ধা রা বা হি ক  : পঞ্চম  প র্ব

আত্মজীবনী

দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়ি

রিজিয়া রহমান

এগার

সারিগের মরুভূমিতে হানিমুনের আনন্দ খুব বেশি দিন স্থায়ী হয় না। ক্রমে সব কিছু নিরানন্দে বিবর্ণ হয়ে ওঠে। বৈরী আবহাওয়া আমার নতুন ভুবন আবিষ্কারের সব উচ্ছ্বাসকে শুষে নিতে থাকে।

চরাচরজুড়ে জ্বলে উঠেছে অগ্নিবাণ হানা ভয়াল গ্রীষ্ম। দিনের তাপমাত্রা ঊর্ধ্বমুখী হয়েই চলেছে। সারাদিন বইতে থাকে ধুলোর মেঘ উড়িয়ে আনা আগুনের হল্কা ছড়ানো ‘লু’ হাওয়া। মরুভূমিতে সাধারণত রাতগুলো শীতল হয়, কিন্তু সারিগের রাতগুলোতে থাকে অসহনীয় গরম। সন্ধ্যার পর তাপ বিকিরণের ফলেই হয়তো মাটি আগ্নেয়গিরির মতো উত্তাপ উদ্গীরণ করতে থাকে। ডাক্তার সাহেব একদিন বলছিলেনÑ এই প্রচণ্ড গরমে আপনারা ঘরে ঘুমোতে পারছেন কী করে। ডাক্তার সাহেবের বাড়ি মাটির তৈরি। মাটির দেয়াল, মাটির ছাদ, এখানকার আবহাওয়ার উপযোগী, অতিরিক্ত রোদের তাপ আর শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা করে। তারপরও না কি তাদের চারপাইয়া বিছিয়ে উঠোনেই ঘুমোতে হয়। মীজানুর রহমানের ইচ্ছে রাতে বাইরেই ঘুমোবে, আমি রাজি হই না। ফলে জ্বলন্ত তন্দুরের মতো ঘরে প্রায় না ঘুমিয়েই রাত কাটছিল।

সাইদুজ্জামান সাহেব সপরিবারে বাংলাদেশে চলে গেছেন ছুটি কাটাতে। কলিয়ারির কলোনিতেও আর যাওয়া হয় না। মীজানুর রহমানও মাইনে কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, ফিরতে তার প্রায়ই দেরি হয়। ইদানীং তাস খেলার পুরনো অভ্যাসটিও তার ফিরে এসেছে। বিকেল না হতেই ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে চলে যায় কলিয়ারির অফিসার্স ক্লাবে তাস খেলতে।

তাসের নেশাটি রপ্ত করেছে সে কোয়েটায় এসেই। চাকরিতে যোগ দিয়ে তাকে আমেরিকান জিওলজিস্ট ড. রেইনিমন্ডের তত্ত্বাবধানে কাজ করতে হয়েছে অনেক দিন। সেই সময়টা একটানা কেটেছে তার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে-ক্যাম্পে। প্রতিদিন আট ঘণ্টা ক্লাইম্বিংয়ের পর ক্যাম্পে ফিরে স্বজন বান্ধবহীন জনবিরল পার্বত্য পরিবেশে কিছুই করার থাকত না তরুণ শিক্ষানবিশ ভূ-তত্ত্ববিদের। সময় কাটাবার জন্য তখন তাস খেলার বিনোদনটির সংযোজন ঘটায় ভারতের হায়দ্রাবাদের ছেলে ভূতত্ত্ববিদদের ফরহাদ হোসেন। আমি তখনো কোয়েটায় আসিনি। মীজানুর রহমানের কাছেই শুনেছি, ফরহাদ হোসেনের ছিল ভীষণ তাস খেলার নেশা। তার স্ত্রী মাঝে মাঝে ক্যাম্পে গিয়ে থাকতেন। সে সময়েও যথেষ্ট আধুনিকা মহিলা ছিলেন মিসেস ফরহাদ। জিন্স আর টি-শার্ট পরে (গোঁড়া গ্রাম্য পাঠানদের রীতি-নীতি অগ্রাহ্য করেই) পাহাড়ে ক্লাইম্বিং করতে যেতেন, তাস পেটানোতেও তারও উৎসাহ কিছু কম ছিল না। এসব মীজানুর রহমানের কাছেই শোনা। পরে বয়কাট চুলের স্মার্ট মহিলাটির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমার। হায়দ্রাবাদি অভিজাত পরিবারের আদব-কায়দাদুরস্ত শরাফতের মানুষটিকে (যদিও তিনি উর্দুর চেয়ে ইংরেজি বলতেই পছন্দ করতেন।) খাস ভারতীয় খানদানি মুলসমান ঘরের মেয়েই মনে হয়েছিল।

কোয়েটায় আমাদের সংসার শুরু হওয়ার পরও মীজানুর রহমানের তাসের নেশাটি পুরোদমেই বহাল ছিল। সন্ধ্যায় সোররেঞ্জ কোল মাইন থেকে ফিরতে না ফিরতেই এসে যেত তাস খেলার পার্টনার লায়েক সাহেব আর গাফ্ফার সাহেব, মীজানুর রহমানের আফিসের সহকর্মী দু’জন। আসত বাঙালি ভূ-তত্ত্ববিদ কোরেশী, মীজানুর রহমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী আমেরিকান শেল কোম্পানির জিওলজিস্ট মোমিনুল হক। সদ্য সংসার করতে এসেছি তখন, স্বামীর এ হেন নেশার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবার মতো ব্যক্তিত্ব তখনো তৈরি হয়নি। বসার ঘরে চা পৌঁছে দিয়ে চলে যেতাম জামমীর সাহেবের বাড়িতে। সালমা আপা, তাহেরা, খালেদা, ফজিলাদের সঙ্গে গল্প করতাম, চা খেতাম। মাঝে মাঝে ওদের সঙ্গে বেড়াতেও চলে যেতাম। অনেক সময় ঘরে ফিরে দেখতাম তাসের আড্ডা চলেছে তখনো। অসুবিধা হতো শীতের রাতগুলোতে, মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রায় শহর জমে যেত। রান্নাঘরে যাওয়া-আসা করা কষ্টসাধ্যই ছিল। রাতের খাবার-দাবার নিয়ে আসতাম ঘরে। ফায়ার প্লেসের পাশে রেখে অপেক্ষায় থাকতাম। অপেক্ষাটা অনেক সময় ক্লান্তিকর হয়ে উঠতো। তবে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল জাম মীর খানের বাড়ির বিরাট লাইব্রেরিটি। সেখান থেকে পছন্দসই বই বেছে বেছে নিয়ে আসতাম। ফায়ার প্লেসের ধারে চেয়ারে বসে পড়তে থাকতাম। মীজানুর রহমানের সেই তাসের নেশার কারণেই পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত বই পড়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। তাসের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই ছিল না হয় তো আর।

কিন্তু সারিগে এসে প্রতিবাদী হলাম। মীজানুর রহমানের তাস খেলতে যাওয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধই ঘোষণা করলাম। বিকেলে সে যখন ক্লাবে যাওয়ার জন্য তৈরি হতো, তাকে আমার তখন পথিবীর নিষ্ঠুরতম মানুষ মনে হতো। রাগা-রাগি কান্না-কাটি কোনো কিছুতেই যখন ফল হলো না, তখন জানিয়ে দিলাম, ‘তুমি ইচ্ছে করলে ক্লাবে সারা রাত তাস খেলতে পার, কিন্তু আমি আর এখানে থাকতে পারব না। থাকলে নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব।’ মীজানুর রহমান হাসে- পাগল আর কাকে বলে। মাত্র ঘণ্টা দেড়েক ক্লাবে কাটাই, সেটাও যদি বন্ধ কর … এত গল্প কবিতা লিখছ, ছবি আঁকছো বোঝ না, মানুষের জীবনে বিনোদনের আনন্দ না থাকলে তার কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়।

মীজানুর রহমান অনেক কথাই বলে, আমি কিন্তু নাছোড়বান্দাই- হয় তাস খেলা ছাড়, না হয় আমাকে সারিগ ছাড়া করে দাও।

মীজানুর রহমানের মতে আমার এই একগুঁয়েমিটা ছেলেমানুষী ছাড়া আর কিছুই নয়। সে তখন আমাকে  বোঝাতে শুরু করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে প্রতিদিন কয়লার খনিতে নামতে হয়।

সারিগে তাকে সেফটি ল্যাম্প, গ্যাস মাস্ক কিছুই এখনো দেওয়া হয়নি, যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। রিস্কেই কাজ করতে হচ্ছে রোজ। কিছুটা রিক্রিয়েশান না হলে বিপজ্জনক চাকরিটা করবে সে কীভাবে! এরপর আমার বলবার কিছু থাকে না।

সারাদিনের তাপদগ্ধ বিজন ভূমি আমাকে বন্দী করে ফেলে। সন্ধ্যার পরে নৈঃশব্দ্যের স্তব্ধতায় ঝিম ধরে থাকে সব কিছু। নিজের নিঃশ্বাসটাও নিজে শুনতে পাই। একটি মাত্র হ্যারিকেনের অপর্যাপ্ত আলোই আমার সঙ্গী হয়ে থাকে। আমাদের বাড়ির সঙ্গেই ডাক্তার শফিকুর রহমানের কোয়ার্টার। সেখানে থাকেন সদ্য বিয়ে হয়ে আসা ডাক্তার সাহেবের অল্প বয়সী স্ত্রী। নোয়াখালির গ্রামাঞ্চলের মেয়ে, নোয়াখালির ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা জানেন না। উর্দু, পশতু, ব্রোহী, বেলুচ ভাষা বোঝেন না, তবু তার কৃতিত্ব, নিজস্ব ভাষাতেই পাঠান বাবুর্চি ও কাজের ছেলেটিকে দিয়ে ইশারায়- ইঙ্গিতে রান্নার আর ঘরের কাজগুলো করিয়ে নিতে পারেন।

তাদের জার্মান শেফার্ড কুকুর টমি, আর অ্যালসেশিয়ান জ্যাকিকে নিয়ে মাঝে মাঝে আসেন তিনি আমাদের বাড়িতে। অনেক গল্প করেন। দেশের কথা, মা বাবা ভাই-বোনের কথা বলতে বলতে চোখ মোছেন। প্রায় কিশোরী মেয়েটির জন্য দুঃখ বোধ করি। কিন্তু তার সঙ্গে গল্প জমে না আমার। সন্ধ্যায় তাকে নিয়ে দুই একদিন হাঁটতে বেরিয়েছি। সেটাও বন্ধ করতে হলো। গরম পড়বার সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের গিরগিটি পাথরের তলা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। দেড় হাত লম্বা পাথুরে হলুদ রঙের গিরগিটিরা যখন তখনই পায়ের সামনে পড়ে। এখানকার লোকে বলে বিদঘুঁটে চেহারার ওই সরীসৃপগুলো ভীষণ বিষাক্ত। কামড়ালে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে না কি মানুষ বা পশু যেই হোক মারা যাবেই। গিরগিটি ছাড়াও দেখা দিচ্ছে বিষাক্ত বিচ্ছুরাও। ডাক্তার সাহেবের বাবুর্চি এদের সম্পর্কে আমাকে সাবধান করে দিয়েছে। এগুলোও না কি কম বিষধর নয়। এরপর সন্ধ্যার পরে ভুলেও বাইরে যাই না, ‘ঘরেই থাকি। অবসরে পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে চেষ্টা করি। তবু বিশাল এক নিঃসঙ্গতা ক্রমে ঘিরে ফেলে আমাকে। বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন হতে থাকি। এরপর দু’টি ঘটনা ঘটল, যেটা আমাকে সার্বক্ষণিক আতঙ্কগ্রস্ততায় ছুড়ে দিল।

চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares