কিডন্যাপ : কয়েস সামী

গল্প

কিডন্যাপ

কয়েস সামী

ছিনতাই, রাহাজানি- এসব জীবনে অনেক করেছে রাজীব। কিন্তু কিডন্যাপ এই প্রথম। তাও আবার কিডন্যাপ করেছে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক রওনক ইসলামকে। কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছে ঢাকা থেকে একটু বাইরে, গাজীপুরে।। দরজা জানালা বন্ধ ছোট্ট একটা রুমে তালা বন্ধ করে রেখেছে তাকে। রুমটি দেখে রওনক সাহেব বেশ অবাক হয়েছিলেন। সাধারণত কিডন্যাপ করে এনে এমন বিলাসবহুল রুমে থাকতে দেয়া হয় না। সুন্দরভাবে সময় কাটানোর জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবই আছে রুমটিতে। একটি বিছানা, তাতে ধবধবে সাদা একটি চাদর, একটি পড়ার টেবিল সাথে একটি চেয়ার, ছোট্ট একটি বুক শেল্ফ যাতে বেশ কিছু বই রাখা, আর একটি টিভি আর ডিভিডি প্লেয়ার।

তুমি আমাকে কেন ধরে এনেছ? আমাকে চিনতে পারছ না তুমি?  আমি… আমি লেখক রওনক ইসলাম। ছেলেবুড়ো সবাই একনামে চেনে আমাকে। তুমি আমাকে চিনতে পারছ না, ছেলে?

এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলেন রওনক।

স্যার, আপনাকে আমি চিনতে পেরেছি বলেই এনেছি।

শ্রদ্ধা মেশানো গলায় বলল রাজীব।

মানে কী? কী চাই তোমার?

একটু সময় দেন স্যার, বলছি।

দেখো ছেলে, কাজটি তুমি মোটেও ভালো করছ না। তুমি বুঝতে পারছ না এর পরিণতি কী হবে।

স্যার, আপনি এখন উত্তেজিত। এখন কথা বলার দরকার নাই। বিশ্রাম নেন। আমি পরে কথা বলব। দুপুরে লাঞ্চ পাঠিয়ে দেয়া হবে, খেয়ে নিয়েন।

হিম শীতল কণ্ঠে কথাগুলো বলে রাজীব দরজায় তালা দিয়ে বাইরে চলে গেল।

রওনক ইসলাম খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। জীবনে এমন অবস্থায় কখনও পড়েননি। ছেলেটার উদ্দেশ্যটাও ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। বাসার কথা খুব মনে পড়ছে তার। শায়লা নিশ্চয়ই চিন্তা করছে। ঘুম থেকে জেগে বাজার করতে বেরিয়েছিলেন তিনি। প্রতি শুক্রবার তিনি নিজে বাজার করতে বের হন। তাও আবার হেঁটে হেঁটে যান। এতে সাধারণ লোকজনের সাথে এক ধরনের যোগাযোগ হয়। লেখার থিম পেয়ে যান তিনি। লেখার থিম খুঁজতে গিয়ে এমন ঝামেলায় পড়া হবে ভবেননি কখনও। শুভ নিশ্চয়ই এতক্ষণে আর্ট স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছে। বাবা ফিরছেন না দেখে কী করবে সে? এয়ার কন্ডিশন্ড রুমে বসে তিনি ঘামতে থাকলেন।

 

২.

চোখ খুলে রওনক সাহেব বুঝতে পারলেন না, দিন নাকি রাত। দুপুরে বেশ ভালো লাঞ্চ দেয়া হয়েছিল তাকে। মাগুর মাছের ঝোল, পাবদা মাছ, শুঁটকি ভর্তা আর ভাত। রওনক সাহেবের প্রিয় খাবার। তার কোনো এক বইয়ে লিখেছিলেন ব্যাপারটি। ছেলেটি মনে হয় পড়েছে। ছেলেটা তার বই পড়ে বুঝতে পেরে খানিকটা রিলাক্সড হয়েছেন তিনি। আর যাই করুক, তাকে নিশ্চয়ই মেরে ফেলবে না। তিনি হাতঘড়িতে সময় দেখলেন। সন্ধ্যা সাতটা। বাড়ি থেকে বের হওয়ার ১০ ঘণ্টা হয়ে গেল। রিমোট নিয়ে অন্যমনস্ক রওনক টিভিটা অন করলেন। চ্যানেল আইয়ের সংবাদ চলছে। এ যে দেখি তারই ছবি টিভিতে!

‘প্রখ্যাত ও জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক রওনক ইসলাম আজ সকাল থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। সকাল দশটার দিকে বাজার করতে বের হয়েছিলেন তিনি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনি বাসায় ফিরেননি। তার মোবইলটাও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা কিছুক্ষণ আগে তার স্ত্রী শায়লা বেগমের সাথে কথা বলেছিলাম। দেখুন তার ভিডিও ফুটেজ।’

টিভি স্ক্রিনে ভেসে এল লেখকের বাসার ড্রয়িংরুম। একমাত্র ছেলে শুভকে পাশে নিয়ে বসে আছে শায়লা। অনেকগুলো মাইক্রোফোন তার সামনে। কান্না কান্না গলায় সে বলছে, সকাল সকাল বেরিয়ে গেল লোকটি। বললাম, গাড়ি নিয়ে যাও। না করল। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত কোথায় আছে কিছু জানতে পারলাম না। দিনেদুপুরে দিব্যি নাই হয়ে গেল লোকটি… টিভি ক্যামেরা ঘুরে গেল চ্যানেল আইয়ের রিপোর্টারের দিকে।

‘জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক রওনক ইসলামকে পাওয়া না যাওয়ায় সারাদেশে উৎকণ্ঠা শুরু হয়েছে। গুলশান থানায় ইতোমধ্যে জিডি করা হয়েছে। এই মুহূর্তে খবরটি নিয়ে আমরা যাচ্ছি মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সামনে মাইক্রোফোন।’

আমরা ব্যাপারটা বেশ সিরিয়্যসলি নিয়েছি। একজন কথাসাহিত্যক গুম হয়েছেন এটাতো মেনে নেয়া যেতে পারে না।

কোনো আলটিমেটাম?

ঘিরে থাকা সাংবাদিকদের মধ্য থেকে প্রশ্ন ভেসে এল।

এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দিলেন।

বললেন, না, কোনোদিন তারিখ গুনে বলা যাবে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে তৎপর হয়ে পড়েছে। আমরা দেখছি ব্যাপারটি।

টিভি আবার স্টুডিওতে ফিরে এল। রওনক টিভি বন্ধ করে দিলেন। সারাজীবন অন্যের খবর নিয়ে গল্প উপন্যাস লিখেছেন আর আজ তিনি নিজেই খবর হয়ে গেলেন! শায়লার কান্না দেখে বুকের মধ্যে ব্যথা শুরু হলো। তিনি আবার বালিশে মাথা রাখলেন।

 

৩.

স্যার, তিনদিন হয়ে গেল। আপনার উত্তেজনা বা ভয় কি কমেছে?

আমি আসলে বুঝতে পারছি না, তুমি কী চাও। টাকা চাও, টাকা? কত চাও বল।

না, টাকা চাই না।

কী চাও, ¯পষ্ট করে বল।

আমি চাই উপন্যাস।

মানে কী? ঝেড়ে কাশ।

ধীরে। ধীরে। উত্তেজিত হবেন না। আপনার  আবার হার্টে প্রবলেম আছে। কিছু হয়ে গেলে ডাক্তার দেখাতে পারব না।

এত নাটকীয়তা কিসের তোমার? বলি এত নাটকীয়তা কী? এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বলছি স্যার। পানি খাবেন? একটু পানি খেয়ে নেন। অবশ্য আমি যা চাইব আপনার কাছে সেটা আপনার জন্য খুব সহজ।

আরে বাবা, সেটাই তো জানতে চাচ্ছি।

আমি চাই আপনি আমাকে একটা উপন্যাস লিখে দেবেন। এখানে আপনাকে থাকতে হবে ঠিক ততদিন যতদিন না আপনি উপন্যাসটি শেষ করবেন। উপন্যাস লেখা হলেই আমি ছেড়ে দেব আপনাকে।

রওনক সাহেব অবাক হলেন। বলে কী ছেলেটি!

উপন্যাস দিয়ে তুমি কী করবে?

বলছি। উপন্যাসটি লিখে আপনি লেখাটি আমাকে দিয়ে দিবেন। ওটা হয়ে যাবে আমার লেখা।

বিস্ময় উপচে পড়ছে লেখকের চোখ দিয়ে।

উপন্যাস দিয়ে তুমি কী করবে সেটা বল?

আমি ওটা আমার নামে প্রকাশ করব।

কিন্তু কেন? তোমার উদ্দেশ্য কি?

আপনার লেখা খুব বিক্রি হয়। ছাতা-মাথা যাই লেখেন তাই দেখি বিক্রি হয় দেদার। আপনার শেষ লেখাটি আমি পড়েছি। লাশ কাটা ঘরে। নামটি জীবনানন্দ থেকে নিয়েছেন। চমৎকার নাম। পড়ার পর কেঁদেছি অনেকক্ষণ। আপনার একটা লেখা যদি আমার নামে ছাপাতে পারি, তবে আর চিন্তা নাই আমার।

কেন? তোমার কিসের চিন্তা?

লেখক এবার কৌতূহলী।

আমার অনেক টাকার দরকার। প্রতিদিন ড্রাগ না হলে চলে না আমার। প্রচুর টাকা লাগে। ছিনতাই করতে আর ভাল্লাগে না। সেদিন আমার বন্ধুটা ছিনতাই করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল। এখন সে পুলিশ কাস্টডিতে আছে। পুলিশ কাস্টডি আমি ভয় পাই না। পুলিশের কাছে ড্রাগ পাব না, সেটাই সমস্যা। ড্রাগ ছাড়া আমার একদম চলে না।

তাই বলে তুমি আমার একটা লেখা নিজের বলে চালিয়ে দিতে চাও?

হু। এটা নিশ্চিত একটা ইনকামের উপায়। আপনার শেষ বইটা দেখলাম ইতোমধ্যেই বাংলা সাহিত্যের বেস্ট সেলার তকমা পেয়ে গেছে। আপনার একটা বই যদি আমার নামে ছাপাতে পারি, তবে এটা একটা নিশ্চিত আর নিরাপদ ইনকামের উপায় হবে, নয় কি?

ও আচ্ছা! এই বুদ্ধি!

রওনক সাহেব চরম উত্তেজিত এবার।

তা তোমার কি করে মনে হলো, আমার সত্তা তোমার কাছে বিকিয়ে দেব? লেখালেখি আমার কাছে কী, জানো সেটা? আমার আত্মা। আমার আত্মা!

চিৎকার করে উঠলেন রওনক সাহেব।

আমি জানি লেখালেখি আপনার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু। কিন্তু এটা নিশ্চয়ই অস্বীকার করবেন না যে, তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ আপনার জীবন।

তুমি কি আমাকে খুন করার হুমকি দিচ্ছ?

আপনি মানুষের মন নিয়ে লেখেন। আর আমার কথা আপনি বুঝবেন না, তাই কি হয়? ঠিক ধরেছেন। আপনি যদি আমার প্রস্তাবে রাজী না হন, তবে আমি সেটাই করব। আর জানেন তো, এদেশে  খুনের কোনো শাস্তি হয় না? সাগর-রুনি নিয়ে তো অনেক করলেন আপনারা। খুনিদের কিছু হয়েছে? যতদূর মনে পড়ে আপনিও তো পত্রিকায় এ নিয়ে একটা কলাম লিখেছিলেন।

তুমি যুবক ভুল করছ। ভুল মানুষকে ধরে এনেছো।

রওনক সাহেবের দৃঢ় উচ্চারণ।

ঠিক আছে। তবে তৈরি হন। রাজীব পকেট থেকে ছোট্ট রিভলবারটি বের করল। স্যার, আপনি আমার জন্য কাজটি কঠিন করে দিলেন। ছোটবেলা থেকেই আপনার লেখা পড়েছি। আপনার এক বিরাট ফ্যান ছিলাম তখন। আপনাকে খুন করাটা আমার জন্য কিছুটা কষ্টের। তবু, উপায় নেই।

রাজীব রিভলবারটি রওনক সাহেবের কপালে ঠেকাল।

রওনক সাহেবের ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। এত স্মার্ট একটা ছেলে, পড়ুয়া একটা ছেলে তাকে খুন করবে! তবু বন্দুকের শীতল স্পর্শে তার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল।

স্যার, স্যাকন্ড থট দেবেন? অনেক সময় স্যাকন্ড থট অনেক বিবেচনাপ্রসূত হয়। স্যার, আপনার ছেলের কথাটা একবার ভাবেন। পিচ্চি ছেলে। সে কী করে তার বাকিটা জীবন কাটাবে, একবার ভাবেন। আপনার স্ত্রী কি সারাজীবন তাকে আগলে রাখতে পারবে? আপনি মরলে কী হবে আপনার ছেলের?

রওনক সাহেবের চোখে শুভর নিষ্পাপ চেহারা ভেসে উঠল। সেদিন টিভিতে তার চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছিল ছেলেটা কতটা অসহায় হয়ে পড়েছে। সেই ছেলেটাকে নিজের লেখার জন্য এতিম করে দিবেন তিনি? ছেলে বড়, না লেখা বড়? নিশ্চয়ই ছেলে বড়। আর কিছু ভাবলেন না তিনি। রাজি হয়ে গেলেন রাজীবের প্রস্তাবে।

 

৪.

রওনক সাহেব লিখছেন। আর কোন কাজ নাই। সারাদিন লেখা। কাহিনী নির্মাণ, চরিত্র চিত্রণ, সংলাপ নির্বাচন- এমন নিবিড় ভাবে মনোনিবেশ আর কখনোই করতে পারেননি তিনি লেখায়। লেখা তরতর করে এগিয়ে চলেছে। একটাই চিন্তা- তাড়াতাড়ি লিখতে হবে। যত তাড়াতাড়ি শেষ করা যাবে লেখাটা, রওনক সাহেবের মুক্তি তত তাড়াতাড়ি হবে। এই বন্দী অবস্থায় আজ সাতদিন হয়ে গেল। দিনে একবার রাজীব আসে। লেখার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চায়। পাঁচ দশ মিনিট পর চলে যায়। আজ সমকাল পত্রিকাটি নিয়ে এল সে। বলল, স্যার, আপনাকে নিয়ে বাইরে তো তুলকালাম অবস্থা। আজ দৈনিক সমকালের সম্পাদকীয় পড়ে দেখেন।

সম্পাদকীয় তাকে নিয়েই লেখা হয়েছে।

‘রওনক ইসলাম কোথায়?

অতি দ্রুত তাকে খুঁজে বের করা হোক’

১০ এপ্রিল, ২০১৮ ঠিক এমন একটি শিরোনাম দিয়ে আমরা একটি সম্পাদকীয় লিখেছিলাম। ছয় মাসের মধ্যে আজ আবার একই শিরোনামে লিখতে হলো বলে আমরা মর্মাহত। সেবার নামটি ছিল অন্য একজনের আর আজ রওনক ইসলাম। মানুষ দু’জন দু’জগতের। একজন রাজনীতির জগতের। আরেকজন সাহিত্যের। জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক রওনক ইসলাম বাংলাদেশের এক বিরল সম্পদ। মাত্র এক দশকে বাংলা সাহিত্যকে তিনি যেখানে নিয়ে গেছেন তাতে তার প্রতি আমরা চিরকৃতজ্ঞ। তার কল্যাণে বাংলাদেশের সাহিত্য আজ সারাবিশ্বে সমাদৃত। তার শেষ উপন্যাস ‘লাশকাটা ঘরে’ জায়গা করে নিয়েছে উইকিপিডিয়ার লিস্ট অব বেস্ট সেলিং বুকস-এ। অতি সম্প্রতি তিনি পেয়েছেন দ্য ম্যান বুকার প্রাইজ যা আমাদের দেশের জন্য এক বিরল সম্মানের বিষয়। তার কাছ থেকে আমাদের পাবার আছে আরও অনেক কিছু। এমন একজন লেখক রাজধানীর রাস্তা থেকে দিনেদুপুরে উধাও হয়ে গেছেন-এ খবর উদ্বেগজনক। উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়  যখন আমরা দেখি বিষয়টিকে পলিটিসাইজ করা হচ্ছে ন্যক্কারজনকভাবে। পলিটিক্স বাদ দিয়ে আমরা এমন অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে এই গুম রহস্যের ত্বরিত সমাধান চাই।

 

৫.

উপন্যাস লেখা শেষ। নামটিও রওনক সাহেব দিয়েছেন। শঙ্খচিল। পাণ্ডুলিপিটি রাজীবের হাতে তুলে দিয়ে তিনি বললেন, এই নাও। আমার জীবনের সেরা লেখা এটা। জানিনা আর চেষ্টা করেও এমন লেখা লিখতে পারব কিনা! এবার আমাকে মুক্তি দাও। রাজীব বলল, আপনি কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কাউকে এ ঘটনা বলবেন না। যদি বলেন তবে কিন্তু আপনার ছেলেকে হারাবেন। মনে রাখবেন, আমার সাথে আরও কয়েকজন আছে।

না, বলব না তুমি নিশ্চিত থাক। আমাকে যে আজ ছেড়ে দিচ্ছ, সেজন্য সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব তোমার প্রতি। তোমার ভদ্র ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমার চিন্তা একটাই। খবরটা নিয়ে দেশে যা শুরু হয়েছে তাতে আমি ফিরে গিয়ে সবাইকে কী বলব?

বলে দিবেন লেখালেখির কাজে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। আপনারা লেখক মানুষ। আপনারা এরকম খামখেয়ালি হবেন, এটা সবাই জানে।

হু, তাই বলতে হবে। দেখা যাক।

 

৬.

রাজীব বসে আছে প্রথম প্রকাশের রহমান সাহেবের সামনে। অনেক কষ্টে তার দেখা পেল রাজীব।

আপনি নিজে পড়েছেন লেখাটা?

হু, পড়েছি রাজীব সাহেব। ততটা খারাপ হয় নাই। তবে পাবলিক খাওয়ার মতো হয় নাই। আরও লিখতে থাকুন। আপনার লেখার হাত ভালো। ভালো করবেন।

আপনি বলছেন, এ লেখাটি ছাপানো যাবে না?

কতবার বলব রাজীব সাহেব? লেগে থাকেন। নিশ্চয়ই হবে।

রাজীব অনেক কষ্টে তার রাগ সামলাচ্ছে।

আচ্ছা স্যার, আমার শেষ প্রশ্ন। এই লেখাটাই যদি রওনক ইসলাম এনে দিতেন তবে তো না পড়েই ছাপাখানায় পাঠিয়ে দিতেন, নয় কি?

রাজীব, আপনি কার সাথে কার তুলনা করছেন? রওনক ইসলাম কখনোই এই মানের লেখা লিখতেন না। আমি এখন উঠব। রওনক সাহেবের বাসায় যেতে হবে। বাই।

রহমান সাহেব তার চেয়ার ছাড়লেন।

হতবাক ও উত্তেজিত রাজীব রাগে গজগজ করতে করতে অন্যপ্রকাশ থেকে বের হলো। সে এ বই প্রকাশের ব্যবস্থা করে তবেই  ক্ষান্ত দেবে।

রাজীবের সামনে আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। বড় বড় সব প্রকাশনী তো বটেই। ছোট প্রকাশনীগুলোও তাকে ফিরিয়ে দিল। সবার এক মতামত, বইটা প্রকাশযোগ্য নয়। লেখককে আরও চেষ্টা করতে হবে।

রাজীব এবার অন্য পথ ধরল। নিজ খরচে বইটি প্রকাশের ব্যবস্থা করল। এজন্য তাকে অবশ্য ছিনতাইয়ের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দিতে হলো। বইটা প্রকাশ হলে তবে তো সব টাকা সুদে আসলে ফেরত আসবে। যেনতেন লেখকের লেখা না বইটি। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে সফলতম লেখকের কলম নিঃসৃত এই পাণ্ডুলিপি।

 

৭.

রাজীবকে নিজ বাসায় দেখতে পেয়ে রওনক সাহেব অবাক। হাতে বড় একটি বস্তা। বস্তা ভর্তি কী যেন!

কী ব্যাপার রাজীব! আবার কেন? আবার কী চাও?

স্যার, ক্ষমা করবেন আমায়। আপনার পাণ্ডুলিপিটা ফিরিয়ে দিতে আসলাম। এখানে আমার নামে প্রকাশিত বইগুলোও থাকল। সব পুড়িয়ে ফেলবেন। একজন পাঠকও আমার বইটি পড়েনি। পাণ্ডুলিপিটি আপনি আপনার নামে প্রকাশ করুন। আমি বুঝতে পেরেছি লেখা কেউ কখনও চুরি করতে পারে না। করলেও তার কোনো লাভ হয় না। টাকা-পয়সা ধন-দৌলত কখনও একজন লেখকের লেখার সমকক্ষ নয়।

রওনক ইসলামের বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই রাজীব চলে গেল। পেছনে পড়ে থাকল বস্তাভর্তি শঙ্খচিল!

লেখক : গল্পকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares