মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল সাতাশ বছর : শামীম আহমেদ

গল্প

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল সাতাশ বছর

শামীম আহমেদ

আব্বা যখন লন্ডনে পড়তে গেল তখন আমার বয়স ছয় কি সাত। সেই সময়ে আমার প্রথম শ্বাসকষ্ট হয়। ওই দিনটির কথা আমার এখনও মনে আছে। আব্বার সাথে এয়ারপোর্টে গেছি আমরা সবাই।

মা, আমি, রিমু আর সিরাজ মামা। সিরাজ মামা আব্বার চাচাত ভাই, আমাদের সাথে থাকতেন একই বাসায়। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল সৌদি আরব যাওয়া। যদিও উনি আব্বার ভাই, কিন্তু কেন জানি চাচাদের চাইতে মামারাই বেশি প্রিয় ছিল বলে সিরাজ চাচা যিনি কিনা আমাদের খুব আদর করতেন, স্কুলে আনা-নেয়া করতেন, তিনিও আমাদের মামা হয়ে গেছিলেন। এমনকি সিরাজ মামাও আম্মাকে আপা বলেই ডাকতেন, ভাবি বলে নয়। আব্বা লন্ডনে যাবার কিছুদিন পর তিনিও মরুর দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন, তবে যাবার আগে উদ্বিগ্নভাবে আম্মাকে বলেছিলেন, আফা রে, আঁর ফুলোকের কিল্লাই হাফানি হইছে কনসেন! হেতে ভাইছার যাওনে বেশি কষ্ট হারনি কোনো!

সবার ধারণা, আব্বার অনুপস্থিতিতে একাকিত্ব বেড়ে যাওয়ায় মানসিক অস্থিরতা থেকে আমার সাময়িক শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ওই সময়ে আমরা মোহাম্মদপুরে থাকতাম। জায়গাটার নাম এখনও দিব্যি মনে আছে কালা চাঁনপুর। এই অদ্ভুত নামের কারণ কী আমার জানা নেই, কখনও জানার চেষ্টা করেছি এমনটিও মনে পড়ে না। তার মানে এই নয় যে আমি কৌতূহলী মানুষ নই।

আমার মনের মধ্যে যৌক্তিক মাত্রায় কৌতূহল সবসময়ই ছিল। একটা জায়গা যেখানে আমি দীর্ঘদিন থেকেছি এবং সেই জায়গাটির নাম কেন কালা চাঁনপুর সেটি না জানবার মতো কম কৌতূহলী আমি কখনই ছিলাম না। তবে এটাও ঠিক, বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার সমবয়সি ষোল-সতের বছর বয়সি বন্ধুদের মনের মধ্যে যেসব বিষয়ে ব্যাপক কৌতূহল ছিল, সেগুলো কোনো এক অদ্ভুত কারণে আমাকে কখনই খুব একটা তাড়িত করেনি। যদিও আমরা সবাই বেশ ভালো ছাত্র ছিলাম, এবং মিরপুরে সেই মানের ভালো স্কুল তখনও ছিল না, তবুও আমাদের মিরপুরে থাকার এবং সেখানকারই কোনো স্কুলে পড়ার মূল কারণ ছিল বাসাভাড়া কম হওয়া। মিরপুরে থাকাকালীন সময়েই আমার পরিচয় হয় সবুজের সাথে, যার কথা একটু পরেই বলব।

আমরা যখন খুলনা থেকে ঢাকা আসি তখনও আব্বা সরকারি চাকরি করতেন। আমাদের এই মোহাম্মদপুরের কালাচাঁনপুর থেকে যশোর এবং খুলনা হয়ে আবার ঢাকার মিরপুরে ফিরে আসার মাঝে কেটে গিয়েছিল প্রায় ছয়-সাত বছর। শুনেছি ঢাকায় বদলি হলে মানুষ খুশি হয়, আমার আব্বাকে তেমন খুশি হতে দেখিনি। ঢাকায় জীবনযাত্রার মান এবং সেই অনুযায়ী খরচ অত্যধিক এবং আব্বার মতো সৎ কর্মচারীর জন্য সেই খরচ বহন করা খুব সহজসাধ্য ছিল না। ফলস্বরূপ আমরা মিরপুরের একদম একপ্রান্তে যেখানে বাসা ভাড়া সবচেয়ে কম সেই এলাকায় থাকতে গিয়েছিলাম।

আব্বা ঢাকায় আসার বেশ কয়েক মাস আগে একদিন খুব গম্ভীরভাবে আমাদের দুইভাই-বোনকে ডেকে বললেন, ‘এইখানে তোমরা ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড হও বলে ভেব না ঢাকায় গেলেও হবে। ঢাকার স্কুলে ভর্তি হওয়া খুব কঠিন এবং এই মার্চ মাসের শেষে কোনো স্কুল তোমাদের ভর্তি করতে চাইবে কিনা সেই বিষয়ে আমি যথেষ্ট সন্দিহান।’

আমাদের স্কুলে ভর্তি হতে অবশ্যি তেমন সমস্যা হয়নি। আমাদের মানে আমার আর আমার ছোট বোন রিমুর। তবে ওই যে বললাম আমরা আমাদের মেধানুযায়ী যে খুব ভালো স্কুলে ভর্তি হইনি সেটা বুঝেছিলাম ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশ করার পর; সে গল্প আরেকদিন। তো যেমনটা বলছিলাম, মোহাম্মদপুরের কালা চাঁনপুরের নাম কেন কালা চাঁনপুর হলো সেটা নিয়ে যে আমি খুব একটা গবেষণা কেন করিনি ছোটবেলায়, সেটা বুঝতে পেরেছিলাম বেশ বড় হবার পরে। বড় হবার পর নিজেকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম আমার এই না জানতে চাইবার কারণ কী ছিল! জিজ্ঞেস করতেই মনে পড়ে গেছিল আমাদের বাড়িওয়ালার কথা। আমাদের বাড়িওয়ালা ছিলেন একজন বিহারি, এমনটাই পরে শুনেছিলাম আব্বা-আম্মার কাছে। বিহারি মানে স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসা মানুষ, যারা যুদ্ধের আগে কিংবা পরে আর ফিরে যায়নি। আমাদের বাড়িওয়ালার নাম ছিল রেজওয়ান, আমরা বলতাম রেজওয়ান কাকা। তিনি উর্দুতেই কথা বলতেন। লুঙির সাথে কাবলি, মাথায় জিন্নাহ টুপি, চোখে সুরমা এই অবয়বটি খুব করে আমার স্মৃতিতে ভেসে উঠে। প্রতিমাসে ভাড়া নেবার দিনই শুধু তার সাথে আমাদের দেখা হতো। আম্মা চা আর বেলা বিস্কিট দিতেন নাস্তায়, সাথে ডিমের হালুয়া।

ডিমের হালুয়ার ভাজা ভাজা গন্ধে আমাদের পাঁচতলা বাসার বারান্দা দিয়ে খেলা করা হাওয়া যেন মাতাল হয়ে যেত, সাথে সাথে খানিকটা দিশেহারা হতাম আমরাও, কারণ এই খাবার আমাদের সময়ে বেশ বিলাসী দ্রব্যই ছিল বটে। রেজওয়ান চাচা বিহারি হলেও তাকে আমরা ভালো পেতাম। উনি যাবার সময় আমার আর রিমুর হাতের মুঠোয় দুটো নাবিস্কো লজেন্স গুঁজে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন,

‘ব্যাটালোক ঠিক ঠাকছে পড়না হ্যায় ক্যায়া? বহুত বাড়ে আদমি হোনে কা হ্যায়!’

তার কথা তেমন বুঝতাম না, কিন্তু এই যে বাড়িতে কেউ এলেই যাবার সময় ছোটদের বড় মানুষ, ভালো মানুষ হতে বলতেন, এটা ততদিনে বুঝে গেছিলাম। রেজওয়ান চাচার গায়ের রঙ ছিল অদ্ভুত রকম কালো। বিহারিরা সাধারণত বেশ ফর্সা হলেও, রেজওয়ান চাচা ছিলেন তার বিপরীত। এই কারণেই কিনা জানি না, বড় হয়ে আমার মনে হতো বিশাল ধনী, মোহাম্মদপুরে ছয়-সাতটা বাড়ির মালিক রেজওয়ান চাচার নামের সাথে নাম মিলিয়েই হয়ত মোহাম্মদপুরের এই জায়গাটার নাম কালা চানপুর! বড় হবার পর যখন মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানলাম, মুক্তিযুদ্ধে বিহারিদের ভূমিকার কথা জানলাম, জানলাম বিহারি মানেই আসলে পাকিস্তানি নয়, ভারতীয়ও হতে পারে, তখনও রেজওয়ান চাচার প্রতি আমার পুরনো ধারণায় তেমন কোন হেরফের হয়নি। আমি একবার মোহাম্মদপুরে গিয়েছিলাম তার খোঁজ করতে, কিন্তু খুঁজে পাইনি। আমাদের সময়ে পাঁচ-ছয়টা বাড়ির মালিক রেজওয়ান চাচা মাত্র পনের বছরের ব্যবধানেই কি হয়ে গেছিলেন একজন সাধারণ মানুষ? নাকি ছোট বেলায় একজন সাধারণ মানুষকেই আমাদের বিশাল মনে হতো? কে জানে! রেজওয়ান চাচা আমার বুকে মালিশ করে দেবার জন্য একটা তেল এনে দিতেন। সেই তেল বুকে মালিশ করলে আমার শ্বাস কষ্ট তেমন কমত না, কিন্তু মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা শান্তি পেতাম। মন আর শরীর, সাদা এবং কালোর স¤পর্ক এবং দূরত্বগুলো আজ এতদিন পরে যতটা নগ্নভাবে বুঝতে পারি, তখন তেমনটা পারতাম না!

শিশু স্বাস্থ্যে মাস্টার্স শেষ করে লন্ডন থেকে আব্বা ফিরে আসার পর আমরা মোহাম্মদপুর থেকে যশোর চলে যাই তার চাকরিসূত্রে। তারপর কিছুকাল খুলনায়; খুলনা থেকে আবার ঢাকায় ফিরি, মিরপুরে- সেখানেই বন্ধু সবুজের সাথে পরিচয় হয়েছিল। সবুজ পরবর্তী সময়ে ম্যাট্রিক আর ইন্টার, দুই পরীক্ষাতেই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে বারতম স্থান পায় ঢাকা বোর্ডে। সবুজ আর আমি পাশাপাশি স্কুলে পড়তাম। ম্যাট্রিক পরীক্ষার মাত্র বছরখানেক বাকি তখন। সবুজদের বাসা ছিল ছয়তলার চিলেকোঠায়।

ওর বাবা মধ্যপ্রাচ্যে থাকত, মা আর একমাত্র বোনকে নিয়ে ওদের সচ্ছল সংসার। সবুজ একদিন জানালো তার ঘরের জানালা দিয়ে পাশের বাসার পাঁচতলার এক নবদম্পত্তির একঘরের বাসা পরিষ্কার দেখা যায়। প্রতিদিন রাত নটা বাজতে না বাজতেই নাকি তরুণ দম্পত্তি খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ভালোবাসায় মত্ত হয়ে ওঠে। সবুজের বর্ণনায় আমরা পরিষ্কার দেখতে পাই গোলাপি স্তনের বোঁটার প্রতিটি অমসৃণ খাঁজ যেখানে জিভের, দাতেঁর লেহনে সংগীতের মাধুর্য সৃষ্টি হয়। তারপর ধীরে ধীরে মরুভূমি উপত্যকা পেরিয়ে হন হন করে নেমে আসে কোনো এক গহিন জঙ্গলে, সেখান  থেকে যখন আবার ফিরে আসে পাহাড়ের চূড়ায়, তখন নতুন দম্পতির মতো সবুজও ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ক্লান্ত হয় আমাদের কিছু সহপাঠীও।

তোরা আয় আমার বাসায় এই শুক্কুরবার, দেখবি কী খেলাটাই না খ্যালে!

রাজিব, সেলিম, দেলোয়ারসহ আমরা সবাই সবুজকে ঘিরে বসে গল্প শুনতাম। আমাদের চোখ মুখ লাল হয়ে উঠত, আমরা লজ্জাও পেতাম, কৌতূহলীও হতাম হয়তো। অন্যরা সবাই সবুজের বাসায় যাবার ছুতো দাঁড় করিয়ে ফেলল একদিন, আমি সীমিত কৌতূহলে তাদের পরিকল্পনা শুনছিলাম।

কিরে পুলক তুই যাবি না?

না রে, আমার যাওয়া হবে না, এত রাতে আমাকে ঘর থেকে বের হতে দিবে না আব্বা, তাও আবার শুক্রবার!

ও হো তোর তো আবার ততক্ষণে দুধ খাবার সময় হয়ে যায়!

সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। দেলোয়ার বলে উঠে,

পুলক চল চল একদিন না হয় দুধ না খেয়ে দুধ খাওয়া দেখবি।

আমি হাসির ভান করেছিলাম, কিন্তু আমার হাসিটা ততটা জোরালো হয়নি নিশ্চয়। খুব একটা কৌতূহলও জাগেনি অবশ্যি। নারী-পুরুষের সম্পর্কের এই দিকটা আমার কাছে তখন নিতান্তই জীববিজ্ঞান বইয়ের একটা অধ্যায় মনে হতো। সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে এর নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে মনে হয় প্রকৃতির এক নির্ধারিত দিক-নির্দেশনা, এর বেশি কিছু নয়!

তবুও এক শুক্রবারের সন্ধ্যায়, কোচিং-এর পর সবুজের বিশেষ আমন্ত্রণে আমি তাদের বাসায় পৌঁছে গেছিলাম হুট করে। সবুজের মা, মানে আমাদের আন্টি, চানাচুর আর মুড়ি মেখে দিয়েছিলেন খেতে।

সাথে লেবুর শরবত। সবুজ দরজা ভেজিয়ে দেবার আগে তাকে বুঝিয়ে বলেছিল আমার উচ্চতর গণিতের দক্ষতার কথা, যা কিনা ওর বোর্ড পরীক্ষায় প্লেস করার জন্য খুব দরকার ছিল। আন্টি হাসিমুখেই আমাদেরকে একলা রেখে রান্নাঘরে চলে গেছিলেন। আমরা কিছুক্ষণ অংক কষে বাতি নিভিয়ে পাশের বাসার সেই আলোকিত অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকি। হাসতে হাসতে দেখি নতুন দ¤পত্তির হাসি-ঠাট্টা। বর-কনে একে অপরকে মুখে তুলে ভাত খাওয়ায়। মাটিতে আলতো ভাঁজ করে রাখা পা দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দেন পিতলের থালা দুটি।

আমাদের চোখে তখন পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান পুরুষটি! সবুজ আমার সামনেই স্বমেহন করতে থাকে। আমি একবার জানালা দিয়ে দেখি দ্রুত ওঠা-নামায় ব্যস্ত পূর্ণনগ্ন নর-নারীর শরীর আর অন্যদিকে আমার অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সবুজের প্রকৃতির সাথে চলমান ঘটমান বর্তমানকে। কোন ঘটনাটি আমাকে বেশি প্রভাবিত করেছিল বলতে পারি না, কিন্তু হঠাৎই আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো। আমি ছিটকে সবুজদের বাসা থেকে বের হয়ে আসি, রাস্তায় নেমে হাঁপাতে শুরু করি, ফুটপাতের দোকান থেকে একগ্লাস পানি নিয়ে ঢক ঢক করে গিলে নিই, তার অর্ধেকই গড়িয়ে নামতে থাকে আমার শার্টের বুকজুড়ে। যদিও দুটি স¤পূর্ণ ভিন্ন গল্পের প্রেক্ষাপটে আমার শ্বাসকষ্টের তীব্র অনুভূতি হয়, কিন্তু এর যন্ত্রণার ব্যাপ্তি কেমন যেন একই ছিল। যন্ত্রণাটি যদিও ঠিক যন্ত্রণা নয়, আমার হৃদপি-ের আশপাশে কোথাও ব্যথা করেনি, কিন্তু দুসময়েই আমি উপুড় হয়ে হাঁটু আঁকড়ে ধরেছিলাম, জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিলাম। আমার আশপাশে এত মানুষ, সবাই প্রাণভরে শ্বাস নেয়, আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম আমার জন্য একফোঁটা হাওয়াও অবশিষ্ট নেই কোথাও।

যদিও তখন গভীর রাত, কিন্তু আমার চারপাশের দৃশ্যপট দ্রুত পালটে যাচ্ছিল। আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল আরও ছোটবেলার কথা, আমি যেন দেখছিলাম আমি খুলনার সোনাডাঙ্গার রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। দূরে সাইকেলে হেলান দিয়ে মিতু আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। আমি কোনোমতে হাঁটু থেকে একহাত তুলে নিয়ে বন্ধু রাজিবের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছি। দূরে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে।

গরমের মধ্যেও একটা প্রশান্তির হাওয়া, আমার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে। মিতু আর আমি একসাথে ক্লাস ফাইভে পড়ি তখন। আমার রোল ২, মিতুর ৩। অথচ আমি মিতুকে ভয় পেতাম খুব।

মিতু আমার চাইতে লম্বায় কিছুটা বড়, সেটা ভয়ের কোনো কারণ নয়। কিন্তু সেদিন দুপুরেই সবাই যখন টিফিন খাওয়ার জন্য কিংবা খেলার জন্য মাঠে গেছিল, আমি তখন আনমনে ছড়া লিখছিলাম।

ক্লাসরুমে আমি ছাড়া ছিল শুধু মিতু। টিফিন খাচ্ছিল আর হাসছিল। আমি অত গুরুত্ব দিইনি, কারণ মিতু, যার কাজই হচ্ছে ক্লাসে বসে আমাকে টিটকিরি দেয়া আর মুচকি মুচকি হাসা, তার এই তীর্যক হাসিকে উপেক্ষা করতে আমি ততদিনে শিখে গেছি!

একটু পরে ছড়া লেখা শেষ করে আমি ধীরে ধীরে ক্লাস থেকে বের হচ্ছি। মিতু দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল, আমি কাছে যেতেই আমার শার্টের কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে দরজার পেছনে নিয়ে যায়। দেয়ালে ঠেসে আমার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। আমি তখনও খানিকটা দিশেহারা, এর মাঝেই মিতু তার একহাত নিয়ে যায় আমার গভীর গহিনে, আমি থরথর করে কাঁপছিলাম, ভয়ে না উত্তেজনায় জানি না, এর মাঝেই টের পাই আমার মুখের ভেতর মিতুর জিভ, ওর চোখ বন্ধ আবেগে, অথচ হঠাৎই আমার ভীষণ বমি চলে আসে। আমি মিতুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দৌড়ে খেলার মাঠের দিকে ছুটে গেলাম। সেদিনও আমার দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। বন্ধুরা হাসতে হাসতে বলছিল, তোকে দিয়ে ফুটবল খেলা হবে না রে শালা! এট্টুক আসতে হাঁপাইয়া গেলি, আসল কামের সময় কী করবি রে!

সবাই হো হো করে হেসে উঠলে আমি পিছন ফিরে তাকিয়েছিলাম। কোথাও মিতুকে দেখিনি। মাঠভর্তি ধুলোয় দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল আরও ধুলো হলে ভালো হতো, আমি ধুলোয় ধুলোয় লুকিয়ে যেতে পারতাম।

আজ প্রায় বিশ বছর পর সে-সব কথা মনে পড়ে কেমন এলোমেলো লাগে। আমি বসে আছি ইউনিভার্সিটি হেলথ সেন্টারের ওয়েটিং রুমে। ডক্টর হিকস আমাকে দেখবেন। অভিযোগÑপ্রতি সন্ধ্যায় হৃৎপি-ের ক¤পনের হার বেড়ে যাওয়া। বেশ কদিন ধরেই এমনটা হচ্ছিল, কিন্তু উড়িয়ে দিয়েছি এতদিন। বাংলাদেশের এক বন্ধু বলেছিল ঘুম না এসে পালপিটিসন হলে একটা রিভোট্রিল খেয়ে নিস ০.৫ মিলিগ্রামের। সেই হার বাড়তে বাড়তে এখন ২ মিলিগ্রাম। কিন্তু ওই যে রাতের বেলা, সন্ধ্যা থেকেই, ১১তলা স্টুডিও এপার্টমেন্টের দেয়াল জোড়া জানালা দিয়ে তুষারপাত দেখতে দেখতে টের পাই হৃদপি- কথা বলছে, হয়ত নিজের সাথেই। গতসপ্তাহে হঠাৎ করেই শ্বাস-কষ্ট হলো। আমার চিকিৎসক বাবা শুনে বলেছিলেন, ও কিছু না, পিএইচডির স্ট্রেস। আম্মা বলেছিলেন, অবশ্যই ডাক্তার দেখাবি, পারলেই কালই। তাই এপয়েন্টমেন্ট করে ডা. হিকসকে দেখাতে এসেছি। এখনও বাইরে তুষারপাত হচ্ছে, অথচ ক্যালেন্ডার বলছে বসন্তকাল। পাতাগুলো ঝরে গেছে সেই কবেই।

ন্যাড়াগাছগুলো সেজেছে শরৎ শুভ্র সাদায়, ঋতু-চিন্তায় বিভ্রান্ত বোধহয়।

ডা. হিকস চমৎকার ভদ্রমহিলা। উচ্চগলায় শুভেচ্ছা জানিয়ে রুমে বসালেন।

বলো পুলক, তোমার হৃৎয়ের কথা শোনা যাক!

হৃদয়ের অবস্থা বিশেষ সুবিধার নয়, কেবলই ধক ধক করে ডক্টর।

আচ্ছা? বাবা-মায়ের কোনো হৃদরোগ ছিল?

উহু।

তোমার আগে হৃদরোগের কোনো সমস্যা ছিল?

না তো!

আচ্ছা এখানটায় বসো। শ্বাস নাও জোরে জোরে। এবার আস্তে আস্তে। সামনে উপুড় হও। বেশ বেশ। ডক্টর হিকস বেশ আগ্রহ নিয়ে আমার হাতের তালু ও পায়ের তালুতে আঙুল বোলান, টের পাই কিনা জানতে চান। চোখের গতি-প্রকৃতি দেখেন। এদিকে তাকাও, ওদিকে তাকাও, আমার আঙুল ¯পর্শ করো, নিজের কপাল ছোঁও!

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার সব নির্দেশনা শুনি। হিকস এবার বললেন, এসো তোমার প্রেসার মাপি, হৃদপি-ের শব্দ শুনি। মিষ্টি হেসে মন দিয়ে আমার বুকে, পিঠে স্টেথেস্কোপ বুলালেন, তারপর বললেন, ‘এবার একটু যন্ত্র দিয়ে মেপে দেখা যাক!’ নিজেই ঠেলে ঠেলে একটা যন্ত্র নিয়ে এসে আমার শরীরে তার-টার লাগিয়ে আবার কোথায় চলে গেলেন। আমি চোখ বুলিয়ে পর্দায় দেখলাম প্রেসার ১২০/৮২। যাক বাবা রক্ষে। দেশে থাকতে বাবা-মার প্রেসার মাপতে মাপতে জেনেছি এটা বেশ ভালো প্রেসার, তাই ডক্টর ফিরতেই হাসি মুখে বললাম, প্রেসার একদম নরমাল। হিকস বিশাল হাসি দিয়ে বললেন জনস্বাস্থ্যে পিএইচডি করতে গিয়ে তুমি তো হাফ ডাক্তার হয়ে গেছ। আমি মুচকি হেসে বলি ওটা তো মাস্টার্সের সময়ই হয়েছি। এখন বলো, সবই যেহেতু স্বাভাবিক, এবার কি তবে বাড়ি যাব?

উহু! তোমার পালপিটিসন তো আসলেই বেশ বাড়তি দেখা যাচ্ছে। ১২০-এর কাছাকাছি!

কত থাকবার কথা?

হুম…৭০/৮০ থাকলে ভালো হয়, তবে একশ’র নিচে অবশ্যই!

বলো কী! তাহলে কি আমি মারা যাচ্ছি?

তা তো যাচ্ছোই, সবাই মরে যাচ্ছে। তবে তোমার ক্ষেত্রে আশার কথা হচ্ছে তুমি একজন সুন্দরী ডাক্তার দেখে হৃৎপি-ের গতি বাড়িয়ে ফেলেছ। সুন্দরী ডাক্তার দেখে কেউ কোনোদিন মরেছে বলে শুনিনি। বলেই আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিয়ে নার্সকে ডাকলেন ফোন করে।

নার্স, আমাদের এই বিজ্ঞ গবেষককে নার্সিং কক্ষে নিয়ে একটু রিলাক্স করানোর ব্যবস্থা করুন।

মিউজিক-টিউজিক ছেড়ে দিন। ভদ্রলোক সুন্দরী ডক্টর দেখে নার্ভাস হয়ে পড়েছেন।

নার্স হেসে বললেন, কিন্তু ডক্টর উনি যে সুন্দরী নার্সকে সামলে নিতে পারবেন এমন কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?

আমরা তিনজনই হো হো করে হেসে উঠি। তবে আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করি, আমার কি আসলে বিশ্রাম নেবার দরকার আছে? আমি কিন্তু বাসায় গিয়েই নিতে পারি। তাছাড়া বাইরে অন্ধকার নেমে গেছে। ক্লিনিকও ৫টায় বন্ধ হয় শুনেছি…

উহু, তোমাকে এই অবস্থায় আমরা ছাড়তে পারি না। আমাদের নিয়মানুযায়ী একশ’র নিচে পালস না নামলে রোগীকে বাসায় পাঠানোর নিয়ম নেই। তুমি রিলাক্স করো। আমি আরও দুজন রোগী দেখি, এরমধ্যে তোমার পালস কমলে কিছু ব্লাড টেস্ট দিয়ে আমি তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি, ভয় পেও না বাসায় নিয়ে যাব না। হা হা হা…

নার্সস্টেশনে শুয়ে শুয়ে আমি গান শুনি; গানে একটা একা মেয়ের ভালোবাসার কথা। সে একজন মেষপালককে ভালোবাসত। সেই মেষপালকের ছিল একটা খামার আর দুইশ মেষ। মেষপালক মেয়েটিকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। যদিও তার মেষগুলো ছিল ধার করে কেনা। আগামী বড়দিনের আগে মেষ বিক্রি করে সে খড় কিনবে, নতুন ঘর তুলবে, তারপর মেয়েটিকে বিয়ে করবে। কিন্তু একদিন ভোরে অদ্ভুত কারণে সবগুলো মেষ পাহাড়ের কিনারা থেকে লাফ দিয়ে মরে যায়।

মেষপালকও এলাকা ছেড়ে চলে যায়। বহু বছর পর মেয়েটির দেখা হয় সেই মেষপালকের সাথে, যখন সে অন্য এক ধনী চাষীর ঘরণী আর সেই মেষপালক এখন সেই খামারের মেষপালক। কী ভীষণ মায়াবি গান। আমার দেশের কথা মনে পড়ে যায়। আমাদেরও একটা গান আছে ‘ওই দূর পাহাড়ের ধারে, বিষণ্ন বসে একটি মেয়ে’…দুনিয়ার সব প্রেমের গল্প, সব বিচ্ছেদের গানই কেমন যেন এক হয়!

এই যে হ্যান্ডসাম ইয়াং ম্যান, খবর কী তোমার? ডাক্তারের গলা শুনে আমি উঠে বসি। এই পুরো সময় আমার শরীরে একটি যন্ত্র রিডিং নিচ্ছিল। ডাক্তার নার্সকে জানতে চাইলেন, রিডিং কত?

এখনও ১১৫।

সেকি! পুলক, তোমার বয়স কত?

উম, সাতাশ বছর!

তাহলে হৃৎপি-ের এত ছটফটানি কেন? তোমার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই?

আমি মুচকি হাসি, কিছু বলি না।

হে তরুণ শোনো! আমি কিন্তু তোমাকে এই অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারি না। তোমার কি শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বা ঝাপসা দেখছ? বা বমি বমি ভাব হচ্ছে? মাথা ঘোরাচ্ছে?

না তো। আমার সবসময় এমনই লাগে। বুক ধক ধক করে, কিন্তু বাকি সব স্বাভাবিক!

হুম। আমি তোমাকে জরুরি বিভাগে পাঠাতে পারি। আর যদি বাসায় যেতে দিই, তাহলে তোমাকে নিশ্চিত করতে হবে তুমি খারাপ বোধ করছ না এবং অবশ্যই কালকে ইসিজি করে ফেলবে। আমি এরপর তোমার হৃৎপিণ্ডের ভেতরেও ঢুকে দেখতে চাই। হিকস কিছুটা উদ্বিগ্নভাবেই মিষ্টি হাসি দিল।

আমি হাসিমুখে হিকসের গভীর চোখে তাকালাম।

ডক্টর, চিন্তা করো না। আমি খুব ভালো বোধ করছি। তুমি যদি চাও, আমি এই মুহূর্তে একটা কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতে পারি তোমাকে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কবিতা শুনে তুমি না আবার আমার প্রেমে পড়ে যাও এবং সেটা একটা ভয়ংকর বিপর্যয় ডেকে আনে!

বিপর্যয় যে হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রোগীর সাথে প্রেম করার কোনো চুক্তি নেই আমার, এই ক্লিনিকের ভেতর তো নয় বটেই! তুমি বরঞ্চ তোমার প্রেমিকহৃদয় নিয়ে মানে মানে করে কেটে পড়ো, বাসায় যাও, কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি যেই টেস্টগুলো দিয়েছি সব করে ফেলো কালকেই। প্রেমে পড়ার জন্য আমার একটা সুস্থ সবল হৃৎপি-ের দরকার! বুঝেছ?

হ্যাঁ, জলের মতো পরিষ্কার ডক!

আমরা দুজনেই আবার হেসে উঠি। ডক্টর হিকস আমার হাতে প্রেসক্রিপসন ধরিয়ে দিয়ে বলল, সাবধানে যেও। আসলেই সাবধানে। আমি তার চোখে গভীর মায়া দেখি। এই মায়াভরা চোখ আমার বড্ড চেনা, পরিচিত। আমি চমকে উঠি। উইন্টার জ্যাকেটটা গায়ে চড়িয়ে ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। চারিদিক অন্ধকার হয়ে এসেছে। তবে ছাত্রছাত্রীদের অভাব নেই এই রাসেল স্ট্রিটে। বাহেন সেন্টার থেকে ক¤িপউটার সায়েন্সের আন্ডারগ্রাজুয়েটের ছাত্ররা কেউ ক্লাস কেউ ল্যাব শেষে বের হয়ে আসে। এদের সন্ধ্যার মাত্র শুরু। গ্রুপ স্টাডি, আড্ডা, সেলফ স্টাডি এসব চলতে থাকে মধ্যরাত পর্যন্ত। কেউ কেউ হেসে হাত নাড়ে। আন্ডারগ্রাজুয়েটদের কয়েকটা কোর্সে পড়াই আমি, বিষয় হিউমেন-ক¤িপউটার ইন্টারেকশন!

প্রথমে ভাবলাম কুইন্স স্ট্রিট থেকে সাবওয়ে নিই, তারপর মনে হলো হেঁটেই যাই। সেন্ট জর্জ থেকে কুইন্স পার্কের ভেতর দিয়ে একটা শর্ট-কাট রাস্তা আছে আমার বাসার দিকে, জোরে হাঁটলে ২০ মিনিটে পৌঁছানো যায়। বেশ ঘন তুষার পড়ছে। তাপমাত্রা শূন্যের নিচে ১০ ডিগ্রি। কেন জানি না আমার এই শীতটা খুব ভালো লাগে, বিশেষত যখন তুষারপাত হয়। দেশে থাকতে আমি বৃষ্টি ভালোবাসতাম। এখন ভালোবাসি তুষার। জানি না আমার আর দেশে যাওয়া হবে কিনা! রাস্তার পাশে দাঁড়ানো ট্রাক থেকে একটা হট ডগ কিনে নিই, বাসায় যেয়ে আর রাঁধতে ইচ্ছে করছে না। হট ডগ চিবুতে চিবুতে দেখি ঠান্ডার মধ্যেই হন হন করে সবাই হেঁটে যাচ্ছে যে-যার গন্তব্যে। এই রাস্তার শেষ মাথায় তেমন মানুষ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাসায় ফিরতি ছেলেমেয়েরা মাথার উপর হুডিটা টেনেটুনে বসায়, বেশিরভাগই জোড়ায় জোড়ায় যাচ্ছে তাদের গন্তব্যের পথে। এরা উচ্চস্বরে হাসে, একসাথে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে হাসিখুশি যুগলগুলো একসাথে যখন ঘরে ফেরে খুব ভালো লাগে আমার।

অথচ আমার বসন্তটা অতটা সরব নয়। গত ঈদের দিন আমি বসে বসে একটা পেপার লেখার কাজ করছিলাম। ওটা যে ঈদের দিন সেটা আমি বুঝতে পারলাম আমার ল্যাব মেট নিকোলের পাঠানো ছোট্ট একটা এসএমএস দেখে ‘ঈদ মুবারক পুলক!’ মানে? আমি চমকে উঠেছিলাম! তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল, আমি তীব্র ক্ষুধা অনুভব করছিলাম, কিন্তু কাজ ফেলে খাবার রান্না করতে গেলে রেশটা কেটে যাবে, তাই সেই দুপুর থেকেই মোটামুটি ক্ষুধাটাকে ভুলে থাকবার চেষ্টা করছিলাম।

নিকোলের এমএমএস দেখে আমি ল্যাপ্টপে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাই, আজকে আসলেই ঈদ। বাইরে ঝলমলে রোদ, কয়েকটা ছেলে ডর্মের বাইরে ফুটবল খেলছিল। জানালা দিয়ে পরিষ্কার দেখছিলাম কয়েকজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা মাঠে এক কোণায় চাদর বিছিয়ে গল্প করছে, কেউবা বই পড়ছে আর কেউ কেউ চুমু খেতে খেতে আধশোয়া হয়ে আছে গাছের গুঁড়িতে। অদ্ভুত প্রশান্তিময় পরিবেশ। আজ ঈদ, আবার মনে পড়েছিল ঠিক তখন আমার। বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠেছিল। দেশে থাকতে ঈদ নিয়ে আমি চরম উন্নাসিক ছিলাম, ঘুমিয়েই কাটাতাম সারাদিন। কিন্তু এই দূর-দেশে একটা ঈদের দিন কেটে গেল কিছু না জেনেই, আমার খুব মন খারাপ হয়। নিকোলের আগে সারাদিন বাঙালি কেউ আমার খোঁজ করেনি, কেউ ডাকেনি একসাথে খাবার জন্য। দেশ থেকেও কেউ ফোন করেনি, আমি ফোন হাতে নিয়ে গভীর আগ্রহে মিস কল খুঁজছিলাম, উহু! নেই। আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল সেদিন। খুউব। শ্বাসকষ্টও হচ্ছিল।

এখন অবশ্যি আর এসবে কষ্ট পাই না। কষ্টের সাথে বসবাস শিখে নিয়েছি। মোবাইলে সময় দেখে নিয়ে চার্লস স্ট্রিটে ডানদিক ঘুরে আমি কুইন্স পার্কে ঢুকে যাই। এই সময় পার্কটা দেখলে মনে হয় পুরো সাদা রঙ ঢেলে দিয়েছে কেউ পিচঢালা রাস্তায়। দুপাশে মাঠের মধ্যে অবশ্যি ঘাসেরা উঁকিঝুঁকি দেয়, শরতে ছড়িয়ে থাকে অদ্ভুত সুন্দর সব ম্যাপল গাছের পাতা। হাঁটতে হাঁটতে আমার ক্লান্ত লাগে।

বুঝতে পারি তিন-পরতের কাপড়ের ভেতর ঘাম হচ্ছে, হঠাৎ করেই খুব গরম লাগতে থাকে। আমি মাঠের পাশটায় সরে আসি, এদিকটায় কোনো বেঞ্চ নেই। ব্যাগপ্যাকটা নামিয়ে বসে পড়ি ধপ করে।

ফ্লাস্কটা বের করে ঢক ঢক করে পানি ঢালতে থাকি গলার ভেতর। হঠাৎ করেই বুকের বামদিকটায় প্রচ- ব্যথা করে ওঠে। আমি হা করে শ্বাস নেবার চেষ্টা করি। কাত হয়ে পড়ে যাই তুষারে ঢাকা কুইন্স পার্কে। জ্যাকেটের বুকটা খুলে দিই। আমার কপাল দিয়ে দর দর করে ঘাম নেমে আসে। আমি তীব্র ব্যথার মধ্যে দেখি আমার মুখের কাছে উপুড় হয়ে আসে এক উজ্জ্বল-বর্ণা তরুণী। লম্বা চুল মুখের উপর থেকে সরিয়ে আমার ঠোঁটের খুব কাছে ঠোঁট এনে বলে, পুলক আমাকে শুনতে পাচ্ছ? আমি আছি তোমার কাছে, সব ঠিক হয়ে যাবে। তারপর তার ঠোঁট আমার ঠোঁটে নামিয়ে আনে। আমাকে চুমু খেতে থাকে পাগলের মতো। এই চুমুর স্বাদ আমার বড্ড চেনা মনে হয়, আমি বলতে চাই, আমার শ্বাস আটকে আসছে, কিন্তু বলতে পারি না। পিঠ আঁকড়ে ধরে চুমু দিতে চাই, তাও পারি না।

আমার রক্ত আমার হৃৎপি-কে চালিয়ে নিতে অক্ষম ততক্ষণে। আমার এলোমেলো মনে পড়ে ডক্টর হিকসের কথা, আমার বয়স যে মাত্র সাতাশ সেই কথা। আমি একহাতে ফোনটা বের করার চেষ্টা করি, শুধু ৯১১-এ একটা ফোন করতে হবে, কিন্তু আমি পারি না। সেই তরুণী আমার হাত থেকে ফোনটা সরিয়ে নেয়। দুহাত মাটিতে চেপে আমাকে আঁকড়ে ধরে, তার বুকের গন্ধ আমার তীব্র চেতনাবোধকে অবশ করে দেয়, আমার সমস্ত ব্যথার অনুভূতি অসাড় হয়ে যায়। আমি হঠাৎই টের পাই আমার বুকের উপর আসলে শুয়ে আছে সবুজের মা, আমাদের আন্টি, ঠিক একযুগ আগের সেই উন্মাতাল দুপুরগুলোর মতো!

কিছু দুপুরের কথা কোথাও লেখা থাকে না, কেউ জানে না সেসব দুপুরে মেঘের রঙ কী ছিল! ঠিক যেমনটি কেউ জানেনি হঠাৎ এক ভোরবেলা অদ্ভুত সুন্দর এই পৃথিবী থেকে কেন সবুজের মা হারিয়ে গিয়েছিল, কেউ জানেনি কেন সবকিছু ভেঙেচুরে আমি চলে এসেছিলাম এই অদ্ভুত শীতল দেশে…

লেখক : গল্পকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares