ধা রা বা হি ক  : তৃ তী য়  প র্ব

আত্মজীবনী

দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়ি

রিজিয়া রহমান

বেলুচিস্তানের গ্রামাঞ্চলের সঙ্গে কিছুটা পরিচয় আগেই হয়েছিল। কিন্তু সারিগের মতো এমন জনবিরল মরুময় পার্বত্য এলাকায় কখনো থাকা হয়নি। (যদিও গোটা বেলুচিস্তানের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে মরুলক্ষণ আক্রান্ত সমভূমি ও বন্ধুর পার্বত্য আধিপত্য।)

সারিগ কয়লাখনির কর্মচারীর কর্মকর্তাদের নতুন আবাসগৃহগুলো তখনো তৈরি হয়নি, অস্থায়ী কোয়ার্টারগুলো ছিল মাটির ঘর। মাটির দেয়াল, মাটির ছাদের সেই ঘরে ঢুকলে মনে হয় ঘর নয়, আধ-অন্ধকার কোনো গুহাই যেন, বিজলি বাতি নেই, রাতে হ্যারিকেন জ্বালাতে হয়। কলের পানির ব্যবস্থাও নেই। সপ্তাহে দু’দিন কয়লাখনির গাড়ি এসে পানি দিয়ে যায়। দু’মাইল দূরের ছোট বাজারটিতে পাওয়া যায় কেবল দুম্বার মাংস (মাছ তো স্বপ্নেরও অতীত) আর দূরাঞ্চলের গ্রাম থেকে আসা কিছু সবজি, তা নিয়মিত নয়। চাল, আটা, তেল, নুন ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আসে সিবি থেকে। বাজারের দোকানে সে সবেরও সংকট দেখা দেয় মাঝে মাঝে।

সাইদুজ্জামান সাহেব বললেন, আপনারা অল্প দিনের জন্য এসেছেন, রান্নাবান্না এসবের ঝামেলায় গিয়ে কাজ নেই। আমার বাসায় একটা ঘর খালি রয়েছে, এখানে এসেই থাকেন।’ একটা রাত কাটিয়েই সেই মাটির গুহায়। সারা রাত বাতাসের হুম হুম গর্জন, আর নানা রকম অচেনা শব্দের উৎপাতে বারবারই বিঘ্নিত হয়েছে ঘুম। তারপর পাহাড়ের দিক থেকে অজানা কোনো অদ্ভুত একটানা শব্দে ঘুম একেবারেই ফেরারি। মীজানুর রহমানকে ডেকে তুলি, -এই ওঠ, ওঠ, শোনো পাহাড়ের দিকে কী যেন আওয়াজ করছে।

কাঁচা ঘুম নিয়ে উঠে বসে মীজানুর রহমান, এক পলক শোনে, নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ে আবার, বলে- হবে হয় তো হায়না, অথবা নেকড়ের আওয়াজ। ভয়ের কিছু নেই। ওরা চলাচল করে পাহাড়ের ওপরে, লোকালয়ে আসে না। এতদূরে নেকড়ে বা হায়নারা নেমে আসে না। শুয়ে পড়।

নির্বিঘ্নেই ঘুমিয়ে পড়ে মীজানুর রহমান। ভয়ে আতংকে কাঠ হয়ে বসে থাকি আমি। কয়েক বছর এদেশে দুর্ভেদ্য পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে ক্যাম্পে কাটাতে হয়েছে মীজানুর রহমানকে। হায়না নেকড়ের ডাক হয়তো অনেক শুনেছে। কিন্তু আমার তো এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা একেবারেই নেই। ভয়ে ক্ষোভে কেঁদে ফেলি Ñএ কোথায় নিয়ে এলে তুমি আমাকে! এখানে আমি আর একদিনও থাকব না। কালই চলে যাব ঢাকা।

আধ-ঘুমের মধ্যেই মীজানুর রহমান বলে, -কালকের ব্যাপার কাল দেখা যাবে। এখন আমাকে ঘুমোতে দাও তো। ভোরে উঠে আমাকে মাইনে যেতে হবে।

পরদিন জামান সাহেবকে ঘটনাটা জানালে তিনি হাসলেনÑ নেকড়ে-টেকড়ে নয়, সম্ভবত কুকুরের কান্না শুনেছেন!

অবাক আমি! কুকুরের ডাক কি আমি শুনিনি আগে! জামান সাহেবই বললেন- আমাদের কলোনির পেছনেই যাযাবররা এসে তাঁবু ফেলেছে। ওদের সঙ্গে অন্তত ছয় ডজন শিকারি কুকুর থাকে। সেগুলো নেকড়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ওদের কুকুরের ডাকই শুনেছেন কাল রাতে। ভয় পেলে আপনারা বরং আমাদের বাড়িতেই এসে থাকতে পারেন।

জামান সাহেবের প্রস্তাবে প্রাণে বেঁচে গেলাম যেন। কয়লাখনির এই অস্থায়ী কলোনিতে ম্যানেজারের বাংলো আর জামান সাহেবের বাড়িটিই বাসযোগ্য দেয়ালঘেরা পাকা বাংলা। সদ্য তৈরি, ঝকঝকে ফিটফাট। জামান সাহেব এখানে আছেন বছর খানেকের মতো। স্ত্রী ও ছোট দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে এই বিরান জগতে বেশ মানিয়ে নিয়েছেন। জামান সাহেবের পরিবারের সঙ্গে তখন যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল আমাদের, সেটা পরে হয়েছিল দীর্ঘমেয়াদি। জামান ভাবী মারা যাওয়া পর্যন্ত সেটা অটুটই ছিল। হারনাই উলেন মিলের সেলস অফিসার লতিফ সাহেবও মীজানুর রহমানের বিশেষ বন্ধু হয়ে ওঠেন। তাদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠবার বিশেষ কারণও ছিল। একই প্রতিষ্ঠানে (পিআইডিসিতে) একই সময়ে তিনজনের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ, বয়সেও তিনজন ছিলেন কাছাকাছিই, একই বছরে তিনজন ম্যাট্রিক পাস করেছেন। এবং তিনজনই ছিলেন সৎ অফিসার।

আমাদের এই তিন পরিবারের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা ও আত্মীয়-সম বন্ধন গড়ে উঠেছিল তা আজও অক্ষুণ্ন্নই রয়েছে।

ষাটের দশকে ‘পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। ইপিআইডিসি অর্থাৎ ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের বাঙালি কর্মকর্তা হিসেবে মীজানুর রহমান, সাইদুজ্জামান সাহেব ও লতিফ সাহেবকে চলে আসতে হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অর্থাৎ বাংলাদেশে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন ছোট ছোট আরো কয়েকটি কর্পোরেশনে বিভক্ত হয়ে যায়। মীজানুর রহমান নিয়োগ পান প্রথমে ‘অয়েল অ্যান্ড গ্যাস’-এ (পরে যেটি পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড গ্যাস নামকরণ হয়।)

সাইদুজ্জামান সাহেব গেলেন ‘ফুড অ্যান্ড অ্যালায়েড’ কর্পোরেশনে, পরে স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। লতিফ সাহেবের পোস্টিং হল কেমিক্যাল কর্পোরেশনে। (তিনজনই পরে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা হয়ে অবসরে, যান।) মীজানুর রহমানের ব্যাপারটি ছিল কিছুটা ভিন্ন মাত্রার, হয় তো সে উপলব্ধি করেছিল, বাংলাদেশে ভূতাত্ত্বিক জরিপের অনুসন্ধানে আবিষ্কৃত খনিজ সম্পদের উত্তোলনে উন্নত মাইনিং ব্যবস্থা একান্ত জরুরি। সে মনে করতো, পশ্চিম পাকিস্তানে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়নের কাজ যতখানি গুরুত্ব পেয়েছে পূর্ব পাকিস্তান সেটা পায়নি। সরকারি জিওলাজিক্যাল সার্ভে অব পাকিস্তান বা পাকিস্তান ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (যেটা অবিভক্ত ভারতে ছিল জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া) কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থাকায়, পূর্ব পাকিস্তানে আবিষ্কৃত খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রেগুলির উন্নয়নে অগ্রগতি হয়নি। সেগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় দীর্ঘদিন নথিপত্রেই বন্দি হয়ে ছিল। এমনকি তিতাস গ্যাস ফিল্ড সিলেটের গ্যাস যতখানি অগ্রগতি পাওয়ার প্রয়োজন ছিল সেটাও হয়নি। বিশেষ করে মিনারেলস বা খনিজ সম্পদ (কয়লা, লাইমস্টোন, হার্ড রক) ক্ষেত্রের এক্সপ্লোরেশন ড্রিলিংয়ের গুরুত্ব আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল। এ ক্ষেত্রে প্রাদেশিক সরকারের তেমন ভূমিকা ছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ নিয়ে ভীষণ উৎসাহী হয়ে ওঠে মীজানুর রহমান। নিজে ছিল সে খনিজ ভূতত্ত্ববিদ, বিদেশে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের খনিতে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল তার, হয় তো সেই কারণেই বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ উত্তোলনের জন্য উন্নত মাইনিংয়ের প্রয়োজন উপলব্ধি করেছিল মীজানুর রহমান। বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ উন্নয়নের জন্য আলাদা একটি কর্পোরেশন তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা প্রায় সে বলতো। মীজানুর রহমান ছিল উদ্যমী দেশপ্রেমিক মানুষ। অনেক ঘোরাঘুরি লেখালেখি করে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে মিনারেলস এক্সপ্লোরেশন  অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন তৈরির কল্পনাকে বাস্তব রূপে এনে ফেলল সে। সিলেটের সুনামগঞ্জ, বাঙালিবাজার, টেকেরঘাট, খুলনা, জয়পুরহাট, জামালগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর গোপালগঞ্জের জলিরপাড় প্রায় সমগ্র বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের ব্যাপক সার্ভে ড্রিলিং ও উন্নত মাইনিংয়ের পরিকল্পনা এসে গেল নতুন কর্পোরেশনের আওতায়। ময়মনসিংহের বিজয়পুরের হোয়াইট ক্লে, কিংবা সিলিকন বালি যেমন তার চিন্তার সুদূরপ্রসারী ছিল, তেমনি অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে রেডিও অ্যাকটিভ মিনারেলসের সম্ভাবনা নিয়েও স্বপ্ন ছিল তার।

অনেক সময় রাগ করে বলতাম বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ আর খনি উন্নয়ন ছাড়া কি আর কিছু নেই তোমার জীবনে?

হাসতো মীজানুর রহমান, বলতো- যেদিন বাংলাদেশের কয়লা দিয়ে এ দেশেই পেট্রল তৈরি হবে, সেদিন বুঝবে। এইটুকু অন্তত বুঝেছিলাম সে একজন স্বপ্ন দেখা মানুষ, স্বপ্ন তার দেশকে নিয়ে।

কয়লা থেকে পেট্রল তৈরির বিষয় নিয়ে কিছু লেখালেখিও শুরু করেছিল মীজানুর রহমান। তার একান্ত অনুসারী আর একজন ছিল। বাংলাদেশ মিনারেলস এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের সিনিয়র মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার নাজির আহমেদ। সে ষাটের দশকে যখন দ্বিতীয় দফায় মীজানুর রহমানকে আবার সারিগ কয়লাখনিতে যেতে হয়েছিল, (আমিও গিয়েছিলাম তার সঙ্গে)। তখনি লাহোরের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে নাজির আহমেদ এসে সারিগ কলিয়ারির চাকরিতে যোগ দিয়েছিল। সেই ছিল সেখানে প্রথম বাঙালি মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার। আমরা একই বাড়িতে ছিলাম। তখন থেকেই নাজির আহমেদ মীজানুর রহমানের একান্ত বাধ্য অনুগত ভক্ত।

ক্রমে আরো অনেক মেধাবি ভূতত্ত্ববিদ ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার সে খনিজ উন্নয়ন কর্পোরেশনে যোগ দেয়। এদের অনেকেই এ পেশাকে নেহাতই চাকরি হিসেবে দেখেছে। একমাত্র নাজির আহমেদই ছিল মীজানুর রহমানের ভাবশিষ্য।

খনিজ সম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখত যে মানুষটি, আশাভঙ্গের হতাশা নিয়ে কর্পোরেশন ছাড়তে হয়েছিল সেই স্বপ্ন হারানো মানুষটিকে। এবং তা দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণেই। দুর্ভাগ্য বৈকি! মীজানুর রহমানের না কি এদেশের মানুষের অথবা দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির কে জানে! এসব স্বপ্নভঙ্গের কাহিনি এখন আমার বিষয় নয়। ফিরে যাই ষাট দশকের পাকিস্তানি প্রদেশ বেলুচিস্তানের পার্বত্য পরিবেশে।

সেই সময়ে সেই পঞ্চাশ ষাট দশকে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলিতে জনসাধারণের জন্য স্বাস্থ্যসেবাটি প্রচলিত দেখেছিলাম। পাকিস্তান মেডিকেল সার্ভিসে কর্মরত পশ্চিম পাকিস্তানি ডাক্তাররা এইসব দুর্গম বিজন অঞ্চলে যেতে পছন্দ করতেন না, সুতরাং পূর্ব পাকিস্তানি বাঙালি ডাক্তারদেরই সেখানে নিয়োগ দেওয়া হতো। সারিগেও একজন বাঙালি ডাক্তার ছিলেন। সেখানকার সরকারি ডিসপেন্সারিটি ছিল কোলিয়ারির কলোনি থেকে দু’মাইল দূরে। সেখানেই থাকতেন বাঙালি ডাক্তার শফিকুর রহমান সাহেব। দেশি মানুষের টানে মাঝে মাঝে আসতেন তিনি জামান সাহেবের বাসায়। আমাদের আসবার খবরে দেখা করতে এলেন তিনি। আমাদের সঙ্গে একদিন কথায় কথায় তিনি জানালেন, তার বাড়ির পাশেই ডাক্তারের জন্য নতুন যে কোয়ার্টারটি তৈরি হয়েছে, সেটা খালিই পড়ে আছে। আমরা ইচ্ছে করলে সে বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারি। মীজানুর রহমান দেখে এলো বাড়ি। বাড়ি তার পছন্দ হয়েছে। দুই বেডরুম আর ড্রইংরুম ছাড়াও আছে চওড়া বারান্দা, অ্যাটাস্ট বাথরুম, কিচেন ও কলের পানির সুবিধা এবং উঁচু দেয়ালে ঘেরা নিরাপত্তা। এমন জায়গায় এমন একটি বাড়ি পাওয়া স্বপ্নেও ভাবা যায় না।

মীজানুর রহমানের সঙ্গে গেলাম বাড়ি দেখতে, পছন্দ হয়ে গেল আমারও। দু’দিন পরেই চলে এলাম নতুন বাড়িতে। বিছানা-পত্তর, রান্নার হাঁড়ি-কড়াই ও কিছু প্লেট-বাটি ইত্যাদি কোয়েটা থেকে নিয়ে এসেছিলাম। ডাক্তার সাহেব তার হাসপাতালের রোগীদের জন্য কেনা নতুন একটি লোহার খাট দিলেন ব্যবহারের জন্য। সেটাই হলো আমাদের নতুন বড় বাড়িটিতে একমাত্র শৌখিন আসবাব। তবু দু’দিন লাগলো গুছিয়ে বসতে। নতুন জায়গায় এসে প্রথমে যেসব ভয় ছিল, সেসব ধীরে ধীরে কেটে গেল। মীজানুর রহমান একদিন বললÑ সারা দিন তো কোনো কাজ নেই। বইপুস্তকগুলো সঙ্গে নিয়ে এসেছো পড়বার সময় তো হয়নি। এবার লেখাপড়ায় মন দাও। পরীক্ষাটা যাতে দিতে পার।

সাত

বিয়ের জন্য লেখাপড়া শেষ করতে পারিনি। ব্যাচেলর ডিগ্রি না নিয়েই চলে আসতে হলো পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায়।

মীজানুর রহমানই বলল একদিন- সারাদিন একা থাক, বরং লেখাপড়াটা শুরু কর। মীজানুর রহমানই আমাকে নিয়ে ভর্তি করে দিল কোয়েটার সরকারি গার্লস কলেজে। অধ্যক্ষা বললেনÑ ঢাকা ইউনিভার্সিটির অধীনে সেখানকার সিলেবাসে এক বছর পড়ছো, পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির সিলেবাস ভিন্ন, ফলো করতে পারবে কি? বরং ফার্স্ট ইয়ারে ফ্রেস অ্যাডমিশান নিয়ে নাও। তাতে রাজি নই আমি, বললামÑ মিস্, আমাকে চান্স দিয়ে দেখেন, আমি পারব। এক বছর নষ্ট হয়েছে আমার, আরো একটা বছর নষ্ট করতে চাই না।

অধ্যক্ষা পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ নন, দেশ ভাগের পরে এসেছেন। দিল্লির এক কলেজে ইতিহাস প্রভাষিকা ছিলেন। হাসলেন, বললেনÑ বেশ, দেখো চেষ্টা করে। তবে ফাইনাল পরীক্ষার আগে তোমাকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাইগ্রেশান সার্টিফিকেট আনিয়ে নিতে হবে। ওটা না হলে, পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি তোমাকে পরীক্ষা দিতে দেবে না। শুরু হয়ে গেল আমার ছাত্রজীবন আবার। আমাদের প্রতিবেশী লাশবেলার নবাব পরিবারের মেয়ে খালেদা কোয়েটা সরকারি গার্লস কলেজের ছাত্রী। ওর সঙ্গেই শুরু করলাম কলেজে যাওয়া। পাড়ার মিয়াখানের টাঙ্গায় আমি, খালেদা, কুদসিয়া, নুসরাত আর মুশরাত যাই কলেজে। কুদসিয়া মীজানুর রহমানের সহকর্মী সর্দার আলী আকবর খানের বড় ভাইয়ের মেয়ে। আমাদেরই পাড়ায় তারা থাকেন। কাবুলের রয়্যাল ফ্যামেলির আত্মীয় এই মাহমুদজায়ী পরিবারটির আভিজাত্যের খ্যাতি আছে টাঙ্গার সহযাত্রী দুই পাঞ্জাবি মেয়ের মধ্যে মুশরাত থাকত আমাদের পাড়ার কাছেই। ওর বাবা সরকারি কর্মকর্তা। 

মুশরাতদের বাড়ি বেশ দূরেÑ চেনার রোড়ের অভিজাত এলাকায়। চেনার রোডকে অনেকে বলে ‘ঠান্ডি সড়ক’। ঝকঝকে ফিটফাট এলাকা। বড় রাস্তার দুই ধারে দীর্ঘ চেনার গাছের সারি। বসন্তে সজীব ছায়াচ্ছন্নতা ঘিরে থাকে প্রায় নির্জন সড়কটিকে। শীতের তুষারপাতে চেনারের সারি অন্য এক শুভ্র সৌন্দর্যের ছবি হয়ে যায়, কোয়েটা শহরে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বলতে তখন ছিল টাঙ্গাÑ একঘোড়ায় টানা গাড়ি, কোনো পাবলিক বাসের চলাচল ছিল না। সরকারি কর্মকর্তা আর অবস্থাপন্ন কিছু লোকদের নিজস্ব মোটরগাড়ি অবশ্য ছিল। সমুদ্র সমতার পাঁচ হাজার ফিট উচ্চতায় অবস্থিত হিল স্টেশান কোয়েটা শহর ছিল যানজট ও পরিবেশ দূষণমুক্ত চমৎকার একটি পাহাড়ি উপত্যকা, একদিকে চিলতান রেঞ্জের টানা পাহাড়ের সারি, আর এক দিকে মুরদার রেঞ্জের আকাশ ছোয়া গৈরিক পর্বতশ্রেণী, মাঝখানে কোয়েটা ভ্যালি, বসন্তের অপার সবুজ আর অজস্র নানা রঙের ফুলে হয়ে ওঠে মনোরম, শীতে তুষারের চাদরে সেই বর্ণাঢ্য প্রকৃতির বাগানটি লুকিয়ে পড়ে শুভ্রতার গাম্ভীর্যে।

কলেজে যাওয়ার পথে প্রতিদিন শহরটিকে প্রাণ ভরে দেখে নিই। মুশরাতের বাবা শহরের বড় ব্যবসায়ী, জিন্নাহ রোডের বেশ বড় কলের দোকানটি ওর বাবার। ঠান্ডি সড়কের ধারে বিরাট এলাকা নিয়ে ওদের বাংলো। অজস্র লতানো গোলাপের ঝাড়ে ঢাকা দেয়ালের প্রধান ফটকটি থেকে যে বিস্তীর্ণ ড্রাইভওয়েটি দিয়ে বাংলোর দ্বিতীয় প্রবেশদ্বারে পৌঁছতে হতো সেটাও ছিল সাদা আর লাল গোলাপের ঝাড়ে ঢাকা। মুশরাতের চেনার রোডের বিরাট এলাকার বাড়িটাকে দেখে প্রথম দিন আমার মনে হয়েছিল যেন কোনো অচেনা রাজ্যের দুর্গে ঢুকে পড়েছি। এই মুশরাতরাই কালাতের যুদ্ধের সময় বাড়িঘর ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপন করেছিল।

বেশ মনে আছে, মিয়াখানের টাঙ্গা কলেজে যাওয়ার পথে নুসরাত ও মুশরাতকে তুলে নিতে এসেছিল, ওরা কেউই বাড়ি ছিল না। মুশরাতদের বাড়ির গেটে তালা ঝুলছিল, মুশরাতদের প্রধান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল টিপে টিপে বিরক্ত হয়ে টাঙ্গাওয়ালা মিয়াখান বলেছিলÑ চিড়িয়া ভাগ গিয়া।’ আফগানি মেয়ে কুদসিয়া আর বেলুচ খালেদা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করে হাসছিল। খালেদাই আমাকে পরে বলেছিল পাঠান বেলুচদের ভয়ে পাঞ্জাবিরা শহর ছেড়ে সরে গেছে।’

কালাত শান্ত হলে সবাই আবার ফিরে এসেছিল। পাঞ্জাবি চরিত্রে যথারীতি বহালও হয়েছিল। ততদিনে জেনে গেছি বেলুচিস্তানের পাঠান বেলুচরা পাঞ্জাবিদের ঘৃণা করে। ঘৃণার কারণটি তখন না বুঝলেও এখন বুঝি। আসলে বিদ্বেষের কারণটিতে ছিল, অর্থনৈতিক বৈষম্য। যে বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ করে তুলছিল সেই বৈষম্যই বেলুচিস্তানে বিদ্রোহের সূত্রপাত করেছিল।

পাঞ্জাবি ছাত্রীরাই কয়েকজন কলেজে একদিন আমাকে নাজেহাল করে ফেলেছিল। অফ পিরিয়ডে কলেজের মাঠে বসে আড্ডা দেবার সময় তর্ক উঠে গেল আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যৌক্তিকতা নিয়ে। কুদসিয়া ও খালেদা আর আমার কাশ্মিরি সহপাঠী নাজিয়া এ বিতর্কে অংশ নেয়নি, হয় তো বন্ধুত্বের খাতিরেই। বাঙালিরা পাকিস্তানের ক্ষতি করছে, তারা দেশের উন্নতি চায় না, বাঙালিরা উর্দু ভাষাকে অপমান করেছে, ইত্যাদি অপমানকর বক্তব্যের আক্রমণে ক্ষুব্ধই হয়ে উঠছিলাম, যখন বলা হলো, বাঙালিরা অলস কর্মবিমুখ বলেই তারা গরিব, তাদের কোনো উন্নতি নেই। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা পরিশ্রমী দেশপ্রেমিক তাই তাদের এতো তরাক্কি। (উন্নতি)। পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে তারা অনেক বেশি এগিয়েছে তাদের নিজ গুণে। বাঙালিরা পাকিস্তান ধ্বংস করতে চায়, তারা ভালো মুসলমান নয়, কমিউনিস্ট, হিন্দুদের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব। এই জন্যই তো তারা ভুখা নাঙ্গা বাঙালি হয়ে আছে।

বাঙালিদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের এই প্রচলিত ধারণা সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতাই আমার তখন ছিল না, ভীষণ অপমানিত বোধ করেছিলাম। রেগে গিয়ে বলে বসলামÑ পশ্চিম পাকিস্তানিরা তো মুনাফেক, চোর, ধাপ্পাবাজ, পূর্ব পাকিস্তানের টাকা মেরে দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের কাজে লাগিয়েছে। (বিদেশি সাহায্যের প্রাপ্য অংশ, অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার বা রাজস্ব আয় বণ্টনের অসমতা কিংবা জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দের অসামঞ্জস্য ইত্যাদি এবং ‘টু ইকোনমি’ সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণাই তখন আমার গড়ে ওঠেনি। শুধু জানতাম পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা শোষিত, অবহেলিত।)

তুমুল বাদানুবাদ শুরু হয়ে গেল। পাঞ্জাবি ছাত্রীদের আগ্রাসন থেকে বাঁচাল  আমাকে কাশ্মিরী মেয়ে নাজিয়া আর কুদসিয়া। নাজিয়া উত্তেজনা তরল করবার জন্য হাসতে হাসতে বললÑ তোম সব কেয়া মার ডালাগে? কুদসিয়া আমাকে হাত ধরে টেনে ওঠাল- বলল- চল উঠ্ যা নাদান। ছোড় ইয়ে বাকোয়াজ। চল্, তুঝে ম্যায় আভি ক্যান্টিনমে চায় পিলাউঙ্গী। উত্তেজিত সবার দিকে তাকিয়ে বলল- ‘বাঙালিরা বালো লোক আছে।’

কুদসিয়া আমার কাছে বাংলা শেখে, বদলে আমাকে ফারসি ভাষা শেখায়। ফারসি উচ্চারণ একটি পুরো বাংলা বাক্য সবাইকে শুনিয়ে দিয়ে ও আমাকে ক্যান্টিনে চা খাওয়াতে নিয়ে যায়। নিচু শব্দে বলে- পাঞ্জাবিরা ভালো লোক নয়, ওদের সঙ্গে তুই পেরে উঠবি না। আমার বিশেষ পছন্দের দুই সহপাঠী দুই বোন নাজমা ও সালমা পাঞ্জাবি না হয়েও প্রচণ্ড বাঙালি বিদ্বেষী। ওদের বাবা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর, কিছু দিন আগেই বাংলাদেশের কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট থেকে বদলি হয়ে কোয়েটায় এসেছেন। বাংলাদেশে বেশ কিছুদিন ছিল সালমারা। বাংলা কথা বোঝে, কিছু কিছু বলতেও শিখে এসেছে। এখানকার ক্যান্টনমেন্ট ইস্কুলে পড়বার সময়ই বাংলা শিখেছে, ছোট বোনটি সালমা। নাজমা বলে আমি বাংলা শিখিনি, বাংলা শিখতে আমার ভালো লাগতো না।

ওরা দু’জনেই কুমিল্লার গল্প করতো আমার কাছে। বলতোÑ বাঙালিরা খুব গরিব।

ওদের পায়ে জুতো থাকতো না, ছেঁড়া ময়লা কাপড় পরে রাস্তায় ঘোরে। এতো গরিব কেন তোমাদের দেশের মানুষ?

সালমাই বলতো বেশি, ওর বলার মধ্যে সহানুভূতি হয়তো কিছুটা থাকত, কতটুকু সেটা বুঝে উঠতাম না।

যখন ও বলতÑ নোংরা ছেঁড়া কাপড় পরা ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আমাদের বাসার গেটে এসে বলত ডিম রাখবেন আম্মা? আমাদের বাঙালি ব্যাট ম্যান ওদের বলতÑ এই তোরা আবার আইছস? ভাগ। সালমার গল্পগুলো খুব সুখকর হতো না আমার জন্য। অনেক সময় আমিও বলতামÑপাকিস্তান তো গরিব দেশই এই বেলুচিস্তানেরও তো ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ছেঁড়া কোট, ফাটা বুট পরে শীতের বরফ ঢাকা রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। অনেকের তো ঘরের ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বালাবার লাকড়ি বা কয়লা কিনবার পয়সাও জোটে না। সবজি মাংস কিনবার পয়সার অভাবে অনেকে শুধু কুড়ুয়া (কাল চা) আর পেঁয়াজ দিয়ে রুটি খায়। আমার কথা আমার এই দুই বন্ধু হয় তো বিশ্বাস করে না। ওরা ভারতের উত্তর প্রদেশের লোক। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ছিলেন ওদের বাবা। ৪৭-এর পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার হিসেবে এ দেশে এসেছেন। পাকিস্তানে সর্বোচ্চ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণী হচ্ছে সেনাবাহিনী। সেই সুবাদে ক্যান্টনমেন্টে আয়েশী বাড়িতে সুখ সুবিধার সাচ্ছল্যে ওদের বেড়ে ওঠা। পূর্ব পাকিস্তানের বা বেলুচিস্তানের গরিব মানুষের দারিদ্র্যের কারণ নিয়ে ওদের মাথাব্যথা নেই। তবে বাঙালিদের প্রতি তাদের এক ধরনের করুণা বা তাচ্ছিল্য আছে সেটা বুঝতে অসুবিধে হতো না আমার। পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসারদের অনেকেরই বাঙালিকে নিচু চোখে দেখার যে উন্নাসিকতা ছিল, সেনা কর্মকর্তা নাজমা-সালমার বাবাও হয়তো তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। হয়তো তার উন্নাসিকতা তার মেয়েদেরও প্রভাবিত করেছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশকে যে দৃষ্টিতে দেখত তারাও সেই দৃষ্টিরই অনুসারী হয়ে উঠেছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের বিষয়কে কেন্দ্র করে ’৭১ এর সেনাবাহিনীতে কর্মরত সিদ্দিক মালিকের লেখা, ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ এবং ‘৭১-এর ঢাকায় কর্মরত পাকিস্তান সুপিরিয়র সার্ভিসের কর্মকর্তা সাহান জাহিরের দ্য সেপারেশান অফ ইস্ট পাকিস্তান বই দু’টিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালিদের প্রতি এই তাচ্ছিল্য তারা যথার্থই তুলে ধরছেন। ‘বাঙালিরা বাক-সর্বস্ব, অকর্মন্য অপদার্থ জাত, পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণে উদাসীন বাঙালিরা এক দঙ্গল সন্তান উৎপাদন ছাড়া আর কিছুই উৎপাদন করতে পারে না, এমন উদ্ধত মন্তব্য করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অনেক অফিসার। এটা পড়ার পর আশ্চর্য হইনি আমি। আমার তখন পুরনো সহপাঠী সালমা ও নাজমার উন্নাসিক সেনা কর্মকর্তা বাবাকেই মনে পড়েছিল। যার কারণে তার মেয়েরা বাঙালিদের করুণা ও তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখতে শিখেছিল পরে হয়তো ঘৃণা করতেও কুণ্ঠিত হয়নি। নাজমাই আমাকে একদিন বলল রিজিয়া শাড়ি পরে তোমার কিন্তু কলেজে আসা ঠিক নয়। 

কলেজে শাড়ি পরেই যেতাম। শাড়ি পরে কলেজে আসতেন আর একজন তিনি অর্থনীতির প্রভাষক মিস মিনহাজ। মিস মিনহাজ ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় মুসলমান। ৪৭-এর পার্টিশানের পর পাকিস্তানে চলে আসেন।

অবাক হয়ে নাজমাকে প্রশ্ন করি- কেন নাজমা, কলেজে শাড়ি পরে আসা ঠিক নয় কেন?

নাজমা বলে- শাড়ি হিন্দুর ড্রেস। পাকিস্তানিদের পোশাক সালোয়ার কামিজ। আমরা পাকিস্তানি, পাকিস্তানিদের হিন্দু- পোশাক পরা উচিত নয়।

অবাকই হই। নাজমাকে বলিÑ এমন কেন মনে হলো তোমার? শাড়ি কেন কেবল হিন্দুর ড্রেস হতে যাবে! আমাদের দেশে সবাই শড়ি পরে। তারা তো অধিকাংশই মুসলমান। নাজমা তার যুক্তিতে অটল শাড়ি ইন্ডিয়ান মহিলাদের ড্রেস, তুমি পাকিস্তানি তোমার তো ইন্ডিয়ান ড্রেস পরা উচিত নয়। সালোয়ার কামিজই আমাদের ন্যাশনাল ড্রেস।

নাজমার ছোটবোন সালমা একদিন অফ পিরিয়ডে আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের কলেজের সামনেই রাস্তার ওপারে নাজমা-সালামদের বাড়ি, কোয়েটা সরকারি গার্লস কলেজ ছিল তখন কোয়েটা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মধ্যে। ওদের একতলা চমৎকার সাজানো-গোছানো বাড়িটি আমাকে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল সালমা। বসার ঘরে ওদের মায়ের শাড়ি পরা ছবি দেখে ফেলেছিলাম- তোমার মা তো দেখছি শাড়ি পরেন।

হাসল সালমাÑ শাড়ি পরেন তিনি আমার ড্যাডির সঙ্গে পার্টিতে যাওয়ার সময় কেবল, অন্য সময় নয়। শাড়ি তো পার্টির ড্রেস।

নাজমার মুরব্বিয়ানার জবাবে বলতে পারতাম তোমার মা একজন জাঁদরেল সামরিক অফিসারের স্ত্রী হয়েও ইন্ডিয়ান ড্রেস পরে অফিসার্স ক্লাবের পার্টিতে যেতে লজ্জিত বোধ করেন না নিশ্চয়ই।

কথাটা অভদ্রজনোচিত হবে ভেবেই বলিনি। শুধু বললাম শাড়িই আমার ন্যাশনাল ড্রেস।

আমি তো শুনেছি, ভারতের ইউপির (উত্তর প্রদেশ) হিন্দু মহিলাদের পোশাক ও সালোয়ার কামিজ। তাহলে সালোয়ার কামিজও কি হিন্দু পোশাক? নাজমা জবাব দেয় না।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে একমাত্র উর্দুই হওয়া উচিত এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত নাজমা। যদিও কলেজে তারা দুইবোন ইংরেজির মাধ্যমেই লেখাপড়া করত। ইংরেজির মাধ্যমে পড়তে হতো আমাকেও। অন্যান্য ছাত্রীরা পড়ে উর্দুর মাধ্যমে। ক্লাসে অধ্যাপকরা উর্দুতে লেকচার দিতেন। আমি কলেজে যাওয়ার পর থেকে তারা উর্দু এবং ইংরেজি দু’ভাষাতেই পড়াতে শুরু করেন। চোস্ত কেতাবি উর্দু বুঝতে আমার অসুবিধার কথাটি আমি তাদের জানিয়েছিলাম। ভারতের কেরালা থেকে আসা মিস্ মিন্হাজ সম্ভবত আমার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি আমার কাছে এসে ইংরেজিতে পড়া বুঝিয়ে দিতেন। ইংরেজিতে প্রশ্ন করতেন। কথা বলতেন তিনি আমার সঙ্গে ইংরেজিতেই। নাজমারা ঘোর উর্দু সমর্থক হলেও আমার সঙ্গে তারা উর্দু বলত না, ইংরেজিতে কথা বলত। নাজমাকে একদিন বলেছিলামÑ শোন নাজমা, দেশের মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, তাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে আপত্তি ওঠে, কিন্তু ভারতীয় ভাষা উর্দু আর কলোনিয়াল ভাষা ইংরেজিকে গুরুত্ব দিতে তো আপত্তি ওঠে না।

জবাবটা নাজমার কাছ থেকে পেয়েছিলাম বলে মনে পড়ে না। তবু নাজমা, সালমা এবং ভারতের আগ্রা শহর থেকে আসা শাকিলা আমার ভালো বন্ধুই ছিল। কলেজে পাঞ্জাবি এবং ভারত থেকে আসা পরিবারের মেয়েরাই ছিল ছাত্রীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ। সংখ্যালঘু ছাত্রীদের মধ্যে খালেদা, নাজিয়া ও আমি ছিলাম একমাত্র বাঙালি, কাশ্মিরী ও বেলুচ ছাত্রী। পশ্তু ভাষী পাঠান ছাত্রী ছিল মাত্র একজন, নামটা তার এখন আর মনে নেই।

ফারসি ভাষাভাষী একমাত্র ছাত্রী ছিল কুদসিয়া। সে সময়ে কোনো সিন্ধি ছাত্রী কোয়েটা সরকারি মহিলা কলেজে ছিল না। সুতরাং উগ্র পাকিস্তানপন্থি ও বাঙালি বিদ্বেষী পাঞ্জাবি ছাত্রীদের মধ্যে আমাকে নিয়ে মজা করতে পছন্দ করত। বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় শুনতাম পেছন থেকে কেউ একজন বিদ্রƒপ ছুড়ে দিচ্ছে ‘ভুখা নাঙ্গা বাঙালি।’

না শোনার ভাণ করতে হতে আমাকে। এর পর যখন ক্লাসের পরীক্ষাগুলোতে অন্যদের চেয়ে বেশি নাম্বার পেতে শুরু করলাম। শিক্ষকদের কাছে আমার সমাদর বাড়ল, ‘ভুখা নাঙ্গা বাঙালিকে’ উপহাস করবার উৎসাহ ক্রমে স্তিমিত হয়ে গেল।

তবে মিয়াখানের টাঙ্গায় আমার দুই পাঞ্জাবি সহযাত্রী সহপাঠী নুসরাত ও মুশরাত কখনো আমার সঙ্গে অভদ্র ব্যবহার করেনি। নুসরাত ছিল হাসি-খুশি রসিকও।

মিয়ার টাঙ্গার ঘোড়াকে ও ঠাট্টা করে বলত ‘সুম্মুন বুকমুন’। বলবার কারণও ছিল। মিয়াখানের ঘোড়াটিকে মাঝে মাঝে তামাশার ঝোঁকে পেয়ে বসত। কখনো কখনো সে মাঝ রাস্তায় গ্যাট হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ত। মিয়া খানের চাবুক ঝাড়া, অনর্গল পাঠানি খিস্তি তাকে এক কদমও নড়াতে পারত না।

নুসরাত তখন বলত- তোমার ওই জিদ্দি সমমুন বুকমুন এখন কিছুই শুনবে না। ও এখন ‘বোবা কালা।’ আমাদের বলত- ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে, চল, পয়দাল চলতে হাম সব।

কান্দাহারি বাজারের ভিড়ের মধ্যে নেমে পড়তাম আমরা। হেঁটে রওনা হতাম কলেজে। মাঝে মাঝে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ত মিয়াখানের আদরের ঘোড়া, তারপর একই জায়গায় টাঙ্গার সওয়ারি আমাদের নিয়ে ক্রমাগত গোলচক্করে ঘুরতে শুরু করত। আমরা ভয় পেয়ে চেঁচামেচি শুরু করলে নুসরাত বলতÑ আরে তোরা চেঁচামেচি শোরগোল করে তো রাস্তায় ভিড় জমিয়ে ফেলছিস।

মিয়াখান লাগাম কষে অবাধ্য সুমমুন বুকমুনকে বাগে আনতে চেষ্টা করে। আর নুসবাত ঘুরতে থাকা ঘোড়াকে বলে পাঞ্জাবি ভাষায় বলে ও-ও পাঁইও, ঠয়র যা, ঠয়র যা। তুমি কিথ্থে যান্দা। তেনু কী হয়্যা? মান যা বাশশেও (আরে ভাই থাম থাম। চল্লি কোথায়? তোর কী হল?)

তারপর আমাদের বলেÑ আমাদের সুমমুন বুকমুন এখন কলেজে যেতে চায় না। বলেছে চল সবাই ম্যারি গো রাউন্ড খেলি।’ আমরা হাসতে শুরু করি। তারপরই হয় তো আমাদের টাঙ্গার চেনা ঘোড়াটি প্রতিদিনের মতো শান্ত ভদ্র দায়িত্বশীল হয়ে যায়। ম্যারি গো রাউন্ডের খেলা ছেড়ে, কলেজের রাস্তায় টগবগিয়ে ছুটতে শুরু করে। নুসরাত গম্ভীরভাবে বলে- আব তো হোশ মে আ গিয়া কেয়া!

আর একদিনের ব্যাপারটি বেশ মনে আছে। কলেজ ছুটির পর গেট দিয়ে বাইরে এসেছি সামনেই মিয়াখান টাঙ্গা নিয়ে আমাদের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যরা তখনো গেটের বাইরে আসেনি। হাতের বইখাতার ব্যাগটি টাঙ্গার সিটে রাখা মাত্র পলকে ঘটে গেল ভোজবাজি। আমাকে টাঙ্গায় উঠবার অবকাশ না দিয়ে মিয়াখানের টাঙ্গা হাওয়া। আচমকা তীর বেগে ছুটে চলে যায়। দৃষ্টির আড়ালে। অন্যরা বেরিয়ে এসে বোকা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমাকে জিজ্ঞেস করেÑ আমাদের টাঙ্গা কোথায়?

ঘটনা শোনার পর ফাজিল কুদ্সিয়া সুর দিয়ে গেয়ে ওঠে- আবে হাওয়া মে উড়তা যায়ে পেয়ারকে মেরে টাঙ্গা…. ওকে থামিয়ে দিয়ে নুসরাত বলে- আমার মনে হয় মিয়ার ঘোড়া আজ  লড়াকু বাঙালিকে দেখে ভয় পেয়েছে। দেখতে বাঙালি ‘ছোট সি কদ্ … মাগর …।

-মাগর কী? আমি প্রশ্ন করি।

-মাগর বহুত খওরনাক। এলেম্ কি ঝান্ডা।

সবাই হাসতে শুরু করে, আমিও।

খামখেয়ালি ঘোড়াকে বশ মানিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসে টাঙ্গা নিয়ে মিয়াখান। নুসরাত আমাকে কপট সাবধান করে রিজিয়া, সাবধান। তুই কিন্তু আগে উঠবি না টাঙ্গায়। মিয়ার ঘোড়া হয়ে তো এবার বাঙালির ভয়ে এক লাফে উঠে যাবে মুরদার পাহাড়ে। সেখান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে জান কোরবান করে ফেলতে পারে।

সবাই আমরা আবার হাসতে থাকি। মিয়াও হাসে। তার রসিক ঘোড়া চিঃ হিঃ করে না ঠোকে। এখনো আমার কোয়েটা কলেজের সেই বন্ধুদের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে মিয়াখানের সেই মজার ঘোড়াটির কাণ্ডকারখানা। মনে পড়ে, ভুখা নাঙ্গা বাঙালির ভয়ে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তার ছুট লাগানোর ঘটনাটিও। 

চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares