উপন্যাস : ময়ূখ : হামিম কামাল

হামিম কামাল ।।

যখন কিঅছু বলি, বন্ধুরা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে খুব সাবধানে শ্বাস ফেলে। বাতাসে ওদের চুলগুলোই কেবল নড়ে, আর নড়ে চোখের মণি। ওরা আড়চোখে একে অপরকে দেখতে চেষ্টা করে, বুঝতে চায়- সবাই তার মতো চুপ করে আছে নাকি একটু-আধটু নড়ছে চড়ছে। এতে করে মাঝে মধ্যে ওদের মন আমার কথার ওপর থেকে সরে গিয়ে ওই এলোনা-বেলোনা খেলার কাঁধে চড়ে বসে। তখন ওদের আরও বড় বিপদ। কেন? কারণ নড়াচড়া আমার গায়ে সয়, কিন্তু ওই পরেরটা, প্রাণেরও অসহ্য। যাই খেপে।

খেপলে আমি চুপ করে যাই, থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার নাকের পাটা কাঁপতে থাকে, নিচের ঠোঁট কাঁপতে থাকে, আমি ঘন ঘন এ-পা ও-পা করতে থাকি। আমার পা দুটোর যে কোনোটি মেজাজের সঙ্গে বিদ্রোহ করে। করবেই। কীভাবে? গোড়ালির কাছে বা পায়ের পাতায় তখনই চুলকাতে শুরু করে। চুলকে নেওয়ার জন্য ঝুঁকলেই আমার কড়া ভাবটা খসে পড়বে, তাই নড়তেও পারি না। তখন বন্ধুদের ওপর ক্রোধটা জমে দ্বিগুণ। আমার নাকের ফুটো দিয়ে গরম হাওয়া বের হতে থাকে, মাথার পেছনের চুল খাড়া হয়ে যায়। প্রায় ওদের কাঠের পুতুল বানিয়ে আমি মাথা ঘুরে পড়ে যাই। তাতে ঝামেলা ওদেরই পোহাতে হয়। আমার ভারী শরীরটা সারা পথ বয়ে নিয়ে, আবার ছয়তলার ওপরে উঠে আমাকে রেখে আসতে হয়। দিনার ধমক শুনতে হয়। বেচারারা কষ্টও করে, আবার ধমকও শোনে।

দিনাকে আমি ভালোবাসি আর সেও আমাকে ভীষণ। যদি কখনও দেখে আমার কোনো অসুবিধা হয়েছে তো ওর কাছে সারা পৃথিবী দোষী হয়ে পড়ে। তখন কেউ ওর রাগ থেকে রেহাই পায় না, আমার বন্ধুরা তো নয়ই। এদিকে আমার এই বন্ধুরা তারও বন্ধু বলে সাড়ে সর্বনাশ। যদি ওরা তারও বন্ধু না-হতো তাহলেও ভদ্রতার খাতিরে হয়ত ছাড় পেতো। কিন্তু এখন কোনো ছাড় নেই।

ইচ্ছে করেই চোখ দুটো বন্ধ রেখে আমি মজা করে সব শুনতে থাকি। আর আমার বন্ধুদের অপরাধী অপরাধী মুখগুলো চোখ পিটপিটিয়ে দেখতে থাকি। একবার একজন দেখে ফেলল আমি চুপ চুপ করে ওদের দেখছি। এরপর তেড়ে মারতে এলো। যাকগে, এই যে শীত নেমেছে আর মানুষও গায়ে চমৎকার নকশা করা উলের জামা চড়িয়েছে, দেখে আমার মনে প্রথমে কী ভাব জাগছে তা বলি। হিংসা।

মানুষ যখন হিংসা করে, তার দাঁতের ধার বেড়ে যায় নখ চোখা হয়ে ওঠে, কিন্তু আমার লাগে অসহায়। তখন কমলের সঙ্গে এক কাপ চা খেতে হয়, কিন্তু কমল এখন এখানে নেই। কোথায় কমল- সে অনেক কথা, তার সব আসলে আমি জানিও না ঠিক। তো যা বলছিলাম- উলের জামা ছোটবেলা থেকেই পরতে পারিনি আমি। সারা শরীর কুটকুট করত, ভারি অসুবিধা। এর ফলে উল যে আমি অপছন্দ করতে শুরু করেছিলাম তা কিন্তু নয় বরং মাঝে মাঝে পরতে ইচ্ছে করত খুব, কারণ এসব জামায় চলতে ফিরতে অসুবিধায় কম পড়তে হয়, আর আমার তো দ্রুত চলাফেরা করতে হয়। কেন? তা যদি বলি লোকে এখনই বুঝবে না, তবু বলে রাখি। আজ না হয় না-ই বুঝল, কিন্তু কাল, যখন আরও বড় হবে, হয়ত অনুমান করতে পারবে। আমি খুব দ্রুত চলি, যেন আজকের শিশুরা বড় হয়ে একটু ধীরে-সুস্থে চলতে পারে। ধীরে-সুস্থে বলতে একেকজন গদাই লস্করি চালে হেলেদুলে চলবে, তা নয়, বরং যেন তাদের মনের ভেতর শান্তি থাকে, মনে নিরাপত্তার বোধ থাকে, অসুখ-বিসুখ না করে, অভাবে না পড়ে। জীবনের ধারে হাত-পা কিছুই কাটেনি এখনও ওদের। ওই পরিবেশটা থেকে এখনও মাথা বাঁচিয়ে চলতে পারছে কারণ অবলম্বন আছে। কিন্তু এই অবলম্বন সরে যাবে? সেই দিন আসছে শিগগির।

যা বলছিলাম, এই শীতে, উলের জামা পরতে পারি না বলে আমাকে পরতে হয় খদ্দরের চাদর। আর এই চাদর আমার দ্রুত চলা ফেরায় খুব বাধা দেয়। দিলে কী হবে, এই চাদর পরে যখন আমি হাঁটি, আমাকে দূর থেকে খুব সুন্দর দেখায়। দূর থেকে খুব রহস্যময় দেখায়, আমি জানি। তাই মেনে নিয়েছি। এই মেনে নিয়ে চাদর পরতে পরতে জিনিসটার ওপর আমার মায়াও পড়ে গেছে। মানুষ যে জিনিসটাকে নিজের করে পায়, তা জীব হোক আর জড়ই হোক, তার ওপর তার মায়া পড়ে যায়। চাদরটার অনেক যত্ন নিতাম। প্রতিদিন বাইরে থেকে এসে ধুলো ঝেড়ে ওটাকে খাটের হেলানে নেড়ে দিতাম, তার কিছুক্ষণ পর ভাঁজ করে আমার চেয়ারের হেলানে রাখতাম, অর্থাৎ সারাক্ষণ সে আমার ছোঁয়া পেত এবং আমিও তার। খুঁজে না পেলে গোটা ঘর ঘেঁটে হয়রান করে ফেলতাম, পেলে তাকে শরীরে জড়িয়ে ঘ্রাণ নিতাম, আর ঘর থেকে বেরোনোর আগে সুগন্ধি ছিটাতাম তার গায়ে।

কিন্তু এসব আবার উশুলও হয়ে যেত।

কোথায় যেত না ওটা আমার সঙ্গে? আর কখন-ই বা নয়? যেহেতু গরমে আমার ঝোলায় সে আছে, শীতে তো বটেই, সুতরাং রংপুরে হোটেল ঘরের মেঝেতে শুতে হবে, চাকার মতো গোলক পাকিয়ে বালিশ বানিয়ে মাথা রাখলাম; বরিশাল যাচ্ছি, এক টুকরো শোয়ার জায়গা পেয়েছি লঞ্চের ইঞ্জিনঘরের ওপর, বা নোয়াখালি যাচ্ছি ছাদে, পেতে শুয়ে পড়লাম; হয়ত খোলা মাঠে বা কোনো ঘরের দাওয়ায় বা ভাঁড়ারে মাদুর পেতে ঘুমোতে হচ্ছে কাঁথা নেইÑ দিনাজপুর, নরসিংদী, চট্টগ্রাম কি ভূষণা- চাদরটা গায়ের ওপর চাপিয়ে ঘাড়-গলা গুঁজে খাদির ওমে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়লাম; লাগলো তো হলো দড়ি, প্রয়োজনে আহতের খাটিয়া, কখনও মাথার পট্টি, আবার প্রাণ বাঁচাতে ছদ্মবেশ! পরতে পরতে নোংরা হয়ে যেত।

বাড়ি ফিরে নিজেই ওটাকে ভালো করে ধুয়ে নিংড়ে বারান্দায় নেড়ে দিতাম। ওখানে আমার টবে দুটো অপরাজিতা ফুলের গাছ ছিল, আজও আছে। আমার চাদর ধোয়া জল যেন টপটপিয়ে ওদের ওপর না পড়ে সেদিকেও আমার চোখ থাকত। কারণ ওই গাছ দুটোকেও আমি নিজের করে পেয়েছিলাম। আর ওরাও আমাকে ওদের বলে জানত, আজও জানে। ওদের জন্যও আমার অনেক মায়া, আর আমার জন্যও ওদের। আমি ওদের যত্ন নিই খুব আর ওরাও আমাকে ভালোবেসে ফুল ফোটায়। নীলচে বেগুনি আর সাদায় মেশানো ভারি অপূর্ব সেই ফুল!

আমার একটা অদ্ভুত বিশ্বাস হচ্ছে, লাল সূর্যের দেশ পৃথিবীতে মানুষ এসেছিল নীল সূর্যের দেশ থেকে, অনেক অনেক দিন আগে, আর পৃথিবীতে তাদের প্রথম সন্তানের মা ছিল অপরাজিতা ফুল। সেই ফুল থেকে একটি মেয়ের জন্ম হয়েছিল, গাঢ় নীল তার গায়ের রং।

চাদরের রং ছিল মেটে সাদা। সুরবাংলার দক্ষিণ পূর্বে কুমিল্লার কোনো এক দরদি তাঁতি চাদরটা বানিয়েছিলেন। ওখানে ভালো খাদির কাপড় হয়। আমার চাদরটা ছিল পুরু খাদির, কিনার ধরে টানা কালো রেখার নকশা করা, দেখতে ছিল খুব সাধারণ। কিন্তু ওই যে ওটাকে আমি নিজের করে পেয়েছিলাম, তাই আমার চোখে ওটা দেখাত অসাধারণ, ভারি সুন্দর। তো এখন কোথায় আমার সেই চাদর? মসৃণ উলের যে দামি চাদরটা এখন গায়ে দিয়ে বসে আছি সেটাও বা কোত্থেকে এলো।

দ্বিতীয়টির উত্তর এখনই দিচ্ছি। কিন্তু প্রথমটির উত্তরে অনেক কথা বলা দরকার।

সর্বশেষ আমি আর আমার বন্ধু কমল উত্তরের হাতিশুঁড় জেলার নলদমন্তী গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলাম। খুব জংলা মতন জায়গা, জেলা শহর ছাড়িয়ে আরও উত্তরে পাহাড়সারি, ঘন বন। উত্তরের পাহাড়ি এলাকায় কলা, আনারস আর দক্ষিণের সমতলে ধানের চাষ হতো বেশি। আমরা এক গরিব ধানচাষির মাটির ঘরে ছিলাম। কিছুদিন থাকতেই নলদমন্তীর পাহাড়ঘেরা ঝলমলে আলো, বনের ঘ্রাণভাসা বাতাস, সাদাসিধে শ্যামল মানুষ আর পথে পথে ঘুরতে থাকা লাল তামাটে ঘোড়াগুলোকেও যেন আমি নিজের করে পেলাম, পড়লাম মায়ায়।

আমার ছিল ঋষির মতো বড় গোঁফ দাড়ি চুল, পরনে পাঞ্জাবি-পাজামা। আর কমলের চুল ছোট করে ছাঁটা, পরনে শার্ট-প্যান্ট। আমার গায়ের রঙ ছিল পুড়ে তামাটে, আর কমলের ঝলমলে সাদা, চাঁদের আলো মতো। আমারও বড় বড় চোখ দুটো নিষ্প্রাণ। কমলের চোখ জলে ভিজে ঝিকমিক করত, মনে হতো চোখে তারার আলো ধরা আছে। ফলে মানুষ আমাকে সাধু মনে করে যতন করল, কিন্তু মানল কমলকে।

আমাদের কুঁড়ে থেকে মিনিট পনেরো দক্ষিণে হাঁটলেই ছিল সরকারি কৃষি দপ্তর। সামনে আধভাঙা পিচ ফেলা রাস্তা, আর বাকি তিন দিকে দপ্তরের কেনা বিরাট ফসলি মাঠ। মাইলখানেক উত্তর-পশ্চিমে ঢেউ খেলানো কালো পাচিলের মতো গারো পাহাড়ের সারি।  জায়গাটায় হাতির দৌরাত্ম্য। উত্তরের কলা আনারস ক্ষেতে হাতি হামলা করত তো বটেই, ওরা তো একেবারে তোপের মুখে; ফসল পাকলে দক্ষিণের ধানক্ষেতও এসে তছনছ করত। কোনো বাড়িতে আলো জ¦লতে দেখলে সেখানেও এসে হামলা চালাত।

এরও কয়েক দশক আগে লোকের কুঁড়েঘরের সামনে দিয়ে পা টেনে টেনে লেজ উঁচিয়ে হেঁটে যেত চিতাবাঘ। মানুষের তাড়া খেয়ে এখন ওরা দূরে সরে গেছে। কিছু চিতা আবার ছাল পাল্টে হয়েছে মেছো বাঘ। 

হাতির আক্রমণে তটস্থ মানুষের আবেদনে বিদ্যুৎ দেওয়া কাঁটাতারে এখন অনেকটা অঞ্চল ঘিরে রেখেছে সরকার। ওই তার কেউ স্পর্শ করামাত্র দুষ্টু মানবশিশু থেকে হাতি একটা ঝাঁকুনি খেয়ে পিছু হটে। তবে সারাক্ষণ বিদ্যুৎ লাগিয়ে রাখা সম্ভব হয় না বিধায় মাঝে মাঝে হাতিরা কাঁটাতার উপড়ে ঢুকে পড়ে। পেছনে হাসতে হাসতে আসে দুয়েকটা নেকড়ে শেয়াল।

কিন্তুÑ শুঁড় দাঁত, আর পেশিসর্বস্ব অবোধ প্রাণীর চেয়ে চাষিদের বেশি ভয় একশ্রেণির স্বজাতিকে। 

হাতিরা ফসল খেয়ে যেত সে পুরনো কথা, কিন্তু ক্রমে খ্যাপা হয়ে উঠে রাতবিরাতে মানুষের বসতিতে হামলা চালাচ্ছে- এটা নতুন। চাষাদের ওই স্বজাতি ভূমিদস্যুরা বন-পাহাড়ে আগুন দেয়, গাছপালা সব কেটে নেয়। হাতি ধরার ফাঁদ পাতে, শুঁড় কাটে, দাঁত কাটে।

বন্যরা মানুষের আদালত ব্যবহার করে না, করে প্রকৃতির আদালত। মানুষের মতো সরাসরি কিছু করে না প্রকৃতি। বিচারপ্রক্রিয়া স্থায়ী ও কার্যকর হলেও দীর্ঘসূত্রী। দীর্ঘসূত্রতার ওই অবকাশে মানুষের একজীবন কেটে যায়। আর পিতা দণ্ডিত না হয়ে সন্তান দণ্ডিত হয়।

আরেক শ্রেণির মানুষ কিন্তু আছে, ঐরাবতের যারা বন্ধু। ওদের ওপর যে অন্যায় হচ্ছে তা বুঝতে পারে, মনে মনে ওদের কাছে হাতজোড় করে দাঁড়ায়। ওই মানুষগুলোকেও চিনতে পারে হাতিরা। বনের ধারে বা গভীরে ওদের পেলে ঘ্রাণ শুঁকে চিনে নেয়। কখনও কান দোলায়, কখনও পেছনে পায়ে ভর দিয়ে বসে বসে শুঁড়টা এগিয়ে দেয়, আর মানুষ বাড়ায় হাত। শেষে ওরা কপালে কপাল ঠেকিয়ে পরস্পরকে প্রণাম করে।

কৃষি দপ্তরের জমিগুলো এখানকার সাধারণ বোকাসোকা কিছু মানুষের সম্পত্তি ছিল। যেখানে বোকাসোকা আছে, বিবর্তনের নিয়ম অনুযায়ী ওদের বোকামি ভাঙিয়ে খাওয়ার ধূর্ত মানুষও সেখানে আছে। ওই ধূর্ত শ্রেণির মানুষেরা উর্বর জমিগুলো নিয়ে খুব বিবাদ সংঘাত বাঁধিয়ে রাখত। লাঠি কোঁচ কিরিচ হাতে নিয়ে মুখে কাপড় বেঁধে রাতবিরাতে বোকা লোকগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, বিচিত্র সব উপায়ে বীজতলা নষ্ট করে দিয়ে যেতÑ হয়ত দিলো বালি ছিটিয়ে, হয়ত পাকা ধানে দিলো মই।

এসবে ওদের কোনো ক্লান্তি ছিল না। ওদের দাবিরও কোনো শেষ ছিল না। বোকা মানুষগুলো ক্লেশ সহ্য করতে না পেরে একসময় চোখের জল মুছে দাবি ছেড়ে বসতি উঠিয়ে দূরে চলে যেত।

আমার বিশ^াস, প্রকৃতি একসঙ্গে দুটো নীতি মেনে চলে- চক্র আর ভারসাম্য। এই নীতি দুটি নিজস্ব নিয়মে চলে বলেই মানুষের মনে ক্রমাগত সৌভাগ্য, মন্দভাগ্য, শাস্তি, প্রায়শ্চিত্ত এসব ধারণার বিভ্রান্তি জন্মে। এই বিভ্রান্তির বরফ মনের ঢাল গড়িয়ে নামে আর আকারে বড় হয়।

অন্ধ প্রকৃতি খারাপদের ধরে শাস্তি দেয় আর ভালোদের কোলে তুলে বর দেয়- ব্যাপারটা যে এমন নয়, তা ধরতে আমার সময় লেগেছে। আমি বুঝেছি, সে কেবল চক্র পূর্ণ করে, আর প্রতিষ্ঠা করে ভারসাম্য। বোকা, নির্বিরোধী মানুষদের তাড়িয়ে সম্পদে ফেঁপে ওঠা লোকগুলো মন্দ বলে নয়, বরং তাদের কাজের ধারার সহজাত প্রতিক্রিয়ায়, হিংসা আর ঠগবাজিতে নিজেরা নিজেরা লড়ে ওরা শক্তিক্ষয় করে ভারসাম্য গড়ল। চক্র তখনও পূর্ণ হয়নি।

কালক্রমে তাড়িয়েদের বংশধরেরা পরিণত হলো বিতাড়িততে। সেদিন চক্র পূর্ণ হলো। হ্যাঁ, সেদিন পূর্ণিমা রাত।

শহরে তো পূর্ণিমা বলে আলাদা করে কিছুর বোঝার উপায় নেই। কারণ সেখানে উটকো আলো, বাছবিচারহীন, স্থানে অস্থানে জ¦লছে। মাঝেসাঝে আকাশের দিকে মুখ যারা তোলে, তারা ভাবুক গোছের লোক। আবহাওয়ার মাপা দপ্তরি খবরের বাইরে যেটুকু অপ্রয়োজনীয় ভাবের খবর আছে, তা কেবল ভাবুকদের কথা থেকে পাওয়া যায়। ওরা বলে, আজ পূর্ণিমা, আজ অমাবস্যা; অথবা বলে, আজ সন্ধ্যাতারার খোঁজ করে লাভ নেই, বলে, আকাশে আজ কালপুরুষ দেখা যাচ্ছে, বিশাখা জ¦লজ¦ল করছে! আর কী বলে? বলে, আজকাল রাতেও খুব লাল হয়ে আছে আকাশ, লক্ষণ ভালো নয়! এইসব হেঁয়ালিপনা- হাহাহা!

ঢাকার মধ্যবিত্ত শহুরেরা স্মৃতি থেকে পূর্ণিমা বোঝাতে গিয়ে বলে- ওই যখন শহরময় লোডশেডিং, মনে আছে? তখন সুযোগ হলে ছাদে গিয়ে, একটু হেঁয়ালি করেই বলি, যখন দেখতে পাওয়া যায় ভুতুড়ে কত রকম অবয়বে ছাওয়া ধূসর মাটির মতো রাস্তাঘাট, কিংবা, রাতে যখন আবর্জনা জমে ঢাকা পড়া ডাস্টবিনের দিকে তাকিয়ে বর্জ্যগুলোকেও মায়াবী ঠেকে, তখন তোমার চাঁদমুখটা তুলে আকাশের চাঁদ খুঁজতে গিয়ে চোখে পড়েছিল আস্ত ওই উপগ্রহটা, রুপালি, ঝকঝকে- মনে নেই?

এদিকে, নলদমন্তীর গ্রামে জোছনা নামলে কী হয়? গ্রামের মাঠের পর মাঠ, বনের পর বন চাঁদের আলোর বেনোজলে থৈ থৈ করতে থাকে, ছায়ারা সব একে একে শরীর পায় আর শরীরগুলো পায় ছায়া, অদৃশ্য সাদা কবুতর ঝোপেঝাড়ে আটকা পড়ে তাদের অপূর্ব ডানা ঝাপটায়, বৃক্ষের নিচে আলো আর কালোর অদ্ভুত নকশা সব নড়ে চড়ে ওঠে, দূরে মাঠ ভেঙে এঁকে বেঁকে বয়ে যায় দুধের নদী, জল ডাকে, বন ডাকে! সৌন্দর্যের ভেক ধরে থাকা মৃত্যুর যত পাতা ফাঁদ, ডাকতে থাকে সব, একসাথে। কুয়াশা ওই ফাঁদের মায়াবী আড়াল।

এমনই এক জোছনা রাতে আমরা দুই বন্ধু হাঁটতে বের হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম জোছনাটা উপভোগ করতে পারব। আর হয়নি।

তখন মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহের কোনো এক দিন। কমলের মা তাকে ফোন করেছিলেন এর ক’দিন আগে। ফোনের অপর পাশে পৌষ-সংক্রান্তির উৎসবের পর গ্রামে তখন রাত নেমেছে। মায়ের ভেজা কণ্ঠে অভিযোগ, এমন একটা দিন, তোরা দুটি ভাইয়ের কেউ আমার কাছে নাই।

কমলের ছোট ভাই, সেলিম। বয়সে বছর পাঁচেক ওরা বড়-ছোট, তবু ঘনিষ্ঠতাবশত পরস্পরকে নাম ধরেই ডাকে। হাতিশুঁড়ে আমাদের সঙ্গে সেলিমেরও আসার কথা ছিল পাকা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কলেজে ওর পরীক্ষার তারিখ পড়ে গেল, আর পারল না।

ওদের কলেজে ছেলেপুলেরা রাজনীতির নামে অস্ত্র নিয়ে নষ্টামি করে বেড়ায়। রাজনীতির র-ও বোঝে না, বোঝে ক্ষমতার ওম। উম, ভারি আরাম। কিন্তু ওই ওম হলো গিয়ে থাবার ওম। থাবাতে লুকানো থাকে ধারাল নখর। নখের আঁচড় নিজের বুকে পিঠে পড়ার আগে ওরা বিপদ টের পায় না। ক্ষমতাবানদের হাত খুব কোমল হয়। ওই কোমলতার ব্যালেন্সও ওরা রক্ষা করে। সহজের বিপরীত যদি হয় জটিল, তাহলে কোমলের বিপরীত হবে রূঢ়। ওই রূঢ়তাটা ওরা এমন ভাবে দেখায় যে পাল্টা রূঢ়তা আসারও ভয় করে, ঠিক যেমন খুনির থাকে খুন হয়ে যাওয়ার ভয়। ক্ষমতা থেকে কেউ যেন তাদের নামাতে না পারে, ওরা সে ভাবনাতে বুঁদ হয়ে থাকে, মরিয়া হয়ে থাকে, সারাক্ষণ। কাউকে নামাতে হলে তো তাকে আগে ধরা চাই, সুতরাং, কেউ যেন তাকে ধরতেই না পারে, সে সেই ব্যবস্থা করে। সে কিছু দাঁতাল পোষে, যারা তার ক্ষমতার কুটোটা কাঁটাটা কুড়োবে, আর ফুর্তির খোরাক পেলেই ধেই ধেই করে নেচে নেচে প্রভুত্ব কবুল করবে।

ওদের নাম দিলাম- অর্বাচীন উল্লুক।

ওই সমস্ত অর্বাচীন উল্লুকদের দল কিন্তু এসে ঠিকই জুটে যায়। ওরা ক্ষমতাবানদের ফুটফরমাশ খাটে আর টুকটাক ফায়দা পায়, তাতেই ধেই ধেই লাফ মারে। ভাবে নেতার সাথে থেকে সেও বড় নেতা হয়ে উঠেছে, রাজার সাথে থেকে থেকে সেও হয়ে রাজা- রাজা না হোক অন্তত গজা তো বটেই।

তো ওই অর্বাচীন উল্লুকদের অনেক রকম আস্তানা আছে। আর সবের কথা থাক, সবচেয়ে ভালোটার কথা হোক। সবচেয়ে ভালো আস্তানাÑ কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়, যেখানে গাছের ঝরাপাতাও সব শিক্ষিত।

ওই দুঃশীল, রূঢ় কিন্তু নরম হাতের ক্ষমতাবানদের চোখ থাকে যত বিশ^বিদ্যালয়ের দিকে, যত কলেজের দিকে। সেখান থেকে ওরা পোষ্য সংগ্রহ করে। কারও হাতে দেয় ডাকাতির অস্ত্র, কারও হাতে দেয় সিঁদ কাটার যন্ত্র- দেখতে দুটো একই। অস্ত্রধারী ‘অর্বাচীন উল্লুক’ ওটা দিয়ে নির্দেশ মানতে, শোধ তুলতে, ভয় দেখাতে হুটহাট বেরিয়ে পড়ে। তখন ওদের দেখায় ভীষণ কদাকার। আমি ওদের দেখেছি। এ যাবত ওরাই আমার দেখা সবচেয়ে কুৎসিত।

যারা, ওদের হাতে অস্ত্রটা তুলে দেয়, ওরা কোথায়? গায়ে ভ্যানিশিং ক্রিম মেখে হাওয়া হয়ে ওরা পাশে পাশে চলতে থাকে। আর ইবলিশের মতো কানে কানে বলতে থাকে, ‘বাহ! এই তো আমার বাচ্চা বড় হয়েছে! কত বড় বড় দাঁত, কী সুন্দর দেখাচ্ছে! শাবাশ! তোকেই আমার চাই রে!’

সেলিম ওরকম শত শত দাঁতাল পোষ্যে গিজগিজে এক কলেজে পড়ে। বলা যায় এক সেলিম হলো সেই ব্যতিক্রম। ছেলেমেয়েদের ডেকে ডেকে সে প্রশ্ন করে কেবল, যেন সক্রেটিস। কোনো উত্তর পেলে ওই উত্তরকে ধরে ফের প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত কী হয়? ওদের দেওয়া কোনো উত্তরই আর নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে না, খোঁড়ার লাঠি নিয়ে দাঁড়ায়। সেলিম যখন ওই লাঠিও কেড়ে নিতে যায়, তখনই উত্তরদাতারা ওঠে খেপে! ওই লাঠি বাগিয়ে তখন সেলিমকে তাড়া করে ওরা।

সে অস্ত্র নিয়ে প্রশ্ন করে;

ধনী গরিব নিয়ে প্রশ্ন করে;

রাজনীতির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করে;

ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করে।

সবাই ওর প্রশ্নগুলো শুনে প্রথমটায় হাসে। পরে ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে যায়। একসময় খেপে উঠে চাপড়ে ঝাপটে ওকে রুম থেকে, টং থেকে, আড্ডা থেকে বের করে দেয়, দূরে সরিয়ে দেয়। কখনও হাসিঠাট্টায় শেষ হয়, কখনও তিক্ততায়।

হয়ত ক্যাম্পাসে অগ্রহায়ণের রোদ, টঙের কাছে একটা জোট জট পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আলাপের ঘোঁট পাকাচ্ছে, সেলিম সেখানে উপস্থিত। তাকে দেখেই সতর্ক হয়ে গেল সবাই। সেলিম বরাবরের মতোই নাটকীয় স্বরে বলে উঠল, ‘কী অপূর্ব আলো! এ আলোতে খুব সুন্দর ছবি তোলা যায়। বাহ, নবরত্নরা সব আছিস দেখছি। সুমন, সালেহীন, শওকত, আহির, মিহির, তাজরিন, মনিকাÑ আছ সবাই। চমৎকার! মহিউদ্দিন, জগদীশ, দীপ কেতকীও আছো! ভালো, ভালো। আরে কাশেম যে!’ এরকম। 

তো, ততক্ষণে সালাপ কণ্ঠগুলো আলাপ দিয়েছে থামিয়ে। এ কথায় সে কথায় সেলিম হয়ত সম্মোহনী ভূমিকা দাঁড় করালো, বরাবরের মতোই। এরপর প্রশংসা করল সবার। প্রশংসা করার মতো কোনো না কোনো গুণ প্রত্যেকেরই থাকে। যেমন সালেহীন গণিতে ভালো, মিহির ভালো আঁকে, কেতকী পরীক্ষায় রেকর্ড নম্বর পায়। এসব। সেলিমের গণিতে মাথা নাই, আঁকা যাচ্ছেতাই, নম্বরেও পেছনের দিকে, সুতরাং নিজ নানা অপারগতার কথাও কৌতুকী ঢঙে কিছু সে বলার সুযোগ পেল, কিছু উহ্য রাখল। সবাই শুনে গেল চুপচাপ।

সেলিম যখন কথা বলে, তখন কিন্তু তাকে বলতে না দিয়ে কারও উপায় নেই, কারণ চারপাশে কথার এত চমৎকার একটা আবহ সে তৈরি করে, আর কণ্ঠটাও এত ভরাট আর ব্যক্তিত্বপূর্ণ যে, কথা সে শুরু করলে শেষটা না শোনা পর্যন্ত কারও মুখে কোনো কথা জোগায় না। সেলিমের কথায় যারা আকৃষ্ট হয় এবং বিকৃষ্ট হয় দু’পক্ষই এটা মানবে। সবার সঙ্গে সেও তাল মেলাতে প্রথমে খেলা থেকে শুরু করে ক্লাস স্ট্যাটাস, এমনকি নারী-পুরুষের উপরিপাতন নিয়ে স্থূল রসিকতায় এক-আধটু হাসে, তারপর ধীরে ধীরে সবার আলাপই যখন কোনো না কোনো সংকটে গিয়ে থামে, তখন সুযোগটা নেয় সেলিম। কারণ তার মাথায় তো এটা আছেই যে, সে প্রশ্ন করবে, আর সংকট হচ্ছে প্রশ্ন ঢোকার ছিদ্রপথ।

একেক দিন একেকভাবে আলাপে ঢোকে সেলিম। হয়ত বলল, ‘শোনো, যতই সমস্যার আণবিক স্তরে তুমি যাবে, ততই সমস্যাটিকে দেখার জন্য, বোঝার জন্য তোমার অণুবীক্ষণ যন্ত্র দরকার হয়ে পড়বে। আর যার হাতে অণুবীক্ষণ যন্ত্র নাই, সে উঠবে খেপে, স্বাভাবিক। বলবে, ‘কই, কিছুই তো দেখতে পারছি না!’ সেই অণুবীক্ষণ যন্ত্র তোদের কোথায়?

‘কী বোঝাতে চাস।’

এটাই গড়াতে গড়াতে একপর্যায়ে হয়তো রব উঠল, ‘ধর বেটাকে!’

জায়গাটা ফোটালাম না, থাক, সামনে অনেক কথা যে!

না ব্যাপারটা ঠিক এমনও নয়, যাহোক, শেষ যেদিনের খবর পেলাম কমলের কাছে, সেদিন বাংলাদেশ আর পশ্চিমবাংলা মিলে সুরবাংলার আবির্ভাব থেকে কী করে যেন আলাপের শুরু। এরপর নানা রকম কথাবার্তা চলছে, সেলিম দেখছে অবস্থাগতিক সুবিধার নয়। দেখা গেল, ওর বন্ধুদের সবাইকে শেষ যেখানে রেখে গিয়েছিল সব সেখানেই আটকে আছে, যেসব বইয়ের নাম করেছিল কেউ উল্টেও দেখেনি, এবং উত্তর দেওয়া যত কঠিন, রাগ তত প্রখর। একপর্যায়ে দেখা গেল, জীবন ধারণের প্রশ্নে সবার উত্তরের বাতিটা ধর্মের বিদ্যুতে জ¦লতে শুরু করেছে, আবারও বলছি ব্যাপারটা জটিল, আর ওটাই হলো সবচেয়ে স্পর্শকাতর দশা, কারণ মানুষ তখন একদম কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।

এরপর প্রশ্ন চালিয়ে যাওয়া কঠিন, নিচে যে খাদ, একদম মারা পড়বে। অপঘাতে মৃত্যু হলে এরপর বেরোবে ভূত, সেই ভূত সামাল দেওয়াও খুব কঠিন হয়ে পড়বে। ভূতকে সামাল দিতে পারে ভূতই কেবল। সেলিম ভূত নয়, সে মানুষ। তবু সেলিম কি আর দমে? বলে উঠল, ‘আচ্ছা, সৃষ্টিকর্তা সে জাতিরই ভাগ্য বদল করে, যে জাতি ভাগ্যটাকে বদলাতে নিজে থেকেই উঠেপড়ে লাগে। তাহলে ঠেকাটা কোথায়। ভাগ্যে, না সৃষ্টিকর্তায়।

সেলিমকে কত বলেছি, ‘প্রশ্ন তোর ঠিক আছে, কিন্তু মানুষ এসব প্রশ্নের  উত্তর নিজ নিজ সুবিধামতো বুঝে নিয়েছে, এতদিন তারা বসে নেই। বাবারে, সত্য খোঁজে আর ক’জন? সবাই খোঁজে যা জানে তা যে সত্য সেই রেফারেন্স। বাবারে ভাবের জগতে অভাবের কোনো অস্তিত্ব নাই, এখানে ভাষায় করা সমস্ত প্রশ্নের ভাষায় গড়া উত্তর আছে। সুতরাং বাদ দে এসব। জানি, বাদ তুই দিতে পারবি না কারণ আমার এ কথারও প্রতিযুক্তি তোর আছে।’

সেলিম হেসে বলেছে, ‘দাদা, বাঁচলাম, তোমাকে বোঝাতে আর বাক্য খরচাতে হলো না।’  

বন্ধুদের ভেতর এসব হলে তো ভালো। আজ যুদ্ধংদেহী, কাল আবার সব মিটে যায়। রসিক সেলিমও আবার পুরনো স্থান, হারানো ভাবমূর্তি ফিরে পায়। কিন্তু অন্য জায়গায়? অন্য বহু বহু জায়গায় সে নতুন নতুন শত্রু তৈরি করে। কতবার বলেছি, মনে করো, তোর মুখ নেই। দুষ্টুটা বলে, ‘তাহলে কানও নেই। শুনলাম না তোমার কথা।’

পরীক্ষার নতুন তারিখ আবার কেন? কারণ ছাত্ররা পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত নয়, তাদের আরও সময় চাই পড়ার। তারা এখানে ওখানে টহল দিয়ে বেড়িয়েছে, নেতার হয়ে চাঁদা তুলেছে, লোক ঠেঙিয়েছে, গুম-পাচার করেছে, এখানে বাগড়া দিয়ে ওখানে দাবড় খেয়েছে; একদণ্ড জিরোতেও কোথাও পারেনি, পড়তেও নয়, তাই তাদের জন্য পরীক্ষা পেছাতে হবে। এ নিয়েও এক কাণ্ড!

পরীক্ষা পেছানোর জন্য ওরা মিছিল নিয়ে বেরিয়েছিল। ওদিকে কলেজে পাসকোর্সের ছাত্রছাত্রীরাও ছিল আন্দোলনে, তাদের আন্দোলনের বিষয় ভিন্ন, ওরা পরীক্ষার ফল পায় না আজ আট মাস, তাই পথে নেমেছে। কলেজ প্রশাসন ভাবল, প্রথম দল বরং কম ক্ষতিকর, দ্বিতীয়টা বেশি। কেন? কারণ কলেজের মান, সম্মান, বরাদ্দ, সব কিছুইতেই ওরা কষে দেবে টান, সুতরাং ওদেরই ফেরত পাঠাতে হবে আগে। পরীক্ষা পেছানোর আন্দোলন চলুক।

ফল দেওয়া তো দূরের কথা, দ্বিতীয় দলকে ঠেঙাতে পুলিশ পাঠানো হলো। কিন্তু এখানে একটা ভুল হয়ে গেল। পুলিশ চড়াও হলো প্রথম দলের ওপর।

ওদিকে দ্বিতীয় দলও খবর পেয়েছিল পুলিশ আসছে। যখন দেখল এই ব্যাপার, তখন ভাবল, ওরাও নিশ্চয়ই তাদেরই পক্ষে। একেবারে ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে এসব ব্যাপার বোঝা অসম্ভব, তো পড়ো ঝাঁপিয়ে। উল্টো ঘটনাও কত ঘটেছে। 

এক শ্রেণির তরুণ আছে, মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠলে ঝাঁপিয়ে পড়তে এরা কুণ্ঠিত হয় না। এরাই ভাসায়, এরাই ডোবায়। যা শক্তি, তা-ই দুর্বলতা। যা দুর্বলতা, তা-ই শক্তি।

সংকটটা কোথায়? দুই দলে আবার ভিন্ন দুই নেতার অস্ত্রধর পোষ্যরা ঢুকে পড়ল। এই হুটোপুটির সদ্ব্যবহার চাই; রাজনীতিতে সুযোগ পেলেই পুরনো শত্রুকে সাপটে দেওয়ার একটা চেষ্টা থাকে। কিন্তু বাবারা, সবার ওপর চেপে বসেছে রাজা ধুন্ধুমারের প্রেতাত্মা! সে এক বিদঘুটে হুটোপুটি, চিৎকার, যুদ্ধ। সাংবাদিক এসে তিন পক্ষেরই মার খেলো, ভাঙল দামি ক্যামেরা; বিদঘুটে এক প্রতিবেদন বের হলো। শৃঙ্খলা বজায়ে এসেছিলেন প্রক্টর, মিস্টার সামাদ। তিনি শিক্ষক বটেন, তবে তার গল্পও কম নয়। খানিকটা তার নাড়িঘটিত, অনেকটা তার নারীঘটিত। কলেজের শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা এ শিক্ষকের ভয়ে খুব ভীত থাকে কলেজের মেয়েরা, রাতে কখন যে কার ফোনে আসে তার ডাক! 

তো, দুই পক্ষই, ধুরন্ধর প্রক্টরের বাকচাতুরিতে আধমজা হয়ে, নতুন দুইটা তারিখ পেয়ে বাড়ি ফিরল। প্রথম দল- অর্থাৎ পরীক্ষা পেছাতে চাওয়া দলের চাওয়া তারিখটা পড়ল আমাদের হাতিশুঁড় যাত্রারও চার দিন পর, সুতরাং সেলিমের পায়ে পড়ল শেকল। আর আমরা শেকলছাড়া দুটি বন্ধু ভাবলাম, বিগত আরও অনেক বারের মতো রাতটা জোছনা দেখে দেব কাটিয়ে।

আবারও ফিরে আসি সেই রাতের গল্পে। বিরাট বিরতি নেওয়া হয়ে গেছে যাহোক।

তো- প্রথমত গ্রাম, দ্বিতীয়ত রক্তজমাট ঠাণ্ডা। কোনো দোকানপাট খোলা পাওয়ার সম্ভাবনা নাই, তাই কিছু হালকা খাবার সঙ্গে নিলাম। কৃষি দপ্তরের পথ দিয়ে যখন হাঁটছিলাম, সেলিমকে নিয়েই কথা হচ্ছিল। ওই পথ আর একটু দূর এগিয়ে উত্তর দিকে ফিরে যাওয়া আসল পথের সঙ্গে মিশেছে। কৃষি দপ্তরটা দেখা যেতেই আলাপ সেলিম থেকে ওই দপ্তরের কথায় মোড় নিলো। দেখতে দেখতে বিরাট এক গবেষণা মাঠের পাশে চলে এলাম। লোকমুখে শুনেছি, এখানে রবিশস্যের ওপর এবার একটা নিরীক্ষা চালানোর কথা ছিল, কিন্তু ভেতরে কে যেন নয়ছয় করেছে। প্রকল্পের টাকা সরিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে। নতুন করেও কোনো বরাদ্দও জোটেনি।

এর আগে উচ্চফলনশীল আশীষ ধান নিয়ে একটা নিরীক্ষা চালানো হয়েছিল। এই অগ্রহায়ণে আশীষ বাজারে গিয়ে উঠেছে, গ্রামের মানুষ আশীষধন্য হয়ে উঠেছে, আর মাঠ এখন পড়ে আছে খালি। কালচে ধূসর রঙের নাড়াগুলো কেমন যেন একটা ন্যাড়া করা মাথায় সদ্য গজানো চুলের মতো জেগে আছে, শক্ত, খরখরে। পথের দু’পাশে পড়ে আছে মরা ওষধি। উত্তরে দেয়ালের মতো পাহাড়ের ছবিটা তখন দেখা যাচ্ছে না। প্রশ^াসের সঙ্গে হিম ঢুকে ফুসফুস জমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

গবেষণা-মাঠ পেরিয়ে আরও অনেকটা পথ এগোলাম, কিন্তু কোন দিকে যে গেলাম তার কোনো উদ্দেশ পেলাম না, রাখলামও না। এমন আমরা প্রায়ই করি। এ নিয়ে আমাদের দু’জনের মধ্যেই ‘দেখাই যাক না’ ধাঁচের খেলোয়াড়ি মনোভাব কাজ করে, বিশেষ করে যখন শুধু আমরা দু’জন থাকি একসঙ্গে তখন।

হেঁটে হেঁটে একসময় দু’জনেরই পা ধরে গেল, তবে কথা শুনে মনে হলো, কমলের চেয়ে আমার অবস্থা বেশি খারাপ। দীনার সঙ্গেও এমন হয়। হাঁটতে হাঁটতে যখন আমার কোমর ধরে যায়, ও তখন হাসছে।

কমলকে বললাম, ‘আসো বসি কিছুক্ষণ। পায়ে বল না পেলে পাহাড়ের দিকে যাব কী করে! আচ্ছা, উত্তরে চলেছি তো?’

‘কে জানে। প্রথমে ঠিক ছিল হিসেব। শেষ এক ঘণ্টায় সব কেমন গুলিয়ে গেছে। আমি তো আরও ভাবলাম, তুমি হিসাব রাখছ। যাক, বসবেটা কোথায়?’   

পথের ওপর দুধ ঢেলে দেওয়া হয়েছে- মাটির এমন রঙ। দু’পাশেই আধমরা দূর্বার ছেঁড়া ছেঁড়া মাদুর, এরপর আলোর ঢাল গড়িয়ে যাকে বলে পতিত জমি। দেখে আমার মাথায় প্রশ্নটা এলো। ‘আচ্ছা, এখানেও জমি এমন পড়ে আছে কেন?’ 

‘এখানকার মানুষ জমির ব্যাপারে কেমন মারমুখী তো দেখেছই। কেউ কাউকে চাষ করতে দেয় না। প্রয়োজনে নিজেও আবাদ করবে না তাও ভালো।’

‘বেশি মারমুখী তো হবিগঞ্জ, ওরে বাপরে! খবরে পড়ি তো প্রায়ই। একেকবারে চল্লিশ-পঞ্চাশজন করে গুরুতর আহত। অথচ মানুষ কত দরদি ওখানে, তা তো নিজ চোখে দেখা। এই হিসেবটা কিন্তু সাদা চোখে মিলল না কমল, চোখ সরু করতে হইলো।’

‘হ সেটাই।’

কেমন নিরাসক্ত ওর কণ্ঠ, যেন অন্য কিছু ভাবছে, আমাকে বলতে চায় না।

‘কী হয়েছে তোমার?’

কোনো উত্তর দিলো না।  

দু’পাশে খোলা মাঠের ওপারে কয়েক সারি ঘরবাড়ি হঠাৎ হঠাৎ কুয়াশা সরে চোখে পড়তে থাকল। ক্রমশ কাছিয়ে এলে চোখে পড়ল অনিয়মিত বিরতিতে নুয়ে থাকা বাঁশঝাড়। হঠাৎ কারও জমির সীমা নির্দেশ করা কিছু কালচে মেহগনি, রুপালি আকাশমনি গাছ বা সাদাটে মান্দার- সারা গায়ে ঈর্ষার মতো কাঁটা। পথটা যেন সামনে কোথাও মোড় নিয়েছে।

এদিকে জমির আল চওড়া হয়ে ওঠা পথ অত দীর্ঘ হয় না বলেই জানি, আবার ওদিকে কোনো কারণে এটা ফুরোচ্ছেই না দেখে বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম।

যাক, আমরা তো তখন দাঁড়িয়ে আছি, স্থির। আমি দুই হাঁটুতে হাতজোড়া ঠেকিয়ে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে পা জোড়ার দিকে তাকিয়ে আছি। পা জমে একদম অনড় বরফ। দাঁড়ানোও কষ্টের। মনে হচ্ছিল হাঁটুটা অন্তত কিছুটা সময় হলেও ভাঁজ করা দরকার। কী করা যায় ভাবছি। কেউ কোনো কথা বলছি না। কেবল, রাত একা কথা বলছিল। রাত কেমন ফিসফিস করে কথা বলে। আর সমগ্র বন, মাটি, রাতপাখি, ঝিঁঝিঁপোকা তার সঙ্গে সঙ্গত করে, এসব ভাবছি। হঠাৎ কমল বলে বসল, ‘কারা যেন আছে ময়ূখ, টের পাওয়া যায়।’

‘মানে?’ ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠল আমার।

‘মানে আর কী, মশা। টের পাও না? কামড়ায় না তোমাকে?’

শুনে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। ‘তাই বলো। নাহ, তুমি থাকলে আমাকে মশা কামড়ানোর সুযোগ নেই। আমার রক্তে ব্যাড কোলেস্টেরল কম।’

কমল মুখের কাছে হাত উঠিয়ে বাতাসে ভেসে থাকা পতঙ্গকে ধরতে চেয়ে ব্যর্থ হলো। ‘এই অহংকার একদিন তোমার কাল হবে। শোনো, এখানে খানিকক্ষণ বসতে পারি যদি আগুন জ¦ালানো যায়। খিদেও পেয়েছে। কী করি?’

‘আরেকটু সামনে চলো বরং, এখানে না। ভালো লাগছে না কেমন, কাছেই ঘরবাড়ি। এত কাছেই যদি ঘরবাড়ি থাকবে তো এ কেমন অভিযান! রাতে অনেকে ফসল পাহারায় থাকে। তেমন কোনো দলের খোঁজ পেলে হতো সবচেয়ে ভালো।’

দু’জন আবার হাঁটতে শুরু করলাম। একসময় মনে হলো পা দুটো সম্পূর্ণ আলাদা অস্তিত্ব, ওরা শরীরের কিছু না, আর এই বাঁধা দাসত্ব ওরা মেনে নিয়ে নিয়েছে, আপনা থেকেই চলছে এখন। কিন্তু এবার একটু জিরোতেই হবে, তবে আবার বেশিক্ষণও নয়। বেশিক্ষণ জিরোলে এগোনোর স্পৃহা মরে যায়।

মনে মনে আমাদের গন্তব্য ছিল পাহাড়। গারো পাহাড়ের একটা সারি উত্তরের এদিকটায় এসে শরীর ছেড়ে দিয়েছে। যদি তার পা-ও স্পর্শ করা যায় এমন রাতে, জীবনে আর কী চাই!

আরেকটু এগোতে হঠাৎ মনে হলো পথ আরও খানিকটা প্রশস্ত হয়েছে। হাতের বাঁয়ে একটা আয়ত জমি, সেখানে হাঁটুসমান চারাগাছগুলো কুয়াশাডোবা হয়ে আছে। জমিন পেরিয়ে তার ওপারে মাটি খানিকটা উঁচু, সেখান থেকেই যতদূর দৃষ্টি যায় বৃক্ষের কালো স্তর, বেড়ার মতো, একটা ছিটাবন। সামনের দিকে কাণ্ডের খাঁজে খাঁজে রহস্যময় আলো-আঁধারী। ওটুকু অংশ পেরোলেই আরও ভেতরে ভয় জাগানো অন্ধকার, আর ডানে বিস্তৃত মাঠ। ওখানে হাঁটুসমান উচ্চতায় ঘাস না ধান তখনও বুঝতে পারছিলাম না। অনেক জায়গায় গবাদি পশুর ঘাসেরও চাষ এখানে চলে বলে শুনেছিলাম, তেমনই কিছু হয়ত।

নাক ঠান্ডায় জমাট, ডগাটা জমে পাথর কঠিন হয়ে ছিল। এ অবস্থায় ঘ্রাণে কিছু চেনা কষ্ট। তবু মনে হলো, ধানই হবে।

দেখা গেল পথের দু’পাশে ওষধির খড়কুটো মতো পড়ে আছে প্রচুর। এই তো জ¦ালানি। আগুন জ¦ালাতে আর কোনো সমস্যা নেই। পথের মধ্যখানে যদিও, তবু এত রাতে, এমন শীতে কেউ আসার কথা নয়। এলেও পাশ কেটে চলে যাবে, অসুবিধা কোথায়। 

আমার কাছে দিয়াশলাই থাকে সবসময়, আগুনের ভাবনা নেই। ভাবনা ছিল জ¦ালানির, তা মিটেছে।

‘বন্ধু, আর এক পাও নয়।’ আমি বললাম। ‘পারছি না। এখানে একবার ঘাঁটি ফেলি।’

কমল পথের দু’পাশ থেকে খড়-বিচালি, পোড়ানোর মতো কাঠকুটো সংগ্রহে লেগে গেল। আমিও। পর্যাপ্ত কুটো জড়ো করা গেলে পকেটে হাত দিয়ে থমকে গেলাম। এক মিনিট! দিয়াশলাইয়ের বাক্সটা কই?

পাঞ্জাবির দুই পকেটে, পাজামার পকেটে, কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। বোধয় নেওয়াই হয়নি বা কোথায় পড়ে গেছে। কী করি? এদিকে তামাক, সাধের পাইপ সবই আছে। শূন্য হাত দেখে কমল বলল, ‘যাহ শালা!’ হঠাৎ ডানের মাঠের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।

আমরা শহরে মানুষ। নাকউঁচু বিদ্যার অহংকারে বড়জোর সূর্য দেখে দিক যা চিনি, চাঁদ তারা দেখে চেনার সময় এলেই ঠেকে যাই। তখন বলি ডান বাম, যদিও ডান বামের হিসেব দিয়ে সবসময় সব বোঝানো কঠিন। সুতরাং কোন দিক বলতে পারব না, তবে কমল দেখল যেখানে আমরা আছি সেখান থেকে ডান দিকের বিরাট চৌকো মাঠের প্রায় মাঝামাঝি একটা কালচে কুঁড়েঘর। আঙুল তুলে দেখাল আমাকে।

‘কী ব্যাপার? এতক্ষণ তো দেখা যায়নি! দেখো? তুমি বোধয় ওরকমই কিছু একটা খুঁজছ!’

এসময় পাকা ধানের ঘ্রাণ এলো নাকে। যে নাক এতক্ষণ এমন প্রতারণা করে এসেছে হঠাৎ তার এমন সততা দেখানোর কারণ? এমন শীতে ধানের ঘ্রাণও কখনও পাইনি। কে জানে, পাওয়া যেতেও তো পারে কোথাও, কত জাত বেরিয়েছে! কমলের মুখের দিকে তাকালাম। অবাক হয়েছে সেও। চাঁদের আলোয় ধানের গোছা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে সাদা চোখে। ক্ষেতের ঠিক মধ্যখানে দাঁড়িয়ে একটা কুঁড়ে, বেশ ছোট। মনে হলো, ভেতরে আগুন জ¦লছে।

‘এ কেমন ধানের ক্ষেত রে বাবা? শীতেও দোলে? যাক, আমাদের আগুন পেলেই হলো।’

‘ওরা কারা আসলে?’ কমলের কণ্ঠে একটা চাপা উদ্বেগ।

বললাম, ‘দেখো না ফসল পেকেছে? এ সময় তো চাষিরা এমন পাহারা বসায়। আর এখানে তো বসাটা আরও স্বাভাবিক। ওখানে বোধয় চাষিদেরই ক’জন জোট বেঁধে পাহারা বসিয়েছে।’

আমি আমার অনুমানের কথা বললাম। ওরা পালা করে ঘুমোয়, হুশ হুশ হুঁকো টেনে গল্প করে সময় কাটায়, খিদে পেলে চিড়া চিবোয়। গানও গায়, ধান গোলায় তোলার গান। ওই সমস্ত কোরাস ওদের জাগিয়ে রাখে। এসব শুনেছি কেবল, কখনও দেখিনি আগে।

কমল একবার ওই কুঁড়ের দিকে, আরেকবার আমার দিকে তাকাচ্ছে। ঠোঁট উল্টে তার দিকে এগিয়ে এসে বাহুতে মৃদু চাপড় দিলাম।

‘কে যাবে ওখানে?’ কমলের প্রশ্ন।

‘তুমি! আমার তো পা আর চলছে না। আর এক পা বাড়ালে হুমড়ি খেয়ে পড়ব।’

‘কী বলব ওদের?’ কমল বলল।

‘বলবে, ‘এই যে ভাই, একটু আগুন হবে?’ ব্যস! চাষিরা ভালো লোক। নিশ্চয়ই বুঝবে। যাও।’

কমল কোনো কথা না বলে কুঁড়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।

চাঁদের আলোয় সব ভিজে জবজবে। সুযোগ নিচ্ছে উত্তরা বাতাস। বরফ হয়ে পড়ছে মাটির শরীর। আঙুল নাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ডগা, গিঁট সব শক্ত হয়ে উঠেছে কেমন। জমাট ভেজা খড়ের মতো হয়ে আছে চুল। শ্বাস নিতেও ভয় করছিল। ভেতরের ওম হারিয়ে মারা পড়ব- এমন বোধ হচ্ছিল। নাকের ডগা পাথর আর তার ভেতরের পাতলা দেয়াল জমাট। থেকে থেকে পাঁজর কেঁপে উঠছিল বুকের। কান দুটো হয়ে ছিল বরফের পাত।

খাদির চাদরটা বিরাট হওয়ায় অনেক সুবিধা। একটা অংশ দিয়ে মাথাটা জড়িয়ে নিয়েছিলাম। পায়ের পাতায় রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কিনা কে বলবে। আঙুলগুলো একবার ভাঁজ করার বৃথা চেষ্টা করলাম, কোনো শোথ নেই। কমলের অল্প হাঁ হয়ে থাকা মুখ আর নাক থেকে ধূসর বাষ্প বেরোচ্ছে। বাক্সময় চোখে স্পষ্ট দ্বিধা। দেখে আমার মায়াই হলো। বললাম, ‘না বন্ধু, তোমার যেতে হবে না। আমিই বরং যাচ্ছি।’

কমল যেন বাঁচল। কিন্তু এবার আমার জন্যে উদ্বেগ ফুটে উঠল ওর চোখে। ‘কিন্তু, কেমন যেন লাগছে আমার। এমন কখনও লাগে নাই।’

বললাম, ‘ভাইবো নাতো! হাত পা চালালেই তো সচল হবে। দাঁড়িয়ে থাকলে তো এমন বরফ হয়েই পড়ে থাকবে। তুমি তাহলে এক কাম করো, খড়কুটো জোগাড় করো, আমি চললাম।’  

ওর কিংবা আমার পেছনে যতদূর দেখতে পেরেছি, কোনো মানুষের আনাগোনা ছিল না। কুয়াশার ছেঁড়া চাদরের ফাঁক গলে বার কয়েকের জন্য দেখা গেল, ডান পাশের ওই মাঠেরও অপরপাশ গিয়ে মিশেছে আরেক ছটাক বনের সঙ্গে।

যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে, সেই প্রশস্ত পথ থেকে বেরিয়ে সরু একটা আল ডান দিকে চলে গেছে। ক্ষেতে না নেমে আমি ওই পথ ধরে চললাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি, কমল আবার খড়কুটো বাছায় মন দিয়েছে। এগিয়ে ওই কুঁড়ের রেখার বরাবর দাঁড়িয়ে থামতে হলো আমাকে। রোপিত ধানের সারির মধ্যখানে ছিল পর্যাপ্ত ফাঁক। পেকে ওঠায় শস্যের ভারে নুয়ে পড়ে প্রশস্ত ফাঁকগুলো প্রায় সরু হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় সরাসরি ধানের ক্ষেতে নেমে গেছি দেখলে মনে আঘাত পেতে পারে চাষিরা। মুখের কাছে দু’হাত জড়ো করে ঘরফেরা দলছুট হাটুরের ভঙ্গি নকল করে আমি শব্দ করে উঠলাম।

‘কুউউ!’

কুঁড়ের মুখটা এদিকে না হওয়ায় বুঝতে পারলাম না ভেতরে কেউ শুনতে পেয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল কি না। ভেবেছিলাম বেরোবে কেউ, বেরোল না, কিন্তু বেড়ার সূক্ষ্ম ফাঁক গলে আসা আগুনের সোনাপোড়া আলো কি খানিকটা নড়ে উঠল?

নাহ, চোখের ভুল। আরও একবার ডেকে উঠলাম। এবার আমার নিজস্ব ঢঙে। চিৎকার করে বললাম, ‘এই যে ভাই, কেউ আছেন ওই ঘরে? আমাদের একটু সাহায্য দরকার। কেউ আছেন?’

আমার মুখে ঠান্ডা হাওয়ার ঝাঁপটা, এর মানে বোধয়, উত্তরমুখো দাঁড়িয়ে আছি। কুঁড়েটা আরও উত্তরে। এমন হলে শ্রুতিভ্রম ঘটে। ভাবলাম, হয়তো তাই হবে। লোকগুলো ভাবছে দূরে কোথাও চিৎকার করে উঠল কেউ।

কেউ হয়ত পাশের জনকে কাঁধে ঠেলে বলছে, ‘কিছু শুনলি?’

উত্তর পেল, ‘আরে ধুর! টান মার, মিরনাল অপেক্ষায়!’ এই বলে এগিয়ে দিলো নারকেলের মালা। জ¦লজ¦লে চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকল দুর্ধর্ষ মৃণাল, আমার কল্পনার মারকুটে চাষা। 

বললাম না ঘরের মধ্যখানে ওই সোনামতি আলো একবার যেন নড়ে উঠল? বোধয় ও-কারণেই। আমাকে বোধয় ওদের কুঁড়ের কাছে যেতে হবে। কমলের দিকে তাকিয়ে দেখি, কুটো কুড়োনো ফেলে ও আমাকে দেখছে। দূর থেকে তার চোখের ভাষা বোঝা গেল না। কিন্তু পা জোড়া ফাঁক করে যেভাবে অনড় দাঁড়িয়ে, তাতে একটা বিমূঢ় ভাব টের পাওয়া গেল। একবার কাঁধ দুটো ওপর-নিচ ঝাঁকিয়ে জানতে চাইলাম, কী হয়েছে। কোনো উত্তর এলো না। ফের কুঁড়ের দিকে মুখ ঘুরিয়েছি এমন সময়ে কমল মুখের কাছে হাত এনে সন্ত্রস্ত স্বরে চিৎকার করে উঠল, ‘ময়ূখ! ফিরে আসো!’

যেন পাথরের নিচ থেকে কোনোক্রমে বুক ঘষটে বেরিয়ে এলো ওই ডাক।  তাকাতেই প্রবলভাবে হাত নেড়ে চলে আসতে ইশারা করতে থাকল। আমি পাল্টা চিৎকার আর দিইনি। ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন? কী হয়েছে!’

তখন ও কিছুক্ষণের জন্য ফের থম মেরে গেল। কোনো উত্তর এলো না। মনে হলো কিছু একটা বলবে ভেবেও শেষ মুহূর্তে মত পাল্টাচ্ছে। মনের ভেতর কিছু একটার স্থান দিতে চাইছে না, তবু বিষয়টি জোর করে তা ভাবনায় ঢুকে পড়ে তাকে তটস্থ করছে। শেষে কেমন মরিয়া হয়ে উঠে মুখের কাছে হাত জড়ো করে ও আবার বলে উঠল, ‘চলে আসো ময়ূখ! দরকার নাই! আল্লার দোহাই চলে আসো!’

ইতোমধ্যেই কি আগুন জোগাড় হয়ে গেছে? তা তো হওয়ার কথা নয়। তেমন হলে সেটাই বলত আমাকে। তবে কি ও ভয় পেয়েছে? কেন?

আমি আর কমল আজ অব্দি বহু স্থানে অস্থানে থেকেছি। কই, কোনোদিন তো ও এমন করেনি? ওর এমন তটস্থতা দেখতে পেয়ে একটা ভীতি আমার ভেতরও সঞ্চারিত হয়ে গেল। কিন্তু ভীতির কোনো কারণ এভাবে আঁচ করতে না পেরে, শুধু পরিবেশের উসকানিতে ভেতরে ঘনিয়ে ওঠা আদিমতাকে মূল্য দিয়ে ফিরে যাওয়াটা কেমন বোকামো হবে না? বিশেষ করে তাদের জন্য যারা সারারাতের জন্য বেরিয়েছে!

ওকে হাত তুলে অভয় দিয়ে ক্ষেতে নেমে পড়লাম।

শিশিরপড়া নরম কালো মাটিতে প্রথমে আমার পা কিছুটা দেবে গেল। পায়ের কাদামাখা তল থেকে পিছলে যেতে চাইলো স্যান্ডেলজোড়া। শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে পাদুকা পায়েই টিকিয়ে কুঁড়ের দিকে এগিয়ে গেলাম। ঠকঠকিয়ে কাঁপছিল আমার চোয়াল দুটো। কথা শুনছিলই না। মনে-প্রাণে চাইছিলাম এই ঠকঠকানো থামুক। কিন্তু শীতার্ত শরীরের সঙ্গে মন পেরে উঠছিল না। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম কুঁড়ের কাছে। আমি যে পথ ধরে এগোচ্ছিলাম, সে পথে পড়েছিল কুঁড়ের একপাশ। দরজাটা খোলা রাখা ছিল বনের দিকে। কাছে যেতেই তার আকার বিকার সব চোখে পড়ল।

খর্বাকার এক মানুষ সমান উঁচু উল্লম্ব আয়তাকার ফাঁক। দরজা নামে মাত্র, কোনো কপাট আছে মনে হলো না। বনের দিকে অরক্ষিত এমন খোলা দরজার কুঁড়ে আমি আর দেখিনি। ভেতরে ছয় থেকে বড়জোর আটজনের একটা দল গোল হয়ে বসে আছে। মনে হলো একটা কিছু নিয়ে নিজেদের ভেতর বিড়বিড়িয়ে আলাপ করছে ওরা। কণ্ঠে মৃদু উদ্বেগের আভাসও মিলল। কিন্তু কী বলছে কিছুই বোঝা গেল না। ভাষারীতির আড়াল। কথার টানের অল্পসল্প যা কানে এলো, তাতে মনে হলো ওরা এখানকার লোক। সবার পরনে প্রায় একই রকম কালো পোশাক। ঘরের ভেতর একটা তামাটে হলুদ আলো। বাইরে দরজার সামনে কেউ এসে দাঁড়ালে তার মুখ দেখার কথা ছিল যাদের, তারা মুখ নামিয়ে কী যেন গুনছে। আলোর উৎসটা ওদের মধ্যখানে রাখা, অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়, দেখা যায় না।

লোকগুলোর পেছনে, অর্থাৎ, দরজার বিপরীত দিকে বেড়ার দেয়ালে একটা বর্গাকার জানালা কাটা। কাশের কপাট দিয়ে ওটা বন্ধ। এ জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা কুঁড়ের ভেতরটা দেখতে পাইনি। ধোঁয়ার একটা নীল কুণ্ডুলী ওদের চক্রটার মধ্যখান থেকে ক্রমশ ওপরের দিকে উঠে আসছিল। হঠাৎ মনে হলো, একটা হারানো বাংলা বর্ণ ওখানে ফুটে উঠেছে। লক্ষ করলাম, ওরা কথা থামিয়ে হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। যেন হঠাৎ সতর্ক হয়ে গেছে! মনে হলো, যেন অন্য জগৎ থেকে কোনো শব্দ এতটা সময় নিয়ে ওদের কাছে পৌঁছুল।

আরও কয়েক পা এগিয়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঠান্ডায় জমাট চোয়াল নিয়ে কথা ফোটানো কষ্টকর, আর লোকগুলোর এমন স্থিরচিত্রের মতো অনড় অবয়বও স্নায়ুর ওপর চাপ ফেলছিল আমার। শেষবার দ্বিধা করে কথা বলে উঠলাম।

‘এই যে ভাই! আমি বিদেশি। আপনাদের গ্রামে মেহমান। আমার একটু আগুন চাই।’

আমার দিকে পিঠ ফেরানো লোকগুলো মাথা উঁচু করল, কিন্তু কেউ আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকানোর মতো দয়া দেখাল না। ভারি অসভ্য তো এ গ্রামের চাষিরা। এমন তো আর দেখিনি।

খানিকটা বিরক্ত হয়ে এবার আগের চেয়ে গলা চড়িয়ে বললাম, ‘এই যে ভায়েরা! আমাকে একটু আগুন দিয়ে সাহায্য করুন! আপনাদের কাছে তো আগুন আছে বলেই মনে হচ্ছে। মশা তাড়াতে একটু খড়কুটো জ¦ালাব আমরা।’ এরপর কণ্ঠে খানিকটা দ্বিধা নিয়ে যোগ করলাম, ‘আর একটু তামাকও ধরাব। আপনারাও চাইলে আসতে পারেন। তবে তার আগে একটু আগুন দরকার, তা আপনাদের কোনো সাড়া নেই। এ কীরাম, ওরে ও ভাই! ’

আমার পায়ের পাতা আবার চুলকাতে শুরু করল। এ বিষয়টার সঙ্গেই আমার ক্ষোভের সংযোগ আছে। শেষবারের মতো ডাকব বলে মুখ খুলেছি, এমন সময় বাতাসে আগুনের এক হলকা এসে হঠাৎ আমার ডান পাশটা যেন পুড়িয়ে দিলো! বসে থাকা লোকগুলো একজন দু’জন করে উঠে দাঁড়াতে শুরু করামাত্র আমার ভেতরে লক্ষ বছর ধরে বাস করা কেউ একজন প্রাণপণে বলে উঠল, পালাও ময়ূখ! পালাও! গোটা স্নায়ুজালে ছড়িয়ে পড়ল ওই সংকেত। কানে বাজল কমলের কথা, কারা যেন আছে, টের পাওয়া যায়! কিন্তু তখনও পালাতে আমি পারলাম না। প্রকৃতির তাই ইচ্ছে ছিল।

অতএব দেখলাম, একটা মুখ। ফোলা পাপড়ির ভেতর অক্ষিগোলক বলে কিছু কিছু কি আছে? চোখের সামনে দেখা দিলো চক্রের মধ্যখানে থিতু আলোটাÑ পাতাকুটোর আড়ে ঢাকা পড়ে থাকা এক সলতে শিশু আগুন। পরমুহূর্তে মূর্তিগুলো কুঁড়ে ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। চাঁদের আলোয় দেখলাম, ওদের নিচের ঠোঁটটুকু কেটে নেওয়া হয়েছে। নিচের পাটির দাঁত দন্তমূল, মাংসের স্তরসহ দেখা যাচ্ছিল। প্রত্যেকের একই দশা। গোঁফদাড়িতে মুখের বাকি অংশ ঢাকা, কিন্তু থুতনির কাছটা নগ্ন, বীভৎস। কে করেছে ওদের এরকম? 

আমার হৃৎপিণ্ডটা তলপেটে সেঁধিয়ে গিয়ে তখন চাকার মতো ঘুরছে। সমস্ত রক্ত এসে ভিড় করেছে দুই পায়ের পাতায়, এবং ওরা নড়বে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে। ঘুরে পালানোর শক্তি নেই। অধরবিহীন লোকগুলো আর এক পা এগোতেই আমার বুকের ভেতরের দেয়ালে শক্তির একটা মরিয়া পিণ্ড মারল এক ঘা, সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে গোটা মেরুদণ্ডে বিদ্যুৎ খেলে গেল। ঘুরে দাঁড়ালাম।

একবার মনে হলো সবল কণ্ঠে আমি চিৎকার করে উঠেছি। পরমুহূর্তে মনে হলো, না, কোনো শব্দই গলা থেকে বেরোয়নি আমার।

হা হা হা-

এ মুহূর্তে যে চাদরটা পরনে তা আমার বাবার। কাশ্মীর গিয়েছিলেন, ভারত অংশে, সেখানে এক ভিখারির কাছ থেকে এটা কেনা। যাওয়ার সময় আমি বলে দিয়েছিলাম একটা ঘোড়া নিয়ে আসতে। বোঝাই যাচ্ছে, তখন কত হতে পারে আমার বয়স। কাশ্মীর আর সুরবাংলার দূরত্ব কতখানি ভাবতে আমার বয়েই গেছে! বাবা ঘোড়া আনেনি। ভিখারির কাছে ঘোড়া ছিল না।

ভুখার তো ছেঁড়া কম্বল মুড়িয়ে চলে যায়, চোঁ চোঁ পেটে বরং কিছু দেওয়া দরকার। তাই এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিল। কার কাছে এ চাদর বিকিয়ে ভালো দাম পাওয়া যাবে, খুঁজছিল তার চোখ।

পৃথিবীর সবখানে দরিদ্র মানুষের মন একই পথে ভাবে। আরে প্রাণ বাঁচানোর একেবারেই মৌলিক শর্ত ধরে তাদের চিন্তা করতে হয়। হয় কিনা। যৌগিক শর্তে মনকে বাঁধার প্রক্রিয়াটা দীর্ঘ আর জটিল। ওটা এক জীবনের কাজ না। ওদিকে জেগে ওঠা নিশ্চিত করতে হলে মানুষকে যৌগিক পথে ভাবতে শিখতে হবে। নয়ত বড় পৃথিবীর বড় বড় ফাঁকিগুলো কোনোদিন সে ধরতে পারবে না।

আমার বাবাকে বিদেশি আঁচ করতে পেরে ভিখারি খুব করে ধরল। বলল, ‘এ চাদরটা নে, সস্তায় দিচ্ছি। এ দামে এ চাদর গোটা ভারতে পাবি না! এমন পশমি সাদা চাদর! তুই তামিল? ও, বাংলার লোক? তোর দেশে নিয়ে যা, নিজে পরিস, না হয় ছেলেকে দিস। এ চাদর তোর গৌরবের কারণ হবে, নিয়ে যা!’

বাবা আমাদের বলেছেন, কোনো কথা শুনেই তিনি দাঁড়াতেন না, কিন্তু একটা কথা তার ভারি পছন্দ হয়েছিলÑ নিজে পরিস, নাহয় ছেলেকে দিস।

এমন একটা সময়ের কথা, যখন আমি আমার বাবা মায়ের কুসন্তান হয়ে উঠিনি। কখনও যে হয়ে উঠব, উঠতে আমাকে হবেই, তাও জানতে পারিনি। অবশ্যি কুসন্তান আখ্যা আমাকে পেতে হতো না, যদি তারা আমায় বুঝতেন। যদি আমার আদর্শকে বুঝতেন। সভ্যতার ফাঁকিটুকু বুঝতেন। যদি মানুষের অমানুষ হয়ে ওঠার যৌগিক শর্তগুলো তারা বুঝতেন। নতুন পৃথিবীর ডাক বুঝতেন। বুঝতেন নতুন মানুষের মন। বুঝতেন কিছু ধ্রুপদী আদর্শ…

কিন্তু না, তারা বোঝেননি বলতে গেলে আমার স্বত্বও ত্যাগ করেছেন। আমার মুখ দেখেন না এখন। ওদিকে আবার নিজ সমাজে তারা আমার জন্যে মুখও দেখাতে পারেন না। তাদের সমস্ত স্বপ্ন আমি জলাঞ্জলি দিয়েছি।

ওই যে বললাম গতকাল, আমি সেই একদল অদেখা শিশুর জন্যে কাজ করছি? যেন আর কুসন্তান হয়ে উঠতে না হয় নিজ নিজ বাবা-মায়ের কাছে।

 আমার বিশ্বাস, তারা ওই ফলের ভাগী এবং ভোগী দুই-ই হতে পারবে। আবার তারাও যেন পথ না হারায়, তারাও যেন ওই ফলের নেশায় বুঁদ না হয়ে উঠে পেশি খাটায়, মাথা খেলায়, তার জন্যেও আমাদের অনেক মুক্ত নির্দেশনা রেখে যেতে হবে। অনেক অনেক লিখে যেতে হবে। যদি ওরা কখনও খোঁজে, যেন পায়।

আজ বাসা থেকে বেরোনোর কালে দেখি আমার বিছানার ওপর আলুথালু হয়ে পড়ে আছে এ কাশ্মীরি চাদর। আগের কথা ঠিক আছে, উলে আমার বড় অস্বস্তি। অস্বস্তি নিয়েই গায়ে দিয়েছি, বাবার স্মৃতি হিসেবে। সঙ্গে বয়ে বেড়াচ্ছি কারণ আমার খদ্দরের চাদর বয়ে বেড়ানোর অভ্যাসটা রাখতে চাই। কিন্তু কোথায় আমার সেই চাদর?

হা হা হা-

বাবা-মায়ের সঙ্গে আদর্শিক দ্বন্দ্ব আমার এমনই প্রবল হয়ে উঠছে যে, ওনাদের পুত্রস্নেহকে দাবিয়ে প্রবল রাগে তা প্রকাশ পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর আমিও আমার চিরায়ত সম্ভ্রমবোধ হারিয়ে প্রায়ই চিৎকার করে বসছি, এ কেমন! এ তো আমি নই! পরে আমি ভীষণ, ভীষণ অনুতপ্ত হই। কিন্তু কিছু করার থাকে না আর।

প্রতিনিয়ত ভাবতাম, বিশেষ করে ধর্ম আর রাজনৈতিক দিক থেকে আমার বাবার সঙ্গে দ্বন্দ্ব এমন চূড়ায় পৌঁছেছে যে, যে-কোনো মুহূর্তে আমি ঘর ছাড়তে পারি, অবশেষে ছেড়েছিও।

বাবা যখন কাশ্মীর যান, তখনও কিন্তু এমন ছিলেন না তিনি। গত সহস্রাব্দের, বলতে পারো শেষ দশকে তার মন বদলে যায়। দেশে যখন অপনীতি স্বাভাবিকতা পায়, তখন মানুষের মন বিকৃত হয়ে যায়।

কোনো বস্তু তখনই স্বাভাবিক আকার হারায় যখন বহনক্ষমতারও বড় কোনো চাপ তার ওপর পড়ে। দুর্নীতির কাদা মানুষের বাঁচার মৌলিক শর্তগুলোর সাথে মিশে যৌগিক শিলা তৈরি করে। বিপুলা তার ভার। ওই যৌগিক শিলা গোটা সমাজ- মানুষকে ওপর থেকে চাপ দিকে থাকে। তখন আদিম প্রবণতাভেদে মানুষ নানা রকম আচরণ করে, তবে সব আচরণেরই আছে একটা সাধারণ দিক। তা হলো, বাঁচতে চাওয়া। সবাই বাঁচতে চায়। সবাই মুক্তি চায়। সক্রেটিস বলেছিলেন, মুক্তির পথ হলো মৃত্যু- হা হা হা! যাহোক, তখনই, কে কতটা পড়ার মতো পড়েছে, কে কতটা ভাবার মতো ভেবেছে, এসবের ওপর ভিত্তি করে আলাদা আলাদা মুক্তির পথ সবার চিন্তায় আসে। তার ভেতর কিছু আছে বাস্তবপথ, কিছু আছে অলীক। আমার বাবা ওই অলীক পথ বেছে নিয়ে তীব্র গোঁড়ামিতে ডুবে গেলেন। সঙ্গগুণে মা-ও বদলাতে শুরু করলেন, যে মা কিনা বাস্তব পথের পথিক ছিলেন।

যাকগে। যতক্ষণ আমার হৃদয় দিয়ে এটুকু বুঝতে পারব যে ঠিক পথে আছি, ততক্ষণ লড়ে যাব, তবে কারো প্রাণ হনন করব না। বরং কেউ যদি আমার প্রাণ নিয়ে নিতে চায়, তাকে নিতে দেবো, কারণ তাতে আমারই উদ্দেশ সফল হবে, তারটা নয়। এটা প্রকৃতির যৌগিক সিদ্ধান্তের মৌলিক শর্ত, হো হো হো! 

বেশ বেশ, এবার ঘটনায় আসি- অপেক্ষা! আগে আরও দুটো কথা আছে। চাদরের কথা বলেছি, কিন্তু টুপির কথা?

এই টুপিও আমার বাবার। ঠিক যেমন আমার এই শরীরটাও তার প্রাণরসে পাওয়া। অনেক আগে যখন আমাকে সাইকেলে চড়িয়ে স্কুলে নিয়ে যেতেন, তখন একদিন সাইকেল থামিয়ে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কেনা এ টুপি। আমার মাথায় তখন একটা নীল-সাদা উলের টুপি ছিল। অস্বস্তি হতো কিন্তু মা একবার পরিয়ে দিলে খোলা মুশকিল! অবশ্য বাতাস ঠেকাতে কাজে দিচ্ছিল, আর বাবা ঠাণ্ডা বাতাসে কষ্ট পাচ্ছিলেন। তার কেনা ওই সবুজ উলের টুপি আমার এত পছন্দ হয়ে গেল যে আমি ওটার জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করলাম, কবে কোনো এক মাহেন্দ্রক্ষণে বাবা ওটা আমার হাতে দেবেন। অতঃপর কুড়ি বছরের অপেক্ষা।

এ টুপি হাতিশুঁড় যাওয়ার সময় আমার সঙ্গে ছিল না। তার আগেই হারিয়ে গিয়েছিল। গত বছর আমরা রূপোসনগরের এক উপশহর থেকে আরেক শহরে যাচ্ছিলাম ট্রেনে। খোলা জানালা দিয়ে কোলের ওপর রোদ এসে পড়েছে, হঠাৎ এই টুপিটাও এসে পড়ল।

হাতিশুঁড়ের ওই গ্রামে পৌঁছানোর দিনকয়েকের ভেতর স্থানীয় এক জোতদারের গল্প শুনি। ওটা প্রায় শতাব্দীকাল আগের কথা হলেও এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ওই জোতদারের সঙ্গে ভীষণ সখ্য ছিল স্থানীয় জমিদারের। জোতদার লোকটা ওই জমিদারেরই চর ছিল প্রথমটায়, ক্রমে যোগ্যতা দেখিয়ে জমিদারের প্রধান উপদেষ্টায় পরিণত হয়। কী সেই যোগ্যতা?

ত্রাসের রাজত্ব তৈরির যোগ্যতা। বিবিধ নোংরায় নিঃসঙ্কোচে হাত ডোবাতে পারত জোতদার, এবং ওটাই উত্থানপর্ব শুরু করিয়ে দিলো তার। পরে ওই জোতদারের এতই প্রতিপত্তি হলো যে, শেষ সহস্রাব্দে হিন্দু মুসলমানের সংখ্যার ওপর ব্রিটিশদের পায়ে ধরে কেঁদে পড়ে যখন দেশ ভাগ হলো, তখন ওই জমিদার, এ পর্যায়ে তার নাম বলছি, রামচন্দ্র, সেকালের পূর্ব বাংলা ছেড়ে গেল পশ্চিম বাংলায়।

সুরবাংলা হওয়ার পর ভেবেছিলাম, বুঝি মুক্তি মিলল। আসলে মানুষগুলো এই মিলল ওই মিলল মনে করে কেবল স্বস্তি পেতে চায়। তার পরিশ্রমবিমুখ মনের এই এক কল্পনাবিলাস। আসলে মুক্তি কখনও পুরোপুরি মেলে না। সক্রেটিস বলেছেনÑ হা হা হা!

বিভব পার্থক্য চিরকাল থাকে। বিভব পার্থক্য না থাকলে তো আধানের প্রবাহই বন্ধই হয়ে যায়, বিদ্যুৎপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়; যাহোক, বাংলার তথাকথিত হিন্দু অংশে চলে গেল রামচন্দ্র, পেছনে থাকল পড়ে তার জমিদারি, আর বাংলার তথাকথিত মুসলমান অংশে থেকে গেল তার ডান হাত, কাশেম, কাশেম সৌদ। ইঁদুরের বিয়ে দেওয়া জমিদার রামচন্দ্রের সম্পত্তি এলো তার ধূর্ত ডান হাতের কাছেই।

কাশেম সামান্য এক হাত থেকে আস্ত এক খাদক দেহে পরিণত হয়ে গেল,  যোগ দিলো মুসলিম লীগে। জোব্বায় সুগন্ধে, দাড়িতে টুপিতে সাচ্চা মুসলমান।

পুরো পরিবেশটা যেখানে দূষিত, সেখানে পুঁজ খেয়ে বাঁচা কীটেরই তো ঈদ! ওই পুঁজ থেকেই এলো শব্দ, পুঁজি।

কাশেমের তখন বিরাট পুঁজি দাঁড়িয়ে গেছে, মানে অনেক কাঁচা টাকা তখন তার, জমা। তাই তার ভারি রমরমা।

ওই সমস্ত পুঁজিদাররা তারও অনেক আগে থেকে পুরোদমে রাজনীতিতে। আর লর্ড মিন্টোর হাওয়ায় পাল তুলে প্রতিযোগিতার রাজনীতির প্রায় ফাঁকা সমুদ্রে জাহাজ ভাসাল মুসলিম লীগ।

কাশেমের কথায় আসি। যৌবন থেকেই তার দেওয়া শাস্তিগুলোর ভেতর সবচেয়ে প্রিয় ছিলÑ নিচের ঠোঁট কেটে নেওয়া।

আমরা যে বিকেলে গ্রামে পৌঁছাই, সৌভাগ্যক্রমে সেদিনই এক টঙে চা খেতে ঢুকে, পেয়ে যাই এক বৃদ্ধকে। অশীতিপর ওই বৃদ্ধ কাঠের ভাঙা বেঞ্চির ওপর শীর্ণ এক পা তুলে দিয়ে আপন মনে কথা বলে চলেছিলেন। আশপাশে যারা ছিলেন, কেউ তার কথায় কান দিচ্ছিল না। কিন্তু কমবয়সী দোকানি থেকে থেকে চোখে সম্ভ্রম নিয়ে তার দিকে তাকাচ্ছিল। দোকানে আসা স্থানীয়দের অনেকের চোখে আমি দেখেছি ‘দিই বুঠাকে তুলে’ এমন একটা ভাব, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাব আর কাজে পরিণত হতে পারেনি।

কমল চায়ে চুমুক দিতে দিতে কান ফেলে বৃদ্ধের কথা শুনছিল। আমিও মন লাগিয়েছিলাম। সাধারণভাবে বৃদ্ধরা যা বলে, অবিরত আক্ষেপবাক্য আর একশ’ স্মৃতিকথা, তারই একটা মিশেল বলে বোধ হলো কথাগুলোকে। তবে এও টের পাচ্ছিলাম, ওই মিশেলের ভেতর আমাদের জন্য কড়া রসদ আছে।

বৃদ্ধ এই আসছে শীতে নির্বাচনে কার হারজিৎ হবে তারই ভবিষ্যদ্বাণী করছিলেন। একেবারে হিসাবি ভবিষ্যদ্বাণী যাকে বলে। প্রথমে অনেকগুলো নাম বলে গেলেন। নামগুলো আমাদের অপরিচিত, বলাই বাহুল্য, যেহেতু আমরা স্থানীয় মানুষ নই। সব শেষে একটা নামে এসে থামলেন তিনি-  ‘হ, আরজত! আরজতই হইবে গ্রামের মাথা! আরশাদ আলী, সারবিনা বেগম, তোরাব খোনকার, গফুর সৌদ, বাসু মালাকার, অমল ভটচার্যÑ অরা কেউ পারব না আরজতের লগ দিয়া পাল্লায়। আরজত প্রেসিডেন্ট হলে আমাদের অবস্থা কেমন হইবে? কেমন আর। কাশেম সৌদ জোতদারের হতভাগা বর্গাদার সমান। হ- একদম! কেউ ঠেকাইতে পারবে না। এমন না হইয়ে উপায় নেই, আর কোনো পথ নেই।

কথাগুলো শুনতে শুনতে ততক্ষণে আমি তার বেঞ্চির কাছে গিয়ে হাঁটু ভেঙে বসেছি, আর অল্প অল্প চুমুক দিচ্ছি চায়ে। অবিরত মাথা নেড়ে নেড়ে বৃদ্ধের বলে যাওয়া কথাগুলো শুনছি। আঞ্চলিক রীতির টান, বৃদ্ধের জড়িয়ে আসা জিভ, দুয়ে মিলে কথা বোঝায় বাধা হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু আমার ইচ্ছেশক্তি ছিল প্রবল, বুঝতে আমাকে হবেই, ছিল পূর্ণ মনোনিবেশ। এরপর ধীরে হলেও আমি তার কথাগুলো বুঝতে শুরু করলাম। গ্রামের বর্তমান রাজনীতির গভীরতর পাঠ। আমি আশ্চর্য হলাম, বৃদ্ধ এটা বলছেন শুনতে পেয়ে, ‘এখন ব্যবসায়ীরা চইলে আসছে গো। যখন রাজ্যের শাসনে বসে বৈশ্যের দল, তখন রাজ্য রসাতল বাবা রাজ্য রসাতল।’

থেকে থেকে তাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করে নিচ্ছিলাম। বৃদ্ধও এমন অনুরাগী শ্রোতা পেয়ে প্রথমে খুশি, পরে বিরক্ত খানিকটা।

হঠাৎ কানের কাছে মুখে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই লোকের ব্যাপারে বলুন না চাচা, কাশেম সৌদ জোতদার। মনে হচ্ছে ওই লোকটা… যেন কেমন। মনে হচ্ছে সে-ই সমস্ত নষ্টের গোড়া এখানে। বলুন তো তার কথা? আর তার বর্গাদারদের কথাও। বর্গাদারি কি এখনও আছে!’

বৃদ্ধের ছানি পড়া চোখে আমি বা কমল কেউ পড়িইনি বোধয়। প্রশ্ন শোনার পর লোকটা সতর্ক হয়ে উঠল। আমাকে দেখতে চেষ্টা করল। ভাষার রীতি বিচার করে বুঝে নিলো আমি শহরের মানুষ।

পাল্টা প্রশ্ন করল আমাকে, ‘রূপোসনগরের মানুষ এখানে?’

আমি আর কমল চোখে চোখে হাসি বিনিময় করলাম একবার। মুখ ফিরিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, রূপোসনগরের মানুষ আমরা।’

বুড়োর পরের প্রশ্ন শুনে দু’জনের হয়ে কমল একাই বলল, ‘আমরা একটা কাজে এসেছিলাম, আবার চলে যাব। এখানে চা খাচ্ছিলাম, হঠাৎ আপনার কথাগুলো শুনে মনে ধরল, তখন থেকে শুনছি। আপনার কোনো অসুবিধা নেই তো?’ আহা বিনয়। 

‘আমার কোনো অসুবিধা নাই। অসুবিধা হয় কাদের? যারা শুনছে তাদের। আমার কি আর কোনো অসুবিধা হয়? না! আমার অনেক কথা কারও সয় না। বিকেলে এই দোকানে বসি, এটাও অনেকের সয় না। এরপরও আসি। পছন্দ করে না বলেই আসি। ব্যাটা! পছন্দ করবি না মানে! আমি একশ’ বার আসমু! আর যা শুনতে পছন্দ করবি না তাই কমু! আমি কি তোদের মন রেখে কথা বলব নাকি! তা তো বলব না। এখানে এইসে উসখুস করে। চিৎকারও করে মাঝে মইধ্যে, আমারে তুইলে দিতে চায়। কিন্তু ওই যে, বিপু, বিপু আমারে ভালো পায়। আমারে ভালোবাসে। আমিও বাসি। ও আমার নাতিনকে ভালো পায়। পছন্দ করে। আমার নাতিনও তাকে পছন্দ করে। দু’জনে আমার কাছে পুরান দিনের গল্প শুনতে চায়। আমি আমার নাতিনকে বলি, তুই বিয়ে করে ফেল। ও কী বলে? বিয়ে করতে কী আর চায়? আমাকে রেখে নাকি বিয়ে করবে না। এই বলে। বলে, আমি মরলে এরপর করবে। এই ছোকরাও তাই শিখেছে। বলে। বুঝি না। আমি সব বুঝলেও, এই এদের কথা কিছু বুঝি না। গ্রামের মানুষ ভালো না। ওদের কথাও বুঝি না। আমি এদের কথাও বুঝি না, ওদের কথাও বুঝি না, ওরাও আমার কথা কিছু বোঝে না। পরের মন অন্ধকার! ওই বিপু আমাকে বসায়। কেউ যেন আমাকে না বকে, তা দেখে। ভালো ছেলে, ভালো। লেখাপড়া করতে পারলে আরও বড় হতো। আপনাগের মতো হতো। আপনাগের মতো বড় না হলেও, বড় তো হতোই।’

‘ধামরা মোটেও বড় না দাদা, আমরা খুবই ছোট।’

‘বুঝি না? আমি কথা শুনে বুঝি না?’

আমি আর কমল আবার চোখে চোখ রেখে হাসি। ততক্ষণে অন্যান্য লোকও আমাদের দিকে তাকাতে শুরু করেছে। আমাদের শহুরে জ্ঞান করে ওরা এতক্ষণ এড়িয়ে যাচ্ছিল। হ্যাঁ, রূপোসনগর কিংবা শপথনগরের বাইরে এটাই সত্যি।

বৃদ্ধের সঙ্গে আমাদের এমন সখ্য জমে গেছে দেখে ওরা অবাক। ওরা আমাদের নতুন চোখে দেখতে শুরু করল।

আমাদের জন্য ভালোই হয়েছিল ওটা। কেননা, এই করেই আমাদের থাকার একটা ব্যবস্থা হয়ে যায়। স্থানীয় মাঝির বাড়ি। মাঝির নাম মৃণাল, সেদিন কাজে যায়নি, গায়ে নাকি জ¦র। কপালে হাত দিয়ে দেখেছিলাম, বেশি নয়। বলছিল, আগের তিন দিন ভুগেছে।

মৃণাল ভালো মানুষ। ওর বাড়িতে এক রাত ছিলাম আমরা। পরে ‘আপনাদের কষ্ট হবে’ এমন কথা বলে সে নিজেই পারাপার- ঋণে তার কাছে ঋণী এমন এক চাষি পরিবারের হাতে আমাদের তুলে দেয়। এমন ঋণ আছে আমাদের জানা ছিল না।

চাষির নাম রফিক। রফিক শুধু চাষিই নয়, সম্পন্ন গৃহস্থ রীতিমতো। শিউলিফুলের ঘ্রাণে ভরা তার বাড়িতে আমরা বাকি দিনগুলো থাকলাম। যেহেতু মানুষের বাড়িতে আছি, আমাদের যথেচ্ছ জীবন কাটানো চলে না। যখন তখন বেরোতাম না খুব ইচ্ছে করলেও।

সে রাতেই শুধু বেরিয়েছিলাম, যে রাতের ঘটনা বলছি।

বেরিয়েছিলাম, কারণ রাতে আর ফেরার পরিকল্পনা ছিল না বলে গৃহস্থকেও রাত জেগে দ্বার পাহারা দিতে হবে না, তাই। যদিও আমাদের চিন্তায় গৃহস্থ রফিকের ঘুম সে রাতে এমনিতেও আর হয়নি। আরও দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল, যখন বেলা চাঁদি বরাবর উঠলেও আমরা ফিরলাম না, এবং সেই থেকে আজ পর্যন্ত নয়।

মুঠোফোনে আমাদের কথা হয়েছে। সে তার দুঃখের কথা আমাদের বলেছে, আমরাও কথা রেখে ঢেকে তাকে বলেছি। আর কথা দিয়েছি, আবার কখনও গিয়ে একটা শুভসমাপ্তি দিয়ে আসব। শেষটা আমাদের ভালো হয়নি।

বেশ, সেই বৃদ্ধের প্রসঙ্গ আবার।

লোকে তখন ধীরে ধীরে আমাদের কাছে এসে শুনতে শুরু করেছে- কী বলছি আমরা, আর বৃদ্ধই বা কী বলছে। বৃদ্ধের নাতনির অনুরাগী বিপু খুব উৎসাহী! এক সারি চায়ের কাপে সে ঘনায়িত দুধ ঢালছিল। কখন ওই সান্দ্র তরল বাইরে পড়ে স্তূপ হতে লেগেছে টেরও পেল না।

বুড়ো, নাম নবী, তখন বলতে শুরু করেছে-

ওই কাশেম সৌদ জোতদার ছিল জমিদার রামচন্দ্রের কর্মচারী। নাম রামচন্দ্র হলে কী হবে। ধর্মের নামগন্ধও তার আচারে ছিল না। কাশেম প্রথমে ছিল তার চর, লোকটার বুদ্ধি ছিল প্রখর। রামচন্দ্রের শোবার ঘরে ঢোকার অনুমতি ছিল তার। লোকে বলে, রামচন্দ্রের নাম বাঁচিয়ে শুরুতেই দুটো কাজ নিজ হাতে করে কাশেম অতখানি কাছে গিয়েছিল, তাকে আসতে দিতে বাধ্য ছিল জমিদার। এক. রামচন্দ্রের একমাত্র বড় ছেলে সূর্যকে পুলিশে তুলে দিয়ে জমিদারি, দুই. রাতপাখি কুসুমকে প্রাণে মেরে মুখ আর মনুকে প্রাণে মেরে মান রক্ষা।

সূর্যকে ফাঁসি না দিয়ে আন্দামানে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছিল ব্রিটিশরাজের কাছে, টেকেনি। রাতপাখি কুসুমের কবর মরালক্ষ্মী দীঘির পুবধারে হয়েছিল, জায়গাটা এখন ঝোপজঙ্গলে পুরোপুরি ঢাকা, আর আনাগোনা যত প্রেতের। মনুর মরদেহের কোনো খোঁজ কোনোদিন পাওয়া যায়নি।

কারা এরা?

কুসুম?

মনু?

সূর্যের অপরাধ?

প্রথমটার পর কাশেম হলো উপদেষ্টা, দ্বিতীয়টার পর পেল পত্তনি। রামচন্দ্র লোকটার মাথাও কি খারাপ হতে ধরেছিল? তখন জমিদারি ক্রমে পড়ে আসছে। অভাব ঘিরে ধরছে কিন্তু সবই ছিল গোপন। আগের জীবন যাপনে অভ্যাস খুব পীড়া দিচ্ছিল, বুড়ো শান্তি পাচ্ছিল না। লোকটা শত দিক থেকে ছিল কাপুরুষ। কিন্তু ওর ভেতরে একজন মানুষও লুকিয়ে ছিল। পরে খুব অনুতাপ করেছে। মানুষই তো অনুতাপ করে, আর অমানুষ শেষদৃশ্য পর্যন্ত বুকে চাপড় দিয়ে ঠাঠায়। কয়, ঠাঠাঠা! খুব ভালো করসি!

যাহোক, যখন পশ্চিমবাংলার যৎসামান্য জমিদারিতে রামচন্দ্র ফিরে যাচ্ছিল, আর এদিকে সব কাশেমের করায়ত্ত, তখন ওর মনের খবর কী?

বৃদ্ধ কন, ‘আমার বাবা বলতেন- কর্মফল। এই কর্মফল কে না ভোগ করে! তয় প্রকৃতি মায়ের কিন্তু চোখ নাই। কর্মফুলের মধু বা বিষ সে বোঝে না, খোঁজেও না। ফলই কেবল ফলায়। ফলে প্রকৃতির হাটে মধুফলও ওঠে, আবার তোমার বিষফলও জোটে। মধুফল খেয়ে কেউ বাঁচে, বিষফল খেয়ে কেউ মরে। কোনো মধুফল দেখতে বিষফলের মতো, আবার কোনো কোনো বিষফল দেখতে যেন, বাপরে, অবিকল মধুফল! 

… সেদিন বৃদ্ধ জলেভাসা বরফ দেখানোর মতো যা বলেছে তার সারসংক্ষেপ এই। লোককে কথা শোনাতে তিনি আসেন বটে। কিন্তু সেদিন অত লোক তাকে ঘিরে ধরেছে বুঝতে পেরে আবার মনের শুরুর দিককার তেজের আগুনে পড়ল জল। উৎসাহ মিইয়ে গেল তার।

গল্প আরও বিস্তৃত হলো ওই চাষি পরিবারে উঠে।

আমাদের আশ্রয়দাতা রফিকের কথা বলছি। তার আদিপুরুষেরা সুরবাংলার আরো উত্তরপুবের জেলে ছিলেন। জাল ছেড়ে কাস্তে হাতে নিয়েছেন মাত্র ক’ প্রজন্ম আগে। বাবা ছিলেন চাষি, দাদাও ছিলেন তাই। দাদার বাবা সরাসরি চাষি ছিলেন না, তবে পরিবারে চাষবাসের পত্তন তার হাতেই। ওই মানুষটার গল্প আমাকে নাড়া দিয়েছিল। তিনি প্রাণ দিয়েছিলেন ওই কাশেম সৌদের করালিপনার দগে।

ঘুরে ফিরে এই এক নাম বারবার।

গ্রামের কথিত অশিক্ষিত মানুষের পারিবারিক ইতিহাসের কোনো লেখাজোখা থাকে না। ঊর্ধ্বের কম পুরুষের নামই তাদের মনে থাকে। পেটেভাতে লোকজন ওরা। পূর্বপুরুষের নাম মনে রেখেও বা কী লাভ- এই হলো ওঁদের ভাষ্য। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটেছে রফিকের দাদার বাবার ক্ষেত্রে। তার নাম গ্রামের সবাই বংশানুক্রমে মনে রেখেছে। এ নাম এখানকার ঘুমপাড়ানি গান, সন্ধ্যার গালগল্পের ভেতর পশে গেছে, সুতরাং মনে না থেকে উপায় কী?

মজনুন- ওই মজলুম নব্যচাষির নাম।

মস্তিষ্ক গল্প বানিয়ে স্মৃতি সংরক্ষণ করে। যে কারণে ঘুমের ভেতর স্বপ্ন দেখে মানুষ, না দেখলে তার স্মৃতি ক’দিন জমা থাকত বলা কঠিন। উদ্ভট হলেও স্বপ্নে যুক্তি সংযুক্তি কোনো ফাঁকফোকর থাকে না। থাকে না বলেই ওটা এত বিশ্বাস মনে হয়। ঘুম ভাঙার আগে মনেই হয় না এ স্বপ্ন। বাস্তবতা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না স্বপ্নে।

ওফ, স্বপ্ন! বার্কলের দর্শন আমাকে দুর্দান্ত প্রভাবিত করেছিল একসময়। এখনও তাড়িত করে। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, করিও। 

যাহোক, স্বপ্নে সত্যের ঘাড়ের ওপর স্বপনবুড়ো চেপে বসতে পারে। তখন সত্য কিছুটা ন্যুব্জ হয়ে যায়, বেঁকে যায়। ন্যুব্জ হলেও বেঁকে গেলেও তার অস্তিত্ব কিন্তু থাকে। তার ওপর কথার মোম ঢেলে রং ফেলে মানুষ তাকে আকৃতি দেয়, রঙিন করে তোলে। একটা নান্দনিক আধাবিমূর্ত, আধামূর্ত কাঠামো দাঁড় করায়।

তাই মানুষ যখন মজনুনকে মনে রাখতে চেয়েছে, তাদের গল্পে, গানে তাকে গ্রহণ করেছে, তখন বহু রটনার সঙ্গেও বোধকরি জড়িয়ে গেল তার নাম। ঘটনা আর রটনা আলাদা করার কোনো উপায় আর থাকল না। শোনা কিছুর ভিত কখনও দুর্বল মনে হয়েছে। তখন ভেবে নিয়েছি ওটা রটনা, তাই জমাট বাঁধেনি। আর যা বিশ্বাস হয়েছে, সেসবকে ঘটনা বলে মেনেছি। কে জানে, কাল হয়ত হেসেছে বেড়ার আড়ালে, হয়ত দেবী উপশ্রুতি কানের কাছে মুখ এনে বলেছে, ‘ঠিক উল্টো!’

হতেই পারে, বিশ^াসের শেকড় মানুষের মনে, তাই কল্পনাই বেশি বিশ^াস্য। বাস্তবতা এবড়োথেবড়ো, কল্পনা সুমসৃণ, সেখানে হাত আটকায় না। আর মানুষ বাস্তবে যা দেখে সেটারই ওলটপালট জুড়ে কল্পনা তৈরি করে। পাখির ডানা গিয়ে লাগে ঘোড়ার পিঠে। পাখিও বাস্তব, ঘোড়াও। আলাদা করতে গেলে দুটোই মারা পড়ে। অনেক দিন পর তাই চারদিকে ঘুরে ঘুরে অবলোকনই উপায়। উপভোগই সার। গল্পের সৌন্দর্য এখানেই।

মনে আবার কিছু কথাবীজ আমি রাখছি, অনুকূল পরিবেশে যেখান থেকে বৃক্ষ জন্মাতে পারে। এই বীজ থেকে গাছ হলে সে গাছ যে ফল দেবে তা কামড়ে খেয়ে নাও মানবকুল! ভৌতিক আধিভৌতিক গল্প আর ভুতুড়ে থাকবে না। অন্ধকারকে তখন ভয় পাবে না। কিন্তু গল্প শোনার সময়, পড়ার কালে ভয়ের আনন্দটুকু ঠিকই পাবে। পুরাণ-কোরান এসব আর তর্কের অতীত অতিপ্রাকৃতিক রহস্যকথা হয়ে থাকবে না। পেছনের লৌকিক ইতিহাসটুকু আপসে চোখে পড়বে। রসের পুরোটা পাবে, কিন্তু মাথা ভারি হবে না।

ওই মজনুনের কারণে রফিক আর তার ছেলেরা; ফারু, কফিল, সাইফু, আলা, আশা; আজও লোককুলে আলাদা আসন পায়। আগের কথায় ফিরেছি। মজনুনরে কথা ঠিক কোথায় থেকে শুরু করা যায়?’

কোনো সাঁঝবেলায় মজনুন পিয়াই নদীর কাছে কথা দিয়েছিল, কোনোদিন তাকে ছেড়ে যাবে না। আশৈশব ওই নদীর জলে মানুষ। নদী তাকে ভালো বাসতো, সন্তান জ্ঞান করত।

গাঁয়ের নাম পিয়াই, নদীর নামে নাম।

সুরবাংলার উত্তর পশ্চিমে নদীগুলো তো কেবল পাহাড়ের কোল ছেড়ে মাটিতে নেমেছে, কী প্রচণ্ড তার স্রোত! ওই স্রোত মজনুনের প্রিয়। দাদার সঙ্গে মাছ শিকারে বেরোলে নিজেকে সামলে রাখত মজনুন, কিন্তু একাকী বেরোলে আর কথা নেই, মাঝনদীতে জলঝপাস। এরপর স্রোতে চিত হয়ে শরীর ভাসিয়ে চলে যেত অনেক দূর। স্রোতের টানে পেছন পেছন আসত তার নৌকা। বহুক্ষণ কেটে গেলে আবার নৌকায় উঠে বৈঠা বেয়ে সাদা বালুর তটে গিয়ে উঠলে তীরবর্তী লোকেরা বুকে আটকে রাখা শ^াস ছেড়ে বাঁচত।

তার মা দুঃস্বপ্ন দেখল একদিন। দেখল, পিয়াইয়ের পাথরটানা জলের ওপর মজনুনের লাল গামছাটা ডুবো ডুবো হয়ে ভেসে চলেছে, কেবল সে কোথাও নেই। স্রোতস্বিনীর সায়নরঙা ঢেউয়ের পিঠে বিন্দু বিন্দু আলো। সময়টা রাত। মজনুন কি তবে জলে তলালো? ছেলে আমার মরেছে- এই বোধ হওয়ামাত্র চোখ মেলল মা।

দুপুরের অলস তন্দ্রার স্বপ্ন। ছেলে তখনও নদীতে।

মজনুন মাছ ধরার কলা জানে আঠারোটা। আবার শিকারির আদর্শও আছে বুকে। কোনো কোনো অজাত শিকারি রাতের বেলা মারতে যেত মাছ, ওরা মজনুনের শত্রু। বুক ঠোকাঠুকিও হয়েছে ওদের সঙ্গে কতবার। এই চোরা! তোরা রাতের বেলা মারবি না মাছ বললাম! শিকার যখন ঘুমায়, বা থাকে সন্তান তার কোলে, বা রতিআনন্দে মৎস্য আর মৎস্যী দোলে, তখন তাদের মারা নিষেধ।

তাহলে কখন তাকে মারব?

একমাত্র সময়, শিকার যখন নিজেও শিকারে।

এই ছিল মজনুন।

কিন্তু ক’জনকেই বা বোঝাতে পারত? পারত না, তাই নিয়ে ছিল ক্ষোভ। মজনুনের এই বোধটা বৃদ্ধ জেলেদের, যাদের তিন মাথা, তাদের কাছ থেকে পাওয়া। বৃদ্ধসেবায় বাড়ে বুদ্ধি, শাস্ত্রে আছে। মজনুন বৃদ্ধসেবী, তাই বুদ্ধিমান। কিন্তু সমবয়সী বা অনুজ অর্বাচীন জল্লারা তা নয়। তারা মানত না, বুঝতেও চাইত না। উল্টোটাও ঘটত, অনেকের বোধোদয় হতো, ওঁরা শুনতেন মজনুনের কথা। তবে সেটা হঠাৎ একবার দু’বার। 

মজনুন তিন মাথাওয়ালাদের কাছে বিশেষ সমাদর পাচ্ছে দেখে অর্বাচীনরা ঈর্ষায় পড়ে তাকে আরও অমান্য করত।

‘ইশ্, নেতা হইতে চায়!’

একই স্বপ্ন দ্বিতীয়বার দেখার পর চমকে ওঠে মজনুনের মা। ছেলেকে তো আর দেবে না যেতে নদীতে।

‘না, তুই শহরে গাড়ি চালা, তুই ক্ষেতে কাজ কর। তবু নদীতে আর না।’

কে জানে, শত্রুর মনে যা ওঠে, মায়ের মনেও তা ওঠে। 

ছেলে কিন্তু বরাবরই হাস্যমুখী, নদীতে না গিয়ে নিরুপায়। মায়ের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করে মাছ শিকারে যায়। তবে, আগের মতো একা জলবিহারে আর না। নদী তার মা-দ্বিতীয়া, ধাত্রী, অন্নদাত্রী। তাকে কোলে তুলে লোফালুফিতে বড় করা প্রাকৃত জননী। একা তার কাছে না যেতে পেরে মজনুনের মন কাঁদে। যখন সে ডাঙায় থাকে, তখনও তার ত্বকের ওপর দিয়ে জল বয়ে যায়, অনুভবে টের পায়। সেই অনুভবে তার রোমকূপ সাড়া দেয়।

এলো বর্ষা ঋতু, মাছ ধরার কাল। বর্ষার শেষে মা তার অসুখে পড়ল। এক বড় ভাই ছিল, ভাগ্য পরীক্ষায় গিয়েছিল দক্ষিণে, বিয়ে করেছিল ওখানে, থাকতও সেখানে, কালেভদ্রে আসত। জেলেনাম ঘুচিয়েছে আগেই। কাঠের ব্যবসা ধরে দু’পয়সাকে চার পয়সা করছে। পিতার ভিটায় এসে মাকে অসুখে পেয়ে, নিয়ে যেতে চাইল। মা তো গেল না!

বলল, ‘শরীল নড়লে সমস্যা। তার চেইয়ে এখানেই আছি ভালো।’

ভাইও গেল, আর মাও পথ দিলো দু’দিন পর, অলখের পথ। হয়ত যমের মনে যা ওঠে, সন্তানের মনেও তা ওঠে। সুরবাংলায় বর্ষার তোড় তখন কম। তবে জেলে বসতির ওখানে পিয়াই নদীর জল দুই মানুষের কম নয়। স্রোতে শয়ে শয়ে পাথর গড়ায় জলের তলে।

বার্ধক্যের রোগকাতর শরীর নিয়ে মা স্নানে নেমেছিল জলে। ছেলে গোসলের জল তুলে এনে দিত, কিন্তু মা নদীর ধারের মানুষ, তুলে আনা জলে তার স্নান হয় না, তাই নদীতে নামে, আশৈশব। কিন্তু এর আগে কোনোদিন যা হয়নি, সেদিন তাই হলো। তাকে কালস্রোতে পেল। বর্ষা ফুরোয়নি বলে মজনুনরা তখনও ব্যস্ত। ভোর গড়িয়ে বেলা, বেলা গড়িয়ে দুপুর পড়লে ওদের নৌকা ভিড়ল ঘাটে।

ঘরে ফিরে মজনুন দেখে, তার মুখ চেয়ে নীরবে চোখের জল ফেলছে সবাই।

‘মা কই!’

দ্বিধান্বিত, ভাঙা কণ্ঠে ওদের উত্তর, ‘মা তোর ভেসে গেছে পিয়াইয়ের স্রোতে।’

এটা নিয়ে পরে গান বেঁধেছিল সেখানকার মানুষ-

‘মায়ে তার নিলি টানি পিয়াই জননী, হায়

মায়ের করালি হলি মা’

শিহরিত মজনুন এক দৌড়ে চলে গেল নদীর ধারে। পেছন পেছন গেল পড়শিরা ক’জন। হৃৎপিণ্ড তার বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। নদীর ধার ধরে মজনুন দৌড়াতে শুরু করল। আমি কল্পনায় দেখতে থাকলাম, একপাশে ফুলেল কাঁটাঝোপ আর দুপুরেও আঁধার হয়ে থাকা শাল সেগুনের ঘন বন রেখে দূর্বা মাথা তোলা ধূসর বালুভূমি ধরে মজনুন কেবল দৌড়াল, দৌড়াল, দৌড়াল আর দৌড়াল! দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। গ্রামের মানুষ দূর, আরও দূর থেকে শুনতে পেল তার মরিয়া কণ্ঠের মা ডাক, কেবলই দক্ষিণে চলেছে।

একসময় সব নীরব হলো। পিয়াইয়ের তীরে রাত নামল। বনজ অন্ধকার। মজনুন সে রাতে ফিরল না। পরদিন সকালে গাঁয়ের মানুষ তার দেখা পেল। পা জোড়া এলোমেলো ফেলে বাড়ির পথে ফিরে আসছে। হাতে মুখে বসনে নদ্য কাদা শুকিয়ে ধূসর হয়ে আছে। কারও চোখের দিকে তাকাচ্ছে না, কেবল সামনের দিকে দৃষ্টি। এক হাতে ধরা সরু কচি বেতের ডাঁটাটা থেকে থেকে বাতাস কেটে চলছে কেবল। বাড়ির কাছে এসে নিজ উঠোনে না ঢুকে চলে গেল পাশের দোরে। মায়ের সখী বয়োবৃদ্ধ এক নারী তাকে দেখতে পেয়ে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মজনুন ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল। তাদের ঘিরে দাঁড়ানো ভিড় ক্রমশ বাড়ছিল। মজনুন বলল, ‘মারে আমার মায়ে টানি নিল।’

ওই নারী তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘এইবার মায়ের কথাটা রাখ।’

মজনুন আর তার আশপাশের সমস্ত মূর্তি কখন তুমি থেকে আপনিতে উত্তীর্ণ হলো আমার মনে।

মজনুন মায়ের কথা রাখলেন। জাল বন্ধুর হাতে তুলে দিয়ে পাড়ি দিলেন সিলট্ট শহরে।

পথে ঘুমোলেন, হঠাৎ দয়ালু কারও দানে বেলা অবেলায় কিছু মুখে দিয়ে কোনোক্রমে বাঁচলেন। শহরে তার সখা হলেন সমবয়সী এক ক্ষুৎকাতর হাজং তরুণ, চিন্তা তার নাম।

চিন্তার বাড়ি মনময়পুর। বড় শহরের আকর্ষণে এসে বিপাকে পড়েছে, এখন ফিরে যেতে চায়। তবে মনময়পুরে নয়, ওখানে তাকে সাদরে গ্রহণ করবে এমন কেউ নেই, বরং সে হাতিশুঁড়ে যাবে, সেখানে এক জ্ঞাতির বাড়ি, নলদমন্তী গাঁ। গারো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ওরা থাকে, লোক ভালো, সন্ন্যাসীপ্রমাণ। সেই জ্ঞাতিও কুলতাড়ানো মানুষ। চিন্তার দুঃখ তিনি বুঝবেন, ফেরাবেন না।

‘তুমিও চলো?’ মজনুনের কাঁধে হাত রেখে চিন্তা বললেন। ‘চিন্তা মজনুন ভাই-ভাই!’

মজনুন দেখলেন, পথই দিচ্ছে পথের সন্ধান। ‘চিন্তা মজনুন ভাই ভাই! বাহ! চিন্তা মজনুন ভাই ভাই!’

ওই সখার সঙ্গে তার হাতিশুঁড়ে আগমন। জায়গাটা ভালো লাগল। জন্মগ্রামের সঙ্গে মিল অনেক, তবে অমিলও আছে। পাহাড় এখানে বাড়ির ওপর ছায়াবিস্তারী নয়, অনেকটা দূরে। যদিও দৃষ্টিসীমার বাইরে নয়, উত্তরে ঢেউ খেলানো কালো পাচিলের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। আর আছে যমুনা। পিয়াইয়ের চেয়ে অনেক শান্ত আর প্রশস্ত তার বুক।

মজনুন ঠিক করলেন, এখানেই কাটুক ক’টা দিন।

থাকতে চাইলে চাই কাজ। কোথায় কাজ?

কাজের অভাব কী। বানের কাল গেছে। তখন বীজ বোনার মৌসুম। চাষের কাজ না পারলেও মজুরের কাজ তিনি মন্দ পারবেন না।

কাজ জুটল। পিয়াইনকে দেওয়া কথাও তিনি ভুললেন। মায়ের কথা রাখতে গিয়ে জল ছেড়েছেন, তার বর হিসেবে অমরত্ব তাকে টানল। অপর মাকে দেওয়া কথা ভুলে তিনি জল ছেড়ে এলেন, শাপ হিসেবে টানল মৃত্যু। অমরত্ব আর মৃত্যুয় জড়াজড়ি। মজনুন টেরও পেলেন না।

মাটির ওপর মজুরের খাটুনি কঠিনতর। ধানের শরীর নুইয়ে দিয়ে হাওয়া যখন মাঠের এপাশ-ওপাশ করল, মুগ্ধ চোখে দেখলেন মজনুন। তিনি জলের ঢেউ দেখেছেন। মাঠের এমন ঢেউ খেলে গেছে, কিন্তু কই, কখনও চোখ চেয়ে দেখেননি।

ধানে শীষ যতই পুষ্ট হতে থাকল, কিষাণ-কিষাণির হাসিমুখ ক্রমশ ততই কালো হতে থাকল। মজনুন কিছু বুঝতে পারলেন না। এমন তো হওয়ার কথা নয়! বরং যে উল্টোটা হওয়ার কথা ছিল।

মানুষের মুখের  দুটো শব্দ মনের ভেতর ছোবল হানে। জোতদার আর আধিয়ার। জোতদার, বর্গাদার! বর্গাদার, আধিয়ার! আধিয়ার, জোতদার! কালো মাড়ি, চিরল দন্ত, হাঁ মুখ, চোখ বিস্ফারিত। বর্গাদার! আধিয়ার! জোতদার! কাহের, রোস্তম, মাতলা! কাশেম সৌদ জোতদার! বাসু, হরেক, বাঞ্ছা! কাশেম সৌদ জোতদার! মৈষাল, চিন্তা, মজনুন! কাশেম সৌদ জোতদার! মজনুন! জোতদার! মজনুন!

হঠাৎ একদিন ঢাকে পড়ল কাঠি। ক’জন ছুটে গেল। মুহূর্তে ছড়িয়ে গেল একটা খবর, আসছেন মহেন দা। মহেন দা? কে তিনি?

কিষাণনেতা। যেখানে তিনি যান, ফেরে তামাকের ঘ্রাণ। সব প্রশ্নের উত্তর তার ঠোঁটের ডগায়। সব সমস্যার সমাধান তার নখের আয়নায়। লোকের মনে অনেক প্রশ্ন, তিনি কেবল উত্তর দেবেন। গাঁয়ের সংকট আসন্ন, তিনি রক্ষা করবেন। এই সুযোগ। বোঝাপড়ায় পক্ব হতে হাজং বন্ধুর সঙ্গে মজনুন চললেন তাজুল মাঝির বাড়ি। সেখানেই মহেন দা বসবেন, নিজেকে যিনি কিষাণ বলেন ঠিকই, কিন্তু কোথায় তার চাষ, আর কোথায় তার বাস, কে জানে। রূপোসনগর-শপথনগর; ঢাকা-কলকাতা করেন যখন তখন। বড় মানুষের সঙ্গে চলাফেরা; তারা ভালো মানুষ সবাই। গরিবের ভালো চান। ধলো কালো মিলে গায়ের রং। সাফ সুতরো পোশাক। কারা ওরা? সব ধোঁয়াটে।

কৃষকদের বলেন কেবল, ‘তোরা গোলায়ে বয়, ওরে তোরা গোলায়ে বয়!’

তামাকপূজারি মহেন, মজার মানুষ মহেন। সেদিন সামনের সারিতে মজনুনের নতুন মুখটা দেখে মহেনদা প্রথমে খুশি হলেন, পরমুহূর্তে তাকে কেমন সন্দিগ্ধ দেখাল।

মহেনদাকে মজনুনের ভালো লাগল। লোকটাকে মনে হলো তার নিজেরই মতন। এতদিন কাশেম সৌদ জোতদারের নামটা তার ভেতর কেবল অস্বস্তি তৈরি করে এসেছে। সব শুনে ওই লোকের উদ্দেশ্য, বিধেয় ভালো করে বুঝে উঠতে পারেননি। মহেন দার কথা থেকে পরিষ্কার হলো, কাশেম জোতদার লোকটা আসলে কে, কী চায় এবং কীভাবে তা চায়। আর তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে চাষি ভায়েরা কী বলবে, কী করবে।

মহেনদা সভা শেষে গানও করেন। সুরের ওঠানামা ভালো নয়, তবে কণ্ঠ ভরাট।

বলেন, ‘আমার এক শহুরে বন্ধু আছেন, সলীল করে নাম। সলীল চৌধুরী। সুন্দর সব গান তিনি লিখে দেন। গানের প্রতিটা কথায় পাকা ধানের ঘ্রাণ! ওরে, সুরের কী যে শক্তি!’

হ্যাঁ, সুরের অনেক শক্তি। কান গলে ঢোকে মাথার ভেতর, তারপর নৃত্য করে। এরপর মেরুদণ্ড ধরে দেয় নাড়া। অল্প আঁচে রক্ত সেদ্ধ হয়, হতেই থাকে। মজনুন জানতে পারে, কাশেম অনেক অনেক জমির অধিকারী। রাজনীতিতে ঢুকে কিছু চর্বিদার লোকের কানের পাশে কাঁচা পয়সার থলে ধরে নাচিয়েছে। এখন তাকে আরও শতেক ব্যবসার পথ খুলে দিতে অনেক ফড়িয়াই তৎপর।

কাশেম সৌদের হাসের ডিমের মতো চোখ। তাতে কুসুমিত লাল মনি। ওই মনিদুটো তাক করে রাখা তার বিস্তীর্ণ ধানী জমির দিকে। তার বর্গাদার শত শত, ক্রমে ‘জারজ’ হয়ে উঠছে সব ক’টা। আধিয়ারি নাকি মানবে না। অথচ এতদিন মাটি চষেছে, বীজ দিয়েছে, শ্রম দিয়েছে, সোনামুখ করে কাজ করেছে, ‘রা করেনি’।

রা করার উপায় কী? কাশেমের চেয়ে ভালো কে আর জানে। জানেই যখন, মনকে চোখ ঠেরে আর লাভ কী। রা ওরা করেছে। মানুষ ঠকছে তা টের পাচ্ছে, রা আবার না করে কী করে। তবে হ্যাঁ, মরার ভয়ে চুপ করে ছিল। কারণ টের পেয়েছে, ওদের মান নয়; জোতদারের চাই ধান। মানুষ নয়, তার চাই মাটি। সুতরাং প্রাণ, মান কেড়ে নিতে সে আর তার লোকেরা কেবল উপলক্ষ খোঁজে। পেলেই হলো।

মজনুন চুপ করে শোনেন। মহেন দা মনে করিয়ে দেন, শত শত কিষাণ-কিষাণিকে ওরা পুলিশ লেলিয়ে পিটিয়ে মেরেছে। ওরা সেনাবাহিনী পর্যন্ত ডাকিয়ে এনেছে। যে সেনাবাহিনীকে এই চাষিরাই পোষে, পোষে ওই গোয়ালা। ওদেরই দুধ ধানে যাদের খাবার, ওদের রক্তজল ঘামের মুক্তো বেচা অর্থে যাদের বন্দুক; ওরাই ওই বন্দুকের বাঁটের শিকার। শিকার বুলেটের। মাথা ভেঙে ওরা মেরেছে, গুলি করে ওরা মেরেছে। ধর্ষণে মেরেছে কত। এই সেদিন, ওই সেদিন। অত নির্যাতনেও কারও কারও প্রাণ গলায় আটকে ছিল। রক্তাক্ত ওই তাদের সেনায়-পুলিশে মিলে নগ্ন করেছে। এরপর গ্রামের পর গ্রাম বেয়নেটের খোঁচায় হাঁটিয়েছে। হাঁটানো শেষে বাঁশডলে চিরতরে পঙ্গু করে দিয়েছে, চোখ তুলে চিরতরে অন্ধ করে দিয়েছে।

মুখে বলে শেষ করা যায় না, কল্পনা পৌঁছয় না অতদূর এমন নির্যাতন ওরা করেছে। ভাষায় ওই ভাষ্য ধরা যায় না। মানুষকে মানুষ কত নিচে নামাতে পারে তার প্রমাণ ওরা দেখিয়েছে। কারণ ওরা আর মানুষ নাই।

মজনুন আসার আগের বছরের ঘটনা এসব।

বা তার আগের বছরের।

বা তারও আগের।

মাথা নিচু করে শুনে গেলেন, আর পরদিন তিনি অন্যমানুষ। শরীর খাটিয়ে কাজ করেন দিনভর, বিকেলে সঙ্গীকে নিয়ে পাহাড়ি নদী দেবীজঙ্ঘার পারে শুয়ে থাকেন, এ নদী আরও দক্ষিণ পশ্চিমে যমুনার সাথে মিশেছে। সেখানে শুয়ে বসে আলাপ করেন, কী খরা যায়, কী করা যায়। নদীর ওপারের বনসন্তানেরা কখনও তার সঙ্গে একমত হয়, কখনও দ্বিমত।

আরও এক নতুন শব্দ তখন যুক্ত হয়েছে তার মনের ভাঁড়ারে- তেভাগা। অর্থ আমার শ্রম আমার, সুতরাং দু’ভাগ আমার। জমি তোমার যখন, এক ভাগ নিয়ে যাও।

নতুন ওই অপ্রতিরোধ্য ওই শব্দবাণ, তার সামনে আর কোনো জড় শব্দপাথর চূর্ণ না হয়ে পারে না, কোনো শব্দশকুন বধ না হয়ে বাঁচে না। এদিকে ফসল তোলার কাল যত এগোয়, গ্রামে পুলিশের টহল তত বাড়ে, আর বাড়ে ফিসফিস, বাড়ে উত্তেজনা। কাশেম সৌদ স্বয়ং তার সাদা ফতুয়া লুঙি আর সবুজ টুপি মাথায় এঁটে সশস্ত্র প্রহরী নিয়ে হেঁটে যায়। চোখ তাক করে। কিষাণ-কিষাণির ক্লিষ্ট শরীর মাপে। মন মাপে, মাপে চোখের আলো। মজনুন তাকে দেখে। দেখে আর ঘৃণা বাড়ে শনৈ শনৈ। দেখতে দেখতে অগ্রহায়ণ আসে। কাশেম সৌদের পুলিশ টহলে টহলে ভীতি ছড়ায়।

অনেক অপেক্ষা শেষে হঠাৎ আবার আসেন মহেন দা। পুলিশের চোখ ফাঁকিয়ে তাকে আসতে হয়। মজনুনের তো তার সঙ্গে বলার মতো অনেক কথা বুকে জমে আছে, কিন্তু বলতে সে পারে কই। মহেন দার সেদিন মন ভীষণ খারাপ, চেহারাও খারাপ হয়ে গেছে আগের চেয়ে, আগের সেই আলো আর নেই।

বললেন, ‘আমি আরও আগেই আসতাম।’

আরও আগে আসতে চেয়েও কেন পারেননি শুনে মজনুনদের বুক ধড়াস করে ওঠে! এমন কেন হলো? এমনও হতে পারে! ভাইয়ের পিঠে ছুরি মারতে পারে ভাই? পারেই তো।

মহেন দা গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বলো তো ভাই, চাষিদের সবচেয়ে বড় শত্রু কারা?’

অনেক হাত উঠল। যাকেই জিজ্ঞেস করেন মহেন দা সেই বলল, জোতদার। মহেন তখন মুখ ফিরিয়ে আরো একজনকে জিজ্ঞেস করলেন। তার মুখ দেখে বোঝা গেল না উত্তরে সন্তুষ্ট হয়েছেন কি হননি।

সবার শেষে হাত তুললেন মজনুন। তোলার আগে তিনি যে একবার দ্বিধাও করেন সেটাও মহেন দার চোখ এড়াল না।

মহেন বললেন, ‘বলো, তুমিই বলো ভাই।’

মজনুন শান্ত নিচু স্বরে বললেন, ‘চাষির শত্রু চাষি।’ 

মহেনদা হাতে কিল মেরে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, শাবাশ! হ্যাঁ, চাষির শত্রু চাষি। মানুষের শত্রু মানুষ। কুসংস্কারে ভরা সমাজে নারীর শত্রু নারী।

পরের প্রশ্নে তার গলার কাঁপন আর চাপা থাকে না। ‘হাত ওঠাতে দ্বিধা করছিলে কেন ভাই?’

মজনুন অকপটে বললেন, ‘আমি এখানকার লোক না, তাই।’

মহেন দা বললেন, ‘কে বলেছে তুমি এখানকার লোক না! একশ’বার তুমি এখানকার লোক। এখানকার লোক হওয়ার জন্য তোমাকে এখানে জন্ম নিতে হবে না। এই যে তুমি এখানে এসেছ! এই যে তুমি এভাবে ভেবেছ! এই যে তুমি ঠিক উত্তরটা দিলে! তুমি এখানকারই লোক। শুনেছ সবাই? ও এখানকার লোক।’

মহেন দার কণ্ঠটা বদলে গেল এরপর। ‘চাষিদের ভেতর বিশ^াসঘাতক আছে। ওদের জন্য আমি মরতে বসেছিলাম। এটা আমি আশা করি নাই। একদম আশা করি নাই। কেন আশা করি নাই আমি জানি না। এমন যে হয় আমি চিরকাল দেখেছি।’

মহেন দা মৃত্যুকে এড়িয়ে এখানে এসেছিলেন। কিন্তু মৃত্যু এড়িয়ে ফিরে যেতে পারলেন না। অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে ফেরার পথে সংকেত পেয়ে ওঁৎ পেতে থাকা পুলিশের এক ‘বাঁ হাত’ তাকে গুলি করে। যার যার বাড়ি থেকে গুলির শব্দ শোনে সবাই। শুধু ঢাকটা বাজলেই রৈ রৈ করে বেরিয়ে আসবে সব, কিন্তু ঢাক আর বাজে না। দুঃসাহসী মজনুন চিন্তাসহ রাতের অন্ধকারে মহেন দার গমনপথ ধরে এগিয়ে আর পেয়েও যান মহেন দা’র মরদেহটা। পাওয়ারই কথা। কারণ, পথই তাকে পথের সন্ধান দিয়ে চলেছে।

ধানক্ষেতের আলের ঢাল থেকে মরদেহ বয়ে নিয়ে মজনুন আসেন নিজ উঠোনে। রাত জেগে পাহারা দেন।

পরদিন চিন্তা, বাসব, সগীর সবাই মিলে বাঁশখাটিয়ায় মরদেহ চাপিয়ে নিয়ে গেল অনেক দূরের দেবীজঙ্ঘার তীর থেকে খানিক দূরে, জংলায়। সেখানেই মহেন দাকে মাটি খুঁড়ে বসিয়ে সমাধিস্থ করা হলো। ওপারের কালো হয়ে আসা বন বুঝি নদী পাড়ি দিয়ে এপারে এসে ওর সমাধি ছুঁতে চায়।

সেই দিন থেকে লোকের মনে মজনুনের আলাদা অবস্থান তৈরি হলো। ঘাতক যখন চেনা বন্ধু, তখন সচরাচর কেউ তাকে চিনতে পারে না। কিন্ত যাদের বুকের ভেতর নীতির আলো নেই, মজনুন তাদের চিনতে পারেন সেই শৈশব থেকে। তাদের সঙ্গে তার আকৈশোর শত্রুতা।

তার সঙ্গী দলে বাড়ে। ওঁরা তার মুখের দিকে আশা নিয়ে তাকাতে শুরু করেন। মজনুন বুঝতে পারেন, খুব ছোট হলেও একটা আশার চারা তার তৈরি বীজতলায় মাথা তুলেছে।

এমন সময় আসেন রমেন। মোস্তফা মাঝির বাড়িতে আর নয়। এবার স্বয়ং মজনুনের ডেরায়। বন্ধু চিন্তার বাড়ির কাছেই ঘরামির গড়া তার দুই কামরার ঘর।

রমেন দা বললেন, ‘মহেন মরেছে, আমি এসেছি। আমিও মরব, এরপর আসবে লীলা। মহেনকে ঠেকাতে পারে রমেনকে নয়। রমেনকে ঠেকাতে পারে লীলাকে নয়। জয় তোমাদের হবেই। কিন্তু উপস্থিত অনেকেই তোমরা ওই জয় দেখে যেতে পারবে না। মজনুন, আমার মন বলছে, তুমিও পারবে না। কিন্তু বলো, এরপরও লড়বে তো?’ 

এভাবে যে কথা বলা যায় মজনুন কখনও ভাবতে পারেননি। এভাবে বুকে ধাক্কা দিয়ে, দাবি বাড়িয়ে, ভয় দমিয়ে, কথা বলিয়ে নেওয়া!

আজ যারা বেঁচে আছে, তাদের বেশিরভাগের পূর্বপ্রজন্মের নরটি কিংবা নারীটি ছিলেন ওই স্বপ্নসভায়। এমন অভাবিত কথার বিপরীতে, যেখানে বিজয়টা মরনের ওপার থেকে স্পষ্ট দেখা গেল, তখন লোকে কী উত্তর আর দেয়। মজনুন চুপ করে থেকে একে একে সবার চোখের দিকে তাকায়। কুপির আলোয় তাদের সামনের সারিতে বসে থাকা ক’জনারই কেবল মুখের ভাব বোঝা যায়, দেখা যায় বাক্সময় চোখ। ভাষা দেখা যায় বটে, ভাষ্যের সবটা বোঝা যায় না।

মজনুন বললেন, ‘আমি প্রাণ দেবো। সন্দেহ নাই।’

তার স্বর নিজগুণে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে। শুধু তিনি ছাড়া আর কেউ কোনো ভাষা পান না। মজনুন চারপাশে তাকালেন। কণ্ঠ মেলানোর মতো আর কাউকে পেলেন না। তখন আগের বলা বাক্যে বদল এনে বললেন, ‘ঠিকাছে, আমি একা দেবো প্রাণ।’

তখন ফিসফিসিয়ে হিসহিসিয়ে উঠল একজন দু’জন করে, শেষে সবাই। রমেন দা’র মুখে হাসি ফুটল।

‘তাহলে, এবার তেভাগার কথা শোনো,’ তিনি বললেন।

তেভাগার তত্ত্বটা এতই সরল, এতই যুক্তিসঙ্গত- বুঝতে যে চায়, সে শোনামাত্র বোঝে। ওঁরা তা বুঝেছিলেন মহেনের কালেই, এবার রমেনের দেওয়া সারে আশার চারা লতিয়ে আরও বাড়ল।

রমেন দা বলেন, ‘আরও পশ্চিমে যাও, আরও পশ্চিমে! ওখানে তেভাগার আগুন দাউদাউ জ¦লছে। আমি ওই আগুনের একটা ফুলকি এনে এখানে ফেললাম। দেখি কী হয়, আগুন ধরে কি না।’

রমেনের কথা মহেনের মতো সহজে বোঝা যায় না, কিন্তু তার চোখে আলোটা অনেক বেশি। লোককে একেবারে বিশ্বাস করিয়ে ছাড়ে। তাই তার ভাষা উদ্ধার করতে না পারলেও ভাষ্যটুকু সবিক্রম উদ্ধার করল মানুষ।

প্রকৃতিতে অগ্রহায়ণ এলো। ধান কাটার সময়। কিন্তু এত কিছুর পরও প্রতিরোধের প্রস্তুতি সেবার ছিল না বললেই চলে। ওভাবে নেওয়া সম্ভব হয় নি। কেন?

কারণ এক রাতে একটা দুর্গন্ধ-হাওয়া বয়ে গেল। যারা সময় মতো নাক চাপতে পারেনি, অনেক দলে ভাগ হয়ে পড়ল।

নিজেদের ভেতরই ছোট ছোট বাগবিতণ্ডায় মনোমালিন্যের শুধু শক্তিক্ষয় করতে থাকল। আর এ সুযোগে পুলিশ লাগিয়ে কাশেম হলো চড়াও মাঠে, বাটে। রমেন হলেন নিখোঁজ। ওই ডামাডোলে নিখোঁজ সংবাদ চাপা পড়ে গেল। তবে সবার কাছে নয়। মজনুন আর তার বন্ধু, চিন্তা, পরেশ, জালাল, বিষ্ণু, সিরাজের কানে পৌঁছুল। লোকেদের মজনুন এক করতে চাইলে হাটে মাঠে বাটে গিয়ে এক আশ্চর্য সব নতুন কথা শুনতে পেলেন,

তুমি বিদেশি, তোমার এত কী। হরিদাস।

বিদেশি জাউলা, দেশে ফিরা যাও। আমরা হাওয়া খাই না। সগীর উদ্দিন।

বিদেশি ভয় পাই। খাবার মাপা, তুমি রাস্তা মাপো ভাই। সরেন।

মজনুন সব বুঝে উন্মাদপ্রায়। ধীরে অতগুলো জোটের সবাই মজনুনের সঙ্গে দিলো ঘরকাট্টা। আঁধারগন্ধী বিকেলে দেবীজঙ্ঘার তীরে মহেনের পাশে মজনুন একা বসে থাকলেন। ঠিক করলেন, এ যাত্রা আর একটা শব্দও নয়। কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে চাঁদ বহন করার আগে শক্তি হোক, শিক্ষা হোক। ধানের দামে প্রাণের দামে সেই শিক্ষার দক্ষিণা হোক। এর আগে কোনো ভালো কথাই দাম পাবে না। জওহরের মূল্য বোঝে জহুরি কেবল। আসুক লীলাদি। রমেন দা বলেছিলেন, লীলাদিকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। 

আমি শিহরিত হচ্ছিলাম! বইয়ের পাতায় পড়া ইলা মিত্র লীলা সেন হয়ে গল্পে, ছন্দে, শ্লোকে টিকে আছেন, আর আমরা এক গাঁয়ের কিষানের মুখে বংশানুক্রমে চলে আসা সে অমূল্যকথন শুনে চলেছি, শুনেই চলেছি!

সে বছর কিষানেরা অনৈক্যের চড়া মূল্য দিলো। কাশেম সৌদ এলো সশস্ত্র পুলিশ নিয়ে, ফসল এক ভাগ দিয়ে সেখান থেকে আর বছরের জরিমানা কাটল। পশ্চিমের আগুনের আঁচ তো ততদিনে তাদের গায়ে লেগেছে। সেখানে নাকি আগুন বইয়ে দিচ্ছে লীলা সেন, সবাই তাকে মা বলে ডাকে। জনা দশেক পুলিশ সেখানে তীরের আঘাতে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেছে হয়েছে বলে শোনা গেছে উড়ু উড়ু। দুই গোরা সেনাও গুলি খেয়ে মরেছে, এবং সে গুলি পুলিশ ছোড়েনি। তবে?

এখন রমেন নেই, নেই কারও অক্ষরজ্ঞানও, তাই কাগজে কী লেখা, কোনো শয়তান জানবে। তবু মানুষের ভিড়ে কান পাতলে কোনো খবর অজ্ঞাত থাকে না- পিয়াইয়ের এক তিন মাথাওয়ালা মানুষের কাছ থেকে এ কথা জেনেছিলেন মজনুন।

সেই কৈবর্ত্য-অবতার সেদিন মলিন বিছানায় শুয়ে ছিলেন, ঘরে একা। শিয়রে তিন তেলচিটে বালিশে তার তিনটা মাথা রাখা। বলেছিলেন, সিলট্ট যাচ্ছিস বাবা, হরিশের কাছে শুনলাম। তোর জাল তাকে দিলি। ওই জাল আমি তোকে কিনে দিয়েছিলাম। দেখেই চিনেছি। কী ঠিক না? কথা শোনো। তুই একটা আগুন, ঠিকাছে। এ আগুনে খাবার পুড়িয়ে খাবি। নিজেরে পোড়াবি না। এ আগুন দিয়ে নিজেরে বাঁচাবি। তবে নিজে চেষ্টা করে নিজেরে বাঁচানো যায় না। শোন কী বলি। মানুষরে বাঁচায় মানুষ, মানুষরে মারেও মানুষ। যদি দশজনকে বাঁচাস, তবেই দশজনে তোকে বাঁচাবে। একার চেয়ে দশজন ভালো, তাই না? শোন, তোর বাবা ছিল আমার শত্রু। কিন্তু তুই আমার বন্ধু। আমার ছেলে তোর বন্ধু। তুই আমার বন্ধু হইলি কী করে? আমি তোকে নিলাম কেন? নিলাম, কারণ তোর চোখে তোর বাপ ছিল না। তোর চোখে ছিলি তুই নিজে। তুই দশজনের সঙ্গে বুক ঠুকিস। ভালো কথা বলিস। ভালো নিয়ে ঝগড়া বাঁধাস। ভালো নিয়ে রগড় বাঁধানো লাগে না। মানুষ জাতে ভালো। যদি সত্যিই মানুষের ভালো চাস, কখনও জোর করবি না। জোরের ফল খোলসফাটা। তবে মানুষের কথা জানতে হবে। মানুষের ঘটনা জানাটা একটা ঘটনা। যতো বেশি ঘটনা জানবি, তত আলো। যত কম জানবি, তত অন্ধ।’

দেয়ালে একটা টিকটিকি টিক টিক টিক করে ডেকে উঠল তখন। মজনুন সেদিকে তাকাতে বৃদ্ধ হাত দিয়ে তার মুখ নিজের দিকে ফিরিয়ে নিলেন।

‘শোন, লোকে টিক টিক করবে। বলবে, তুই ঠিক। ‘তুই ঠিক না’র চেয়ে ‘তুই ঠিক’ শোনায় বিপদ বেশি। কান দিবি না। কান পাতবি নিজের বুকে। শুনবি কী বলে তোর মন। তার আগে মনটারে আকার দেওয়া লাগে। তুই তিন মাথার কাছে যাস, তোর মন আকার পাওয়া। মানুষ গুরু ধরে ধরে কেন? মনটা  যেন আকার পায়। আকার পাওয়া মনে ভগবানের শক্তি। শক্তি থাকলে দায় আসে, যমন ঘ্রাণ থাকলে অলি। আকার পাওয়া মনের একটা মানুষ, সে নিজেরে সবার জন্য উজাড় করবে। যার জন্য উজাড় করবে তারে সে জানবে না? বাজারি হবি না, কিন্তু বাজারে যাবি, মানুষের মুখ পড়বি। মানুষের মুখ না পড়লে নিজের মানুষ থাকে অচেনা। বাজারে মোড়ে দাঁড়াবি, কান খোলা রাখবি, যেখানে যাস। সিলট্ট যাস, রূপোসনগর যাস, শপথনগর যাস, মনময়পুরের কারখানায় যাস, যে জায়গাই হোক; সবার আগে বাজার খুঁজবি। দেখবি মানুষ কী খায়, কী কয়। চায়ের দোকানে বসবি। মানুষের আলাপ শুনবি, বিলাপ শুনবি। এইটাই পড়া। তাহলেই বুঝবি সামনে কী আছে। আর পেছনটাতো জানাই।’

হাতে গোনা কটা পত্রিকা তখন? ওসবের একটাতেও পুলিশের মৃত্যুর খবর এলো না, সেনার মৃত্যুর খবর এলো না। লীলা সেনের খবর এলো না। এসব আসে না। এলে রাষ্ট্রযন্ত্রে ধাক্কা লাগে, কলকব্জা নড়ে যায়। ক্ষমতাযন্ত্র যে পাটাতনের ওপর বসানো তা থরথরিয়ে কাঁপে। তাই পুলিশ গোপনে সাবধানি হয়ে উঠল। আর সেনাবাহিনীর ব্যাপারে সাবধানি হয়ে উঠল রাষ্ট্র। পুলিশ শুধু সাবধানিই হলো না, একইসঙ্গে হয়ে উঠল প্রবল প্রতিশোধপরায়ণ। তবে সবাই নয়।

একজনের কথা বিশেষভাবে বলা যায়- তাজ।

রফিক বলল, এ কেমন পুলিশ। আসলে সে পুলিশই নয়। মূলত সে কবি। ভুল করে পুলিশে ঢুকেছে। কোন ইংরাজ ইশকুলে লীলার সাথে প’ড়ে লীলাকে সে ভালোবেসেছে।

লীলা পড়েছিলেন বেথুন কলেজে। কোনো পুরুষের পক্ষে সেখানে পড়া সম্ভব নয়। পড়ানোও কঠিন। হতে পারে তাজ পড়েছিলেন স্কটিশ চার্চে। দুটোই শপথনগর। বেথুনে পড়া লীলাকে কি তিনি ভালোবেসেছিলেন? অসম্ভব নয়। কবিরা ভালোবাসে দুর্দম নারী। লীলার নাম ছড়ানো তখন থেকেই। অবশ্য ধর্মের বাধা তো ছিল। আর যতই কবিত্ব থাক, উপরন্তু লীলার অগ্নিমূর্তির একটা আঁচও ছিল অসহনীয়। কাছে আসতে দেয় না। তবু গিয়েছিলেন।

সেবারেরই তো কথা। প্রকৃতির কী লীলাযোগ! প্রত্যাখ্যাত তাজ নিজেকে আড়াল করতে শপথনগর থেকে এলেন দূর পূর্ববঙ্গের নিভৃত কোণে। আর ওদিকে তেভাগার ডাকে এলেন লীলা সেন।

যাহোক, কিষানের ভেতর কিষানের শত্রু থাকলে পুলিশের ভেতর পুলিশের শত্রু থাকতে বাধা কী। তাজ হয়ে উঠলেন সেই বিভীষণ।

পরের বছর, সেই আগুনে সময়ে মজনুনকে ওই তাজই ছেড়ে দিয়েছিলেন আরও সাতাশ বিপ্লবীর সঙ্গে। অব্যাহতি পেয়েছিলেন। হয়েছিলেন সহকর্মী পুলিশ, জোতদার, স্থানীয় জোতদার মুসলিম লীগার-কংগ্রেসম্যানের সাধারণ শত্রু।

কাঁচা তুই, মুখোশ পরা যুধিষ্ঠির, তোদের আমি চিনি। মরবি, মারবিও। ক’টাকা খেয়েছিস। আমার নামটা স্মরণে রাখিস। অরিন্দম। সহকর্মী।

পাদরিতে পড়িয়েছে, আধা কাফের, নাফরমান। বেইমান। ও টিকবে না। কাশেম সৌদ। জোতদার। মুসলিম লীগার। 

ওই আগের ঘটেই ঘটছে যত অঘটন। মূর্খ চাষাগুলোর হাড় অব্দি চিনি, চিনি নব্য সাহেবটিকেও। যবনে যবনে জোট। ঘাড় মটকাব প্রথম সুযোগে। ক্ষিতিশ রায়। জোতদার। কংগ্রেসি।

পরের সে বছরেরই কথা। মজনুন ধান পাহারার কাজ নিয়েছিলেন শরাফের জমিতে।

শরাফ ভালো মানুষ, মজনুনকে নিজ ভাইয়ের মতোই দেখতেন। একটা ভীষণ মূল্যবান ব্যক্তিগত ব্যথার স্মৃতি থেকে মজনুনকে তার বড় কাছের মনে হতো। আর শরাফের কাছে মজনুনের অন্নঋণ। মজনুন তাকে কথা দিয়েছিলেনÑ ধান পাহারার সময় থাকবেন, কাটার সময়ও।

তাকে যখন সবাই বিদেশি বলে দূরে ঠেলে দিচ্ছিলেন, আবার কাশেম সৌদের চর বলেও বাজারে মিছে শোর উঠল একদিন; প্রশ্ন সবার- ছিল না কোথাও, চিনতো না কেউ, হঠাৎ কোথা থেকে এলো, আর আসার পর থেকেই কেবল উসকে দিতে চায়, দেখ দেখ, আবার বাইরে দেখায় কত শান্ত, কিচ্ছু জানে না, ওদিকে সবকিছুতেই তার বাড়াবাড়ি, নিজের ওপর চোখ এনে সে সবাইকে বিপাকে ফেলতে চায়, নাকি এক করতে চায়, আসলে বেটা লোক চিনতে চায়, গিয়ে লাগাবে নামে নামে-

… অজাতশত্রু শরাফ তখন তাকে কাছে টেনে নিলেন। মজনুনকে তিনি চোখে চিনেছিলেন।

পাহারার কালে তার বাড়িতে থাকতে তিনি অনুরোধ করলেন মজনুনকে। মজনুন অনুরোধ শুনতে চাইলেন না।

শরাফ বললেন, ‘তোমার বাড়িটা নিরাপদ না। ‘আপদ বিদায়’ করতে চায় অনেকে, বুঝলে না? তুমি আমার বাড়িতে এসে থাকো, খাও, কাজ করো।’

ওই আপদ বিদায়ের মানে বোঝেন মজনুন। কিন্তু যা তিনি শুরু করেছিলেন, তার শেষ দেখে যাবেন, মাঝপথে এসে নৌকা ঘোরাতে চান না, তাই শরাফের কথায় মজনুন নিমরাজি হয়ে থাকলেন বটে, কিন্তু একদিন মাত্র। মন মানলো না, পরদিনই চললেন নিজ বাড়ি। বন্ধু চিন্তা তাকে সরিয়ে নিলো তার জ্ঞাতি সেই সন্ন্যাসীর বাড়ি। তিনজনের ভাত চড়ল এক চুলোয়।

চিন্তাকে বলেছিলেন মজনুন-

আমি চাষবাস বুজিসুঝি না। মজুরের কাজে মান নাই। আমি মান ছাড়া কোনো দিন ছিলাম না। মানুষের কাছে তোলাতোলা ছিলাম সবটা কাল। এইসব দিন আমি আর নিতে পারি না। ধানপাহারায় কথা দিয়েছি বন্ধু। নিরুপায়। কাটার কালেও থাকব, এরপর চলে যাব।

সন্ন্যাসী, উলুখ তার নাম, তখন হাঁটু ভেঙে পায়ের গোছায় চাপ দিয়ে বসে ছিলেন জ¦লন্ত উনুনের কাছে। মাটির চুলোর গর্তে গাছের ভাঙা ডালগুলো অঙ্গার হয়ে উঠেছে তখন। বললেন, ‘লোকে তোমায় চুলোয় দিয়েছে। শিগগির তুমি অঙ্গার হবে, আগুন ধরবে। তাতে আমাদের ভাত চড়বে। ফসল কাটার পরই তো আসল যুদ্ধ শুরু, তুমি যেও না।’

কাশেম সৌদের চর ছিল প্রচ্ছন্ন। মজনুনের খবর কাশেম সৌদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল নিয়মিত। জোতদারের অগোচরে ছিল না যে, কিষানদের ঐক্যে ফাটল ধরানোর বিপরীতে একা দাঁড়িয়ে মজনুন কথা বলে চলেছে। শত্রুকে পরাজিত করতে গেলে তার বিষয়ে যেমন জানা চাই, একইভাবে জানা থাকা চাই নিজেকেও। মজনুনের অবস্থান, সাধ্য, উদ্দেশ, ভাষ্য কাশেম জানত। আর জানত মজনুনকে ঘিরে পরিবর্তিত পরিস্থিতির খবর। মজনুনকে সবাই বিদেশি বলে দূরে ঠেলছে। দ্বিতীয়ত, মনে করা হচ্ছে সে কাশেম সৌদের চর; যদিও মজনুনের বিরুদ্ধে একটা আধাযৌক্তিক অবস্থান তৈরির জন্য ওটা মূলত মুখে বলা, খুব কম মানুষই অন্তরে সে কথা বিশ্বাস করে। এ অবস্থায় মজনুনের ঠিক কেমন পরিণতি কাশেম সৌদের নাম রক্ষায় কাজে আসবে, আবার আরাধ্য অনৈক্যও বজায় থাকবে, সেটাই ভাবতে বসল জোতদার।

আপন শত্রুকে কাশেম চিনত, নিজেকেও জানত। সিদ্ধান্ত নিতে তার দেরি হলো না।

চিন্তাসহ আলাপের দিনটিতে উলুখের ঘরের পেছন দিয়ে হেলেদুলে ডালপাতা মাড়িয়ে বাঁশের ছিলকের একটা শূন্য কোরা পিঠে ঝুলিয়ে বাড়িতে ফিরছিল ঠুড্ডু। সেটা ওর পাড়ায় যাওয়ার ছোট পথ। বেড়ার ফাঁক গলে আসা যাওয়া করা বাতাস মজনুনদের কথোপকথনের ছিন্নাংশ এদিক ওদিক ভাসিয়ে নিয়ে চলেছিল। খোঁড়া কিশোর ঠুড্ডুÑ কথার ঠোকরে বিবশ করার গুণের কারণে নামটা ওর বন্ধুদের দেওয়া, আর পোলিওকষা পায়ে হাঁটার নিরুপায় ভঙ্গির কারণে বড়রা আদর করে ডাকে তাকে তৈমুর লংÑ চেনা নাম, কানআঠা দুটো শব্দ শুনতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। গাঁয়ে শুধু কান পাতার আড়ালটা পেলেই তাবত গোপনীয়তায় অধিকার জন্মে যায়Ñ হাহাহা! কারণ প্রকৃতি সেখানে সারাক্ষণ আঁড়ি পাতে আর সেই মতো দিকবদল করে। সেখানে জল নড়ার শব্দ শোনে বাজকুরা, কোলার শব্দ পেয়ে এগিয়ে গোখর, তক্ষকের ডাকে সুঁইচোরা সাবধান হয়ে যায়।

বাইরে আলো যথেষ্ট থাকলে ওই ধরনের বেড়ার ফাঁক গলে আসা-যাওয়ায় রত মানুষের ঝিরঝিরে একটা ছবি ঘরের ভেতর থেকে চোখে পড়ে। একটা অবয়ব হঠাৎ থেমে গেছে দেখতে পেয়ে বেড়ার ফাঁকের কাছে চোখ নিয়ে ঠুড্ডুকে চিনতে পারলেন চিন্তা।

-তৈমুর!

ডাক শুনে তড়িৎ খেলে গেল কিশোরের শরীরে, হঠাৎ থেমে যাওয়া কলটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফের চলতে শুরু করল। কোনোদিকে আর একবারও না তাকিয়ে দিলো লং পায়ে ছুট। মঞ্চে ছুটোছুটি করতে থাকা পুতুলের একটা সুতো যদি হঠাৎ ছিঁড়ে যায়, তাকে যেমন দেখায়, ঠুড্ডু ছোটার সময় পেছন থেকে ঠিক তেমন দেখাতো। অপর পাশের সুতোটা অক্ষত ছিল পুতুলের, আর ওই জোরেই ঠুড্ডু মাটির ওপর সচল। রান্নাঘরের পাশখোলা দরজা দিয়ে চোখে উদ্বেগ নিয়ে আরও বার দুই নাম ধরে ডেকে থেমে গেলেন চিন্তা। ছেলেটার ছোটার ভঙ্গিটা এমন যে পিছু নিতেও করুণা জাগে। আর তার প্রয়োজনও নেই। ছোকরা আদৌ ক্ষতিকর নয়। তবু সময়টা এমন যে, ভালোর আর খারাপের ভেতর দ্বিতীয়টার কথাই মনে আগে জাগে।

শরাফের ক্ষেতমজুর হয়েছেন মজনুন, এ কথা জানত কিশোর তৈমুর ওরফে তৈমুর লং ওরফে ঠুড্ডু। যখন মজনুনের কাঁধে হাত রেখে শান্ত চোখে তাকে সব বলছিলেন শরাফ, সেও ছিল পাশে। এটা রীতি। কথার সময় বিশ^স্ত কাউকে পাশে রাখা, যেন সাক্ষ্য থাকে, যেন ভুলে যাওয়া কোনো কথা তুলে আনার সুযোগ থাকে।

কে এই তৈমুর?

কে নয়, বরং কারা।

শরাফের দূরসম্পর্কের আত্মীয় ওরা। পরিবারটার খরচাও অনেকাংশেই শরাফ চালাতেন; তার অবিরল বদান্যতার এও এক উদাহরণ।

তৈমুরের দাদা, জাফর, ছিলেন শরাফের দূরসম্পর্কের ভাই। জাফর এবং শরাফের দাদারা ছিলেন সহোদর। দূরবর্তী ওই সম্পর্ক-সুতো একদিন দড়ি হয়ে উঠেছিল, আর তা ধরে গভীর জল থেকে উঠে এসেছিল শরাফের গোটা পরিবার। গল্পটা খাটো নয়, তাই ছোট করে হলেও বলি।

শরাফের বাবা কলিমকে আটোয়ারিতে মেরে ফেলেছিল এক গ্রামপুলিশ, তার নামও বের করা গেছে- নায়েব, কলিমের ওপর তার ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল। কী সেই আক্রোশ?

একবার খবর পেয়ে ভারতবর্ষে ব্রিটিশরাজের নেশার টোপ চায়ের চালান আটকে কলিম দলবল নিয়ে নিরাপত্তা দেওয়া দলটিকে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন। সেই দলের নেতা ছিল নায়েব। ঘটনাক্রমে সেদিন তার একটি চোখ অন্ধ হয়ে যায়।

 সেই আক্রোশ সে এমন এক সময়ে চরিতার্থ করেছিল যখন তা করার জন্য সময় ভারি অনুকূল, অর্থাৎ, ফসল তোলার কাল। ছড়ি ধরা কেউ ফিরে দু’কথা জিজ্ঞেস করবে না; কাস্তেধরাকেউ যতই গলার রগ ফোলাক, আর কলিম ছিলেন চিহ্নিত কৃষকনেতা। তাকে সরিয়ে দেওয়ার খবরের অর্থ তো ব্রিটিশ ‘দেবালয়ে’ দুন্দুভি বেজে ওঠার মতো উপলক্ষ। কিন্তুÑ গুলি করার অনুমতিটা ছিল না। তাই বেয়নেট বিঁধিয়ে মেরেছিল সে কলিমকে, দশজনে দেখেছে।

শরাফ তখন কিশোর, বোন মিনা তখন শরাফের মায়ের পেটে। তৈমুরের দাদা জাফরের বাবা মেশকাত তখন আসামে। স্থানীয় অসমীয়রা বাঙালিদের ওপর ক্রমশ বিরূপ থেকে বিরূপতর হয়ে উঠছে।

ভাগ্যের বিফল অন্বেষণটা থামিয়ে নিজ গাঁয়ে ফেরার কথা ভাবছিলেন মেশকাত। কোন পথে যাবেন? সোজা পথে যেহেতু বিপদ হতে পারে, একটু ঘুরপথ হলেও আটোয়ারি হয়েই যাওয়া যাক। ভাই কলিমের সঙ্গে এক ছিলিম অন্তত তামাক হোক। যদিও জানেন ওখানেও তখন সরকারি আগুনের আঁচ তীব্র, লোকের মুখ পুড়ছে।

আটোয়ারি পৌঁছে কলিমকে আর পেলেন না মেশকাত।

আটোয়ারির মানুষ কলিমকে ভালোবাসত। একজন ছিলেন, হানিফ নামÑ মৃত স্ত্রীর সোনার গয়না বন্ধক রেখে কিছু পয়সা তুলে দিয়েছিলেন মেশকাতের হাতে, কলিম তার কাছে পাওনা ছিলেন ওই ক’টা টাকা। ভাইয়ের পরিবারটিকে বাঁচাতে হলে পাড়ি দিতে বিস্তর পথ। নিজ সঞ্চয়ের সঙ্গে জোড়া হানিফের দেওয়া টাকা ক’টা ফেরার পথে ভীষণ কাজে এলো।

মিনা তখন বাইরের পৃথিবীর ডাকে পেটের ভেতর পা ছুড়ছে।

সেইসব দিন শরাফের স্মৃতিতে সজীব। নিজ দায়িত্ব পালনে তিনি সতর্ক ভীষণ। এরই ধারা মেনে বিকলাঙ্গ তৈমুরের প্রতি শরাফ মনোযোগী হয়েছিলেন।

ওকে সারিয়ে তুলতে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিল শরাফ। রঙ্গনপুর শহর অব্দি নিয়ে ইংরেজ ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। নীল চোখের ওই দরিদ্রসেবী সাহেব ডাক্তার কোনো টাকা রাখতেন না। চিকিৎসা হিসেবে কতকগুলো ব্যায়াম দিয়েছিলেন, আর কিছু খাবারে বাছ। খোঁড়া একরোখা এই কিশোরকে নিয়ে শরাফের তখন অনেকটা সময় ব্যয় হয়েছে। ব্যয় করা সময়ের সমানুপাতে বাড়ে মায়া। তো- দু’পাশে মায়ার পক্ষ বিস্তারে এ ক্ষেত্রেও কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি।

যাহোক, মনচপল ওই কিশোর শরাফের কাছে যেতে যেতে, পথে অর্ধেকটা ভুলল, বাকি অর্ধেকটা কানে তুলল, তবে মূল হারাল না।

মজনুনকে বোঝা শরাফের সংবেদনশীল মনের জন্য সহজ ছিল। কারণ তাতে শক্তি জোগাত তার পেছনের সব দিন। বাড়ির উঠোনে ছাল-ওঠা, বাঁকা পেয়ারা গাছের নিচে মসৃণ পিঁড়ি পেতে বসে শরাফ তামাক টেনে চললেন। তামাকের নীল ধোঁয়ায় কাঁপতে থাকল পেয়ারা গাছের টিয়ে সবুজ পাতা।

সে গাছে পাতাই ফুটত কেবল, ফল নয়। গাছটা বারবার কেটে ফেলার কথা তুলত মিনা। শরাফের তেরো বছরের ছোট সেই কণ্ঠলগ্না বোন। গলা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ভেজা রক্তাভ চোখ মুছে একদিন শরাফই তাকে পাঠিয়েছিল দশ গাঁয়ের পর।

বরের ভালোবাসা পেয়েছিল মিনা, আর বয়েস কম বলে মিলিত সিদ্ধান্তেই ওরা সন্তানাদি তখনও নেয়নি, যেটা বিরল। চাপটা দু’জনে মিলে সয়েছে। তারপর- চার বছর আগের এক অগ্রহায়ণের কথা। তখনও রামচন্দ্র জমিদারের কাল। সম্পদ ক্রমশ কমে আসতে থাকলে ছোট মনে ভয়ের সঞ্চার হয়, তখন সেই ছোট মন বারবার লঙ্ঘন করতে থাকে। রামচন্দ্রের তখন চলছিল ওই কাল। তার পরামর্শক আজকের কাশেম জোতদারের নামের শেষে তখনও সৌদ লাগেনি।

মিনার বরÑ মনোয়ার, লোকে ডাকত মনু… কিছু কি মনে পড়েছে? মনু-মিনা জুটি ছিল গাঁয়ের মুখে মুখে, কারণ মাঠে মনু যেমন দক্ষ কিষান, মিনাও তেমন কিষানি।

মনুর আরও এক গুণ ছিল এ ছাড়া- সে ভালো লাঠি চালাতে পারত। লাঠির বাতাসপেটা চোটপাট সে শিখেছিল নানা মুর্শিদির কাছ থেকে।

ধান কাটা হয়ে গেলে তার নানা মুর্শিদ, লোকমুখের মুর্শিদি গ্রামে গ্রামে মৌসুমবিলাসী কিষান পরিবারের অনুরোধে মাঠ থেকে উঠোনে দলবল নিয়ে মুখে রঙচঙ মেখে লাঠির খেলা দেখাতেন। তার বিচিত্র লাফঝাঁপ আর বেহাড় কবজির মোচড়ে সাত রঙে রাঙানো জোড়া লাঠির হাওয়াকাটা ঘূর্ণি কিশোর মনুর মনে তাকে নায়ক করে তুলেছিল।

রামচন্দ্র রাজশাহীর ইংরেজ জেলারের স্নাতক শ্যালক ডেভর চ্যাপম্যানের মনোরঞ্জনের জন্য একদিন তাকে ডেকে নিলো নিজ প্রাসাদের মাঝ উঠোনে। লাঠিখেলা চলল, একসময় থেমেও গেল। তারও বহুক্ষণ পর চিবুক উঁচিয়ে ডেভর সাহেব বেরোল, তেলতেলে মুখো রামচন্দ্র বেরোল, হাতের তালু ঝেড়ে কাশেম সৌদ বেরোল, কেবল মনু আর বেরোল না।

মনুর খোঁজে যারা এলো তাদের বলল কাশেম, ‘আরে সে তো বেইরিয়ে গেছে কবেই! কোথায় গেইছে সে খবর তো আমার রাখার কথা নয়!’

কথা হলোÑ মনুকে মানতো লোকে। জমিদারপুত্র সূর্যের সঙ্গে তার সখ্য। সূর্য তো মিশতেন সবার সঙ্গেই। তিনি স্বদেশি করেছেন, আর যা বুঝলাম, ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভাবশিষ্য। স্বদেশ ইংরেজের কাছে চেয়ে নেওয়ার বিষয় নয়। আগে জাতপতনের সূত্রগুলো ছেঁড়ার ইচ্ছে ছিল তার। বলতেন, ‘নয়তো স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে।’

ওনার সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন পুতুল, বিরাজ ওঁরা, গাঁয়ে এসেছিলেন, পরে তাঁরা শত্রুর মতো হয়ে উঠলেন; যদিও ওঁরাও স্বদেশি করতেন, আর ভারতবর্ষের জন্য তাঁদেরও ত্যাগ অনেক, সূর্যের মতোই। 

মনু একবার বাড়িতে সুর করে গাইছিল, ‘পূর্বাচলের পানে তাকাই, অস্তাচলের ধারে আসি।’

মিনা শুনে বলেছিল, এ গান তুমি শুনলে কই?

এটা সূর্যের প্রিয় গান।

মনুর সঙ্গে সূর্যের সখ্যের কথা জানতে পেরেছিলেন শরাফ। জানতেন, সূর্য ভালো লোক, তবু তার সঙ্গ ছিল বিপদজনক। বোনাইয়ের জন্যে ভয় পেতেন, কিন্তু কিছু বলতেও পারতেন না, কাছে এসে ফিরে যেতেন, কিছু বলতে বুকে বাধতো। কী বলবেন?

সংক্ষিপ্ত বিচারে সূর্যের ফাঁসির খবর এলো, জনসমক্ষে ফাঁসি।

মনু অস্থির হয়ে কাটাল ক’টা দিন। আর মনের ভেতর যা চলছিল তা ভাগ করে নেওয়ার মতো মানুষ কেউ ছিল না। মিনা নয়, শরাফ নয়, নিজ বন্ধুবান্ধবরা তো নয়ই। সূর্যের বিপ্লবী, অথচ শান্ত জীবনদর্শনের সংস্পর্শে এসে জীবন সম্বন্ধে মনুর ধারণার একটা বদল ঘটছিল, আর এই বদল যার সঙ্গযাপনকে ঘিরে, তার হঠাৎ থেমে যাওয়াটা ছিল অঙ্গচ্ছেদের মতো বেদনাদায়ক।

আমার ধারণা, মনুর মনে দুটো শূল বিঁধেছিল। একটা মনুর ডান মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করেছিল, আরেকটা করেছিল বাঁ মস্তিষ্ককে। একটা তার সঙ্গস্মৃতিতে আঘাত হানলÑ যেখানে সূর্যের সঙ্গে তার স্মৃতি তাকে ভাই হারানোর যাতনা দিয়ে যাচ্ছিল। অপর শূলটা, নিজেকে যে আত্মিক স্তরে দেখার কল্পনা মনু করেছিল, আঘাত হানল সেই কল্পনায়। একটায় বিষনীল হলো হৃৎপিণ্ড, অপরটায় ছিঁড়ে পড়ল স্বর্গ।

এরপর মনে মনে কোনো সিদ্ধান্তে এসে থাকবে হয়ত মনু, কে জানে!

এবার রাতপাখি কুসুমের প্রসঙ্গ। এ জায়গাটা ঠিক বুঝতে পারিনি।

পাতানো সখা বীজদার রফির সঙ্গে এসে দেখা করে গিয়েছিল কুসুম। বিষণ্ন মুখে বলেছিল, ‘অনেক কথা আছে তোমার সঙ্গে।’ বীজদার রফি ছিল মনুরও বন্ধু।

কুসুম জমিদারের সবচেয়ে প্রিয় রাতপাখি, জানে সবাই। রফিকে প্রথমে পাঠিয়ে, পেছন পেছন কুসুম এসে খুব অল্প সময়ই কথা বলেছিল মনুর সঙ্গে।

এরপর দ্রুত উঠোন ছেড়ে, বেত বনের আড়াল নিয়ে হেঁটে গিয়ে দূরের হালটে উঠে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল।

মনু জেনেছে তখন, সূর্যকে ধরিয়ে দিয়েছে পিতা রামচন্দ্র নিজেই। কিন্তু নাম আড়াল। তার দুর্বুদ্ধি-গাছের গোড়াটা স্বার্থপরতা, কাণ্ডটা ইংরাজ, এবং দুর্মতি কাশেম সে গাছের শাখা আর পাতা দুটোই। কাশেমের হাত হয়েই ওটা হয়েছে। বিনিময়ে একটা বড় পত্তনি পেতে চলেছে দুর্মুখটা।

কুসুম এসব কথা পুতুলদেরও বলে এসেছে- সূর্যের যারা বিপ্লবী বন্ধু। ওরা ওদের মতো এগোবে ঠিকই। কিন্তু কুসুমের মনে হয়েছে, গ্রামের কিষানদের ভেতর এ নিয়ে একটা ঢেউ ওঠা উচিত। সময়ে যেন ওরাও বিহিতে নামতে পারে। কিন্তু বিহিতের পথ ধরে সেই হিতের দিকে কিষানদের এগিয়ে নিতে পারে কে? তখন মনুর মুখটা তার মনে ভেসে উঠেছিল, আর ওটাই ছিল উত্তর। মনুর নাম সে জানত না। শুধু জানত কিষানদের ভেতর ওই এক লোক আছে সূর্যের খুব বন্ধু।

ওই একটা সূত্র ধরেই মনুর নাম এবং ধাম সে খুঁজে বের করেছিল, এবং ফিরে যাওয়ার পরদিনই কুসুম মরল।

শান্ত মনুর মনের ভেতর ফের উঠল ঝড়। কুসুম কিষান মনুর মনকে কথায় প্রেরণার আঁচে উত্তপ্ত করে গিয়েছিল। বলেছিল, ‘তুমি না পারলে আর কে আছে? তুমি সূর্যের নিকটজন। শোধ নেবে না? মরণ তো চারদিকেই, কিছু করো বা না করো। করেই না হয় মরলে! মৃত্যুর ভয় কি আমারও নাই মনু মিয়া? দেখো, তারপরও এলাম। তুমি এর মূল্য বোঝো, যতই চুপ থাকো না কেন, আমি ঠিক জানি। সূর্য সবার সাথি, কিন্তু বন্ধু সূর্য সবাইকে বানায় না।’

মনটা উত্তপ্ত ছিল বলেই সেখানকার মনহাওয়া ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছিল, আর ওই শূন্যতা পূরণের জন্য তখন ধেয়ে এলো কুসুমের মৃত্যুর বার্তাবাহী হাওয়া। ঝড় উঠল। কিন্তু ওই ঝড়ে সেদিনই সব উড়িয়ে দিতে মনু পারল না, কারণ ঠিক লোকদের সংগঠিত করা, আলাদা করা এখনও বাকি…

মুহূর্তে মনু আমার কাছে তুমি থেকে আপনিতে উন্নীত হলেন।

আমি দেখতে পেলাম, মনু ঝড়ের শক্তি একটা লাল কৌটোয় ভরে তার জামার পাশথলেতে রাখছেন। জামার স্বচ্ছ কাপড় ভেদ করে লাল কৌটোটা দেখা যেত, লোকে তখন জিজ্ঞেস না করে পারত না। লোকের ভেতর লুকিয়ে ছিল চর। ওরা মনুর পিছু নিতে শুরু করল, বাড়ি চিনে এলো; মনু টের পেলেন সব। দরজা দিয়ে শেকল টেনে দিলেন, কিছু বললেন না, এবং-

পরদিন বাজারে তার বিশ্বাসী দুই সহযোদ্ধা শায়েস্তা আর ফকিরকে সেই কৌটো খুলে দেখালেন।

ক্ষমতাবানের কান হতে হয় অসংখ্য, চোখ হতে হয় পুঞ্জাক্ষীপ্রমাণ এবং রামচন্দ্রের ছিলও তাই। তাই শায়েস্তা আর ফকিরের সঙ্গে ওই কৌটোর ভেতরটা দেখে নিলো আরও অনেকেই। ঘরের চালা, কঞ্চি বেড়ার ফাঁক, পায়ের নিচের মাটি; কে কার চেয়ে কম? ডেভর চ্যাপম্যান লাঠির খেলা দেখতে হয়ত চায়নি, উৎসাহ রামচন্দ্রের দিক থেকেই বেশি ছিল সন্দেহ নেই। বাকিটা সামলেছিল ভবিষ্যতের কাশেম সৌদ জোতদার।

পেয়ারা গাছের নিচে বসে হাওয়ায় কোমল সবুজ পাতার নড়া দেখে মিনার কথার সুতোটানে আরও কত কথা মনে এলো শরাফের। মনের গতি আবার ফিরল মিনায়। সে পাশে এসে দাঁড়িয়ে।

‘ভাইজান তুই এই বাঁজা গাছ কাট, ফলদ কিছু লাগা!’

রায়ের প্রচ্ছন্ন নিষ্ঠুরতা মিনার কোমল কণ্ঠে মুকুট হতো না বলে কথাগুলো ভীষণ মিষ্টি শোনাতো। কিন্তু শরাফ যে ভারি বিষ্ণুধর্মী। বলতেন, ‘নারে, কাটব না। দ্যাখ না, কী সুন্দর পাতা দেয়! এই সুন্দরও তো একটা ফল!’

মজনুনকে নিয়ে ভাবতে বসার ধারাবাহিকতায় অত কথা মনে পড়ল। শরাফ ভাবলেন, সৃষ্টিকর্তা কি কোনো ইশারা দিচ্ছেন?

শরাফ কিষান। স্রষ্টা বা প্রকৃতির ইশারার প্রতি ওঁরা ভারি সাবধানী। প্রয়োজনে ভোগেন, কিন্তু উপেক্ষা করার কথা মনেও আনেন না। কিন্তু সেদিনের ব্যাপার ছিল অন্য, যা বুঝলাম। আসলে শরাফ নিজেই তো প্রকৃতি। তাই স্মৃতির এগিয়ে দেওয়া শব্দের ফুল মনের সুতোয় গেঁথে পরিকল্পানার যে মালা তিনি তৈরি করেছিলেন, সেই মালার ঘ্রাণ, বাক্যের ভাষ্য তো আসলে ঈশ^রের মুখোশের আড়ালে নিজেরই মনোবাসনা।

এ মালা তিনি পরাবেন কাকে? স্মৃতি, বর্তমান, আবেগ, যুক্তি, স্নেহ, মননাদ, গন্তব্য সব মিলে মনের ঘরে বিচিত্র এক আবহ তৈরি হলো। সেই মালা পরাবেন বলে শরাফ ওই আবহকেই আহ্বান করলেন।

আমি কল্পনায় দেখতে পারছিÑ

আবহ তখন নারীমূর্তি ধরে শরাফের সামনে আবির্ভূত হলেন। বললেন, ‘আমি এসেছি শরাফ। মানুষের মনে রাখা উচিৎÑ অতীত ও ভবিষ্যৎ, আবেগ ও যুক্তি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মুদ্রাটা হাতে নিলে দুটো একসঙ্গে আসে। যারা অতীত থেকে ভবিষ্যৎকে, আবেগ থেকে যুুক্তিকে; ভবিষ্যৎ থেকে অতীতকে, যুক্তি থেকে আবেগকে বিযুক্ত করতে চায়, তারা ওই মুদ্রাই চেনে না। তারা ওই মহাস্মারক কখনও দেখেনি বলে নিরুপায়। দেখলেও সাদা চোখে দেখেছে যা না দেখারই তুল্য। তোমার হাতের এই মালা আমার কণ্ঠেই বিশেষ শোভনীয় হবে সন্দেহ নাই। তুমি পরিয়ে দাও।’

শরাফ ওই মালা পরিয়ে দিলেন। আর ওই নারীও অন্তর্হিত হলেন।

‘কিন্তু মিনা কি রাজি হবে?’

লাখ কথার আগে মেয়ের বিয়ে হয় না, কথায় বলে। প্রকৃতি বিয়োগান্তের ফাঁদে পা রাখতে চলা নারীর রাজি হতে কথা লাখ পর্যন্ত পৌঁছেছিল কিনা বলতে পারি না, তবে সম্মত মিনা হয়েছিল। তার আগে মজনুন।

কতদিন আগের সব কথা কেমন স্বপ্নালু চোখে বলে যাচ্ছে রফিক। লোকটাকে বড় ভালো পেলাম।

মনু তো আর ফিরল না। তারপর তার সংসারে কী হলো? সন্তান না হওয়ায় নিঃসঙ্গ মিনাকে মনুর পরিবার রাখতে চাইলো না। মিনা থাকতে চাইলেও কাজের লোকের বেড়ে কোনো পদ তার জন্য নেই। শরাফ তাই বোনকে নিজের কাছে নিয়ে এলেন। যত বাকবিতণ্ডাই হোক, বোনের এত ভালো হলো। লোকের কথা আর ক’দিন। ক’দিন ক’দিন ছ’দিন ছ’দিন।

সারাক্ষণ কারও আড়গান না শোনায় ধীরে নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পেতে থাকল মিনা। নিজেকে পয়া ভাবতে শিখল আগের মতো।

কিন্তু মজনুনকে বিয়ে করতে রাজি হওয়ার পর কী ঘটেছিল? গল্পের স্রোতাবহ আমার মনে দুই কূল ভেঙে এগোচ্ছে।

শরাফ মজনুনকে তার বড় ঘরে ডেকে দরজা ভিড়িয়ে বললেন, ‘আমি যতদূর জানি, বাড়িতে তোমার কেউ নাই। সেখানে ফিরে যাওয়ারও কোনো ইচ্ছে তোমার নাই। আমি জানি না, মন বদল করেছ কিনা। যদি না করো, যদি এখানে থাকার কথাই তোমার মনে থাকে, তাহলে আমি শরাফ, তোমার দেখভাল করতে রাজি আছি। আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন অনেক। সবাইকে দেন, কিন্তু সবাই বোঝে না। আমি বুঝেছি তাই আমার কোনো অভাব নাই, অভাবের জায়গাটা মনে। আমার কোনো খেদ নাই, কারণ খেদের জায়গাটা মনে। আল্লার নেয়ামত না বুঝলে সারাক্ষণ বুক চাপড়াতাম, এত দুঃখও আমি পেয়েছি। তোমার সাথে একদিন এসব নিয়ে আলাপ করতে যাচ্ছিলাম। পরে বন্ধ করলাম, দেখলাম, মনে হইল, তোমার কোনো আকর্ষণ নাই এদিকে। আমি সেদিন একটু ধাক্কা খেলাম; তুমি দোষ নিও না। আমি তো তোমাকে কোনো সম্পত্তির গল্প বলছিলাম না মজনুন, আমার সম্পত্তি বলতে কিছু নাই। যা আছে, তারে সম্পদ বলা যায়। মানুষ; আমার আছে শুধু মানুষ। সম্পত্তি হলো বিষয়; বিষয়ে বিষ থাকে। আর মানুষে থাকে অমৃত; বিষের বিপরীত। অমৃত হইল আসল সম্পদ, কারণ, অমূল্য। আর সম্পত্তি মূল্যমানের সীমায় আটক। আমার আছে অমৃত, আর অমৃতের ওই ভাণ্ড, আমার চিন্তা নাই। ভাই মজনুন, তুমি আমার মাঠে ঘাটে না, এখানে, আমার এই বুকের মধ্যে থাকো। আমার এখানে অনেক মণিরতনের বাস। এই বোধ ছিল না আমার; এক রাতের পর এসেছে। আমি জানি না তুমি আমার কথা বুঝতেছ কিনা। তোমারে একটা গল্প বলি। একবার আমার ঘরে এক সাঁই তাঁর শিষ্যসহ আসন নিলেন। আমাকে কাছে ডেকে কত কথা যে জিজ্ঞেস করলেন! নিজে থেকে কিছুই বললেন না, সব আমাকে দিয়ে বলিয়ে নিলেন। আমি নিজেও জানতাম না, এত কথা এইখানে লুকানো। নাকি সব হাওয়া থেকে টেইনে আনলাম! সেই রাতে তিনিই আমায় ওই মণিরতন চেনালেন। চেনার পর আমি তাদেরই কেবল সংগ্রহ করেছি, জমায়েছি। সেই রতন হলো মানবরতন। অঘ্রাণের এক মেলায় তিনি এসেছিলেন। আসরের সময় বললেন, দূরের পথ, শরীর শ্রান্ত, বিশ্রাম চাই। সবাই তারে নিতে চায়। আমি নত মুখে দাঁড়িয়েছিলাম, সংকোচে অনুরোধ করতে পারি নাই। কী যেন বলতে গিয়ে আবার থম ধরলাম, তোমার সামনে যেমন ধরি মাঝেসাঝে, সাঁইজি দেখলেন। তার শিষ্য ছিলেন গৌরবরণ এক কিশোর। টানা টানা কালো চোখ, মাথার তালুতে চাঁদের মতো আলো ঠিকরায়। সাঁই তারে পাঠালেন, বললেন, যাও, ঘর দেখে আসো তার। গোরা কিশোর আমাকে নিয়ে চললেন, আর পেছনে ভক্তকুলে ঘেরা সাঁইজি গান ধরলেন। ভাবলাম, আমার কি আর এত সৌভাগ্য হবে? ভেইবে আমি কাঁদছিলাম। দেখে গৌর কিশোর মধ্যপথেই থামলেন। বললেন, ঘর দেখায় কাজ নাই। ভোর রাতে আমার ঘরে তাঁরা উঠলেন। একটা রাত, মাত্র একটা রাত তাঁরে পেয়েছিলাম। ওই এক রাতের সম্পদ আমার সব পুরুষের সারা জীবনের সম্পত্তিরে অপর পাল্লায় হারাতে পারে। তোমারে দেখামাত্র আমার একটা হারানো মণির কথা মনে পড়েছিল ভাই। সেও ছিল আমার ভাই। আমার সেই হারানো মণির চোখে যেই আলো ছিল, ওই আলো তোমার ভেতরও দেখলাম। তোমারে সেদিন সেটাই বলতে চেয়েছিলাম, পারলাম না। আজ যদি শুনতে মনঃস্থ করো, তার কথা শোনাইতে পারি।’

মজনুন মনুর কথা আদ্যপান্ত শুনলেন। শুনলেন মিনার কথা। সব শেষে শরাফ বললেন, ‘তোমারে যখন দেখলাম, তোমার কথা শুনলাম, বারবার মনে হচ্ছিল আল্লাহ যেন আমার মনুকেই আবার এখানে পাঠালেন। তার লীলা আমার অজানা। লীলার অতল নদীতে শরীর না ভাসায়ে পারি না, ভাসাই। তারে বলি, মওলা, তুমি আমার ধাতা, তুমিই আমার ধাত্রী জগতী, যেখানে খুশি নাও। আর যদি ডোবাতে চাও, ডোবাও, ভয় আমি পাই না। ডুবতে ডুবতে ভাসতে ভাসতেই আমি তারে পেলাম, সে আমারে পেল। আমি এখানে ইশারা দেখলাম। তুমি আমার কাছে জলবতী মেঘের মতন। কিন্তু মনের শুকনা মাঠে তুমি নামবে কিনা বলতে পারি না। আমার কথায় কাব্য করার দুর্মতি আছে। তুমি বিরক্ত হইতেছ নাতো? তুমি কি বলতে পারো? তুমি কি নামবে আমার মাঠে? তুমি কি আসবে আমার এইখানটায়?’

 শরাফ এক হাত বুকের ওপর রেখে সজল চোখে তাকিয়ে থাকলেন নতমুখী মজনুনের দিকে, দেখলেন, মজনুনের কালো ঘাসের অরণ্যে গলা বাঁকানো ক’টা সাদা সারস।

একা মজনুন গেলেন দেবীজঙ্ঘার পারে, বললেন, ‘আমার মা বেঁচে নেই, যে বেঁচে আছে তার কাছে আমি যাব না। এখন তুমিই আমার আছো, তুমিই বলো কী করব আমি।’

এমন সময় পাশে এসে বসলেন মহেন। ‘মজনুন, তুমি এখানে আমার একাকিত্ব দূর করো’, বললেন তিনি।

মজনুন কিছুই শুনতে পেলেন না। মহেন জলের ওপর হেঁটে ওপারে গিয়ে তীরবর্তী একটা বাঁশঝাড়ের কাছে দাঁড়ালেন। বাতাসের প্রবাহ এলে তাতে চেপে বাঁশঝাড়ের ভর বাড়িয়ে নুইয়ে নামালেন জলের ওপর। ভাবলেন, মজনুন তাতে ভয় পেয়ে সচকিত হবে। আর ভীতির ছিদ্রপথ দিয়ে তার মনের ভেতর ঢুকে হৃৎপিণ্ডে অঙ্কুশ ছুঁইয়ে কথাগুলো বলবেন আবার।

মজনুন দেখলেন বাতাসে বাঁশের ঝাড়গুলো নুয়ে পড়ছে। তাদের ভেতর নদীবর্তী একটির সবচেয়ে বড় বাঁশটি নুয়ে এসে ডগার সমস্ত পাতায় দেবীজঙ্ঘার জল ছুঁয়ে দিলো।

তিনি এখানে প্রকৃতির সম্মতি দেখলেন। চিন্তার বাড়ি ফিরে গিয়ে সন্ন্যাসী উলুখের দেখা মিলল। উলুখের দেখা পাওয়া দুরূহ, চিন্তাই বরং চলার পথ আড়াল করে ঘুরে বেড়ায়, আর আজ উল্টো। চিন্তা বাইরে কোথাও গেছে আর সন্ন্যাসী ব্যস্ত ঘরকন্নায়।

তখনকার মতো চেপে গিয়ে, রাতে শরাফ আর দেবীজঙ্ঘার সায়ের কথা শোনাতেই উলুখ বললেন, ‘তোমার দশা ঘনিয়েছে। তুমি আর এড়াতে পারো না গো, আর পারো না।’

চিন্তা এমন কোনো কথায় না গিয়ে কৌতুক করে বলল, মিনাকে সেও চোখে চোখে রেখেছে এতদিন, কিন্তু বন্ধুর জন্য ছাড় দিতে তার আপত্তি নাই।

দুই বন্ধুর রসিকতায় পরিবেশ হালকা হয়ে উঠলে, বাছবিচারের বোধসহ ভবিষ্যৎচিন্তা ক্রমেই লঘু হয়ে এলে, আবেগের বেগ এলো সিদ্ধান্তে ওদের। ফলে যুক্তি প্রস্তুত হতে থাকল।

মজনুন তার সম্মতির কথা জানালেন শরাফকে। কিন্তু শরাফের জন্য একটা কঠিন সময় এলো এরপর। ভাই হিসেবে মিনার মনের একাংশের ওপর দখল তার থাকতেও পারে, কিন্তু সবটাকেই দখলী জমি জ্ঞান করে রীতিমতো তা নিলামে তোলার সিদ্ধান্তটা রাতারাতি নিলে, সেই নিরুপায়ের মন যদি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে, দোষ দেওয়া যায়?

তরুণী মিনা বিধবা, ভাইয়ের অঙ্গনে লালিতা, শ্বশুরকুলবিতাড়িতা, সময়ের বিচিত্র দুঃশাসনে নির্বাক এবং ক্ষেত্রবিশেষে জ্যেষ্ঠের সিদ্ধান্তেরও মুখাপেক্ষী। কিন্তু-

মনুর স্মৃতি?

সময়ের নদী বয়ে যাওয়ায় তার ওপর পলি পড়েছে বটে, অস্তিত্বহীন তো আর হয়ে পড়েনি।

তার আসনে অন্য কারও পুনরাধিষ্ঠান? মনটা যে একেবারেই তৈরি নয়।

কিন্তু ‘না’ করবে সেই মনও কি মিনার ভেতর বেঁচেছিল?

ধীরে ধীরে একটা মিশ্র নির্লিপ্ততা তাকে দখল করেছিল- যা হয় হোক। নতুন করে কোথাও যে যেতে হচ্ছে না এও তো ভালো। ভাইকে বলল, যেমন আছি তার চেয়ে, যেমন থাকব তার কোনো ইতরবিশেষ আছে? 

মিনার মনের এ অবস্থায় সম্পর্কসুতো জোড়াটা ঠিক হয়নি। প্রকৃতি মুক্ত ইচ্ছের মূল্য দিয়ে প্রতি মুহূর্তে ভবিষ্যৎ তৈরি করছে। তাকে তা করতে দাও। কিন্তু শরাফ এখানে আবেগ খাটিয়ে বোন এবং মজনুন দু’জনের কাছেই কেমন অপরাধী হয়ে থাকল।

ঠিক হয়েছিল, ধান তোলার পর হবে বিয়েটা। কিন্তু শরাফের শুভাকাক্সক্ষী, বন্ধু অঙ্গিরা বসল বেঁকে। কাঁচাপাকা দাড়ি নেড়ে বলল, ‘কাল বিঘ্নকর, শাস্ত্রে আছে। তাই তো বলে, শুভস্য শীঘ্রম। আর ধান তোলার কালে গণ্ডগোল ঘনাবে নিশ্চিত। কলমার কাজ এখনই সেরে রাখো শরাফ। পরে কী হবে বলা যায় না। আর গণ্ডগোল বাধলে কোথাও পাঠিয়ে দিও।’

শরাফ বলল, ‘মজনুন কোথাও যাওয়ার ছেলে না। গেলে তো আরও আগেই যেতে পারত। আর মিনাও তেমন মেয়ে না, বরং এসব থেকে বহুদূরের। তোমরা তাকে চেনো নাই আজও? জানি না অঙ্গিরা, কী করতে কী করতেছি।’

প্রতিবেশী কিষান সলিম বলল, ‘মজনুনকে আমরাও চিনি। কলমা তো পড়িয়ে রাখতে পারো। ভালোর জন্যে বলছি। কাশেমের মনে আছে মনুর কথা। তাহলে? মিনার কথা কি আর মনে নাই!’

 শরাফ বলল, ‘তাহলে বিপদ তাতে আরও বাড়ে। কমে না।’

গফুর কাছে এসে শরাফের কাঁধে হাত রেখে বুক খালি করে শ্বাস ফেলল। ‘মজনুন বড় দুঃখী। আমাদের মিনাও তাই। ওদের মিলায়ে দিতেছ, আল্লাহ খুশি হবেন। ওরা দুটোই অনাথ। অনাথের নাথ আল্লা। কী বলো শরাফ। আল্লা তো মানো।’

শরাফ বলল, ‘ওমা, তুমি কোথায় পড়ে আছো। আলাপ তো ওই বেড়া ডিঙায়ে গেছে কবেই!’

সুতরাং বিয়েটা শিগগিরই হলো। কিন্তু দু’জনের মনোভাব কী হলো বলা যায় না।

মজনুনকে এড়িয়ে চলতেন মিনা। আগন্তুক মজুরের জীবনে ওই কিষানিই প্রথম নারী। কিন্তু কিষানির জীবনে মজুর প্রথম পুরুষ নন। মিনার মনে অকেজোর প্রতি বিচারের একটা নির্মম মানদণ্ড ছিল। যে মানদণ্ডে পেয়ারা গাছের বিরুদ্ধে অমন রায় মিনা উচ্চারণ করত। মজুর মজনুনের পাল্লা কিষানি মিনার ওই মানদণ্ডে আকাশমুখী হলো। মিনা জানত মজনুন লড়াকু, ঠিক যেন মনু। সেটা ওর মনকে মুগ্ধ না করে আরও বিষিয়ে তুলত।

নবাগত প্রতিবেশিনী বধূ অতসী এসে বলে গেল, ব্রীঢ়াবতী মিনা।

অতীতের কারণে কিছুটা সংকুচিত কিনা, ভাবল সালমা, শরাফের অর্ধাঙ্গিনী।

শরাফ ভাবলেন, ‘থাক, এবার সময়ের ব্যাপার।’

মিলিত ওরা হলো ঠিকই, কিন্তু মিলন ওদের ঘটল না। মজনুন-মিনা ছাড়া সত্যটা জানল কেবল দেবীজঙ্ঘা নদী। মজনুনকে শরাফ রাতপাহারার কাজ থেকে অব্যাহতি দিতে চাইলেন। কিন্তু সময়ের রাতমজুর তা প্রত্যাখ্যান করলেন। শরাফের তোলা নতুন ঘরে মন আটকের চুম্বক নেই। তাই হিমপড়া রাতের সুপরিসর পাকা ধানক্ষেতের মধ্যখানে তোলা ওই কুঁড়েঘরে তার মন আশ্রয় নিলো।

বেশ। কাশেম সৌদ সিদ্ধান্তে এসেছিল আগেই। এবার থাকল কেবল ঠিক সময়ের অপেক্ষায়।

মধ্যরাতে তামাকে খিদে উতরে পেটেও খিদে পায়। রাতপাহারার মজুরেরা তাই পিঠা, চিড়া, মুড়ি, চিনির বড় টুকরো এসব কাপড়ে বেঁধে সঙ্গে রাখত। মাঝরাতে পুঁটলি খুলে খেতো, এ তাকে ভাগ দিত। কুঁড়ের বাইরে কেঁপে কেঁপে কুয়াশা যেত, পর্দার ওপারে বন এগিয়ে আসছে বলে বিভ্রম ঘটত। আজকের মতো আল-সীমানা তোলা একীভূত ধানী জমি তখন ছিল না। চাষের জন্য অনুকূল জমি পরিষ্কার করে বীজতলা তৈরি হতো, তারপর বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে ছিটাবনের আড়াল নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকত টুকরো টুকরো অনেক ধানের ক্ষেত।

কাশেম সৌদ আপ্যায়ন করাতে শুরু করল মুসলমান বর্গাদার ক্ষেতপ্রহরীদের; প্রথমে।

‘আমার বর্গাদাররা আমার ভাই। একই মাটির আমরা পুত, ঠিক কিনা। স্বীকার করি, ভুল বোঝাবুঝি কিছু হয়েছে, তা ভায়ে ভায়ে তো অমন হয়ই ঠোকাঠুকি। কথায় বলে, ভাইয়ের মিত্র ভাই, আবার ভাইয়ের শত্রু ভাই, যেমন মাছের শত্রু ঘাই। ভুল স্বীকারে লজ্জা নাই, ঢাকতেই লজ্জা, আমার বাবা আমারে শিখায়েছিলেন। আল্লাহ তারে বেহেশত নসিব করুন। তা, আমি বুঝদার আদমি, তোমরা নাফরমানদের সাথে না মিলে আমারে বুঝিয়ে বলতে! অনেক কিছু থেকে রেহাই পেতে কসম! মানুষ আমি এত খারাপ না। কিন্তু এটাও আমি মানি, আল্লাহ সোবহান সব মানুষ সমান বানান নাই। বড় ছোট কাছের দূরের বানিয়ে পরীক্ষায় ফেলেছেন। দেখো, তোমরা এবার ঠিক এমনই এক পরীক্ষায় পড়েছ। এই জমিন মুসলমানের দখলে আসায় কিছু লোকের মনে তুষের আগুন। চোখে আগুন, দাঁতে বিষ। জিভটা এই এমন, সাপের মতন দুই ফালা, কেমন হিলহিল করে, ফোঁস ফোঁস ছোবল দেয়। আমার ভাইয়েরা, তোমরা কিন্তু সতর্ক থাকবে।’

এলো গুড় মাখানো চিড়ার মোয়া, মুড়ির মোয়া, বাতাসা, পিঠা হরেক।

কিন্তু সবদিন সবার কাছে এসব যাবে না। একেকদিন যাবে একেকজনের কাছে। কারণ কাশেম সৌদেরও তো সাধ্যের সীমানা আছে, ইচ্ছের ব্যাশ-কম আছে।

মজনুনদের পালা এলো, এবং প্রথমবার, সেদিন নিয়মিত শোনা খাবারের পাশাপাশি সবার জন্য এক টুকরো করে মসলা মাখানো মুরগির মাংসপোড়া।

সবাই মুখে তুললেন। খেলেন না কেবল মজনুন। হাতে তুলে রেখে দিলেন। মাছ ছাড়া অন্য আমিষ তার মুখে রোচে না, তখনও। তার ওপর একটু কি টকে গেছে মাংসের আঁশ?

সেদিন মাটির কলসের জলও কেমন মৃদু লবণগোলা মনে হলো, আবার খানিক তিতকুটে মিঠা, কেমন বরাবরের মতো নয়।

যে দুটো লোক এসে খাবার দিয়ে গেছে, তাদের কেউ একবারও তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেনি। মুখ একপাশে রেখে কুশল জিজ্ঞেস করেছে, এরপর খাবার রেখে গেছে। একজনের সঙ্গে মজনুনের দৃষ্টি কাটা পড়েছিল, তাও ক্ষণিকের জন্য। ভালো লাগেনি মজনুনের। ভালো লাগেনি হাওয়া, গাছের পাতার দোলা, কুকুরের ডাক, পাখির অধীর পাখসাট।

তিন দিকে বিবিধ ঘনত্বের বন, দূরে অপরের ক্ষেত। সঙ্গীরা সৌদ-মুগ্ধ। অন্তত একটা মুরগির টুকরো হলেও মুখে পুরেছে। মাংস চাখার সুযোগ পেয়েও নিবৃত্ত করবে নিজেকে, এতখানি আত্মনিয়ন্ত্রণ ছিল না ওদের। তাছাড়া আজ তাদের ‘পালা’ শুনে খাবার আর আনেনি কেউ, সুতরাং খিদে সামাল দেওয়া ছিল কঠিন। মজনুনের মন বিষণ্ন, তাই খেতে উদগ্রীব ভেতর ভেতর, কিন্তু সংযমেও রত।

প্রথম দু’জন যখন ঘুমিয়ে পড়ল কেউ গা করল না। পালা করে ক’জনের তো ঘুমানোরই কথা। দু’জনই সেই দলে। দিনভর পরিশ্রমের পর রাতে ভারী খাবার পেটে পড়েছে। চোখ খোলা রাখা কঠিন। কিন্তু, যাদের জেগে থাকার কথা তাদের দু’জনও যখন মাঠের দুই কোণে টাল হারিয়ে পড়ে গেল, কুঁড়ের সামনে সতর্ক হয়ে উঠল মজনুন। কয়েকজনে মিলে ওদের টেনে কুঁড়েতে নিয়ে এলো, চেতনা ফেরানো গেল না। জাগল না শুরুতে ঘুমিয়ে পড়া অন্যেরাও। ধীরে ধীরে বাকিরা আতঙ্কের সঙ্গে লক্ষ করল এক মজনুন ছাড়া সবার শরীরে যেন কয়েক মন বোঝা চেপেছে। হাঁটু ভাঁজ করে পড়ে যেতে থাকল একে একে আর তলিয়ে যেতে থাকল নিরুপায়। যারা তখনও সজাগ, চোখে মুখে জলের ছিটা দিতে থাকল, বমি করতে চেষ্টা করল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আর পারল না। মাথার চক্কর ঠেকাতে চোখ বুজে কাত হয়ে মাটিতে শরীর ঠেকাল একে একে। সঙ্গে জল যা ছিল সব পড়ে রইল কুঁড়ের মেঝেতে মাটিতে। বাইরে ঝিঁঝিঁর ডাক। টিপটিপ পুড়ছে আগুন। বাতাসে ধানের সুঘ্রাণ।

ওদের মধ্যখানে আগুন বাঁচিয়ে রেখে দরজার বাইরে ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকল মজনুন। কাকে ডাকবে?

হাই!

এমন অনির্দিষ্ট শব্দে আতঙ্কিত চিৎকার করল ক’বার। কোনো দিক থেকে সাড়া এলো না।

এমন সময় শোকার্ত ভীত কুকুরের কান্না শোনা গেল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিছুই চোখে পড়ল না।

আকাশে ফ্যাকাশে চাঁদ। হেমন্তের রাতশীতলা হাওয়াটা বইছে মৃদু মৃদু। মাটির রন্ধ্রভেদী কুয়াশার ঘাস ক্রমে পর্দা হয়ে উঠতে থাকল চোখের ওপর। আধস্বচ্ছ সেই পর্দার ওপারে নড়ছে কালো বন। কুকুরীর কণ্ঠ কেঁপে কেঁপে সরে যাচ্ছে, উত্তর থেকে দক্ষিণ, পুব থেকে পশ্চিম। যেন ওটা তাকে প্রদক্ষিণ করছে। আপন শোক, ভীতি ছড়িয়ে দিতে চাইছে মজনুনের সবল মনে, তাকে দুর্বল করতে চাইছে।

হঠাৎ মনে হলো, কুকুরীর ডাক এটা নয়। কুকুরী এত নিখুঁত কুকুরী হয়ে কখনও ডাকে না।

ঠিক ওই মুহূর্তে ঢালা লোহার ভারী হাতুড় পড়ল মাথার ওপর। গজাল তোলার সূচাল অংশটা যেন নরম করোটি ভেদ করে গেল। চতুর্দিকে থৈ থৈ জোছনা, এখানে ওখানে জমাট আঁধার, তার কিছু সচল, কিছু নিশ্চল। আনন্দের টিপটিপ নাড়া পোড়া শব্দ। সোনাধরা ওষধির গোড়া থেঁতলে গেছে। আঠালো সিরার মতো সান্দ্র এক ঘুমগলা পিয়াই নদী কোথাও কুলকুল বয়ে চলেছে।

সযতন নৈঃশব্দ্যে। কাটা হয়ে গেল সব ধান।

ওষধির তাল তাল সোনা এরপর দুলে দুলে বাঁশবন পাশ কাটালো। অপরাপর ক্ষেতরক্ষীর চোখ এড়াতে শালবন ভেদ করল। শ্যাওড়া শিমুল মান্দারের আধবিরান বন উতরালো। মশককীটে আবিল জোলো মাটির নলখাগড়া বনের আড়াল নিয়ে চলল বেত, ধঞ্চের বনের দিকে। পেছন পেছন ছুটল কুকুরীর ডাক।

আড়াল নিয়ে আরও খানিকটা পথ পেরোনোর পর আর অল্প যেতেই পেয়ে গেল চাঁদের আলোয় ভাসা নির্জন হালট। ব্যস, উঠে পড়ল। এরপর আর হাঁটতে হলো না। শকটে চড়ে দ্রুতগতিতে হলো চোখের আড়াল।

এদিকে মাঠের ওপর পড়ে থাকল উষ্ণ কুঁড়ে। তার পাশে মজনুনের ঠাণ্ডা মরদেহ।

 দ্বিতীয় খণ্ড

আসলে রফিক তো ছিল এক কাঁটাগান্ধী লোক, ও তো কথাই বলেনি আমাদের সঙ্গে ঠিক মতো। তবে হ্যাঁ, যতন করেছে, এটা বলতেই হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী চাষি, সচ্ছল রীতিমতো। তা নিয়ে প্রকাশ্য অহংকারও ছিল। শহুরে লোক হলেই যে তাদের আলাদা যতন করতে হবে এমনটা সে মনে করে না- এই একটা ভাব তার চোখেমুখে সারাক্ষণ লেগে থাকত। এটা ওটা সশব্দে নামিয়ে রাখত আমাদের সামনে। সামনেই যার তার ওপর মেজাজ দেখাত। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম- ধুরোবা! এর বাড়িতে আর নয়, চলে যাব। কিন্তু অচেনা গ্রাম। তাও নিজেদের সিদ্ধান্তে আসিনি। ধাম বদলাতে হলে লোকসিদ্ধান্তসভা আবার আহ্বান করতে হয়, বাউরে বাউ! তাতে যদি লোকটার মানহানি ঘটে! কী দরকার বাবা, অল্প দিনের জন্য এসেছি। কারও মানহানিতে কাজ নেই, সুতরাং পালাব এরচেয়ে। তাতে লোকটার শাস্তি হবে- এই একপ্রকার ছেলেমানুষী ভাবনা আমাদের। বিশেষ করে আমার। ময়ূখ তার গল্পের রসদ পেয়েছে, কিল চড় একশ’টা খেয়েও সরবে না। কিন্তু আমার মনটা আর টিকছে না, শুধু পালাই পালাই।

হাতে বোনা টুপি পরত লোকটা। কথা বলতে বসলেই ধীরে ধীরে রাজনীতির দিকে চলে যেত। কেন যেন ওর ধারণা হয়েছিল আমরা ওর রাজনৈতিক শত্রু। ময়ূখের গোঁফ-দাড়ি তার খুব অপছন্দ ছিল। কয়েকবার বলেছে, ‘আপনি যা খান তার সবই নাপাক হয়ে যায়।’

আমাকে অবশ্যি বলেনি কিছু। মাংসের পদ প্রতিদিন তার থাকবেই। আমার আবার মাংস অপছন্দ। এমনকি গন্ধ পেলেও শরীর গুলিয়ে ওঠে। তাই বলে আমি ধর্মীয় বিধিকানুন মানি তা কিন্তু নয়; ভালো কথা, আমার ভাইয়ের নাম সেলিম কেন তা নিয়েও তার আপত্তি। লোকটা দেখি সুযোগ পেলে কোনো পরিবারের একেবারে শোবার ঘরেও ঢুকে যাবে।

মাংসাশী, সেই মাপের। কোনো চাষিকে এমন মাংসাশী হতে দেখিনি আগে। আমার বেড়ে ওঠার কালের অনেকটাই কেটেছে গ্রামে, কুমার নদের পারে। কিষান কিষানিই ছিলেন চতুর্দিক। ওঁদের অনেকের ঘরে আমার খাওয়া ঘুমানো স্নান- সবই চলত। তাই ওদের খুব কাছ থেকে দেখেছি আমি। 

রফিকের ঘরে যতদিন ছিলাম, ফজরের নামাজের সময় আমাদের ঠেলে তুলে দিয়েছে। ভদ্রলোকের উদ্দেশ্য তার দিক থেকে মহৎ। মানে, নরকের আগুন থেকে বাঁচাতে চাইত ময়ূখকে, মন্দ কী করে বলি।

যেহেতু আমাদের অন্নদাতা, অন্তত ওই ক’টা দিন, আমরা তাকে শ্রদ্ধার একটা আসন দিতে চেয়েছি। পাঁচ ছেলের একটাই কাছে ছিল তার, আশা বলে ডাকত। আসলে নাম ছিল আশরাফ; সেখান থেকে আশা। আমাদের কাছে ছেলেটা আসত না খুব একটা। তবে, একবার খুব মজার একটা কথা বলেছিল। তৈরি হয়ে সকাল সকাল কোথায় যেন যাচ্ছে ছেলেটা। তো ময়ূূখ তাকে জিজ্ঞেস করল, যাচ্ছেন কোথায়? আশা বলল, ‘যুব সমাজের উন্নয়ন’। ব্যস, এটুকুই। মানে যুব সমাজের উন্নয়ন ঘটাতে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু কী উপায়ে তা করবেন তা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি, এই তো।

ময়ূখের একটা বৈশিষ্ট্য হলো, তার কাজের শুরু আছে, শেষ নেই। আমোদ করে বলে, ‘বাকিটুকু তোদের জন্য রেখেছি। আমি শুরু করে দেখাব, তোরা শেষ করবি। সবটাই আমি করলে যৌথতা কোথায়!

তো আমাদের সর্বশেষ অভিযান দিয়ে সেটা নতুন একটা মাত্রা পেল। অভিযানটা আমরা একসঙ্গে শুরু করেছিলাম, কিন্তু একসঙ্গে আর শেষ পর্যন্ত করতে পারলাম না। ভয়ানক অভিজ্ঞতাময় সেই রাতের কথা মনে পড়ে গেল।

আমার সনাতনী পরিবেশে বেড়ে ওঠা, দেবতা-অপদেবতার সঙ্গে নিত্য ওঠ-বোস, ভূতলোক-প্রেতলোকে নিত্য আসা যাওয়া, মানে আমার চারপাশে সারাক্ষণ একটা তেমন-তেমন পরিবেশ বিরাজ করেছে। উপরন্তু আমি গাঁয়ে বড় হয়েছি, কুমার নদ, বাঁশঝাড়, ধানক্ষেত, ভুতুড়ে সব পাতালস্পর্শী দীঘি- এইসব ছিল আমার হাঁটাপথের দূরত্বে, চলতে ফিরতে। মনের ওপর একটা নিয়ন্ত্রণ ছিল আমার। কিন্তু, এমন নিয়ন্ত্রহীন ভয়, এমন উদ্ভট কর্মকাণ্ড আমার চারপাশে কখনও ঘটেনি।

তবে সেদিন যখন আমি আর ময়ূখ বেরোলাম, বুকের ভেতর একটা শস্যকণার মতো অযাত্রার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। তবে এটা আমার অভিশাপ। কেন বলছি- এই বারবেলা-টেলা এসব যদিও আমি মানি না, কিন্তু, আমার পূর্বপুরুষেরা তো খুব মানতেন তাই স্বভাবের ওপর পরিবারের ধারার একটা প্রভাব খুব সঙ্গত কারণেই আছে, এবং এটা আমাকে ভীষণ জ্বালায়। ভরদুপুরে তেল কিনতে মুদির দোকানে যাওয়ার আগেও চৌকাঠে এসে আমার কী যে আকাশ-পাতাল সব মনে হয়! আমি এই করে করে কোথাও শান্তি পাই না। তাই খুব স্বাভাবিক, এই ম্যানিয়া আমাকে সেদিন ছাড়বে কেন। উপরন্তু জায়গাটা পাহাড় আর সমতলের একটা মিশ্রণ। যেখানে পাহাড় আছে সেখানে আমার ভয় আছে। আমার ভালো লাগে সাগর- যে সাগরে নুহের নৌকা টেনে নিয়েছে বিষ্ণু, যে সাগর আছে বলে আমাদের সুরবাংলা তার গর্ভ থেকে উঠে এসেছে- পাহাড় আমার বুকের ওপর চাপ ফেলে। অবশ্য সুরবাংলা সাগরের বুক থেকে উঠে আসতে পারত না, যদি না পাহাড় থাকত। তবু সুরবাংলাপ্রেমের অংশ হিসেবে পাহাড়কে স্থান দিতে আমার একটু বাধে। কে জানে, বোধয় আমার পূর্বপুরুষ ভরদ্বাজ, ভবিষ্যতে কুসন্তান হবো বলে আমাকে আদিজন্মে পাহাড় থেকে ফেলে দিয়েছিলেন, আর সেই থেকে আমার পাহাড়ভীতি। 

ময়ূখ আর আমাতে এই এক মিল- মোরা দু’জনাই কুসন্তান। কুসন্তানরাই নাকি দেশোদ্ধার করে। আমরাও সে অপেক্ষাতেই আছি। 

তো গাঁয়ের পথ ধরে আমরা হাঁটছিলাম, দূরে পাহাড়। বেশ অনেকটা দূরেই বলা যায়। হাঁটছি তো সমতল ধরেই। সুতরাং বুকের ভেতর দূরে তাকালে চাপ পড়ছিল, এমনিতে ভালো ছিলাম। এ ছাড়া ময়ূখ আর আমি এমন অনেক বেড়িয়েছি, পাহাড়ি এলাকায় রাতের বেলা এভাবে আমি আগেও নেমেছি। গা ছমছমে ভাবটা অনেক বেশি হয় এসব জায়গায় আমার, অস্বীকার করার কিছু নাই। আমি সমতলের মানুষ। আমার দৃষ্টিপথে পাহাড় কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায় নাই। তাই আমি যখন দূরে এমন পাহাড় দেখি, তখন প্রথম প্রথম খুব মজা লাগে, মনে হয়, হুররে, বোধয় অনেক দূরে বেড়াতে এসেছে কমল বাবু! কিন্তু একটু পরই কেমন বুকের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। মনে হতে থাকে, দেখ, দূরে দাঁড়িয়ে আছে বিভীষিকা, ওখানে মেঘের মতো মৃত্যু ভাসে, তোকে দেখতে পায়… আরও অদ্ভুত সব। যাহোক। রক্ষা এদিক দিয়ে যে ওটা পাহাড়ি অঞ্চল নয়, দূরে কেবল দাঁড়িয়ে আছে- গুরুকুল, এটুকুই মনে হয়।

প্রচণ্ড প্রচণ্ড শীত। আমার পূর্বপুরুষেরা কোনো শীতের দেশ থেকেই এসেছিলেন, কিন্তু আমি এত শীতকাতর কেন কে জানে। শীতে আমার গলার গ্রন্থি ফুলে ওঠে, যেভাবে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়। তারপর, আমার দাঁত ব্যথা শুরু হয়। ডানপাশের নিচের চোয়ালটায় খুব যন্ত্রণা হয়। মনে হয় আমার দাঁতগুলো মাড়ি ফুটো করে চোয়ালের নিচ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। সেই রাতে আমার তেমন ব্যথা শুরু হলো, এবং দেখতে দেখতে ব্যথাটা সৈনিকের মতো সদলবলে মাথার দিকে রওনা হলো। মাথায় যদি এটা স্থায়ী হতে পারে তো আর দেখতে হবে না, আজকের রাতটা বরবাদ হয়ে যাবে। আমারও, ময়ূখেরও।

আমি ঘোরগ্রস্তের মতো হেঁটে যাচ্ছিলাম। ময়ূখই কথা বলে যাচ্ছিল, আমি কেবল প্রয়োজনীয় সাড়াটা দিচ্ছিলাম, বা প্রশ্নের উত্তর করছিলাম। ময়ূখ দ্রুত ক্লান্ত হয়ে উঠল। সেদিন রাতের খাওয়াটা বেশ ভারী ছিল। আমার কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকলেও ময়ূখ খেয়েছে ঠেসে। মাছ ছিল অনেক পদের, আর যায় কোথায়। মাছ পেলে ময়ূখ পৃথিবীর হোঁৎকাতম বেড়াল। না নজর দিচ্ছি না, থাকুক ব্যাটা এমন। মাছের গন্ধে আমার গা গোলায়, আমি খেলাম পোকা ভাজা। পোকা বলতে- চিংড়ি, মানুষ যার পোকা অস্তিত্ব ভুলে থাকতে চায়। শীতের সবজির জন্য একটা আক্ষেপ ছিল। সবজির বলতে ছিল শিম দিয়ে ফুলকপি আর বাঁধাকপি ভাজা- এই মাত্র। এটা কি কোনো শীতকাল! এই এক অষ্টমাশ্চর্য যে এক কৃষক পরিবারে থেকে সবজি পেলামই না প্রায়।

সে রাতের কথা বলছিলাম। আমি হালকা ছিলাম, কেবল দাঁতটা… বেরোনোর আগে চিনি দিয়ে দুধটা না খেলেই পারতাম। এ হলো গাঁয়ের আরেক আতিথেয়তা। চায়ে ছাড়া এমনি দুধ কবে খেয়েছি ভুলে গিয়েছিলাম। এখানে এসে রাতে খাওয়ার পর এক গ্লাস করে দুধ খেতে হয়েছে। ব্যাপারটা ভালোই, মানে আমাদের ভালোর জন্যেই তো, অতিথি-আপ্যায়নের সুস্থ প্রতিযোগিতার গ্রাম্য সেই সমৃদ্ধির কাল কি এখন আছে আর, না না, নেই, কোথায় আর, এসব যে সৌভাগ্য, তবু কেন যে মন পালাই পালাই করে!

এমন সব অদ্ভুত ব্যাপার ভাবছিলাম, অথচ চোখের সামনে নিসর্গ কেঁদে যাচ্ছে। শুনলাম, ময়ূখ বসতে চায়। এটাই কাল হলো। কালকে তো একটা কোনো পথে প্রবেশ করতে হবে, এটাই আমাদের সেই পথ, যে পথ আমাদের অদ্ভুত, অতিপ্রাকৃত, আরেক পৃথিবীর সময়রেখায় নিয়ে ফেলল।

ময়ূখ যখন ওই কুঁড়েঘরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল, বুকের ভেতর যেন হঠাৎ ঢাকের ওপর হাতুড় পড়তে শুরু করল আমার, জানি না কেন। আমার কেবলই মনে হতে থাকল, কিছু ঠিক নেই, কিছু একটা ঠিক নেই। ইচ্ছে হলো চিৎকার করে ওকে সাবধান করে দিই, কিন্তু পরমুহূর্তে ভাবলাম, এসব আমি কী ভাবছি, ছেলেমানুষী! পরে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।

কিন্তু কী বলব, নিজের মনের সাথে পারছিলাম না আমি।

এরপর যে একটা দৌড় আমাদের দিতে হলোÑ এখনও মাঝে মাঝে স্বপ্নে ওভাবে দৌড়ুতে দৌড়ুতে বিছানা চাদর মেঝেতে নামিয়ে ফেলি…

এক মিনিট, এক মিনিট!

পাগলটা আবার তার পুরনো ঠিকানায় এইমাত্র গিয়ে উঠেছে।

তাই কি? নাকি এ আমার কল্পনা। আমার তো তার খবর পাওয়ার কথা নয়…

এখান থেকে বহুদূরে, রূপোসনগরের ধার ঘেঁষে তুরাগ নদের পাড়ে, আছে এক হাজার বছরের পুরনো বটবৃক্ষ। তার মোমের মতো কাণ্ড-শেকড়ে ঢাকা পড়ে আছে এক প্রাচীন শিবমন্দির। মন্দিরের নিচে আছে এক তিন কোণা কুঠুরি। আছে এক মাচান-মসজিদ, তার চটসংকুল বারান্দা, ছলাৎ ছলাৎ তুরাগের জল।

আমাদের আত্মগোপনের জায়গা।

আমাদের আত্ম-উপলব্ধির জায়গা।

দৈবের সাহায্যে আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম। 

সে ছিল আরেক অভিযাত্রা। তখনÑ

চেনা সব দৃশ্য আমরা ক্লান্ত ছিলাম। একদিন ঠিক করলাম শহরের চোয়াল দেখতে বেরোব।

শহরের ধর্ম গ্রাস করা। ধর্ম হলো তা-ই, যা তোমাকে ধারণ করে। তোমার অস্তিত্বকে রক্ষা করতে যে নীতি দরকার, সেই নীতিই ধর্ম। বেশিরভাগ মানুষ ব্যাপারটাকে উল্টোদিক থেকে দেখে, তাই কাজও করে উল্টো।

শহর হলো পুঁজির বিকাশতীর্থ আর বড় পুঁজি ছোট পুঁজিকে গ্রাস করে। রাত-বিরাতে আমরা সেই আগ্রাসী শহরের চোয়াল দেখতে বেরোতে শুরু করলাম। তার দাঁতের তীক্ষè ডগায় আঙুল চেপে ধরে ধার পরীক্ষা করতাম। আমাদের আঙুল কেটে কেটে যেত। আজ পুবদিকের চোয়াল, তো কাল পশ্চিমের। কাল উত্তর দিকের চোয়াল, তো আজ দক্ষিণের। এভাবে চলছিল। শহরের পুঁজির চোয়াল তো চারদিকেই আছে, সশব্দে ওঠানামা করছে। থেকে থেকে ওটা বিশ্রামে যায়। বিশ্রামে না গেলে কাজ চালাবে কী করে? আমরা অনেক রাত ওটাকে বিশ্রামে দেখেছি।

তো একদিনের কথা। সেদিন আমরা শহরের পশ্চিম দিকের চোয়াল দেখতে গেছি। একেকটা দিক তো আর একদিনে দেখে শেষ করা যায় না। আমরা যতটা দেখেছিলাম সেই সীমার হিসেব মনে রাখি। পরদিন তার পর থেকে শুরু করি, বা শেষপ্রান্ত থেকে এসে ওই বিন্দুতে মিলি।

আগের দিন আমরা পশ্চিমে গেছি। সেদিন উল্টো দিক থেকে এসে আগের বিন্দুতে মিলিত হবো বলে এগোচ্ছিলাম। আমাদের যাত্রাবিন্দু ছিল- শচী। 

শচী এখন মহামূল্য আবাসন প্রকল্পের রমরমা হাট।

একসময় এই শচী ছিল অরণ্যসংকুল। মানুষ তেমন যেত টেত না। তখন কারও জানা ছিল না এখানে বুড়িগঙ্গা নদীর একটা সরু শাখা এসে তুরাগ নদের পুষ্টি জোগাচ্ছে। যেন রাজার কিশোর-কারাগারে আটক ছেলেকে গোপনে এসে খাইয়ে যাচ্ছে তার দুঃখিনী মা।

একটা অরণ্য রক্ষা পায় তার হিংস্র বন্যপ্রাণীর জন্য। শচীকেও রক্ষা করতে হিংস্র সব প্রাণী তৎপর ছিল। এখানে অদ্ভুত, স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা বাস্তুসংস্থান টিকে ছিল। মহাভারতে আছে, কৌরব আর পান্ডবদের যুদ্ধের আগে কৃষ্ণ অনেকবার সন্ধি করতে চেয়ে দূত সঞ্জয়কে বলেছিলেন, কৌরবরা হচ্ছে অরণ্য, আর পাণ্ডবরা তাতে বাঘস্বরূপ। বাঘ অরণ্য ছাড়া বাঁচে না, আবার অরণ্য বাঘ ছাড়া টেকে না। শচীর এই বনও এ উপায়ে হাজার বছর নিভৃতে কাটিয়েছে। বুড়িগঙ্গা আর তুরাগের ওই গোপন সংযোগরেখাটায় ঝড়বাদল শুরু হলে তুরাগ বা বুড়িগঙ্গার জেলেরা আশ্রয় নিতো।

এক বয়স্ক জাল্লা, নাম বুগো, বলেছিল, খালের ভেতরে প্রায় একদিনের পথ এগোলে মাছের অভয়বাড়ি। সেখানে হাজার লক্ষ কোটি মাছ নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ায়। বাইরের পৃথিবীর খবরও তারা জানে না। মাছের ওই জননক্ষেত্র পাহারা দিয়ে রাখে দুই যক্ষ। সেখানে গেলে সাক্ষাৎ মৃত্যু। কোনো উত্তরপুরুষ যেন কখনও প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ ছাড়া সেখানে প্রবেশ না করে, আর করলেও যেন ওই মাছের কোনো ক্ষতি না করে।

মাথার ওপর ধনুকের মতো বাঁকা একটা ভয়াল ছাদ নীচে জল- এই নিয়ে দূরে থেকে খালটাকে একটা ভয়ঙ্কর কালো মুখবিবরের মতো দেখাতো। জেলেরা সেই বুগো জাল্লার কথা মনে রেখে কখনও বেশি ভেতরে যেত না। কিন্তু চিরকাল ঘটনার স্রোত একরকম বয়?

শহরের ক্ষুধা ওদের বুকে চাপ বাড়াল। নিরুপায় তিন জেলে একদিন নিজেরা শলাপরামর্শ করে সেই ‘একদিনের পথ’ পাড়ি দিতে চলল।

জায়গাটা একদিনের মতো দীর্ঘ হলে লোকে চিনে যেত, অত দীর্ঘ নয়। গাছের বাধায় দুর্গম আর অন্ধকার বলে তা একদিনের পথ।

বুগো অনেক যত্নে পেরিয়েছিল জায়গাটা। সাধারণ ভাগ্যান্বেষী জেলেরা তার ধার ধারল না। ভোজালি চালাতে ওরা অভ্যস্ত নয়, তাই অনভ্যস্ত পরিশ্রমে ওদের বাহু, ঘাড় অবশ হয়ে এলো। তবে সুবিধা পেল এইÑ একদিনের পথ ওরা অর্ধেক দিনে পার হয়ে গেল। বাতাসে তীব্র বুনো আঁশটে ঘ্রাণ। হাজার বছর সেখানকার গাছ, আঁধার, প্রাণীদের কেউ বিরক্ত করেনি। বাতাসও এদিক থেকে ওদিক অবাধে বয়ে যেতে পারেনি যে বদলে যাওয়া পৃথিবীর বার্তা সেখানে প্রবেশ করবে। গাছের গায়ে শ্যাওলায়, জলের সঙ্গে জলচরের গোপন বোঝ-পড়ায় একটা আদিম পরিবেশ, একটা প্রাচীন গা ছমছমে মৃতুনিথর নীরবতা সেখানকার ওই খানিকটা জায়গায় আটকা পড়ে আছে। জেলেরা বিস্ময়ে শব্দ করতে ভুলে গেল।

এবং অবধারিতভাবে যক্ষের দেখা পেয়ে গেল।

একটা দেখতে বড়সড় চালকুমড়োর মতন। কালো মসৃণ শরীর, দীর্ঘ নমনীয় অসংখ্য হাত, আর রক্তলাল মুখগহ্বর। আরে আরেকটা দেখতে যেন স্বচ্ছ চামড়ার থলে, আকৃতি বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত। চিতাবাঘের গায়ের ফুটকির মতো হালকা নকশা তার গায়ে। চলার গতি ভীষণ মন্থর। এর কোনো মুখ নেই। খাবার যেদিকে থাকে, সেদিকে মুখ তৈরি হয়। জেলেদের একজন নিজ জীবন দিয়ে তা অপরদের দেখিয়ে গেল।

জেলের নাম ফটিক। বছর আঠারো বয়স। নৌকার নিচ দিয়ে ওই চিতা দানবটা যখন যাচ্ছিল কৌতূহলী রাসু তখন ঝুঁকে দেখতে গিয়ে একটা বিপজ্জনক অবস্থা তৈরি করল। তার দিকে নৌকাটা হঠাৎ বেশি ঝুঁকে যাওয়ায় তাল সামলাতে পেছন দিকে গিয়ে ফটিককে ফেলে দিলো জলে। স্বচ্ছ জলচিতা ফটিককে তখনই আত্মস্থ করল। তার স্বচ্ছ শরীরের ভেতর দিয়ে ফটিকের যাতনাকাতর মুখটা দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু বেশিক্ষণ দেখতে হলো না। জলের অন্ধকারে কোথায় মিলিয়ে গেল দানবটা, যেন কালের মতো নিতে এসেছিল, একজনাকে নিয়ে গেল, কে এলো কে গেল তাতে তার কিছুই এলো গেল না।

তখন থেকে জলডুবির জায়গাটিকে ওরা বলত ফটিকডোবা।

দিনকয়েকের মধ্যে এক জেলে নৌকা ফটিকডোবার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। এমন সময় ঢেউ বড় হতে থাকায় জলের দিকে সচকিত হয়ে তাকাল ওরা। নৌকার নিচ দিয়ে ওই স্বচ্ছ প্রাণীটা মন্থর বেগে ওদের পেরিয়ে মিলিয়ে গেল। ওর পেটের ভেতর জবুথবু আধগলা ফটিককে সেদিনও স্পষ্ট দেখতে পেল ওরা। জেলেরা ওই দৃশ্যের তীব্রতা সইতে পারেনি। বুগোর আদেশের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তার পুতি জগা, তার সাথে যখন আমাদের আলাপ হয় বয়স ষাটের কাছাকাছি, প্রস্তাব দিলো জায়গাটা পুরোপুরি পরিত্যাগের, কিন্তু অল্প কয়েকজন ছাড়া বছর কুড়ির এ তরুণের কথায় কেউ কান করল না। এবং একদিন ফটিকের বৃদ্ধ বাপ পুত্রহত্যার প্রতিশোধ নিতে এসে নিজেও প্রাণ দিলো।

গল্প ছড়িয়ে পড়ল জায়গাটার। শচীর দশা ঘনাল। নতুন জায়গার খোঁজ পেয়ে গেল আনাড়ি ডাকাত, নব্য অপহরণকারীর দল। ওরাও আপন ডেরা বানাতে চাইলো ওখানে।

জলের যক্ষ যেমন ওই মিঠা পানির কুমড়ো বহুপদী, দানবীয় অ্যামিবাচিতা, স্থলের যক্ষ তেমনই জোটবদ্ধ শেয়াল। শচীর বনজুড়ে ছড়িয়ে থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে শেয়াল। ওরা দেখতে অনেকটা নেকড়ের মতন।

বন তখন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। একটা দলছুট শেয়াল কেটে ছাগলের মাংস বলে বিক্রি করছিল দুই হতদরিদ্র লোক। অনেকেই বুঝতে না পেরে কিনে নিয়ে গেল, কিন্তু হঠাৎ কাটা মাথাটাকে স্থানীয় কুকুরের দল বড় বড় ঘাসের আড়াল থেকে কামড়ে বের করে আনল। এরপর লোকালয়ে চলল তার কদর্য শোভাযাত্রা।

মাথাটা কুকুরের মাথার প্রায় তিনগুণ বড়। এত বড় শেয়ালমাথা কেউ কোনোদিন দেখেনি। গল্পে তার নখের ধার, চোয়ালের আকার আরও বড় হয়ে উঠল। কাঁচা ডাকাত আর অপক্ব অপহরকরা পালাল। আবার ফিরে এলো। আবার পালাল। আবার এলো। এবার তাদের তাড়া করার মতো শেয়াল আর পাওয়া গেল না।

 এরপর উজাড় হয়ে আসতে থাকা বনের উপকণ্ঠে আশ্রয় নিলো নেশারুরা। ওরা আগুন জ¦ালত বলে অবশিষ্ট জন্তুরা কেউ কাছে আসত না, আর ওদের যত নিষিদ্ধ নেশাদ্রব্যের চালান বুঝে পাওয়ার একটা মোক্ষম জায়গা হয়ে দাঁড়াল শচীর বনের ধারকাছ। শচীর বনকে ঘিরে ভৌতিক গল্পের উচ্চফলন হলো সে বছর। 

এবার আরও দূরে জায়গাটার নাম পড়ল ছড়িয়ে। চলচ্চিত্রে কান পুরস্কার-জেতা পরিচালক সুষমা গোপনে শপথনগর থেকে এসে শচীর ধ্বংসাবশেষ দেখে গিয়ে পরে দল নিয়ে এলো। চলচ্চিত্রের শুট হলো টানা ন’দিন। সেই ছবি ক্যামেরার তাক লাগানো কাজ আলোর অপূর্ব ব্যবহারের সুবাদে সার্ক পুরস্কার পেয়ে গেল।

প্রকৃতির মুক্ত ইচ্ছেসমষ্টি তার লব্ধির খেলাটা দেখাল।

জায়গাটার খোঁজ আগের বিশেষ বলয় ছাপিয়ে সর্বস্তরের মানুষ সেবারই প্রথম পায়। অন্তত যতদিন মানুষ এই গ্রহে আছে, এবং প্রকৃতির কোনো কোণের নাম ছড়িয়ে পড়ে সর্বস্তরের গমনোপযোগী হলো তো ওই কোণের মৃত্যুঘণ্টা বাজল।

সৃষ্টির সূচনার পর থেকে কোটি বছরে যা হয়নি তা মাত্র দশ বছরে হবেÑ প্রকৃতি এমন সন্তানের জন্ম দিয়েছে, বলিহারি, ধন্য মাতা। শচীর অরণ্যের অবধারিত মৃত্যুঘণ্টাও বাজল। শত শত শেয়াল তির, বিষটোপ আর গুলি খেয়ে মরল। কোনোটা কোনোটা পালিয়ে লোকালয়ে পৌঁছে মরল লাঠির ঘায়ে। জলরেখার পৌরাণিক প্রাণী দুটিও কোথায় হারালো! ভূমিদস্যুরা খোঁজ পেয়ে বন উজাড় করেই থেমে থাকেনি, যা ঘটবে বলে সন্দেহ করেছিলাম… আমরা যখন শচীতে যাই, তখন বুড়িগঙ্গা থেকে তুরাগ অব্দি দীর্ঘ ওই শীতল স্থবিরজল খালের কোনো অস্তিÍত্বই ছিল না। যা বিশ^সম্পদ হতে পারত, তা তখন বালুর নিচে সমাধিস্থ হলো।

আবাসন প্রকল্পের নানা মাপের রঙের ভাষার জ্যামিতিক নকশার দেয়াল তোলা এখন এখানে-ওখানে। বন আর ওই শচী খালের গল্প এখন পুরাণ। শেয়ালের খুলিটা বিলুপ্ত প্রজাতি হিসেবে চিড়িয়াখানার প্রাণী জাদুঘরে স্থান পেয়েছে, কিন্তু মধ্যখানে এক প্রজন্মের দেয়াল উঠে যাওয়ায় এখন মানুষ আর ঠিক নিশ্চিতও নয়, সত্যিই এমন কোনো বন সেখানে ছিল কিনা, এবং সেই বন আবার বুড়িগঙ্গা আর তুরাগের কোনো সংযোগকে আদৌ আড়াল করে রেখেছিল কিনা। ফটিকডোবা বোধহয় তুরাগ নদের কোথাও, শেয়ালেরা বোধয় আরও উত্তরের যমুনাবর্তী অঞ্চল থেকে আসা।

ঠিক কোথায় ওই জলধারা, কোথায় অরণ্য, সাদা চোখে তার খোঁজ এখন আর পাওয়ার উপায় নেই। তবে ওখানে যেসব জায়গা ভরাটের দরকার হয়নি সেখানকার উর্বর কালো মাটির প্রকৃতি তো বদলানো যায়নি। অপ্রচল জাতের বড় বড় ঘাসের জংলা ওখানটায়। আর কোথাও নাকি তেমন ঘাস নেই। সে ঘাস কোনো গবাদি পশু খায় না, ধারে জিভ কেটে যায়। মধুপুরের বনকাটা অঞ্চলে অমন একমানুষ দুই মানুষ সমান উঁচু ঘাসের অরণ্য আমরা অনেক দেখেছি। আমরা গিয়েছিলাম ওখানেও। এগুলোই সেই বিখ্যাত হাতিঘাস কিনা আমি জানি না।  

 তো, ওখানে একটা দুটো করে কিছু ঘর উঠল এরপর। এখন তো লোকালয়। লোকেরা উঠোনে শিম বেগুন এসব লাগাতে শুরু করেছে। প্রথম প্রথম দানবীয় ছিল আকার, আমিও দেখেছি। শিমের পাতা হতো কুমড়োপাতার মতো বড়। আর বেগুনগাছের পাতা যেন বুড়ো উলটকম্বল। ফলগুলোর কথা থাক। শিম হতো লম্বায় চ্যাপ্টা শজনের আকার, আর বেগুনগুলো চালকুমড়ো। স্বাদেও নাকি দারুণ। তবে শিমের বুনা গন্ধ দূর করা ছিল কঠিন, বেগুনে জিভ আর টাকরা ভীষণ চুলকাত, কারও কারও চোখ ফুলে যেত। 

ধীরে ধীরে বালি কাঁকর মিশে মাটি নষ্ট হতে শুরু করে। নদীর ধারাজল থেকে বঞ্চিত হয়ে অবোধ মাটি কতদিনই বা উর্বরতা ধরে রাখতে পারে? আমি আর ময়ূখ সেই শচী, একসময়ের অরণ্য, আজকের ছেঁড়া ছেঁড়া লোকালয়ের ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে সেই বুড়িগঙ্গার ধারে পৌঁছে গিয়েছিলাম। সুযোগ পেলেই বীরুৎ গুল্মেরা বেয়াড়ার মতো বাড়ছে তখনও। আকাশে চাঁদি বরাবর একটা গোল চাঁদ।

এক জায়গায় কোমরসমান ঘাসের মধ্য দিয়ে দীর্ঘক্ষণ যেতে হলো। এদিকটায় লোকেরা তেমন আসে না, ঘাসেরা তাই নিজের মতো বেড়েছে। হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, মাটি এখানে বেশ নরম, পা কেমন দেবে দেবে যায়।

হঠাৎ বুকটা ধড়াস করে উঠল। আমাদের দু’পাশে কারা যেন সরসরিয়ে দ্রুত জায়গাবদল করছে। পরস্পরের চোখে তাকালাম আমরা। মাথা নেড়ে বললাম, ‘সর্বনাশ! এখন থামা যাবে না। থামামাত্র আক্রমণ হবে।’

‘কী এগুলো?’

‘জানি না।’

এরা ওই শেয়াল বা শেয়ালের প্রেতাত্মা একটা কিছু হবে নিশ্চিত। প্রেতাত্মা হলে তবু রক্ষা পাওয়া যাবে, কিন্তু শেয়াল হলে আজ এখানেই আমরা শেষ। কিন্তু ওরা কি সত্যিই আছে? না থাকলে এমন শিকারির মতো সাথে সাথে যাচ্ছে কারা। আগেই ভাবা উচিত ছিল। ওসব মহাশেয়ালের বংশধররা এখনও বোধয় এখানে ওখানে লুকিয়ে চুপিয়ে রয়ে গেছে। হয়ত আকারে ছোট হয়ে গেছে। বিবর্তনে নয়, অসম মিলনে, আর তন্তুর ভেতর সেই শিকারিই রয়ে গেছে। হয়তো সুযোগ পেলেই লোকালয়ের আশপাশে ঢুঁ মেরে যায়। লোকালয়ের কাছে থাকা মানেই তো খাবারের কাছে থাকা।’

ময়ূখ বলল, ‘কিন্তু সেই খাবার আমরাই হবো কেন? চলো চিৎকার করি। ভয় দেখানোর চিৎকার করা যাক, মানে হুঙ্কার। স্বয়ং বাঘও পাল্টা হুঙ্কারে হঠাৎ থমকে যায়। প্রাণের মায়া মগজের একেবারে এপিডার্মিসে। এড়ানোর কোনো উপায় নেই।’

এই হলো ময়ূখ।

অতএব আমরা চিৎকার করে উঠলাম। দুঃখিত- একেবারে যাকে বলে হুঙ্কার! আর পায়ের গতি আপনাতেই কমে এলো তখন। হুঙ্কারের প্রথম দফায় দু’পাশের ঘাসে নড়াচড়াও খানিকটা কমে গেল। চাঁদের আলোর নিচে মঞ্চায়িত হতে থাকল সে এক নাটকের মতো নাটক। দেখলাম বেশ কিছু কালা খাদ যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। 

আমাদের সাহস গেল বেড়ে। আমরা আরও সরোষে, গলা ফাটিয়ে হুঙ্কার ছাড়লাম। এবার পায়ের গতি বাড়ালাম। নরম মাটির জায়গাটা একটা ফাঁদের মতো। চাইলেও খুব দ্রুত পা চালানো যায় না। আমাদের পা, সাদাসিধে চপ্পল সেই সুবিধা আমাদের দেয় না মোটেই।

মাথার ওপরে চাঁদ, পাশে বয়ে চলা রুপালি প্রাচীন নদী। রাতটা কেমন ধূসর। কিন্তু মৃত্যুমুখী মনে হলো না তাকে। আজ আমরা বেঁচে যাব, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। ওই জায়গা ছেড়ে সরতে সরতে আমরা রুপালি আরেক ধারার কাছে চলে এলাম। বুঝলাম, এই হলো তুরাগ। তুরাগের পার ধরে হাঁটতে হাঁটতে চাঁদের আলোয় চোখে পড়ল, দক্ষিণে বহুদূরে ছাতার মতো এক বিপুলা ছাউনির বিস্তার। এ হলো সেই সহস্রবর্ষী বটগাছ। ময়ূখ শৈশবে, কৈশোরে এখানে অনেকবার এসেছে, তবে আমার জন্যে এবারই প্রথম। দেখতে দেখতে দু’জনে পৌঁছে গেলাম।

ময়ূখ আর আমি সে রাতে ওই গাছের নিচে ঘুমোব বলে শুয়ে ছিলাম। এখনকার মতোই শীত তখন, তবে রূপোসনগরী শীত, খুলনার গায়েও লাগে না। তুরাগের জল অনেকটাই শুকিয়ে এসেছে, মধ্যে মধ্যে জেগেছে চর। চাঁদের নরম আলোয় ভূখণ্ডগুলো স্বপ্নের মতো জেগে ছিল। নদের জল কালচে রুপালি। ঢেউয়ের চূড়োয় মনোরোম মন-নরম আলো।

চরগুলোর মধ্যে ফসলশূন্য নেই একটিও। চিকচিকে বালুর রুপালি অর্ধস্বচ্ছ শাড়ি বিছিয়ে রাখা নদ্য কালো মাটির ওপর। চরের ভেতর দিকে বালি আরও কালো। ধানের চারা রোয়া হয়েছে। সুরবাংলার মৃতÑ নদ্যসুমতি, মরুভূমির দুঃস্বপ্নের মতো উর্বর। চারাগুলো চাঁদের আলোর নীচেও কী সবুজ!

বটের পাতার ছায়ায় জোছনার ফুল, আর দূরে চরে আধশোয়া শস্যের দোল দেখছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, কেউ একজন এসে দাঁড়িয়ে দেখছে আমাদের।

কী বলব, যমতুল্য একজোড়া চোখ। তাকিয়ে তো আমার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল। দেখলাম, ময়ূখও জেগে।

চোখ নামে সরু দুটো চিড়ের ভেতর দিয়ে লোকটা দেখছিল আমাদের, কিন্তু পুরোপুরি মঙ্গোলীয় সে নয়। মঙ্গোলের সঙ্গে দ্রাবিড়ের একটা মিশ্রণ ছিল তার মুখের গড়নে। একটা লাল কাপড় শরীরের নিম্নাংশে জড়ানো। একটা লম্বিত অংশ ঘুরিয়ে বুকের ওপর আড়াআড়ি দিয়ে পিঠের ওপর ফেলে রাখা হয়েছে, নাকি সেখান থেকে আবার ঘুরিয়ে কোমরে গোঁজা হয়েছে ধরতে পারলাম না। পেকে সাদা হয়ে ওঠা চুলগুলো মনে হলো পেছনে টান টান করে বাঁধা। নাকি নয়, বরং পেছনমুখো হয়ে এমনভাবে লেপ্টে আছে যে বাঁধা বলে ভুল হয়। চাঁদের আলোয় সাদা রঙের বিক্ষেপ মাথার ওপর, তাকে জ্যোতির্ময় লাগছে। ফাঁক হওয়া ঠোঁটের ভেতর থেকে সাদা দাঁত বেরিয়ে ছিল। মনে হলো, ভারি ক্রোধ। মনে হলো, মুহূর্তের জন্য তার মনটা পড়তে পারলাম। শাপ দেওয়ার জন্য তিনি তৈরি রীতিমতো।

পুরাণের পাতা থেকে উঠে আসা ক্ষিপ্ত মুনি। আমাকে বললেন, ‘ভরদ্বাজের রক্ত যেন কার দেহে বইছে। সংকট বুঝতে পেরে উঠে এলাম।’

আঙুল দিয়ে বটগাছের গোড়াটা দেখালেন। সেখানে কোথায় ছিলেন আলো-আঁধারীতে বুঝতে পারলাম না। আবার তার মুখের দিকে তাকালাম। 

‘ভরদ্বাজ আমার স্নেহধন্য ছিল। স্নেহধন্য ছিল তার পুত্রও, এবং তারও পুত্র। কিন্তু পরে তারা আমার অপ্রীতি উৎপন্ন করে। দেখতে পাচ্ছি, তোর সঙ্গে বন্ধু আছে একজন। রক্তের ঘ্রাণ বলছে রাক্ষসকুলে জন্ম, অগ্রজের অবাধ্য, কিন্তু শাস্ত্রজ্ঞ। শ^াপদেরা এখনই এপথ ধরে যাবে, ওরা ক্ষুধার্ত। উষ্ণ নোনা রক্তের ঘ্রাণ পেয়েছে, তাই পিছু ছাড়ছে না। ওদের রক্তের ভেতর আদিম পুরুষ ডাক দিয়েছে। ঘ্রাণশক্তি প্রবল ওদের। এখানে আসামাত্র ধরা পড়ে যাবি তোরা। তোরা এখনই দেহ তোল।’

বললাম, ‘মহাত্মা। যদি বিগতকালে কোনো পুণ্যযোগ থাকে, তো তার বিনিময়ে আমাদের লুকিয়ে রাখুন।’

তিনি বললেন, ‘অতীত নয়, বরং সামনের দিনগুলোয় তোদের পুণ্যযোগ। পুরন্নম নরক থেকে তোমরা পিতৃকুলকে রক্ষা করবে। পুণ্যযোগ। বর দিতে সম্মত। কিন্তু বিনা প্রশ্নে বর দান করি না।’

‘তথাস্তু, মহাত্মন।’

ময়ূখ চোখ গোল করে একবার আমাকে, আরেকবার মুনিকে দেখছে। দেখলাম, সম্ভ্রমে কেমন গুটিয়ে বসল। 

মুনি বললেন, ‘বলো, মানুষ কী চায়।’

প্রশ্ন শুনে আমি কী উত্তর দেবো ভেবে পেলাম না। কী চায় তা এক কথায় কী করে বলি। সাধু আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার পলক ফেলার গতি অতিধীর। বেশ কিছু সময় কেটে গেল, কিছুই মাথায় এলো না। শ^াপদের পথ কমে আসছে। ভাবনার গতি বাড়ানো দরকার।

এ সময় পাশ থেকে ময়ূখ কথা বলে উঠল, যেন সবল শীলাবৃষ্টির ভেতর মাথার ওপর ছাতা নিয়ে দাঁড়াল কেউ। 

‘মানুষ রোদ পেলে ছায়া চায়, ছায়া পেলে রোদ।’

নীরবতা নামল। হঠাৎ চুরচুর করে তা ভেঙে দিয়ে মুনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললেন, ‘দুর্গজয়! আমি তুষ্ট!’

আমি ময়ূখের দিকে তাকালাম। সেই মুহূর্তে তার মনের গতি আমি বুঝতে পারলাম না। ওদিকে মুনি উত্তরে ধু-ধু নদীতটের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তিষ্ঠ! তিষ্ঠ!’

দূরে কারা মাটিতে বুক ঘষে এগিয়ে আসছিল, তিষ্ঠ উচ্চারণে থমকে দাঁড়াল। মুনি বললেন, ‘বৃত্তায়ন!’

দেখি চারপেয়ে প্রাণীগুলো নিদ্রাগ্রস্তের মতো হেলেদুলে হাঁটতে থাকল বৃত্তাকারে।

সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে এনে মুনিবর বললেন, ‘মানুষের প্রতি বলবতী হিংসা ওদের চালিত করছে। পরমাত্মা ওদের মাঝেও বণ্টিত। আমার সঙ্গে যোগ ঘটাতে ওরাও পারে। পরমাত্মার সংযোগহেতু টের পাই। তপস্যা ঘোরতর হলে আমি ওদেরও ফেরাব না। এরপর ময়ূখের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা দুটি এখানেই থাকতে পারবে। মাটির গর্ভস্থ মন্দিরে আমার ত্রিকোণ ঘরটা ব্যবহার করো। ওই ঘরটায় থাকে আমার মায়া। আর নদীর বুকের ওই যে উপাসনালয়। ওইখানে থাকে আমার কায়া। আর সর্বত্র বিরাজিত- আমার ছায়া।’

আমরা বর পেলাম অমর বন্ধুতা, আর অখণ্ড যোগাযোগ। মুনি বললেন, ‘এর ধার আছে, ভারও আছে। হাত কেটো না, অধীরও হয়ো না। নিশ্চয়ই ফল ফলবে।’

নদের তীর ঘেঁষে মাচানের মতো কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে মসজিদ। তার নীচে নদের জল, আসছে, খেলছে, ফিরে চলেছে। বটগাছের কাছে গিয়ে ঝোপালো সব বীরুতের সরু যত ডালপালা সরিয়ে ঝরকাকাটা চাঁদের আলোয় দেখলাম, মোমের মতো গলে যাওয়ার শেকড়ের নিচে পুরনো এক শিবমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ নাক বের করে শ্বাস নিচ্ছে। পশ্চিমে মার্জিত স্বরে কথা বলছে তুরাগ। আহ, সেই রাত!

দূরে বিন্দুর মতো দৃশ্যমান ওই  মহাশৃগালগুলোর ঘোর কেটে গেছে। উঠে দাঁড়াচ্ছে ওরা একের পর এক। আমরা মন্দিরের পাতালে, ত্রিকোণ ঘরে আশ্রয় নিলাম। বিরাট সেই বটবৃক্ষের কাছে এসে ঘুরে গেল মহাশেয়ালের বংশধরেরা। তারা চলে গেলে আমরা বেরোলাম।

ওই মাচা মসজিদের সামনের অংশে একটা বারান্দা আছে। বাড়তি আর বাতিল চটের দীর্ঘ সব মাদুর ওখানে জড়ো করে রাখা ওখানে। তার ভেতর কুণ্ডুলী পাকিয়ে শুয়ে আছেন এক রহস্যময় বৃদ্ধ, অশীতিপর। দাঁতহীন মুখে টোল খাওয়া চোয়াল, কোটরে ঢুকে পড়া চোখ আর কুঁচকে যাওয়া চামড়া। প্রায় নিশ্চিহ্ন ভুরুর নিচে নিভু নিভু আগুন জ¦লে, তাতে মহামুনিকে পাওয়া যায়।

মুনি বলেছিলেন, ‘আমার মায়ার নাম আয়না, আমার কায়ার নাম বুধবার, আমার ছায়ার নাম শূন্য।’ 

আমরা নত হয়ে তাঁকে প্রণতি জানালাম। তিনি আমাদের সালাম গ্রহণ করলেন কিনা বলতে পারলাম না। তাই পরদিন আমরা আবার সেখানে গেলাম, এবং একই অবস্থায় পেলাম তাঁকে। তিনি আমাদের চিনতে পারলেন। তিনি আমাদের নাম বললেন। ক্রমে আবিষ্কার করলাম তিনি সবাইকে চেনেন, সবাইকে জানেন। পৃথিবীর এমন একজন মানুষ মৃত্যুবরণ করেননি যাকে তিনি জানেন না। পৃথিবীর একজন মানুষ জন্মলাভ করেননি যাকে তিনি চেনেন না। আমরা আশ্চর্য হয়ে গেলাম। আমরা অধীর হয়ে উঠলাম।

তিনি বললেন, ‘এ পৃথিবীর জীবিত ও মৃত সমস্ত প্রাণকে আমার জানা, এবং এখানেই শেষ নয়,’ তার কণ্ঠ দুর্বল, জরাগ্রস্ত, ‘তাদের আমি নিজের ভেতর অনুভব করতে পারি। আমার যোগাযোগ এতই প্রাকৃতিক, এমনভাবে তা পারি, যেন আমিই সে, সে-ই আমি। যেন আমিই ওরা, ওরাই আমি। আমি বলে যেতে পারি তার বর্তমান, তার অতীত। ভবিষ্যৎ বলতে পারি না। বর্তমান আর অতীতের লব্ধি প্রতিমুহূর্তে অসংখ্য ভবিষ্যৎ তৈরি করছে এবং তার ভেতর থেকে হঠাৎ একটি নির্বাচিত হচ্ছে। পাত্রের ওপর আমার দখল আছে, মানে স্থান আর কালের ওপর আছে। কিন্তু সম্ভাবনার ওপর দখল নেই। ওটা আমার জায়গা নয়। আমার জায়গা জীবিত ও মৃত সমস্ত প্রাণ। আমি তাদের ভেতর পশে যেতে পারি। তবেÑ’

এখানে তিনি থেমেছিলেন। তবে?

‘তবে তার আগে আমার মনকে ভয়াবহ এক দুঃখে জারিত করতে হয়। এতখানি, যেন আমি অস্তিত্ব বদলে ফেলতে ব্যাকুল হয়ে উঠি। আর আমাকে আমার ব্যাকুলতার কাছে নিয়ে যাওয়ার একটাই পথ।’

সেই পথ তিনি আমাদের জানিয়ে দিলেন।

এক সোনালি বিকেলে তাঁর সামনে আমি একটা আয়না ধরলাম, প্রশ্ন করলাম, ‘কাকে দেখছেন?’

তিনি সরু চোখ করে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এরপর চোখ জোড়া আরও কাছে নিয়ে এসে গভীর মনোযোগে অনেকটা সময় চেয়ে থেকে প্রায় শোনা যায় না এমন স্বরে বললেন, ‘এ যে বুধবার!’

‘বুধবার শেষ কবে আয়নায় নিজেকে দেখেছিল?’

‘যখন শূন্য আসেনি।’

‘শূন্য কখন এলো?’

‘আহা বুধবার, তোমার কী হলো, হ্যাঁ? আহা। কখন শূন্য এলো এ প্রশ্নের কী উত্তর আছে। যখন তোমার পূর্ণতার শর্ত পঞ্চভূতে হলো বিলীন, বলো ওকে? বলে দাও, যখন অস্তিত্ব খুইয়ে সে পুরোপুরি, পুরোপুরি তোমার চেতনা হলো- তখন,’ বুধবার কাতর কণ্ঠে বলছিলেন।  

‘কে সে!’

‘আমার সাথী।’

‘কী নাম তার!’

বুধবার মৃগী-জরাগ্রস্তের মতো কাঁপতে থাকলেন। কাঁপতে থাকল তাঁর হাতের পাতা। সূর্যের দিকে ঘোলাটে চোখ তুলে ধীরে ধীরে বললেন, ‘সেতু, ওর নাম।’ এরপর শীর্ণ হাত তুলে আঙুল নির্দেশ করে তুরাগের অপ্রশস্ত বুক দেখিয়ে বললেন, ‘এই নদে আমি তাকে ডুবিয়ে মেরেছি।’

আমাদের বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দিয়ে তিনি ঘড়িহীন সময় ধরে ডুকরে ডুকরে কাঁদলেন, তাঁর কান্নার বান ভয়ানক উথলে উঠল, তুরাগের জল আছড়ে পড়তে থাকল সবেগে, সেই নির্জন মসজিদের মাচার খুঁটির কাছে দাঁড়িয়ে আমরা… এবং- এই সেই সময়, সেই উপযুক্ত সময়, যখন আয়নাটা সরিয়ে বলে উঠতে হয়, তুমি বুধবার নও, তুমি বরং ‘…’ এবং তখন বুধবার বলেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ আমি তাই, আমি সে, সে-ই আমি।’  

এরপর তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে সমস্ত বলে যান, সমস্ত! ‘প্রকৃতির কাছে আমি নতজানু, আমি নতজানু তোমার কাছে হে প্রকৃতি,’ আমি বলে যাই, ‘যে তুমি তোমার রহস্যের খানিকটা হলেও আমার সামনে উন্মুক্ত করেছ!’

মন্দিরের কথা বলছিলাম, গরমকালে ওটা জাতসাপের আবাস। শীতকাল এলে সাপের কুল মাটির আরও গভীরে চলে যায়। মাচানের ওপর সেই মসজিদের বারান্দা কিংবা ভূগর্ভে তলিয়ে যাওয়া মন্দিরের পাতালে ওই ত্রিকোণঘর, এ দুটির বাসিন্দা যে কায়া ও মায়া; সেই মুনিবর, সেই বুধবার, সেই রাতে আমাদের বর দিয়েছিলেন। আমাদের বর- অমর বন্ধুতা, অখণ্ড যোগাযোগ।

মুনি বলেছিলেন, এর ধারে হাত কেটো না, এর ভরে অধীর হয়ো না। আমার হাত কাটল না, কিন্তু আমি অধীর হয়ে গেলাম। অখণ্ড যোগাযোগ আমার বুকের ওপর চেপে বসতে থাকল। বরের ওটুকু আমার মন প্রত্যাখ্যান করতেই টের পেলাম, মাথার ওপর থেকে ছায়ার একাংশ যেন সরে গেল, যেমন জলো মেঘের হালকা হয়ে আসা অংশ ছিন্ন হয়ে বাতাসে সরে যায়। আমার ওপর থেকে মুনির আশিসের কিছুটা সরে গেল। তুমি ভার বহন করবে, না তুমি গন্তব্যে পৌঁছানোর উপহার- কী করে গ্রহণ করবে। বরের দূরপ্রসারী সবটুকু প্রভাব কেবল ময়ূখের ওপর আরোপিত হতে থাকল। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম এই বলে যে, অত ক্ষমতা আমার নাই- অত যাতনা নেওয়ার মতো ক্ষমতা নাই, নাই তো। ময়ূখের তা আছে, আমি জানতাম।

এখন, ক্রমে, ময়ূখই বুধবার, বুধবারই ময়ূখ।

মাঝখানে তুরাগে অনেক জল গড়াল। ময়ূখের সাধনফুলও শতডালে ফুটে উঠল। ময়ূখ এ মুহূর্তে সে পৃথিবীর সমস্ত পরিবারে কোনো না কোনো সদস্য। এই সুরবাংলার যে কোনো পরিবারে গিয়ে খোঁজ নিয়ে তাকে পাওয়া যাবে। কারও সে বড় ভাই, কারও ছোট বোন, কারও সে বাবা, কোথাও সে মা, কোথাও স্ত্রী, কোথাও তালই, উকিল পিতা। এখানেই শেষ নয়। কারও সে বন্ধু, কারও শ্যালক, কারও শিক্ষক, কারও কাছে মনের রাজা, কারও কাছে রানী।

কিন্তু, সবার ভেতর রোপিত ময়ূখ নিঃসঙ্গ। যে কারণে বুধবার নিঃসঙ্গ। মাঝনদীতে সেতুর মৃত্যু হয়েছিল, এবং তারই কারণে। সেতু তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী। 

যাহোক-

আমি দেখলাম, ময়ূখ আচমকা দৌড়াতে শুরু করেছে। দেখে এক পা করে পেছাতে থাকলাম আমি। ঈশ্বর! বলে বোঝাতে পারব না, কী প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল বুক ভেঙে হৃৎপিণ্ডটা বেরিয়ে আসবে।

চাঁদের নরম আলোয় ডুবে আছে পুরো গ্রাম। মনে হচ্ছিল গাছগুলো মুখ নামিয়ে আলোয় ভিজছে আর অল্প অল্প হাসছে। চোখের সামনে ময়ূখ তখন হুমড়ি খেয়ে ধানক্ষেতের ওপর পড়ে আছে। দেখলাম ওর গলায় পেঁচানো চাদরের ঝুল হাঁটুর নিচে চাপা পড়েছে। উঠে দাঁড়াতে পারছে না ময়ূখ। একাকী যুঝছে মাটির ওপর। আমার মুখ দিয়ে একটা শব্দও বেরোচ্ছে না। হঠাৎ গলায় পেঁচিয়ে ওঠা চাদরের ফাঁস খুলে দাঁড়িয়ে পড়ে ময়ূখ চিৎকার করে বলল, ‘পালাও!’

ওর চিৎকার শোনামাত্র, যে পথে এসেছিলাম ঘুরে ছুটতে শুরু করলাম।

পেছনে ময়ূখের আর্তচিৎকার। শুনে আবার থমকে দাঁড়ালাম। ছিঃ! এ আমি কী করছি! বন্ধুকে এভাবে রেখে পালাচ্ছে এ কে? এ তো আমি নই।

ঘুরে দাঁড়ালাম। কেবল বুকের হাঁপর চলছে, আর বিশ^কর্মা মারছেন সজোর সরোষ ঘা, একের পর এক, একের পর এক। দেখলাম ময়ূখ উঠে দৌড়ুতে শুরু করেছে, তবে এবার আর আমার দিকে আসছে না। দু’জনকেই এক দিকের শিকারে পরিণত না করার মতো বুদ্ধি তখনও ধরে রেখেছিল ময়ূখ, তখন বুঝিনি যদিও। মনে হচ্ছিল, উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে কেন ও? একসাথে থাকলে কী সুন্দর একসঙ্গে লড়া যেত! আবার এমনকি ক্ষণিকের জন্য এও মনে হয়েছিল, আমার দিকে এলো না কেন ও? আমাকে শুধু পালাতে বলেই শেষ? একা বাঁচতে চাইলো?

চাঁদের আলোয় দেখলাম, ভয়বিকৃত মুখ নিয়ে ময়ূখ ছুটছে। চাঁদের আলোয় অত দূর থেকে কি আর দেখা সম্ভব? ওটা আমার মনের কল্পনা। তবে এটা সত্য, স্পষ্ট দেখলাম, ওর পিঠের কাপড়ে আগুন ধরে গেছে। এ মুহূর্তে মাটিতে গড়ানো দরকার। কিন্তু একবার পড়লে আর উঠতে হবে না। আবছা কতকগুলো অবয়ব দ্রুত আগপিছ করছে। কিছু তার পিছু নিয়েছিল। দৌড়ুতো দৌড়ুতে ঝুঁকে হঠাৎ পড়ে গেল ময়ূখ। আমার মনের কথা তার কাছে পৌঁছে গেছে নাকি অনভ্যাসে টাল হারিয়ে পড়ে গেছে বুঝতে পারলাম না।

আচ্ছা, আগুন এলো কোত্থেকে?

পেছনের ছায়ামূর্তিগুলোকে কিছুটা বিভ্রান্ত দেখা গেল। ময়ূখের পেছন আর দু’পাশ ধরে ওরা দৌড়াচ্ছিল। সামনে যেতে চাইছিল নাÑ প্রকৃতির খেয়াল। কিন্তু যে যে অবস্থানে আছে সে অবস্থান থেকেই, প্রথমবারের মতো দেখলাম, ওর দিকে সবেগে আগুনের ছোট ছোট পিণ্ড ছুড়ে মারছে। পিণ্ডগুলোর দু-একটা ময়ূখের পিঠে লেগে মাটিতে পড়েই নিভে যাচ্ছিল, কিছু কিছু হচ্ছিল লক্ষ্যভ্রষ্ট।

জানি না কোনো গাছ নিজ থেকে আমার পথের ওপর এগিয়ে এলো কিনা, কারণ একটু আগেও কোনো গাছ আমি দেখিনি। তার আড়ালে চলে গেলাম। ময়ূখের চাদরটা দলিতমথিত হয়ে ক্ষেতে দুমড়ে থাকা ধানগাছের ওপর পড়ে আছে। মনে আছে, একবার কেবল মনে হয়েছিল, ওই চাদরটা রক্ষা করা দরকার। ওর পেছনে ময়ূখের দরদের তীব্রতার কথা আমি জানতাম। আমি জানতাম, ওটা তার কাছে নিছক একটা চাদর ছিল না।

এরপরই আমি ছুটতে শুরু করলাম। চাদরটা নিয়েছিলাম বলে মনে পড়ে না। কিন্তু বহুক্ষণ পরে যখন আমি একটা মাছবাহী বিরাট ট্রাকে চেপে বসেছি, বিকট আঁশটেগন্ধি সব পিপের পেছনে আড়াল নিয়েছি, তখন হঠাৎ অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছিলাম চাদরটা আমার গায়ে। এ কী রকম কাণ্ড কে বলবে। এখন ঘটনার পরম্পরা সাজাতে গিয়ে ওই ফাঁকা জায়গাটা বাদে যেটুকু মনে পড়ছ তা হলো- ওই আধস্বচ্ছ কালো অবয়বগুলো, একজন কি দু’জন তখনও রয়ে গিয়েছিল কুঁড়েতে, বেরিয়ে এসেছিল পরপরই, এবং ওরা দেখল আমাকে। কেবল দেখার দেরি। তৎক্ষণাৎ হাতের মুঠো থেকে ওই অগ্নিপিণ্ড ছুড়তে শুরু করে দিলো। আমি কয়েকটা পিণ্ড এড়িয়ে কি খানিকটা সামনের দিকে যেতে চেষ্টা করেছিলাম? খেতে নামার চেষ্টা করেছিলাম! মনে নেই। না থাকলে নেই, কিন্তু আমি নিশ্চয়ই মাঠে গিয়েছিলাম। ওই প্রেতগুলোর কেউ এসে আমার গলায় উত্তরীয় পরিয়ে যায়নি।  হয়ত ফেরার সময় কোনোভাবে আমি আঘাত পেয়ে বা প্রচণ্ড ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছিলাম, যে স্মৃতি আমার মন মুছে দিয়েছে। তারপর হয়ত আবার ছুটতে শুরু করি।

হ্যাঁ, এটা মনে পড়ল, আবার ছুটতে শুরু করার বেশ কিছুক্ষণ আমার মনে ছিল না আসলে কোথায় ছুটছি, কেনই বা ছুটছি। হঠাৎ যখন মনে পড়ে গেল, পেছন ফিরে তাকালাম, এবং যা বুঝলাম তাতে একটু হলেও বুকে শান্তি ফিরে এলো।  ময়ূখ ওদের সীমার বাইরে চলে গেছে। এবার আর মন বাঁধা নাই। সুতরাং- দৌড় বলে কাকে। দৌড়ুতে দৌড়ুতে টের পেলাম জগৎটাই আমার সঙ্গে দৌড়ুচ্ছে। ক্ষেত দৌড়াচ্ছে, মাঠ দৌড়াচ্ছে, সনিষ্ঠ সাথির মতো চাঁদ দৌড়াচ্ছে, গম্ভীর অভিভাবকের মতো অরণ্য দৌড়াচ্ছে, প্রেমিকার মতো নদী দৌড়াচ্ছে। প্রথম কিছুক্ষণ আমার এপাশে-ওপাশে আগুনের পিণ্ড এসে পড়ে গাছ জ¦ালিয়ে দিলো, ঘাস জ¦ালিয়ে দিলো। পথের ওপর নুয়ে আসা বাঁশের ঝাড় জ¦ালিয়ে দিলো। কিন্তু আমার গায়ে এসে পড়ল না। এর কৃতিত্বটা কি আমার? নাকি এর বদান্যতা ওই প্রেতসমস্তের, কে বলবে।

যাহোক, দৌড়াতে দৌড়াতে পেলাম একটা সরু পাকা রাস্তা। ছুটতে ছুটতে মনে হলো শরীরটা হালকা হয়ে এসেছে। পায়ে ডানা গজিয়েছে। বারকয়েক মুহূর্তের জন্য ময়ূখের কথা মনে হলো। মনে হলো একবার, কেবল একটিবার পেছন ফিরে দেখি। দেখি, কেউ পিছু নিয়েছে কিনা আমার। পরে ভাবলাম, নাহ, পেছনে তাকাতে নেই। কোনো মায়ায় যদি পড়ে যাই! তখন ভাবনাচিন্তা কেমন এলোমেলো হয়ে এসেছিল।

ওই পথ গিয়ে মিলেছে মহাসড়কের সঙ্গে। মহাসড়কে এসেই ভাবলাম, আর অপেক্ষা নয়, পিছু ফেরাও নয়। ছাড়তে হবে, এই পাপগ্রাম ছাড়তে হবে। মহাসড়ক পেয়েই মনে এলো ময়ূখের কথা। সৌভাগ্যক্রমে আমি এদিকে দৌড়ানোয় ওই সরু পাকা রাস্তাটা পেয়েছিলাম। ময়ূখ যেদিকে গেছে, তাতে ওর আরও গহিন গ্রামের দিকে চলে যাওয়ার কথা। হালট সেখান থেকে আরও বহুদূরের ঘুরপথ; আমাদের থাকার গ্রাম নলদমন্তী আর এর আশপাশটা যতটা ঘুরেছি আমরা, তার অভিজ্ঞতা থেকে জানি।

দৌড়াতে দৌড়াতে আমি মহাসড়কে এসে যখন হাঁপাচ্ছি, দূর থেকে একটা ট্রাক আসছে দেখলাম। বড় বড় রাগী চোখের মতো দুটো হেডলাইট জ¦লছে। ট্রাকটা বড় রাস্তার এপাশ ওপাশ টলছিল, যেন মাতাল। স্বাভাবিক সময় হলে ওটায় চড়ার কথা ভাবতেই পারতাম না। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। আমি রাস্তার মধ্যখানে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে থাকলাম। ট্রাকটা কাছে আসতে আলোয় প্রায় অন্ধ হয়ে গেলাম। রাস্তার একপাশে সরে আসতে হলো। মনে হচ্ছিল থামবে না গাড়িটা। বিপদগ্রস্ত পথিককে তুলে নিয়ে কম বিপদে পড়তে হয় না ট্রাকওয়ালাদের, ট্রাক বমাল অদৃশ্য হয়ে যায়। আমার সৌভাগ্য যে চালকের মনে হয়ত করুণা জেগেছিল। গাড়িটা রাস্তার একপাশে থামতেই দৌড়ে গেলাম। পা দুটো টনটনিয়ে উঠল। শেষবার নেত্রকোনায় গিয়ে টানা আট ঘণ্টা হাঁটার পর এ দশা হয়েছিল। আর এই ম্যারাথন দৌড়ের সময় আর সীমা কত ছিল তা প্রকৃতি জানে।

ট্রাকের দরজা খুলে চালক সহকারী জিজ্ঞেস করল, কই যাবেন?

গাড়ি যতটুকু আলো ছড়াচ্ছিল তাতে তার মুখের অবয়বটুকুই কেবল বোঝা যাচ্ছিল। আমার মাথায় রূপোসনগরের নাম মনে এলো তা-ই বলে দিলাম।

ট্রাকটা চলতে শুরু করল, এবং এই যে অজানা অচেনা দেশে বিপদের মুখে ময়ূখকে রেখে আমি একা একাই নিরাপদে নিশ্চিন্তে রূপোসনগরের পথে রওনা হয়ে গেলাম, এটা আমাকে আজীবন পোড়াবে।  ময়ূখের কোনো খোঁজ না করেই আমি রূপোসনগরের গাড়িতে কী করে উঠে বসলাম? নিজেকে কোনোদিন আমি ক্ষমা করব না। আমার জীবনের একটা বড় অংশ অনুতাপের উত্তাপে তরল। প্রকৃতি হয়ত এটাই ঠিক করেছে আমার জন্য।

হ্যাঁ, এরপর সেই পরীক্ষার দীর্ঘ কাল শুরু। বন্ধুকে ফেলে ক্রমশ ঢাকার দিকে এগোচ্ছি, রূপোসনগরের দিকে এগোচ্ছি, আর মনের ভেতর পুড়ছি। যতই জ¦লছি, ততই উপশমের তাগিদ থেকে আত্মপক্ষ সমর্থন করছে মন। দশ মনের পাঁচ মন আত্মপক্ষে লড়ছে। ওরা বলছে, তোমার এর বেশি কিছু করার ছিল না। যে যেদিকে পেরেছ পালিয়েছ। এমনকি ময়ূখও তো জানে না তুমি এখন কোথায়, কী করছ, কেমন আছো। তোমাদের ভেতর যোগাযোগের কোনো সুযোগ আর ছিল না, সুতরাং রূপোসনগরই একমাত্র গন্তব্য যেখানে ফিরে গিয়ে তোমরা আবার দেখা করতে পারো। আর আরেকটা বড় ব্যাপার টাকা। টাকা আমরা ঘরেও রাখতাম না, শুধু একজনের কাছেও না। টাকা যার যারটা তার তার কাছে থাকত। ওটাই তো বাঁচিয়েছে। আর ময়ূখ বুদ্ধিমান, সেও নিজের একটা ব্যবস্থা করে নিতে পারবে। এ মুহূর্তে প্রকৃতিকে কেবল এটুকু বলার আছে, হে প্রকৃতি, তুমি অন্ধ হলেও অন্ধত্বকর নও, তুমি উদ্দেশ্যবিহীন হলেও গন্তব্যধর- দেখো, আমার মন আবার প্রার্থনাও বানাচ্ছেÑ তুমি আমার মনের ঝোঁক বুঝে নাও কারণ আমিও প্রকৃতি, তুমি আমার বন্ধুকে দেখো।’ আমি তা-ই জপছিলাম।

আমি এর আগেও দেখেছি, এমন পথজীবী মানুষেরা পথের বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করে। এটা হয়ত পথের কোনো নিয়ম, কে জানে। যদি হয়, তো বলব, এ ধরনের নিয়মগুলোই ধর্ম। পথজীবীরা জানে, তার আজকের বদান্যতা কাল তাকে বাঁচাবে।

আমার জায়গা হয়েছিল ওদের পাশে। চালক, সহকারী আর উটকো যাত্রী, এই তিনজন উইন্ডশিল্ডের এপারে দুলছে আর ইঞ্জিনের ওম পোহাচ্ছে। ওপারে হেডলাইটের দুটো আলোয় আলোকিত অন্ধকার রাস্তা। অপর দিক থেকে সবেগে বাস আসছে, ট্রাক আসছে, আমাদের চালক নিথর মুখে তাদের পথ করে দিচ্ছে। কাউকে অতিক্রমের কোনো তাড়া তার ভেতর নেই, বেশ তো।  

দেখলাম, চালকের সামনে ড্যাশবোর্ডে রাখা পান আর কাঁচামরিচ। পরমুহূর্তে চৌকো মুখের প্রৌঢ় লোকটা একটা পান নিয়ে মুখে দিলো, তারপর কাঁচামরিচে কামড়। কী সাংঘাতিক!

খানিক বাদে চালকের সহকারীরও এই কাণ্ড করল। ঝালে চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসার জোগাড়। ঘুম পরপারে।

একটু আগে নির্লিপ্ত মনে হয়েছিল চালককে, কিন্তু কাঁচামরিচে কামড় পড়ার পর দেখা গেল ধারণা বদলানোর সময় এসেছে। চোখের সামনের বিশাল পর্দায় এর তার সঙ্গে পাল্লা শুরু হয়ে গেল। একেবারে বাস্তব হারজিতের লড়াই। প্রথম কিছুক্ষণ দারুণ লাগল, এরপর লাগল ভয়। পত্রিকার বিদঘুটে সব শিরোনাম ভাসতে থাকল চোখ। এভাবে কতক্ষণ চলতে পারে কোনো ধারণা ছিল না। দেখলাম প্রায় এক ঘণ্টা হবে, টানা চলল এমন। শেষদিকে একঘেয়ে লাগল খুব। একটা আঠালো তন্দ্রাভাব আমাকে কাবু করে ফেলতে থাকল। এবার, আবার ভালো লাগতে থাকল। ভাবলাম, এভাবে চলুক না, মন্দ কী। কপাল বরাবর ঠোনা খেলাম পরমুহূর্তেই।

ট্রাকটা থেমে গেছে। আমাকে কোল ডিঙিয়ে চালকের সহকারী দরজার ছিটকিনি খুলে দিলো। দেখি নিচে দাঁড়িয়ে এক মধ্যবয়সী নারী। পেছনের গাড়ির আলোয় চোখে পড়ল তার প্রশস্ত কাজলটানা চোখ, ভুরু। ঢেউ খেলানো চুল। চালকের দিকে তাকিয়ে দেখি, স্যালুট দেওয়ার ভঙ্গিতে হাতটা তার কপালে উঠে গেছে। ঠোঁটে হাসি। বুঝলাম, ওরা পূর্বপরিচিত, এবং আপন লোক।

অবিশ^াস নিয়ে শুনলাম সহকারী ছেলেটা অমলিন মুখে বলছে, ‘এবার আপনি পেছনে যান।’

ওরা বিপদে আমায় আশ্রয় দিয়েছে। সুতরাং যা বলবে শিরোধার্য। তাছাড়া আশ্রয়দাতা বা তাদের আদরণীয় কাউকে তো আমি কষ্ট দিতে পারি না।

গাড়ির ড্যাশবোর্ডে একটা টিপবাতি রাখা ছিল, ছেলেটা ওটা হাতে নিয়ে আমার পেছন পেছন নেমে পড়ল। এর আগে লক্ষ্যই করিনি পেছনে কী, এবার দেখলাম।

 নীল ভেজা কতকগুলো পিপে, মোটা রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। এবার দ্বিতীয়বারের মতো ওই আঁশটে জলচাপা গন্ধটা পেলাম। গন্তব্য রূপোসনগরের ‘সকাল-সন্ধ্যা’ মাছের আড়ত। আগপিছ ভাবার সময় কোথায়। ট্রাকের পেছনে গিয়ে কী একটা ধরে ঝুলে পড়লাম। ছেলেটা আমাকে ঠেলে ওপরে তুলে দিলো।

হাড়কাটা ঠাণ্ডা। অভিমানী মন ঠোঁট ফুলিয়ে বলছে, ওরা আমায় ভেতরে নিলো না। মনকে প্রবোধ দিলাম, গাড়িতে যে নিয়েছে এই বেশি। ভেতরে না নিয়ে ভালোই করেছে। তোমাকে ওরা স্বাধীনতা দিয়েছে। আরেক মন বলছে, হায়, এমন স্বাধীনতা কে চেয়েছে!

নীল পিপেগুলোর ওপরে কালো ঢাকনায় বেশ ক’টা করে ছিদ্র। ট্রাকের ঝাঁকুনিতে ছিদ্র দিয়ে জল ছলকে বেরিয়ে আসছে।

আমি বাইরের দিকে একটা শুকনো পিপে দেখে তার পাশে বসলাম। ভেতরে খলবলে জলছলাৎ শব্দ খেলছে সারাক্ষণ, আর সেই নাসিকাবিধ্বংসী আঁশটে গন্ধ। একবার ভাবলাম, আমি ট্রাকের একেবারে শেষ প্রান্তে আছি বলে বাতাসে মাছের গন্ধ উড়ে এসে সব নাকে লাগছে। একেবারে সামনের দিকে চলে যেতে পারি তো গন্ধ থেকে রেহাই মিলবে।

বুদ্ধিটা কাজে এলো। ট্রাকের চালক-চেম্বারের কাছে গন্ধ আসলেই কম। একেবারেই গন্ধমুক্ত হওয়া তো অসম্ভব, আর শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচলাম খানিকটা, যেটা বড় অর্জন। মাথায় কানে ভালোভাবে পেঁচিয়ে নিলাম ময়ূখের চাদর- এটা এর আগেও আমাদের বহু কাজে এসেছে। কিনারের একটা অংশ দাঁতে কামড়ে ঠোঁট ঢাকলাম। পিঠের ওপর খানিটা দিলাম ছড়িয়ে। চাদর বড় হলে সুবিধা অনেক।

ওটা কীভাবে এলো আমার কাছে তা আবারও মনে করার চেষ্টা করলাম। মনে না পড়লেও ব্যাখ্যা ওই একটাই।

পিপেগুলোর মধ্যখানে সংকীর্ণ ফাঁকে কোনোভাবে শরীর বাঁকিয়ে ঘাড় গুঁজে পড়ে থাকলাম। পাশ দিয়ে যখন বাসগুলো হুশহাশ করে বেরিয়ে যাচ্ছিল, বুকে খুব ধকাধক। ট্রাক ওসবের চেয়ে অনেক ধীরে চলে। কোনো সদরে থামিয়ে ঢাকার বাস ধরা যায়। কিন্তু এত রাতে জেলা সদর ছাড়া বাস পাওয়া কঠিন।

কয়েকটা স্টপেজ পেরোলে দেখলাম কাউন্টারগুলো অন্ধকার। যা হয় হোক, শুয়ে বসে কোথাও কাটিয়ে দেবো। এভাবে শীত খেতে খেতে যাওয়া অসম্ভব। নাকি কোনো রেলস্টেশনে চলে যাব। রেলস্টেশনগুলো সাধারণ বাস ট্রাকের চলার পথে পড়ে না। সুতরাং সে চিন্তা বাদ। অচেনা জায়গা, কোথায় কোন ঠ্যাঙাড়ে ওঁৎ পেতে আছে কে জানে।

হঠাৎ ভাবলাম, বন্ধু আমার কোথায় আছে কোনো ঠিক নেই। আমি ট্রাকযাত্রাই মেনে নিলাম। এটাকে আমি শাস্তি হিসেবে বরণ করে নিলাম। আমাকে ও বলেছে পালাও, তা তো বলবেই। বন্ধুর মতোই কাজ করেছে। আমি কী করে মনকে বোঝাতে পারলাম। আমি কেন তার সঙ্গে দৌড়ালাম না। তার পিছু যারা ধাওয়া করছিল তাদের পাল্টা আক্রমণ করলাম না। স্তোত্র আমার তো কিছু কম জানা নাই।

জানি কী হলো, মুহূর্তের জন্য ইচ্ছে হলো, ট্রাক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ি। কী অপমান আমি করেছি নিজেকে! নাকমুখ থেঁতলে রক্তাক্ত হয়ে যাই। ময়ূখ হয়ত খোলা আকাশের নিচে…

সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে। নিজেকে নিজে এ শাস্তি আমি দিলাম।

মাঝে মধ্যে ঝিমুনি মতন এলো। কিছু কিছু এলাকার রাস্তা এত খারাপ যে, ঝাঁকুনিতে আবারও পিপেগুলোর জলবিয়োগ হলো। তবে ধীরে ধীরে গা-সওয়া মন-সওয়া হয়ে গেল সব।

সকাল নাগাদ ঢাকার সীমায় ঢোকার কিছুক্ষণের ভেতর তন্দ্রা ভেঙে এদিক-ওদিক তাকাতে পরিচিত ঠেকল দু’পাশ। পথের পাশে সার দেওয়া দোকানের সাইনবোর্ডে চোখ রেখে দেখি ট্রাক জুরা অতিক্রম করছে। জুরায় চলে এসেছি যখন এবার নামা উচিত। চালকের জানালার দিকে মুখ করে চিৎকার করে থামাতে বললাম।

থামলে লাফিয়ে নেমে আসতে গিয়ে গোড়ালিতে চোট পেলাম। চালকের জানালার নিচে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলে সেও দিলো।

ওরা যে সমাজের মানুষ সেখানে দুঃখ বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের খুব বেশি চল নেই। তাই কেউ কৃতজ্ঞতা জানালে তারা বিব্রত হয়ে পড়ে, কেউ দুঃখ প্রকাশ করলে তারা কিছুক্ষণ বুঝতে পারে না।

আমি মানিব্যাগ বের করে টাকা সাধলে, কেমন অবজ্ঞা ভরে সোজা হুইলে হাত রেখে আমাকে ইশারায় সরে দাঁড়াতে বলল।

আমি অবাক হইনি। দ্বিতীয়বারও সাধিনি।

বাসায় ফিরে প্রথমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হলাম। ভরপেট খেয়ে বিছানায় পিঠ লাগালাম। বহুক্ষণ এপাশ- ওপাশ করলাম, ঘুম এলো না। মনে হচ্ছিল আমার যথেষ্ট শাস্তি হয়নি।

কখন যে চোখের পাতা লেগে এলো টের পেলাম না। ওই তীব্র অপরাধবোধ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বলেই হয়ত স্বপ্নে ময়ূখকে দেখলাম।

দেখলাম, ময়ূখ একটা মেয়ের সঙ্গে রমনা পার্কের বেঞ্চে বসে আছে। স্বপ্নে মানুষ দৃশ্যগুলো রঙহীন দেখে, কিন্তু আমি দেখলাম রঙিন। ওদের মাথার ওপর দুলছে কৃষ্ণচূড়ার ডাল। ডাল হাতছানি দিচ্ছে পাতার মঞ্জরি। প্রতিটা মঞ্জরিতে বেশ কয়েক গাছা লাল টকটকে ফুল। বেশিরভাগ ফুল তখনও কলি। দেখলাম, মেয়েটি তার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজে আছে, আর ময়ূখ চোখ জলের দিকে। সামনেই রমনার সেই হ্রদ। জলের রঙ সবুজ, তাতে পাড়ের সমস্ত গাছের বিম্ব। মনে হলো জলে অনেক কমেট মাছ সাঁতরাচ্ছে। অত দূর থেকে জলের ভেতর মাছ দেখাটা অসম্ভব।

বহু বছর আগে ময়ূখের বাগদত্তা ছিল মেয়েটি- সেতু, আমি তাকে চিনতে পারলাম। এক বুধবারের পর আর কোনোদিন কেউ তাকে পেল না।

আমি জলের ওপরে ভেসে আছি, কিন্তু আমার পায়ের পাতা জল স্পর্শ করছে না। আমি কি বাতাসে ভাসছি? চাইলেই এক আধটু ওঠানামা করতে পারছি। যখন বাতাস কেটে এদিক ওদিক ঘুরছি ফিরছি, উঠছি নামছি, মনে হচ্ছিল, ঘন কিছুর ভেতর দিয়ে চলছি, এবং আমার শক্তিক্ষয় হচ্ছে। ওরা তখনও দিব্বি ওখানে আছে।

আমি ডাকলাম, ‘ময়ূখ! ও বন্ধু রে!’ যেভাবে নাটকীয় ঢঙে ডাকি।

ময়ূখ শুনল কিনা জানি না। জলের ওপর থেকে চোখ সরাল না। কিন্তু ওই নারী মাথা তুলে এদিক ওদিক তাকাল, কে ডাকে? ময়ূখের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘আপনাকে ডাকছে!’

ময়ূখ একবার তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। যেন বুঝতে পারছে না তাকে কী বলা হচ্ছে। এরপর হঠাৎ যেন ওর বোধে এলো কথার অর্থ। চারদিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখল। কোনো উদ্বেগ নেই। বলল, ‘কই, আপনি কিছু শুনেছেন? আমি তো দেখছি না কাউকে।’

ওই নারী একবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘একবার শুনলাম বলে মনে হলো। ভুলও হতে পারে।’

ছোট বড় এক শ্বাস টেনে আবার মাথা রাখল ময়ূখের কাঁধে। আমার খুব কষ্ট হলো, ময়ূখ কিনা আমাকে দেখতে পেল না!

আমি তখনই ঘুরে হ্রদের ওপারে চলে গেলাম। একটা গাছের আড়াল নিয়ে তাকিয়ে থাকলাম ওদের দিকে। এমন সময় প্রবল যান্ত্রিক শব্দ আমার কানে এলো। রমনা পার্কের বাইরে অনেক গাড়িঘোড়ার চল। কিন্তু শব্দটা এসেছে ভেতর থেকে।

দেখলাম, যে গাছের আড়ালে আমি দাঁড়িয়েছি তার পেছনেই একটা পায়ে চলার পাকা রাস্তা। ওই রাস্তা ধরেই হেলেদুলে জল ছিটিয়ে এগিয়ে আসছে বিরাট এক মাছের ট্রাক। জায়গাটা আর রমনা পার্ক নেই, জুরার প্রধান সড়কের কাছে কোথাও। চালক হেল্পার ছেলেটা জানালার কাচ নামিয়ে বলল, ‘উইঠে আসেন! যাবেন না? উনি নেইমে গেছেন।’

‘কে নেইমে গেইছে বাওয়া?’ সত্যিই মনে করতে পারলাম না আমি।

‘তিনি।’

হঠাৎ অকারণেই মনে হলো, কেন যেন ওই ট্রাকে না চেপে আমার উপায় নেই। আমি ট্রাকের সামনের দিকে উঠব বলে পা চালাতে চাইছি, পা চলছে না।

চালক বলল, ‘এখনও সময় আসেনি। এলেই রঙ লাগিয়ে নেব।’

‘কিসের রং!’

কোনো উত্তর নেই।

ট্রাকটা চলতে শুরু করতেই দেখি রাস্তায় আড়াআড়ি চিৎ হয়ে একটা মানুষ শুয়ে আছে। আমি ভাবছিলাম ট্রাকটা বুঝি থামবে বা পাশ  কাটাবে। কিন্তু দুটোর কোনোটাই করল না। লোকটার গায়ের ওপর যখন তুলে দিলো মনে হলো গতি না কমিয়ে বুঝি একটা গতিরোধকের ওপর তুলে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেল।

চাদরটা জড়িয়ে বাসার নিচে নেমে এলাম। ধানমণ্ডির দিকে যায় এমন এক বাসে চেপে বসলাম এরপর। মিরপুর ছাড়তে কতক্ষণ লাগে তাই ভাবছিলাম।

বিদেশ থেকে ক্রিকেট দল এসেছে, স্টেডিয়ামে খেলা চলছে। রাস্তার ওপর এসে পড়েছে বানবাতির আলো। খেলা শুরু হয়ে গেছে বলে নগরীর গোল চত্বরটা পেরোনো সম্ভব হলো। খানিক আগে এলেও মানুষের প্রতিকূল স্রোতে বাসটা ভেসে যেতে পারত, সংখ্যায় তারা এত বেশি।

চত্বরটা পেরোনোর পর আর ঘণ্টাখানেকের ভেতর পৌঁছে গেলাম ময়ূখের বাড়ির সামনে। মনে হচ্ছিল তখনও স্বপ্ন দেখছি। বারান্দার দিকে চোখ তুলে তাকাতে আমার সংকোচ হচ্ছিল।

রাস্তার দু’পাশে নিয়মিত বিরতিতে সাদাটে সরকারি আলো জ¦লছিল। আলোয় গাছের পাতা, বিদ্যুতের থামের ছায়া পড়ছিল রাস্তায়। এক গাছের ছায়ায় আত্মগোপন করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। এপায়ে ওপায়ে ভর বদল করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম। শরীর আড়াআড়ি করে দৌড়ে রাস্তা পার হলো দুটি কুকুর। রাস্তার অপর পাশে নির্মাণাধীন ভবনের ঘেরের ফোকর থেকে লেজ তুলে বেরোল ক্ষুধার্ত বেড়াল। বাড়ির পাশে বয়সী এক কড়ই গাছের নিচে ময়লার স্তূপ, থেকে থেকে সেদিক থেকে ইঁদুরের হুটোপুটির শব্দ আসছে। বেড়ালটা সেদিকে এগোল।

শীতের বিচিত্র পোশাকের নানান বয়সী মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। নিয়মিত বিরতিতে পেরিয়ে যাচ্ছে টহল পুলিশের গাড়ি। টহল দিতে গিয়ে একই গাছের নিচে পরপর দু’বার আমাকে দেখতে পেয়েছে ওরা। তৃতীয়বার ব্রেক কষল। দু’জন নেমে এলো ত্বরিত। মনে হলো, এতক্ষণের অব্যবহৃত শক্তি ওরা আমার ওপর উপুড় করবে।

 তবে কাছে এসে আমার মুখ দেখে হয়ত কিছুটা সামলে নিলো। আমার মুখের কিছু সুপ্রভাব আছে। আমি যে ঋষি ভরদ্বাজের অনুক্রমজ!

দুজন এগিয়ে এসে একজন আমার খানিকটা পেছনে দাঁড়াল, আরেকজন কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বলল, ‘আমরা একটু তল্লাশি করব আপনাকে।’ গম্ভীর কণ্ঠে আদেশের সুর। ‘ভয় নেই, কিছু মিসিং হবে না।’

ওরা বারবার ওপর-নিচ করে দেখল আমাকে। মুঠোফোন, রুপালি চাবি, কিছু খুচরো টাকা, আর একটা ঝরনা কলম পেল। কলমটা খাপ খুলে দেখল ওরা। একবার গন্ধও নিলো ওটার। এরপর সব ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন।’

বললাম, ‘এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি।’

‘বন্ধুর ফোন নাই? কতক্ষণ অপেক্ষা করবেন। ফোন করুন।’

পুলিশকে ধন্যবাদ। গতকাল থেকে একটাবার আমার ওকে ফোন করার কথা মনে আসেনি, আশ্চর্য।

‘ওকে আসলে এভাবে ডাকতে চাইছি না।’

শরীরে তল্লাশি চালানো পুলিশ সদস্য তখন নিরুত্তাপ গলায় বলল, ‘সোজা চলে যান। দাঁড়াবেন না। ঘুরে এসে আপনাকে আবার দেখলে বিপদে পড়বেন। প্রেম বেরিয়ে যাবে।’

মাথার ওপর মেঘ হয়ে থাকা মাঝবয়সী অপরূপা বাগানবিলাসটিকে একটি উড়ন্ত চুম্বন দিয়ে সরে এলাম। বাসে উঠেই ময়ূখের মুঠোফোনে ডাক পাঠালাম। বন্ধ। হলো?

এমন একটা সময় আমি ফেরার পথ ধরেছি যখন খেলাও শেষ হয়েছে। দেশি দলটা বোধহয় হেরে  গেছে, মানুষকে খুব উত্তেজিত দেখা গেল। দেখি রাস্তার অপর পাশ দিয়ে যাচ্ছে বিদেশি দলটার বাস। হঠাৎ একটা ইটের বড় টুকরো উড়ে গিয়ে বাসের জানালার ওপর পড়ল। ঈশ^র! একি বাংলাদেশ, একি সুরবাংলা!

সামনে ভিড়, বাসটা এগোতে না পেরে অবিরাম ভেঁপু বাজাতে থাকল। মানুষ, গাড়িঘোড়া সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ওটাকে জায়গা করে দিচ্ছে, কিন্তু ওটা ঠেকে যাচ্ছে, কেবলই ভেঁপু বাজছে। এমন সময় আরও একটা ইটের টুকরো গিয়ে কাচের ওপর পড়ল। আগেরটার চেয়ে এর শক্তি ছিল বেশি।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের শক্ত কাচের ওপর পলিমারের প্রলেপ, তাতে রঙিন সব নকশা আঁকা। গোটা বাসটাই তেমন নকশায় ঢাকা। খেলোয়াড়দের ভয়ার্ত কি রাগত মুখ দেখার কোনো অবকাশ পেলাম না। বাসের উইন্ডশিল্ডটা দেখলাম ফটে মাকড়সার জালের মতো রূপ নিয়েছে। 

হঠাৎ পুলিশের বাঁশি। আচমকা লোকের ভিড়ের ভেতর ঢুকে পড়ে শুরু হলো লাঠিচার্জ। ইট যারা ছুড়েছে কবেই পগারপার। নিরীহরা লাঠি খাচ্ছে এবার। 

পুলিশের দাপড়ে মানুষগুলো সড়কদ্বীপের উঁচু বেড়া হাঁচড়ে পাঁচড়ে পেরিয়ে এপারে চলে আসতে চাইছে, ধুন্ধুমার ব্যাপার। কেউ কেউ উল্টো দিকে দৌড়ে পুলিশের টহল গাড়ির সামনে পড়ে দিশেহারা। কাচঘেরা এক ফুলের দোকানের আলোয় কয়েকজনের ঘর্মাক্ত মুখ দেখা গেল। হঠাৎ রাস্তার আরেক পাশে শোরগোল শোনা গেল। তাকিয়ে দেখি সোডিয়াম আলোর নিচে এক উদ্ভ্রান্ত কিশোরের মুখ, দেখলাম, পুলিশ ঘাড়ের কাপড় মুঠো করে ধরে এক কিশোরকে গাড়ির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। হাত-পা ছুড়ছে ছেলেটা। চোখেমুখে শঠতার ছাপ।

এ ছেলেগুলো…

এমন সময় সামনের দিকের গাড়িগুলো চলতে শুরু করল। অপেক্ষাতেই ছিল চালক। কিন্তু চাকা খানিকটা গড়াতেই আবার থম! সামনে পাথুরে যানজট, কিছুই নড়ছে না, নড়বেও না।

হঠাৎ চালকের কী যে হলো, হাতের বাঁয়ে, পশ্চিমে এক গলিতে আস্ত বাসটা ঢুকিয়ে দিলো। উত্তরে একটা বন্ধ বিপণিবিতানের পেছন ঘেঁষে একটা সরু রাস্তা সোজা গিয়ে আবার পশ্চিমে মোড় নিয়েছে। চালক সেদিকে বাসের মুখ ঘুরিয়ে সবেগে টানল। অন্ধকার এবড়োথেবড়ো রাস্তায় ভেতরে ঝালমুড়ি পাকানো হচ্ছে। যাত্রীরা চিৎকার করে গালাগাল দিতে শুরু করেছে। পশ্চিমে মোড় নিয়ে এভাবে বেশ খানিকটা সময় চলল বাস। ততক্ষণ চলল খিস্তিখেউড়। বাসটা বাজার পেরোল, পরিত্যক্ত এক কলোনি পেরোল, একটা টিমটিমে আলোর জনবিরল হাসপাতাল পেরোল, তারপর আচমকা আবার উত্তরে মুখ ঘুরিয়ে যেন ছোট এক লাফ দিয়ে পড়ল নির্জর সড়কে। বহু পেছনে খেলার হইচই। মুহূর্তে শান্ত হয়ে এলো সবাই। বাকিসময় কেউ কোনো কথা বলল না।

চাবির মোচড়ে দরজা খুলে দেখি মেঝেতে একটা চিঠি পড়ে আছে।  

কাগজের পরত ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাওয়া অক্ষরগুলো দেখেই বুঝতে পারলাম, সেলিমের চিঠি। ও কাগজে ভীষণ চাপ দিয়ে লেখে। আর মুঠোফোন বর্জন করেছে আজকাল। এর ফলে যা হচ্ছে, অনেক জায়গায় গিয়ে ‘কাক্সিক্ষত মানুষটিকে খুঁজে পাচ্ছে না, কিন্তু সে দমার পাত্র নয়। চিরকুট রেখে আসছে। আর যাদের তাকে সত্যিই দরকার, তারাও ওর পন্থাতেই ওকে খুঁজে নিচ্ছে। এটা তো আসলে পারস্পরিক ব্যাপার। একসময় মোবাইল ছাড়া কি আর লোকে চলেনি? কিন্তু এখন তো সময়টা…

তাকে না পেলে যা তৈরি হয়, সেলিম তাকে বলে- আবহ। বলে, মানুষে মানুষে সম্পর্কের রহস্যময় মিষ্টতা ধরে রাখতে চাইলে এই আবহ তৈরি করতেই হবে।

যাহোক-

ওর রহস্যময় চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলাম। লিখেছে, শিগগিরই সে তুরাগ নদের ধারে যেতে চায়। বুধবারকে তার দরকার। আর একা যেতে চায় না, আমাকে নিয়ে যেতে চায়।

আমার বুকে রক্ত ছলাৎ! ময়ূখের খবর জানতে বুধবারের বিকল্প নেই। আর এটাও কিনা আমার মনে আসেনি।

তবু ভালো যে নিজের মনে না এলেও কিছু ঠেকে থাকছে না। কেউ না কেউ এসে ঠিকই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

পরদিন সকালে সেলিম এলো। জিজ্ঞেস করলাম পরীক্ষা কেমন হয়েছে।

বলল, ‘পরীক্ষাই তো হয়নি।’

‘আবার পিছিয়েছে!’

সেলিম কোনো উত্তর দিলো না। আমিও বললাম না কিছু।

দুপুরে দুটি ভাই বুধবারের পথ দিলাম। পৌঁছানো তো কেবল সময়ের ব্যাপার…

সেলিমের ব্যাগ থেকে আয়নাটা বের করে মুখের ভাপ দিয়ে একবার পরিষ্কার করে নিলাম। মাচা-মসজিদের বারান্দায় গিয়ে চটের স্তূপ থেকে বৃদ্ধকে আলাদা করে বসালাম আমি। মসজিদের পূর্বমুখী দরজা, আর তখন বিকেল। বারান্দার দিকটায় তাই ছায়া পড়েছে। সেই ছায়া ছায়া আলোয় আমি বৃদ্ধের মুখের সামনে আয়না ধরলাম।

‘আমি কমল, ও সেলিম। এ আয়নায় কে?’

… এরপর যথারীতি যা হয়ে থাকে।

 বৃদ্ধের চোখ দুটো ভয়ার্ত, মুখটা কষ্টবিকৃত। ছটফট করছে। কিন্তু আমাদের মনে যে দয়ামায়া নেই। এ কেমন কী হলো আমার কাছে বড় রহস্য, যখন ভাবি। শচীর বনকে ধন্যবাদ, ধন্যবাদ মহাশেয়ালের বংশধর, ধন্যবাদ আমাদের ফলবতী কৌতূহল, পলায়ন, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা মহামুনি, ধন্যবাদ আমাকে, ধন্যবাদ তোমাকে ময়ূখ এবং অভিশাপও তোমাকে, ময়ূখ, এবং করুণা তোমার জন্য ময়ূখ! জগৎ কোথায় কার জন্যে কী সাজিয়ে রেখেছে, সবই কি দৃষ্টিভ্রম ছিল? না, তা কী করে হয়। এই যে বৃদ্ধের সংকটÑ এ তো জীবন্ত,  এ তো কাঁচা, কী আশ্চর্য বাস্তব!

বৃদ্ধ হু হু করে কাঁদছে। বলছে, ‘আমিই তাকে হত্যা করেছি, আমিই।’ এ কান্নার কোনো শেষ নেই বুধবার।  আমি আবার প্রশ্ন করলাম, ‘কে?’

‘আমিই,’ বৃদ্ধ বলল।

‘কে?’

‘আমিই।’

‘কে?’

‘আমি, আমি, আমি, ঈশ^র। হে ঈশ^র! মৃত্যু দাও, আমাকে মৃত্যু দাও।’

উপযুক্ত সময়। সেলিম আয়না সরিয়ে নিলো। বুধবার কাঁপতে শুরু করলেন। বলতেও পারলেন নাÑ এই তোরা কারা এসেছিস, দূর হ! দূর হ!’ তার মনেও আসেনি। কাঁপতে কাঁপতে বুধবারের গালের রঙ দ্রুত বদলে যেতে থাকল। চোখের আলো নিভে আসতে থাকল। ওর পা-জোড়া কাঁপতে শুরু করল ঠকাঠক। চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে একটা অপরটার ওপর চেপে বসল।

সেলিম কী যেন বলবে বলে মুখ খুলল, কিন্তু কোনো কথা বেরোনোর আগেই আমি ওর মুখ চেপে ধরলাম। হুটোপুটি দেখে বৃদ্ধ একবার আমার দিকে, একবার সেলিমের চোখে তাকাতে থাকলেন। তার চোখের দৃষ্টিতে করুণা ভিক্ষা, তীব্র ভীতি। বললাম, ‘কাঁপছেন কেন। আপনি ময়ূখ। আপনার কোনো ভয় নেই।’

 সেলিমকে ছেড়ে দিলাম। চোখে মিনতি। ওর একটু দূরে দাঁড়িয়ে তীব্র দৃষ্টিতে আমাকে দেখতে থাকল।

আমি সন্ত্রস্ত বুধবারের কাঁধে হাত রেখে চোখে রাখলাম চোখ।

‘আপনি ময়ূখ। ময়ূখ? ময়ূখ! তুমি কেমন আছো? তোমাকে আমি খুঁজছি কতদিন! তোমার সঙ্গে নলদমন্তী পথ, কী ভয়ঙ্কর এক রাত! কেউ কারও মুখটুকু দেখারও সময় পেলাম না। ওই জ¦লন্ত চোখ, জ¦লন্ত আগুনের গোলা! দু’জন কেবল ছুটছি আর ছুটছি! ছুটছি আর ছুটছি! কিন্তু এরপর?’

বুধবার আমার কথা শুনে ঘন ঘন ঢোক গিলতে থাকলেন আর ওপর-নিচ মাথা নেড়ে চললেন থেকে থেকে, সবেগে। দেখে আমার চোখে জল এলো। আমার সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে সব, কিন্তু আমি যে নিরুপায়!

লোকটা ওপর-নিচ মাথা নাড়তে নাড়তে রুদ্ধকণ্ঠে একটা বলে গেল- ‘ঘন বন! বনের ভেতর না ঢুকে পাশ কেটে ছুটলাম, আমি ছুটলাম। পানায় ঢাকা ডোবা, আমি ডাঙা ভেবে পা রাখতেই চমক ভাঙল, কিন্তু পিছু ফিরিনি, পেরিয়ে গেছি। কাঁটা বিছানো মাটির রাস্তায় পা রক্তে ভিজেছে, তবু থামিনি। পাকা রাস্তাগুলো পেরিয়েছি এক লাফে। জমিদারের এক কুঠিবাড়ি পেরোলাম। দৌড়ুতে দৌড়ুতে, দৌড়ুতে দৌড়ুতে নেশার মতো পেয়ে গেল। টের পেলাম আমি যেন আর আমি নেই, বদলে গেছি। তারপর যমুনা নদীটা দৌড়ে পেরিয়ে গেলাম, পা ভিজল না। পেছনে তাকিয়ে দেখি নদী ফুঁসছে। দেখলাম ওরা নদীতে ডুবছে, ভাসছে, ডুবছে। আমি থামলাম না। দৌড়ুতে দৌড়ুতে, দৌড়ুতে দৌড়ুতে… কোথায় কোথায় সব শুকনো বিলের মধ্যখানে উঁচু নরম মাটি… পা দেবে যাচ্ছিল, থামলাম না। মাথার ওপর চাঁদের আলো। চাঁদটা আমার পিছু ছাড়েনি। আমি ঘামছিলাম! একবার মনে হলো, আমার চাদর কোথায়! চাদর নেই, হায়! চোখে ঘোলা দেখতে শুরু করলাম। দেখলাম কুয়াশায় আড়াল হতে চাওয়া একটা বাঁশঝাড়! বিশাল বাঁশ বন, তার ভেতর দিয়ে পায়ে চলা সাদা রাস্তা, তার শেষ নেই। মনে হলো উড়ে চলে যাই। ওড়াটা যে আমার জন্য বিশেষ কোনো কঠিন কাজ, মনেই হলো না। আমি উড়তে চাইলাম। হলো না। চারদিকে চলে যাওয়া রাস্তার কেবল এক দিক দেখেই আমি বিহ্বল, দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু কেন? দাঁড়িয়ে কেন আছি? কমল কোথায়? কমল?’

আমি বুধবারের বাহু চেপে ধরে বললাম, ‘এই তো আমি বন্ধু! এই তো আমি! আমি ভালো আছি বন্ধু! আমি দিব্যি ভালো আছি। আমি চলে এসেছি রুপোসনগর! আমি ভালো আছি।’

বুধবার বললেন, ‘আমি একদিক থেকে এলাম। সামনে পথটা সোজা চলে গেছে খোলা মাঠের দিকে। দূরে আবার বনের রেখা, মধ্যখানে ধানের ক্ষেত। আর বামে? বসতি। আরে, বসতি! কোথায় আর যাব, আমি যে বসতিই খুঁজছি। এগোলাম। দৌড়ুতে দৌড়ুতে প্রথম বাড়িটা পেরোলাম। কী এক সংকেত যেন পেল আমার মন। প্রথম বাড়িটাকে পছন্দ করতে পারলাম না, পাশ ঘেঁষে ছুটলাম। বাড়ির পেছনে জোছনাঢালা উঠান। লাউ কুমড়োর মাচা, মুরগির ঘর, খড়ের গাদা। এক কোণে গোয়াল। বেড়ার ফাঁক গলে দেখা গেল, ভেতরে কী যে নড়ছে। বাছুরই হবে হয়ত। হঠাৎ পায়ে পা জড়িয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম এক টিনের দেয়ালের ওপর। দেয়ালটা আমাকে নিলো, বুঝলে? আমাকে নিতে গিয়ে কেমন বেঁকেচুরে গেল। ভেতরে হাঁ হাঁ করে উঠল কেউ!’

‘তারপর?’

মাচা মসজিদের বারান্দা থেকে মাটিতে নেমে এলেন বুধবার। খুব ধীরে। মাথার ওপর বটের ছায়া। পায়ের নিচে তুরাগের ভিজিয়ে যাওয়া মাটি।

‘একটা আলনা, বনেদি, নকশি আলনা। দু’পাশে ময়ূরের পেখম, মধ্যখানে আড়াআড়ি ফেলা কাঠের দণ্ড বেশ কটা। আলনাটা সাদা। আমাদের ঘরের পুরনো কাঠের আলনাটা তো ফেলে দিয়েছিল। ওটায় মায়ের শাড়ির আড়ালে আমি লুকোতাম। আমার ওই আলনার কথাই মনে আছে। বড় মলিন, কেমন নরম কাঠের আলনা ছিল আমাদের। ঘরে একা থাকতাম আমি, বাইরে দরজায় তালা। মা-বাবা কাজে গেছেন। দরজা খোলা ছিল নিষেধ! টিনশেড বাড়ি। উঠোনে আমগাছ। বন্ধুদের বলতাম, বারান্দার শিক ধরে টিনের চালের ওপর গাছ ধরে নেমে আয়! ওরা আসত। ভেতরে ছোট ছোট বালকেরা লুকোচুরি খেলছে! আমি লুকোতাম ওই আলনার ওপর, মায়ের শাড়ির আড়ালে। একটা শাড়ি ছিল আমার ভারি প্রিয়! নীল জমিনের ওপর লাল লাল সূর্য আঁকা শাড়ি। আমি ওটার পেছনে লুকোতে পারলে সবচেয়ে খুশি হতাম। কী যে ভালো লাগতো! একদিন হলো কী, আলনার নিচের জুতো রাখার অংশটা আমার পায়ের চাপে গেল মটর করে ভেঙে। মা ফিরে এসে বললেন, এটা ভাঙলো কী করে! হা হা হা! হো হো হো! যে আলনা দেখলাম ওটা অমন না। ওটার নিচে অমন জুতো রাখার অংশ নেই। ওখানে শাড়ির আড়াল নিয়ে লুকোলে ওটা ভেঙে পড়ে তোমাকে ধরা পড়িয়ে দেবে না। ওটা তোমাকে আড়ালে রাখবে। ও তোমাকে আড়াল দেবে, আশ্রয় দেবে। খাবার দেবে- লীলা। লীলা সেন! কমল, ওটা লীলা সেনের বাড়ি! ভাবতেও পারিনি। আমার মাথায় পানি ঢালছিলেন তিনি লীলা। আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম। টানা টানা চোখ, কী অপূর্ব! দীর্ঘ গ্রীবা। খুব যেন চেনা। কার মতন? ভারি দরদ জড়ানো এক মসৃণ শাড়ি তার গায়ে। আমাকে বললেন, ‘আপনি কোথা থেকে আসছেন? কোথায় বাড়ি আপনার? কী নাম? কিছু মনে পড়ে না?’ পেছন থেকে পুরুষকণ্ঠে কেউ বলে উঠলেন, ‘থাক থাক। এখন কিছু জিজ্ঞেস করো না।’ আমি কেবল কণ্ঠই শুনতে পেলাম তার, চোখ তুলে দেখতে পেলাম না। মাথাটা ঘুরে উঠল। মনে হলো গোটা ঘরটা ঘুরতে শুরু করেছে। চোখ বুজে বিছানা মুঠো করে ধরলাম। শুনলাম লীলা বলছেন, এই ছেলেটা কোনো অদ্ভুত উপায়ে আমাকে চেনে। আশ্চর্য!’ আমার কপালের কাছে ঝুঁকে এসে বলে উঠলেন ওই পুরুষ কণ্ঠ, ‘ওঁকে ভালো চিকিৎসক দেখাতে হবে। যা বয়েস তাতে বেঁচে যাবে মনে হচ্ছে। তুমি একটু দেখে রেখো।’ লোকটার পোশাক থেকে আসছে তামাকে ঘ্রাণ। কোথায় শুনেছি এই কণ্ঠ? কোথায় পেয়েছি এই ঘ্রাণ? কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না। কমল! কমল, কী আশ্চর্য দেখো! ওনাকে আমি দেখতে চেয়েছিলাম। অথচ যখন মুখের ওপর ঝুঁকে এলেন, তখন আর তাকাতেই পারলাম না। কেন এমন হয়? ওঁকে দেখতে পেলাম না কিন্তু লীলা ওঁর নামটা বললেন, ‘আমি দেখছি মহেন, তুই যা।’ এই বলে লীলা থামলেন। মহেন? এ কোন মহেন? নাম তো কখনও শুনিনি। তাহলে বাকি সব কিছু কেন এতো চেনা? তামাকের ঘ্রাণটা চলে গেল। এমন সময়, চোখ বুজেই টের পেলাম ঘরে অন্য কেউ এলেন। খুব কষ্ট করে হলেও চোখ দুটো খুললাম একবার। দেখলাম, বলিষ্ঠদেহী এক যুবক। জানালা গলে আসা আলোয় তার শক্তিধর অবয়ব স্পষ্ট। আলো! বাইরে তাহলে সকাল। সকাল, না কোন বেলা, কে বলবে? লীলাই ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু তিনি কী বলবেন? লীলা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে আপনি?’ বলিষ্ঠদেহী যুবক তার দিকে একবার তাকালেন। কিন্তু কোনো উত্তর দিলেন না। লীলা আবার জিজ্ঞেস করলেন। এবার যুবক কথা বলল, ‘আমি মজনুন, আমাকে আপনি দেখেন নাই।’ লীলা বোধয় বসা ছেড়ে উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। উত্তেজিত আমিও। শুনতে পেলাম মজনুন বলছেন, ‘কাঁদছেন লীলা দি? আমি কেন কাঁদতে পারি না? কত অপেক্ষা ছিল আপনার জন্য যদি জানতেন! আপনাকে পেলাম না। কাশেম সৌদের লোকেরা পঞ্চায়েতী করে আমার বন্ধুদের চোর সাব্যস্ত করে সবার ঠোঁট কেটে নিলো। আপনি তো পাশের কয়েক গাঁ পরেই ছিলেন, এত দেরি কেন করলেন লীলাদি? রমেন দা কিছু বলেনি আপনাকে?’ আমি তো শুনে যাচ্ছি, শুনেই যাচ্ছি। কান ফেলে শুনে যাচ্ছি। লীলা বললেন, ‘তুমি আমার কাজ অনেক সহজ করে দিয়ে গিয়েছিলে মজনুন! অনেক সহজ করে দিয়েছিলে! আমি যখন পৌঁছেছি তখন সবার মুখে তোমার নাম! তোমার কথা! তোমায় নিয়ে ওরা গান বেঁধেছে মজনুন! রমেন আমার কাছে আসতে পারেনি। এখন পারবে। যেমন মহেন পেরেছে। কিন্তু এখন পেরে কী লাভ বলো? মজনুন, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে এসেছ?’ যুবক হেসে বললেন, ‘আমি জানতাম না আপনি এখানে লীলা দি! আপনাকে দেখলাম, এটা ভাইগ্য আমার। ভাইগ্যের ভাগবাটোয়ারা তাইলে এখনও চলে! আমি আসলে এসেছি, এই যে, এই ছেলেটার জন্যে।’ ক্রমে আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ওকে আমার বন্ধুরা তাড়া করেছে। এই ছেলে দৌড়ে যমুনা পার হয়েছে লীলাদি।’ লীলা বললেন, ‘অসম্ভব। এ কি মানুষের কাজ?’  মজনুন বললেন, ‘আমিও তাই ভাবছি। তাই তো দেখতে এসেছি ও সত্যিই মানুষ কিনা।’

এই বলে বুড়ো থেমে গেলেন আর আমি পিছিয়ে এলাম।

‘ময়ূখ? ময়ূখ কি তাহলে নেই?’

তুরাগের তীরে আমি শোর তুলে কাঁদতে বসলাম। বুধবার হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকল। সেলিম ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর।

‘খবরদার! খবরদার কমল একদম মেরে ফেলব তোকে, ওঠ, ওঠ বললাম!’

আমি হাসতে হাসতে কাঁদতে কাঁদতে দু’হাত জোড় করে মুখ ঢেকে বাহুর ফাঁক গলে ওর দিকে তাকালাম। এরপর নিজেকে বহু শক্তিক্ষয়ে স্বাভাবিক করে উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম বুধবারের কাছে। পেছনে তুরাগ নদের ওপর পড়ন্ত বেলার রক্তাভ আলো। রুপালি নদীর জল ক্রমশ কালো হয়ে উঠছে। বাতাসে কালো মাটির ঘ্রাণ। শুধু সূর্য থেকে রক্তাভ সরলরেখা দেখার লোকের চোখ মেপে এপার-ওপার ছুঁয়ে জলের ওপর শুয়ে আছে। নদী পেছনে রেখে দাঁড়ানো বুড়োর মুখ অন্ধকার। পেছনে উপাসনালয়ে নত হতে আসছে পূজারিরা সব।

আবার তার নামনে দাঁড়িয়ে নম্র গলায় ডাকলাম, ‘ময়ূখ?’ বুড়ো চোখে উদ্বেগ নিয়ে তাকালেন।

‘এরপর? রুপোসনগর এলে?’

‘এলাম।’

শুনে আমি উচ্ছ্বাসে হেসে ফেললাম এবার। সেলিম আমাকে জড়িয়ে ধরল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী করে এলে?’

‘গাড়িতে চড়েই এলাম।’

‘টিকিট করেছ?’

বললেন, ‘হ্যাঁ।’

‘তোমার পাশের যাত্রী তোমার সঙ্গে কথা বলেছে?’

‘না।’

‘ওই বাড়ি থেকে কীভাবে বেরোলে? কেউ আটকায়নি? বলেনি, যেও না, রেখে দেবো তোমাকে?’

‘না। কেউ ছিল না। মাঝখানে অনেক কিছু মনে নেই। আবার যেখানে মনে আছে সেখানে কেউ নেই। পরিত্যক্ত বাড়ি। গোটা গ্রামের সবাই ঘর ছেড়েছে। কিছু ঘরদোর দেখলাম, পোড়া। ঘরের কাঠামোটা কেবল কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর কিছু টিনের দেয়াল দায়ের কোপ! অসংখ্য কোপের চিহ্ন! রুপালি টিন, কালো চিহ্ন। গাঁয়ে কেউ নেই! ওই চৌরাস্তায় এসে এবার সামনের পথ ধরলাম। তখন পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা আমার। প্রচণ্ড ক্ষুধা!’

বুধবার শরীরটা ঘোরাতে থাকল নদীর দিকে। তার হাতের পাতা, নিচের ঠোঁট কাঁপছে। সেলিম বলল, ‘যথেষ্ট শুনেছিস। আজ আর কিছুই করা যাবে না। তাঁকে বাঁচতে দে।’

‘তুই কেন এসেছিলি?’

‘আমি যে এসেছিলাম সেটা ভুলে থাকলাম দাদা, যা হোক। বিবেকের সামনে একা দাঁড়াতে পারি না বলে তোকেও ডেকেছিলাম। কিন্তু, যাক, যা হয়েছে ভালো হয়েছে। তুই বেপরোয়া ছিলি, তাই-না এতকিছু জানা গেল। আমি তো জানিই না ময়ূখদাকে ওখানে ফেলে এসেছিস। ঠিক কী ঘটেছিল বলবি?’

‘বলব।’

বুধবার আবার কাঠের সিঁড়িতে নড়বড়ে পা রেখে রেখে উঠে যাচ্ছে উপাসনালয়ের দিকে। বারান্দায় গিয়ে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়ে গায়ে চটের মাদুর টেনে নিলো।

‘খবরদার ওখানেই দাঁড়া!’ সেলিমের দিকে আঙুল উঁচিয়ে আমি বললাম। ‘মুনিবরের ঘোর কেটেছে। আমি অন্য কথা বলব এবার। তুই আমার মন বুঝিস না?’

সেলিম আর এগোল না। আমি উপাসনালয়ের বারান্দার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। পা দুটো তুরাগের ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে। জলের স্পর্শ আমাকে শান্ত করল।

‘এই যে শুনুন? একটুখানি?’

বুড়ো মাথা তুলে তাকাল। আমি আমার উলের চাদরের নিচ থেকে ময়ূখের চাদরটা বের করে আনলাম।

‘এই চাদরটা এখানে থাক। কেমন?’

‘থাক না, কেউ নেবে না।’

‘এটা আপনার।’

‘বেশ।’

হামিম কামাল : কথাশিল্পী

#

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares