ধা রা বা হি ক  : চতুর্থ পর্ব

আত্মজীবনী

দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়ি

রিজিয়া রহমান

আট

সারিগে নতুন বাড়িটার পরিবেশ প্রথম ক’দিন আমাকে ‘হলি-ডে’ মুডে উৎফুল্ল রাখল। যেন অচেনা কোনো পর্যটন স্পটে ছুটি কাটাতে এসেছি। আছি চমৎকার কোনো ‘মোটেল’ কিংবা ‘ডাক বাংলাতে’ সব ঘরের জানালার কাচে রঙিন ল্যান্ডস্কেপের ছবি হয়ে সেঁটে থাকে উত্তুঙ্গ পর্বতশ্রেণির চূড়া হলুদ গম খেত, পাহাড়ের কোলে মাটির দেয়াল ঘেরা বাড়ির, বাগান, আর বিশাল নীল আকাশ।

জানালার ওইটুকু প্রাকৃতিই যেন এক টুকরো শ্যামল স্নিগ্ধ মরুদ্যান, ওগুলো দেখতে দেখতেই সংসারের কাজকর্ম সারি। রান্না-বান্না করি। মীজানুর রহমানকে কয়লাখনির গাড়ি আসে ভোর না হতেই, তাড়াহুড়ো করে নাশতা সেরে মাইনে চলে যায় সে। ফেরে বেলা তিনটের পরে। তখন দুপুরের খাওয়া খাই। দু’জনের এই অস্থায়ী ছোট সংসারটিকে মনে হয় ‘ছোটবেলার চড়ুইভাতি’ খেলা। বেশ নতুন লাগে, নতুনত্বের স্বাদ উপভোগ করি দু’জনেই।

সারা দিন প্রায় একাই কাটে, ঘরে ঘরে ঘুরি, জানালায় দাঁড়াই। খেলার ছলে সংসারের কাজ সারি : গান গাই, ছবি আঁকি, পড়ার বইগুলো অবশ্য মাঝে মাঝে খুলে বসি, মন বসে না। ভেবে নিই, ফাইনাল পরীক্ষার তো আরো চার মাস বাকি মাইগ্রেশান সার্টিফিকেটের জন্য ঢাকায় চিঠি পাঠিয়েছি- ইউনিভার্সিটিতে মীজানুর রহমান বলে, পরীক্ষার ফরম ফিল-আপের আগেই পেয়ে যাবে। ও নিয়ে চিন্তা করো না, বরং পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে থাক।

কিন্তু এই নতুন ভুবনটিতে এত কিছু দেখার চেনার বুঝে নেওয়ার বিষয় ছড়িয়ে রয়েছে, পরীক্ষার জন্য পড়ার বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা অবান্তরই হয়ে যায়।

সারাদিন হু হু হাওয়া।

নিঃশব্দ বাতাসের গানে কখনো শোনা যায়, পাহাড়ের ধারে ঘাস খুঁজতে যাওয়া পশুপালের ঘণ্টার ধ্বনি, ভেসে আসে দূরবর্তী কাফেলার উটের পায়ের ঘুঙুরের শব্দ। দুপুরে একবার আসে সি বি থেকে রেলগাড়ি। পাহাড়ে পাহাড়ে শব্দের প্রতিধ্বনি বাজিয়ে ঢুকে পড়ে জরাগুণ পর্বত শ্রেণির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বোলান গিরিপথের ট্যানেলে। চলে যায় পরবর্তী স্টেশন খোস্টে। সেখান থেকে ফিরে এই সারিগের স্টেশন ছুঁয়ে দিয়ে আবার যাত্রা করে সিবির উদ্দেশে। বাইরের গেট খুলে দাঁড়িয়ে ইংরেজ শাসকের স্মৃতি বহনকারী রেলগাড়ি দেখি। কখনো দেখতে পাই বিশাল পাথুরে প্রান্তরের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলেছে উটের কাফেলা। দেখি, ক্যাকটাস আর বামুন তালগাছের ঝড়ের পাশে ব্রোহী যাযাবরদের তাঁবু। তাঁবুর সামনে ঘাঘরা পরা তরুণীর গাধাকে ঝরনায় পানি খাওয়াতে নেওয়া।

তার বুকের দু’পাশে দু’টি বিনুনি রঙিন ঘাঘরার আন্দোলন আর তামার অলংকার, জামার সোনালি চাকতিগুলোতে রোদের হিরণ¥য় ঝলক স্পষ্টই দেখতে পাই। দিগন্তজোড়া মরুময় পাথুরে প্রান্তরে অবাধ্য গাধাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার শক্তিময়তার আশ্চর্য ছবি হয়ে সেই বযাযাবর তরুণীটি আজো আমার মনে রয়ে গেছে।

মীজানুর রহমানের সহকর্মী আর এক মাইনিং জিওলজিস্ট অবাঙালি খুরশিদ একবার ওই রকম এক যাযাবর তরুণীর ছবি তুলতে গিয়েছিলেন তার ক্যামেরায়, প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত সেই ব্রোহী তরুণী না কি আগুনের মতোই ঝলসে উঠেছিল প্রতিবাদে।

কিন্তু আমার দেখা যাযাবর তরুণী কিন্তু আমার অন্তর্গত সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে দিয়েছিল। ‘অনন্য পৃথিবী’ নামের আমার জীবনের প্রথম গল্পটি লিখেছিলাম, ওই ব্রোহী যাযাবর মেয়েটিকে নিয়েই। সারিগে বসেই সেটা লিখেছিলাম।

আমার প্রথম গল্প সংকলন ‘অগ্নিস্বাক্ষরা’য় গল্পটি আজো রয়ে গেছে।

গল্পকার হিসেবে আমার আত্মপ্রকাশ সারিগে এসেই। সেখানেই লিখেছিলাম কয়লাখনির দুর্ঘটনায় নিহত এক মজুরের পরিবারের করুণ কাহিনি নিয়ে ‘কার্পেট’ গল্পটি। লিখেছিলাম সিন্ধু প্রদেশের অতীত সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ মহেঞ্জোদারোর পতনের ঘটনা নিয়ে গল্প ‘সিন্ধু-পতন’।

সারিগের প্রকৃতি, পরিবেশ প্রেরণা দিয়েছিল কয়লাখনির দেশীয় খ্রিস্টান ম্যানেজার নাথানিয়েলের স্ত্রীর অবৈধ সন্তান রোজার (যার জন্মদাতা ছিল একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা) কাহিনি যেটা সারিগ কয়লাখনির অতীতের এক ঘটনা ‘লালটিলার আকাশ’ লিখবার। এ গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করবার সময় রোকেয়া হল ম্যাগাজিনে। এই গল্প নিয়েই অশ্লীলতার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হয়েছিল আমাকে। অপ্রাসঙ্গিক হলেও ঘটনাটির উল্লেখ করবার ইচ্ছাকে দমন করছি না। ষাট দশকের শেষার্ধে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আমি, অর্থনীতিতে ফাইনাল পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছি। রোকেয়া হলের ছাত্রী সংসদের সাহিত্য সম্পাদিকা রওশন আমার কাছে একটি গল্প চাইলেন হল ম্যাগাজিনে ছাপাবার জন্য। কিছুদিন আগেই ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় প্রকাশিত আমার ‘সমুদ্র-প্রিয়া’ গল্পটি তিনি পড়েছেন, জানালেন তার ভালো লেগেছে।

লেখা-পড়ার চাপে তখন গল্প লেখার একেবারেই সময় নেই। ‘লালটিলার আকাশ’ গল্পটির কথাই মনে পড়ল স্যুটকেসে পুরোন কাগজপত্র ঘেঁটে সেটি পেয়ে গেলাম। দিয়ে দিলাম রওশনকে। এরপর গল্পটির কথা ভুলেই গেলাম লেখাপড়ার চাপে।

কিছুদিন পরে হঠাৎ একদিন সাংবাদিকতা বিভাগের এক ছাত্র এসে আমাকে জানাল, তাদের বিভাগের প্রধান আতিকুজ্জামান সাহেব আমাকে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন। আমি কখনো সাংবাদিকতায় লেখাপড়া করবার কথা চিন্তা করি নি। বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাস বিভাগে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলাম, অর্থনীতিতেও। আমার প্রিয় বিষয় অর্থনীতিতে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যাওয়ায় অন্যদিকে আর পা বাড়াই নি। ডিগ্রি পরীক্ষা পাসের মার্কশিটে বাংলা সাহিত্যে আমার ছিল রেকর্ড মার্ক আর ইতিহাসে প্রথম শ্রেণির, মীজানুর রহমানের ইচ্ছে ছিল তাই, আমি বাংলা সাহিত্য অথবা ইতিহাস পড়ি। রাজি হইনি। কিন্তু সাংবাদিকতা তো আমার পছন্দের তালিকায় ছিল না। আতিকুজ্জামান সাহেবের তলবে বিভ্রান্তই হয়েছিলাম। পরদিন অফ পিরিয়ডে গেলাম তার কামরায়।

আতিকুজ্জামান সাহেব আমাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন তুমিই রিয়া রহমান?

মাথা নাড়লামÑ জি স্যার।

ইশারায় তাঁর সামনের চেয়ারটি দেখিয়ে বললেন বস।

বসলাম ভয়ে ভয়েই। বুঝে উঠছি না কেন তিনি আমাকে ডেকেছেন। লক্ষ করলাম তার গম্ভীর চেহারাটি ক্রমে সহজ হয়ে উঠছে। প্রশ্ন করলেন- ‘লাল টিলার আকাশ’ গল্পটা তো তুমিই লিখেছ?

Ñজি স্যার,

হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে- খুব চমৎকার হয়েছে গল্পটা। ভালো লেগেছে আমার। ভাল তোমার লেখার হাত। এটাই কি তোমার প্রথম লেখা?

-না স্যার। আরো কয়েকটা লিখেছি। একটা গল্প ইডেন কলেজ ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল। আর দু’একটা ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছে।

স্যার মন দিয়ে শুনলেন, বললেন- তোমার ‘লালটিলার আকাশ’ ও রোকেয়া হল ম্যাগাজিনে ছাপা যেত কিন্তু…

সেই মুহূর্তে ‘লালটিলার আকাশ’ নিয়ে হয়ে উঠি। ভয়ে ভয়ে বলি- গল্পটায় কি কোনো অসুবিধা আছে?

আতিকুজ্জামান সাহেব হাসলেন, বললেন- আমি কোনো অসুবিধা দেখছি না, তবে সম্পাদকীয় বোর্ডের মেম্বার কেউ কেউ আপত্তি তুলেছেন, তাদের মতো গল্পটা অশ্লীল। ভীষণ অবাক হলাম। গল্পটি এক অবৈধ সন্তানের যন্ত্রণাময় জীবনের গল্প। সে জানত যে দেশীয় খ্রিস্টান ভদ্রলোকের বাড়িতে সে প্রতিপালিত তিনি তার বাবা নন, তার জন্মদাতা এক ইংরেজ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বড় হয়ে মেয়েটি মানসিক ভারসাম্য হারায়, শেষ পর্যন্ত সৎ বাবার নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়।

আতিকুজ্জামান সাহেবকে বললাম- স্যার গল্পটা আপনি তো পড়েছেন, আমাকে বলে দিন এর কোথায় অশ্লীলতা আছে।

তিনি বেশ খোলাখুলি কথা বললেন আমার সঙ্গে। জানালেন রোকেয়া হলের প্রভোষ্ট আখতার ইমামের প্রচণ্ড আপত্তি রয়েছে। তিনি মনে করছেন একজন স্বামী তার চাকরির উন্নতির জন্য নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে জোর করে রাত্রিযাপন করতে পাঠানোর ব্যাপারটাই অম্লীল। তাছাড়া গল্পটিতে ‘হুইস্কি’ মদের উল্লেখ রয়েছে। এ গল্প পড়ে রোকেয়া হলের কোমলমতি মেয়েরা না কি অশ্লীলতায় প্রভাবিত হবে। সুতরাং এমন গল্প মেয়েদের হল ম্যাগাজিনে ছাপানো যাবে না।

অশ্লীলতার অভিযোগ আমাকে এতই অবাক করল, কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলাম। তারপর বললাম- থাক স্যার। ওটা ছাপার দরকার নেই। গল্পটা আমি ফেরত নিতে চাই।

আতিকুজ্জামান সাহেব প্রস্তাব দিলেন- তুমি বরং এক কাজ কর অশ্লীল জায়গাগুলো কেটে বাদ দিয়ে দাও।

বুঝলাম তিনি চান গল্পটা হল ম্যাগাজিনে ছাপা হোক। আমার প্রিয় গল্পটির এই অহেতুক অপবাদ মেনে নিতে একেবারেই রাজি ছিলাম না। যথেষ্ট দুঃখ পেয়েছিলাম।

দুঃখ হচ্ছিল আমারই সৃষ্ট চরিত্র রোজার জন্য। তাকে খুব কম বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। একদিকে আইডেনটিটি সংকট, আর একদিকে নাথানিয়েলের অত্যাচার। জীবন বীতশ্রদ্ধ হয়ে যীশুর পদতলে আশ্রয় নেওয়ার জন্য অ্যাবোটাবাদের ক্যাথলিক চার্চে দীক্ষা নিয়ে ‘নান’ হতে গেল সে। নাথানিয়েল চেয়েছিল সোনালি চুলের নীল নয়না সৎ কন্যাটিকে ক্যাবারে ডান্সার তৈরি করতে।

তাকে জোর করে নিয়ে এসেছিল লালটিলায়, নানের শুভ্র পোশাক খুলে ছুড়ে ফেলেছিল, গলার চেইন, হলিক্রস চিহ্নিত লকেট হ্যাঁচকা টানে ছিড়ে জোর করে এক বোতল হুইস্কি ঢেলে দিয়েছিল রোজার গলায়। জোর গলায় প্রচার করেছিলÑ জারজ সন্তান কখনো নানা হতে পারে না, যীশুর পবিত্র প্রার্থনাগৃহ ঘৃণ্য জারজের জন্য নয়, ও হবে ক্যাবারে ডান্সার।

জানি না, এখানে কোন অশ্লীলতা আবিষ্কার করেছিলেন সম্পাদকীয় বোর্ডের প্রাজ্ঞ সদস্য। আতিকুজ্জামান সাহেব বললামÑ স্যার, যে মেয়েটি পবিত্র জীবন খুজছিল, তাকে অপবিত্রতায় ছুড়ে ফেলে দেওয়ার নিষ্ঠুর অমানবিকতাকে কি অশ্লীল বলা যায়? এ গল্পের বিষয় বদলানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

চলেই আসছিলাম। স্যার বললেন- বস, আমাকে তোমার সঙ্গে আলোচনা করবার ভার দেওয়া হয়েছে। সুতরাং আমার দিক থেকে কিছু সাজেশান তো থাকতে পারে।

কিছুটা ইতস্তত করে বললেন আবার- গল্প বদলাবার দরকার নেই, তুমি শুধু হুইস্কি শব্দটা বদলে দাও।

সেই বয়সে, এত বছর আগেও হুইস্কি শব্দকে অশ্লীল ভাববার মতো গোড়ামি বা বোকামি শুধু আমার কেন। অনেকেরই ছিল না।

আতিকুজ্জামান সাহেবের মতো পাশ্চাত্য সংস্কৃতি প্রভাবিত জাদরেল অধ্যাপকের হাস্যকর প্রস্তাব আমাকে দুঃখিত করলেও ক্ষুব্ধ করে নি, বুঝতে অসুবিধা হয় নি, যেভাবেই হোক গল্পটিকে নির্বাচিত করতে চেয়েছিলেন তিনি এবং অত্যন্ত আন্তরিকভাবেই। তাকে বললাম- হুইস্কি বদলে কোন শব্দ লিখব, আপনিই বলে দিন স্যার।

একটু ভেবে নিয়ে তিনি বললেন- ‘লাল পানি’ লিখলেন কেমন হয়?

হেসে ফেললাম- ‘লালপানি’ শব্দে কি অশ্লীলতার ইংগিত বেশি নয়? হাসলেন আতিকুজ্জামান সাহেব, তাও তা ঠিক। বরং এক কাজ কর, শরৎচন্দ্রের মতো করতে পার। শরৎচন্দ্র তার উপন্যাসকে অশ্লীলতার অভিযোগ থেকে বাচার জন্য কখনো ‘শালা’ লিখতেন না। শ-য়ে আকার লিখে ‘লা’ আর লিখতেন না, দিতেন একটা ড্যাশ (-) চিহ্ন। (যমন শা-) এমন উদ্ভট প্রস্তাবে জবাব দেবার কিছুই আর থাকে না আমার তরফ থেকে।

উঠে দাঁড়িয়ে বললাম- স্যার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়তে আসে তারা কেউ দশ-বারো বছরের বালক বালিকা নয় যে একটি মদের নাম পড়লেই তারা উচ্ছন্নে যাবে। থাক স্যার, ‘লালটিলার আকাশ’ হল ম্যাগাজিনে ছাপানোর চেষ্টা আপনি আর করবেন না।

আতিকুজ্জামান সাহেব আর কিছু বললেন না আমাকে।

কিছুদিন পরেই রোকেয়া হলের বার্ষিক পত্রিকাটি ছাপা হয়ে হাতে এল আমার। দেখলাম ‘লালটিলার আকাশ’ তাতে স্থান পেয়েছে। অবাক হয়ে দেখলাম সম্পাদনা বোর্ড হুইস্কি কেটে ‘হু-’করে দেয় নি। অবৈধ সন্তান রোজাকে বৈধ করবার জন্য তাদের আপত্তির অংশটিও বাদ দেওয়া হয় নি। গল্পটি রয়েছে অটুট। সম্পাদকীয় কলমের একটি আঁচড়ও পড়ে নি।

সহপাঠীরা অনেকেই বলল- দারুণ-দুঃসাহসী একটা গল্প হয়েছে।

এর ক’দিন পরেই বাংলা সাহিত্য বিভাগের ছাত্রী বীথি ভদ্র আমাকে এসে জানাল তাদের বিভাগের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী সাহেব আমাকে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন। পরদিন গেলাম বাংলা ডিপার্টমেন্টে। স্যার রুমেই ছিলেন, প্রথমে মাস্টারি নৈর্ব্যক্তিতায় ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করলেনÑ কি দরকার?

নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম। এলোমেলো ভাবেই বলে ফেললাম- আমি ইকোনমিক্স বিভাগের ছাত্রী। আপনি আমাকে আসতে বলেছিলেন তাই।

অবাক দৃষ্টি তুলে তাকালেন অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী- আমি বলেছিলাম আসতে?

কী নাম?

তড়বড় করে বলে ফেললাম- আমার নাম রিজিয়া রহমান… বীথি ভদ্র বলল…..

আমাকে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন তিনি, উজ্জ্বল হাসিতে উদ্ভাসিত হলেন- তুমি রিজিয়া রহমান? বস… বস। হ্যাঁ আমি তোমাকে আসতে বলেছিলাম।

বসে পড়লাম। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী রোকেয়া হল ম্যাগাজিনের সম্পাদনা বোর্ডের একজন সদস্য ছিলেন বলে জানালেন আমার গল্পটির অজস্র প্রশংসা শেষে বললেন- এই বয়সে এমন পরিণত একটি গল্প লিখলে কী করে। গল্পটা বাদ পড়ে যাচ্ছিল, আমি আর আতিকুজ্জামানের প্রতিবাদে গল্পটা ছাপা হল।

অনেকক্ষণ কথা বললেন তিনি। বললেনÑ এতো ভাল গল্প অনেকদিন পড়িনি।

কাহিনির প্রেক্ষাপটটি তো চমৎকার। এমন পটভূমি কোথায় পেলে?

বললাম- জায়গাটার নাম সারিগ, বেলুচিস্তানের সিবি আর কালাতের মাঝামাঝি জায়গায়? ওখানে যে কয়লাখনি রয়েছে। সেখানেই ছিলাম কিছুদিন। বিদায় নিয়ে চলে আসবার সময় মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী বললেন- আমার ছাত্র-ছাত্রীদের বলেছি গল্পটা পড়তে।

পরে বীথি ভদ্র আমাকে বলেছিল অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ওদের ক্লাস নেবার সময় ‘লালটিলার আকাশ’ গল্পের কথা বলেছেন। বলেছেন, এমন গল্প পূর্বপাকিস্তানের সাহিত্যে আর কেউ লেখেনি। এই মেয়ে অনেক বড় লেখা হতে পারবে।

(মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও আতিকুজ্জামান সাহেব আজ আর নেই। কিন্তু শখের বশে লিখে ফেলা আমার সেই গল্পটির জন্য তাদের বলিষ্ঠ ভূমিকায় আজো তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ আমি। গল্পটি সেদিন বাদ পড়ে গেলে। হয় তো অশ্লীলতার অপবাদের ভয়ে আর কোথাও ছাপতে দিতাম না। হয় তো হারিয়েই যেত।)

আমার লেখক হয়ে ওঠার নবিশির সময় তাদের প্রশংসা যে আমার সাহিত্যিক পথ চলায় কতখানি সহায়ক হয়েছিল, তখন না বুঝলেও এখন বুঝি।

নয়

সারিগের উদার প্রকৃতি সম্ভবত আমার সৃজনশীলতার পরিধিও বিস্তৃত করে দিল। এখানে এসেই গল্পকার হিসেবে                আবিষ্কার আমার। শুধু গল্পই নয়, লিখতে শুরু করলাম ছড়া। যা লিখবার চিন্তা ছিল আমার স্বপ্নেরও অতীত।

এক সকালে যখন মীজানুর রহমান চলে গেছে কাজে। খালি বাড়িতে যথারীতি আমি গান গাইতে গাইতে ঘরের কাজ সারছি, হঠাৎ মনে হল দিনটা আজ ভারি চমৎকার। আকাশ, পাহাড় গম ক্ষেত নুড়ির প্রান্তর অনেক বেশি উজ্জ্বল। ঝলমলে সোনালি রোদ পাহাড়ের চূড়া থেকে বেঁধে চকোর আর ছোট ছোট পাখিরা নেমেছে গম ক্ষেতে। প্রান্তরজুড়ে হুটোপুটি খেলে বেড়াচ্ছে স্বাধীন হাওয়া, প্রান্তরের বাতাসে পশুপালের গলার ঘণ্টাধ্বনি। মনের মাঝে ছুটোছুটি করতে শুরু করল- না, গল্প নয়, কবিতাও নয়, ছড়া। মজার ছড়া।

বসে গেলাম খাতা কলম নিয়ে, লিখলাম প্রথম ছড়াটি

ওপাড়ার বেলিটা

একেবারে বুদ্ধু

কাঁচা বেল খেয়ে ফেলে

আঠা-খোলা শুদ্ধু

বইখাতা চেটে দেখে টক

                         টক নাকি মিষ্টি

কলম চিবিয়ে খায়, কি যে অনাসৃষ্টি

এরপর লেখা শুরু করলাম রাজা কাহিনি অনাসৃষ্টি। অর্থাৎ ছড়ায় রাজার গল্প। রোজই লিখি নুতন নতুন রাজার ছড়া। যেমন-

বোকা রাজা বদ্যি ডেকে বললে,

ওহে কন তো,

অষ্ট প্রহর অবশ কেন

বদ্যি বলে অনেক ভেবে

কঠিন জটিল রোগ যে

এমন রোগে বিশেষত

বাঁচে না আর লোক যে।

শুনেই রাজা মূর্চ্ছা গেলেন

দু’হাত চেপে বক্ষে

কান্নাকাটি উঠল বেজায়

রাজার সভা কক্ষে…।

লিখলাম আর এক রাজার কাহিনিÑ

বোকাদের রাজা বলে

মাথা চুলকিয়ে

জল আন এক ঘটি

ফরমাশ দিয়ে

খাজা-গজা খাব না তো

খিদে নেই আজ

জল দাও ফরমাশি

থাক সব কাজ।

কথা শুনে উজিরের

গেল মাথা পুরে

জল-ঘটি দেওয়া যায়

যত খুশি চাই…

ফরমাশটাই শুধু বোকাপুরে নাই।

রাজার ছড়ায় ভরে ওঠে খাতা।

লিখতে থাকিÑ

এক যে রাজ, ভারি মজা

থাকেন না রাজ বাড়িতে

পায়ে হেঁটে চলেন তিনি

চড়েন না তো গাড়িতে,

বন্ধুর পার্বত্য ভূমির দেশে বসেই লিখলাম অপুষ্টি আক্রান্ত বাংলাদেশের আট বছরের শিশু মহারাজার কথাÑ

… নাম তার মহারাজ

করে মিনতির কাজ

বসে থাকে কাজারের গলিতে

আম জাম জামরুল

লাল লিচু পাকা কুল

বয়ে নেয় সাহেব থলিতে,

‘মিন্তি লাগব স্যার?

মুখ ভরা হাসি তার

‘ছুটে আসে, সবাইকে ছাড়িয়ে

আসেন আসে স্যার কাদাটা করাই পার’

রোগা-কাঠি হাত দেয় বাড়িতে।

ওপরের ছড়াগুলো বেশ বড় এখানে সামান্য অংশই উদ্ধৃত করলাম। এসব ছড়া পরে ঢাকার পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল (বইভুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য হয় নি বলেই অন্ধকারে হারিয়েছিল, শিশু একাডেমিতে পড়ে আছে পাবলিশারের গুদামে)

সারিগে বসবাস আমাকে গল্প ছড়া লিখতে ছাড়পত্র দেয় নি কেবল, ছবি আঁকার হাতটিও খুলে দিয়েছিল। ছবি আঁকার নেশা আমার ছেলেবেলা থেকেই। সারিগে এসেই আমার ঝোঁক গেল পেন্সিল স্কেচের দিকে। সূত্রপাতটা কোয়েটাতেই আমার প্রিয় মুবদার পাহাড়কে কেন্দ্র করে। মুবদার পাহাড়ের অনেক সেচ আমি করেছি, তাতে শিক্ষানবিশের অপরিপক্বতা ছিল, সারিগের প্রকৃতি আমার স্কেচের উত্তরণ ঘটাল। সেখানে প্রকৃতিই আমাকে শিল্পের জগতের দুয়ার খুলে দিয়েছিল।

দশ

সারিগ কালিয়ারির কালোনি আর আমাদের নতুন বাসস্থানের পরিবেশে কিছুটা ভিন্নতা ছিল, ওখানে ছিল লোকজনের চলাচল, কয়লা খনির গাড়ির আসা যাওয়ার শব্দ বিকেলে কলোনির মাঠে শিশুদের ছুটোছুটি খেলার কলরব, বেশ একটা সজীব লোকালয়ের পরিবেশ। আর এখানে যেন এক নিধুয়া পাথারে বসবাস আমার। এমন জনবিরল নির্জনতা, এত বিশাল নিস্তব্ধ প্রকৃতি আর কখনো দেখি নি; দেখি নি, এমন অজস্র উজ্জ্বল নক্ষত্রময় রাতের বিশাল আকাশ, দেখিনি, শুক্লপক্ষের অপূর্ব জ্যোৎস্না। মরুজ্যোৎস্নার রহস্যময়তার কথা পড়েছি বইপত্রে। পূর্ণিমার দিগন্তপ্লাবী আলোর সমুদ্র সারিগেই কেবল দেখেছি।

তাকে আঁকা, ছবিতে ধরে আনা যথেষ্ট কঠিন কাজ হলেও সেটাই দাঁড়িয়েছিল আমার নেশা।

রোববার মীজানুর রহমানের ছুটির দিন। প্রায় প্রতি রোববারেই চলে যেতাম জামান সাহেবের বাসায়। মাঝে মাঝে থেকেও আসতাম। ছবি আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে যেতাম সঙ্গে। বিকেল না হতেই বেরিয়ে পড়তাম। ঝর্ণার ধারে লাল ঝাউয়ের ছায়ায় পাথরের চাঙ্গাড়ের ওপরে বসে আঁকতাম ছবি। দূর থেকে আসা ঝর্ণা ধারাটি জলঘাসের আড়ালে মিষ্টি বোলে বয়ে যেত। ঝর্ণার সেই গান শুনতে শুনতেই আঁকতাম ছবি।

আঁকতাম ঝর্ণা পাহাড়ের সারি, দূরের ল্যান্ডস্কেপ চলমান উটের সারির দৃশ্য। জামান সাহেবের স্ত্রী সকিনা ভাবি প্রায়ই সঙ্গী হতেন আমার। মানুষটি চমৎকার। নিপুণ গৃহিনী তিনি, স্বামী সন্তান সংসার অন্ত প্রাণ। এই পাণ্ডববর্জিত দূরান্তের দেশে এসেও কোন অভিযোগ নেই তার। মন দিয়ে করেন সংসার, স্বামী সন্তানের সেবা অবসরে উল বোনেন, ফ্রেমে আটা কাপড় এমব্রয়ডারির লতাপাতার নকশা সেলাই করেন। কলেজে পড়ার সুযোগ হয় নি, তার আগেই বিয়ে-সন্তান। মফঃস্বলের মেয়ে ঘোর সংসারি মানুষটির চমৎকার রোমান্টিক মনটির খোঁজ আমি পেয়ে গিয়েছিলাম। অল্প ক’দিনেই তার সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছিল আমার, সেটা অটুট ছিল অপরাহ্ন বেলার জীবন অবধি। আমার খামখেয়ালি অভিযানের সঙ্গী হতে দারুণ উৎসাহ ছিল তার। ঝরণার ধারে উঁচু পাথরে আর লাল ঝাউয়ের ছবি আঁকি, ভাবি বসে থাকেন আমার পাশে বলেনÑ ঝরণার শব্দ শুনতে ভীষণ ভাল লাগে। তার এই কথাতেই উদ্বুদ্ধ হয়ে বিপজ্জনক এক ঘটনা ঘটিয়ে হঠাৎ তাকে একদিন বলি চলুন না ভাবি দেখি আমি পাহাড়ি এই ঝর্ণাটা কতদূর থেকে বয়ে আসছে! প্রথমে খুব অবাক হন সফিনা ভাবি, বলেন, মাথা খারাপ! অতদূরে কি যাওয়া সম্ভব! ঝর্ণা তো ওই পরস্তন পাহাড় থেকে নেমে এসেছে।

উৎসাহ বাড়ে আমার- তাহলে তো ভালই হবে। এত কাছে জরগুন পাহাড়, ওখানে যায়া হয় নি একদিনও। এতদিন কেবল টিলায় টিলায় ঘুরে বেড়িয়েছি।

মাঝে মাঝে বিকেলে আমরা আশেপাশের টিলার চড়াই উতরাইগুলোতে ওঠা-নামা করি। মীজানুর রহমান আর জামান সাহেব ঘরে তাস খেলতে বসেও নজর রাখে।

সেদিন কলোনির দারোয়ান লালগুল খান দূরের গ্রাম থেকে একজোড়া মোরগ কিনে এনেছে জামান সাহেবের জন্য মহাখুশি জামান সাহেব। ঠিক করেছেন রাতে মুরগি ভুনা আর খিচুড়ি রান্না হবে। মীজানুর রহমান ঘোষণা দিল, রান্নাটা সে-ই করবে। মীজানুর রহমানের ধারণা সে খুব ভাল রান্না করতে পারে।

জামান সাহেব রান্নায় পারদর্শিতার দাবি না করলেও বলেন- আজকের রান্না আমার দুই বন্ধুতে করব। আপনারা বেড়িয়ে আসুন।

আমরা যখন ঝর্ণার উদ্দেশ্যে বাইরে আসি তারা দু’জন তখন রান্নার জোগাড় নিয়ে রান্নাঘরে মহাব্যস্ত। মীজানুর রহমান চৌচিয়ে বলে দেয় তোমরা ফিরেই দেখবে রান্না কমপ্লিট। টেবিলে রাতের খাবার রেডি।

সফিনা ভাবির ঝর্ণার উৎস খুঁজতে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও ইতস্তত করলেন বলেন- ওদিকে দুই কর্তাা রান্না করতে বসেছেন। রান্নাঘরে কোথায় কী আছে খুঁজে না পেলে হুলস্থূল করবে। আজ না হয় থাক, ঝরণা খুঁজতে যাওয়ার প্ল্যান। অন্য একদিন যাওয়া যাবে।

তাকে বুঝিয়ে স্বমতে আনতে দেরি হয় না আমার। বলি- ঝর্ণার পাড় ধরে হেঁটে গেলে বেশি সময় তো লাগবার কথা নয়, তাড়াতাড়িই ফিরে আসা যাবে।

জামান সাহেবের তিন বছরের মেয়ে শেলু আর দুই বছরের ছেলে বাবুর হাত ধরে শুরু হয়ে গেল আমাদের পর্বত অভিযান, ডা. লিভিংস্টোনের মতে ঝর্ণার উৎস অনুসন্ধানের অভিযাত্রা কিন্তু পাহাড়ের দূরত্বের বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না। মনে হয়েছিল এই তো কাছেই পাহাড়। কিন্তু যতই হাঁটি, পাহাড় দূরেই থেকে যায়, কাছে পৌঁছনোর পথ ফুরোয় না। চড়াই উৎরাইয়ে ওঠা-নামা করতে করতে পা ধরে আসে। বাবু বায়না ধরে -আম্মু কোলে নাও।

শেলি এতক্ষণ আমাদের আগে আগেই লাফিয়ে ছুটোছুটি খেলতে খেলতে এগিয়ে চলেছিল। সেও উদ্যম হারায়, বসে পড়ে বলে Ñআম্মু বাসায় চল।

সফিনা ভাবিও ক্লান্ত, কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত, বলেন- সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পাহাড়ে পৌঁছতে মনে হয় রাত হয়ে যাবে। রাত করে ওদিকে না যাওয়াই ভাল। চলুন ফিরে যাই। শেষ বিকেলের রোদ ম্লান হয়ে এসেছে। সূর্য নেমে চলেছে দিগন্ত রেখার দিকে। পাহাড়ের বিশাল ছায়া নামছে খোলা প্রান্তরে। কিন্তু আমি যেন তখন নেশাগ্রস্ত। পাহাড়ের ফাটল বেয়ে নেমে আসা ঝর্ণা আবিষ্কারের নেশাই আমাকে হিতাহিত ভুলিয়ে দিয়েছে, নেশার ঘোরেই হয় তো বলি -ভাবি আপনি শেলু বাবুকে নিয়ে কোয়ার্টারে ফিরে যান। আমি একাই পাহাড়ে যাব। মনে হয় সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে যেতে পারব।

দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকেন সফিনা ভাবি, আর আমি হনহন করে হাঁটতে শুরু করি পাহাড়ের দিকে। তারপরই থেমে যেতে হয় আমাকে। শুনতে পাই কুকুরের ডাকাডাকি। দেখতে পাই সামনের চড়াইতে ওঠে আসছে উটের মুখের রশি ধরে কালো পাগড়ির ঝুলা মুখ ঢাকা দীর্ঘকায় এক জাঠ যাযাবর পুরুষ, তার পেছনে ওঠ গাধার পিঠে সংসারের লটবহর চাপিয়ে এগিয়ে আসছে যাযাবরদের ছোট-খাট কাফেলা। তাদের ঝাপড়া লোমের বিকট দর্শন পাহারাদার কুকুরগুলোও রয়েছে সঙ্গে।

কয়েক পলক বোকার মতই নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। তারপরই বুঝতে পারি, আমরা বিপদগ্রস্ত। কলোনির বাড়ি ফেলে এসেছি পেছনে অনেকটা দূরে। দু’টো ছোট বাচ্চাকে নিয়ে পেছন ফিরে ছুট লাগানোও সম্ভব নয়। শেলি ভয় পেয়ে আমার পেছনে লুকিয়েছে। বাবু মায়ের গলা জড়িয়ে কান্না জুড়েছে।

ভাবিকে বলি- আর দাঁড়িয়ে থাকবেন না, পেছন ফিরে ছুটতে শুরু করেন, দেখছেন না ওদের এক পাল কুকুর কীভাবে তেড়ে আসছে আমাদের দিকে!

সফিনা ভাবি বুদ্ধিমতী, বললেন- ভুলেও দৌঁড়বেন না। কুকুরগুলো আরো তেড়ে আসবে, ভয়ংকর পাজি ওগুলো। দাঁড়িয়েই থাকেন, তাতে বরং কুকুরের হাত থেকে কাচতে পারবেন। যমদূতের মতো হিংস্র চেহারার কুকুরের দল আমাদের লক্ষ করেই ডাকতেই থাকে।

উটের কাফেলা বেশ কাছেই চলে এসেছে। কাফেলার অধিনায়ক হাত তুলে ধমক দিয়ে কুকুরগুলোকে 

থামাতে চেষ্টা করছে। তাতে তাদের আক্রমণাত্মক আগ্রাসন কমে গেলেও দাঁত মুখ খিঁচিয়ে আমাদের ধমক ধমক দিয়েই চলেছে। কাফেলার প্রায় মুখোমুখি তখন আমরা। দু’জন নারী ও কয়েকটি শিশুর হাওদা বহনকারী উটটি আমাদের একেবারে সামনে এসে যায়, উটের রশি ধরে হেঁটে আসছিল যে পুরুষটি আমাদের দেখে সম্ভবত : অবাকই হয়। হাত নেড়ে কী কী সব প্রশ্ন করতে থাকে। তাতে বলিÑ তোমাদের কুকুরগুলোকে সরাও। দেখছ না, আমাদের বাচ্চারা ভয় পাচ্ছে।

লোকটি আমার কথা বুঝল না, কী কী সব বলেই চলল। অনুমান করলাম, হয় তো সে জানতে চাইছে, আমরা কে? কোথা থেকে এখানে এলাম।

সফিনা ভাবিই হঠাৎ সপ্রতিভ ভঙ্গিতে বলে উঠল- কান্… কান…। অফিসার… অফিসার।

এখানকার লোকেরা কয়লাকে, কয়লার খনি-কে যে কান, বলে মনে পড়ল এতক্ষণে। ইশারায় নিজেদের দেখিয়ে, কলিয়ারির কলোনির দিকে আঙুল তুলে বার বার বললাম- দাগা, কান্… মা অফিসার… জানানা।

লোকটি বোধহয় বঝল। তার দৃষ্টি থেকে এতক্ষণে- প্রশ্নের-বিস্ময় মুছে গেল। আমাদের অবাক করে দিয়ে পশতু আর ভাগ ভাগ উর্দুতে বলল- চল, তোমাদের আমাদের ডেরায় নিয়ে যাব, মেহমানদারি করব।

ভীষণ ভয় পেলাম। চোখে পড়ল তার পিঠে ঝুলান রাইফেলের মাথা। কী যেন কী মতলব… যাযাবরটির। আগে একদিন ব্রোহী যাযাবরদের ডেরায় যাওয়ায়, মীজানুর রহমান আমাকে জাট যাযাবরদের ভয় দেখিয়েছিল, ওরা নাকি নিজেরাই রাইফেল তৈরি করে। পিঠে রাইফেল বেঁধে ভেড়া-দুম্বা চরায়। পশু পালে নেকড়ে বা পাহাড়ি চিতা হামা দিলে যেমন গুলি ছুড়তে দেরি করে না, তেমনি দরকার হলে মানুষকে গুলি করে মারাও তাদের কাছে ডাল-ভাত। জাঠ যাযাবর সম্প্রদায়ের কাহিনি তারপরে অনেক শুনেছি, যাযাবরের সামনে এমন নিরুপায় অবস্থায় দাঁড়াতে হবে ভুলেও চিন্তা করি নি।

অবেলায় ঝর্ণার উৎস খুঁজতে বেরিয়ে পড়ার দুঃসাহসের জন্য নিজেকে অর্বাচীনই মনে হল। রেগে উঠলেন নিজের ওপরেই। এই জাঠ লোকটি যদি এখন আমাদের দিকে রাইফেল ত্যাগ করে বলে- ভালো চাও তো উঠে বস উটের পিঠে, ত্যাড়ামি করলে এখানেই সব ক’টাকে গুলি করে ফেলে রেখে যাব। রাইফেলধারী যাযাবরটির দিকে তাকালাম ভয়ে ভয়েই। কাল পাগড়ির ঝুলে চার মুখটি ঢাকা। ঘন জোড়া ভুরু নিচে শুধু চোখ দু’টোই দেখা যায়। দেখলাম, তার সবুজ চোখের তারায় কোনো বন্য হিংস্রতা নেই, আছে দয়ালু মানুষের সৌহার্দ্যরে কোমলতা। বুঝে নিলাম, লোকটিকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। সে বার বারই অনুরোধ করতে থাকল- চল তোমার, মেহমানদারি করব, তোমাদের ইজ্জত করব। ইশারায়-বিশারায় তাকে আমরা বুঝাতে চেষ্টা করি- আমাদের এখন বাড়ি ফিরতে হবে বাচ্চাদের ঘুম পেরিয়ে, খিদে পেয়েছে, বাড়ি ফিরবার জন্য কাঁদছে ওরা।

লোকটি বুঝল। উঠের পিঠে বসে থাকা বয়স্ক মহিলাটিকে কী সব বলল চেঁচিয়ে মহিলাটি চামড়ার থলে থেকে কয়েক টুকরো রুটি আর এক মুঠো খেঁজুর বের করে দিলে লোকটির হাতে। শেলির দিকে খাবার ঘুলো বাড়িয়ে দিয়ে হাসি ভরা আদরের কণ্ঠে বার বার বলল- নাম নান, জোতি, শাকুর। ওখরে, ওখরে, (রুটি, মিষ্ট, খাও খাও) লোকটির ভাঙা পশ্ত বুঝতে অসুবিধা হল না। আমাদের শেলিও বুঝল। লাল গুল খানের কাছে সে পশ্তু বলতে শিখেছে। আমাদের ভয় শেলির মাঝেও সংক্রমিত হয়েছিল, বোধহয়। খাবার নিল না সে, আমার হাঁটুতে মুখ গুজে শুরু করল কান্না।

হাত বাড়িয়ে আমি নিলাম রুটি আর খেজুর বললাম- শোকরিয়া, শোকরিয়া। বুঝাতে চাইলাম, রুটি আর মিষ্টি খেঁজুরের জন্য শুকরিয়া।

মুখের ওপর থেকে পাগড়ির ঝুলের নেকাব সরিয়ে জাঠ পুরুষটি বন্ধুত্বের হাসি হাসল। ডুবন্ত সূর্যের দিকে একবার আঙুল তুলে আমাদেরকে ইশারায় বলল- যাও, সূর্য ডুবছে, অন্ধকার নামছে। ঘরে চলে যাও। ভয় কেটে গেছে আমাদের, বাচ্চা দুটোকে নিয়ে ফিরে চললাম নিশ্চিন্তেই।

তারাও আর দাঁড়াল না? এক পাল পশু আধা ডজন ঝাঁকড়া লোমের পাহারাদার কুকুর আর উট গাধার বহর নিয়ে চলে গেল দূরের টিলার দিকে। নিরাপদে বাড়ি ফিরলাম আমরাও। মীজানুর রহমান বা জামান সাহেব কেউই আমাদের সেই বিপজ্জনক অভিযানের কথা জানতে পারেনি, তাদের কিছুই বলিনি আমরা।             (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares