অনিবার্য মুক্তিযুদ্ধ

স্বপন নাথ

জাতি হিসেবে বাঙালির মহান স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে মহৎ ও শ্রেষ্ঠ আর কী হতে পারে। অবশ্যই এর সাথে তুলনীয় আর কিছু নেই। এ অর্জনের পেছনে রয়েছে কত বিয়োগান্ত, রক্তক্ষয়ী, যন্ত্রণা, দহন, আখ্যান ও উপাখ্যান এবং অকাতরে জীবন বিসর্জনের ঘটনা; যা পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। এ মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ আর স্বাধীনতা না থাকলে বাঙালির অস্তিত্বই থাকে না। ফলে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মূল্যবোধের বাইরে আমাদের কাছে কোনো বিকল্প নেই। এর মানে হলো জাতি হিসেবে বিকশিত হতে চাইলে এর ভিত্তিতে আমাদের এগোতে হবে। তা শুধু এখন কথার কথা নয়, প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে, স্বপ্নে, বাস্তবে, চিন্তা, ভাষা ও কর্মে মুক্তিযুদ্ধ হলো ভিত্তি। যদি কখনও সভ্যতার গড়ন কাঠামোতে রাষ্ট্র, জাতি, জাতিত্ব ইত্যাদি ধারণা কোনো এক সময় বিলোপ হয়ে যায়, তখনও জাতি-গোত্র, ভাষা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, আবহাওয়া, জলবায়ু প্রভৃতির পরিচয় থেকে নিজেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। আবার কখনও যদি প্রাযুক্তিক উৎকর্ষে এ পৃথিবীতে মানবগোষ্ঠীর গুরুত্ব ক্ষীণ হয়ে যায়, আমাদের ধারণা তা হলেও ওই প্রযুক্তিও ক্ষেত্রবিশেষে স্থানিক বৈশিষ্ট্য হারাবে না। ফলে, বাঙালি জাতির অর্জিত এ গৌরবকে নানাভাবে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও রূপায়ণের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মৌল বৈশিষ্ট্য, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যকে হারানোর কোনো সুযোগ নেই। এর ভিত্তিতেই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে।

এ বিষয়ে আলোচনায় বারবার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি, ইতিহাস, বীরত্বগাথা, আত্মত্যাগ অনিবার্যভাবে এসে যায়। বলতে দ্বিধা নেই যে, পুনরাবৃত্তিও ঘটে। এর মানে এ নয় যে, ইতিহাস ও ঘটনাবলির বিবরণ পুরোপুরি উঠে এসেছে বা রচিত হয়েছে। হয়তো কখনও তা শেষ হবে না। আপতিকভাবে একটি কাঠামোর মধ্যে আলোচনাগুলো নিয়ে আসা যেতে পারে। সে সময়ের সাড়ে সাত কোটি মানুষ, ত্রিশ লাখ শহিদ, দুই লাখ নারীর সম্ভ্রম হারানোর বিবরণ তা হলে কীভাবে হতে পারে। বিভিন্ন পরিধিতে ইতিহাস রচনা হচ্ছে, তথ্য সংগ্রহের কাজ ও ইতিহাসকর্ম চলমান রয়েছে। তার পরও কি সম্ভব সবকিছু ইতিহাসের বিবরণে নিয়ে আসা? প্রায় অসম্ভব। প্রাতিষ্ঠানিক অনেক কিছুই হতে পারে; কিন্তু অনেক ঘটনার সূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না, বা অনুদ্ধারই থেকে যাবে। এর নানাবিধ কারণ বিদ্যমান। ১৯৭১-এ প্রতিটি পরিবার, ব্যক্তিমানুষের মানসিক যন্ত্রণা, কষ্ট, পঙ্গুত্ববরণ, সহায়-সম্বল হারানো, ঘর-বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদÑ এসব ঘটনার তথ্য কী হবে। টুকরো টুকরো তুলে আনা সম্ভব, সবকিছুর লিখিত রূপ দেওয়া যাবে না। যা কিছু পাওয়া যায়, তা থেকেই বুঝে নিতে হবে আমাদের অস্তিত্ব সেখানেই নিহিত। হাজার হাজার শিশুর এতিম হওয়া, কত মানুষের নিজের পরিচয় হারানো, মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাওয়া ইত্যাদির বিবরণ কীভাবে হতে পারে, আদৌ কী হতে পারে। এমন হারানোর প্রতিবেদন লেখা হয়ে ওঠে না। ফলে, ইতিহাসও ধারণ করতে পারে না। এমনও অনেক ঘটনা থাকা স্বাভাবিক যে, অনেক ব্যক্তি বা পরিবার জিম্মি বা বন্দি ছিল, বিপন্ন, অসহায়ত্বে ছিল, বাইরের জগতের সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল না। ওই সকল ব্যক্তি ও পরিবারে প্রথমে নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এরপর একে একে সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। আবার যন্ত্রণাপর্বের কথাগুলো বলার জন্য কেউ বেঁচে নেই। এ ঘটনাবলির কোনো সাক্ষ্য নেই, তাহলে এমন যুদ্ধের ইতিহাস কোথায় কীভাবে পেতে পারি। সুযোগও নেই। এমনও হতে পারে যে, একজন বেঁচেছিলেন শুধু যন্ত্রণা, আতঙ্ক, ভয় বহন করার জন্য। অর্থাৎ স্বজন, আত্মীয় সবাই শহিদ, একজন বেঁচে আছেন। তাঁর কাছে কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। কথা বলতে চান না। জানতে গেলে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। চোখের জলে এখন চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। তা হলে এমন বাস্তবতায় ওই ব্যক্তির মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি কী হতে পারে আমাদের কাছে। তিনি তাঁর ভেতরে কী কী ভেবেছেন আগে ও পরে। এককথায় এমন আত্মত্যাগ পৃথিবীতে বিরল। আমরা কিছু সাধারণ, অসহনীয় বেদনামথিত কথার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে বিবেচনা করি। তাতে কথা শেষ হয় না। ওই মাত্রা শুধুই উপলব্ধি ও অনুভব করতে হয়। সার্বিক একটি দৃষ্টিভঙ্গিতে, এমন বোধ-বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধকে উপলব্ধিতে নিয়ে আসা কর্তব্য বলে মনে করি। মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অবদান আমাদের কাছে সেভাবেই চিত্রিত হয়ে আছে। শুধু যুদ্ধের বিবরণে তা শেষ হয় না। সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের বিবরণে মাটিসম্পৃক্ত মানুষের চেতনাও বুঝে নিতে সহায়ক হয়ে ওঠে। কেবল উপলব্ধির জন্য দু-একটি উদাহরণ উল্লেখ করা হলো :

ক. হঠাৎ করেই যেন পরিচিত মানুষগুলো অযাচিতভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। এমন অবস্থায় কাকে বিশ^াস করব? কার সাথে মনের কথাগুলো শেয়ার করব? একটি দেশের বসবাসকারী মানুষগুলো যখন আদর্শের দিক থেকে বিভক্ত হয়ে পড়েÑ দেশের অস্তিত্বের পক্ষে-বিপক্ষে, তখন কোন মানুষের ভেতরে কী আছে অত সহজে বোঝা যায় না। শামুক যেমন নিজের খোলসের ভেতর আত্মরক্ষার চেষ্টা করে- মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি চেতনায় অনুপ্রাণিত মানুষগুলোর অবস্থা যেন ঠিক তেমনি। প্রথম পাকবাহিনী আসার এক সপ্তাহের মধ্যে হিন্দুদের পরিত্যক্ত বাসাগুলো কোত্থেকে দানবের মতো দলে দলে মানুষ দা, কুড়াল, শাবল দিয়ে ভেঙে খুলে কোথায় নিয়ে গেলÑ জানি না।

[জোবায়দা  খাতুন, ২০১৮ : ১২১]

খ. সময়টা বর্ষাকাল। মাস তারিখ আমার মনে নাই। সেদিন বেলা ১২-১টা হবে। এ সময় তিনজন  খানসেনা আমাদের বাড়িতে আসে। দু’জন খানসেনা আমার আম্মার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে বলতে একজন খানসেনা আমাদের ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ে এবং আমাকে দেখে আমার ওপর রাইফেল ধরে। তখন আমি শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। একটু পর মা, ভাইবোনের সামনেই আমার প্রতি সে অশ্লীল আচরণ করতে লাগল। একপর্যায়ে আমাকে সে জড়িয়ে ধরে চুমো খেতে থাকল।… তারপর ওই খানসেনা সম্পূর্ণ উলঙ্গ হলো এবং সে আমার ওপর প্রায় আধঘণ্টা পাশবিক অত্যাচার চালাল। আমি যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকি,… এভাবেই আমার জীবনে ঘটে গেল এক কলঙ্কময় ঘটনা। আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু আমি নিগৃহীতা। সমাজ আমাকে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখে। কেউ স্থান দেয় না। আমার এই পরিণতির জন্য আমি দায়ী কি?

 [হানুফা খাতুনের সাক্ষাৎকার, রাশেদুর রহমান, ২০১৫ : ২৩৯-২৪০ ]

এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যাঁরা শহিদ হয়েছেন তাঁরা চিরঞ্জীব, মৃতুঞ্জয়ী। তাঁরা কখনও হারায় না; এদেশের অস্তিত্বে যাঁদের উপস্থিতি। স্বাধীন বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র গঠনে যে নাম ও প্রতিষ্ঠান অবিচ্ছিন্ন, তিনি- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অবশ্যই স্মরণ করি ১৯৭১ সালে গঠিত মুজিবনগর সরকার পরিচালনায় যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। সরকারের সঙ্গে যাঁরা কাজ করেছেন। বিভিন্ন সেক্টরে যাঁরা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। ওই সময়ে শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ সংগ্রামে অংশী হয়েছেন। কতভাবে মানুষের যে প্রচেষ্টা, এর বিবরণ লিখে শেষ করা যাবে না।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বঙ্গবন্ধু হঠাৎ করেই ১৯৭১ সালে এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের ডাক দেননি। এ জন্য তাঁর ব্যক্তিজীবন এবং অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচাই প্রমাণ। একই সঙ্গে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতিসত্তা বিনির্মাণে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন বিভিন্ন সময়ে অবদান রেখেছেন। হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতি নিজের বৈশিষ্ট্য নির্মাণ করে। এ ধারাবাহিকতায় জাতিগত চেতনা ও বৈশিষ্ট্য উপলব্ধির চেষ্টা হয়েছে। একদিনে কখনও হয় না। আমরা বঙ্গবন্ধুর কথাই যদি বলি, তাঁর আত্মত্যাগ ও নিজেকে প্রস্তুত করতে যে পথপরিক্রমণ, এর কি কোনো হিসেব করা যায়? যায় না। ইতিহাস ও মহাকালের মহানায়ক তিনি। দুর্জনেরা তাঁর নাম ভোলাতে চেষ্টা করেছে, এখনও তাঁর নাম উচ্চারণ করতে চায় না কেউ কেউ। এ ধরনের ক্রিয়াকর্ম চরম অকৃতজ্ঞতা ও নিজেকেই অস্বীকারের শামিল। দু-দশক বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস আলোচনা হয়েছে। তা কীভাবে হতে পারে? তা হলে এদেশের অস্তিত্ব থাকে কোথায়? কোনোভাবেই থাকে না। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে নিজেকে নির্মাণ করেছেন। গণসংগঠন তৈরি ও সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রসঙ্গত, এদেশে বিভিন্ন সময়ে কৃষক আন্দোলন, সাধারণ মানুষের অনেক আন্দোলন হয়েেেছ। হয়েছে মহান ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনে তৈরি হওয়া দ্রোহ পরিণতি পায় স্বাধীনতার সংগ্রামে। এমনকি পাকিস্তান আন্দোলন হয়েছে সাধারণ একটি মুক্তির লক্ষ্যেইÑ তা হলো শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তি। এ পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই শুরু হলো জাতিগত মুক্তির লড়াই। সে সময় থেকে বঙ্গবন্ধু আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু এদেশের মানুষের ভাষা, চেতনা, বৈশিষ্ট্য নিবিড়ভাবে বোঝাপড়া করেছেন। এ জাতির মুক্তিসংগ্রামে একইসঙ্গে কর্মসূচি ও কর্তব্য নির্ধারণ করেছেন। ফলে, তাঁর নেতৃত্বেই হলো চূড়ান্ত পরিণতিÑ স্বাধীনতা। মোদ্দাকথা হলোÑ এদেশের জাতি-রাষ্ট্রবোধ, বিভিন্ন পর্বের আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং আজকের বাস্তবতায় আগামীদিনের বাংলাদেশ বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধুর অবদান, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, আদর্শ আমাদের জন্য জরুরি। বাঙালি ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা এর সাক্ষ্য বহন করে।

বাঙালির স্বাধীন ভূমি, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি অনেক আগে থেকেই। শুধু চূড়ান্ত সময়ের অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ জন্য তাঁর ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা অবশ্যই স্মরণ করতে হবে। এর আলোকে আমরা কেন বলছি এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির আকাক্সক্ষা এবং মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল? বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের সংগ্রাম ও এর উৎসসূত্র তা আমাদের বুঝিয়ে দেয়। পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু জনগণের মুক্তি সনদÑ ছয় দফা দাবি, জাতির কাছে তুলে ধরে কিছু কথা বলেছেন। যাতে তিনি বাঙালির ওপর ঔপনিবেশিক ক্ষমতা ও নিপীড়নের দীর্ঘ ধারাক্রম উল্লেখ করেন। এ  ছয় দফাই বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে। তিনি বলেছেন :

আমাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি পূর্ব-পাক জনগণের মুক্তি-সনদ একুশ-দফা দাবি, যুক্ত নির্বাচন প্রথার দাবি, ছাত্র-তরুণদের সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষা-লাভের দাবি, বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার দাবি ইত্যাদি সকল প্রকার দাবির মধ্যেই এই শোষকদের দল ও তাহাদের দালালরা ইসলাম ও পাকিস্তান ধ্বংসের ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করিয়াছেন।

 [শেখ মুজিবুর রহমান, ২০১৫/১৯৭১ : ২৩]

এ ছয় দফা প্রকাশের সময় স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর ইচ্ছাশক্তি, স্বপ্ন ও দৃঢ়তা তিনি সাহসের সাথে উচ্চারণ করেন। বঙ্গবন্ধু প্রায় সময়ই বলেছেন, বাঙালির জন্য তিনি জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগে প্রস্তুত ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তিনি শুধু বাঙালি জাতির মুক্তি কামনা করেন। স্পষ্ট করে এখানেও তিনি তাঁর সে চেতনার কথা ও ভাবনা তুলে ধরেছেন। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রত্যয়ী। তিনি বলেছেন : 

অতএব দেখা গেল পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য দাবির কথা বলিতে গেলে দেশদ্রোহিতার বদনাম ও জেল জুলুমের ঝুঁকি লইয়াই সে কাজ করিতে হইবে। অতীতে এমন অনেক জেল জুলুম ভুগিবার তক্দির আমার হইয়াছে। মুরুব্বিদের দোয়ায়, সহকর্মীদের সহৃদয়তায় এবং দেশবাসীর সমর্থনে সে-সব সহ্য করিবার মতো মনের বল আল্লাহ্ আমাকে দান করিয়াছেন। সাড়ে পাঁচ কোটি পূর্ব পাকিস্তানীর ভালোবাসাকে সম্বল করিয়া আমি এই কাজে যে-কোনোও ত্যাগের জন্য প্রস্তুত আছি।

[শেখ মুজিবুর রহমান, ২০১৫/১৯৭১ : ৩৪]

কারণ, তিনি মনের ভেতর যে স্বপ্ন বপন করেছেন, তা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়জ স্বপ্ন। এ স্বপ্ন কোনো কল্পিত ভ্রান্তির ছিল না। উল্লেখযোগ্য যে, তা চিরায়ত বাঙালির জাগরণ ও চেতনার স্বপ্ন। বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের উপকরণগুলো সুপ্তাবস্থায় বহমান ছিল। কখনও কখনও উপনিবেশ, বিদেশি, বিজাতি-বিভাষীদের কারণে চাপা পড়েছে; কিন্তু সামষ্টিক অবচেতন থেকে হারিয়ে যায়নি। সংগ্রামের পলে পলে এ জাতি সচেতন হয়েছে; ফিরেছে নিজের দিকে। প্রতিরোধে, নির্যাতনে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, নিজের সংস্কৃতির প্রতি আরও বিশ^স্ততায় দৃঢ় হয়েছে। সংস্কৃতির উত্তরাধিকারের বোধ শক্তিশালী হওয়ায় মুক্তি আন্দোলনের সমান্তরালে অবশেষে সাংস্কৃতিক ও এদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন একাকার হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে নির্দেশিত হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারে সচেতন হওয়া। এ সংস্কৃতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বিকাশে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা জনগণের মধ্যে পরিপুষ্টি লাভ করে। তা অনিবার্য হয়ে ওঠে বাঙালির জীবনে। বস্তুত, বাঙালি জাতীয়তার উত্তরণে চিরায়ত এ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনুপ্রেরণার উৎস। জাতীয়তার উচ্ছ্বাসে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এদেশের মানুষ। এ কারণেই এ জাতীয়তার উৎসে প্রেরণাসঞ্চারী হলো হাজার বছরের লোকবৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি ও ভাষিক ঐতিহ্য। বলা বাহুল্য যে, এ ধরনের ঐক্যসূত্র অনেক জাতির মধ্যে অনুপস্থিত। আমরা অস্বীকার করি না যে, পাকিস্তানবাদের আক্রমণের আগে মাঝে-মধ্যে এ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংশয়ের মুখোমুখি হয়নি; যা এখনও হচ্ছে। কিন্তু এসব নেতিবাচক আক্রমণ, বাধা সবসময় পরাজিত হয়েছে। ফলে, ভাষা, সাহিত্যে এবং সাধারণ মানুষের নির্জ্ঞান স্তরে সংস্কৃতির বিবেচনাগুলো বহমান রয়েছে। লক্ষণীয়, ওই সাংস্কৃতিক প্রণোদনা কখনও কখনও বাঙালিকে দ্রোহীসত্তায় রূপান্তরিত করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির এ উত্তাপ, দাবি ও স্বপ্ন উপলব্ধি এবং অনুভব করেছেন। বঙ্গবন্ধু অনেক আগেই বুঝে নিয়েছেন মানুষের অন্তরের কথা। তিনি অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন :

পাকিস্তান দুইটা হবে, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে। একটা বাংলা ও আসাম নিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র; আর একটা ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র- পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, সীমান্ত ও সিন্ধু প্রদেশ নিয়ে। অন্যটা হিন্দুস্তান।

[শেখ মুজিবুর রহমান, ২০১৭/২০১২ : ২২]

ইতিহাসের ধাপে ধাপে সংঘটিত হওয়া আন্দোলনের আকাক্সক্ষাকে একবিন্দুতে নিয়ে এসেছেন তিনি। আর কোনো বাঙালি নেতৃত্ব তা করতে পারেননি। এ জন্যই বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের অস্তিত্ব অবিচ্ছিন্ন। তাঁকে বাদ দিয়ে ইতিহাসের কথা উচ্চারণ করা সমূহ শুভ তৎপরতাকে অস্বীকারের শামিল বলে আমরা মনে করি। প্রসঙ্গত, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিরোধ-চেতনা সমৃদ্ধ রাজনীতি দেশের হাজার বছরের সংস্কৃতি চিন্তা ও শক্তিতে আরও গতিশীল ও ব্যাপ্ত হয়েছে। মুজিবের আন্দোলনে সাহায্য জুগিয়েছেন চণ্ডীদাস, লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, সুকান্ত, মুকুন্দদাসসহ অনেকে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর মৃত্যুর ত্রিশ বছর পরে স্বাদেশিকতার গান-কণ্ঠে আবার পুনরাবির্ভূত হয়েছেন বাংলাদেশের পদ্মাতীরে মুক্তিযুদ্ধের চারণ কবিরূপে। শেখ মুজিব তাই আজ বাংলার ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস মুজিবের ইতিহাস।

[রঞ্জন, ২০১৫/১৯৭১ : ২২]

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান বিভাজনে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও এর প্রতিষ্ঠাকালীন বিভিন্ন বিভ্রান্তি থেকে যায়। যা কি না চির-ক্ষয়রোগের জন্ম দেয়। এ থেকেই মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন পর্যায়ে ভ্রান্তির সূত্রগুলো আসন করে নেয়। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবে যা বলা হয়েছিলো,- Independent States; এ ধারণা থেকে সরে গেল সামন্ত-পুঁজির প্রতিনিধিরা। সাধারণ মানুষ মুক্তির আকাক্সক্ষায় এত কূটকৌশল খেয়াল করেনি। তারা মুক্তির আশায় সমবেত হয়েছিল পাকিস্তান আন্দোলনে। তারা ভাবেনি কে ক্ষমতার অধিকারী হচ্ছে বা সেখানে পাকিস্তানবাদের প্রতিনিধিÑ ভূস্বামী, সামন্ত-পুঁজিবাদীদের চালাকি ও কৌশল রয়েছে সুপ্ত। তবে সময় গেলে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা সাধারণ মানুষকে হতাশ ও খানিকটা বিভ্রান্ত করে। বলাবাহুল্য যে, উপনিবেশ সবসময়ই বাঙালি সংস্কৃতিকে অবহেলা ও ঘৃণা করেছে। কখনওই সম্মান দিয়ে গ্রহণ করেনি। যে ভাষা ও সংস্কৃতিতে বাঙালির উজ্জীবন শক্তি নিহিত। ফলে, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও এদের মিত্ররা বিশ্বাসঘাতকতার ধারাবাহিকতায় হিংস্র্রতা প্রকাশ করে ভাষার অধিকার অস্বীকার এবং সাহিত্য ও সঙ্গীত নিষিদ্ধকরণের মাধ্যমে। এমনকি মহান ভাষা আন্দোলনের পরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের ওই স্বভাব ত্যাগ করেননি। পাকিস্তানি শাসকরা একদিকে নিজেকে অস্বীকার এবং অন্যদিকে চরম ঘৃণা ও দম্ভের সাথে বাঙালিত্ব সম্পর্কে অবমাননাসূচক মন্তব্য করেছেন। একই সাথে ভুল-বিভ্রান্তিসূচক তথ্যের ভিত্তিতে তারা নিজেদের শ্রেয় প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। এর প্রমাণ স্বয়ং তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান। তার মন্তব্য পর্যবেক্ষণযোগ্য : 

The people of Pakistan consist of a variety of race, each with its own historical background and culture. East Bengalee, Who constitute the bulk of the population probably belong to the very original Indian races, it would be no exaggeration to say that up to the creation of Pakistan, they had not known any real freedom or sovereingnty, They have been in turn ruled either by the caste Hindus, Moghuls, Pathans or the British. In addition they had been and still are under considerable Hindu culture and, linguistic influence. As such they have all the inhibitions of down-trodden races and have not found it possible to adjust psycho -logically to the requirements of the newborn freedom. Their popular complexes, exclusive- ness, suspicions and a sort of defensive aggressiveness probably emerge from their historical background.

[Ayub Khan, 1968/1967:187]

আইয়ুব খান ও তার অনুসারীদের এসব প্রোপাগান্ডার মূল কারণ ছিল, ক্ষমতার এককেন্দ্রিক মনোভাব। তিনি চালু করেন সামরিক শাসনমিশ্রিত মৌলিক গণতন্ত্র। এর ফলে সে সময় জনবিরোধী আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা বেড়ে যায়। তারা একযোগে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থবিরোধী। বস্তুত, এমন হিংসাত্মক পরিস্থিতি, হীন মানসিকতা ও ঘৃণ্য শাসনযন্ত্র থেকে নিষ্কৃতির জন্য বাঙালিদের স্বশাসনের অধিকার প্রতিষ্ঠা জরুরি হয়ে উঠেছিল। এ থেকে উদ্ধারের জন্য প্রথমেই সংঘটিত হয় ভাষা আন্দোলন। ধাপে ধাপে বাঙালির উত্তরণে এ মুক্তিসংগ্রামের কোনো বিকল্প ছিল না। এ জন্য বলা হয়ে থাকে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে আমরা পৌঁছে যাই ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু এখানেই তো শুরু নয়। ইতিহাসের নিরিখে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম বিবেচনা করতে গেলে আরও পেছনে যেতে হয়। সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাষা থাকা সত্ত্বেও বাঙালি স্বাধীন হতে পারেনি। এসব বিবেচনা করেই বঙ্গবন্ধু বাঙালির ইতিহাসের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যকে ধারণ করেছিলেন।  

আমরা বলতে চাই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুধুই যুদ্ধের ঘটনা নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আক্রমণ করেছে, আর যুদ্ধ হয়েছে। মনে রাখা দরকার এখানে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। পূর্ব পাকিস্তান বলে কোনো নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ছিল না। ফলে, এটা দুই প্যারালাল বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ ছিল না। নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্র বলতে বোঝাত পশ্চিম পাকিস্তান। বাঙালি জনগোষ্ঠী ও ভূখণ্ডকে রাষ্ট্রের খোলসে, তকমায় তারা শোষণ করেছে মাত্র। ফলে, বাধ্য হয়ে এ ভূখণ্ডের মানুষ শোষণের বিরুদ্ধে দ্রোহ ঘোষণা ও তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করে। এমনকি নির্বাচনের মাধ্যমে ওই অধিকার স্বীকৃত হলেও ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে বিদ্রোহ, বিক্ষোভে সমবেত হতে থাকে। ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহ দমনে পশ্চিম পাকিস্তানিরা যা কিছু করা সম্ভব তা-ই এখানে করেছে। ভাষা সংস্কৃতিতে উন্নত, ফসলের ভাণ্ডার, চমৎকার প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এ বাংলাদেশ (সেকালের পূর্ব পাকিস্তান)-কে শোষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রের ন্যূনতম বৈশিষ্ট্য বজায় রাখেনি। সভ্যতার কোনো মাত্রা, বৈশিষ্ট্যকে মানেনি। শুধুই হত্যা ও নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছিল। এমন শৃঙ্খল থেকে বাঁচা ও মুক্তির জন্য এদেশের সাধারণ মানুষ লড়াই করেছে। যেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। লক্ষ একটাই স্বাধীনতা ও মুক্তি। এ দু-টি প্রত্যয়ই গুরুত্বপূর্ণ। এর তাৎপর্য ওই সংগ্রামের মধ্যে নিহিত বলেই বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের উপান্তে স্পষ্ট করেই বলেছিলেন :

রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব- এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

আমরা ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্য পাঠে এটুকু জেনে নিতে সমর্থ হই যে, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হঠাৎ কোনো কিছু নয়। এ ছিল ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি। তবে তা অর্জন করতে হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। তা ছিল জনযুদ্ধ। এ দেশের একটি ক্ষুদ্র অংশ শুধু এ যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে ও ওই সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে গণহত্যায় সহযোগিতা করেছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা পাঠে আমরা জেনে নিই যে,  অপরাজনীতির আকাক্সক্ষা, সাম্প্রদায়িক ও আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি, সম্পদ ও পুঁজি বাড়ানো ইত্যাদি লোভ-লাভে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতারা শোষণমুক্তির স্লোগানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ওই স্লোগানে সাধারণ কৃষকসমাজের সমর্থনও ছিল। কিন্তু তাঁদের সুপ্ত আকাক্সক্ষা হঠাৎ ও দ্রুত প্রকাশ পেয়ে যায়। ফলে, অতিদ্রুত বাঙালির মধ্যে পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক, নেতা, কর্মীরা ওই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে আসে। এমন মিথ্যে প্রলোভনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয় বাঙালি। তা শুধু আবেগ তাড়িত হয়ে নয়। যৌক্তিক কারণও রয়েছে। সে সময় এমন শোষণ-বঞ্চনার উপাত্তসহ গবেষণা জাতির সামনে উপস্থাপন করেন রেহমান সোবহান। তাঁর গবেষণায় স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের আর্থসামজিক এবং পরিষেবা খাতে কী পরিমাণ ব্যবধান এবং পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক অর্থনীতিতে কোন অঞ্চলের মানুষের কীরকম অবদান। এ ছাড়াও কীভাবে শাসকগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে দু-অঞ্চলের মধ্যে উন্নয়ন ও বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যবধান তৈরি করেছে। তিনি দেখিয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যে হারে উৎপাদনে অবদান রেখেছে, উল্টোভাবে ঠিক ওই হারেই তারা বঞ্চিত হয়েছে। লক্ষণীয়, ১৯৫০-৫৫ সময়পর্বে জনখাতে উন্নয়ন কর্মসূচিতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল ৭০০ মিলিয়ন রুপির বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল ২০০০ মিলিয়ন রুপি। কী কারণে বরাদ্দে এমন বৈষম্য রাখা হয়েছিল, তারা তা যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে জাতীয় পুঁজিতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অবদান ৬৮.২ শতাংশ আর প্রাপ্তি হলো মাত্র ২৩.৭ শতাংশ। যেক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের অবদান ৩১.৮ শতাংশ সেক্ষেত্রে তাদের প্রাপ্তি হলো ৭৬.৩ শতাংশ। এভাবে সামরিক ও বেসামরিক খাতে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য, ব্যবধান শাসকগোষ্ঠীর মনোভঙ্গি তুলে ধরেছেন রেহমান সোবহান, তাঁর  From Two Economies to Two Nations : My Journey to Bangladesh (2015) গ্রন্থে। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালির স্বতন্ত্র আইডেনটিটিকে মেনে নিতে পারেনি। উলটো বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা ধ্বংস করতে চেয়েছে। এক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন দাবি থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া বাঙালির কোনো বিকল্প ছিল না :

Why could not the urge for self-rule by the Bengalis be accommodated by the Pakistan state? In the absence of more definitive research the answers must at best remain speculative and thus open to debate. … But it was the 1969-71 election campaign of Sheikh Mujib and the Awami League which took the demand for self-rule down to the villages and made every household in Bangladesh conscious of their sense of deprivation. This deprivation was linked up with the denial of self-rule so that the Bengali masses became the driving force behind Bengali Nationalism and the final custodians of the Six-point demand. … Their decision to destroy the Bengali Nationalist Movement thus meant that they had to destroy the Pakistan state. The Genocide inflicted by the Pakistani army on the People of Bangladesh was the final recognition of the Pakistan state of their failure to accommodate the demands of Bengali nationalism within the framework of one Pakistan.

[R. Sobhan, 2015: 262-263]

প্রথমত এরকম অদ্ভুত একটি রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি এবং এটাকে মেনে নেওয়া, কেন জরুরি ছিলÑ এমন প্রশ্ন হতেই পারে। কেন যেন তৎকালীন নেতৃত্ব উদ্ভট কাঠামোকে মেনে নিলেন, এ প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। এমন রাষ্ট্রকাঠামোতে রাষ্ট্রের জন্ম ও অব্যবহিত পরে শুধু সাম্প্রদায়িকতার জন্য কত মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। জানি এর ক্ষত শুকাবে না কোনোদিন। এখনও এ নিয়ে রাজনীতি হয়, সিদ্ধান্তে পিছিয়ে যেতে হয়। তৎকালীন বাঙালি নেতৃত্বের ব্যর্থতাকে কোনো যুক্তি দিয়ে অস্বীকার করা যাবে না। অবশ্য সাধারণ বাঙালি তা আঁচ করতে পেরেছিল বলেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুই অংশের মধ্যে কোনো মিল হয়নি। বস্তুত, এ দুই অংশের মধ্যে সংহত কাঠামো গঠিত হয়নি। এর পরিণামে যা হওয়ার তা-ই হলো। কিন্তু ১৯৭১-এ অনেক মূল্য দিতে হলো বাঙালিকে। নিম্নবর্গীয়  প্রসঙ্গ এলেই আমরা তুলে আনি আন্তোনিও গ্রামসির কথা। গ্রামসির মতোই বলেছেন অনেক কিছু লোকবাংলার বুদ্ধিজীবী যতীন সরকার। পাকিস্তান রাষ্ট্র, এর বৈশিষ্ট্য, চারিত্র্য, উৎস ও ব্যর্থ হওয়া বোঝা যায় তাঁর তত্ত্বে। দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তর, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সবই দেখেছেন গভীরভাবে এবং একধরনের নাগরিক রুচি ও মননের বাইরে থেকে। তিনি লক্ষ ও উপলব্ধি করেছেন সাধারণ মানুষের ভাবনা, তাদের ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা এবং শক্তির মাত্রা। তিনি রচনা করেছেন ওই নিম্নবর্গীয় মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস। যা বিবৃত হয়ে আছে তাঁর পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন গ্রন্থে। বাস্তবতা বিবর্জিত নাগরিক প্রলেপমাখানো ইতিহাসের রঙ্গরসিকতা এড়িয়ে ওই ইতিহাসেই সাধারণের সারার্থটুকু ধরা যায়। তাঁর তত্ত্বে ও তথ্যে সাধারণ লোকবাংলার মানুষেরা পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং স্বাধীনতার জন্য কীভাবে ভেবেছে, এর একটি সারবত্তা উপলব্ধি সম্ভব। যতীন সরকার বলেই দিয়েছেন,-‘সাতচল্লিশের আগস্টের অনেক আগেই পাকিস্তানের জন্ম হয়েই গিয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়েছিল।’ আবার মানুষের অভিব্যক্তি লক্ষ করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, পাকিস্তানের জন্মদাতারাই পাকিস্তানের মৃত্যুবীজ বপন করেছিল। যে সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির নিয়তে যে রাষ্ট্রের উদ্ভব, ওই সাম্প্রদায়িক-সংস্কৃতির মানস গঠনের প্রেক্ষিত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করতে সমর্থ ছিলেন চারণ বুদ্ধিজীবীরা। তাঁরা লক্ষ করেছেন,- ‘মুক্তিযুদ্ধই একথা স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে এখন আর হিন্দু আর মুসলমান নয়, বাঙালি হয়ে আমাদের বাঁচতে হবে।’ যতীন সরকারকৃত পর্যবেক্ষণের স্বল্পাংশ এখানে উল্লেখ করা যায় :

ক. উনিশ শতকে যে মধ্যবিত্ত সমাজটি আধুনিক শিক্ষা-সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসেছিল সেটি ছিল মূলত হিন্দু সমাজ। স্কুল কলেজ সভা সমিতি- এরকম যা কিছু তখন গড়ে উঠেছিল তারও সবই ছিল, তাই হিন্দু। সে শতকের শেষ দিক থেকেই যখন একটু   একটু করে  মুসলমান  মধ্যবিত্তের উদ্ভব ঘটতে লাগলো এবং সে মধ্যবিত্তরা যখন আধুনিক শিক্ষার এলাকায় প্রবেশ করতে শুরু করলো, তখন সে আধুনিকতার ভেতর তারা প্রবলভাবে হিন্দু ও হিন্দুত্বের উপস্থিতি দেখতে পেলো। এই হিন্দু ও হিন্দুত্বের ধাক্কায় তারা তাদের আধুনিকতাকেও মুসলমান বানিয়ে নিলো, মুসলমানত্বের দুর্গ তৈরি তাতেই স্বচ্ছন্দ আশ্রয় খুঁজলো। অর্থাৎ, ইংরেজ আমলে এ দেশে যে ‘আধুনিকতা’টি এসেছিল, এখানকার জল হাওয়ার ছোঁয়া লেগে সেটি আর খাঁটি আধুনিক হয়ে থাকতে পারলো না, হয়ে গেলো-‘হিন্দু আধুনিকতা’ ও ‘মুসলিম আধুনিকতা’। আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত মুসলমানের মনেই মুসলিম স্বাতন্ত্র্যের বোধটি দানা বেঁধে উঠতে লাগলো। সেই বোধেরই এক ধরনের প্রকাশ দেখা গেলো মুসলমানদের আঞ্জুমানগুলোর মধ্যে। পাকিস্তান সম্পর্কীয় রাষ্ট্রিক ধারণাটি জন্ম নেয়ার অনেক আগেই একেকটি আঞ্জুমান হয়ে উঠলো একেকটি সামাজিক পাকিস্তান।

 [যতীন সরকার, ২০০৭/২০০৫ : ১০৫]

মূলত, বাঙালির সংস্কৃতিতে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতি ও বাস্তবতায় অনুপ্রবেশ ঘটে। ফলে, বাঙালির ভাব-ভাবনা-চিন্তা আপাত কলুষিত হলেও আবার ফিরে আসে মৌল অস্তিত্বে, চিরায়ত ঐতিহ্যে। বস্তুত, কলুষ থেকে উত্তরণে, সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ধারণার নিগড় থেকে মুক্ত হতে মুক্তিসংগ্রামের বিকল্প কোনো পথ খোলা ছিল না। বাঙালির যত কৃষক আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধে এ-অসাম্প্রদায়িক চেতনারই প্রতিফলন লক্ষণীয়। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের পর্বে যতীন সরকার সেই গ্রামে তরুণ-কিশোর-যুবকসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে একই লক্ষের জাগরণ অনুভব ও দৃশ্যমান দেখেছেন। একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ দ্রষ্টব্য :

 খ. সে আকাঙক্ষার প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিলো, এমন কি, পাগলদের কথায় ও আচরণেও। তিন-চার বছর ধরেই একটি পাগলকে দেখেছি ছেঁড়া চট পরে শহরের গাঙিনার পার, মদনবাবু রোড ও নতুন বাজারের রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। কখনো তা হাতে থাকে খবরের কাগজের ছেঁড়া পাতা, কখনো কোনো মানুষের ছবি। এগুলো হাতে নিয়ে কী আবোল তাবোল বকতে থাকে তার মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা যায় না। কিংবা বলা উচিত, তার কথা আমরা কোনোদিন বুঝতে চেষ্টা করিনি, মনোযোগ দিয়ে শুনিওনি। পাগলের কথা তো নয়- প্রলাপ। সে প্রলাপে কে কবে মনোযোগ দেয়? কিন্তু একাত্তরের মার্চে সেই পাগলটিও আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিলো। কোথা থেকে সে জোগাড় করে নিয়ে এসেছে পাকিস্তানের জাতির পিতার একটি ছবি, সে ছবির গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে একটি ছেঁড়া সেন্ডেল, একখণ্ড বাঁশের আগায় ছবিটা ঝুলিয়ে নিয়ে সারা শহর জুড়ে হাঁটছে আর অদ্ভুত কণ্ঠস্বরে বলে যাচ্ছে- ‘জিন্নাহ সাবের পাকিস্তান, আজিমপুরের গোরস্থান।’… পাগলরাই সত্য কথা বলে, অথবা অজস্র মিথ্যার ভিড়ে যারা সত্য কথা বলে তারাই পাগল।

[প্রাগুক্ত : ৩৫৩]

ফলত, সবার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ছিল এক ও অভিন্ন। ১৯৭১ সালের মহান বিজয় ও স্বাধীনতার সুফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। সে সময় পাকিস্তানের ঔপনিবেশ শাসন থেকে মুক্তি, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত, সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল সকলের। এ লক্ষ্য পূরণের ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা-উত্তর বর্তমান বাংলাদেশের অর্জন সবই দৃশ্যমান। স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও সুষম সমাজ নির্মাণ, সব মিলিয়ে ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

 লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares