গল্প : তুই একটা ভালোবাসা : শামীম আল আমিন

শামীম আল আমিন ।।

রানু মাথা নিচু করে বসে আছে। নিঃশব্দে কাঁদছে। শাহেদ অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে আছে দেয়াল ঘড়িটার দিকে। সেকেন্ডের কাঁটাগুলো নড়ছে। নীরবতার কারণে পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে টিক টিক শব্দ। ডাক্তার রাবেয়াকে কিছুটা চিন্তিত দেখাচ্ছে। জীবনে অনেক অদ্ভুত কথা শুনেছেন। তবে এমন কথা শুনেছেন কিনা মনে করতে পারছেন না। এক সক্ষম দম্পতি বাবা-মা হতে চায় না। কারণটাও খুব বেশি যুক্তিযুক্ত লাগছে না তার কাছে। একটু এগিয়ে এসে তিনি রানুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে আপনি কোনো অবস্থাতেই মা হতে চান না। তাই তো?’ চোখ মুছতে মুছতে মাথা তুলে তাকায় রানু। তখনও শাহেদ ঘড়িটার দিকেই তাকিয়ে। যেন কোথাও কিছু হয়নি। কেউ কিছু বলছে না। ডাক্তার রাবেয়া আবারও প্রশ্নটা করলেন। এবার চোয়াল শক্ত করে উত্তর দেয় রানু। ‘না, কোনো অবস্থাতেই না।’

‘কারণটা কি আর একবার বলবেন।’ জিজ্ঞাসু চোখে তাকান ডাক্তার। শাহেদের দিকে তাকিয়ে রানু বলে, ‘ও বলবে। ওদিকে তাকিয়ে কী দেখছ! কারণ বলো।’ অনেকটা যেন ধমকে ওঠে। চোখ সরিয়ে এনে এবার ডাক্তারের দিকে তাকায় শাহেদ। ‘দেখুন, আপনাকে তো আগেই বলেছি। আবার যখন জানতে চাইছেন, বলছি শুনুন। আমার বড় ভাইয়ের দুটো বাচ্চা। দুজনেই অটিস্টিক। আমার ভয়, যদি আমাদের বাচ্চাও তেমনটা হয়। এ জন্য আমরা ঠিক করেছি, সন্তান নেবই না।’ বলে রানুর দিকে তাকায় সে। ‘আপনিও কি তাই মনে করেন?’ ডাক্তারের প্রশ্নে কেবল মাথা নেড়ে সায় জানায় রানু। ‘দেখুন, শাহেদ সাহেবের বড় ভাইয়ের দুটো বাচ্চা অটিস্টিক। বুঝলাম। জেনেটিক কারণে অনেক সময় পরিবারের অন্য কারও সন্তানও তেমনটি হতে পারে। এ নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকে হয়তো। কিন্তু এটাই কি শেষ কথা! এটা কি নিশ্চিত? ডাক্তারের কথায় রানু কিংবা শাহেদ কিছুই বলে না। একটু থেমে আবারও ডাক্তার রাবেয়া বলতে শুরু করেন, ‘জন্মনিয়ন্ত্রণে স্থায়ী, অস্থায়ী অনেক পদ্ধতিই আছে। সন্তান নিতে না চাইলে, নেবেন না। কিন্তু এটা তো কোন সমাধান না।’

‘কিন্তু ডাক্তার সাহেব, আমাদের ভয় হয়। অমন সন্তান থাকার চেয়ে, না থাকাই ভালো। জীবনের বারোটা বেজে যায়। আমি কিছুতেই চাই না। একদম না।’ শাহেদ খুব শক্তভাবেই কথাগুলো বলল। বিষয়টা ভালো লাগল না ডাক্তারের। তিনি বললেন, ‘আমাদের বুঝতে হবে এই জীবন সৃষ্টিকর্তার বিচিত্র খেয়ালে চলে। আমরা চাইলেই প্রকৃতির স্বাভাবিক গতি থামিয়ে দিতে পারি না। বিজ্ঞান চলে তার নিজস্ব নিয়মে। তাই সম্ভাব্য বাবা-মায়েদের এমন চিন্তা ঠিক না।’

‘আমরা এসব কথা শুনতে চাচ্ছি না। আমরা এসেছি কেবল আপনার পরামর্শ চাইতে।’ শাহেদ বলেন। রানু তখনও নীরব। ডাক্তার রাবেয়া কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। এরপর বলেন, ‘মানবেন কি-না, এটা সম্পূর্ণ আপনাদের ব্যাপার। কিন্তু আমাকে বলতেই হবে। মনে রাখবেন জীবনকে সহজ করতে বিজ্ঞান অনেকদূর এগিয়েছে। ফলে অটিস্টিক সন্তান হলেই বা কি! তাদের প্রতিও ভালোবাসা দেখাতে হবে। কোনো কিছু নিয়ে অযথা ভয় না পেয়ে, তার মোকাবেলা করুন। জীবনকে ভালোবাসুন। তা ছাড়া আমাদের বাবা-মায়েরা কি কখনও ভেবেছিলেন, সন্তান অটিস্টিক হতে পারে, তাই সন্তান নেবেন না? তাহলে কি আমরা জন্মাতে পারতাম?’ ডাক্তারের কথা শেষ হতেই শাহেদ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। রানুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওঠো। আমাদের যেতে হবে।’ রানুও উঠে দাঁড়াল। হাতের ইশারায় তাদের দু’জনকে বসতে বললেন ডাক্তার রাবেয়া। দু’জন দু’জনের দিকে তাকিয়ে বসে পড়ল। খস খস করে কাগজে প্রেসক্রিপশন লিখে তাদের দিকে বাড়িয়ে দিলেন ডাক্তার। সেটা নিয়ে বেরিয়ে এলো রানু এবং শাহেদ।

কয়েকদিন ধরে শরীরটা কেমন যেন খারাপ লাগছে রানুর। মাথা ঘোরায়। বমিও হয়েছে কয়েকবার। মনে মনে ভয় পায় সে। জন্মনিয়ন্ত্রণে স্থায়ী পদ্ধতি নেওয়া হয়নি। অনেকবার ভেবেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত করা হয়ে ওঠেনি। সেদিন একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। তাহলে কি সে সন্তানসম্ভবা! ভেবে আঁতকে ওঠে রানু। এখনও শাহেদকে পুরো বিষয়টা বলা হয়ে ওঠেনি। আজই বলতে হবে। ভাবতেই রুমে ঢুকল শাহেদ।

‘কী হয়েছে, তোমাকে এমন বিচলিত দেখাচ্ছে যে?’

‘শরীরটা ভালো লাগছে না। মনটাও খারাপ। অস্থির লাগছে।’

‘কেন বলো তো?’ শাহেদের পরের প্রশ্নে কোন উত্তর দিলো না রানু। কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। আকাশ-পাতাল ভাবছে। কাছে এগিয়ে এসে রানুর পাশে বসল শাহেদ। আলতো করে পিঠে হাত রেখে জানতে চাইলো, ‘খুব বেশি কি খারাপ লাগছে?’

‘হ্যাঁ। মনে হচ্ছে আমি প্রেগন্যান্ট।’ হঠাৎ করেই কথাগুলো বলে ফেলল রানু

‘বলো কী! কিন্তু আমরা তো বেবি নেবো না বলে ঠিক করেছি। কী করে হলো! আচ্ছা, সেদিনের ওই ব্যাপারটা!’ বেশ চিন্তিত দেখাল শাহেদের মুখটা।

শাহেদ উঠে দাঁড়ায়। রানীকে বলে, ‘ভেবো না। আপাতত শরীরের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরে কী করা

যায়, ভেবে দেখব।’

‘কী আর করব। ফেলে দেবো বাচ্চাটাকে। মেরে ফেলব।’ বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে রানু। কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত রাখে শাহেদ। ‘আহা, কী হচ্ছে এসব! আমরা তো নিশ্চিত নই। এমনও তো হতে পারে, বিষয়টি সে রকম নয়। চলো ডাক্তারের কাছে যাই। বিস্তারিত টেস্ট করি। এরপর না হয়, ডিসিশন নেওয়া যাবে।’ রানু কান্না থামায় না। মুখটা ফিরিয়ে নেয়। শাহেদকেও যথেষ্ট বিষণ্ন লাগছে। ‘যদি তাই হয়, তাহলে পুরো বিষয়টা সামলানো তার জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। তার ভাইয়ের পরিবারের অভিজ্ঞতা সে জানে। এক জীবনে সেই জটিল পরিস্থিতির মুখে সে কিছুতেই পড়তে চায় না।’ ভাবতে ভাবতে রুম থেকে বের হয়ে গেল সে।

প্রতিটা পরিবারের জন্য সন্তান আগমনের খবর ভীষণ আনন্দ নিয়ে আসে। কিন্তু শাহেদ আর রানুর জীবনে এই সংবাদ এলো আতংক হয়ে। যে খবরে দু’জনের উৎসবে মেতে ওঠার কথা, তাদের জীবনে হচ্ছে উল্টোটা। ডাক্তার রাবেয়া বিষয়টি পরিষ্কার করলেন। সব টেস্টের রিপোর্ট তার হাতে। রানু প্রেগনেন্ট। শাহেদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। রানু কিছু বলছে না। কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না।

মাথা তুলে শাহেদ বলল, ‘ম্যাডাম, আমরা বেবিটা রাখতে চাচ্ছি না। আমাদের একটা ভুলে রানু আজ প্রেগনেন্ট। আপনি তো জানেনই আমরা বেবি চাই না। এরপর থেকে সাবধান হওয়া যাবে। কিন্তু এখন অ্যাবরশন করাতে চাচ্ছি।’ শাহেদের কথা শেষ হতেই রানু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ডাক্তার রাবেয়া বললেন, ‘আর একবার ভেবে দেখুন। শাহেদ সাহেব, আমরা তো নিশ্চিত নই, রানুর গর্ভে থাকা বেবিটা অটিস্টিকই হবে। তা ছাড়া কোনো বেবি অটিস্টিক হওয়া তো কারও অপরাধের ফল নয়। এতে কারও দোষও নেই। এটি বিজ্ঞানের অদ্ভুত এক খেলা। আজকাল অনেক ভালো ট্রিটমেন্ট আছে। পড়াশোনার ভালো ব্যবস্থা আছে। বিষয়টি নিয়ে সবাই খুবই সচেতন। অটিস্টিক বেবিদের অধিকারের বিষয়টিও পরিষ্কার। তাদের বাবা-মায়েদের এখন অন্য চোখে দেখা হয় না।’ একসঙ্গে অনেকগুলো কথা বলে থামলেন ডাক্তার রাবেয়া।

শাহেদ কঠিন চোখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আছে। ‘দেখুন ম্যাডাম, আমাদের ডিসিশনটা আমাদেরকেই নিতে দিন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছি। অ্যাবরশনই করাতে হবে। আর সেটা আজই। দেরি করলে, অনেক রকম সমস্যা হতে পারে।’ শাহেদের শেষ কথাগুলো শুনে চমকে উঠল রানু। এত তাড়া কিসের? সময় তো কিছু আছেই। এখনই কেন ফেলে দিতে হবে! বুঝে উঠতে পারে না সে। কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না।

ডাক্তার রাবেয়া বললেন, ‘অ্যাবরশন করতে চাইলে, করাবেন। কিন্তু আমি যা ভালো বুঝেছি, সেটাই বলেছি আপনাদের। দরকার হলে বাড়ি যান। আর একটু ভাবুন। পরে না হয় ফিরে আসবেন।’ ‘না, ম্যাডাম। আমি আর সময় নিতেই চাই না।’ জোর দিয়ে বলে শাহেদ। তবে তার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রানু প্রায় চিৎকার করে ওঠে ‘আজই অ্যাবরশন করাতে হবে মানে! তুমি আমার পারমিশন নিয়েছ? আমি ফিজিক্যালি, মেন্টালি ঠিক আছি কিনা সেটা ভেবেছ? তুমি ডিসিশন নিয়ে ফেলেছ! বাহ্। শরীরটা কি তোমার, নাকি আমার?’

রানুর কথায় চমকে উঠল শাহেদ। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। রানু এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে বুঝতে পারেনি সে। কী বলবে, ভেবে পাচ্ছে না। এক ধরনের নীরবতা তৈরি হলো। নীরবতা ভেঙে ডাক্তার রাবেয়া বললেন, ‘আজ বাড়ি যান। ভালো করে ভাবুন। দুজনেই তৈরি হয়ে তবেই আসুন। এটা বড় একটা ডিসিশন। হুট করে নেওয়া ঠিক না। যান বাড়ি যান।’ ডাক্তারের কথা শেষ হতেই দুজনে উঠে দাঁড়াল। কেউ কোনো কথা বলল না। রানুর চাপাকান্নার শব্দ পরিবেশটাকে আরও বিষণ্ন করে তুলল।

কয়েকটা দিন গড়িয়ে গেছে। রানু কেমন যেন বদলে যেতে শুরু করেছে। কিছু বললেই চট করে রেগে যায়। খুব একটা কথা বলতে চায় না। নিরত থাকতে পছন্দ করে। রানু একা একা কথা বলে। কথার উত্তরও স্বাভাবিকভাবে দেয় না। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম- কিছুই ঠিক নেই। তার সাথে ঠিকমতো কথাও বলতে পারছে না শাহেদ। অথচ অ্যাবরশনের বিষয়টা নিয়ে কথা বলা দরকার। কাজটা করে ফেললেই ভালো। তাকে বেশ বিচলিত দেখায়। অফিসের কাজে মন বসে না। কেমন যেন ভয় আর আতঙ্ক পেয়ে বসেছে তাকে। দু-একবার ভেবেছে বাচ্চাটাকে রেখেই দেবে। কিন্তু তার অশান্ত মন কিছুতেই সায় দেয় না। রানু বারান্দায় বসে আছে। ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে আছে বাইরে। কখন যে শাহেদ তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়ালই করেনি। ‘রানু, শরীর কেমন লাগছে?’ ‘ভালো’। ছোট্ট করে জবাব দেয় সে। এরচেয়ে বেশি কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না। তারপর অনেক সময়ের নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলছে না। ‘কিছু বলবে?’ পাথুরে গলায় রানুর প্রশ্ন।

‘না, বলছিলাম। বিষয়টা নিয়ে একটা ডিসিশন তো নেওয়া দরকার। নাকি?’

‘কোন বিষয়টা?’ রানুর গলায় ক্ষোভ।

‘তুমি বুঝতে পারছ না। অ্যাবরশন নিয়ে।’

‘না, আমি বুঝতে পারছি না।’ চিৎকার করে উঠল রানু। ‘বুঝতে চাইও না। তোমার ফ্যামিলিতে কারও বাচ্চা অটিস্টিক, তার জন্য আমি মা হতে পারব না। কেন? তোমার দায় আমি কেন নেবো? তা ছাড়া আমার পেটের বেবি যে অটিস্টিক সেটা তোমাকে কে বলেছে?’

‘রানু, তুমি এমন করছ কেন? ডিসিশনটা তো আমরা দুজনে মিলেই নিয়েছিলাম। এখন কথা ঘোরাচ্ছো কেন?’ ‘ডিসিশন আমি নিইনি। তুমি আমাকে কনভিন্স করার চেষ্টা করেছ। তুমি ওইসব কথা আমাকে বলেছ। বোঝানোর চেষ্টা করেছ। আমি এখন কোনো কথা শুনতে চাই না। আমি কোনো অবস্থাতেই আমার বেবিকে ফেলে দেবো না।’

‘রানু কি বলে এসব!’ শাহেদ কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে রানুকে বলে, ‘দেখো রানু, তুমি এখন আবেগের বশে কথা বলছ। আমি জানি, আমাদের বেবি অটিস্টিকই হবে। ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে এমন হয়। এটা তোমার ব্যাডলাক। কিছু করার নেই। আমি বেবিটাকে রাখতে চাই না।’ ‘তুমি কি নিয়ে কথা বলছো, বুঝতে পারছ? তুমি আমার অনাগত সন্তানকে নিয়ে কথা বলছ। তুমি একপ্রকার আমার পেটে লাথি মারছ! তুমি কেবল আমাকে নয়, তোমার বেবিকেও আঘাত করছ। তুমি এখন কোনো কথা বলবে না। এখান থেকে যাও।’

‘যাবো, তবে তোমাকে নিয়ে। তুমি আমার সাথে যাবে। আমরা ডাক্তারের কাছে যাবো। আজই অ্যাবরশন হবে।’ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠে শাহেদ। তার কণ্ঠে রীতিমতো ক্রোধ জমা হয়েছে। চোখ-মুখ অন্ধকারে ঢেকে গেছে।

‘আর যদি না যাই?’ রানুর চেহারাটা আরও কঠিন দেখাচ্ছে। কেমন যেন অন্য মানুষ। কঠিন। অচেনা। অদেখা। শাহেদ এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বললো, ‘তুমি অবশ্যই যাবে।’ ‘আমি যাবো না। তুমি এখান থেকে যাও।’ রানুর কথা ঠিকমতো শেষ হবার আগেই শাহেদ একটা চড় বসিয়ে দিলো তার গালে- ‘হয় তুমি আমার সাথে ডাক্তারের কাছে যাবে। নয়তো আমি তোমার সাথে আর থাকব না।’ কেমন যেন পাষণ্ডের মতো শোনায় শাহেদের গলা। যে গলায় কোনো মমতা নেই। রানু চমকে উঠল, ভাবতেও পারেনি শাহেদ তার গায়ে হাত তুলবে। এভাবে কথা বলবে। এ কোন শাহদকে দেখছে সে! নীরবে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে তার। সে উঠে দাঁড়াল। ‘আমি তবে তোমাকেই ছেড়ে চলে যাচ্ছি।’ বলে ভেতরে চলে গেল রানু। ঘণ্টাখানেক পর একটা লাগেজ হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল সে। তাকে ফেরানোর কোনো চেষ্টাই করল না শাহেদ। অদ্ভুত! সবকিছু এমন কেন হচ্ছে! দু’জনের কেউই বুঝতে পারছে না।

হাসপাতালের বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় বসে আছে রানু। কোলে তার সদ্যোজাত কন্যাশিশু। অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে সে। কিছুক্ষণ আগেই বাচ্চাটাকে তার কোলে দেওয়া হয়েছে। কী সুন্দর! পরীর মতো বাচ্চা। কেবল দুটো ডানা নেই। রানুর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। সে কাঁদছে। সেই কান্নার বেগ বাড়তে লাগল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রানুর মা আলেয়া বেগমও কাঁদছে অঝোর ধারায়। সেই কান্না সংক্রমিত হলো রুমে থাকা আরও কয়েকজনের মধ্যে। বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে শাহেদ আর দেখতে আসেনি রানুকে। তার বাচ্চা হওয়ার দিনে খবর দেওয়া হয়েছিল। তবুও আসেনি। হয়তো আর আসবেও না! শাহেদকে চিনতে ভুল হয়েছিল তার। এতটা কঠোর, কঠিন এবং পাষণ্ড কোনোদিন তাকে মনে হয়নি! অথচ সে তাই। দিনে দিনে এমনটাই মনে হচ্ছে তার কাছে।

রানুর পৃথিবী আরও লন্ডভন্ড হয়ে গেছে, যখন ডাক্তার জানিয়েছে ভূমিষ্ঠ হওয়া কন্যাশিশু অটিস্টিক হতেও পারে। আরও কিছুদিন পর পরিষ্কার হবে বিষয়টা। যদি তাই হয়, তাহলে কোনো একদিন যদি শাহেদ আসে, কী জবাব দেবে সে? ডাক্তারের কথা শোনার পর থেকে আরও খারাপ লাগছিল। তবে চাঁদমুখকে তার কোলে দেওয়ার পর থেকে কেমন যেন একটা অনুভূতি হচ্ছে। সেই অনুভূতি স্বর্গীয়।

মা হওয়ার অনুভূতি। রানু এখন মা। এখন কষ্ট আর আনন্দের কান্নায় বুক ভাসাচ্ছে সে।

নবজাতকের দিকে তাকিয়ে রানু বলল, ‘শোন, তোর নাম আমি দিলাম ‘অদেখা’। যাকে দেখা হয়নি। আমি দেখেছি। তোর ভেতরটাকে। কিন্তু হয়তো অনেকে দেখতে পাবে না। তোর বাবা আসেনি। সে হয়তো আসবেও না। আমার তীব্র ভালোবাসা আর তোর প্রচণ্ড টানও তাকে ফেরাতে পারেনি। শোন অদেখা, আমি কষ্ট পাচ্ছি। কিন্তু ভেঙে পড়ব না। তোকে নিয়ে বাঁচব। আজ থেকে কেবল তুই আমার ভালোবাসা। তুই একটা ভালোবাসা মা। তুই একটা ভালোবাসা।’ বলে চিৎকার করে কেঁদে উঠল রানু।

শামীম আল আমিন : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares