গল্প : বিড়াল রহস্য : কয়েস সামী

কয়েস সামী ।।

অবাক কাণ্ড! মারিয়া বিড়ালটির কথা বুঝতে পারছে! 

কেমন আছেন, আপু?

মারিয়া বুঝতে পারছে না, ব্যাপারটি সত্যি কি-না? সত্যি হতে যাবে কেন? মানুষ প্রাণীদের ভাষা বোঝে না। যদি এমনটা কখনও ঘটে, তবে নিশ্চয়ই তার মাথার গণ্ডগোল হয়েছে ধরে নিতে হয়। তবে কি তার..? নাহ! সে তো সুস্থভাবে চিন্তা করতে পারছে। একজন মানসিক রোগী তো এটা পারবে না। হয়তো-বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা থেকে এটা হচ্ছে। কী জানি!

বিড়ালটা তার দিকে ড্যাব ড্যাব চোখে তাকিয়ে আছে। মাত্র ঘুম ভেঙেছে মারিয়ার। বিকেলের এ ঘুমটা মারিয়াকে পুরোপুরি মাতাল করে দেয়। নড়াচড়ার শক্তিও থাকে না। সে জন্য বিছানা থেকে নেমে বিড়ালটাকে তাড়িয়েও দিতে পারছে না। মহা যন্ত্রণায় পড়া গেল!

আপু কেমন লাগছে আজ? বিড়ালটি তাকিয়ে আছে এমনভাবে যেন বোঝা যাচ্ছে সে প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষা করছে।

মোটামুটি। মারিয়ার মনে হলো জবাব না দিলে বিড়ালটি তার রুম থেকে যাবে না।

আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে ইদানীং একটু বেশি দুশ্চিন্তা করছেন, আপু। দুশ্চিন্তা করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

তুমি আমাকে আপু ডাকছো কেন? তুমি তো এ বাড়ির সদস্য। ভাবি ডাকতে পারো, অথবা অন্যদের মতো, চাচি, আন্টিÑ এসব?

আপু, আপনি আমাকে চিনতে পারেননি। আমি আপনার বাড়ি থেকে এসেছি। আপনার হাজব্যান্ডকে আমি দুলাভাই ডাকি।

আমার বাড়ি থেকে? কবে এলে?

এইতো যেদিন আপনি প্রথম এ বাড়িতে এসেছিলেন, আপনার বিয়ের দিন।

বিয়ের দিন? আশ্চর্য! কীভাবে এলে শুনি? মারিয়া এবার বেশ মজা পাচ্ছে।

আপনার গাড়ির পেছনে উঠে বসেছিলাম। ব্যস্ততার কারণে কেউ খেয়াল করেনি।

কেন এলে অত দূর থেকে, জানতে পারি কি?

বিয়ের দিন দেখাশোনা করার জন্য পাত্রীর  সাথে তার ছোট বোন বা ভাই অথবা কোনো কাজের বুয়াকে দেওয়া নিয়ম। কিন্তু আপনার সাথে দেখলাম কাউকে দেওয়া হচ্ছে না। তাই নিজ দায়িত্বে আপনার সাথে চলে এলাম।

ভালো করেছ। তা, মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে এসে এতদিন কেউ থাকে বুঝি? যদ্দুর জানি, কন্যার সাথে আসা লোকজন ফিরযাত্রার সময় চলে যায়।

সে কথা বলে আর লজ্জা দিবেন না আপু। আমিও চলে যেতাম।

যাওনি কেন?

আপনারা যখন ফিরযাত্রায় রওনা দিলেন, তখন আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আপনারা চলে গেলেন টেরও পাইনি।

সেদিন যেতে পারো নাই, ঠিক আছে। কিন্তু পরে তো আমি আরও অনেকবার গিয়েছি।

আর লজ্জা দিবেন না আপু। লজ্জার কথা এটা। তবু আপনি যখন জানতে চাইছেন, বলি। আপনারা তখন বাসায় নাই। হঠাৎ একদিন দেখা হয়ে গেল পাশের বাসায় থাকা টমির সাথে। সে আমাকে প্রপোজ করল। বলল, সে নাকি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে। খড়াব ধঃ ভরৎংঃ ংরমযঃ যাকে বলে আর কি। এর আগে কেউ আমাকে অমন করে বলে নাই বলে থেকে গেলাম তার সাথে। এখানে দু’জন বেশ সুখেই আছি। খাওয়া-দাওয়ার কোনো অভাব নেই। দুই বাসায় মিলেঝুলে থাকি দু’জন। আপু কি রাগ করলেন আমার কথা শুনে?

নাহ! রাগ করব কেন?

আপু, একটা কথা বলব। আসলে কথাটা বলতেই আপনার কাছে আসা।

তোমার আবার কী কথা?

আপু, দুলাভাইয়ের স্বভাব খারাপ।

কী যা তা বলছ!

জি আপু। সত্যি ঘটনা। উনি বিড়াল দেখলেই ঢিল ছুড়ে মারেন। একেবার বিনা কারণে, আপু। বিশ্বাস করেন। সেদিন আমি উঠোনে একটু শুয়ে ছিলাম। দুলাভাই বাইরে থেকে এলেন। গেট দিয়ে ঢুকে আমাকে দেখতে পেয়ে বলা নেই কওয়া নেই একটা ঢিল কুড়িয়ে নিয়ে ছুড়ে মারলেন। ভাগ্যিস! আমি আগেই দেখতে পেয়েছিলাম!

তো, আমি কী করব?

আপনি ভাইয়াকে একটু বলে দিবেন, এমন কাজ যেন না করেন। আপনার কথা ভাইয়া শুনবেন। চিন্তা করেন আপু, সেদিন যদি ঢিলটা আমার পেটে লাগতো, কী হতো ব্যাপারটা? আপু, বলতে লজ্জা করে, তবু বলছি। ব্যাপারটার গুরুত্ব তবে বুঝতে পারবেন আপনি।  আপু, আপনার যেমন বাবু হতে যাচ্ছে, তেমনি আমারও।

মারিয়া খেয়াল করল, বিড়ালের পেটটা বেশ ঝুলে রয়েছে।

ঠিক আছে, বলে দেব। এখন তুমি যাও। আমার আবার ঘুম পাচ্ছে।

ঠিক আছে আপু, যাচ্ছি। মনে করে বলবেন কিন্তু। প্লিজ।

বিড়ালটি চলে গেল। এসব কী হচ্ছে! মারিয়ার মাথা সত্যিই খারাপ হয়ে যাচ্ছে বোধ হয়! সে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করল। কম ঘুমের কারণে এমন হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। 

২.

আপু, আপু…

মারিয়া ঘুমাচ্ছিল। অনবরত ডাকে ঘুম ভেঙে গেল তার। আবার দেখি উপদ্রব শুরু হলো! মাঝে দু’দিন একেবারেই দেখা যায়নি বিড়ালটাকে। আজ আবার দেখা যাচ্ছে সামনের পা দুটি উঁচু করে বসে আছে মারিয়ার দিকে তাকিয়ে। মারিয়া চোখ রগড়ে উঠে বসল।

কী ব্যাপার? ডাকছো কেন?

বিরক্ত করার জন্য এক্সট্রিমলি স্যরি। ঘুমাচ্ছিলেন বুঝি?

দেখতেই পাচ্ছ ঘুমুচ্ছি। তাড়াতাড়ি কথা শেষ করো।

আপু, ভাইয়াকে বলেছিলেন? ভাইয়া তো আজও তেড়ে এলেন।

উফ! আশ্চর্য যন্ত্রণায় পড়া গেল। বলিনি। ভুলে গিয়েছিলাম। আজ বলব।

প্লিজ আপু, মনে করে বলবেন।

ঠিক আছে। এখন যাও।

আপু, একটা কথা বলি?

আবার কী কথা?

আপু, আপনি আমাকে আগে যেভাবে দেখাশোনা করতেন, এখনও সেভাবে করবেন প্লিজ। না হলে মনে কষ্ট পাই।

আগে দেখাশোনা করতাম! মানে কী?

আপনি ভুলে গেলেন আপু? সেই যে, আপনার ছোট ভাইটা একদিন আমাকে মোড়ার ভেতর ঢুকিয়ে খেলা করছিল, আপনি দৌড়ে এসে আপনার ভাইকে ধমক দিলেন। আপনার ধমকে ভয় পেয়ে আমাকে ছেড়ে দিল সে। সেই থেকে আমি আপনার জনমের গোলাম হয়ে আছি। তাইতো আমি নিজ দায়িত্ব থেকে আপনার দেখাশোনার জন্য চলে এসেছি এখানে।

মারিয়ার ঘটনাটা মনে পড়ল।

ও, তাহলে তুমি সেই বিড়াল?

জি, আমি সে-ই। আপু, আমাকে আপনি মিনি বলে ডাকবেন। আপনার ভাইটিই আমাকে এই নাম দিয়েছিল।

ঠিক আছে মিনি। আমি বলে দেব আজ। তুমি যাও তো এখন!

আচ্ছা আপু। আস্সালামু আলাইকুম।

আশ্চর্য! বিড়ালও কি মুসলমান হয়! নাকি মুসলিম বাড়িতে থাকে বলে সালাম দিল। হিন্দু বাড়িতে থাকলে নমস্কার দিত! ধুস! মারিয়া এসব কী ভাবছে! নিশ্চয়ই এটা একটা স্বপ্ন। একটু পরেই ঘুম ভাঙবে। নাহ! মারিয়ার আবার নতুন করে ঘুম ভাঙল না। সন্ধ্যার পর রাকিব বাড়ি ফিরল। মারিয়া রাকিবকে জিজ্ঞেস করল, রাকিব, তুমি কি আজ বিড়ালটাকে মেরেছ?

রাকিব কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, হঠাৎ এ প্রশ্ন?

না, এমনি। মেরেছ কিনা বলো।

মেরেছিলাম তো। কিন্তু থ্রোটা ভালো হয়নি। লাগল না গায়ে। জানো, আমি যখন ক্রিকেট খেলতাম, খুব ভালো ফিল্ডার হিসেবে নামডাক ছিল। সবাই আমাকে জন্টি রোডস বলে ডাকত। এক থ্রোতে স্টাম্প উড়িয়ে দিতাম। এখন বয়স হয়েছে। হাতের নিশানা আর আগের মতো নেই।

সেই চিরাচরিত রাকিব। কিছু বলতে গেলেই ক্রিকেট। এমনকি মারিয়ার আব্বার সাথেও ক্রিকেট নিয়ে গল্প। সবাই খেতে বসেছে। ইলিশ মাছ রান্না হয়েছে। আব্বা বলছেন তার সময়ের ইলিশ মাছের গল্প।

বুঝছো রাকিব, আমাদের সময় দু’টাকা দিয়ে ইলিশ কিনেছি। পদ্মার ইলিশ। কী স্বাদ! বলে বুঝাতে পারব না। এখনকার মতো কেজি হিসাব ছিল না তখন। বাজারে গেলেই আস্ত ইলিশ ব্যাগে ঢুকিয়ে দিতো জোর করে।

নিখাদ ইলিশের গল্প। এখানে ক্রিকেট নিয়ে আসা স্বয়ং স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের পক্ষেও সম্ভব না। অথচ রাকিব ঠিকই ক্রিকেট নিয়ে এলো।

জি আব্বা। আমি যখন ছোট ছিলাম তখনও কিন্তু ইলিশ পাওয়া যেত। মানে, এখনকার মতো অত রেয়ার ছিল না। সকালে ইলিশ মাছ ভাজা খেয়ে ক্রিকেট খেলতে যেতাম। একবার, আব্বা, কী হলো জানেন, আমি ওপেনিং উঠে শেষ পর্যন্ত খেললাম। ৫০ ওভার খেলে আমার রান কত জানেন আব্বা? মাত্র ৩৫। আপনি ভাবছেন, আমি খুব বাজে খেলেছি। বিশ্বাস করেন আব্বা, আমার খেলাটা সময়োপযোগী হয়েছিল। খেলা দেখলে বুঝতে পারতেন। উইকেটের পর উইকেট পড়ে যাচ্ছে আর আমি একটা এন্ড ধরে রেখেছি। ইশ! আমি যদি এখনও খেলতাম আব্বা, আপনাকে স্টেডিয়াম নিয়ে যেতাম।

এই হচ্ছে রাকিব। এত ক্রিকেট ভক্ত খুব কমই দেখেছে মারিয়া।

সাবধানী মারিয়া এখন তাই রাকিবকে ক্রিকেটে যেতে দিল না।

তুমি বিড়াল দেখলেই মারো কেন?

একশ’ বার মারব। বিড়ালের মতো মিচকা শয়তান খুব কম আছে। দেখতে মনে হয় কত সুন্দর, কত নিরীহ। অথচ ভেতরে ভেতরে কী না করে বেড়ায়। সুযোগ পেলেই লুকিয়ে দুধ, মাছ সব সাবাড় করে ফেলে। বিড়ালে কামড়ালে কী হয় জানো? র‌্যাবিস। ভয়ানক রোগ। হলে নির্ঘাৎ মৃত্যু! মৃত্যু অবশ্য ক্রিকেট খেললেও হয়। রমন লাম্বাকে চিনতে? খুব ভালো ক্রিকেট খেলত। আবাহনীর হয়ে খেলত। মনে আছে তোমার?

না, মনে নাই। মনে করতেও চাই না।

ক্রিকেট পাগল এই মানুষটার  সাথে সিরিয়াসলি একটা কথাও বলা যায় না। মারিয়া রান্নাঘরে চলে গেল।

রান্নাঘরের পাশে বাড়ির পেছন দরজার পাশে বিড়ালটা বসে ছিল।

আপু, করছেন কী? পানিভর্তি হাঁড়ি তো আপনার তোলা উচিত না। ভারী জিনিস কখনও তুলবেন না।

মারিয়া পেছন ফিরে বিড়ালটাকে দেখতে পেল। মাথা গরম হয়ে গেল তার।

চুপ! চুপ! একটা কথাও বলবি না তুই। যা ভাগ!

মারিয়া হাত তুলে ঢিল ছোড়ার ভঙ্গি করল। চিৎকার শুনে শাশুড়ি দৌড়ে এলেন।

কী হয়েছে, মারিয়া? কার সাথে কথা বলছ?

না,  মা। ব্যথা পেয়েছি পায়ে!

তোমাকে কতবার বললাম, দেখেশুনে থাকবে তুমি। এ সময় সাবধান থাকতে হয়।

ঠিক আছে মা, সাবধান থাকব।

৩.

মারিয়া বিছানায় শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছে। থ্রি ম্যান ইন অ্যা বোট । হাসির বই। হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাচ্ছে।

হ্যারিস ঢুকেছে একটা গোলকধাঁধায়। এ গোলকধাঁধায় ঢুকলে নাকি কেউ বেরোতে পারে না। হ্যারিস খুব গল্প করতে করতে ঢুকল, এটা কোনো গোলকধাঁধা হলো নাকি? সে পাঁচ মিনিটের মধ্যে বের হয়ে সবাইকে দেখাবে। পথ খুঁজে না পাওয়ায় যাকেই পাচ্ছে তাকেই বলছে আমার সাথে আসেন এটা কোনো ব্যাপারই না। সবাই তার পিছু নেওয়া শুরু করেছে। পাঁচ মিনিট অতিক্রম হয়ে ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে অথচ হ্যারিস গোলকধাঁধার কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছে না। সবাই ধীরে ধীরে হ্যারিসের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। তবু হ্যারিস বলছে, এটা কোনো ব্যাপার না। বড়জোর আর পাঁচ মিনিট লাগবে। কঠিন অবস্থা! হাসতে হাসতে মারিয়ার চোখ পড়ল ড্রেসিংরুমের কাছে বসে থাকা মিনির দিকে।

কেমন আছ?

না আপু, অতটা ভালো না।

কেন?

বেশ শীত পড়েছে। ঠান্ডা লাগে।

মারিয়া আবার পড়তে শুরু করল।

আপু, একটা কথা বলি?

বলো।

ভাইয়াকে বলে আমার জন্য একটা বাক্সের ব্যবস্থা করতে পারবেন?

বাক্স! কেন?

আমার থাকার জন্য। রাতের বেলা প্রচণ্ড শীত লাগে। বাক্সের ভেতর থাকলে শীত একটু কম লাগবে।

আচ্ছা, দেখি।

বিদেশে বিড়ালদের কত আদর-যত্ন করা হয়। থাকার জন্য বাক্সের ব্যবস্থা থাকে। বাথরুম করার জন্য থাকে লিটার বক্স। বাচ্চা প্রসবের সময় ডেলিভারি বক্স। কত সুবিধা! শালা, বাংলাদেশ। এদেশে কিছুই নাই।

এটা কেমন ভাষা মিনি!

স্যরি আপু। আর এমন হবে না। আপু, আপনি পড়েন। আমি আছি।

তোমাকে থাকতে হবে না। চলে যাও।

না আপু, আমি ঠিক করেছি এ অবস্থায় যতক্ষণ পারি আপনার আশপাশে থাকব। কখন কী লাগে বলা যায় না।

ওকে বাবা, তোমার যা খুশি করো।

আপু, আর একটা কথা।

আবার কী?

আপনার ছেলে হবে।

তুমি জানলে কীভাবে?

আমরা অনেক কিছু বুঝতে পারি। আর, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আমি আছি। আপনি দয়া করে আমার একটু খেয়াল নিবেন। কাজের মেয়েটাকে বলে দিবেন আমাকে যেন মাঝে মাঝে একটুখানি দুধ দেয়। এ সময় আপনার যেমন পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন, আমারও প্রয়োজন।

ঠিক আছে, বলা যাবে।

মারিয়ার ছেলে হবে, ছেলে! খুব আনন্দ লাগছে। পড়া ফেলে পিচ্চি বাবুটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করল মারিয়া। খানিক পরে আবার বাস্তবে ফিরল। কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য! বিড়ালের সাথে কথা বলাটাকে এখন সে সত্যি মনে করছে! এমনকি বিড়ালের কথাকেও বিশ্বাস করা শুরু করেছে! এটা কি তবে পাগলামির শুরু। মারিয়া কি পাগল হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে? এ সময় নাকি এমনটা হয় মাঝে মাঝে। রাকিবের সাথে আজকেই ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে হবে। নাহ! রাকিব তবে খুব হাসবে। সবাইকে বলে বেড়াবে। নাহ। বেড়াল প্রসঙ্গে কোনো কথাই তাকে বলা যাবে না। মরে গেলেও না।

রাকিব বাইরে থেকে আসতেই মারিয়া বায়না ধরল।

এই চলো না আলট্রাসনো  করে আসি।

কেন? হঠাৎ! কোনো সমস্যা?

নাহ, সমস্যা না। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে ছেলে না মেয়ে হবে।

আশ্চর্য ব্যাপার! সেদিনই তো তুমি বললে ছেলে-মেয়ে আল্লাহ ঠিক করে দেন। এটা আগেভাগে জানা উচিত না।

সেদিন ইচ্ছে করেনি। আজ করছে। নিয়ে যাবে কিনা বলো?

রাকিবের খুব খুশি খুশি লাগছে। তাদের ছেলে হবে। ছেলেকে ক্রিকেটার বানাবে। খুব বড় ক্রিকেটার। বাংলাদেশ জাতীয় টিমে খেলবে।

মারিয়ার কেন জানি ভালো লাগছে না কিছু। বিড়ালের সাথে কথা বলার বিষয়টা কি তবে সত্যি? মারিয়া কি তবে সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছে? মারিয়ার খুব ভয় করে।

 ৪.

পেটজুড়ে তীব্র ব্যথা। অপার্থিব ব্যথা। ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে সে। বিছানা থেকে নামতে পারছে না কিছুতেই। এখন তো এ ব্যথা ওঠার কথা না। আরও দুই-তিন দিন দেরি হওয়ার কথা।  হঠাৎ ব্যথার তীব্র আক্রমণে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। শ^শুর-শাশুড়ি দু’জনের কেউ এখন বাসায় নেই। রাকিব আছে তবে টিভি রুমে। বেশ সাউন্ড দিয়ে খেলা দেখছে। ডাকলেও তো শুনবে না। মারিয়া কোনো রকমে পাশে রাখা মোবাইল হাতে নিল। চার্জ নেই! এখন? রাকিবকে কী করে ডাকবে সে? বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করতেই তীব্র ব্যথা তাকে আবার বিছানায় শুইয়ে দিল। এমন সময় মারিয়া মিনির কণ্ঠ শুনতে পেল।

আপা, ঘাবড়াবেন না। আমি এক দৌড়ে দুলাভাইকে নিয়ে আসছি। আপনি ধৈর্য ধরেন।

মারিয়া ব্যথায় কোনো উত্তর দিতে পারল না।

৫.

মারিয়ার কোলজুড়ে ফুটফুটে একটা বাবু। ঠিক তার বাবার মতো হয়েছে দেখতে। গতকাল মারিয়াকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। বাচ্চা এবং মা দু’জনই সুস্থ। বাবুর সাথে কথা বলতে বলতে তার হঠাৎ মিনির কথা মনে পড়ল। রাকিবকে ডাকল সে। রাকিব পাশের রুমেই ছিল।

অ্যাই, একটা বিড়াল ছিল আমাদের বাসায়। ওটাকে দেখছি না যে!

ওই পাজিটার কথা বলছো?

রাকিবের কণ্ঠে উষ্মা।

পাজি বলছ কেন? কী করেছে?

আর বলো না! সেদিন, ওই যে তোমার ব্যথা উঠল যেদিন, আমি তো তখন খেলা দেখছিলাম। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই আমার পায়ে এসে কামড়ে ধরল। আমি লাথি দিয়ে কোনো রকমে ছুটতে পেরেছিলাম। তারপরই তো স্যাভলন লাগাতে গিয়ে দেখি তুমি ব্যথায় মরে যাচ্ছ। এই দেখো, এখানে কামড় মেরেছে পাজিটা। রাকিব তার পায়ে কামড়ের চিহ্ন দেখাল।

মারিয়া অবাক হলেও বুঝতে দিল না। বলল, বিড়ালটাকে দেখছি না কেন?

আর কোথায় খুঁজে পাবে ওটাকে। রমিজকে বলেছি বস্তায় ঢুকিয়ে দূরে কোথাও ফেলে আসতে। এতদূরে ফেলে আসতে যেখান থেকে  স্বয়ং কলম্বাসও ফিরে আসতে পারবে না।

মারিয়া বুঝতে পারল বিড়ালটা তাকে বাঁচাতেই রাকিবকে ওভাবে কামড়ে ধরেছিল। রাকিব তো আর বিড়ালের কথা বুঝতে পারে না। মারিয়ার মনটা বিষাদে ভরে গেল। বিড়ালটা তাকে বলেছিল আমি আপনার দেখাশুনা করব, বিনিময়ে আপনি একটু আমার দেখাশুনা করবেন। বিড়ালটি তার কাছে একটা বাক্স চেয়েছিল, দুধ চেয়েছিল। বিড়াল কথা রেখেছে, মারিয়া রাখেনি। মন খারাপ করে সে বাবুটার পাশে শুয়ে থাকল।

৬.

পরদিন বিকেলে বাবুর ভিজে যাওয়া কাঁথা ধুয়ে রোদে দিতে উঠোনে গিয়ে মারিয়া অবাক। মিনি! মারিয়ার মনটা আনন্দে ভরে উঠল। তার মনে হলো মা বেড়াতে এসেছেন মেয়েকে দেখতে।

মিনি, কেমন আছ তুমি?

নিজের অজান্তেই প্রশ্নটি চলে এলো মারিয়ার মুখে।

কিন্তু মিনি তা শুনল না! শব্দ শুনে কেবল একবার তার দিকে তাকাল। তারপর আপনমনে রান্নাঘরের পেছন দিকে এগোতে থাকল।

মিনি, এই মিনি।

মারিয়া আবার ডাকল।

তার ডাক শুনে শাশুড়ি বারান্দায় এলেন।

কী হয়েছে বউমা। কাকে ডাকো?

না মা, কিছু না।

মারিয়া তার রুমে ঢুকল। বিড়ালের ব্যাপারটি তাকে ধাঁধায় ফেলে দিল। সে অনেকক্ষণ চিন্তা করল। আরও কয়েকবার মিনির কাছে গেল। কিন্তু না। মিনি কোনো সাড়া দিল না। তার মনে হলো, বিড়াল রহস্য বুঝিবা সে আর কখনওই উদঘাটন করতে পারবে না।

কয়েস সামী : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : রাজিব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares