আত্মসাৎ : সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

গল্প

আত্মসাৎ

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

পরিতোষ হালদারের বাড়ির সামনে ভিড়। কালরাতে ডাকা হয়নি বলে শিক্ষা দিতে লঙ্গরখানা খুলে খাওয়াচ্ছে নাকি! অবশ্যি চান্স জিরো। এই তো ঘুরে এলো। আমি আসছি তা জানার মতো জটা পরিতোষের মাথায় তো নেই। নেহায়েত চশমাটা ফেলে এসেছিল বলেই হাঁটা পথে উপস্থিত। গলির ভেতরে শেষ মাথায় বাড়ি। ধানমন্ডি ছয়-এ ৫ কাঠা জমির মাঝখানে একতলা বাড়িটা দু’ শরিকের বিবাদে অনাবাদী। অধিকাংশ জায়গা জুড়ে গাছপালা বড় হয়ে লতায় পাতায় সবসময় একটা গোলমুখো অন্ধকারের মানচিত্র। জানালাগুলো পুরনো দিনের ঘঁষটে যাওয়া, তালায় মরচে। ডান পাশের প্রাচীর দিয়ে বটগাছ যেন বিস্ফোরণের মতো উদ্ভাসিত। সামনের দুটো ঘরে স্ত্রী নিয়ে প্রায় বিনামূল্যে থাকেন হরিপদ কেরানির আধুনিক সংস্করণ পরিতোষ হালদার। ভদ্র মহিলাকেও একবার দেখেছি। চোখ দুটো বাদ দিলে নেহায়েত সাদামাটা কাপড় পরানো কলাগাছ। বাড়ির সামনে এত মানুষ দেখে মনটা একটু কেমন করল অস্বীকার করছি না। এই তো সৈন্যটা শেষ ঘর অব্দি তুলে মন্ত্রী উঠিয়ে জিতে নিলো দান আর একটা বেশ ক্যাসলম্যান মুখ করে বের হলো আমার ঘর থেকে। লিফটে উঠে কী মনে করে পিছু ফিরল, শেষটা আজই লিখবেন তো? পরিতোষ হালদার আমাকে কি চ্যালেঞ্জ দিয়ে গেল! বললাম, কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ করব। পরিতোষ হালদারের হাসি লিফটের দরজার ওপাশে আটকে রইল। হাসিটা আমাকে বরাবরের মতো চমকে দিয়েছে। তবে দুপুরে আচমকা প্রবেশের সময় চাপা অভিমানটা কিন্তু চোখ এড়িয়ে যায়নি।

সাধারণত অমন করে না, ফোন না করেই ভরদুপুরে উপস্থিত। কী ব্যাপার আজ সকাল সকালই নতুন কিছু সৃষ্টি হলো? নতুন লেখা হলে পরিতোষ নিজের আগ্রহেই শোনাতে আসেন। তবে ‘সৃষ্টি’ শব্দে হয়ত একটু ক্ষত হতেও পারে। বুঝতে দিতে চায় না তাই অন্য প্রসঙ্গ। সবাই এলো?

ওই আরকি দশ-বারোজন, অনেকদিন পর।

নিশ্চয়ই খুব খুশি?

মুখ দেখে বলা যায়?

কাউকে বলেছেন লেখার কথা?

কাকে আর বলব? প্রকাশ হোক নিশ্চয়ই পড়বে। আফটার অল লেখকের টাকায় খেয়ে গেল।

মনে হয় না। বড়জোর ফ্ল্যাপ দেখে গল্পটা জানার ভাব করবে। তারিফ করলে খারাপ লাগবে না?

কেন লাগবে?

লেখা নিয়ে লেখকদের নানারকম মানসিক টানাপড়েন থাকে তাই বলছিলাম। এই যে পাঠক তৈরি করতে আড্ডার আয়োজন করলেন।

ওসব ধরে রাখলে চলে না। দেখুন সম্পাদকদের অনুরোধ করবেন না, শুধু ওই এক গো ধরে আজ পর্যন্ত কোথাও লেখা ছাপাতে পারলেন? কিন্তু আপনার লেখার মান নিয়ে আমার কোনো সংশয় নেই।

কী জানি ব্যাপারটা এক-একজনের কাছে ভিন্ন ভিন্ন রকম। তবে আপনার উপন্যাসটা পড়ে কে কী বলছে শোনার আগ্রহ বুঝতেই পারছেন।

বুঝতে পারছি তবে যেটুকু লেখা হয়েছে আপনাকেও কিন্তু বলা হয়নি।

জানি কী লিখবেন, তাই অত নিষেধ করেছিলাম।

লিখতে গেলে অনেকটা তলিয়ে দেখতেই হয়। ধরে নিন ওটা আমারই কল্পনা। আর কেইবা জানছে?

শুধু অতীত নিয়ে তো লিখবেন না, আপনাকে একটা পরিণতিও আনতে হবে।

ভালো মানুষী মুখ করে থাকা আচরণ করপোরেটদের শিখতেই হয় তবুও আমি এবারে প্রসঙ্গান্তর যাই। হবে নাকি দুটো দান?

চলুন বসা যাক তবে হাতে সময় বেশি নেই।

কেন তিনি থালা সাজিয়ে বসে আছেন? কপাল আপনার, আমাদের ওই বছরে একবার বন্ধুবান্ধব এলে একপাতে যেটুকু। নিমন্ত্রণ না করার উপশম দিতে চাইলাম। বিনিময়ে পরিতোষ দক্ষ হাসিটা উপহার দিলো। ওতেই একেবারে দমকল বাহিনীর জল ঢালার কাজটা হয়। পরিতোষ অস্ত্র চালানোর মতো সত্যি ভালো জানে এটা। ভেতরে ভেতরে পরিতোষ হালদারকে আপাদমস্তক অপছন্দ না করার কোনো কারণ নেই। এই শহরে অন্যের গলগ্রহ হয়ে বাড়ি ভাড়া বাচাচ্ছেন। ওয়াসায় হিসাব বিভাগে ছোট একটা চাকরি করেন। এসব কোনো ব্যাপার না তবে তাঁর আচরণে যে দম্ভটা সেটা বিশেষ সহনীয় না। ওর হতদরিদ্র ভাবটা নিয়েও মনে হয় একটা দেখানো ব্যাপার আছে। সাবেকি সমাজবাদী বিপ্লবীদের মতো পোশাক আশাক। এ কারণেই কাল রাতে তাকে ডাকিনি সেটা হয়ত নিজেও বুঝেছে। কাল আড্ডাটা বেশ রাত পর্যন্তই গড়িয়েছিল। আপত্তি করারও কিছু ছিল না।

এই ব্যাচেলর ফ্ল্যাটে কালেভদ্রেই মানুষের আসার অনুমতি। সেখানে নিজেই যখন আয়োজক, আমিও চেয়েছি উদযাপনটা দীর্ঘ হোক। যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণই মূল কারণটা ঘুরেফিরে সামনে আসবে। আমার রুচি যে ভালো সেটা বোঝা যাচ্ছে মৃদুস্বরে দেবব্রত বিশ্বাসের সুরে। ওটা এমনভাবে ছেড়েছি যে ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বটে কারও কথা ছাপিয়ে উঠছে না। আমার তো বাড়িতে স্ত্রী নেই যে তিনি রেঁধে খাওয়াবেন। ঢাকা ক্লাবে অর্ডার করলে প্লেট প্রতি রেটটা বেশি হয় তবুও করলাম। সে সব এসে পৌঁছেছে। ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার আগেই দিতে হবে। কিন্তু কারও মন সেদিকে আছে বলে মনে হচ্ছে না। শালারা গ্লাস ধরে রাখতে এত ভালোবাসে। আমিও তো মনে মনে তাই চাই। আরও একটু বেসামাল হয়ে ওঠ তোমরা। আর একটু খোলস ছড়াক। এ জন্যই তো ডেকেছি। এরপর সবাইকে সামনে বসিয়ে বিশেষ অংশ পড়ে শোনাব। বুঝবে আমি কী জিনিস! এই শালাদের যে ভেতরে ভেতরে কেমন গাত্রদাহ হচ্ছে সেটা বুঝতে তো আর আমার কামেল পাশ করার দরকার নেই। দুটো পেগ নেওয়ার পর সেটা প্রমাণও করে দিয়েছে আমার বন্ধু মামুনুর রশিদ।

তাইলে দোস্ত এবার একটা পুরস্কারের ব্যবস্থাও করে ফেলতে হয় কি বলো? তোমার মতো এত বড় ব্যাংক কর্মকর্তা জীবনের প্রথম উপন্যাসে প্রেস্টিজিয়াস একটা পুরস্কার পেয়ে গেলে ভাবো স্ট্যাটাসটা কোথায় যাবে? মামুনের কথা শেষ হওয়ার আগেই ‘ধারে ভারে দুদিকেই কাটে’ বলে উসকে দিলো আশরাফুল। সত্যি বলতে কী আমারও খারাপ লাগছিল না। একটা পুরস্কারের তকমা লাগানো গেলে, পরের বইমেলায় বইটা ‘ওমুক পুরস্কারপ্রাপ্ত’ লেবেল দিয়ে বিক্রি হবে। চাইকি ওয়েব সাইটগুলোতে বেস্ট সেলারের লিস্টেও তুলে দেয়া যাবে। আর দুএকটা টিভি ক্যামেরা আমার সাবঅর্ডিনেটদের বললে ওরাই ব্যবস্থা করে বর্তে যাবে। তবে এসব ভাবনা খুব ব্যক্তিগত। ওদের কথায় আমি শুধু সৎ লেখকের মতো একটা প্রচ্ছন্ন  হাসি ঝুলিয়ে রাখি। টের পাই, পরিতোষ হালদারের ওই হাসি না হয়ে কেমন বোকা বোকা দেখাচ্ছে। তবে এও তো সত্যি যে, প্রতিষ্ঠিত মানুষ যা করে ওটাই স্টাইল। সেই আত্মবিশ্বাসে আশরাফুলের গ্লাসটা আরেকবার রিফিল করি। আতিথেয়তায় বন্ধুরা আমার সাহিত্যিক জীবনের দীর্ঘায়ু কামনা করে। মনে মনে পরিতোষ হালদারের কাছে কৃতজ্ঞ হই।

পরিতোষ হালদারের সাথে সম্পর্কটাকে কোন নামে ডাকা যায় নিশ্চিত নই। বন্ধুত্বের দাবি করে নিজের স্ট্যাটাস সে বাড়াতেই পারে। আমার বন্ধুরা জানলে উৎসুক হবে। এমনকি এই বয়সে মতিভ্রম হয়েছে বলে অন্য ইঙ্গিতও দিতে পারে। এখনও আকছার শোনা যাচ্ছেই এসব। পরিতোষ হালদারেকে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণ একটাই। সে সাহিত্যটা বোঝে। কেরানিগিরি করে এসে ওই বইপত্র নিয়েই পড়ে থাকে। ছেলেপুলের বালাই নেই, কার সমস্যা কে জানে। তবে মাঝে মাঝে লেখার খবর নেয়। বলতে কী উপন্যাসের গল্পটা পরিতোষ হালদারের ছায়া গল্প। একদিন বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে আমার মানিপ্ল্যান্টের পাতাগুলোতে হাত বুলাচ্ছিল। জানেন মাঝে মাঝে মনে হয়, এই আমিটা ঠিক আমি নই।

সে সকলেরই মাঝে মাঝে ওরকম হয়। অফিসে ঝামেলা?

ঠিক বোঝাতে পারছি না। নিজেকে অন্য কেউ মনে হয়। অফিসে আর কী হবে আমাদের ওই পদবিতে!

কাকে মনে হয়?

কাকে যে মনে হয় নিশ্চিত নই। হতে পারে যে ছেলেটা ১৪ বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে মরে গিয়েছিল কখনও কখনও তাকে মনে হয়। আমার বড় ভাই খুব ব্রাইট ছিল জানেন।

আপনার চোখের সামনে?

ওর হাতে বল ছিল। আমি-ই তাড়া করেছিলাম। দৌড়ে রেললাইন পার হচ্ছিল।

আর আপনি বাড়িতে বলেও দিয়েছিলেন ঘটনাটা?

বাবা অফিস থেকে হাঁটা পথেই ফিরছিলেন। চোখের সামনে।

দুর্ঘটনা এটা। এমনিতেও হতে পারত। এর জন্য নিজেকে দোষ দিচ্ছেন কেন অবশ্য ওই বয়সে এমন মনে হতেই পারে।

দোষ দিচ্ছি না কিন্তু জানেন তো আমার বাবা কখনও এরপর থেকে আর আমায় নাম ধরে ডাকেনি। মা ভুল নামেই ডেকেছে। বয়সটা খুব বেশি ছিল না। তখন থেকে একটু একটু করে…

একটু একটু করে কী? মনে হতে লাগল আপনার ভাই আপনার অস্তিত্বের ভেতর ঢুকে পড়েছেন?

তারাপদ রায়ের কবিতা পড়েছেন?

কবিতাও লিখত নাকি? তাহলে নিশ্চয়ই সেসবও কা-জ্ঞান আর আবোলতাবোলের মতো সরসই লিখত।

এখানেই বৈচিত্র্য। যে তারাপদ কবিতা লিখত সে অন্য। কেন বললাম জানেন? তারাপদ রায়ের এমন একটা অভিজ্ঞতা ছিল। ওরা জমজ ভাই, একই রকম দেখতে। একসাথে স্নানে নেমে একজন জলে ডুবে যায়। রসিক মানুষ তারাপদ। বলত কে উঠেছিল জল থেকে আমি না আমার ভাই কেউ বুঝতে পারেনি। এই কথা বলে আবার নিজেই বলতেন, আর আমি এখনও বুঝতে পারি না।

আরে লেখকরা এমন অনেক কিছু বানিয়ে বলেন। আপনি ওসবের ভেতর যাবেন না। আপনি পরিতোষ হালদার, আমার সামনে বসে আছেন। বাড়িতে স্ত্রী আছে। দিব্যি মূর্তিমানকে দেখা যাচ্ছে।

তাই বললেই কি হয়! দৃশ্যটা যে চোখের সামনে। এরপর থেকে আমার দিকে কেউ তাকালেই দেখেছি, একঝলকে আগে সন্তোষের মানে বড়দার মুখ দেখছে। তারপর আমাকে। বলুন তো কেমন করে আমি শুধু আমি রইলাম? এমনকি আমার স্ত্রী পর্যন্ত কখনও কখনও অভিযোগ করে, চুপচাপ পাশে এসে দাঁড়ালে তাঁর নাকি হঠাৎ অন্য কেউ মনে হয়।

জানেন তো আমরা যা ভাবি বিশ্ব আসলে তাই। এসব আপনি তৈরি করছেন নিজের অসহায়তা থেকে। সে প্রতিবিম্বই অন্যের ওপরেও প্রভাব রাখছে। আসলে কিছু না।

বিশ্বপ্রাণ যদি একআত্মা মেনে নিই তবে হতে পারে না, সন্তোষও আমার ভেতর আছে? আমি আসলে সন্তোষের হয়েই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছি?

এ বড় জটিল বিষয়। আসলে আপনার প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্জনগুলো আসেনি তাই স্থান দিচ্ছেন এসব ভাবনা। প্রচলিত রীতি মেনে প্রতিষ্ঠা হলে ওটা স্মৃতি এবং  নিছক হারানোর বেদনা হয়েই থাকত।

আমার মা কেন বারবার ভুল নামে ডাকতেন বলেন তো? এমনকি তাঁর শেষ সময়েও আমার হাত ধরে বলেছেন, সন্তোষ এসেছিস? চল যাই। আমি ঠিক বসে রইলাম, তিনি যেন অদৃশ্য কার হাত ধরে চলে গেলেন। কাকে দেখলেন আমার ভেতর দিয়ে?

এসব নিয়ে বেশি ভাবলে পরিণতিটা ভালো হবে না। আপনি বরং অফিসে আরও একটু ব্যবস্থা করা যায় কিনা মন দিন। টাকাটা বেঁচে যাচ্ছে বাড়ি ভাড়ার, সেটা সঞ্চয় করুন।

পরিণতিটা কেমন হয় এসব নিয়ে ভাবলে?

জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে জীবন কী দেয় বলুন তো? মৃত্যু যেমন আসে তেমনই জীবনও যাপনের কাছে আসে। সে চায় তাকে গ্রহণ করা হোক। ওই সময়টা হারাতে নেই। আমার ধারণা বহুবার আপনি সেটা স্বেচ্ছায় প্রত্যাখ্যান করেছেন, গ্রহণ করুন। যা হওয়ার তা হয়েছে। জীবন যার যাপনও তারই। এই যে ভাবছেন সন্তোষ আপনার মধ্যে, সেও আপনি আছেন বলেই।

আমি আর কোথায় আছি?

দারুণ গদ্য লেখেন। সত্যি বলছি। একটু ছাপানোর ব্যবস্থা করুন। আপনার তো আবার সৎ সাহিত্যিক হবার ব্রত, নয়ত আমিও বলতে পারি দু’একজনকে। পাঠকরা যখন ফিডব্যাক দিতে শুরু করবে আর দেখবেন ওতে অফিসেও অন্যরা আপনাকে আরেক রকম জানছেন এইসব ভাবনা বদলে যাবে। জীবনটা এত অর্থহীন মনে হবে না।

আর যদি তা না হয়, পরিণতি কী হবে বলছিলেন?

সে কেমন করে বলা যায়? মানুষের জীবনের আগ্রহ হারিয়ে গেলে কত কিছুই তো সে করতে পারে।

আমার কোনো পিছুটান নেই জানেন তো?

সেটা আরও ভয়ের কথা। বাদ দিন আমরা বরং আপনার লেখা ছাপানো নিয়ে কী করা যায় ভাবতে পারি।

ওসব থাক। আমি কী লিখি আর ওসব নেহায়েত নিজের মনের আবোলতাবোল কথা।

চা খাবেন আরেক কাপ?

নাহ আজ উঠি। আপনি বরং বড় কাজে হাত দিন। জানেন তো উপন্যাস ছাড়া লেখক হিসেবে পরিচিতিটা ঠিক জমে উঠে না।

বেশ আসুন।

সে রাতেই মনে হয়েছিল এতদিন ধরে যে একটা গল্পের অপেক্ষায় ছিলাম সেটা এবারে শুরু করা যায়। সর্বোপরি, নাগরিক বিচ্ছিন্নতা বিষয়টা পাবলিক খাবে বলেই মনে হয়। একটু টুইস্ট দিয়ে দেবো ভেতরে। আর পরিতোষ হালদারের ছায়া চরিত্রকে একটা বিপদে ফেলতে হবে, নারীঘটিত। ব্যস জমে গেলে কাহিনি। বড়জোড় মাস ছয় আগের কথা। এরপর থেকে আমি পরিতোষ হালদারকে আরও ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখেছি। এ ধরনের মানুষ শেষ পর্যন্ত কী করতে পারে ভেবেছি। পরিতোষ হালদার নিজের সকল পরাজয় থেকে পরিত্রাণ পেতে সাহিত্যচর্চা করত। আর আমি নিজের বৈচিত্র্য সন্ধানে। ব্যাংক কর্মকর্তা ভেবে ডেবিট-ক্রেডিটের জমাদার তকমা দিয়ে আমাকে হিসেব করা অতো সোজা নয় এমনই তো চেয়েছি। আরও খানিকটা তলিয়ে না দেখলে আমার ঠাঁই মিলবে না এই তো ছিল ইচ্ছে। অথচ পরিতোষ হালদারের এত ব্যর্থতার ভেতরও এটুকু আমাকে ঈর্ষান্বিত করেছে বারবার। আসলে নিজের ভেতরে নিমগ্ন মানুষকে পাঠ করা সহজ নয়। পরিতোষ হালদার তাঁর লেখাগুলো ছাপাতে পত্রিকার কাছে যেতে চায় না। আমার অফিস থেকে বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা হয়। পরিতোষ তাঁর লেখা দেখাতে চায় না। আমি লেখা মনমতো সংশোধন না করেই ই-মেইল করি ছাপা হবেই নিশ্চয়তায়। আমি অন্য মানুষের গল্প শুনে গল্প ভাবি, পরিতোষ বিশ্বসাহিত্য পাঠ করে তার এসেন্স নিয়ে আমাকে শোনায়। পরিতোষ জানেই না সে কোথায় আমাকে ক্রমাগত পরাজিত করে চলেছে। মাঝেমাঝে ভালো বইপত্র পড়ে সেখান থেকে আমাকেও কিছু কিছু শোনায় বলে আমি এই কেরানিটার অহঙ্কার দেখে যাই। মৃদুস্বরে হলেও এই যে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্পে জীবিকা ও ভালোবাসার দারুণ মিশেল বা তলস্তয়ের কাছে আদিমকালের আধ্যাত্মিকতার আবহাওয়া পাওয়া যায় এসব ব্যাখ্যা মেনে নিচ্ছিলাম। ওসব কনভেনশনাল লিটারেচার আমারও খানিকটা করে পড়া আছে। ইদানীং সে আবার তুলনামূলক সাহিত্য পাঠ থেকে উদ্ধৃতি দিতে দিতে বারবার মানুষের ভেতরের অন্ধকার দিক নিয়ে বলতে শুরু করেছিল। ইংরেজিতে একটা অ্যাপ্লিকেশন লিখতে পারে না, বিশ্বসাহিত্য খাওয়াচ্ছে আমাকে। যতসব চোগলখুড়ি কথাবার্তা। ওসব তত্ত্ব নিয়ে তাত্ত্বিকরা পরে থাকুক। লেখকের অত সময় কোথায়! এত কাজ করে বাড়ি ফিরে সে নিজের লেখা নিয়ে বসবে না তত্ত্ব আওড়াবে? এখন কি শুধু লেখক জীবন যাপনের সময় আছে মানুষের হাতে? কিন্তু পরিতোষ হালদারের বয়ান ভিন্ন। সাহিত্যিকরা পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলেছে। নিজেদের বন্ধুরাই পাঠক-প্রকাশক। পাঠকের রুচিবোধ তৈরি করার দায়িত্ব নেই লেখকের, তাই মহান সৃষ্টি হচ্ছে না বলে আক্ষেপের অন্ত নেই। বারবার এই এক নীতিবাক্য শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে উঠি বটে আবার অস্বস্তি হয়। সব মানুষের ভেতর যে-কোনোভাবেই নিজেকে বড় দেখানোর বাসনা থাকবেই। যে নত সে ভেতরে ভেতরে আরও বেশি দৃঢ় জানবেন। পরিতোষ হয়ত তাঁর অন্যসব ব্যর্থতা ঢাকতেই এ প্রসঙ্গ ইচ্ছে করে বারবার টেনে আনে আমার সামনে। অত যাকে পরাজিত মনে হয় তার সামনে নিজেকে পরাজিত দেখতে আমার কি ভালো লাগে? ট্রেনে কাটা পড়া সন্তোষের জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা পরিতোষ হালদার এই যে আমাকে বারবার দেয়ালে চেপে ধরছে এর একটা জবাব আমি দিতে পারি। খানিকটা শুনে পরিতোষও বুঝেছে, উপন্যাসের মূল চরিত্র আসলে কে। পরিণতিটা তো আমার হাতে।

পরিতোষ হালদার দাবায় জিতে চলে যাওয়ার পথে যে হাসিটা দিয়ে গেল ওর একটা অর্থ আছে। লেখাটার সামান্য একটু অংশই বাকি ছিল। এবার আমি একা একাই হাসলাম। বিকেলের মধ্যে পাণ্ডুলিপি শেষ করে একটা প্রিন্টেড কপি পড়তে দেব পরিতোষকে। ওই হাসিটা ফিরিয়ে দেওয়ার আর কোনো উপায় জানা নেই এ ছাড়া। সেদিন বারান্দায় বসে বারবার জানতে চাইছিল, জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে কী হয় পরিণতি। ঠিক ধরতে পারবে, আপাদমস্তক ব্যর্থ মানুষের বিচ্ছিন্নতা কোথায় ঠেলে দিতে পারে। আর সে উত্তর দিয়েই আমি উপন্যাস শেষ করেছি। অত যদি জীবনে অনাগ্রহ তবে খুঁজে খুঁজে বাড়ি পাহারা দিয়ে পয়সা বাঁচানোর চেষ্টা কেন? প্রতিদিন টিফিন বাটি নিয়ে দৌড়ে লোকাল বাসেই বা কেন উঠছ? এসব যাপন নয়? অত বিমুখ বিমুখ ভাব দেখালে কৈলাশ গিয়ে থাকো। ঠিকই তো আমার বাড়ির চা’টা তোমার ভালো লাগে। বুক  শেলফের ভেতর দামি বইগুলোতে চোখ আটকে থাকে। তোমাকে বাদ দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে জমায়েত করলে অভিমান হয়, তবে জীবনে তুমি কোথায় নেই বাছা? এসব মানুষ নিজের ব্যর্থতা ঠিকঠাক গ্রহণ করতে পারে না আবার প্রতিযোগিতাতেও নামবে না, মাঝখান দিয়ে সমাজে হতাশা ছড়ায়। সৎ লেখক কী আবার! লেখক মানেই কোথাও না কোথাও নিজের সাথে প্রতারণা। মানুষ মাত্রই তো তাই। সেখানে এই যে তকমা দিয়ে বসে থাকা-এ হচ্ছে আমি পারি না তাই তোমার সক্ষমতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছি। পরিতোষ হালদারের প্রতি আমার এক ধরনের করুণা আছে। যাকে করুণা করা যায় তাঁর অহং মানুষ সহজে নেবে? উপন্যাসের শেষ অংশটাই এর মোক্ষম জবাব। একদিন আনমনে অফিস যাওয়ার পথে ট্রেনটা ঠিক সময়মতো এসে যাবে যথাস্থানে। একদম মুহূর্তের খেলা। ভালোই হয় একজন ব্যর্থ লেখকের এমন পরিণতি যদি দেখানো যায়। আমাদের কবি সাহিত্যিকদের তো আবার জীবনানন্দের ট্রাম নিয়ে অবশেসন আছে। পরিতোষ হালদারের লিফটের হাসি আমাকে উপন্যাসের শেষ ১০ পাতার খোরাক দিয়ে গেল। যাপনে যা আসছে তাকে কলমে ঠাঁই দিচ্ছি। এইত আমি সৎ সাহিত্যিক হয়ে উঠছি ভেবে আনন্দও হচ্ছে কিন্তু মনে মনে। পরিতোষ হালদারের লিফটের দরজায় আটকা পড়া হাসিটা ছুড়ির মতো ফালা ফালা করে দিল। দশপাতা লিখে ফেলতে আর কতক্ষণ সময় চাই। ৬৪ খোপের কোটটা যতেœ তুলে রাখতে রাখতে শতরঞ্জি কা খিলাড়ির দৃশ্যটা মনে এলো। ফারুক শেখ আর তাঁর বন্ধু দাবার টানে আরেকজনের বাড়ি চলে গেল তারপর কল্পিত এক মসজিদ ভেবে বহুদূরের উষর এক গ্রামে। অভ্যস্ত আয়েশ থেকে বের হতেই হুমড়ি খেয়ে বেরিয়ে এলো ভেতরের আরেকটা হিংস্র মানুষ। একজন অন্যজনকে গুলিও চালালো। পরিতোষের হাসিটা বাঁধাই প্রোর্ট্রেটের মতো তাকিয়ে আছে মাথার ভেতরের দেয়াল থেকে। এইবার একটা সুযোগ। উপন্যাস পড়েই বুঝুক, আমাকে এত ছোট লেখক ভাবার কোনো সুযোগই ছিল না। চাইলে আমি তাঁর সৎ চরিত্র ঠিকঠাক দাঁড় করিয়ে দিতে পারি কাগজে কলমে। এমনকি সে যা ভয় করছে সেটাও ঘটিয়ে দিতে পারি পরিণতিতে। শুধু ট্রেনটা সময়মতো আসবে আমার শেষ পৃষ্ঠায়। এতদিন ওই কবিতা আর ছোট ছোটগল্প পড়ে সে নিশ্চয়ই আন্দাজ করেনি আমারও যোগ্যতা আছে।

টেনে লিখে গেলাম দশ পৃষ্ঠা। পেন ড্রাইভে নিয়ে ল্যাপটপের ঝাপিটা বন্ধ করতে যেয়ে দেখলাম, খেলার পর চশমাটা খুলেছিল পরিতোষ। সেটা ডায়নিং টেবিলের ওপর। ভালোই তো হয় এ সুযোগে চশমার অজুহাতে একটা প্রিন্টেড কপি ধরিয়ে দিয়ে আসি হাতে। কাল ছুটি আছে। বেশি দীর্ঘ তো নয়। চট করে পড়ে ফেলুক দেখি। অবশ্য তাতে আমার পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে সহজ হবে। ভুলগুলো চোখে পড়া দরকার দ্বিতীয় কারও। ট্রাউজারটা বদলে নিয়ে লক করে বেরিয়ে এলাম। একটু কি বৃষ্টি নেমেছে? ঘরের ভেতর থেকে টের পাইনি। সাত মসজিদ রোডের মাথায় ভালো একটা দোকান আছে। চট করে দাঁড়িয়ে থেকেই প্রিন্ট দিয়ে নিলাম। অ্যালাইনমেন্ট ভাঙেনি। মোটামুটি ঠিকঠাক মার্জিন। পরিতোষ লিখুক আমার মার্জিনে মন্তব্য। একশ ত্রিশ পৃষ্ঠা হয়েছে। এবার একটা ফটোকপি করা যাক। এক একটা ধাপ পার হচ্ছে আর আমি পরিতোষ হালদারের সেই হাসির জবাবের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছি। এই তো আর কিছুক্ষণ সময়। নিশ্চয়ই পরিতোষ লাল কালি নিয়ে রাতেই বসবে। টেনে পড়ার মতো হয়েছে কিনা জানি না তবে সে নিজের আগ্রহেই শেষ করবে। এমনও হতে পারে, অতি আগ্রহে শেষটাতে আগে চট করে চোখ বুলিয়ে নেবে। তা অবশ্যি নাও করতে পারে। সে তো আবার স্ব-ঘোষিত সৎ সাহিত্যিক। আহ্ পরিতোষ তুমি শেষে যেয়ে দেখবে ঠিকঠাক সময় মতো ট্রেনটা এসে গিয়েছিল। মনের ভেতর তারাবাতি ফুটছে আমার। দু’দিনবাদেই সৎ সাহিত্যিক পরিতোষ হালদারের মুখোমুখি হলে ঠিক ওই হাসিটা আমি ফেরত দেব। কত দ্রুত হেঁটেছিলাম মনে নেই। অবশ্যি পথও দীর্ঘ নয়। সাত মসজিদ রোড থেকে ধানমন্ডি ছয়ের গলির শেষ মাথার বাড়িটা। দূর থেকেই ও বাড়ির ঘনীভূত অন্ধকার টের পাওয়া যায়। পরিতোষ চলে আসার পর বিকেলে যেমন ল্যাপটপের কি বোর্ডে দ্রুত আঙুল চালিয়েছিলাম তারও বেশি গতিতে পা চালাই। প্রথম উপন্যাস আমার। মূল নায়কের আসল চরিত্রকে পড়তে দেব এও কম প্রাপ্তি না। সাথে সেই হাসি ফিরিয়ে দেওয়ার লোভ। কিন্তু পরিতোষের বাড়ির সামনে কয়েকজনের জটলা দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমার পাশ দিয়ে হর্ন না বাজিয়ে একটা সাদা অ্যাম্বুলেন্স বেশ ধীরেসুস্থে গেটের কাছে আসতেই কয়েকজন সরে পথ করে দিল। ভেতরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না। কী হতে পারে এইটুকু সময়ের ভেতর! এই তো কয়েক ঘণ্টা আগেই ফিরল সে। তবে এসব জটলা থেকে খবর পেতে অসুবিধে হয় না। আরেকটু এগিয়ে হাওয়ার ভেতর প্রশ্ন করেই যেন জানতে চাইলাম, কী হয়েছে? চোখ কোটরে ঢোকা তেল চিটচিটে মুখের রিকশা চালক গোছের একজন বলল, এই বাড়ির লোক আত্মহত্যা করছে সিলিংয়ের সাথে ফাঁস দিয়া। আমার হাতের ভেতর রাখা পাণ্ডুলিপির ওজন কয়েক মন ভারি হয়ে উঠেছে। কখনকার ঘটনা?  কেউ একজন বলল, দুপুর বেলা বলে করছে কিন্তু টের পায় নাই। ঘরের দরজা লাগানো ছিল। বিকাল পর্যন্ত সাড়াশব্দ না পাইয়া দরজা ভাইঙ্গা বাইর করছে। এই বয়সের মানুষ এমনে আত্মহত্যা করে কেন, কে জানে, বলে, কে হাওয়ার কথা উড়িয়ে ঘুরে পা চালাচ্ছে। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম, পরিতোষ হালদারের চশমাটা আছে এখনও। কিন্তু হিসেব করে দেখলাম ওই সময় আমার সাথে থাকা পরিতোষ হালদার দাবায় জিতেছে। ফেরার পথে লেখাটা শেষ করতে বলে সেই হাসি। ঘোরের ভেতর বাড়ি ফিরেছিলাম।

আমার ফ্ল্যাটে কাউকে আসতে হলে রিসিপশন থেকে ইন্টারকমে ফোন করে জেনে নেয় পরিচিত কিনা। এরপর গেটের খাতায় নাম লিখিয়ে প্রবেশ। পরিতোষ হালদার বছরখানেক ধরে প্রায়ই আসে বলে সে শুধু নাম লিখেই প্রবেশাধিকার পায়। কেয়ারটেকার ছেলেটাকে ডেকে খাতা খুললাম। আজ আমার কাছে কেউ আসেনি। তখনওবা হাতটা পাঞ্জাবির পকেটে। পরিতোষ হালদারের চশমাটা হাতের ভেতর। মাথার ভেতর সৎ সাহিত্যিক পরিতোষ হালদারের পোর্ট্রটেটা ঝুলছে।

লেখক : গল্পকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares