গোধূলি : খালিদ মারুফ

গল্প

গোধূলি

খালিদ মারুফ

আমাদের সলোমন পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তরুণ কর্মকর্তা। কিছুদিন হয় দেশে ফিরেছে। সাগ্রহে নয়, বাধ্য হয়ে। নিউইয়র্কে তার মিশনের পুরো সময়টা অতিবাহিত হয়নি। তার আগেই তাকে ফিরে আসতে হয়েছে। দপ্তরের কোনও কাজে মারাত্মক কোনো ভুল-ভ্রান্তি কিংবা অবহেলার জন্য নয়। অফিসের ভেতর সিনিয়র কারও সাথে অসদাচরণের জন্যেও নয়। নিউইয়র্কে প্রথম কয়েক মাস বাধ্য কর্মকর্তা হয়ে কাটানোর পর সলোমন তার কৈশোরে পাওয়া তুমুল উত্তেজনাকর বিট জেনারেশনকে খুঁজতে বেরিয়েছিল। যদিও তাদের কাউকে পায়নি। ঐ জেনারেশনের অনেকে ছিলেন স্বল্পায়ু, কেউ কেউ আত্মহত্যা করেছেন, কয়েকজন দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করে এখন মারা গেছেন। যা দু-একজন বেঁচে আছেন তারা এখন দুনিয়া কাঁপানো সেলিব্রেটি। নিউইয়র্কে খুব একটা থাকেন না তারা, সানফ্রান্সিসকো, প্যারিস ইত্যাদি শহরে তাদের বাস। আর নিউয়ইর্কে থাকলেও তাদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, খুঁজে পেলেও দেখা পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

সলোমন সেইসব কবি-শিল্পীর কাউকে খুঁজে না পেলেও একটা বইয়ের দোকানে খুঁজে পায় তাদের অনুসারী একটি ছোট্ট দলকে। যারা কবিতা-চিত্রে বিটদের সমকক্ষ না হলেও জীবনাচারে তাদের সার্থক অনুগামী। সলোমন ঐ দোকানটাতে যায় মূলত গ্রেগরি করসো’র ‘দ্য ভেস্টেল অন ব্র্যাট্ল’ নামক কবিতার বইটি খুঁজতে। পেয়েও যায়, সাথে পায় সেখানকার আর্ট স্কুলের ঐ ছাত্র দলটিকে, যাদের অনেকের নামের সাথে বিটদের নামের সাযুজ্য রয়েছে। একদিন-দু’দিন করে দারুণ জমে ওঠে সলোমনের সাথে তাদের। স্যান্ডি, ওমর, প্রিমা আরও কয়েকজন। ওমর কালো, সুতরাং নিউইয়র্কের ‘কালো-রাস্তুা’ আর তাদের প্রয়োজনীয় বস্তিুগুলোতে ওমরের অবাধ যাতায়াত। শুরুতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি, হাশিশ-মারিজুয়ানা সলোমনকে কাবু করতে পারেনি, ওসবের অভ্যাস তার আগে থেকেই ছিল। তবে কিছুদিনের মধ্যেই রাত করে বর্মিটরিতে ফেরা, দেরি করে অফিসে যাওয়া, এগুলো শুরু হয়। শুরুর দিকে খুব একটা কেউ চোখ না দিলেও দিনে-দিনে বিষয়টি উচ্চতর কর্মকর্তাদের চোখে পড়তে থাকে। ফিরে আসার কিছুদিন আগে একদিন, রাতের ডোজটা একটু বেশি হয়ে যায়, ফেন্টানিল নামের বস্তুটি সলোমন আগে কখনও গ্রহণ করেনি, ফলে এর অত্যধিক ঘুমজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে যায়। আর পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী দলবল নিয়ে সেদিনই হাজির হন নিউইয়র্কে, হঠাৎ নয় সিডিউল করাই ছিল।

তরুণ কর্মকর্তা হিসেবে, মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে, কেনেডি বিমানবন্দর থেকে রিসিভ করা; নির্দিষ্ট হোটেলে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তার। স্বদেশি ড্রাইভার দীর্ঘক্ষণ তার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে, ফোন করে, বেল টিপে সলোমনকে না পেয়ে কনস্যুলেট জেনারেল অফিসে ফেরত যায়। মন্ত্রী মহোদয় খুব একটা চটেননি। চটবার সুযোগও পাননি। সলোমন ওখানে নেই অথবা মন্ত্রী মহোদয়ের দল তাকে খুঁজে পাচ্ছে না, এমন খবরটি দূতাবাসে এসে পৌঁছানোর আগেই দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন সম্মানিত কনসল জেনারেল। মিটিং ফেলে দ্রুতই তিনি ছুটে গেছেন এয়ারপোর্টে। কিছুদিন পরেই ঢাকা অফিস থেকে সলোমনের নামে একটি চিঠি আসে এবং চিঠিতে দিন-তারিখ উল্লেখ করে দ্রুততার সাথে ঢাকার পররাষ্ট্র দপ্তরের নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা বিভাগে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় তাকে।

পররাষ্ট্র দপ্তরের চাকরি কিংবা নিউইয়র্কে পোস্টিংয়ে কোনোটিই নয়, সলোমনকে বরং আনন্দিত করেছিল একটি বিষয় তা হলো ঢাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে পারা। তীব্র সমস্যাআক্রান্ত শহরটি তাকে ক্লান্ত করে ফেলেছিল। তবে সলোমন কিছুতেই ভাবেনি, পৃথিবীর বাস অযোগ্য শহরের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করে নেওয়া এই শহরে তার পুনরায় ফিরে আসার পরবর্তী কতক গুলো দিন এতটা রঙিন আর উপভোগ্য হয়ে উঠবে। ঢাকায় ফেরার চিঠিটি হাতে পেয়ে সলোমন দ্রুততার সাথে ওমরকে ফোন করে। তার জন্য বেশকিছু কোকেন নিয়ে আসবার জন্য অনুরোধ করে। ওমর দুই থেকে তিনবার ব্যবহার উপযোগী অত্যল্প কোকেন আর কয়েকটি ফেন্টানিল পিলই শুধু জোগাড় করতে পারে। যেগুলো এখনও আছে, একটু কৃচ্ছ্রের সাথেই সলোমন ওগুলো সেবন করছে, তাছাড়া ফেন্টানিল অতি উচ্চমাত্রার নেশাদ্রব্য, নেওয়ার পর থেকে পরবর্তী আধঘণ্টা-এক ঘণ্টা সম্পূর্ণ সোল-আউট দশা তৈরি হয়, ফলে সময় এবং স্থান বিবেচনা করেই ওটা সেব্য; অন্তত সলোমনের জন্য। এমনকি কোনো-কোনো দিন তার ওগুলোর দরকারও পড়ছে না।

সলোমন নিউইয়র্কে চলে যাবার পর মি. মইনুল আহসান খান পুনরায় বিয়ে করেছেন। সলোমনের জন্মদাত্রী মাতা মারা গেছেন প্রায় ছ-বছর হয়, সলোমন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই। মি. মইনুল আহসান খান পৈতৃকসূত্রে ধানমন্ডির এই পুরনো বাড়িটা পেয়েছেন। তার পিতা কলকাতার উল্টোডাঙার সবটুকু সম্পত্তির বদলে একজনের সাথে অদল-বদল করে নিয়েছিলেন বাড়িটা। তবে মইনুল আহসান খানের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা এখানেই। সলোমনের পিতা মইনুল আহসান খান তার পিতামহের একমাত্র সন্তান; সলোমনও তাই। সলোমনের মা সলোমনকে এই বাড়িতেই জন্ম দিয়েছেন সুতরাং বাড়িটা তারও। পিতার দ্বিতীয় বিয়ে খবর সলোমন নিউইয়র্কে থাকতেই পেয়েছিল। পিতাই তাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন। ‘এত বড়ো বাড়িটা পুরো ফাঁকাই পড়ে থাকে, কথা বলবার মতো একটি লোকও নেই, কয়েকজন চাপরাশি ছাড়া।’- দ্বিতীয় বিবাহের যুক্তি হিসেবে তিনি সলোমনকে এই কথা বুঝিয়েছিলেন। সলোমন পিতার সাথে তার দ্বিতীয় বিয়ে বিষয়ে খুব একটা কথা বলেনি, কেবল নবপরিণীতা ও তাকে অভিনন্দন জানিয়েই ফোন শেষ করে। এমনকি নিউইয়র্কে থাকার পুরো সময়টাতে তার এ বিষয়ে কিছু মনেও হয়নি। ফিরে আসার ডামাডোলে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত কিছুই তার মনে ছিল না। শুধু গাড়িটা যখন বাঁক নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকবার জন্য হর্ন বাজায়, তখনই তার এটা মনে পড়ে। গাড়ি থেকে নেমে পিতার ঘরের জানালার দিকে যখন চোখ যায়; তখন গ্রিলের ফাঁকে সাবিহাকে সলাজ মুখে বসে থাকতে দেখে। তার মনে পড়ে, ঘরটি একসময় তার মায়ের ছিল এবং সেখানে তার যাতায়াতও ছিল অবাধ; যা এখন আর থাকছে না।

মইনুল আহসান খান নিজেও প্রথম সিভিল সার্ভিসে জয়েন করেছিলেন। গ্রাজুয়েশন করেছেন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। যুদ্ধের পর দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজনেসে এম.এ. করেন আর যোগ দেন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে। তখন সরকারি চাকরিতে এতটা সুযোগ-সুবিধা ছিল না। বিয়ে, তৎপরবর্তী সলোমনের জন্ম, নিজের অমিতব্যয়িতা ইত্যাদি সামাল দিতে মি. খানের বেগ পেতে হয়। রাস্তা ছিল একটাই, দুই বিঘা জমির উপর তৈরি এই দ্বিতল বাড়িটির উপরের অথবা নিচের তলাটি ভাড়া দেওয়া। তবে কিছুতেই সেটা করতে পারেননি। নিজের ঘরে অন্য একটা পরিবার এসে থাকছে, তাদের ইচ্ছামতো এ ঘর-সে ঘর করছে, বাগান-বারান্দা সর্বত্র হাঁটছে, ঘুরছে, নোংরা করছে; উফ্! এ কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

মৃত্যুশয্যায় পিতাকে দেওয়া কথা অনুযায়ী মইনুল আহসান খান ঘুষ-দুর্নীতিতে নিজেকে জড়াতে পারেননি। যদিও চারপাশে সেটা চলছিল লাগামহীনভাবে, এখনও যা থামেনি, এভাবে প্রায় পনেরো বছর কাটিয়ে রেলের দ্বিতীয় শীর্ষ কর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরেই তিনি চাকরিটা ছেড়ে দেন। এবং চাকরি ছাড়ার আগের কয়েকমাস বর্তমানে তিনি যে ব্যবসাটা করছেন সেটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ও পড়াশোনা শুরু করেন। শুরুতেই তিনি বুঝে নেন স্বদেশি ব্যবসায়ীদের দুর্বলতার বিষয়গুলো। তিনি ভেবে দেখেন, এখানকার ব্যবসায়ীরা প্রথমত অসৎ, দ্বিতীয়ত তাদের রয়েছে নেগোসিয়েশন ক্ষমতার দারুণ অভাব, ফলে বিদেশের বড়-বড় কোম্পানি এদেশীয় ব্যবসায়ীদের সাথে ব্যবসা করতে খুব একটা আগ্রহ দেখায় না।

সলোমনের শৈশবে, যখন মইনুল আহসান খান চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নামেন, তখন দেশে সামরিক শাসন চলছে। ধর্ম আর ভারত বিরোধিতাই যাদের রাজনীতির একমাত্র পুঁজি। ওসব অন্য বিষয়। মইনুল আহসান খানের দায়িত্ব পড়ে স্বাধীনতার পর মুখ থুবড়ে পড়া রেল ব্যবস্থার ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা। এই অবস্থার কারণ অনুসন্ধান, বর্তমান বাস্তব অবস্থার বিবরণ ও পরিস্থিতির উত্তরণে সরকারের করণীয় নির্ধারণ করা। প্রথমে তিনি পত্র-পত্রিকা ঘাঁটেন এবং দেখেন সামরিকচক্রের আজ্ঞাবহ পত্রিকাগুলো বাংলাদেশে রেল ব্যবস্থার মুখ থুবড়ে পড়ার একমাত্র কারণ হিসেবে ভারতীয় ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু খুঁজে পায়নি।

এই প্রতিবেদনটা করতে গিয়েই ব্যবসায়ের সকল পরিকল্পনা ও করণীয় বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয় তার। এবং তিনি এমন একটি ব্যবসাই খুঁজছিলেন, যা হবে প্রায় একচেটিয়া, সেরকম একটি ব্যবসায়ের রাস্তাও খুলে যায় তার সামনে। তিনি দেখেন, বাংলাদেশ রেলের অর্ধেকের বেশি গাড়ি অব্যবহৃত আর বিকল হয়ে পড়ে আছে কেবল প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অভাবে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আর ভালোমানের লোকোমটিভ লুব্রিকেন্ট পাওয়া গেলেই বর্তমান ইঞ্জিনিয়ার ও মেকানিকদের দিয়ে এগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব। প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে তিনি সেটা উল্লেখ করেন আর চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে দ্রুততার সাথে খান লোকোমোটিভ নামের কোম্পানিটি খুলে ফেলেন। প্রথমে  প্রোপ্রাইটরশিপ তারপর কোম্পানি। দেশের একমাত্র লোকোমোটিভ পার্টস ও লুবওয়েল আমদানিকারক। রেলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে নিম্নপর্যায়, সর্বত্রই সৎ কর্মকর্তা হিসেবে মি. খানের ছিল দারুণ গ্রহণযোগ্যতা। তারপর দীর্ঘকাল চলেছে তার এই একচেটিয়া ব্যবসা, কয়েক বছর হয় ভারত ও চিনের কিছু কোম্পানি রেলের ক্রয়-বিভাগে উৎকোচ দিয়ে তাদের তৈরি নিম্নমানের লুব্রিকেন্ট ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের সুযোগ করে নিয়েছে। যদিও খান লোকোমোটিভের তাতে কিছু আসে-যায় না। দেশের অর্থনীতি বেড়েছে, বেড়েছে সামরিক বাহিনীর ব্যয়-বরাদ্দ, অনেক কিছু। খান লোকোমোটিভের বর্তমান ব্যবসা এখন তাদের সাথে, সঙ্গে রেল-তো রয়েছেই। এসব সামলাতে মইনুল আহসান খানের ব্যস্ততাও বেড়েছে কয়েকগুণ। এবং এসব কিছুর সাথে অবধারিতভাবে তার দরকার হয়েছে একজন সুন্দরী সঙ্গী। সলোমনের ফিরে আসার মুহূর্তে মইনুল আহসান খান বাড়িতে ছিলেন না, হয়তো ক্লাবে বা জরুরি কোনো মিটিংয়ে ছিলেন।

সলোমন গাড়ি থেকে নেমে কয়েক পা সামনে এসে একটু দাঁড়ায়, তারপর ড্রাইভারের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে ইচ্ছা করেই অনেকটা জোরে শব্দ করে দরজাটি লাগিয়ে দেয়। যাতে তার সৎমা কিংবা পুরাতন চাপরাশিদের কেউ সহসা তাকে নক না করে। ঢুকেই একবার বাথরুমে যায়, সেখান থেকে বেরিয়ে ব্যাগ খুলে একটি বড়-সড় ডোজ নাকে নিয়ে ধাতস্থ হয়। জিনিসটা বেশ কড়া আর টাটকা, মনে মনে ওমরকে ধন্যবাদ দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ফ্যান্টানিলের তীব্র প্রতিক্রিয়া সেই সাথে দীর্ঘ বিমান ভ্রমণে দুর্বল হয়ে যাওয়া শরীর কাঁপতে শুরু করে। এসব মুহূর্তে উরুর পেশিগুলোই কাঁপে বেশি, সলোমন বুঝতে পারে, এখনই শুরু হবে সেই চেনা হ্যালুসিনেশনটা। প্রথমে তীব্র হুইসেল তারপর দুলুনি আর ছন্দোবদ্ধ খটখট শব্দ, তারপর ওটার চলে যাওয়া। দুই পাটির মাঝখানে একটি নারীদেহ, পা ও মাথাবিহীন। কর্তিত মুণ্ডুটি ডানপাশের পাটির ওপার থেকে খলখল করে হাসতে থাকবে।

প্রথম প্রথম হ্যালুসিনেশনটা খুব বেশি কষ্ট দিত সলোমনকে, তবে এখন আর ততটা পীড়াদায়ক নয়। কর্তিত নারীমু-ুর খলখল হাসির সাথে সলোমনও এখন হা হা করে হাসে, হাসতে শিখে গেছে। তার মনে পড়ে, বসার ঘরের ওপাশের ঘরটাতেই বসে আছে তার সৎ মা। হয়তো এতক্ষণে বেরিয়ে এসে বসার ঘরেও বসে থাকতে পারে। অতএব কর্তিত নারী মু-ুর সাথে হাসতে হলে এমন আর একটা উচ্চ স্বরের শব্দ দরকার। কম্পিত পা আর ঝাপসা চোখে টেবিলের নিচে হাত দেয় সলোমন। সব আগের অবস্থানেই আছে। কম্পিউটারের স্টার্ট-আপ বাটন চেপে কিছুক্ষণ অপেক্ষা, অব্যবহারে মারাত্মক ধীর হয়ে আছে তার থার্ড জেনারেশন কম্পিউটারটি। ওপেন হয় ঠিক-ঠিক, ফোল্ডারগুলো অক্ষুণ্নই আছে। রাত জেগে নামানো পর্নোগুালোও নিশ্চয় আছে। তবে এই মুহূর্তে ওগুলো তার দরকার নেই। তার দরকার ‘রাইজিং অন দ্য স্টর্ম’, জিম ডগলাস মরিসনের গাওয়া, লেখা অন্য এক বিট কবির, কি যেন নাম! ঐ শালাকে খোঁজা হয়নি নিউইয়র্কে। বেঁচে আছে না মরে গেছে তা-ও সলোমন মনে করতে পারে না, দরকারও নেই। তীব্র স্বরে বাজতে থাকে ‘রাইজিং অন দ্য স্টর্ম…’। দেহচ্যুত নারীমুণ্ডু এখন সলোমনের হাতে, হাসছে হি হি হি, সাথে সলোমন, উউ হা হা হা।

সকাল হয়। জানলার ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে দিনের চকচকে আলো। চাইলেই আর বিছানায় থাকা যাবে না। তার বাবা নিশ্চয় রাতে ফিরেছেন। এখন হয়তো বসার ঘরে চায়ের কাপটি হাতে নিয়ে পত্রিকা দেখছেন আর নানা অঘটনের খবরে ‘উহু, আহা!’ করছেন, কথা বলছেন একা একা। বিছানা ছেড়ে বাথরুমে ঢোকে সলোমন, সেভ করে একটি অনতিদীর্ঘ গোসল দিয়ে ঝরঝরে শরীরে বেরিয়ে আসে। হাফপ্যান্ট পরে বেরোনো যাবে না, মা থাকতে যেত, মা যখন ছিল না তখনও যেত, তবে সৎমায়ের সামনে সেটা শোভন হবে না। পাতলা পাজামা আর টি-শার্ট শরীরে চড়িয়ে বেরিয়ে আসে সলোমন। খাবার টেবিলে তার সৎমা একটি চেয়ার আগলে দাঁড়িয়ে আছে, অনতিদূরে হেলানো চেয়ারে ইংরেজি দৈনিক হাতে মুখ ঢেকে বসা তার পিতা, মইনুল আহসান খান। সলোমনের প্রথমেই চোখ যায় তার সৎমায়ের দিকে, চোখ ধাঁধানো সুন্দরী, সাবিহা। সলোমনের চোখে চোখ পড়তেই একটু হাসে, দারুণ সে হাসি, এমনকি স্যান্ডির চেয়েও। চট করে স্যান্ডিকে মনে পড়ে তার। স্যান্ডির হাসিমাখা শীৎকার কানে বাজে।

সাবিহা তার সামনের চেয়ারটি টেনে পেছনের দিকে নেয়, একটু শব্দ হয়, মইনুল আহসান খান পত্রিকা নামিয়ে উঠে আসেন। চেয়ারে বসতে বসতে সলোমনকে জিজ্ঞেস করেন,

‘ঘুমোতে তোর কোনো অসুবিধা হয়নি-তো?’ ‘না’ বলে সামনের উপুড় করে রাখা প্লেটটি উল্টে নেয় সলোমন। তার ঠিক মুখোমুখি অপর চেয়ারটি টেনে নিয়ে বসে সাবিহা।

‘ও হ্যাঁ’ তোর নিশ্চয়ই নতুন মায়ের সাথে কথা হয়নি, শুনলাম ফিরেই নিজের ঘরে ঢুকেছিস, আর এই বেরোলি।’ বলে মইনুল আহসান খান তাদের দু’জনের মুখের দিকে তাকান, সাবিহাকে উদ্দেশ করে বলেন,

‘ও হলো সলোমন, আমাদের একমাত্র ছেলে। আশা করি দ্রুতই তোমরা পরস্পরের বন্ধু হয়ে উঠবে।’ সাবিহা হাতের নাইফ জেলির বয়ামে ডুবিয়ে মিষ্টি করে হাসে, বলে, ‘হ্যাঁ, সামনা-সামনি না দেখলেও সলোমনের অনেক ছবিই তো আমি দেখেছি, তুমি দেখিয়েছ।’

সলোমন ফিরতি হাসি হেসে নিচু মুখে পাউরুটি ঠেসে দেয়। কিছুক্ষণ সাবিহার চুড়ির টুংটাং ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যায় না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে তুলে উঠে দাঁড়ান আহসান সাহেব।

‘দশটা বাজে! আমার একটা জরুরি মিটিং ছিল রেল মন্ত্রণালয়ে’ সলোমনের দিকে তাকিয়ে বলেন,

‘তোর ঘুম থেকে ওঠার জন্য অপেক্ষা করে করে এতটা বেলা হয়ে গেল। অফিসে যাবি না?

‘না বাবা’ বলে ছোট্ট উত্তর দেয় সলোমন।

‘কেন, তোকে এখানে জয়েন করতে হবে না? আচ্ছা বলতো, নিউইয়র্কে তোর কোনো ঝামেলা হয়নি তো, তোর-তো তিন বছর ওখানে থাকবার কথা ছিল, হঠাৎ চলে এলি!’

‘না বাবা, কোনো ঝামেলা হয়নি, এমনিই ওরা আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছে, আমি দু’দিন হাতে নিয়ে এসেছি, একটু রেস্ট নেব, পরে জয়েন করলেও চলবে।’

‘আচ্ছা আচ্ছা’ বলে বিদায় আহসান সাহেব।

যেতে যেতে সাবিহাকে বলেন, ‘আমি ছোটো গাড়িটা নিয়ে বেরোচ্ছি, বড়োটা থাকছে, সুযোগ হলে সলোমনকে নিয়ে একটু বেড়িয়ে এসো, ও অনেকদিন ঢাকায় থাকেনি, কিছু শপিং-টপিং করে দিও।’ আহসান সাহেব চলে যাবার পর সাবিহা কথা বলেÑ

‘তোমার ঘরে আমি কয়েকবার ঢুকেছি। কয়েকবার বলছি কেন! অনেকবার-বলতে পারো রোজ একবার করে ঢুকি, তবে কিছু নষ্ট করিনি; শুধু তোমার স্তূপ করে রেখে যাওয়া পেইন্টিংগুলো উল্টেপাল্টে দেখেছি। সবই পোর্ট্রেট, কোনো ল্যান্ডস্কেপ নেই; ওখান থেকে একটা ছবি আমি নিয়েছি, ড্রাইভারকে দিয়ে বাঁধাই করে এনে আমার ঘরে টানিয়ে রেখেছি; ছবিটা একদম আমার মতো, মনে হয় আমাকেই এঁকেছ তুমি।’

সলোমন চুপ করে থাকে। তার খাওয়া শেষ, তবু বসে থাকে, সাবিহার কথা শোনে, হাত নেড়ে জোরে জোরে কথা বলে সাবিহা। তার আত্মবিশ্বাস দেখে ভালো লাগে সলোমনের। সাবিহা বলে চলেÑ

‘তোমার বাবা অবশ্য বলেছিল, আমি কাজটা ঠিক করিনি। আচ্ছা আমি কি তোমার ছবিটা ফেরত দিয়ে দেব?

‘না’ বলে মাথা নাড়ে সলোমন।

‘তোমার আঁকা ছবিগুলো একেবারে ফ্লেমিস চিত্রকরদের মতো। আচ্ছা তুমি ওখানকার গ্যালারিতে ফ্লেমিসদের আঁকা কোনো ছবি দেখনি?’

‘না, প্রথম দিককার ফ্লেমিসরা তো শুধু ফ্রেসকো আঁকতো; পরের দিকের কিছু ছবি আছে, যা সব লন্ডন- প্যারিস আর ওই দিককার গ্যালারিগুলোতে সংরক্ষিত, আমি সেখানে যাইনি।’

‘ও হ্যাঁ! তুমি কি ফ্রেসকো আঁকতে জানো? মানে আমাদের বাইরের দেয়ালটার তো এমনিতেই পলেস্তারা খসে গেছে, নতুন করে পলেস্তারা দিতে হবে, যদি সম্ভব হয়!’

‘সম্ভব হবে না। আমি ফ্রেসকো জানি না আর ইদানীংকালের দেয়ালচিত্র আমার পছন্দ নয়। তাছাড়া আমি প্রাতিষ্ঠানিক চিত্রশিল্পীও নই।’

‘আচ্ছা তোমার যত ছবি তা-তো প্রায় সবই নারীর মুখ, ওইসব নারীর কি সবাই তোমার পরিচিত। আর প্রায় হুবহু আমার একটি ছবি তুমি কীভাবে আঁকলে?’

‘আমি আপনার ছবি আঁকিনি। আর ওইসব নারীর কেউই আমার পরিচিত নন, সবই কল্পিত।’

‘ও’ বলে নড়ে ওঠে সাবিহা, আর তখন টেবিলের তলায় ছড়িয়ে রাখা সালোমনের পায়ের সাথে ওর পায়ের ধাক্কা লাগে। সরি বলে সোজা হয়ে বসে সে। এই ছোট্ট পা ছুঁয়ে যাওয়াতেই সলোমনের শরীরে একটু শিহরণ বোধ হয়। নিজেকে সামলে নেয়, স্যান্ডির কথা মনে পড়ে তার। পাগল মেয়ে একটা, তবে ওর শরীরের এমনতর ছোঁয়া সলোমনকে কখনোই শিহরণ দেয়নি। একটু ফাঁকা পেলেই সলোমনের কোলে চড়ে বসতো স্যান্ডি। হয়তো অন্যদের কোলেও বসতো, এ নিয়ে কখনও কোনো ভাবনা তৈরি হয়নি সলোমনের। ব্যক্তি ভিন্ন, সংস্কৃতিও ভিন্ন, এখানে নারী শরীরের এতটুকু ছোঁয়াও এতবড় শিহরণ জাগাতে পারে!

টেবিল ছেড়ে উঠে যায় সলোমন, নিজের ঘরে ঢুকে ব্যাগ খোলে, হাতড়ায়, প্যাকেটটা খুঁজে পায় না। অস্বস্তিতে শরীর গুলিয়ে আসে, মেজাজ খারাপ হয়, তাহলে কি! না। তা-কীভাবে হয়; সে-তো ঘরে ঢুকেই ভেতর থেকে দরজা আটকে দিয়েছে, আর বেরিয়েছে যখন তারপর থেকে কেউই তার ঘরে ঢোকেনি। তাহলে? এদিক-ওদিক তাকাতেই কম্পিউটার টেবিলের উপর দেখতে পায় প্যাকেটটা। হাফ ছেড়ে বাঁচে। হাতে নিয়ে কোথায় লুকোবে বুঝে উঠতে পারে না। বলে কি মেয়েটা! আমার ঘরে ঢুকেছে, সব কিছু হাতড়েছে! তবে যতটা বিরক্তি লাগার কথা, ততটা লাগছে না দেখে নিজেই কিছুটা আশ্চর্য হয়। প্যাকেটটা হাতে নিয়েই বিছানায় শুয়ে পড়ে, অফিসে না গেলেও চলবে, তবে অফিসে না গিয়ে করবেইবা কি। বাইরে যে যাবে, কারও নাম্বারই-তো নেই, সেল ফোনে এখনও ওখানকার সিম কার্ড ঢোকানো। উঠে দাঁড়ায়, সবগুলো ড্রয়ার হাতড়ে দেখে, না! রেখে যাওয়া সিমকার্ডটা কোথাও নেই। সাবিহা নেয়নি তো? না, তা কেন হবে। একবার ভাবে, বেরিয়ে সাবিহাকে ডাকবে; দেখেছে কিনা জিজ্ঞেস করবে। তবে ডাকতে গিয়ে থেমে যায় সলোমন, কী বলে ডাকবে? ‘মা’! দূর ছাই! তাই হয় না কি। তার মানে এখন একমাত্র পথ খোলা আছে বাইরে গিয়ে সিমকার্ডটা রিপ্লেস করা, একটা নতুন ফোনও কিনবে, ওই ফোনটা নিশ্চয় লক হয়ে আছে, সেটা খোলার জন্য আবার দোকানে-দোকানে দৌড়াতে হবে। উফ্, এত সমস্যা এই শহরে!

অনেকক্ষণ কেটে যায়, বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে সলোমন। একবার ভাবে, ব্যাগ খুলে ‘দ্য ভেস্টেল অন ব্র্যাট্ল’ থেকে কিছুক্ষণ পড়বে। বইটা কেনা হয়েছে, পড়া হয়নি। ঐ বইয়ের দোকানেই সে স্যান্ডিদের দেখা পেয়েছিল। তারপর-তো শুধু অফিস আর স্যান্ডির দলের সাথে হ্যাংআউট। নিউইয়র্কের পুরো সময়টাই সে কিছু পড়েনি। পড়বার ক্ষুধা মাঝে-মাঝেই ঘাই মেরে উঠেছে বুকের ভেতর, তবে পড়া হয়নি।

দুপুর হয়ে আসে, দারোয়ানের গেট খোলার ক্যাচ-ক্যাচ আওয়াজ শোনা যায়। একটি ভি-৮ মডেলের ঝা চকচকে কালো জিপ ভেতরে ঢোকে। জানালার ফাঁকা দিয়ে দেখতে থাকে সলোমন, গাড়িটার ঢোকা দেখেই বোঝা যায়, নিরীহ গাড়ি, অন্তত কোনো ক্ষতির জন্য ওটা ভেতরে ঢুকছে না। দরজার কাছে এসে দাঁড়ায় গাড়িটা, ভেতর থেকে সাবিহা নামে, হাসিমুখ তার। সলোমন বুঝতে পারে, এটা তাদের নতুন গাড়ি, নিশ্চয় নতুন মায়ের সাথে ওটা এ বাড়িতে এসেছ। বাইশ-তেইশ বছরের সুন্দরী স্ত্রীকে দেওয়া মি. খানের উপহার। শক্ত জুতোর খট-খট আওয়াজ শোনা যায়, আওয়াজটা দ্রুততায় এসে সলোমনের ঘরে ঢুকে পড়ে। সলোমন উঠে বসে, কথার আগে একচোট হেসে নেয় সাবিহা, তারপর প্যাকেটটা তার গায়ের কাছে রেখে চেয়ার টেনে বসে, বলেÑ

‘তোমার জন্য! একটা নতুন মোবাইল ফোন, সাথে সিমকার্ডও আছে। আমি বুঝেছি তোমার সাথে ফোন নেই, আর থাকলেও ওদেশি মোবাইল এখানে চলবে কি না সন্দেহ আছে। নাও! যার যার সাথে যোগাযোগ করার করো।’

বলেই আবার খাটের দিকে ঝুকে আসে, সলোমনের হাতের প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়ায়, ‘কী ওটা? ছবি আকার কোনো কেমিক্যাল, আমেরিকা থেকে এনেছ? দেখি-দেখি!

সাবিহার হাত প্যাকেটটার কাছে পৌঁছনোর আগেই ‘কিছু না, কিছু না’ বলে শরীরের পেছনে লুকিয়ে ফেলে, মোবাইল ফোনের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে সাবিহাকে ধন্যবাদ বলে চুপ করে বসে থাকে সলোমন। সাবিহা সরে যায়, একটুও অপ্রস্তুত না হয়ে জিজ্ঞেস করে-

‘দুপুরে তুমি কী খাবে? আমি আজ রান্না করবো সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

‘যে কোনো কিছু!’ বলে সংক্ষেপে জবাব দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে সলোমন। ‘আচ্ছা’ বলে হাসিমুখে বিদায় নেয় সাবিহা।

সেদিন এবং তার পরের দিনটিও সলোমনের এভাবেই ঘরে বসে কাটে। সাবিহার উৎসাহ আন্তরিকতা ও যত্নের বিপরীতে সলোমন কেবল ‘হা, না, উহু’ বলে চালিয়ে দেয়। তৃতীয় দিন সকালে অফিসে যোগ দেওয়ার উদ্দেশে পরিপাটি হয়ে নিজের ঘর থেকে বেরোয় সলোমন। খাবার টেবিলে পিতার সাথে দেখা হয়। সলোমন লক্ষ্য করে, তার মা মারা যাবার পরও পিতার প্রায় কোনো অভ্যাসই বদলায়নি। একইরকম বসে, একইরকম খায়, কথা বলে। মইনুল আহসান খান তাকে জিজ্ঞেস করে-

‘তাহলে আজ জয়েন করছিস?

‘হ্যাঁ’ বলে উত্তর দেয় সলোমন। সাবিহা ও সলোমনকে উদ্দেশ করে আহসান সাহেব বলে যান,

‘আমার সপ্তাহখানেকের জন্য একবার সুইডেন যাওয়ার দরকার হতে পারে, গভর্নমেন্ট কয়েকটি ডেম্যু ট্রেন কিনতে চায়, আমাকে সাথে নিচ্ছে কনসালটেন্ট হিসেবে। বুঝতেই পারছ, আমাদের দেশের সচিবদের এসব বিষয়ে নেগোসিয়েশন করবার অবস্থা নেই, তাই হয়তো। আমিও যেতে ইচ্ছুক, ওদের কোম্পানির সাথেই-তো আমার ব্যবসা, শুরুর দিকে একবার গিয়েছিলাম, বছর দু’য়েক আগেও একবার গিয়েছি, আবার একটু যাওয়া দরকার।’

সলোমন ভাবে তার কী বলা উচিত, মা বেঁচে থাকলে নির্দ্বিধায় বলতে পারতো, ‘মাকে নিয়ে যাও! তা-আর বলতে পারছে না। তবু মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়, ‘উনাকে নিয়ে যাও!’ সলোমনের মুখে সাবিহার বিষয়ে ‘উনি’ সম্বোধন শুনে খান সাহেবের কথায় একটু ছেদ পড়ে। তবে ওটুকুই, সামলে নিয়ে বলে চলেন,

‘হ্যাঁ! সেটা হতেই পারতো, তবে অনেকদিন পর তুই বাড়িতে ফিরেছিস, তোর আবার অফিসও আছে, সেটা একটা বিষয়; তাছাড়া এইসব সরকারি লোকের দঙ্গলে আমি আসলে ও-কে নিতে চাচ্ছি না।’

সলোমন আর কিছু বলে না, সাবিহাও না। খাওয়া শেষ করে আহসান সাহেব সলোমনকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুই গাড়ি কোনটা নিয়ে বেরোতে চাস?’ সোৎসাহে সাবিহা বলে ‘অবশ্যই নতুনটা!’ তুমি তোমারটা নিয়ে বেরিয়ে যাও। মুখ না তুলেই সলোমন জবাব দেয়-

‘না, আমি গাড়ি নিতে চাচ্ছি না। কেন! বলে কিছুটা বিস্ময়ের সাথে আহসান সাহেব ছেলের দিকে তাকান।

তুমি-তো জানোই, আমার অফিসে পার্কিংয়ের জায়গা খুবই কম, স্যারদের গাড়িও কখনো-কখনো রাস্তায় রাখতে হয়, আমি ট্যাক্সি নিয়েই যাবো। আহসান সাহেব পুনরায় বলেন-

‘তাহলে চল! তোকে নামিয়ে দিয়ে যাই, আমি ওদিক দিয়েই যাবো।

সলোমন এবারও বাধা দিয়ে বলে, ‘না বাবা, আমি ট্যাক্সিতেই যাবো।’

আহসান সাহেব এবার কিছুটা অপ্রতিভ হন। একটু দম নিয়ে বলেন,

‘আচ্ছা! তোর জন্য একটা গাড়ি আনিয়ে নিতে হবে, ওকে! দু-একদিনের ভেতরেই আনাচ্ছি।’

‘প্লিজ বাবা, তোমার নিশ্চয় মনে আছে, স্কুলের পর আমি আর বিশেষ একটা গাড়িতে চড়িনি। বাস-রিকশাতেই চলাফেরা করেছি, তাই না?’

‘তা বটে! কিন্তু দেশের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তুই কিছু জানিস না। টিভি দেখার অভ্যাস তোর কোনোদিনই খুব একটা ছিল না। ‘উই আর রুলড বাই টিভি’ বলে সেই ছোটবেলায়ই টিভি দেখা বাদ দিয়েছিস। শোন! টেলিভিশন কেবল আমাদের রুলই করে না। খবরাখবরও দেয়। পত্রিকাও তো পড়িস না। দেশে এখন মারাত্মক পলিটিক্যাল হাঙ্গামা চলছে, কিছুদিন আগে-তো পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ ছিল, তুই ঢাকায় নেই এটা ভেবেই আমরা বরং একটু স্বস্তিতে ছিলাম। রাস্তায় চলন্ত পাবলিক বাস-প্রাইভেট কারে কারা যেন আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে, একটা কোনো গোষ্ঠীর মদদে এগুলো হচ্ছে, আবার বিদেশের মদদেও হতে পারে। তবে কারা কাজগুলো করছে পুলিশ তার কিছুই জানে না। ভেতরে কে আছে না আছে এসব ওদের বিবেচ্য বিষয় নয়, গানপাউডার ছড়াচ্ছে অথবা পেট্রোল ঢালছে, আগুন দিচ্ছে, তারপর চোখের নিমিষে এক একটা গাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। সকাল-আর সন্ধ্যার দিকেই এসব হচ্ছে বেশি। গোলাম রাব্বানি চাচাকে মনে আছে তো তোর! ওই যে, ওয়াপদায় আমার কলিগ ছিল। তোর প্রায় প্রতিটি জন্মদিনেই ওরা আসতো। ওর ওই মেয়েটা এশা আর বউ গিয়েছিল গুলশানে, কী যেন শপিং-টপিং করতে, গাড়িতে সরকারি স্টিকার লাগানোই ছিল, ফেরার পথে মহাখালী রেলক্রসিংটার সামনে সিগন্যালে দাঁড়ানো অবস্থায় গাড়িটাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ড্রাইভারের উপস্থিত বুদ্ধিতে প্রাণে বেঁচে গেছে, এখন হাসপাতালে। মেয়েটার শরীরের অর্ধেকের বেশি পুড়ে গেছে।’

সলোমন নির্বিকার মুখে একবার সাবিহা, একবার তার পিতা ও শেষে টেবিলের উপর রাখা শূন্য প্লেটটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ছেলের দিকে তাকিয়ে পুনরায় আহসান সাহেব বলেন,

‘তাছাড়া তুই অনেকদিন একটা ভিন্ন আর উন্নত জায়গায় থেকে এলি, ওখানকার পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাটের বিপরীতে এখানকার অসহনীয় ট্রাফিক, রিকশা-বাসের হুটোপুটি, রাস্তাময় কেবল ধুলো আর ধুলো। পারবি তো?’

সলোমন এবার দেয়ালের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে ওঠে; ফেরার পর এই প্রথম। ‘পারবো বাবা’ বলে আহসান সাহেবকে আশ্বস্ত করে।

অফিসে ঢুকে সলোমন সোজা নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা বিভাগের পরিচালকের কক্ষে যায়। পরিচালক মহোদয় সদাশয় মানুষ; তিনি সলোমনকে বিব্রতকর কিছুই বলেন না। কেবল বলেন, জায়গাস্বল্পতার কারণে এই মুহূর্তে তার জন্য একটি পুরো কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না। আপাতত সলোমনের দুই ব্যাচ সিনিয়র মনির সাহেবের কক্ষটিতে তাকে শেয়ার করে বসতে হবে। কিছুদিন পর একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই বের করা যাবে। সলোমন তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে আসে। বারান্দায় একজন সহকারী তাকে সালাম দেয়, কুশল বিনিময়ের পর সলোমন তাকে নিজের অনুকূলে একটি যোগদানপত্র প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়ে তার কাছ থেকে মনির সাহেবের কক্ষ নাম্বারটি জেনে নেয়। একশ’ সাত নম্বর কক্ষে ঢুকতেই মনির সাহেব তাকে উঠে এসে আলিঙ্গন করেন। পাশে থাকা ডেস্কটি দেখিয়ে দিয়ে জানতে চান-

‘আচ্ছা সলোমন! নিউইয়র্কে আপনার কী ধরনের সমস্যা হচ্ছিল?’

সলোমন কী উত্তর দেবে ভেবে বের করার আগেই মনির সাহেব বলেন,

‘আমাদের মতো গরিব দেশের ফরেন অ্যাফেয়ার্স অফিসারদের স্বপ্নই থাকে নিউইয়র্ক বা এমন কোনো একটা জায়গায় পোস্টিং। চাকরির দু’বছরের মাথায় আপনি সেটা পেয়ে গেলেন। আবার শেষ না করে ফিরেও এলেন। অবশ্য আপনার ব্যাপারটা আলাদা, আপনি-তো আবার বড়োলোকের ছেলে। বলুন-তো আসলে কী সমস্যা হচ্ছিল? নিশ্চয় খাওয়া-দাওয়া, রাস্তায় চেনা মানুষের অভাব, নাকি পিতা-মাতার জন্য প্রাণ কাঁদছিল।

সলোমন তাকে জানায়, ‘তার মা বেশ আগেই মারা গেছেন।’

মনির সাহেব ‘ও আচ্ছা, সরি’ বলে চুপ করে যান। সলোমন চোখ বন্ধ করে একটু দম নেয়, বুঝতে পারে, কনসল জেনারেল তার প্রত্যাগমন বিষয়ে বিশেষ কোনো কড়া নোট লেখেননি। হয়তো সলোমন স্বেচ্ছায় চলে যেতে চায়; এমন কিছুই লিখে থাকবেন। নিউইয়র্কের শেষ দিনগুলোর স্মৃতি সলোমনের ততটা স্পষ্ট নয়, ঐ দিনগুলোতে সে আসলে তার ভেতরে ছিল না। ফলে কী কী ঘটেছিল তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সলোমন স্মরণ করতে পারে না।

পরদিন থেকে সলোমন নিয়মিত অফিসে আসতে থাকে এবং মনির সাহেবের পাশে বসতে থাকে। সলোমনের বিশেষ কোনো কাজ থাকে না, বিশেষ কোনো কাজ মনির সাহেবেরও থাকে না। আসলে এই বিভাগে খুব বেশি কাজ নেই। কেউ-কেউ হাতের কাজটাকে অকারণ দীর্ঘায়িত করে অর্জিত ব্যস্ততাটুকু অক্ষুণœ রাখছেন মাত্র।

সলোমন-সাবিহার বন্ধুত্ব দারুণভাবে জমে ওঠে। সাবিহাই সলোমনকে বলে,

‘দেখ, বয়সে ছোটো একজন নারীকে মা বলে ডাকতে তোমার অসুবিধা হচ্ছে, হবারই কথা তুমি বরং আমাকে নাম ধরেই ডেক।’

এই কথা সাবিহা যখন বলে তার আগেই তারা মিলিত হয়েছে। কর্মহীন অফিসে টানা বসে থাকাটা সলোমনের কাছে উপভোগ্য হয়নি। আর নিচতলার লম্বা কক্ষটির শেষভাগে, অর্থাৎ যে পাশে জানলা; মনির সাহেব নিজের টেবিল-চেয়ার নিয়ে সেদিকে সরে গেছেন। আর দরজার সামনের অংশটিতে অর্থাৎ দরজা খুললেই যে জায়গাটুকু ওখানেই সলোমনের বসবার জায়গা হয়েছে। দুপুরটা বাইরে তাকিয়ে কাটিয়ে দেবার স্থৈর্য এবং বিলাসিতা দুটোই সলোমনের রয়েছে কিন্তু, দুপুর হলেই সলোমন যখন তার চেয়ার থেকে জানলার দিকে তাকানোর জন্য বাঁয়ে মাথা ঘোরায় তখনই, সলোমনের চোখে মনির সাহেবের মুখটা অবধারিত হয়ে পড়ে। সলোমন সেদিকে ফিরলেই মনির সাহেব কিছু একটা বলে ওঠেন, সেটা যেকোনো কিছু-যেকোনো প্রসঙ্গে। এবং সলোমনের চোখ বাধাগ্রস্ত হয়ে নিজের টেবিলে ফিরে আসে। ডানের দরজাটা খোলা থাকলেও কিছুটা চলতো, কিন্তু গোথিক এই বাড়ির দুই-পাল্লার সাদা রঙের পুরনো দরজাগুলোতে সদ্যই ডোরক্লোজার লাগানো হয়েছে। ফলে ওটা এমনিতেই বন্ধ থাকে।

যোগ দেওয়ার দ্বিতীয় দিন কি তৃতীয় দিন দুপুরে, সলোমান যখন জানলা দেখার উদ্দেশ্য বাঁয়ে তাকায় তখন মনির সাহেব সবে খাওয়া শেষ করে আঙুল চাটছেন। একের পর এক আঙুল তিনি মুখে পুরছেন এবং চট-চট শব্দে টেনে বের করছেন। এই দৃশ্য দেখে সলোমন বাড়ি চলে আসে এবং ঢুকতেই সাবিহার সাথে দেখা হয়। সাবিহা তার সাথে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এবং মাইকেল অ্যাঞ্জোলোর চিত্রকর্ম নিয়ে আলোচনা করতে চায়, যেহেতু ভিঞ্চি হলেন একই সাথে একজন বৈজ্ঞানিক, একজন প্রকৌশলী, সংগীতজ্ঞ, চিন্তাবিদ ও লেখক পক্ষান্তরে মাইকেল অ্যাঞ্জোলো তার মহান সব চিত্রকর্মের বাইরে একজন কবি ও ভাস্কর হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিলেন। সাবিহার কথা শেষ হলে সলোমন বলে, ‘দ্য আর্ট ইজ এলস্হয়্যার।’ এবং এই কথা বলে সলোমন তার দুই বাহু উন্মুক্ত করে সাবিহাকে আমন্ত্রণ জানায়। সাবিহা কালবিলম্ব না করে ছুটে গিয়ে উদ্বাহু সলোমনের বুকের সাথে লেপ্টে যায় এবং পরিতৃপ্ত হয়। তখনই সে সলোমনকে ঐ কথা বলে।

সলোমনের রঙিন আর উপভোগ্য দিনগুলোর সূচনা মূলত তখনই হয়। একদিন দুপুরে, অফিস থেকে ফিরে সালোমন ও সাবিহা মিলিত হয় এবং বিকেল পর্যন্ত খোলা শরীরে তারা চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে, এসময়ে সাবিহা সলোমনকে শ্রেষ্ঠ ফ্লেমিস চিত্রকর পল রুবেন্সের গল্প শোনায়। এবং এ অবস্থায় জানলার ফাঁক দিয়ে তারা আহসান সাহেবকে ভেতরে ঢুকতে দেখে। সলোমন কিঞ্চিৎ ভড়কে যায়। তবে সাবিহা বিছানা ছাড়তে ছাড়তে বলে,

‘ভয় পেয় না সলোমন, আমি নারী, অমৃত আর হলাহল, দুটো একসাথে পান করার ক্ষমতা আমার রয়েছে।’

সলোমন সবিস্ময়ে লক্ষ্য করে, এতসব যে তাদের ভেতরে ঘটছে তার কোনো চিহ্নই সাবিহার মুখে নেই। আহসান সাহেব পরিতৃপ্ত স্ত্রী ও সন্তানকে দেখে ভীষণ খুশি হন। এবং উচ্চ স্বরে পুনরায় তাদের বন্ধুত্বকে অভিনন্দন জানান। আহসান সাহেবের সুইডেন অবস্থানের দিনগুলো এই শহরটাকে হঠাৎই সলোমনের খুব ভালো লাগতে থাকে। রাস্তায় চলা সন্ত্রাসের লাগাম টানতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ, আতঙ্ক কেটে গেছে। ট্যাক্সি ছেড়ে রিকশায় করে অফিসে যায় সলোমন। রোদ-ধুলো, মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির ধেয়ে আসা কালো ধোঁয়া, বিদঘুটে ভিক্ষুক, ঘিরে ধরা হিজড়ার দল, গলায় সাপ ঝুলিয়ে ভিক্ষে করা জিপসি নারী, পাশ দিয়ে যাবার সময় বাসের হেল্পার-কন্ডাকটরের বিকট চিৎকার, ক্রমাগত হর্ন, মৃদু-মাঝারি কিংবা পুলিশ-হাসপাতাল-দমকলের গাড়িগুলোর নিষ্ফল আর ভয়ানক সাইরেন, ফুল বিক্রেতা শিশু, অকারণ জ্যামে বসে থাকা, ঋতুকালীন জোড়া লেগে যাওয়া কুকুরের মতো রিকশার সারি; পেছনে একটার পেছনে আরেকটা, ডানে-বাঁয়ে সামনে-পেছনে অজ¯্র, হ্যান্ডেল ছেড়ে রাস্তায় নেমে খিস্তি-ধস্তাধস্তি, ট্রাফিকের লাঠি হাতে ছুটে আসা, যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকার অপরাধে হাওয়া ছেড়ে দেওয়া চাকার ফোঁপানি; এই সবকিছুই তার ভালো লাগতে থাকে। গাঢ় চুম্বনের উষ্ণতা নিয়ে বিছানা ছাড়ে সলোমন। বেরোবার সময় পেছন থেকে জড়িয়ে ধরা চুম্বনের সৌরভ নিয়ে অফিসে যায়। কাজ না থাকায় আবারও দুপুরে ফিরে আসে। সাবিহা তার জন্য অপেক্ষা করে, এই সময়টার অধিকাংশই সলোমন সাবিহার ঘরে অবস্থান করে, যে ঘরটা একসময় তার মায়ের ছিল, যদিও এখন আর তার কোনো স্মৃতি-গন্ধ কোনোটাই অবশিষ্ট নেই। পিতা-মাতার কোলে হাস্যোজ্জ্বল শিশু সলোমনের ছবিটাও চলে গেছে বসার ঘরে। সাবিহা নয় আহসান সাহেবই ছবিটাকে বসার ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তরুণী স্ত্রীর সাথে সঙ্গমকালে মাঝে-মাঝেই তার চোখ চলে যেত ঐ ছবিটার দিকে আর তক্ষোণই মনোযোগ হারিয়ে হয়ে যেতেন নিরুত্তেজিত। ফলে ছবিটাকে বের করে দেওয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না।

রাষ্ট্র, বিদেশি কোম্পানি ও নিজের কোম্পানি; তিনপক্ষের জন্যই বিপুল লাভজনক একটি চুক্তি স্বাক্ষর শেষে মইনুল আহসান খান দেশে ফেরেন। পরদিন নাস্তার টেবিলে জানান, ওখানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোটের একজন শীর্ষ নেতার সাথে তার কথা হয়েছে, নেতা তাকে জানিয়েছেন, পলিটিক্সে তার মতো দক্ষ লোকের খুব অভাব রয়েছে এবং এখন তার রাজনীতি করা উচিত। আহসান সাহেব রাজি থাকলে তার দল তাকে পার্লামেন্টারিয়ান অথবা ব্যবসায়ী গিল্ডের শীর্ষ পদে বসতে সাহায্য করবে। প্রথম দফায় ব্যাপারটি কেমন যেন মনে হলেও ফিরে আসার দীর্ঘ বিমান ভ্রমণে বিষয়টি নিয়ে তিনি গভীরভাবে ভেবেছেন এবং প্রস্তাবটি তিনি বিবেচনা করতে চান। এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে স্ত্রী-সন্তানকে সাথে নিয়ে ঢাকার বাইরে কোথাও তিনি কয়েকটি দিন অবসর যাপন করতে চান। সেক্ষেত্রে নিজের দেশে অবস্থিত পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারকেই তিনি উত্তম জায়গা বলে বিবেচনা করছেন, আর সময়টা যেহেতু পর্যটনের নয় সুতরাং হোটেল-মোটেল থেকে সৈকত সব জায়গাই ফাঁকা পড়ে আছে বলে তিনি সালোমন ও সাবিহাকে জানান।

আকাশ নয়, উদ্বীপ্ত আহসান সাহেব এই ভ্রমণটি সড়কপথেই করতে চান। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দু’দিন পরের এক সকালে ভি-৮ জিপটাতে চড়ে তারা কক্সবাজার যাত্রা করেন। চূড়ান্ত প্রাইভেসি আর অন্তরঙ্গতার স্বার্থে ড্রাইভারকে নেওয়া হয় না। অর্ধেকটা পথ আহসান সাহেব গাড়ি চালিয়ে যান। সেসময় তার পাশে অর্থাৎ সামনের সিটটাতে সাবিহা বসে থাকে। সলোমন বসে পেছনের সিটে। তার ব্যাগে ‘দ্য ভেস্টেল অন ব্র্যাট্ল’। চাইলেই  বের করে সেটা পড়তে পারে, তবে তা করে না। সামনে বসে গাড়ি চালানো পিতার আনন্দিত মুখ দেখে সলোমন, পাশে সাবিহার মুখটা খোঁজে, পায় না। পিতার এই সৌভাগ্য তাকে কিয়ৎক্ষণের জন্য আনন্দিত করে। তার পিতার রাজনীতিতে নামা না নামার সোয়াট অ্যানালাইসিস পূর্ণ মনোযোগের সাথে শোনে সাবিহা, গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করে, সে সময়ে তার পিতা আরও গৌরবান্বিত আরও সুখী হয়ে ওঠে। সলোমনের মায়ের কথা মনে পড়ে এবং  বাইরে তাকিয়ে শব্দহীনভাবে মায়ের সাথে কথা বলতে থাকে। স্বামীর এই সৌভাগ্যে সলোমনের মা-ও সুখী হয়, সুখের হাসি আড়াল করতে মুখে আঁচল টেনে দেয়। একসময় সে-ও চলে যায়, স্যান্ডি আর ওমর সামনে আসে, কী করছে তারা? ফেন্টানিলে নীল হয়ে বসে আছে আর একটা নীল পানির নদীর পাড়ে; উঁচু একটা ঢিবির উপর। নদীতে ওদের জোড়া মুখ দেখা যায়। পানির দুলুনিতে ক্রমাগত ফেটে যেতে থাকে স্যান্ডি আর ওমরের মুখচ্ছবি। কী ভাবছে তারা, সলোমনকে মনে পড়ছে ওদের? যৌথভাবে ওরা একটি কবিতার বই প্রকাশ করতে চায়, কতদূর গেল সেটা? সলোমনের কি ফোন করে ওদের খবর নেওয়া উচিত? একসময় সামনের দিক থেকে কথা বলা বন্ধ হয়। রবীন্দ্রনাথের প্রাণ শীতল করা সুর ভেসে আসে নতুন গাড়ির কড়া এসির সাথে। সলোমনের ঠান্ডা বোধ হয়। এসিটা কমিয়ে দিতে বলার জন্য দুই ঠোঁট এক করেও থেমে যায়; কেমন যেন অচেনা লাগে আহসান সাহেবকে, কথা বলতে ইচ্ছে হয় না। ক্রমাগত পেছনে পড়ে যেতে থাকা ফসলের মাঠ, বনানী দেখতে দেখতে ঝিমুনি ধরে আসে।

পিতার ডাক আর সাবিহার হাসিতে ঘুম ভাঙে সলোমনের, তারা দরজা খুলে দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। একটি বড় সড় রেস্তোরাঁর সামনে গাড়িটি পার্ক করেছেন আহসান সাহেব। বিরতি দরকার, একটানা ঘণ্টা তিনেক গাড়ি চালিয়েছেন তিনি, কোমরটাও ধরে এসেছে, চায়ের তেষ্টাও পেয়েছে। সেখানে কিছুসময় অতিবাহিত করে তারা। সলোমনের ইচ্ছা হয় সিগারেট খাওয়ার, খায় না। গাড়িতে ওঠার সময় আহসান সাহেব সলোমনকে বলেন,

‘আমরা অর্ধেকটা চলে এসেছি, এবার তোর পালা।’

সলোমন ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে, সিট বেল্ট গুঁজতে বাঁয়ে তাকায়, সাবিহার চোখে চোখ পড়ে। সাবিহার মুখে হাসি। পথে আর কোথাও তাদের দাঁড়ানোর দরকার পড়ে না। পেছন থেকে পিতার ডান-বাম নির্দেশনা ধরে যেতে যেতে সমুদ্রঘেঁষা সদ্য-নির্মিত পাঁচতারকা হোটেলটির সামনে গিয়ে পার্ক করে। কোথায় থাকবেন, কী করবেন সবকিছুর জন্যই পূর্ব থেকে ব্যবস্থা নিয়েছেন আহসান সাহেব। তারা ব্যাগ হাতে নেমে দাঁড়ান। দু’জন বেয়ারা আসে, হাতের ব্যাগগুলো নিয়ে নেয়। তিনতলার পেছন দিকের একটি হানিমুন স্যুট; যেটার জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা যায়। ঢেউয়ের শব্দ আর উন্মাতাল নোনা বাতাস ভেতরে ঢুকে পড়ে; সেটিতে ওঠে সাবিহা ও তার পিতা। এটা তাদের হানিমুনও হতে পারে, ঠিক জানে না সলোমন। হোটেলটি প্রায় ফাঁকা। অন্তত তাদের তলাটি-তো সম্পূর্ণ ফাঁকা। কক্ষে নোনা বাতাসের প্রবাহ অক্ষুণœ রাখতে দরজা খুলে দেন আহসান সাহেব, ঢুকতেই একটি ওয়েটিং রুম, বেশ প্রশস্ত, হোটেলটির কক্ষগুলো নির্মাণে কোনো কার্পণ্য নেই। সামনের একাধিক দরজায় উপর্যুপরি পর্দা রয়েছে, দরজা খোলা থাকলেও গোপনীয়তায় কোনো ঘাটতি নেই।

পাশের কক্ষটিতে ঢুকে পড়ে সলোমন। ব্যাগ নিয়ে আসা বেয়ারার নানা সেবামূলক নির্দেশনা মাঝখানে থামিয়ে দেয়। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে দরজার সুইচ টিপে দিয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকে যায়। জুতসই কিছু খুঁজে পায় না। ফ্রিজ খুলে একটি কাচের বোতল বের করে, মুখ খুলে ভেতরের সবটুকু পানি বেসিনে ঢেলে টিস্যু দিয়ে ওটার ভেজা শরীরটা মুছে নেয়। ওয়ালেটের খুচরো পয়সার পকেটটি হাতড়ে ফ্যান্টানিলগুলো বের করে। কমোডের সাথে লাগানো সাদা জারটির উপর একটি রাখে, শেষ হয়ে এসেছে, আর মাত্র তিনটি অবশিষ্ট আছে। সাবধানী হাতে কাচের বোতল দিয়ে ওটাকে গুঁড়ো করে নেয়। পকেটে রয়ে যাওয়া আব্রাহাম লিংকনের ছবিওয়ালা ডলারটি বের করে ভাঁজ করে এবং জারের উপর ছড়িয়ে থাকা পাউডারটুকু পরপর তিনটি লম্বা টানে নাকের ভেতর নিয়ে নেয়। সবটুকু আসে না, লেগে থাকে জারের গায়ে, ফুঁ দিয়ে দিয়ে সেটুকু উড়িয়ে দেয়- হাত দিয়ে মুছে ফেলে।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে সলোমন। জানলা দিয়ে বিপুলা সমুদ্রের স্ফীত ঢেউ আর বাঁকানো বুক দেখা যায়। সেদিকে তাকায় না, সৌন্দর্য কখনও কখনও আতঙ্ক তৈরি করে, পর্দা টেনে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে, অপেক্ষা করে সেই ভয়াবহ নারীমু-ু, কর্তিত পা, আর লেজ-মাথাহীন আঁশটে ছড়ানো মাছের মতো পড়ে থাকা উলঙ্গ ধড়টির জন্য। ধড়টির শরীরে কোনো কাপড় নেই, হয়তো ট্রেনের নিচে কোনো নাট-বল্টু অথবা স্ক্রুর সাথে আটকে শাড়িটা চলে গেছে কোথাও। তাইবা কীভাবে হয়! শৈশবে সলোমন তার মায়ের শাড়ি পরা দেখেছে, যে পদ্ধতিতে সেটা পরা হয় তাতে পড়ে থাকা শরীর থেকে ওটা খুলে নিতে হলে শরীরটাকে কয়েকবার উল্টে পাল্টে যেতে হবে। এমন কি হতে পারে; ওই নারী বিবস্ত্র অবস্থায় ওখানে এসে শুয়েছিলেন? না, তা হতে পারে না। হতে পারে না কেন? বিংশ শতকের গোড়ার দিকে একজন বিপ্লবী নারী পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর আত্মহত্যার জন্য টানা চার দিন অপেক্ষা করেছিলেন, যদিও অন্যান্য কমরেডের মতো তার গলায়ও পটাশিয়াম সায়ানাইডের কবজ বাঁধা ছিল। এবং তার সাথের অনেকেই, ধরা পড়ার সাথে সাথে সেটা মুখে পুরে আত্মহত্যা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ঐ নারী চারদিন অপেক্ষা করেছিলেন, কেননা ঐ সময়ে তার ঋতুস্রাব চলছিল, মৃত্যুর পরে নি¤œাঙ্গে রক্ত দেখে কেউ যেন তাকে দোষারোপ করতে না পারে; মৃত্যুর পূর্বে তিনি অবৈধ সন্তান পেটে ধারণ করেছিলেন। ট্রেনের তলায় ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়া নারী তাহলে উলঙ্গ হয়ে কেন আত্মহত্যা করেছিলেন? অথবা এমনকি হতে পারে? তিনি আত্মহত্যা করেননি। মৃত্যুর পূর্বে তাকে উলঙ্গ করে ধর্ষণ করা হয় এবং মৃত অথবা অচেতন অবস্থায় তাকে ওখানে শুইয়ে রেখে যাওয়া হয়েছিল। হতে পারে কি? এটা সলোমন দেখেছিল তার শৈশবে, নারায়ণগঞ্জ, তার মাতুলালয়ে বেড়াতে গিয়ে। রেললাইনের অদূরেই একটি পুরানো বেশ্যালয় ছিল, হতে পারে কি; ট্রেনের চাকায় টুকরো-টুকরো হয়ে যাওয়া নারী ওখানকারই কোনো সদস্য ছিলেন। ভাবনার এই নকশাগুলো আগে কোনোদিন সলোমনের মনে আসেনি। আজই এসব মনে হলো। বিছানায় শুয়ে কর্তিত নারীমুণ্ডুর অপেক্ষায় থেকে থেকে সলোমনের দম বন্ধ হয়ে আসে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ঠিক হয়ে যায়। নারীমুণ্ডু আর আসে না। সলোমন ভাবে; তবে কি সে মুক্তি পেয়ে গেল? মুক্তি! কিসের মুক্তি? তার এই মুক্তি প্রার্থিত নয়। বরং ঐ করুণ হাসির মায়ায় পড়েছে সে। তার সাথে হো হো করে হাসতে সলোমনের ভালো লাগে।

কক্সবাজারের প্রথম সন্ধ্যাটা রুমের ভেতর পড়ে থেকেই কাটিয়ে দেয় সলোমন। পরদিন সকালে সুবিশাল ডাইনিংযে নাস্তার সময় আহসান সাহেবের একজন পূর্ব-পরিচিত লোক তাদের সাথে যোগ দেয়। তার সাথে বাংলাদেশের পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলাপ করেন আহসান সাহেব। আহসান সাহেব খান বলেন,

‘শুধু রক্ষণশীল সমাজের দোহাই দিলে চলবে না। পৃথিবীর অপরাপর রক্ষণশীল দেশগুলো বিশেষ ব্যবস্থায় পর্যটন শিল্পে উন্নতি করেছে, এ বিষয়ে যথেষ্ট পরিমাণ উদাহরণ দেওয়া যাবে।’

লোকটা আহসান সাহেবের সকল অসন্তোষ ও অভিযোগের হাসিমুখে একমত পোষণ করে। লোকটা সলোমনের পিতাকে এখান থেকে মাত্র ত্রিশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে একটি সমুদ্র লাগোয়া উপভোগ্য রিসোর্টের কথা বলে; জায়গাটা একেবারেই নিরিবিলি। আহসান সাহেবের মতো লোকদের আড্ডা দেওয়া ও সময় কাটানোর জন্য দারুণভাবে উপযোগী। লোকটা তাদের আরও জানায়, সেখানে কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের প্রধান ছাড়াও চট্টগ্রামের দু’জন ব্যবসায়ী থাকবেন। ভেতরে মদ্যপানের জন্য সুসজ্জিত জায়গা রয়েছে। এশিয়ার অন্যান্য প্রতিনিধিত্বশীল রিসোর্টের সাথে পাল্লা দিয়ে ওটাকে প্রস্তুত করা হয়েছে। এখনও জমে ওঠেনি জায়গাটা, আর ওটার পরিচালনকর্তৃপক্ষ একটু বাছাই করেই অতিথি নির্বাচন করছে, সুতরাং ইতস্তত ঘুরতে থাকা পর্যটকেরা সহসাই ওটার ভেতর ঢুকে পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। আহসান সাহেব সোৎসাহে রাজি হয়ে যান। সলোমন-সাবিহাকে পেছনে বসিয়ে আগত বন্ধুকে বাঁয়ের সিটে তুলে নিয়ে গাড়ি হাঁকান। ডানে সমুদ্র আর বাঁয়ে পাহাড় রেখে সোজা এবং ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময়ে মইনুল আহসান খানকে অনেক বেশি উৎফুল্ল দেখায়। তিনি গাড়ির কাঁচ নামিয়ে দেন এবং স্বভাববিরুদ্ধভাবে চিৎকার করে সলোমনের ভালো লাগছে কিনা জানতে চান। সলোমন অনুচ্চ স্বরে ‘ভালো লাগছে’ বলে জানায়। পাশে বসা লোকটার সাথে নিজ দেশের এইসব প্রাকৃতিক লীলাভূমি ছাড়াও নানা বিষয়ে উচ্চস্বরে কথা বলে চলেন এহসান সাহেব। লোকটার শুটকি মাছের ব্যবসা। ব্যবসা নিয়ে হতাশার গল্প করে সে, শুঁটকির ব্যবসায় ব্যাংকগুলো ফাইনান্স করতে চায় না। অথচ তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিবছর অন্তত পাঁচ হাজার টন শুঁটকি তারা বিদেশের বাজারে রপ্তানি করতে সক্ষম। ঢাকাকেন্দ্রিক দু’চারজন রপ্তানিকারক থাকলেও তারা যথেষ্ট নয় এবং তাদের লেনদেনের মানও খুব খারাপ। লোকটা আহসান সাহেবকে খানকে শুঁটকির ব্যবসায় লগ্নি করার জন্য বলে। আহসান সাহেব ‘আচ্ছা! ভেবে দেখা যাবে বলে’ ছোট্ট উত্তরে নিজের নিরুৎসাহ প্রকাশ করে।

সাবিহা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে, যে পাশে সারিবদ্ধ টিলা-পাহাড়। সলোমন ডানের সমুদ্রকে উপেক্ষা করে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সাবিহার চুলে খোঁপা, এই বাতাসে তার চুলগুলো ওড়ার স্বাধীনতা পাচ্ছে না। সমুদ্র না কি পাহাড়? কোনটা সাবিহার বেশি ভালো লাগে তা সলোমন জানে না। সলোমনের পিতাও জানেন না, জানতেও চান না, পূর্বে জেনেছেন কি না তা-ও জানে না সলোমন। বাঁ-পাশের পাহাড়ে আটকে পড়া চোখ ফিরিয়ে সাবিহা ডানে তাকায়। মোটা আর নকশাকাটা ছাই রঙের শাড়ি পরে আছে সাবিহা। সলোমনের মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসে। সামনে বসা আহসান সাহেব ও শুঁটকি ব্যবসায়ীর উচ্চ স্বরের কথোপকথনের আড়ালে ছোট্ট করে জানতে চায় সাবিহা, ‘এখানে এসে সলোমনের মনে কবিতা এসেছে কি না?’ উত্তেজনাকর দিনগুলোতে সাবিহা ও সলোমনের আলোচনায় চিত্রশিল্প ছাড়াও শিল্পের বিবিধ শাখা-প্রশাখা নিয়ে আলোচনা হলেও কবিতা কখনও আসেনি। সলোমন উত্তর দেয়,

‘আমি কবিতা লিখতে জানি না, কখনো লিখিনি।’

সাবিহা আশ্চর্য হয়, ‘কবিতা লেখেনি এমন মানুষ আছে নাকি পৃথিবীতে!’

সাবিহার আশ্চর্য হওয়া দেখে সলোমন সমুদ্রের দিকে তাকায়, প্যারিসের এক কবির কথা মনে পড়ে তার; যার মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। যুদ্ধের সময়ে অন্য অনেক কবির সাথে সে-ও আমেরিকা পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। তার ভয় ছিল, আমেরিকান দূতাবাস তাকে ভিসা দেবে কি না! এবং তার ভীতি সত্যে পরিণত হয়, তার ভিসা মেলে না; এরপর তাকে আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায় না। তার মৃতদেহও কেউ কোথাও পড়ে থাকতে দেখেনি। ধারণা করা হয়, ভিসা না পাওয়ার গ্লানি কাটাতে তিনি জলপথে স্পেন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সেই অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে জাহাজে চড়ে বসেন। অজস্র ঘরহারা পলাতক মানুষের সাথে জাহাজের ডেকে কেউ কেউ তাকে বসে থাকতে দেখেছিল। তবে জাহাজ কার্ডোভা বন্দরে নোঙর করার পর কেউ তাকে নামতে দেখেনি। স্পেনেও কোনোদিন তাকে দেখা যায়নি, প্যারিসেও ফেরেননি। যাত্রাপথে ঝড়ের কবলে পড়েছিল তাদের জাহাজ, কিন্তু সে ঝড়ে জাহাজ থেকে কেউ ছিটকে পড়েনি। অনুমান হয় ঝড় শুরু হওয়ার পর ফুঁসে ওঠা সমুদ্রের সৌন্দর্য তাকে বিমোহিত করে এবং জাহাজ থেকে তিনি সমুদ্রে লাফিয়ে পড়েন। তার কথা মনে হওয়াতে সমুদ্রের ওপর থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয় সলোমন। সামনের দিকে তাকায়, গাড়ির গতি কমে বাঁক নেওয়া দেখে বুঝতে পারে, তারা গন্তব্যে পৌঁছে গেছে।

রিসোর্টটিকে বাইরে থেকে দেখে এর ভেতরটা বোঝার সুযোগ নেই। মোটা আর জবড়জঙ কাঠের সুবিশাল বাড়ি, ডান দিকে একটি মেকি পুল রয়েছে, বালি সরিয়ে নদীর মতো শুকনো নালা তৈরি করা হয়েছে তার ওপর কাঠ-লোহা চাপিয়ে তৈরি করা হয়েছে পুলটি। সেটি পাড়ি দিলে আরেকটা ঘর, সেখানে বিশ্বের নামকরা সকল ব্র্যান্ডের কফি পাওয়া যায়। ভেতরটা তৈরি করা হয়েছে ড্যান্স-বারের সকল সুযোগ-সুবিধাসহ। সেটি তিনপাশ ঘুরিয়ে সমুদ্রের দিকে মুখ করা বেশ কিছু কক্ষ। সামনের বালুময় চত্বরটি পাড়ি দিলেই সমুদ্র। শুটকি ব্যবসায়ীর সাথে ভেতরে প্রবেশ করে তারা। সুবিশাল মদের দোকান, চোখ ধাঁধানো সংগ্রহ। ভেতরে এবং মাঝখানে একটি টেবিলে মাত্র চারজন লোক বসা। শুঁটকি ব্যবসায়ীর বলা চট্টগ্রামের ভাঙা জাহাজের কারবারি, একজন রিফাইন্ড স্টিলের ব্যবসায়ী, চেম্বার সভাপতিসহ অপর একজন। তারা আহসান সাহেবের অপেক্ষায় ছিল। উঠে দাঁড়িয়ে বিপুল হাসিতে তারা তাকে অভ্যর্থনা জানায়। কোনো নির্দেশনা ছাড়াই সাবিহা ও সলোমন ঈষৎ পেছনে দাঁড়িয়ে তাদের সাথে অমনোযোগের হাসি হেসে পরিচিত হওয়ার পর্বটি সেরে নেয়। তাদের থেকে বেশ দূরে  আহসান সাহেবের পেছন দিকের একটি টেবিলে বসে তারা।

আহসান সাহেব আসন নিতেই তাদের একজন হাঁক ছেড়ে বেয়ারাকে ডাকে। হাজির হওয়া পরিপাটি বেয়ারাকে টেবিলে রাখা তাস পাল্টে দেওয়ার হুকুম দেয়, সেই সাথে বিয়ার পরিবেশন। মুহূর্তে সব হাজির হয়ে যায়। আহসান সাহেব কাচের বোতলে বিয়ার দেখে খুশি হয়ে ওঠেন। আনন্দিত মুখে সঙ্গীদের জানান, ‘কাচের বোতলের বিয়ার তিনি বিশেষ পছন্দ করেন’। এখানে এটা পেয়ে যাবার জন্য রিসোর্টটির প্রশংসা করেন। তিনি জানান, ‘সত্যি বলতে কি অ্যালুমিনিয়ামের কৌটাওয়ালা বিয়ার তিনি বিশেষ পছন্দ করেন না, ক্ষেত্রবিশেষ ওটা তার জন্য বিরক্তিকরও বটে। বেয়ারাকে তিনি তখনই বখশিস দিতে উদ্যত হন। বাকিরা তাকে ‘আরে আরে করছেন কি! ওটা আমাদের বিষয়, আপনি আমাদের অতিথি’ বলে আহসান সাহেবকে নিবৃত্ত করে। বেয়ারা ওখান থেকে এবার সলোমন-সাবিহার টেবিলে এসে দাঁড়ায়। নিচু স্বরে সলোমন দশটি বিয়ারের অর্ডার দেয়, বেয়ারা তাকে বলে,

‘স্যার একেবারেই দেব, নাকি দু’তিন দফায়?

সলোমন তাকে একবারেই নিয়ে আসার অনুরোধ করে। সাবিহা ও বেয়ারা একমুহূর্তের জন্য মুখ চাওয়া-চাউয়ি করে।

বিয়ার চলে আসে। কোনো ধরনের তিক্ততা কিংবা শীতলতা ছাড়াই তারা চুপচাপ বসে থাকে, পান করে। সময় এগিয়ে যায়। আহসান সাহেবের টেবিল জমে ওঠে। এমনিতে তিনি নিয়মিত তাস-জুয়া কোনোটাই খেলেন না। নিজেকে ডিস্ট্রেস করতে কিংবা বড় কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে তিনি এরকম আড্ডা পছন্দ করেন। অফিসার্স ক্লাবের দুই টাকা বোর্ডের হাউজি থেকে আজ অবধি এই খেলাটা কোনোদিনই তার জন্য লোকসান বয়ে আনেনি। তিনি ভাগ্যের উপর নির্ভর করেন না। তবে মাঝে মাঝে সেটা বাজিয়ে দেখেন। সলোমন-সাবিহা পেছন থেকে তার নড়াচড়া ও টেবিল চাপড়ানো দেখে বুঝতে পারে; ভাগ্য বরাবরের মতোই তার সাথে হাঁটছে। কিছুক্ষণের মধ্যে তার বাঁধভাঙা হো-হো হাসিতে তারা বুঝতে পারে আহসান সাহেব চাবুক হাতে ভাগ্যের পিঠে সওয়ার হয়েছেন। সহ-খোলোয়াড়দের মৃদু ‘উহু-আহা’ আর আপত্তির শব্দ শোনা যায়। কেউ একজন উঠে দাঁড়ায় পুনরায় তাস পাল্টে নেওয়ার প্রস্তাব করে, বাকিরা তাকে টেনে বসায়। আহসান সাহেব সাগ্রহে তাস পাল্টে নেওয়ার প্রস্তাব মেনে নেন। তাদের এখানে নিয়ে আসা শুঁটকি ব্যবসায়ী খেলায় অংশগ্রহণ করছে না, পঞ্চম ব্যক্তি হিসেবে কেবল বিয়ার পান করছে আর বোর্ডে ছুটে আসা কার্ডের সাথে চোখ মেলাচ্ছে। তার মুখের দুশ্চিন্তা আরও গভীর আকার ধারণ করেছে।

স্বল্পসময়ের মধ্যে নয়টি বিয়ার গলাধঃকরণ করে সলোমন উঠে দাঁড়ায়; সাবিহার নেওয়া প্রথম মগটা তখনও শেষ হয়নি। প্রায় ভরা বোতল আর অর্ধেক খালি মগ রেখে সাবিহা সলোমনের টলায়মান পা অনুসরণ করে। দরজার বাইরে গিয়ে সলোমন বাঁ-দিকের করিডর বেয়ে সামনে যায়। সাবিহা তার সমান্তরালে হাঁটতে থাকে। ছয়টি কোণ বিশিষ্ট রিসোর্টটির প্রথম বারান্দাটা অতিক্রম করে সুমুদ্রকে ডানে রেখে একটি কাঠের খিলানে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সলোমন। পকেট হাতড়ায়, সিগারেট খোঁজে, পায় না। আবার সামনে হাঁটতে উদ্যত হয়, সাবিহা তার বাহু জাপটে ধরে, সলোমন দাঁড়িয়ে যায়, তারা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে। সাবিহার পাতলা ঠোঁট মুখে পুরে গভীরভাবে চুষতে থাকে সলোমন। দীর্ঘ চুম্বনের পর সাবিহা আলিঙ্গন শিথিল করে। হাঁটু গেড়ে বসে, সলোমনের বেল্টের বন্ধন মুখে, নাভীর আশপাশে, সাবিহার উষ্ণ আঙুলের ছোঁয়া অনুভব করে, সবটুকু অনুভব করে না। বিয়ারের ঘোরে তার অনুভূতি কিছুটা শিথিল হয়ে গেছে। স্যান্ডির আঙুলের কথা মনে পড়ে তার; আঙুলগুলো স্মরণ করতে পারে না, কেবল হাসিমাখা গড! ও গড!  শীৎকার মনে পড়ে। তারা সেখানে কতক্ষণ ছিল সলোমনের মনে নেই। এমন অসংখ্য সময়গুচ্ছ রয়েছে তার জীবনে, যেগুলো কীভাবে কেটেছিল তা আর পরে স্মরণ করতে পারে না।

তারা ভেতরে আসে। মইনুল আহসান খান ও তার সঙ্গীদের উত্তেজিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। তাদের অনুপস্থিতির সময়ে বাকি তিনজনের পকেটের সবগুলো টাকাই চলে এসেছে আহসান সাহেবের হাতে। প্রথমে তারা সেসবে কিছু মনে করেনি। পেছনে হেলান দিয়ে বসে, তাদের ভেতর থেকে ভাঙা গাল আর শক্ত চোয়ালের মুখওয়ালা তাকে প্রস্তাব দেয়Ñ

‘দেখুন! আপনি তো লুব্রিক্যান্ট ব্যবসায়ী, আর আমি করি পুরাতন জাহাজের ব্যবসা। প্রতিটি পুরাতন জাহাজের সাথেই বিপুল পরিমাণ উন্নতমানের অব্যবহৃত লুব্রিক্যান্ট থাকে। আমরা সেগুলো ঢাকা-চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসায়ীর কাছে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করি। আমার মাথায় একটা আইডিয়া রয়েছে, সেটা হলো, আপনার কোম্পানির সিলসহ যে অজস্র ড্রামভর্তি লুব্রিক্যান্ট রেলসহ সরকারের অন্যান্য দপ্তরে সাপ্লাই হয়, ওগুলোতে আমরা জাহাজের পুরাতন লুব্রিক্যান্ট ভরে দেব। আপনাকে শুধু ড্রামগুলোর গায়ে আপনার কোম্পানির সিল মেরে দিতে হবে; বিলটা হবে আপনার কোম্পনির প্যাডে। ব্যবসা যা হবে তা সমান দু’ভাগে বিভক্ত করে নেব আমরা। ততক্ষণে তারাও সবাই বিপুল পরিমাণ বিয়ার খেয়ে নিয়েছে। আহসান সাহেব সহসা কিছু উত্তর করে উঠতে পারেন না। চোখ বড় বড় করে তাকান কেবল। চোয়াল ভাঙা লোকটা সামনের দিকে ঝুঁকে এসে বলে,

‘দেখুন খান সাহেব, ঝক্কি ঝামেলা যা তা আমরা এখান থেকেই সামাল দেব। ড্রাম জোগাড় করা, লোড করা থেকে আপনার গুদাম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া, সবই আমরা করব। আর আপনার ভয় পাবার কোনো কারণ নেই, কেননা আপনি যে দেশ থেকে লুব্রিক্যান্ট এনে রেলে বিক্রি করছেন, ওগুলো আর এটা; একই ফল দেবে, আপনার সুনাম অক্ষুণ্নই থাকবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাহাজে পাওয়া লুব আপনার লুবের চেয়ে ভালো বৈ মন্দ হবে না।’

আহসান সাহেব সামনের খালি মগটির দিকে তাকান। এই সময়ে বেয়ারা বিলটি নিয়ে আসে। প্রায় এক লক্ষ টাকার কাছাকাছি। আহসান সাহেব সেটার দিকে একনজর তাকান। তারপর উচ্চ স্বরে বলে ওঠেন-

‘এটা অনৈতিক! আমি নীতিগর্হিত কোনো কাজ করি না।’ সাথে সাথে শক্ত চোয়াল উঠে দাঁড়ায়।

‘হ্যাঁ অনৈতিক! ঢাকা থেকে এসে আমাদের সাথে বসে মোজ করবেন কয়েক ঘণ্টায় কয়েক লক্ষ টাকা পকেটে পুরে গাড়ি হাঁকাবেন, সেটা অনৈতিক না! আমাদের নৈতিকতা শেখাতে আসবেন না। শুঁটকির ব্যবসা অনৈতিক, ভাঙা জাহাজের তেলের ব্যবসা অনৈতিক আর আপনার প্যাকেট করা তেলের ব্যবসাটাই কেবল নৈতিক! এ্যাঁ! আপনার মতো শেয়াল দু’চারটা আমাদের পকেটে থাকে। তাড়াতাড়ি আমাদের কাছ থেকে জিতে নেওয়া টাকাগুলো ফেরত দিন আর এখানকার বিলটা পরিশোধ করে বিদায় হন! নইলে বুঝতেই পারছেন, এখান থেকে শব্দ বাইরে যায় না।’

উত্তেজনা আর বিয়ারের প্রভাবে শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে আহসান সাহেবের।

‘ব্যাটা ভেড়া কোথাকার, ‘আমাকে হুমকি দিচ্ছিস! আমি এইসব পাতলা হুমকি থোড়াই কেয়ার করি। দূর হ! নয়তো পুলিশে যাবি।’

শক্ত চোয়াল এবার তুমুল চিৎকারে ফেটে পড়ে,

‘হারামজাদা! অল্প বয়েসি মেয়ে নিয়ে বাপ-ব্যাটা ফুর্তি করে বেড়াচ্ছ আর মদের টেবিলে শোনাচ্ছ ধর্মের বাণী! তোমার মতো পাঁঠার ঘাড় কীভাবে ভাঙতে হয়, তা আমাদের জানা আছে।’

বলেই সব ক’জন মিলে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর সেই মুহূর্তে সলোমন ও সাবিহা সেখানে প্রবেশ করে। সলোমন দেখে তার পিতাকে আক্রমণকারীদের মধ্যে সকাল বেলা যে শুঁটকির ব্যবসায়ী এখানে তাদের নিয়ে এসেছে সেও আছে।

সলোমন পিতাকে তাদের হাত থেকে ছাড়িয়ে নেয়। ততক্ষণে আহসান সাহেবের হাত থেকে টাকার ব্যাগটা তারা নিয়ে নিয়েছে। সলোমন-সাবিহা আহসান সাহেবকে ধরে এনে গাড়িতে বসায়। সাবিহা আহসান সাহেবের ওয়ালেট থেকে একটি কার্ড বের করে দেয়। সলোমন ভেতরে গিয়ে বিলটা পরিশোধ করে দ্রুতই গাড়ি চালিয়ে হোটেলে ফিরে আসে। ফেরার পথে তারা কেউ কারও সাথে কথা বলে না। সলোমন আয়নায় কয়েকবার আহসান সাহেবের চেহারা দেখে নেয়, বিমর্ষ, তবে সকলেই মদের ঘোরে থাকায় লোকগুলোর সাথে তার ধস্তাধস্তিটাই শুধু হয়েছে, গুরুতর কিছু ঘটেনি।

হোটেলে ফিরে বেয়ারাকে দুপুরের খাবারটি রুমে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে তাদেরকে তাদের হানিমুন স্যুটে ঢুকিয়ে দিয়ে সলোমন নিজের রুমে আসে। লাইটগুলো বন্ধ করে জানলা খুলে দেয়, পশ্চিমে দুই কাঠি হেলে যাওয়া সূর্য তার নিরুত্তাপ আলো সলোমনের কক্ষে পৌঁছে দেয়। নোনা বাতাসে শরীর উন্মুক্ত করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে সলোমন, এভাবে কতক্ষণ সে দাঁড়িয়েছিল তা আমরা জানব না। তবে তার মৃত্যুর পর অনুসন্ধানকারী পুলিশের দলটি ঐ বারান্দায় সর্বমোট আঠারোটি সিগারেটের পুচ্ছ খুঁজে পায়। যার প্রায় সবগুলোতেই আগুন তুলো ছুঁয়ে গেছে। ঠিক কতক্ষণ সলোমন ওখানে দাঁড়িয়েছিল আর দাঁড়ানো অবস্থায় সলোয়মান কী কী ভাবছিল তা আমরা জানতে না পারলেও জানবো যে, ঐ দিন ডুবন্ত সূর্য প্রথমবারের মতো সলোমনকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। নিসর্গ সলোমনকে কোনোদিন আকৃষ্ট করেনি অথবা সলোমন সবসময়ই নিসর্গতাকে এড়িয়ে গেছে। অন্ধকার কিংবা পূর্ণিমার ধবধবে চাঁদ, ঝুম বৃষ্টি, কাঠফাটা রোদ, দিনের প্রথম কিংবা শেষভাগের আলো কিছুই সলোমনকে আকৃষ্ট করেনি। সলোমনকে আকৃষ্ট করেছিল কিছু মুখ, যেগুলোর অনেকগুলোই সে উজ্জ্বল রঙ তেলে মিশিয়ে ক্যানভাসে ধরার চেষ্টা করেছিল। তবে সেদিন চোখের সামনে একটু একটু করে নামতে থাকা সূর্যটি যখন ডুবতে বসে তখন সলোমনের ইচ্ছা হয় ওর দিকে এগিয়ে যেতে। সলোমন রুম থেকে বেরিয়ে সৈকতের দিকে এগিয়ে যায়। যাবার সময় সাবিহা ও আহসান সাহেবের হানিমুন স্যুটের সামনে একটু দাঁড়ায়। দরজায় কান লাগিয়ে ভেতর থেকে আসা গাঢ় নিস্তব্ধতার শব্দ শোনে। সেটা অসহ্য হয়ে উঠবার আগেই হতাশা আর সুখমিশ্রিত বয়েসি গলার গো-গো আওয়াজ ভেসে আসে। সলোমন যখন সাগরের বালুময় তিরে এসে দাঁড়ায় তখন চোখ শীতল করা সূর্য নীল জলরাশি ছুঁই-ছুঁই করে অবস্থান করছে। পাড়ে দাঁড়ানো অসংখ্য মানুষ বিমূঢ়তার সাথে সাগরবক্ষে ডুবে যেতে থাকা প্রতাপের সৌন্দর্য উপভোগ করছে। সলোমন তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। সূর্য ও সমুদ্রের পবিত্রতা উপলব্ধি করে পায়ে পায়ে সূর্যের দিকে এগিয়ে যায়। দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা পরস্পরের সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে ডুবন্ত সূর্যের জন্য শোকপ্রকাশ করে।

তরুণ কূটনীতিকের মৃত্যুর খবর দেশের মানুষকে শোকাভিভূত করে। পত্রিকাগুলো কক্সবাজারে তরুণ কূটনীতিকের রহস্যময় মৃত্যুর খবর কিছুদিন যাবৎ ফলোআপ করে। পুলিশের কর্তা জানান, ‘তারা সবদিকে খোঁজ নিচ্ছেন, কোনো সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না।’ সাংবাদিক তাকে জেরা করে, ‘যদি তিনি আত্মহত্যাই করবেন তাহলে বিবস্ত্র হয়ে পানিতে নামার কী দরকার ছিল। তার সেদিনের পরিধেয়গুলো হোটেলেও পাওয়া যায়নি; সমুদ্র তটেও না। তাহলে কি আমরা ধরে নেব, দূরে কোথাও তাকে হত্যা করে উলঙ্গ লাশটি সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে? পুলিশের কর্তা মৃদু হেসে বলেন, ‘যদিও পোর্স্টমর্টেম বলছে তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। এবং পাকস্থলিতে মৃদুমাত্রার অ্যালকোহল ছাড়া বিষাক্ত কিছু পাওয়া যায়নি। তবু আপনাদের এই সন্দেহ আমরা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখব।’

সাংবাদিক দলটি আহসান খানের বসার ঘরে এসে উপস্থিত হয়। কিছুক্ষণ পরে মইনুল আহসান খান এবং সাবিহা ওপর থেকে নেমে আসে। আহসান খানের রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। ব্যবসায়ী গিল্ডের আসন্ন সাধারণ পরিষদ নির্বাচনে সরকার দলীয় জোট তাকেই সমর্থন করছে। সেখানকারই একটা গুরুত্বপূর্ণ সভায় যোগ দেওয়ার উদ্দেশে তিনি বেরিয়েছেন। যাবার পথে কিছুক্ষণের জন্য সাবিহাকে পাশে নিয়ে বসে আহসান খান আগত সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন, তাদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বলেন, ‘তার ছেলে খুন হতে পারে এমন কিছুই তার মনে হয়নি কখনও। সলোমন ছোটোবেলা থেকেই ছিল চুপচাপ, স্থির ও প্রখর, খুব একটা মিশত না কারও সাথে। আর ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও তার বিশেষ কোনো শত্রুতা-মিত্রতা নেই, ফলে তাদের সন্তানকে কেউ খুন করতে পারে এমনটা তিনি ভাবছেন না। যদিও ডেডবডিটার উলঙ্গ অবস্থায় তীরে ভাসার বিষয়টি অব্যাখ্যাতই থেকে যায়, তবু তিনি এ বিষয়ে নিশ্চিত যে, তাদের সন্তান সাঁতার জানতো না।

ব্রিফিং শেষে সাংবাদিকদের পেছন পেছন আহসান সাহেবও বেরিয়ে যান। সাবিহা সেখানেই বসে থাকে, তার মাথা ঘোরে, কেমন যেন বমি পায়, নিজের ঘরে গিয়ে সলোমনের আঁকা ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ, লুক্কায়িত হাসিমুখের নারীমুখ, দেখতে ঠিক তার মতো। সাবিহার মনে পড়ে, সলোমন তাকে বলেছিল, এই ছবিটাকে দিনের আলো কিংবা ইলেকট্রিক বাতি দিয়ে উপলব্ধি করা যাবে না। বেদিতে বসিয়ে তিন ফুট দূরত্বে সাতটি মোম জ্বালিয়ে ছবিটাকে দেখতে হবে, তবেই এর পুরো অবয়বটা বোঝা যাবে। জানালার বাইরে তাকায় সাবিহা, সূর্য ডুবতে তখনো অনেক বাকি। ছবিটাকে নামিয়ে দেয়ালঘেঁষা টিপাইটির উপর বসিয়ে ছবিটার মুখোমুখি বসে থাকে। একসময় সূর্য ডুবে আঁধার নামে, বাইরে থেকে আসা মৃদু আলোটুকুও বড্ড অসহ্য লাগে সাবিহার। ছবিটির সামনে সাতটি মোম জ্বালিয়ে দেয় সাবিহা, প্রথমে কিছুই দেখা যায় না। তারপর ধীরে ধীরে সেটা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে। মোমের আগুনের দিক পরিবর্তনের সাথে সাথে ভেসে ওঠে একটি নারীমুণ্ডু, কেবলই একটা মাথা; গ-দেশ, স্কন্ধ, ধড় কিছুই নেই, ছাই রঙের আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে যেন। মুখটি কখনও সাবিহার, কখনও তা নয়।

লেখক : গল্পকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares