একটি ছবির অতীত ইতিহাস : কুশল ইশতিয়াক

গল্প

একটি ছবির অতীত ইতিহাস

কুশল ইশতিয়াক

ঈদের রাতে, যখন বাড়িতে ওরা রাতের খাবার খাচ্ছিল টেবিলে, তখন বৃদ্ধটি টের পায় টিনের চালে ঝিরিঝিরি কিছু পতনের শব্দ। এই শব্দে এমনকি কান খাড়া হয় বাকিদেরও, তবে বৃদ্ধের বড় ছেলের নয়, সে সোফায় আধশোয়া অবস্থায় টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে। আর তারা, যারা টিনের চালে সেই শব্দ শোনে, যা মাঝে মাঝে খুবই তীব্র, আবার মাঝে মাঝে খুবই মিহি, যেন বাতাস এসে উড়িয়ে নিয়ে যায় সেইসব, আবার ফিরিয়ে আনে, তাদের মনে হয় বৃষ্টি, আবার মনে হয় বৃষ্টি এমন হয় না কখনও। তারা যখন এই শব্দ শোনে, তখন পুত্রবধূটি চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে থাকে এবং সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে বৃদ্ধের বড় নাতি বলে যে,  টিনের চালে সেইসময় যা পতিত হয়েছিল তা বৃষ্টির ফোঁটা নয়, বরং তার নানাবাড়িতে আসার সময় সে আকাশ থেকে আলোর চূর্ণের একটি স্তম্ভ খসে পড়তে দেখে। ঈদ-রাতে নিমন্ত্রণে সে আসছিল একা, তার বাবা মা থাকে দূরে, একটি গ্রামে, আর তার বোন এসে পৌঁছেছিল আগেই, তখন তার দৃষ্টিগোচর হয় দৃশ্যটি তাতে এরকম মনে হয়, যেন অনেক উঁচু থেকে উজ্জ্বল  একটি তারা চিনির গুঁড়োর মতো ঝরে পড়ছিল। তো, এই পতনের শব্দে বাড়িতে থাকা অন্য তিনজনেরও কিছু পরিবর্তন ঘটে; বৃদ্ধটি, যে বলতে গেলে একজন মৃত্যুপথযাত্রী, তার মধ্যে এক অস্বাভাবিক প্রাণসঞ্জীবনীর সঞ্চার ঘটে, ফলত তার বয়স আর বাড়ে না। এটা আমরা পরবর্তীসময় আরও স্পষ্ট দেখতে পাবো। আর ছোট নাতনি যে নিমন্ত্রণে এসেছিল তার ভাইয়ের আগেই, এবং সেরে নিচ্ছিল রাতের ভোজ, তার শরীরের ভিতর অচিরেই কোথাও একটি গাছের চারা জন্মাতে শুরু করে। এই পরিবর্তনগুলো যদিও তাদের কেউ তাৎক্ষণিকভাবে টের পায় না । বৃদ্ধের বড় ছেলেটি ঘুমের ভিতরে বধির হয়ে যায়, এমনকি সেও এটা ততক্ষণ পর্যন্ত বুঝতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার কাজে যায়, সে কাজ করত রেলওয়েতে, একজন সিগনালম্যান হিসেবে, যেহেতু সে বধির, সুতরাং ট্রেনটি আসার শব্দও শুনতে পায় না।  ফলে দুইদিন পর মারাত্মক একটি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে তার জন্য। আর এই দুর্ঘটনায় প্রচুর মানুষ মারা যায়। এই কারণে তাকে প্রেরণ করা হয় কারাগারে, এবং তার শাস্তি হয় যাবজ্জীবন কারাদ-। বাকি জীবন সে জেলেই কাটিয়ে দেয়, নিরপরাধ, যেহেতু বধির হয়ে যাওয়ার পেছনে তার কোনো হাত নেই, এক্ষেত্রে নিয়তিই থাকে দায়ী, ঠিক এই কারণে এই জগৎটিতে তেমন কোনো দুর্ঘটনা নিয়তি ঘটতেও দেয় না। কিন্তু যে জগৎটি বাস্তব এবং বর্তমান, সেই জগতে যে একেবারে কিছুই ঘটে না তা নয়, একটি অঘটন এখানেও ঘটে বধির মানুষটির কারণে, এখানে যেটা হয় আরকি, সে রাস্তা থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরবার সময় খেয়াল করে না একটা গাড়ি, আর গাড়ির চালক বধিরকে বাঁচাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটা ফুটপাথে উঠিয়ে দেয়। তার ফলে মারা যায় আরেকজন, আর যে মারা যায় সে থাকে বৃদ্ধেরই বড় নাতি, যে হেঁটে হেঁটে হোস্টেলে ফিরছিল কলেজ থেকে। সেই নাতি, যে ওইদিন ঈদের রাতে আলোকচূর্ণ পড়তে দেখেছিল। সুতরাং এই আশ্চর্য ঘটনার যে ছিল একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী, সে আর জীবিত রইল না, ফলে জনে জনে সেই রাতের ঘটনা বলে বেড়াবার মতন কেউ রইল না, এতে নিয়তি বলতে গেলে এক প্রকার হাঁফ ছেড়েই বাঁচে, আর বধিরও রাস্তা থেকে হেঁটে আসার সময়  খেয়াল করে না যে তার ভাগ্নের দুর্ঘটনাটি তার জন্যই ঘটে।

আদালতে সেই গাড়ি চালকের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। অথচ গাড়ি চালক প্রকৃত অর্থে ছিল নির্দোষ। সে বধির মানুষটিকে বাঁচাতে গিয়ে গাড়িটা তুলে দিয়েছিল ফুটপাথে। আর বধিরের ভাগ্নের ঠিক ওইসময়ই কেন ফুটপাথ ধরে যাওয়া লাগল, এ নিয়ে নিয়তি ছেলেটাকে দোষারোপও করে। মামলার কারণে গাড়ির চালককে গ্রেফতার করা হয়, তার শাস্তি হয়; সে কারাগারে দিনের পর দিন হত্যার দায়ে সাজা ভোগ করে। কিন্তু একজন নিরপরাধ ব্যক্তি আদালত থেকে সাজাপ্রাপ্ত হলে পর দেশটির ন্যায়বিচার আর অক্ষত থাকে না। এ যেন নিষ্পাপ আর প্রচ- শুভ্র কিছুতে কালি লেগে যাওয়ার মতো, অথবা একটি অক্ষত কাচে চিড় ধরবার মতো। অথবা এও বলা চলে দেশের ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে একটি ছোট ভাঙন ঘটে, ছোট কিন্তু অনতিক্রম্য, অনিচ্ছাকৃত আর অজ্ঞতাবশত এবং তার ফলে দেশের বিচার ব্যবস্থায় নৈরাজ্য ও অনৈতিকতার সুত্রপাত ঘটে। দেশের সুশাসন ব্যাহত হয়, নিয়তি অনুসারেই, কারণ প্রতিটা ঘটনার সাথে জড়িত থাকে তার নিকট ভবিষ্যৎ আর দূর পরিণতি, যা এড়ানো কারও পক্ষেই সম্ভব না। তো, এই যে বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়ে যায়, একটি ভুল বিচারের কারণে; ঠিক এই সময় অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূটি জন্ম দিল সেই মেয়েটিকে, যে ছিল অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল আর এত রূপবতী যে তার দিক থেকে চোখ ফেরানোই কঠিন, এবং তার কানদুটি ছিল বেশ বড় ও লম্বা। যদিও তার জন্মের মূল রহস্য সম্পর্কে অবগত ছিল না তার বাবা, এমনকি তার মা নিজেও যে ওই রাতে ওই আশ্চর্য শব্দে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিল। আর যেহেতু তারা একই সাথে ঘুমায়, প্রতিরাতে, সেহেতু তাদের কাছে এই কন্যাসন্তানের জন্ম একটি স্বাভাবিক ঘটনার মতনই লাগে।

মেয়েটি বাবার ও মায়ের আশ্রয়ে বড় হয়ে ওঠে, ঘুরঘুর করে তার ফুপাতো বোনটির পাশে, কম কথা বলা কিশোরী সেই বোন, যে স্কুলে পড়ত, যার শরীরের ভিতরে গাছ জন্ম নেয়াতে সে দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিল আর খুব সবুজ হয়ে উঠছিল তার দেহ, তাকে দেখলে একটি গাছের মতোন মনে হতে থাকে, শুকনো এবং প্যাঁচানো মোড়ানো আর খুব জড়, নানাবাড়ি ছেড়ে সে কোথাও যেতেও চায় না। এমনকি ঘর ছেড়ে উঠানেও বের হয় না খুব একটা। এতটাই জড়, যে সেই ঈদের রাতের পর একদিনের জন্যও সে কোথাও যায়নি, এমনকি তার বাবা মায়ের কাছেও না, দূরবর্তী গ্রামে, সন্তানহারা সেই বাবা মা, যাদের বড় ছেলেটা আটাশ বছর বয়সে মারা গেল গাড়ির নিচে চাপা পড়ে।

বড়-কান আরও বড় হয়ে উঠলে স্কুলে ভর্তি হয়। যদিও দেশের অস্থিতিশীলতা তখন চরমাকার ধারণ করেছে এবং খুন, রাহাজানি, লুটপাট ধর্ষণ প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে এমনভাবে, যার কোনো বিচার নেই, আর যদি-বা কোনোক্রমে বিচার হয়েও যায়, তাতে অবশ্যই কিছু না কিছু ভুল হয়। যেন দেশের আইন শৃঙ্খলার লাগাম ছুটে গেছে নিয়ন্ত্রণহীন একটি ট্রেনের মতন, এমন অবস্থায় বড় কান একদিন তার সহপাঠীদের বলে যে, সবকিছু ঠিক হতে হলে তাকে আবার জন্ম নিতে হবে। তার সহপাঠিরা এই কথার অর্থ বোঝে না, একদমই না, তবে তারা বড়কানকে আসলে খুবই মান্য করত, তার মধ্যকার স্বভাবজাত সাহস আর অপরিসীম সৌন্দর্যের কারণে। যদিও তার পরিবার দিন দিন হয়ে ওঠে খুব দরিদ্র, যেহেতু তার বাবা চাকরি হারিয়ে উপার্জনক্ষমহীন হয়ে পড়েছিল আগেই, আর উপার্জনহীন হওয়ার কারণে তারা খেতেও পারত না ঠিকমতো, ফলে তাদের বয়স দ্রুতই বেড়ে যায়, এত দ্রুত, যে স্বামী-স্ত্রী অর্থাৎ বড়-কানের বাবা-মা দুজনই হয়ে পড়ে বৃদ্ধ, আর বৃদ্ধ পিতামহের বয়স আর বাড়ে না, সেক্ষেত্রে তাদের তিনজনকেই সমবয়সি বলে মনে হয়। এই তিনজনের অধিকাংশ সময় কাটে ঘরের ভেতরে, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ায় তারা বাইরেও যেতে পারে না তেমন, অন্যদিকে, নাতনি-গাছটি ততদিনে ডালপালা ছড়িয়েছে ঘরের ভিতরে, এবং অন্যদের কষ্ট সে সহ্যও করতে না পেরে অচিরেই ফল দেওয়া শুরু করে।

দিন দিন দেশটির বিশৃঙ্খলা আরও বাড়তে থাকে। একসময় সামরিক শাসন জারি হয়। তাতে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটলেও পুরোপুরি ঠিক হয় না। এই অবস্থায় একজন তরুণ আর্মি অফিসার বড়-কানকে প্রেম নিবেদন করে বসে। বড়কান প্রথমে রাজি হয় না, কিন্তু সময় যতই এগোয়, সে ততটাই হয় নমনীয় আর একসময় অফিসারটির প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। চুটিয়ে প্রেম করে তারা দুজন। যখন তাদের প্রেম টালমাটাল বেসামাল আর তুঙ্গে, তখন অফিসারটির অনুরোধে বড়-কান একদিন তার বাংলোতে যায়, আর তারা লিপ্ত হয় যৌনসম্পর্কে, বিছানায়, বড়কানের জন্য ছিল সেটিই প্রথম, যদিও অফিসারটির নয়, এর কিছুক্ষণ পর আর্মি অফিসারটি মারা যায়। একজন আর্মি অফিসারকে হত্যার অভিযোগে বড়-কানকে গ্রেফতার করা হয়, এবং প্রেরণ করা হয় কারাগারে। সেই কারাগারটিতে, যে কারাগারে তার বধির পিতা, যদিও আসল পিতা নয়, কারণ বড়-কানের মূলত কোনো পিতা নেই, বন্দি ছিল পাশাপাশি জগতে, কিন্তু এই জগতে শুধুমাত্র বড়কান বন্দি থাকে। জেলের ভিতর সে তার পালিত পিতার অবয়ব দেখতে পায়, এমনকি তাদের বাক্যালাপ, কিন্তু কেউই বোঝে না কীভাবে, না মেয়ে না পিতা, এমনকি এটা দেখে রক্ষীরাও ভয় পায়, তারা ভাবতে থাকে বড়-কান নিশ্চয়ই জাদু জানে, যে অচিরেই জেলের গরাদ থেকে বের হয়ে এসে তাদের হত্যা করবে। কিন্তু বড়-কানের এরকম কোনো ক্ষমতা ছিল না, বড়-কান শুধুই বড়-কান আর যথেষ্ট রূপবতী একজন মেয়ে, যার সাথে সঙ্গমে নিহত হয় মানুষ আর এইসকল ঘটনা দেখে নিয়তি নিজেও যথেষ্ট বিব্রত, এবং তার কারণে আরও একজন নিরপরাধের সাজা পাবার সম্ভাবনা জাগ্রত হলে নিয়তি বড়-কানকে চিরতরে মুক্তি দিতে চায়। কিন্তু এভাবে মুক্তি দেওয়া নিয়তির পক্ষে সম্ভব হয় না বলে সে পুরো কারাগারটিকেই অদৃশ্য করে দেয় কারাগারটির জায়গা থেকে। তাতে বড়কানের যে আবার জন্ম নেওয়া হয়, তা না, কিন্তু তার অস্তিত্ব তো কিছুটা হলেও অস্বীকার করা হয়। হয়তো জন্মও। কিংবা হতে পারে নিয়তি কারাগারটিকে অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলে, যার কিছু জানা যায় না পরদিন শহরের মানুষ কারাগারের সামনে জড়ো হয়ে দেখতে পায়, কারাগারের বদলে ওখানে কারাগারের একটি ছবি দাঁড়িয়ে আছে।

লেখক : গল্পকার

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares