মাধু বাসন্তী : নাহিদা নাহিদ

গল্প

মাধু বাসন্তী

নাহিদা নাহিদ

 

কেরোসিনের কুপির নীলচে আলোর শিখায় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বাঁশির লজ্জিত অনুতপ্ত ম্লান মুখ। বাঁশির পায়ের কাছে পড়ে আছে নয়নতারা। কথা বলতে পারে না মেয়েটা। তার গালের ডান পাশটা লাল হয়ে থাকে প্রায়ই, সিঁদুর আর জবার মাঝামাঝি কেমন একটা রঙ। গালের এই লালটা দেখার জন্যই বাঁশি তাকে অর্থহীন আক্রোশে আঘাত করে দিনক্ষণহীন, উপলক্ষবিহীন। এসব অপ্রত্যাশিত আঘাতে নয়নতারা কাঁদে না, অপার্থিব এক দুঃখী চেহারায় চেয়ে থাকে অস্ফুট। বাঁশি জানে পৃথিবীর সকল দুঃখী মানুষের চেহারা পবিত্র কিন্তু অস্বচ্ছ। ঈশ্বরের সাথে তার বিরোধ নেই। তবু ঈশ্বর তার কলমে লিখে দিয়েছেন নয়নতারা আর বাঁশির দীর্ঘস্থায়ী জীবনের নতজানু অধোমুখ!

বংশীবাদক বাঁশির ভাবনায় আজ আর কোনো সুন্দর নেই, মধুসঞ্চয়ী সুখ তাকে ছেড়ে গেছে কবে তার আর হিসেব নেই। দারবিশ মিজান উদ্দিন বাউল তাকে শিখিয়েছিল শিল্পীর সুখ বলতে মনোসংযোগ, আবেগের শুদ্ধাচার। সুরসাধনায় জীবন বলতেই রাগ, আলাপ! এখানে প্রলোভনে নারী আসবে শতরূপে কামনায়, ঘোর অথবা মাংস হয়ে। মনে রাখতে হবে মাংসাশী সুখের অপর নাম মৃত্যু। সাবধান! বাঁশি সাবধান হতে পারেনি সর্বনাশ ঘটেছে তার। পাকা সুরসাধকের মতো নারী শরীর ছেকে তুলে আনতে পারেনি বিশুদ্ধ প্রেম। কারও অসহ্য তৃষ্ণায় বলি হয়ে তাল ভুলে প্রথম আলাপেই বেতাল সে। এখন তার আত্মা বিচ্ছিন্ন সুর অর্থহীন চিৎকারে বাজে দশ দিক, সুরের সে গলিত শব নিয়ে বাঁশি পথ ভুলে হাঁটে ভুল ঠিকানায়। এই কর্মহীন অবসাদের জীবনে নয়নতারা তার আরও এক অকস্মাৎ কর্মের অসুখ, পোড়খাওয়া আত্মার পরিণত শোক!

কত ছিল বয়স? নিউ স্টার অপেরায় রাগ ভূপালী বাজাত তখন। প্রতি শো শেষে অধিকারী বাবু জোর করে দর্শককে শুনতে বাধ্য করতেন হংসধ্বনি, বেহাগ শিবমঞ্জুরি। ততক্ষণে ভেতর ঘরের এক নটসম্রাজ্ঞী সাজঘরে সাজ ভুলে শুদ্ধ হতে শুরু করত আপন মনে। সুরের আলস্য আবেগী প্রেম হয়ে মিশে যেত বাতাসে। এই সুর তার মুখোশ রঙ পরিষ্কারক। বাঁশি একমনে সঁপে ছিল প্রাণ ! সুরে কাঁদত! কোন শৈশবে নাকি তার নাম ছিল হোসেন আলী। অনাথ আশ্রমের ছেঁড়া কাঁথায় পৌষের শীতবাতাসে ফুঁপিয়ে কাঁদা ছেলেটা কৈশোরেও নাকি ছিল হোসেন আলী, মধ্যরাতে দারবিশ নিজাম বাউলের যৌনসাথী। বাঁশি বাজাতে বাজাতে তেহাইতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়া এই যুবকের ভেতরে আজ সেই আশ্রমবালক বিস্মৃত! এই অপেরার জীবন অন্যরকম ঘোরের জীবন!

বিস্মৃত সে ঘোরের দিনে সুরের দেবতার ক্ষমাহীন অত্যাচারে বাঁশির কণ্ঠ ফুটো হয়ে বেরিয়ে আসত সুর, লাল হয়ে যেত সাদা উত্তরীয় থান। রক্ত! বিরামহীন ক্ষয়ে ক্ষয়ে বাঁশি হয়েছিল নিঃস্ব! রাত শেষে গালিচাকোণে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকত বাঁশি। কখনও কখনও আলতাপরানি এসে তুলে নিতো ঘরে। নরম কাপড় ভিজিয়ে মাথায় চেপে রাখত অনেকক্ষণ। যষ্টিমধুর ডাল ছেঁচে গরমজলে তুলে দিত ঠোঁটে। গলনালি বেয়ে নেমে যাওয়া সে তরল ¯্রােত বাঁশির মৃতসঞ্জীবনী। পরানির হৃদয়ের উষ্ণতা, শরীরের উত্তাপ বাষ্পীভূত হয়ে ছড়িয়ে পড়ত ঘরময়। পদ্মডাটার মতো টলমলে জল পরানির চোখ।

কেন তুমি এমন করে বাজাও?

মাধু বাসন্তী খুঁজি।

সে বুঝি হয়নি?

না হয়নি, দারবিশ বলেছিল খুঁজে নিতে পাইনি কোথাও।

কোথায় মাধু বাসন্তী?

জানি নে, মল্লার আর বেহাগে আটকে থাকে, বাসন্তী আসে না।

কেন আসে না?

প্রেম নেই যে।

প্রেম?

হু।

কেন।

সে আমার হবার নয়? শরীরজুড়ে ক্ষত!

আলতা রঙে সারে না?

তরল রঙে ভয়! রক্তের মতো গাঢ় নয়।

রক্তের রঙ সে কি থাকে।

জন্মের ঠিক না থাকলে সব রঙ ই ফিকে। তা আবার রক্ত !

কী থাকে তবে।

অন্ধকার, গাঢ় অন্ধকার।

পরানি নিখোঁজ হওয়ার পর বাঁশি দল ছেড়েছিল, কী লাভ ঘোরহীন জীবনে খররৌদ্র সয়ে। অপেরায় পরানির চরিত্রটার নাম ছিল কমলা। চুলে বিনুনি করত সে, ঠোঁটে দিত টকটকা রঙিন রঙ। সাদা গালে কী যেন লাগাত ঘষে, তার দু’গাল থাকত টকটকে লালফুল! বাঁশির মনে হতো রাক্ষসী রূপের মাদক নেশাও বুঝি এমন হয় না। শো-এর মাঝে পরানি পানি খেত গপাগপ। পাগলা পানি। লাল চোখে খিস্তি করে বাড়িয়ে দিত মধ্যরাতের চাঁদোয়া মানুষের অশ্লীল সুখ। সেই পরানি হারিয়ে গেল কোথায়! পরানি নেই তো সুখ নেই। পরানি কেন পালিয়ে ছিল কেউ জানে না। খুঁজে পায়নি কেউ। নয়নতারা কাঁদলে তার চোখ লাল হয় যায়। বাঁশির ভালো লাগে খুব, মনে হয় এই তো তার লাল চোখের সেই আলতাপরানি। যার আঁচলে বাঁধা থাকে পরানির মতোই ধুতুরার বিষ!

নাহ আর না। বাঁশি ঠিক করে আজ রাতেই শুরু করবে তার অন্তিম যাত্রা। মরণের সাথে সোহাগ প্রেমের এইতো সময়! কাল সকাল হতেই নয়নতারার এক নতুন জীবন। আজকের এ রাতের প্রস্তুতি তার দীর্ঘদিনের! বাঁশির কেমন স্বস্তি আসে মনে অন্ধকারে কান পাতে পৃথিবীর শেষ কোলাহলে। কেউ কি কাঁদছে তার বিচ্ছেদে?

হু এইতো দূরে শোনা যাচ্ছে কান্নার শব্দ। একটা পাগলা কুকুর কুঁই কুঁই করে কাঁদছে। আহা কাঁদুক। বোবা পশু তবুও কাঁদে শুধু তার নয়নতারা কাঁদতে জানে না। খুব বেশি মারলে গোঙ্গায়, মুখ দিয়ে লালা পড়ে ভেসে যায় গাল। চোখের কোণ হয় বিচ্ছিরি লাল। নয়নতারা কি জানে বাঁশি আর লাল ভালোবাসে না। রক্তলাল, আলতা লাল, বাসন্তী লাল সব মিছে! বাঁশি চোখ ফেরায়। নয়নতারা এখন পড়ে আছে বিছানায়, হেলান মাথা একদিকে কাত। ছেঁড়া শাড়ি আলুথালু, হাঁটু পর্যন্ত সাদা চামড়া প্রকাশ্য। বাঁশি ছুঁয়ে দেখে শেষবারের মতো তার শীতল নগ্ন পা। হঠাৎ তার গা কেমন করে, ঝিমঝিম করে। শরীরে কী যেন হয়! বিস্মৃত হয় শোক! বুকের ভেতর শুরু হয় তোলপাড়, তার নিঃসঙ্গ যাত্রায় নয়নতারা কেমন হা রে রে করে ছুটে আসছে যেন। বাঁশির মনে হয় নয়নতারা এক পপ্রলয়ঙ্করী ঝড়। ঘূর্ণন শুরু হয় বুকের পাঁজরে। বাঁশি সরে যেতে চায়। পারে না। আড়মোড়া ভেঙে হৃদয়ে জাগে এক অন্যরকম বোধ। খুব ইচ্ছে করে তার ব্যথার পাহাড় ডিঙিয়ে জড়িয়ে রাখতে নয়নতারার মুখ। নয়নতারার বিছানায় পাশে দুটো তিনটে কাঁচা পেয়ারা, হাট থেকে এনেছিল বাঁশি। পেঁয়ারার অসমান বুকে কালশিটে দাগ, ভিড়ের মাঝে কেউ একজন হয়তো বসিয়েছে নখের আঁচড়! ঠিক তার মতো কেউ। বাঁশির নিজেকে মনে হয় এক অন্ধসুখ শিকারি, শুক্লা দ্বাদশীর রাতে ষোড়শী ব্যথাতুর চোখের মায়া যে দেখতে জানে না তার জীবনে প্রেম কিসে? নয়নতারার ঠোঁট কাঁপছে, বাঁশির মনে হয় এ ঠোঁটেই মাধু বাসন্তী বাঁশি শুধু চোখ খুলে দেখেনি। কী মনে হতেই বাঁশি আজ ঠোঁট বাড়ায়, কণ্ঠে তুলে নিতে চায় ক্ষত আত্মার সেই বিচ্ছেদী সুর! আশ্চর্য তার এই মনোবিকলনে কী যেন হয়ে যায় ব্রহ্মাণ্ডে। স্রষ্টা স্বয়ং ছুটে আসেন ব্যস্ত হয়ে। নয়নতারার প্রতি বাঁশির সকল অযাচিত অবহেলা আর অর্থহীন অত্যচারের শাস্তির আয়োজন শুরু হয় চারপাশে। মহাবিশ্বে শুরু হয় প্রলয় নাচ। বাতাস কুণ্ডলিত শলাকায় ভর করে এলোমেলো ছুটতে থাকে। আলো-আঁধারি দলছুট মেঘের খেলাশেষে বাঁশির মনে হয় তার ঘরের ছাদটা নেই। নয়নতারার মাথার শিথানটাও নেই। একটুকরা ফুসফুসীয় বাতাস লক্ষ লক্ষ কোটি গুণ হয়ে কেমন করে গান গাইছে ঝড়ের বাতাসে। বাঁশি আঁধারে হাতড়ে হাতড়ে নয়নতারার হাত খোঁজে, পা খোঁজে। পায় না। খুঁজে যায়, খুঁজেই যায়। উল্টোদিকে কোথাও কিছু হয়, বাঁশি ঝুপ করে পড়ে যায় মাটিতে। আহ্ ব্যথা, হঠাৎ আলোর ঝলকানি।

বাঁশি পরিচিত ঘর খোঁজে, নেই। কে যেন হেঁটে আসে কাছে। গম্ভীর! আশ্চর্য বাঁশি কি মরে গেছে? রাতের আলো বদলে গিয়ে এখানে দিন কেন, এটা মর্ত্যলোক না পাতাল।

বাঁশি চোখ কচলে দেখে বড় একটা বাগান, ঘাসে নিড়ানি দেয়া আলগা মাটিতে ছোট ছোট ঘাসফুল ! তার ওপরে লম্বা একটা ছায়া গাছ, কত হবে দৈর্ঘ? বুক সমান, গায়ে তার পাঁচ-সাতটা ফুল! রঙ কালো অথবা বেগুনি? দিনের আলোতেও স্পষ্ট নয়।

বাঁশির সামনে মুণ্ডিত মস্তকের এক বামুন। তার পেছনের এটাকে কী বলে? টিকি? কপালে তিলক! বাঁশি ভেবে পায় না এখানে সে কেমন করে এল। জন্মসূত্রে সে কোন ধর্মের ছিল? আচ্ছা এই লোকটার কাছে যদি জানতে চায় এখানে সে কেমন করে এল, তবে? এই লোকটা কী বলবে তাকে কোথায় তার ঘর, কোথায় বাড়ি, কোথায় বিছানাপত্র?

বাঁশির মনে পড়ে না রাতে সে সত্যি সত্যি ধুতুরার বিষ খেয়েছিল কিনা! হয়তো খেয়েছে, হয়তো না। বাঁশি ব্যাকুল হয়ে ডাকে

নয়নতারা

নয়নতারা

ডাক শুনে ভারী পায়ে সেই লোকটাই এগিয়ে আসে। নিঃশব্দে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় বাগানের কাছে সেখানে অজস্র নয়নতারা গাছ। লোকটা একটা গাছের ডাল ধরিয়ে দেয় হাতে। পাতা ক্ষয়ে যাওয়া বিবর্ণ ডাল। সাদা ফুলগুলো সব কালো হয়ে গেছে, কোনটা খয়েরি কোনটা বেগুনি! এরপর লোকটা একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে আউড়ে যায়Ñ ‘ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্। ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম।’ লোকটার উচ্চারিত মন্ত্রে গাঢ় হতে শুরু করে পুবের আকাশ, একসময় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। বাঁশি হাত উল্টে চোখের পাতা ঢাকে। হঠাৎ ডাল থেকে একটা ফুল গড়িয়ে পড়ে পায়ের পাতায়, এই তবে নয়নতারা? এত চমৎকার! গন্ধ নেই ফুলটার গায়ে, তবু কী স্নিগ্ধ! আচ্ছা ফুলটা কী দুঃখী? বাঁশি উত্তর পায় না তার আগেই আলো কমে গিয়ে আবার চলে আসে সন্ধ্যার অন্ধকার। বাঁশি সেই আলো অন্ধকারের খেলায় অস্পষ্ট চোখে দেখতে পায় সেই খনখনে বুড়োর দানব হাত কিলবিল করছে নয়নতারার ডালে, নয়নতারার হাত ছিঁড়ছে, পা ছিঁড়ছে, বুকের মাঝখান থেকে খুবলে দিচ্ছে মাংস। বাঁশি ব্যথা পায়। বাঁশির মন কাঁদে। আহা, তার নয়নতারা, কথা বলতে না পারা দুঃখ।

ছিঁড়বেন না। দোহাই ছিঁড়বেন না, নয়নতারা নিরীহ ফুল।

লোকটা তেড়ে আসে, বাঁশি অন্ধকার বা আলোতে দেখতে পায় তার জবাকুসুম সঙ্কাশ চোখ। ‘রে স্বার্থপর পাষ- তুই যখন মারিস এই বোবা মেয়েকে তখন তার গায়ে লাগে না?’

বাঁশি ভ্যাবাচেকা খায়! তাইতো সে কেন এমন? চেয়ে দেখে তার সম্মুখের নয়নতারা গাছটা উধাও, একটা জবা গাছ সেখানে। একটা ঘোমটা পরা মেয়ে মল বাজিয়ে বাগান জুড়ে হাঁটে ফুলের মতো, তাঁর সিঁথি জুড়ে ল্যাপ্টানো সিঁদুর। কাঁটাঝোপ সরিয়ে সে মেয়েটা এসে দাঁড়ায় ঘৃতকুমারীর নিচে। বাঁশির চেনা লাগে খুব, অদৃশ্য রহস্যময় কোনো রাতে তার কণ্ঠে ছিল কমলার সুন্দরীর গান। বাঁশি চোখ ফেরায়, নয়নতারার ঝোপটা খোঁজে।

পাল্টে যায় দৃশ্যপট, বাগানজুড়ে এখন এলাচ গাছ।

নিমছাল, লতাগুল্ম হরীতকী বহেড়া। কোথায় নয়নতারা। হঠাৎ দেখে হাজার হাজার গাছ মুখ হয়ে ধেয়ে আসছে তার চারপাশে। লজ্জাবতী, দারুচিনি কালোমেঘ। তেলাকুচি পাতার পেছন থেকে নয়নতারা। ছুটে আসে আবার সেই বুড়োÑ

বুঝলে বাপু দাঁত ব্যথা হলে পেয়ারার ডাল, অজীর্ণ হলে নিমছাল।

বাঁশির চারপাশে এখন নানান রকম গাছ, লতাপাতা মানুষ। আনাগোনায় একজন এল একজিমা রোগ নিয়ে, বহুমূত্র রোগে ত্রাহী মধুসূদন অবস্থা এক উঠতি যুবকের। বুড়ো কবিরাজ দাওয়াই দেয় ‘রাতে ঘুমানোর আগে নয়নতারা ফুল সিদ্ধ করে মিছরি যোগে খেতে হবে অমাবস্যায়। মিছরি পাওয়া যাবে গন্ধবণিক বাসুর দোকানে’ হায় তবে কি তিন মাসের টোটকায় কোনো ধ্বজভঙ্গ যুবকের মূত্রথলি পরিষ্কারের দায়িত্ব নিতেই জন্মেছিল নয়নতারা। তার নয়নতারা!

বাঁশি অস্থির হয় বাগানটা খোঁজে আবার। বুড়ো কবিরাজ তাকে কী যেন খাইয়ে দিয়েছে ঝিমুনি ভাব মাথায়, অবসন্ন শ্রান্ত শরীর নিয়ে তবু সে ওঠে। সারি সারি বৃক্ষ স্থাণুর মতো অনড়। অনন্ত নক্ষত্রকাল সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায় তার নিঃসঙ্গতায়। সময় থমকে আছে। বাঁশির কিছু একটা করা প্রয়োজন,তার শিরদাড়া শক্ত।

ঝোপ থেকে তুলে নেয় লাঠি, একের পর এক গোড়াসুদ্ধ তুলে নেয় লতাগুল্ম, ধ্বংস করে দেবে সব। বাঁশির অত্যাচারে সব গাছের শ্বাস পড়ে একসাথে, হাহাকার করে ওঠে ডালপাতা ফুলফল। সব হাহাকার এক হয়ে হয়ে যায় অপেরার সুর। রাগ ভূপালি। ইশ কী বীভৎস। বাঁশি তার কান চেপে ধরে। না চাই না তার অপেরা আলতা পরানি, না পাওয়া মাধুবাসন্তী পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত সুর কান্না। সুর আর কান্নার এই চিৎকার চাই না তার। শব্দহীন হোক পৃথিবী। বাঁশি শব্দ থেকে বাঁচতে এলোপাতাড়ি ছুটে যায় এদিক-সেদিক। হাঁপরের শব্দ হয় বুকে। আকাশে সূর্য ডুবে যায়! গাছেদের দীর্ঘশ্বাস জোর থেকে আরও জোরে বয়। ভীত বাঁশি জোরসে আঁকড়ে ধরে একটা দেবদারু গাছের গোড়া। গাছের নিচে বিশাল খাদ চলে গেছে পাতাল অব্দি। মৃত্যুর কিনারায় দাঁড়িয়ে বাঁশি উপলব্ধি করে শব্দের অত্যাচারে মৃত্যু হতে পারে। নিঃশব্দ পৃথিবীরও থাকে নিজস্ব সুর হয়তো তারই নাম মাধুবাসন্তী! হয়তো নিঃসঙ্গ যাপন এ সুর আপন হয় না। প্রেমেই হয় সিদ্ধ। এই পরিতৃপ্ত বোধ নিয়ে অনেকক্ষণ ঝুলে থাকে বাঁশি বাতাসে। কে যেন ছুঁয়ে দেয় তাকে। ঝুপ করে পড়ে যায় বাঁশি, উহ্ করে ওঠে ব্যথায়। চোখের সম্মুখে আবার সেই আলোর ঝলকানি। ভোরের আলো ফুটছে। এইতো তার ঘরে তার বিছানায় বিমর্ষমুখে এখনও ঘুমাচ্ছে নয়নতারা। তবে তাকে ছুঁয়ে দিল, কে? কে ছিল ফুল হয়ে এতটা সময়?

বাঁশি তার কানে শুনতে পায় প্রভাতি রাগ নট ভৈরব। আহা কেমন কোমল আবেগী সুর! অভিমানেও এত প্রেম! বাঁশি অপলক চেয়ে দেখে নয়নতারার মুখ!

‘নয়ন সরসী যেন ভরেছে জলে

কত কি লেখা কাজলে কাজলে।’

লেখক : গল্পকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares