উপন্যাস : রোদসী : অরুণ কুমার বিশ্বাস

অরুণ কুমার বিশ্বাস ।।

 সেই কখন থেকে অঝোরে ঝরেই চলেছে আষাঢ়ের বৃষ্টি। একটানা, বিরামহীন। যেন এর কোনো বিশ্রাম নেই। থামতে জানে না ঝিরঝির ক্রন্দসী বর্ষা! বৃষ্টির একঘেয়ে কান্নায় ঘুম ভাঙে অর্ণবের। অর্ণব কবিতা লেখে, লিখতে ভালোবাসে। সে মনের আনন্দে লেখে, কষ্টেও লেখে। নাকি এটা তার অভিনব লুকোচুরি খেলা! জীবনের ভার বইতে না পেরে স্বেচ্ছায় নিজেকে সরিয়ে নেওয়া! কেতাবি বাংলায় যাকে বলে অক্ষম পলায়নপরতা!

বৃষ্টির গন্ধ পেলেই অর্ণব চঞ্চল হয়ে ওঠে, যেমন নেচে ওঠে ওর তিন বছর বয়সী মেয়ে কথার মনটা। কথা এখনও ছোট, বেশ ছোট। জগৎ-সংসারের কিছুই ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। ওর ভালো নাম রূপকথা। সারাক্ষণ পায়রার মতো বকম বকম করে কথা বলে। একের পর এক প্রশ্ন করে চলে। যেন কেবল কথা বলার জন্যই জন্ম হয়েছে ওর।

অর্ণব শোনে। বেশ মনোযোগ দিয়ে ওর প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ বোধ হয় ঠিকই বলেছেন- প্রতিটি শিশু এক একজন দার্শনিক। ওদের মনের থৈ পায়, সাধ্যি কার! 

বাপি, তুমি একলা এখানে দাঁড়িয়ে কী দেখছো বলো তো! বৃষ্টি! সে তো নিত্যই দেখো। আর দেখবে যদি তো আমায় ডাকোনি কেন! আমি বুঝি তোমার কেউ নই! অমনি মুখ গোমড়া করে ফেলে রূপকথা, অর্ণবের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন!

কে বলল তুমি আমার কেউ নও মামণি! আমার মিষ্টি মেয়ে রূপকথা, যাকে রোজ আমি একটা করে ফুলপরীদের গল্প  শোনাই। কী, ঠিক বলিনি!

তাহলে তুমি আমাকে বৃষ্টি দেখতে ডাকোনি কেন? বৃষ্টি আমি ভীষণ ভালোবাসি।

আমাকে বাসো না বুঝি?

বা রে! আমি তাই বলেছি নাকি! তোমাকেও ভালোবাসি বাপি! অ-নে-ক! তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো তো! মা কোনো, আমাকে ফাঁকি দিয়ে মা কবেই চলে গেছে! রূপকথার কণ্ঠে অভিমানের সুর! অর্ণব বুঝতে পারে এক্ষুনি সামাল দিতে না পারলে অনর্থ হয়ে যাবে। রূপকথা হাপুস নয়নে কাঁদতে বসবে। সেকি কান্না! সকাল-সন্ধ্যা অষ্টপ্রহর একটানা চলতেই থাকবে। কোনো বিরাম নেই। ওর কান্না আষাঢ়কেও হার মানায়!

চলো মামণি, এবার আমরা ভিতরে যাই। জানালায় দাঁড়ালে ঠান্ডা লেগে যাবে। নাশতার সময় হয়ে গেছে। চলো দেখি বিজুটা কী তৈরি করেছে তোমার জন্য! মেয়েকে একরকম জোর করেই ভিতরে নিয়ে এলো অর্ণব।

জানো বাপি, বিজুটা এক নম্বর ফাঁকিবাজ। আমাকে একটুও ঘোড়ায় চড়তে দেয় না। যেই না ওর পিঠে চড়েছি, অমনি বলে টাট্টুঘোড়া ভীষণ খেপে গেছে। জলদি নেমে পড়ো, নইলে তোমাকে সুদ্ধ ছুট লাগাবে! একছুটে মাঠ ছাড়িয়ে গাঙ পেরিয়ে চলে যাবে তেপান্তরের দেশে। একবার সেখানে নিয়ে গেলে কোনোদিন আর ফিরতে পারবে না!

তাই নাকি! তোমার সাথে চালাকি! ঠিক আছে, আমি ওকে খুব করে বকে দেব।

আরও বলে কী জানো, আমার মা নাকি আর কখনও আসবে না! কক্ষনো না! তাই কখনও হয়! মা আমাকে কত্তো আদর করে। আমাকে ছেড়ে মা বেশিদিন থাকতেই পারবে না! আপন মনে একলাটি বলে যায় রূপকথা।

কিন্তু অর্ণব জানে, নিপা সত্যি আর ফিরবে না। সে যে বহতা নদী। কখনও পেছন পানে তাকিয়ে দেখে না। নইলে রূপকথার মতো এমন মিষ্টি মেয়েকে ছেড়ে সে কখনও মরীচিকার পিছনে ছোটে!

নিপা চলে গেছে, তাতে এতটুকু আফসোস নেই অর্ণবের। সে জানে অধরার পানে হাত বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। তাতে শুধু কষ্টই বাড়ে, স্বস্তি আসে না। অর্ণব সচরাচর মিথ্যে বলে না। অপ্রয়োজনে তো নয়ই, লাভের আশায়ও নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সে সত্যি অসহায়। এইটুকুন মেয়েকে কী বলে বোঝাবে অর্ণব!

সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরের মতো বুক চিতিয়ে বলবে- রূপকথা, তোমার মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। কারণ আমি তাকে যথেষ্ট প্রাচুর্য দিতে পারিনি। বিয়েবার্ষিকীতে আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব সবাইকে ডেকে বিদেশি স্টাইলে জমজমাট পার্টি থ্রো করতে পারিনি। নিপা চলে গেছে, কারণ সে আমাদের ভালোবাসেনি। ভালোবেসেছিল আমার পৈতৃক সম্পত্তি আর কাব্যখ্যাতিকে। দুটোই যখন গেছে, তখন আর কিসের মোহে সে মিছেমিছি পড়ে থাকবে এখানে!

সত্যি বলতে কী, অর্ণব এতে দোষের কিছু দেখে না। এটাই নিয়ম। মৌ ফুরোলে মাছিরা আর থাকবে না, হন্যে হয়ে অন্য বাগানে কুসুম খুঁজবে এতে আর আশ্চর্য কী! ভাগ্যিস নিপা দূরের কারও সাথে ভাগেনি। তাই লোক জানাজানি হয়েছে সামান্যই! অর্ণবের খুব কাছের বন্ধু আসিফের সাথে সুদূর ইউরোপে পাড়ি জামিয়েছে সে। শুনেছে সেখানে ওর রমরমা হোটেল ব্যবসা। শেয়ার মার্কেটে বিপুল অঙ্কের টাকা লগ্নি করা আছে। যার হিসাব কেবল ডলার কিংবা পাউন্ডে করা সম্ভব, তৃতীয় বিশ্বের অর্থহীন অর্থ দিয়ে নয়!  

বাপি, রোজ রোজ আমি ওমলেট আর রুটি খাবো না! একদম ভালো লাগে না খেতে! আমি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই চাই। অমনি কাঁদতে বসল রূপকথা।

আজ খেয়ে নাও মামণি! কাল আমি তোমাকে নিশ্চয়ই ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এনে দেব। সাথে ক্যাডবেরি চকলেট!

কাল নয়, আজই। এক্ষুনি চাই আমার। সহসা জেদি হয়ে ওঠে রূপকথা।

মা-হারা মেয়েরা বুঝি এমনই হয়! বেচারি রূপকথা! মা যার কোনো সে অভাগা, আর যার থেকেও নেই তাকে কী বলবে! দুর্ভাগা নিশ্চয়ই! ওর জন্য কষ্ট হয় অর্ণবের। বুঝতে পারে না, এমন জেদি মেয়েকে সে কী করে সামলাবে। একটু পরেই অবশ্য এর জবাব পেয়ে যায় কবি। রূপকথার হয়তো তাকে না হলেও চলবে, কিন্তু কথাকে ছাড়া অর্ণব বাঁচবে কী করে! রূপকথা যে ওর প্রেরণা, ধূসর পৃথিবীতে এক টুকরো সুখ! 

ওই দেখো মামণি, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বেরোতে না পারলে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আনব কী করে? মেয়েকে বোঝাতে চেষ্টা করে অর্ণব।

বৃষ্টি  নেই। একটু ভিজলে কিচ্ছু হবে না। বড়দের কিছু হয় না। আমি তোমার মতো বড় হলে এক্ষুনি গিয়ে একছুটে কিনে নিয়ে আসতাম। তুমি কিচ্ছু পারো না বাপি। তুমি বড্ড ভীতু! ঠোঁক বাঁকালো রূপকথা। 

রূপকথা বোধহয় ঠিকই বলেছে। কিচ্ছু পারে না অর্ণব! কিচ্ছু না! জাস্ট গুড ফর নাথিং! নিজের বউকে যে সমঝে রাখতে পারে না সে কি পুরুষ! মাঝে মাঝে নিজেকেই নিজের কাছে বড্ড অপদার্থ মনে হয়! অক্ষম ক্রোধে গালে চড় মারতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তবু রূপকথার মনে কষ্ট দিতে পারে না অর্ণব!

  আহা! কী মিষ্টি হয়েছে দেখতে! অনেকটা নিপার মতো! না, ওর নাম মুখে আনতে চায় না অর্ণব। যে গেছে তাকে ভাবতে  নেই। চিরদিনের মতো ওর লোভী স্বার্থপর মুখটা মন থেকে মুছে ফেলতে চায় সে।

নাশতা খেয়ে চলো তো মামণি, জানালায় গিয়ে দেখি বৃষ্টিটা একটু ধরেছে কিনা। ওমলেট আর এক স্লাইস পাউরুটি হাতে নিয়ে ঝিলিমিলি তুলে দাঁড়ায় অর্ণব! হ্যাঁ বর্ষণ একটু কমেছে, তবে পুরোপুরি থামেনি। অন্তত বেরোবার মতো নয়!

কী মজা! কী মজা! বৃষ্টি থেমেছে! চলো বাপি, এখন বেরোই। অমনি বায়না ধরে রূপকথা। 

মেয়ের কথা একদম আমলে নেয় না অর্ণব। বিজুকে ডেকে বলে ওকে নিয়ে খেলতে যেতে। অর্ণব একটু বেরোবে। ছোটখাটো হলেও ওর একটা কাজ আছে। ছোট্ট সাহিত্য পত্রিকা। এখনও সুধীজনের নজর কাড়েনি। সপ্তাহান্তে বেরোয়! তাও নিয়মিত নয়। অর্ণব সেখানে সাব-এডিটরের কাজ করে। সেই সাথে শৌখিন কাব্যচর্চা।

শৌখিন বললাম এ জন্যÑ ওর কবিতা ভালো কি মন্দ সেটা কোনো বিচার্য বিষয় নয়। তথাকথিত উঁচুদরের পত্রিকায় খুব একটা ছাপা হয় না এটাই আসল কথা। কবিতা লিখে পেট চলে না, এ আর নতুন কী! বরং এই করে করে সে নিপাকে হারিয়েছে। অবশ্য দুর্জনেরা বলে কবিতা না লিখলেও নিপা ওর হতো না। কারণ অর্ণবের কড়ি নেই। এটা ভালোবাসাকে ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’-এর যুগ। কাব্যচর্চাটা জাস্ট ফ্যাশন। অনেকটা যেন ময়ূরের পালকের মতো। কেউ ‘কবিতা লেখে’ শুনতে বেশ ভালোই লাগে।

কিন্তু ফুলটাইম কবির কাছে কেউ মেয়ে বিয়ে দিতে সাহস করবে না। ইয়েস, দিস ইজ দ্য রিয়েলিটি!

দুই

মেয়ের মুখে টুকরো টুকরো রুটি তুলে দেয় অর্ণব, দেখে ধরে আসা বৃষ্টির নৃত্য। এখন আর ঠিক কান্নার মতো লাগছে না। বরং ওর বুকের ভেতর কেমন এক অজানা সুখানুভূতি তৈরি হচ্ছে! নাকে আসছে মাটির সোঁদা গন্ধ! অনেকদিন পর এই গন্ধটা পেল অর্ণব।

যখন গাঁয়ে থাকতো, সেই উন্মুক্ত উদার আকাশের নিচে বাঁধনহারা সোনালি কৈশোর, বন্ধুরা মিলে স্কুলমাঠে হুটোপুটি হৈ-হুল্লোড়! তখন ঠিক এমন অনুভূতি হতো। সহসা অতীতচারী হয়ে পড়ে অর্ণব! ঢাকা শহরের এই চুন-সুরকি-সিমেন্টে বাঁধানো নাগরিক জীবনে কৈশোর-যাত্রার জায়গা কই!

একটা মেয়ে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে! ঠিক উল্টোদিকে একটা নির্মীয়মাণ বাড়ির কার্নিশের নিচে! অর্ণব দেখছে। ভাবছে হয়তো পরিচিত কারও জন্য অপেক্ষমাণ। নয়তো যাচ্ছিল কোথাও, বেরসিক বৃষ্টিতে আটকে গেছে! কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে গেল, বৃষ্টি ধরে এসেছে আরও আগেই। চাইলে এবার সে যেতে পারে। কিন্তু যাচ্ছে না। ব্যাপারটা তাকে বেশ কৌতূহলী করে তোলে!

কে এই মেয়ে! এ পাড়ায় থাকে বলে তো মনে হয় না। অর্ণব নিশ্চিত, একে সে আগে কখনও দেখেনি।

দেখো বাপি, আন্টিটা সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে। ওর বুঝি কেউ নেই! ঠিক আমার মতো!

তোমার কেউ নেই মানে! এই তো আমি আছি! এমন করে কেন বলো মামণি! আমার কষ্ট হয় না বুঝি!

তুমি আছো, কিন্তু মা তো নেই! মা না থাকলে বাবুদের খুব কষ্ট হয় জানো! মায়ের কোলে বসে গল্প শুনতে পারি না আমি! মা আমাকে আদর করে চুমু খায় না। রূপকথার কণ্ঠে বৃষ্টির ঘ্রাণ! কথার অনেক কষ্ট, ওর মা নেই। কিন্তু নিপা সেটা বোঝেনি! বোঝার চেষ্টাও করেনি কোনোদিন! বুঝলে স্রেফ হিরে-নেকলেসের মোহে এমন মিষ্টি মেয়েটাকে ছেড়ে যেতে পারত না। 

কষ্টে অর্ণবের বুকের ভেতরটা সহসাই মুচড়ে ওঠে। যেন জোরসে দুরমুশ পিটছে কেউ। অর্ণব অসহায়ের মতো বৃষ্টি দেখে। ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছে করে ওর। নিজের জন্য নয়, কথার জন্য! কিন্তু কাঁদা হয় না আর। মনে হয় কে যেন ডাকছে! নাকি ভুল শুনেছে!

এই যে, শুনছেন? দয়া করে একটু শুনুন!

কাকে ডাকছে! কেনই-বা! ওই তো উল্টো দিকে কার্নিশের নিচে দাঁড়ানো সেই মেয়ে, নাকি মহিলা বলা উচিত! বিভ্রান্ত অর্ণব! তাকেই ডাকছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। আশপাশে আরও অনেকে থাকে। হয়তো তারা কেউ কবিতা লেখে না, তার মানে ওরা সব কাজের লোক। রূপকথার বাপির মতো ভীতু নয় কেউ।

আপনাকে বলছি! প্লিজ একটু শুনুন! আবার সেই রিনরিনে নারীকণ্ঠ। কণ্ঠে আকুতি ও সম্ভ্রান্তির যুগপৎ উপস্থিতি! স্বভাবতই উপেক্ষা করতে পারেনি অর্ণব। কারণ যে কবিতা লেখে, নিষ্ঠুরতা তাকে মানায় না।

মেয়েকে সাথে নিয়ে পায়ে পায়ে নেমে এলো অর্ণব। মেয়েটির সাথে ছাতা নেই। অথচ আষাঢ়! তার এই অবিমৃষ্যকারিতা দেখে মনে মনে একচোট হেসে নেয় অর্ণব! অবাকও সে অবশ্য কম হয়নি! আজকালকার মেয়েরা তো এমন অপক্ব নয়! রাস্তা দেখে চলার মতো বোধবুদ্ধি তাদের আছে।

বলুন, আপনার জন্য আমি কী করতে পারি? সম্ভ্রমের সুরে বলল অর্ণব।

না, মানে আমি একটু বিপদে পড়েই বেরিয়েছি! একটু নয়, অনেকখানি! যদি দয়া করে আমার কথাটা শোনেন! ইতস্তত করছে ভদ্রমহিলা!

সে আমি বুঝতে পারছি। বিপদে না পড়লে সাতসকালে এই বৃষ্টির মধ্যে কেউ ঘরের বাইরে পা বাড়ায় না। ইনফ্যাক্ট আমরা এখনও ততটা কেজো হয়ে উঠতে পরিনি।

ঠিক বলেছেন! কিন্তু আমার দরকারটা সত্যি গুরুতর! একপ্রকার অনন্যোপায় হয়ে আমি বেরিয়েছি!

বলুন, কী সাহায্য চান আপনি! আবশ্য আপনাকে আমি হেল্প করতেই পারবো এমন কোনো গ্যারান্টি দিতে পারছি না। অতটা মনের জোর আমার নেই। অমনি অর্ণবের খোলস ছেড়ে একচিলতে কাব্য বেরিয়ে পড়ল। বাপির এমন কাঁচুমাচু ভাব দেখে ভীষণ মজা পেয়েছে রূপকথা! সে ফিক করে হেসে ফেলল।

এ কে? আপনার মেয়ে বুঝি? ভারি মিষ্টি দেখতে! 

ঠিক ধরেছেন। আমার একমাত্র মেয়ে রূপকথা! খুব ভালো মেয়ে! নাচতে জানে, গানের সুরে ছড়া বলতে পারে। তো এবার বলুন আপনার কাজের কথাটা কী! অমনি মেয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে অর্ণব!

আমার একটা বাসা দরকার। ‘ভালো বাসা’ না হলেও চলবে, এই একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই আর কি! বড্ড প্রয়োজন। আপনি তো এ পাড়ায় থাকেন। দয়া করে যদি একটা খোঁজ দেন…!

আপনি শহরে নতুন! আই মিন সাথে আর কে আছে? অমনি জেরা শুরু করে দিল অর্ণব। এই ওর এক মস্ত বদভ্যাস! কৌতূহলী হয়েছে কী আর রক্ষে নেই। জেরায় জেরায় একেবারে জেরবার করে দেবে। বড্ড নোজি!

না, আমি একা। একাই থাকবো। ছোট্ট একরুমের ঘর, সাথে টয়লেট? নারীর কণ্ঠে আকুতি!

এখনই বলতে পারছি না। মানে ঠিক জানা নেই। ভাবতে হবে। আমিও এদিকে নতুন কিনা! এড়িয়ে যেতে চাইলো অর্ণব, নাকি আগ্রহটা যাতে প্রকাশ না হয়ে পড়ে তাই আত্মরক্ষার চেষ্টা! 

ও! তার মানে আপনি আমাকে কোনোরকম হেল্প করতে পারবেন না! বড্ড হতাশ মনে হলো তাকে।

আমি সত্যিই দুঃখিত! জানা থাকলে নিশ্চয়ই আপনাকে বলতাম। এই শহরে সামান্য মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে পাওয়া যে কত কঠিন সে আমিও জানি। আপনাকে সাহায্য করতে পারলে বরং আমি খুশিই হতাম।

ঠিক আছে, চলি তাহলে। আবার সেই রিনরিনে কণ্ঠ! এটুকু না বললেও হতো, তাও বললেন। স্রেফ অভ্যস্ততা! 

কিন্তু ওর যাওয়া হলো না। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। অবিরাম ধারায়।

এখানে দাঁড়িয়ে ভিজবেন? চলুন ভিতরে যাওয়া যাক। অবশ্য আপনার যদি কোনো আপত্তি না থাকে। বলে রাখি, আমি আর আমার মেয়ে রূপকথা ছাড়া আর কেউ থাকে না এখানে। অর্ণব বলল।

ভুল বললে বাপি! কেন বিজু! ওই পাজিটা? মনে করিয়ে দিল রূপকথা। মেয়েটা এমন পেকেছে না! ওর সামনে কিচ্ছু বলার উপায় নেই।

কেন, আপনার স্ত্রী? উনি কোথায় থাকেন? সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বলল মেয়েটা।

কোথাও না! ছোট্ট করে বলল অর্ণব। সে চায় না রূপকথা সব শুনতে পাক।  

মানে? পার্শ্ববর্তিনীর চোখে স্পষ্ট বিস্ময়! সে অমনি থমকে দাঁড়াল।

এ প্রশ্নের উত্তর এত সহজে দেওয়া যাবে না ম্যাডাম। উপরে চলুন। একেবারে ভিজে গেছেন আপনি। ভালোমতো মুছে নিন। পরে প্রয়োজন হলে বলব। চেপে গেল অর্ণব। একজন অপরিচিতার কাছে নিজের কষ্টের কাহিনি ঢোল-শহরত করে বলার মাঝে কোনো কৃতিত্ব খুঁজে পেল না।

ও, আপনার নামটাই তো জানা হলো না ? কী নাম আপনার? অর্ণব বলল। সে বুঝতে পারছে পরিস্থিতিটা একটু যেন অন্যরকম হয়ে গেল।

আমি তিস্তা! আপনি?

তিস্তা! স্রোতস্বিনী তিস্তা! অসাধারণ! এই নামে কোনো মেয়েকে আমি কখনও দেখিনি! আমি অর্ণব! মেয়ের নাম আগেই বলেছি- রূপকথা। ডাকনাম কথা। কথা বলতে ও ভীষণ পছন্দ করে। একের পর এক প্রশ্ন করে ও আমার কানের পোকা বের দিচ্ছে!

ভালোই তো! এই বয়সে আপনার মেয়ে বিখ্যাত ইএনটি স্পেশালিস্ট! কত বড় ভাগ্যের কথা ভাবতে পারেন! মৃদু হেসে বলল তিস্তা। অর্ণব বুঝে নিল, অ্যা লেডি অব গুড হিউমার! সে কথায় রঙ চড়াতে জানে। শব্দ নিয়ে খেলতে ভালোবাসে।

আপনি একটু বসুন। আমি দেখি কী করা যায়। অভ্যাগতকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখে ভিতরে গেল অর্ণব। অনেকদিন বাদে সে নিপার ওয়ার্ডরোব খুলে একটা শাড়ি, ব্লাউজ আর তোয়ালে বের করে আনলো! সহসা নিপার কথা মনে পড়ে গেল ওর। থুঃ স্বার্থপর এক হৃদয়হীনা!  

এই নিন, মাথাটা ভালো করে মুছে নিন। ওদিকে ওয়াশরুম। আপনি দেখছি পুরোপুরি ভিজে গেছেন!

তিস্তা আর দাঁড়াল না। যেতে যেতে ভাবছে এভাবে ভদ্রলোকের ঘরে ঢুকে পড়াটা কি ঠিক হলো! অজানা অচেনা জায়গা। কার মনে কী আছে কে জানে! অবশ্য ঢুকেই যখন পড়েছে, এখন আর এসব ভেবে কোনো লাভ নেই। দেখে যতটা মনে হলো, খুব খারাপ নয় নিশ্চয়ই!

বিজুর ভালো নাম বিজয়। দুনিয়ায় ওর কেউ নেই আর। অর্ণবের গাঁয়ের ছেলে। সাথে করে নিয়ে এসেছে। বেশ ভালো রান্না করতে পারে। কথার সাথে ওর খুব ভাব! নিপা চলে যাবার পর বিজুই সব সামলায়। রূপকথার কান্না থামাতে অর্ণব যখন ব্যর্থ, বিজুর কেরামতির তখনই শুরু। রেগেমেগে কথা ওর চুল ছিঁড়ে নেয়, নাক-মুখ খামচে রক্তাক্ত করে দেয়। অথচ বিজু রাগ করে না। সহোদরের মতো পরম মমতায় আদর দিয়ে ভুলিয়ে রাখে মা-হারা মেয়েটাকে। বিজুর ঋণ তাই কোনোদিন শোধ করতে পারবে না অর্ণব! স্রেফ মাসমাইনের বাঁধা কাজের লোক হলে কি সে এতটা করত! টাকা দিয়ে কখনও হৃদয়ের দাম চুকানো যায়!    

তিন

খানিক বাদে ফ্রেশরুম ঘুরে বেরিয়ে এলো তিস্তা। একবারে নতুন সাজে, নতুন রূপে। বেশ ফ্রেশ লাগছে এখন!

এই বেশবাস অর্ণবের অচেনা নয়, বরং অতিপরিচিত। ভুলে যেতে চায়, অর্ণব কিচ্ছু মনে রাখতে চায় না। ওর কথা না হোক, মেয়ের কথা ভেবেও কি নিপা লোভ সংবরণ করতে পারত না! জীবনে প্রাচুর্যই কি সব! হৃদয়ের কোনো মূল্য নেই! টাকা থাকলেই বুঝি সুখী হওয়া যায়! সেই অর্থে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ বিলগেটস কিংবা সৌদি বাদশাহ! সত্যি তাই!  

কী ভাবছেন! নিশ্চয়ই ভাবছেন সাতসকালে এমন জলজ্যান্ত উপদ্রব কোত্থেকে এলো, তাই না? মৃদু হেসে তিস্তা বলল।

একদম নয়। ঠিক তার উল্টো! একজন সঙ্গী পেলে আমার মেয়ে রূপকথা খুব খুশি হতো। রীতিমতো বর্তে যেত! আপনি কল্পনা করতে পারবেন না, মাকে হারিয়ে মেয়েটা কেমন অসহায় বোধ করছে! 

মাকে হারিয়ে মানে! ওর মা নেই? কী হয়েছিল তার? তিস্তার কণ্ঠে সমবেদনা।

ও কিছু না। আপনি বলুন কী খাবেন? এত সকালে নাশতা করা হয়নি নিশ্চয়ই? আতিথেয়তায় মনোনিবেশ করল অর্ণব।

না খেলেও এখন কিছু খাব না। জাস্ট বৃষ্টি থামলেই বেরোব। যেমন করে হোক আজকের মধ্যেই বাসা ঠিক করতে হবে। ইট্স আর্জেন্ট!

আপনি চাকরি করেন? আগে কোথাও দেখেছি মনে হয়! ভিন্ন প্রসঙ্গে এলো অর্ণব। আসলে সে ঠিক বুঝতে পারছে না কী বলা উচিত। এই নারীকে দেখে কেমন যেন সম্ভ্রমের ভাব ফুটে ওঠে। অভিজাত ফ্যামিলির কেউ হবে!

তা করি। একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়াই। রূপকথার মতো বাচ্চাদের সাথেই আমার বসবাস! তিস্তা বলল।

বাহ, বেশ বলেছেন! বাচ্চাদের সাথে সময় কাটানো সত্যিই ইন্টেরেস্টিং! আপনি বড্ড ভাগ্যবান!      

ভুল হলো। ভাগ্যবান নই, ভাগ্যবতী! মনে মনে বলল, আপনি যদি জানতেন আমার অতীত, তাহলে কখনও এ কথা বলতে পারতেন না!  

ওই হলো। নিন, গরম গরম কফি খান। সাথে টোস্ট। এরচেয়ে বেশি কিছু দেবার সুযোগ নেই। তাহলে বৃষ্টি ভেঙে বাইরে যেতে হয়। সেন্টার টেবিলে বিজু খাবারের ট্রে নামিয়ে রাখল।  

এসব আবার কেন! আমি এক্ষুনি চলে যাব। তিস্তা বলল। বলল বটে, তবে খুব শিগগিরই তার যাওয়া হলো না। কারণ বৃষ্টি থামার কোনো নাম-গন্ধ নেই। কফির কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে সে বলল, আপনি কী করেন অর্ণব সাহেব, বললেন না তো?

জানতে চাননি তো! ঠিক আছে বলছি, আমি স্রেফ ভেরেন্ডা ভাজি। কাজের কিছুই নয়!

হেঁয়ালি করছেন! এই শহরে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই, জাস্ট প্রতিবন্ধীরা ছাড়া। প্রাচুর্য গড়ার ইঁদুর দৌড়ে সবাই শামিল হতে চায়। কেউ এগিয়ে যায় সামনে, আবার কেউ-বা অন্যের পদাঘাতে মরে পড়ে থাকে। খুব রূঢ় শোনালেও এটাই সত্যি।  

এরচেয়ে সত্যি যে কিছু হয় না সে কি আর জানে না অর্ণব! এই ইঁদুর দৌড়ে হেরে গেছে বলেই আজ রূপকথার চোখে তার বাপি স্রেফ অপদার্থ ভীতুর ডিম! সে বলল, তেমন কিছু না। একটা পত্রিকায় কাজ করি। নিজের মনে কবিতা লিখি। যা পাই আমাদের বেশ চলে যায়।

আপনি কবি! সুন্দর সুন্দর কবিতা লেখেন বুঝি! আমাকে শেখাবেন কী করে লিখতে হয়! আমার না খুব ইচ্ছে করে কাব্যের ডানা মেলে হারিয়ে যাই দূর-আকাশে। কল্পলোকে নাটাই হাতে আমি যেন এক ইচ্ছেঘুড়ি! সহসাই চঞ্চল হয়ে ওঠে তিস্তা। এখন তাকে ঠিক রূপকথার মতো মনে হয়! সহজ-সরল এক মিষ্টি মেয়ে। যদিও অর্ণব জানে এর বয়স ত্রিশের কম নয়। 

বিজুর কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে ছুটে এলো রূপকথা। ওর নাশতা শেষ, এবার টাট্টুঘোড়া খেলবে। 

ও মা, তুমি এখনও যাওনি! বেশ করেছ। তুমি এখানে থাকবে আন্টি! আমাদের সাথে? বেণি দুলিয়ে বলে রূপকথা। 

এখানে থাকলে তুমি খুব খুশি হবে? জানতে চায় তিস্তা।

খু-উ-ব! খুব খুশি হব। তুমি থাকবে বলো?  

কী করে থাকব মামণি! আমাকে বাসায় ফিরতে হবে যে! বৃষ্টি থামলেই আমি বেরিয়ে যাব।

মিথ্যে কথা! একটু আগেই না তুমি বললে বাসা খুঁজতে বেরিয়েছ! তোমার থাকার জায়গা নেই! তাহলে এখন আবার কেন যেতে চাইছ তুমি! থাকো না, আমাদের এখানে। তুমি থাকলে খুব মজা হবে। আমরা দু’জনে মিলে খেলব। ঘুরব, বৃষ্টিতে ভিজব, আকাশ দেখব।

তিস্তা কিছু বলে না। অকারণে বাচ্চাদের কাছে মিথ্যে বলতে নেই। তখন আর বড়দের ওরা সম্মান করে না। বিশ্বাস করতে চায় না একদম।

বিজু অর্ণবের কানে কানে এসে বলে, থাক না ভাইজান। আমাদের একটা রুম তো খালি পড়ে আছে। রুমটা ভাড়া দিয়ে দেন। কিছু বাড়তি টাকা আসবে। কথা প্রতিদিন চিকেন আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতে চায়!

অন্য কেউ হলে ধমকে দিত অর্ণব। কিন্তু বিজুর কথা আলাদা। বিজু তার মেয়ের মায়ের অভাব পূরণ করেছে। তা ছাড়া সে খারাপ কিছু তো বলেনি। রুমটা একটু ছোট। তবে ব্যবহার অনুপযোগী নয়। কিন্তু টয়লেট? তার কী হবে! এটুকু বাসায় বাড়িঅলা একটার বেশি টয়লেট অ্যালাউ করবে কেন? তবে সে যাই হোক, বিজুর কথাটা কেন যেন ঠিক উড়িয়ে দিতে পারল না অর্ণব! তবে সে চাইছে প্রস্তাবটা তিস্তার কাছ থেকে আসুক। সে নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে গেলে তার ভিন্ন মানে হতে পারে।

কী হলো অর্ণব সাহেব, ছেলেটা কী বলল? এনিথিং রঙ উইদ মি! প্লিজ বলুন। আমার বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে! তিস্তার চোখের তারায়  সংকোচ। 

কথাটা আপনাকে নিয়ে নয়, তবে আপনার বিষয়ে। আমি অবশ্যি ওর সাথে একমত নই। কারণ জানি, এতে আপনার চলবে না। অর্ণব বলল।

কীসে চলবে না! হেঁয়ালি না করে একটু ভেঙে বলুন তো? কফি যখন খাইয়েছেন এখন আর আমি আপনার অপরিচিত নই। আফটার অল আপনি একজন কবি, আর আমি কবিতা ভালোবাসি। ধরে নিন আপনার পাঠক।

সত্যি বলব! আগেই বলে রাখছি, পছন্দ না হলে কিছু বলতে পারবেন না!

ঠিক আছে বলুন! আপনাদের কোনো স্পেয়ার রুম আছে কি? তিস্তা বুদ্ধিমতী। ওর বুঝতে সময় লাগেনি যে, কথাটা রুম নিয়েই হচ্ছে।

ইয়েস, আমাদের একটা রুম আছে। আপাতত ওখানে কেউ থাকে না। আগে আমার পড়ার ঘর ছিল। এখন রূপকথার সাথে থাকতে হয়। তাই স্টাডি কাম বেডরুম একটাই। ওটা খালি পড়ে আছে।

তাই নাকি! ওটা সত্যি ভাড়া দেবেন তো? নাকি আমাকে নিয়ে খেলছেন? রহস্য করে বলল তিস্তা। আসল কথা হলো সে নিজেই ঠিক করতে পারছে না এখানে থাকাটা তার ঠিক হবে কিনা। অর্ণব একা নন, সে ঠিক আছে। তার মেয়ে রূপকথা, সাথে বার-চৌদ্দ বছরের বিজয় ওরফে বিজু। নিরাপত্তার কথা তুললে ভয়ের কিছু নয়! তাছাড়া যে আগুনের ভিতর সে এতদিন ছিল, তারচেয়ে খারাপ নিশ্চয়ই আর কিছু হবে না।

সবচেয়ে বড় কথা, তিস্তা বুঝতে পেরেছে এই শহরে বাবা-মা কিংবা স্বামীর পরিচয় ছাড়া তার মতো একজন সোমত্ত মেয়েকে কেউ বাসা ভাড়া দেবে না। তা সে যত ভাড়াই অফার করুক না কেন!

কফি শেষ করে তিস্তা, অর্ণব আর রূপকথা মিলে রুমটা দেখে এলো। প্রমাণ সাইজ, তবে সুপরিসর নয়। একটা খাট ফেলার পর খুব বেশি হলে দুটো টেবিল আর চারটে চেয়ার পড়তে পারে। পায়ের দিকে আলনা একটা এঁটে যাবে! চেপেচুপে একখানা মাঝারি গোছের স্টিল আলমারি! ব্যস, আর কী চাই!

আমি রাজি! তবে এবেলা ভাড়ার কথাটা জেনে নিই। স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল তিস্তা। 

ও নিয়ে ভাববেন না। আপনি আগে উঠে পড়ুন তো। ভাড়ার কথা পরে ভাবা যাবে। আন্তরিকতার সুরে অর্ণব বলল।

না ভাই, তা হবে না। আমার বাবা বলতেন, ভাড়া না চুকিয়ে রিকশা কিংবা নতুন বাসায় কখনও উঠবে না। পরে ঝামেলা হতে পারে। আপনি বলুন কত দিতে হবে?

তার মানে আপনি আমাকে রিকশাঅলা ভেবেছেন! আপনি এভাবে বলতে পারলেন? ক্ষুব্ধ অর্ণব। আহত তিস্তাও। আসলে এভাবে সে কথাটা বলতে চায়নি। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। বড্ড বাজে ব্যাপার হয়ে গেল। তিস্তা লজ্জিত! সে বলল, আমি দুঃখিত অর্ণব সাহেব। অপরাধ নেবেন না প্লিজ। ভুল যখন করেছি, মাশুল দিতেও আমি প্রস্তুত। বলুন কী করতে হবে আমাকে! তিস্তার চোখের তারায় টলমল করছে অশ্রু। তার মানে সে সত্যিই অনুতপ্ত। অর্ণব বিশ্বাস করে ভুল করে কেউ অনুতপ্ত করলে ক্ষমা তার প্রাপ্য। তাকে ক্ষমা না করলে বরং উল্টো অপরাধ করা হয়।

সে বলল, ওকে, এবারের মতো মাফ করে দিলাম। তবে এমনি এমনি নয়, মাশুল আপনাকে দিতেই হবে। কী সেটা সময়মতো জানবেন।

পরিস্থিতি নিমেষে হালকা হয়ে গেল। তিস্তা এখানে থাকবে শুনে রূপকথা ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করে দিয়েছে। গাঁয়ের ছেলে বিজুও কিন্তু কম খুশি হয়নি। অবশ্য অর্ণব এখনও নিশ্চিত নয়, কাজটা ঠিক হলো কিনা। কারণ সমাজে ‘নিপারা’ একলা নয়। এমন হাজারো নিপা হয়তো খোলসের আড়ালে মুখ লুকিয়ে আছে। সাদা চোখে যাদের আমরা চিনতে পারি না। দুধের বাচ্চা ফেলে পরপুরুষের হাত ধরে ওরা পাড়ি জমায় সুদূর ইউরোপ আমেরিকা, স্রেফ প্রাচুর্যের লোভে। এদের মা হওয়ার কোনো অধিকার নেই, বরং নাইট ক্লাবেই মানায় ভালো!

চার

নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ। তিস্তা এখানে একেবারেই অচেনা।

অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বললেও ভুল হয় না। অবৈধ হয়তো সে নয়, তবে ঝোঁকের মাথায় অর্ণবের বাসায় উঠে পড়াটা কি খুব সমীচীন হলো! পাকাপাকিভাবে চলে আসার আগে আরেকটু বাজিয়ে নিলে হতো না! বাইরে থেকে দেখে মানুষকে কতটা চেনা যায়! রঙচঙে মুখোশ-আঁটা শহুরে মানুষগুলো এক একজন পাক্কা অভিনেতা। তিস্তা ক্রমশ এদের চিনতে শিখেছে। পেটের দায়ে বেঁচে থাকার জন্য শিখতে বাধ্য হয়েছে সে। ওদের নোংরা কদর্য চেহারা দেখে বারবার আঁতকে উঠেছে তিস্তা। গা বাঁচিয়ে এড়িয়ে চলতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি।

রাত বাড়ছে, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা! তিস্তা ভাবছে অতীতের কথা, ভবিষ্যতের কথা। মানুষের ক্ষমতা কত সীমিত। অথচ তাই নিয়ে আমাদের অহংকারের যেন শেষ নেই। এত চেষ্টা করেও ভবিতব্যকে পাশ কাটিয়ে কি সে যেতে পারল! অর্ণবকে দেখে যতটা বুঝতে পেরেছে, লোকটা বোধহয় খুব খারাপ নয়। মতলববাজ বলেও মনে হয়নি! তবে সে ভাগ্যবিড়ম্বিত। এই বয়সে স্ত্রীবিয়োগ! মা-হারা ছোট্ট মেয়ে রূপকথা!

অর্ণবের স্ত্রী সত্যি মারা গেছে? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কাহিনি! তিস্তা জানে না। জানতে চাইলে সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছে ভদ্রলোক। তার মানে ব্যাপারটা খুব সহজ সাধারণ কিছু নয়। কিন্তু এখানে থাকতে গেলে পুরো গল্পটা যে তাকে জানতেই হবে! নিশিদিন একটা অমূলক সন্দেহ পুষে রেখে কীভাবে সে এক ছাদের নিচে মাথা গুঁজে পড়ে থাকবে!

অর্ণব কবিতা লেখে। একের পর এক উপমা সাজিয়ে রচনা করে উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প! কে এই যুবক! তিস্তাকে সে আবার কৌশলে কোনো ফাঁদে ফেলছে না তো! শতচেষ্টা করেও মন থেকে ভয়টাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়াতে পারছে না তিস্তা। হয়তো অমূলক, তাও ভয় লাগে! ঘরপোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়! সাথে বিজু রয়েছে। সাদাসিধে গাঁয়ের ছেলে। তিস্তাকে পেয়ে রূপকথা খুব খুশি হয়েছে। এমন মিষ্টি মেয়ে যার তার আবার দুঃখ কিসের! অথচ তিস্তার কেউ  নেই! সে একেবারে একা! ওর যদি রূপকথার মতো একটা মেয়ে থাকত! তাকে নিয়ে কাটিয়ে দিত বাকি জীবনটা। বেঁচে থাকার জন্য খুব বেশি কিছু চাই না ওর! একটু অবলম্বন, একটু ভালোবাসা! যাকে বুকের ভিতর গহিনতম প্রকোষ্ঠে মুখ লুকিয়ে থাকা গোপন ভাবনাটিও নিঃসংকোচে খুলে বলা যায়!

কথা ঘুমিয়েছে অনেকক্ষণ! কিচেনে এখন আর ঠুনঠান শব্দ শোনা যায় না। তার মানে বিজুটাও আর জেগে নেই। দিনভর খেটেখুটে ছেলেটা এবার ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাচ্ছে! ঘুম আসছে না কেবল অর্ণবের চোখে। সে ভাবছে রূপকথার ব্যাপারে, আজ সকালে মেয়েটা তাকে আবার মনে করিয়ে দিল যে, সে একটা অপদার্থ! ভীতুর ডিম! নিপা চলে গেছে। ছেড়ে গেছে তাকে। পাড়ি জমিয়েছে সমৃদ্ধির মহাদেশ ইউরোপে। সুখে আছে তো নিপা! থাকলেই বা কী! তাতে অর্ণবের কী এসে যায়!

তিস্তা মেয়েটা কেমন? সে কতদিন থাকবে এখানে! দেখে তো বেশ লেখাপড়া জানা চৌকস বলেই মনে হয়! কিন্তু সে একা কেন! বিয়ে হয়নি এখনও! নাকি অন্য কোনো রহস্য! তিস্তা বলল, আজই তাকে বাসা খুঁজে পেতে হবে। কিন্তু কেন! এত তাড়া কিসের! সে কোথায় ছিল এতদিন! কে তাকে হঠাৎই ঘরছাড়া করল! এমন হাজারো প্রশ্ন মাথার ভিতর কিলবিল করছে অর্ণবের।

রূপকথা তিস্তাকে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছে। সারাটা দিন সে তিস্তার সাথে খেলাধুলা করে কাটিয়েছে। একবারও মায়ের কথা মনে করেনি। অন্তত কিছুদিন মেয়েটা এখানে থেকে গেলে বেশ হয়! রূপকথা একটু বুঝতে শিখলে ওকে বড় করার কাজটা সহজ হয়ে যাবে অর্ণবের। তবে সে কখনই ওকে মায়ের অভাব বুঝতে দেবে না। বেচারা রূপকথা! কী মিষ্টি অথচ হতভাগ্য!

তিস্তা কি বিবাহিত! কিংবা ডিভোর্সি! দেখে মনে হয় ওর বুকের ভিতর কোনো ক্ষত মুখ লুকিয়ে আছে। কষ্টের চোরাকাঁটা প্রতি মুহূর্তে খোঁচাচ্ছে তিস্তাকে। কেন, কিসের কষ্ট ওর! জিজ্ঞেস করবে! ঠিক ভরসা পায় না। তিস্তা যদি সহজভাবে না নেয়! হয়তো যেমন এসেছিল তেমনি ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যাবে বাসা ছেড়ে। না, এসেছে যখন থাক না আরও কিছুদিন। পরে না হয় ওর মেজাজ-মর্জি বুঝে জেনে নেওয়া যাবে।

গুড মর্নিং তিস্তা! কেমন আছেন বলুন। রাতে ঘুম হয়েছে তো? জানতে চাইলো অর্ণব। আজ শনিবার, তাই স্কুলে যাবার তাড়া  নেই ওর। 

তা হয়েছে। একেবারে নতুন জায়গা কিনা, ঠিক অ্যাডজাস্ট করতে পারিনি। ভোররাতে আজেবাজে কী কী সব দেখলাম!

তার মানে দুঃস্বপ্ন! তাও আবার ভোর রাতে! জানেন তো, ভোর রাতে দেখা স্বপ্ন সত্যি হয়! কী দেখেছেন চটপট বলে ফেলুন, দেখি কী করা যায়! ফিচকে হেসে বলল অর্ণব।   

আপনি এসব সুপারস্টিশনে বিশ্বাস করেন! স্বপ্ন তো স্বপ্নই। সে ভোররাতে হোক বা মাঝরাতে। এর আলাদা কোনো মানে  নেই। তবে ঘুমের ক্ষতি হয়, এই যা!

স্রেফ কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেবেন না ম্যাডাম! জানেন তো স্বপ্নের কিছু ব্যাখ্যা আছে। অস্ট্রিয়ান ডক্টর সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেছেন স্বপ্নরা ভিনগ্রহ থেকে উড়ে আসা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মানুষ অবচেতনে যা ভাবে বা পেতে চায়, তা-ই স্বপ্ন হয়ে ধরা দেয় ঘুমের ঘোরে তন্দ্রায়।

এই নিয়ে আপনি একদম ভাববেন না! ঠিক হয়ে যাবে। এবার বলুন আমার খাওয়া-দাওয়ার কী ব্যবস্থা! আশপাশে কোথাও হোটেল আছে? দু’বেলা আনিয়ে নিলেই হবে। তিস্তা বলল।

হোটেল! না নেই। এটা পুরোপুরি আবাসিক এলাকা। যারা আছেন সবারই হেঁশেল আছে। সে ব্যাচেলর হোক আর চরে খাওয়া উদ্বাস্তু হোক!

তবে তো ভীষণ সমস্যা হলো! এ ব্যাপারটা কাল আমার মাথায় আসেনি। সহসাই বাসা খুঁজে পেয়ে এতটা উত্তেজিত হয়ে পড়েছি! যেন মেঘ না চাইতেই জল! জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করল তিস্তা। হাসলে ওকে দারুণ লাগে। কেমন এক মায়াবী আভা ছড়িয়ে পড়ে, যেন শীতের সকালে ওর মুখমণ্ডলে ফুল-পাখিদের মেলা বসেছে।  

নো প্রবলেম ম্যাডাম। আপনার যদি আপত্তি না থাকে তো বিজুর হোটেলে ট্রাই করতে পারেন। ছোকরা মন্দ রাঁধে না! অর্ণব বলল।

অমনি কোত্থেতে রূপকথা ছুটে এলো। অভিযোগের সুরে বলল, বিজুকে তুমি ছোকরা বললে কেন! জানো না সে আমার বন্ধু! বন্ধুকে কেউ কিছু বললে আমার বড্ড খারাপ লাগে। তুমি আর কখনও ওকে ছোকরা বলে ডাকবে না। মনে থাকবে? কথার দু’চোখে শাসানি। যেন মস্ত অপরাধ করে ফেলেছে তার বাপি।    

ঠিক বলেছ রূপকথা! ছোকরা বলা একদম চলবে না। মিষ্টি হাসল তিস্তা।  

আমাদের সংসার! তার মানে একসাথে খাবার প্রস্তাব মেনে নিয়েছে তিস্তা! মেয়েটা সত্যি ভালো! নিঃসীম আকাশের মতো উদার ওর মনটা! মুখে বলল, তাহলে কী ঠিক করলেন মিস তিস্তা, আমাদের সাথে খাওয়া চলবে তো?

না চলে উপায় কী বলুন। পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে! তবে আমারও একটা শর্ত আছে। সেটা মানতে হবে।

বলুন কী শর্ত আপনার? অর্ণব উৎসুক চোখে তাকাল তিস্তার দিকে। যেন সব শর্ত সে মেনে নিতে রাজি।

খাওয়া বাবদ মাসে যা খরচ হবে তার আধাআধি আমার, বলুন রাজি?

এ কেমন শর্ত তিস্তা! আপনি একা, আর আমরা তিনজন। বড়জোর এক-চতুর্থাংশ আপনার কাছ থেকে নেওয়া যেতে পারে। অর্ধেক কেন? বুঝতে পারে না অর্ণব।

বুঝতে পারলেন না! রূপকথা আমার বন্ধু। তাই ওর খরচটা আমি দেব। আর বিজু কেবল আপনার নয়, আমার জন্যও কাজ করবে। তাই ওর অর্ধেকটা আমার। হিসেব কষে বুঝিয়ে দিল তিস্তা।

এটা ঠিক হলো না তিস্তা! বলছি না আপনি আমাদের অতিথি। তবে সত্যি সত্যি যদি কথাকে আপনি বন্ধু মনে করেন তাহলে তার বাপিকে নিশ্চয়ই নিরাশ করবেন না। যেভাবে চলছে চলুক, মাস গেলে তখন দেখা যাবে। অর্ণব বলল। তিস্তা আর কথা বাড়ালো না। বিজু নাশতা দিয়েছে টেবিলে। চটপট ওরা সব বসে পড়ল। রূপকথা আজ নাশতার টেবিলে একদম চিৎকার চেঁচামেচি করেনি। ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের কথা ভুলে তিস্তা যা মুখে তুলে দিচ্ছে তাই খেয়ে নিল লক্ষ্মী মেয়ের মতো। অর্ণব রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখছে, আর ভাবছে হায় নিপা! দুনিয়াটা এখনও চলছে, কারণ সব মেয়ে তোমার মতো নয়!

পাঁচ 

আরও কিছুদিন পরে। তিস্তা আগের চেয়ে এখন অনেক অন্তরঙ্গ। সে বুঝতে পেরেছে অর্ণব আর যাই হোক অভদ্র নয়। ওর ভিতরে এক ধরনের ‘ভব্যতা’ আছে। অর্ণব নারীদের সম্মান করতে জানে। তবে কোনো কারণে দুনিয়ার তাব্য নারীর ব্যাপারে ওর অ্যালার্জি রয়েছে। তিস্তাও তা থেকে রেহাই পায়নি। তবে সে যেহেতু ব্যাপারটা আগেভাগেই আঁচ করতে পেরেছে, তাই বিভ্রান্ত হয়নি। বরং একটু একটু করে অর্ণবের ধারণা যে সত্যি নয়, তা প্রমাণের চেষ্টা করছে। বলা বাহুল্য, তিস্তা সফলও হয়েছে অনেকটা। অর্ণব আর এখন ঢালাওভাবে নারীর ব্যাপারে নেতিবাচক কথা বলে না। কারণ তার চোখের মণি রূপকথাও যে একটা মেয়ে! পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠতে এখনও ঢের দেরি। 

অর্ণব একটু বেরিয়েছিল। অফিসের কাজে নয়, কারণটা ব্যক্তিগত। তিস্তার স্কুলে গিয়েছিল অর্ণব। কৌশলে জানার চেষ্টা করছে তিস্তার একাকিত্বের কারণ! কিন্তু স্কুলের কেউ কিছু বলতে পারল না। সেখানেও ব্যাপারটা সে বেমালুম চেপে গেছে। ওরা বলল, তিস্তা সেখানে পড়ায়। খুব ভালো পড়ায় সে। বাচ্চারা তাকে ভীষণ পছন্দ করে। নিজের মেয়ের মতো আদর করে বলেই হয়তো। এরচেয়ে বেশি কিছু জানার প্রয়োজন নেই তাদের।

সব শুনে অর্ণবের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। তাকে জানতেই হবে কে এই তিস্তা! কেনই-বা সে এভাবে একাকী এসে মুখ লুকিয়েছে! ওর গ্রাম কোথায়, সেখানে আর কে কে আছে! এ ব্যাপারে অর্ণব নিশ্চিত, তিস্তার একটা অতীত আছে যা সে চেপে রাখতে চায়। তার মানে সেই সময়টা ওর কাছে মোটেও সুখকর নয়। মানুষ অতীতচারী হয় তখন, যখন সেখানে ভালো লাগার মতো কিছু থাকে। কষ্টের স্মৃতি কেউ মনে রাখতে চায় না। যেমন চায়নি অর্ণব। কিন্তু চাইলেই কি সব ভুলে থাকা যায়! রূপকথার দিকে তাকালেই মনে পড়ে নিপাকে। ছিঃ নিপা ছিঃ! এতটা স্বার্থপর তুমি হতে পারলে! কোটি কোটি পাউন্ড দিয়েও কি তুমি রূপকথার মতো একটা মেয়ে পাবে!

অর্ণব বাসায় ফেরার আগেই ফিরে এসেছে তিস্তা। কারণ ওর স্কুল ছুটির পরেই অর্ণব সেখানে গিয়েছিল। বাসায় ফিরে দেখে তিস্তা তখনও খায়নি। রূপকথা একটা চীনা পুতুল নিয়ে বিজুর সাথে খেলছে। বেশ দামি পুতুল, সন্দেহ নেই। কে ওকে এনে দিল এই চীনা পুতুল!

মামণি, এটা কোথায় পেলে? কে দিয়েছে তোমাকে?

আমার বন্ধু, তিস্তা আন্টি। স্কুল থেকে ফেরার পথে আমার জন্য কিনে এনেছে। দেখো বাপি পুতুলটা কী সুন্দর চোখ মেলে তাকায়। একটু ছুঁয়ে দিলেই অমনি লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলে।

বিজু, তোর ম্যাডাম খায়নি?

না ভাইজান, এখনও খায়নি। বলেছে আপনি ফিরলে জানাতে। একসাথে বসে খাবে।

ঠিক আছে, তুই টেবিলে খাবার দিয়ে দে। আমি এক্ষুনি বাথরুম ঘুরে আসছি।

তোয়ালে নিয়ে জলদি বাথরুমে ঢুকল অর্ণব। মেয়েটা সত্যিই রহস্যময়ী। একটু একটু করে শেকড় গাড়ছে এখানে। রূপকথা এখন তিস্তা ছাড়া যেন আর কিছু বোঝেই না। বিজু কিংবা অর্ণব ওর খেলার সাথি। আর তিস্তা ওর সব সময়ের সঙ্গী। বাপির চেয়ে কথা এখন তিস্তা আন্টির কাছে গল্প শুনতে বেশি ভালোবাসে। গল্প শুনতে শুনতে সেখানেই ঘুমিয়ে যায় রূপকথা! অর্ণবও আপত্তি করেনি। বাচ্চা মেয়ে! ও যেখানে ভালো থাকে, থাক না। কিন্তু তিস্তার রহস্যময়তা ক্রমশ তাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। সময়টা মোটেও ভালো নয়। পত্রিকা খুললেই নানা রকম ফাঁদ-প্রতারণার খবর চোখে পড়ে! তিস্তাকে অবিশ্বাস করতে ওর মন চায় না। কিন্তু কী করবে অর্ণব! তিস্তাকে এখনও যে পুরোপুরি চেনা হয়ে ওঠেনি! তাই বিজুকে অর্ণব সাবধান করে দেয়। কক্ষনো যেন সে কথাকে চোখের আড়াল না করে।

এত দামি পুতুলটা আনতে গেলেন কেন তিস্তা? মিছেমিছি অনেকগুলো টাকা খরচ করলেন! খাবার টেবিলে অর্ণব বলল!

মিছেমিছি বলছেন কেন! রূপকথা আমার বন্ধু! ওর জন্য একটা পুতুল কিনতে গিয়ে টাকার হিসাব করব! এতটা হিসাবি তো আমি কোনোদিন ছিলাম না অর্ণব!

না, না আমি সে কথা বলছি না। এতে ওর অভ্যেস খারাপ হয়ে যাবে। নতুন নতুন পুতুল পেতে চাইবে। আপনি তো আর সব সময় এখানে থাকবেন না! তখন কে ওকে পুতুল কিনে দেবে!

এ নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না মিস্টার। আমি যেখানেই থাকি কথার পুতুলের অভাব হবে না কোনোদিন। আমি আপনার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেব। আলতো হেসে তিস্তা বলল।

এটা কোনো কাজের কথা হলো না তিস্তা। আমি চাই না আমার সাধ্যের বাইরে রূপকথার সাধ পৌঁছে যাক! এতে ক্রমশ ওর লোভ বেড়ে যাবে। আরও বেশি দামি জিনিস পেতে চাইবে। ঠিক ওর মায়ের মতো। বলল অর্ণব। পরের কথাটুকু অপেক্ষাকৃত নিচুস্বরে।

আপনি খামোখাই ভাবছেন অর্ণব। ঠিক আছে, আপনি না চাইলে আর কিনে দেব না। এবার হলো তো! তিস্তার কণ্ঠে উদগত বাষ্প! নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা। অর্ণব আসলে এভাবে বলতে চায়নি। ওর স্কুলে গিয়ে কোনো খোঁজ-খবর করতে না পেরে ভিতরে ভিতরে কিছুটা বিচলিত অর্ণব। তিস্তার পরিচয়টা জানা দরকার। নইলে দিনের পর দিন এভাবে একটা দুঃসহ সন্দেহ পুষে রেখে শান্তি পাবে না। একটু পরে অর্ণব বলল, আই’ম সরি তিস্তা। সত্যিই দুঃখিত। বিজুকে বলল, মোচার ঘণ্ট কে রেঁধেছে বল তো! বড্ড স্বাদ হয়েছে আজ।

আমি না, আপামণি রেঁধেছে। বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও আসল সত্যটা ফাঁস করে দিল বিজু। তিস্তা ওর দিকে চোখ পাকালো। সেখানে স্পষ্ট স্নেহের শাসানি। মেয়েটা সত্যিই ভালো। এমন অমায়িক ওর ব্যবহার! এ মেয়ে কোনো ভুল করতে পারে না। ভুল যদি কিছু হয়ে থাকে তো অন্যরা করেছে, তিস্তা নয়।

মোচার ঘণ্ট আমার পছন্দ, আপনি জানলেন কী করে? কে বলেছে আপনাকে, বিজু? তিস্তার চোখে চোখ রেখে অর্ণব বলল।

সবকিছু বলতে হয় না, বুঝে নিতে হয়! আপনি সত্যি ভুলোমনা। এই তো সেদিন আপনি মায়ের রান্নার প্রশংসা করতে গিয়ে নিজেই বললেন। আপনার মা নাকি পাঁচফোড়নে আলুর দম আর মোচার ঘণ্ট রেঁধে বাড়ির সবার মন জয় করে নিয়েছেন। মোচার ঘণ্ট মানেই সারা বাড়িতে উৎসবের আমেজ। সবার মেজাজ ফুরফুরে।

তাই নাকি! ডোন্ট মাইন্ড মিস তিস্তা! কবিরা একটু এরকমই হয়। পা উপরে তুলে স্রেফ মগজে ভর দিয়ে হাঁটতে চায়। এদের উপরে নির্ভর করা চলে না, বরং অন্যের গায়ে হেলান দিয়ে কবিরা নির্ভার হতে চায়। কী আর করবেন বলুন, একটু মানিয়ে গুছিয়ে নিন। একখানে থাকতে গেলে এটুকু করতেই হয়। 

সে আর বলতে! এ ক’দিনে আপনাকে আমি যথেষ্টই চিনেছি। তড়িঘড়ি খেয়ে নিন, আমাদের একটু বেরোতে হবে। হাসি চেপে তিস্তা বলল।

আমাদের মানে? আমি কোথায় যাচ্ছি?  

শুধু আপনি নন, আমাদের সাথে কথাও যাচ্ছে। বিজু বাসা পাহারা দেবে, আর আমরা তিনজন ঘুরে আসব।

যাক, অর্ণবের বুকের ভিতর ধুকপুকানিটা একটু নিউট্রাল হলো। তিস্তা ওর সাথে একলা বেরোবে ভাবতেই কেমন এক অদ্ভুত  অনুভূতি! তবে কি সে এবার খুলে বলবে সব, যা এতদিন লুকিয়ে রেখেছে! এতদিনে অর্ণব ওর বিশ্বস্ততা অর্জন করতে পেরেছে তাহলে!

তিস্তার সব কথা শুনতে চায় অর্ণব। সব, সবকিছু। কিন্তু কেন, কিসের এত প্রয়োজন ওর! তিস্তা স্রেফ সাবলেট হোল্ডার বৈ তো কিছু নয়! ক্ষণিকের অতিথি মাত্র! আজ আছে, কাল হয়তো থাকবে না। অথচ রূপকথাকে নিয়ে তাকে থাকতে হবে। আরও অনেক অনেক দিন। যতদিন না কথাকে সে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে পারছে।

ছয়

সাঁজের মুখে ওরা বেরোল। অর্ণব, তিস্তা আর মিষ্টি মেয়ে রূপকথা। কথা আজ ভীষণ খুশি। বাপি তাকে নিয়ে খুব একটা বেরোয় না বা বেরোলেও কাছাকাছি কোথাও। রেললাইনের ধার ঘেঁষে একটু এগিয়ে আঞ্জুমান এতিমখানা। তারপর আলতু মিঞার নার্সারি, ফুলের বাগান। ব্যস, ঘোরা শেষ। অর্ণব প্রায়ই এতিমখানার দিকে আসে। বাচ্চাদের দেখে ভীষণ কষ্ট হয় ওর। কী মায়াবী দেখতে। অথচ ওদের আদর করার মতো কেউ নেই। কী দোষ ছিল এসব ছিন্নমূল শিশুর! কে জানে ওদের মা-বাবা কোথায়! কেনই-বা এখানে ফেলে গেছে ওদের! নাকি কারও পাপের ফসল! রাস্তার ধারে কুড়িয়ে পেয়ে কেউ জমা দিয়ে গেছে এতিমখানায়!   

তিস্তা সচরাচর শাড়ি পরে না। সালোয়ার-কামিজে ওর স্বাচ্ছন্দ্য বেশি। শাড়ি পরে কাজ করতে গেলে আঁচল সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়! তিস্তা মিষ্টি দেখতে! মায়াবী ঢলঢলে মুখমণ্ডল, টানা ভ্রু, শরতের আকাশের মতো স্বচ্ছ নিটোল  চাহনি! যখন ও কথা বলে, কেমন এক স্বপ্নাতুর কল্পনাবিলাস ছুঁয়ে যায় কণ্ঠস্বর। একটা ব্যাপার খেয়াল করেছে অর্ণব। সালোয়ার-কামিজ পরে যখন ও বেরোয়, প্রায়শ গলার দিকটাতে ওড়না পেঁচিয়ে রাখে। নেহাত মন্দ লাগে না দেখতে! স্কুল পালানো মেয়েদের মতো চপল চঞ্চল এক বনহরিণী। দীর্ঘ সরোবরে ডানা ঝাপটে সাঁতারকাটা রাজহংসী যেন! 

আজ শাড়ি পরেছে তিস্তা। তার মানে বিশেষ কোনো অকেশন! ওড়না নেই, তবে গলার দিকটা শাড়ির আঁচল টেনে বেশ যত্ন করে ঢেকে রেখেছে। সেদিকে অর্ণবের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়, কিন্তু ধরতে পারে না। কোনো রহস্য, নাকি স্রেফ অভ্যস্ততা! এভাবে কোনো মেয়ের দিকে বারবার তাকানোটা ঠিক সহবতের মধ্যে পড়ে না। তাই চোখ সরিয়ে নেয় অর্ণব। তবে ওর অবদমিত কৌতূহল স্বস্তি দেয় না। অবিরাম খোঁচাতে থাকে, ফিরে ফিরে দৃষ্টি চলে যায় তিস্তার গ্রীবা বেষ্টন করে থাকা আটপৌরে আঁচলের দিকে।

তিস্তার সাথে বাইরে এসে খুশিতে পপকর্নের মতো ফুটছে রূপকথা। বাড়তি পাওনা হিসেবে রয়েছে বাপি। কথা তিস্তার হাত ধরে চলছে, পেছনে অর্ণব। এখন ওদের দেখলে যে কেউ একটা ছোট্ট সুখী পরিবারের সার্টিফিকেট দিয়ে দেবে নিশ্চয়ই। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! তা কখনও হবার নয়! রূপকথার উচ্ছ্বাস দেখে খুশি হয় অর্ণব। বাসায় থেকে থেকে মেয়েটা কেমন চুপ মেরে গিয়েছিল। তিস্তা আসায় প্রাণ ফিরে পেল রূপকথা।

কী হলো তিস্তা, শাড়িটা আপনি ওরকম বিশ্রীভাবে গলায় জড়িয়ে রেখেছেন কেন? সবাই কেমন হাঁ করে দেখছে! থাকতে না পেরে বলেই ফেলল অর্ণব। সে জানতে চায় কী এর রহস্য!

কই, কে দেখছে আমায়! দেখলই-বা। আপনি দয়া করে ওদের দলে যোগ দেবেন না। তিস্তার ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি।

আপনার চোখে পড়ছে না! ঠিক আছে, দেখেশুনে চলুন। সামনে খোলা ম্যানহোল। হুমড়ি খেলে আর দেখতে হবে না। চুলঅব্দি ডুবে যাবে।

ওটা আপনাদের ব্যাপার। আমাকে কেন মিছেমিছি ভয় দেখাচ্ছেন? আমি জুজুর ভয় পাই না! আমি বাচ্চা নই। আবার হাসি তিস্তার।    

তার মানে! এসব কী বলছেন?

বা রে, আপনিই না বললেন সামনে ম্যানহোল! ওম্যানরা সেখানে পড়তে যাবে কেন। ওটা তো পুরুষকে টাইট দেবার জন্য! কি, ঠিক বলিনি? 

অর্ণব জাস্ট চুপ মেরে গেল। তার আর কিছু বলার নেই। মেয়েটা সত্যি বিচ্ছু! এর সাথে এঁেট ওঠা অর্ণবের কাজ নয়! বাংলার মেলা থেকে রূপকথার জন্য একটা ফতুয়া কিনল তিস্তা। অর্ণবের নিষেধ শুনল না। আরও কিছু টুকটাক কেনাকাটা সেরে ওরা গিয়ে ঢুকল সাংহাই চায়নিজ রেস্তোরাঁয়।

আবার চায়নিজ কেন! বাসায় রান্না হচ্ছে সেগুলো কে খাবে? ভেটো দিল অর্ণব।

একদম টেনশন করবেন না অর্ণব সাহেব। বিজুকে বলা আছে। ও আর আজ হেঁশেল জ্বালবে না। ওর জন্য পার্সেল নিয়ে নেব! কতদিন বাইরে কিছু খাওয়া হয়নি! 

আপনার ব্যাপারটা কী বলুন তো! টাকা বেশি হয়ে গেছে বুঝি! অর্থকে পরমার্থ মনে করুন। নইলে অনর্থ হয়ে যাবে। এই টাকার জন্য মানুষ কত কী করে! কেউ শরীর বেচে, কেউ বুদ্ধি বেচে, আবার কেউ বেচে মন। যাকে বলে হৃদয়বৃত্তি। পেটের দায়ে শরীর বিকিয়ে দেওয়ার চেয়েও জঘন্য হৃদয় নিয়ে ব্যবসা! টাকার মোহে ওরা ছুটে যায় ঘর-সংসার ছেড়ে, পাড়ি জমায়  দেশমাতৃকার সীমানা পেরিয়ে অন্য কোনোখানে। সহসাই দুঃখবাদী কবি হয়ে ওঠে অর্ণব।

তিস্তা কিছু বলে না। নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে অর্ণবের দিকে। ভাগ্যিস রূপকথা কাছে নেই। ও খেলছে অন্য বাবুদের সাথে রেস্তোরাঁর কোণে সাজিয়ে রাখা পিংপং বল দিয়ে। খানিক বাদে নৈঃশব্দ্য ভেঙে তিস্তা বলল, আপনার নিজের কথা বলুন। কেন এই একাকিত্ব! রূপের মা কোথায়?

ও নেই! স্রেফ নেই হয়ে গেছে। সন্তর্পণে দীর্ঘশ্বাস চাপল অর্ণব।

নেই মানে! কোথায় গেছে? রূপকথা বলল ফিরে আসবে একদিন! নাকি মরে গেছে? সাহস করে বলল তিস্তা।

মারা গেলে বরং ভালো ছিল। আমি রোজ রোজ ওর কবরে গিয়ে ফুল ছড়াতাম! সে বেঁচে আছে। বড় নির্লজ্জের মতো বেঁচে আছে নিপা।

একটু খুলে বলবেন প্লিজ। আমি আপনার কষ্ট শেয়ার করতে চাই। তিস্তার কণ্ঠে অন্তরঙ্গতার আভাস!    

এখন নয়, আরেক দিন। শুনতে চাইলে বলব। নিশ্চয়ই বলব। এসব কথা সবাইকে বলা যায় না! কষ্ট! অনেক কষ্ট আমার!

আমাকেও না! আমাকে আপনি বিশ্বাস করেন না অর্ণব?

এ প্রশ্নের উত্তর এখনও জানা হয়নি ওর। চীনা রেস্তোরাঁর আলো-আঁধারিতে অর্ণব অপলক তাকিয়ে থাকে। সে চোখে কোনো এক্সপ্রেশন নেই। শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে রূপকথা খেলছে। পিংপং বলের পেছনে ছুটছে ওর বাড়ন্ত মেয়েটা। এই পৃথিবীটা অর্ণবের, একান্তই ওর। সেখানে আর কেউ নেই, কিছু  নেই। শুধু সে, রূপকথা আর পিংপং বলের বেয়াড়া উল্লম্ফন!

আপনি আমাকে বন্ধু ভাবতে পারেন। নির্দ্বিধায়! তিস্তা বলল। কেন বলল, সে নিজেই জানে না। স্রেফ ভদ্রতা, নাকি অন্যকিছু! তিস্তা এটুকু বুঝতে পারছে ওদের দু’জনের মাঝে একটা অদ্ভুত মিল আছে। শুনতে বিসদৃশ ঠেকলেও এটাই সত্যি। ওদের কষ্ট, কল্পনা, দুঃস্বপ্ন হুবহু একরকম।

তিস্তার কথা শুনে অর্ণব চোখ তুলে তাকাল। ওর চোখে কী আছে! অনুকম্পা না সমবেদনা! স্পষ্ট না দেখতে না পেলেও অর্ণবের মনে হলো তিস্তার গলায় ওড়না পেঁচানোর রহস্য সে ধরতে পেরেছে। একটা কালো দাগ! গভীর ক্ষত! কাঁধের ঠিক বাঁ দিকে বড্ড বিশ্রী দেখতে!

কী ওটা? আঙুল তুলে দেখাল অর্ণব?

কই, কিছু না তো! ভুল দেখেছেন আপনি! ঠোঁটে একচিলতে কার্পাস তুলোর মতন আলতো হাসি মেখে নিয়ে বলল তিস্তা।

অর্ণব চেপে গেল! বুঝতে পারছে তিস্তা এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইছে না। তবে সে মনে মনে বলল, ভুল আমি দেখিনি তিস্তা। ভুলোমনা বলে মাইওপিক নই। আমার বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষে কেউ ক্ষীণদৃষ্টি ছিল না। তার মানে তিস্তা এখনও আমাকে বন্ধু ভাবতে পারেনি। নয়তো ওর অতীত এতই অমসৃণ যে, বন্ধুকেও তা খুলে বলা যায় না!  

খাবার এলো একটু পরে। ফিরে এলো রূপকথা! ইচ্ছে করেই চিকেনটা বাদ দিয়েছে তিস্তা। রূপ এখনও ছোট। বার্ডফ্লুর বিষ ওকে আক্রান্ত করতে পারে। থাই প্রন স্যুপ, অ্যাপিটাইজার, ইথিওপিয়ার রাইস এন স্পাইস আর মাটন গ্রেভি নিয়েছে। রূপের জন্য ফ্রুটি, আর ওরা দু’জন বট্ল-হট কফি। রূপকথা বড্ড মজা করে খেলেও খুব একটা এনজয় করেনি তিস্তা। খাবারের মাঝপথে যখন মাটন এলো, তখন কী একটা দেখে সহসাই চঞ্চল হয়ে ওঠে তিস্তা! কথাকে বারবার তাড়া দেয়, শিগগির খেয়ে নাও মামণি। ঠান্ডা হয়ে গেলে একদম মজা লাগবে না। অর্ণব বুঝতে পারে খাবারের স্বাদ নয়, বরং কিছু একটা দেখে বিচলিত হয়েছে তিস্তা।

কী সেটা, নাকি মানুষ! ঠিক বুঝতে পারল না অর্ণব। বলতে গেলে একরকম জোর করে ওদের বের করে আনল তিস্তা। রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে নিজেই ট্যাক্সি ডেকে নিল। ড্রাইভারকে বলল, জলদি চলুন। একদম সময় নেই হাতে। সারা পথ একটাও কথা বলেনি তিস্তা। জানালার পাশে বসে বারবার বাইরে দেখছে। আর চিরুনির মতো করে চুলে আঙুল চালাচ্ছে। বেশ বোঝা যায় তিস্তা ভীষণ অস্থির, উত্তেজিত!

একটু পরে বৃষ্টি নামল। খুব জোরেশোরে নয়, মেপেজুখে! একসময় এমন বৃষ্টি কতই না কাক্সিক্ষত ছিল অর্ণবের কাছে। ইউনিভার্সিটি লাইফ, অপরাজেয় বাংলার ঘেসো কার্পেট, বিতর্ক, নাট্যচর্চা, কবিতা পরিষদ! উঠতি কবি হিসেবে ডিপার্টমেন্টের মেয়েদের কাছে ওর বাড়তি কদর! সব মিলিয়ে জীবনটাকে বড্ড বর্ণিল মনে হতো।

সাত 

বাসায় ফিরে নিজের ঘরে সেঁধিয়ে গেছে তিস্তা। কারও সাথে কোনো কথা নয়! সেই যে ঢুকেছে, আর সাড়াশব্দ নেই!

ওর কাণ্ড দেখে ভয় পেয়ে যায় অর্ণব। শুরু থেকেই তিস্তার আচরণ বড্ড বিসদৃশ মনে হয়েছে। এভাবে হুট করে কেউ বাসা ভাড়া নেয় না। রূপকথাকে ওর ভালো লেগেছে বেশ ভালো কথা! দেখে মনে হয় পোড়খাওয়া মেয়ে তিস্তা। সহজে ঠকতে রাজি নয় সে। কিন্তু আজ হঠাৎ ওর কী হলো! সত্যি ভড়কে গেছে অর্ণব। সুইসাইড টুইসাইড করে বসবে না তো আবার! এ জাতীয় মেয়েরা খুব সেন্টিমেন্টাল হয়! কষ্টের মুখোমুখি দাঁড়াতে জানে না। অর্ণব নিজে গিয়ে একবার দেখে আসবে! না, সেটা বোধ হয় ঠিক হবে না! রাতের বেলা কোনো ভদ্রমহিলার ঘরে কড়া নাড়ার একটাই মানে হয়Ñ চরিত্র জলাঞ্জলি দেওয়া! তারচেয়ে বরং এক কাজ করলে হয়। বিজুকে পাঠানো যেতে পারে।

এই বিজু, যা তো গিয়ে দেখ তোর আপামণি কী করছে? সেই কখন থেকে দরজায় খিল এঁেট বসে আছে। গিয়ে বল আমি ডাকছি। জরুরি দরকার!

বিজু গিয়ে অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করল, কিন্তু কোনো জবাব নেই। তিস্তা ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি! হয়তো শুনতে পায়নি। অর্ণবের সন্দেহ আরও বদ্ধমূল হলো! এত তাড়াতাড়ি ওর ঘুমানোর কথা নয়। অনুমান ক্রমশ আতঙ্কে রূপ নিচ্ছে। যদি সত্যি সত্যি কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসে তবেই সেরেছে। জেলের ঘানি না টেনে নিস্তার নেই। এই জন্যই বুঝি বাড়িঅলারা ব্যাচেলর ছোকরা আর একলা মেয়েকে বাসা ভাড়া দিতে চায় না। এখন ওর কী করা উচিত! পাশের বাসার সোহরাব সাহেবকে গিয়ে ডেকে আনবে! পাড়ার লোকজন ডেকে তিস্তার ঘরের দরজা ভাঙবে! কিন্তু যদি কিছু না ঘটে থাকে! সবার সামনে কেমন অপদস্থ হতে হবে তাই ভেবে সিদ্ধান্ত পাল্টাল অর্ণব! দেখাই যাক না কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে গড়ায়!  

রাত বাড়ছে। বাড়ছে অর্ণবের উদ্বেগ আর উত্তেজনা। বিজু ঘুমিয়েছে। জেগে নেই রূপকথা। মেয়েটা আজ বড্ড টায়ার্ড। অনেকটা পথ হেঁটেছে কিনা। ছোট্ট মেয়ে, পায়ে হাঁটার অভ্যাস নেই একদম। সাংহাই চাইনিজের ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছে অর্ণব। বেশ তো ছিল তিস্তা। অর্ণবের সাথে আন্তরিকতার সুরে কত কথা বলল। নিজেকে ওর বন্ধু বলে দাবি করল। কিন্তু খাওয়ার ঠিক মাঝপথে হঠাৎ কী হলো কে জানে! কী বা কাকে দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল তিস্তা! তারপর আর একটুও খায়নি সে। খাওয়া শেষ করার জন্য কথাকে বরং তাড়া দিচ্ছিল বারবার! শতচেষ্টা করেও ঘটনা আঁচ করতে পারেনি অর্ণব। 

রাত তখন বোধহয় দেড়টা বাজে। বাইরে বৃষ্টি নেই, তবে বেশ ঠান্ডা পড়েছে। গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে রূপকথা। গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। তার মানে বড্ড শীত লাগছে ওর। রূপকথার গায়ে চাদরটা টেনে দিয়ে বেরিয়ে এলো অর্ণব! ঘুম আসছে না তাই পায়ে পায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে বেলে জোছনা। মেদুর আকাশে নিভে আসা তারাদের উঁকিঝুঁকি!

আকাশ পাতাল ভাবছে অর্ণব। না চাইলেও নিপার কথা এসে যায়! ও কেমন আছে, কোথায় আছে কে জানে! রূপের কথা কি একবার ওর মনে পড়ে না! অর্ণবের কথা! নাকি প্রাচুর্যের ফেনিল সমুদ্রে নাগরদোলার মতো দুলছে নিপা! নাহ, ওর কথা আর ভাববে না অর্ণব! এই নিপা একদিন ওর কবিতার কত প্রশংসা করত! অর্ণবের মতো শক্তিশালী অথচ অপূর্ব দ্যোতনাময় চিত্রকল্প  নাকি কেউ সৃষ্টি করতে পারেনি আজও! সব মিথ্যে! পুরোটাই সাজানো! শুধু ওকে নিজের করে পাবার জন্য মিথ্যে স্তোক দিয়েছে নিপা।

সহসা কারও উপস্থিতি টের পায় অর্ণব। নাকি ভুল শুনেছে! হতেই পারে। বিক্ষিপ্ত মন বিভ্রান্তি আনে! কাছেই কারও পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়! চকিতে পেছন ফিরে তাকায় অর্ণব। সেকি! তিস্তা! তার মানে সে ভুল শোনেনি!

কী ব্যাপার তিস্তা! এত রাতে তুমি মানে আপনি এখানে?

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল, তাই উঠে এলাম। আপনাকে ডিস্টার্ব করিনি তো! তিস্তার কণ্ঠে দোলাচল। 

না না, বিরক্ত করবেন কেন! তবে আশ্চর্য হয়েছি! এত রাতে আপনাকে সত্যিই আশা করিনি!

বেশ তো চলছিল। তুমি থেকে আবার ‘ধাপনি’তে উঠে এলেন কেন! আমাকে ঠিক আপন ভাবতে পারছেন না, তাই তো!

তা কেন হবে! আসলে আমি নিশ্চিত নই ‘তুমি’ বলায় আপনি শক্ড হলেন কিনা! 

মোটেও না। আপনার মুখে বরং তুমিটাই ভালো মানায়। আপনি এখনও ঘুমাননি কেন অর্ণব! এনি প্রবলেম?

উহু! একযাত্রায় পৃথক ফল হতে পারে না। তুমি আমাকে বন্ধু মনে করো, অথচ এখনও আপনি আপনি করে যাচ্ছ! এ কেমন কথা!

ঠিক আছে, এখন থেকে তুমিও আমার কাছে ‘তুমি’ হলে! উই আর জাস্ট ফ্রেন্ডস! তো এবার বলো এখনও ঘুমাওনি কেন! কে তোমার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে!

এটা নতুন কিছু নয় তিস্তা। প্রায়ই আমি মাঝরাতে উঠে আকাশ দেখি! বলতে পারো অনেকটা নিশাচরের মতো। নিঃশব্দে হাসছে অর্ণব।

রাত জেগে কাব্য সাজাও, তাই না! তোমাদের কবিদের বুঝে ওঠা সত্যি কঠিন! কখন যে কী দেখে তন্ময় হয়ে যাও কে জানে! তিস্তার স্বরে সুরের আনাগোনা। মনেই হয় না এই মেয়ে সারাটা সন্ধ্যা ওদের সবাইকে প্রচণ্ড টেনশনে রেখেছে। তাকে দেখে এখন কে বলবে তিস্তা কাউকে কিছু না বলে নিজের ঘরে ঢুকে দরজার সিটকিনি তুলে দিয়েছিল।  

ঠাট্টা করছ! তবে শোনো, কবিদেরও কষ্ট থাকে। পাওয়া না-পাওয়ার হিসাবটা তাদেরও কখনও কখনও মেলাতে হয়! মিলে গেলে ভালো, আর যখন না মেলে তখনই শুরু হয় গোঁজামিল। অমিলের অন্য নাম! কাব্যের মাঝে হারিয়ে যাওয়া নিছক পলায়নপরতা! অর্ণবের কণ্ঠে জলকণার গন্ধ পায় তিস্তা! ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে, যেন এক্ষুনি ঝরতে শুরু করবে।   

কিছুক্ষণ নীরবতা। কারও মুখে কোনো কথা নেই। যেন সব কথা ফুরিয়ে গেছে। সহসাই শূন্য ঠেকেছে অর্ণবের কাব্যসম্ভার! ওরা আকাশ দেখে, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নৈঃশব্দ্যের গান শোনে। 

আচ্ছা তিস্তা, সত্যি করে বলো তো, আজ সন্ধ্যায় তোমার কী হয়েছিল? কেন অমন করলে? অর্ণব এখনও ভোলেনি ওর বিসদৃশ আচরণ।

কই, কখন কী করলাম! আমার কিছু হয়নি তো! সব ঠিক আছে। অভিনয়টা ভালোই করল তিস্তা। তবে অর্ণবের কাছে সত্যি লুকানো এত সহজ নয়! সে ঠিক ধরে নিয়েছে তিস্তা যা বলল তা মিথ্যা। 

তুমি ঠিক বলোনি তিস্তা! আমার কাছে কেন লুকাচ্ছ। বলো না কী হয়েছিল তোমার! চাইনিজে কাকে দেখেছ তুমি? নাছোড়বান্দা অর্ণব। নিশ্চয়ই সাংহাইয়ে সে কাউকে দেখেছে যার কথা বেমালুম চেপে যেতে চায়।

বলেছি তো কেউ না! অমনি রেগে যায় তিস্তা! তার মানে ঠিক ধরেছে অর্ণব।

আমাকে সব খুলে বলো প্লিজ। আমি হয়তো তোমাকে কোনোভাবে হেল্প করতে পারি! বলো কে সে?

আছে একজন! আমার এই দুর্দশার জন্য সে-ই দায়ী! আমি তাকে ঘৃণা করি। আই জাস্ট হেট হিম! হিসহিসিয়ে বলল তিস্তা। ওর দু’চোখে বারুদের গন্ধ। যেন আগুন লেগেছে কোথাও।

অর্ণব জানে তিস্তা একটু আগেই যে দুটো বাক্য ব্যবহার করেছে অর্থের বিচারে তার আলাদা কোনো মানে নেই। কেউ কেউ বলবেন এটা স্রেফ বাহুল্যদোষ ছাড়া আর কিছু নয়। একই কথার দ্বিরুক্তি মাত্র। ভাষার বৈচিত্র্য আছে, অর্থের নেই। সত্যিই কি তাই! কোনো তফাত নেই! আমি তাকে ঘৃণা করি বললে বোঝা যায় না কে সে! নারী নাকি পুরুষ! কিন্তু ‘জাস্ট হেট হিম’ অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়! অর্ণব আর কিছু জানতে চায় না। বোঝার চেষ্টা করে কে সেই লোক! তিস্তা কি তবে বিবাহিত! আর ভয়ের কারণ ওর স্বামী!

কী হলো, চুপ মেরে গেলে যে একেবারে! জানতে চাইলে না কে সে! কাকে আমি মন-প্রাণ ভরে ঘৃণা করি! বেসুরো বাজে তিস্তার কণ্ঠস্বর। 

বলো শুনছি! তোমার স্বামী নিশ্চয়ই।

এই তো বুঝে গেছ! তুমি কবি, তুমি না বুঝলে আর কে বুঝবে বলো! বিশ্বাস করবে না অর্ণব, ও আমার জীবনটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিয়েছে! ও একটা ইতর, নিষ্ঠুর জানোয়ার! তিস্তার কণ্ঠে বিষ।

অনেকটা আমার মতো। তোমার এ নাটকে কোনো চমক নেই তিস্তা। সব ঠিক আছে, শুধু কুশীলব বদলে নিলেই হয়! তোমার জায়গায় আমি, আর তোমার স্বামীর স্থলে আমার ছেড়ে যাওয়া স্ত্রী নিপা! দু’জনই পীড়কের ভূমিকায়। ওরা আমাদের ভদ্রতার সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করেছে।

আর একটা তফাৎ আছে অর্ণব। তুমি ঠিক ধরতে পারনি! নিপা তোমাকে ছেড়ে গেছে, আর আমি ওই জানোয়ারটার কাছ থেকে পালিয়ে এসেছি। একটা স্বেচ্ছাধীন আর আমার বেলায় তীব্র প্রয়োজন। পালিয়ে না এলে আমি বাঁচতাম না অর্ণব। ও আমাকে নির্ঘাত…!

কী করতো বল! মেরে ফেলত?       

নাহ, ও আমাকে মারত না। টাকার বিনিময়ে বেঁচে দিত। অনেকবার চেয়েছে, কিন্তু পারেনি। এই সভ্য সমাজের অসভ্য ইতরগুলো আমায় দেখে ঠোঁটে জিভ চেটেছে। কামার্ত পুরুষের লোল জিহ্বা আমি দেখেছি অর্ণব। আর আঁতকে উঠেছি বারবার। ওরা মানুষ নয়, জন্তুর চেয়েও ভয়ঙ্কর। নরকের কীট! বিশ্বাস করো এখনও আমি রাতে ঘুমাতে পারি না। এ জন্যই সন্ধ্যেবেলা ঘুমিয়ে নিই। কারণ জানি রাতে আর দু’চোখের পাতা এক করতে পারব না। ভয়ে আতঙ্কে মরে গেছি আমি। আর বাঁচতে চাই না। কী নিয়ে বাঁচবো বলো, কেনই-বা! বলতে বলতে তিস্তার কণ্ঠ মিইয়ে আসে। কান্নার পূর্বপ্রস্তুতি!

রেস্তোরাঁয় সে তোমাকে দেখতে পেয়েছে?

না বোধ হয়। আমি দেখেছি। এক ষণ্ডামতন সঙ্গী নিয়ে ঢুকছে। ভাগ্যিস আমি দেখেছিলাম। নইলে ও হয়তো আমাকে দেখে ফেলত! একবার দেখে ফেললে রক্ষে ছিল না আর!     

তুমি তাকে এত ভয় পাও কেন বলো তো তিস্তা! আমি তো আছি, নাকি?   

তুমি! তুমি আমাকে সেভ করতে পারবে! ভয়ের কথা বলছো! ওকে তুমি চেন না অর্ণব। ও পারে না এহেন কাজ নেই। আমি জানি আসফাক আমায় হন্যে হয়ে খুঁজছে! একবার বাগে পেলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবে। কারণ ওর নারী পাচারের খুঁটিনাটি সব আমি জানি। আমি বেঁচে থাকতে ও আশ্বস্ত হতে পারবে না। কেঁপে উঠল তিস্তা।

তোমার স্বামীর নাম আসফাক! কোথায় থাকে সে? আমায় বলবে? 

জেনে কী হবে! তুমি লড়বে তার সাথে! বাব্বা! বড্ড বীরপুরুষ দেখছি!  

প্রয়োজন হলে লড়ব! দেশে আইন আছে না! তুমি সব ভেঙে বলো। দেখো না আমি কী করতে পারি! সহসা নিজেকে ঠিক গ্রিক হিরো একিলিসের মতো মনে হয়! যেন তিস্তার জন্য সে সব করতে পারে। সব!

আমার জন্য কেন লড়বে বলো! আমার জীবন তো শেষ হয়েই গেছে। বেঁচে থাকার কোনো দরকার নেই আর। কিন্তু তোমাকে থাকতে হবে রূপকথার জন্য।

তুমি না আমার বন্ধু তিস্তা! ভরসা রাখো। নিজেকে কখনও একলা ভেব না। আমরা তোমার সাথে আছি। সান্ত্বনার সুরে অর্ণব বলল। কেন ঠিক জানে না, তিস্তার প্রতি একধরনের মমত্ববোধ জন্ম নেয় অর্ণবের বুকের ভেতর। গাঢ় চোখে তাকিয়ে দেখে সে। দৃশ্যত তিস্তা ওর আপন কেউ নয়। কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই, নেই কোনো পারিবারিক বা সামাজিক স্বীকৃতি! অথচ সে দূরের কেউ ভাবতে পারে না অর্ণব।

পানসে চাঁদ পশ্চিমে ঢলে পড়েছে কখন। আষাঢ়ে আকাশ যেন কাঁদতে ভুলে গেছে। কারণ কান্না কোনো সমাধান নয়। বেঁচে থাকতে গেলে লড়াই করতে হয়! কখনও মুখোমুখি, কখনও-বা চোরাগোপ্তা আক্রমণ! অর্ণব অপাঙ্গে তাকিয়ে দেখে তিস্তা কাঁদছে। ওর নিটোল গাল বেয়ে নামছে অবিরল অশ্রুধারা।

ছিঃ তিস্তা, তুমি কাঁদছ!

আমি কি দুর্ভাগা দেখ। বাবা-মা দেখেশুনে আমার বিয়ে দিলেন। কত ধুমধাম, বাহারি আয়োজন। আমার ছোট ছোট দুটো ভাইবোন আছে। কতদিন ওদের দেখিনি। চাইলেও বাড়ি যাওয়া হয় না। আমি জানি সেখানেও আসফাকের চর শেয়ালের মতো মুখ লুকিয়ে আছে। গেলেই তুলে নিয়ে আসবে। ওর ভয়ে বাবাও কোনো যোগাযোগ রাখে না আমার সাথে। আমিই বারণ করেছি। আমি চাই না আমার কারণে ভাইবোনদের কোনো ক্ষতি হোক। কান্না জড়ানো কণ্ঠে ওর কষ্টের ফিরিস্তি দিল তিস্তা।

এবার শোবে চলো। কতক্ষণ আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে তিস্তা! খুব কাছে এসে দাঁড়ায় অর্ণব। ওর কাঁধে আলতো হাত রাখে। সহমর্মিতার হাত! কেঁপে ওঠে নারী। ঠিক বুঝতে পারে না তিস্তা সরিয়ে দেবে কিনা। দ্বিধা-দ্বন্দ্বের নাগরদোলায় দুলতে থাকে পোড় খাওয়া মেয়ে। অর্ণব নিজে থেকে সরে আসে। বুঝতে পারে তিস্তা এখনও তৈরি নয়! আরও সময় চাই ওর। সে যেন আসফাকের মতো সবাইকে সমান নিক্তিতে পরিমাপ না করে!

দেখো অর্ণব, একটা তারা খসে পড়ল আকাশ থেকে! তিস্তা বলল।

ওটা ধূমকেতু! চিনিয়ে দেয় অর্ণব।

ওটা চলে গেল, অথচ তাতে আকাশের কোনো ক্রান্তিভঙ্গ হয়নি! তারারাও আছে বেশ আগের মতোই। আমি চলে গেলে কারও কিচ্ছু এসে যাবে না। থেমে থাকবে না প্রবহমান নগরজীবন। তবে কেন মিছেমিছি এই অর্থহীন জীবনটা প্রলম্বিত করা! আমার জন্য তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না অর্ণব। আমি ঠিক সামলে নেব।

সে আমি জানি তুমি পারবে। তবে একটু ভুল বলেছ তিস্তা। তুমি চলে গেলে রূপকথার খুব কষ্ট হবে। মেয়েটা তোমাকে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছে। আপন করে নিয়েছে তার ‘চীনা পুতুল আন্টি’কে! কাল সন্ধ্যায় বাইরে থেকে এসে তুমি যখন নিজেকে অবরুদ্ধ করলে নিজের ঘরে, তখন খুব কেঁদেছে রূপকথা। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। ওর সেই কান্না তুমি যদি দেখতে!

সে কী! কেঁদেছে কেন! তুমি কিছু বলেছ অর্ণব?    

ও মনে করেছে সাংহাই রেস্তোরাঁয় গিয়ে খেতে দেরি করেছে বলেই হয়তো রাগ করে তুমি নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছ! ছোট্ট মেয়ে রূপকথা! ওর যেমন বুদ্ধি। পৃথিবীর অনেক কিছুই এখনও সে বুঝতে শেখেনি তিস্তা! তুমি যদি অন্তত ওর কথা ভেবে এখানে থেকে যাও তো আমি চিরদিন তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।

তোমার কৃতজ্ঞতা নিয়ে আমার কী হবে বলতে পারো! কৃতজ্ঞতা! কত প্রয়োজনীয় অথচ অর্থহীন একটা শব্দ! তোমার মেয়েকে ভালোবাসার বিনিময়ে আমাকে কৃতজ্ঞতা জানাবে অর্ণব! তার আগে একটু ভেবে দেখেছ তোমার কৃতজ্ঞতায় আমার দরকার আছে কি কোনো! আমি শর্তাধীন কিছু চাই না অর্ণব। ভালোবাসা তো নয়ই। আমি জানি ভালোবাসা কখনও প্রতিদান চায় না। যে চায় সে ফেরিঅলা। পণের বিনিময়ে হৃদয়টাকে হাতবদল করে মাত্র!    

আমি ঠিক ওভাবে বলিনি তিস্তা! ভুল বুঝো না প্লিজ! তোমার মন আজ দুঃখভারাক্রান্ত তাই উল্টো মানে করছ। প্রয়োজন যদি নাও থাকে, আমি তোমার পাশে থাকব। ঠিক যেভাবে চাও সেভাবেই। নিজেকে শুধরে নেয় অর্ণব।

তিস্তা কিছু বলল না। নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টি মেলে তাকায় ঘোলাটে আকাশের পানে।   

আট

অর্ণব যা ভেবেছে ঠিক তাই। তিস্তার একটা ভয়ঙ্কর অতীত আছে। যা সে কাউকে বলতে চায় না।

এক্ষেত্রে অবশ্যি তাকে দোষ দেবার কিছু নই। এমন কষ্টের কথা কি কখনও অন্যকে বলা যায়! আসফাক ওর স্বামী যে কিনা নিজের বউকে টাকার বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দিতে চায়! স্ত্রীর সম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে লোকটা! তিস্তা মেয়ে হিসেবে ভালো কোনো সন্দেহ নেই। রূপকথাও তাকে আপন করে নিয়েছে। কিন্তু তিস্তাকে এখানে রাখাটা কি আদৌ সমীচীন! যদি কোনো বিপদ হয়! ওর মতো ছাপোষা লোক কীভাবে প্রতিহত করবে!

অর্ণব শুয়ে শুয়ে কেবল তিস্তার কথাই ভাবছে। বুঝতে পারছে আজ আর চোখে ঘুম আসবে না। তাই সে চেষ্টা বৃথা। তিস্তা তাকে বন্ধু মনে করে। নিজে থেকে সে বন্ধুর হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই বন্ধুত্বের মর্যাদা রাখতে পারবে তো অর্ণব! ওর স্বামী হন্যে হয়ে খুঁজছে তিস্তাকে। যতক্ষণ না বাগে পাচ্ছে পুরো শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজবে। কারণ এটা তার জীবন-মরণ সমস্যা! এরপর হয়তো আসফাক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবে। পুরস্কার ঘোষণা করবে ওকে ফেরত পাবার জন্য। স্বেচ্ছায় না হোক, টাকার লোভে কেউ না কেউ শনাক্ত করবে তিস্তাকে।

তারপর! তারপর কী হবে?

আসফাক যদি জানতে পারে অর্ণব শেল্টার দিয়েছে তিস্তাকে, তখন নিশ্চয়ই গুন্ডাটা তাকে ছেড়ে দেবে না। প্রতিশোধ নিতে চাইবে! মারাত্মক কোনো বিপদে জড়িয়ে পড়ছে অর্ণব! তাকে বাঁচতে হবে, রূপকথার জন্য হলেও।

ছিঃ কাপুরুষের মতো এসব কী ভাবছে অর্ণব! সে শুধু ভীতুই নয়, আত্মকেন্দ্রিক! বন্ধুর জন্য যদি নিজের জীবন বিপন্ন করে এগিয়ে যেতে না পারে তাহলে সে কিসের বন্ধুত্ব!

রাত আর বাকি নেই। ফিকে অন্ধকার, ফর্সা হয়ে এসেছে পূর্ব দিগন্ত। কিন্তু তিস্তা তখনও জেগে। অর্ণবের কথা মেনে নিজের ঘরে এলেও দু’চোখের পাতা এক হয়নি। একটু তন্দ্রামতো এলেই অমনি দুঃস্বপ্ন তাড়া করে। চোখের পাতে ভেসে ওঠে কামলোলুপ খদ্দেরের লোভাতুর হাসি, আসফাকের নির্লজ্জ দরকষাকষি আর নিজের বিপন্ন অস্তিত্ব! ঘুমাতে পারে না তিস্তা, চিরতরে নিদ্রা বিদায় নিয়েছে ওর জীবন থেকে।   

অর্ণব তাকে আশ্রয় দিয়েছে, বলেছে বন্ধুর মতো সারাক্ষণ ওর পাশে থাকবে। কিন্তু ওকে ঠিক কতটা বিশ্বাস করা যায়! নিজের স্ত্রীকে যে ধরে রাখতে পারে না, সে কী করে অন্যের স্ত্রীর দায় নেবে! তিস্তা যেন ঠিক ভরসা পায় না। হয়তো আবেগ আছে অর্ণবের, অনুভব করে তিস্তার অসহায়ত্ব। কিন্তু তার করার কিছু নেই। নিজেকে নিয়েই সে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। তিস্তা সেখানে জগদ্দল পাথর।

কিন্তু রূপকথা!

মা-হারা হতভাগ্য মেয়ে! এখনও সে জানে না যে ওর মা চলে গেছে। আর কখনও ফিরে আসবে না। তিস্তাকে পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছে মেয়েটা। ও চলে গেলে খুব কষ্ট পাবে রূপকথা। আর থেকে গেলে হয়তো সাময়িক সন্তুষ্টি। কিন্তু এতে বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না। কারণ তিস্তা জানে আজ না হোক কাল, আসফাক তাকে খুঁজে বের করবেই। ছোট্ট ঢাকা শহর, ওর সহস্র অনুচর। কাল দেখেনি, তার মানে এই নয় সে রণে ভঙ্গ দিয়ে বসে থাকবে! আসফাক তাকে ভালো করেই চেনে। তিস্তা ভাঙবে তবু মচকাবে না। একবার পেয়ে গেলে আসফাক অর্ণবকেও ছাড়বে না। হয়তো রূপকথাকে তুলে নিয়ে যাবে। ভালো ভালো খাইয়ে বড় করে তুলবে নতুন কোনো খদ্দের ধরার জন্য। না, আর ভাবতে পারছে না তিস্তা। এখানে আর থাকা চলে না। তাকে অন্য কোথাও দেখতে হবে। কথার কোনো ক্ষতি হোক তা চায় না তিস্তা। যাকে ভালোবাসা যায়, নিজের স্বার্থের জন্য কী করে তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে! 

এভাবেই কেটে গেল আরও কিছুদিন। ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে অর্ণব। সেই দুর্বলতা সংক্রমিত হচ্ছে তিস্তার মাঝে। অর্ণব বুঝতে পারে ওর একার পক্ষে রূপকথাকে বড় করা সম্ভব নয়। তিস্তাকে ওর চাই। কিন্তু কী করে সেটা সম্ভব! তিস্তা তার বাসার ভাড়াটে বই তো নয়! সাবলেট ছেড়ে সে চলে যেতেই পারে। যখন খুশি, যেখানে খুশি। বন্ধুত্বের দাবি! সেও তো সময়ের প্রয়োজনে! জায়গাটা ভালো নয়। এ তল্লাটে নানা রকম ভবঘুরের আনাগোনা। কে বলতে পারে এদের মাঝে আসফাকের কোনো চর লুকিয়ে নেই!

তিস্তা সারাক্ষণ ওর নিজের ঘরে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে। স্কুল থেকে দু’সপ্তাহের ছুটি নিয়েছে। মজা হয়েছে কথার। সে এখন তিস্তা আন্টির সাথে মনের সুখে খেলতে পারে। কিন্তু এ সুখ আর ক’দিন! বিজু তিস্তার দেখভাল করে। ভাইজানের নির্দেশÑ তিস্তার যেন কোনো রকম অসুবিধা না হয়!

হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটল। ঘটনা নয়, বরং অঘটন বলা যায়! অফিস থেকে ফেরার পথে কে বা কারা অর্ণবকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়! ও অন্যমনস্কভাবে ফুটপাত ধরে হাঁটছিল। রাত তখনও খুব বেশি হয়নি। নয়টা সাড়ে নয়টা হবে হয়তো। বেমক্কা ধাক্কা খেয়ে টাল সামলাতে পারেনি অর্ণব। হুমড়ি খেয়ে ফুটপাতে পড়ে যায়। পাশেই ছিল নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের ফেলে রাখা রডের স্তূপ। ব্যস, বিঁধে গেল অর্ণবের কপালে।

অনেক রাত হয়েছে, অথচ অর্ণব এখনও ফিরছে না। বিজু বারকয়েক গলির মুখ থেকে ঘুরে এসেছে। তিস্তা বারবার অর্ণবের সেলফোনে কল দিচ্ছে। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। তার মানে ফোন বন্ধ। বা সিম খুলে নিয়েছে কেউ। অর্ণব তো কখনও এত রাত করে বাসায় ফেরে না! তবে কি কোনো বিপদ!

কান্নাজুড়ে দিয়েছে রূপকথা। বাপি কেন এখনও বাসায় ফেরেনি! কে তাকে আজ ঘুম পাড়াবে! 

কেঁদো না মামণি! বাপি ঠিক ফিরে আসবে। লক্ষ্মীসোনা মেয়ে আমার! কথাকে সান্ত্বনা দেয় তিস্তা।

ব্যাপার কী বলো তো বিজু! কী হলো তোমার ভাইজানের? এখনও ফিরল না! অফিসের কাজে আটকে গেছে নাকি? নিজের মনে ব্যাখ্যা সাজায় তিস্তা। 

এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ে বিজু। তার মানে ওর কোনো ধারণা নেই। ভাইজান কখনও ফিরতে এত দেরি করে না। 

রাত প্রায় বারোটা বেজে গেছে। এখনও এলো না অর্ণব। এবার সত্যি সত্যি দুশ্চিন্তার কারণ হলো। বিজু নিচে নেমে গেটের কাছে দাঁড়িয়েছে। জানালার ঝিলিমিলি তুলে বাইরে তাকিয়ে আছে তিন্তা। কেঁদে কেঁদে রূপকথা একসময় ঘুমিয়ে গেছে।

তবে কি অপহরণ! আসফাকের লোক অর্ণবকে তুলে নিয়ে গেছে! লোকটা যা ধূর্ত। হয়তো সেদিন আসফাক ওদের দেখেছে। কিন্তু বুঝতে দেয়নি। এমনও হতে পারে হোটেলের ম্যানেজারকে হাত করে ডিজিক্যামে অর্ণবের ছবি তুলে নিয়েছে। তিস্তার জন্য অর্ণবের মতো গোবেচারা মানুষটা এভাবে ফেঁসে যাবে! মনের ভিতর একধরনের অপরাধবোধ তৈরি হয় তিস্তার!

অর্ণব এলো। রাত তখন একটা। ওর এক কলিগ পৌঁছে দিয়ে গেছে অর্ণবকে। আজ একটু দেরি করেই বেরিয়েছে সে। অফিসের নতুন একটা অ্যাসাইনমেন্ট পেল কিনা। অর্ণব বের হওয়ার একটু পরেই বেরিয়েছে ওর বন্ধু রফিক। বাংলামটর ক্রস করে একটু সামনে এগোতেই দেখে অনেক লোকের ভিড়!

কী ব্যাপার, কী হয়েছে! এত লোকের ভিড় কেন! রফিক দেখল অর্ণব পড়ে আছে রাস্তায়। রক্তাক্ত কপাল! বেশ গভীর ক্ষত। ওর জ্ঞান নেই। রক্ত দেখে বোধহয় সামলাতে পারেনি। মূর্ছা গেছে। 

বন্ধুকে রফিক ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেল। সেখানে ফার্স্টএইড দিয়ে ফিরতে ফিরতে রাত ১টা।

রফিককে অনেক ধন্যবাদ জানাল তিস্তা। তিস্তার কথা অর্ণব অবশ্যি তাকে আগেই বলেছে। মেয়েটা ভালো। কিন্তু দুর্ভাগা!  

আপনি প্রকৃত বন্ধুর কাজ করেছেন রফিক সাহেব। আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ! তিস্তার ঠোঁটে বিগলিত হাসি।

বন্ধু বন্ধুর কাজ করবে না তো কে করবে বলুন? আপনি করেননি! এত রাত অবধি জেগে বসে আছেন অর্ণব ফিরবে বলে! রফিক বলল।

সত্যি, বড্ড দুশ্চিন্তা হচ্ছিল ওর জন্য! এমন নিপাট ভালো মানুষ খুব একটা দেখা যায় না আজকাল!

‘ওর’ শব্দটা খট করে কানে বাজলো রফিকের। তার মানে শালা অর্ণব তলে তলে কাজ বাগিয়ে নিয়েছে! ওর এলেম আছে বলতে হয়! রফিক বলল, ঠিক বলেছেন। একটু দেখবেন ওকে! ছোট্ট মেয়ে রূপকথা!

হ্যাঁ, বড্ড মিষ্টি দেখতে! ও এখন ঘুমাচ্ছে। বাপির জন্য কেঁদেছে অনেক। রফিক সাহেব, একটু খুলে বলবেন আসলে কী হয়েছিল অর্ণবের?

কিচ্ছু না! স্রেফ দুর্ঘটনা। আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় দেখতে দেখতে হাঁটে কিনা। কে জানে কী ভাবছিল তখন। ও বড্ড অন্যমনস্ক থাকে আজকাল। রফিক জানাল।

তাই নাকি! পুরো রাস্তাটা নিজের মনে করে চললে মুখ থুবড়ে পড়বেই তো! নাকি কেউ ধাক্কা দিয়েছে? তিস্তার চোখে রহস্যময় দৃষ্টি। ওর ধারণা এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, আসফাকের লোকেরা অর্ণবকে একা পেয়ে অ্যাটাক করেছিল। এমনও হতে পারে ফলো করে বাসায় আসার প্ল্যান ছিল ওদের। সুবিধে করতে না পেরে শেষে ওকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে! থ্রেট করেছে কিনা কে জানে! রফিক বলল, অর্ণব ইদানীং বড্ড অন্যমনস্ক থাকে। তার মানে টেনশন করে। কিন্তু কাকে নিয়ে! রূপকথা, নাকি তিস্তা!

ভাবতে ভালো লাগছে ওকে নিয়ে এখনও কেউ ভাবে। তিস্তার জন্য ভাবছে অর্ণব। সে চায় আসফাকের কবল থেকে তিস্তাকে উদ্ধার করে আনতে। তিস্তা জানে, সে কখনও হবার নয়! আসফাকের হাত অনেক লম্বা। তার ভয়াল থাবা থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না তিস্তাকে। 

আপনি একটু বসুন রফিক সাহেব, আপনার জন্য চা করে আনছি!

এত রাতে চা! এক কাপ চা পেলে অবশ্য মন্দ হয় না! ইলশে গুঁড়ির ভিতর দিয়ে এতটা পথ ঠেঙিয়ে এসেছি। শীত শীত লাগছে!

কষ্ট করে আপনি যাবেন কেন আপামনি? আমি যাচ্ছি। বিজু বলল। কিন্তু বিজুকে অর্ণবের কাছে বসতে বলে তিস্তা নিজেই উঠে গেল। চা এলো একটু পরে। চা খেয়ে বিদায় নিল রফিক। বলল কাল একবার এসে দেখে যাবে।   

নয়

সারা রাত ঘুমায়নি তিস্তা। এমনিতেই ঘুম আসে না, আজ অর্ণব অসুস্থ। ওর কাছে একজন থাকা দরকার। বিজু থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু তিস্তা নিষেধ করেছে। সারাদিন খেটেখুটে ছেলেটা ক্লান্ত। একটু ঘুমানো দরকার।

অর্ণবের ঘুম ভাঙল খুব ভোরে। তখনও আলো ফোটেনি। আলোর কুসুম সবে পাপড়ি মেলছে। হঠাৎ কঁকিয়ে উঠল অর্ণব। মাথায় ব্যান্ডেজ, রক্ত চুঁইয়ে নেমেছে একটু। বড্ড লেগেছে!

আমি আমি এখন কোথায়! কী হয়েছে আমার? মিয়ানো গলায় জানতে চায় অর্ণব।

এই তো তুমি এখানে! নিজের বিছানায় শুয়ে আছো। তিস্তা বলল।

কে তুমি! কোত্থেকে এলে?  

আমায় চিনতে পারছ না অর্ণব! আমি তোমার বন্ধু তিস্তা। কাল রাতে তুমি ফুটপাতে পড়ে গিয়েছিলে।

কী করে এলাম এখানে?

তোমার বন্ধু রফিক সাহেব তুলে এনেছেন। ভালো আছ তো অর্ণব?

বড্ড ব্যথা! মাথা টনটন করছে! ব্যান্ডেজের গায়ে হাত বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করে অর্ণব।

ভয় পেও না। তাড়াতাড়ি সেরে যাবে। চোট সামান্যই। তেমন মারাত্মক কিছু হয়নি। ছোট্ট বাবুদের মতো সান্ত্বনাবাণী  শোনায় তিস্তা।

তিস্তার কোথাও যাওয়া হলো না। ধপ করে বসে পড়ল। অর্ণবের মাথার কাছে বসে ওর ব্যান্ডেজে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বড় মমতা মাখানো সে হাত। ওর কোমল হাতের পেলব ছোঁয়ায় পরম নির্ভরতায় চোখ বুজলো অর্ণব। কিন্তু ঘুম এলো না চোখে। অর্ণব বলল, তুমি না থাকলে আমার কী হবে বলো তো?

কী আবার হবে! বারবার নিশ্চয়ই তুমি ফুটপাতে হুমড়ি খেয়ে পড়বে না! পড়লেও সামলে নিতে পারবে। এই তো অভিজ্ঞতা হলো। মৃদু হেসে তিস্তা বলল।

ঠাট্টা করো না তিস্তা। আমি মোটেও হুমড়ি খেয়ে পড়িনি। আমাকে ধাক্কা মেরেছে কেউ। কেন মেরেছে তাও জানি।

সত্যি! কেন মেরেছে বলো তো!

মোবাইলটা নেবে তাই। যত্তসব ছিঁচকে চোরের দল। নিবি তো চাইলেই পারতিস। আমি দিয়ে দিতাম। অর্ণবের কণ্ঠে বীরত্ব!

চিরকাল তুমি এভাবে দিয়েই এসেছো অর্ণব! কখনও চাইতে শেখোনি! রবিঠাকুর বলেছেন, অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, ছিনিয়ে নিতে হয়! এভাবে বাঁচতে পারবে না তুমি। আরেকটু শক্ত হও। জিততে শেখো।

অন্য সময় হলে রেগে যেত অর্ণব। যুক্তিতর্কে মেতে উঠত রূপকথার ভীতুর ডিম বাপি! কিন্তু এখন সে কিছুই বলল না। তিস্তার হাতে সঁপে দিল নিজেকে। যেন তিস্তা যা বলেছে সব ঠিক। বড্ড শীত লাগছে ওর। একটু উষ্ণতা দরকার। একাকিত্বের বোঝা বইতে বইতে সত্যি নুইয়ে পড়েছে অর্ণব। এমন জীবন ওর চাই না।

কী হলো, কষ্ট পেলে! কথা বলছো না যে! তিস্তা অর্ণবকে ধরে বসিয়ে দিল। একা একা উঠতে পারছে না। বড্ড লাগছে। কপালের ক্ষতটা বড় কম নয়! ইঞ্চি দুয়েক হবে।

না, আমি ঠিক আছি। তাছাড়া তুমি ভুল বলনি কিছু তিস্তা। কেউ চরে খায়, আর কেউ চরিয়ে! আমি পারিনি তিস্তা, দুটোর কোনোটাই পারিনি। সত্যি হেরে গেছি।     

হেরে গেলে তো চলবে না। তোমাকে আবার শুরু করতে হবে। রূপকথার মতো একটা মেয়ে আছে তোমার। ওর জন্য হলেও লড়াইটা তোমাকে লড়তে হবে।

সে লড়াইয়ে তুমি আমার সঙ্গে থাকবে তো তিস্তা! বলো থাকবে! অর্ণবের কণ্ঠে প্রগাঢ় আকুতি!

তিস্তা কিছু বলল না। নীরবে উঠে গেল।

অর্ণব এখন অনেকটাই সুস্থ। চাইলে সে অফিসে যেতে পারে। কিন্তু তিস্তা বারণ করেছে। বলেছে আর দুটো দিন রেস্ট নাও। সময় হলে আমিই বলব। বাচ্চাদের মতো বেগড়বাই করেছে অর্ণব, কিন্তু তিস্তা তাতে কান দেয়নি। কারণ ওর শরীর এখনও যথেষ্ট সেরে ওঠেনি। বড্ড দুর্বল আর টলমলে। যেকোনো সময় আবার হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারে। ফুটপাতের বদলে হয়তো ডাস্টবিনে।

সেদিন রাতে রূপকথা খুব করে ধরল, চলো না আন্টি ছাদে গিয়ে আকাশ দেখি। কতদিন ছাদে যাইনি।

ওর কথা শুনে বড্ড মায়া হলো তিস্তার। খুব বেশি কিছু তো চায়নি। আকাশ কারও একার নয়! আবার চাইলে যে কেউ তাকে আপন করে নিতে পারে। আকাশের রঙ বদল হয়, যেমন বদলায় মানুষের মন। কথাকে নিয়ে পায়ে পায়ে ছাদে এলো তিস্তা। আকাশ দেখতে ওর খুব ভালো লাগে। কিন্তু দেখা হয় না আর। মনে কষ্ট নিয়ে আকাশের গায়ে কী দেখবে সে!

বর্ষার আকাশ খুব একটা ঝকঝকে নয়। বৃষ্টি না হলেও মেদুর আবছায়া ঢেকে রেখেছে আকাশের বুক। ম্রিয়মাণ তারকারা জ্বলছে নিভছে। যেন কোনো বার্তা পাঠাচ্ছে তিস্তার জন্য।

রূপকথা বলল, জানো আন্টি, বাবা বলেছে মা এখন অনেক দূরে। তারাদের মতো চাইলেই ডেকে নেওয়া যায় না।

তাই বুঝি! তোমার বাপি যখন বলেছে তখন মিথ্যে নয়। মাকে তোমার খুব মনে পড়ে তাই না রূপ!

পড়ে না আবার। সারাক্ষণ মনে পড়ে। মনে হয় একছুটে গিয়ে মায়ের কোলে চড়ে বসি। রূপকথার চোখে অব্যক্ত কান্না।

দেখো, দেখো রূপ, ওই তারাটা কেমন জ্বলজ্বল করছে! ইচ্ছে করেই ওর মনটা অন্যদিকে ফেরাতে চেষ্টা করে তিস্তা।

ওই তো আমার মা। তারা হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কেমন হাসছে দেখো! হাত নাড়লে মাও আমাকে দেখতে পায়। সহসাই উচ্ছল হয়ে ওঠে মিষ্টি মেয়ে রূপকথা। সবেগে হাত নাড়তে শুরু করে।

যাহ! তোমার মা কেন তারা হতে যাবে! মায়ের জন্য তুমি অপেক্ষা করছ! দেখবে, একদিন ঠিক মাকে পেয়ে যাবে তুমি!

বাপিও তাই বলে। কিন্তু আমার কী মনে হয় জানো, মা আর ফিরবে না। আকাশে গেলে কি কেউ ফিরে আসে, তুমি বলো!

তা আসে না। কিন্তু তোমার মা তো আকাশে যায়নি। আছে আশপাশে কোথাও। তুমি ঠিকমতো চললে, পেটপুরে নাশতা খেলে তোমার মা ভীষণ খুশি হবে। একদম দুষ্টুমি করবে না বুঝলে, কথা! তাহলে কিন্তু মা রাগ করবেন। তার ফিরতে দেরি হবে। ইচ্ছেমতো গল্প বানায় তিস্তা। এছাড়া আর কী করার আছে ওর!

রূপ কিছু বলে না। কেবল তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষ চোখে। আপনমনে ছড়া কাটে। ওর সেই ছড়া তিস্তার কানঅব্দি পৌঁছে না।

হঠাৎ এক সময় বলে, তোমরা আমাকে ছোট্ট পেয়ে যা খুশি তাই বলো আন্টি। ভেবেছো আমি কিচ্ছু বুঝি না। আমি কিন্তু সব বুঝতে পারি। মা চলে যাবার পর বাপিটা একদম ভালো নেই। আগের মতো হাসে না, কথা বলে না, যখন তখন বেড়াতে বেরোয় না! এমনকি আমাকে বকে না পর্যন্ত! বাপির বকুনি শুনতে আমার বেশ লাগে। রেগে গেলে বাপি একেবারে টমেটো হয়ে যায় জানো! 

তাই নাকি! বিচ্ছু মেয়ে! এতকিছু তুমি জানলে কী করে! ঠিক আছে, অর্ণবকে আজই বলে দেব যেন সে রোজ তোমাকে আচ্ছা করে বকে দেয়! ওর কথা শুনে হাসি চাপতে পারে না তিস্তা।

আন্টি, বাপিকে তুমি নাম ধরে ডাকো কেন? বাপি তোমার চেয়ে বড় নয়?

তাই তো! ভুল হয়ে গেছে আমার। আর কক্ষনও বলবো না। তুমি দেখে নিও রূপকথা! ভীষণ লজ্জা পেয়ে যায় তিস্তা।

মুখে বললে কী হবে! আমি জানি এবার থেকে তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে বাপির নাম ধরে ডাকবে। যখন আমি ধারেকাছে থাকব না। কী, ঠিক বলিনি!

এই মেয়ে, এসব কী হচ্ছে! বড়দের ব্যাপারে এত নাক গলানো কেন! যাও তুমি আকাশ দেখ। তাড়া করে তিস্তা। এই বয়সে মেয়েটা বড্ড পেকেছে! অর্ণবকে বলতে হবে।

রূপের পাকামো সত্যি অবাক করেছে তাকে। এখনও চার পোরেনি, অথচ সে কতকিছু বোঝে। ভাবতে ভাবতে রেলিং-এর ধারে চলে এলো তিস্তা। চারতলা দালানের সুপরিসর ছাদ। নিচের দিকে তাকায় তিস্তা। দুটো ছেলেমেয়ে খেলছে। হঠাৎ নিচে পড়ে গেলে কি সে মারা যাবে! নাও যেতে পারে। আর যদি ইচ্ছে করে লাফ দেয়! গতিবেগ নিশ্চয়ই বেশি থাকবে। সাথে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি! সেক্ষেত্রে মরলেও মরতে পারে। ব্যস, সব শেষ। আর কেউ ওর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারবে না। মাঝরাতে তাড়া করে ফিরবে না কোনো ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন। বেঁচে যাবে আসফাকও। ওর জঘন্য নারী পাচার ব্যবসা আর স্মাগলিংয়ের কথা ফাঁস করে দেবার মতো কেউ থাকবে না। অর্ণব হয়তো কষ্ট পাবে। ভুলেও যাবে খুব শিগগিরই। সময়ের পললে ঢেকে যাবে সাময়িক কষ্ট, দুঃখবোধ। সবচেয়ে বেশি কাঁদবে রূপকথা! তিস্তা জানে, কথাকে সামলানো বড্ড কঠিন অর্ণবের জন্য।

কিন্তু যদি না মরে!

স্রেফ কোমর ভেঙে পড়ে থাকতে হবে হাসপাতালের বেডে। দর্শনার্থী আসবে, দেখবে, কারণ জানতে চাইবে! নানা রকম মুখরোচক গপ্প বানাবে। বেশ একটা রসালো সিনেমা গড়ে উঠবে তিস্তাকে ঘিরে।

না, এটা সে কক্ষনও করবে না। মরতে যদি হয় তো লড়াই করে মরবে। তিস্তা সব সইতে পারে, কিন্তু কারও করুণা নয়। তিস্তা ফিরে তাকাল। রূপ কোথায়! ছাদে নেই তো! কোথায় গেল মেয়েটা। অমনি পাগলের মতো এলোমেলো পা ফেলে নিচে নেমে এলো তিস্তা।

দেখে, বাপির মাথার কাছে বসে মমতাভরে ক্ষতস্থানে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে রূপকথা। বড় প্রার্থিত সেই দৃশ্য। বাবার অপত্য স্নেহ, মেয়ের ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এমন একটা স্বপ্ন তিস্তারও ছিল। কিন্তু ওই জঘন্য ইতর লোকটা সব ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সহসাই ওর বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা আগুনটা ঝলসে উঠল যেন। না, সহজে তাকে ছাড়বে না তিস্তা। আসফাকের মুখোশটা ছিঁড়ে দিয়ে তবে ওর শান্তি!

দশ  

মন ঠিক করে ফেলেছে অর্ণব। আর লুকোচুরি নয়। সরাসরি কথাটা ওকে জানিয়ে দেবে।

এরকম কিছু হলে রূপকথার বোধ হয় খুব একটা আপত্তি হবে না। এখনও রূপ বেশ ছোট। যখন ও বুঝতে শিখবে, তখন সব ভেঙে বললেই হবে।

তুমি জানো না অর্ণব, তোমার ওই মিষ্টি মেয়ে রূপ আর ছোট্টটি নেই। সে অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। রূপ জানতে চায় আমি তোমার নাম ধরে কেন ডাকি? হাসতে হাসতে বলল তিস্তা। অর্ণব যে তাকে বিশেষ কিছু বলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ঘুণাক্ষরেও তা টের পায়নি।

তা তুমি কী বললে শুনি? আসল কথাটা লুকোওনি তো! সব বুঝিয়ে বলেছ নিশ্চয়ই। অর্ণবের ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি।

যাহ, তুমি না বড্ড বাড়াবাড়ি করছ আজকাল। রূপকে আমি কী বলব! ওর কথা শুনে রীতিমতো ভড়কে গেছি! এক রত্তি মেয়ে বলে কী শোনো! সব কথার মানে জানতে চায়!  

না তিস্তা, তুমি ঠিক কাজ করনি মোটেও। বলে দিলেই বরং ভালো করতে। আজ না হোক কাল ও তো সব জানবেই। দুম করে বলে দিল অর্ণব।

কী জানবে! ওকে বলার কী আছে অর্ণব! তোমার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না আমি। প্লিজ মেক ইট ক্লিয়ার!

সত্যি বুঝতে পারছ না তিস্তা?

একেবারেই না। তুমি আমার বন্ধু। উই আর জাস্ট ফ্রেন্ডস। এতে বলাবলির কী আছে! বোকার মতো হাঁ করে তাকিয়ে থাকে তিস্তা।

ওর চাহনি দেখে ঘাবড়ে যায় অর্ণব। কী বলবে ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারে না। বলে, ছেড়ে দাও। পিচ্চি মেয়ে কী বলতে কী বলেছে। এই নিয়ে এত গবেষণার কী আছে! কিন্তু তিস্তা ছাড়তে রাজি নয়। সে বুঝতে পারে অর্ণব কিছু একটা ‘মিন’ করতে চাইছে। কী সেটা আগেভাগে জেনে নেওয়া ভালো। 

তিস্তা বলল, তুমি কী ভাবছ বলো তো! তোমার মনে কী আছে আমি ঠিক বুঝতে পারি! কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলে। নিশ্চয়ই কোনো বদমতলব ভাঁজছো! আমি জানতে চাই হোয়াট দ্য ম্যাটার ইজ। বলো প্লিজ।

একটু আগেই না বললে আমার মনের কথা তুমি বুঝতে পারো। জাস্ট বুঝে নাও, আমি কী চাইছি! হা হা করে হাসছে অর্ণব।

ওহ নো! তুমি আমাকে নিয়ে খেলছো অর্ণব। তুমি না আমার বন্ধু! তাহলে এত সংকোচ কিসের! জাস্ট বলে ফেলো, আমি শুনতে চাই। নাছোড়বান্দা তিস্তা। ওর জেদ চেপে গেছে। এমন কি কথা যা অর্ণব মুখে আনতে পারছে না!  

সত্যি বলব! খেপে গিয়ে তেড়ে আসবে না তো! নাকি পরে শুনবে! অর্ণব বিচলিত। তিস্তাকে সে ঠিক বুঝতে পারে না। স্বামীর ভয়ে সব ছেড়ে ছুড়ে তিস্তা পালিয়ে এসেছে। বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ কোনো। মাথার উপরে ছাদ আর পায়ের নিচে মাটি দুটোই আলগা ভীষণ। বাকি জীবনটা কী করে কাটাবে তিস্তা! এমন অনিশ্চয়তার মাঝে বেঁচে থাকা যায়!

তিস্তা বলল, তেড়ে আসার মতো কিছু বললে নিশ্চয়ই ছেড়ে দেবো না। ঘাউ করে কামড়ে দেবো গ্রে হাউন্ডের মতো। তবে ভয় পেও না অর্ণব, পেছন থেকে বেমক্কা ধাক্কা মেরে ফেলে দেব না তোমাকে। পড়ে গিয়ে মাথা ফাটালে সেই তো আমাকেই সেবা করতে হবে আবার!

ওর কথা শুনে বড্ড সাহসী হয়ে উঠল অর্ণব। যা ভাবে ভাবুক না। থোড়াই কেয়ার করি! বুকের ভিতর কথা চেপে রাখাটা কোনো সমাধান নয়।

বলল, আমি তোমাকে নিজের করে পেতে চাই তিস্তা। একান্তই আমার।

অর্ণবের কথা শুনে তিস্তা হতভম্ব! হাসবে কি কাঁদবে তাই বুঝতে পারছে না। অর্ণব তাকে এমন একটা উদ্ভট প্রস্তাব দিয়ে বসবে সত্যি ভাবতে পারেনি। তিস্তা বলল, ইউ আর জাস্ট কিডিং! অ্যাম আই রাইট অর্ণব? তবে কি জানো, এমন নিষ্ঠুর প্র্যাকটিক্যাল জোক না করলেই ভালো করতে। আমার ঠিক সহ্য হয় না। বড্ড কঠোর শোনাল ওর কণ্ঠস্বর।

আমি কৌতুক করছি কে বলল তোমাকে? ইয়েস তিস্তা, আমি ডু মিন ইট!

জোক্স নয় তো কী! তুমি আমাকে পেতে চাও মানে! এর একটাই অর্থ হয়, মানে মানে কেটে পড়ো এবার। তুমি চাও না আমি এখানে থাকি, ঠিক বলিনি?    

না, বলোনি। আমি চাই তুমি এখানে থাকো। চিরদিনের জন্য! বোঝাতে পেরেছি?

একটুও নয়! বুঝতে চাইও না আমি। কারণ তুমি মিছেমিছি ভুল বুঝেছ আমায়। তিস্তার কণ্ঠে আগের সেই কাঠিন্য।

ভুল বুঝেছি মানে? আমি সত্যি তোমাকে বুঝতে পারি না তিস্তা!

না চাইতেই আমি তোমার বন্ধু হলাম। কারণ তোমার অসহায়ত্ব দেখে খারাপ লেগেছিল। আর অমনি তুমি ধরে নিলে আই’ম রেডি টু গিভ ইউ কম্প্যানি! সত্যি তোমরা পুরুষরা পারোও বটে! নিজেদের মতো করে সম্পর্কের অভিধান খুলে বসেছ! হাউ ফানি! তীব্র শ্লেষ মিশ্রিত স্বরে তিস্তা বলল।   

দেখো তিস্তা, আমার যা মনে হয়েছে তাই বলেছি। ডিসিশন ইজ ইওরস! যদি তুমি অপমান বোধ করো আমি সত্যি দুঃখিত! আর কখনও বলব না। যদি বলো আমি তোমার একাকিত্বের সুযোগ নিয়েছি, বলতে পারো। সে দায় আমার। একটু ভেবে দেখো, তুমিও কিন্তু দায় এড়াতে পারো না। হয়তো বলবে তুমি সুযোগ নিতে চাওনি। আমিই আগ বাড়িয়ে সুযোগ করে দিয়েছি, তাও বলতে পারো। তবে একটা কথা জেনে রেখোÑ! সহসা থেমে গেল অর্ণব।

কী কথা, বলো! ওর দিকে মুখ তুলে চাইলো তিস্তা। হঠাৎ মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল তাই বুঝতে পারেনি ঠিক কতটা রি-অ্যাক্ট করা উচিত! ভেবে দেখলো অর্ণব তাকে অসম্মানজনক কিছু বলেনি। আর দু-চারটা মতলববাজ ছেলের মতো সে নয়। তাই যদি হতো নিপাকে তাহলে এত সহজে সে মুক্তি দিত না। উচ্চাভিলাষী প্রবাসী বন্ধুর কাছ থেকে কিছু পয়সা অন্তত সে খিঁচে নিতে পারত। কিছুই করেনি অর্ণব।

বলো না অর্ণব কী কথা?

আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি। মধ্যবয়সী কোনো পুরুষের মুখে কথাটা হয়তো ঠিক মানায় না। কিন্তু আবেগের ভাষা যে একটাই তিস্তা। আভাসে বুঝে নিলে ভালো, নইলে লাজ-শরমের মাথা খুইয়ে এভাবেই বলতে হয়!

আমি রাগ করিনি অর্ণব। করাটা উচিতও নয়। তুমি তোমার কথা বলেছ, তা সে বলতেই পারো। এবার আমার ভাবনার শুরু! ভাবতে হবে আমাকে। নিজের কথা, তোমার আর রূপের কথা। সবচে বেশি যাকে ভাবব সে আমার হতভাগ্য স্বামী আসফাক।

রঙচটা অতীতটাকে ভুলে গেলে হয় না তিস্তা! ধরে নাও ওটা একটা দুঃস্বপ্ন মাত্র!

আমি তাই চাই অর্ণব। কিন্তু পেরে উঠছি না যে! আমার অতীতটা মাঝরাতে খসে পড়া উল্কার লেজের মতো। কিছুতেই ছেড়ে আসতে পারছি না। আগুন হয়তো কোনো, তবে তেজ আছে। আমি চাইলেও আসফাক আমাকে মুক্তি দেবে না।

আমরা দূরে কোথাও চলে যাব তিস্তা। তুমি আমি আর রূপকথা। সারাক্ষণের সঙ্গী হিসেবে থাকবে বিজু। দু’জন মিলে কিছু একটা করে নিশ্চয়ই নিজেদের প্রয়োজনটুকু মিটিয়ে নিতে পারব। বলো যাবে তুমি তিস্তা? 

তুমি কবি তাই কল্পনার সমুদ্রে স্বপ্নডিঙায় পাল তুলেছ! কিন্তু আমি তো কবি নই। রূঢ় বাস্তবতার নিষ্ঠুর পেষণে ক্ষতবিক্ষত এক নারী। তোমার ওই সুখস্বপ্নে সওয়ার হতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু সে তো হবার নয়।

কেন নয় তিস্তা! কেন! তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না?

নিশ্চয়ই বিশ্বাস করি। আর করি বলেই তো ভয় হয়! আমার বিষাক্ত অতীত তোমাদের সবাইকে অস্পৃশ্য করে দেবে না তো! আমাকে একটু সময় দাও অর্ণব। ভেবে দেখি।

সে তুমি পাবে। যত ইচ্ছে সময় নাও। তোমাকে একটুও জোর করব

 না।      

তিস্তা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মাঝপথে থেমে গেল। রূপ এসে পড়েছে। ছুটে গিয়ে তিস্তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, চলো না আন্টি কাগজ কেটে আমাকে একটা নৌকা বানিয়ে দাও। আর ময়ূর!

শতচেষ্টা করেও রূপকথার সেই বাঁধন আলগা করতে পারে না তিস্তা। বলল, তোমার নৌকা চাই মামণি! ঠিক আছে, কাগজ নিয়ে এসো। একটু পরে বানিয়ে দেব। বাপির সাথে কথা বলছি আমি।

পরে নয়, এক্ষুনি! নৌকার সাথে ময়ূরও চাই। জেদি গলায় বলল রূপকথা।

কিন্তু মামণি, আমি যে ময়ূর বানাতে জানি না। অন্যকিছু চাই! অ্যারোপ্লেন বানিয়ে দেব! কিংবা চীনা পুতুল!

না, ময়ূর চাই আমার। এই নাও কাগজ। ময়ূর বানাও। কাগজ ধরিয়ে দিল রূপকথা।

নাও, এবার মেয়েকে সামলাও। ময়ূর চাই ওর। অপাঙ্গে তাকিয়ে অর্ণবের উদ্দেশে তিস্তা বলল।

কিন্তু আমি যে কাগজের ময়ূর বানাতে জানি না। কী হবে এবার? রূপকথা মযূর আর নৌকার অর্ডার দিয়ে বিজুর কাছে গেছে। বিজু নাকি তাকে মটরশুঁটি ভেজে খাওয়াবে।  

তাই তো! কী হবে! একটু পরেই রূপ এসে তোমার গলা জড়িয়ে বলবেÑ কই, মামণি আমার ময়ূর কই। কী করবে তখন, বলো তিস্তা! ওর শিয়রে সমন দেখে ঠাট্টা করছে অর্ণব।

তুমি না সত্যি বড় নিষ্ঠুর! আমার সমূহ বিপদ দেখে তুমি হাসছো! একটুও কষ্ট হচ্ছে না! এই না হলে বন্ধুত্ব! সে নাকি আবার আমাকে চিরদিনের সওয়ার করতে চায়! যেন কেঁদেই ফেলবে তিস্তা।

ঠিক আছে, আমাকে দাও। আমি বানিয়ে দিচ্ছি। আমি খুব সুন্দর ময়ূর বানাতে পারি। পেখমওয়ালা! দেখে মনে হবে যেন এক্ষুনি নাচতে শুরু করছে ময়ূর!   

যাক বাবা, বাঁচা গেল। চটপট বানিয়ে ফেলো তো অর্ণব। আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসছি।

হয়েছে, হয়েছে, আমাকে আর ঘুষ দিতে হবে না! এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ আমার একার পক্ষে রূপকে বড় করা সত্যি সম্ভব নয়। ওর তোমাকেও চাই। আমি ময়ূর, আর তুমি নৌকো বানিয়ে দেবে।

ছিঃ ছিঃ কী লজ্জা! কী লজ্জা! তুমি একটা পাজির পা ঝাড়া! ইনিয়ে বিনিয়ে সেই এক কথা! বলেছি না আমার সময় চাই। একদম তাড়া দেওয়া চলবে না। কথায় বলে, লুক বিফোর ইউ লিপ! আমি বুঝব কখন লাফ দিতে হয়! খুবজোর ধাক্কা দিলে আবার সেই ফুটপাতে হুমড়ি। রাত জেগে তখন আমার সেবা করতে হবে। পারবে, নাকি রাত বাড়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে যাবে তুমিও।

একটা চান্স দিয়েই দেখো না তিস্তা! কবিরা কেবল আকাশ দেখে না, ভালোবেসে প্রিয়জনের পাশে রাত জাগতে জানে!

তার মানে তুমি চাও আমি ফুটপাতে গড়াগড়ি খাই, কপাল ফাটাই। এমনিতেই অনেক কষ্ট আমার কপালে। আর উসকে দিও না প্লিজ। অত লোভ দেখালে হয়তো তোমাকে কাছে পাবার জন্যই শখ করে মাথা ফাটিয়ে বসব! তিস্তার কণ্ঠে তারল্য!

অর্ণব কিছু বলল না। অপলক তাকিয়ে দেখছে তিস্তাকে! কে এই মেয়ে! একে কী সে চেনে!

কী দেখছ অমন করে!

না, মানে ভাবছি। একটু আগের তুমি আর এখন… ঠিক মেলাতে পারছি না। কোনটা সত্যি বলো তো তিস্তা! এই তুমি, না সেই? 

যাও! কোনোটা নয়! আমি আমিই। কই, তোমার ময়ূর হলো! বিমুগ্ধ হাসির ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত তিস্তার মুখমণ্ডল। সেখানে এতটুকু আবিলতা কোনো!  

হলো মানে, এই দেখো ময়ূরের কী সুন্দর ডানা! জাস্ট উড়ছে। অর্ণব বলল।

তার মানে জীবনে তুমি কোনোদিন ময়ূর দেখনি!

দেখিনি মানে! হোয়াট ডু ইউ মিন? একশ’ বার দেখেছি। ময়ূরের পিঠে চড়ে আমি আকাশে উড়েছি!

সেই জন্যই তো বললাম, তুমি ময়ূর দেখনি অর্ণব। ময়ূররা উড়তে জানে না। কিন্তু বড্ড অহংকারী।

এই যা! ভুল করে ফেললাম! জিভ কাটলো অর্ণব! ঠিক আছে, আমি আসছি। তর্কটা তোলা থাক। পরে আবার হবে। ময়ূর উড়তে পারে না তো কী হয়েছে! আমি তাকে উড়িয়েই ছাড়বো। দরকার হলে ময়ূরের লেজে গ্যাসবেলুন বেঁধে দেব।

এই, কোথায় যাচ্ছ তুমি! একটু বসো, আমি চা নিয়ে আসছি! নাকি কফি? উঠে যায় তিস্তা।

আর কোথাও যাওয়া হয় না ওর। কুরবকের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে হতবিহ্বল অর্ণব।

এগারো 

এর পরের অধ্যায় খুব সংক্ষিপ্ত! তবে ঘটনাবহুল!

তিস্তা প্রায় মন ঠিক করে ফেলেছিল। অর্ণব যখন এত করে চাইছে তাকে মিছেমিছি কষ্ট দেওয়া কেন! বেলা শেষে আরেক বার না হয় দিবাস্বপ্নে বিভোর হবে! অর্ণবের চোখে আকাশ দেখে যদি স্বস্তি মেলে তো কিসের ক্ষতি! তিস্তা কী চায় সেটা বড় কথা নয়, অর্ণব চাইছে। ভীষণভাবে চাইছে রূপকে ছেড়ে যেন সে না যায়! অন্তত রূপকথার দিকে তাকিয়ে হলেও তিস্তা থাক।

অভিনয় নয়, তিস্তা বুঝতে পারে অর্ণব অভিনয় জানে না। সে যা বলে হৃদয় থেকে বলে। মনের কথা চোখেমুখে স্পষ্ট বিম্বিত ওর!

সব ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু একটা ঘটনা পুরো ব্যাপারটা ওলটপালট করে দিল।

তিস্তা আবার স্কুলে জয়েন করেছে। ভয়ে ভয়ে সে স্কুলে যায়, বাচ্চাদের পড়ায়। ওদের মাঝে খুঁজে নেয় রূপকথার মিষ্টি মুখচ্ছবি। অর্ণবের সাথে সে অলরেডি কথাও বলেছে। ছ’মাস পরে কথাকে স্কুলে দেবে। তিস্তার সাথে রোজ স্কুলে যাবে রূপ, অবসরে হৈ-হুল্লোড়, খেলাধুলা, ছবি আঁকা! বেশ সময় কেটে যাবে। ওর প্রস্তাব শুনে অর্ণবও যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। এমন মিষ্টি মেয়েকে কী করে সে একলা ছেড়ে দেবে!   

সামনে রূপকথার জন্মদিন। জন্মদিনে কী দেবে তাই ভাবছে তিস্তা। স্কুলশেষে সরাসরি বাসায় না গিয়ে নিউমার্কেট নামল। কিছু খেলনা, একটা স্কুলব্যাগ আর এক বক্স চকোলেট কিনবে ঠিক করেছে। দিন দিন জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে মধ্যবিত্তের পক্ষে হয়তো আর কেনাকাটা করা সম্ভব হবে না! ছোট একটা স্কুলব্যাগের দাম পাঁচশ টাকা! বাজেটের চেয়ে যথেষ্টই বেশি! কিন্তু রূপকথার জন্য সব করতে পারে তিস্তা। প্রায় ঘণ্টাখানেক ঘুরে কেনাকাটা সারলো। অর্ণবের জন্য কিনল একটা বই। শঙ্খ ঘোষের কবিতা সমগ্র। বড্ড ভালো লেখেন ভদ্রলোক। তাঁর কবিতায় জীবন আছে, জীবনের জয়গান আছে।

কেনাকাটা সেরে নিউমার্কেটের তিন নম্বর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তিস্তা। অটোরিকশার জন্য অপেক্ষা করছে। ঠিক তখনই  লোকটাকে চোখে পড়ল তিস্তার।

আসফাক! সাথে সেই হুকোমুখো গুণ্ডাটা!

ভরদুপুরে ও এখানে কেন! কেন এসেছে! তিস্তাকে দেখতে পায়নি তো! ওর মুখমণ্ডল ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ভয়ে। গলা শুকিয়ে কাঠ! আতঙ্কে চোখ বুজলো তিস্তা। যেন চোখ খুললেই তাকে ধরে ফেলবে আসফাক! চট করে একটা গাড়ির পেছনে লুকিয়ে ফেলল নিজেকে।

আশপাশে অনেক লোক। কারও সাথে বাচ্চা, শপিংব্যাগ। প্রত্যেকে কোনো না কোনো যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছে। দিনদুপুরে ওকে দেখতে পেলে তুলে নিয়ে যাবে আসফাক! এত্ত সাহস ওর!

কোনো বিশ্বাস নেই, আসফাক তা করতেও পারে। একটু পেছনে সরে এসে তিস্তা দেখল আসফাকের হাতে একটা প্যাকেট। কিসের প্যাকেট! হেরোইন নয় তো! সাথের ষণ্ডাটা ছুঁচোর মতো ছোঁক ছোঁক করছে। খুনে চোখে দেখছে চারপাশ! নাকি তিস্তাকেই খুঁজছে! কে জানে কতক্ষণ ধরে ফলো করছে তাকে! আসফাক বোকা নয়। মাঝরাস্তায় অ্যাটাক করলে হয়তো ধরা পড়ে যাবে। তাই চোরের মতো অনুসরণ করছে।

মরিয়া হয়ে অটোরিকশা ডাকল তিস্তা। তাকে দেখতে পাক বা না পাক, সে এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। সহসা চোখে চোখ পড়ে গেল ওর! আসফাক দেখতে পেয়েছে তিস্তাকে। মাঝখানে চার-পাঁচটা গাড়ির ফারাক। ঘামতে শুরু করেছে তিস্তা। এমনভাবে তাকাচ্ছে ওর দিকে আসফাক যেন হিপনোটাইজ করে ফেলবে। তিস্তা চোখ নামিয়ে নিতেও ভুলে গেল। কী করবে তাই বুঝে উঠতে পারছে না। পালাবে! কিন্তু কীভাবে! লোকাল বাসে ওঠার উপায় নেই। বড্ড ভিড়!

আসফাক ওকে কাছে আসতে ইশারা করল! এবার ষণ্ডাটাও দেখতে পেয়েছে তিস্তাকে। কী যেন বলছে। হয়তো অনুমতি চাইছে সবার চোখের সামনে তুলে নিয়ে যাবে কিনা! হাত-পা কাঁপছে ভীষণ। অর্ণবের জন্য কেনা কবিতার বই, রূপের খেলনা,  শপিং ব্যাগ হাত থেকে পড়ে গেল রাস্তায়। তিস্তার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে জোর করে উঠে পড়ল একটা সিএনজি অটোরিকশায়। আসফাকের চোখে স্পষ্ট দেখেছে খুনের আলামত।

শুনতে পেল পেছন থেকে কে যেন ডাকছে। পথচারী কেউ হয়তো ওর রেখে যাওয়া শপিংব্যাগের কথা বলতে চেয়েছে। নাকি পিছু নিয়েছে আসফাক! অটোরিকশা ছুটতে শুরু করতেই ওর কোলের ওপর এসে পড়ল এক টুকরো কাগজ। তিস্তা হতভম্ব! হতচকিত। ভাবতে পারছে না কিছু। সে নিশ্চিত জানে, আজ আর ওর রক্ষা নেই। আসফাক নিশ্চয়ই হোন্ডায় চড়ে  পিছু নেবে। দেখে যাবে কোথায় আস্তানা গেড়েছে তিস্তা!

ভয়ে ভয়ে কাগজের ভাঁজ খুলল! লাল কালিতে লেখাÑ কোথায় পালাবে! আমি ঠিক তোমাকে খুঁজে নেব। আমি আসছি। বাঁচতে চাও তো ফিরে এসো। একবার বাগে পেলে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব!

তার মানে ওরা বুঝতে পেরে গেছে কোন এলাকায় থাকে তিস্তা। আর রেহাই নেই। ধরা তাকে পড়তেই হবে।

এবার উপায়! বার কয়েক পেছনে তাকাল তিস্তা। আবার মুখ ফিরিয়ে নিল। ওদের দেখা না গেলেও আশ্বস্ত হতে পারছে না।

বুদ্ধি করে একটা কাজ করল তিস্তা। রাস্তার মাঝপথে মার্কেটের সামনে থেমে ভাড়া মিটিয়ে নেমে এলো। তারপর আবার রিকশা নিল, সোজা পথে না গিয়ে গলির ভিতর দিয়ে যেতে বলল। রিকশায় যেতে যেতে ভাবছে, এবার কী করবে সে! কী করা উচিত! অর্ণব তাকে ভালোবাসে সন্দেহ নেই। ও না থাকলে রূপ ভীষণ কষ্ট পাবে তিস্তা জানে। কিন্তু সে যে নিরুপায়!

তিস্তা পালাবে!

পালাতেই হবে তাকে। জানের মায়া থাকলে ঢাকা শহর ছাড়তে হবে। অন্তত কিছু দিনের জন্য হলেও।

বাসায় ফিরে সে হাঁপাচ্ছে। ত্রস্ত হাতে দু’কলম লিখে খামে ঢুকিয়ে নিল তিস্তা। তারপর রেখে দিল অর্ণবের টেবিলে। রূপ জেগে নেই। ও ঘুমাচ্ছে। যাক বাবা বাঁচা গেল। রূপ জেগে থাকলে ওর সামনে দিয়ে কী করে বেরিয়ে আসবে তাই ভাবছিল!

একটা ব্যাগে সামান্য কিছু কাপড় চটজলদি গুছিয়ে নিল। ওর কাণ্ড দেখে বিজু রীতিমতো বোকা বনে গেছে। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছে শুধু। তো তো করে কোনোমতে বলল, আপনি কোথায় যাচ্ছেন আপা! সাথে ব্যাগ!

কথা বাড়াস নে বিজু। আমি আসছি। আমার ভীষণ বিপদ। তোর ভাইজান এলে বলিস এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না আমার। আবার কবে দেখা হবে কে জানে! হয়তো আর হবে না কোনোদিন!    

এসব কী বলছেন আপামণি! কোথায় যাচ্ছেন আপনি? ভাইজান এসে খুব রেগে যাবে! বিজু বলল।

কিন্তু ওর কথা শোনার সময় নেই তিস্তার। দ্রুত রূপের ঘরে ঢুকে ওকে আদর করে দিল। শতচেষ্টা করেও নিজেকে সামলাতে পারেনি। তিস্তার গাল বেয়ে গড়িয়ে নামল দু’ফোঁটা টলমলে অশ্রু।   

অর্ণব এলো সন্ধ্যের পর। রূপ ততক্ষণে জেগে উঠেছে। বাপি বা আন্টি কাউকে দেখতে না পেয়ে কান্না শুরু করে দিল। বিজুর ভীষণ মন খারাপ! কারণ জানতে চাইলে সে বলল, আপামণি চলে গেছে।

চলে গেছে মানে! এসব আবোল-তাবোল কী বকছিস! কোথায় গেছে তিস্তা?  

বিজু চুপ। সে জানে না তো কী বলবে! অর্ণব ছুটে ওর নিজের ঘরে এলো। টেবিলের উপর একটা হলুদ রঙের খাম। ভিতরে চিঠি। তিস্তা লিখেছেÑ

   আমায় ক্ষমা করে দাও অর্ণব। বিশ্বাস করো, আমি সত্যি চাইনি এভাবে চলে আসতে। কিন্তু আমার যে আর কোনো উপায় ছিল না! আই’ম হেল্পলেস! ওরা আমার পিছু নিয়েছে। আমি চাই না তোমাদের কোনো বিপদ হোক! ভালোবাসি বলেই ছেড়ে আসতে হলো! রূপ রইল। ওকে দেখো। আমি যাচ্ছি, হয়তো আর ফেরা হবে না কোনোদিন। ভালো থেকো অর্ণব! সারাক্ষণ, সব সময়!

তোমাদের তিস্তা!    

 অর্ণব বসে আছে, কাঁদছে রূপ।

এবার সত্যি সত্যি একা হয়ে গেল অর্ণব। অনেকের মাঝে একা! ওর এই নৈঃসঙ্গ্য কেউ বুঝবে না। অনুভব করবে না কোনোদিন। তবু তো চলতে হবে। পথ যত দুর্গমই হোক। বন্ধু নেই, অথচ বন্ধুর দীর্ঘ পথ! কে জানে কী করে পাড়ি দেবে এই বিপ্রতীপ সময়! 

আরেকটা খবর এলো। তিস্তা চলে যাবার ঠিক দু’দিনের মাথায়!

নিপা ফিরে এসেছে। অর্ণবের বিয়ে করা বউ নিপা! যে একদিন স্রেফ ভালো থাকার জন্য তাকে ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিল প্রাচুর্যের দেশে!

নিপা এসেছে, তবে ওর সেই এলোমেলো দুর্জ্ঞেয় হাসিটি নেই। এসেছে নিপার লাশ!

সাদা কাফনে মুড়ে দূরদেশ থেকে উড়িয়ে দিয়েছে ওর সেই বন্ধু যার হাত ধরে নিপা ঘর ছেড়েছিল।

শোনা যায়, নিপা আত্মহত্যা করেছে। অর্ণবের ঠিক বিশ্বাস হয়নি। যে মেয়ে জীবনটাকে এমন বুভুক্ষুর মতো ভোগ করতে চেয়েছে, সে কেন মিছেমিছি আত্মাহুতি দেবে! অবশ্যি এ ব্যাপারে কোনো ঔৎসুক্য নেই অর্ণবের। নিপা গেছে, তিস্তাও গেছে, যাক না। রূপকথা ব্যাপারটা না জানলেই হয়! শুধু একটাই দুঃখ- নির্বোধের মতো জীবনটা স্রেফ যাপন করে চলেছে অর্ণব, উদ্যাপন করা আর হলো না!

 অরুণ কুমার বিশ্বাস : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares