ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতার। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিজয়ী হওয়ার পর পাশের বাড়ির গুপ্তদাদা বলেছিলেন- শেখ মুজিব যেদিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন সেদিনই গুপ্তদা শান্তিনগর বাজারের বড় রুই মাছ কিনে আনবেন আমাদের জন্য। এক সঙ্গে রান্না-বান্না খাওয়া-দাওয়ার উৎসব করা হবে। আজ ঢাকার রাজপথে প্রতিবাদী মিছিল। পাকিস্তান আর্মির সদস্যরা গত দু’দিনেই মিছিলে গুলি করে রাজপথে মানুষ মারার মহড়া শুরু করেছিল।…

আজও পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকায় মিছিলে গুলি চালিয়েছে। আজকের জনসভায় শেখ মুজিব অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।…

সন্ধ্যায় গুপ্তদাদা এসেছিলেন, খুবই চিন্তিত তিনি। তার পরিবার রয়েছে দেশে গ্রামের বাড়িতে। মীরপুরে বিহারিরা দাঙ্গা শুরু করেছে, হিন্দুদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে, লুঠপাটও করছে। এটা নিয়েই গুপ্তদার ভয়। বললেন, পাকিস্তানি সরকার সব সময়ই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছে। গুপ্তদাকে সাহস দিলাম আমরা। বললাম প্রয়োজন মনে করলে রাতে তিনি আমাদের বাড়িতে এসে থাকতে পারেন। আমাদের গেস্টরুমটাতো খালিই পড়ে থাকে।

অনেক রাত পর্যন্ত গুপ্তদাদা থাকলেন আমাদের সঙ্গে। যাবার সময় বলে গেলেনÑ শহরের এদিকে তেমন ভয় নেই। তেমন কিছু হলে চলে আসব।

হাসিমুখেই কথা বললেন- দাদা ঝড় কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। আমাকে সাহস দিলেনÑ দিদি ভয় পাবেন না। সাহসী হয়ে উঠুন। মনে রাখবেন শেখ মুজিবের মতো সাহসী নেতা রয়েছে আমাদের সামনে।

“… অদ্ভুত এক উত্তেজনায় কাটছে আমাদের দিন। ভয় আমাদের কেটে গেছে, প্রতিদিনই সাহসী হয়ে উঠছি আমরা, সাহস দিচ্ছে রাস্তার মিছিল, প্রতিবাদী জনতা। আফিস-ঘাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানপাট বন্ধ। শেখ মুজিবের অসহযোগের ডাকে অচল হয়ে গেছে সারাদেশ। ঢাকা এখন মিছিল আর স্লোগানের শহর। বড় রাস্তায় সারাদিনই বয়ে চলেছে মিছিলের ঢেউ। উত্তেজনায় ক্ষোভে বুঝি ফেটে পড়েছে দেশ। স্লোগানের গর্জনে কেঁপে উঠছে রাজপথ-

‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর

বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’

স্বাধীনতা! সত্যিই কি তুমি আসবে!…”

ষোল

আমার পুরোন ডায়েরির বিবর্ণ কয়েকটি পাতায় নিঃশব্দ হয়ে থাকা ’৭১-এর মার্চের রক্তঝরা উত্তাল দিনগুলোকে মাঝে মাঝেই খুলে দেখি। অবাক হই, রোমাঞ্চিত হই, আবেগে ভিজে ওঠে চোখ। অবাক হয়ে ভাবি, সত্যিই কি এমন গৌরবের দিন এসেছিল আমাদের জীবনে! এখন নির্দ্বিধায় স্বীকার করি, আমার দীর্ঘ জীবনে শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়েছি একাত্তরের মার্চ মাসের দিনগুলোতে। একাত্তরের পরের প্রজন্ম এবং সে সময়ে যারা বাংলাদেশের বাইরে ছিলেন তারা হয়তো বুঝবেন না, হাজার বছরের পথ হেঁটে কী গৌরবের মুকুট পরে এসেছিল একাত্তরের অবিস্মরণীয মার্চ মাস! আমরাই সেই সৌভাগ্যবান বাঙালি যারা সেই গৌরবের দিনগুলোকে তখন ধারণ করেছি, আজো ধারণ করে আছি।

অন্যরা বুঝবেন কি না জানি না, আমরা যারা একাত্তর দেখেছি, তারা জানি, মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা কতখানি ভালোবেসেছিলাম। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতা যে মানুষের কত প্রিয় হতে পারেন, একাত্তরে যারা ছিলেন এবং যারা তারই নির্দেশে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, নির্ভয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তারা সবাই জানতেন এবং জানেন।

আজ স্বীকার করতেই হয় আমাদের প্রিয় নেতা তার ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেনÑ ‘রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেব।’ হয়তো তিনি জানতেন গৌরবের রক্তদান না হলে স্বাধীনতা আসে না।

ব্রিটিশ উপনিবেশের জিঞ্জির ভেঙে স্বাধীনতা আনবার প্রত্যয়ে আর এক নেতা- সুভাষ চন্দ্র বসুও এক সময় দেশবাসীকে বলেছিলেন- ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা এনে দেব।’

একাত্তরে লেখা আমার ডায়েরির বিচ্ছিন্ন অসম্পূর্ণ পৃষ্ঠা ক’টি কোনো ইতিহাসের দায়ভার বহন করে না। এগুলো একান্তই আমার আবেগ ও দিনপঞ্জির স্বাক্ষর, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের পুরোনো দলিল মাত্র।

পৃথিবীর যে কোনো দেশ, জাতি, সমাজ বা নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীর ওপর বিভিন্ন যুগ বা কালে দুঃসময়ের ঘোর অন্ধকার নেমে আসে, সেই সঙ্গে আশ্চর্যভাবে খুঁজে পাওয়া যায় স্বপ্নের সিঁড়ি, সেই সিঁড়িটির নির্ভরতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সব অন্যায়-অবিচার, নির্যাতন, অত্যাচার তুচ্ছ করে দেয়। অসহায় উপায়হীনতায় সাহস ও সংগ্রামের শক্তি জোগায়।

একাত্তরের সু-সময়কে ঘিরে ফেলেছিল তখন দুঃসময়ের নিষ্ঠুরতা। ঘাতকের অস্ত্র বাঙালির রুক্তপানের জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। ততদিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানের স্থলাভিষিক্ত হয়ে পাকিস্তান আর্মির পূর্বাঞ্চলীয় জোনের অধিনায়ক হয়ে জাকিয়ে বসেছে, ‘বুচার অব বেলুচিস্তান’ নামে কুখ্যাত জেনারেল টিক্কা খান। এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতাপশালী জেনারেলরা শেখ মুজিবুর রহমান ও বিদ্রোহী বাঙালিদের তিনজনমের মতো শায়েস্তা করে দিতে ইয়াহিয়া খানকে ‘নেকেড মার্শাল ল’ জারি করাতে বাধ্য করেছে।

এই রক্তপিপাসু ঘাতকেরা যখন পর্দার অন্তরালে অস্ত্র শান দিচ্ছে। তখনি স্বপ্নের সিঁড়ির ঝলক নির্দেশিত হলো শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণে। যে ভাষণটির জন্য সারা বাংলাদেশ উন্মুখ হয়ে অপেক্ষায় ছিল। দুপুরের আগে থেকেই শহরের নানা প্রান্ত থেকে আসছিল মিছিলের পর মিছিল। জমা হচ্ছিল রেসকোর্স ময়দানে। আমাদের পাড়ার অনেকেই চলে গিয়েছিল শেখ মুজিবের ভাষণ শুনতে। শহরের প্রায় অধিকাংশ লোকই সেদিন চলে গিয়েছিল রেসকোর্সে।

দুপুরের পর পাড়াগুলো নির্জনই হয়ে এলো। পথঘাট প্রায় ফাঁকাই হয়ে গিয়েছিল। শুধু পাকিস্তান আর্মির টহলদার সশস্ত্র ট্রাকের ঘোরা-ফেরা ছিল রাস্তায়, অস্ত্র নিয়ে মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়েছিল পাকি সৈন্যরা।

চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর জেনারেল টিক্কা খান রেডিও পাকিস্তান ও পাকিস্তান টেলিভিশনে শেখ মুজিবর রহমানের ভাষণ প্রচার নিষিদ্ধ করে। টিভি ও রেডিওর কর্মচারী কর্মকর্তারা প্রতিবাদ জানিয়ে কাজ বন্ধ করে দিলে টিক্কাকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়।

আমাদের বাড়ির সবাই, গুপ্তদাদা, আমাদের পাড়ারই বাসিন্দা- আমাদের এক আত্মীয় মইন ও তার ভাই শান্ত, স্ত্রী রেখা, সবাই টিভিতে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনবার অপেক্ষায় ড্রইংরুমে বসেছিলাম। কার্তিকের মা আলী হোসেনও এসে বসেছিল বসার ঘরের এক ধারে। সবাই শুনলাম এক সঙ্গে সেই বহু প্রতীক্ষিত ভাষণ। হৃদয়স্পর্শী, আত্মপ্রত্যয়ী, ওজস্বী, আবেগপূর্ণ ভাষণটি ছিল অত্যন্ত গোছানো, সংযত। এর প্রত্যেকটি শব্দ ও বাক্য ছিল দৃঢ় সিদ্ধান্তবাহী ও তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন উদ্দীপনায় উদ্দীপ্ত ও উদ্বুদ্ধ হলো লক্ষ লক্ষ শ্রোতা, উদ্দীপনা এসেছিল আমাদের মাঝেও। আজ জীবনের অপরাহ্ন অতিক্রান্ত সময়ে এসেও শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি স্মরণে এলে আবেগে আপ্লুত হই। একাত্তরের সাক্ষী আমরা সবাই জানি, সেদিনের সেই ভাষণটি কোনো দলের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি? শেখ মুজিবর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে, ছিল বাঙালি জাতির ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। সম্ভবত সেই কারণেই মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের শ্রেষ্ঠ ভাষণ হয়ে উঠেছিল সেটা। মানুষের বঞ্চনা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং ন্যায়সঙ্গত অধিকারের স্বপক্ষে নির্ভীক এক ঘোষণার দলিল ছিল ’৭১ এর ৭ মার্চের সেই ভাষণ। তারপর এতগুলো বছর পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের গৌরব আর কলঙ্কের রক্তভেজা পথ অতিক্রমের সাক্ষী হয়েও আমাদের এখনো ভাবতে হয়, কী এমন যাদু ছিল শেখ মুজিবের একাত্তরের ৭ মার্চের ভাষণে। যার জন্য একটি জাতির উত্থান পৃথিবীর মানচিত্রের পুরোনো সংজ্ঞাটি বদলে দিয়েছিল!

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares