গল্প : রাহেলা বেওয়ার থুতু ও অন্যান্য ঘটনা : রেজওয়ান তানিম

রেজওয়ান তানিম ।।

সে-বার এদিকটায় শীত নেমেছিল পঞ্জিকার নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, বেশ আগেই। শীতের শুরুতেই ধোঁয়া ওঠা একটা ভাপ চারপাশ ছেয়ে থাকত যেন মাঘ এসে গেছে, গাছের পাতা ধুয়ে পড়তে থাকত শিশিরের জলকণা, নারী-পুরুষ সকলের গায়েই রংবেরঙের পুরু চাদর, সকালে ভাপা, পুলির বেহিসাবি রকম আয়োজন গেরস্থ ঘরে সমস্তটা মিলে শীতকে বরণ করে নিতে যতরকম আয়োজনের কথা মনে পড়ে, তার সবই হচ্ছিল সে বছর বিলাইমারা গ্রামে। হাড় কাঁপানো শীত নামার আগেই ও-রকম মিষ্টি এক সকালে বাড়াবাড়ি রকম আড়ম্বরে সাঙ্গোপাঙ্গ সহকারে গঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে বেলায়েত খাঁ। গণ্ডগোল তখনও চোখে দেখা দূরত্বে শ্বাস ফেলছে, অলীক গল্প বা লোককথা হয়ে উঠবার সুযোগ পায়নি।

বছর সাত-আট পার হয়েছে হয়তো, ভয়ঙ্কর সেই দিনগুলোর। বেলায়েত খাঁর জন্য গণ্ডগোল আর ওই অপয়া বছর সংক্রান্ত যে কোনো কিছু খাইখরচের গল্প, টং দোকানের খুচরো আলাপে হঠাৎ বদল, রাজনীতির রঙ্গমঞ্চের চরিত্রবদল কিংবা পয়সাপাতির লেনদেন সমস্তই অস্বস্তির।

তবে সেদিন লোকটা ওসব নিয়ে মোটেই ভাবছিল না।

নিমের দাঁতন দিয়ে মেসওয়াক শেষ করে লোকটা। সকাল সকাল কর্পূর মেশানো কুসুম গরম পানিতে কলপাড়ে বাসনা দেওয়া সাবান গায়ে ঘষে ঘসে গোসল সারে আর তারপর গায়ে চাপায় তার সপ্তাহখানেক আগে ঢাকা থেকে কিনে আনা শেরওয়ানি ও জিন্নাহ টুপি। যাত্রা ভালোয় ভালোয় শুরু করা, গ্রামবাসীকে একচোট দেখিয়ে দেওয়া; যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে আর আজ এর কোনোরকম ব্যত্যয় ঘটবে এমনটি ভাবারও সুযোগ নেই।

যাত্রা শুরু হলে দেখা যায় বেলায়েত খাঁর পেছনে জুটেছে গাঁয়ের লোকের দীর্ঘ সারি ছেলে-বুড়ো, বৃদ্ধ-কিশোর, বন্ধু-শত্রু সবাই আছে লাইনে। এ কথা রটে যায় শিরিশপুর মহকুমার সব গ্রাম কিংবা ইউনিয়নে- এলাকার মাথা বেলায়েত খাঁ নিয়ত করছে হজ্জ্বে যাইব এইবার, মক্কা নগরীতে গিয়া কালো পাথরে চুমা দিয়া এক্কারে গেদা ছাওয়ার মতো নিষ্পাপ হয়া ফিরব! 

দূরদূরান্ত থেকে হাজি সাবকে দেখার জন্য লোক আসতে শুরু করে। মহল্লার অবস্থাপন্ন লোকের তো কথাই নেই, এমনকি কৃষকরাও তাদের ক্ষেতের আলু, মুলা বা লাউটা এসে দিয়ে যেত; আল্লাহর ঘরে তাদের জন্য হাত তুলে দোয়া করতে বলত খাঁ সাহেবকে। শেষ অবস্থা এমন দাঁড়াল, যাত্রার জন্য নির্ধারিত সময়ের দিন পনেরো আগে, প্রতিদিন দুপুরের আহারের পর ঘণ্টাখানেক সময় বেঁধে হারাম শরিফ ভ্রমণেচ্ছু গর্বিত বেলায়েত খাঁ লোকজনের দাবিদাওয়া শুনতে লাগল। পরম ভক্তি আর শ্রদ্ধার সবটুকু নিয়ে দীর্ঘ সালাম বিনিময় শেষে গ্রামের মুরব্বিরা বলাবলি করতে থাকল-

‘আল্লার বাড়িত যাইচ্ছেন, কী সৌভাগ্য আপনের।

পাক দরবারত যায়া আমরার জইন্যে খাস দিলে দোয়া কইরেন, ভাইছাব।’

হজযাত্রা নিয়ে গ্রামে একটা শোরগোল হবে ধারণা ছিল বেলায়েত খাঁর, তবে এরকম জমক হবে ভাবতেও পারেনি সে। প্রত্যাশার সাথে সঙ্গতিহীন ঘটনার বাঁকবদলে সে সুখে পাগল হয়ে ওঠে। ঘুরপথে ঘণ্টাখানেক ইচ্ছে করেই হাঁটে আর সেই পুরো সময়টা পেছনে থেকে সঙ্গত দিতে থাকে একদল চামচা। কুৎসিত রকম দৃষ্টিকটু আচরণেও গ্রামের লোকের ভ্রু কুঁচকে যায় না, অবশ্যি যেখানে বেশিরভাগ মানুষ ক-অক্ষর গোমাংস আর বিস্মৃতিপ্রবণ, সেখানে অমন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। গ্রাম ছাড়ার আগে এলাকাবাসীর হাজি সাব লম্বা ভাষণে সহি সালামতে ফেরার জন্য সকলের দোয়া চায়। হারাম শরিফে গিয়ে এলাকার উন্নতি ও সকলের মঙ্গলের জন্য দোয়া চাইবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েই গ্রাম থেকে বের হয়।

গ্রামের সীমানা ছাড়ার আগেই বেলায়েত খাঁর মনের ভেতর শুরু হয় কপট এক হাসির দমক। গ্রামের লোকেরা হজের আগেই যেভাবে হাজি হিসেবে সম্মান দিয়েছে, এই একটি ঘটনাই তার নিকট অতীতের অপকর্ম বিষয়ে সকল দুশ্চিন্তা ও অন্ধকার এক ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে যথেষ্ট। বিলাইমারা থেকে বের হবার সময় প্রতিবারই লোকটার মনে হয়, প্রায় পুরো জীবনটাই পার করে দিল এই গ্রামে অথচ এখনও একটা বিলাই মারা হলো না। অবশ্যি আজকে যা হলো, তার চেয়ে ভালো আর কী হতে পারত ভেবে পায় না সে।

গরুর গাড়ি জলার পার বড় দিঘি পার হয়ে মন্তাজপুরের দিকে আগাতে থাকলে লোকটা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। মন্তাজপুরের আগে জলারপার দিঘি থেকে পুরো এলাকাটা মোটামুটি ঘন জংলা, মনুষ্যবসতি নেই তেমন। তাই ঠোঁটে চারমিনার ধরায় লোকটা, একজন ম্যাচকাঠি জ্বালিয়ে সামনে ধরে। আজকাল চারমিনার আর এদিকে পাওয়া যায় না তেমন, কাঁটাতারের এলাকা থেকে বহু ঝামেলা করে আনতে হয়।

‘কী একটা অবস্থা, বালের স্বাধীন দেশ! শখের একটা সিগারেট খাইতে মালুগো দিকে চাইয়া থাকতে অয়’

মুখে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে অনুযোগ করে বেলায়েত খাঁ। আবার পরক্ষণেই হেসে ওঠে হা হা করে।

সমস্ত অপকর্ম, দোষ-ত্রুটি, গণ্ডগোল, রাজাকার, খুন, ধর্ষণ, মুক্তিযোদ্ধা ধরিয়ে দেওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে এলাকা ছাড়া হওয়া সমস্ত জটিলতা একবারে চাপা দিয়ে আসা লোকটার জন্য মন্তাজপুরে কী অপেক্ষা করছিল, তা ওই মুহূর্তে একেবারেই জানা ছিল না তার, দুষ্কর ছিল হয়ত কল্পনা করাও…

দুই

সয়ে আসা বাতাসহীন নিবিড় অন্ধকারের মাঝেই গত রাতে ঘুম ভেঙে যায় আমার; দুঃস্বপ্নের মুহূর্তটুকু চিরে মশারি ছেড়ে বের হই আমি। বুঝতে পারি বুকের পশম, চুল, ঘাড়ের পেছন এমনকি পিঠের সমস্তটাই ঘামে ভিজে উঠেছে। উপরে একটা ফ্যান রয়েছে যেটা কিনা প্রবল বিরক্তি নিয়ে ঘুরছে আর ঘরঘর শব্দ করে যাচ্ছে। ঘরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকারের রাজত্ব। চাঁদ ডুবেছে বেশ কিছুক্ষণ, শেষ রাতের ছাপ রেখে…

নিয়মমাফিক ছাপোষা জীবনে দারুণ অভ্যস্ত আমার এমন নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঘুমের কমতি হয় না আমার। বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়ি, একটানা পাঁচ-ছয় ঘণ্টা চলে দীর্ঘ নিঃশব্দ ঘুম। ভ্যাপসা গরম, টিনের চাল থেকে নামা বাদলার ধারা কিংবা শীতের অসহ্য কাঁপন সমস্তই সহ্য করে যেতে পারি এমনকি পাশবদলও করতে হয় না তেমন একটা। এমনকি বদ খোয়াবের পাল্লায়ও পড়তে হয় না মাশাল্লাহ।

কিন্তু আজ, আজ যা দেখলাম তা এত জীবন্ত লাগল যে, মনে হলো সত্যিই অমন কিছু ঘটে গেছে।

বিছানা থেকে নামতে শায়লাকে ডিঙিয়ে যেতে হলো। বিয়ের আগে শায়লার মুখ থেকে মিনিট দুয়েকের জন্য কথা বের করতে পেটে বোম মারতে হতো আর আজকাল ওর কথা থামাতে সেটা লাগে। পাশের ঘরের মহিলার নতুন কেনা শাড়িটার রং কী, সামনের তিনতলা বাড়ির যৌথ পরিবারে কার কী সমস্যা, ছোটনের বড় ভাইয়ের গোপনে বিয়ে করার সমস্ত গল্প স্বামীকে শোনাতেই হবে যত রাতই হোক। আজও আমি ঘুমিয়ে যাবার বেশ অনেকটা পরেই যে ও ঘুমিয়েছে; সন্দেহ নেই। তাই স্বাভাবিকভাবেই ওর ঘুম নেভেনি একটুও, সগর্বে নাক ডেকে চলছেই।

ছেলেরা ও ঘরে ঘুমাচ্ছে। বড় ছেলেটা বেশ ডাঙর হয়ে উঠেছে, মুসলমানির পর থেকে লুঙ্গি পরা শুরু করেছে আর ছাড়েনি। মেয়েটার বিয়ে দেওয়ার সময় ছিল এইটুকু মাত্র, এই ক’বছরে গায়ে-গতরে বেড়ে উঠেছে। ছোট ভাইয়ের সাথে ঘর ভাগাভাগিতে বেজায় আপত্তি তার, নিজের জন্য একটা ঘর চায়। আকারে যত দ্রুত বাড়ছে, বুঝ-ব্যবস্থাটা যদি তার সাথে তাল রাখতে পারত, তাহলে কষ্টটা কম হতো আমাদের।

গত মাস তিনেক, অফিস শেষে প্রায় প্রতিদিনই আশপাশের বাড়িগুলোয় ঘর খালি আছে কিনা সেদিকে খোঁজ রাখছি। আরেকটু বড় বাসায় বোধহয় এবারে যেতেই হচ্ছে। হাজার দু-তিন, বড়জোর পাঁচ হাজার এর বেশি বাড়তি খরচ নেবার সামর্থ্য আমার নেই।

গত ছাব্বিশ বছরে গ্রামে যাবার কথা মনে হয়নি এমন কোনো মাস যায়নি। তবে ও চিন্তাকে  হারাম বলে দূরে সরিয়ে রেখেছি। কিন্তু আজ যে দুঃস্বপ্ন আমাকে ইশারা দিয়ে গেল, সেটাকে অবহেলা করা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছি না।

স্বপ্নে দেখতে পেলাম, একটা শিশু দৌড়াচ্ছে। তাড়া খাওয়া দৌড় না, বেশ আনন্দেই; অনেকটা খেলাচ্ছলে। দৌড়াতে থাকা শিশুটি একসময় তার ছায়ার দৈর্ঘ্যের মতো বাড়তে বাড়তে হয়ে যায় পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষ। এই পর্যায়ে লক্ষ্য করি, দৌড়াতে থাকা মানুষটি আর কেউ নয়, সে আমিই।

আর এই আমি-র দৌড় এই পর্যায়ে খেই হারায়। শৈশবের আনন্দ, ফুর্তির উচ্ছ্বাস মিলিয়ে যায়; সামনের তুলনামূলক রুক্ষ ধুলোমাটি, নবীন ধানের ক্ষেতে। সবজি বা কচুখেতের ধার ধরে আগাতে থাকলে সামনে পরে খেজুর, সুপারি বা তালের গাছ; ওগুলো পেরিয়ে সামনে আগালে চোখে লাগে বনবাদাড়ে ঘেরা এলাকা আর তার বাদে জলার পার। অনিশ্চিত অথচ জ্ঞাত ফলাফলের একটা ঘটনার পেছনে ইঁদুর বিড়ালের খেলা চালাচ্ছি যার অর্থ খুঁজে পাওয়া হয়তো অসম্ভব।

দৌড় শেষ হয় মোটামুটি বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের কোনো এক অচিন গেরস্থ বাড়ির সামনে, যাতে ঢুকতেই চোখে পড়ে মরাবাড়ির যাবতীয় আয়োজন। মৃতব্যক্তিকে ঘিরে জনাকয়েক লোকের কান্না দেখতে পেলাম; কিন্তু কে মরেছে দেখা হলো না। আর তখনই প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হলে আমি জেগে উঠি।

আলনা থেকে আগামীকালের অফিসে যাবার প্যান্টটা তুলে লুঙ্গিটা পাল্টে নিলাম। আমাকে যেতেই হবে মন্তাজপুর। ছাব্বিশটা বছর বিলাইমারা, মন্তাজপুর কিংবা জলারপারে আমার পায়ের ছাপ পড়েনি! ওখানে গেলে কেউ আমাকে চিনবে কিনা সন্দেহ আছে যথেষ্টই।

অন্ধকারে মোবাইলের খোঁজ বের করার মতো সময় এখন হাতে নেই। ছেলের পড়ার টেবিলে শায়লার জন্য ছোট্ট একটা চিরকুট লিখে রাখলাম।

হয়তো অনর্থক আবেগ, এর দাম সুদে-আসলে মেটাতে হতে পারে। তবুও ঠিক করলাম যেতেই হবে আমাকে। শেকড় আমাকে ভুলে গেলেও, আমাকে অস্বীকার করলেও আমি যে তারই কাণ্ড…

তিন

ও মিয়ার ব্যাটা, ক দেকি আমারে, ছিলকাডা ভাংতে পারস কিনাÑ

সবুজ বুড়ি হাটত যায়

হাটত গিয়া চিমটি খায়

পথে পথে ঘুরতে থাকা আর ভিক্ষাবৃত্তিতে ক্ষুন্নিবৃত্তি করা রাহেলা বেওয়ার মস্ত এক নেশার নাম ছিলকা ভাঙা। শুধু যে ছিলকা তাই নয়, পুঁথি, পালা ও লোকগান আর পুরনো বচন নিয়ে বুড়ির আসক্তি দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। ভিক্ষে করার পাশাপাশি ছিলকা ভাঙা, পুরনো গান গেয়ে শোনানোই বিকল্প পেশা হয়ে উঠেছে অনেকটা। পথে ঘাটে চলার ফাঁকে কথা বলার মতো কাউকে পেলে আমোদে মেতে ওঠে।

কথার রাশ টানা বুড়ি ভালো-মন্দ কুশলাদি জিজ্ঞেস বাবদ দু’দণ্ড ব্যয় করতে না করতেই শুরু করে দেয় ছিলকার প্রসঙ্গ। কথা যে প্রসঙ্গেই থাকুক ঘুরে ফিরে কেমন যেন নিজের পছন্দের বিষয়ের দিকে নিয়ে আসে। এরপর জেরার মতো চালাতে থাকে হররোজ ছিলকা ভাঙার খেলা। হাটবাজারের দিনের সকালে তার আনন্দের ঢেউ দেখে মনে হয় সে যেন কিশোরীবেলায় ফিরে যায়। লোকের ব্যস্ততা, মালসামানের ওঠানামা, কেনাকাটার ঝুটঝামেলার মাঝে গিয়ে বুড়ি হয়তো কাউকে কাউকে এভাবে চমকে দিয়ে বলে বসে। বুড়ির এই অবাঞ্ছিত প্রশ্নের কোনো উত্তর না জানা ব্যাটা মাইনষেরা ভীষণ ত্যক্ত হয়। তাদের কেউ কেউ রাগ দেখিয়ে বলেই বসে-

‘মুই পারং না, ইবার মোক ছাড় তো বুড়ি। কাম আছে মেলা।’

লোকটা হয়ত উত্তর না দিয়েই এভাবে এড়িয়ে যায় কিংবা বুড়িকে পাত্তা না দেবার চেষ্টা করে। তখন উত্তর না দিতে পারা লোকটাকে লজ্জা দেবার চেষ্টা করে বুড়ি, খিলখিল হাসি চলতে থাকে, সে বলে আর হাসেÑ

‘কদু বেচবার আইছু কিন্তু কদু চিনিস না।’

মন্তাজপুর গ্রামকে হাতে গোনা যে ক’জন মানুষ আশপাশের গ্রামগুলো থেকে একটা আলাদা পরিচয় দিয়েছে তাদের একজন ফোকলা দেঁতো রাহেলা বেওয়া। বুড়ির চেয়ে-চিনতে খাওয়ার এই প্রবণতা নিয়েও লোকে বিরক্ত। হয়তো মজিদ মিয়ার দোকানে গিয়ে চাইল রং চা, হয়ত মদনের দোকানে গিয়ে চাইল মণ্ডা-মিঠাই কিংবা সুলেমানের দোকানে গিয়ে একটা নতুন শাড়ি। বুড়ির এসব আবদার একেবারেই অন্যায় বলে সাব্যস্ত করে গ্রামের লোকেরা, তবুও বিচিত্র কারণেই সবাই প্রশ্রয় দেয়, তেমন কিছু বলে না। মজিদ মিয়া বিরক্তি মুখে নিয়েও দোকানের বেঞ্চের নিচে বসে থাকা বুড়িকে চায়ের কাপটা ধরিয়ে দেয়। 

কারও কাছে বাচাল বুড়ি, আবার কারও কাছে ছিলকা বুড়ি এমন নামের আড়ালে আসল নাম রাহেলা বেওয়া হারাতে থাকে। তা নিয়ে খেদ নেই তার, সবাইকে বরং বলে বেড়ায়।

‘ছিলকা হামার সাত জনমের সই, ওরে আমি কবরে নিয়া সংসার বাইধবো গা।’

কত ধারার ছিলকা যে বুড়ির মাথায় পোকা হয়ে বাসা বেঁধেছে, সে খোঁজ রাখা মুশকিল। হেন কিছু নেই যা ছিলকার বাইরে; জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, সঙ্গম- জীবনের সব নিয়েই গপপো করার বিচিত্র জগৎ বুড়ো মহিলাটির। এসব গাঁথা সবাইকে জানাতে চায়, বলে যেতে চায় সে কিন্তু কেউ শুনতে চায় না। কথাটা অবশ্যি একেবারে সত্য নয়, উঠতি বয়সী ছেলেছোকরার দল অনেক সময় নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর প্রতি আগ্রহবশত বুড়ির কাছে গিয়ে হাঁক ছাড়ে-

‘ও ছিলকা বুড়ি, অনেক তো ছিলকা হুনাইলা,

অহনে একটা পিরিতের গান শুনাও দেকি হামাগের, শরিলত জোস লাগায়া শুনি।’

তখন বুড়ির বড্ড আনন্দ হয়, কখনও হাসি এত প্রবল হয় যে, সামনের দিকের দাঁত হারিয়ে ফেলা ভোঁতা মাড়িটাও বেরিয়ে আসে। তখন বুড়ি মেজাজ-মর্জি অনুযায়ী গান ধরে, দুঃখ কিংবা সুখের বেশিরভাগ সময়ে গান বা ছিলকা নির্দোষ বিনোদন হিসেবে পরিবেশিত হলেও মাঝেমধ্যে এগুলোর সীমা ছাড়িয়ে যায়। কথা বলার লোক না পেয়ে উঠতি বয়সের ছেলেছোকরাদের নাতিন বলে ডেকে বসিয়ে পচা গপ্পের ডালি খুলতে শুরু করে রাহেলা বেওয়া। ছেলেগুলোও বয়সের দোষে বড়মানুষের বিষয়-আশয় নিয়ে প্রশ্ন করতে থাকে, বুড়িকে উৎসাহ দেয় সঞ্চিত জ্ঞানভাণ্ডার প্রকাশে।

কে না জানে, বয়স্ক মানুষের বিষয়-আশয় ছেলে ছোকরাদের বলতে নেই; এসবের অনেক রীতিমতো অশ্লীল, কান গরম করে দেবার মতো। তবে এ নিয়ে ভাবার সময় ও ইচ্ছে নেই বুড়ির, মনোযোগী শ্রোতা মেলে না সহজে আজকাল। তাই কালেভদ্রে কোনোদিন মাত্রাজ্ঞান ছাড়িয়ে গেলে, একটু বড় মানুষের বিষয়গুলো ওরা শুনে ফেললে কী আর এমন ক্ষতি!

গ্রামের মুরব্বিরা মনে করে এতে উঠতি বয়সীদের চরিত্র নষ্ট হবার শঙ্কা বাড়ছে। কিন্তু বয়স্ক বলে শক্ত করে কেউ কিছু বলতেও চায় না। এসবের মাঝেই চলে বুড়ির ছিলকা ভাঙা, গঞ্জের বাজারের কাছে ভিক্ষা করতে বসা বুড়ি বলেই চলে, বলেই চলে। প্রায় অন্ধ হয়ে যাওয়া বুড়ির শুধু শুরুতে শোনার মতো একজন শ্রোতা দরকার। এরপর সামনে কেউ আছে কি নেই তার গ্রাহ্য সে করে না, গল্প চলতে থাকে।

আশ্চর্য হলেও সত্য, অকস্মাৎ এমন দু-একজনের দেখা মেলে যারা এসবের গুরুত্ব বোঝে। কেউ কেউ শোনার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আসে, বুড়িকে টাকাও দিয়ে যায় শোনার বদলে। খুব বেশিদিন না, বছর ছয়েক আগের কথা, গ্রামের অনেকেই দেখেছে; শাদা চামড়ার এক ফিরিঙ্গি সাবকে নিয়ে শহর থেকে সাহেব মতো দু-তিনজন লোক এসেছিল। এসে এর-ওর কাছে জিজ্ঞেস করে বের করে বুড়ির ঠিকুজি।

এমনই যার ছিলকা প্রীতি, সেই বুড়িও মধ্যে মধ্যে বয়সের ফ্যাঁকড়ায় আটকে যায়, শরীর খারাপ হয়ে যায় যখন তখন। ওই সময় সে কেমন উদাস হয়ে যায়। সদাচঞ্চল হাসিমাখা মুখ আর চলতে চায় না, গম্ভীর হয়ে ওঠে। বলার ধরনে ও বিষয়ে পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু ছিলকা থেকে যায়। হয়তো তখন সে জিজ্ঞেস করে এ রকম একটা ছিলকা-

‘আয় মাঁই ঘরোত যাই,

ঘর আছে তার দুয়ার নাই।’

সন্তোষজনক উত্তর পাবার জন্য স্বাভাবিক সময়ের চেষ্টার কিছু দেখা যায় না আর। কৌশলে ধারণা বাতলায় না, এমনকি উত্তর পেতে একটু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতেও পছন্দ করে না তখন। উত্তর না এলে নিজেই বলে দেয়-

‘উয়ার উত্তর কবর, আন্ধার ঘরই হচ্ছে উত্তর।

সবারই যাওয়া লাগবে। মিয়ারা সময় থাকতে আমল কর, হও হুঁশিয়ার।’ 

চার

চৈত্রের তীব্র দহন যখন ফেলে যায়, অসহ গরমের শ্বাস অথবা জ্যৈষ্ঠের মাটিফাটা গরমে ভাপ ওঠার দশা হয় ফসলি ক্ষেত থেকে, তখন গ্রামগুলোর ছোটখাটো ডোবানালা, মজাপুকুর এক ফোঁটা পানির তৃষ্ণায় গলা ট্যাটায়।

সেই সময়টায় কাকচক্ষু এই দিঘিজল তাতানো রোদে নগ্ন হয়ে যাওয়া জলাধারগুলোকে দেয় নিবিড় আশ্রয়। কালের গ্রাসে দেখতে দেখতে ব্রিটিশরাজ গেল, পার্টিশন সমূহ অভিশাপ নিয়ে হাজির হলো, সম্প্রীতি আর ভাই-দাদা সম্পর্কের খাতায় বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভয়ংকর অপচর্চার জয় হলো দাঙ্গার নামে, শেষমেষ অনেক রক্ত আর কান্নার পর স্বাধীনতা নাম দিয়ে পাকিস্তান হলো কিন্তু জলার পার দিঘিটা রয়ে গেল ঠিক একই রকম।

দিঘিটা ঠিক কবে খোঁড়া হয়েছিল তাও পরিষ্কারভাবে জানা যায় না। মন্তাজপুরের গ্রামের নাম যার নামানুসারে, সেই মন্তাজ মিয়া যখন উদ্বাস্তু হয়ে এ অঞ্চলে এসে ঘর তুলেছিল কপর্দকশূন্য অবস্থায়, তখনও এ দিঘি ছিল; আর ছিল তার অযুত অভিশাপের কেচ্ছা। গ্রামের উত্তরে জেলেপাড়ার কার্তিক একবার জামশেদকে গল্প শুনিয়েছিল-

‘ওই দিঘি বলে হাজার বছর আগে খোঁড়া হইছে, এডা বলে কোন মাইনষের কাম নয়।’

জামশেদ বিশ্বাস করেনি বলে কার্তিক খুব খেপে গিয়ে বলে ওঠে-

‘ময়মুরুব্বিরা কি তাইলে মিছা কতা কইছে?’

জলার পার দিঘির গল্প চিরনতুন, প্রতিটি দিনের মতো; বহমান ও সতেজ। এসব লোকেরা শুনেছে গেরস্ত মুরব্বিদের কাছ কাছে, তারা শুনেছে তাদের বাপ-দাদার কাছ থেকে এভাবে নিস্তরঙ্গ জীবনের চাকা ঢিমে তেতালা গতিতে গড়াতে থাকে, শতবছরের পরম্পরায় চলতে থাকে মাটিবর্তী মানুষের জীবনের গাথা রচনা। এই দিঘি ঠিক যেন সর্বংসহা দেবীর মতো, বৃহৎ বুকে যার ঠাঁই মিলেছে শুষ্ক, রুক্ষ, মৃতপ্রায় সন্তানদের।

জলদাত্রী আর দুর্গতিনাশিনী এ মা, এই মহামহিম দয়ার্দ্র জলার পার দিয়ে গেছে অবিরাম আর নিয়েছে শুধু একবার, চরম মূল্য। জলের ধারায় মিশে গিয়েছিল ভীষণ করুণ সুর, রক্ত ও ক্লেদের সেই দিনগুলোর কথা ভুলে গেছে উত্তরপ্রজন্মের অনেকেই।

সেই সময়টা অন্ধকারের, অনেক হারানোর। মুক্তিযুদ্ধের সময়টাকে বহুকাল ধরে এলাকার লোকেরা বলে আসছে গণ্ডগোলের বছর। সে বছর দিঘিটা বারবার ভেসে গিয়েছিল রক্তে। নরপশুদের বীভৎসতা দেখেছে জলার পারের প্রতিটা গাছ, প্রতিটা ঘাসে লেগে আছে এখনও ভুলে যাওয়া রক্তের উপাখ্যান।

গোবিন্দপুর, গোসাইপাড়া আর ধীবরপল্লি হিন্দুপ্রধান এ গ্রামগুলো থেকে শত শত হিন্দু জোয়ান ছেলেদের ধরে এনেছিল হিংস্র নরপশুরা। বাদ যায়নি মন্তাজপুর বা শিরীষপুরের মতো এলাকাও। মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধা কিংবা তাদের সাহায্যকারী এই সন্দেহে দাঁড় করিয়ে ঠা ঠা ঠা শব্দে একটানা শুধু গুলি চলেছে; বীভৎস আর্তনাদে হয়ত সেদিন খোদার আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল।

গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়া দেহগুলোর নিস্তার মেলেনি মৃত্যুতে, খানসেনারা এসব মালাউন আর গাদ্দাররা মরেছে কিনা তা মৃতদেহ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নিশ্চিত করেছিল। শুধু যে হিন্দুদের মেরেই তার লোকেরা থেমেছে বা ধর্মের কারণে বাকিদের নিস্তার মিলেছে এমন নয়; বরং তার করাল থাবার গ্রাসে ভাই, স্বামী কিংবা পিতা হারিয়েছে এ তল্লাটের বহু নারী; সঙ্গে হারিয়েছে নিজের সতীত্ব। ওদের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে বেলায়েত খাঁ আর জয়নাল চেয়ারম্যানের দলবলে।

দু’জনেরই তখন ছিল কম বয়স আর ভরা যৌবনের পুরো শক্তি দিয়ে ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’-এর চেতনা বাস্তবায়নের কাজ করে গেছে তারা।

রাহেলা বেওয়ার স্বামী আর আট বছরের সন্তানটিও রাজাকারের শ্যেন দৃষ্টি এড়াতে সক্ষম হয়নি। ওরা প্রায় সময়ই মুক্তিবাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় রসদপত্র, গোলাবারুদ লোকের চোখ এড়িয়ে পৌঁছে দিত। হত্যাকাণ্ডের দিন রাহেলা বেওয়ার পরিবারও তাদের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিল দিঘির জলে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য মহিলা স্বামী সন্তানকে ছাড়িয়ে নিতে এসে শিকার হন অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতার।

একটা তালগাছে বেঁধে তাকে প্রত্যক্ষদর্শী করা হয় এ তল্লাটের সবচেয়ে ভয়াবহ জলার পার হত্যাকাণ্ডের। সবার শেষে আলাদা করে হত্যা করা হয় প্রাণপ্রিয় স্বামী আর মাসুম ছেলেটাকে। এখানেই শেষ নয়, ওই জলারপারের চার চারজন পাক আর্মির অফিসার ফর্সা মাঝবয়স থেকে একটু কমের রাহেলা বেওয়াকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণ শেষে রাহেলা বেওয়ার ডান বুকটা কেটে নিয়ে চলে যায় ওরা।

নিথর, নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা দেহটার ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলারের যাতায়াত তখনও শেষ হয়ে যায়নি। খ্যাঁক খ্যাঁক হাসিতে ফেটে পড়া বেলায়েত খাঁ সেদিন পাক আর্মিদের সন্তুষ্ট করার এনাম হিসেবে রাহেলা বেওয়ার উপর চড়াও হওয়ার অধিকার আদায় করে নেয়। বিক্ষত যোনি যখন রক্তে ভেসে যাচ্ছিল তখন সেটার ভেতরের গর্তটা আরও বড় করতে ছোট মুলিবাঁশটা ঢুকিয়ে দেয়। অসভ্য কতকগুলো গৌরবদণ্ডের বিরামহীন আসা-যাওয়ায় বেঁচে থাকার আশা হারিয়ে ফেলা রাহেলা বেওয়ার সতীত্বের সমস্ত অহংকার,  সংসার-ধর্ম পালন আর বেঁচে থাকার ঠুনকো আনন্দটুকু ধুলায় লুটিয়ে দিতে থাকে।

দিনভর এত নির্যাতনের শিকার রাহেলা বেওয়া ওরফে ছিলকা বুড়ি বোধহয় কই মাছের প্রাণ নিয়েই এসেছিল, না হলে অমন তীব্র মানসিক ও শারীরিক আঘাতের পর তার আর বেঁচে ফেরার কথা নয়। তবু সে বেঁচে গেল, হয়ত আরও কিছু অপমান পাওনা ছিল মৃত্যুর আগে।

জলার পারের জলে কত প্রাণের দাম চুকিয়ে স্বাধীনতা এনেছে এলাকার লোকেরা; এইসব রক্তের কথা, ছিলকা আর গানের মধ্যে জীবনের সুখ খুঁজে নেওয়া রাহেলা বেওয়ার সর্বস্ব ত্যাগ করে আসার কাহিনির বীভৎসতা;  বেদনার কথা আজকালকার ছেলেছোকরারা জানে না, জানতেও চায় না। সমস্তই আস্তে আস্তে কেমন ধূসর হয়ে উঠছে, পূর্বসূরিরাও কেমন জীবনের ঘানি টানতে টানতে ভুলে যাচ্ছে এইসব রক্তখরচের মহাকাব্যিক উপাখ্যান।

পাঁচ

পথের দু’ধারে বিস্তীর্ণ নাল জমি, হেমন্ত আসছে জানিয়ে দিতেই যেন ফলভারে নত হয়ে চোখে লাগছে অদ্ভুত সুন্দর ঢেউখেলানো ধানের ক্ষেত। ওগুলোর দিকে এ সময়টায় তাকালে যেন মনে হয় সারা মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে সোনাফুল। পথের দু’পাশে বা যেখানেই সামান্য পতিত জমি আছে, সেখানেই হাওয়াই মিঠাই কাশফুলগুলো অপার আনন্দে দুলে দুলে খেলা করতে থাকে, সামান্য আড়বাতাসে।

এসবের কিছুতেই চোখ যাচ্ছে না আর। অন্য সময় হয়ত এসব দেখে পুরনো স্মৃতিগুলো জেগে উঠত, মন বলে উঠত দু-যুগের বেশি না দেখা মাটি জলের অগুনতি সন্ধির কথা।

এখন আমার সমস্ত মনোযোগ খানিকটা দূরে চলতে থাকা গাড়িটির চাকার দিকে। সরু পথে চলতে থাকা গাড়ির চাকা একটার পর একটা চক্র পূর্ণ করছে, আর মৃত্যু যেন পরম সখা হয়ে জড়িয়ে ধরতে এগিয়ে আসছে। ওরা ক্ষণ গুনে যাচ্ছে প্রতিমুহূর্তে কতদূর আর কতদূর।

আমার চোখ দুটো এখন ভয়ঙ্কর রকম একরোখা, জীবনের বিদ্রুপমাখা আলো-ছায়া-রং দেখে দেখে এখন ক্লান্ত। মৃত্যুময় হয়ে থাকা আমার চিন্তাজগতে রাতের শাড়িসজ্জা শুধুই গাঢ় হয়ে নামা অন্ধকারের রাজত্ব। যে ক’টা নক্ষত্র সামান্য আলো ছড়িয়ে দূর করতে চেয়েছিল, কালচে মায়ার ভ্রম খেলাটুকু, সেটাকে সযত্নে ঢেকে দিয়েছে বড়-ছোট কিছু বেয়াড়া মেঘ।

বোঝার মতো বয়স হবার পর থেকে মায়ের ভালোবাসা পাইনি কোনোদিন। মায়ের চোখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারতাম তিনি আমাকে ঘৃণা করেন, ঘুমের মধ্যে চেতনা ফিরলে শুনতে পেতাম অভিশাপগুলো। এমনকি সময় সুযোগ পেয়ে গেলে হয়ত মেরেই একদিন শান্তি পাবেন।

অথচ তাকে ঘৃণা করা তো দূর, আম্মার সম্পর্কে কখনও কটু কথাও ঘুণাক্ষরে ভাবিনি। তার মতো মহীয়সী নারীর পায়ের নিচেই যে আমার বেহেশত- এই বিশ্বাস বুকে নিয়ে আমি শান্তিতে মরতে পারব…

নানান ঝড়-বাদলের পরেও আম্মা তুলনামূলক দীর্ঘজীবনই লাভ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় নিষ্ঠুরতম নির্যাতনের শিকার, পরবর্তীকালে চেয়েচিন্তে আধপেট-এক পেট খেয়ে দিন গুজরান; এতকিছুর পরেও ছিলেন প্রাণশক্তিতে উচ্ছল। বিয়েবাড়িতে গীত গেয়ে কারও চোখে জল আনতেন, আবার কারও ঠোঁটে হাসি। আম্মা অনন্ত জীবনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেন দিন তিনেক আগে। আমি যতক্ষণে মন্তাজপুর গিয়ে পৌঁছাই, ততক্ষণে দেখতে পাই কোরআন পড়া শেষ করে হাফেজরা তাদের বাক্স-পেটরা গুছিয়ে রওনা দিয়েছে। লাশ দাফন করে মাত্রই ফিরে আসছে গাঁয়ের লোকেরা। মা নিজের সন্তানের চেয়েও যাদের আপন বলে মনে করতেন, সেই আমেনা বেগম আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলল-

ভাইজান, ও জামশেদ ভাইজান! আইলেন যহন, ঘণ্টা দুই আগে আইলেন না ক্যান?

খালায় মরণের আগে আপনের নাম কইরা কইল- বাজান রে, অবুঝ মায়রে তুই মাফ কইরা দিস। 

সম্মুখে দীর্ঘপথ, বড়বাজার এখনও মাইল দশেক।

সময় গড়িয়ে চলে, চাকা গড়াতে থাকে; পথের ধুলো ওড়ে। ছিলকা পাগল গ্রামের এক সাদাসিধে গাঁয়ের বধূর ওপর পাশবিক নির্যাতনের ফলে যার জন্ম, যার রক্তে নির্যাতনকারী নরপশুর ছায়া লেগে আছে, তাকে রাহেলা বেওয়া যদি সহ্য করতে না পারে; তবে তাকে কি কোনো দোষ দেওয়া চলে? জন্ম পাপের দোষ শুধুই আমার, একলা বয়ে যাবার! আল্লাহর কাছে বারবার হাত তুলে বলতে থাকি- সারাটা জীবন যার কেটেছে এমন নির্যাতনে, তার কবর তুমি জান্নাতের বাগান করে দিও আল্লাহ্।

ছয়

জয়নাল চেয়ারম্যানের বাড়ির উঠান।

সালিশ বসেছে, চলছে মাগি পেটানোর আসর…

পুরো গ্রাম ভেঙে পড়েছে মাতবর বাড়িতে। লোকারণ্যে চাপা উত্তেজনা, হাল্কা কানাঘুষা কানে আসে। পুরুষদের কারও কারও দাঁত কেলিয়ে হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে, অল্প কিছু সহমর্মিও আছে আর বহু পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাদের মাথায় বড় করে দেওয়া ঘোমটার ফাঁক গলে করুণ দৃষ্টিতে তাকানোÑ সব কিছুই রাহেলা বেওয়াকে কেন্দ্র করে। তার হাত-পা বাঁধা হয়েছে বড় নারকেল গাছটার সাথে, আর শোনা যাচ্ছে বেতের আওয়াজ। মহিলা দাতে দাঁত চেপে সহ্য করে যাচ্ছে সব।

বেলায়েত খাঁর হজযাত্রার আয়োজনে পুরো এলাকা, সমস্ত গণ্যমান্য মানুষ ভুলে গিয়েছিল সমস্ত অতীত। এমনকি বছর তিনেক যে লোককে পলাতক থাকতে হয়েছিল, ভিটেমাটি ছেড়ে, যে মুক্তিযোদ্ধারা ওহাব মিয়ার নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজাকার বেলায়েত খাঁকে দেখা মাত্র মেরে ফেলবে; তারাও কেমন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বিস্মৃত হলো লোকটার সমস্ত অপকর্মের কথা। উল্টো বেখাপ্পা রকমভাবে তারাও খোদার দরবারে গিয়ে নিজের নামে দোয়া করার জন্য অনুরোধ জানায়। যে-লোকের হাতে হাজারো নিরীহ লোকের রক্তের অভিশাপ লেগে আছে, সেই হাত স্রষ্টার ঘরে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দোয়ার জন্য উঁচু হবে- এই ভাবনা কাউকে আহত করেছিল কিনা জানা না গেলেও রাহেলা বেওয়াকে করেছিল।

রাহেলা বেওয়া ভোলেনি জলার পার ধ্বংসযজ্ঞের মহামারি, নিজের ওপর ঘটে যাওয়া পাশবিক নির্যাতনের কথা। তাই বেলায়েত খাঁর গাড়িবহর মন্তাজপুর ঢুকতেই মহিলা রামদা হাতে আক্রমণ করে তাকে, উপস্থিত চামচাদের কিছু করতে না পেরে অশেষ ঘৃণায় মুখের ওপর ছুড়ে দেয় একদলা থুতু…

হজের মৌসুম শেষে নিজ বাড়িতে ফেরা মাত্রই গ্রামবাসী আয়োজন করে সংবর্ধনার।

সেই সংবর্ধনায় নবীর রওজা জিয়ারত করে আসা হাজি সাহেবকে গ্রামবাসীর চাঁদায় বানানো ফুলের মালা গলায় ঝুলিয়ে দেন জয়নাল চেয়ারম্যান। আরও অনেকেই রঙবেরঙের কাগজের মালা পরিয়ে দেয়। বেলায়েত খাঁ আর জয়নাল চেয়ারম্যান তাদের লোক নিয়ে উপভোগ করতে থাকে মাগি পেটানোর আসর।

রাহেলা বেওয়ার নির্যাতনের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তান জামশেদ এগিয়ে এসে বাধা দিলে বেলায়েত খাঁ নিজেই এগিয়ে এসে বছর দশের ছেলেটাকে দু’ঘা বসিয়ে দিয়ে বলে-

জাউরার ছাও,

খানকি মাগির লইগা নিজের বাপের অসম্মান করস?

বেলায়েত খাঁ যে জামশেদের বাপ, এ কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি সে। তার ভেতরটা কুঁকড়ে যায়। আর ওদিকে পঞ্চাশটা বেতের দাগ একে একে বসে যেতে থাকে রাহেলা বেওয়ার শরীরে।

পুরো ঘটনা শেষে অসমর মা, আলোর বোন ধরাধরি করে নিয়ে যায় জামশেদ আর ওর মাকে। হাসপাতালে মাসখানেক ভর্তি থাকতে হয়, যম-মানুষে ব্যাপক টানাটানি শেষে রাহেলা বেওয়া আবার বেঁচে ওঠে। আর জামশেদ তার কিছুদিন পরেই এ তল্লাট ছেড়ে অচেনা কোন এক শহরে চলে যায়। বেলায়েত খাঁর লোকেরা হাতে লেগে থাকা হাজারো মুক্তিযোদ্ধা আর তার নিষ্পাপ সম্ভ্রমহানির পাপ ধুয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছে; এমন পাপে ভরা গ্রামে সে আর থাকবে না। 

  রেজওয়ান তানিম: কথাসাত্যিক

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares