উপন্যাস : চন্দ্রলেখা : আবদুল্লাহ আল ইমরান

আবদুল্লাহ আল ইমরান । ।

করাতকল থেকে খবরটা নিয়ে এলো হাশেম চাচা।

বৈশাখের খাঁ-খাঁ দুপুর। বলদত্তের বিরান বাগানে পাতা কুড়াচ্ছিল শশী। অদূরেই দাঁড়িয়ে সাত বছরের ছোট ভাই হাবু। হাতে একখানা আধখোলা চটের বস্তা। ঝুড়িতে ভরে শশী শুকনো পাতা নিয়ে এলে ঠেসে তা বস্তায় ভরাই ওর কাজ।

ওদের বাবা কেরোসিনের রান্না খেতে পারেন না। দিনময় গাধার খাটুনি খেটে বাসায় আসা মানুষটাকে খাওয়ার কষ্ট দিতে চায় না শশীর মা লায়লা বানু। যত কষ্টই হোক, মাটির চুলায় রান্না করে সে। কিন্তু লাকড়িতে চট করে আগুন ধরতে চায় না। আগুন ধরাতে নানা কসরত করতে হয়। শুকনো পাতার মজুদ থাকলে সুবিধা। এক মুঠি পাতা কুপির ওপর ধরলেই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। তারপর লাকড়ি ঠেলে দিয়ে রান্না করতে বেগ পেতে হয় না। মায়ের আদেশে চুলাঘরের চতুর্দিকে তাই শুকনো পাতা মজুদ রাখে শশী।

গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। ক’দিন ধরে অসহ্য এক গুমোট পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কোথাও দাঁড়িয়ে থাকার উপায় নেই। আগুনের হল্কা এসে লাগে শরীরে। পানিতে শরীর চুবিয়ে রাখতে ইচ্ছে হয় শশীর। পাতা কুড়ানো শেষে রইচ চাচার পুকুরে গিয়ে বসে থাকার পরিকল্পনা করেছে মনে মনে।

বাগানের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে হঠাৎ হাশেম কাকার ডাকে সটান দাঁড়িয়ে পড়ল শশী। ঘুরে তাকিয়ে দেখল বয়স্ক মানুষটা গরমে হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতেই সে বলল, ‘তোগের আব্বার খবর কিছু জানোস?’

কাঁপা কণ্ঠে এমন প্রশ্নের মানে বুঝতে সময় লাগে না শশীর। নিশ্চয়ই কোনো খারাপ খবর বয়ে এনেছে চাচা। অনাগত বিপদ আঁচ করতে পেরে উত্তেজনায় হৃৎপিণ্ডটা যেন লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়। কোনো জবাব না দিয়ে অপলক শুধু তাকিয়ে থাকে শশী। সকালে নাকে-মুখে পান্তা খেয়ে সেই যে কাজে গেছে বাবা, ফিরতে ফিরতে রাত আটটা-নয়টা বেজে যাবে। এই নিয়মের বাইরে পিতার অন্য কোনো খবর জানে না শশী। দীর্ঘপথ হেঁটে আসার ধকলে হাশেম মৃধার পাতলা শরীরটা এখনও কাঁপছে। ডান হাতে শজনে গাছের শরীরে ভর দিয়ে জিরিয়ে নেয় খানিক। এই ফাঁকে হাতের ঝাড়ু ফেলে কয়েক পা এগিয়ে যায় শশী। বর্ণিল ওড়নায় মলিন মুখটা মুছে নেয় বার কয়েক। তারপর অস্ফুট স্বরে জানতে চায়, ‘আব্বার কী হইছে চাচা?’

বা হাতের আঙুলের লম্বা টানে কপালের ঘাম ঝরায় হাশেম। বলে, ‘তোর আব্বারে তো পুলিশে ধরছে। পিঠমোড়া কইরে বাইন্ধে থানায় নিয়ে গেছে।’

হঠাৎ ঝড়ে মাথাগোঁজার ঠাঁই নিশ্চিহ্ন হলে সর্বগ্রাসী কষ্ট যেভাবে পেঁচিয়ে ধরে কণ্ঠনালি, শশীর বুকেও তেমন ভাংচুর শুরু হলো। মনে হলো পায়ের তলার মাটি সরে গেছে। হঠাৎ নিজেকে শূন্য মনে হয়। ভারসাম্য হারাতে হারাতে জানতে চায় শশী, ‘আব্বায় কী করিছে? তারে পুলিশে নিছে ক্যান?’

‘তাতো জানিনে মা। কাঠ ফাড়ারকালে হঠাৎ এক গাড়ি পুলিশ আইল। আমি তখন মনুর দোকানে টিভি দেখি। পুলিশের গাড়ি দেইখে আগায়ে গেলাম। লোকের ভিড় ঠেইলে দেখি, তোর বাপেরে পিঠমোড়া কইরে বাইন্দে গাড়িতে উঠাল। ঘটনা জানতি চাওয়ার সাহস পাইনি। তোর বাপে খালি চিল্লায়ে কয়েকবার ক’লো, আমারে কই নিয়ে যাতিছেন, আমি কী করিছি? কেউ কোনো জবাব দিলো না। কিছু বুইঝে ওঠার আগেই গাড়ি টাইনে দিঘলিয়ার দিকে চইলে গেল!’

শশী ঘাড় ঘুরিয়ে হাবুর দিকে তাকাল। লিচুপাতার ফোকর গলে কড়কড়া রোদ এসে পড়েছে ছেলেটার শরীরে। ঘেমে নেয়ে একদম একাকার। আধখোলা বস্তা হাতে অনাথ শিশুর মতো তাকিয়ে আছে ভাইটা। পিতার এমন দুঃসংবাদের আঁচড় কি বাচ্চাটার ওপরও পড়েছে খানিক? 

টলতে টলতে ভাইয়ের কাছে ছুটে গেল শশী। হাঁটু গেড়ে বসে ওড়নায় মুখটা মুছিয়ে দিল। তারপর আচমকা বুকে জাড়িয়ে নিল। কয়েকটা স্তব্ধ মুহূর্ত পেরিয়ে গেলে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় শশী। শক্ত করে হাত ধরে হাবুর। হেঁচকা টানে রওনা হয় বাড়ির পথে। যেতে যেতে বার কয়েক পিছন ফিরে তাকায় শশী। দেখে, পাতাভরা কয়েকটা বস্তা, নারকেল শলাকায় তৈরি ছোট্ট ঝাড়ু আর বাঁশের ঝুড়ি পড়ে আছে। এসবের বাইরেও ওর মনে হয়, কালো কুচকুচে অশরীরী অবয়ব নিয়ে ধীর পায়ে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ক্ষিপ্র চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে!

২.

ডিউটি অফিসারের রুমে বসে আছে শশী।

পুরনো আমলের একতলা বাড়ির পুরোটা নিয়ে থানা ভবন। ভবনের ভেতরে অনেকগুলো কক্ষ। ভবনে ঢোকার মুখে দীর্ঘ এক করিডোর। হাবুকে কোলে নিয়ে সেই করিডোরে পায়চারি করছে লায়লা বানু। সারারাত ঘুম হয়নি। চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। গতকালই থানায় আসতে চেয়েছিল। কিন্তু আতাহার চেয়ারম্যানকে খুঁজে পেতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। রাতে আর আসতে পারেনি। চেয়ারম্যান বলেছে সকালে খোঁজ নেবে। কিন্তু রাত তো আর কাটে না। জায়নামাজে বসে শুধু কেঁদেছে। সকালেও একই চিত্র। লুঙ্গি আর গামছাভর্তি একটা পলিথিনের ব্যাগ বুকে অঝোরে কাদছে লায়লা বানু। শশী বার কয়েক সান্ত্বনা দিয়েছে। কাজ হয়নি। অবশ্যি কণ্ঠে তেমন জোরও ছিল না।

থানা-ভবনের বারান্দায় পায়চারি করতে করতে লায়লা বানুর উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে। খানিক পর পর আঁচলে চোখ মুছে ইতিউতি তাকিয়ে স্বামীকে খুঁজছে। মানুষটার সঙ্গে একটা বার দেখা হওয়া দরকার। দেখা হলে অসহনীয় অস্থিরতা কিছুটা হলেও কমত। নিজেকে সামলে নিতে পারত লায়লা। কিন্তু এত বড় ভবনের কোথায় যে মানুষটাকে আটকে রেখেছে, খুঁজে পেল না সে। একবার মনে হলো চিৎকার দিয়ে ডাকবে, ‘হাবুর আব্বা, ও হাবুর আব্বা!’ ডাকটা গলার কাছে এলেও শেষ পর্যন্ত সাহস পেল না।

আরও একবার থানার করিডোর চক্কর দিয়ে হাবুকে কোল থেকে নামাল লায়লা। এমন সময় থানার সাইনবোর্ড পেরিয়ে একটা পুলিশভ্যান এসে থামল দরজায়। পিঠমোড়া করে বাঁধা একটা ছেলেকে নামালো দুই পুলিশ সদস্য। ছেলেটার গায়ে কোনো জামা নেই। হাড় জিরজিরে শরীরের হাড্ডি আঙুলে গোনা যায়। গাড়ি থেকে নামলেও ছেলেটা ভেতরে যেতে চাইল না। অনেক ঠেলাঠেলি করেও কাজ হলো না। ভবনে ওঠার সিঁড়িতে পা ঠেকিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল একজনের। রাইফেলের বাঁট দিয়ে পাছায় বসিয়ে দিল কয়েক ঘা। কুঁই কুঁই করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল ছেলেটা। আরও কয়েকটা চড়-থাপ্পড় দিয়ে টেনেহিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে গেল তাকে। 

জীবনেও কোনোদিন থানার বারান্দায় আসেনি লায়লা বানু। এসব দৃশ্যের সঙ্গে সে পরিচিত নয়। আরও কয়েক কদম হেঁটে সদর দরজা লাগোয়া দেয়াল ঘেঁষে বসে পড়ল লায়লা। তারপর আঁচলে মুখ ঢেকে ‘আল্লাহ গো’ বলে বিকট এক চিৎকারে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বার বার বলতে লাগল, ‘আমার স্বামীরে তুমি রক্ষা করো আল্লাহ।’

কান্না সংক্রামক। দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। কিছু বুঝুক আর না বুঝুক মায়ের কান্না দেখে হাবুও কাঁদতে লাগল। মা-ছেলের এমন কান্নায় থানা এলাকায় শোরগোল পড়ে গেল। কাছে-পিঠে এলোপাতাড়ি দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন কনস্টেবল নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না।

চিৎকারের উৎস খুঁজতে একজন অল্পবয়সী অফিসার ছুটে এলো বাইরে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসে থাকা লায়লা বানুকে আবিষ্কার করল সে। যারপরনাই বিরক্ত হলো অফিসার। কর্কশ কণ্ঠে বলল, ‘হা কইরা দেখার কি আছে? এই যন্ত্রণারে কেউ একজন জলদি গেটের বাইরে রাইখা আসো।’

দরজার অদূরে কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন কনস্টেবল দৌড়ে এসে লায়লা বানুকে উঠে দাঁড়াতে তাড়া দিল। কোনো কাজ হলো না। লায়লা বানু উঠল না। উল্টো কান্নার গতি আরও বেড়ে গেল। কথায় কাজ হচ্ছে না দেখে কাঁধের বন্দুক হাতে নিয়ে তেড়ে এলো একজন। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হওয়ার আগে শশী এসে দাঁড়ালো পেছনে। বলল, ‘মা, কি শুরু করলা! এমন করলি কি আব্বারে ওনারা ছাইড়ে দেবে? উল্টো তোমার রাগ যাইয়ে পড়বেনে আব্বার উপর। বিপদ আরও বাড়বেনে।’

এই কথায় কাজ হলো। বন্দুকের নলও যে কান্না থামাতে পারল না, কয়েকটা মামুলি কথায় সে কান্না থেমে গেল। চোখ মুছে মুহূর্তেই স্বাভাবিক মানুষ হয়ে গেল লায়লা বানু। দেয়াল ধরে নিজে নিজে উঠেও দাঁড়াল। শাড়ির ভাঁজ ঠিক করতে করতে বলল, ‘অলক্ষুণে কথা কইস না তো। তোর আব্বার কোনো খোঁজ পালি?’

‘খোঁজ পাওয়ার কোনো উপায় রাখিছ?’ শশীর কণ্ঠে ক্ষোভ।

কান্নার রেশ কাটেনি। আর্দ্র গলায় লায়লা বানু বলল, ‘আমি আবার কী করলাম?’

মায়ের আচরণ দেখে থ হয়ে গেল শশী। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে মহিলা কেঁদে-কেটে বুক ভাসালো, আহাজারিতে থানা এলাকা বানিয়ে ফেলল কারবালার প্রান্তর, সে মানুষই এখন জানতে চায়, কী করেছে!

মায়ের কথার জবাব না দিয়ে পুলিশ সদস্যদের দিকে তাকাল শশী। মিনতিভরা কণ্ঠে বলল, ‘স্বামীর বিরাট বিপদ। গতকাল থিকা কোনো খোঁজ পাচ্ছে না। বোঝেনই তো চিন্তায় চিন্তায় মাথা ঠিক নাই। আপনারা কিছু মনে কইরেন না। আমি দেখতিছি বিষয়টা। আর এমন হবে না।’

পুলিশরা যেভাবে এসেছিল, সেভাবে নির্বিকার ভঙ্গিতে চলে গেল। তাদের চলে যাওয়া পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আহত কণ্ঠে জানতে চাইল লায়লা বানু, ‘আচ্ছা, অচেনা লোকের কাছে নিজের মায়রে পাগল কতি তোর একটুও লজ্জা লাগল না?’

শশীর তড়িৎ জবাব, ‘ভুল কিছু তো বলি নাই!’

‘কী কতি চাচ্ছিস? তার মানে আমি পাগল?’ কণ্ঠে তেজ বাড়ল লায়লা বানুর। মুহূর্তেই চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল।

‘তুমি থানা ভর্তি লোকের সামনে ভেউ ভেউ কইরে কানতি পারবা আর আমি তোমারে পাগল ক’লি দোষ!’

একটু যেন দমে গেল লায়লা বানু। মেয়ের সঙ্গে যুক্তিতে পারা দায়। কণ্ঠের উত্তাপ খানিক কমিয়ে বলল, ‘যার যায় সে বোঝে। তোর স্বামীরে তো আর পুলিশে ধরে নাই। তুই কী বুঝবি!’

‘ও, তোমার খালি স্বামী। আর আমার তো আব্বা না, খালু!’

মেয়ের এমন জবাবে বিমূঢ় হয়ে গেল লায়লা বানু। অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শুধু। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেল না। মায়ের জবাবের অপেক্ষায় রইল না শশী। তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলতে লাগল, ‘এই জন্যিই তোমারে আনতি চাই নাই। ক’লাম হাবুরে নিয়া ঘরে থাকো। আমি হাশেম কাকারে নিয়ে যাই। রাজি হ’লা না। ছ্যাচড়াইতে ছ্যাচড়াইতে আইসে পড়লা। আইসে লাভের লাভ তো কিছু করতি পারতিছ না, উল্টো ঝামেলা পাকাচ্ছ। এইখানে বইসে সারাদিন কানলিও যদি আব্বারে ছাইড়ে দেয় তাইলে কান্দো। বাধা দেব না।’

‘তুই মনে হয় হাতিঘোড়া মারতিছিস।’ মুখ বাঁকালো লায়লা বানু। ‘ঘণ্টা ধইরে পুলিশ ব্যাটার রুমে ম্যান্দা মাইরে বইসে আছিস। একটা কামের কথাও তো কারও লগে ক’তি পারলি না। বাপরে ছাড়ানো দূরে থাক, লোকটারে এক নজর দেখাতিও তো পারলি না। খালি মুখে বড় বড় কথা! তোর দাদিও আছিল একদম তোর মতন। মুখ দিয়া বিশ্ব জয়।’

‘হইছে। এইবার ক্ষমা করো। কবর থিকা মরা দাদিরে আর টাইনে আইনো না। মাফ চাই। তুমি জিতছ। বাপ গারদে, তোমার লগে এখন ঝগড়া করার শক্তি নাই। আমি কি করিছি না করিছি আমি জানি।’ 

‘আমারেও একটু জানা, শুনি।’ টিপ্পনী কাটল লায়লা বানু। অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল শশী। কে বলবে, এই মহিলাই খানিক আগে স্বামী শোকে হাউমাউ করে কেঁদেছে।

‘তুমি দয়া কইরে একটু চুপ থাকো। থানায় ঢুইকেই ডিউটি অফিসারের লগে আমার কথা হইছে। তুমি বাইরে ছিলা, খেয়াল করো নাই। লোকটা জরুরি মিটিংয়ে গেছে। ঘণ্টা দেড়েক পর আসবে বলছে। দেরি হওয়াতে সুবিধাই হইছে। চেয়ারম্যান চাচাও আশা করি এর মধ্যি আইসা পড়বে। থানায় আসার আগে হাশেম চাচারে দিয়া তারে খবর দিছি।’

মেয়ের কথায় এবার কিছুটা স্বস্তি পেল লায়লা বানু। আর কথা বাড়াল না। হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে গেল। হাবুকে কোলে নিয়ে হাঁটা দিল দক্ষিণে। চলে গেল বারান্দার একদম শেষ মাথায়। যেতে যেতে কয়েকবার ফিরে তাকাল মেয়ের দিকে। মায়ের শিশুসুলভ কাণ্ড দেখে কষ্টের মাঝেও হেসে ফেলল শশী।

উঠে দাঁড়াল ডিউটি অফিসার।

দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে ভীষণ তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকাল আতাহার চেয়ারম্যানের দিকে। দীর্ঘদেহী লোকটার বুকের উপর নেমপ্লেটে লেখা ‘রুস্তম’। ঘুরে চেয়ারের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল সে। পকেট থেকে এক প্যাকেট সিগারেট বের করে চেয়ারম্যানকে একবার সাধল। চেয়ারম্যান মাথা ঝাঁকিয়ে না করতেই আয়েশ করে নিজেই একটা ধরাল। ছাদের দিকে তাকিয়ে হাঁ করে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘আপনারে বেশ বুদ্ধিমান লোক ভাবছিলাম চেয়ারম্যান। পনেরো বছর ধইরা মানুষ চরাইয়া খান। আপনেরে তো মানুষ চেনানোর কিছু নাই।’

আতাহার চেয়ারম্যান দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে টুপিটা খুলে পকেটে রাখল। অফিসারের কথা তার কাছে অপ্রয়োজনীয় ঠেকছে। অপ্রয়োজনীয় কথার জবাব দিতে নেই। তাই সে চুপ করে রইল। গত পনেরো মিনিট ধরে রুস্তম দারোগা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে শশীর বাবা মোক্তার একজন ভাড়াটে খুনি। করাতকলে কাজের আড়ালে সে আসলে মানুষ খুন করে বেড়ায়। সপ্তাহখানেক আগে নাকি গাজীরহাটে একটা খুন হয়েছে। খুনিরা বাড়িটাতে ডাকাতিও করেছে। বিপুল স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়েছে। পুলিশের অভিযানে কয়েকদিন আগে এদের এক সদস্য ধরা পড়েছে। নাম কাশেম। সে জানিয়েছে টাকার বিনিময়ে মানুষ খুন করাই তার পেশা। এদের একটা চক্র আছে। কাশেমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পথের বাজার থেকে এক স্বর্ণকারকে ধরেছে পুলিশ। লুট করা স্বর্ণ তার কাছে বিক্রি করত খুনিরা। ওই দোকানে এর আগে মোক্তার মিয়াও গেছে সোনা বিক্রি করতে।

অফিসার যতই বলুক, চেয়ারম্যান কিছুতেই মানতে চাইল না। পুরো ঘটনা শুনে শশীর চোখ ছানাবড়া। সিনেমার গল্পের মতো মনে হলো ওর। নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। কোথাও ভুল হচ্ছে। বড় কোনো ভুল হচ্ছে। কেউ কি তবে ওর বাবাকে ফাঁসিয়ে দিতে চাইছে? এমন সরল মানুষের শত্রু কারা?

‘শোনেন চেয়ারম্যান সাহেব।’ রুস্তম দারোগা কথা শেষ করল না। আধখাওয়া সিগারেটের ছাই ফেলল হাতল ভাঙা অব্যহৃত একটা চায়ের কাপে। তারপর আরও একটা টান দিয়ে বলল, ‘পথের বাজারের যে দোকানটাতে প্রায়ই ডাকাতির স্বর্ণ বেচতে যায় এরা, সেই দোকানির সঙ্গে এই চক্রটাকে মোক্তারই প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। দু’জনই আদালতে অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দী দিয়েছে। কতদিন ধরে এই কাজ করে, কারা কারা করে, সব বলে গেছে। এখানে সন্দেহের কোনো সুযোগ নেই।’

খানিক দম নিল দারোগা। ভ্রু কুঁচকে তাকাল চেয়ারম্যানের দিকে। জানতে চাইল, ‘আচ্ছা বলেন তো, আপনার মোক্তারের সাথে আমাদের কোনো শত্রুতা আছে? খামাখা নির্দোষ একটা লোকরে ধইরা চালান করে আমাদের লাভ কী? সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই তারে নিয়া আসছি। এখন খুন-ডাকাতি কোর্টে প্রমাণ হোক। নির্দোষ হলে ছাড়া পাবে। না হলে শাস্তি পাবে। হিসাব ক্লিয়ার। তাছাড়া ওসি স্যারের কড়া নির্দেশ, সকাল সকাল আসামি কোর্টে চালান হবে। এই মামলা নিয়া খুব চাপে আছি। আমার আর কিছু করার নাই। বোঝাইতে পারলাম চেয়ারম্যান?’

আতাহার চেয়ারম্যান পাংশুটে মুখে শশীর দিকে তাকাল। মাথা নিচু করে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। চেহারা এতটাই বিধ্বস্ত, এতটাই মলিন যে, দীর্ঘ সময় সে মুখে তাকিয়ে থাকা যায় না। চোখ নামিয়ে নিল চেয়ারম্যান। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দারোগাকে বলল, ‘আপনি যতই যুক্তি দেন, আমার বিশ্বাস হবে না। এই ছেলেরে আমি চোখের সামনে বড় হতি দেখিছি। এত বছরের চিনা-জানা, এই ছেলে এরাম কাজ করতিই পারে না। কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে দারোগা। কেউ এরে ফাঁসায়ে দিতেছে।’

‘একদম ঠিক ধরেছেন। কোথাও ভুল তো হচ্ছেই।’ চেয়ারম্যানের দিকে মুচকি হেসে খোঁচা মারল দারোগা। চেয়ারে ফের বসে বলল, ‘ভুলটা হচ্ছে আপনার জানাশোনায়। এই ভুল আর বাড়ায়েন না। আপনি বাপের বয়সী মুরব্বি মানুষ। আপনারে জ্ঞান দেওয়া আমার সাজে না। তবু বলি, মানুষরে বিশ্বাস করেন ঠিকাছে, অন্ধ বিশ্বাস কইরেন না। বাড়িতে যান। পারলে ভালো উকিল ধরেন, কোর্ট থেকে জামিন করায়ে আনেন।’

আতাহার চেয়ারম্যান দাঁড়িয়ে পড়ল। বুঝতে পারছে এর সাথে কথা বলে লাভ নেই। রাগে-ক্ষোভে চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। বেরিয়ে যাওয়ার মুখে দারোগাকে কয়েকটা কড়া কথা শোনাবে ঠিক করেছে। টানা তিনবারের চেয়ারম্যান। এলাকায় তুমুল জনপ্রিয়তা। প্রত্যেকটা লোকের নাড়ি-নক্ষত্র তার জানা। অথচ সেদিন বদলি হয়ে আসা দারোগা তাকে মানুষ চেনায়!

কড়া কিছু একটা বলার আগেই শশী বলে উঠল, ‘আব্বায় কিছু করে নাই এইটে বললি বিশ্বাস করবেন না জানি। কিন্তু বিশ্বাস করেন আর নাই করেন এইটেই সত্যি। আমার আব্বায় খুনি না। একটা পিঁপড়া মাড়লিও যে লোক কষ্ট পায়, সে মানুষ খুন করবে কীভাবে? সে যদি দিনের পর দিন ডাকাতি করে, সোনাদানা লুট করে, তার বাড়িতে ভাতের অভাব হয়? আমরা না খাইয়ে থাকি? নতুন জামার অভাবে এক জামা পইরে দিনের পর দিন স্কুলে যাই? মানুষটা সকাল থিকা সন্ধ্যা পর্যন্ত বলদের মতো খাইটে সংসারডা চালায়। কীভাবে যে আমাগের দিন যায়, একমাত্র আল্লা জানে।’

শশীর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। ওড়না দিয়ে চোখ মোছার চেষ্টা করছে কিন্তু মুহূর্তেই ফের চোখ ভরে যাচ্ছে জলে। মেয়েটার এমন কান্নায় রুস্তম দারোগার মুখটা বিষণ্ন হয়ে গেল। একদৃষ্টিতে সে শশীর দিকে তাকিয়ে রইল। ভাঙা কাপটা কয়েক দফা ঘুরিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় আতাহার চেয়ারম্যান তাড়া দিল, ‘চল তো মা, এদের এসব বলে লাভ নেই। টাকার লোভ আর ক্ষমতার জোরে এদের চোখে পর্দা পইড়ে গেছে। যা বলার আমরা কোর্টেই বলব। আমি থাকতি তোর বাপের কিচ্ছু হবে না।’

দারোগার ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় আসতেই লায়লা বানু ছুটে এলো। জানতে চাইল, ‘তোর আব্বায় কই? তার লগে দেখা হইছে?’

অন্যদিকে ঘুরে চোখ মুছে নিল শশী। স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, ‘ঘরে চলো মা।’ যেন কিছুই হয়নি। অথচ বুকের ভেতর চলছে ভাঙনের স্রোত। বেদনা আড়ালের এই ছলটুকু ধরতে পারল না লায়লা বানু। সে বারবার স্বামীকে দেখতে চাইছে। ‘তোর আব্বারে ছাড়া ঘরে যামু মানে? তারে ছাড়ে নাই? ও শশী, কথা কস না ক্যান?’

লায়লা বানুর কণ্ঠটা ভারী হয়ে ওঠে। মেয়েকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে সে আতাহার চেয়ারম্যানের দিকে ফেরে। আচমকা হাত চেপে ধরে জানতে চায়, ‘আপনেও চুপ কইরে আছেন? একটা জবাব অন্তত দেন। এতক্ষণ ভিতরে তা’লি কি করলেন? পুলিশরে বোঝাতি পারলেন না হাবুর আব্বায় কিছু করে নাই। সে খুব ভালো মানুষ। ওনার মতো মানুষ হয় না! কিসের চেয়ারম্যান আপনে?’

আতাহার চেয়ারম্যান লায়লা বানুকে কিছু বলল না। হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে শশীর দিকে তাকাল। মুখ দিয়ে উষ্মা প্রকাশের শব্দ করে শীতল কণ্ঠে বলল, ‘তোর মায়রে একটু থামতি বল। এমন অবুঝের মতো করলি তো হবে না। এইভাবে কান্নাকাটি করলি কি বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া যাবে? যা করার ঠান্ডা মাথায় করতি হবে। আমি তো আছি। বের করে আনবো ইনশাল্লাহ।’

কারও চোখের দিকে তাকিয়ে মিছে সান্ত্বনা দেওয়া কঠিন। বুকটা ধক্ করে ওঠে। লায়লা বানুর দিকে তাই তাকাতে পারল না চেয়ারম্যান। মুখে মুখে বের করে আনবে বললেও কার্যত কতটুকু কী করতে পারবে নিজেও তা জানে না আতাহার। কিন্তু এটা জানে কোর্ট-কাছারি কোনো ভালো জায়গা না। বড় কঠিন এক জায়গা। টাকা ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না। সম্পূর্ণ নিরাপরাধ লোকেরও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে বেরিয়ে আসতে ঘাম ছুটে যায়। সর্বস্বান্ত হয় পরিবার। কিন্তু যে পরিবার এমনিতেই সর্বস্বান্ত, তার বেলায়?

আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে ধারণা দিল চেয়ারম্যান। তারপর হাত উঁচিয়ে বিদায় নিয়ে অপেক্ষমাণ মোটরসাইকেলে চেপে বসল। চালককে ইশারা করতেই সে রওনা হলো ইউনিয়ন পরিষদের দিকে। চেয়ারম্যানের চলে যাওয়া পথের দিকে বিহ্বল তাকিয়ে রইল লায়লা বানু।

কয়েক মুহূর্ত পেরিয়ে যাওয়ার পর মায়ের হাত ধরে টেনে থানার ফটকের দিকে  যেতে লাগল শশী। লায়লা বানু কয়েক দফা বাধা দিতে চাইল। স্বামীর সঙ্গে কথা না বলে সে যাবে না। কিন্তু পণ রাখতে পারল না। কোনো নিষেধই শুনলো না শশী। ঠেলে ফটকের কাছাকাছি নিয়ে এলো মাকে।

বেলা বাড়ছে। কড়কড়া রোদ চড়ছে মাথায়। এমন রোদে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। চোখ মেলে তাকিয়ে থাকাও দায়। ফটক গলে সামনে এগিয়ে ভ্যানে চড়ারকালে হর্ন বাজিয়ে থানা থেকে একটা পুলিশের গাড়ি বেরিয়ে গেল। গাড়ির পেছন দিকটা খোলা। হাবুকে কোলে বসিয়ে ওড়না ঠিক করায় ব্যস্ত শশী। গাড়িটা ভালো করে খেয়াল করল না। খেয়াল করল লায়লা বানু। বোরখার নেকাব তুলে দেখল, হাতকড়া পরানো একটা লোককে ঘিরে বসে আছে তিন-চারজন পুলিশ। মধ্যবয়সী লোকটাকে বড্ড চেনাচেনা লাগছে।

‘হাবুর আব্বায় না?’ বিড়বিড় করে এই কথা বলে হঠাৎ ভ্যান থেকে লাফিয়ে পড়ল লায়লা বানু। পলিথিনের ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে দিল নিচে। কাউকে কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে দৌড় শুরু করল। মায়ের এমন কাণ্ডে হকচকিয়ে গেল শশী। কী করবে বুঝতে পারছে না। অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে থেকে শুধু দেখল, কুঁচকানো কালো বোরখায় আবৃত হয়ে অসংলগ্ন গুটি গুটি পায়ে পুলিশ ভ্যানের পেছন পেছন ছুটছে তার মা। এতই মন্থর সে গতি যে, গাড়িটা মুহূর্তেই ডানে মোড় নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। গাড়ির নাগাল না পেয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ইটের রাস্তায় আছড়ে পড়ল লায়লা বানু। চোখের সামনে পুরো সংসারটাকেই যেন মুখ থুবড়ে পড়তে দেখল শশী।

৩.      

করাতকলের সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ছোট-বড় গাছের গুঁড়ি।

দূরদূরান্ত থেকে কেটে এনে ফেলে রেখেছে মালিক। রোদে খানিক শুকালে চিরে ফালি করবে। কেউ বানাবে তক্তা, কেউ-বা ঘরের খুঁটি। আসবাবপত্র নির্মাণের বাসনায় বৈচিত্রময় আকৃতির তাগাদাও আসে মাঝে মাঝে।

তবে এ এক বিপুল কষ্টসাধ্য কাজ। ধারালো ফলা ঘুরতে থাকে অবিরাম। ভারী আর বৃহৎ আকৃতির গাছের গুঁড়িগুলো তিন-চারজন তুলে আনে ফলার সামনে। তারপর নির্দিষ্ট মাপে স্থির রেখে ধীরে ধীরে ঠেলতে হয়। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ব্যাপার। সামান্য এদিক-সেদিক হলেই এবড়ো-থেবড়ো হয়ে যায়। কোনো কাজে আসে না দামি কাঠ। দিনের পর দিন গভীর মনোযোগে বাবাকে এই কাজ করতে দেখেছে শশী। গাছ ফাড়ার কাজ আর সংসারের বাইরে অন্য কোনো জগৎ ছিল না মানুষটার।

করাত কলের সামনে দিয়ে ঘরে ফেরার সময় মনটা খুব নরম হয়ে গেল শশীর। অবিরাম ঘূর্ণায়মান ধারালো ফলায় গাছের গুঁড়ি চিরে ফালি হচ্ছে ঠিকই কিন্তু পরিচিত এই দৃশ্যের কোথাও ওর বাবা নেই।

টানা তিন দিনের চেষ্টায়ও বাবার জামিন করাতে পারেনি। দিনে দিনে বাস্তবতা বুঝতে পারছে। ডাকাতির মামলায় জামিন এত সোজা নয়। পরবর্তী তারিখ পড়েছে এক মাস পর। উকিল বলেছে, এর আগেও জামিনের আবেদন করা যাবে। কিন্তু পয়সা খরচ ছাড়া কোনো লাভ হবে না। দেদার পয়সা খরচের সামর্থ্যও নেই ওদের। দিন আনে দিন খায় অবস্থায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিই বিপদে পড়েছে। মাত্র কয়েকদিনের দৌড়-ঝাঁপেই চোখে অন্ধকার দেখছে শশী। অনাগত দিনে এই খরুচে মামলা কীভাবে চালাবে বুঝতে পারছে না।

গত কয়েকদিনে বহু টাকা নেমে গেছে। লায়লা বানুর কিছু জামানো টাকা ছিল। এই ঘনঘোর দুর্দিনে চেয়ারম্যানও দিয়েছে কিছু। এমন কোনো আত্মীয় নেই যে হাত খুলে সাহায্য করবে। তিন সন্তানের মৃত্যুর পর শশীর বাবার জন্ম। তিনকুলেও বলার মতো কোনো স্বজন নেই। দাদির মৃত্যু হয়েছে এক যুগ আগে। দাদাও চলে গেছে আট-দশ বছর হবে। যাওয়ার আগে পুরো পরিবারটা নিঃস্ব করে গেছে। 

অথচ বছর দশেক আগেও শশীদের অবস্থা এমন ছিল না। ওর বাবার একটা মুদি দোকান ছিল বাজারে। ধানী জমি আর মাছের ঘেরও ছিল। প্রাচুর্য না থাকলেও অভাব ছিল না। কিন্তু দাদার একটার পর একটা অসুখ শুরু হলো। একটা সারে তো আরেকটা শুরু হয়।  একেকবার শহরে যায়, আর কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ হয়। বাধ্য হয়ে জমিজমা বিক্রি করতে হলো। শশীর বাবা একা মানুষ। সব দিক সামলাতে গিয়ে মাছের ঘের আর মুদি দোকানে সময় দিতে পারল না। ব্যবসা মরে গেল। দাদার মৃত্যুর পর অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, তিনবেলা ঠিকমতো খেতেও মানুষের দুয়ারে হাত পাততে হবে।

শরীরে শক্তি আছে, কারও কাছে হাত পাততে যাবে কেন? দৈনিক মজুরিতে বন্ধুর করাতকলে কাজে লেগে গেল মানুষটা। দেখতে দেখতে নয়টা বছর পেরিয়ে গেল। অবস্থার আর উন্নতি হলো না। নিজের ভাগ্য বদলাতে না পারলেও মেয়েকে নিয়ে বড় বড় স্বপ্ন দেখে মোক্তার। সেভেন-এইটে উঠলেই যেখানে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়, শশীকে সে স্কুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে কলেজে পড়াতে চায়। হাড়-ভাঙা পরিশ্রম করেও তাই মেয়ের পড়াশোনায় ছেদ পড়তে দেয়নি।

বাবার স্বপ্ন পূরণের পথেই আছে শশী। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছে। দুই মাস পরেই মাধ্যমিকের বোর্ড পরীক্ষা। শিক্ষকদের ধারণা, এতটাই ভালো ফল হবে যে, স্কুলের গর্ব হবে শশীকে নিয়ে। প্রস্তুতিও আছে তেমন। কিন্তু এর মধ্যেই এই কাণ্ডটা ঘটে গেল। সংসারে এমন কেউ নেই যে হাল ধরবে। পড়াশোনা বাদ দিয়ে শশীকেই মামলা নিয়ে দৌড়-ঝাঁপ করতে হচ্ছে।

আবেগ কম শশীর। সব কিছু যুক্তি দিয়ে চিন্তা করে। বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর অনেকভাবে ভেবে দেখেছে সে, কিন্তু কিছুতেই খুনের ঘটনার সঙ্গে বাবার যোগসূত্র মেলাতে পারেনি। রাতের পর রাত যদি মানুষটা খুন করত, ডাকাতি করত, তাহলে কোনো না কোনো ছুঁতায় তাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। করাতকলে কাজ শেষে রাত আটটার মধ্যে বাসায় ফেরে মানুষটা। কখনও কখনও ফরমাইশখানা বাজারে বসে টিভি দেখে। ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা। এর বাইরে গত এক বছরে কখনও বাসার বাইরে ছিল কিনা মনে পড়ে না শশীর। একটা মানুষ সারারাত পরিবারের সঙ্গে ঘুমিয়ে রাতের অন্ধকারে ভাড়ায় খুন করে কীভাবে?

কিন্তু কোর্ট তো মুখের কথা শুনবে না। সাক্ষী লাগবে। প্রমাণ লাগবে। এতসব জোগাড় করে ঘটনাটা মিথ্যা প্রমাণ করা বিরাট ঝক্কি-ঝামেলার কাজ। শশী ভেবে পায় না, ওদের মতো এমন নির্বিবাদী পরিবারটাকে কারা এমন বিপদে ঠেলে দিলো? কাদের এত বড় সর্বনাশ করেছে ওরা?

গরম ভাত রান্না করেছে লায়লা বানু। 

চাল ধুয়ে দুটো গোল আলু ছেড়ে দিয়েছে পানিতে। ভাতের মাড় গেলে এখন আলুর খোসা ছাড়াচ্ছে। সরিষার তেল আর শুকনো মরিচ ডলে আলুভর্তা বানাবে। দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগ এমনভাবে জাপটে ধরেছিল, কয়েকটা দিন ছেলেমেয়ে দুটোর দিকে খেয়ালই রাখতে পারেনি। আজ খেয়াল হয়েছে ঘরে কোনো বাজার নেই। রান্নাও হয়নি কয়েকদিন। সকাল আর দুপুর কেটেছে আদালতে। ফেরার পথে গঞ্জের সস্তা হোটেলে নাকেমুখে দুটো খেয়ে বাড়ি ফিরেছে। রাতে দু-একদিন রইচের বউ ডাল-ভাত পাঠিয়েছে। কোনোদিন খেয়েছে, কোনোদিন খায়নি। এই করে চলেছে।

গত কয়েকদিনের ছোটাছুটি শেষে খানিক স্থির হয়েছে লায়লা বানু। বুঝতে পারছে সহসাই স্বামীর মুক্তি মিলবে না। মানুষটাকে ফিরে পেতে সময় লাগবে। পঁয়ত্রিশ বছরের জীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে। বহু বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। অচেনা বনে দুই হাতে ডাল, লতাপাতা সরিয়ে যেভাবে এগোয় গন্তব্যসন্ধানী মানুষ, লায়লাও সেভাবে এগিয়ে গেছে। দিনশেষে টিকেও আছে। গন্তব্যের সন্ধান না পেলেও ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।

কিন্তু এবারের যাত্রাটা ভিন্ন। কয়েকটা দিনেই হাঁপিয়ে উঠেছে লায়লা বানু। ক্লান্তিতে দু’চোখ বুজে আসে তার। মনে হয়, এই আঁধার কাটবে না, আর ভোর হবে না। প্রতিটি ভাঙা-গড়ায়, উত্থান-পতনে নির্ভরতার ছায়া হয়ে পাশে ছিল স্বামী মোক্তার। পেছনে পেশিবহুল মানুষটা আছে বলেই নির্ভাবনায় এগিয়ে যেতে পেরেছে। প্রেরণা পেয়েছে। এই প্রেরণা যে কতটা শক্তিশালী, কতটা দুর্দমনীয়, মাত্র কয়েকটা দিনেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে লায়লা।

আলুভর্তা আর গরম ভাতের আয়োজন শুরুর আগে একবার ভেবেছিল লাউ আর চিংড়ি মাছের ঝোল করবে। উঠোনের মাচা ছাপিয়ে ঘরের চালে উঠে গেছে চঞ্চলা লাউয়ের ডগা। যত্ন করে বাড়ির উঠোনে মাচা তৈরি দিয়েছিল হাবুর আব্বা। বছরজুড়ে শাক আর লাউ খাবে। কুচো চিংড়ি দিয়ে কচি লাউয়ের তরকারি কি যে পছন্দ মানুষটার!

কুচো চিংড়ি না পাক, আলু আর ডাল দিয়ে লাউ রান্না করতে চেয়েছিল লায়লা বানু। কিন্তু হঠাৎ লোকটার কথা মনে পড়তেই এলোমেলো হয়ে গেল সব। বুকের ভেতর এমন উথাল-পাথাল শুরু হলো, লাউ আর কাটতে যেতে পারল না। জেলের ভেতর কি খায় না খায় ভেবে চোখটা ছলছল করে উঠল।

আলুর খোসা ছাড়িয়ে বসে আছে। সরিষার তেল আর পিঁয়াজ মরিচ আনেনি। বয়ামভর্তি টালা শুকনা মরিচ আছে। কিন্তু একটা পিঁয়াজও নেই ঘরে। পিঁয়াজ ছাড়া ভর্তা বানাবে কী করে? গলাছেড়ে শশীকে ডাকল লায়লা, ‘শশী, ও শশী?’

রায় চন্দনের কলপাড়ে ধুন্দলের খোসায় সামান মেখে হাবুকে গোসল করাচ্ছিল শশী। মায়ের গলা শুনতে পেলেও সহসাই ছুটে আসতে পারল না। ‘আসতেছি মা’ বলে সায় দিল শুধু। লায়লা বানু প্রতিশ্রুতিতে দমে যাওয়ার মানুষ নয়। কোনো কিছু খুঁজতে শুরু করলে চোখের সামনে তা না দেখা পর্যন্ত তর সয় না তার। লাগামহীন সাইরেনের মতো মেয়েকে তাই ডেকেই চলল, ‘কইরে, কোন জঙ্গলের মধ্যি হাইন্দে রইছিস। জলদি আয়। শশী, ওই ছেড়ি…।’

এই সাইরেন থামবে না। থামাতে হলে শশীকে ছুটে আসতে হবে। কিন্তু সে উপায় নেই। ছোট ভাইটার গায়ে সাবান মাখিয়েছে। বাপের পেছনে ছুটতে গিয়ে কারওই নাওয়া-খাওয়ার ঠিক নেই। শরীরে ময়লার প্রলেপ জমেছে। ধুন্দলের খোসা দিয়ে ডলে ডলে শরীর পরিষ্কার করছে। এরপর পানি ঢেলে গোসল করাবে। কিন্তু মায়ের বিরামহীন ডাকাডাকিতে পানি আর ঢালতে পারল কই? মাঝপথে ছুটতে হলো ঘরে। শরীরে সাবানের ফেনা নিয়ে বোকার মতো তাকিয়ে রইল হাবু। ফেনার বুদ্বুদে একটা চোখ খুলতে পারছে না ছেলেটা।

উঠোনে ঢুকতেই শশী দেখল আবু তালেব দাঁড়িয়ে আছে। মুখভর্তি কয়েকদিনের না কাটা খোঁচাখোঁচা দাড়ি। মাথাভর্তি তেল চুপচুপা চুল। তেলের কিছু অংশ বোধহয় মুখেও পড়েছে। নইলে একটা মানুষ অমন তেলতেলে হাসি হাসে কী করে?

এই ছেলেকে একদম দেখতে পারে না শশী। বয়সে ওর থেকে কমপক্ষে দশ বছরের বড়। কিন্তু আচরণে শিশুদের মতো বিবেচনাহীন। কথা ও কাজের কোনো লাগাম নেই। সুযোগ পেলেই চোখ দিয়ে শশীকে গিলে খায়! এমন বুভুক্ষের মতো তাকায় যেন মেয়ে মানুষ দেখেনি জীবনে। নানা ছুঁতায় বাড়িতেও আসে। অদ্ভুত সব কথা বলে। ভালো লাগে না শশীর। কিন্তু বাপের সঙ্গে করাতকলে কাজ করে বলে কিছু বলতেও পারে না।

তালেবের ক্ষোভ গিয়ে পড়ে লায়লা বানুর ওপর। আক্রোশভরা কণ্ঠে শশী মাকে বলল, ‘ফাটাবাঁশের মতো আল্লায় একখান গলা দিছে, সকাল নাই বিকাল নাই খালি চিল্লাও। তোমার কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান হবে না মা?’

লায়লা বানু চুপসে গেল। বাইরের একটা লোকের সামনে মেয়ের এমন অতর্কিত আক্রমণ সে আন্দাজ করতে পারেনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে নরম কণ্ঠে বলল, ‘ভর্তা বানাতি বইছি, দেখি ঘরে একখান পিঁয়াজও নাই। কেমন লাগে ক?’

‘পিঁয়াজ নাই ভালো কথা, তা আমার নাম ধইরে এরোম চিল্লালি করে পিঁয়াজ কি উইড়ে উইড়ে আসবেনে?’ তালেবকে দেখে মেজাজ এত বেশি খিটখিটে হয়েছে যে, শশীর উত্তাপ কমে না। লায়লা বানু এসব ধরতে পারে না। সে অপরাধী কণ্ঠে বলে, ‘বলি কি, রইচের বউরে ক’ দুটো পিঁয়াজ দিতি।’

‘কাকি মা আমি আইনে দিচ্ছি। আপনি পাকের ঘরে যান।’  মা-মেয়ের কথার মাঝে ঢুকে পড়ে তালেব। শশী অগ্নিদৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকায়। তালেব তাতে পাত্তা দেয় না। হনহন করে বাজারের দিকে হাঁটা শুরু করার আগে বলে, ‘খালি পড়ালেখা শিখলে পরে  হবেনানে। আদপ-কায়দাও খানিক শিখতি হবে। ময়-মুরুব্বিগে লগে চোটপাট করলি লোকে খারাপ কবেনে।’

শশীর মনে হলো, ওর পুরো শরীরে কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। কলমির ডাল দিয়ে যদি মন মতো ছেলেটাকে পিটানো যেত, মনের জ্বালা কিছুটা কমতো। সেই শৈশব থেকে পিছনে লেগে আছে। নানা ছুঁতোয় বাসায় এসে সুযোগের অপেক্ষায় থাকত। মা একটু আড়াল হলেই হ্যাচকা টানে কোলে বসাত। শশী ভেবে পেতো না, একটা মানুষ লোহার মতো শক্ত হাতে ওর বুক হাতড়ায় কেন?

এক পোঁটলা পিঁয়াজ নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো তালেব।

চুলাঘরে আলু, মরিচ আর তেল নিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বসে আছে লায়লা বানু। হাবুকে গোসল করিয়ে এনেছে শশী। নিজেও কয়েক মগ পানি ঢেলেছে শশীরে। তালেব ফেরার আগেই কাপড় বদলে নেবে ভেবেছিল। কিন্তু বদমাশ ছেলেটার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। শশীকে দেখেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল তালেবের। দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ‘বাপরে বাপ, তোর গতর তো দেখি আইড্ডা কলার মতো খালি বড় হচ্ছে রে।’

চুলে পেঁচানো ভেজা গামছা। সেটা খুলে বাতাসে ঝাঁকি দিতে দিতে বলল, ‘কুত্তার নজরে তাকালি দুনিয়ার সব কিছু খানা-খাদ্যই মনে হবে। কুত্তার নজর কেমনে ঠিক করতি হয় জানো তো?’ কথা শেষ করেই উঠানে রাখা কয়েকটা গরান কাঠের লাঠির দিকে ইশারা করে শশী। বেড়া দেবে বলে বাবা এনেছিল।

চোখ নামিয়ে নেয় তালেব। পিঁয়াজের ঠোঙাটা লায়লা বানুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘চাচার কোনো গতি করতি পারলা?’

লায়লা বানুর কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস, ‘নারে বাজান, কোর্ট-কাছারি-জেলখানা বড় কঠিন জায়গা। ঢোকা যত সহজ, বাইর হওয়া তত সহজ না। উকিলে খালি টাকা নেয়। জামিন করাতি পারে না। এক মাস পর আবার যাতি কইছে। একটা নিরাপরাধ লোকরে ধইরা জেলে দিলো। দেশে আইন-কানুন-বিচার নাইরে। তুই একটু দোয়া করিস তালেব।’

‘দোয়ায় কী হবে কও, ঠিক মতো দৌড়াতি হবে। টাকা ঢালতি হবে। তোমার মাইয়ে তো আমারে দেখতে পারে না, নালি আমিও তোমার লগে কোর্টে যাতাম। জেলখানায় মোক্তার চাচারে একবার দেইখে আসা দরকার।’

লায়লা বানু নিঃশব্দে পিঁয়াজ কাটতে লাগল। কিছুই ভালো লাগছে না। অস্থিরতার পাগলা ঘোড়া ফের দাপাদাপি শুরু করেছে। জেলখানার কথা মনে হলেই তার এমন বুক ধুকপুক করে।

চুলাঘরের পোতায় এক পা তুলে তালেব জানতে চাইল, ‘সত্যি কইরে কও তো, এত বড় ঘটনা ঘটাল, তোমরা কিছু আঁচ করতি পারলা না? এত যে টাকা-পয়সা, সোনাদানার কথা শুনতিছি, কই রাখিছে সব? তোমাগের কিছু কয় নাই?’

পিঁয়াজ কাটা থামিয়ে লায়লা বানু ভ্রু কুঁচকে তালেবের দিকে তাকাল। তালেব কথা ঘুরিয়ে নিল সঙ্গে সঙ্গে, ‘কিন্তু কি জানো, চাচারে আমার কোনো দিনও এমন লোক মনে হয় নাই। তার মতো মানুষের পক্ষে এইসব করা সম্ভব না। করলি আমি অন্তত টের পাতাম।’

একটু দম নিয়ে ভেতর ঘরের দিকে তাকায় তালেব। মাঝারি আকৃতির পাশাপাশি দুটো ঘর। কাঠের তক্তার বেড়া, উপরে গোলপাতার ছাউনি। দরজা গলে যতটা ভেতরে দেখা যায়, উঁকি দিয়ে দেখে। শশীকে দেখে না কোথাও। খানিক হতাশার সুরে বলে, ‘আমারে তো মানুষটা নিজের ছেলের মতোই দেখত। পেটের সব কথা আমারে না কইয়ে থাকতি পারত না। ডাকাতি-ডুকাতি করলি আমারে নিয়েই করত। দূর গাঁওয়ের কাশেম-কুশেমরে লইত না। সবই ঠিক আছিল। খালি তোমার মাইয়ারে বিয়ার প্রস্তাব দেওয়ার পর থিকা তালেব খারাপ। খারাপ তো খারাপ, দুনিয়ার খারাপ। মাইয়ারে সে লেখাপড়া করাবে, জজ-ব্যারিস্টার বানাবে। সেই মাইয়ারে কিনা আমার মতো মূর্খ লোকে বিয়ার প্রস্তাব দিলো! এই শোকে লোকটা কথা কওয়া বন্ধ কইরে দিলো।’

হঠাৎ তালেবের কণ্ঠে তেজ বাড়লো। মনে হলো কাউকে শুনিয়ে সে বলছে, ‘আরে নাই নাই কইরেও এই তালেবের তিন বিঘা জমিন আছে। ব্যাংকে লাখ দেড়েক টাকা আছে। আমি কি রাস্তার পোলা? কাঠ ফাড়ার কাম করি বইলে কি পইচে গেছি?’

লায়লা বানু এবার বেশ বিরক্ত হচ্ছে। একে তো খানিক আগে তার স্বামীকে নিয়ে আজেবাজে বলেছে। এখন আবার মেয়েকে বিয়ের প্রসঙ্গটা তুলল। ইচ্ছে করছে তাড়িয়ে দিতে। কিন্তু খানিক আগেই ছেলেটা পিঁয়াজ এনে দিয়েছে। এখন তাড়িয়ে দেয় কি করে! চক্ষুলজ্জা বলে একটা ব্যাপার আছে। ঘরের আর কেউ দেখতে না পারলেও লায়লা বানু ছেলেটাকে খানিক প্রশ্রয় দেয়। বিপদে-আপদে কাজে লাগে বলে নয়, ছেলেটাকে সে বেশ ভয় পায়। সেয়ানা মেয়েটাকে পছন্দ করে। বহু বছর ধরে পিছে ঘুর ঘুর করে।। বাপ-মা মরা ছেলে, পিছুটান বলে কিছু নেই। সবাই মিলে যদি দূর দূর করে, কখন না একটা খারাপ কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে। মায়ের মন, কত চিন্তা যে করতে হয়!

লায়লা বিরক্তি লুকিয়ে পরিবেশ হালকা করে, ‘না রে বাপ, চুই পচা হবি কেন? তোর শরীরে  গোলাপ ফুলের ঘ্রাণ। এখন এসব আলাপ বাদ দিয়ে, হাত-মুখ ধুইয়ে আয়, আমার লগে ভর্তা দিয়ে ভাত খাবি।’

‘ভাত-টাত খাতি আসি নাই। তোমারে একখান খবর দিতে আইছি।’

লায়লা বানু কৌতূহলী হয়। গলা বাড়িয়ে জানতে চায়, ‘কী খবর, জলদি বলে ফেল। পোলা-মাইয়াগুলান না খা’য়ে রইছে। ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছে।’

‘এত যে চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান করো, তোমার স্বামীরে ফাঁসায় দিছে কেডা জানো?’

লায়লা বানুর চোখজোড়া পিটপিট করে। সে বুঝতে পারে না ছেলেটা কী বলতে চায়। জবাবের অপেক্ষা করে না তালেব। নিজের মনে বলতে থাকে, পুরনো হিসাব বড় খারাপ জিনিস। আজ না হোক কাল, ঠিকই আদায় কইরে নেয়।’

‘বুঝলাম না!’

‘বুঝবা কেমনে? চোখে তো ছানি পড়িছে। তোমার স্বামীরে ফাঁসাইছে চেয়ারম্যানের ভাই মোতাহার। দারোগারে টাকা খাওয়ায়ে কাশেমরে দিয়া নামডা কওয়াইছে। দুনিয়াডা অত পানি পানি ভাইবো না চাচি। দুনিয়াডা বড় কঠিন।’

কথা শেষ করে আর দাঁড়ায় না তালেব। লুঙি উঁচু করে হাঁটতে থাকে। নতুন কেনা স্পঞ্জের স্যান্ডেলে কচকচ শব্দ হয়।

৪.

লোহার শক্ত গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে শশী।

হাবুকে কোলে নিয়ে পাশেই লায়লা বানু। ছোট্ট ছেলেটা উঁকিঝুকি দিয়ে গ্রিলের ফোকর গলে পিতাকে দেখার চেষ্টা করছে। মাঝে কয়েক ফুটের দূরত্ব। ওইপারে ফের লোহার গ্রিল। সেই গ্রিল ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে মোক্তার মিয়া। কয়েক দিনে অচেনা হয়ে গেছে চেহারা। খোঁচা-খোঁচা কাঁচাপাকা দাড়ি। হঠাৎ যেন বুড়িয়ে গেছে। হাবুর ছোট্ট চোখে সীমাহীন অবিশ্বাস। একবার বাবার মুখে, একবার বোন আর মায়ের মুখে তাকাচ্ছে। কিছুতেই বুঝতে পারছে না, তার বাবাকে এভাবে খাঁচায় আটকে রাখা হয়েছে কেন!

খানিক পর পর প্রবল ঢেউয়ের মতো চাপ আসে মানুষের। মনে হয়, এই বুঝি দেয়ালে পিষে গেল শরীর। কারাগারে বন্দি আসামির স্বজনদের জন্য এই দর্শনার্থী রুমের ব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ। ত্রিশ টাকা দিয়ে নাম লেখালে কাক্সিক্ষত বন্দীর সঙ্গে দেখা করা যায়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় জায়গাটা এত ছোট্ট  যে, দাঁড়িয়ে থাকা দায়। একে তো প্রচণ্ড ভিড়, তার ওপর বহুদিন পর আপনজনকে দেখে চিৎকার, আহাজারি আর কান্নাকাটিতে কোনো কথাই বোঝার উপায় নেই। সাত-সকালে হাটখোলার মতো গমগম করছে চারপাশ।

দুই হাতে লোহার শিখ ধরে মানুষের চাপ সামলে বাবার দিকে তাকাল শশী। মাত্র কয়েক ফুটের দূরত্ব। কিন্তু মনে হচ্ছে এই পৃথিবীর এপার আর ওপার। খুব অসহায় লাগছে নিজেকে। ভয়ে ভয়ে মায়ের দিকে তাকাল একবার। গ্রেফতারের পর আজই প্রথম দেখা। নিশ্চয়ই কেঁদে-কেটে অস্থির করে তুলবে আশপাশ। কিন্তু অবাক ব্যাপার, তেমন কিছুই হলো না। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল লায়লা বানু। কিশোরীর মতো লাজুক চাহনিতে ঘুরেফিরে স্বামীকে দেখছে।

কয়েক মুহূর্ত পেরিয়ে গেলেও কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে না শশী। কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছে কিন্তু কাজ হয়নি। চিৎকার করে করে কথা বলতে হবে। জবাবও আসতে হবে সজোরে। না হয় কেউই কারও কথা শুনতে পাবে না। উপায়ান্তর না দেখে, উঁচুস্বরে জানতে চাইল, ‘তুমি কোনো চিন্তা কইরো না আব্বা। আমরা জামিনের ব্যবস্থা করতিছি। দ্রুতই হয়ে যাবে। আর কয়েকটা দিন কষ্ট করো।’

মেয়ের কথায় মাথা তুলে তাকায় মোক্তার। দুই হাতে গ্রিলটা ধরে মুখটা খানিক বাড়িয়ে দেয়। শশী দেখে, তার বাবার চোখটা কেমন ছলছল করছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে বুঝতে সময় লাগে না। কথা ঘুরায় শশী। ত্বরিৎ জানতে চায়, ‘তোমার কি কিছু লাগবে আব্বা?’

মোক্তার জবাব দেয় না। বহুদূর থেকে ভেসে আসা বিপদগ্রস্ত মানুষের কণ্ঠে শুধু বলে, ‘মা চন্দ্র, তোর মুখটা মলিন ক্যান?’

বাবার এই ডাকটা শশীর খুব পছন্দ। একমাত্র বাবাই তাকে ‘চন্দ্র’ বলে ডাকে। ওর জন্মের পর দাদা কোলে নিয়ে বলেছিলে, ‘মাইয়া তো চান্দের মতো সুন্দর’। মেয়ে সন্তানকে অনেকেই আপদ মনে করে। কিন্তু দাদা বলতো ভিন্ন কথা। তার মতে, মেয়ে হলো ঘরের লক্ষ্মী। প্রথম সন্তান মেয়ে হলে ভাগ্য খুলে যায়। সেই আমলের ম্যাট্রিক পাস মানুষটা বংশের প্রথম সন্তানের নাম রাখল শশী। আদর করে ডাকত চন্দ্র। দুটোই চাঁদের প্রতিশব্দ।

প্রিয় ডাকে সাড়া দেয় শশী। বলে, আমরা ঠিক আছি আব্বা। তোমার কথা বলো।’

নিজের কথা বলে না মোক্তার। বলে মেয়ের কথা। জানতে চায়, ‘পরীক্ষার তো বেশি বাকি নাই, তোর পড়াশোনার কী খবর মা? খুব চিন্তায় আছি। তোদের কি একটা বিপদে ফেললাম বল তো!’

বাবার কথাগুলো ভাঙা ভাঙা, অস্পষ্ট। তবু বুঝতে অসুবিধা হয় না শশীর। কণ্ঠটা কেমন ধরে আসে। জবাব দিতে পারে না। ভেঙে পড়ার আগে নিজেকে লুকানোর পথ খোঁজে। এমন বিপদের মুখেও মেয়েকে নিয়েই তার যত চিন্তা।

‘যাই ঘটুক, যত বিপদই আসুক, পড়াশোনাটা ঠিকমতো করিস মা। ছাড়িস না। আমার স্বপ্নটা পূরণ করিস।’

বাবার কথার জবাব দেয় না শশী। ফ্যালফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে থাকে। দীর্ঘ মৌনতা ভেঙে কথা বলে ওঠে লায়লা বানু। স্বামীকে অভয় দিয়ে বলে, ‘এসব নিয়ে আপনের চিন্তা করা লাগবে না। ওর পরীক্ষা আল্লায় দিলে ভালোই হবেনে। আমগে কথা বাদ দেন। আমরা ভালো আছি। এখন আপনের কথা কন। আপনের শত্রু কারা? কারা এরোম বিনা দোষে ফাঁসায়ে দিলো কনতো?

জবাব দেওয়ার আগেই মোক্তার মিয়াকে কে যেন ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল গ্রিল থেকে। মুহূর্তেই আরও তিন-চারজন লোক এসে জায়গাটা দখল করে নিল। এদেরই একজন শশীদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘সরো তোমরা, জায়গা দেও। আমার বাচ্চাগুলারে একটু জায়গা দেও।’

হাবুকে নিয়ে পিছিয়ে গেল লায়লা বানু। তিন বাচ্চা নিয়ে এক মধ্যবয়সী মহিলা ঠেলে সামনে চলে এলো। এসেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। কিছু সময় অদৃশ্য থাকার পর, ঠেলেঠুলে কোনো রকম মাথাটা বের করল মোক্তার। উচ্চকণ্ঠে বলল, ‘কাউরে বিশ্বাস করিসনে মা। কাউরে না। বিশ্বাস কইরে আমার আইজ এই পরিণতি। তোরা বাড়িতে যা। আমার জন্যি দোয়া কর…’

মোক্তার মিয়ার কথা শেষ হয় না। ধাক্কাধাক্কিতে ভিড়ের মধ্যে ভেসে থাকা মাথাটা তলিয়ে যায়। এইপারে শশীও আর গ্রিলটা নিজের দখলে রাখতে পারে না। দর্শনপ্রার্থী মানুষের প্রবল চাপে ছিটকে পড়ে দূরে।

উকিলের চেম্বারটা যেন একটা কাছারি ঘর।

চারদিকে ইটের দেয়াল। মেঝেটাও পাকা। উপরে শুধু টিনের চালা। আড়াআড়ি দুটো ঘরের সম্মুখভাগে ছোট্ট মাঠের মতো ফাঁকা একটা জায়গা। নানা গাছের সমারোহে চেম্বারটা গ্রামীণ অবয়ব পেয়েছে। বাউন্ডারি ঘেরা এলাকাটা পেরোলেই বড় রাস্তা। সারাক্ষণ সেখানে রিকশা-গাড়ি চলে। কোলাহলে ছেয়ে থাকে চারপাশ। শহুরে যান্ত্রিকতার ভিড় ঠেলে কাছারি ঘরের কাছাকাছি এলেই সতেজ পরিবেশ মনটা কেমন শীতল করে দেয়।

কিন্তু শশীর মনটা কিছুতেই শীতল হচ্ছে না। অস্থিরতার বহুরঙা শামিয়ানায় ছেয়ে আছে ভাবনার পুরোটা আকাশ। বাবার সঙ্গে কথা শেষ করতে পারেনি। শেষ বেলায় মানুষটা আসলে কী বলতে চাইল? কাকে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের প্রশ্ন তুলল? মনের মধ্যে সারাক্ষণ এইসব প্রশ্ন ঘুরছে আর মনের পশ্চিমাকাশে কালো মেঘের মতো দামামা বাজাচ্ছে।

রাজ্যের কাগজপত্র আর ফাইলের সমুদ্রে মাথাগুঁজে কাজ করছে উকিল সাহেব। তার সামনে দুটো মানুষ যে ঘণ্টা ধরে বসে আছে, সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। খানিক পর পর অল্পবয়সী এক সহকারী এসে নতুন নতুন কাগজ ধরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আর আড়চোখে ওদের দেখছে।

রাত বাড়ছে। মা আর ভাইকে নিয়ে এখনই বাড়ির পথে রওনা হওয়া দরকার। অনেক দূরের পথ। প্রথমে স্কুটারে চেপে আড়ংঘাটা। নৌকায় ঘাট পার হয়ে ভ্যানে চেপে যেতে হবে আরও কমপক্ষে আট-দশ মাইল। শহরে দশটা-এগারোটা পর্যন্ত মানুষের চলাচল থাকলেও গ্রামের যাত্রাপথটা বড় নির্জন। ক্রমেই গাঢ় হওয়া রাতে এত দূরের পথে দুটো মেয়ের একলা ভ্রমণ মোটেই নিরাপদ নয়।

পর পর দু’বার গলা খাঁকারি দিয়ে উঠল শশী। ঠুনকো কাচের মতো ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ল প্রগাঢ় এক নীরবতার আস্তরণ। মাথা তুলে তাকাল অ্যাডভোকেট হরিচরণ মিস্ত্রি। অদ্ভুত কায়দায় একটা ভ্রু কুঁচকে সে বলল, ‘তোমরা এখনও বসে আছ? বাড়ি চলে যাও।’

শশী একদৃষ্টিতে হরিচরণ বাবুর দিকে তাকিয়ে রইল। এত দীর্ঘ সময় বসিয়ে রেখে এইলোক বলে কী? কয়েকটা কড়া কথা শোনাতে ইচ্ছে করলেও দমে যেতে হলো। মেজাজ যতই বিগড়ে যাক, আচরণে তা প্রকাশ করতে পারল না। প্রয়োজনটা ওদের। মাথা গরম করলে হবে না। কিন্তু মাথা ঠিক রাখাও দায় হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড ক্ষুধায় মাথা ঝিমঝিম করছে। হাবুকে এক প্যাকেট বিস্কুট দিয়ে শান্ত রাখলেও ওরা কিছু খায়নি।

উত্তাপহীন কণ্ঠে শশী জানতে চাইল, ‘আব্বার তো কোনো খারাপ রেকর্ড নাই। একটা মানুষ বলল আর পুলিশ তারে ধইরে জেলে দিয়ে দিলো! এইটা কোনো কথা? এখন জামিন পাইতেও যদি দিনের পর দিন ঘুরতি হয়, আমরা কোথায় যাবো কাকা? আপনি একটা কিছু করেন।’

হরিচরণ বাবু কিছুক্ষণ থ মেরে রইল। হাত থেকে কলমটা নামিয়ে রাখল টেবিলে। তারপর কাঠের চেয়ারে হেলাল দিয়ে বলল, ‘ডাকাতির মামলা আর চুরির মামলা এক না মা। বললা আর জামিন হয়ে গেল বিষয়টা এমনও না। এই মামলায় আসামি মাসের পর মাস জেলে বইসা পচে। তোমার বাপের তো এক মাসও হয় নাই। আর অত নির্দোষ নির্দোষ যে বলতিছ, এত মানুষ থাকতি পুলিশ তোমার বাপেরেই কেন ধরলো? এমন কি টাকাকড়ি আছে তোমাদের?’

শশীর মনটা ছোট হয়ে গেল। মায়ের মুখের দিকেও তাকানো যাচ্ছে না। আশা-ভরসা দেবে যে লোক, সে যদি এমন কথা বলে, ভেঙে না পড়ে উপায় থাকে?

গম্ভীর কণ্ঠে হরিচরণ বাবু বলতে লাগলেন, ‘তোমরা হয়তো জানো না, নিশ্চয়ই ঘটনা একটা আছে। এখন সেই ঘটনায় গিয়া কাম নাই। কীভাবে কম সময়ে জামিন করানো যায় সেই চেষ্টা আমি করব। আপাতত জামিনের জন্য দাঁড়াব না। যতটুকু বুঝলাম, পরের তারিখের আগে জজ সাহেব জামিন দেবে না। তোমরা গরিব মানুষ, শুধু শুধু টাকা খরচ হোক চাই না। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করো, পরের তারিখে যেন জামিন করাতে পারি। এখন বাপু যাও তো সামনে থেকে।’

এমন কথার পর আর কিছু বলার থাকে না। টাকা-পয়সা থাকলে একটা কথা ছিল। খরচের দিকে তাকাত না। সামর্থ্য যেহেতু নেই, মেনে নেওয়া ছাড়া উপায়ও নাই। সমস্ত দিনের ক্লান্তি যেন ভর করেছে ওদের দুই পায়ে। কিছুতেই আগাতে চাইল না। কাছারি ঘর থেকে বেরিয়ে মাঠ পেরিয়ে বড় রাস্তার কাছাকাছি যেতেই পেছন থেকে কে যেন ডেকে উঠল। ফিরে তাকাতেই দেখে, কাকাবাবুর সহকারী ছেলেটা। বগলে একটা ফাইল নিয়ে গম্ভীর মুখে বাউন্ডারি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যাংলা-পাতলা একহারা লম্বা গড়ন। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর হবে। কিন্তু পরিপাটি চেহারা।

শশী দাঁড়াতে চাইল না। ওর তাড়া আছে। বহু দূরের পথ যেতে হবে। এখানে সময় নষ্ট করার মানে হয় না। কিন্তু লায়লা বানু দাঁড়িয়ে পড়ল। ফিসফিস করে বলল, ‘পোলাডা কি কতি চায় একটু শোন। খালি ছ্যানছ্যান করিস ক্যান?’

মায়ের কথায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও দাড়ায় শশী। মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখে। কপালটা কুঁচকে আছে। ছেলেটা এই দৃশ্য খেয়াল করল না। সে বলতে শুরু করল, ‘আমার নাম কামাল পাশা। স্যারের সঙ্গে আছি প্রায় সাত বছর। আপনাদের কেসটার কাগজপত্র আমিই তৈরি করেছি। কিছু মনে না করলে কয়েকটা কথা বলতাম।’

খুব গুছিয়ে কথা বলল ছেলেটা। আঞ্চলিক কোনো টান নেই। শশীও লেখাপড়া জানা মেয়ে। কথায় তবু গ্রাম্য টান রয়ে গেছে। যদিও ঘরের বাইরে কারো সঙ্গে কথাবার্তায় সতর্ক থাকে। গুছিয়ে কথা বলতে চেষ্টা করে। কিন্তু তবুও আঞ্চলিকতা থেকে যায়। কাটাতে পারে না। কী বলতে চায় কামাল পাশা? কৌতূহল বাড়ে শশীর। ফিরে তাকালেও কপালের ভাঁজটা সরে না। মেয়েকে চুপ থাকতে দেখে লায়লা বানুর তর সয় না। জানতে চায়, ‘বইলে ফেলো বাজান। কোনো অসুবিধা নাই।’

কামাল পাশা কয়েক পা এগিয়ে আসে। এক বগল থেকে ফাইলটা অন্য বগলে নিতে নিতে বলে, ‘আমার স্যার একজন ভালো আইনজীবী, এতে কোনো সন্দেহ নাই। আজ হোক, কাল হোক মোক্তার মিয়ার জামিন তিনি করাবেন। সামনের তারিখে না হোক, পরের তারিখে হবে। পরের তারিখে না হোক, তার পরের তারিখে হবে। আপনাদের একটা দিন সহ্য না হলেও গত ত্রিশ বছরে স্যারের সয়ে গেছে। তার অতো তাড়া নেই। দেরি হলে ক্ষতি নেই। উল্টো লাভ আছে। আইন পেশাটাই এমন। এত কথা আমার বলার কথা না। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে আপনাদের দেখে খুব মায়া লাগল। তাই বলতে বাধ্য হচ্ছি। আপনাদের কষ্টটা আমি বুঝি। বুঝি বলেই মোক্তার মিয়ার দ্রুত জামিন হোক এটা চাই। স্যারের কাছে দ্রুত জামিন হবে না। আপনারা চাইলে দ্রুত জামিনের একটা ভিন্ন পথ আমি দেখিয়ে দিতে পারি।’

এমন কথায় লায়লা বানুর চোখজোড়া হঠাৎ জ্বলজ্বল করে ওঠে। কিন্তু শশীর চোখে সন্দেহ কাটে না। তীক্ষè দৃষ্টিতে সে কামালকে মাপে। ঘটনা বোঝার চেষ্টা করে। এই ছেলের মতলবটা কি? কোনো সুবিধা নিতে চায় না তো?

‘কি সেই পথ জলদি কও বাপ।’ কোল থেকে হাবুকে নামিয়ে ছেলেটার আরও কাছে চলে আসে লায়লা বানু। হাত চেপে ধরে বলে, ‘স্বামীই আমার সংসারের সব। মানুষটা ছাড়া আমাগে দেখার কেউ নাই। দ্রুত জামিনের একটা ব্যবস্থা কইরে দেও বাবা। আল্লায় তোমার মঙ্গল করবে।’

মায়ের এমন আচরণ ভালো লাগে না শশীর। বহুবার নিষেধ করেছে। কিন্তু লাভ হয় না। চেনে না জানে না হুট করে একটা মানুষকে আপন ভেবে ফেলে। চেয়ারম্যান চাচার সূত্রে উকিল কাকার সঙ্গে পরিচয়। খুব বেশি না, অল্প দিনের। কয়েকদিনের দেখায় মানুষটাকে ওর ভালোই মনে হয়েছে। অন্তত অমঙ্গল চাইবে না- এই বিশ্বাস জন্মেছে। কিন্তু এই ছেলেকে তো একদমই চেনে না। দু-চারদিন হয়তো কাকার রুমে দেখেছে। বলা নেই কওয়া নেই, অচেনা ছেলেটাকে এত আপন ভাবার মানে আছে?

মায়ের ওপর বেজায় অসন্তুষ্ট হয় শশী। কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারছে না। অচেনা একটা ছেলের সামনে নিজের মাকে ভর্ৎসনা করতে মন সায় দেয় না। সংশয়ভরা মনে ছেলেটার প্রস্তাবের প্রতীক্ষায় থাকে।

কামাল পাশা কয়েক কদম হেঁটে বড় রাস্তায় উঠে যায়। লায়লা বানুও তাকে অনুসরণ করে। শশীই কেবল নড়ে না। হাবুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে মুখ মুছে নেয় কামাল। তারপর আচমকা উল্টো ঘুরে শশীর দিকে তাকায়। গুটি গুটি পায়ে কাছে এসে বলে, ‘তোমার নাম তো শশী।’ জবাবের অপক্ষোয় না থেকে নিচু স্বরে বলে, ‘কথাটা তোমাকেই বলা দরকার শশী। তোমাকে দেখে আমার শিক্ষিত মেয়েই মনে হয়। তুমি বিষয়টা জলদি ধরতে পারবে।’

কামালের এমন কথায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। কিন্তু শশীর চেহারায় কোনো ভাবান্তর নেই। এইটুকু বয়সেই যে কোনো পরিস্থিতিতে নিরুত্তাপ থাকার কৌশল আয়ত্ত করে ফেলেছে মেয়েটা। মনের ভেতর কি চলছে, তা অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠতে দেয় না কিছুতেই।

কৌশল কাজে লাগছে। কামাল পাশাকে বিভ্রান্ত লাগছে। বিভ্রান্ত ভাব নিয়েই সে বলে চলে, ‘শোনো শশী, তোমার বাবা কিন্তু একদম নির্দোষ না। ডাকাতির ঘটনাটার তার যোগসাজশ আছে। বিশেষ করে কাশেম আর স্বর্ণকারের সঙ্গে। কতটা আছে সেটা এখনই বোঝা যাবে না। মামলার চার্জশিট হয়ে ট্রায়ালে গেলে বোঝা যাবে। তবে এইটুকু বলি, কাশেম নামের যে লোকটা ধরা পড়েছে, তার উকিলের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তোমার বাবার সঙ্গে কাশেমের একটা লেনদেন ছিল।’

শশী যতই নিরুত্তাপ ভাব নিয়ে থাকুক, এই কথা শোনার পর তার কপালে ফের ভাঁজ পড়েছে। ক্রমেই তা সম্প্রসারিত হচ্ছে। সংশয় কিংবা সন্দেহের নয়, এই ভাঁজ চিন্তার। গভীরতর এক দুশ্চিন্তার।

লায়লা বানুও কামালের কথায় ঘাবড়ে গেল। কী দিয়ে কী বলবে ভেবে পেল না। কয়েকটা মুহূর্ত এভাবেই নিশ্চুপ বয়ে গেল। তারপর কামাল পাশা অন্যদিকে ফিরে বলল, ‘যে কোর্টে তোমাদের মামলা, সেই কোর্টের জজ সাহেবের পেশকার আমার পূর্বপরিচিত। তাকে কোনোভাবে রাজি করাতে পারলেই তোমার বাবার জামিন হয়ে যাবে। এই পেশকার খুব কামেল লোক। কথা ও কাজে মিল আছে।’

‘তালি পরে, পেশকাররে একটু বইলে দেও বাবা। মানুষটার জামিন হয়ে যাক। কতদিন ঘরের ভাত খায় না। আজকে দেখা হইছিলো। চেহারার দিকে তাকানো যায় না।’ কামালের কথার অন্তর্নিহিত মোজেজা ধরতে পারল না লায়লা বানু। না ধরতে পেরেই আবদার করে বসল। মা না পারলেও শশী ঠিকই পারল। পারল বলেই ধমকের সুরে বলল, ‘পুরো কথাটা শেষ করতি দেও। কথার মাঝে বা হাত ঢুকানোর অভ্যাস গেল না তোমার।’

মেয়ের ধমক খেয়ে বোকার মতো তাকিয়ে রইল লায়লা বানু। জামিনের এই প্রস্তাবের পরও ফের কি কথা থাকতে পারে, বুঝতে পারে না সে। মা-মেয়ের এমন কথোপকথনে হেসে উঠল কামাল পাশা। মাপা এবং নিঃশব্দ হাসি। লোকটাকে দেখতে কেমন বীভৎস লাগছে এখন। মনে হচ্ছে, কোনো অশরীরী ছায়া ভর করেছে ওদের উপর।

‘পেশকাররে রাজি করাতে কী লাগবে?’ কোনো ভণিতা নয়, সরাসরি জানতে চাইল শশী।

কামালের হাসি আরও বিস্তৃত হয়। কিছুক্ষণ কোনো কথা বলে না। তারপর ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি ধরে রেখে বলে, ‘তুমি খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে শশী। বুদ্ধিমান মানুষ আমার পছন্দ। পেশকার কাজটা টাকার বিনিময়ে করে- এটা মিথ্যা নয়। তবে যে কেউ গিয়ে বললেই কিন্তু করে না, তার বিশ্বস্ত লোক হতে হবে। আমি তার বিশ্বস্ত লোক। আমার সঙ্গে মানুষটার সম্পর্ক ঠিক টাকারও না। যেহেতু তোমরা বিপদে আছো, তুমি চাইলে, সাহায্যটা আমি করতে পারি। টাকার হিসাব পরে দেখা যাবে। ভাবো, ভেবে আমাকে জানাও।’

কথা শেষে একটা কাগজের টুকরো ধরিয়ে দিল কামাল পাশা। অপেক্ষা করল না। উল্টো ঘুরে চলে গেল। শশী দেখল, কাগজে একটা ঠিকানা লেখা। ‘কামাল পাশা, ৩২/৮, টুটপাড়া, জোড়াকল বাজার (হামিদ সাহেবের বাড়ি)।’

কাগজটা ডান হাতের মুঠোয় ভরে কাছারি ঘরের দরজার দিকে তাকাল শশী। দেখল, ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে কামাল। মুহূর্তেই ছোট্ট উঠোনটা পেরিয়ে দরজার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেল। শশীর কপালের ঈষৎ ভাঁজটা আরও বড় হচ্ছে। ডালপালা ছড়িয়ে ক্রমেই বিশাল এক মহীরুহে পরিণত হচ্ছে যেন!

৫.

অদ্ভুত কিছু শব্দে ঘুম ভেঙে গেল শশীর।

ঘুম ভেঙে দেখল, ঘরজুড়ে প্রগাঢ় অন্ধকার। কয়েক হাত দূরের কিছুও দেখা যায় না। বুঝতে পারছে না, কী ঘটছে। ওর একার ঘুম ভাঙল, নাকি মাও কিছু টের পেয়েছে? শশীর মনে হলো পুরো ঘরটা যেন দুলছে। কেউ বুঝি ঘরটা ধরে উপড়ে ফেলতে চাইছে। প্রবল ঝাঁকুনিতে কাঠের তক্তাগুলো কটকট করছে। কাঁচা ঘুম ভেঙে ধাতস্থ হতে সময় লাগে মানুষের। সহসাই বোঝা যায় না কোথায় আছে, কী হচ্ছে! শশীও বুঝতে পারছে না, স্বপ্ন দেখছে নাকি বাস্তবেই এসব ঘটছে। ঘটলেও কী ঘটছে?

গোলপাতার ছাউনি ফাঁক হয়ে হঠাৎ একরাশ দমকা হাওয়া ঘরে ঢোকার মুহূর্তে আকাশে বিদ্যুৎ চমকালো। উজ্জ্বল আলোর রেখা তৈরি হয়ে ফের মিলিয়ে গেল। এই কয়েকটা মূহূর্তের আলোর ঝলকানি ঢুকে পড়ল শশীদের ঘরেও। দেখল, মাও উঠে বসে আছে খাটে। বিকট শব্দে জানালার খিল বাড়ি খেলো কাঠের ফ্রেমে। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে চালে। শশীর বুঝতে বাকি রইল না, বাইরে প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়েছে।

বিছানার কাছে রাখা সুইচ টিপল শশী। আলো জ্বললো না। বিদ্যুৎ নেই। ঝড় শুরু হওয়ার আগেই বোধহয় চলে গেছে। অন্ধকার হাতড়ে খাটের পাশেই রাখা একটা দিয়াশলাইয়ের বাক্স খুঁজে পেল। ত্বরিত একটা কাঠি জ্বালিয়ে কুপি খুঁজে বের করল। কুপি জ্বালাতেই একটা হলুদ আলো তৈরি হলো খাটের আশপাশে। সে আলো ক্রমেই তার অস্তিত্বের জানান দিতে ছড়িয়ে পড়ল ঘরের চারপাশে। কোনায় কোনায় ঘাপটি মেরে থাকা জমাট অন্ধকার কিছুটা পাতলা হলো।

লায়লা বানু এখনও স্থির বসে আছে। থেকে থেকে ঘরটা কাঁপছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি উড়িয়ে নিয়ে গেল। শশী উঠে গিয়ে কয়েকবারের চেষ্টায় জানালাটা বন্ধ করল। এখন আর বিকট আওয়াজটা হচ্ছে না। তবে হঠাৎ হঠাৎ গোলপাতার ছাউনি ফাঁকা হয়ে ধুলোবালি মিশ্রিত বাতাস ঢুকে যাচ্ছে ঘরে। কুপিটা নিভতে নিভতেও জ্বলে উঠছে ফের।  

হাবুটাই কিছু টের পেল না। উপুড় হয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। স্বামী জেলে যাবার পর নিজের ঘরে একা ঘুমায় না লায়লা বানু। দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে ঘুমায়। পাশাপাশি দুটো ঘর। একটা ঘরে শশী আর হাবু, অন্যঘরে স্বামী নিয়ে লায়লা বানু।

কয়েক বছর আগেও মাটির ঘরে থাকতো ওরা। এক পোতায় তিনটা ঘর ছিল। একটা ছিল শশীর দাদার। সে মারা যাওয়ার পর ঘরগুলো ভেঙে নতুন তুলেছে মোক্তার মিয়া। দুই রুমের ছোট্ট একটা কাঠের ঘর। ঘর লাগোয়া হোগলাপাতার রান্নাঘর।

করাতকলের সামনে পড়ে থাকা দীর্ঘদিনের পুরনো গাছের গুঁড়ি চিরে তক্তা আর খুঁটি বানিয়েছে। সে খুঁটিতে মজবুত করে ঘরের অবয়ব তুলেছে। বেড়া দিয়েছে। আড়া দিয়েছে। নিজের হাতেই সব তদারকি করেছে। উপরে টিনের চালা দিতে চেয়েছিল। ফ্রেম বানাতে কাঠের অভাবও ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টাকায় হলো না। পুরো ঘর ছেয়ে দিতে কয়েক বান টিন লাগতো। অত নগদ টাকা ছিল না মোক্তারের কাছে। কারও কাছে হাত পাতারও অভ্যাস নেই। ফলে শেষ পর্যন্ত ভালো মানের গোলপাতায় দোচালা ছাউনি দিয়েছে। টিনের চালা আর দিতে পারেনি।

নির্মাণের পর বহু ঝড়-ঝাপ্টা গেছে। ঘরের কিছুই হয়নি। বড়জোর চালার দু-এক জায়গা আলগা হয়ে চুইয়ে পানি পড়েছে। সেই বরাবর বালতি বা হাঁড়ি বাসিয়ে দিতো লায়লা বানু। ঘর আর ভিজত না। পরদিন ঠিকই চালায় উঠে যেত মোক্তার মিয়া। নতুন কয়েকটা গোলপাতা এনে ফুটোগুলো নিবারণ করত।

এসব ভাবতে ভাবতেই চুইয়ে চুইয়ে বৃষ্টির জল পড়তে লাগল বিছানায়। চমকে উঠে একটা পাতিল নিয়ে এলো লায়লা বানু। ফোঁটা বরাবর রেখে দিল। এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে গেল শশী। দৌড়ে বইগুলোর কাছে গেল। টেবিলের পাশেই জানালা। জানালাটা বন্ধ। কিন্তু পানি ছিটকে বই ভিজে যেতে পারে। দ্রুত বইগুলো একটা চটের বস্তায় ভরে খাটের তলায় রেখে দিল।

ঝড় থেমে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। চুইয়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা বাড়ছে। যেখানেই ফোঁটা পড়ছে সেখানেই একটা পাতিল নয়তো প্লাস্টিকের ছোট বাটি বসিয়ে দিচ্ছে লায়লা বানু। তর্ক দৃষ্টি রাখছে চারিদিকে। শশী তাকে সাহায্য করছে। মধ্যরাতে মা-মেয়ের দৌড়-ঝাঁপে বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেল ঘরটা।

ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেলে বিছানায় ফিরে এলো দু’জন। কুপি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল ঠিকই কিন্তু রাতে আর ঘুম এলো না। নানা চিন্তা ঘিরে ধরলো শশীকে। পরীক্ষার বেশি বাকি নেই। কোনো পড়াশোনা করতে পারছে না। যদিও নির্বাচনী পরীক্ষার পর স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। এই সময়টা ঘরে বসে প্রস্তুতি নেওয়ার। কিন্তু প্রস্তুতি আর নিতে পারছে কই? বাবার জন্য দৌড়-ঝাঁপ করতে করতে কখন যে রাত হয়ে যাচ্ছে, রাত শেষে ভোর এসে পড়ছে- টেরই পাচ্ছে না।

সামনের দিনগুলো কীভাবে পার করবে বুঝতে পারছে না। এলাকায় নানা কানাঘুষা। কারও সঙ্গে কোনো বিবাদে না জড়িয়ে, অমঙ্গল চিন্তা না করেও, মাত্র কয়েকটা দিনেই ডাকাতের মেয়ে হয়ে গেল শশী। সবাই কেমন এড়িয়ে চলতে চায়। নানা অদ্ভুত কথা বলে। সফুরা চাচি সেদিন কলপাড়ে হাত টেনে বললেন, ‘তোগেরও দোষ আছে। এইসব কাম যে করে, বাপটারে নিষেধ করতি পারলি না?’

জবাব দেবে কীÑ চাচির কথা শুনে নিজেকে খুব অসহায় লেগেছে শশীর। মানুষগুলো ধরেই নিয়েছে মোক্তার মিয়া একজন ছদ্মবেশী ডাকাত। অথচ এলাকার কারও বিপদ হলে সবার আগে এই মানুষটাই ছুটে গেছে। প্রতিবাদ করেছে। কোনোদিন কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি। মানুষ বদলে যেতে সময় লাগে না। কে কতটা আপন, আদৌ আপন কিনা বিপদে পড়লে বোঝা যায়। মানুষ চেনার জন্য দুঃসময়ের চেয়ে ভালো আর কোনো সময় হয় না।

এখন আর কারও সঙ্গেই কথা বলতে যায় না শশী। অবশ্য সময়ও পায় না। থানা-পুলিশ-কোর্ট করতে করতে সেই অবসর নেই। কিন্তু অবসর বের করতে হবে। ভালো করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। যেভাবেই হোক বাবার স্বপ্নটা পূরণ করবে। এত বিপদের মধ্যেও পরীক্ষাটা ভালো হলে, ’কাক্সিক্ষত ফল হলে মানুষটা ভীষণ খুশি হবে। শশী জানে, প্রস্তুতি যেমনই হোক, পরীক্ষা খারাপ হবে না। এতটুকু আত্মবিশ্বাস ওর আছে। কিন্তু গণিত নিয়ে যত চিন্তা। চর্চা না করলে ভুল করার আতঙ্ক থাকে। কয়েকটা মাস গৌতম স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে পারলে ভালো হতো। ওর বান্ধবীরা সবাই পড়ছে। সংসারের এই অবস্থায় সেই চিন্তা বাদ দিতে হচ্ছে। মনে মনে ঠিক করল, কাল থেকে যত ব্যস্ততাই থাকুক প্রতিদিন তিন ঘণ্টা অংক করবে।

‘তোর বয়স তখন চাইর-কি পাঁচ।’ মায়ের কথায় চমকে ওঠে শশী। পাশ ফিরে শোয়। ভেবেছিল ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু ওর মতোই যে জেগে আছে, বুঝতে পারেনি। মা-মেয়ের মাঝখানে হাবু। ভাইটার মাথায়, শরীরে হাত বুলিয়ে দেয় শশী। দিন দিন কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা।

‘এক রাইতে ঝড় উঠল। সে কী ঝড়, মনে হয় সব কিছু দুমড়য়ে-মুচড়ায়ে ফেলবে। তোর দাদা-দাদি কেউ বাড়িতে আছিল না। কাঞ্চনপুর না জানি কই বেড়াতি গেছিল। তুই তখন ছোট্ট। তিন কি চাইর বয়স। হাবু তখনও হয় নাই। ভয়ে আমি খাটের এক কোনায় যেয়ে বসলাম। তোরে কোলে নিয়ে আল্লা আল্লা করতিছি। তখন আমাগের মাটির ঘর আছিল। উপরে গোলপাতা। ঘরের একটা জানলার সিটকিনি আবার ভাঙা। বাতাসের চোটে সেই জানলা খালি বাড়ি খায়। এমন শব্দ হয় যেন বুকের মধ্যি কেউ হাতুড়িপিটা করতিছে। চারিদিকে ঘুটঘুইটে আন্ধার। সেই আন্ধারের মধ্যি তোর আব্বা জানলাটা আটকাইন্নার খুব চেষ্টা করল। পারল না। এক ফাঁকে আমি কুপিটা জ্বালায়ে দিলাম। হালকা আলোয় দেখলাম, মানুষটার শরীর অর্ধেক ভিজে গেছে। একেকটা বাজ পড়ে আর এমন শব্দ হয়, মনে হয় এই বুঝি আমাগে ঘরের চালায় পড়ল। তোরে বুকের মধ্যি চাইপে ধইরে ভয়ে কাইন্দে দিলাম। তোর আব্বারে ডাকলাম। সে পাত্তা দেয় না। কাছেও আসে না।’

একটানা কথাগুলো বলে একটু থামল লায়লা বানু। শশী গভীর মনোযোগ দিয়ে মায়ের কথা শুনছে। হঠাৎ হঠাৎ পুরনো দিনের কথা শুরু করে মানুষটা। ভালো লাগে শশীর। আবছায়া ঘটনাগুলো মেলাতে চায়। মনে করার চেষ্টা করে। কিছু মনে পড়ে, কিছু পড়ে না। কিন্তু বুকের ভেতর শৈশব স্মৃতির ঘ্রাণ উড়তে থাকে জোনাক পোকার মতো।

ফের লায়লা বানুর কণ্ঠ শোনা যায়। ‘গোলপাতা এমন একটা জিনিস, যত মজবুত কইরে বানাইস, ঝড়-বৃষ্টি হলি পর বান্ধন খানিক আলগা হবেই। পানিও পড়বে। আজকের মতো সেদিনও নানান জায়গা থিকা পানি পড়তি লাগল। বালতি দিয়া তোর আব্বায় একবার চালার পানি আটকায়, একবার জানলাটা বন্ধ করার চেষ্টা করে। কাজ আর হয় না। পানির চোটে মাটির ঘরখান কাদাকাদা হইয়া গেল। আমারও ইচ্ছা করে মানুষটারে সাহায্য করি। কিন্তু ভয়ে খাট থিকা নামতে পারলাম না।’

বৃষ্টি থেমে গেছে বহুক্ষণ আগে। কাঠের বেড়ার ছোট ছোট ফোকর গলে শীতল হাওয়া বইছে ঘরজুড়ে। লায়লা বানু হঠাৎ খাটের উপর উঠে বসল। হাত বাড়িয়ে মাথার কাছের জানলাটা খুলে দিল। মন কেমন করা বৃষ্টিমাখা হাওয়া এসে বাড়ি খেল চোখেমুখে। শরীরটা শিউরে উঠল। ভালো লাগল, বড় ভালো লাগল শশীর।

বৃষ্টি শেষের রাতের আকাশটা তারায় তারায় খচিত। জানালা খোলায় ঘরের গুমোট অন্ধকার ভাবটা কেটে গেছে। আবছা আলোয় প্রায় সবই দেখা যায়। লায়লা বানু কাঠের বেড়ায় হেলান দিয়ে বসে রইল। হাবুর মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে বলল, ‘আচমকা একটা কাণ্ড ঘটল জানিস। বিকট এক আওয়াজের পর দেলখাম, ঘরের চালা নাই। প্রবল বাতাসে চালা উইড়ে গেছে। মাথার উপরে খোলা আসমান। সেই আসমান থিকা বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়তিছে মাথায়, গায়ে। ভিজে যাতিছি আমরা। হঠাৎ একটা ডাল ভাইঙে পড়ল মাটির দেয়ালের ঠিক পাশে। একটুর লাইগা ঘরে পড়ে নাই। এই ঘটনায় ভয়ে আমি চিৎকার দিয়া উঠলাম। তোর আব্বায় করলো কি, এক দৌড়ে খাটের কাছে আইলো। আমার থিকা তোরে ছিনায়ে নিল। বুকের মধ্যি তোরে চিপকায় আমার ডান হাতখান খপ কইরে ধরল। ধইরে এমন এক টান মারল, আমি ছিটকে খাট থিকা নিচে পড়লাম। টানতি টানতি গিয়া উঠাইল রান্নাঘরে। ভিজে-পুইড়ে একাকার অবস্থা। চোখের সামনে ঘরখান তলায় যাতি দেখলাম। আমি অবশ্যি কয়েকবার কাঁথা, বালিশ আর রেডিওটা আনতি ঘরে যাতি চাইলাম, কিন্তু তোর আব্বায় আমার হাত ছাড়ে না। এমন শক্ত কইরে ধইরে রাখল, আর যাতি পারলাম না। বিড়বিড় কইরে কয়, লাগলি, আরেকটা কিনে দিমু। চুপচায় বইসে থাক।’

লায়লা বানুর কণ্ঠটা হঠাৎ কেমন নরম হয়ে এলো। নরম কণ্ঠেই সে বলতে লাগল, ‘সারাটা রাইত বৃষ্টি হলো। সে কী বৃষ্টিরে আল্লা! মনে হয় দুনিয়াদারি ভাসায়ে নেবে। মধ্যি মধ্যি দমকা বাতাস। বাজ পড়ার শব্দ। এমন শোঁ শোঁ শব্দ, মনে হয় রান্নাঘরও উড়ায়ে নেবে। বাজ পড়ে, বিকট শব্দ হয়। আমি আর তুই ভয়ে কাঁইপে কাঁইপে উঠি। তোর আব্বায় কিন্তু ডরায় না। সে অভয় দেয়। কিচ্ছু হবে না। বইসে থাক। আমরা বইসে থাকি। কিন্তু ভয় আর কমে না। কাঁপাকাঁপিও না। একটু পর তোরে আর আমারে আধভেজা কবুতর ছাওয়ের মতো বুকের মধ্যি জড়ায়ে নিল লোকটা। সারারাত আমরা দুইজন তার বুকের মধ্যি চিপকায় থাকলাম। কখন জানি ঘুমায়েও গেলাম।’

একটু দম নিল লায়লা বানু। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস নিয়ে বলল, ‘আইজকাও ঝড়-বৃষ্টির রাইত। আইজকাও পানি পড়তিছে চারিদিক থিকা। আইজকাও ভয় লাগতিছে। কিন্তু কবুতরের ছাওগুলারে বুকের মইধ্যে জড়ায়ে ধরার লোকটা কোথাও নাই।’

লায়লা বানুর শেষের কথাগুলো জড়িয়ে গেল। কেমন গোঙানির মতো শোনাল। ঘরের মধ্যে আবছা আলো। সেই আলোয় লায়লা বানুর মুখ দেখা যায়। কিন্তু চোখের জল দেখা যায় না। শশীর তবু বুঝতে অসুবিধা হয় না, তার মা কাঁদছে। কথায় কথায় মায়ের এমন কান্না শশীর খুব অপছন্দ। প্রায়শই এ নিয়ে ঝগড়া হয়। ধমক দিয়ে থামিয়েও দেয়। কিন্তু আজ আর ধমক দিতে ইচ্ছে করছে না। কিছু কিছু কান্নার শব্দ অসহ্য লাগে না। বিরক্তিকরও লাগে না। নিজের খুব আপন মনে হয়। মনে হয়, বুকের ভেতর জমতে থাকা অভিমানের মেঘগুলোকে কেউ বুঝি বৃষ্টি হয়ে ঝরাল।

লায়লা বানু প্রাণপণ নিজের কান্না আড়াল করতে চাইছে। কিছুতেই সে চায় না শশী বুঝুক। চায় না বলেই খুব নীরবে চোখের জল মুছছে। নিজেকে সামলে নিতে চাইছে। স্বামীকে নিয়ে তার এই একান্ত ব্যক্তিগত দুঃখগাথা একান্তই তার। এই দুঃখের ভাগ সে মেয়েটাকে দিতে চায় না। জগতে এমন কিছু কান্না আছে যার ভাগ কাউকে দিতে হয় না। কিছু কান্না নিজের। একান্তই নিজের।

লায়লা বানুর সতর্কতা কাজে আসছে না। নিশ্বাসের তটস্থ ওঠানামা আর আঁচলে চোখ মোছার তোড়জোড়ে কান্নার অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে। শশী বুঝতে পারছে তার মা কাঁদছে। কিন্তু না বোঝার ভান করে অন্য পাশে ফিরে রইল। কেউ কোনো কথা বলছে না। নিথর পড়ে থেকে শূন্য অনুভূতিটা ধারণ করছে কেবল।

বুকের ভেতরটা কেমন যেন করছে শশীর। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে খুব। বেদনাহত চোখ থেকে কখন যে দু’ফোঁটা কবোষ্ণ জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল নিচে, টের পেল না। একই শোকে জেগে ওঠা তীব্র বেদনা, সে বেদনা আড়ালে মা-মেয়ের অদ্ভুত ছল, অসহনীয় রাতটাকে ক্রমেই ভোরের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে লাগল।

৬.

‘চোরাই দুল নাতো আবার?’

ফরমাইজখানা বাজারে সঞ্চিতা জুয়েলার্সের বেঞ্চিতে বসে আছে শশী। গ্রামের সবচেয়ে পুরনো স্বর্ণের দোকান। চেহারায় জৌলুস নেই কিন্তু বনেদি আভিজাত্য আছে। লায়লা বানু এক জোড়া কানের দুল নিয়ে এসেছে বেচতে। হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে প্রশ্নটা করল কানাই।

‘ভগবান জানে, কার না কার মাল কিনে কোন বিপদে পড়ি।’

কানাইয়ের এই অবিশ্বাস ও সংশয় অমূলক নয়। ডাকাতির ঘটনায় মোক্তার মিয়া জেলে। প্রায় একই কায়দায় সোনা বেচতে গিয়ে পথের বাজারে ধরা পড়েছে কাশেম। স্বর্ণকারকেও ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। তাজা এসব ঘটনার মধ্যে শশী আর লায়লা বানু যদি সোনা বেচতে আসে, লোকে ওদের বিশ্বাস করবে কেন?

তবুও বিষয়টা খারাপ লাগল শশীর। কত বড় বিপদে পড়ে যে নিজের কানের দুলজোড়া বিক্রি করতে এসেছে মা, আর কেউ না জানুক ও জানে। জানে বলেই, এমন কথা নিতে পারল না। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আপনেও কি তাইলে ডাকাতির মাল বেচেন কাকা?’

এমন কথায় বিব্রত হলো কানাই। খানিক ঘাবড়েও গেল। তার বড় ভাইয়ের মেয়ে বীথিকা আর শশী একই ক্লাসে পড়ে। চোখের সামনেই মেয়েটা বড় হয়েছে। এত লাজুক আর ভদ্র মেয়ে কমই দেখেছে কানাই। মুখের ওপর কথা বলা দূরে থাক কোনো দিন চোখ তুলে তাকায়নি। বীথিকা  কোনো অন্যায় করলে, কথা না শুনলে, কানাই প্রায়ই শশীর উদাহরণ দেয়। সেই মেয়ে কিনা এভাবে কথা বলছে?

বিব্রত ভাবটা ধরে রেখে কানাই জানতে চায়, ‘বুঝলাম না তোর কথা!’

‘না বোঝা কি আছে কাকা? একদম সোজা কথা। আমরা যদি চোরাই মাল বেচতি আসি, তালি পরে আপনেও নিশ্চয় ডাকাতির মালই বেচেন।’

শশীর পরের কথায় ঘোর আরও বাড়ল। কানাই এখনও ঠাওর করতে পারল না শশী কী বোঝাতে চায়। বোকার মতো সে লায়লা বানুর দিকে তাকিয়ে রইল। এই দৃষ্টির মানে বুঝতে পারল লায়লা। মেয়েকে ধমকের সুরে বলল, ‘কী যা তা বলিস! কানাই দার সঙ্গে কি আজকের পরিচয়? জন্মের পর থিকা এই দোকান দেখতিছি।’

শশীর কণ্ঠের ঝাঁজ কমে না। বলে, ‘আমরাও তো তার সামনে বড় হইছি মা। কাকাও তো আমাদের আজকে থিকা চেনে না। তারপরও এমন কথা বলল কী করে?’

‘সময়টা খারাপ। সতর্ক থাকার দরকার আছে। উনি মুরুব্বি মানুষ। উনি বলতে পারে। তাই বলে তুইও বলবি? লেখাপড়া শিখাইলাম কি এই জন্যি?’ লায়লা বানুর কণ্ঠে হতাশা।

শশী চুপ হয়ে গেল। দোকান থেকে দুই কদম বেরিয়ে বাজারের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘আমি তো খারাপ কিছু বলিনি। তুমিই একদিন নকশার প্রশংসা কইরে কইছিলা, এই দুল আর হাতের বালা জোড়া কানাই কাকার দোকান থিকা বানানো। উনি হয়তো ভুইলে গেছে, কিন্তু আমরা তো ভুলি নাই। এখন সে যদি বলে, এই দুল চোরাই মাল, তালি পরে উনিও তো চোরাই মালই বেচে।’

কানাই লজ্জায় পড়ে গেল। খোঁচা মারতে গিয়ে নিজে এমন বেকুব হবে ভাবেনি। আর কথা না বাড়িয়ে দুলজোড়ার সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে দিল লায়লা বানুর হাতে। শশী মায়ের সঙ্গে বাড়ির পথ ধরল।

অভাবের সংসার। জমানো সম্পদ বলতে কিছু নেই ওদের। অর্থের ঝনঝনানি নিয়ে কেউ যে এসে পাশে দাঁড়াবে তিন কুলে এমন কোনো স্বজনও নেই। অথচ গত কয়েকটা দিনে দেদার টাকা নেমে গেছে। কিন্তু মানুষটার জামিন করাতে পারছে না। অনেক চিন্তা করে দেখেছে শশী, হরিচরণ উকিলের সহকারী কামাল পাশা ছেলেটার প্রস্তাব খারাপ না। এই মুহূর্তে ভিন্ন পথ দেখা ছাড়া কোনো উপায় নেই। নিয়ম মেনে জামিন করাতে গেলে যে সময় আর ভোগান্তি হবে, তার কোনোটাই সহ্য করার ক্ষমতা অথবা সামর্থ্য ওদের নেই।

বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করতেই দেখা গেল লায়লা বানুও এক পায়ে খাড়া। কিন্তু টাকা? পেশকারকে কম হোক বেশি হোক কিছু টাকা-পয়সা দিতে হবে। বিনা পয়সায় কাজ করবে নাকি? যদিও কামাল বলেছে টাকাপয়সা নিয়ে পড়েও ভাবা যাবে। কিন্তু লাগবে তো! একদম খালি হাতে যায় কী করে?

এসব ভাবতে ভাবতে দুলজোড়া এগিয়ে দিলো লায়লা বানু। বলল, ‘বালাজোড়া আগেই বিক্রি করিছি। তোর দাদার চিকিৎসার সময় জায়গা-জমিনও গেছে। শুধু কুদির বটতলার পাশে পাঁচ কাঠা জমি আছে। তোর বিয়া-শাদিতে লাগবে বইলে যত বিপদ হোক ওই জমিনে উনি হাত দেয় নাই। আমিও চাই না সে কষ্ট পাক। এই দুলজোড়া বেইচে যা পাওয়া যাবে, তাতে হবে না?’

বিয়েতে পাওয়া স্বর্ণালংকার প্রত্যেক নারীর যক্ষের ধন। মায়ের শেষ সম্বল কানের দুল জোড়া বেচতে তাই মন সায় দিল না শশীর। কিন্তু উপায়ও নাই। গুজবের ডালপালা যেভাবে ছড়াচ্ছে, পরিস্থিতি যেভাবে মোড় নিচ্ছে, তাতে শশীর বাবা আরও কয়েক মাস জেলে থাকলে ওদের এই এলাকা ছাড়তে হবে।

গতকাল বিকেলেই একটা ঘটনা ঘটেছে। কলপাড়ে পানি আনতে গিয়েছিল শশী। ফেরার পথে আচমকা পথ আগলে দাঁড়াল তালেব। মুখে সেই বিশ্রী তেলতেলে হাসি। অদ্ভুতভাবে লুঙ্গি উঁচিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বলল, ‘কিরে তোর মায়ের নাকি বিয়া?

এমন কথায় শশীর উত্তেজিত হওয়ার কথা। তেড়ে-ফুঁড়ে মারতে আসারও। কিন্তু উত্তেজিত হলো না। শান্ত গলায় বলল, ‘তুমি এখনও দাওয়াত পান নাই? কার্ড ছাপাতি দিছি। হাতে পাইলেই দাওয়াত পাবা। চিন্তা কইরো না।’

এমন জবাব আশা করেনি তালেব। ভেবেছিল মেয়েটাকে খুঁচিয়ে খানিক আনন্দ নেবে। কিন্তু হলো উল্টোটা। এত নির্বিকারভাবে শশী ঘটনা মেনে নিল যে, তালেব নিজেই দ্বিধায় পড়ে গেল। ঘটনা তাহলে সত্যি নাকি?

‘না, মাইনষি কওয়া-কওয়ি করে। যেই মামলায় ফাঁসিছে, তোর বাপে তো এই জনমে আর জেল থিকা বাইর হ’তি পারবেনানে। তাই শুনলাম, চেয়ারম্যান নাকি প্রস্তাব দিছে, তার বউ মরা ভাইটারে তোর মায়ের লগে বিয়া দিবে। শুনি আরকি। সত্য-মিথ্যা জানি না।’

‘এই এলাকার সব খবর তো বাতাসের আগে তোমার কাছেই যায়।’ মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি নিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ায় শশী। এর সঙ্গে কথা বলা দায়। কখন মেজাজ বিগড়ে যাবে ঠিক নেই। তালেব তবু থামে না। পেছন থেকে বলে, ‘খুনি-ডাকাতের ঘর কইরে লাভ কী? যৌবন থাকতি তোর মায়ের একটা গতি হ’ল রে। এইবার তোর একটা গতি হ’লি হয়। কিডা জানে, খুনির মাইয়ারে কেউ বিয়া করবি কিনা!’

শশী থমকে দাঁড়ায়। আবু তালেবের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। দৃঢ়কণ্ঠে বলে, ‘করাতকলের দেওয়ালের লগে আব্বায় তোমারে গলা ঠাইসা ধরছিল পর জিহ্বাখান যে বাইর হইয়া গেছিল, এত জলদি ভুইলা গেলা তালেব ভাই? অবশ্য ভুইলা যাওনেরই কথা। গলার পাঁচ আঙুলের দাগখান মুইছা গেছে দেখা যায়।’

তালেবের মুখটা হাঁ হয়ে যায়। নিজের অজান্তেই ডান হাতটা গলার কাছে উঠে আসে। বোকার মতো হাত বুলাতে থাকে গলায়। গট গট করে হেঁটে ঘরে ফিরেছে শশী। ঘরে ফিরে মাকে এই কথা বলেনি। বলেও লাভ নেই। তালেবের কথা সে পাত্তা দেয় না। হেসেই উড়িয়ে দেয়। কোনো এক অদ্ভুত কারণে তালেবকে প্রশ্রয় দেয় লায়লা বানু। 

ফরমাইজখানা থেকে ফিরে দেখে আতাহার চেয়ারম্যান বেরিয়ে যাচ্ছে।

ওদের দেখেই বলল, ‘এই যে, মা-মেয়েকে পাওয়া গেল। কই গেছিলা তোমরা? আমি খুঁইজা মরি।’

‘বাজারে গেছিলাম চাচা। আপনি কখন এলেন? ভেতরে আসেন।’ বলেই ঘর খুলে একটা চেয়ার টেনে আনে শশী। বসতে দেয়। কিন্তু ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে বসে না চেয়ারম্যান। ত্বরিত বলে ওঠে, ‘সামনে নির্বাচন। খুব দৌড়ের উপর আছি। খোঁজ নিতে পারতিছিলাম না। তাই জানতি আলাম, জামিনের কতদূর? হরিচরণ সাহায্য করতিছে তো?’

শশী একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বলে, ‘সাহায্য করতিছে চাচা। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের টাকা ছাড়া ফিস নিচ্ছে না। কিন্তু জামিন তো হচ্ছে না। বলতিছে, এসব মামলায় দ্রুত জামিন হয় না। সময় লাগে। আর দ্রুত জামিন হলিও অনেক টাকাপয়সার মামলা। বারবার জামিন ধরা লাগে। কিন্তু সে চায় না আমাগের এত টাকা নাইমে যাক।’

‘তালি উপায় কী?’ চেয়ারম্যানের কণ্ঠে হতাশা।

‘উপায় আর কি! অপেক্ষা করতি হবে। সামনের মাসে তারিখ আছে। চেষ্টা করতিছে ওই তারিখেই জামিন করার। না হলি পরের তারিখ। আপনি একটু কথা বইলেন তো উকিল কাকার সাথে। পারলে একদিন যাইয়েন আমাগের সাথে।’

মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দেয় আতাহার। চলে যেতে গিয়ে লায়লা বানুকে খোঁজে। পায় না। জানতে চায়, ‘তোর মায়ওে কেবলই দেখলাম, হুট কইরে কই গেলো!’

‘ওই যে’ হাত ইশারায় মাকে দেখায় শশী। রান্নাঘরে বসে পেয়ারা কাটছে। চেয়ারম্যান তার দিকে এগিয়ে যায়। বলে, ‘এসব লাগবে না। কথা শোনো। এদিকে আসো।’

লায়রা বানু কথা শোনো না। ঠিকই পেয়ারা কেটে আনে। বাটিভর্তি কচকচে পেয়ারা এগিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘শশীর আব্বার নিজের হাতে লাগাইন্না গাছের পেয়ারা। খুব মিষ্টি। খান।’

এক টুকরা পেয়ারা মুখে নেয় চেয়ারম্যান। তারপর পকেট থেকে দশ হাজার টাকা বের করে লায়লা বানুর হাতে দিতে দিতে বলে, ‘টাকা-পয়সা নিয়া চিন্তা কইরো না। খালি একটু ধৈর্য ধরো। আমি আছি তোমাগো পাশে। তোমরা খালি হরিচরণের পিছনে লাইগা থাকো।’

কথা শেষ করে আর অপেক্ষা করে না, দ্রুত লয়ে চলে যায় চেয়ারম্যান। বিপদের দিনে দুটো ভালো কথা বলা মানুষকেও দেবদূত মনে হয়। চেয়ারম্যান সেখানে টাকা, বুদ্ধি, পরামর্শ সব দিয়ে বটের ছায়া হয়ে পাশে আছে। মানুষটাকে ফেরেশতা মনে হয়। টাকাটা হাতে পেয়ে নির্ভার লাগে লায়লার। মনে মনে আফসোসও হয়, আরেকটু আগে পেলে নিশ্চয়ই দুল জোড়া বেচতে হতো না!

এই পরিবারের প্রতি আতাহার চেয়ারম্যানের দায় আছে। দায় এই কারণে নয় যে, প্রত্যেক নির্বাচনে শশীর বাবা খাওয়া-ঘুম হারাম করে চেয়ারম্যানের কাজ করে। দায় অন্য কারণে। গেল নির্বাচনের ঘটনা। যোগীপোলে নির্বাচনী প্রচারণা শেষে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। ঘাট পার হয়ে ভ্যানে চেপে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছে চেয়ারম্যান। মোক্তার মিয়াসহ আরও চার-পাঁচজন সঙ্গে। মিতালী ক্লাবের কাছাকাছি আসতেই মুখে গামছা বাঁধা দু’জন লোক পথ আটকে দাঁড়াল। হাতে বিরাট রামদা। এই দৃশ্য দেখে ভ্যান চালক দৌড়ে পালাল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন দৌড়ে এসে কোপ বসিয়ে দিল চেয়ারম্যানের ওপর। মোক্তার লোকটার হাত চেপে ধরল। তারপর সজোরে এক লাত্থি বসিয়ে দিল বুকে। লোকটা গড়িয়ে পড়ে গেল ডোবায়। অন্য হামলাকারী ঘাবড়ে গেল। তাকে ধাওয়া দিয়ে পশ্চিম দিকে নিয়ে গেল চেয়ারম্যানের লোকেরা। এই ফাঁকে নিজেই ভ্যান চালিয়ে চেয়ারম্যানকে নিরাপদে ফরমাইজখানা বাজারে নিয়ে এলো মোক্তার। সেই থেকে এই পরিবারের প্রতি একটা কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি হয়েছে লোকটার।

যদিও ভিন্ন একটা ঘটনাও আছে। মোক্তারের সঙ্গে বিয়ের আগে লায়লা বানুর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল চেয়ারম্যানের ছোট ভাই মোহাতাবের সঙ্গে। ঘটনা এগিয়েও যায় অনেক দূর। কিন্তু ছেলের নানা বদ অভ্যাসের খবরে বিয়েটা আর হয় না। সে অনেক বছর আগের কথা। মানুষের ধারণা, বিয়ে না হোক, ছোট ভাইয়ের পছন্দের মেয়ে হওয়ায় লায়লাকে স্নেহ করে চেয়ারম্যান। লোকমুখে এ কথাও বলতে শোনা যায়, নিজের বড় ছেলে আমজাদের জন্য মনে মনে লায়লার মেয়ে শশীকেই ঠিক করে রেখেছে চেয়ারম্যান। যদিও নিজে কোনোদিন এই কথা মুখ ফুটে বলেনি চেয়ারম্যান।

৭.

ঠিকানাটা সহজ মনে হয়েছিল শশীর।

কিন্তু বাস্তবে খুঁজে পেতে ঘাম ছুটে যাচ্ছে। টুটপাড়া জোড়াকল বাজার খুঁজে পেয়েছে কিন্তু হামিদ সাহেবের বাড়িটা আর খুঁজে পায় না। কারও কাছে জানতে চাইলে পাল্টা প্রশ্ন ছোড়ে, ‘কোন হামিদ সাহেব?’

তার মানে একাধিক হামিদ সাহেব আছে এখানে। ভালো মুশকিলে পড়েছে শশী। কোন হামিদ সাহেব তা তো কাগজে লেখা নেই। তবে বাড়ির নাম্বার আছে। সেই নাম্বার দেখেও কেউ বাড়িটা চিনিয়ে দিতে পারছে না। দুপুরে খেয়েই রওনা দিয়েছে। মাকে বলেছে সন্ধ্যার আগেই ফিরবে। কিন্তু বাসা খুঁজে পেতেই দুপুর গড়িয়ে এখন পড়ন্ত বিকেল।

সকাল থেকে হাবুর জ্বর। মাকে তাই নিয়ে আসতে পারেনি শশী। অবশ্য মায়ের এখানে কোনো কাজও নেই। লোকটার সঙ্গে দেখা করে হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে জামিনের ব্যবস্থাটা পাকা করবে শশী। যদিও টাকাটা জলে যাওয়ার একটা আশঙ্কা আছে। এসব কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এ ছাড়া বিকল্প কোনো পথও নেই। ঝুঁকি ওকে নিতেই হবে।

সন্ধ্যা নামার আগেই বাসাটা খুঁজে পাওয়া দরকার। না হলে লোকটা আবার উকিল কাকার চেম্বারে চলে যাবে। ওখানে বসে এই আলাপ করা যাবে না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা অল্পবয়সী ছেলে ৩৮/২ নাম্বার বাসাটা দেখিয়ে দিল। জোড়াকল বাজারের প্রধান সড়ক থেকে একটা গলি ঢুকে গেছে বাঁয়ে। দারোগা লেন বলে। সেই লেনের শেষ মাথায় আবার ডান পাশে আরেকটা সরু গলি। সেই গলিতে পলেস্তারা খসা একটা হাড় জিরজিরে তিনতলা ভবন। এটাই হামিদ সাহেবের বাড়ি, যেটা গত দেড় ঘণ্টা ধরে খুঁজছে শশী।

নিচতলায় এক মহিলার কাছে জানল, দোতলার একদম ডান পাশের ঘরে থাকে কামাল পাশা। খুব নির্জন একটা বাড়ি। এই যে গেট পেরিয়ে, সিঁড়ি ভেঙে দোতলা অবধি উঠল, ওই একজন মহিলা ছাড়া কাউকে আর দেখল না। কাঠের দরজায় টোকা দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে একগাদা চিন্তা ঘিরে ধরল শশীকে। কোনো বিপদে পড়তে যাচ্ছে না তো?

নিজেকে নিজেই সান্ত্বনা দিল। ভাবল, দিনেদুপুরে কিসের বিপদ? বাসাবাড়িতে কেউ নিশ্চয়ই ওর উপর হামলে পড়বে না। তাছাড়া যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে চলার কৌশল জানা আছে শশীর।

দরজায় বার কয়েক টোকা দিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে কামাল পাশা বেরিয়ে এলো। শশীকে দেখে বেশ চমকে গেল। কিন্তু এই চমকানো ভাবটা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। দ্রুতই নিজেকে সামলে নিল। হাসিমুখে ভেতরে আমন্ত্রণ জানিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিল কামাল।

প্রায় অন্ধকার একটা বাসা। দরজা দিয়ে ঢুকেই সামান্য ফাঁকা জায়গা। তারপর পাশাপাশি দুটো কক্ষ। সেগুলোতে আলাদা আলাদা দরজা। একটা ঘরে শশীকে নিয়ে গেল কামাল। বসতে বলল খাটের উপর। কিন্তু শশীর কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। আড়চোখে সে ঘরটা ভালো করে দেখে নিল। একটা সস্তা খাট, খাটের পাশে একটা নড়বড়ে টেবিল। টেবিলে স্তূপ করে রাখা অসংখ্য বই। আসবাব বলতে আর কিছুই নেই ঘরে। পুরো ঘরটা এতই অন্ধকার যে, দিনের বেলায়ও লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয়। বাসাটাকে মেস মনে হচ্ছে শশীর। নিশ্চিত হতে জানতে চাইল, ‘বাসায় আর কেউ নেই?’

খুব নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিল কামাল, ‘পাশের ঘরে দুটো ছেলে থাকে। বিএল কলেজে পড়ে। ক্লাসে-টøাসে গেছে হয়তো। আমি এই রুমে একাই থাকি।’

নিজের আত্নবিশ্বাসটা হঠাৎ দুলে উঠল শশীর। একটা ভয়ানক শিরশিরে অনুভূতি  চেপে বসেছে কাঁধের ওপর। ক্রমেই তা ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে। ও ভাবতেই পারেনি একটা ব্যাচেলর বাসায় একা একা ঢুকে যাচ্ছে। ভয়টাকে পাশ কাটাতে কাজের কথায় এলো শশী। বলল, ‘শোনেন, পেশকারের সঙ্গে সব ফাইনাল করেন। কাল-পরশুর মধ্যি যেন জামিন হয়। আমাদের হাতে বেশি টাকাপয়সা নেই। তার পরও কিছু আনিছি। কাজ হয়ে গেলি বাকিটা পাবেন। টেনশন কইরেন না। তবে পেশকারকে মোট কত দিতি হবে একটা ধারণা দেন তো!’

‘তোমার কাছে টাকা কে চেয়েছে?’ কামালের কণ্ঠে বিরক্তি।

‘এই দুনিয়ায় টাকা ছাড়া কেউ কাজ করে?’

‘তা হয়তো করে না। তবে টাকায় কিন্তু সব কিছু মেলেও না।’

‘আচ্ছা বুঝলাম। হেঁয়ালি কইরেন না। হেঁয়ালি করার সময় নেই। দ্রুত বলেন। বাড়ি যাতি হবে।’ শশী তাড়া দেয়। তারপর ব্যাগ হাতড়ে ছয় হাজার টাকা বের করে আনে। কামালের হাতে তুলে দিতে যাবে তখন দেখে, ভেতর ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছে কামাল। কাঁধের ওপর চেপে বসা শিরশিরে ভয়টা এক ঝটকায় শশীর গলা পেঁচিয়ে ধরল। কী ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে অসুবিধা হয় না। তবু স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক থাকার চেয়ে বড় শক্তি আর নেই।

‘আপনি উল্টাপাল্টা কিছু চিন্তা কইরে থাকলি বড় ভুল করিছেন। বাড়ির নিচে কিন্তু মায়রে দাঁড় করায় রাখিছি। দেরি দেখলি যে কোনো সময় সে চইলে আসবে। বড় বিপদে পড়বেন কলাম।’

মায়ের কথা শুনে খানিক দমে যায় কামাল। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয় না। নিচু কণ্ঠে বলে, ‘দেরি হবে কে বলেছে? আপসে করলে খুব বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু ঝামেলা করলে সময় লাগবে। আমিও খুব ঝামেলা করব তখন।’

বিছানার নিচ থেকে একটা বড় চাকু বের করল কামাল। একদম নতুন চাকু। নাড়াচাড়া করতেই চকচক করছে। ঘরের ভেতর টানানো আড়াআড়ি দড়িতে ঝুলতে থাকা একটা গামছা টেনে নিল কাছে। বলল, ‘বাপ তো গেছে। এখন খামাখা মাকেও বিপদে ফেলবা শশী?’

ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে শশীর। গুটি গুটি পায়ে দেয়ালের দিকে পিছিয়ে যায়। মাথায় হাজারো চিন্তা ঘুরপাক থাচ্ছে। কিন্তু এই ছদ্মবেশী জানোয়ারের হাত থেকে রক্ষার কোনো পথ বের করতে পারছে না। পিছাতে পিছাতে পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। চমকে ওঠে শশী। এই দৃশ্য দেখে হেসে ওঠে কামাল। বলে, ‘চিৎকার-চেঁচামেচি করলে তোমারই ক্ষতি। মানুষ বলবে ব্যাচেলর বাসায় একা কী করতে এসেছ? আমি বলব প্রেম ছিল। সবাই তোমারেই খারাপ বলবে। শুধু শুধু ঝামেলা করবা কেন? আপসে আসো। বিষয়টা উপভোগ করো। অভিজ্ঞতা অর্জন করো। খেলো। খেলা শেষে খুশি মনে বাড়ি চলে যাও। দেখবা সামনের সপ্তায় তোমার বাপের জামিন হয়ে গেছে।’

দরদর করে ঘামছে শশী। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। এত সতর্ক হয়ে চলে, সহসাই কাউকে বিশ্বাস করে না, অথচ ঠিকই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলো! এই মহাবিপদ থেকে রক্ষার কোনো উপায় দেখছে না।

কামাল এগিয়ে এসে ছোরাটা শশীর গলার কাছে ধরে। টান দিয়ে ওড়নাটা ছুড়ে ফেলে বিছানায়। শশী হুংকার দিয়ে ওঠে, ‘খবরদার, গায়ে হাত দিলি খুন কইরে ফেলব।’ কিন্তু হুংকারে জোর হয় না। কণ্ঠটা কেমন কেঁপে কেঁপে ওঠে।

থুতনিটা উঁচু করে ধরে কামাল। ছোরাটা আরও একটু চাপ দিয়ে ঠেসিয়ে ধরে গলায়। রক্ত চলাচলে বাধা পেয়ে রগগুলো কেমন ফুলে ফুলে ওঠে। শশীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কামাল বলে, ‘শুধু হাত দেবো কেন সোনা? তোকে প্রথমে ন্যাংটা করব। তারপর ঘুরায়-ফিরায় দেখবো কোথায় এত জোর। জোর আজকে কমায় দেবো।’

এক হাতে ধারালো চাকু দিয়ে গলা চেপে ধরে, অন্যহাতে নরম বুক দুটো ময়দার মতো ডলতে শুরু করে কামাল। শশীর হঠাৎ ছোট বেলার কথা মনে পড়ে। কলপাড়ে, বাড়ির উঠোনে, করাতকলের পাশে নির্জন বাগানে সুযোগ পেলে এভাবেই ওর বুক ডলে দিত তালেব। বুঝতে শেখার পর ঘৃণায়, কষ্টে, অপমানে কত রাত যে ঘুমাতে পারেনি শশী, কত রাত যে একা একা কেঁদেছে!

আজও কাঁদছে শশী। ক্রমেই সে কান্নার ঢেউ বাড়ছে। শরীরে কোনো শক্তি নেই। অবশ হয়ে গেছে সব। বুকের উপর হামলে পড়ে কামাল ওকে খুবলে খাচ্ছেÑ মানতে পারছে না। ভয়ে, ঘৃণায়, হয়তো সব হারানোর বেদনায় কান্নারা ঘাই দিয়ে দিয়ে উঠে আসে কণ্ঠনালির কাছে। অবুঝ শিশুর মতো চিৎকার করে কাঁদতে থাকে শশী।

এমন কান্না শুনে যে কারও থমকে থেকে যেতে হয়। কিন্তু এসবে খেয়াল নেই কামালের। ’কাক্সিক্ষত নারীদেহ পেয়ে উন্মাদ হয়ে গেছে সে। মুহূর্তেই পাকা খেলোয়াড়ের মতো শশীর সালোয়ারের গিঁট খুলে ফেলেছে। বুকের উপর থেকে শক্ত হাতটা নামিয়ে এনে ঢুকিয়ে দিয়েছে সালোয়ারের ভেতর। চিৎকার দিয়ে ওঠে শশী। চাকুটা আরও জোরে ঠেসে ধরে কামাল। কান্না মিশ্রিত চিৎকারটা গোঙানির মতো শোনায়।

ঠিক এমন সময় ধুপধাপ শব্দ হয় দরজায়। একবার, দুইবার, বার বার। আতঙ্কিত মানুষের মতো থমকে যায় কামাল। হঠাৎ শরীরে শক্তি ফিরে পায় শশী। এক ধাক্কায় জানোয়ারটাকে দূরে ছিটকে ফেলে দৌড়ে দরজার সিটকিনি খুলে দেয়। মস্ত রড হাতে ভেতরে ঢুকলো বিশ-একুশ বছরের একটা ছেলে। ঢুকেই এলোপাতাড়ি মারতে লাগল কামালকে। সালোয়ারের ফিতা লাগিয়ে দরজার কপাটে নিজেকে আড়াল করতে করতে শশী শুনল, ‘কুত্তার বাচ্চা, তোকে আজ মেরেই ফেলব।’

শশীকে নিয়ে একটা স্কুটারে চেপে আড়ংঘাটার দিকে রওনা দিয়েছে আবিদ।

মাগরিবের আজান পড়েছে কিছুক্ষণ আগে। সন্ধ্যা নামছে চরাচরে। এক কোনায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে শশী। কোনো কথা বলছে না। বারবার শুধু চোখটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। খানিক পর পর ওড়না দিয়ে চোখ মুছে দূরের আকাশ দেখছে। স্কুটারে ওঠার আগে ছেলেটা জানিয়েছে ওর নাম আবিদ। বিএল কলেজে অর্থনীতেতে পড়ে। দ্বিতীয় বর্ষ। কামাল নাকি সুযোগ পেলেই বাসায় মেয়ে নিয়ে আসে। আগেও বহুবার সতর্ক করেছে। আজ যখন কান্নার শব্দ পেল, মাথায় খুন চেপে গেল আবিদের।

শশী একটা কথাও বলেনি আবিদের সঙ্গে। নিজেই বলেছে আবিদ। পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও করেছে। কিন্তু শশীর সাড়া পায়নি। মেয়েটার মনে অবস্থা বুঝতে পেরে আর জোর করেনি। কবরস্থান মোড় থেকে স্কুটারে তুলে দেওয়ার সময় জানতে চেয়েছে, ‘কোথায় যাবেন?’ শশী বলেছে, ‘আড়ংঘাটা’।

আবিদ তখন আঁতকে উঠে বলেছে, ‘এ তো অনেক দূরের পথ। যদি কিছু মনে না করেন, আমি কি এগিয়ে দিতে পারি?’

মুখে কোনো জবাব না দিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়েছে শশী। স্কুটারে আর কাউকে উঠতে দেয়নি আবিদ। রিজার্ভ করেছে। বিরতিহীন একটা শব্দ হয় স্কুটারে। কোনো কথা শোনা যায় না। নিজস্ব গতিতে রয়েলের মোড়, ফেরিঘাট, নিউমার্কেট পার হয়ে স্কুটারটা নতুন রাস্তার দিকে ছুটে চলল। বিএল কলেজ গেট আসতেই আবিদ চিৎকার করে বলল, ‘আমার কলেজ’। ছেলেটার এমন উৎসাহে আগ্রহ দেখাল না শশী। ওর মনের মধ্যে চলছে ভাংচুর খেলা।

আড়ংঘাটা নেমে শশীকে খেয়া নৌকায় তুলে দিল আবিদ। জানতে চাইল, বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দেবে কিনা! শশী মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিয়েছে। ইশারায় বলেছে একাই যেতে পারবে। দেখতে না দেখতেই নৌকাটা মানুষে ভরে গেল। ঘাটের কংক্রিটে বৈঠা ঠেকিয়ে সজোর ধাক্কায় নৌকাটা মাঝ নদী বরাবর এগিয়ে নিল মাঝি। ঘাটের পাশেই একটা ফাঁকা বাঁশের জেটি। জেটিতে একটা সার্চলাইট বসানো। খেয়াঘাটের আশপাশ, মাঝ নদী পর্যন্ত তীব্র আলো। আবিদ জেটিতে দাঁড়িয়ে হেলেদুলে এগিয়ে যাওয়া নৌকাটা দেখল। শশী একবারও ফিরে তাকাল না।

মাঝ নদীতে পৌঁছে শশীর মনে হলো, ছেলেটাকে ভালো করে বিদায় বলা হয়নি। যে মানুষটা এত বড় বিপদ থেকে ওকে উদ্ধার করল, একটাবার তার সঙ্গে ভালো করে কথাও বলল না! এমন এক ঘোরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক-বেঠিকের হিসাব এখন ওলটপালট হয়ে গেছে। তবুও ছেলেটার জন্য মনটা কেমন করে উঠল শশীর। মুহূর্তেই ঘাটের দিকে তাকাল। দেখল, নীলরঙা একটা হাফহাতা শার্ট পরে জেটির উপর দাঁড়িয়ে আছে আবিদ। তীব্র আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। ছেলেটাকে দেখতে ঠিক দেবশিশুর মতো লাগছে।

৮.

শশীর বাবার জামিন হয়েছে।

জেলগেট থেকে মানুষটা যখন বেরিয়ে এলো হাবু গিয়ে দৌড়ে জাপটে ধরল। লায়লা বানুরও ইচ্ছে করছে দৌড়ে গিয়ে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু এত মানুষের ভিড়ে একান্ত ব্যক্তিগত এই ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারল না সে। বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল শুধু।

হাবুকে কোলে নিয়ে মোক্তার মিয়া যখন শশীর কাছে এসে ওর মাথাটা বুকের দিকে টেনে নিল, ওর খুব কান্না পেল। বাবাকে ছাড়া গত পাঁচটা মাস যে কি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গেছে, কী ভয়ানক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে, তা বর্ণনা করার মতো নয়।

উকিল বাবুর কথাই ঠিক। ডাকাতির মামলায় সহসা জামিন হয় না। পরপর চারটা তারিখে ব্যর্থ হবার পর গতকাল জামিন মিলেছে। সেই কাগজ জেলখানায় পৌঁছাতে একদিন লেগে গেল। দীর্ঘদিন পর মেয়েকে পেয়েই বাবার প্রথম প্রশ্ন, ‘পরীক্ষা কেমন হয়েছে মা?’

গত তিন মাসে বাবার সঙ্গে দেখা হয়নি শশীর। এর মধ্যে পরীক্ষা শেষ হয়ে ফল প্রকাশেরও সময় হয়ে গেছে। স্কুলের স্যাররা বলেছেন, আগামীকাল সকালে বোর্ড থেকে ফলাফল আনতে যাবেন তারা। দুপুরের পর নাকি ফল জানা যাবে।

শশী বাবাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে আব্বা। শুনলাম কাল রেজাল্ট দেবে। এমন সময় তুমি ছাড়া পাইলা। আমার কী যে ভালো লাগতিছে।’

গত কয়েকটা মাস নামাজের পাটিতে বসে শুধু আল্লাহকে ডেকেছে শশী। ফরিয়াদ করেছে, পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন যেন বাবা বাড়িতে থাকে। এর আগেই যেন মানুষটার জামিন হয়। আল্লাহ ডাক শুনেছেন।

শশী ক্লাস এইটে যেবার বৃত্তি পেল, দশ কেজি মিষ্টি কিনে বিলি করেছিল মোক্তার। মেয়ের সাফল্যে সে কি আনন্দ তার। এবারও তাই নিজের চোখে বাবার আনন্দ দেখতে চেয়েছিল শশী। আল্লাহ ওর ফরিয়াদ রেখেছে বলে মনে মনে কয়েক রাকাত নফল নামাজের মানত করে ফেলেছে।

কিন্তু মোক্তার মিয়ার অবস্থা বেশ করুণ। ঠিক মতো হাঁটতে পারছে না। শরীরেও বল নেই। গত পাঁচ মাসের ধকলে শালপাংশুল দেহটা শুকিয়ে নুয়ে পড়েছে। নানা রোগও বাসা বেঁধেছে শরীরে। কয়েকটা কথা বললেই কাশি এসে থামিয়ে দেয়। কথা বলতে পারে না। বাবা-মেয়ের অনেক গল্প জমে আছে। কিন্তু শরীরের অবস্থা দেখে কথা বাড়ায় না শশী। বাবাকে নিয়ে রওনা দেয় বাড়ির পথে।

গরুর মাংস রান্না করেছে লায়লা বানু।

রান্না শেষে তাওয়ায় জিরা টেলে গুঁড়ো করেছে। সেই গুঁড়ো মাংসের ওপর ছিটিয়ে দেওয়ায় অদ্ভুত সুন্দর একটা ঘ্রাণ ছড়িয়েছে। চোখ বন্ধ করে এই ঘ্রাণ নিলে যে কারও খিদে কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। গোল করে কাটা আলু দিয়ে গরুর মাংসের ঝোল খুব পছন্দ মোক্তারের। এত দিন পর মানুষটা বাড়ির রান্না খাবে, প্রিয় তরকারি রান্না করতে চেয়েছে লায়লা বানু। চিংড়ি মাছ দিয়ে কচুরমুখী, রুই মাছের ডিম ভাজিসহ আরও কয়েকটা পদ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সময়ের অভাবে পারেনি। এই নিয়ে আফসোসের শেষ নেই লায়লার।

হাবুকে কোলে নিয়ে খেতে বসেছে মোক্তার। গরম ভাত নিয়ে সামনে বসে আছে শশী। লায়লা বানু সবার পাতেই তরকারি তুলে দিচ্ছে। এতগুলো দিন পর পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে। তার খুব আনন্দ হচ্ছে।

খুব আগ্রহ নিয়ে ভাত মাখাচ্ছে মোক্তার। কয়েকটা কাঁচামরিচ নিয়েছে পাতে। কাঁচামরিচে একটা কামড় দিয়ে যেই না প্রথম লোকমা মুখে দিয়েছে অমনি ভয়াবহ কাশি শুরু হলো। এমন কাশি, শুরু হয়ে আর থামতে চায় না। খাওয়া বাদ দিয়ে বাবার মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে শশী। পারে না। এগিয়ে আসে লায়লা বানু। চোখেমুখে আতঙ্ক, ভয়। কলসি থেকে পানি ঢেলে স্বামীর মুখে তুলে দেয়। এবার কিছুটা স্থির হয় মোক্তার। কাশিটাও থেমে যায়।

শশী বুঝল, ওর বাবা মোক্তার মিয়া ঘরে ফিরেছে ঠিকই কিন্তু অদম্য শক্তিতে ভরপুর প্রাণচঞ্চল মানুষটাকে ফিরে পেতে সময় লাগবে। দেরি করা যাবে না। কালই শহরে নিয়ে ভালো ডাক্তার দেখাতে হবে।

সন্ধ্যায় চেয়ারম্যান এলো বাসায়।

কীভাবে কী হলো, কারা মোক্তারকে ফাঁসিয়ে দিল- পুরো ঘটনা জানতে চাইলো আতাহার চেয়ারম্যান। উঠোনে শীতলপাটি পাতা হয়েছে। মোক্তারকে ঘিরে বসেছে সবাই। ঘটনা জানতে কারওই তর সইছে না। মোক্তার ধীরে ধীরে ঘটনা বলতে শুরু করল।

 গাজীরহাটের কাশেমের সঙ্গে মোক্তারের দীর্ঘ দিনের পরিচয়। একবার গাছ ফাড়াতে এসেছিল করাতকলে। আলাপী লোকটার সঙ্গে অল্পতেই খাতির জমে যায়। করাতকলের কাজ শেষে মাঝে মধ্যে ফরমাইজখানায় আড্ডা দিতে যায় মোক্তার। সেখানে কাশেমও আসে। মোক্তারের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়।

 আলাপে আলাপে লোকটা একদিন বলল, তার এক খালাতো ভাই থাকে সৌদি আরবে। খুব টাকা পয়সাওয়ালা লোক। ওদের অভাবের কথা শুনে কিছু স্বর্ণালংকার পাঠিয়েছে। ঢাকা থেকে এক লোক এসে দিয়ে গেছে। কিন্তু অভাবের সংসারে সোনাদানা দিয়ে কী হবে? হাতে নগদ টাকা দরকার। সোনাগুলো কীভাবে বিক্রি করা যায়, বুদ্ধি-পরামর্শ চায়।

আগামাথা না ভেবে কাশেমকে পথের বাজারের পরিচিত এক স্বর্ণকারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল মোক্তার। সেদিনই দশ ভরি সোনা বিক্রি করেছিল লোকটা। ঘটনাটা আরও বছর দুয়েক আগের। এরপর আর এ বিষয়ে কথা হয়নি। পুরো ঘটনার এই হলো সারমর্ম।

মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকেছে মোক্তার- এটাই বলতে চাইল সে। নিজেই কেবল বিপদে পড়েনি, পুরো পরিবারকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চয়তায়। সামাজিক সম্মানও লুণ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এতটুকু ঘটনার জেরেই মোক্তারকে খুনি ভাবছে পুলিশ? গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছে? খটকা কাটে না চেয়ারম্যানের। আরও কোনো ঘটনা আছে যা মোক্তার বলতে চায় না?

 চেয়ারম্যান উঠে দাঁড়ায়। বলে, ‘তোমার কথাগুলোন যদি সত্যি হয়, তবে তদন্তে যেন প্রকৃত ঘটনা উইঠে আসে সে ব্যবস্থা করতি হবে। না হলি কোর্ট থিকা নির্দোষ প্রমাণ হয়ে ফিরতি ফিরতি জিন্দেগি পার হয়ে যাবে।’

অনেক দিন পর সে রাতে খুব ভালো ঘুম হলো শশীর।

এক ঘুমে সকাল। ঘুম ভাঙল মায়ের ডাকাডাকিতে। চোখ কচলে বিছানায় উঠে বসল। ঘোর কাটেনি। ঝাপসা চোখে দেখল, উদ্ভ্রান্তের মতো চিৎকার করছে মা। শরীরের কাপড় মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ‘সাত সকালে এমন চিল্লাপাল্লা শুরু করছ কেন মা? আবার কি হইল?’

লায়লা বানু শোকগ্রস্ত মানুষের গলায় বলতে লাগল, ‘জলদি ওঠ। তোর আব্বারে কোথাও খুঁইজে পাতিছি না।’

‘মানে?’ শশীর ঘোর কেটে গেল। লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামল।

‘ভালো মানুষটা রাইতে আমার পাশে ঘুমাইল। শেষ রাইতে একবার হাতায়া দেখলাম পাশেই আছে। এখন ঘুম থেইকা উইঠা দেখি নাই। উঠানে, কলপাড়ে খুঁইজা আসলাম। নাই। তুই একটু খুঁইজা দেখ মা। কাউরে কিছু না বইলে কই গেল?’

আড়ায় ঝোলানো ওড়নাটা টেনে দৌড়ে ঘরের বাইরে গেল শশী। উঠোন ছাপিয়ে রইচ চাচার ঘরে খুঁজল পেল না। দৌড়ে বড় রাস্তার কাছাকাছি যেতেই দেখল জোর পায়ে আবু তালেব এগিয়ে আসছে এদিকে। শশীর কাছাকাছি আসতেই উচ্চ স্বরে বলল, ‘ওদিকে কই যাস, জানোস কিছু?’

‘কী জানব?’ শশীর কণ্ঠে উৎকণ্ঠা। ‘সকাল থেইকা আব্বারে খুঁইজা পাইতেছি না। তারে দেখছ কোথাও?

‘সেইটা কইতেই তো আইলাম। তোর আব্বারে কারা যেন মাইরা করাতকলের পিছে ফালায়া রাখছে। গলা থেইকা পেট পর্যন্ত চিরা…।’

আরও কী কী যেন বলছে আবু তালেব। শশী কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, কানে তব্দা লেগে গেছে। একটা বিশ্রী শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে শুধু। তালেবের ঠোঁট আর হাত নড়ছে। কিন্তু কোনো শব্দই আর কানে আসছে না। মুহূর্তেই শরীরটা দুলে উঠল শশীর। চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে গেল হঠাৎ।

লাশটা দাফন করা হবে চন্দনীমহলে।

পোস্টমর্টেম শেষে লাশ পেতে পেতে বিকেল হয়ে গেছে। এদিকে দুপুরের পর পর শশীর পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। বীথিকা এসে খবর দিয়েছে, ৩ বিষয়ে লেটার মার্কসসহ ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছে শশী। এমন সময়ে খবরটা পেল, যখন এসব সংবাদের কোনো গুরুত্ব নেই ওর জীবনে। যে মানুষটা সবচেয়ে বেশি খুশি হতো, সে নিজেই আজ সকল অনুভূতির ঊর্ধ্বে।

আছরের নামাজের পর মোক্তার মিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হলো শেখপাড়া স্কুল মাঠে। অনেক মানুষ হলো জানাজায়। নানা বয়সী মানুষ। একটা ময়লা পাঞ্জাবি আর টুপি মাথায় হাবুকেও পাঠিয়ে দিয়েছে শশী। সন্তান হিসেবে বাবার জানাজা পড়ার যে বেদনা, তা বোঝার বয়স হয়নি ছেলেটার। ও বুঝতে পারছে না, খাটিয়ার উপর ঘুমিয়ে থাকা মানুষটা আর কোনোদিন চোখ মেলে তাকাবে না। স্নেহভরা কণ্ঠে বলবে না, বুকে আয় বাপধন।

লায়লা বানু আর শশী স্কুল মাঠের অদূরে একটা গৃহস্থবাড়ির কোনায় দাঁড়িয়ে জানাজা দেখেছে। আতাহার চেয়ারম্যান, তার ছোট ভাই মোতাহার, রইচ উদ্দিন, হাশেম, আবু তালেবসহ পরিচিত বহু মানুষ এসেছে। রাস্তায় যেতে যেতে অনেকে বলছিল, আরও মানুষ হতো যদি না কেউ কেউ মনে করত মোক্তার একজন খুনি-ডাকাত।

কিছু কিছু প্রশ্ন থাকে মৃত্যুও যার সমাধান দিয়ে যেতে পারে না। মোক্তারের এমন মৃত্যু বরং আরও অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেল। ঘরে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটা কীভাবে করাতকলের পেছনে গেল, কারা তাকে এতটা নির্মমভাবে খুন করল- রহস্যই থেকে গেল।

জানাজা শেষে মোক্তার মিয়াকে চন্দনীমহল কবরস্থানে দাফন করা হলো।

ক্লান্ত-বিধ্বস্ত শরীরে মাকে আর ছোট ভাইকে নিয়ে সন্ধ্যার পর পর বাড়িতে ফিরল শশী। মাত্র একটা বিকেলের ব্যবধানে ওর জীবনটা পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। পরিণত করেছে অন্য এক মানুষে। জেলে থাকলেও তবু সান্ত্বনা ছিল, বাবা আছে, কোথাও না কোথাও আছে। কিন্তু জীবন থেকে চিরতরে বাবা হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতিটা ওকে নীল করে দিচ্ছে বেদনার বিষে।

অবুঝ ছোট ভাই আর মাকে নিয়ে কীভাবে সংসারটা চলবে জানে না শশী। জানে না, পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নটা আদৌ পূরণ হবে কিনা! শশী শুধু জানে, সকল ঝড়-ঝাপটায় ওদের কবুতরের বাচ্চার মতো বুকে আগলে রাখা মানুষটা আর নেই। কোথাও নেই!

আবদুল্লাহ আল ইমরান : কথাশিল্পী

 #

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares