দুর্ভিক্ষ : আনিফ রুবেদ

গল্প

দুর্ভিক্ষ

আনিফ রুবেদ

“হাসছেন? আমি জোনাকিকে পাখিই বলি। পাখি বলতে ভালো লাগে। ছোট ছোট আলোর পাখি। মিষ্টি আলোর পাখি। ছোট ছোট আলোর টুকরো। ছোট ছোট ঠান্ডা আগুনের টুকরো উড়ে বেড়াচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে সুরে সুরে, কাছে দূরে, ফুরফুরে মেজাজে। আর এসবের মধ্যে আপনার হাসি, খুবই দারুণ ব্যাপার। আপনার হাসিরাশি কেমন বিলি কেটে চলে যাচ্ছে অন্ধকার নদীর জলে। আরে না, আমি কবি না। কথা শুনে কবি মনে হচ্ছে? হা হা হাসালেন। কী! আমারও হাসি সুন্দর? এই প্রথম কেউ আমাকে বলল, ধন্যবাদ আপনাকে। কী আর করব- বেকার- পড়াশোনা শেষ করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমার এক বন্ধু ছিল, ও কি বলত জানেন? ও বলত- ‘এতদিন পড়ালেখা করে কী লাভ হলো বলত, ২০ বছর ধরে পড়লাম বাপের গাঁট খসিয়ে। তারপরেও চাকরি হয় না ঘুষ দিতে পারি না বলে।’ ওর জীবন দুর্বিষহ হয়ে গেছিল। বাপটা অক্ষম ছিল প্রায়। ওর বাপ ভিখারি ছিল, ভিক্ষা করেই ওর পড়ালেখার খরচ চালাত। বন্ধুটা একটা ছোট চাকরির জন্য কত ঘুরে বেড়িয়েছে, হয়নি। মরে গেছে দুবছর আগে, না খেতে পেয়ে, অসুখ বাধিয়ে বিনাচিকিৎসায়। সে ভিখারিও হতে পারেনি, ভিখারি হতে পারাটাও একটা যোগ্যতার ব্যাপার। ওর একটা চমৎকার হিসাব ছিল, হিসাবটা এমন- দিন তিনশ টাকা হিসেবে ২০ বছর প্রায় ২০-২২ লক্ষ টাকা কামাতাম যদি ইটের ভাটা বা কোনো কারখানায় শ্রমিকের কাজ করতাম। পড়ালেখার জন্যও ৮-১০ লাখ টাকা খরচ না হয়ে বেঁচে যেত। এতদিনে প্রায় ৩০ লাখ টাকা জমা হত। তাছাড়া চাকরির পেছনে ঘুরতে গিয়ে যে পোস্টাল অর্ডার করতে হয়েছে, যাতায়াত করতে হয়েছে আর জুতার তলা ক্ষয় হয়েছে তাও কম নয় নেহাত। যদি ‘সম্মান বা পড়াশোনার আলাদা একটা গুরুত্ব আছে’ বলতাম তাকে, ও রেগে যেত ভীষণ- ‘রাখ তোর সম্মান, মানুষ টাকা ছাড়া সম্মান করে না।’ আমারও এখন তাই মনে হয়। তার হিসাবটাকে ঠিক মনে হয়। বাপের ভিক্ষালব্ধ টাকা আর নিজে প্রাইভেট টিউশনি করে বেচারা কোনোরকমে পড়াশোনা করেছিল। ওর হিসাবটা দারুণ না? অন্ধকারে অবশ্য দেখতে পাচ্ছি না আপনাকে, তবে আমার মনে হয় আপনি মিটিমিটি হাসছেন। চাঁদ উঠতে আর দেরি নাই। তখন আপনার হাসি দেখতে পারব। বাহ্ দারুণ বাতাস দিচ্ছে, সুন্দর। শুধু শুধু হাসবেন না, কিছু একটা বলুন। আমার বন্ধুটির হিসাবটা ভালো না? আমিও কত ঘুরে বেড়াচ্ছি একটা চাকরির জন্য। হচ্ছে না। চারদিকে একটা কথা চালু আছে- ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।’ মাথার ঘাম পায়ে ফেলা- এটা তো সহজ, পায়ের ঘাম মাথাতে উঠিয়েও একটু সুখের মুক্ত বাতাস পেলাম কই। আমাদের জন্য সুখ তার মুখ বন্ধ করে রাখে সবসময়। উপায়ের পায়ে পড়েও কোনো কাজ হয় না আমাদের। অথচ ‘ওদের’ উপায় হচ্ছে অনায়াসে। ‘ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়’ কথাটার ওপর আমার সন্দেহ আছে। দেখেছি, উপায় থাকলেই উপায় হয়, উপায় থাকলে ইচ্ছে হয়। তখন সে ইচ্ছা দিয়ে আরও উপায় হয়। ‘ওদের’ মানে বুঝলেন না। ঠিক আছে বলছি, ট্রাফিক জ্যাম দেখেননি কখনও? দেখেছেন, বেশ তবে! বোঝানো সুবিধা হবে। ট্রাফিক জ্যামে কী দেখতে পান? দেখতে পান, যেন একটা বিশাল গাড়ির মিছিল হঠাৎ থেমে গেছে অপর পাশ হতে আরও একটা গাড়ির মিছিলকে পার হতে দেবার জন্য। তখন কী মনে হয় না?- এগুলোর দাম আর কত হবে, হলো পাঁচ টাকা বা ছয় টাকা। কিন্তু গাড়ির দোকানে গিয়ে দেখেন, মনে হবে ছুলেই হয়তো টাকা চেয়ে বসবে। এইসব যাদের তারাই ‘ওদের’। এই ‘ওদেরদের’ হাতেই সমস্ত দেশ, সমস্ত চাকরি, সমস্ত মানুষের সমস্ত ভবিষ্যৎ বাঁধা। তারা যেটাকে বলে উপায়, সেটা উপায়। যাকে বলে নিরুপায়, তা নিরুপায়। আমাদের আর কী করার আছে, ট্রেনের সমান, ট্রেনের গতির সমান দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া! হাসালেন আমাকে। কেন হাসছি, আবার প্রশ্নও করছেন? এই যে আপনি বললেনÑ ‘আমাদের চারপাশে প্রচুর সংখ্যক মই থাকে। ব্যক্তিভেদে মইগুলো বড় এবং ছোট। আপনার চারপাশে যে মইগুলো তার সবই বড়। মানুষের প্রচুর সংখ্যক মইয়ের মধ্যে সবগুলোই মিস চলে যায় মাত্র একটাতে উঠতে পারে মানুষ। একটা বড় মইয়ে আপনিও উঠবেন।’ কেমন করে যে বলতে পারছেন, আমিও একটা মইয়ে উঠতে পারব তাও আবার বড় মইয়ে সে আপনিই জানেন। তাই যেন হয়। কিন্তু কতদিন আর অপেক্ষা করব? অপেক্ষা, আর প্রতীক্ষা আর পরীক্ষাতেই জীবন শেষ হয়ে গেল। যাক এসব। ভারী ভারী কথা বলে অযথা ভারী হয়ে যাবার মানে হয় না। দেখুন, কেমন সুন্দর চাঁদ উঠেছে। চাঁদের মুখ থেকে জোছনার মধু ঝরছে। এসব আমার ভালো লাগে খুব। ভালো লাগা বলতে তো এগুলোই। যদিও এগুলো মানুষের জন্য এক ধরনের ফাঁদ, ধরে রাখার ফাঁদ, বাঁচিয়ে রেখে যন্ত্রণা দেবার কায়দা। আবারও ভারী কথা শুরু হয়ে গেল। থাক এসব। দেখুন, পার্কের সমস্ত কিছু কেমন নীরব অথচ কতটা সরব। সরবভাবে নীরব রয়েছে চারদিক। সরবে তারা তাদের নীরবতা আর সৌন্দর্য বিলিয়ে দিচ্ছে। সবকিছু মাখছে জোছনার জাদু, চাঁদের মধু। কেমন নদীর মতো মনে হচ্ছে না? জোছনা জলের নদী। আপনার কী গান গাইতে ইচ্ছে করছে? আমার তো খুব ইচ্ছে করছে। আসুন দুজন মিলে গান গাইÑ ‘চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙ্গেছে…’ কই গাইছেন না তো! আমার সঙ্গে গলা মেলান, সুর মেলান, কথা মেলান। কী বললেন? আমি একাই গাইব? থাক তবে গান। কিছু মনে করবেন না, একটা সিগারেট জ্বালাই আমি? ঠিক আছে তাই হবে, সেভ করব, ধোঁয়া ওদিকে যাবে না। না, খুব বেশি সিগারেট খাই না, দিনে কত আর হবে ১১-১৩টা মতো। এটাই খুব বেশি!? জেনে অবাক হবেন, নেপোলিয়ান ৫০-৫৫টা খেতেন প্রতিদিন। নেপোলিয়ান তো ইতিহাসের মানুষ, সে অন্য কোথার, অন্য কথার। আমাদের গ্রামেরই মন্টু মামাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলÑ ‘রমজান মাসে, রোজার মধ্যে নিশ্চয় আপনার সিগারেট কম খাওয়া হচ্ছে?’ উত্তর করেছিলÑ ‘হ্যাঁ কমে গেছে, ২৫-২৭টির বেশি হয় না। অথচ তিনি সিগারেট খেতে পেতেন সন্ধ্যার পর থেকে ঘুম এবং সেহেরি খেতে ওঠার পর থেকে ফজরের আজান পর্যন্ত। আমরা হেসেছিলাম খুব। এক্ষেত্রে ১১-১৩ টা সিগারেট খুব কম নয় কি? ও হ্যাঁ, ষোল সতেরো বছর থেকে খাই। বাহ্! আপনি তো বেশ বুদ্ধিমতী এর মধ্যেই হিসাব করে ফেলেছেন, চার লাখ টাকার সিগারেট খেয়ে ফেলেছি। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, এখন বয়স ৩৩ ক্যালেন্ডারে দু’ছক প্রায়। কী জিজ্ঞেস করলেন? জন্মদিন? হঠাৎ! জন্মদিন দিয়ে কী হবে? আমার জন্মদিন ২৯ জুন। হ্যাঁ, জন্মদিনের তারিখ সবাইকে বলি, সেদিনের দিনও সবাইকে বলিÑ আজ আমার জন্মদিন। কেন বলি? কারণ তো নিশ্চয়ই আছে। প্রতিটি জন্মদিন জানিয়ে দেয়- পৃথিবীর এত প্রতিকূল অবস্থাতেও আমরা আর একটা নতুন ক্যালেন্ডারের দিকে এগুলাম। বেঁচে থাকাটা এখন বিরাট ব্যাপার। প্রতিকূলতার প্রতি অনুসাড়া দিয়ে আমার সে বন্ধু তো মরেই গেল। জন্মদিনের আরও একটা অস্বস্তি আছে, গড় আয়ূর দিকে আরও একটু এগিয়ে গেলাম শরীর আর মন নিয়ে। মৃত্যুটা আরও একটু কাছের দিকে এল। যাহোক, এই যে দেখেন, বাতাস বইতে শুরু করেছে। বুকের কাছের কয়টা বোতাম খুলে দিলাম, প্লিজ, ডোন্ট মাইন্ড! গরম সহ্য করতে পারি না আমি। মাঝে মধ্যে রাতে তো পোশাকই রাখতাম না। এখন  আর সেটা করতে পারি না। মেসে একটা রুমে তিন চারজন থাকি, কী করে সম্ভব! বাড়িতে একটা রুমে আমি একাই থাকতাম। আরে না, পোশাক খুললে স্বাধীন স্বাধীন লাগবে কেন? মানুষ স্বাধীন কখনওই নয়। গর্ভের ভেতর গর্ভনাড়ির বাঁধন, বাইরেও সে নাড়ি যুক্ত থাকে। নাড়ি কেটে মুক্ত করা হয় বটে কিন্তু চারপাশের অসংখ্য সমস্যাগর্ভের নাড়ি বেঁধে রাখে মানুষকে। মানুষের স্বাধীন হবার যো নেই। মানুষ স্বাধীন থাকে যখন জন্মে না তখন আর যখন মরে যায়। অজন্মিত মানুষ স্বাধীন, মৃত মানুষ স্বাধীন। আমাদের ভাগ্য, আমাদের স্বাধীনতা দেশচালকের হাতে বাঁধা। মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস, হায় হুতাশ, চলাচল, বলাবল, কলা কল সবই নিয়ন্ত্রণ করে তারা। মৃত্যুর পরেও ঝামেলা করে ধর্মওয়ালারা। পোড়াবে? নাকি কবরে দেবে? নাকি জলে ভাসাবে? তা নিয়ে শুরু হয় ধর্ম-ক্রদ্ধ মানুষের যুদ্ধ। অবশ্যি সেটা জীবিতদের ব্যাপার, ততক্ষণে মরা মানুষ স্বাধীন হয়ে গেছে। পোড়াক বা খালে পুঁতুক, শেয়ালে বা শকুনে চোখ-মাংস খুবলে খাক, মরা মানুষের এতে কিছুই যায় আসে না। আরে দেখুন, দেখুন, চাঁদটা মাঝ আকাশে থেকে নিচ দিকে পিট পিট করে তাকাচ্ছে শান্তভাবে, গিরগিটির চোখের মতো চাঁদ। আর দেখুন, পুকুরটার দিকে। খুব ছোট ছোট ধীর ঢেউ, যেন আলোর পুকুর। তরল আলোর ঢেউ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে কালো মাটির দিকে। আসুন কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকি। নাহ্ আর চুপ থাকতে ইচ্ছে করছে না। অথচ কয়েক মিনিটও যায়নি। থাকগে। যাকগে, মিনিট যাক আর আসুক, তার ব্যাপার। আসুন আমরা কথা বলি। ছাত্রজীবনের কথা শুনতে চাইছেন? সে তেমন কিছু না। ছাত্রজীবনটা অবহেলায় কাটিয়াছি, রেজাল্ট ভালো করা যায়নি কোনো পরীক্ষাতেই। আড্ডাতে বহু তত্ত্ব, তথ্য, বহু তর্ক, মত বেমত, বেমত মত করেই সময় পার করে দিতাম। আমরা চাইতাম আড্ডার টেবিলে বসে সমস্ত কিছু নাড়িয়ে দিতে। কিন্তু… হা হা হা…। স্বাধীনতার আগে কী ছিল দেখিনি, শুনেছি বা পড়েছি মাত্র। যুদ্ধের বছর জন্ম বলে বাবা-মা নাম রেখেছিল সমর, সমর উদ্দীন। যুদ্ধ হবার পেছনে শোনা কারণগুলোর কাছে যুদ্ধটাকে অহেতুক মনে হয় অথবা মনে হয় আসলে যুদ্ধ হয়নি কোনোদিন। সে সমস্ত কারণ তো এখনও অহরহ সর্বস্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখনও শোষণ এখনও শোষণ, তখনও ধর্ষণ এখনও ধর্ষণ, তখনও দুর্নীতি এখনও দুর্নীতি। তখনও গোলাগুলি এখনও তাই। পার্থক্যটা বুঝি না। একটা মানুষের চাই বাঁচার অধিকার এবং মৃত্যুর অধিকার। এখানের মানুষেরা বাঁচতে পারছে না, মরতে পারছে না। ওদের যতক্ষণ ইচ্ছে, যতক্ষণ প্রয়োজন, ততক্ষণ বাঁচিয়ে রাখছে, যখন ইচ্ছে মেরে ফেলছে। কী করে কিছু লোকের শোষণের মাত্রা, ধর্মের মাত্রা দশমিকের ডানে থাকতে থাকতে বামে চলে আসছে তা আর বুঝতে বাকি নাই। এরা কারা জানেন? এই তো, বেশ বুঝেছেন। হ্যাঁ, এরা মানুষকে মিথ্যা কথা বলে, হত্যা করে, বিচারালয়ে হাত খেলায়, জেলে পাঠায়, শোষণ করে, ধর্ষণ করে। এরা মানুষকে ভালোবাসে না। সার চাইলে গুলি করে, খাবার চাইলে গুলি করে। নিজেরা কাউকে ভালোবাসে না, কাউকে ভালোবাসতেও দেয় না। ভালোবাসা দিবসেও হরতাল করে। হরতালগুলোকে তো আমার হরতাল মনে হয় না, জোরতাল বলে মনে হয়। জোরাজুরি করে মানুষের প্রতি। আপনার কী মনে হয়? লোকদের কাছে শুনে, বইয়ে পড়ে রাজাকারদের ওপর এমন ঘৃণা জন্মেছিল যে- একজন বলেছিল, রাজাকাররাই একদিন ক্ষমতায় যাবে- একথা শোনার সাথে সাথে তাকে এমন একটা ঘুষি মেরেছিলাম। সেদিন বলেছিলাম- যেদিন তারা ক্ষমতায় যাবে সেদিন আমি দেশ ছেড়ে দেবো। হা হা হা আপনি আমার দিকে তাকাচ্ছেন কেন! আমি যেহেতু কথা বলছি, সেহেতু বুঝতেই পারছেন আমি আছি, চোখ তুলে দেখার কোনো দরকার নেই। হ্যাঁ, দেশ ছেড়ে যেতে পারিনি। লজ্জিত হয়ে দেশেই বাস করছি। টিভি খুলেই দেখি মাননীয় কৃষিমন্ত্রী, মাননীয় শিল্পমন্ত্রী গেলেন স্মৃতিসৌধে, শহিদ মিনারে। এখন রাজাকার থেকে তারা রাজা হয়েছে। দর্শনটা একটু চেঞ্জ হয়েছে আমার। লোকদের মুখে শুনেছিলাম যে কথা, বইয়ে রাজাকার সম্পর্কে পড়ে যে ঘৃণা জন্মেছিলÑ তা মিথ্যা। তাদের মন্ত্রী, এম. পি হওয়া দেখে দারুণ বেদনা পাই। ঐ লোকের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেব কখন গিয়ে। কী বললেন? বুঝলাম না। ও আড্ডার কথা? হঠাৎ হঠাৎ কোন প্রসঙ্গ থেকে কোন প্রসঙ্গে যে যাচ্ছেন। যাহোক, হ্যাঁ, এখনও আড্ডা দিই সব বেকারগুলো, সন্ধ্যা পার হলেই। মনিচত্বরের সোহাগের চায়ের দোকানে আড্ডা জমে ওঠে রোজ। প্রতিদিন এক টেবিল করে গল্প করি, চা খাই গল্প গল্প। আগে কত কষ্ট পেতাম মানুষের আর্তনাদে, দুঃখে, কষ্টে। এখন আর তা হয় না। কষ্ট পাই না মানুষের কষ্টে। মানুষের রক্ত দেখে সময় পান করি, সিগারেটের ধোঁয়ার মতোই ভুলে যাই মানুষের আর্তনাদ। তাছাড়া মানুষকে দেখে কষ্ট পাবার সময় কই? সারাদিন হাঁটাহাঁটি করি। রাতে রুমে ফিরে মোজা শুঁকে দেখি কালকে আবার মোজাটা পরা যাবে কিনা। জুতার তলাটা কতদূর আর আমাকে নিয়ে যেতে পারবে। ওহ! হ্যাঁ হ্যাঁ, রাত তো প্রায় শেষ হয়ে এল, বুঝতেই পারিনি। আপনাকে আমি চিনি না, নাম জানি না, আপনি কী করেন জানি না, আপনিও জানেন না আমার ব্যাপারে। তারপরেও কত কথা হয়ে গেল। তবু খুব ভালো লাগল। আমার নামতো আগেই জেনেছেন, দয়া করে আপনার নামটা বলবেন? ও দারুণ নাম তো আপনার- জোনাকি! আমি আপনাকে কিন্তু জোনাকি পাখি বলে ডাকব। আগেই তো বলেছি, আমি জোনাকিকে পাখি বলি, তখন কিন্তু জানতাম না আপনার নাম জোনাকি। আপনি তো জেনেছেন আমি কী কাজ করি, আপনি কী করেন বলবেন কি প্লিজ? আমি কেন এখানে রাত পার করে দিলাম সেটা জানার পর বলবেন? না না, তার আগে আপনি বলেন আমাকে, আপনি কেন এখানে সারারাত আমার সাথে গল্প করে পার করে দিলেন আর কেনইবা এসেছিলেন? কী!!!??? আশ্চর্য কাণ্ড তো, আপনি বেশ্যা! আমি তো বুঝতেই পারিনি, অন্য দশটা নারীর থেকে আপনাকে তো আমি আলাদা করতেই পারছি না। তাহলে তো আপনার আজকের সব কাজ আমি মাটি করে দিলাম, ভোর তো হয়ে এল জোনাকি পাখি, দিকে দিকে মসজিদগুলো আজান দিতে শুরু করেছে মধু সুরে, আপনাকে তো এখন চলে যেতে হবে, আপনার কী ক্ষতিই না করলাম আমি। মাফ করবেন। আর হ্যাঁ, আমি এসেছিলাম একজন বেশ্যার কাছেই। মানুষ মানুষকে টাকা ভিক্ষা দেয়, কাপড় ভিক্ষা দেয়, পরামর্শ বা উপদেশ ভিক্ষা দেয়। আমার দরকার যৌনতার ভিক্ষা। আমি কোনো বেশ্যার কাছে যৌনতা ভিক্ষার জন্য আজ রাতে বের হয়েছিলাম। কিন্তু আপনার সাথে কথা বলতে বলতে ভুলেই গেছিলাম। তাছাড়া আপনি বলার আগে বুঝতেই পারিনি আপনি বেশ্যা। আর এখন তো ভোর হয়ে এল আর আপনার ফিরে যাবার সময় হয়ে গেল। আপনার কাছে যৌনতা ভিক্ষা তো এখন আর চাওয়া যাবে না। কী বললেন! আমাকে যৌনতা ভিক্ষা দিতেন না? কিন্তু কেন? ও আচ্ছা, ঠিক আছে। মনে ব্যথা পেলাম আপনার কথা শুনে, ভিক্ষা পেলাম না বলে। তারপরেও, আমি আপনার কথা মনে গেঁথে নিলাম- জোনাকি পাখি নামে এক মহান বেশ্যা আমাকে বলেছেনÑ ‘যৌনতা কেউ কাউকে ভিক্ষা দেয় না। যৌনতা কিনে নিতে হয় অর্থ দিয়ে বা শাসনিক বা প্রশাসনিক বা অন্যকোনো ক্ষমতা দিয়ে বা রূপ দিয়ে। বা ছলনা করে যৌনতা নিতে হয়। বা জোর করে যৌনতা নিতে হয়। যৌনতার ভিক্ষা হয় না।’ আচ্ছা, ঠিক আছে যান, বিদায় জোনাকি পাখি। সাবধানে যান, দিনের আলো আসার আগেই চলে যান। বিদায়।”

লেখক : গল্পকার

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares