ধা রা বা হি ক  : ষষ্ঠ  প র্ব

আত্মজীবনী

দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়ি

রিজিয়া রহমান

॥ বার ॥

আমার পৃথিবী ক্রমে জনশূন্যই হয়ে যায়। জানালায় দাঁড়ালে মানুষ-জন কমই চোখে পড়ে। দূরের কাছের যাযাবররা গরম পড়বার আগেই ডেরা তুলে চলে গেছে সমতলের দিকে। সিবি ছাড়িয়ে হয়তো আরো দক্ষিণে, যেখানে সিন্ধু নদী বয়ে চলেছে, যেখানে পশু খাদ্যের অপ্রতুলতা নেই। কিছু জাঠ যাযাবরদের মাঝে মাঝে দেখা যায়। রৌদ্রদগ্ধ জারগুন পর্বত, দূরের। আর বাবলা গাছগুলো প্রচণ্ড তাপে কাঁপা-কাঁপা দৃশ্য হয়ে যেন বহু দূরে সরে যেতে থাকে। সেখানে কদাচিৎ কোনো উটের কাফেলা চোখে পড়ে। পরিবেশও বৈচিত্র্য হারায়। আর ঠিক এই সময়ে আমার এক সঙ্গী জুটে যায় আমাদের পাড়া-প্রতিবেশী বলতে একমাত্র ডা. শফিকুর রহমান সাহেবরা। তার চিকিৎসালয়টি আমাদের বাড়ির পাশেই। সকাল-বিকেল দু’বেলা সেখানে রোগীদের চিকিৎসা দেন তিনি। দূরের গ্রাম থেকে আসে রোগী। দিনের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পর হাসপাতালে রোগীদের আসা কমে গেছে। সন্ধ্যা না লাগতেই হাসপাতালের গেটে তালা লাগিয়ে ওয়ার্ডবয় আর কম্পাউন্ডার চলে যায় গ্রামের বাড়িতে। থাকে কেবল একজন পাহারাদার। ডাক্তার সাহেব আর মীজানুর রহমান ক্লাবে চলে গেলে এই বুড়ো পাঠান পাহারাদারটি আমাদের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বটি নিয়ে নেয়। আমাদের দুই বাড়ির চারপাশে দু’চারবার টহল দিয়ে যায়। আসল অভিভাবকত্বটি কিন্তু নিয়ে নেয় ডাক্তার সাহেবের দুই বিদেশি কুকুর- টমি আর জ্যাকি। হাসপাতালের পুরো এলাকাটাই তারা টহল দিয়ে বেড়ায়। গাছের পাতাটি নড়লেও শুরু করে ঘেউ ঘেউ করে প্রচণ্ড ধমকা-ধমকি।

এই জ্যাকির সঙ্গেই আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। জানি না, কেন আমাকে জ্যাকি খুব পছন্দ করতে শুরু করে। দিনে বার কয়েক আমাকে সে দেখতে আসবেই, নানাভাবে সৌহার্দ জানাবে। আমার সঙ্গে ঘোরাঘুরি করবে এ ঘরে, ও ঘরে। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলি- এখানে আর ঘোরাঘুরি করিস না তো। যা, বাড়ি যা।

জ্যাকি যায় না। আমাদের বারান্দায় বেশ আরামে লম্বা হয়ে বসে থাকে। জ্যাকিকে নিয়ে ভালোই সময় কাটে আমার। ওকে ডাকি, ওর সঙ্গেই কথা বলি। বাইরের গেটে বাতাসের শব্দ হলেও, জ্যাকিকেই বলিÑ দ্যাখ তো জ্যাকি কে এল। জ্যাকি এক ছুটে গেটের কাছে গিয়ে ডাকাডাকি শুরু করে। ওকে মাঝে মাঝে বিস্কিট খেতে দিই, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলি- খুব লক্ষ্মী মেয়ে আমাদের জ্যাকি।

আমার আদরের প্রশংসা বুঝতে পারে জ্যাকি। বিস্কিট খেতে খেতে লেজ নাড়ে। জ্যাকির সঙ্গেই সারাদিন এমনভাবে গল্প করি, যেন সে কুকুর নয়, মানুষ। যেন সে আমার গল্পগুলো বোঝে। জ্যাকি মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ে রান্না ঘরে, চেঁচিয়ে শাসন করি- এই জ্যাকি খবরদার! রান্নাঘরে ঢুকবি না। কোনো কিছুতে মুখ দিলে কিন্তু মজা টের পাবি বলে রাখছি। জ্যাকি কী বোঝে কে জানে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে চোরা চোখে তাকায় আমার দিকে। আমাকে খুশি করবার জন্য আমার পায়ের কাছে এসে গড়াগড়ি খায়। ওকে কপট ধমকাইÑ হয়েছে, এবার ওঠ। আর তেল দিতে হবে না।

জ্যাকি হয় আমার সারাক্ষণের সঙ্গী। কোনো কারণে জ্যাকি না এলে, গেটে দাঁড়িয়ে ডাকিÑ জ্যাকি! জ্যা…কি! এক ছুটে চলে আসে জ্যাকি। লাফিয়ে দু’পায়ের থাবায় আমার গলা ধরতে চায়।

ডাক্তার সাহেব হাসতে হাসতে বলেনÑ জ্যাকি এখন ভাবিকেই বেশি পছন্দ করছে। মীজানুর রহমান বলেÑ ভালো বন্ধুই পেয়ে গেছ। জ্যাকি থাকতে আর চিন্তা কী! র‌্যাটল্ স্নেক আর পাহাড়ি গিরগিটিদের তোমার ত্রিসীমানায় আসতে দেবে না। অ্যালসেশিয়ানরা যেমন বিশ্বস্ত হয় তেমন বুদ্ধিমানও মানুষের মতোই। জ্যাকির বুদ্ধিমত্তার পরিচয় যে পাই না তা নয়, সে যে সাধারণ কুকুরদের মতো নয়, সে ব্যাপারটিও একদিন উপলব্ধি করতে হল। মাঝে মাঝে জ্যাকির ছোটখাটো দুষ্টুমির জন্য ওকে শাসন করতে হয়। একদিন মীজানুর রহমানের খনিতে নামবার হেলমেটের বাল্বে লাগানো ব্যাটারির তার কামড়ে ছিঁড়ে ফেলল জ্যাকি। ঝাড়ু তুলে শাসিয়ে দিলাম- বড় বেশি বাঁদরামি হয়েছে তোমার। রাখো আজ তোমাকে ঝাড়ু পেটা করব। আমার হাতের ঝাড়ুকে বিন্দুমাত্র ভয় পায় না জ্যাকি। দিব্যি শুয়ে লেজ নাড়ে। হাল্কা দু’একটা ঝাড়ুর বাড়িকে পাত্তাই দেয় না।

সেই জ্যাকিই একদিন এক ম্যাজিক দেখিয়ে আমাকে একেবারে হতবাক করে দিল। দুপুরে খাওয়ার জন্য এক প্লেট মুরগি ভাজা করে রেখেছিলাম রান্নাঘরের আলমারির তাকে। কিছুক্ষণ পরই গিয়ে দেখি আলমারির পাল্লা খোলা। এক টুকরো ভাজা মুরগিও নেই। প্লেট খালি পড়ে আছে। জ্যাকি বারান্দায় শুয়ে চোখ পিট পিট করছে। বুঝে ফেললাম অপকর্মটি সেই করেছে। মেজাজ বিগড়ে গেল আমার। জ্যাকিকে রোজই  বিস্কিট রুটি খাওয়াই। মাংস রান্না হলে কিছুটা ওর জন্য রাখি। তারপরও চুরি করে খাওয়া! সেই মুহূর্তে ভুলেই যাই জ্যাকি মানুষ নয়, কুকুর। ভুলে যাই, ডাক্তার সাহেবের বাড়ির কাজের পাঠান ছেলেটি টমি আর জ্যাকিকে ঠিকমত খাবার দেওয়ার কাজে গাফিলতি করে। এই নিয়ে ডাক্তার সাহেব বেশ রাগারাগিও করেছেন ছেলেটির সঙ্গে। রান্নাঘর থেকে ঝাড়ু হাতে বেরিয়ে আসি। কোমরে শাড়ির আঁচল জড়াতে জড়াতে বলিÑ এতগুলো মুরগি ভাজা খেয়ে এখন আরাম করছ! চোর কোথাকার, রাখ, তোকে মজা দেখাচ্ছি আমি।

জ্যাকি বোধহয় বুঝলো চুরি করে খাওয়ার অপরাধে আজ নির্ঘাত উত্তম-মধ্যম পড়বে তার পিঠে। একলাফে গিয়ে লুকালো বসার ঘরে। আমিও নাছোড়বান্দা। ওকে আজ শায়েস্তা করেই ছাড়ব। এরপর শুরু হলো জ্যাকির আর আমার চোর-পুলিশ খেলা। জ্যাকি আত্মরক্ষার জন্য ছুটোছুটি করছে এ ঘরে-ও ঘরে, বারান্দায়, উঠোনে। আমিও ছুটছি ওর পেছনে। বেশ কিছুক্ষণ চলল জ্যাকিকে ধরবার জন্য ছুটোছুটি। জাকি হয় তো বুঝল, আমি আজ সত্যিই রেগেছি। আমাকে নিরস্ত করবার জন্যই সুঠাম দেহের সুস্বাস্থ্যের অ্যালসেশিয়ান কুকুরটি অভাবনীয় এক কাণ্ড করে বসল। আমাদের বাড়িটি ছিল যথেষ্ট সুরক্ষিত, দশ ফিট উঁচু দেয়ালে ঘেরা। বাইরের বড় গেটটিও বন্ধ থাকে। ছুটোছুটি করতে করতে দিশেহারা জ্যাকি এক সময় দিল লম্বা হাই জাম্প। ঝাড়ু হাতে হতভম্ব আমি নির্বাক হয়ে দেখলাম কী অবলীলায় টপকে পেরিয়ে গেল সে প্রায় দশ ফিট উঁচু দেয়াল। যেন স্লো মোশানে অপূর্ব একটি দৃশ্য প্রদর্শিত হলো আমার সামনে। একমাত্র সিনেমাতেই বোধহয় প্রশিক্ষিত কুকুরের এমন লাফিয়ে দেয়াল পেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখেছি।

ধাতস্থ হওয়ার পর বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করলাম, কৃতজ্ঞই হলাম জ্যাকির ওপরে। যেভাবে নির্বোধের মতো বন্ধ বাড়িতে ওকে আমি তাড়া করে ফিরছিলাম নিজেকে বাঁচাবার জন্য ও তো আমাকে উল্টো আক্রমণ করতে পারত। শুধু আনুগত্যের কারণেই হয় তো একটা ফুলের ঝাড়ুর কাছে নতি স্বীকার করে গেল।

এরপর জ্যাকি আমাকে দেখলে ছুটে আসত না আর। দূরে দূরে সরে থাকত, ভয়ে ভয়ে তাকাত। ডাকলেও কাছে আসত না, অভিমানী মেয়ের মতো মুখ ফিরিয়ে চলে যেত। একেবারেই ছেড়ে দিল আমার বাড়িতে আসা। তখনি বুঝলাম, জ্যাকি আমার নিঃসঙ্গতাকে কী আশ্চর্যভাবে মুছে দিয়েছিল। কিন্তু দিন কয়েক পরেই জ্যাকিকে আবার দায়িত্বশীল অ্যালসেশিয়ানের ভূমিকায় দেখলাম।

সেদিন ডাক্তার সাহেব আর মীজানুর রহমান বেশ তাড়াতাড়ি ফিরেছে ক্লাব থেকে। হ্যারিকেনের আলোয় রাতের খাবার খেতে বসেছি সবে। হঠাৎ দুম-দাম গোলাগুলির শব্দে কেঁপে উঠল নিস্তব্ধ সন্ধ্যা রাত। সারিগের নিরীহ স্থবির পরিবেশে এমন শব্দ একেবারেই অকল্পনীয়। শব্দগুলো যে গোলাগুলির বুঝে উঠিনি প্রথমে, ভেবেছিলাম হয় তো ভূমিকম্প হচ্ছে। পার্বত্য এলাকার ভূমিকম্প যে পাহাড়ে যুদ্ধের বাজনার মতো শব্দ তোলে কোয়েটায় আসবার আগে সেটা জানতাম না। কোয়েটা বাংলাদেশের মতোই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাÑ প্রায়ই সেখানে ভূমিকম্প হয়। অনেক সময় দিনে তিন চার বারও ভূমিকম্প ঝাঁকুনি দিয়ে যায়। সে সময় মুরদার পাহাড়ে ঝম ঝম শব্দ ওঠে, বড় বড় পাথরের চাঙ্গড় গড়িয়ে পড়ে নিচে। প্রথম দিকে ভয় পেতাম, পরে আর সেটা ছিল না। অনেক সময় রাতে ভূমিকম্প হলে ঘর ছেড়ে বাইরে আসতাম না, শুয়েই থাকতাম। নিশ্চিন্ত থাকবার কারণও ছিল। আমাদের বেলুচি স্ট্রিটের বাড়িটা ছিল কোয়েটা শহরের অন্যসব বাড়ির মতোই ভূমিকম্প সহনীয় করে তৈরি। কেঁপে কেঁপে দোল খেলেও ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ত না। ১৯৩৫ সালে কোয়েটায় একবার প্রচণ্ড ভূমিকম্প হয়। সেই ভূমিকম্পে শহরটা না কি মাটিতে প্রায় মিশে গিয়েছিল। প্রাণহানিও হয়েছিল প্রচুর। তারপর থেকেই কোয়েটায় ‘আর্থকোয়েক প্রুফ’ বাড়ি তৈরি শুরু হয়।

মীজানুর রহমান চিন্তিতভাবে বললÑ ভূমিকম্প নয়, মনে হয় গোলাগুলি হচ্ছে বাইরে। খুব ছোট বয়সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আক্রান্ত কলকাতায় জাপানি বোমা আর অ্যান্টি এয়ারক্রাফটের শব্দ শুনেছি। গোলন্দাজী ট্যাংকের শব্দ, মর্টার শেলিং, গ্রেনেড, স্টেনগান, এল. এম. জি এস. এল. আর ইত্যাদি স্বয়ংক্রীয় অস্ত্রের ভয়ঙ্কর শব্দ ’৭১-এর আগে একেবারেই অপরিচিত ছিল। বাংলাদেশে এখনকার হরতাল অবরোধে মুড়ি-মুড়কির মতো এন্তার ফুটতে থাকা ককটেল, গ্রেনেড বা পেট্রলবোমার আক্রমণ সম্পর্কে তখন কোনো ধারণাই ছিল না। তাই সারিগের মতো জনবসতি বিরল পার্বত্য-মরু এলাকায় এমন আচমকা গোলাগুলির শব্দ অবিশ্বাস্যই লাগছিল, যেখানে সারা দিনে মাঝে মাঝে একজন মানুষও চোখে পড়ে না জানালায় দাঁড়ালে, সেখানে কারা এমন পাহাড় কাঁপানো অস্ত্রের হুঙ্কার তুলছে! খাওয়া ফেলে আমি আর মীজানুর রহমান হতবাক হয়েই বসে থাকি। এক সময় গোলাগুলির শব্দ থেমে যায়। টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে এসে যান ডাক্তার সাহেবরা, বলেনÑ ভয় পাননি তো আপনারা? ভয়ের কিছু নেই, এখানে প্রায়ই এমন হয়, দু’চারটা গুলি খাওয়া রোগীও আসে হাসপাতালে।

মীজানুর রহমান জিজ্ঞেস করেÑ গোলাগুলি হওয়ার কারণটা কী? কারা করে এসব?

ডাক্তার সাহেব জানালেনÑ এখানকার ট্রাইবাল আর নোম্যাডদের রাইফেলের লাইসেন্স নিতে হয় না, নিজেরাই তৈরি করে রাইফেল। পশুপালের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র রাখলেও অনেক সময় বিভিন্ন গোত্রে বা দলের মধ্যে মনোমালিন্য, ঝগড়া-সংঘাতের সমাধান রাইফেলের গোলাগুলি দিয়েই হয়। আজকের গোলাগুলিও হয় তো এরকম কোনো কারণে ঘটিয়েছে দুই বিবাদী পক্ষ। হাসতে হাসতে ডাক্তার সাহেব বললেন, আমাদের ওরা কোনো ক্ষতি করবে না। জানেন না বোধ হয়, কালাতের গণ্ডগোলের সময় এখানকার পাঠানরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কয়লা খনির সব বিদেশিদের মেরে ফেলবে, কেবল হাসপাতালের বাঙালি ডাক্তারকে ছাড়া।

ডাক্তার সাহেব সম্ভবত আমাদের সাহস দেওয়ার জন্যই বেশ কিছুক্ষণ থাকলেন। নানা গল্পে পরিবেশ কিছুটা সহজ হলো। এলাকাটি বেলুচিস্তানের অন্তর্গত হলেও এখানে পাঠানদেরই বসবাস। বেলুচদের মতো নিরীহ শান্তিপ্রিয় নয় পাঠানরা। তারা যোদ্ধার জাত। ব্রিটিশরা পর পর অনেকগুলো যুদ্ধের পরেও পুরো বেলুচিস্তান কব্জায় নিতে পারেনি পাঠানদের জন্যই। কোয়েটা সিবি এবং বোলান গিরিপথের কিছু অংশ নিয়েই ছিল ব্রিটিশ বেলুচিস্তান। এর বাইরে ছিল খানের আধিপত্য। কথায় কথায় বন্দুকযুদ্ধ, হানাহানি খুনোখুনির বিচার এখানে পুরোন নিয়মেই নিষ্পত্তি হয় ‘জিবগায়’। কালাতের যুদ্ধের পর সমগ্র বেলুচিস্তানে পাকিস্তানি আইনের শাসন জারি হওয়ার পরও আগের নিয়ম বহাল তবিয়তেই আছে। পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশের শাসনে প্রথম দিকে মাথা ঘামায়নি। এখনো ঘামাচ্ছে না। এসব গল্পের মাঝেই হাসপাতালের কেয়ারটেকার এল ডাক্তার সাহেবকে ডাকতে। গুলিতে আহত দু’জন রোগী এসেছে।

ডাক্তার সাহেব চলে গেলেন। সঙ্গে মীজানুর রহমানও গেল। আমার উদ্বেগ তখনো কাটেনি। ডাক্তার-ভাবিকে জিজ্ঞেস করলামÑ আপনি এখানে আসবার পরে এমন গোলাগুলির ঘটনা কি আরো ঘটেছে?

অসময়ে ডাক্তার সাহেবের হাসপাতালে চলে যাওয়ায় তার মেজাজ খারাপ। রাগ করেই বললেন, হইছেই তো। কয়দিন বাদে বাদেই হয়। এইটা তো ডাকাইত্যা দ্যাশ। এইহানে নি থাহন যায় কন!

ওদিকে জ্যাকি এসে আমাদের খোলা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে পাহারায়। অদৃশ্য কোনো শত্রুকে ঘেউ ঘেউ করে ধমক দিয়েই চলেছে। টমি চলে গেছে ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে হাসপাতালে। সেখান থেকেই তার ডাকাডাকির শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিছু লোকজনের কথার শব্দও ভেসে আসছে। শঙ্কিত হলাম আবার। বাইরের গেট বন্ধ করবার জন্য যেতেই হুলস্থূল শুরু করল জ্যাকি। অস্থির ছুটোছুটি করতে থাকল একবার গেটের বাইরে, একবার আমার সামনে। গরগর শব্দে কাউকে ধমকে দিতে থাকল। বুঝে উঠলাম না ব্যাপারটা কী। রাইফেলধারী কেউ কি লুকিয়ে আছে আমাদের বাড়ির আশপাশে! জ্যাকি কেন এমন করছে! ভয় পেয়ে চলে এলাম। ঘরের দরোজা বন্ধ করে দিলাম। ডাক্তার ভাবি কিন্তু ভয় পাননি। হাসতে হাসতে বললেনÑ বুইজ্জেন্ নি ভাবি! এইগ্যা আপনেরে বাইরাতে দিত না। হেইতি আপনের র্গাজেন হই বইছে।

মীজানুর রহমান ফিরল একটু পরেইÑ দু’টি উত্তেজনাপূর্ণ খবর নিয়ে এল সে। প্রথম খবরটি হলÑ গোলাগুলির কারণ যথারীতি দুই দলের বিবাদ। এতে দু’জন লোক আহত হয়েছে, তবে তেমন গুরুতর নয়। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, ডাক্তার সাহেব একটু পরেই ফিরবেন বাড়িতে।

দ্বিতীয় খবরটি আমার জন্য ভয়াবহই বটে। আমাদের গেটের সামনে একটু আগেই বিষাক্ত একটি গিরগিটিকে মারা হয়েছে। ডাক্তার সাহেবের বাবুর্চি তাকে দেখতে পায়। নীল আলো বিচ্ছুরিত জিভ বের করে হিস হিস শব্দ করছিল। জ্যাকি না থাকলে হয়তো ঢুকে পড়ত আমাদের বাড়িতেই। কদাকার প্রাণীটাকে মেরে মাটির তলায় পুঁতে ফেলা হয়েছে। মরা গিরগিটির শরীরও নাকি বিষ ছড়ায় সেই জন্যই ওটাকে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে। জ্যাকি উঠোনে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছিল। ওকে পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করলাম। বললামÑ কাল থেকে তুই রোজ আসবি আবার। তোকে মুরগি ভাজা খাওয়াব। আর কখনো তোকে ঝাড়ু নিয়ে তাড়াব না। আমার পায়ের কাছে মুখ ঘষল জ্যাকি। যেন বলতে চাইলÑ এখন বুঝলে তো কেন তখন তোমাকে গেটের বাইরে যেতে বাধা দিয়েছিলাম।

পরদিন গোলাগুলির ঘটনার পূর্ণ-বিবরণ পাওয়া গেল। এক পশুপালক জাঠ দলের কিছু ছাগল ভেড়া নিজের দলে ভিড়িয়ে কেটে পড়ছিল আর এক পশুপালক দল। তাতেই বিবাদের সূত্রপাত এবং গোলাগুলি বিনিময়। দুই দলের লোকই আহত হয়েছে। কয়েটি দুম্বা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা পড়েছে। পরদিন দুপুরে পলিটিক্যাল এজেন্টের জিপ আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে ধুলো উড়িয়ে চলে গেল। আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসি সরকারের সদস্য- এখানকার পাঠান সর্দারের বাড়িতে। সেখানেই জিরগা বসল। জরিমানা হিসেবে বিবদমান দুই দলকেই কয়েকটি দুম্বা দিতে হলো। মিটমাট হয়ে গেল। এসবই ডাক্তার সাহেবের কাছে শোনা। ডাক্তার শফিকুর রহমানকে তার বিনয় ও ভদ্র ব্যবহারের জন্যই কেবল এখানকার পাঠানরা পছন্দ করে না তার চিকিৎসারও সুনাম আছে। সবাই তাকে সম্মান করে তার জন্য ফল-মূল, মুরগি, ডিম ইত্যাদি নিয়ে আসে। এখানকার সর্দারও ডাক্তার সাহেবকে সম্মান করে। ঈদ-উল-আজহার সময় একটা আস্ত দুম্বা হালাল করে পাঠিয়ে দেয়। একবার মারখোর শিকার করে ডাক্তার সাহেবকে উপহার দিয়েছিল। মারখোর (পাহাড়ি বন্য ছাগল) আমি কখনো দেখিনি। শুনেছি বেলুচিস্তানের উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় এরা থাকে। বাঁকানো শিঙয়ের ক্ষীপ্র গতি এই বন্য ছাগলেরা পাহাড় থেকে কখনো নিচে নেমে আসে না। মাঝেমধ্যে পাহাড়ি চিতাবাঘের (স্নো লেপার্ড) তাড়া খেয়ে দলছুট দু’একটি নিচে নেমে এলে মানুষের হাতে ধরা পড়ে। দুর্ধর্ষ জাঠ শিকারিরাই পাহাড়ে যায় ‘মারখোর’ শিকার করতে।

দুই দল পশু পালকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই বলা হলেও আমি একেবারেই কিন্তু নির্ভয় হতে পারিনি। সব ঘরের জানালা সব সময় বন্ধ রেখেও উৎকণ্ঠায় থাকতাম। মনে হতো, যে কোনো সময় হঠাৎ শুরু হয়ে যেতে পারে বন্দুকযুদ্ধ। লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি হয়তো জানালার কাচ ভেদ করে ঢুকে পড়বে আমাদের ঘরে। সময়টা ছিল ষাটের দশকের শুরু। সেই সময়ের বাঙালি মেয়ে আমি, ঢাকা শহরে মিছিল-আন্দোলন দেখেছি। কিন্তু এমন বন্দুকযুদ্ধ দেখিনি। আজকের ঢাকায় গোলাগুলি-খুনোখুনির ঘটনা নৈমিত্তিক ডাল-ভাত হলেও, তখন যারা ঢাকায় বড় হয়েছে, একটি নিরুপদ্রব শহর বা দেশের মানুষই ছিল তারা। ছিল প্রকৃতই শান্তিপ্রিয় নিরাপদ জীবন যাপনকারী বাঙালি। সেই দেশের মানুষ আমি এমন রুক্ষ প্রকৃতির উগ্র মানুষদের আচরণে যদি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ি, সেটা অস্বাভাবিক কিছু তো নয়।

এর ক’দিন পরেই জ্যাকিকে হারালাম। প্রাণশক্তিতে ভরপুর বুদ্ধিমতী অ্যালসেশিয়ান কুকুরটির মৃত্যুর কারণ হবে যে একটি মৃত গিরগিটি এ আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। গোলাগুলির রাতের পরই জ্যাকি অসুস্থ হয়। মুখ ফুলে ঢোল হলো। ছুটোছুটি ডাকাডাকিও বন্ধ হলো তার। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিল। ডাক্তার সাহেবের বাড়ির সিঁড়িতে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকত সারাদিন। ডাক্তার সাহেবও ধরতে পারছিলেন না জ্যাকির রোগ। ডাক্তার সাহেবের বাড়ির পাঠান ছেলেটির কাছেই পরে জানা গেল জ্যাকির অসুস্থতার কারণ। মরা গিরগিটিকে জ্যাকি নাকি মাটি খুঁড়ে তুলে খেয়ে ফেলেছিল। ছেলেটির চাক্ষুস বিবরণে সত্যতা কতটুকু ছিল জানা যায়নি। ডাক্তার সাহেব কিছু চিকিৎসার চেষ্টা করলেও জ্যাকির অজ্ঞাত রোগের উপশম ঘটল না। দিন কয়েক ভুগে মারা গেল আমাদের সবার প্রিয় জ্যাকি। অনেকে বলল, মরা গিরগিটির বিষেই জ্যাকি মারা গেছে।

॥ তের ॥

কালাত থেকে দাদার চিঠি এল। দাদা অর্থাৎ আমার বড়ভাই চিঠিতে জানিয়েছেন আমাকে কালাতে চলে যাওয়ার জন্য। মীজানুর রহমান বললÑ সামনের মাসের প্রথম সপ্তাহে ছুটি নিয়ে তোমাকে কালাতে পৌঁছে দিয়ে আসব, গোছগাছ করে নাও।

গোছগাছ করবার মতো তেমন কিছুই নেই। কিছু বইপত্র আর কাপড়-চোপড় ছাড়া। আমাকে কালাতে পৌঁছে দিয়ে মীজানুর রহমানকে সারিগেই ফিরতে হবে। এখানকার কাজ শেষ হতে আরো কিছুদিন লাগবে। সে ঠিক করেছে বাড়িটা ছেড়ে কলিয়ারীর অফিসার্স মেসে কাটিয়ে দেবে বাকি সময়টুকু। সুতরাং সংসার নির্বাহের ছোটখাটো লটবহরটিকে বয়ে নিতে হবে কোয়েটায় আবার। কোয়েটার বাড়িতে সেসব রেখে আমাকে যেতে হবে কালাতে।

কালাত সম্পর্কে যথেষ্টই আগ্রহ ছিল আমার। কালাতের যুদ্ধের সময় কোয়েটাতেই ছিলাম। কালাতের পতন হওয়ার পরও যে বেলুচিস্তানের মানুষের মনে কালাতের প্রতি অটুট আনুগত্য ছিল সে সম্পর্কে ধারণা ছিল আমার। যুদ্ধের গল্পও অনেক শুনেছি। সুতরাং বেলুচিস্তানের ‘রক্তাক্ত হৃদয়’ সেই কালাতেই যাওয়ার সুযোগ আমাকে উৎফুল্ল করে তুলল। সারিগে আসবার সময় খালেদাকে বলে এসেছিলাম, পরীক্ষার ফরম ফিলআপের খবরটা সে যেন কলেজ থেকে জেনে নিয়ে আমাকে জানায়। খালেদার চিঠি না পেয়ে আমি ওকে চিঠি লিখলাম। উত্তরে খালেদা জানাল পরীক্ষার ফরম জমা দেওয়ার সময় এখনো হয়নি। তবে কলেজের অধ্যক্ষা আমাকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে আনা মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট এক মাসের মধ্যেই জমা দিতে বলেছেন। দেরি হলে ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি নাও পেতে পারি। ব্যাপারটা মীজানুর রহমানকে জানালে সে বলল, চিন্তার কিছু নেই। তোমার মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট নিশ্চয়ই এত দিনে আমার অফিসের ঠিকানায় এসে গেছে। এরপর নিশ্চিন্ত হয়ে যাই। পরীক্ষার আগের এই কয়েকটি মাস কালাতেই থেকে যাব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। সেখানে নির্বিঘ্নেই পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে পারব। উদ্যম ফিরে এলো আবার। কিন্তু একদিনের ছোট্ট একটি ব্যাপারে আমার সব উৎসাহ-উদ্দীপনা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। রীতিমতো অসুস্থই হয়ে পড়লাম।  সকালেই রান্নার কাজ শেষ করে ফেলেছি। এখানে কয়েক মাসের সংসারে বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জমে গেছে। সেগুলো ঝুড়িতে ভরছিলাম ফেলে দেওয়ার জন্য। ইদানীং গরমের প্রকোপ কিছুটা কমে যাওয়ায় ঘরের জানালা খোলাই রেখেছিলাম। কাজ করতে করতে হঠাৎ দৃষ্টি গেল জানালায়। সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেলাম জমাট পাথর যেন। হাতের আঙুলটি নাড়াবার শক্তিও নেই যেন আর। দেখলাম রাইফেলধারী দুই জাঠ যুবক খোলা জানালায় মুখ বাড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে ঘরে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ার পরও তারা সরে গেল না। সেই রাতের গোলাগুলির পরে জাঠ যাযাবররা আমার কাছে রুটি খেজুর দিয়ে আপ্যায়ন করবার ভালোমানুষি চরিত্রটি হারিয়ে হয়ে উঠেছে দুর্ধর্ষ ভিলেন। আমার ঘরের জানালায় তাদের নিঃসঙ্কোচ উঁকি-ঝুঁকিতে এতো ভয় পেলাম। ভয়ে চিৎকারও করে উঠতে পারি না। বসেই থাকি। এক সময় তারা সরে গেল জানালা থেকে। তারপরও আমি নিষ্প্রাণ কাঠের পুতুলের মতো বসেই ছিলাম, উঠে জানালাটাও বন্ধ করতে পারিনি।

ঠিক এমনি ঘটেছিল অনেক বছর পর হানাদার পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী শহর ঢাকার মগবাজারে। সময়টা ছিল একাত্তর সালের জুন অথবা জুলাই মাস। পঁচিশে মার্চ-এর পর থেকে মগবাজারে বাড়িতেই বন্দী দিন যাপন ছিল আমাদের। ভুলেও ঘরে বাইরে যাই না, ঘরের জানালা খুলি না, সব সময় ঘরে আলো জ্বলে না। যেন বাইরে থেকে মনে হয় বাড়িটিতে জন-মানবের বসবাস নেই। শুধু আমরাই নই, ঢাকা শহরে যারা বাধ্য হয়ে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় বাস করছিল, আত্মগোপন করবার এই একটি পদ্ধতি ছিল সবারই। এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের আসা যাওয়া ছিল অনেক বাড়িতে, আমাদের বাড়িতেও। সুতরাং অতিমাত্রায় সতর্ক থাকতে হতো প্রায় সময় পরিবারকেই। ব্যতিক্রমও ছিল। ঢাকার বেশ কিছু বাঙালি বাড়িতে পাকিস্তান আর্মির অফিসারদের আসা-যাওয়া ছিল। আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তার ওপারের বাড়ির দোতলায় সপরিবারে থাকতেন ই. পি. আই. সির অ্যাকউন্টস সেকশনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা আতিয়র রহমান সাহেব। দিনে দুপুরে একদিন তাদের বাড়ির সামনে এসে থামল আর্মির জিপ। পাড়ায় সব বাড়িতেই নীরব আতঙ্ক তটস্থ করে তুলল সবাইকে। সে সময়ে কোনো বাড়িতে পাকিস্তানি আর্মির হানা মানেই গোটা পাড়ার জন্যই রোজকেয়ামত। ভয় পেয়েছিলাম সবাই। কি যেন কী ঘটছে আতিয়ার রহমানদের ভাগ্যে। ও বাড়ির পরে আবার কোন বাড়িতে হানা দেবে নরপিশাচরা কে জানে! পাড়ায় আর্মি ঢুকলে কোনো বাড়িই যে ছাড় পাবে না এ সত্য তখন আমাদের সবারই জানা। তেমন কোনো ঘটনাই ঘটে না। আগ্নেয় অস্ত্রের হিংস্র শব্দ বা কারো শেষ আর্তনাদ শোনা যায় না। এক মনে দোয়া দরুদ পড়তে থাকা আমরা জিপটি স্টার্ট নেওয়ার শব্দ শুনতে পাই। আমরা নিশ্চিত হই পাকিস্তান আর্মি এসেছিল হয়তো আতিয়র রহমান ও তার তরুণ ছেলেটিকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য (এ রকম প্রতিদিনই ঘটছিল ঢাকা শহরে। এ রকম হতে দেখেছি কালাতের যুদ্ধের পরে বেলুচিস্তানের কোয়েটা শহরে।)

অতি সাবধানে পর্দার ফাঁক দিয়ে তাকাই। অবাক হয়ে দেখি, আতিয়র রহমান সাহেব হাত তুলে হাসিমুখে বিদায় জানাচ্ছেন। ইউনিফরম পরা পাকিস্তানি অফিসারটিও হাসিমুখে সালাম দিয়ে বলছে, ফির মিলেঙ্গে ভাইয়া।

পরে আতিয়র রহমানের স্ত্রী রহস্যের জাল উন্মোচন করেন। আতিয়র রহমান পাকস্তিানে ছিলেন অনেক দিন, বেশ কয়েক বছর পাকিস্তান আর্মির অ্যাকাউন্টস-অডিট সেকশনে কাজ করেন। সেখানকার তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মীর ছোটভাই এই আর্মি অফিসারটি। বড় ভাইয়ের নির্দেশেই ঢাকায় পোস্টিং পেয়ে আসা ছোটভাই এসেছিল আতিয়র রহমানদের খোঁজ-খবর নিতে। পরে এই অফিসারটি প্রায়ই আসতেন আতিয়র রহমানের বাড়িতে। মাঝে মাঝে অন্য দু’একজনও আসতে শুরু করে তার সঙ্গে। এই নিয়ে পাড়ায় কিছুটা সন্দেহ দেখা দিলে মিসেস আতিয়র রহমান আমাকে জানাল যে, এরা তাদের চেনা অফিসার। এরা এখানে আসে বলেই এ পাড়ায় কোনো ‘রেইড’ হয়নি। আতিয়র রহমান না কি ওদের বলেছেন, এ পাড়ায় যারা থাকেন তারা সবাই ভালো লোক। এখানে কখনো কোনো ‘মুক্তি বাহিনী’র ছেলেরা আসে না। (কথাটা যদিও সঠিক ছিল না, অনেক মুক্তিযোদ্ধাই আমাদের এবং আরো দু’একটি বাড়িতে আসা-যাওয়া করতো।) আতিয়র ভাবি আমাদের আশ্বাস দিলেও আতঙ্কমুক্ত আমরা কেউই ছিলাম না। জুলাই মাসের দিকে পাকিস্তান আর্মি ঢাকার বাইরে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের চাপ মোকাবেলা করতে ব্যস্ত তখন ঢাকা শহরের রাস্তায় টহল দিত পাকিস্তান থেকে আনা পাকিস্তানি পুলিশ আর মিলিশিয়ারা। এরা ‘মুক্তির’ ভয়ে সহজে শহরের গলিঘুচিতে ঢুকত না। ফলে আমরা কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করবার অবকাশ পেয়েছিলাম। মাঝে মধ্যে বাইরেও গাড়ি নিয়ে বের হতে পারছিলাম। ’৭০-এর নির্বাচনের আগে মীজানুর রহমান অফিস থেকে ‘কার-লোন’ নিয়ে একটা গাড়ি কিনেছিল। গাড়িটার খুবই যত্ন নিত সে। পঁচিশে মার্চের পর থেকে গাড়ির যত্ন নেওয়ার কথা আমাদের মনেই ছিল না। প্রাণে বেঁচে থাকাই তখন বড় ছিল আমাদের কাছে। এক সময় মীজানুর রহমানের মনে হলো, গাড়িটাকে এত অবহেলায় ফেলে রাখা ঠিক নয়। পরিস্থিতির যদি আরো অবনতি হয় তখন এই গাড়ি নিয়েই আমাদের শহর থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। অফিসে যাওয়ার সময় বলে গেল, আলী হোসেনকে দিয়ে গাড়িটা ধুয়ে পরিষ্কার করে রেখ। আলী হোসেন আমার নানি বাড়ির পুরনো মানুষ। বছর খানেক আগে নানি মারা যাওয়ার পর থেকে আমাদের বাড়িতেই থাকছে। সারাদিন ঘুমোন আর আমার ছেলে তপুর সঙ্গে দুষ্টুমি করাই তার প্রধান কাজ। আলী হোসেনকে বললাম- আলি হোসেন ভাই, তোমার ভাইজান বলে গেছে গাড়িটা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে রাখতে। পারবে তো? খুশি মনেই পাইপের পানি দিয়ে গাড়ি ধোয়া শুরু করল আলী হোসেন। তার গাড়ি ধোয়ার বহর দেখে আমার তো মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। পাইপের পানিতে পোর্টিকোতে পুকুর তৈরি করে ফেলেছে। বাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসতে হলো আমাকে। আলী হোসেনের হাত থেকে পাইপ নিয়ে পানি দেওয়ার ভার আমিই নিয়ে নিলাম, আলী হোসেনকে বললাম স্পঞ্জ নিয়ে গাড়ির বডি আর চাকার ময়লা ঘষে তুলতে। ভালোই চলছিল গাড়ি ধোয়ার কাজ। কিন্তু যা আশাও করিনি, তাই-ই ঘটল। কোনো রকম আগাম জানান না দিয়েই হুস করে গলি দিয়ে এসে গেল এক আর্মির জিপ। বেলা এগারটায় সাধারণত এ পাড়ার পুরুষ মানুষরা থাকেন অফিসে। আতিয়র রহমানও বাড়িতে থাকেন না। এ সময় তার বাড়িতে আর্মি জিপ নিয়ে কেউ আসে না। আসে তারা বিকেলের পরে অথবা রাতে। তখন আমরা ভুলেও বাইরে আসি না, জানালার পর্দা একই ইঞ্চিও ফাঁক করি না।

আমার অবস্থা তখন অবর্ণনীয়। হাতে ধরা পাইপ থেকে পানি পড়েই যাচ্ছে, হাঁটু পর্যন্ত শাড়ি ভিজে জবজবে হয়ে উঠছে। কোনোই খেয়াল নেই আমার। নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

আলী হোসেন চেঁচামেচি শুরু করেছে- আপা মেলেটারি, মেলেটারি। কোনো জবাব নেই আমার।

যে আর্মি অফিসারটি জিপ ড্রাইভ করে গলিতে ঢুকেছে, সেও অবাক হয়ে দেখছে আমাকে। হয়তো আপাত স্ত্রীলোক শূন্য ঢাকা শহরের এক গলিতে একজন বাঙালি মহিলাকে এমনভাবে পাইপের পানিতে ভিজে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য তার কাছে অবিশ্বাস্যই মনে হয়েছিল। জিপ আতিয়র রহমানের গেটে থামিয়ে ‘ফুল ইউনিফরমের’ অফিসারটি সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলে হুঁশ ফিরলো আমার। পানির পাইপ ফেলে এক ছুটে ঢুকে গেলাম বাড়ির ভেতরে। সারা শরীর ভীষণ-কাঁপছে তখন আমার। সেই একাত্তরের দুঃসময়ে আমার যে বয়স, সেই বয়সী বাংলাদেশে সব নারীদের কাছেই পাকিস্তান আর্মির একজন জওয়ান থেকে শুরু করে সর্বাধিনয়াক লে. কর্নেল নিয়াজী পর্যন্ত সবাই ছিল দুরাচারী বিভীষিকা। ভীষণ আতঙ্কে কাটল দিন। সন্ধ্যায় আতিয়র রহমানের মেয়েকে ডেকে এনে আর্মি অফিসারটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল, ও উনি তো মেজর সিদ্দিক চাচা। খুব ভালো মানুষ, আব্বার পুরনো বন্ধু।

ভয়াল সেই পঁচিশে মার্চের রাতের পর থেকে পাকিস্তান আর্মির সদস্যরা আমাদের কাছে ভালো মানুষ অথবা মানুষ অর্থে আর পরিচিত নয়, তারা সবাই তখন দুর্ধর্ষ ভিলেন-সারিগের অস্ত্রধারী জাঠদের মতোই।

আমার জানালায় দুই জাঠ পশুপালকের হানা দেওয়ার খবরটি ডাক্তার সাহেব গুরুত্বই দিলেন না। বললেন, বাড়িটা তো এতদিন খালি পড়েছিল। জানালা-দরোজা বন্ধই থাকত। জানালা খোলা দেখেই হয়তো দেখতে এসেছিল,  কারা এলো এই বাড়িটিতে। যুক্তিটা মনঃপুত হয় না আমার। এখানে থাকছি তো কবে থেকেই। আজ কেন হঠাৎ লোকগুলো কৌতূহলী হবে। ডাক্তার সাহেব অভয় দেন- নিশ্চিন্ত থাকেন ভাবি, ডাক্তারের বাড়ির এলাকায় কোনো অঘটন ওরা ঘটাবে না। ওরা দাঙ্গাবাজ হলেও, খারাপ লোক নয়। মীজানুর রহমান তো ব্যাপারটা উড়িয়েই দিল। তার ধারণা সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতে থাকতে আমি না কি অবাস্তব কাল্পনিক দৃশ্য দেখতে শুরু করেছি।

সেদিনও সে ক্লাবে চলে গেল তাস খেলতে। সন্ধ্যার পর সব ঘরের দরোজা জানালা এঁটে একাই বসে থাকলাম। সারাক্ষণ মনে হলো সকালের জাঠ পুরুষ দু’টি যে কোনো সময় দেয়াল টপকে ঢুকে পড়বে বাড়িতে। রাইফেলের গুলিতে দরোজা ঝাঁজরা করে ফেলবে।

ঢাকায় পঁচিশে মার্চের পরের রাতগুলোতে যে আতঙ্ক আমাদের ভয় দেখাত, তেমন ভয়ের অভিজ্ঞতাই হয়েছিল আমার সারিগের সেই রাতে। সে রাতে মীজানুর রহমানও ফিরতে দেরি করছিল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ও বাড়ছিল আমার। হ্যারিকেনের সলতে কমিয়ে চারপাশে বই ঘিরে ঘর অন্ধকার করে রাখলাম। বাইরে বাতাসের শব্দেও ভয়ে অসাড় হতে থাকলাম। প্রচণ্ড গরমেও খাটের তোষক, চাদর গুটিয়ে তার ভেতরে ঢুকে বসে থাকলাম। টেবিল ঘড়ির টিক টিক শব্দেও আতঙ্ক হচ্ছিল। ঘড়িটাকে কম্বলে মুড়িয়ে রাখলাম। মীজানুর রহমান ফিরল রাত দশটার পরে। ততক্ষণে আমি তোষক মুড়িয়ে থাকার ফলে ঘেমে নেয়ে একাকার, ভয়ে মুখ দিয়ে কথাও ফুটছে না।

এরপর থেকে ক্রমেই অসুস্থ হতে থাকলাম। হার্টবিট অস্বাভাবিক বাড়তে থাকল। হাত পা বরফের মত ঠাণ্ডা থাকে সারাক্ষণই। রাতে একেবারেই ঘুমোতে পারি না। ড্রিপেশানের চাপে, নার্ভাস ব্রেক ডাউন হওয়ার মতো অবস্থা।

ডাক্তার সাহেবই মীজানুর রহমানকে বললেন- ভাবিকে কোয়েটায় নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে দেন। ভালোভাবে চেক আপ করা দরকার।

অবশেষে সারিগ ছাড়লাম। ফিরে এলাম কোয়েটায়। কোয়েটার চেনা পরিবেশে ক্রমেই সুস্থ হয়ে উঠলাম। পরের সপ্তাহেই দাদা এলো আমাকে কালাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares