গল্প : দ্বৈত : সুমন্ত আসলাম

সুমন্ত আসলাম ।।

খুব কাতর গলায় মাননাত কবির বললেন, ‘আমি যা বলছি, তার একবিন্দুও মিথ্যা বলছি না আপনাকে।’

‘তার মানে সব সত্য বলেছেন আপনি।’ নির্ভার গলা আমার।

‘জি।’

‘একটা জিনিস খেয়াল রাখবেন আপনি।’ তার দিকে একটু ঝুঁকে বসি আমি, ‘যা প্রশ্ন করব, একটু ভেবে উত্তর দেবেন। এতে আপনারও সুবিধা হবে, আমারও।’

‘জি।’

‘আপনি কথায় কথায় জি বলেন।’

‘এই অভ্যাসটাও ছিল না আমার।’ দু’হাত এক করে কচলাতে থাকেন ভদ্রলোক, ‘আমি কিন্তু বুঝতে পারি এটা ভালো শোনায় না। কিন্তু নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না।’

‘আপনি যখন একা থাকেন, তখন হুবহু আপনার মতো আরেকজন ঘুরঘুর করে আশপাশে। এমনকি কথাও বলে আপনার সঙ্গে।’ মাননাত কবিরের চোখের দিকে তাকাই আমি, ‘আপনার সমস্যা তো এটাই?’

‘এটা মূল সমস্যা। এটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও অনেক সমস্যা।’

‘দু-একটা উদাহরণ দেওয়া যাবে?’

মাথা নিচু করে ফেললেন ভদ্রলোক। দু’হাত এক করে মুষ্টিবদ্ধ করলেন। ঠোঁটে ঠেকিয়ে বুজে ফেললেন চোখ দুটো। আমি এবার ভালো করে দেখতে লাগলাম তাকে। মাথায় চারপাশে বেশ ঘন চুল তার, মাঝখানে চরের মতো গোল হয়ে জেগে উঠেছে একটা জায়গা। কয়েক বিন্দু ঘামও জমেছে সেখানে। কানের দু’পাশের জুলফি দুটো ঈষৎ পাকা। বাম গাল বরাবর লম্বা একটা দাগ আছে, অনেকটা খামচির মতো। নিচের ঠোঁটটাও ফুলে আছে বেশ। তবে যতটুকু বয়স হয়েছে তার, ততটা বয়স্ক দেখাচ্ছে না তাকে।

ঝট করে সোজা হয়ে বসলেন মাননাত কবির। চোখ বড় বড় করে তিনি এপাশ-ওপাশ তাকালেন। ভীষণ ভয় পাওয়া গলায় কিছুটা শব্দ করে বললেন, ‘একটু আগে কাউকে দেখেছেন আপনি?’

‘কোথায়?’

‘আমার পাশে।’

‘আপনার পাশে!’

‘ওই যে, আমার মতো দেখতে আরেকজনকে?’

‘না।’

‘দেখেননি!’

‘আপনি তো একাই ছিলেন। পাশে কেউ ছিল না।’

‘এটা একটা সমস্যা। আমার মতো দেখতে যে মানুষটা আমার কাছে আসে, তাকে কেবল আমি একাই দেখতে পাই।’

‘আর কেউ পায় না?’

‘না।’ চেহারা অনেকটা কুঁচকে ফেললেন মাননাত কবির, ‘আমি কাউকে বুঝাতেও পারি নাÑ আমি ইদানীং একটা মানুষকে দেখতে পাই, যে দেখতে হুবহু আমার মতো।’

‘আর কোনো সমস্যা?’

‘সে ঠিক আমার মতো না।’

‘বুঝিয়ে বলুন।’

‘ধরুন, রাস্তায় হাঁটছি আমি। পাশে পাশে সেও হাঁটছে। হঠাৎ একটা অন্যায় করতে দেখলাম কাউকে। বরাবরের মতো প্রতিবাদ করতে চাই আমি। কিন্তু পারি না। সে পারে।’

‘সে কীভাবে পারে?’

‘প্রথমে কাছে গিয়ে অন্যায় করতে যাওয়া মানুষটাকে বুঝায়Ñ না, এটা অন্যায়। এ কাজ করা যাবে না।  না শুনলে হাত টেনে ধরে।’

‘আপনি তখন কী করেন?’

‘ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কিছু করার থাকে না।’ নাক চুলকাতে চুলকাতে মাননাত কবির বললেন, ‘সেদিন কী হয়েছে, জানেন?’

থেমে যান আবার মাননাত কবির। আমিও কিছু জিজ্ঞেস করি না। একটু স্পেস দিই তাকে। ওটুকু সময়ে একটু ভাবুক। কিন্তু মাত্র কয়েক সেকেন্ড। ফোঁস করে একটা নিশ^াস ছাড়েন তিনি। কিছুটা হন্তদন্ত গলায় বলেন, ‘এই যে আমার গালে একটা দাগ দেখছেন না?’

‘হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি।’

ডান হাতের একটা আঙুল গালের দাগটায় স্পর্শ করে বললেন, ‘বলুন তো এটা কীসের দাগ?’

‘খামচির মতো মনে হচ্ছে।’

‘আপনি মনোচিকিৎসক, ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন।’

‘ওই দাগ চেনার সঙ্গে মনোচিকিৎসকের কোনো সম্পর্ক নেই।’ আবার ঝুঁকে বসি ভদ্রলোকের দিকে, ‘ওটার দিকে তাকালেই বোঝা যায় আঙুলের দাগ ওটা। এবং বড় কোনো মানুষের আঙুল।’

‘বড় কোনো মানুষ মানে কী, আমার মতো যে দেখতে, সেই মানুষটার খামচি। এত ব্যথা পেয়েছিলাম!’

‘আপনাকে খামচি দেওয়ার কারণ?’

‘জটিল একটা কারণ। কিন্তু আপনাকে বলতে লজ্জা লাগছে।’

‘ডাক্তারের কাছে এসেছেন, লজ্জা পেলে তো চলবে না।’

‘কী করব বলুন, ছোটবেলা থেকেই আমি কিছুটা লাজুক।’

‘কিছুটা না, আপনি বেশ লাজুক। কথা বলার সময় লাজুক মানুষদের নাক ঘামে। আপনারও ঘেমেছে।’

‘ইদানীং একটা জিনিস প্রবলভাবে খেয়াল করছি আমি- কয়দিন আগেও আমি যা করতাম না, এখন অবলীলায় তা করি।’

‘যেমন?’

‘কলেজ থেকে বাসায় ফিরছিলাম সেদিন, বাসে।’

‘ভালো কথা, আপনি তো একজন শিক্ষক।’ 

‘জি।’

‘কোন সাবজেক্ট পড়ান?’

‘কেমিস্ট্রি।’

‘খুব ভালো সাবজেক্ট।’

‘বরাবরই ভালো ছাত্র ছিলাম। রেজাল্টও উপরের দিকে ছিল। একসময় ভাবলাম ভালো কোনো রিসার্চ করব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিক্ষক হতে হলো। এতে অবশ্যি আমার কোনো আফসোস নেই।’

‘আপনার কথা শেষ করুন।’ লোকটার চোখের দিকে তাকাই আমি, ‘ওই যে কলেজ থেকে বাসায় ফিরছিলেন বাসে।’

‘বেশ ভিড় ছিল বাসে। মাঝখানে ঠেসেঠুসে হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে আছি। সারাদিন ক্লাস নেওয়ার পর ক্লান্ত শরীর। এর মধ্যে বাসের দুলুনি। ঘুম এসে যায় চোখে। হঠাৎ প্রচণ্ড ব্রেক কষে বাসটা। ঘুম ছুটে যায়। পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখি- সেও দাঁড়িয়ে আছে আমার পাশে। আমাকে দেখেই মুচকি একটা হাসি দিল।’

‘আচ্ছা, ওই মানুষটা যখন আপনার পাশে আসে, তখন তার পোশাক কেমন থাকে?’

‘আমি যা পড়ে থাকি, তার থেকে সম্পূর্র্ণ আলাদা।’

‘আপনি চোখে চশমা ব্যবহার করেন, তিনিও কি করেন?’

‘জি।’

‘একই ফ্রেমের?’

‘সেটা খেয়াল করিনি।’

‘আচ্ছা, এমন কি হতে পারে- আপনার একজন যমজ ভাই ছিল। ছোটকালে কোনো কারণে মিসিং হয়ে গেছেন। কিন্তু মানসপটে রয়ে গেছেন তিনি এখনও। মাঝে মাঝেই দেখতে পান তাই তাকে।’

‘না, আমার কোনো যমজ ভাই ছিল না। এমনকি কোনো ভাইও নেই আমার। তিনটা কেবল বোন আছে আমার।’

‘আমরা বরং আগের প্রসঙ্গে যাই। ওই যে বাসের ভেতর-।’

‘জি। মানুষটার মুচকি হাসি দেখে ভীষণ রাগ হয় আমার। কিন্তু বাঁ দিকে চোখ যায় হঠাৎ। একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ওই হ্যান্ডেল ধরেই। চমৎকার দেখতে। বুকের ভেতর কেমন ছলাৎ করে ওঠে। বাসের দুলুনি, নিজেও দুলছি। আলতো করে গা ঘেঁষে দাঁড়াই মেয়েটার। মেয়েটা জড়োসড়ো হয়ে যায় আরও। আমি আরও কাছ ঘেঁষে দাঁড়াই তার। ওপাশে আরেকজন পুরুষ, এ পাশে আমি, কেমন অসহায় হয়ে যায় মেয়েটা। বলতে পারেন আমার ভেতর চরম লোলুপতা জেগে ওঠে।’

‘বাসে, বিভিন্ন যানবাহনে ইদানীং এসব খুব বেশি হচ্ছে। এমনকি মেরেও ফেলা হয়েছে অনেক মেয়েকে।’

‘মেয়েটা কেমন কুঁচকে যায়। হঠাৎ আমার মতো দেখতে পাশের জন আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে, সরে আসো ওদিক থেকে। নিজের মাঝে জিদ চেপে যায়। চিনি না, জানি না, এই ব্যাটা বাধা দেওয়ার কে? আমি আরও চেপে দাঁড়াই মেয়েটার। অসহায়ের মতো দেখায় তখন মেয়েটাকে। আমার পাশের জন এবার কিছুটা রূঢ়স্বরে বলে, ভালো হচ্ছে না। এদিকে সরে আসো। আমি বলি, না। সঙ্গে সঙ্গে সে বলে, আসতেই হবে। আমি আবার বলি, না। সে বলে, সরে আসো বলছি।’

‘আপনাদের কথোপকথন আশপাশের কেউ শোনেনি?’

‘সেটা খেয়াল করিনি, আমরা নিজেদের কথা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।’

‘তারপর?’

‘তারপর একপর্যায়ে প্রচণ্ড রেগে গিয়ে আমার মুখে খামচি দিয়ে বসে সে। চিৎকার দিয়ে উঠি আমি। কিন্তু তাকে জাপটে ধরার আগেই বাস থেকে নেমে যায়।’

‘এরপরও তো তার সঙ্গে দেখা হয়েছে আপনার।’

‘জি।’

‘তখন কিছু বলেননি?’

‘ব্যাপারটা স্পর্শকাতর, তাই প্রসঙ্গটা আর টানতে ইচ্ছে করেনি। স্টপ-।’ মাননাত কবির হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বাঁ পাশে অদৃশ্য কারও প্রতি মারমুখী দৃষ্টিতে তাকান, ‘আমি মিথ্যা বলছি! শয়তান, বদজাত। আমি শিক্ষক মানুষ, আমি কখনও মিথ্যা বলিনি। বলবও না। ভাগ।’

মাননাত কবির আবার চেয়ারে বসেন। হাঁপাতে থাকেন ঘন ঘন। আমি নরম গলায় বলি, ‘পানি খাবেন?’

‘জি। ঠাণ্ডা, শীতল পানি।’

মাননাত কবিরের স্ত্রী সুনীতা খান বেশ ইতস্তত ভঙ্গিতে বললেন, ‘আপনাকে তো সব কথা বলতে পারব না। যদিও আপনি ডাক্তার, সব কথা বলা দরকার আপনাকে।’

‘আপনাকে সব কথা বলতে হবে না। শুধু আমি যা প্রশ্ন করব, তার উত্তর দিলেই হবে। যদিও আমার প্রশ্ন মাননাত কবির সংক্রান্তই।’

‘চা চলবে?’

‘চলবে।’

‘সুগার?’

‘সামান্য।’

ভেতরের ঘরে গেলেন সুনীতা খান। সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। বেশ পরিপাটি করে সাজানো লিভিংরুমটা। জানালার পাশের দেয়ালে অনেকগুলো ছবির ফ্রেম ঝুলানো। কিন্তু ওগুলোতে কোনো ছবি নেই, বিভিন্ন সার্টিফিকেট বাঁধাই করা আছে সেখানে। তিনটা সার্টিফিকেটে চোখ আটকে যায় আমার। আরও একটু দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াই আমি। পরপর তিন বছর সার্টিফিকেটগুলো পেয়েছেন তিনি- বেস্ট এবং অনেস্ট টিচার-২০১৪, ২০১৫, ২০১৬।

‘সার্টিফিকেট আরও পেত ও।’ দুটো কাপ হাতে পাশে দাঁড়ালেন সুনীতা খান, ‘কিন্তু কলেজের নিয়ম হচ্ছে- পরপর তিনবার কেউ একই সার্টিফিকেট পেলে পরের দু’বছর তাকে আর দেওয়া হয় না।’

‘অন্যকেও উৎসাহিত করা আর কী।’

‘কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, এ রকম অনেস্ট মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। আমার বাবাও একজন সৎ মানুষ ছিলেন।’ সুনীতা খান হাসতে থাকেন, ‘বলতে পারেন, এ জন্যই বাবা পছন্দ করেছিলেন ওকে।’

‘আপনি তো আর্কিটেক্ট?’

‘জি।’

‘একজন আর্কিটেক্ট একজন কলেজ টিচারকে বিয়ে করল!’

‘ওই যে বললামÑ বাবা তার মতো একটা সৎ ছেলে পেয়েছেন। আমিও আপত্তি করিনি। একজন সৎ মানুষের পরিবারে বড় হয়েছি, কিন্তু সংসার যদি একজন অসৎ মানুষের সঙ্গে করতাম, তাহলে হয়তো ভালো থাকতাম না।’

‘সত্য বলেছেন আপনি।’

‘যদিও আরও একটা অসম্ভব গুণ আছে ওর। সুন্দর করে কথা বলতে পারে ও। অনেকটা গল্পের ঢঙে।’

‘এটা কি বিয়ের আগে জানতেন আপনি?’

‘বিয়ের সবকিছু ঠিকঠাক। দু’দিন আগে একদিন ও বাসায় আসে আমাদের। বাবাকে বলে, আপনার মেয়ের সঙ্গে একটা ঘণ্টা কথা বলতে চাই আমি। বাবা বলেছিলেন, বসো। মাননাত বলেছিল, ওই লেকের পাশে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে চাই। বাবা একমুহূর্ত অপেক্ষা করেননি। আমাকে পাঠিয়ে দিলেন তার সঙ্গে।’

‘সৎ মানুষ সৎ মানুষকে চিনতে পারেন।’

‘চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।’

সুনীতা খানের হাত থেকে নিজের হাতে নিই চায়ের কাপটা। সার্টিফিকেটগুলোর দিকে আরও একবার তাকিয়ে সোফায় বসি। তিনিও বসেন। কপালে নেমে আসা চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে বলেন, ‘একটা আর্কিটেকচারাল ফার্ম আছে আমার। অনেক দিন ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায়। ও কোনোদিন কখনও কোনো প্রশ্ন করেনি আমাকে।’

‘সৎ মানুষরা অন্যকেও সৎ ভাবেন।’

‘একদম ঠিক বলেছেন। ওর সঙ্গে মিশে মিশে মাঝে মাঝে নিজেকেই অসৎ মনে হয় আমার। জানেন, প্রতিমাসে বেতন পাওয়ার পর তিনি কী করেন?’

আরও একটু মনোযোগী চোখে তাকাই আমি সুনীতা খানের দিকে। প্রফুল্ল চোখে তিনি আমার দিকে তাকান। গুনে গুনে পুরো তিন হাজার টাকা আলাদা করে পাঠিয়ে দেয় গ্রামে তার এক শিক্ষকের ঠিকানায়।’

‘কেন?’

‘বৃদ্ধ হয়ে গেছেন মানুষটি। ক্লাস নাইনে ওঠার পর প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য ছিল না তার। ওই শিক্ষক মশাই তাকে বিনা বেতনে পড়িয়েছিলেন এসএসসি পর্যন্ত।’

‘ইদানীং ওনার কোনো অসামঞ্জস্যতা চোখে পড়েছে আপনার?’

‘বেশ কয়েকটা।’

‘কী করেন তখন আপনি?’

‘অনেকগুলো আমি পাশ কাটিয়ে যাই। কিন্তু একটা জিনিস এখনও বুঝতে পারি না আমি।’

‘খুলে বলা যাবে ব্যাপারটা?’

‘খুবই ব্যক্তিগত।’

‘গোপন রোগের চেয়ে ব্যক্তিগত আর কোনো বিষয় নেই।’

‘হ্যাঁ, ইদানীং ওটা রোগই মনে হচ্ছে।’ মহিলা একটু জড়োসড়ো হয়ে বসলেন, ‘প্রতি রাতে আমরা অন্তত আমাদের বারান্দায় গিয়ে বসি। ঘন দুধ দিয়ে কফি খেতে খুব পছন্দ করে ও। আমি লিকার চা। এ সময়টায় আমি একটা হাত চেপে ধরে থাকি ওর। খুব ভালো লাগে তখন। সারাদিন দেখা হয় না। ওই রাতটুকুই আমাদের সব।’ সুনিতা খান থামেন, ‘এখন আর হাত ধরতে দেয় না ও।’

‘কারণ জিজ্ঞেস করেছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘কী বলেছেন?’

‘গলার স্বর নিচু করে বলেছিল- আশপাশে নাকি কেউ একজন আছে, যে আমাদের দেখছে।’ লাজুক একটা হাসি দেন সুনিতা খান, ‘মানসিকভাবে আমরা দূরে সরে গেছি অনেক, শারীরিকভাবেও। আমি একটু কাছে ঘেঁষতে চাইলেই ও প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে বলে- দেখছো না একজন মানুষ তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।’

মাথা নিচু করে ফেলি আমি। কোনো কিছু আর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে না। অনেকক্ষণ পর মাথা তুলে বলি- ‘এগুলো ঠিক কতদিন আগে শুরু হয়েছে?’

‘ঠিক পাঁচ মাস আগে।’ মহিলা গড়গড় করে বলতে থাকেন পরের কথাগুলো। আমি শুনছি, সঙ্গে সঙ্গে ভাবছি। পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় নিমেষে।

মাননাত কবির বেশ লাজুক গলায় বললেন, ‘আপনি আমার বাসায় গিয়েছিলেন। কলেজে ছিলাম তখন। জানতে পারলে একসঙ্গে চা খেতাম। গল্পও করা যেত কিছুক্ষণ।’

‘আমি আপনার অনুপস্থিতিটাই চাচ্ছিলাম।’ তার দিকে একটু ঝুঁকে বসি আমি, ‘আপনার স্ত্রীর সঙ্গে কিছু কথা বলার দরকার ছিল।’

‘কথা তো হয়েছে। কিছু বুঝতে পেরেছেন?’

‘জি। আপনার সমস্যাটা তেমন জটিল না। আপনাকে অন্তত সাতটা দিন আমার কাছাকাছি থাকতে হবে।’

‘কাছাকাছি মানে?’

‘আমাদের হাসপাতালে।’

‘তিনটা দিন থাকলে হয় না?’

‘কেন?’

‘সামনে বাচ্চাদের পরীক্ষা। ক্লাস মিস করলে ওদের সমস্যা হবে।’

‘আচ্ছা দেখা যাক, আগে ভর্তি হন তো।’

‘কিন্তু আপনাকে একটা কথা বলি, খুব বেশি দিন বাঁচব না আমি। দেখুন-।’ গলার কাছ থেকে শার্টটা সরিয়ে ফেলেন মাননাত কবির, ‘গত রাতে আরেকটা খামচি দিয়েছে ও। বলতে পারেন শ্বাসনালি চেপে ধরতে চেয়েছিল। ভাগ্যিস, ঝটকা দিয়ে সরে এসেছিলাম।’

চেয়ার থেকে উঠে আমি মাননাত কবিরের পাশে দাঁড়াই। নিজেই শার্টটা সরিয়ে খামচিটা দেখি। হুবহু তার গালের খামচির মতো। 

রাতে ডিউটি ছিল না আজ। চেঞ্জ করেছি এক কলিগের সঙ্গে। ২১১ নম্বর কেবিনে রয়েছেন মাননাত কবির। রাত একটু গভীর হলেই তার কেবিনে যাব। আরও কিছু কথা বলা দরকার তার সঙ্গে।

মাননাত কবিরের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু পড়াশোনা করছি নিজের রুমে। ইন্টারনেট ঘেঁটে কিছু ইনফরমেশন বের করেছি এরই মধ্যে। ব্যাপারটা যত সহজ মনে করেছিলাম, ততটা না।

দরজায় একটা টোকা পড়ল হঠাৎ। বই থেকে চোখ না সরিয়েই বললাম, ‘কাম ইন।’

সাত-আট সেকেন্ড কেটে গেল, কেউ এলো না। দরজার দিকে তাকালাম। স্থির।

মনোযোগ দিলাম আবার বইয়ে। শব্দ হলো আবার। উঠে দাঁড়ালাম। কিছু একটা ভাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কেমন যেন অসংলগ্ন লাগছে সবকিছু। যা ভাবতে চাচ্ছি, তা পারছি না।

আবার শব্দ হলো। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে টেনে ধরলাম দরজাটা। কেউ নেই। ফাঁকা। মন খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু ভালো করে দরজার দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা- দরজার লকটা লুজ, বাতাসে নড়ে ওঠে একটু পর পর।

ফিরে এলাম টেবিলে। সঙ্গে সঙ্গে শব্দ হলো আবার। পাত্তা দিলাম না এবার।

শব্দটা আবার হলো। কান পাতলাম মনোযোগী হয়ে। শব্দ হলো। হঠাৎ মনে হলো আগের বারের শব্দের চেয়ে এবার আলাদা। উঠে দাঁড়ালাম। দরজায় গিয়ে দেখি মাননাত কবির। আমাকে দেখেই কাতর গলায় বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, আমি তো ঘুমাতে পারছি না।’

‘কেন?’

‘দুটো কারণে।’

‘ভেতরে আসুন।’

আমি আমার চেয়ারে বসলাম, কিন্তু মাননাত কবির দাঁড়িয়ে রইলেন। কেমন জবুথবু দেখাচ্ছে তাকে।

‘বসুন।’

চমকে ওঠার মতো সোজা হলেন তিনি।

‘আপনি কি কিছু ভাবছেন?’

‘জি।’ মাননাত কবির সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, ‘আপনাকে ঠিক আমার মতো দেখাচ্ছে।’

‘যেমন?’ হাসতে থাকি আমি।

‘হুবহু আমার মতো চেহারা। গালে যে নতুন খামচির দাগটা আছে, সেটাও আছে। আমার একটা গজদন্ত আছে, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেটাও। বাঁ কানের নিচে একটা তিল আছে, ওটাও দেখা যাচ্ছে।’

‘আপনি বসুন।’

চেয়ারের পেছন থেকে সামনে এলেন মাননাত কবির। সংকোচের ভঙ্গিতে  বসে একটা নিশ্বাস ছাড়লেন শব্দ করে।

‘দুটো কারণে আপনার ঘুম হচ্ছিল না। কারণ দুটো বলা যাবে?’

‘কে যেন একটু পর পর দরজায় ধাক্কা দেয়। আমি বলি- কে? জবাব দেয় না। আবার ধাক্কা দেয়। আমি আবার বলি- কে? জবাব দেয় না। শেষে উঠে গিয়ে দেখি, কেউ নেই। সেই কখন থেকে এমন দরজা ধাক্কাধাক্কি চলছে!’

‘দ্বিতীয় কারণ?’

‘আমার মতো দেখতে বজ্জাতটা, আমি একটু স্থির হয়ে বসলেই বকবক করতে থাকে সে।’

‘আপনাদের মধ্যে সাধারণত কী ধরনের কথা হয়?’

‘বিচিত্র সব কথাবার্তা। কিছুক্ষণ আগে বলে কি আমার শরীর থেকে নাকি মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছে সে।’

দু’চোখ স্থির করে মাননাত কবিরের দিকে তাকাই আমি। যারা মিথ্যা কথা বলে, তারা চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না। এতক্ষণ তিনি কথা বলছিলেন চোখ নিচু করেই।

গলাটা যতটুকু ব্যক্তিত্বময় করা যায়, সে রকমভাবেই আমি তাকে বললাম, ‘আপনার মতো দেখতে কোনো মানুষ দেখেন না আপনি। আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলতে পারেন। যারা সুন্দর করে কথা বলতে পারে, তারা সুন্দর করে মিথ্যাও বলতে পারে।’

‘আমার কথাগুলো মিথ্যা মনে হচ্ছে আপনার!’

‘শুধু মিথ্যা না, ডাঁহা মিথ্যা।’ মানুষটাকে পূর্ণ চোখে লক্ষ্য করি আমি। তার রি-অ্যাকশনটা বোঝা দরকার আমার। কিন্তু তিনি ভাবলেশহীন। অনেকটা স্ট্যাচুর মতো স্থির, নির্ভার।

নাক ঘেমে উঠেছে মানুষটার। আমি তাকে মিথ্যাবাদী বলাতে তিনি লজ্জা পেলেন! আমার মন বলছে, তাকে আরও লজ্জা দেওয়া দরকার। কোনোভাবেই আর কিছু ভাবতে না দিয়ে আমি বললাম, ‘আপনার ডান হাতটা উঁচু করুন তো।’

কোলের ওপর থেকে হাতটা উঁচু করলেন মাননাত কবির।

‘টেবিলের ওপর রাখুন।’

চিৎ করে টেবিলে রাখলেন তিনি হাতটা।

‘আপনার ডান হাতের মাঝের আঙুলটা নেই।’

‘জি।’

‘ওটা নেই কেন?’

‘ছোটকালে আখের রস বের করা মেশিনে ওই আঙুলটা ঢুকে গিয়েছিল। থেঁতলে গিয়েছিল পুরোপুরি। পচন ধরে গিয়েছিল। ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু রাখতে পারেননি।’

‘এখন আপনার ডান হাতে চারটা আঙুল।’

‘জি।’

কালো রঙের একটা পাতলা কার্বন পেপার এগিয়ে দিই আমি মাননাত কবিরের দিকে, ‘আপনি আপনার ওই ডান হাত দিয়ে খামচির মতো একটা আঁচড় কাটুন এখানে।’

কিছুটা ইতস্তত বোধ করলেন মাননাত কবির।

‘এটা চিকিৎসার একটা অংশ। প্লিজ, আঁচড় কাটুন।’

অনিচ্ছার ভঙ্গিতে কাগজে আঁচড় কাটলেন মাননাত কবির। কার্বন পেপারটায় খামচির মতো একটা দাগ ভেসে উঠল। মাননাত কবিরকে আমি বললাম- ‘এই যে খামচির মতো আঁচড়টা দিলেন, এখানে তিনটা আঙুলের খামচি রয়েছে। খামচি দেওয়ার সময় বুড়ো আঙুলটার কোনো দরকার পড়ে না। বাকি চারটার উপস্থিতি থাকে তাতে। কিন্তু কাগজে উপস্থিতি আছে তিনটা আঙুলের। যেহেতু আপনার মাঝের আঙুলটা নেই, তাই তিনটা আঙুলের উপস্থিতি থাকাই স্বাভাবিক।’

‘জি!’

‘আপনার গালে ও গলার কাছে খামচির দাগ আছে, সেখানে ওই তিনটা আঙুলের উপস্থিতিই রয়েছে।’

‘জি।’

‘এর মানে কী? এর মানে হলো আপনি নিজেই নিজেকে খামচি দিয়েছেন। সাধারণত একে বলে নন সুইসাইডাল সেল্ফ ইনজুরি সিনড্রোম।’ টেবিলে দু’হাত তুলে একটু ঝুঁকে বসি মাননাত কবিরের দিকে, ‘এর কিছু কারণ আমি আপনাকে বলতে পারি।’

মাথা নিচু করে ফেললেন মাননাত কবির।

‘সংবেদনশীল, বিশেষত সৎ মানুষেরা একটু খারাপ কিছু দেখলেই অপরাধবোধে ভোগেন। আপনার কলেজের একজন শিক্ষক এক ছাত্রীকে শ্লীলতাহানি করেছে গত বছর, এটা আপনি জানেন। কিন্তু জানার পর কিছু করতে পারেননি আপনি। গ্রামে আপনাদের বড় একটা জায়গা আছে। আপনার বড় বোন কৌশলে সবার কাছ থেকে ওটা লিখে নিয়েছেন নিজের নামে। অথচ ওখানে একটা স্কুল করার ইচ্ছে ছিল আপনার, বাবা-মায়ের নামে। তা করতে পারেননি। আপনার ছোট ফুপু ক্যান্সারে মারা গেছেন। যিনি আপনাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। ছোটকালে আপনাদের যৌথ বড় সংসারে আপনার মাকে বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকতে হতো রান্নাবান্না নিয়ে, ওই সময়টাতে আপনার ছোট ফুপু দেখভাল করতেন আপনাকে। কিন্তু ক্যান্সার হওয়ায় মুষড়ে যান আপনি। আপনার সবসময় মনে হতে থাকে- কিছুই করতে পরছেন না ফুপুর জন্য। সম্প্রতি দুটো ব্যাপার আপনাকে আরও অস্থির করে তুলেছে।’ 

নিচু করা মাথা সামান্য তুলে ধরলেন মাননাত কবির। একপলক আমাকে দেখে নিচু করে ফেললেন আবার।

‘কয়দিন আগে জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেল দেশে। আপনি একটা কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার ছিলেন। ভোটের আগের রাত থেকে ওখানে থাকতে হয়েছে আপনাকে। আপনি কিছু জিনিস দেখেছেন, কিছু কাজ আপনাকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা আপনি অন্যায় মনে করেছেন, যদিও তা অন্যায়ই ছিল। এই ব্যাপারটা আপনাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। কিন্তু কাউকে বলতে পারছেন না, মেনে নিতে পারছেন না, সহ্য করতে পারছেন না।’ টেবিলে রাখা মাননাত কবিরের হাতের ওপর একটা হাত রাখি আমি, ‘আপনার ভেতরটা অস্থির হয়ে যাচ্ছে। প্লিজ, শান্ত হোন।’

মাননাত কবির আমার হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে গাল চুলকাতে লাগলেন দ্রুত।

‘আপনি ইদানীং যে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছেন- সেটা হলো আপনার স্ত্রীকে নিয়ে। আপনার ধারণা তিনি অন্য কারও সঙ্গে মেশেন। এটা আপনার মাঝে এতই তীব্র যে, আপনি তাকে আর মেনে নিতে পারছে না। তাকে জড়িয়ে ধরা তো দূরের কথা, ছুঁয়েও দেখতে চান না। অথচ তাকে কখনও কিছু বলেননি। একা একাই একটা বেদনা বয়ে চলছেন আপনি।’

‘আমি এখন ঘুমাব, ঘুম পাচ্ছে আপনার।’

‘না, ঘুম পাচ্ছে না আপনার। আপনি আসলে পালাতে চাচ্ছেন।’ টেবিলে রাখা মাননাত কবিরের হাতের ওপর আমি হাত রাখি আবার- ‘আপনি যে বলেন হুবহু আপনার মতো দেখতে আরেকজনকে দেখেন আপনি, কথাটা ঠিক না। ওই মানুষটা হচ্ছে আপনার আরেকটা সত্তা। এত অন্যায় দেখে আপনার অন্যায় করতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ওই সত্তা এসে বাধা দেয় আপনাকে। মানুষের মাঝে একই সঙ্গে খারাপ এবং ভালো- দুই সত্তাই কাজ করে, দুটোই এক সঙ্গে জেগে ওঠে। পরস্পর যুদ্ধও করে তারা। শেষ পর্যন্ত জিতে যায় যেকোনো একটা সত্তা।’

উঠে দাঁড়ান মাননাত কবির। কোনো কথা না বলে চলে যান নিজের কেবিনে।

সকালে সুইপারের চিৎকারে চমকে উঠি আমি। সারা রাত জেগে থাকার পর তন্দ্রার মতো এসেছিল। দ্রুত বের হয়ে আসি রুম থেকে। সামনের কেবিনের দিকে তাকিয়ে দেখি- দরজার নিজ দিয়ে রক্তের একটা ধারা বের হয়ে এসেছে বাইরে।

মাননাত কবিরের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি। তার লাশটা হাসপাতালে। কয়েকটা ফর্মালিটিজ সেরে বুঝে নিতে হবে ওটা। খুব আপনজনের একটা মৃত্যুসংবাদ সাধারণত ফোনে দেওয়া যায় না। তাই আমি নিজেই এসেছি খবরটা দিতে।

কলবেলে চাপ দিলাম।

দ্বিতীয়বার দিতে হলো না। মাননাত কবিরের স্ত্রী সুনীতা খানই খুলে দিলেন। তার মাথার পাশ দিয়ে দেখি- এক ভদ্রলোক ফুলহাতা শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে এগিয়ে আসছেন লিভিংরুমের দিকে। দরজার পাশে এসেই মাথা তুললেন, তাকালেন আমার দিকে। মাননাত কবির। চমকে উঠি আমি। কিন্তু তার চোখ এবং অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো- তিনি আমাকে চেনেন না, কখনও দেখেনওনি।

মৃত্যুসংবাদটা আর দেওয়া হলো না আমার।

সুমন্ত আসলাম : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares