মুক্তিযুদ্ধের কবিতা নিয়ে কিছুকথা

অনুপম হাসান

বাংলাদেশের সাহিত্যের একটা বড় অংশজুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ, এ কথা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের গল্প কবিতা উপন্যাস নাটক- অর্থাৎ সাহিত্যের সব শাখায়ই সমানভাবে বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ স্থান করে নিয়েছে নানাভাবে, নানামাত্রায়। আমাদের এই আলোচনা নির্বাচিত কয়েকটি কবিতা নিয়ে। কবিতাগুলো হচ্ছে :

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা              শামসুর রাহমান

এখন সকল শব্দই   হাসান হাফিজুর রহমান

আর কত রক্তের দরকার হবে             সৈয়দ শামসুল হক

একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মসমর্পণ       রফিক আজাদ

আগ্নেয়াস্ত্র                নির্মলেন্দু গুণ

নচিকেতা               আবুল হাসান

বাঙালির জন্মতিথি              মুহম্মদ নূরুল হুদা

বাতাসে লাশের গন্ধ              রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

বাংলাদেশের কবিতার বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠে এসেছে প্রায় সকল প্রধান কবির কবিতায়। মূল ধারার প্রধান কবির এক বা একাধিক কবিতা কিংবা কাব্যগ্রন্থও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত কবিতা রচিত হয়েছে যে, তা নিয়ে বিশদ গবেষণার সুযোগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত কবি ও কবিতার কালানুক্রমিক ধারাক্রম হচ্ছে নিম্নরূপ :

জসীম উদ্দীন         দগ্ধগ্রাম। গীতারা চলিয়া যাবে। গীতারা কোথায় যাবে? গীতারা কোথায় গেল।

সুফিয়া কামাল      আজকের বাংলাদেশ। উদাত্ত বাংলা। একত্রিশে চৈত্রÑ১৩৭৭

আবুল হোসেন        পুত্রদের প্রতি। ভালোই করেছ। কয়েকজন বিদেশী সংবাদদাতার উদ্দেশে। দেব, সব দেব।

আহসান হাবীব      মুক্তিযোদ্ধারা দেখতে কেমন। স্বাধীনতা। সার্চ। আমার সন্তান।

সিকান্দার আবু জাফর         বাংলা ছাড়ো। তখন রাত্রিশেষ।

শামসুর রাহমান    স্বাধীনতা তুমি। আসাদের শার্ট। তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা। গেরিলা। এখানে দরজা ছিল। সম্পত্তি। পথের কুকুর। তুমি বলেছিলে। কাক।

আল মাহমুদ           বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎকার।

হাসান হাফিজুর রহমান       যখন উদ্যত সঙ্গীন। এখন সকল শব্দই। স্মৃতি।

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ       আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি। কমলের চোখ। মানুষের স্বাধীনতা। আরো কত রক্ত দিতে হবে।

সৈয়দ শামসুল হক গেরিলা। আর কত রক্তের দরকার হবে। বস্তুর আকার। জগন্নাথ হল। শূন্য পটভূমিতে শূন্যতার স্থিরচিত্র। বেজান শহরের জন্যে কোরাস। এই ঘণ্টাধ্বনি।

শহীদ কাদরী          নিষিদ্ধ জার্নাল থেকে। ব্লাকআউটের পূর্ণিমায়।

বেলাল চৌধুরী      স্বদেশভূমি। মর্মে মর্মে স্বাধীনতা। অনিঃশেষ। মুক্তির মাস, বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। আবহমান বাংলা ও বাঙালির। একদিন চিরদিন জয়বাংলা।

আসাদ চৌধুরী      রিপোর্ট ১৯৭১। অজ্ঞাত শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কথা। তাঁর কণ্ঠস্বর থেকে। শহীদের প্রতি। বারবারা বিডলার-কে। তখন সত্যি মানুষ ছিলাম।

মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান       শহীদ স্মরণে। জার্নাল ১৯৭১। সহজে নয়। ঘৃণা-ক্রোধের বারুদ।

জুলফিকার মতিন অন্যরকম প্রেমিক। শোকের নকশী মাঠ। দ-িত। মুক্তিযুদ্ধের কবিতা।

রফিক আজাদ       একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মসমর্পণ। সৌন্দর্য-সৈনিকের শপথ প্যারেড। নেবে স্বাধীনতা।

মোহাম্মদ রফিক   রূপকাহিনী। রোকসানা ও রোকসান। আরজ আলীর জন্যে দ্বিতীয় গাথা।

সিকদার আমিনুল হক          নেকড়ের মুখে। প্রাণী ও মানুষ। তোমার অপেক্ষায় ছিল সবাই। কোনো এক দগ্ধ দিনে। আশায় বাঁচি আশায়।

মহাদেব সাহা         ফারুকের মুখ। একজন মুক্তিযোদ্ধার ডায়রিতে। বদলবাড়ি চেনা যায় না। ফিরে আসা গ্রাম। তোমার জন্য।

রুবী রহমান          পঁচাত্তরে বাংলাদেশ। একাত্তরে একজন। স্মৃতি জাগানিয়া পদ্য

নির্মলেন্দু গুণ         স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো। হুলিয়া। আগ্নেয়াস্ত্র।

আবুল হাসান         উচ্চারণগুলি শোকের। নচিকেতা। সেখানে নিশ্চুপ। নিজের স্বদেশে।

হেলাল হাফিজ        নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়। অস্ত্র সমর্পণ। অগ্ন্যুৎসব।

দাউদ হায়দার       বাংলাদেশ, তোমার মুখ।

রবিউল হুসাইন     যুবকেরা। দেশ ও দশের দেশজ ওষুধ। লাশ ও লিঙ্গ। এক সেকেন্ডে মাত্র চার ফুট। হাঁ-এর ভিতর ড্রাগন ঘুমায়। ঝরে পড়ে। প্রিয়তম বাংলাদেশ।

হুমায়ুন কবির       বাংলার কারবালা। লাল বলের মতো গ্রেনেড। আমার ভাই।

সায্যাদ কাদির      শত্রু-মিত্র। রাত দশটায়।

মুহম্মদ নূরুল হুদা আমরা তামাটে জাতি। বাঙালির জন্মতিথি। বিজয়। সূর্যোদয়। মানবপদ্ম। দুধখোকা। বাবা ফিরে এসে। একবার পরাজিত হলে।

মাকিদ হায়দার     জন্মভূমি। প্রিয় রোকোনালী। মুক্তিযোদ্ধার আক্ষেপ। মাছি।

সানাউল হক খান সাতই মার্চ একাত্তর। খোকন খোকন করে মায়। সাবিত্রী।

অসীম সাহা            পৃথিবীর সবচেয়ে মর্মঘাতী রক্তপাত। ন্যায়যুদ্ধ।

খোন্দকার আশরাফ হোসেন                বাউসী ব্রিজ ’৭১।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী                প্রিয় স্বাধীনতা। যুদ্ধ। প্রার্থিত শীতের অরণ্য।

আবিদ আজাদ       এখন যে কবিতাটি লিখব আমি। গ্রেনেড।

শিহাব সরকার      তিন কবরে। জ্যোতির্মং তর্জনী। নজরুলকে মনে পড়ে। তোমার রক্তের ঋণ। টুকরো টুকরো জ্বলন্ত অঙ্গার।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ           বাতাসে লাশের গন্ধ। হাড়েরও ঘরখানি।

ত্রিদিব দস্তিদার      যুদ্ধ ক্ষেত্রে একটি কবিতা। তুমি পিতৃ-বীজ। বোবা মেয়েটিকে।

ফারুক মাহমুদ      রাহেলা ফুফু।

আবিদ আনোয়ার  আমার মায়ের নামে তোপধ্বনি চাই। প্রতিরোধ। দ্রব্যগুণ।

কামাল চৌধুরী      সেই মুখখানি কবিতার বড় ছিল। ক্রাচের যুবক। সাহসী জননী বাংলা।

নাসির আহমেদ     বুকের ভেতরে বাজে। বিজয়ের বোন কড়া নেড়ে যায়। ফ্ল্যাশব্যাক : ১৯৭১। আরো এক একাত্তর ডাকে।

মিনার মনসুর       কী জবাব দেব। প্রিয় বাংলাদেশ। প্রিয় স্বাধীনতা।

তানভীর মোকাম্মেল            কংসের দেশে শিশু এক। বাংলা নামের মেয়ে।

সোহরাব পাশা       তবে কেন এত আয়োজন। একাত্তর। সেইসব রাত।

গোলাম কিবরিয়া পিনু         মুক্তি। সোনামুখ স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা।

মোহন রায়হান      তোমার জন্যে মাগো। সবুজ চাদরে ঢাকা রক্তাক্ত ছুরি।

রেজাউদ্দিন স্টালিন             এক মুক্তিযোদ্ধার মহত্তম ক্ষমা।

সুহিতা সুলতানা    মাছ ও শকুন রহস্য।

আমিনুর রহমান সুলতান    লোনার পতাকা। রজত জোছনার গোলাপ।

[দ্রষ্টব্য : মুক্তিযুদ্ধনির্ভর রচিত কবিতার এটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা নয়; এখানে আমাদের নির্বাচিত কবিতাগুলোর আলোচনার সুবিধার্থে সংক্ষিপ্ত একটি তালিকা প্রদান করা হয়েছে মাত্র।]

মুক্তিযুদ্ধনির্ভর রচিত কবিতায় প্রধানত বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা, মানবিক আবেগ, স্বদেশপ্রেম, সাম্যচেতনা, ব্যক্তির ক্ষোভ ও মুক্তির তথা স্বাধীনতার তীব্রতর আকাক্সক্ষা। কোনো কবিতায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, আন্দোলনমুখর ঘটনাবলির চূড়ান্ত পরিণতি, আন্দোলনের বিশ্বস্ত বর্ণনা প্রভৃতি উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কবিতায়। শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’ কবিতায় উচ্চারিত পঙ্ক্তি : ‘লাশ আমরা রাখবো কোথায়’Ñ ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের কাব্যিক দলিল। সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী বাঙালিকে যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে দেয়া হলো না, তার অনিবার্য পরিণাম হিসেবে একাত্তর সালে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে এগিয়ে গেল দেশ-জাতি। বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা শামসুর রাহমান ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কিংবা ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় অসামান্য দক্ষতায় তুলে ধরলেন। তাঁর কণ্ঠে সমগ্র জাতির মুক্তির আকাক্সক্ষা উচ্চরিত হলো :

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা

তোমাকে পাওয়ার জন্যে

আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?

আর কতবার দেখতে হবে খা-ব দাহন?

স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতির রক্তঝরা ইতিহাস আর তা পাওয়ার দুর্দমনীয় প্রতিধ্বনি এ কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে।

সিকান্দার আবু জাফর পাকহানাদার বাহিনীকে হুংকার দিয়েছেন :

তুমি আমার আকাশ থেকে

সরাও তোমার ছায়া

তুমি বাংলা ছাড়ো।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে বাঙালি জাতির হৃদয়ে জাতীয়তাবাদী যে চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, একাত্তরে সেই চেতনা এবং আকাক্সক্ষা চূড়ান্ত এক পরিণামে উপনীত হয়েছিল। ভাষার দাবিকে কেন্দ্র করেই বাঙালি জাতি প্রথম মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখে। একুশকে উপলক্ষ করেই মাহবুবুল আলম চৌধুরী লিখলেন : ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি।’ অন্যদিকে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ভাষাশহীদদের উদ্দেশে রচনা করলেন অবিস্মরণীয় গান : ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। আলাউদ্দিন আল আজাদ ‘স্মৃতির মিনার’ কবিতায় বাঙালিকে শোনালেন অভয়ের বাণী। একুশের এই চেতনা বাঙালির বুকে জ্বেলে দিয়েছিল জাতীয়তাবাদী চেতনার বহ্নিশিখা; পরিণামে যা স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় রূপান্তরিত হয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে জাতিকে জুগিয়েছিলÑ আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার অমিত সাহস। ‘মুক্তিযোদ্ধারা দেখতে কেমন’ শীর্ষক আহসান হাবীবের কবিতায় একজন মুক্তিযোদ্ধা সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের ঔৎসুক্যের আড়ালে প্রকাশ করেছেন সহমর্মিতা ও মাহাত্ম্য।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসব্যাপী সমগ্র বাংলাদেশ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল; বাংলা যেন তখন হিটলারের ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’। গ্রামের পর গ্রাম আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে হানাদার বাহিনী। রাইফেলের মুখে ছিল প্রত্যেক বাঙালির প্রাণ। নিঃশ্বাস বন্ধ করা দুঃসহ এই বাস্তবতার মধ্যে বসেই শামসুর রাহমান লিখলেন :

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত

ঘোষণার ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলে

নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগি¦দিক,

এই বাংলায়

তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।

শামসুর রাহমান যখন স্বাধীনতার ব্যাপারে সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা ঘোষণা করেন, তখন অন্য কবির লেখায়Ñ স্বাধীনতার জন্য জাতিকে যে নির্মমতার শিকার হতে হয়েছিল সে কথা উঠে আসে; হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের মর্মান্তিক করুণ-গাথা উঠে এসেছে শহীদ কাদরীর কবিতায়। মুক্তিযুদ্ধে এক কিশোর নিহত হওয়ার বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন :

ধ্বংসস্তূপের পাশে, ভোরের আলোয়

একটা বিকলাঙ্গ ভায়োলিনের মতো দেখলাম তে-রাস্তার মোড়ে

সমস্ত বাংলাদেশ পড়ে আছে আর সেই কিশোর, যে তাকে

ইচ্ছের ছড় দিয়ে নিজের মতো করে বাজাবে বলে বেড়ে উঠেছিল

সেও শুয়ে আছে পাশে, রক্তাপ্লুত শার্ট পরে।

পঁচিশে মার্চের পর অপারেশন সার্চলাইট নাম দিয়ে পাকবাহিনী নিরীহ-নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির ওপর আক্রমণ শুরু করলে সমগ্র দেশ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

সৈয়দ শামসুল হক অবরুদ্ধ বাংলার চিত্র তুলে আনতে গিয়ে লিখলেন : ‘আমি যেখানে যাই এ শহরের অবেলায় ক্রমাগত বেলা পড়ে যায়।’  সৈয়দ হক বাঙালির স্বাধীনতা কীভাবে আসবে, কারা যুদ্ধ করবে, তাদের যুদ্ধের কৌশল কীÑ এসব কথা ‘গেরিলা’ কবিতায় প্রকাশ করলেন। সাহসী গেরিলাবাহিনী সামান্য অস্ত্র নিয়েই দেশকে মাতৃজ্ঞানে তার সম্ভ্রম রক্ষার জন্য মনপ্রাণ সমর্পণ করেছিল যুদ্ধেÑ তাদের প্রতিজ্ঞা ছিল, দেহে একবিন্দু রক্ত থাকতেও দেশমাতাকে শত্রুর হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতেই হবে। সৈয়দ শামসুল হকের কণ্ঠে তাই মুক্তিসংগ্রামী যোদ্ধার প্রশ্ন :

মা,

তুই এবার নিজেই তবে বলে দে,

এই একটি শব্দ,

উচ্চারিত এই একটি শব্দ লিখতে কতখানি রক্তের দরকার হয়?

আমার এ দেহের আর কতটুকু রক্তের দরকার হবে?

যখন এ শব্দ আর এই বড় রক্তাক্ত স্বদেশে

কেউ মুছে ফেলতে পারবে না।

হাসান হাফিজুর রহমান ‘গেরিলা’ শীর্ষক কবিতায় মুক্তিযোদ্ধার কথা লিখেছেন। এ কবিতায় তিনি লিখেছেন : ‘সবুজ মানুষেরা আচম্বিতে আজ প্রত্যেকেই গেরিলা।’ পঁচিশে মার্চ রাতের অন্ধকারে আক্রমণ করে পাকবাহিনীই নিরস্ত্র বাঙালিকে ঠেলে দিয়েছিলÑ সশস্ত্র সংগ্রামের পথে; সংগ্রামে প্রত্যেকেই হয়ে উঠেছে একজন গেরিলা যোদ্ধা; যারা মরণপণ প্রতিজ্ঞা করেছিল স্বাধীনতার নিমিত্তে। ‘তোমার আপন পতাকা’ কবিতায় হাসান হাফিজুর রহমান এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন পতাকার দুঃখ-নিবারণী অমিত শক্তির কথা ব্যক্ত করেছেন :

হাজার বছরের বেদনা থেকে জন্ম নিল

রক্তিম সূর্যের অধিকারী যে শ্যামকান্ত ফুল

নিঃশঙ্ক হাওয়ায় আজ ওড়ে, দুঃখ ভোলানিয়া গান গায়।

মোছাব তোমার মুখ সেই পতাকায়।

হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতায় স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা তীব্রতম আবেগমথিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। পঁচিশে মার্চের কালরাতের পর প্রতিটি ক্ষণ যেন কবি মুক্তির প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করেছেন। হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাকা-ের আর্তধ্বনি শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়েছেন কবি। আর তাই সাধারণ মানুষ হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন :

আমার নিশ্বাসের নাম স্বাধীনতা

আমার বিশ্বাসের নখর এখন ক্রোধের দারুণ রঙে রাঙানো

দুঃস্বপ্নের কোলবন্দী আমার ভালবাসা

এখন কেবলই

এ অহরহ চিৎকার হত্যা কর, হত্যা কর, হত্যা কর।

মুক্তিযুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার কথা এসব কবিতায় স্পষ্টভাষায় প্রকাশ পেয়েছে।  প্রসঙ্গত বলা দরকার, আমাদের নির্বাচিত মুক্তিযুদ্ধের কবিতাগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা; প্রায় সবগুলো কবিতাই মুক্তিযুদ্ধকালীন রণাঙ্গনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত ‘উচ্চারণগুলি শোকের’ আবুল হাসানের বিশিষ্ট কবিতা। এ কবিতায় তিনি স্বাধীনতা অর্জনের বন্ধুর পথে কত যে নির্মম অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেকথা তুলে ধরেছেন :

হাঁটি হাঁটি শিশুটিকে আমি আর আজ

কোথাও দেখি না

নরম নোলক পরা বৌটিকে আমি আর আজ

কোথাও দেখি না

কেবল পতাকা দেখি,

স্বাধীনতা দেখি!

তবে কি আমার ভাই আজ ওই স্বাধীন পতাকা?

তবে কি আমার বোন তিমিরের বেদীতে উৎসব?’

স্বাধীনতার জন্য জাতিকে কতটা মূল্য দিতে হয়েছেÑ আবুল হাসানের কবিতার ভাষ্যে তা প্রতিফলিত হয়েছে। অসংখ্য শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব প্রাণ অকালে ঝরে গেছে, তাঁদের অমরত্ব প্রসঙ্গে আবুল হাসান ‘নচিকেতা’ কবিতায় অসামান্য দৃঢ়তায় জানিয়েছেন :

এ বাংলায় বারবার হাঁসের নরম পায়ে খঞ্জনার লোহার ক্ষরায়

বন্যার খুরের ধারে কেটে ফেলা মৃত্তিকার মলিন কাগজ

মাঝে মাঝে গলিত শুয়োর গন্ধ, ইঁদুরের বালখিল্য ভাড়াটে উৎপাত

অসুস্থতা, অসুস্থতা আর ক্ষত সারা দেশ জুড়ে হাহাকার

ধান বুনলে ধান হয় না, বীজ থেকে পুনরায় পল্লবিত হয় না পারুল

তবুও রয়েছি আজো আমি আছি,

শেষ অঙ্কে প্রবাহিত শোন তবে আমার বিনাশ নেই

মুক্তিযুদ্ধে অকালে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছে তাঁদের সেই ত্যাগ বৃথা যাবে নাÑ বাঙালি জাতি, তা হতে দেবে না। শহীদের আত্মাগুলো বাংলাকে ভালোবেসে যে এ জল-হাওয়ায় চিরদিন ঘুরে বেড়াবেÑ সে ব্যাপারে আবুল হাসান নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। শহীদের নাম কোনোদিন বাংলার মাটি থেকে হারিয়ে যাবে নাÑ ‘নচিকেতা’ কবিতায় আবুল হাসান সেকথা দৃঢ়প্রত্যয়ে ব্যক্ত করেছেন।

মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘বাঙালির জন্মতিথি’ কবিতায় বিজয়োত্তর শহিদের আত্মার প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ পেয়েছে। কবিতায় নূরুল হুদা সংগ্রামে যেসব প্রাণ অকালে উৎসর্গিত হয়েছে, তাঁদের কথা স্মরণ করে লিখেছেন :

তোমাদের হাড়গুলো বাংলার সীমানা ডিঙ্গানো

ক্রমশঃ বর্ধিষ্ণু এক হরিৎ বাগান

কারবাইন তাক করাÑ বেপরোয়া সৈনিকের গান;

তোমাদের হাড়গুলো বাংলার হৃৎপি-ে অবিনাশী ঝড়,

বাঙালির জন্মতিথি, রক্তে লেখা ষোল ডিসেম্বর।

বাঙালির মুক্তি মিলেছে, স্বাধীনতা এসেছে একাত্তরের ডিসেম্বরে। স্বাধীনতার পতাকার জন্য এ মুক্তির কথা জাতিকে এক সাগর রক্ত দিতে হয়েছে। মুহম্মদ নূরুল হুদা ‘বাঙালির জন্মতিথি’ কবিতায় শহীদদের অবিস্মরণীয় আত্মার কথা ব্যক্ত করেছেন গভীর বেদনায়।

‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতাটি নির্মলেন্দু গুণ রচিত মুক্তিসংগ্রামের অনন্য দলিল। এ কবিতায়, গুণ স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম প্রহরের ইতিবৃত্ত অসাধারণ কাব্যিকতায় প্রকাশ করেছেন, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ঘোষণা ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে বিশাল এক জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তর্জনী উঁচিয়ে। সেদিনের সংগ্রামী ভাষণের চিত্র গুণ তাঁর কবিতায় অসামান্য কাব্যিক কুশলতায় প্রকাশ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর বাণীই যে বাঙালির স্বাধীনতার কবিতাÑ তা গুণের কবিতায় স্পষ্ট আভাষিত:

এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম

এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।

এ ঘোষণাই প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা কৌশলে দেশের দামাল মুক্তিযোদ্ধারা যা বাস্তবতায় রূপ দিয়েছেÑ মাত্র নয় মাসেই। গুণ মূলত কবিতায় একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের বিদ্যমান অবস্থার খুঁটিনাটি চিত্র কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন কাব্যিক নৈপুণ্যে। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক স্বপ্নই বাস্তায়িত হয়নি; অথবা স্বপ্নভঙ্গ ঘটেছে। এই স্বপ্নভঙ্গের বাস্তবতা নির্মলেন্দু গুণ ‘আগ্নেয়াস্ত্র’ কবিতায় প্রকাশ করেছেন। তিনি এ কবিতায় লিখেছেন :

আমি শুধু সামরিক আদেশ অমান্য করে হয়ে গেছি

কোমল বিদ্রোহীÑ প্রকাশ্যে ফিরছি ঘরে

                অথচ আমার সঙ্গে

হৃদয়ের মতো মারাত্মক একটি আগ্নেয়াস্ত্র

                আমি জমা দিই নি।

কবি সামরিক আদেশ অমান্য করার দুঃসাহস কেন দেখিয়েছেন, তা বিবেচনার দাবি রাখে। মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে যে স্বপ্ন, যে আশা বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করেছিল মুক্তিযোদ্ধারা, অথবা যে আকাক্সক্ষা থেকে দামাল যুবকেরা মরণপণ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলÑ স্বাধীনতার পর যখন দেখা গেল, সেই প্রত্যাশার প্রায় কিছুই বাস্তবে পূরণ হয়নি; অথচ সামরিক আদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অস্ত্র তুলে নেওয়া হলো, তখন কবি ‘হৃদয়ের মতো মারাত্মক একটি আগ্নেয়াস্ত্র’ জমা না দেওয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। প্রয়োজনে সে হৃদয় যে আবারও জ্বলে উঠতে পারে, এ কবিতায় তারই ইঙ্গিত দিয়েছেন নির্মলেন্দু গুণ। প্রসঙ্গত বলা দরকার, স্বাধীনতা-উত্তর মুক্তিযোদ্ধারা দেশে ফিরে দেখে, অবাধ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চারিদিকে; বিশেষত সাধারণ মানুষের বিপর্যস্ত, শোষিত-নিপীড়িত জীবনে সুদিন ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যেই তারা যুদ্ধে গিয়েছিলÑ অথচ স্বাধীনতার পর দেখা গেল, সেই নিরীহ জনগণের মুক্তি সুদূরপরাহতই থেকে গেল। এমনকি স্বাধীনতার পাঁচ দশকেও এর খুব বেশি হেরফের হয়নি।

নির্বাচিত মুক্তিযুদ্ধের কবিতায় রফিক আজাদের ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মসমর্পণ’ এবং রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ শীর্ষক কবিতায় স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটেছে। যে স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা, প্রত্যাশা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল সাধারণ মানুষÑ স্বাধীনতা অর্জনের পর তার প্রায় কিছুই যখন পূরণ হলো না; সেই হতাশার চিত্র উঠে এসেছে এ দু’জনের কবিতায়। রফিক আজাদ স্বাধীন দেশে সংসার-যুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছেন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার খাতিরে অথবা জীবন-জীবিকা নির্বাহের দায়ে। তবে তিনি সাবধান করে দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যাঁর [বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী] অধীনে যুদ্ধ করেছিলেনÑ তিনি নয় মাসে ‘হ্যান্ডস আপ’ বা আত্মসমর্পণ করতে শেখাননি। অন্যদিকে স্বাধীনতার সব আশা-আকাক্সক্ষা ভূলুণ্ঠিত করে দিয়ে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু পরিবারকে হত্যা করে যারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করল, তারা তো সেই পুরনো হায়েনার দলÑ স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী। তাদের হয়ে সামরিক ব্যারাকের জলপাই রঙের পোশাক পরিহিতরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে অসংখ্য দেশপ্রেমিককে হত্যা করল। স্বাধীনতার পক্ষশক্তিকে নিঃশেষ করে দিতে তাদের অব্যাহত হত্যাকা- দৃষ্টে রুদ্র লিখলেন :

আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,

আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি,

ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরেÑ

এদেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?

জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন ।

পঁচাত্তরের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির পরে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাই সংকটের মুখে পড়েছিল, সে কথা রুদ্র ১৯৭৯ সালেই ‘উপদ্রুত উপকূল’ কাব্যগ্রন্থে উল্লেখ করলেন। কবির দূরদর্শিতা প্রমাণিত হলো একুশ শতকে; যখন এদেশে স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীদের বিচার করে ফাঁসির রায় দেয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়Ñ তখন দেশব্যাপী এই চক্র তা-ব চালালো। তাদের পরীক্ষিত দোসর পাকিস্তান আন্তর্জাতিকভাবে মদদ জোগাল। এমনকি আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে চরমভাবে কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করতেও পিছপা হলো না।

একথা সত্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কবিতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা কিংবা গবেষণার সুযোগ রয়েছে; এখানে মাত্র ৮টি কবিতা সম্বন্ধে বিশদ আলোচনার প্রয়াস করা হয়েছে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা কবিতাসমূহের আলোচনা ভাসা ভাসা করার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের এই প্রয়াস অব্যাহত থাকবে ভবিষ্যতেওÑ ক্রমশ এই আলোচনাটি একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করবে এই আমাদের প্রত্যাশা।

 লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares