ধা রা বা হি ক  : দ্বিতীয়  প র্ব

আত্মজীবনী

দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়ি

রিজিয়া রহমান

॥ ৩ ॥

একাত্তরের জানুয়ারিতে আমাদের দিনযাপন যথানিয়মেই চলেছিল। রান্নাবান্না, ঘর গোছানো, বেড়ানো, গল্পগুজব, তার ওপর সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের স্বপ্ন। ভালোই চলছে সব। চট্টগ্রাম থেকে চলে আসবার পর মীজানুর রহমানের ডিওডিন্যাল আলসারের ঝামেলা হয়নি আর। চমৎকার মেজাজে আছে সে। 

ছুটির দিনে বাজার করা মীজানুর রহমানের একটা হবি। যদিও কেনাকাটায় নিয়মিত ঠকে যাওয়াই তার ভাগ্যলিপি। প্রায়ই রাজ্যের পচা মাছ কিনে কিংবা দশ টাকার জিনিশ বিশ টাকায় কিনে যথেষ্ট বকাবকি শুনতে অভ্যস্ত সে। তবু প্রতি রোববারে বাজার করবার শখটি তার থেকেই যায়।

জানুয়ারির এক রোববার সকালে যথারীতি ঝাঁকা বোঝাই বাজার নিয়ে ফিরল সে। বাজারের বহর দেখে নির্বাক আমি। তার পছন্দের বড় রুই মাছ, সরপুঁটি মাছ, খাসির মাংস তো আছেই, সেই সঙ্গে ছোট পুঁটি, মলা, ঢেলার ভাগা, চিংড়ি, শোল, টাকি, রয়না, খলসে ট্যাংরা কিছুই বাদ পড়েনি।

তখন অবশ্য দেশি টাটকা (চাষের মাছ নয়) মাছ প্রচুর পাওয়া যেত, দামও ছিল মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যেই। সে সময়ে একজন সৎ সরকারি কর্মকর্তা (অবৈধ ‘উপরি’ বা কমিশন আয় না করেও) খাওয়ার টেবিলে সুষম খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেয়ে যেতেন না। এখন অবিশ্বাস্য মনে হলেও, অনেকেই জানেন, উনসত্তর-সত্তর সনে তিরিশ থেকে পঞ্চাশ টাকায় তিন-চার কেজি ওজনের একটা রুই মাছ কেনা যেত। এক ভাগা ছোট মাছ (প্রায় তিন শ গ্রাম ওজনের) আট আনায় (পঞ্চাশ পয়সা) পাওয়া যেত। বেশ বড় একটা দেশি মুরগির (তখন ব্রয়লার মুরগি বাজার অচেনা) দাম ছিল দেড় টাকা থেকে দু’টাকা, খুব বেশি হলে আড়াই টাকা অর্থাৎ দু’টাকা আট আনায় (তখন ষোলো আনায় হতো এক টাকা) পেতাম। ডিমের হালি চার আনা (পঁচিশ পয়সা) থেকে ছয় আনা, গরুর মাংস সেরপ্রতি দেড় টাকা আর খাসির মাংস বিক্রি হতো আড়াই টাকা সেরে। বড় একটি লাউ বা কুমড়ার দাম এক টাকায় পৌঁছত না। শাকসবজির দামও ছিল ‘আনা’-র ঘরে, টাকার ঘরের নিচে। (উনসত্তর-সত্তরকে ‘বেইজ ইয়ার’ বা ভিত্তি বছর ধরে দ্রব্যমূল্যের সূচক ৫ হাজার তের-চৌদ্দ সালে কতটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, পরিসংখ্যানের মূল্যস্ফীতি পরিমাপকরা সেটা নির্ভুলভাবেই জানেন। তবে আমার মতো সাধারণ গৃহিণীরাও সেটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারেন, চাকরির সুবাদে মীজানুর রহমান অফিস থেকেই বাড়িভাড়া, টেলিফোন ও বিদ্যুৎ খরচের বিলের টাকাটা পেত, সে কারণে আমাদের ছোট পরিবারটি মোটামুটি সচ্ছলভাবেই জীবন যাপন করতে পারত এবং মীজানুর রহমানও তার বাজার করবার শখটি ভালোভাবেই পূরণ করত। সেদিনও করল। বাজারে যাওয়ার সময় বলে দিয়েছিলাম নিরামিষ রান্না করব। শীতের সবজি সব পদ অল্প অল্প করে নিয়ে এসো। উৎসাহিত হয়ে মীজানুর রহমান ঝাঁকা বোঝাই সবজি কিনে ফেলেছে, যা সাত দিন রেঁধেও শেষ করা যাবে না। বিপত্তিতে পড়লাম, ফ্রিজটা আমার ছোট, এত ফুলকপি, বাঁধা কপি, গাজর, শালগম, ওলকপি, টমেটো, মটরশুঁটি এখন রাখি কোথায়! বেগতিক বুঝে মীজানুর রহমান যথারীতি বসার ঘরের সোফায় বসে সেদিনের খবরের কাগজের আড়ালে আত্মগোপন করেছে। গিয়ে বললাম, বাড়িতে আজ জিয়াফতের রান্না হবে, কে খবর দিল তোমাকে?

খবর কাগজের আড়াল থেকেই তার নির্বিবাদী জবাব, দাওয়াতের রান্না করছ নাকি? কাকে কাকে খেতে ডেকেছ? আমিনুল হক ফোন করেছিল, আসতে পারে আজ। ওকেও ফোন করে দুপুরে খাওয়ার কথা বলে দাও।

আমি নির্বাক। কী বলা যায় এমন উদাসীন লোককে! মীজানুর রহমান এমনি মানুষ। রাগ করতে গিয়ে হেসে ফেলি।

আমিনুল হককে ফোন করতে হয় না, তার আগেই সে সস্ত্রীক এসে যায়।

মীজানুর রহমান তখন ইপিআইডিসি-র প্ল্যানিং ডিভিশনে কাজ করছে। ডিওডিনাল আলসারের রোগী সে। ব্লিডিংয়ের কারণে বারবারই হাসপাতালে থাকতে হবে। খনিজসম্পদের অনুসন্ধানে পাহাড়ে-জঙ্গলে মাসের পর মাস ক্যাম্পে থাকা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না। অফিসের পরিচালনা বোর্ড তাকে আপাতত প্ল্যানিংয়ের কাজে দিয়েছে। মীজানুর রহমানও খুশি। কয়লা, হার্ড রক, লাইমস্টোন, মাইনিংয়ের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করছে মহা উৎসাহে। চাকরিতে সদ্য যোগ দেওয়া কয়েকজন মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারও তার সঙ্গে কাজ করছে। আমিনুল হক তাদেরই একজন। ছেলেটি হাসিখুশি আড্ডাবাজ। মীজানুর রহমানের একান্ত ভক্ত। প্রায়ই আসে আমাদের বাড়িতে।

ঘরে পা দিয়েই আমিনুল হক হইচই শুরু করল- ভাবি, আজ আমাদের বিরিয়ানি রান্না করে খাওয়াতে হবে কিন্তু, আপনার জন্য বিরাট একটা সুখবর নিয়ে এসেছি। স্কলারশিপটা হয়ে গেছে আপনার। তৈরি হয়ে যান জাপানে যাওয়ার জন্য। নিঃসন্দেহে সুখবর নিয়ে এসেছে আমিনুল হক, কিন্তু আমার জন্য সেটা নিরানন্দই তৈরি করল। এমএ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই স্কলারশিপের জন্য আবেদন করেছিলাম। খবরটা আমিনুল হকই এনেছিল। এসে বলেছিল, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এমএস করবার জন্য একটা স্কলারশিপ এসেছে মিনিস্ট্রিতে, যাবেন নাকি?

তো ইকোনমিকসেই, রেজাল্টও ভালো।

আমিনুল হকের শ্বশুর তখন সম্ভবত সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি পদে কর্মরত রয়েছেন রাওয়ালপিন্ডিতে। তিনিই জানিয়েছেন আমিনুল হককে, পূর্ব পাকিস্তানের কোনো ছাত্রকে স্কলারশিপটি পাঠাতে চান তিনি। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যেসব স্কলারশিপ আসে, সেগুলো সব পশ্চিম পাকিস্তানের ছাত্রছাত্রীদের জন্যই বরাদ্দ হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো হয় না, সুযোগটা থেকে বাংলাদেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা অধিকাংশ সময়েই বঞ্চিত হয়।

আমিনুল হক তার শ্বশুরকে আমার কথা জানালে, তিনি আমার জন্যই বরাদ্দ রাখেন। আমি কিন্তু প্রথমে ব্যাপারটা আমলেই আনিনি। আমার ছেলে তপু একেবারেই ছোট, দু’টি বছর তাকে ফেলে বিদেশে লেখাপড়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তা ছাড়া মীজানুর রহমানকে আলসারের ব্লিডিংয়ের জন্য বছরে দু-একবার হাসপাতালে যেতে হয়। জীবন-মরণ সমস্যা হয় তখন। আমি না থাকলে তাকেই বা দেখবে কে!

সে সময়ে প্ল্যানিং কমিশনে চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে অপেক্ষায় রয়েছি। সরকারি কলেজের প্রভাষক হিসেবে চট্টগ্রাম কলেজের পোস্টিংটা ঢাকার কোনো সরকারি কলেজে করবার চেষ্টা ও করছি। কলেজের চাকরিই আমার পছন্দ।

স্কলারশিপের ব্যাপারে উৎসাহ মীজানুর রহমানেরই বেশি ছিল। তার ধারণা, অর্থনীতিবিদ হিসেবে ক্যারিয়ার তৈরির এটা আমার জন্য সুবর্ণ সুযোগ। হাতছাড়া করাটা বোকামি। টিউশান ফিস, ফরমের খরচ ফ্রি, তার ওপর মাসে চার শ’ ইয়েন হাতখরচ। (তখন  জাপানি চার শ’ ইয়েন পাকিস্তানি রুপির বিনিময়ে যথেষ্ট টাকা)। তা ছাড়া এমএস-এ ভালো ফল করলে, পিএইচডি করবার সুযোগ রয়েছেÑ আমাকে রাজি করিয়ে ফেলে সে। উদ্যোগী হয়ে সব পাঠিয়ে দেয় পিন্ডিতে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সেসব তো বেশ কয়েক মাস আগের কথা। দীর্ঘসূত্রিতার কারণ ধরে নিয়েছিলাম স্কলারশিপটা আমার হয়নি, কোনো পশ্চিম পাকিস্তানি ছাত্রকেই দেওয়া হয়েছে। নিশ্চিতই হয়ে গিয়েছিলাম।

আমিনুল হকের আনা সুখবরটি নি¯প্রভই করে দেয় আমাকে। আমিনুল হককে বলি, জাপানে পড়তে যাই না যাই, আজ আপনাকে সবজি-পোলাও খাওয়াব।

লেগে গেলাম রান্নায়। সবজির পোলাও, রুই মাছ খাসির মাংস আর নতুন গুড়ের পায়েস টেবিলে সাজিয়ে দিয়ে সবাইকে জানালাম- আজ বিরিয়ানি রান্না করা গেল না, কারণ টোকিও ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপে আমি যাচ্ছি না। ঠিক করেছি, দেশেই চাকরি করব।

যথেষ্ট বুঝানো হলো আমাকে। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল। শেষ পর্যন্ত বললাম, সরকারি কলেজে চাকরি নিলে বিদেশে ইকোনমিকসে এমএস করবার সুযোগ অনেক আসবে। শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে বাঙালিদের জন্য সব সুযোগের দরোজাই খুলে যাবে।

শুধু আমার একার নয়, আমাদের সকলেরই তখন দৃঢ় বিশ্বাস, শেখ মুজিবুর রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্ব বাঙালিদের ভাগ্য ফিরাবে। এতকাল দেশকে সব দিক দিয়ে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে।

পাকিস্তানে বাঙালি প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় গেলে পশ্চিম পাকিস্তান আর একা সব সুযোগ ভোগ করতে পারবে না, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষও তাদের সমান সুযোগ পাবে।

খাবার টেবিলের আলোচনা দখল করে দেশের চলমান রাজনীতি। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ঢাকায় এসে শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনায় বসে তাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্বোধন করেছেন। নতুন সংবিধান তৈরি ও আওয়ামী লীগের ছয় দফা বিষয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ ও সামরিক শাসনের জেনারেলরা এখনো স্থির সিদ্ধান্তে আসতে না পারা সত্ত্বেও আমরা ধরে নিয়েছি, নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বিকেলে আমিনুল হকরা চলে যাওয়ার পরে মীজানুর রহমান বলল, বড় একটা সুযোগ হারালে।

আমি তখন নির্ভার, বলে ফেললাম, সুযোগ তো এখন আমাদের দোরগোড়ায়। শেখ মুজিবের ছয় দফা পার্লামেন্টে পাস হোক না একবার। তখন হাজারটা সুযোগের দরোজা সবার জন্যই খুলে যাবে।

মীজানুর রহমান উদ্দীপ্ত হয় না। সে নিজে একবার কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেয়েও চাকরির কারণে যেতে রাজি হয়নি এবং কোল পেট্রলজিতে জার্মানিতে পিএইচডি করবার সুযোগ ছেড়েই দেশে ফিরেছিল। এটা তার ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলেই মনে করত সে। এবং সুযোগ কাজে না লাগানোর জন্য অনুশোচনাও ছিল তার।

আমার সিদ্ধান্তে শুধু মীজানুর রহমানই নয়, আমিনুল হকও বিব্রত হয়েছিল। দুঃখিত হয়েছিলেন তার শ্বশুরও। তিনি নাকি পরে বলেছিলেন, রিজিয়া রহমান অন্য একটি বাঙালি ছাত্রের সুযোগ নষ্ট করে দিল। স্কলারশিপটি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি পশ্চিম পাকিস্তানি ছাত্রকেই দিতে হয়েছিল।

আমি তখন হয়তো জানতাম না, অর্থনীতিবিদ নয়, আমার জন্য অপেক্ষা করছে একটি স্বাধীন দেশের কথাশিল্পী হওয়ার পেশাটি। জানতাম না, বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ ও কালাতের যুদ্ধ নিয়ে আমাকে লিখতে হবে একটি প্রামাণ্য তথ্যভিত্তিক উপন্যাস। খুঁজতে হবে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ও বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাসংগ্রামের যোগসূত্রের অন্তর্নিহিত সূত্রটিকে।

॥ ৪ ॥

ষাট দশকের শুরুতে মীজানুর রহমানকে কোয়েটা অফিস কয়েক মাসের জন্য পাঠাল সারিগ কয়লাখনির কাজে।

সারিগ কোয়েটা থেকে বেশ পূর্বে, একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। জায়গাটা সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না আমাদের। মীজানুর রহমান বলল সারিগ কালিয়ারির অফিসের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার সাইদুজ্জামান সাহেব বাঙালি। তিনি বলে পাঠিয়েছেন, আমরা গেলে কোনো অসুবিধে হবে না; সব ব্যবস্থা জামান সাহেবই করে রাখবেন। তা ছাড়া কাছেই হারনাই উলেন মিলি। ওখানে লতিফ সাহেব আছেন। এরা দুজনেই মীজানুর রহমানের পরিচিত। কোয়েটা শহর তখনো প্রচণ্ড শীতের দখলে। মুরদার পাহাড়ের চূড়া বরফে ঢাকা। সেবার তুষারপাতও ছিল বেশি। ক’দিন আগেও পথঘাট, বাড়ির ছাদ ছিল সাদা বরফে ঢাকা। কোয়েটায় আসবার আগে জীবনে কখনো তুষারপাত, বরফে ঢাকা শহর দেখিনি।

এক শীতে ব্লিজার্ডের শহর আমেরিকার শিকাগো শহরে ছিলাম, বরফাচ্ছন্ন শীতের সেই ভুতুড়ে শহর একেবারেই ভালো লাগেনি আমার। কিন্তু কোয়েটার প্রথম শীতের তুষারপাত আজও আশ্চর্য বিস্ময়ের ছবি হয়ে রয়ে গেছে মনে। বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটার গ্রীষ্মকাল তখন ছিল না বললেই চলে। ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া নিয়ে গ্রীষ্মটি ছিল ফুলে ফলে, মনোহারিত্বে যেন বসন্তের দিন। সেখানে বর্ষাকাল নেই, বৃষ্টি হয় শীতের শুরুতে। আগস্ট না আসতেই বাতাস শীতল হতে থাকে, ক্রমে মুরদার পাহাড়ের চূড়ায় ভেসে আসতে থাকে শীতের মেঘ বৃষ্টি ঝরিয়ে শীত নামায়। ডিসেম্বরেই তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির নিচে নেমে যায়। তরল পানি জমাট বরফ হতে থাকে। আমাদের কলঘরে পানি রাখবার জন্য যে বিরাট সামাভারটি রয়েছে, লালু নামের ব্রোহি ছেলেটি সেটা পানি এনে দু’বেলা ভরে দিয়ে যায়। ডিসেম্বরের এক সকালে দেখি, সামাভারের পানি জমে বরফ হয়ে আছে। কল দিয়ে পানি আসছে না। নাওয়া-খাওয়া রান্না-বান্না, সংসারের কাজকর্ম নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার উদ্বেগে লালু বলে, ‘কোই ফিকর নেহি আয়ি (ব্রোহি ভাষায় ‘আয়ি’ অর্থ মা) আমি এখন তোমার কলে পানি আসবার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’

হাম্মামের পানি গরম হয়ে যাবে। (ওরা বাথরুমের সামাভারকে হাম্মাম বলে) কোল মাইন থেকে আমাদের প্রতি মাসে জ্বালানি হিসেবে বস্তাভরা কোক দিয়ে যায়। (কোক হচ্ছে কয়লার গুঁড়োর তৈরি কেক, যেগুলো দিয়ে আমরা ঘরের ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালাতাম)। লালু হাম্মামের (সামাভারের) ভেতরের মোটা পাইপে কোক ভরে দিয়ে আগুন জ্বালায়। অল্পক্ষণেই হাম্মামের পানি গরম হয়ে ফুটতে শুরু করে। ধোঁয়া উড়তে থাকে তার চিমনি দিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বরফ গলা পানি গরম হয়ে কলে চলে আসে।

তুষারপাতের আগের রাতটিতেই টিপটপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সকাল থেকেই দিনটা ছিল ঘোলাটে। মীজানুর রহমান ভোরেই গাম-বুট, চামড়ার জ্যাকেট, গ্লাভস, আর রাশিয়ান মেষপালকের মতো কানঢাকা পশমের টুপি পরে চলে গেছে। কোলিয়ারিতে। যাবার সময় বলে গেছে, মনে হচ্ছে আজ স্নো-ফল হতে পারে। বরফ পড়া দেখবার জন্য আবার বাইরে বেরিয়ে পড়বে না। তাহলে কিন্তু নির্ঘাত নিউমোনিয়া।

তুষারপাত দেখবার জন্য সারা দিন উন্মুখ হয়ে থাকি, বন্ধ জানালার কাচের ভেতর দিয়ে বারবার তাকাই মুরদার পাহাড়ে। বিকেলের দিকে হালকা বৃষ্টি ধরে যায়, ঘোলাটে দিনটি আরো ঘোলাটে হয়ে যেন সন্ধ্যা নামিয়ে আনে। তারপর সাদা খরগোশের লোমের মতো উড়ে উড়ে ঝরতে থাকে তুষারে অজস্র ছোট ছোট বল যেন। খুব লীলায়িত ভঙ্গিতে নিঃশব্দে এসে ঝরে পড়ে আমার জানালার কাচে, উঠোনে, রান্নাঘরের ছাদে। তুলোর ফুলের মতো আটকে যায় রাস্তার ও ধারের বাড়ির নিষ্পত্র আপেলগাছের ডালে, লাস বেলার নবাববাড়ির দেয়ালে লতিয়ে ওঠা ঝাপড়া আঙুরঝাড়ের ডালপালায়।

সকালে ঘুম থেকে উঠে বিস্ময়ে মুগ্ধতায় নির্বাক আমি। সাদা বরফের আস্তরণে ঢাকা পড়ে আমার চেনা পাড়াটি হয়ে গেছে যেন রুশ রূপকথার দেশ।

স্নো-ফলের পরে আকাশে মেঘ কেটে যায়, সকালের প্রথম আলোয় ঝলমল করে তুষার-শুভ্র মুরদার পাহাড়ের চূড়া, শুরু হয় তীক্ষè হিমেল উত্তুরে হাওয়া। লোকেরা বলে ‘কান্দাহারি হাওয়া’ এই হাওয়া বা শৈত্যপ্রবাহটি আসে সাইবেরিয়া থেকে। বইতে থাকে বেশ ক’দিন। বরফ মুড়ি দেওয়া শহরটি তখন শীতে কুঁকড়ে যায়। দিন-রাত ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বালিয়ে রাখি। কলঘরে হাম্মাম ভরা পানি ফুটতে থাকে। এরই মধ্যে কাজে আসে লাদ্দো। বড় রাস্তা থেকে পানি এনে হাম্মাম ভরে দিয়ে যায় লালু। বলে ‘আয়ি। পানি কম খরচ কর, রাস্তার নলকার পানি জমে বরফ হয়ে থাকে, পানি আনতে বড় মেহনত।’ পুরোনো বিবর্ণ বালাপোষ জড়ানো লালু চলে যায় খাবার পানি আনতে। শীতে অভ্যস্ত এখানকার মানুষ। ভারী বুট-কোট, টুপি পরে মানুষেরা পথে চলাচল করে। ফেরিওয়ালারা হাঁক দিয়ে যায়। সবজির গাড়ি ঠেলে ঠেলে গলি-গলিতে ঘোরে বুড়ো বেলুচ সবজিওয়ালা। শীত-গ্রীষ্ম সব সময়েই ওর কাছ থেকে সবজি কিনি আমি। ওরে সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে আমার। ভেসে আসে বুড়োর চেনা ডাক ‘আলু…পালক…গোবি, মারু…হারা ধনিয়া…তীক্ষè বাতাসের নিষেধ অগ্রাহ্য করে, মোটা শালে মাথা ঢেকে দাঁড়াই এসে গেটে, সবজিওয়ালাকে ডাকি- ও তাতো! সুমা কুজা রওয়ে? ইংগা বেয়া। (ও চাচা, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? এদিকে আসুন।)

বাতাসের ঝাপটা খেতে খেতে সবজিওয়ালা মুখ ফেরায়Ñ চে গুশি মনা বাঙালি বাচাক? (কী বলছ আমার বাঙালি বাছা?)

আমি হাসি- বেয়া, মনা সবজি বিদেয় (আসুন, আমাকে সবজি দিয়ে যান।)

বরফের ওপরে ঠেলাগাড়ির চাকার দাগ এঁকে সবজিওয়ালা আসে আমাদের গেটে, বলেÑ বোগো, চে দরকর? (বলো, কোন সবজি দরকার?) সবজিওয়ালার ফুরফুরে সাদা দাড়ি, তালি দেওয়া ছেঁড়া কোটের কলার বাতাসে ঝাপটা খেতে থাকে, তাকিয়ে দেখি, খুব মায়া হয় সবজিওয়ালার জন্য। মীজানুর রহমানের পুরোনো ওভারকোটটা ওকে দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে থাকি মনে মনে। জিজ্ঞেস করি, আনচো সরদ্ সুমা চে হাল? জোড় আস্ত? খুব আস্ত? (এত ঠান্ডা! আপনি ঠিকঠাক আছেন? ভালো আছেন তো?)

আমার জন্য সবজি মাপতে মাপতে সবজিওয়ালা শুকনো, কালচে ঠোঁটে হাসেÑ মান জোড় আস্ত, জোড় আস্ত, খুব আস্ত। তও চে হাল বাচাক? (আমি ঠিক আছি, ভালো আছি, তুমি কেমন আছ, বাছা?) সবজিওয়ালাকে বলি আমি তো শীতে কাহিল হয়ে গেছি। কিন্তু তুমি এই জানমারা ঠান্ডায় সবজির গাড়ি নিয়ে বিরেয়েছে যে! দেখছ না, কান্দাহারি হাওয়া চলছে, নিউমোনিয়া হয়ে মরবে যে। সবজির প্যাকেট আমার হাতে দিয়ে সবজিওয়ালা বুড়ো আবার হাসেÑ মওতের ফেরেশতা কি কান্দাহারি হাওয়ার জন্য বসে থাকে। যখন আসবার আসবে, যতক্ষণ বেঁচে আছি ভুখ আছে। সবজি না বেচলে নান্ আসবে কোথা থেকে!

কেন তোমার এই বুড়ো বয়সে কেউ কি তোমাকে খাবার দিতে পারে না?

আমার কথায় রেগে ওঠে সবজিওয়ালাÑ ওহ্ চুপ কান, চুপ কান নাদান জিনিক! (থাম, অবোধ মেয়ে) বুড়ো হয়েছি, তাই কী! আমি কি মিসকিনÑ নান্ মেঙ্গে খাব! যতক্ষণ শরীরে তাগদ্ আছে, নিজের রুটি, নিজেই কামাই করব। শীতকে আমরা পরোয়া করি না, বরফ নিয়ে রাস্তায় খেলতে খেলতে বড় হয়েছি।

এক ঝটকাট গাড়ি ঘুরিয়ে সামনে এগোতে থাকে সবজিওয়ালা, গজগজ করতে থাকে মন মিসকিন নেস্ত, মিসকিন নেস্ত। (আমি ভিক্ষুক নই, ভিক্ষুক নই)

বুড়োকে ডেকে বলিÑ কোথায় যাচ্ছ তুমি এখন, মুখ ঘুরিয়ে ফিরে তাকায় সে মন রওয়ান চক্করা (আমি আমার ঘোড়ায় যাচ্ছি, তুমি ভেতরে যাও, মা।)

কিছুটা গিয়ে আবার দাঁড়ায় সবজিওয়ালা, চেঁচিয়ে বলেÑ ভেতরে যাও, আমার বাঙালি বাছা। বাইরে দাঁড়িয়ে থেকো না। বেমারি ধরবে।

সবজিওয়ালা চলে যায়। লোকটা আমার কেউ নয়, নেহাতই গরিব ফেরিওয়ালা, তবু নিজ দেশ থেকে অনেক দূরে- প্রত্যন্তের প্রবাসে ভিনদেশি। ভিন্নভাষী বৃদ্ধকে মনে হয় যেন একান্তই আমার আপন কেউ। গেট বন্ধ করতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, ভুলে যাই মীজানুর রহমানের সতর্ক-নির্দেশ। দেখি বরফ জমা রাস্তায় তালমারা বুট কোট ছেঁড়া বিবর্ণ টুপি পরে বিত্তহীন ঘরের শিশুরা বরফ ছোঁড়াছুড়ির খেলা খেলছে। ওদের গাল ঠান্ডায় পাকা লাল আপেলের রং ধরলেও কচি কণ্ঠের আনন্দ কাকলিতে উচ্ছল। বরফ ঢাকা রাস্তায় ঘোড়ার খুরের ছাপ ফেলে টাঙা গাড়ি চলে। টাঙাওয়ালা খেলায় মেতে থাকা বাচ্চাগুলোকে ডেকে বলে এই, চুচোরা (বাচ্চারা) পথ ছাড় সব। গাড়ি যেতে দে। শিশুরা শোরগোল করে ওঠেÑ না, না। আমরা পথ ছাড়ব না, দেখছ না আমরা খেলছি।

ঘোড়ার লাগামের রাশ টেনে টাঙাওয়ালা সাবধান করে- শোর মা কান, নাদান চুচো। দূর আÑ, দূর আ। (এই বোকা কাচরা, সরে যা, সরে যাব, শোরগোল করিস না।)

বাচ্চাদের খেলার পাশ কাটিয়ে টগবগিয়ে চলে যায় টাঙা। পিঠে চাপান কয়লার বস্তার ভারে কুঁজো হয়ে হেঁটে আসা বেলুচ মিনতিটি পিঠের বোঝা নামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় দস্তানাহীন দু’হাতের তালু গরম করবার জন্য ঘষতে থাকে, শিশুদের খেলা দেখে কিছুক্ষণ, টুকটাক কী যেন বলে ওদের সঙ্গে, হাসে। আবার বোঝা তুলে নেয় পিঠে। কুঁজো হয়ে পা টেনে টেনে হেঁটে চলে যায় দূরে। ঝকঝকে নীল আকাশের পটভূমিতে বরফের টুপি পরা পাঁচ হাজার ফিট উঁচু মুরদার পাহাড়ের চূড়া উঠতি রোদে ঝলমল করে। সেই মুহূর্তে শীতবেলার বেলুচিস্তান, আর সেখানকার বঞ্চিত দরিদ্র মানুষের প্রতি সহমর্মিতায় একাত্ম হয়ে যাই।

॥ ৫ ॥

শীতের শেষেই সারিগে যাওয়ার জন্য গোছগাছ শুরু হয় আমাদের। ইতোমধ্যে সোররেঞ্জ কয়লার খনিতে বেশ বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটায় সারিগে যাওয়া পিছিয়ে যায় মাস দুয়েক। বসন্তের শেষে এক ভোরে আমরা সারিগের উদ্দেশে রেলগাড়িতে উঠে বসলাম। একসময় বোলনে মেল সমতলের সিবি জংশান স্টেশনে আমাদের নামিয়ে দিয়ে চলে গেল তার পরবর্তী গন্তব্যে। সিবি, বেলুচিস্তান- সিন্ধ-সীমান্তের শেষ স্টেশন। এর পরেই পৃথিবীর উষ্ণতম স্থান সিন্ধের জেকোবাবাদ।

জেকোবাবাদের ভয়ংকর গরমের অভিজ্ঞতা আমার আছে। কিন্তু শৈল-শহর কোয়েটার শীতল স্নিগ্ধ বসন্তের আবহাওয়া থেকে এসে আচমকা সিধির রোদজ্বলা তপ্ত বেলাকে জেকোবাবাদের মতোই উগ্র মেজাজিই মনে হলো। চারপাশে নুড়ি- বালুকার ধু ধু প্রান্তর, দূরে দূরে ছোট ছোট পাহাড়ের ঢেউ। ইতস্তত কিছু পিপ্পল, আর ধূলিধূসরিত বাবলাগাছ, ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে উটের কাফেলা। বোলান মেল চলে যাওয়ার পর স্টেশনটি প্রায় জনবিরলই হয়ে যায়। কয়েকজন ঠেট, গ্রাম্য পাঠান, ভারী বুট, বিশাল পাগড়ি আর বিরাট চাদর নিয়ে খোলা প্ল্যাটফরমের বেঞ্চে বসে দাঁতে নেসোয়ার ঘষছে। ভারী গলায় পশতুতে আলাপ করছে নিজেদের মধ্যে।

সিবি স্টেশনের চড়া গরম আর চারপাশের রুক্ষ প্রকৃতি আমাকে নিষ্প্রভ করে তুলেছিল, মীজানুর রহমান সেটা বুঝল হয় তো। বলল- চলো, তোমাকে ওয়েটিং রুমে বসিয়ে তোমার জন্য কফি এনে দিচ্ছি। দু’জোড়া ব্রড গেজের লাইন পার হয়ে ওয়েটিংরুমে এসে বসলাম। মীজানুর রহমান গেল, কফি আনতে। ফিরল একটু পরেই। জানাল। কফি পাওয়া গেল না, ক্যান্টিনে খাওয়া চা আছে তাই নিয়ে এলাম।

গুরুত্বপূর্ণ জংশন স্টেশন হলেও সিড়ি স্টেশনের তেমন জৌলুশ নেই, ব্রিটিশ আমলের তৈরি নেহাতই সাদামাটা একটা স্টেশন। যাত্রীরাও সাধারণ চেহারার। শহুরে ছাপ তাদের পোশাকে আচরণে একেবারেই নেই। ধুলোর গন্ধভরা ওয়েটিং রুমটিতেও যথেষ্ট গরম। ছাদের সিলিংয়ে ঝুলে থাকা রঙচটা পুরোনো ফ্যানটি সশব্দে ঘুরেও স্বস্তি দিতে পারছে না।

ঘূর্ণায়মান বৈদ্যুতিক পাখাটির একঘেয়ে বিরক্তিকর শব্দ শুনতে শুনতে যখন ক্লান্ত হয়ে উঠেছি, মীজানুর রহমান খবর আনল- সারিগে যাওয়ার লোক্যাল ট্রেন এসে দাঁড়িয়ে গেছে তিন নম্বর প্ল্যাটফরমে। চলো, যেতে হবে।

তিন নম্বর প্ল্যাটফরমে থেমে আছে তিন-চারটি বগির স্টিম ইঞ্জিনে টানা রেলগাড়ি। ‘বোরি বিসতারা’ পোঁটলাপুটলি, বস্তা ঘাড়ে নিয়ে কিছু যাত্রী হইচই করে ট্রেনে উঠছে।

পশতুতে ডাকাডাকি করছেÑ ও সুলাইমা-না! দেলতা, দেলতা রাসা। (ও সুলেমান, এই যে, এদিকে, এদিকে এসো)।

বগলে পোঁটলা আর এক হাতে এক দুম্বার গলার দড়ি ধরে টেনে হাঁফাতে হাঁফাতে এসে হাবির সুলেমান নামক আরেক যাত্রী। দুম্বাসমেত ওঠে গেল কম্পার্টমেন্টে।

শঙ্কিতই হলাম। দাঁতে নেসোয়ার ঘষতে থাকা বিরাটদেহী ঠেট পাঠান আর ভেড়া-দুম্বার মাঝে বসে যাব কী করে আমরা! ভাগ্য ভালো, আমাদের প্রথম শ্রেণীর কম্পার্টমেন্টে আমরা দু’জন ছাড়া আর কোনো যাত্রীই উঠল না। ট্রেন চলতে শুরু করলে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। সিবি থেকে সারিগ পর্যন্ত আমার সেই ট্রেনযাত্রাটি ছিল অভূতপূর্ব।

নুড়ি পাথর উপলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক পাহাড়ি নদীকে বারবার আতিক্রম করতে হয়, পেরিয়ে যেতে হয় ব্রিজের পর ব্রিজ, দুর্ভেদ্য পর্বতের শরীর ফুড়ে তৈরি ট্যানেলের পর ট্যানেল। এক দিকে উত্তুঙ্গ পবর্তশ্রেণি, আর এক দিকে নুড়ির প্রান্তরে নীল ফিতার মতো নদীর গুচ্ছধারা, পাহাড়ি ঘাসের বন, নিঃসঙ্গ লাল ঝাউয়ের সারি, আর বামুন তালগাছের ঝোপ ছাড়িয়ে ছুটে চলে স্টিম ইঞ্জিনে টানা ছোট ছোট রেলগাড়ি।

মীজানুর রহমান সিবি থেকে কেনা সেদিনের ইংরেজি দৈনিক পত্রিকাটি পড়তে থাকে। আমি জানালায় মুখ রেখে কৌতূহলী শিশুর মতো দেখতে থাকি অচেনা ভুবনের অজানা প্রকৃতিকে। রেলগাড়ির জানালায় দৃশ্যের পর দৃশ্য ঝলক দিয়ে সরে যায়। ব্রোহি যাযাবরদের তাঁবু, তাঁবুর কাছেই হাঁটু মুড়ে বসে আয়েশে ঝিমোয়, যাযাবরদের উট ক’টা। মেয়েরা ঘাঘরা দুলিয়ে ঘোরাফেরা করে ডেরার সামনে, ছোট নদীটিতে কাপড় কাচায় ব্যস্ত কেউ, সন্তানকে স্নান করায় কোনো ব্রোহি মা। শিশুদের ছুটোছুটি খেলা, পুরুষদের গোল হয়ে বসে গড়গড়ায় ধূমপান, গাধার পিঠে জ্বালানি কাঠকুটোর বোঝা চাপিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসা কোনো কিশোর অথবা পাহাড়ের ঢালে পশুপাল চরিয়ে বেড়ায় বালকেরা, জনবিরল পার্বত্য উপত্যকায় অস্থায়ী ঘর-সংসারের এই দৃশ্যগুলো আশ্চর্য সজীবতা নিয়ে পেছনে পড়ে যায়।

ব্রোহি যাবাবরেরা তখন শহরে বসবাস করত না। পশুপালনই নিয়ন্ত্রিত করত তাদের জীবন। আদিম পশুপালক মানবগোষ্ঠীর মতো তারাও যেখানে আছে চারণভূমি পানীয় জলের উৎস-ঝরনা অথবা নদী, সেখানেই বাঁধে অস্থায়ী ডেরা, শীতে নেমে আসে সমভূমিতে গ্রীষ্মে পাহাড়ি অঞ্চলে। ঘুরে বেড়ায় সারা বেলুচিস্তানের প্রান্তে-প্রত্যন্তে। কালাতের স্নিগ্ধ শ্যামল পার্বত্য অঞ্চল থেকে লাসবেলার সোনা মিয়ানি আরব সাগরের কোল ঘেঁষা মাকরানের গোদের থেকে ইরানের খোরাসান সীমান্তে জায়দান, আফগানিস্তানের সীমানায় চমন পর্যন্ত অনেক সময় সীমান্ত পেরিয়ে কান্দাহারের পার্বত্য অঞ্চলেও চলে যায়। সীমান্তপ্রহরীরা যাযাবরদের বিচরণে তেমন সতর্ক দৃষ্টি রাখত না। তখন আধুনিক রাষ্ট্রের নিয়মকানুনের বিধিবদ্ধতা সম্পর্কে তারা যেমন অজ্ঞ ছিল তেমনি আধুনিক জীবন যাপনের উপকরণের কোনো কিছুই তারা ব্যবহার করতে জানত না। একবার কান্দাহার সীমান্তে বোলান গিবির পথমুখে অবস্থিত চমনে বেড়াতে গিয়ে এক ব্রোহি যাযাবর মহিলাকে দেখেছিলাম। পোষা গাধাটিকে ঘাস খেতে ছেড়ে দিয়ে তিনি পাহাড়ের ওপর এক পাথরে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাকে ডেকে তুলেছিলাম, জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে কান্দাহারের লোক কি না! মহিলা জানিয়েছিল, তার দাদা অর্থাৎ তার বাবার বাবা কান্দাহার থেকে অনেক আগে এই হিন্দুস্তানে চলে আসে। হিন্দুস্তানেই থেকে গেছে তারা। বলেছিলাম তাকে এ দেশকে এখন আর কেউ হিন্দুস্তান বলে না, এখন এ দেশের নাম পাকিস্তান। মহিলা অবাক হয়ে বলেÑ পাকিস্তান কোন দেশ! সে দেশ তো চিনি না।

ষাটের দশকের শুরুতেও সেই মহিলার বিশ্বাস ছিল, হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে কান্দাহারের পরে বিশাল দেশটিকে হিন্দুস্তান বলেই তারা জানে। এককালের মধ্য এশিয়া তৃণাঞ্চলের প্রায় সব যাযাবর মানুষের মতোই মধ্যযুগীয় ইতিহাসের বৃত্তে বন্দী যাবাবর মহিলাটিরও বোধহয় ধারণা ছিল, যে দেশে সিন্ধু নদী বয়ে চলেছে সে দেশেরই নাম হিন্দুস্তান। (এখন তাদের জীবন ও জ্ঞানে পরিবর্তন ঘটেছে কি না জানি না।)

ভ্রাম্যমাণ ব্রোহি যাযাবরদের জীবনযাপন আকৃষ্ট করত আমাকে। সারিগে থাকবার সময় একদিন একা হেঁটে হেঁটে চলে গিয়েছিলাম সারিগ কালিয়ারির কলোনি থেকে বেশ দূরে এক যাযাবর ডেরায়। নিজেদের ব্রোহি ভাষা ছাড়া উর্দু, ফারসি, পশতু ভাষা তারা জানত না। ভাঙা-ভাঙা কিছু বেলুচ ভাষা বলতে ও বুঝতে পারত। তাই দিয়েই চলেছিল ভাবের আদান-প্রদান। তারা আমাকে যবের রুটি, রোদে শুকানো দুম্বার মাংস আর উটের দুধের শুকনো দই খাওয়ার জন্য খুব সাধাসাধি করেছিল। খেতে রাজি হইনি। একান্ত অনুরোধে দুম্বার দুধের পেয়ালা হাতে নিতে হয়েছিল, মুখে দিয়েই বিকট গন্ধে উগড়ে দিয়েছিলাম। ঘাঘরা-কোর্তা পরা অল্পবয়সী মেয়েগুলো আমার অবস্থা দেখে মজা পেয়েছিল, তামার অলংকারের গোছায় ঝংকার তুলে হেসে উঠেছিল। তাদের খাবার আমি খেতে না পারলেও সরল অনাড়ম্বর সেই মানুষগুলোর আন্তরিকতা আজও ভুলিনি।

মীজানুর রহমান পরে শুনে বলেছিল, আর কখনো এমন হুটহাট করে যেখানে-সেখানে এক চলে যেয়ো না। জাঠ-যাযাবরদের পাল্লায় পড়লে বুঝবে, তোমার মতো হাওয়ায় ওড়া হালকা শরীরের বাঙালিনীকে আফগানিস্তানে নিয়ে যাওয়া ওদের জন্য কঠিন কিছু নয়।

রাগ করে বলি- ওরা জাঠ নয়, ব্রোহি, খুব ভালো মানুষ।

কেমন করে বুঝলে?

মীজানুর রহমানের প্রশ্নে নির্দ্বিধায় বলে ফেলি, আমি ভালো মানুষদের চিনতে পারি।

এর পরে আর ব্রোহি যাযাবরদের জীবন দেখতে যাইনি।

ট্রেন এসে থামে হারনাই স্টেশনে। ধু ধু প্রান্তরের মাঝে ছোট এক স্টেশন। ট্রেনের কামরা থেকেই দেখা গেল হারনাই উলেন মিলের ঘরবাড়ি। স্টেশন থেকেই হারনাই উলেন মিল দেখা যায়। মীজানুর রহমানের কাছেই জানলাম, মিলটি খুব বেশিদিন তৈরি হয়নি।

আইয়ুবি শাসনের শিল্পায়ন উন্নয়নে অংশ হিসেবেই বেলুচিস্তানে একমাত্র উল তৈরির কারখানাটি তৈরি করেছে পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (পিআইডিসি) সারিগের কয়লা ঋণ উন্নয়নের কাজটিও এসেছে এই অর্ধসরকারি স্বায়ত্তশাসিত পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের হাতে। পাকিস্তানের শিল্প উন্নয়নের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানের মতোই বেলচিস্তানের ভাগেও তেমন কিছু জোটেনি। পশ্চিম পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও জেনারেল আইয়ুবের উন্নয়ন দশকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ ও বেলুচিস্তান ছিল অবহেলিত। স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের আগে বাঙালি প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর চাপে বাংলাদেশে কিছু মিল-কারখানা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও বেলুচিস্তানের দিকে একবারেই নজর দেওয়া হয়নি। (কারণটা হয়তো ছিল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ ও কালাতের যুদ্ধের ঘটনা) ব্রিটিশ আমলে যেসব রেলপথ বসানো হয়েছিল, তা ছিল শুধু ব্রিটিশ বেলুচিস্তানের অংশটুকুতে, তাও নিজেদের দখল বহাল রাখবার জন্যই। বিশাল এলাকার প্রদেশটি তখনো পড়েছিল মধ্যযুগীয় পশুচারণভূমি হয়ে। ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়ায় উৎপন্ন ফল (আঙুর, আপেল, আনার) আর সামান্য গম, যব, ভুট্টাই ছিল একমাত্র কৃষিজ উৎপাদন। পশুর লোমের পুশতিন আর ভেড়া-দুম্বার লোম বিক্রি করে, যৎসামান্যই আয় হতো। বেলুচিস্তানের অধিকাংশ মানুষের বসবাস ছিল দারিদ্র্যসীমার অনেক নিচে। বেলুচদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হয় তো আইওয়াশ কৌশলের ফসল ছিল ‘হারনাই উলেন মিল’ আর সারিগের কয়লা খনি (পাকিস্তান সৃষ্টির আগে যে প্রাচীন পদ্ধতির কয়লা উত্তোলনের খনিটিতে মালিক ছিল সিন্ধি হিন্দু ব্যবসায়ীরা)।

সিবি ছাড়বার পর যে পাহাড়ি নদীটি প্রায় আমাদের সঙ্গেই রয়েছে তার সঙ্গে দেখা হলো আবার হারনাইতে। রেললাইনের ধার ঘেঁষে বেশ চওড়া খাত ধরে নীলাম্বরী শাড়িটির মতো বয়ে চলেছে। নদীটির প্রতি আমার উৎসাহ লক্ষ করে মীজানুর রহমান হাসে, বলেÑ লতিফ সাহেব এখন এখানে নেই। ছুটিতে বাংলাদেশে গেছেন। ফিরে এলে তোমাকে হারানাইতে বেড়াতে নিয়ে আসব। তখন মন ভরে নদীটা দেখতে পারবে।

পরে বেড়াতে এসেছিলাম একবার হারনাইতে। হাঁটুজলের নদীতে পা ডুবিয়ে অনেক হেঁটেছিলাম। ছুটোছুটি করে ধরতে চেষ্টা করেছিলাম কাচের মতো স্বচ্ছ নীল পানিতে ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়ানো ছোট লাল মাছগুলোকে।

হারনাইর পরের স্টেশনই সারিগ। চড়া রোদের দুপুরে রেলগাড়ি আমাদের পৌঁছে দিল সেখানে। সারিগ কোলিয়ারির বাঙালি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার জামান সাহেব আমাদের জন্য ষ্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। পরিচয় পর্ব শেষ হলে বললেনÑ চলুন, স্টেশনের বাইরে আপনাদের জন্য জিপ রয়েছে।

চারপাশে তাকিয়ে সারিগ সম্পর্কে সব উৎসাহ আমার পলকে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। দিগন্তজোড়া পাথুরে প্রান্তর দুপুরে রোদের তাপে দাউ দাউ করে জ্বলছে। উত্তরে দৃষ্টি অবরুদ্ধ করে দেওয়া পাহাড়ের দেয়াল।

জিপে বসেই দূর থেকে দেখলাম, কোলিয়ারির কলোনির বাড়িগুলোর পেছনেই উদ্ধত ভঙ্গিতে আকাশ ছুয়েছে উত্তুঙ্গ পর্বতশ্রেণি। জামাল সাহেবই জানালেনÑ ওটা এখানকার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়, জরগুন পর্বত, দশ হাজার ফিট উঁচু। রেঞ্জটি এখান থেকে শুরু হয়ে আরো উত্তরে চলে গেছে।

বেলুচিস্তানের অনমনীয় স্বাধীন সত্তার মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন অবয়রের জরগুন পাহাড়ের দিকে যে রাস্তাটি চলে গেছে, সেই রাস্তাতেই এগিয়ে যেতে থাকি আমরা।

তখন কিন্তু জানতাম না, বিপজ্জনক জরগুন পাহাড় পেরিয়ে, তার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অনেক ইতিহাসের সাক্ষী দুর্গম বোলান গিরিপথ অতিক্রম করতে হবে একদিন আমাকেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares