ধা রা বা হি ক  : প্র থ ম  প র্ব

আত্মজীবনী

দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়ি

রিজিয়া রহমান

থাকি তখন বড় মগবাজারের ছোট এক পাড়ায়। সেই সত্তর-একাত্তরে পাড়াটা ছিল বেশ ফাঁকা-ফাঁকা, নিরিবিলি ছিমছাম। প্রতিবেশীরাও ভালো। মিলে-মিশে ভালোই ছিলাম।

এখনকার মতো বহুতল ভবনের ‘অ্যাপার্টমেন্ট কালচার’ তখন জানা ছিল না। তখনো মধ্যবিত্ত পাড়ায় পড়শি-সৌহার্দ্যরে রেশটুকু মুছে যায়নি। বাড়ির গিন্নিরা এ বাড়ি ও বাড়ি বেড়ান, কর্তারা ছুটির দিনে মাঝে-মধ্যে কারো বাড়ির ড্রইংরুম চলমান রাজনীতির আলোচনায় সরগরম করে তোলেন, পাড়ার ছেলেরাও বাড়ির সামনে ক্রিকেট খেলে, স্ট্যাম্প বিনিময় করে। ঘুড়ি ওড়ায় ছাদে। একই সঙ্গে, একই মমতা ভিত্তিক পরিবেশে বড় হয়ে ওঠে।

আমাদের বাড়ির ডান দিকে থাকেন বিদেশি এক কোম্পানির স্থানীয় কর্ণধার- গুপ্ত বাবু। রোববার ছুটির সকালে প্রায়ই চলে আসেন আমাদের বাড়িতে, আমার স্বামী মিজানুর রহমানের সঙ্গে গল্প করেন, চা খান। গুপ্ত বাবুর পরিবার থাকে তার দেশের চট্টগ্রামের পটিয়ায়। ছুটির দিনে হয় তো একা বাড়িতে ভালো লাগে না তার। মিজানুর রহমান তাকে পছন্দ করেন। মাঝে মাঝে গল্পে গল্পে বেলা গড়ায়, তখন বলি- গুপ্ত আজ আমাদের সঙ্গে ভাত খেতে হবে আপনাকে। গুপ্ত হাসেন- আজ  নয় দিদি, যেদিন শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেবেন, সেদিন খাব। সেদিন আমি বাজার করে আনব, আপনি রান্না করবেন। সবাই মিলে আনন্দ করে খাব। মিজানুর রহমান গুপ্তদাকে ঠাট্টা করেন- পাকিস্তানের বাঙালী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অনারে আপনাকে শান্তিনগর বাজারের সব চেয়ে বড় রুই মাছটা কিনে আনতে হবে। গুপ্তদাও হাসেন – নিশ্চয়ই আনব, শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, গর্বে এখনি বুক আমার দশ হাত হয়ে গেছে।

আমরা সবাই খুবই উৎফুল্ল হয়ে আছি। আমরাই কেবল নই, আমাদের ছোট্ট পাড়াটি গোটা শহর, সারা দেশটাই আনন্দে উদ্বেল, যেন বিরাট কোনো উৎসবের আয়োজনের মধ্যে আছি। যেন আমাদের পরিবারেরই একজন বিজয়ী হয়েছে।

সত্তরের অবিস্মরণীয় নির্বাচনটি সবে শেষ হয়েছে, পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক দলকে পিছে ফেলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপলস পার্টি সংখ্যা গরিষ্ঠ বিজয়ী হলেও, সরকার গঠনের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আওয়ামী লীগেরই।

আওয়ামী লীগেরই সরকার গঠন করবার অধিকার। পার্লামেন্টে ভুট্টোর পার্টি প্রধান বিরোধী দল। পেশোয়ারের ওয়ালী খানের ন্যাপ, মুসলীম লীগ, জামায়াতে ইসলাম ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বিজিত আসনসংখ্যা নেই বললেই চলে, যা আছে  নেহাতই নগণ্য। পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনীর গোপন তথ্যে আওয়ামী লীগের এমন বাঁধভাঙা বিজয়ের সম্ভাবনা একেবারেই ছিল না, পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী নিশ্চিন্তই ছিল, জুলফিকার আলী ভুট্টোও তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার বিষয়ে নিশ্চয়তা পেয়েছিলেন। তাদের সব গোপন তথ্যের নিশ্চয়তা নস্যাৎ করে শেখ মুজিবের দলের এমন একক  সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যাওয়া একেবারেই অকল্পনীয়। অপ্রত্যাশিত আঘাতে প্রথমে তারা হতবুদ্ধি হয়ে গেলেও আমরা বাংলাদেশ কিন্তু আনন্দে উদ্বেল, এ বিজয় যেন বাঙালিরই বিজয়। আনন্দে ভাসছি আমরা, ভাসছে দেশ।

আমাদের বাড়ির লাগোয়া বাম দিকের দোতালাটি ইপিআইডিসি-র (ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশেনের) কর্মকর্তা মাহফুজউর রহমানের দোতলা বাড়ি। নিচতলায় ভাড়া থাকেন গোয়ানিজ খ্রিস্টান মি. রডরিকস। ভারতীয় সেনাবাহিনী গোয়া দখল করলে, তার বাবা সপরিবারে চলে যান করাচিতে, একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মি. রডরিকস করাচি থেকে ঢাকায় বদলি হয়ে এসেছেন খুব বেশি দিন হয়নি।

নির্বিবাদী ভদ্র রডরিকসের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সদ্ভাবের। মাঝে মাঝে আসেন আমাদের বাড়িতে। মিসেস রডরিকস চাকরি করেন একটি বিদেশি দূতাবাসে, সুনিপুণ গৃহিণী তিনি, রান্নাও করেন চমৎকার। তার গোয়ানিজ রান্না আমাদের পাঠিয়েছেন দু’ একবার। অত্যন্ত সুস্বাদু।

রডরিকসরা ছাড়া আরো একটি অবাঙালি পড়শি ছিল আমাদের। পাড়ার গলির  মুখেই দোতলা বাড়িটি ছিল তাদের। ফটকের দেয়ালের নামফলকে মালিকের লেখা ছিল নয়না মোহাম্মদ শামসু গনি। এত বড় একটা নাম বিভ্রান্তিকরই। পরে জেনেছিলাম নামটি দুই মালিকের, অর্থাৎ দুই ভাইয়ের। নয়না মোহাম্মদরা ভারতের কেরালার লোক।  দেশ ভাগের পর চলে এসেছিলেন ঢাকায়। দেখতে তারা বাঙালিদের মতোই, দুই ভায়ের একজন আবার বাঙালি মেয়েই বিয়ে করেছিলেন। অবাঙালি হলেও কেরালার এই পরিবারটি ছিল অত্যন্ত ভদ্র, সজ্জন। পাড়ার দুই অবাঙালি পরিবার আওয়ামী লীগের একক বিজয়ে আমাদের মতোই সম্ভবতঃ উৎফুল্ল হয়েছিল। হয়তো তারা পাকিস্তানি নন, সেজন্যই। আমার সত্তর সালের ঢাকার এক ছোট্ট পাড়ার সব মানুষ যেন বহু আকাক্সিক্ষত কোনো স্বপ্ন পূরণের প্রহর গুনছিলাম।  স্বপ্নের ডানায় ভর করে উড়ছিলাম।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কুটোর মত উড়ে গেছে, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবর রহমান হাল ধরেছেন সাত কোটি বাঙালির ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে তাঁর ছয় দফা নির্বাচনী এজেন্ডায় রয়েছে সৌভাগ্যের দুয়ার খোলার চাবি- এমনি বিশ্বাস নিয়েই কাটছে সকলের অপেক্ষার দিন-রাত।

আমাদের বসার ঘরে প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যায় জমজমাট আলোচনার আসর বসে, আসেন মীজানুর রহমানের বন্ধু-বান্ধব, অফিসের সহকর্মীরা দু’চারজন, পাড়ার ভদ্রলোকেরাও অনেকে আসেন। আলোচনা আর তর্ক-বিতর্কের ঝড় ওঠে। বারবার চা-নাশতার ট্রে পাঠাতে হয় তাদের।

রাত ন’টার পর অতিথিরা বিদায় নিলে খাবার টেবিলে বসে টিভিতে রাতের খবর শুনি আমরা। টেলিভিশনের খবরেই জানা যায় যায়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেছেন, খুব শীঘ্রই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।

আমার স্বামী মীজানুর রহমান খনিজ ভূতত্ত্ববিদ। পশ্চিম জার্মানি থেকে মাইনিং ‘এবং’ ‘কোল পেট্রোলজি’ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন। চাকরি জীবন শুরু তার পশ্চিম পাকিস্তানেই। পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনে দীর্ঘ কয়েক বছর কাজ করেছেন বেলুচিস্তানে। বিয়ের পরে সেখানেই আমার সংসার জীবনের শুরু। ছিলাম বেলুচিস্তান প্রদেশের রাজধানী কোয়েটা শহরে। তখন আইয়ূবী সামরিক শাসনের জমানা।

আইয়ূব খানের ‘বেসিক ডেমোক্র্যাসি’ দেখেছি, কিন্তু সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে সাধারণত নির্বাচন দেখিনি। ১৯৫৪ সনে পাকিস্তানে (দুই অংশেই) সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল। তখন আমি ইশকুলের ছাত্রী, ভোট দেওয়ার বয়স হয়নি।

আমাদের বাংলাদেশের অর্থাৎ সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ছিল যেমন রাজনীতি সচেতন, পশ্চিম পাকিস্তানে তেমন দেখিনি। বেলুচিস্তানে তো নয়ই। সেখানে তখনো মানুষ তাদের খানের শাসনের প্রতি অনুগত। দরিদ্র  নিরক্ষর বালুচরা অনেকে তাকে বলত ‘বাদশা’। মেনে চলত তারা ‘জিরগাব’ শাসন (যে ব্যবস্থাটি ব্রিটিশ-পূর্ব কাল থেকেই প্রচলিত ছিল।

ভারতবর্ষ অধিকার করবার পর বেলুচিস্তান দখল করতে অনেক সময় লেগেছিল ব্রিটিশদের। দফায় দফায় যুদ্ধের পর বেলুচিন্তানের সীমিত কিছু অংশ এসেছিল তাদের অধিকারে, যেটাকে বলা হত ব্রিটিশ বেলুচিস্তান। এর বাইরে স্বাধীন বেলুচিস্তানের শাসন ক্ষমতা ছিল খারান, মাকরান, লাশবেলা ও কালাত এই চারটি খানাতের বা রাজ্যের খান বা নবাবদের অধীনে। কালাতের খানের প্রতি বশ্যতায় ছিল অন্যান্য ‘খানাত’গুলো। সেই কারণেই  কালাতের খানকে বেলুচিস্তানের মানুষ বলত ‘খান-ই-খানান (খানদের খান)।

‘৪৭ এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময়, কালাতের খান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে জানিয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের অধীনতায় তারা যাবেন না, বেলুচিস্তান স্বাধীন থাকবে। অনেক দেন-দরবারের পরে জিন্নাহ তাদের আনতে সমর্থ হলেও তারা পাকিস্তানের করদরাজ্য হিসেবেই থেকে যায়, কালাতের খানের শাসন ক্ষমতা ও জিরগার শাসন বহালই থাকে। সামরিক শাসক আইয়ূবের ক্ষমতা দখলের আগে বেলুচরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বা সাধারণ নির্বাচন নিয়ে মাথা ঘামায়নি, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মতো রাজনীতি সচেতনও ছিল না তারা। আইয়ূব খানই তাদের স্বাধীনতার গর্বে প্রথম আঘাতটি হানে। খান-ই খানানের ক্ষমতা খর্ব করার জন্য আগ্রাসী হয়। এর ভেতরে অবশ্য আইয়ূবের একটি কূটকৌশল প্রচ্ছন্ন ছিল। আর সেটা ছিল পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করাই ছিল যার মূল উদ্দেশ্য। সিন্ধ (সিন্ধু), পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, ফ্রন্টিয়ার (বর্তমানে খাইবার পাখতুন খোয়া প্রদেশ) প্রদেশগুলির তুলনায় পূর্ব পাকিস্তান ছিল জনবহুল প্রদেশ। জনভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দের অর্থ পূর্ব পাকিস্তানেরই বেশি প্রাপ্য ছিল।

এর আগেও পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্য ভাগ থেকে বঞ্চিত করা  হয় তাকে। সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে। তারপরও পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করার জন্যই পশ্চিম পাকিস্তানের সব প্রদেশকে একত্র করে ‘ওয়ান ইউনিট’ করবার পরিকল্পনাটি করা হয়,  প্রয়োজন হয় বেলুচিস্তানের খানের শাসন বিলুপ্ত করার। শুরু হয় সংঘাত,  বেলুচিস্তান ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, পাকিস্তানের প্রতি প্রথম থেকেই তেমন আনুগত্য দেখায়নি। বরং তারা স্বাধীন পাখতুনিস্তান আন্দোলন সমর্থন করছিল। এর প্রভাব বেলুচিস্তানের পাখতুন বা পাঠান অধিবাসীদেরও প্রভাবিত করছিল। ঠিক সেই সময়েই কালাতের খানের শাসনক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে আগ্রাসন শুরু করল পাকিস্তান ব্রিটিশ বেলুচিস্তান হিসেবে চিহ্নিত কোয়েটা ও তার সংলগ্ন এলাকাগুলোতে পাকিস্তানি  শাসন ছিল নিরঙ্কুশ। ব্রিটিশদের তৈরি কোয়ার্টার সাজ ক্যান্টনমেন্ট ছিল তখন পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ সেনা ছাউনি। সেখান থেকেই আক্রমণ পরিচালিত হলো কালাতের খানের বিরুদ্ধে।

পাঠানরা ধরে নিল এটা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের স্বাধীন পাখতুনি লড়াই। বেলুচরা ভাবল- এ যুদ্ধে তাদের খানের স্বাধীনতার নস্যাতের জন্য। বেলুচিস্তানের কসাই বা ‘বুচার অব বেলুচিস্তান’ টিক্কা খানের নামটি তখনি আমার শোনা। তখন স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। এই বুচার অব বেলুচিস্তান একদিন বাংলাদেশের গণহত্যার অপরাধীদের একজন হিসেবে কুখ্যাত হবে।  আমাদের স্বপ্নের ডানায় ট্যাংকের শেলিং ছুড়ে হয়ে উঠবে বুচার অব বাংলাদেশ।

॥ দুই ॥

তখন থাকি বেলুচিস্তান কোয়েটা শহরেই, বেলুচি স্ট্রিটের ছোট বাড়িটিতে। বাড়ির মালিক লাসবেলা খানাতের সদস্য এক রাজকীয় পরিবার। থাকেন তারা আমাদের বাড়ির দেয়ালের ওপারেই শৌখিন বিরাট বাংলোটিতে। সেখানে অবাধ যাতায়াত আমার। অল্প দিনেই শিখে ফেলেছি বেলুচভাষা।  বেলুচি ভাষা বলবার দক্ষতার কারণেই নবাব পরিবারের সঙ্গে গড়ে উঠেছে আমার ঘনিষ্ঠতা। কিছুদিন থেকেই কোয়েটা শহরে চলছে নানা গুঞ্জন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে আর্মির বহর বেরিয়ে চলে যাচ্ছে .. শহরের বাইরে। নবাব পরিবারেও ইশারায় আকারে ইংগিতে নিচু শব্দে আলোচনা চলে নিজেদের মধ্যে, আমি গিয়ে দাঁড়ালেই চুপ করে যায় সবাই। বুঝে উঠি না কারণ, কিছুটা মর্মাহতও হই। মীজানুর রহমান তখন কাজ করছে শহর থেকে পঁচিশ মাইল দূরে সোর রেঞ্জ কোল মাইনে। ভোর না হতেই ওর অফিসের জিপ বাড়ির গেটে এসে হর্ন বাজায়। তার আগেই তৈরি হয়ে যায় মীজানুর রহমান যাবার সময় বলে যায়- বাইরের গেটটা বন্ধ করে দিয়ে যাও। পাঁচ হাজার ফিট উঁচু স্টেশনটিতে শীতের বরফ জমা তীক্ষ্ণ ঠাণ্ডা না হলেও জুন-জুলইয়ের ভোরেও থাকে আমাদের পৌষের কনকনে শীত। কোনো রকমে উঠে গেট বন্ধ করে আবার ঢুকে পড়ি লেপের তলায়। বেলা বাড়লে আমার বাড়ির ব্রোহী কাজের মেয়ে লাদ্দো আসে। তখন উঠি।

কোয়েটা ভ্যালির শহরটিকে অভিভাবকের মতো বিরাট গাম্ভীর্যে পাহারা দেয়। যে বিশাল পবর্তশ্রেণী- কোহে মুরদার বা মুরদার পাহাড়, তার চূড়ায় তখন রোদের ঢল নামে। লাদ্দো আমাকে গরম ধোঁয়া ওড়া চায়ের কাপ হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে আব্ উঠ্ যাও, বাজী। সূরয্ আ গিয়া।

ও জানে আমি প্রভাতী চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে জানালা দিয়ে মুরদার পাহাড়ের রোদ মাখা চূড়া দেখতে ভালোবাসি।  লাদ্দোই  আমাকে বলে – ক’দিন বাইরে কম যেও। শহর খুব গরম। হেসে ফেলি- তোমাদের এই শীতের শহর কোয়েটাতে গরম আবার কবে আসে! কলের পানি তো সব সময়ই বরফ পানি হয়ে থাকে।

লাদদো খুব সতর্কভাবে চারপাশে দেখে নিয়ে চাপা স্বরে বলে – কেয়া সোচা! আব্ লড়াই হোগা, যুদ্ধ হবে পাকিস্তানি হুকুমাতের বিরুদ্ধে। ওরা আমাদের আজাদী কেড়ে নিতে চায়।

বেলুচিস্তানের ব্রোহী বেলুচ পাঠানরা পাঞ্জাবিদের পছন্দ করে না, সেটা জানি, লাদ্দোর মত নিরক্ষর ব্রোহী কাজের বুয়া মনে করে পাকিস্তানি মানেই পাঞ্জাবি। লাদ্দোর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে হাসতে থাকি। মীজানুর রহমানের কোল মাইন থেকে ফিরতে প্রায়ই সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়, মাঝে মাঝে রাতও হয়। কয়লার খনিতে দুর্ঘটনা লেগেই থাকে, গ্যাস বিস্ফোরণ, আগুন লাগা, ছাদ ধসে পড়া, – তখন ফিরতে রাত হয়। একবার সারা রাতই কাটাতে হয়েছিল মীজানুর রহমানকে আর তার অ্যাডভাইজার পোলিশ মাইনিং জিওলজিষ্ট ড. স্লোভাস্কিকে।

বাড়ি ফিরেছিল যখন চিলতান রেঞ্জের পাহাড়ের সারিতে শব্দের প্রতিধ্বনি বাজিয়ে চলে  গেছে ভোর রাতের শেষ ট্রেনটি। মুরদার পাহাড়ের চূড়ার ওপরে রাতের তারা নিভতে শুরু করেছে।

তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ নামের বিখ্যাত ভারি ওজনের উপন্যাসটি কোলের ওপরে খুলে সারা রাত একইভাবে চেয়ারে বসে থেকে সবে তখন ঘুমিয়ে পড়েছি আমি।

ঘরে ঢুকেই মীজানুর রহমান  বলে – জলদি এক কাপ গরম কফি দাও। সারা রাত ঠাণ্ডায় জমে কাঠ হয়ে গেছি। সময়টা শীতকাল ছিল না, মধ্য বসন্ত। তখনও মুরদার চিলতানের শরীরে বরফের শিরা-উপশিরা গলে ঝরণা হয়ে নামেনি। ঘরের ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বালাতে হয়। পথে জিপ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হয়েছে মীজানুর রহমান আর ডা. ভস্কিকে।

এমন বিপাক মাঝে মাঝেই হতো।  তখন মোবাইল ফোনের যুগ নয়, কোনো মাবাইল কোম্পানি তখন বলত না- ‘যত দূরেই যাও, কিপ ইন টাচ্।’ শহর থেকে পঁচিশ মাইল দূরের সরকারি কোলমাইনে বেখবর মীজানুর রহমানের ফেরার অপেক্ষার রাতগুলোতে অসহায় দুশ্চিন্তায় আমি গল্পের বই কোলের ওপরে খুলে রেখে এক পৃষ্ঠাই সারা রাত পড়েছি কতবার।

লাদ্দোর সেই গোপন খবরের ভিত্তিতে শহর যখন ‘গরম’। তেমনি এক বিকেলে নবাব পরিবারের প্রয়াত কর্তা জাম সীর খানের বেগম তাদের বাড়ির দিকের দেয়ালের বন্ধ দরজাটি খুলে ডাকলেন আমাকে, বললেন – তোমরা সবাই ঠিকঠাক আছো তো?

অবাক হয়ে বলি, ঠিকঠাকই তো আছি লোম্বা। (বেলুচি ভাষায় লোম্বা অর্থ আম্মা, তাকে আমি লোম্বাই ডাকতাম।)

কেন, কী হয়েছে?

আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লোম্বা আবার জিজ্ঞেস করলেন  মীজান ফেরেনি এখনো?

বললাম  ফিরেছে। গেছে পাড়ার সেলুনে চুল কাটতে।

লোম্বা উদ্বিগ্ন হলো  এর মধ্যে আবার সেলুনে যাওয়ার কী দরকার! ও ফিরলে বলে দিও। আজ যেন আর বাইরে না যায়। যাবার সময় বলে গেলেন বাইরের গেট ভালো করে বন্ধ রেখ। অচেনা কেউ এসে হল্লা করলে, আমাদের খবর দিও।

মীজানুর রহমান ফিরলে, ব্যাপারটা তাকে জানালাম। আমলেই আনল না। বলল  বাঙালিদের ভয় নেই, ভয় পাঞ্জাবিদের।

দিন কয়েক আগে মীজানুর রহমানের পাঠান পিয়ন না কি বলেছিল এখানে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হবে।  পাঞ্জাবিদের তাড়িয়ে দেওয়া হবে এখান থেকে। মীজানুর রহমান কারণ জানতে চাইলে, সে নাকি বলে পাঞ্জাবিরাই তো ‘ওয়ান ইউনিট’ করে আমাদের ধোঁকা দিতে চাইছে। তার মতে, বাঙালি অফিসারের  অধীনে কাজ করতে তাদের আপত্তি নেই।

বাঙালিরা তাদের দূরের বাঙ্গাল দেশ থেকে লোক এনে বাঙালি নিয়ন দারোয়ানের চাকরি দেবে না। ‘ওয়ান ইউনিট’ হলে পাঞ্জাবিরা এসে সব অফিসের বস হয়ে বসবে। তখন পিয়ন-চাপরাশিও আসবে পাঞ্জাব থেকে। বেলুচ-পাঠানরা আর চাকরি পাবে না।

মীজানুর রহমানকে কয়লা খনির এক পাঠান শ্রমিক, বলেছে আমরা লড়াইর জন্য তৈরি হচ্ছি। এদেশে একজন পাঞ্জাবিও রাখব না। সব মেরে ফেলব। মাইনের সুপারভাইজার লায়েক সাহেব পাঞ্জাবি নন, ‘৪৭-এ ভারতের দিল্লি থেকে চলে এসেছিলেন কোয়েটায়, প্রশ্ন করেছিলেন  পাঞ্জাবি তোমরা কাদের বল?

শ্রমিকটির সোজা জবাব- ওবোকে (আবকে) যারা পানি বলে, তারা সবাই পাঞ্জাবি। এমন সোজা জবাবে মীজানুর রহমান তাকে বলে,  ওবোকে আমরা বাঙালিরাও পানি বলি। আমাদেরও মেরে ফেলবে? শ্রমিকটি লজ্জিত হয়ে, বলে  বাঙালিদের আমরা কখনো মারব না। বাঙালিরা শরীফ।

জাম মীর খানের বেগমের সতর্ক করে দেওয়ার পর বোধ হয় ভীতই হয়ে পড়েছিলাম। আমাকে সাহস দেওয়ার জন্যই মীজানুর রহমান এ গল্পগুলো শোনায়। বলে কোয়েটা তো ক্যান্টনমেন্টের শহর। এখানে তেমন কিছুই হবে না। হলে শহরের বাইরে। পাকিস্তানের টার্গেট তো কালাত, কালাতের খানের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া।

কোয়েটা শহরে দাঙ্গা-হাঙ্গামা তেমন হয় না। বেলুচরা স্বাধীনচেতা হলেও বাঙালিদের মতোই শান্তিপ্রিয়। বছরে একবার দাঙ্গা-হাঙ্গামা যা হয় সেটা সুন্নি পাঠানদের সঙ্গে শিয়া হাযারাদের। তাও মহরমের সময়। হাযারা (মোঙ্গল) দুর্ধর্ষ। মহরমের সময় পাঠানরা হাযারা মহল্লায় পাও বাড়ায় না। তবু দু’চারটে খুনখারাবি হয়ে যায়।

কোয়েটা ক্যান্টনমেন্ট-প্রধান শহর হলেও তেমন বড় ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়নি। তবে প্রতিরোধের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল শহরের বাইরে- প্রত্যন্ত পার্বত্য এলাকা থেকে পাকিস্তান সেনা বাহিনীর সাঁজোয়া বাহিনী নিয়ে কালাতের দিকে অগ্রসর হওয়ার খবরটি কারো অজানা ছিল না। হয় তো পাঠান বেলুচদের পাঞ্জাবিগুলো বেসরকারি এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছিল। শহরটা ছিল থমথমে। খবর উড়ছিল শহরের হাওয়ায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা না কি বেদম মার খাচ্ছে, অনেক ক্যাজুয়ালিটির খবরও পাওয়া যাচ্ছে ফৌজিদের লাশ আসছে প্রতিদিন ক্যান্টনমেন্টে। সামরিক হাসপাতালে আহত সৈনিকের সংখ্যাও যথেষ্ট। পদাতিক ও সাঁজোয়া বাহিনীর ট্যাংকের শেলিংও দমাতে পারছে খানের যোদ্ধাদের।            

কালাতের পথে মাসতুং থেকেই শুরু হয়েছে দুর্ভেদ্য পর্বতশ্রেণী। বোলান গিরিপথের এই পার্বত্য অঞ্চলের ঘাটিগুলো থেকে যুদ্ধ চালাচ্ছে বেলুচরা শোনা যাচ্ছিল খোদ খান-ই-খানান ইয়ার মুহম্মদ খানের ছোট ভাই প্রিন্স করিম খান, যিনি ওয়ালী ন্যাপের সদস্য, তিনিও যুদ্ধে অধিনায়কত্ব করছেন। শোনা যাচ্ছে আফগানিস্তানের কাছে সহায়তা চেয়েছেন খান-ই-খানান। প্রিন্স করিম খানের বিশেষ বন্ধু খান গফ্ফার খানের ছেলে  পাকিস্তান ন্যাপের নেতা ওয়ালী খানও নাকি কালাতের খানকেই সমর্থন করছেন।

যুদ্ধটা চলল দিন কয়েক। ট্যাংক বাহিনী কালাতে পৌঁছতে বাধা পাচ্ছিল, খানের যোদ্ধাদের আক্রমণে, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বিমানের সহায়তা নিতে হলো যুদ্ধরত পাকিস্তানি সেনা প্রধানকে।

সকালের দিকে এক ঝাঁক বোমারু বিমান আমাদের সেই শহরের আকাশ কাঁপিয়ে উড়ে গেল, ফিরল অল্প পরেই। বিকেলের  দিকে এক পেয়ালা চা নিয়ে আমার ঘরের সামনে খোলা চত্বরে এসে দাঁড়িয়েছি। মাথার ওপর দিয়ে স্বগর্জনে উড়ে গেল আবার যুদ্ধের বোমারু বিমানের ঝাঁক।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এই বোমারু বিমানগুলো যে কালাতেই বিমান থেকে বোমা বর্ষণের খবরটি জানলাম পরদিন আমার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী লাসবেলার নবাব পরিবারের কাছে। তারা ক্ষুব্ধ এবং বিষণ্ন। বিক্ষুব্ধ কালাত, লাসবেলা, মাকরান, খাবানের নবাব পরিবারগুলোর প্রায় সব সদস্য। যেন পাকিস্তান আঘাত করেছে তাদের স্বাধীন চেতা জাতীয়তাবোধে।

ওদের বাড়িতেই শুনলাম, বোমা বর্ষণে অনেক বেসামরিক নারীপুরুষ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। খানের সৈন্যদের বিধ্বস্ত করা হয়েছে। একদিন পরেই পতন ঘটল কালাতের। স্বাধীনচেতা বেলুচদের আত্মসম্মান আর অহংকারের প্রতীক, খান-ই- খানান ইয়ার মুহাম্মদ থানকে বন্দি করে নিয়ে আসা হয়েছে কোয়েটা ক্যান্টনমেন্টে। (চাপা উত্তেজনায় অগ্নিগর্ভ হয়ে আছে গোটা বেলুচিস্তান, বিস্ফোরিত হতে পারে আবার। খানকে কোয়েটায় রাখা নিরাপদ নয় ভেবেই তাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

অনেক পরে শুনেছিলাম সিন্ধ বেলুচিস্তানের সীমান্তে ঝালওয়ানের এক নির্জন বন্দিশালায় তাকে রাখা হয়েছিল।

একদিকে কালাত শহরের দখল নিচ্ছিল যখন পাকিস্তান সেনা বাহিনী, কোয়েটা শহরে চলেছিল বিদ্রোহী ও বিদ্রোহীদের ইন্ধনদাতাদের ধরপাকড়। প্রতি রাতেই  চলছিল সেনাবাহিনীর মার্চ-অভিযান। আমাদের পাড়ায় জাম মীর খানের বড় ভাইয়ের বাড়িতেও তার বড় মেয়ের স্বামী কালাতের খান পরিবারের যুবরাজ প্রিন্স করিম খানের খোঁজে সেনাবাহিনী হানা দেয়। তিনি সেখানে ছিলেন না। আগেই সরে পড়েছিলেন। পরে জেনেছিলাম তিনি ওয়ালীখানের সহায়তায় চলে গেছেন আফগানিস্তানের কান্দাহারে।     

কোয়েটা ক্যান্টনমেন্টে স্বাধীনতাকামী যোদ্ধা বেলুচ পাঠানদের বন্দি রেখে চলেছিল নির্যাতন। শহরের সাধারণ বেলুচ পাঠান পরিবারগুলো পাকিস্তান বিমান বাহিনী বোমা ফেলে বেসামরিক মানুষ হত্যা ও বেলুচিস্তানে সম্ভ্রান্ত গোত্রের মানুষদের নির্যাতনে ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিল।

এই সময়েই মার্শাল ল’ জারীর মাধ্যমে সমগ্র পাকিস্তানকে সামরিক আইনের কারাগারে বন্দি করে ফেলেছেন কালাতের যুদ্ধ নিয়ে বেলুচিস্তানের ধূমায়িত বিদ্রোহকে দমনের জন্য অত্যন্ত কূট একটি চাল চাললেন। বন্দি খানের বড় ভাইয়ের ছেলে তরুণ দাউদ তখন ইংল্যান্ডে পড়ালেখা করছেন, দাউদই ছিলেন প্রকৃত ক্রাউন প্রিন্স অর্থাৎ খান-ই-খানানের তখ্তের ওয়ারিশ। আইয়ূব খান তাকে দেশে ফিরিয়ে আনলেন, ভালো মতো মগজ ধোলাই করে তাকে বশ করে ফেললেন। রফা হয়ে গেল। খানের শাসন আর থাকবে না, বেলুচিস্তান সরাসরি পাকিস্তানের শাসিত প্রদেশ হয়ে যাবে। রাজকীয় পরিবারগুলো নিয়মিত মাসোহারা পাবে। ব্রিটিশ আমল থেকে প্রচলিত বেলুচদের ‘ট্রাইব্যাল’ বৃত্তিও বন্ধ হবে না।

সারিয়ার রোডে বিরাট আধুনিক বাংলো বরাদ্দ হয়ে গেল দাউদের জন্য। নির্ধারিত হল মোটা অংকের মাসোহারা। বিরাট দামি গাড়ি হাঁকিয়ে মায়না করা তরুণ নবাব শহর দাপিয়ে বেড়াতে থাকলেন দুঃখে, ক্ষোভে, অপমানে বেলুচিস্তান স্তব্ধ হয়ে থাকল, বেলুচিস্তানকে ‘সাইজ আপ’ করবার জন্য সব ব্যবস্থা  নেওয়া হলো, চাকরি বাকরিতে বেলুচদের সুযোগ কমল, উন্নয়ন প্রবাহ সীমিত হলো। গোপনে চলল বেলুচ নির্যাতন। বঞ্চনা আরো বাড়ল। বেলুচিস্তানের মানুষের মনে, স্বাধীনতার বীজ অঙ্কুরিত হতে শুরু করল। কালাতের যুদ্ধেই স্বাধীনতার বীজ উপ্ত হয়েছিল।

কালাতের যুদ্ধে দু’জন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন, একজন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে সেই বীর অধিনায়ক জেনারেল এ. এ. জি ওসমানী।

কালাতের যুদ্ধের বিশদ বিষয়ে জানিয়ে যিনি আমাকে ‘আমার শিলায় শিলায় আগুন’ উপন্যাসটি লেখায় সাহায্য করেছিলেন। উপন্যাসটি লিখেছিলাম ’৭৮ সালে, কালাতের যুদ্ধ ও বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাতের ঘটনা নিয়ে। আজ নিঃসন্দেহে ভেবে নিতে পারি পাকিস্তান আজকের বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী ‘বেলুচ ফ্রিডম পার্টির’ বীজ নিহিত ছিল কালাতের যুদ্ধ তারপরের বেলুচ নির্যাতনের নায়ক কুখ্যাত জেনারেল টিক্কা খান অর্থাৎ ‘বুচার অব বেলুচিস্তান’ নামে বেলুচদের কাছে ঘৃণিত ব্যক্তিটির নৃশংসতার কারণে। কালাতের যুদ্ধ কালে এম. এ. জি ওসমানী সাহেব ছিলেন পাকিস্তান সেনা বাহিনীতে কর্মরত, তিনিই আমাকে জানিয়েছিলেন কালাতের যুদ্ধের সামরিক পরিকল্পনাটি তারই করা।

কালাতের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আরেক বাঙালি সেনা কর্মকর্তা (পরে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী) ছিলেন, কর্নেল মুস্তাফিজুর রহমান (অব.)। তখন তিনি ছিলেন লেফটেন্যান্ট মুস্তাফিজুর রহমান। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আর্টিলারিতে। ট্যাংক নিয়ে তিনিই কালাতের রাজকীয় প্রাসাদের ফটক ভেঙে ঢুকে পড়েছিলেন। মসজিদের মিনারে উড়তে থাকা স্বাধীন খানের পতাকা গোলা বর্ষণে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল কালাতেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares