যাপন : মিলাদুন রিমা

গল্প

যাপন

মিলাদুন রিমা

 

এই মহাপৃথিবীর আনাচেকানাচে কত মূল্যবান জীবনের ভিড়। সেই জীবনকে ঘিরে নিত্য নতুন কত আয়োজন দিনভর। খুঁটিনাটি কত শত প্রয়োজন। শেষ নেই তার কোথাও। সীমারেখা নেই কোনো এইসব চাওয়া পাওয়ার। হাসিকান্না, সুখদুঃখগুলো একের পর এক ইট গেঁথে জীবনের দেয়াল গড়তে থাকে। তারপর একদিন গাঁথুনি শেষ হয়ে গেলে ছাদ দিয়ে বাঁধাই করে দেয় সেই ঘর। আলো, বাতাস, পৃথিবী, সব কিছু থেকে নিকষ অন্ধকারে আলাদা হয়ে যায় জীবন। হাজারটা জীবন থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখে। করে রাখে আলাদা। মিল নেই কোথাও কারও কোনো জীবনের সাথে। এক একটি জীবন যেন মহাকালের এক একটি অনন্যখুঁটি। এক নিরাকার বিশাল স্তম্ভ। সেই বিশালতা জন্মমৃত্যু সব কিছু ছাড়িয়ে। সব জানাঅজানার অনেক অনেক দূরে। অথচ এই অমূল্য জীবনের কোথায় কী পরিণতি কেউ জানে না। জীবন নিজেও জানে না তার মৃত্যু কোথায় কখন কীভাবে। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কোটি কোটি বছরের সাধনার ফসল যে জীবন তার এতটুকু নিশ্চয়তা নেই কোথাও। এতটুকু ভরসা নেই সময়ের কাছে। সময় তার এতগুলো মুহূর্ত খরচ করে সুগভীর স্নেহে ও যত্নে ধীরে ধীরে যে জটিল প্রাণ-রসায়নের জন্ম দিল তার নিরাপত্তার জন্য এক মুহূর্ত ব্যয় করতে সে নারাজ। এই হলো প্রকৃতির মহামূল্যবান জীবনের চিরায়ত নিয়তি। সেই নিয়তির সুতো ধরে একেকটি মানুষের জন্ম। তারপর এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে পদযাত্রা। সেই অনিশ্চয়তাকে ঘিরে আমাদের এত আহ্লাদ, এত এত ভালোবাসা। অথচ কি ভীষণ একলা একেকটি জন্ম। এবং তার চেয়েও একাকী ও অন্ধকার একটি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা।

সেই প্রাচীনত্বের হাত ধরেই পৃথিবীতে প্রত্যেকটি জীব একা জন্ম গ্রহণ করে। মৃত্যুবরণ করার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। তবে আমি কিন্তু একা জন্মাইনি। আমরা এক সাথেই জন্মেছিলাম। একই মায়ের গর্ভে একই সময়ে আমাদের জন্ম হয়েছিল। অথচ আমাদের দেখা হয়নি কোনোদিন। একই ভ্রুণ থেকে যে দুটি মানুষের জন্ম তারা পরস্পর পরস্পরের কাছে কি প্রচণ্ড অচেনা। দুই প্রান্তের দুজন ভীষণ অপরিচিত মানুষ। অথচ আজ এতগুলো বছর পরেও তার স্থান আমার কাছে এতটুকু হালকা হয়ে যায়নি। আমার পুরোটা জুড়েই তার প্রবল অবস্থান। এখনও তাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে আমার। খুব ইচ্ছে করে। আরেকটি আমার আমির মুখোমুখি হওয়ার প্রচণ্ড তৃষ্ণা আমার আকণ্ঠ সত্তাকে ঊষর মরুভূমি করে রাখে। পৃথিবীর সকল পানীয় একসাথে পান করলেও আমার এই তৃষ্ণার শেষ নেই জানি। শুধু একটিবার মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় আমি কাটিয়ে দিতে পারি আরও হাজার খানেক জন্মান্তর। তবুও একবার যদি দেখা পাওয়া যায় সেই আরেকটি আমির।

বর্ষাস্নাত লিলি আর গন্ধরাজের মাদক ঘ্রাণময় এই গোধূলিগুলোয় এ তৃষ্ণা বাড়তে থাকে বিপুল বেগে। লাগাম ছাড়া এ বোধের কি শেষ নেই কোথাও? আমি বিভূতিভূষণের আরণ্যক কোলে রেখে শূন্য দৃষ্টিতে কেবলই দিগন্ত দেখি। অথবা দেখি না কিছুই। ওদিকে সত্যচরণের ভালোবাসার বন উজাড় হতে থাকে তার নিজেরই হাতে। প্রকৃতি দেবীর কাছে বাড়তে থাকে তার অপরাধ ও গ্লানির পাহাড়। আর এদিকে তারই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে আমার ভিতরের অস্পর্শী এক অদ্ভুত শূন্যতা। পৃথিবীর বুকে এই শূন্যতা দূরীকরণের উপায় আমি আর কোথায় পাই!

নিদিশা! অমন হাঁ করে কী দেখিস?

হঠাৎ আম্মুর কথায় চমকে উঠেছিলাম। পিছন ফিরে কোনো জবাব না দিয়ে আম্মুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। দেখতে ভালো লাগছিল তাকে। আশরীর মায়াবী এক নারী। আমার উৎপত্তি স্থল। আমার জীবনের সকল উৎস। কি অদ্ভুত নাড়ির টান আমাদের। কি ভয়াবহ প্রবল সেই টান। সৃষ্টিকর্তা এত ভালোবাসা, এত প্রেম এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে কেন পাঠিয়েছিলেন? কী ছিল তাঁর উদ্দেশ্য?

মা বিরক্ত হয়ে উঠছিল। গলায় সেই বিরক্তির রাশ রেখেই বলল, কিরে কথা বলিস না যে? আকাশে আবার নতুন আরেকটা চাঁদ উঠল নাকি রে?

না। কিছু করি না আম্মু।

চা টা কিছু খাওয়া লাগবে না? খিদা লাগে নাই?

হ্যাঁ। লাগবে তো।

এখানে বসে বসে মশার কামড় না খেয়ে ঘরে গিয়ে বস। আমি চা নাস্তা বানাচ্ছি। একটু পরে একসাথে বসে খাওয়া যাবে। কোনোদিন তো একটু নিজে চা বানিয়ে খেলি না। আমাকেও খাওয়ালিও না কোনোদিন। গল্পের বই রেখে এখন একটু পড়তে বস, যা। পড়াশুনা তো সব মাথায় উঠেছে। সারাদিন খালি গল্পের বই আর গল্পের বই।

আজকাল আম্মুর বকুনিগুলোও আমার কাছে খুব প্রিয় হয়ে গেছে। রবীন্দ্রসংগীতের মতন ধীরলয়ে সুর তুলে তুলে বুকের ভিতর সাবলীল তরঙ্গের জন্ম দেয় যেন। আমি প্রাণভরে শুনি। মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি এই তরঙ্গের যেন কোনোদিন শেষ না হয়।

পড়ার টেবিলের বিরক্তিকর পাঠ্য বইগুলোও আজকাল আমার ভালোবাসার জায়গায় স্থান করে নিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ার টেবিলে বসে বসে আমি ওদেরকে দেখি। পাতা উল্টাতে উল্টাতে ইচ্ছে করে সবগুলো শব্দ ঠোঁটের আগায় ধরে রাখি। চোখ বুঁজে যেন বলে দিতে পারি কোন পৃষ্ঠার কোন বাক্যে কী লেখা আছে। কিন্তু এইসব আর পারা হয়ে ওঠে না কোনোদিন। হয়ত আর কোনোদিন হবেও না। ইচ্ছেরা শুধু দিনে দিনে ইচ্ছের ঘরেই ঘুরপাক খেয়ে মরবে।

খুঁজে খুঁজে বাংলা বইটি বের করে তার পাতা খুলে বসলাম। হাজারবার পড়া ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাটিই আবার পড়তে শুরু করলাম। এতবার পড়ি তবু কেন যেন সাধ মিটে না। মনে হয় জীবনানন্দ যেন শুধু তাঁর আর আমার জন্যই এই কবিতাটি লিখেছিলেন। তাঁর মতোন আমারও কি ফের আসা হবে শঙ্খচিল অথবা শালিকের বেশে এই বাংলায়? একটি মুহূর্তের জন্যও কি আর আসা হবে না আমার এই ছোট্ট ঘরে? বসা হবে না কি কোনোদিন আমার এই পড়ার টেবিল চেয়ারে? আমার এই পনেরো বছরের ছোট্ট জীবনে কি আর ফেরা হবে না কোনোদিন? বইয়ের পাতায় উষ্ণ জলের হঠাৎ অধিষ্ঠান আমাকে সচকিত করে দেয় আমার অবাধ্য অশ্রু সম্পর্কে। আমি আর তাদের বাধা দিই না। সবকিছু ভুলে টেবিলের ওপাশের হাট করে খোলা জানালা দিয়ে বাইরের চাঁদ দেখি। গন্ধরাজের মাদক ঘ্রাণে মাখামাখি ঝাপসা একটি চাঁদ।

 

২.

স্কুল বরাবরই আমার অত্যন্ত প্রিয়। শুধু একঘেঁয়ে ক্লাসগুলো ছাড়া। ইদানীং অবশ্যি ক্লাসগুলোও কেন যেন মজার লাগতে শুরু করেছে। কিন্তু সেদিন সকালে গিয়ে যখন শুনলাম কোনো ক্লাস হবে না- আমাদের আনন্দ আর দেখে কে? মৃত্তিকা, যাকে আমরা মাটি বলে ডাকি, ও ওর চড়া গলা আরও চড়িয়ে বলল, ওই চল আমরা কোথাও ঘুরতে যাই।

ডাক নামের কথা বলতে গেলে কিছু কথা আগেভাগে জানিয়ে রাখা ভালো। সকল বন্ধুবৃত্তের একটি অলিখিত নিয়মের মতো আমাদের বৃত্তেও সবারই একটি করে বন্ধু-প্রদত্ত ডাকনাম রয়েছে। যথাসময়ে সবারটাই জানা যাবে। নামগুলো যেমন হাস্যকর ঠিক তেমন বিরক্তিকরও। মাঝে মাঝে তো কিছু নাম লোকসমাজের সামনে ডাকার যোগ্যতাই রাখে না। আমার ডাকনামটি যেমন। থাক সেটি আর এখানে বলে কাজ নেই। প্রসঙ্গে ফেরা যাক ।

ন্যাকা ন্যাকা গলায় ন্যাকু তারিফা বলল, এখন কোথায় ঘুরতে যাবি তোরা? একটু পরেই তো রোদ উঠে যাবে। রোদে কি আর ঘোরাঘুরি করা যাবে বল?

তারিফা, যার স্কুল ব্যাগে এক গাদা বইখাতার সাথে সবসময় ফেস পাউডার আর লিপস্টিক থাকে, এমনিতেও বড্ড ন্যাকামি করে। ওর স্বভাবই হলো ন্যাকামি করা। ওর ন্যাকু তারিফা নামটি এক্ষেত্রে অত্যন্ত সার্থক হয়েছে বলেই আমরা মনে করি। আমরা অবশ্য ওর ন্যাকামিকে একটুও পাত্তা দিই না। শীলনÑ যাকে আমরা প্রাকটিস বলে ডাকি- তারিফার মাথায় চাঁটি মেরে বলে, তুই চুপ যা। যাবি কিনা বল?

উমম। আ…। মানে হয়েছে কি রোদের ব্যাপারটা তো মাথায় রাখতে হবে না কি? আগে জানলে তো আমি সানস্ক্রিন নিয়ে আসতাম। তোরা যে কিনা!

উফ! মাটি, ওর কথা বাদ দে তো। ইগনোর ইগনোর! কোথায় যাওয়া যায় তাই বল?

মাটি সবার কাছাকাছি ঘেঁষে এসে বলল, আমি কদিন আগে একটা জায়গা আবিষ্কার করেছি। রোমাঞ্চকর এক জায়গা। অনেকদিনের পুরনো পোড়ো বাড়ি। ইটের দেয়াল খসে খসে পড়ছে। দেয়ালের গায়ে কাঁটালতা, নাটালতা আরও কত গাছের ঝোপ। চারিদিকে প্রাচীনত্বের সোঁদা গন্ধ। সুনসান চারিদিক। আহা! এই শহরের মাঝখানে একই সাথে শান্তিময় আর গা ছমছমে একটা জায়গা।

মাটির বর্ণনায় আমি খুব কৌতূহলী হয়ে উঠছিলাম। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তুই এই জায়গার খোঁজ পেলি কোথায়?

মাটি রহস্য বাড়িয়ে বলল, আরে আছে আছে। আমি নিয়ে যাব তোদেরকে।

শীলন বলল, কিন্তু কতদূর?

অনেক কাছে। তোরা গেলে অবাক হয়ে যাবি।

অবাক হওয়ার জন্য অথবা অ্যাডভেঞ্চার কিংবা শান্তি, কারণ যেটাই হোক না কেন আমরা সবাই রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু সমস্যা বাধালো স্কুল ইউনিফর্ম। গার্লস স্কুলের ইউনিফর্ম চেনে না এমন লোক এই শহরে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু শেষমেষ চিন্তার কোটা থেকে সেটিকেও বাদ দিলাম। যা হওয়ার হবে। এটিও যেন আমাদের কাছে এক নতুন অ্যাডভেঞ্চার।

নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে এবার সত্যিই আমাদের অবাক হওয়ার পালা। স্কুল থেকে মাত্র ২০ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে যে একটি পোড়ো বাড়ি আছে আমরা তা জানতামই না। কি আশ্চর্য!

মাটি কোমরে হাত দিয়ে গর্বের সুরে বলল, কিরে বলেছিলাম না তোদেরকে। তোরা তো বিশ্বাসই করছিলি না? এখন নিজের চোখে প্রমাণ পেলি তো।

শীলন বিরক্ত হয়ে বলল, কি যে বলিস না মাটি। বিশ্বাস না করলে কি আর আমরা তোর সাথে আসতাম নাকি? কি যে অদ্ভুত তোর কথাবার্তা।

তারিফা বলল, ও নিজে কি কম অদ্ভুত নাকি? চিন্তা কর এমন চিপায় চাপায় কিভাবে একটা ভূতের বাড়ি আবিষ্কার করে ফেলেছে! তুই কিভাবে এটার খোঁজ পেলি রে?

মাটি বলল, একদিন ভোরবেলা আমি আর মৃদুল প্রাতঃভ্রমণে বের হয়েছিলাম।

আমি চোখ উপরে তুলে বললাম, কি বললি তুই? প্রাতঃভ্রমণ! এমন বঙ্কিমীয় ভাষার ব্যবহার কবে থেকে শুরু করলি তুই? তোর মুখ থেকে তো তুই মুই ছাড়া কিছু বের হয় না।

মাটি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, দুই একটা বই পড়ে নিজেকে তোর খুব কবি গুরু চণ্ডীদাস মনে হয় না?

হা হা হা! চণ্ডীদাস আবার কবে কবি গুরু হলো? ওটা তো রবীন্দ্রনাথ। আর চণ্ডীদাস হলেন…

তারিফা বিরক্ত হয়ে বলল, উফ! ও হে মহান কবি গরু নিদু পাদু তুই চুপ যা। দয়া করে ক্ষান্ত হ। মাটি তুই আগে তোর আবিষ্কারের ঘটনা বল।

আমার ডাক নামটি যে সমাজ বহির্ভূত এবার নিশ্চয়ই আর বুঝিয়ে বলতে হবে না। আমি অবশ্যি এইসব ছোটখাটো ব্যাপার আর গায়ে লাগাই না। সে যাই হোক। আমিও মাটির দিকে ফিরলাম ওর আবিষ্কারের কাহিনি শোনার জন্য।

মাটি বলল, আবিষ্কারের ঘটনা তেমন কিছু না। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে এই জায়গাটা পেয়ে যাই। সেদিন অনেক অবাক হয়েছিলাম জানিস। আমাদের শহরে যে এমন একটা নিরিবিলি জায়গা আছে আমরা জানতামই না। তারপর থেকেই খালি খুসখুস করছিলাম কবে তোদের এইখানে নিয়ে আসব। জায়গাটা তোদের পছন্দ হয়নি?

এইসব জায়গা আবার পছন্দ অপছন্দ কি রে? এমন জায়গায় এরকম নিরিবিলি সময় কাটানোটাই তো ভাগ্যের ব্যাপার।

শীলন বলল, যাই হোক তারিফার মুখ থেকে তাহলে ভালো কিছু বের হয়েছে।

তারিফা শীলনের কথায় পাত্তা না দিয়ে বাড়িটিকে ভালোমতো দেখার জন্য এগিয়ে গেল।

আমি মাটির পাশে এসে জিজ্ঞেস করলাম, তোরা ভাইবোন কি রোজ বের হোস নাকি সকালে?

মাটি হাত নাচিয়ে বলে, আরে নাহ! মাঝে মাঝে। ওই ছুটির দিনগুলোতে, শুক্রবারে এই আর কি। তাও সবসময় হয় না ।

আমরা পোড়ো বাড়িটির দিকে মনোযোগ দিলাম। বাড়িটি শিক্ষা অফিসের পিছনে অনেক গাছপালা ঘেরা যেটি শিক্ষা অফিসের ফলবাগান নামে পরিচিত এমন একটি জায়গার এক কোণায়। এত এত গাছপালার সহাবস্থানের জন্যই জায়গাটি এমন মৌন ও শান্তরূপ পেয়েছে। বাড়িটির একপাশ অনেকদিনের অব্যবহার ও দুর্যোগে আধা ভেঙে পড়ে আছে। দেয়ালের গায়ে পোড়া পোড়া কালচে ছোপ। পলেস্তারা খসা দেয়ালে ইটের কঙ্কালের উৎসুক উঁকিঝুঁকি। দেয়ালে দেয়ালে শ্যাওলা আর বুনো ঝোপঝাড়ের নিপাট রাজত্ব। মোদ্দাকথা, আর পাঁচটা পোড়ো বাড়ি দেখতে যেমন হয় মানে সিনেমা নাটকে যেমনটা দেখায় আর কি, কিছুটা ঠিক তেমনটাই। তবে পুরো বাড়িটিকে বাড়ির চেয়ে খুব বেশি স্কুল ঘর মনে হয়। লম্বায় টানা কয়েকটা ঘর।

শীলন মাথা উঁচিয়ে ঘরগুলো দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, এইটা কি কোনো স্কুল টিস্কুল ছিল না কি রে মাটি? বাড়ি বাড়ি তো মনে হচ্ছে না।

মাটি জবাবে বলে, হ্যাঁ। তুই ঠিক বলেছিস। এটা শিক্ষা অফিসের পুরনো অফিস ঘর। আগুন লেগে এখন এই অবস্থা। সেবার নাকি আগুনে অনেক অনেক পরীক্ষার খাতা পুড়ে ছাই হয়েছে। সেইসব খাতা আর পরীক্ষার্থীদের রেজাল্টের দফারফা করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে শিক্ষা অফিসের। কি ভজঘট অবস্থা হয়েছিল ভেবে দেখ।

তুই এত খবর পেলি কোথায়?

যেদিন প্রথম এসেছিলাম সেইদিন এখানকার দারোয়ানের কাছ থেকে শুনেছি।

ভাঙা দেয়ালের গায়ে স্যাঁতসেঁতে এক জায়গায় বেশ পুরু শ্যাওলা হয়েছে। আমি ওদের উপর দিয়ে হাত বুলিয়ে ওদের শীতল নমনীয়তা অনুভব করছিলাম আর ওদের কথা শুনছিলাম। পুরো জায়গাটিকে আমার কাছে একটি গল্পের মতোন মনে হচ্ছিল। সেই কতকাল আগের কথা, পুরনো অফিস বাড়ি, আগুন সবকিছু যেন গল্পের একেকটি অংশ। চোখের সামনে একের পর এক সব এসে এসে দেখা দিয়ে যাচ্ছিল। জীবনের ছোট ছোট ঘটনাগুলোও কত বড় হয়ে ওঠে অতীতের ঘনঘটায়। বর্তমানকালে একই সাথে চলে অতীতের তাণ্ডব। কি মোহময় অদ্ভুত জীবন আমাদের! অথচ কোথায় একটুখানি বিরতি নেই। নেই কোনো বিশ্রামের অবকাশ। নিশ্চয়তার ধারার বদলে কেবলই স্রোতের নাব্যতা। আর কি কোনোদিন এমন দিন আসবে আমার? চোখের কোণাটা ভিজে ওঠার আগেই বাঁ-হাতে মুছে নিলাম। সেদিন অনেকক্ষণ ছিলাম আমরা। ফেরার পথে বেকারি দোকান থেকে ফুলেশ্বরী মিষ্টান্ন কিনেছিলাম আমরা। তারপর খেতে খেতে অনেকগুলো পথ ভ্রমণ করে যখন সূর্য মাথার উপর চড়ে বসল তখন বাড়িমুখো হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

 

৩.

রাতে বেশ আয়োজন করে ছোট খালা বেড়াতে এলেন। সাথে একগাদা জিনিসপত্র। খাবারদাবার থেকে শুরু করে আমার জন্য পোশাকসহ প্রায় সবই আছে সেখানে। আস্ত একটি হকারের দোকান হয়ে এসেছেন খালা। আর তার এক কোণায় খালার কোলের ওপর জবুথবু হয়ে পড়ে আছে আমার দুই বছরের ছোট্ট ভাই তিমির। ওর নামটি আমার একদম পছন্দ নয়। ছেলেপেলের নাম হবে আলো, বাতি, রঙ এইসব। এরকম রঙহীন অন্ধকার নাম রাখার কোনো মানে হয়! খালাকে বুঝিয়ে পারা যায় না। তবু আমি এখনও চেষ্টায় আছি, যদি কোনোভাবে এফিডেবিট করে নামটা পালটানো যায়। নামটা পছন্দ নয় বলে আমি ওকে খাটো করে তিমি বলে ডাকি। এতে খালা আরও বেশি ক্ষ্যাপেন। তবে তিমিরের এই নামটা বোধহয় খুব পছন্দ হয়েছে। তিমি বলে ডাকতেই সুড়সুড় করে আমার কোলে চলে আসে। তিমিরকে আমার কোলে দিয়ে খালা বিরক্ত হয়ে বললেন, তোকে না হাজারবার বলেছি ওকে তিমি বলে ডাকবি না।

লক্ষবার ডাকব। তোমাকে না কতবার বলেছি তিমির নামটা পাল্টাও। তুমি শুনেছ?

এত সুন্দর একটা নাম পালটাতে হবে কেন! তোর আসলেই কোন রুচিবোধ নাই।

হ্যাঁ। তোমার থেকে অন্তত বেশি আছে। বড় হলে দেখবে এই নামের জন্য তোমার ছেলে কত পচানি খায়। বন্ধু-বান্ধবরা ওকে হয় অন্ধকার নয় তো কালা বলে ডাকবে। আমরা যেমন মৃত্তিকা কে মাটি বলে ডাকি। ওরা আমাকে নিদুপাদু বলে ডাকে। আর দেখো তিমি বলে তো আমিই ডাকি। এরপর বন্ধুরা ওকে নীল তিমি, তিমি মাছ, স্তন্যপায়ী বলে ডাকবে। তারপর বাড়ি এসে সব রাগ ঝাড়বে তোমার ওপর।

তোরা গার্লস স্কুলের মেয়েরা তো একেকটা দস্যুর দল। তোদের কথা আলাদা। তবে তোর নামটা এক্কেবারে পারফেক্ট হয়েছে। চমৎকার! আমার ছেলে অনেক ভদ্র স্কুলে যাবে পড়তে বুঝেছিস। আর নাম পালটানো কি অত সহজ নাকি। নিবন্ধন হয়ে গেছে। আমি ওসব ঝামেলায় যেতে পারব না। আর ঝামেলায় যাবই-বা কেন? আমার পছন্দ হয়েছে আমি দিয়েছি।

বেশ করেছ খালা। এখন তাহলে দয়া করে তিমি ডাকটাও সহ্য করো।

উফ! হয়েছে। এখন ঝগড়া বন্ধ করে জিনিসগুলো দেখ তো তোর পছন্দ হয় কিনা। সব তোর জন্য। আমি নিজে বেছে বেছে তোর জন্য দোকানের সবচেয়ে সুন্দর তাঁতের জামাটা এনেছি। অন্তত খুলে তো দেখ।

জামাটি সত্যিই খুব সুন্দর। খুব দামিও বটে। আমি সম্ভবত আমার জীবনে এত দামি জামা কোনোদিন পরিনি। সত্যি বলতে ছোটখালাও সম্ভবত পরেননি। আমি কখনও দেখিনি। অবাক হয়ে খালার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

খালা বললেন, অমন হাঁ করে তাকিয়ে আছিস কেন? জামা পছন্দ হয়নি?

তুমি এত দাম দিয়ে জামা কিনতে গেলে কেন?

আমার ইচ্ছা হয়েছে আমি কিনেছি। তুই পরার মালিক পরবি। নাকি পছন্দ হয় নাই?

তুমি কি যে সব কর না খালা। এত সুন্দর জামা আবার পছন্দ না হয়। তবে একটু কমের মধ্যে দিলেও তো পারতে।

শোন তোর মাপ তো আর আমি জানি না। তাই বানিয়ে দিতে পারলাম না। তুই সালোয়ার কামিজটা বানাতে দে। আমি মজুরি দিয়ে দেব।

আমি জিনিসগুলো উঠিয়ে নিয়ে যেতে যেতে খালার মুখের দিকে বিরক্তির ভান করে একবার তাকালাম।

একটু বাদে খালু এসে যোগ দিলে আড্ডা বেশ জমে উঠল। ততক্ষণে বাবাও চলে এসেছে। আমি বই পড়তে ভালোবাসি বলে খালু আমার জন্য পুরো ড্যান ব্রাউনের সিরিজ নিয়ে এসেছেন। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, হায় আল্লাহ! আমি তো এই বইটাই মনে মনে খুঁজছিলাম। আপনি কি করে জানলেন?

খালু হেসে বলেন, ছেলেরা ঠিক মায়ের মনের খবর পেয়ে যায়।

 

৪.

নিশীথ রাতের আকাশ, অন্ধকার ও নক্ষত্রম-লীর দিকে চেয়ে চেয়ে কত কিছু মনে হয় আমার। কোটি কোটি প্রশ্নবাণে জর্জরিত হই হাজারবার। এই যে এত রাজ্যপাট, ঘরসংসার, পৃথিবীর কতসব অপ্রয়োজনীয় মহা আয়োজন কেন বলতে পারো? কোন অর্থে, কিসের ভিত্তিতে দুনিয়াজুড়ে এত তা-ব? আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক এর কিছুই বুঝতে পারে না। তুমি বোঝো আকাশ? বোঝো কি এইসব কিছু তোমরা, ওই বেহিসেবি, হিসেব নিকেষহীন নক্ষত্রম-ল? কোথায় আছে উত্তর? কার কাছে আছে? জবাবের ছিটেফোঁটাতেও যদি ঢেউ লাগে তাতে আমার বেশ চলবে। আমার জিজ্ঞেস বোঝাই ডিঙ্গি নৌকার পাল ফুরফুরে মেজাজে ছুটে যাবে দিগি¦দিক। এই যে এত এত অগুণতি নক্ষত্রম-ল এর কোথাও কি আছে সে? সেই আরেকজন আমি? সে কি দেখছে আমাকে? নাকি আমারই মতোন তাকিয়ে আছে নিরাকার অন্ধকার আকাশের দিকে।

আজকাল সহস্র শব্দ মিলেও আমার মনের কথা বলতে পারে না। এ এক অদ্ভুত রোগ জেঁকে বসেছে আমার ভিতর। মনের কথা তো মনের ভিতরের ব্যাপার, নাহয় একটু দুর্বোধ্য, মুখের কথাই বলতে পারে না এইসব  কোটি কোটি শব্দ অক্ষর। আমি হাঁ করে আকাশ দেখি। রোদে আলোয় চোখ ঝলসায়। তবু ফিরিয়ে নিতে পারি না চোখ। আমি নদীর বুকের বাতাসকে ভরে নিই প্রতিটি নিশ্বাসের সাথে। তবু তারা পথ ভুল করে। পৌঁছাতে পারে না আমার ফুসফুসের ঘরে। সবুজের অজ¯্র ছোট ছোট কোষীয় পাতায় মুখ ডুবিয়ে দিই। প্রকৃতির পাখায়, ডানায়, ঘাসে, লতাপাতায় নিখুঁত অভিযান চালিয়ে যাই শূন্য মাথায়। মাথা আমার আরও শূন্য মনে হয়। প্রকৃতির গূঢ় নিয়মের আগা গোড়ার অণুমাত্র বোধগম্য হয় না আমার শূন্য মস্তিষ্কে। কেন এত সৌন্দর্য? কেনইবা এত নির্মম পরিহাস চারিদিক? বল তো আকাশ দোষটি কি শুধুই আমার? এই বিবেক বুদ্ধিহীন প্রকৃতি এবং তার আগা মাথাহীন নিয়মকানুনের কি কোনো দোষ নেই? ঈশ্বর কি এতই নির্দোষ?

আমরা একই সাথে জন্মেছিলাম। আমি এবং মৃত্যু। জন্মের কয়েকদিনের মাথায় তার মৃত্যু হয়। আমার তাকে দেখা হয়নি কোনোদিন। আমারই মতন দেখতে আরেকটি ফুটফুটে মানুষ। তাকে দেখার সাধ এজন্মে আমার ঘুচবে না। মানুষটি মরে গিয়েও মরে যায়নি। আমার ভিতর সেঁটে আছে আষ্টেপৃষ্ঠে একটি মৃত্যু হয়ে। তার যে কারণে মৃত্যু হয়েছিল, আমি ঠিক তার বিপরীত কারণে মারা যাব। এবং খুব শীঘ্রই। আমি এবং আমার পরিবার সবাই জেনে গেছে এই সত্য। আমার অনেক আগেই মারা যাওয়ার কথা ছিল। যমজ বাচ্চার একজন মারা গেলে আরেকজন সহজে বাঁচে না। আমি যেন প্রকৃতির সাথে জেদ করে জোর জবরদস্তি বেঁচে আছি। ওর মৃত্যু হয়েছিল অতিরিক্ত রক্তশূন্যতায়। আমি মারা যাব অত্যধিক রক্ত এবং রক্তচাপে। একদিন যেকোনো সময় উত্তেজনা অথবা আনন্দ বেদনায় অতিরিক্ত রক্ত চাপে মস্তিষ্কের স্নায়ু ছিঁড়ে আমার মৃত্যু হবে। আমি অধীর আগ্রহে সেইদিনটির অপেক্ষায় আছি। হয়ত সেইদিন তার সাথে আমার দেখা হবে। কিন্তু নিষ্ঠুর পৃথিবীর মায়া কাটানো কি অতই সহজ! এ ব্যথা যে জানে না সে বুঝবে না কোনোদিন। এখন ভিতর বাইরে আমার কেবলই কৌতূহল। জন্ম, মৃত্যু, আকাশ, পাতাল, আলো, অন্ধকার সবকিছু নিয়ে।

তুমি কেমন আছ আমার অর্ধসত্তা? চিন্তা কোরো না। আমাদের দেখা হবে। দেখে নিও, খুব শীঘ্রই দেখা হবে আমাদের।

 

৫.

আমাদের বাড়িটি বাইরে থেকে দেখলে খুব স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে এর ভিতরের গুমোট ভাব, চাপা কান্না, হতাশা এবং অভিনয়ের বিশাল বিস্তৃতি। সকালে নাস্তা খেতে খেতে আম্মুকে দেখছিলাম আমি। শুকিয়ে শুকিয়ে হাড্ডিসার অবস্থা হয়েছে। বাবার কখনও কোনো রোগবালাই ছিল না। আজকাল হার্টের রোগ ধরা পড়েছে। দুজনের কোটরাগত চোখের নিচে বিরাট কালশিটে দাগ। তারা রাতে ঘুমায় না অনেকদিন। আমি জানি। মাঝে মাঝে গভীর রাতে কান্নার শব্দ শুনতে পাই আমি। অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার মতন ভয়ংকর সেই শব্দ। আমি বালিশে কান চেপে শুয়ে থাকি। সারারাত ভয়াবহ দমবন্ধ অন্ধকার নিয়ে ছটফট করতে থাকি। আলো জ্বালতে ভয় হয়। যদি আব্বু আম্মু টের পায়। আমার চোখের সামনে দুজন দেবতার মতোন শক্ত মানুষ ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমি নিরুপায়। আমার আর কোথাও কিচ্ছু করার ক্ষমতা নেই। রোগে আমি যতটা না মারা যাব তার চেয়ে অনেক বেশি মারা যাব সম্ভবত অপরাধবোধে। কিছুই করা হলো না এই ছোট্ট জীবনে। আমার কাছে পৃথিবীটা শুধু নিষ্ঠুর নয়, অনেক বেশি অর্থহীন। অনেক বেশি ছেলেখেলা। এছাড়া আর একবিন্দু কিছু নয়।

তবু আমি চাই শেষটা ভালো হোক। সুন্দর হোক। কোনো ক্ষোভ অথবা খেদ নিয়ে চলে যেতে চাই না আমি। খেতে খেতে আব্বুকে খুব স্বাভাবিকভাবে বললাম, আব্বু চল না কোথাও ঘুরতে যাই।

আব্বু উ™£ান্তের মতো বলে, অ্যাঁ ! কি বললি?

বললাম যে চল সবাই মিলে কোথাও ঘুরতে যাই।

এখন? এখন তো আমি অফিসে যাব।

উফফ! আব্বু আমি দূরে কোথাও যাওয়ার কথা বলছি। এখন নয়, এর মধ্যেই। চল না যাই।

আম্মু রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, কই যাবি তোরা?

আব্বু বলল, দূরে কোথাও।

তা দূরে কোথাওটা কোথায়?

এখনও ঠিক হয়নি। তোমার মেয়ে বায়না করেছে যাওয়ার জন্য। কোথায় যাওয়া যায় বলতো?

যে বায়না করেছে তাকেই জিজ্ঞেস করা হোক। কিরে কই যাবি?

নারিকেল জিঞ্জিরা! উৎফুল্লস্বরে জবাব দিলাম আমি।

আম্মু হেসে বলল, ভালো প্রস্তাব। অনুমোদিত হলো।

আমাদের বাড়ির পিছনে অনেকদূর অব্দি ফাঁকা জমি আছে। এর মধ্যে কিছু কিছু জমিতে চাষবাস করা হয়। এখন সর্ষের মৌসুম। একরের পর একরজুড়ে ফুলেল সৌরভের মাতামাতি। চারিদিকে হলুদ রঙের রাজ্য। আমি প্রায় রোজ বিকেলেই ক্ষেতের মাঝখানের আইল দিয়ে হেঁটে যাই অনেক দূর। এত ফুলের মাঝে নিজেকে বেশ স্বর্গীয় মনে হয়। আমার সাথে সেই স্বর্গে আরেকজনও হাঁটে। কত কথা হয় আমাদের! আমি ওকে কেবলই আশ্বাস দিই, খুব শীগ্রই দেখা হবে আমাদের। আর চিন্তা কি! একদিন এই ফুলের রাজ্য থাকবে না। অসংখ্য জীবন ও সবুজের সমাহার তছনছ করে এখানে তৈরি হবে ইট কাঠের মৃত সা¤্রাজ্য। ভাগ্যিস, সেইদিনটি আমাকে দেখতে হবে না। আমার চোখের তারায় থাকবে কোটি কোটি ফুল, রঙের রাজত্ব, পাখির মিষ্টি কলতান, নদী ও লেকের স্বচ্ছ জল, আবর্জনাহীন একটি সুন্দর দ্বীপ যেখানে অচিরেই পদচিহ্ন এঁকে দেব আমি, থাকবে প্রগাঢ় বিশ্বাস ও প্রেম। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। তোমার এই নিয়ামতের দাম আমি ছাড়া আর কে বুঝবে বলো। আমি জানি আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে আরেকটি বাগান ও অন্ধকারহীন নির্মোহ আলোর জগৎ। সেখানে অপেক্ষা করে আছে আরেকজন আমি, যার সাথে আমার দেখা হয়নি কোনোদিন। আমার ভিতরে আনন্দের তরঙ্গ আমাকে বাধাহীন উদ্ভাসিত করে তোলে। আমি ঋষির মতন তৃপ্ত ও প্রস্তরের মতোন শান্তহৃদয় নিয়ে হেঁটে যাই। আমাকে বিদায় জানায় রাশি রাশি ফুল, গোধূলির শেষ সূর্যালোক।

লেখক : গল্পকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares