উপন্যাস : হিমঘর : ইমরোজ সোহেল

ইমরোজ সোহেল ।।

 শেষ নিশ্বাসটা বের হতে কষ্ট হলো। এই কষ্টটা বুঝতে অনেক সময় ভুল হয়। কারণ ওই সময় বুকের ভেতর অনেক ক্রিয়াকাণ্ড ঘটে। সব ক্রিয়াকাণ্ডেরই একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। শব্দের ঘনঘটা আছে।

শব্দহীন মৃত্যু আমি দেখিনি। মৃত্যু একটা ঢেউয়ের মতো। জলে আছাড় খেতে খেতে একসময় ম্রিয়মাণ হয়ে তীরে এসে ভেড়ে। তখন সে নিষ্ক্রিয় থাকে। বন্দনা করার মতো শক্তি থাকে না তার। মৃত্যু মানে নীরবতা। মৃত্যুতে মানুষ কথা বলতে পারে না।

যখন সে মারা গেল তখন সকাল। ঘরে দেয়াল ঘড়ি নেই। টেবিলেও নেই। ঘড়ির ব্যবহার আজকাল কমে গেছে। মনে হয় শূন্যের কোঠায় চলে আসবে। তাই জোছনার মেয়ে তিলকা একপলকে দেখে নিলো সময়টা। পাঁচটা বত্রিশ। সময়টা মনে রাখা খুব জরুরি।

কারণ ঠিক সময়টা অবশ্যই তার মামাকে জানাতে হবে। তার মামা সৌদি আরব থাকেন। অনেক বছর।

প্রায় উনিশ বছর। যখন তার মামা বিদেশ যায়, তখন তার বয়স ছিল মাত্র চার বছর। যাওয়ার আগে তিলকা বুঝতে পারেনি মামার অভাব কত তীব্র হবে।

এখন সে প্রাইভেট মেডিক্যালে পড়ে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজে। থার্ড ইয়ার। এই মেডিক্যাল কলেজটি অনেক প্রাইভেট মেডিক্যালের মধ্যে প্রথম।

তাই সে এখানেই অ্যাডমিশন নিয়েছে। সরকারি মেডিক্যালে চান্স পায়নি- এই কথা সে ভুলে যেতে চায়।

সে এখনও ডাক্তার হয়নি। তবুও নানির মৃত্যুর সময়টায় থাকতে চায় বলে খবর পেয়ে গতকালই সে কুষ্টিয়ায় এসেছে। বড় খালার বাড়িতে। চৌরহাস।

শহরের মধ্যেই। কিন্তু এক প্রান্তে। পাকা রাস্তা থেকে আধা কি. মি. দূর। শেষের পাঁচশ’ ফুট রাস্তা কাঁচা। এবড়ো-খেবড়ো। উঁচু-নিচু। দিনে চোখ খুলে হাঁটা যায়। কিন্তু রাতে আলো না হলে পথ চলা কঠিন।

এর আগেও নানির মৃত্যুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল আরও দুই-তিনবার। মনে হয়েছিল, এই বুঝি তিনি মারা যাচ্ছেন। নিশ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত। চোখ স্থির। একভাবে তাকিয়ে ছিল। কাউকে চিনতে পারছিল না। কেউ কথা বললেও উত্তর দিচ্ছিল না। মৃত্যুপূর্ববর্তী মুহূর্তে এ রকমই হয় শুনেছি। পৃথিবী একপলক দেখে নিতে চায়। শেষ বারের মতো।

পৃথিবীটা খুব আদরের। যত্ন করে তাকে বুকে ধরে রাখতে ইচ্ছে করে। এর মায়া ত্যাগ করা কঠিন। এর সাথে যে সখ্য গড়ে ওঠে, তা থেকে মুক্তি পাওয়া দুরূহ। পৃথিবী আষ্টেপৃষ্ঠে মানুষকে বেঁধে রাখে। মানুষের অনেক আশা। মৃত্যুর আগে সেগুলো ফুটে ওঠে। তার সুগন্ধ সে ভুলতে পারে না। বার বার শুঁকে দেখতে চায় প্রতিটি মানুষ। মানুষের এটা সহজাত ধর্ম।

মানুষের আশার শেষ নেই। যার একতলা বাড়ি আছে সে দোতলা তৈরি করতে চায়। দোতলা যার আছে সে তিনতলা। সে চতুর্থতলা তৈরি করার জন্য তিনতলার ছাদের উপর রড বের করে রাখে। যে ভোররাতে মারা গেছে, সে আমার বোন। মৃত্যুর সময় তার কাছে কে কে ছিল। তার তিন মেয়ে- হাসিনা, জোছনা, রেহানা আর জোছনার হাফ ডাক্তার মেয়ে তিলকা। কিন্তু ঘরে এলোমেলো ভাবে শুয়ে ছিল তারা। আধো ঘুম আধো জাগরণে। প্রায় দুই মাস হলো এই একই অবস্থা। কতবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল মৃত্যুর। জীবনটা যেন এই যায় এই আসে। আর আমার বোন তাহমিনা বেগম যাওয়া-আসার মধ্যে কোনোরকমভাবে বেঁচে থাকে। এর নাম কি বেঁচে থাকা? অক্সিজেন-যন্ত্র নাকে। প্লাস্টিকের নল দিয়ে তরল খাদ্য ভেতরে পাঠানো। হজম হওয়া না হওয়া মল বেড প্যানে সমর্পণ। পা নড়ে না। হাত চলে না। চোখ দেখে না। কান শোনে না। অনুভূতিহীন জড় পদার্থের মতো এই বেঁচে থাকা কি জীবন?

এটা আরও ভালো করে জানে তিলকা। প্রতিদিন তার সামনে দিয়ে কত মানুষ মৃত্যুর দিকে হেঁটে যায়। আবার কত মানুষ মৃত্যুকে টপকিয়ে জীবনের রথে চড়ে বাড়ি ফেরে। সে রোজ রোজ এসব দৃশ্য দেখে দেখে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম তার মনে মৃত্যু খুব রেখাপাত করত। এখন, তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। যখন সে ভর্তি হলো কলেজে, রোগী দেখলে তার বুক কাঁপত। মৃত্যু দেখে সে অস্থির হয়ে যেত। অনেককে লুকিয়ে সে চোখের পানি ফেলত। এখন সব সয়ে গেছে। মৃত্যুর পর সে পালস পরীক্ষা করে দেখতে পারে, জীবনের প্রতিধ্বনি আছে কি-না। চোখের মনিতে টর্চলাইটের আলো ফেলে দেখে নিই, সেটা স্থির হয়ে গেছে কিনা। জিহ্বা আলো ঢেলে দেখে নেয় জীবন উড়ে গেছে কিনা… শরীরের খাঁচা থেকে।

গতকাল যখন তিলকা এ বাড়িতে এলো, তখন অনেক সাজসজ্জা তার। চোখে আইলাইনার, ঠোঁটে লিপস্টিক, নাকে নাকফুল। জরিওলা কামিজ, ট্রাউজারে আধুনিক ধরনের ভাঁজ, রঙ করা চুলে অপূর্ব দীপ্তি সব ছিল। এখানে এসে সে যখন মৃত্যুর গন্ধ পেল, তখন খুব বেমানান লাগছিল। খুলে ফেলেছিল সব প্রসাধন। সাদাকে আগলে ধরে সে বিধবার মতো ম্রিয়মাণ হয়ে গিয়েছিল। মৃত্যু সাদাকে ভালোবাসে।

সাদা পোশাকে তাই জড়িয়ে নেওয়া হয় মৃতকে। খুলে নেওয়া হয় পার্থিব সব রঙচঙ। ঠোঁট লাল থাকলে, নখে নেলপলিশ থাকলে, শেষ গোসলের সময় তা মুছে ফেলা হয়। মৃত্যু রঙচঙ একেবারেই পছন্দ করে না।

এমনকি মৃত্যু আসতে পারে এ জন্য হাসপাতালের বিছানা পর্যন্ত ধবধবে সাদা রাখা হয়। লোহার ট্রলি খাটের রঙ সাদা রাখার নির্দেশনা থাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। বিল্ডিংয়ের ছাদ, দেয়াল, বিছানা, বালিশ সব সাদা। সাদাকে মৃত্যু বড় পছন্দ করে।

তিলকার চারজন মামা। যে দু’জন মামা কাছে থাকে তাদের মায়া কি কম। তাদের মা মারা যাচ্ছে… অথচ তারা এখানে নেই। ঘটনাক্রমে সেলিম বিশ্বাস, যে মামাটি জেদ্দায় থাকে, সেও এখন নেই। পর পর দু’বার মায়ের মৃত্যু দেখতে উড়ে এসেছিল অল্প নোটিশে।

কিন্তু মৃত্যুর দেখা না মেলায় ফিরে গিয়েছিল ক’দিন পর। মৃত্যু জীবনে একবারই আসে। মৃত্যুর অন্তিম মুহূর্ত জীবনে দু’বার কেউ দেখেনি।

আমার মেজ বোন যখন একেবারেই মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে… তিলকা তখন টের পেয়েছিল। তার মনে হয়েছিল সে তার বিদেশে থাকা মামাকে মৃত্যুদৃশ্যটাকে লাইভ দেখাবে। আজকাল এটা তো একটা সহজ প্রযুক্তি। মেসেঞ্জারে মামাকে কল দিলেই তাহমিনা বেগমের মৃত্যুর দৃশ্য দেখানো যেত। ঘরে আরও তিনটা প্রাণী ছিল। কেউ চিৎপটাং, কেউ ভিন্ন ভঙ্গিতে পা ছড়িয়ে। কেউ বালিশের নিচে মাথাটাকে গুঁজে দিয়ে শুয়ে আছে। হয়তো বালিশকে মা ভেবে তার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে। এ দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না।

তিলকার একবার লোভ হলো, মোবাইলে ছবিটা তুলে রাখি। পরে, অর্থাৎ মৃত্যুর পর দৃশ্যটা দেখে দেখে মজা করা যাবে। বালিশের নিচে তার খালা রেহানার মাথা। উপুড় হয়ে শুয়ে আছে । কিন্তু ওড়নাটা এই ভাবে সরে গেছে যে, সেটা একটা কুণ্ডলী পাকিয়ে বিশ্রী দেখাচ্ছে।

তা ছাড়া তার মায়ের শরীরের ভঙ্গিটাও বেশ এলোমেলো। ছড়ানো-ছিটানো নক্ষত্রের মতো ছড়িয়ে আছে তার অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গ। বড় বেসামাল। এই দৃশ্যটাও ক্যামেরায় বন্দি করা ঠিক হবে না।

একবার মনে হয়েছিল, আজকাল তো মোবাইল থেকে ছবি অনেক এডিট করা যায়। সেও তা রপ্ত করেছে।

রঙ বদলানো যায়। ঢং বদলানো যায়। কাটছাঁট করা যায়। সংকুচিত করা যায়। আবার জুম করে ছোট ছবিটা বিশাল দৈত্য বানানো যায়। প্রকৃতি এখন প্রযুক্তির কাছে বড় অসহায়।

তিলকা লোভ সামলাতে পারলো না। সে মৃতপ্রায় নানিকে মামার কাছে উদ্ভাসিত করতে চায়। এর আগে

মামাকে নল দিয়ে নানির খাদ্য গ্রহণের ছবি দেখিয়েছে।

অক্সিজেন গ্রহণের প্রক্রিয়া দেখিয়েছে। শক্ত পাথর হয়ে যাওয়া মুষ্টিবদ্ধ হাতের কার্যকলাপ দেখিয়েছে। স্থির চোখের প্রবল মিনতি দেখিয়েছে। দীর্ঘদিন বিছানায় তাকে শুয়ে থাকা হাড় আর মাংসের গলন ও ঘা দেখিয়েছে। আজ মৃত্যু দেখানোর জন্যে তার প্রাণ খুব কাঁদছে।

দুই

মৃত্যু তো জীবনেরই অংশ। তাই মৃত্যুকে সকলেই ভয় পায়। জীবনকে মানুষ ভালোবাসে বলে মৃত্যুকে ভুলে থাকতে চায়। জীবন এতই প্রত্যশিত যে, মৃত্যুর কথা বললে মানুষ সেখান থেকে পালাতে চায়। জীবনের স্বপ্ন দেখে মৃত্যুকে অবহেলা করতে চায়। ঘৃণা করতে চায় মৃত্যুর অহেতুক আনাগোনাকে।

তিলকা ভিডিও কল করে। রাত তিনটা পর্যন্ত মামা জেগে ছিল। তখন মাকে বারংবার দেখেছে। দেখেছে তার নিথর নিস্পন্দ শরীর। বার বার। একটু আশা, যদি আবার জেগে ওঠে। এ রকম তো আরও কয়েকবার হয়েছে। তখন সে ভিডিও কল নয় নিজ চোখে মায়ের ফিরে আসা দেখেছে। মৃত্যু থেকে ফিরে আসা। সে বিধাতার কাছে প্রার্থনা করেছেÑ মা যদি আর ক’টা দিন থেকে যায়।

কেউ মায়ের মৃত্যু চায় না। মৃত্যু যখন জীবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দরজায় কড়া নাড়ে… তখনও পুত্র খুলতে চায় না দরজার খিল। মনে হয় খিল খুললেই মৃত্যু বাতাসের মতো এক লাফে ঢুকে পড়বে।

তিলকা কল করে। ধরে না সেলিম বিশ্বাস। সে এখন ঘুমিয়ে। হাসপাতালে। গত পরশু রাতে তার একটি মেয়ে পৃথিবীতে এসেছে। ধরা পড়েছে জন্ডিস। মেয়ে ইনকিউবিটরে। পৃথিবীর আলো তার জন্য যথেষ্ট নয়।

সে তাই কৃত্রিম আলোতে দগ্ধ হচ্ছে। মাঝে মাঝে ভেইনে ইঞ্জেকশন দেওয়া হচ্ছে। অন্য ঘরে। সেখানে আরও অনেক শিশু কৃত্রিম রোদ পোহাচ্ছে। তাদেরও কচি চিকন হাতে ফুটিয়ে দিচ্ছে সূঁচ। চিৎকার করে কাঁদছে ফুটফুটে শিশুগুলো। কিছুক্ষণ পর থেমে যাচ্ছে আবার।

তিলকার মামি, অহনা বিশ্বাসের পেটে নতুন সেলাই।

সেও যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ভিন্ন বিছানায়। জেদ্দার একটি অভিজাত হসপিটালে কেবিনের দুই বিছানায় দুইজন। এ রকম হয় না কখনও। একা থাকার অভ্যাস নেই তাদের। প্রচণ্ড ভালোবাসা তাদের আলাদা হতে দেয় না। টুকিটাকি দাম্পত্য কলহ মাঝে মাথা চাড়া দেয় বটে… কিন্তু সেই নড়বড়ে ভুল বোঝাবুঝি একসময় স্তিমিত হয়ে যায়। সাপের ফণা নিভে গেলে যেমন সাপ গর্তে লুকায়, ঠিক সেভাবে অভিমান অনায়াসে নির্জীব হয়ে পড়ে। ভালোবেসে বিয়ে করা বউ আবার ভালোবাসার আচ্ছাদনের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

নিদ্রিত সেলিম বিশ্বাস অহনার ডাকে সাড়া দেয়।

এই দেখো তো কার কল?

সেলিম সেই ডাক টের পায় না।

অহনা এবার একটু জোরে ডাকে, সেলিম, সেলিম দেখো তো কে এত রাতে কল করল?

এবার সেলিম, উত্তর দেয়।

কেন, কী হয়েছে অহনা, ডাকছ কেন?

দেখো তো কে কল করেছে? দু-তিনবার কল এলো।

মনে হয় বাংলাদেশ থেকে। আম্মার কিছু হলো না তো?

সেলিম চমকে ওঠে। ঘুমানোর আগেও সে মাকে নিস্পন্দ দেখেছে। তখন শুধু বুক ওঠানামা করছিল।

ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। কি যেন বলতে চাচ্ছিল তাকে। ঠোঁট নড়ছিল একটু একটু।

কত কথা জমা হয়ে আছে তার।

যখন সে জীবনকে আঁকড়ে ছিল… এই বছরখানেক আগেও, কত সক্রিয় ছিল তার কর্মকাণ্ড। অসম্ভব মেধাবী ছিল সে। সাত রাজ্যের খোঁজ একা রাখত সে।

এর কোথায় বিয়ে হলো, ওর কেন সংসার ভাঙলো?

অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যে চোখটা খামচে ধরল চিকন রড, সেই অপারশন কি সাকসেসফুল হলো নাত জামাইয়ের?

মেজ ছেলে মন্টু বিশ্বাসের ডায়াবেটিসের মাত্রা কত? তার চোখের অন্ধ অন্ধ ভাবটা কি গেছে? সেজ ছেলে মঞ্জুর মেয়ে ইসরাতের নাকফুল কি কেনা হয়েছে?

নাকফুল নেওয়ার পর কেমন লাগছে দেখতে। মঞ্জুর বৌটা খুব সুন্দর। তাই বাচ্চাটা কি সুন্দর ফুটফুটে হয়েছে। ছোট ছেলের ছেলে ওসমান কি স্কুলে যায়?

না ওকি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছে? সৌদিতে কি স্কুল আছ? ইংলিশ মিডিয়াম না আরবি মিডিয়াম?

লক্ষ লক্ষ প্রশ্নে জর্জরিত করত সে। অবিরাম অনবরত। কাছেপিঠে কেউ না থাকলে বেছে নিতো মোবাইল সেট। একটার পর একটা কল করে সব লেটেস্ট খবর করায়ত্ত করতো সে। টাকা শেষ হয়ে গেলে ওড়নার আঁচলে বাঁধা টাকা দিয়ে কোনো এক নাতিকে পাঠাতো ফ্লেক্সি লোড করতে। তারপর আবার সেই পৃথিবীকে ফিরে দেখা। কে কোথায় কেমন আছে।

কার কেমন চলছে দিন রাতের ঘটনাপ্রবাহ। তাকে সব জানতে হবে। একজন রাজা যেমন খোঁজ রাখেন সকল প্রজার। সৈন্যসামন্ত। পাইক পেয়াদা। ঘোড়াশালে ঘোড়া, হাতিশালের হাতি ঠিকমতো ঘাস খাচ্ছে কিনা… ঠিক সেই রকম তার দশা। মুড়ি খাওয়ার সময় আঙুল গলিয়ে একটা মুড়ি পালিয়ে গেলেও তাকে ধরে মুখে পুরতে হবে… এ রকম তার অবস্থা ছিল।

সেলিম অপেক্ষা না করে বাংলাদেশে কল করল।

তিলকা দেখতে পেলো, মামা হাসপাতালের কেবিনের একটি বেডে শুয়ে। অন্য বেডে মামি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।

মাঝখানে লোহার দোলনায় কেউ নেই। দোল না চুপ চাপ ঘুমাচ্ছে।

জড়পদার্থের ঘুম বড় মজার। টোকা দিলেই উঠে যায়।

অনুভূতি নেই বলে অবেলায় অনাকাক্সিক্ষত ঘুম ভাঙানোর জন্য প্রতিবাদ করে না। জীব ও জড়ের পার্থক্য এখানেই। জীব প্রতিক্রিয়াশীল। জড় নিষ্ক্রিয়।

জীব গতিশীল। জড় স্থির। জীব সোচ্চার। জড় নিশ্চুপ।

দোলনা খালি কেন? তাহলে নবজাত শিশুটির কোন সমস্যা? মামা তো বলেনি আগে। কী হয়েছে তার?

সেও কি নিঃশব্দে চলে গেছে পৃথিবী থেকে? একই সাথে কি প্রকাশিত হলো দুই মৃত্যুর খবর? একজন শিশু। তিন দিনের। অন্য জন বৃদ্ধা একাশি বছরের। একজন কন্যা। অন্যজন মা। একাশি বছর ধরে পাপ-পুণ্য ভালো-মন্দের মধ্যে মিশে আছে একজন।

অন্যজন নয় মাস গর্ভে থেকে কেবল ভূমিষ্ঠ হয়েছে পৃথিবীতে। একজন একাশি বছর ধরে এই পৃথিবীর আলোবাতাস চুষেছে। অন্যজন রক্ত চুষেছে মায়ের।

একজন পৃথিবীকে লাথি মেরে আহরণ করেছে বেঁচে থাকার সম্পদ। অন্যজন মায়ের জঠরে কখনও মাথা কখনও লাথি মেরে জানান দিয়েছে তার আগমন।

এই দুই অর্বাচীন মানুষ নামের জীব কি একই সাথে পৃথিবী হারালো। একজন উপভোগ করে অন্যজন উপভোগের সুযোগ না পেয়ে করে না। পৃথিবীর কে না চায় তার রস আস্বাদন করে তাকে ছিবড়ে করে ছুড়ে ফেলে দিতে ড্রেনে কিংবা আঁস্তাকুড়ে।

তিলকা এসব প্রশ্নের উত্তর পায় না।

সেলিম ভিডিও কলে দেখতে পায় তার মা, তাহমিনা বেগমকে ঘিরে একদঙ্গল মানুষ। পুরুষ এবং নারী।

হাউমাউ করে কাঁদছে কেউ কেউ। কেউ কেউ আঁচলে চোখ মুছছে। লম্বা একটা ভারী মানুষ ঘরের এক কোনে দাঁড়িয়ে হাঁ করে জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। বিশাল শরীর। গায়ে নীল পাঞ্জাবি। পরনে খোপ খোপ লুঙ্গি। সে অনায়াসে চিনতে পারে সে তার বড় বোন হাসিনার স্বামী। আবদুল মান্নান। বিএডিসি-তে চাকরি করতো। বছর দশেক হলো রিটায়ার্ড। তার দুই ছেলে। ফসলের পোকা নিধন ওষুধের ব্যবসা। তিন পা হাঁটলেই দোকান। সে এত স্বাস্থ্যবান যে, এটুকুই হাঁটতে তার কষ্ট হয়। মনে হয় ১২০ কেজি তার ওজন। মোটা মানুষের এই এক যন্ত্রণা। চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া এমনকি স্ত্রীকে ভালোবাসার ক্ষেত্রেও সে নিতান্তই পরাধীন। তাকে সকলেই করুণার চোখে দেখে। দুনিয়ায় বেঁচে থাকলেও তাকে অচল ভাবে।

আমার বন্ধু তাপস চৌধুরী। তার একমাত্র পুত্র রাজীব। বয়স ২৯ বছর। খুব ব্রিলিয়ান্ট। ছোট বেলায় কী সুন্দর দেখতে ছিল। আদর করে কত চুমু খেয়েছি তাকে। কাঁধে ঝুলিয়ে কত নেচেছি তাকে নিয়ে। সেই ছেলে এখন পরিপূর্ণ যুবক। চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং পাস করে এখন সে এক এনজিওর কর্মকর্তা। রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের গুরুদায়িত্ব নিয়ে এখন সে রাঙামাটি।

উঠতে কষ্ট, বসতে কষ্ট। ঘুম হয় না তার। জেগে থাকতেও ইচ্ছে করে না। কারও সাথে প্রেম করবে… সেখানেও প্রবল ব্যর্থতা। কেই তাকে পছন্দ করে না। তার কষ্ট দেখে আমার খুব করুণা হয়। এ বিষয়ে মাঝে মাঝে বন্ধুর সাথে কথা হয়। সেও খুবই হতাশ। এত বড় একজন ব্রিলিয়ান্ট যুবক প্রায় জীবন্মৃত। কিছু দিন আগে শুনলাম, সে অপারেশন করে ওজন কমাবে। সিঙ্গাপুরে। আঠারো লক্ষ টাকা লাগবে। ছুটি এবং টাকার জোগাড় হলেই সে চলে অন্য দেশে। আমাদের দেশে এত ডাক্তার আছে… এই অপারেশন হয় না কেন? দেশের টাকা দেশে থেকে যেত। ডাক্তারদের সুনাম হতো। আমার মেয়ে ডাক্তার। বছর পাঁচেক হলো পাস করেছে। খুব ইচ্ছে হয়েছিল সে সার্জারির ডাক্তার হবে। কিন্তু তার ইচ্ছে সে ছাত্র পড়াবে। সে খুব সুন্দর কথা বলতে পারে। তাই বায়ো-কেমিস্ট্রিতে এমফিল করল। শুরু করে দিলো অধ্যাপনা।

আমার ইচ্ছে আর পূর্ণ হলো না। মানুষের সব ইচ্ছে পূর্ণ হয় না। তাপসের ওই ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা ব্রিলিয়ান্ট ছেলেকে আমি আমার ছোট কন্যার জন্য নির্বাচন করতে চেয়েছিলাম। তা কী করে হয়। একশ’ সিক্সটি কেজি ওজনের একজন পুরুষকে কি কোনো মেয়ে পচ্ছন্দ করবে। আর সে যদি হয় আমার কন্যা? যার প্রতি ইঞ্চিতে অনর্গল ভবিষ্যৎ ফুটে ওঠে।

তিন

সেলিম ভিডিও কলে পরিষ্কার দেখতে পায়, তার মা ঘুমিয়ে পড়েছে। যে ঘুম আর ভাঙবে না। তার নবজাত কন্যাও কি ঘুমিয়ে পড়বে? দুটি মৃত্যুর শোক কীভাবে সে একই সাথে সামলাবে। আট ঘণ্টা পর পর এই তিন দিনের শিশুকে ক্যানোলা করে ইঞ্জেকশন দেওয়া হচ্ছে। ক্যানোলা করার সময় অনেক কষ্ট হয়। কেবিন থেকে সেই কান্নার শব্দ শোনা যায়। কী যে কষ্ট তা অনুমান করা কঠিন। আমি শিশু হসপিটালে একবার একজন আত্মীয়ার শিশুর ক্যানোলা করার সেই কঠিন শব্দ শুনেছিলাম। সহ্য করতে পারিনি। আলোচনা শুনতে পাচ্ছিলাম, নার্স অথবা ডাক্তারদের। ভেইন পাওয়া যাচ্ছে না। আমি বুঝতে পারি, বড় মানুষের ভেইন পাওয়াই কত কঠিন, ওইটুকু বাচ্চার ভেইন খুঁজে পাওয়া? মনে হয় অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজতে হবে। ডাক্তাররা পায় কীভাবে। জোড়াতালি দিয়ে কাজটা সেরে ফেলে নাকি। তাই বা হয় কী করে? ভেইন না পেলে অ্যান্টিবায়োটিক ইঞ্জেক্ট হয় কীভাবে। মনে হয় ট্রেনিং দিয়ে দিয়ে রপ্ত করেছে কলাকৌশল। তাই ওরা পারে। পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। শুধু মেধা আর একাগ্রতা প্রয়োজন। তাহলে সব অসাধ্য সাধন সম্ভব। সেলিমের কল ধরে তিলকা। মামা, মামা বলে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে সে। বলে, নানি আর নেই।

সেলিম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, কখন মারা গেল আমার মা?

চারটা বত্রিশ মিনিটে।

কে কে ছিল মৃত্যুর সময়?

মা, রেহানা খালা আর বড় খালা।

জেগে ছিল?

না একটু আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিল তারা।

তুমি?

আমি জেগে ছিলাম। একসময় দেখলাম, নানির মুখটা নীল হয়ে যাচ্ছে। চোখ স্থির আর ঘোলাটে। শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। মাঝে মাঝে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আবার খানিকক্ষণ পর আবার কিছুটা শ্বাস নিতে পারছে। মামা, আমি বুঝতে পারছিলাম, নানি মনে হয় মারা যাচ্ছে।

তারপর?

আমার কারুকে ডাকার কথা একবারও মনে হয়নি। শুধু মনে হচ্ছিল, আপনাকে নানির মৃত্যুকে দেখাই। এতদিন অসংখ্যবার সেলিম মায়ের জীবন দেখেছে।

এই ৭-৮ মাস আগে যখন কথা বলতে পারত, জড়ানো জড়ানো কণ্ঠে, একটু হাত-পা নেড়ে, একটু ঠোঁট কাঁপিয়ে মৃদুকণ্ঠে, তখন সেলিম প্রায় প্রতিদিন মায়ের সাথে কথা বলেছে। কখনও ভিডিও কলে, কখনও অডিও কলে। কথা বলতে মায়ের কষ্ট হচ্ছে, তবুও মাকে জিজ্ঞেস করেছে- মা, তোমার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে?

না না বাবা, কষ্ট হচ্ছে না।

বাবা, তুই কবে আসবি, তোকে দেকতি খুব মন চায় রে। আর কদ্দিন থাকবি? কত বছর হয়ে গেল, তুই

মরুভূমিতে পড়ি থাকলি। বউমার কত কষ্ট হয়। একা একা কত কাজ করতি হয়। সৌদিতে কি কাজের বেডি পাওয়া যায় না? একডা রাখিস। তোর ছেলেডা বড় হচ্চে। শুনতিচি, বউমার আবার বাচ্চা হবি। পোয়াতি বউটাক আর কত কষ্ট দিবি? বাবা, আমার মরণের সময় তুই থাকপি না… আমি কি করি সহ্য করব, তুইই বল বাবা?

এতক্ষণ সেলিম চুপ করে ছিল মায়ের আকুতি ভরা কথাগুলো প্রাণভরে শুনছিল। এবার বলতে শুরু করে, মা আমি চলিই আসব। আর ক’টা দিন মা। সৌদির অবস্থা খুব খারাপ। খালি ট্যাক্স বসাচ্ছে। মানুষের উপর ট্যাক্স, সব জিনিসের উপর ট্যাক্স। বেতনের উপর ট্যক্স। মা আমি তো মোবাইলের ব্যবসা করি। এখন আর চলছে না মা। আমি চলিই আসব মা।

হ্যাঁ, তুই চলিই আয়। আর থাকিস না অই দ্যাশে। ওকানে নাকি মেয়েলোক গাড়ি চালাচ্চে, সিনিমা হল খুলতেচে, কত খারাপ হয়ে যাচ্ছে নবিজির দ্যাশের লোক। আল্লাহ এসব সহ্যি করবিনানে।

এই কথা বলে মা থামে। সেলিম আবার বলতে শুরু করেÑ মা, এ দেশের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। শুনছি, মেয়েরা ফুটবল খেলবে। গান বাজনা করবে।

কবে দেকপি, মেয়েরা বুরকা খুলে ফেলবি। মদ খাবি, জুয়া খেলতি শুরু করপি, দ্যাশটা এক্কেবারে নাফরমানিতে ভরি যাবি। বাপ, তুই থাকিস না অই দ্যাশে। চলি আয়, বাপ চলি আয়।

চলিই আসব মা। আর থাকতি মন চায় না। আপনের বৌমা তো পোয়াতি। দোয়া করো মা, ভালোভাবে সব কিছু হয়ে গেলি আমি চলিই আসব। খুব খারাপ বিজিনেসের অবস্থা। পুঁজিই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সৌদিরা চাচ্ছে, বাঙালিরা সব চলে যাক। এখন আর দরকার নেই। লাথি মারি খেদায়ে দিতি চাচ্ছে। যাওয়া স্টার্ট করে দেছে লোকজন। নিমক হারামের দেশে আর কেউ থাকবে না।

সেই ভালো বাপ। আর থাকিস না। জলদি করি চলি আয়। নুন ভাত খাবো, যা বরাতে থাকে। একসাতে থাকতি পারব। এর মদ্যিই শান্তি বাপ, এর মদ্যিই শান্তি।

কথা শেষ হতে চায় না। এক সময় কথা বলতেই মা ঘুমিয়ে যায়। মনে হয় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে মা। দুই দু’বার স্ট্রোক করার পর যে বেঁচে আছে মা, এটাই তো অনেক।

ভিডিওতে দেখতে পায় সেলিম, মা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। চামড়া জড়িয়ে গেছে হাত-পা-মুখ, সব জায়গার। চুল ধবধবে সাদা। ছোট। পাতলা। ছাগলের দাড়ির মতো। ছিঃ। কী ভাবছি। মায়ের চুলের সাথে একি তুলনা এলো আমার। যে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। তার সম্বন্ধে একি ভাবলাম আমি।

খোদা, আমাকে মাফ করে দিও।

চার

দিন তিনেক আগেই সেলিম বুঝতে পারছিল, মায়ের অবস্থা খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। কাউকে চিনতে পারছে না। এপাশ-ওপাশ করাতেও খুব কষ্ট হচ্ছে। একভাবে শুয়ে থাকতে থাকতে পিঠে একধরনের থ্যাকথেকে ঘা হয়ে গেছে। সেখান থেকে দর দর করে একধরনের পুঁজ বেরোচ্ছে। খুব দুর্গন্ধ। খুব কাছের মানুষ ছাড়া কেউ এলে বেশিক্ষণ থাকতে চায় না। দুর্গন্ধ সহ্য করা কঠিন। দেখতে এসে কার দায় পড়েছে, সে বিদঘুটে গন্ধ সহ্য করবে। কিন্তু কোনোভাবেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। একদিকে জীবন। অন্যদিকে মৃত্যু। সন্তানসম্ভবা বউকে একা ফেলে কীভাবে মাকে দেখতে যাবে? আবার ওদিকে মা মৃত্যুর দিকে কীভাবে দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে। ডাক্তারের দেওয়া দিনে যদি সিজার করা যায়, তবে দিন আছে সাতদিন। ওদিকে মায়ের এই অবস্থা। একবার ভাবে, নির্দিষ্ট দিনের আগেই সিজার করালে কেমন হয়?

সে আল্ট্রাসোনো রিপোর্ট নিয়ে ডা. মাহজাবিনের কাছে গেল। তার আন্ডারেই ফলোআপে ছিল…। ডা. মাহজাবিন অত্যন্ত আন্তরিক। বাংলাদেশি ডাক্তার। অনেক সুনাম করেছে সৌদি আরবে। সরকারি হাসপাতালে চাকরি করে প্রায় বিশ বছর। এতই সুনাম যে, সৌদিরা পর্যন্ত গাইনি বিষয়ে কোনো পরামর্শের জন্য তার কাছে আসে। অত্যন্ত সাদাসিধা। নরম মনের। অন্যের কষ্টে নিজেও কষ্ট পায়। চেম্বারে, হাসপাতালে তো বটেই রাতবিরাতে বাসায় এলেও তাকে পরামর্শ দেয়। ইমার্জেন্সি হলে নিজে সাথে করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসা করে।

সেলিম তার চেম্বারে গেল।

আমার বউ… আপনার আন্ডারে চিকিৎসাধীন। তার ডেট হতে এখনও দিন সাতেক বাকি। ওদিকে আমার মা, আপনি তো জানেনই খুব অসুস্থ। যে কোনো সময় মারা যেতে পারেন। আমার খুব ইচ্ছা, মায়ের কাছে যাই। মনটা খুব চাচ্ছে। ডাক্তার সাহেব, অপারেশনটা ৫/৬ দিন আগে করা যায়? এই অবস্থায় তাকে রেখে আমি কেমন করে যাই।

কী বলেন? এটা কী করে সম্ভব? ডেটের আগে যদি কোনো ক্ষতি হয়, কে দায়িত্ব নেবে? আপনার মায়ের বয়স কত?

একাশি বছর।

কী হয়েছে তার?

দুই-দু’বার স্ট্রোক করেছে। এবার একবারে বেড রিডেন। কিছু খেতে পারছে না মুখে। নল দিয়ে খাবার দেওয়া হচ্ছে।

কতদিন এই রকম?

তা তো ৪/৫ দিন তো হলোই।

কত দিন আগে তার সাথে দেখা হয়েছে আপনার?

দুই মাস পাঁচ দিন। তখন এতটা খারাপ হয়নি। মুখে খেতে পারত, কথা বলতে পারত।

তাকে দেখার কে কে আছে, আপনার ভাইবোন নেই?

আছে, দুইজন ভাই আছে, যার যার কাজে তারা ব্যস্ত। মা আমার বড় বোনের কাছে কুষ্টিয়ায় আছে। বড় ভাইয়েরা পাবনায়।

কিন্তু আপনার যাওয়া ঠিক হবে না। আপনার মা যথেষ্ট আয়ু পেয়েছেন। এখন যে অবস্থায় আছেন, আপনি বললেন, তাতে দুনিয়ায় যেভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, তাতে চলে যাওয়াই ভালো।

ডাক্তার সাহেব, আপনি বলেন, আমি কী করব?

আমি বললাম তো, তাকে একা ফেলে যাওয়া ঠিক হবে না। ডেটের আগে আমি অপারেশনের রিস্ক নেবো না।

ডাক্তার কিছুটা বিরক্ত হয়ে এই কথা বললেন, সেলিম বুঝতে পারে।

সেলিম মন খারাপ করে বাসায় ফিরে আসে। অহনাকে বলে, মায়ের অবস্থা বেশি খারাপ। যে কোনো সময় মারা যেতে পারে। আমার খুব খারাপ লাগছে। আমি কী করব, বলে দাও সোনা?

সেলিম অসহায়ের মতো আত্মসমর্পণ করল অহনার কাছে।

অহনা কালক্ষেপণ না করে একটু আবেগজড়িত কণ্ঠে বলল- তুমি যাও। মা তোমাকে দেখতে চাচ্ছে। যাও। আমার কিচ্ছু হবে না। আল্লাহ আছেন না।

তোমাকে এভাবে রেখে কী করে যাই অহনা? তোমার যদি কিছু হয়? আমি কী করে সহ্য করব। এই কথা বলে সেলিম বিছানায় অহনার কোলে মাথা রাখে। সেলিমের কান অহনার পেটের কাছে স্থির হয়। মোটা গোলাকার ফুটবলের একাংশের মতো পেটের মধ্যে অহনার প্রায় প্রস্ফুটিত জীবন্ত সন্তান নড়েচড়ে ওঠে।

দেয়াল ঘড়ির কাঁটার শব্দের মতো একটি টিক টিক টিক টিক শব্দ কানে সেলিমের বেদনার্ত কানে আঘাত হানে। সেলিম চমকে ওঠে। সেলিমকে সেই চামড়ার ভাঁজে লুকানো শিশুটি আর্তচিৎকার করে বলতে থাকে যেও না বাবা, আমাকে ছেড়ে যেও না বাবা। তুমি চলে গেলে আমি যদি মরে যাই। আমার মা যদি জ্ঞান হারানোর পর আর ফিরে না আসে। বাবা, আমার কী হবে?

সেলিম চমকে ওঠে। কী বলছে শব্দ? সত্যিই তো তাই, যদি কোনো অঘটন ঘটে? অহনা যদি সিজারের পর আর জেগে না ওঠে। আলট্রাসনোগ্রাফিতে ভেসে উঠেছিল একটি অস্পষ্ট মেয়ের নাদুসনুদুস মুখ যাকে অহনা নাম রেখেছে শব্দ, তার যদি কোনো ক্ষতি হয়, অহনার যদি অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে, এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে কে দেখবে ওদের। সে সিদ্ধান্ত নেয়, সে যাবে না। তার আবার মনে হয়, একদিকে দুটি জীবন, অন্যদিকে একটি মৃত্যু। যাঁর মৃত্যু, সে একাশি বছর এই পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ আস্বাদন করেছে, তার জীবনে আর কোনো প্রাপ্তি নেই, সে এখন পৃথিবী থেকে যে বাতাস চুষে নিচ্ছে তা তার প্রাপ্য নয়, সে এখন গলগ্রহ, পৃথিবী থেকে যেটুকুই সে নেবে, সেটা যাই হোক, টাকা কিংবা খাদ্য, পানি কিংবা বাতাসÑ সবই ভবিষ্যৎ বংশধরদের প্রাপ্য অংশ সে সন্ত্রাসের মতো ছিনিয়ে নিচ্ছে। পৃথিবীর কাছে সে এখন পচা অথর্ব অহেতুক অপ্রয়োজনীয়। নষ্ট হয়ে যাওয়া মাংসের দলার মতো, বাসি হয়ে যাওয়া ফুলের মতো, গলে যাওয়া বরফের মতো। সে চলে গেলেই পৃথিবী একচিলতে জায়গা পাবে একটি শিশুর জন্য। তার বরাদ্দ শেষ। এখান থেকে তার দ্রুত চলে যাওয়া উচিত। না হলে পৃথিবী দুর্গন্ধে ভরে যাবে।

সেলিম পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত নিলো, সে যাবে না। অহনার পেটের মধ্যে নড়েচড়ে ওঠা জীবন্ত শিশুটি তাকে যে শিক্ষা দিলো সে জীবনে ভুলতে পারবে না।

পাঁচ

মাঝে মাঝে লিখতে লিখতে একটু বেশিই রাত হয়। লুই, আমার বউ, যথারীতি বারোটার দিকে ঘুমিয়ে পড়ে। ইদানীং মাঝে মাঝে তার প্রেসার বাড়ে। শুচি আমার মেয়ে, যার অন্য নাম ডাক্তার তানজিয়া তাজফিম তাকে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। সব রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শুচির মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন। তাতে দেখা গেল দুটি মেডিসিন। একটি ব্লাড প্রেসারের অন্যটি হার্টের। ডাক্তার ফি নিলেন না। টেস্টের চার্জ ৪০%।

প্রায় বিনা পয়সায় লুইয়ের চিকিৎসা শুরু হলো। কিন্তু লুইয়ের মন খুব খারাপ। ষাট বছরে একবারও অসুস্থ হয়নি যে মেয়েটি, একষট্টি বছরে পা দিয়েই দুটি শক্ত অসুখ তাকে অবলীলায় আক্রমণ করল, এতে তার মন তো খারাপ হতেই পারে। তারও চেয়ে মজার ব্যপার সে কোনো অস্ত্রোপচার ছাড়াই পাঁচ-পাঁচটা সন্তানের জন্ম দিয়েছে। এই অসম্ভব অহংকারটা আজ অসুস্থতা ধরা পড়ার পর কিছুটা ম্লান হয়ে গেল।

আমি এটা ওটা বলে অনেক সান্ত্বনা দিলাম। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। এক সময় ভাবনায় কিছুটা ক্লান্তি এলে সে অনায়াসে ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমের জন্য ক্লান্তি দরকার। শ্রমিকরা ক্লান্ত হয়ে রাস্তার আইল্যান্ডে ঘুমিয়ে পড়ে। বিছানা বালিশ কিচ্ছু লাগে না। অথচ ক্লান্তিহীন উপর তলার মানুষেরা ঘুমের জন্য কত কসরত করে। স্লিপিং পিল খায়। কত নায়ক নায়িকা, কবি সাহিত্যিককে ইনসোমনিয়ায় ভুগতে দেখেছি। কেউ কেউ ভ্যাট ৬৯ খেয়ে ঘুমের প্রার্থনা করে।

জীবনে বেঁচে থাকার জন্যে ঘুম খুব প্রয়োজন। শুধু মানুষ নয়, পশু-পক্ষীও যার যার মতো নির্দিষ্ট নিয়মে ঘুমায়। সাপ তো এক ঘুমে অন্ধকার গর্তে পাঁচ মাস কাটিয়ে দেয়। বৃক্ষও ঘুমায়। চাঁদ সূর্যও ঘুমায়। অবশ্য প্রবহমান নদীকে কখনও ঘুমাতে দেখিনি। স্রোত ঘুমায় না। চলতেই থাকে। পাহাড়ে বা পাথরে ধাক্কা খেয়েও সে চলতে থাকে। খোঁড়া ফকিরের মতো বাটি হাতে করে কক্ষনো বসে থাকে না।

লেখা শেষ করে যখন বিছানার দিকে গেলাম, হঠাৎ লুই জেগে উঠে বলল, এখনও ঘুমাওনি? দেখি কি লিখলে?

কাল সকালে দেখো।

না, এখনই দেখব।

সে জিদ করতে লাগল। আমার A9 Pro মোবাইল সেটটি তখন চার্জে। তবুও সে শুনবে না। হাতে নিয়ে বের করে একটি কবিতা। সে মোবাইলটা প্রায় ছুড়ে ফেলে দিলো বিছানার কোণে। নরম বিছানার আঘাতে ডিসপ্লে ভাঙলো না। সে নরম এবং শক্তের যোগসূত্র জানে। শক্তের সাথে নরমের যুদ্ধে শক্ত জিতে যায়। শক্তের কোনো ক্ষতি হয় না। নরম কিছুটা পর্যুদস্ত হয়। আর শক্তে শক্তে যুদ্ধ হলে দুজনেরই হাত মুখ দাঁত ভাঙে।

লুই এ কথা ভালো করে জানে বলে মোবাইল সেটটা মোজাইক অলা মেঝেতে ফেলেনি। আর একটি কারণ অবশ্যি হতে পারে। আমার মেয়ে সিলভিয়া অস্ট্রেলিয়া থাকে। একটা জব করে সে। কোকা-কোলা কোম্পানিতে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। সেখানকার প্রথম এক সপ্তাহের বেতনের প্রায় পুরোটা দিয়ে এই সেটটা কিনে দিয়েছে সে। তাই লুইয়ের এটাও মনে হতে পারে, মেয়েটার প্রথম কষ্টের টাকায় কেনা মোবাইলটা ইচ্ছে করে ভাঙা ঠিক হবে না।

লুই এত লক্ষ্মী যে, আমার কোনো জিনিস সে নষ্ট করে না। ফুলহীন জামায় নকশা এঁকে দেয়। ছোট ট্রাউজার বাতিল করে দিই বলে অন্য ট্রাউজারের একাংশ কেটে অন্য ট্রাউজার লম্বা করে দেয়। ১৯৮২ সালে কিনে দেওয়া সিঙ্গার মেশিনটি যত্ন করে ব্যবহার করে বলে এখনও বহাল তবিয়তে বিদ্যমান। যাই হোক, তার রাগ কবিতার প্রতি নয়, আমার প্রতি।

কিছু দিন থেকে বায়না ধরেছে সে, আমাকে উপন্যাস লিখতে হবে। জলকলঙ্ক লেখার পর তার কাটতি দেখে তার এই আগ্রহ। তার ধারণা কবিতার বই কেউ কেনে না আর একটি উপন্যাসই প্রকাশ করেছিল অনন্যা।

মনে হয় একটি কপিও অবশিষ্ট নেই।

উপন্যাসের চাহিদা দেখে এই মতিভ্রম। আর আমার কথা হলো আমার কবিতা এখন তৃতীয় বছরে অনেক কবিতাপ্রেমী পড়ছে। আবৃত্তিকারের কণ্ঠে শুনছে। আমি প্রাণভরে উপভোগ করছি। লুইকে কী করে বুঝাই, উপন্যাস হুট করে লেখা যায় না। তার জন্য প্রস্তুতি লাগে, কাহিনির বিন্যাস লাগে, পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখার ভাষা জাদুকরি ভাষার মাধুর্য লাগে। আমার এসব নেই। আদার ব্যাপারি দিয়ে কি অতকিছু হয়?

অন্য একটি কারণও হতে পারে। হঠাৎ আমার মনে হলো আমি যখন ১৯৭৫-৭৬ সালে লেখালেখি করতাম;

তখন সেগুলো ছাপা হতো ঢাকার বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায়। ইত্তেফাক, সংবাদ, পূর্বাণী, বিচিত্রার মতো পত্রিকায়। দুই একটি গল্প তো আলোড়ন তুলেছিল খুব। দু-একজন সম্পাদক তো আমাকে চিঠি লিখতেন বিশেষ সংখ্যার জন্য। একজনের কথা তো মনেই আছে। আবুল হাসনাত। তখন সংবাদের। গণসাহিত্য ছিল তখনকার সময়ের প্রধান সাহিত্য পত্রিকা। ওই পত্রিকায় তিনি আমার একটি দীর্ঘ গল্প ছেপেছিলেন। গল্পের নাম ছিল, যতদূর মনে পড়ে, ক্রিয়া = প্রতিক্রিয়া। খুব আলোচিত হয়েছিল গল্পটি। সেখানে শ্রেণিসংগ্রামের পরিপূর্ণ চিত্রটা ভেসে উঠেছিল। চন্দন নামের ১০/১১ বছরের একটি বালক সেই গল্পের নায়ক। তার একজোড়া জুতা হারিয়ে গিয়েছিল মুচির দোকান থেকে। সাড়ে তিন নং বাটার জুতা। তার সে কী কান্না। ক’দিন পর সে তার স্কুলে একটি ছেলের পায়ে দেখতে পায় সেই জুতা। তার পর শুরু হয় সংঘাত। সে এক লম্বা কাহিনি। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের মধ্যে যে সংঘাত, তা ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলাম ওই গল্পে। এখন অবাক হয়ে ভাবি… তখন আমি রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, এতটুকু বয়সে এই জটিল বিষয়গুলো কীভাবে ঢুকেছিল… এখন ভাবতে গেলে অবাক লাগে।

এখনও মনে আছে শ্রদ্ধেয় আবুল হাসনাত, বর্তমানে ‘কালি ও কলমের’ সম্পাদক, চিঠি লিখতেন আমাকে।

তার নিউজপ্রিন্টের কাগজে বলপেনে লেখা সেসব চিটি এখনও আমার স্মৃতিতে জ্বল জ্বল করে ভাসে।

কী সুন্দর গোটা গোটা স্পষ্ট লেখা ছিল তাঁর। আমি অনেকদিন পৌরহিত্যের দেওয়া তাবিজের মতো আমি সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিলাম আমার ট্রাংকে। আমার তখন মনে হয়েছিল, সম্পাদকদের লেখা এত সুন্দর হয়! কবি আল মুজাহিদের লেখাও খুব সুন্দর ছিল। কী সুন্দর চকচকে। মানুষটির মতোই।

লুইয়ের উপন্যাস প্রীতির আর একটি কারণ আছে। কিছুদিন আগে আমার একক কবিতা নিয়ে একটি ১০ জন আবৃত্তিকার একটি অনুষ্ঠান করেছিল। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসনে ছিলেন আমার কবিবন্ধু ভাস্কর চৌধুরী। প্রধান অতিথির বক্তব্যে সে একটা মজার তথ্য দিলো। ইত্তেফাকে তখনকার দিনে প্রকাশিত একটা গল্প নিয়ে একটা সিনেমা হয়েছে। সে বলল, আমি হয়তো জানিই না এই ঘটনা।

তাইতো, আসলেই আমি জানি না। তবে গল্পটির কথা কিছু মনে আছে। সৌদি আরবে মাল্টি স্টোরেড বিল্ডিংয়ে কাজ করার সময় ৫ দেশের ৭ জন শ্রমিক ছাদ থেকে পড়ে মারা গিয়েছিল। এর একজন ছিল বাংলাদেশি। সৌদি সরকার বাক্সবন্দি করে ওই লাশগুলো যার যার দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু লেভেল মারার সময় ভুল করে একজন হিন্দু ইন্ডিয়ান শ্রমিককে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আর রহিম মণ্ডল নামের বাংলাদেশি শ্রমিককে পাঠিয়ে দিয়েছিল ইন্ডিয়ায়। ভুল হোক, কিন্তু সৌদি আরবের নীতিমালায় এই নির্দেশনা ছিল। এটা অবশ্যই সহমর্মিতার একটা ভালো নিদর্শন।

এই বিষয়টা ধরা পড়েছিল রহিম মণ্ডলের গ্রামের মৌলভির কাছে। লাশ ধোয়ানোর সময় সে লক্ষ্য করেছিল, ‘এ লাশ তো রহিম মণ্ডলের লয়।’

আসলেই কতটুকু পার্থক্য মানুষের মধ্যে। হিন্দু, মুসলমানের, খ্রিস্টানের মধ্যে। তা কি আগে বোঝা যায় না? লাশ হওয়ার আগে? মানুষ মরে গেলেই নির্ধারিত হয় তার ধর্ম? এসব জটিল ধাঁধাঁ আমি বুঝতে পারি না। শুধু এটুকু বুঝি, রহিম মণ্ডলকে চিতাকাষ্ঠে পুড়িয়েছিল ওরা। তাকে আর ফেরত আনা যায়নি। অথচ রামচন্দ্রকে ঠিকই কবর থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ইন্ডিয়া। বাংলাদেশ এম্বেসি হন্তদন্ত হয়ে ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিল। মুখ ফুটে বলতেই পারেনি ‘তোমরাও ফেরত দিয়ে যাও রহিম মণ্ডলের লাশ।’

এটাই নিয়তি বড় দেশগুলো ছোটদের কে এভাবে নিষ্পেষণ করে।

আমি বুঝতে পারি উপন্যাসে তার আগ্রহ কেন। সে সিনেমা দেখে না। তবু যে আমার উপন্যাসের প্রতি কেন যে আগ্রহ, তা এখনও আবিষ্কার করতে পারিনি। তবে তার অগ্রজ মামুন ভাইয়ের কাছে শুনেছি অল্পবেলায়, সে যখন স্কুলে পড়তো, তখন সে সুন্দর নাচতে পারত। রবীন্দ্র সংগীত গাইতো স্কুলের কোন অনুষ্ঠানে। আমার এটা মনে আছে সে তখন খুব স্লিম ছিল। আমাদের যখন বিয়ে হয়, তার ওজন ছিল মাত্র ৪২ কেজি।

লুইয়ের রাগ থামাতে সময় লাগে না। একটু প্রতিশ্রুতি দিলেই হলো।

ঠিক আছে, কাল থেকে উপন্যাস লিখব। বিশ্বাস করো, আমি কাহিনিও ঠিক করে রেখেছি।

কোন বিষয় নিয়ে লিখবে?

আইলা, জলোচ্ছ্বাস এসব নিয়ে।

লুই ভালো করেই জানে, আইলায় আমি তিন বছর কাটিয়েছি। সহস্র ভাঙন দেখেছি। ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়া লক্ষ মানুষের আর্তনাদ দেখেছি। কত কেঁদেছি। সমুদ্রের মধ্যে স্পিডবোটের নাচন দেখেছি। অন্ধকারে স্পিডবোটের ট্রলারের সাথে ধাক্কা খেয়ে মরতেও দেখেছি। আয়লার কত গল্প বগলদাবা করে এখানে সেখানে আবোলতাবোল ঘুরে বেড়াচ্ছি। এখন দরকার একটু স্থিত হওয়া। সব উগরাতে পারব একে একে।

মোবাইল সেটে রিং বাজতে থাকল। খবর এলো।

আমি চুপ করে শুনতে থাকলাম।

 কে?

আমি এনামুল।

কী হয়েছে এনামুল? কোনো খবর?

চাচা, মেজো ফুফু আজ ভোরে মারা গেছেন। আজ জোহর বাদ জানাজা আর দাফন হবে। আপনি আসতে পারবেন। সেজো চাচা কি আসবেন।

তাঁকে কী খবর দিয়েছো?

না, এখন দিচ্ছি। ঠিক আছে চাচা। আপনি আসেন।

আপনার আসা দরকার। আমি কি জানিয়ে দেব? যে আপনি, সেজ চাচা আসছেন, দাফনে শরিক হবেন?

পাঁচ মিনিট পর জানাচ্ছি।

ঠিক আছে।

সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো।

আমি ফোন করলাম সেজ ভাইকে। রিং বাজল। উনি ধরলেন না। আবার করলাম। রিং বেজেই চলল। ক্রিং ক্রিং…

আমার ফোনে কোনো বাদ্য বাজে না। গান বা গজল হয় না। সাদামাটা সাধারণ শব্দ। সাধারণ শব্দের মধ্যে এক ধরনের মাদকতা আছে। কোকিলের ডাক সাধারণ। মিষ্টি মধুর। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ঝাঁঝালো। রসকষহীন। তাই মানুষ কোকিলকে আদর করে, তার কথা শোনে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক কর্কশ। কেউ সেই মিশ্র ভঙ্গির গান শুনতে চায় না। ঝিঁঝিঁ পোকা একা একা ডাকতে পারে না। ভয় পায়।

ছয়

অবশেষে সেজ ভাইয়ের সাথে কথা হলো। উনি নামাজে ছিলেন। ফোন ধরতে পারেননি। এখন রিং ব্যাক করেছেন। আমি বলি, আচ্ছালামু আলাইকুম।

ওয়া আলাইকুম আচ্ছালাম।

কেমন আছেন ভাই? আপনি কি মেজবুবুর খবর জানেন?

না তো। কেন কী হয়েছে?

উনি আজ ভোরে ইন্তেকাল করেছেন।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন।

আজ জোহর বাদ দাফন হবে, আপনি কি যাবেন?

আমার শরীরটা তো বেশি ভালো না। পাঁচ মিনিট পর তোমাকে জানাচ্ছি।

আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম।

লুইকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি যাবে কুষ্টিয়ায়?

না, শরীরটা বেশি ভালো যাচ্ছে না। এত জার্নির ধকল সইতে পারব না।

সে জিজ্ঞেস করেÑ তুমি কি আজকেই ফিরবে?

হ্যাঁ, আজকেই। কাল প্রচুর কাজ আছে।

আমি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করি। প্রচুর কাজ করতে হয়। কোনো অবসর নেই। আজই চলে আসতে হবে। আপন বোনের মৃত্যুর পর দাফন শেষ করে কবরস্থান থেকেই কবরের ধুলা গায়ে মেখেই

চলে আসতে হবে ঢাকায়। মেজ বোন তাহমিনা বেগমকে দেখতে দূরদূরান্ত থেকে কত মানুষ আসবে, তাদের সাথে সেভাবে দেখা না করেই, কথা না বলেই চলে আসতে হবে। এটাই আমাদের জীবন। কাজের চাপে অনেক কর্তব্যকে অবেলায় ছুটি দিয়ে চলে আসতে হয়। কাজ এখানে মুখ্য। কর্তব্য ঠেলাগাড়ির মতো গৌণ। অটো রিকশা, স্কুটার, বাস দ্রুত চলে। ঠেলাগাড়ি ঠেলে ঠেলে চালাতে হয়। না ঠেললে সে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। আমার ঠেলাগাড়ি ঠেলার সময় কোথায়?

সকালে বেরুব। লুই এক কাপ চা বানিয়ে দিলো। দুধ চা। খুব সুন্দর। দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে সে। যখন লালচে আভা পড়ে। সর হয়। সেই দুধ দিয়ে চা বানায়।

আমি এনজয় করে খাই।

আল আমিন একটা কাজ করে পথেঘাটে চলার সময়।

দুধের চায়ের দোকান দেখলেই সে গাড়ি থামিয়ে এক কাপ চা এনে দেয়। আমি গাড়িতে বসে খাই। কখনও নেমে চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসি। চা খাই। ভালো লাগলে দুই কাপও খাই। টং দোকানের বেঞ্চে বসে আলাদা মজা আছে। একসাথে বাতাস, ছায়া রোদ। হুড়মুড় করে চায়ের কাপে বসে পড়ে। আমি প্রাণ ভরে সব একসাথে গিলি। আরও দু-একজন খরিদ্দার থাকলে তাদের সাথে কিছু কথাবার্তা বলি।

দুধ চা আমার খুব পছন্দ। খুলনা গেলে শুধু দুধ চা খাওয়ার জন্য আমি রূপসা যাই। ওখানে একটা দুধ চায়ের স্পেশাল দোকান আছে। শুধু গরুর দুধ নয়, ওর মধ্যে কয়েক রকম মসলা দেয়। শেষে কফির দানাও কয়েক টুকরা দেয়। চা অন্য মাত্রা পায়।

লুই চা খাবে না। সে নাশতার পর এক কাপ চা খায়। চিনি ছাড়া। ডায়াবেটিস নেই। তবু খুব সাবধানী। তার সাবধানতার ঝাঁজ আমার গায়েও লাগে। আমাকেও চায়ে সে হাফ চামচের বেশি চিনি নিতে দেয় না। এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

জীবনটা এ রকমই। অভ্যাসের দাস। অভ্যাস জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে। চলার পথ ঠিক করে দেয়। আঁকাবাঁকা চলতে গেলে সামনে এসে দাঁড়ায়। তাকে অতিক্রম করা কঠিন। আল আমিন অসুস্থ। শেষ পর্যন্ত রুবাইয়ার সাহায্য নিতে হয়। ওর গাড়ির ড্রাইভার নিতে হচ্ছে। ছেলেটি ভালো।

বেশ স্মুথ গাড়ি চালায়। রুবাইয়ার একটু কষ্ট হবে। বাচ্চাদের স্কুল আনা-নেওয়া। আজ হয়তো রিকশা করতে হবে। রুবাইয়া ড্রাইভিং জানে। কিন্তু ঢাকার এলোমেলো যানজটে তার গাড়ি চালাতে ইচ্ছে করে না। আরেক সমস্যা আছে। গাড়ি রেখে কোথাও গেলে, দেখা যাবে লুকিং গ্লাস নেই। অথবা কানসুদ্ধ উধাও। একসময় দেখা যাবে, গাড়ির চাকা বা ব্যাটারিও গায়েব হয়ে যাবে।

হর্ন দিতেই ভাই নেমে এলেন। তার বাসা শ্যামলীর আদাবরে ১৬ নম্বর রোডে। ৯২ নম্বর বাসা। নম্বরটা আমার মুখস্থ। আমার তত্ত্বাধায়নে এই বাড়িটা করা হয়ে ছিল। ভাই তখন সৌদি আরবে চাকরি করেন। সৌদি ন্যাশনাল আর্মির ইঞ্জিনিয়ার। বাংলাদেশের এমইএস-এর মতো। সৌদি আরবে ২৬ বছর কাটিয়ে আসার পর এখন বাংলাদেশে।

আমরা কুষ্টিয়ায় যাচ্ছি। মৃত বোনের লাশ দাফন করতে যাচ্ছি। বোনটি আমাদের বড়। অনেক আদর করতো আমাদের। যে হাত দিয়ে মাথায় আশীর্বাদ আঁকতো, সেই হাত ৬/৭ মাস হলো স্থির হয়ে গিয়েছিল। ইচ্ছে করেও নড়াতে পারত না। যে ঠোঁট দিয়ে স্নেহভরে চুমুু খেতো, সেই ঠোঁট নিথর হয়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো মানুষের জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো আর তার আয়ত্তে থাকে না। ইচ্ছে করলেই সেগুলো নড়াচড়া করতে পারে না। তার অধীনস্থ হাত তার কথা শোনে না। তার পা তার কথা মতো চলে না। তার চোখ তার ইচ্ছেমতো দেখে। সে যা চিন্তা করতে চায় তা করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। এই সমটা সে পরাধীন থাকে। ভেতরের শক্তি পঙ্গু হয়ে যায়। আমাদের বোন তাহমিনা বেগম গত ৭-৮ মাস এই অবস্থার মধ্যে অতিবাহিত করে শেষ পর্যন্ত একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। এতদিন চলৎশক্তি রহিত অবস্থায় ছিল এখন পচনশীল হয়ে গেল। আজই তাকে মাটি দিয়ে ঢেকে ফেলতে হবে। না হলে সে পচতে শুরু করবে। গলতে শুরু করবে। পৃথিবীর তাবত মানুষ তাকে ঘৃণা করবে। গন্ধ সহ্য করতে না পেরে রুমাল দিয়ে নাক ঢাকবে। মানুষের গন্ধ বড্ড ভয়ংকর। অন্য পশুপাখির চেয়ে অনেক তীব্র। মানুষ যেমন সমস্ত জীবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, পচে গেলে তার গন্ধ সবচেয়ে উৎকট।

সাত

ছয় ঘণ্টার পথ কুষ্টিয়া। কিন্তু খুব লম্বা মনে হচ্ছে।

ড্রাইভারটা ভালো, খুব সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছে।

আল আমিনের মতো নয়। সে অতিদ্রুত গাড়ি চালায়।

সামনে যে আছে তাকে অতিক্রম করাই তার আরাধ্য। যে কোনো মূল্যে তাকে সামনে যেতে হবে। এ এক ধরনের অহংকার। অথবা পাগলামি। পাগলদের অহংকার অনেক। সে নিজেকে সবচেয়ে জ্ঞানী ভাবে।

সে মনে করে সে সব কিছু জানে। এবং সবকিছু তার ইচ্ছা অনুযায়ী হবে। তাই সে সকলকে শাসন করতে চায়। সে মনে করে, এই পৃথিবীর সব কিছু তার অনুগত হবে। কিন্তু ফাঁক-ফোকর দিয়ে গাড়িকে সামনে নিতে পারলেই প্রকৃত ড্রাইভার হওয়া যায় না। প্রকৃত ড্রাইভার হতে হলে তাকে অনেক ধৈর্যশীল আর বিনীত হতে হয়। সময়ের জ্ঞান থাকতে হয়।

আল আমিনকে আমার মেয়েরা আর লুই খুব ভালোবাসে। এর একটা প্রমাণ আছে। বছর দুয়েক আগে আল আমিনের বিয়েতে গিয়েছিলাম। ওর বাড়ি বরগুনার এক অজগাঁয়ে। কোনোভাবে মাইক্রোবাস তার বাড়ি পর্যন্ত গেল বটে কিন্তু ফেরার সময় মহা বিভ্রাট ঘটল। গাড়ি ঘোরানোর জায়গা নেই। অনেক কসরত করে গাড়ি ঘোরাতে হলো। চিকন সাপের মতো রাস্তার দু’পাশে জোয়ারের জল কিলবিল করছে। মেয়েরা এই গ্রামে জোয়ারের জলের হাল দেখে কিছুটা অভিভূত হলো।

যখন জোয়ার টগবগিয়ে ওঠে, তখন নানা জাতের গাছের কাণ্ড পর্যন্ত ডুবে যায়। মনে হয় কোনো শক্ত-সামর্থ্য পুরুষ কাছা মেরে পানিতে স্নান করছে। গাছের খালের মতো যার রঙ।

কুষ্টিয়ার পথে আমরা। ইতিমধ্যে ফেরি পার হয়েছি আমরা। পাটুরিয়া ফেরি। খুব একটা জ্যাম ছিল না।

মনে হয় জোহরের আগেই পৌঁছতে পারব। ভাই সারা পথ কথা বলেননি। মনে হয় কোরান শরিফ পড়ছিলেন। তার অনেক সূরা মুখস্থ। মনটা অনেক ভারী। সকলকেই মরতে হবে, কিন্তু মৃত্যুকে মেনে নেওয়া সহজ নয়।

ওদিকে যে ঘরটায় মেজ বুবু থাকত, সে ঘর এখন অনেকটা খালি। এক কোণে বসে কয়েকজন মাদ্রাসার ছেলে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কোরান শরিফ পড়ছেন।

তাদের ত্রিশপারা কোরান মুখস্থ। এর মধ্যে একজন অনেক ছোট। তার বয়স খুব বেশি হলে ১১ বছর হবে।

এত অল্প বয়সে সে হেফজ করেছে পুরো কোরান।

আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগে। অইটুকু ছেলের এত মেধা। হাফেজরা এমনভাবে মুখস্থ করে যে একটা অক্ষরও ভুল হয় না। এ এক আশ্চর্য উপলব্ধি।

তিলকার এখন অনেক কাজ। কত মানুষ ভিড় জমাচ্ছে। শেষ বারের মতো একবার চোখের দেখা দেখার জন্য। যারা গ্রাম থেকে এসেছে, অনেকটা পথ হেঁটে, কিছু অটোরিক্সা, কিছু বাস। তিলকা তাদের মুখটা খুলে দেখাচ্ছে। সে তার নানির মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।  এ এক বিশাল গুরুদায়িত্ব। মৃত মানুষের আবরণ উন্মুক্ত করা। এত সাবধানে মাথার কাছের গিঁট খুলে মুখটা আলগা করে মানুষকে দেখানো একটা শিল্পিত কাজ। এবং এত স্পর্শকাতর যে, কোনোভাবেই কোনো আঘাত যেন মুখকে বিব্রত না করে। মৃত মানুষের কোনো অনুভূতি নেই; তবুও মৃত মানুষকে মানুষ খুব সাবধানে সতর্কতার সাথে হ্যান্ডেল করে। সারাজীবন যে মানুষটি আঘাতের পর আঘাত সহ্য করে লীন হয়ে যায়, মৃত্যুর পর তাকে একটু শান্তিতে রাখা… এটা মানুষের দায়িত্ব। পৃথিবীতে জীবন যাপন করতে গেলে আঘাত লাগবেই।

আমাদের পৌঁছতে আর বেশি দেরি নেই। হঠাৎ মনে হয়, আমার ছোট ভাই, অবদুল ওয়ারেছ আজ আমাদের মেজবোনের দাফনের সময় থাকতে পারছে না। কারণ প্রায় এক যুগ আগে সে এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছে। তার মৃত্যুটা অস্বাভাবিক। ইলেক্ট্রিক শকে তার মৃত্যু হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গার একটা মসজিদে দুপুরে চৌবাচ্চায় গোসল করছিল সে। খুব সর্দি লাগে তার। এখন প্রচলন নেই। কিন্তু তখন রুমাল ব্যবহার করতো প্রায় সবাই। সে সর্দিঅলা রুমাল পানিতে ধুয়ে মেলতে যায় চৌবাচ্চার উপরের তারে। সে বোঝেনি, ওই তার ইলেক্ট্রিক লাইনের। আর সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রাস করে ইলেক্ট্রিসিটি। চুষে নেয় রক্ত। তেমন কেউ এগিয়ে আসেনি। মানুষ ইলেক্ট্রিসিটিকে খুব ভয় পায়। কারণ ইলেক্ট্রিসিটি খুব শক্তিশালী। ছোাট ভাইয়ের একটি ছেলে লিমন। ছেলেটি পিতৃহীন একা হয়ে গেল। তারপর অনিশ্চিত জীবনযাত্রা শুরু হলো তার। আমি সেই জীবনের গল্প জানি। শুধু এটুকু বলা যায়, ভাগ্যের চাকা ঘুরতে ঘুরতে এখন আমেরিকায় গিয়ে থেমেছে। খুব সুন্দর লক্ষ্মী বউ আছে তার। ডাক্তার। বাংলাদেশি মেয়ে। আমার মেয়ের বান্ধবী। পরিচ্ছন্ন প্রেমের সফল পরিণতি।

আমরা মৃত বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। কান্নার রোল পড়ে গেল। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল মেয়েরা। সহ্য করা কঠিন। হৃদয়বিদারক এসব কান্নার শব্দে বাতাস কেঁপে উঠল। আকাশে অল্প অল্প মেঘ। খুব বেশি সময় নেই। অনেক মানুষ জমা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই দাফন শেষ করতে হবে। সেলিম আসতে পারেনি। এই মায়ের যে ছেলেটি সব সময় খোঁজ রাখতো, বিদেশে থেকেও যার অন্তর সব সময় পড়ে থাকতো মায়ের পায়ের কাছে, সে শেষবারের মতো দেখতে পেল না। এ কথা মনে হতেই সেলিমের অন্তর পুড়ে যেতে থাকল। মা নেই, এই কথা ভাবতেই তার হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে গেল। হাসপাতালে বসে সে অহনার দিকে তাকিয়ে বলল-

তুমি কি জানো মা মারা গেছে?

জানি।

কেমন করে বুঝলে?

তিলকার সাথে যখন তুমি কথা বলছিলে তখনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম। মা নেই।

অহনার খুব কষ্ট হচ্ছে। তার শাশুড়ি তাকে খুব পছন্দ করত। কত স্মৃতি আছে তার সাথে। একে একে সব মনে হয়। আগে কত যত্ন করেছে তাকে। একবার মাকে ভিজিট ভিসায় সৌদি আরব আনে। ছয় মাসের জন্য। তখন কিছু সুযোগ মিলে মায়ের সেবা-যত্ন করার। এখন সেই মা নেই। ভাবতে কষ্ট হচ্ছে।

শাশুড়ির মৃত্যুর খবর শোনার পর যে কষ্ট তাকে আচ্ছন্ন, এতে নিজের যে কষ্ট তা কিছুটা উপশম হয়েছে।  সেই কষ্ট দুই ধরনের। একটি আত্মিক। অন্যটি দৈহিক। আত্মিক কষ্টের ধার দৈহিক কষ্টের চেয়ে অনেক বেশি। এটা অহনা বেশ ভালো করে উপলব্ধি করতে পারে।

হঠাৎ তার শব্দের কথা মনে হয়। শব্দ কি ঘুমাচ্ছে ইনকিউবেটরের হালকা উত্তাপে। এখন কেমন আছে। তার খুব দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তার বিছানা থেকে নামা নিষেধ। সিজারিয়ানের ঘা এখনও দগদগ করছে। একবার মনে হয়, যা হয় হোক, একপলক দেখে আসি শব্দকে। যে তার মাকে ভালো করে দেখেনি। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই তাকে নিয়ে যাওয়া কাচঘরে।  চোখ ফোটার আগেই কাচ দিয়ে বন্দী করে রাখা হয়েছে তাকে। কেমন করে মাকে দেখবে সে।

হঠাৎ অহনা বললÑ

আমার খুব শব্দকে দেখতে ইচ্ছে করছে। নিয়ে যাও না?

সেলিম উত্তর দেয়Ñ

কেমন করে যাবে? তোমার তো হাঁটা নিষেধ।

তুমি আমাকে ধরে নিয়ে যাও না।

না না, তুমি থাকো। একটু বেলা হোক। আমি শব্দকে

এখানে আনার ব্যবস্থা করবো। দরকার হলে ডাক্তারের

কাছে পারমিশন নেবো। তবু তোমার যাওয়া ঠিক হবে না।

ঠিক আছে।

অহনা নির্বিবাদে মেনে নেয়। তার তো শব্দকে দেখতে ইচ্ছে করছে। সেটা যদি ব্যবস্থা করতে পারে সেলিম। তাহলে অসুবিধা কোথায়। কিন্তু এখন মাত্র সকাল সাতটা বাজে। এত সময় অপেক্ষা করতে পারবে তো?

সেলিম এখন চুপচাপ। তার ভাইয়ের কথা মনে হয়। সেও তো সৌদি আরব। প্রায় বিশ বছর এসেছে সে এই মরুভূমির দেশে।

আট

আনিসুর রহমান, সেলিমের বড় ভাই। সে গ্র্যাজুয়েট। প্রায় ৩৬ বছর আগে সে চাকরি করত ঢাকায়। সরকারি। কিন্তু যে অফিসে চাকরি করত, তেমন কাজ থাকতো না। সকাল ১০টা-৫টা অফিস। অফিসের পাখার নিচে বসে খবরের কাগজ পড়া ছাড়া সময় কাটানোর মতো আর কোনো মাধ্যম ছিল না তখনকার দিনে।

তার ভাবনার মধ্যে তীব্রভাবে এই চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, তার ইনকামের টাকা হালাল হচ্ছে না। সারাদিন সারারাত একটাই ভাবনা তার, কী করে সৎভাবে উপার্জন করা যায়। দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। ক’দিনের। ডাক এলেই চলে যেতে হবে অন্য জগতে। আখেরাতের জীবন কত লম্বা। শুরু হবে কিন্তু কোনো দিন শেষ হবে না। এ দুনিয়া তো মরা ছাগলের মতো। এসব টানাটানি করে লাভ কী। দুনিয়ার কোনো দাম নেই। মশার পালকের মতো। এ জীবন অস্থায়ী। কিন্তু পরকাল স্থায়ী। শুরু হবে তো কোনোদিন শেষ হবে না।

একসময় তার মনে হয়.. এ চাকরি আর নয়। রিকশা চালাবে, কুলিগিরি করবে, তবুও এ চাকরি আর নয়।

তাই সে সত্যি সত্যিই একদিন রিকশা চালাতে শুরু। সে এখন ঢাকার পথে পথে রিকশা চালায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা। যা পায়, তাতেই তার ভালোভাবে সংসার চলে যায়।

তার রিকশায় চড়লে কিছু শর্ত মেনে চলতে হবে। শর্তগুলো নিম্নরূপ :

১. একা কোনো মেয়ে মানুষ ওঠা যাবে না।

* সে এই হাদিস জানে, মিথ্যা পাপের মা, নারীরা শয়তানের রশি, কাজেই মোমেন সাবধান।

২. নামাজের আজান পড়লে রিকশার চাকা বন্ধ।

যদি কেউ অপেক্ষা করতে না পারে, সে নেমে যাবে।

ভাড়া প্রয়োজন নেই।

৩. নায্য ভাড়া দিতে হবে। কোনো দরদাম করা লাগবে না।

৪. পথে রিকশা নষ্ট হলে অথবা চাকা লিক হলে যাত্রী ভাড়া না দিয়ে চলে যেতে পারবেন।

৫. মেয়েমানুষ সাথে থাকলে রিকশার হুড ওঠানো চলবে না। বৃষ্টি বা রোদেও না।

৭. সালামের উত্তর দিতে হবে শব্দ করে।

৮. ঝড়-বাতাসে গাড়ি উল্টে গেলে যদি প্যাসেঞ্জারের হাত-পা ভাঙে, তবে রিকশা কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।

৯. প্যাসেঞ্জারের কাছে অবশ্যই ভোটার আইডি কার্ড থাকতে হবে।

১০. প্যাসেঞ্জার রিকাশায় বমি করলে কোনো ফাইন লাগবে না।

১১. ৫০০ টাকা অথবা ১০০০ টাকার ভাংতি চলবে না।

১২.  একবার এই রিকশায় চড়লে দ্বিতীবার আর চড়া যাবে না।

১৩. পায়ে ধুলাবালি/কাদা থাকলে এই রিকশায় ওঠা যাবে না।

১৪. রিকশা খালি থাকলেও যদি কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাপোষণ করে তবে রিকশায় ওঠা যাবে না।

১৫. রিকশায় উঠে পানি খেতে চাইলে তা বিনা মূল্যে সরবরাহ করে হবে।

এই বিজ্ঞাপন রিকশায় লটকানো আছে। যা আমি একদিন কাকরাইলের সামনে আবিষ্কার করলাম।

এবং এটাও আবিষ্কার করলাম, রিকশার হ্যান্ডেল ধরে আমার আপন ভাগিনা, তাহমিনা বেগমের বড় ছেলে,

আনিসুর রহমান দিব্যি দাঁড়িয়ে আছেন।

রমনা পার্কের ভিতর রিকশা রেখে প্রায় এক ঘণ্টা আলাপ-আলোচনার পর সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, তিনি আর রিকশা চালাবেন না।

এরপর, জানা গেছে যে, সে চিটাগাং গিয়ে কুলিগিরি করেছে। দুই মণ দশ কেজির চালের বস্তা অনায়াসে

ট্রাক থেকে আনলোড করেছে।

এ কথা পরিষ্কার যে, সে কায়িক পরিশ্রমের ইনকাম ছাড়া আর কোনো ইনকামকে হালাল মনে করে না।

এর আরও পর সে মাথায় করে কাপড়ের ব্যবসা করেছে। এই ব্যবসা সুন্নত বলে স্পষ্ট জানে। আর এ কথাও জানে যে, সুন্নতের মধ্যেই জীবনের সব ভালো-মন্দ আটকে আছে। তাই সুন্নতকে আঁকড়ে ধরা ছাড়া বিকল্প নেই। আরও শুনেছি সে এর পর চিটাগাংয়ে বেবিটেক্সি চালিয়েছে এবং প্রমোশন পেয়ে সৌদি আরবে এখন রেন্ট এ কার চালায়। তার এখন ৬২ বছর বয়স। সে দিব্যি কার চালিয়ে তার জীবিকা নির্বাহ করে। সৌদি আরবে কার চালানো নাকি বাংলাদেশে গাড়ি চালানোর চেয়ে অনেক সহজ। সেই আনিসুর রহমান, সেলিমের বড়ভাই, কি মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়েছে? নিশ্চয় পেয়েছে। তবে সে এত নির্বিকার কেন?

সে তো মায়ের বড় ছেলে। মায়ের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য তো কম নয়। আনিসুর রহমান মা অসুস্থ হওয়ার পর একবার দেখতে আসে। তার ধারণা, অসুস্থ মাসুষ দুনিয়া থেকে তাড়াতাড়ি চলে যাওয়া ভালো। বিছানাগত হয়ে পড়ে থাকা খুবই লজ্জাজনক। পৃথিবী যখন চায় না, তার পৃথিবীতে থাকার কতটুকুই-বা অধিকার আছে?

সেলিম যখন ফোনে জানালো বড় ভাইকে, তখন একটুও বিচলিত হলো না সে। তার ধারণা, তার মা তার প্রাপ্য মাটির নিচে চলে গেছে। মাটির নিচে তার জন্য সুখের বিছানা পাতা আছে। ফুলের সৌরভ আছে। অনাবিল আনন্দ আছে। সুখ-দুঃখ বলার জায়গা আছে। এই কষ্টকর অধ্যায় শেষ করায় সে মহা খুশি। মায়ের সাথে দেখা না হওয়ার জন্য তার কোনো আফসোস নেই। অনুশোচনা নেই।

নয়

সেলিমের একবার মনে হয়, মাকে হিমঘরে রেখে দিতে বলি। চেষ্টা করলে আমি তো দু-তিন দিনের মধ্যেই যেতে পারব। মাকে শেষবারের মতো দেখি। যে মাকে গত বিশ বছর ধরে একা লালন করেছি, তার সব চাওয়া ইচ্ছায়-অনিচ্ছা পূরণ করেছি, কোনোদিন যার অবাধ্য হইনি… সেই মা চিরতরে না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছে, তাকে শেষবারের মতো একবার দেখি। একবার মাটির সাথে মিশে গেলে তাকে তো এক মুহূর্তের জন্যও স্পর্শ করতে পারব না। হোক না সে মৃত, হোক না সে নিস্পন্দ-নিথর তবু একবার দেখি তাকে।

মুহূর্তেই মনে হয় তার সদ্যোজাত সন্তান এখনও তো মহাবিপদের মধ্যে ঘুমাচ্ছে। তার শরীর ফ্যাকাশে। রক্তহীন। আমি চলে গেলে অহনা তাকে সামলাতে পারবে? অহনা নিজেই তো ব্যথায় কাতরাচ্ছে। সে নিরুপায় বেলুনের মতো দোটানায় দুলতে লাগল।

অহনাকে জিজ্ঞেস করলে নিশ্চিত বলবে-

যাও, শেষ দেখা দেখে আসো।

অহনা এমনভাবে বলল, যে পাশের ঘরে মা শুয়ে আছে।

তুমি কি সত্যি সত্যিই যেতে বলছো?

হ্যাঁ।

তোমরা?

দেখে তাড়াতাড়ি চলে এসো।

তোমরা?

কিচ্ছু হবে না। আমরা তো হাসপাতালেই আছি। কত ডাক্তার,কত নার্স, কত ওষুধ।

 সেলিমের মন গলে যায়। অহনার কথায় কিছুটা ভরসা পায়।

দেখি চেষ্টা করে।

এই কথা বলে সেলিম টিকিটের চেষ্টায় লেগে যায়। যাবে যাবে বলে ভিসা আগেই করা আছে।

সে ভাবতে থাকে, আসলেই তো যাওয়া যায়। অহনার মহাবিপদ তো কেটে গেছে। সমস্যার মধ্যে শব্দ অসুস্থ।

ও তো ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে। আমার তো কিছু করার নেই। যা করার ডাক্তাররা করছে। বাকিটুকু ডাক্তাররাই করবে। সে সিদ্ধান্ত নেয়, সে যাবে। সে যাবেই।

সঙ্গে সঙ্গে বড় ভাই আনিসুর রহমানকে ফোন করে।

ভাই

কী সেলিম?

আমি কুষ্টিয়া যেতে চাচ্ছি।

কী বলিস? সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে আজ জোহর বাদ কবরস্থ করা হবে। কবর খোঁড়া হয়েছে। পাবনা থেকে আত্মীয়স্বজন সব এসেছে। দূরদূরান্ত থেকে। এখন বলছিস, তুই যাবি। মামারা, মন্টু মঞ্জু রাজি হবে না। সকলেই এর বিপক্ষে বলবে।

ভাই, আমি যাবো, সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি যাবো। আপনি যাবেন কিনা তাই বলেন।

আনিসের খুব রাগ হয়। মুর্দারের খুব কষ্ট হয় লাশ দাফনে দেরি করলে। আল্লাহ অখুশি হন। যে যাওয়ার চলে গেছে। তাকে সুতা দিয়ে বেঁধে টেনে ধরে লাভ কী?

সেলিমÑ

আমি যাচ্ছি। আপনি গেলে যেতে পারেন।

আনিসুর রহমান কোনো কথা বলেন  না। দুই ভাই দুই শহরে থাকে। একজন মক্কা, অন্যজন জেদ্দা।

এই দূরত্ব আজ লাঘব হলো না। সেলিম যাবে, আনিস যাবে না।

সেলিমের স্পষ্ট ধারণা, সে টিকিট পেয়ে যাবে। আজ না হয় কাল। সে অহংকারী হয়ে উঠল। মায়ের মুখটা দেখবেই শেষ বারের মতো। সে আজ কারও কথা শুনবে না। সে আমাকে ফোন করে।

মামা?

সেলিম, বলো।

সে কাঁদলো কিছুক্ষণ। আমি তাকে সান্ত্বনা দিলাম। বললামÑ

দুঃখ করো না। অনেকদিন বিছানাগত। কষ্ট পাচ্ছিল। আল্লাহ নিয়ে গেছেন। এখন দোয়া করো। তিনি জান্নাতবাসিনী হন।

মামা, একটা কথা বলি। আমি আসতে চাই। আজ রাতেই অথবা আগামীকাল সকালে। ইমিডিয়েট যে ফ্লাইট পাই। আম্মাকে হিমঘরে রেখে দেন।

আমি চমকে উঠি। কী বলছে সেলিম! আমি উত্তর খুঁজে পাই না।

সেলিম, দাফনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আর এক ঘণ্টা পর দাফন হবে। কবর খোঁড়া হয়েছে। তোমার নানা-নানির কবরের পাশে। শত শত আত্মীয়স্বজন এসেছে দূরদূরান্ত থেকে। তুমি এখন বলছ, লাশ রেখে দিতে হিমঘরে। এটা ঠিক হবে না সেলিম। মনে হয় এটা ঠিক হবে না।

সেলিম এবার কিছুটা বিক্ষুব্ধ হয়। বলেÑ

সোহেল মামা, সেজ মামা আসেনি? তাকে দিন।

আমি নিরুপায় হয়ে ফোনটা সেজ ভাইকে দিই। সেলিম জোরে জোরে বলতে থাকে অথবা সাউন্ড বাটনে টিপ পড়ে শব্দ শোনা যাচ্ছে।

সেজ মামা, আমার একটা অনুরোধ, আপনারা মাকে হিমঘরে রেখে দিন। মাত্র একটি দিনের জন্য। কেউ আমার কথা শুনছে না। প্লিজ মামা, আপনি আমাদের মুরব্বি। আপনার কথা সকলেই শুনবে।

সেলিম একনাগাড়ে কথাগুলো বলে হাঁপাতে লাগল।

ভাই তাৎক্ষনিক কোনো উত্তর দিলেন না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শান্ত গলায় বললেন-

সেলিম, তুমি আসো, কিন্তু মরে যাওয়ার পর মুর্দা বেশিক্ষণ রাখতে হয় না। আল্লাহর বান্দাকে যত তাড়াতাড়ি আল্লাহর কাছে পাঠানো যায়, ততই মঙ্গল।

না মামা, আমার মনটা খুব চাচ্ছে, মাকে একপলকের জন্য দেখি, একবার মায়ের মুখে হাত বুলিয়ে দিই,

মামা, কোনোদিন আপনার কাছে কিছু চাইনি, আল্লাহর দোহাই, আপনি আমার মাকে এক দিনের জন্য রেখে দিন। আমি আমার মাকে একবার দেখতে চাই। মামা আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে এই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করবেন না।

এবার আর সেজ ভাই স্থির থাকতে পারলেন না। বললেন-

ঠিক আছে, সেলিম। তুমি দশ মিনিট পর ফোন করো, আমরা তোমার বিষয়টা পরামর্শ করে দেখি।

আচ্ছা।

সেলিম কিছুটা আশ্বস্ত হয়। তার বিশ্বাস, একটা ব্যবস্থা হবেই।

সেলিম সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে থাকে। তার মনে হয় আল্লাহ এত নিষ্ঠুর নন। তিনি অবশ্যই আমার ইচ্ছে পূরণ করবেন।

এদিকে হাসিনা বেগমের ড্রইংরুমে মিটিং বসে। আমি, সেজ ভাই, মন্টু, মঞ্জু, মেজ বুবুর দুই জামাই, এলাকার মাতবর করম আলি, পাশের মসজিদের ইমাম আখের আলি আরও তিন-চারজন অনভিপ্রেত মানুষ।

বিষয়টি আমিই উত্থাপন করি-

সেলিম কান্নাকাটি করছে, সে আসতে চায়, একবার শেষ বারের মতো মাকে দেখতে চায়। সেক্ষেত্রে আজকের বদলে আগামীকাল জোহর বাদ দাফন করা যাবে কি-না।

সেলিমের বড় ভগ্নিপতি আবদুল মান্নান বললেন-

কী বলেন? এদিকে লাশ পচবে আর উনি পচা লাশের গন্ধ শুঁকতে আসবেন। না না, এ সিদ্ধান্ত নেবেন না মামা। এ সিদ্ধান্ত নেবেন না।

ছোট ভগ্নিপতি দিদারুল ইসলাম বললেন-

এত কঠিন কথা বলছেন কেন? আম্মা অসুস্থ হওয়ার পর সবই তো সে করেছে, আমরা কেউই তো সেইভাবে খেয়াল করতে পারিনি। ওর একটা আলাদা অধিকার আছে।

আবদুল মান্নান-

অধিকার আছে সেটা মানলাম। কিন্তু তাই বলে অধিকার খাটাতে গিয়ে আম্মাকে পচাতে চায়। এটা কোনোভাবেই মানা যায় না। কবর খোঁড়া হয়ে গেছে।

পিকআপ এসে গেছে, মামা চলেন তো। আর দেরি করা ঠিক হবে না।

আমি ভাই কে বললাম-

কী করা যায়?

সেলিমকে কষ্ট দেওয়া ঠিক হবে না। একদিনই তো।

হিমঘর পাওয়া গেলে তো ভালোই, নইলে বরফ দিয়েও রাখা যাবে। অসুবিধা হবে না।

সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, আজ নয়, আগামীকাল জোহর বাদ দাফন করা হবে মেজ বোন তাহমিনা বেগমকে। আরও সিদ্ধান্ত হলো যে, আজ প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পাশের মসজিদে।

 দশ

সেলিমকে জানিয়ে দেওয়া হলো। হ্যাঁ, হিমঘরে রাখা হবে তার মায়ের লাশ। কুষ্টিয়ায় কি হিমঘর আছে? এ কথা সকলেই জানে, লাশকাটা ঘর আছে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে। কিন্তু হিমঘর? ফোন করা হলো? কিন্তু হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রুমের ফোন কেউ ধরল না। এখনও কি সব ডাক্তার নার্স ঘুমাচ্ছে?

সেলিম টিকিট কেটে ফেলল। রাত বারোটা তিরিশে কুয়েত এয়ারলাইন্সের জেদ্দা-ঢাকা ফ্লাইট। বড় ভাই আনিসুর রহমানকে আর একবার জানানো হলো, মায়ের লাশ হিমঘরে রাখা হচ্ছে। সে মাকে দেখতে যাবে কি-না?  কোন উত্তর এলো না। এই সিদ্ধান্ত তার পছন্দ হলো না। সে লাশ হিমঘরে রাখার মোটেই পক্ষপাতী  না। সংসারে এমন অনেক কিছু ঘটে যা আয়ত্তের বাইরে। একটা শক্তি এর পিছনে কাজ করে। যার নাম টাকা। টাকা অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে।

আনিসুর রহমান চিন্তা করে, সেই প্রথম এসে সৌদি আরব। বাংলাদেশে স্কুটার চালাত সে। সৎ ইনকামের জন্য সে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। রিকশা চালিয়েছে, কুলিগিরি করেছে, বেবিট্যাক্সি চালিয়েছে, মাথায় কাপড়ের পোঁটলা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ফেরি করে বেড়িয়েছে।  এরপর সৌদি আরব এসে ট্যাক্সি চালিয়ে টাকা জমিয়ে ছোট ভাইকে এনেছে। আজ সেলিমের অনেক টাকা। সে এখানে এসে মোবাইলের ব্যবসা করেছে। কপাল খুলে গেছে। টাকায় টাকা লাভ হয়েছে।

অবশ্যি সে একা ভোগ করেনি সেই টাকা। সংসারের জন্য সে অনেক কিছু করেছে। এমন কেউ নেই যে সে সেলিমের সাহায্য নেয়নি। ভাতিজা, ভাগ্নেসহ প্রায় ১২-১৩ জন কে নিজ খরচে ভিসা কিনে নিজের কোম্পানিতে চাকরি দিয়েছে। কেউ কেউ সুযোগ বুঝে অন্যত্র ভালো পজিশনে চাকরি নিয়েছে।  সে আত্মীয় স্বজনের অভাব রাখতে দেয়নি। অসুখবিসুখে- সেলিম, ঘরবাড়িতে টাকা কম পড়েছে- সেলিম, পড়াশোনার জন্য টাকা দরকার- সেলিম। সব জায়গায় সেলিমের জয়গান। এভাবে সে প্রত্যেকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সাধ্যমতো করেছে সবার জন্য।

গত সাত বছরে সে একা মায়ের সুখের জন্য যা করেছে, সংসারের আর সকলে মিলে এর অর্ধেকও করেনি। সেলিম তাই এই সংসারের বরপুত্র। বিধাতা তাকে পাঠিয়েছেনই ত্রাণকর্তা হিসেবে। এতে সেলিমের কমেনি। যত মানুষের উপকারের জন্য খরচ করা যায়, সেটা অলৌকিকভাবে পূর্ণ করে দেয়। এটা অনেকে বিশ্বাস করে না। কিন্তু সেলিমের পূর্বাপর বিশ্লেষণ করলে এর সত্যতা উপলব্ধি করা যায়। এর পরও দেখা যায়, অভিজাত এলাকায় সেলিমের ফ্ল্যাট, কক্সবাজারে সেলিমের হোটেল, পাবনার নিজ এলাকায় বাড়ি, জমি, কী নেই সেলিমের। সুতরাং সেলিমের মাকে একনজর দেখার শেষ ইচ্ছে পূরণ হতে যাচ্ছে।

আনিসুর রহমান এলো না। কিন্তু মায়ের দাফনের জন্য, নীরব দেহে একটি চুমু খাওয়ার জন্য আকাশে উড়ল সেলিম। এর আগে অহনা আর শব্দের কাছে বিদায়ের সময় কাঁদলো কিছুক্ষণ।

অহনাÑ

কাঁদছো কেন?

তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি, বিপদের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছ তোমরা। এই অবস্থায় তোমাদের একা ফেলে যেতে খুব খারাপ লাগছে। শব্দ এখনও ইমার্জেন্সিতে নিরাপদ নয়। তুমি পেটে ইনফেকশন নিয়ে তিন দিন হয় কাতরাচ্ছ। আর অমানুষের মতো আমি মৃত মায়ের লাশ দেখার জন্য বাংলাদেশ যাচ্ছি। এই এক আশ্চর্য অনুভব- মৃত্যু যেখানে জীবনের চেয়ে বেশি মূল্য রাখে, মৃত্যু যেখানে জীবনকে নির্বিচারে গ্রাস করে, মৃত্যু যেখানে জীবনকে অতিক্রম করে, অর্থাৎ মৃত্যু এই একটি জায়গায় জীবনের সাথে যুদ্ধ করে জিতে যায়। গলাটিপে হত্যা করে জীবনের মাথা-মুণ্ডু সব।

এটা কি রক্তের টান? সেলিমের মধ্যে তার মায়ের রক্ত প্রবাহিত বলে? অহনার রক্ত আলাদা ধাতুতে গড়া বলে। কিন্তু তাই বা হবে কেন?

শব্দ, ওই তিন দিনের শিশু, তার রক্তের মধ্যেও তো নিজস্ব রক্ত আছে। সেলিমের রক্তের অণু-পরমাণু আছে। কী করে অস্বীকার করবে সেলিম। সে তো প্রচণ্ড ভালোবাসে অহনাকে। পনেরো বছর আগে যখন সে বিয়ে করে অহনাকে, তখন কি সেলিমের? অহনার রূপ, যৌবন, বাবাহীন মায়ের প্রাচুর্য, সম্পদের অহংকার, শহরে চকচকে বাড়ি- কি  না ১৬ বছররের প্রদীপ্ত কিশোরী অহনার?

এরপর কেটে গেছে দীর্ঘদিন। অহনার মা নেই। সমস্ত সম্পদ নিয়মের কড়িকাঠে অহনার। অহনা এতিম কিন্তু ঐশ্বর্যের শিখরে দাঁড়িয়ে। অহনা এতিম, কিন্তু সেলিম প্রাচুর্যের যোগ্য উত্তরাধিকারী। অহনা এতিম, কিন্ত দুটি সন্তান নতুন জীবন এঁকে দিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। ওসমান আছে, ইনকিউবিটরে শব্দ আছে। অহনার রক্তের এর মধ্যে সেই ঢেউ প্রতি মুহূর্তে দোলা দেয়। সেলিম কখনও বোঝে, কখনও বোঝে না। এখন বুঝতে চেষ্টা করে। অহনার চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বুঝতে পারে, অহনার ভালোবাসার তীব্রতা। যেখানে সে নিত্যদিন অবগাহন করে। স্নিগ্ধ হয়। পবিত্র হয়। অনুভূতিপ্রবণ হয়।

সেলিম বিদায়ের পূর্বমুহূর্তে অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটায়। হঠাৎ অহনাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে। অহনাও অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে আগলে রাখে তাকে। ভুলে যায় অপারেশনের সুতায় এখনও জলজ্যান্ত ঘা। অনভিপ্রেত ইনফেকশন।

অহনার সাথে সেলিমের আর কি দেখা হবে? শব্দ আর ওসমানের সাথে?

এগার

প্রথম জানাজা হয়ে গেল যথাসময়ে। লোকজন যে যার মতো বাড়ি ফিরে গেল। যারা দূরদূরান্ত থেকে এসে, তারা কেউ কেউ চলে গেল, কেউ কেউ মায়ার টানা আর এক দিন থেকে গেল। হাসিনার বাড়িতে এত মানুষের থাকার জায়গা নেই। তিনতলা বাড়ি, তেরো-চৌদ্দটি ঘর তবুও। তাই কেউ কেউ যার যার মতো অন্য জায়গায় চলে গেল। শহরে চারটে ডাল-ভাত মিলে যায়, কিন্তু থাকার জায়গার বড্ড অভাব। শহর এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেয় না। প্রতি ইঞ্চি জমি এখানে বড় মূল্যবান।

সেলিম আকাশে উড়ছে। ১৭০০০ ফুট উঁচুতে। তার মা গতকাল উড়েছে। লক্ষ হাজার ফুট উঁচুতে। সেলিম একসময় নিচে নামবে। মর্ত্যরে মাটিতে। হাঁটবে, চলবে, খেলবে, প্রেম করবে… তার মাও নামবে। কিন্তু নিশ্চল পাথর হয়ে। স্থির দেহ মাটির মধ্যে নিঃসাড় পড়ে থাকবে। এটুকুই পার্থক্য।

সেলিমের এখন খুব খারাপ লাগছে। শব্দকে আসার সময় দেখে আসতে পারেনি। একবার ডাক্তারকে বলে। কিন্তু সেই ঘরে ঢুকতে দেয়নি। ইনকিউবিটরের দোলনায় দুলতে থাকা শব্দ বাবাকে চেনে না। দুনিয়ার সব বাবা তার কাছে এক।  সেলিম যখন ঢাকাতে পৌঁছলো তখন ভোর চারটা।

সেলিমের মা সনো টাউয়ারের হিমঘরে। গত সন্ধ্যায় তাকে সেখানে রাখা হয়েছে। কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে একটা হিমঘর আছে বটে, তা প্রায়ই অকার্যকর থাকে। প্রায়ই কারেন্ট থাকে না। জেনারেটরহীন হিমঘর মাঝে মাঝেই লাশের গন্ধ মাথায় নিয়ে অনবরত এতিমের মতো কাঁদে।

সেলিম এখন কুষ্টিয়ার পথে। একদিকে মা আর অন্য দিকে অহনা আর শব্দ। সে একটা দোদুল্যমান সেতুতে। সামনে গেলে মায়ের ধবধবে আঁচল। আর পেছনে ফেলে আসা অহনা আর শব্দের ধূসর ওড়না। সাদা মানে মৃত্যু। মৃত্যুর রঙ। আর ধূসর? চলমান পৃথিবীর ধূসর প্রতিচ্ছবি। সেলিম একবার সেতু ধরে এগিয়ে যায় আবার জোকারের মতো ছাতা ধরে পেছনে হাঁটতে শুরু করে। কোনো কূল-কিনারা পায় না।

গতকাল কবর খোঁড়া হয়েছে। খুব তদবির করে কবরের স্থানটা নেওয়া হয়েছে আমার মা-বাবার কবরের  কোল ঘেঁষে। এতে অদ্ভুত একটা কাণ্ড ঘটেছে। কবরের মাটির সাথে উঠে এসেছে অসংখ্য হাড়। প্রত্যেক হাড়ে কালো ও ধূসর দাগ। হাড়ের সাইজ দেখে বোঝা যায়, এসব পাঁজরের কিংবা হাতের কব্জির, কিংবা মেরুদণ্ডের। আমার মনে হলো, তাহলে কি এই সব হাড় আমার মা ও বাবার। আমি সকলকে লুকিয়ে গত সন্ধ্যায় কবর স্থানে যাই। একটি হাড় হাতে নিই। শুঁকি। একধরনের সুগন্ধ পাই। আমার বাবা আতর ব্যবহার করতেন। আমার মনে হয় সেই আতরের গন্ধ এখনও আমার বাবার হাড়ে লেগে আছে। ওই হাড়টি মাটির মধ্যে লুকিয়ে রাখি। আর একটা তুলে নিই। এটি নরম আর সুন্দর। আমার মায়ের কথা মনে হয়। আমার মা এই হাড়ের মতোই তুলতুলে আর সুন্দর ছিলেন। মায়ের সেই স্মিত সৌন্দর্য কি হাড়ের গায়েও লেগে আছে। আমি বুঝতে পারি না। আমার চোখ দিয়ে টপাটপ জল গড়িয়ে পড়ে। মা আর বাবার হাড় সেই জলে ভিজে যায়। এখন মা নেই, সে বেঁচে থাকলে কি তাঁর আঁচল দিয়ে আমার চোখ মুছে দিতো। আমি হাড়ের মধ্যে মায়ের আঁচল দেখতে পাই। মাটি থেকে দুটি হাড় হাতে নিই। চোখেমুখে বুলাই। হাড়ে চুমু খাই। অন্যরকম স্বাদ পাই। যা মায়ের জীবদ্দশায় পেতাম। সে কবেকার কথা। তখন পরিপূর্ণ যুবক ছিলাম। এখন জীবনের অনেক ধাপ পার হয়ে মায়ের বয়স পেয়েছি। আমার সন্তানরাও কি আমার বয়স পাবে? অনেক রাত গোরস্তানে কাটিয়ে দিই। হাড়ের মধ্যে মা ও বাবাকে আবিষ্কার করি। দীর্ঘদিন পর তাদের সান্নিধ্য পাই। এই পাওয়ার কোনো তুলনা হয় না। এক সময় কবরের মাটির ওপর মাথা রাখি। আমি মাকে খুঁজে পাই। মনে হয় মায়ের কোলে ঘুমিয়ে আছি। আমি এই কবরে, মা ও বাবার কবরের পাশে কবে ঘুমাতে পারব জানি না। তবে, আমার মেজ বোন তাহমিনা বেগম, আজই, তার ছেলে সেলিম এলেই ঘুমাতে পারবে। সেলিম দেরি করে আসায় তার একদিন সময় নষ্ট হয়ে গেল।

বারো

সেলিম কুষ্টিয়া পৌঁছলো দুপুর বারোটায়। মসজিদের মাইকে জানিয়ে দেওয়া হলো এই খবরটি। সকলেই আস্তে আস্তে এই বাড়িতে ভিড় করতে লাগল। আজ আমার মেজ বোন, তাহমিনা বেগমের লাশ দাফন করা হবে। হিমঘর থেকে সাদা ধবধবে কাফনে মোড়ানো লাশ চৌরহাস আনা হলো। নতুন কিছু মুখ তাকে শেষ বার দেখতে চাইলো। তিলকার কাজ বেড়ে গেল। এই কাজটি গতকাল থেকে তিলকাই করছে। ডাক্তার বলেÑ এই মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে মুখশ্রী উন্মোচনের কাজটি সে সুচারুভাবেই করতে পারে।

একসময় সেলিম মাকে দেখতে এলো। সে চমকে উঠল, এত সুন্দর হয়েছে মা! ভিডিওতে যখন অসুস্থ মাকে দেখত, তখন কেমন মলিন, শুষ্ক লাগত মাকে। আজ অপূর্ব সুন্দর লাগছে তাকে। যেন বেহেশতের হুর। জরাজীর্ণ পৃথিবী থেকে যখন বিধাতা মানুষকে নিজ আশ্রয়ে তুলে নেন, তখন রোগ-শোক কলঙ্ক-বিষাদ থেকে তাকে পরিত্রাণ দেন। এই সৌন্দর্য কখনও দেখেনি সেলিম। তাই সে একটু কাঁদল না। তার চোখে এখন অনাবিল মাধুর্য। এই অনাবিল সৌন্দর্য দেখার পর সে অনুভব করে সে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে শব্দকে দেখতে পায়। সে একভাবে হৃদয়ের গহিন চোখ দিয়ে সে অপলক মা আর মায়ের প্রতিবিম্ব শব্দকে দেখতে থাকে। তার কোনো ক্লান্তি লাগে না।

সেলিম নিজ হাতে মাকে কবরের মধ্যে রাখে। এখন তার কাঁধে অনেক শক্তি। মাটিচাপা পড়ে মা। একটি মাটির টুকরাও যেন মাকে আঘাত না করে তার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। তবু কিছু চিকন চিকন ধুলা অল্প বাতাসে উড়ে গিয়ে মায়ের মুখের কাছে বসে। সেলিম এটুকুও সহ্য করতে পারে নাÑ মায়ের মুখে একটু ধুলার আঁচড় লাগুক। সে কখনও মায়ের সৌন্দর্য নষ্ট হতে দেবে না। জীবন থাকতে নয়। কবর থেকে উঠে এলো সেলিম। হাত-মুখ ধুয়ে পরিষ্কার হতে হবে। তার সর্বাঙ্গে ধুলা। ঠিক এই সময় তার পাঞ্জাবির পকেটে থাকা ফোন বেজে উঠল। সে চমকে উঠল। সৌদি আরবের হাসপাতাল থেকে ফোন। শব্দ মারা গেছে। সেলিম ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকল। সৌদি আরব কতদূর?

তেরো

অফিস খুব ডাকছে আমাকে। আজই ফিরতে হবে ঢাকায়। একদিন দেরি হয়ে গেল। সেলিমের মাতৃদর্শনের জন্য। আমারও অগ্রজা দর্শন শেষ। মৃত মানুষের সাথে সখ্য টেকে না। মাটিতে পুঁতে ফেললেই সব অন্ধকার। অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। মৃত্যুকেও না। গাড়ি ঢাকার দিকে ছুটে চলল। গাছগাছালি সারা পথজুড়ে। গাছে পাখি থাকে। পাখিরা এ-ডাল থেকে ও-ডালে যায়। আমিও। কিন্তু কোনো ডাল আমাকে নেয় না। তাই আমার পাখি হতে ইচ্ছে করে। পাখির কোনো শত্রু নেই। মানুষের রাজ্যে কত শত্রু। আমি বন্ধু চাই। বন্ধুর জন্য অনেক কাঁদি। কেউ আসে না। মনে হয় মৃত্যু ছাড়া কোনো বন্ধু নেই। তাই তার কাছে যেতে চাই।  সাড়ে তিন হাত ভুঁই আমার খুব দরকার। তাই বিধাতার কাছে দরখাস্ত করতে থাকি। গাড়িতে বসেই। মোবাইলের বাটন টিপেও আজকাল কবিতা লেখা যায়।

সাড়ে তিন হাত ভুঁই

বাস্তবতা

আমি কোদালের পাতে মাটিই তো চেয়েছি।

খুঁড়েছি শরীর।

মাটির মাংস চেয়েছি উঠে এলো হাড়। আমার বাবার।

অগ্রজার মতো এই ভাবে আর একদিন

পঁচিশ বছর আগে

খুব সন্তর্পণে এই ভুঁয়ে শুইয়ে দিয়েছি তাঁকে।

আর্দ্র বাতাস যেমন অহরহ শুইয়ে দেয় শিশিরবিন্দু ঘাসের ডগায়।

সেইভাবে শুইয়ে দিয়েছি তাকে।

মাকে তো আরও আগে। যে বছর পিতা-হত্যা হলো, ১৯৭৫। তার ঠিক বছর দশেক পর।

তারপর আজ, একই মাটিতে, অগ্রজার লাশ।

নিজ হাতে শুইয়ে দিতে গিয়ে দেখি,

কবরের মাটির মধ্যে মিশে আছে হাড়

ধূসর, তিল তিল দাগ তার গায়ে

যেন উইপোকা খেয়ে যাওয়া পর্যুদস্ত কাঠ।

বাবা যখন জীবিত, তখনও ঘুণপোকা

খেয়েছে তাকে, সভ্যতার বেশে। এখন মাটিতে।

তবুও থামেনি।

এখনও কুট কুট করে কামড়ায় তাঁকে,

অস্থিমজ্জা খেয়ে মেটেনি সাধ, এখনও বসায় কামড়

পচে যাওয়া গলে যাওয়া নম্র হাড়ের উদ্ভ্রান্ত ঠোঁটে।

আমি কোদালের পাতে মাটিই তো চেয়েছি।

তবু কেন ভেঙে গেল কোদালের দাঁত, ভোঁতা হলো ধার। মাটিতে মিশে থাকা হাড় আমার বাবার।

আমার মায়ের।

ভবিতব্যঃ

পার হলো ছেঁষট্টি বছর

হৃৎপিণ্ডে প্রায়শ কিলবিল করে পোকা

নিস্তেজ পালস মাঝে মাঝে মাঝরাতে

হাইরোডে দাঁড়ানো খ্যাঁকশিয়ালের মতো থমকে দাঁড়ায়।

ব্রেক চাপি। কোনোভাবে পার হই জীবনের রথ।

তেত্রিশ বছর আগে সাত হাজারে কিনেছি কবরের মাটি

এখন তা তিনশ হাজার।

নতুন মাটির এত দাম কে দেবে আমার।

তাই পরিজন জিজ্ঞাসা করে, নতুন কিনব?

না, পূর্বে কেনা এই মাটি ঘিরে আরবার বানাব মৃত্যুবাসর?

আমি কিছুই বলিনি। যেখানে নির্বিকার শুয়ে আছে বাবা

মায়ের শাড়ির আঁচলে

সেখানে হয় যদি ঠাঁই, এই দেহ যদি সে মাটিতে মেশে…

ভালোবেসে করে চুম্বন

কোনো ক্ষতি নাই, কোনো ক্ষতি নাই।

বাবার পাঁজরের হাড়, আর মায়ের অন্তঃসার মিশে

গেছে যে মাটিতে, আমি জানি, সে মাটি কেবল আমার।

তার পর?

একদিন আমার আত্মজা সব জেনে যাবে।

আমার মৃত্যু হলে খোঁড়া হবে আমার কবর,

মাটির অন্তঃপুর ভেদ করে কিছু হাড়

সেদিনও উঠবে ফুঁসে..

পরবাস থেকে মেঘে ভেসে আসবে আত্মজা,

না না, এখানে নয়, এখানে নয়, নতুন কবর খোঁড়ো আমার বাবার। এখানে উইপোকা খাওয়া হাড়

এখানে পিতৃ পুরুষের নড়বড়ে হাড়। ভয় করে।

এই সব অপগণ্ড বিপুল আঁধার।

নতুন কবর খোঁড়ো আমার বাবার।

ধবধবে বকের মতো আমি মৃত পড়ে থাকি।

সেদিকে ভ্রুক্ষেপ কম সাথে আসা মানুষের।

কুকুর ঠ্যাং ভাঁজ করে বসে থাকে শিয়রের কাছে।

খোদক খুঁড়তে থাকে নতুন কবর।

কাঁচা পয়সার লোভ তাকে ভীষণ তাড়ায়।

অন্য কোদাল বসায় ভিন্ন মাটিতে বিষাক্ত কামড়

এখানেও উঠে আসে হাড়।

টের পেয়ে কবর খোদক নীরবে লুকায় সেই হাড়। হাড়হীন মাটি জন্ম দেয় অন্য গল্প পরিপাটি।

আত্মজা পায় না টের এই সব গল্পের বিবিধ বরণ।

সে কেনে হাড়মুক্ত মাটি।

ওয়ালেট থেকে খসে পড়ে চকচকে হাজার ডলার।

এখন তার বাবা হাড়হীন একা।

সমাহিত হয় বাবা।

মা যখন আসবে এখানে। তার জন্যও কিনে ফেলে অগ্রিম মাটি। সাড়ে তিন হাত ভুঁই।

সে চায় আমার বাবা ও মায়ের মতো একসাথে আমরাও একত্রে ঘুমাই।

ইমরোজ সোহেল : কবি ও কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares