হিন্দু কবি : সুফি বাংলার পান্থ

গল্প

হিন্দু কবি

সুফি বাংলার পান্থ

 

আজ ঢাকা শহরে বৃষ্টি। শিবাজি ভট্টাচার্য চারতলার ছাদে দাঁড়িয়ে। রেইনকোট পরে বৃষ্টি দেখছে। ঝুমঝুম বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির ফোঁটার সাইজ বেশ বড়। বৃষ্টির সাথে এলোমেলো বাতাস। তার ভালো লাগছে। রেইনকোট জড়িয়ে বৃষ্টিতে ভেজার উদ্দেশ্য অন্য কিছু না। কিছুদিন আগে রেইনকোট নামে শিবাজি একটা বড় গল্প লিখেছে। লেখক গল্প লিখবে এবং গল্পের নায়কের মতো বজ্র চমকানো রাতে একা চারতলার ছাদে উঠে বৃষ্টিতে ভিজবে এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। অস্বাভাবিক হলো গল্পের কাহিনির মতো কিছুক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে হঠাৎ ছাদের রেলিং থেকে লাফিয়ে নিজে নিজে মরে যাওয়া। লেখকের ইচ্ছা মৃত্যু।

শিবাজি এখন ছাদের কিনারে দাঁড়ানো। দেখা গেল শিবাজি যা পরে আছে তার নাম উইন্ড ব্লকার। হালকা নীল জিন্সের উপর কিছু জড়ানো নেই। শুধু ধূসর টিশার্টটি উইন্ড ব্লকারে ঢাকা। ব্লকারের মাঝে ম্যাজিক বক্সের মতো বিশেষ থলে বসানো। থলের মুখ বন্ধ। মোটা চেইন একসময় ডান-বামে চলে যায়। থলে ওপেন হয়।

ঝুম বৃষ্টির সময় কালো উইন্ড ব্লকারের লম্বা টুপিতে এখন শিবাজির পুরো মাথা ঘেরা। ভারি বৃষ্টি ধীরে ধীরে একসময় হালকা হয়। চেইন আবার ডানে-বামে ঘুরে আসে। শিবাজির বডি থেকে মাথা-ধড় আলাদা হয়! কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে বৃষ্টি আবারও হুট করে বাড়তে শুরু করে।

কয়েকদিন আগে একটা ছবিতে শিবাজি এমন দৃশ্য দেখেছে। দূর পাহাড়ের চূড়ায় এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ থেকে শুভ্র বরফ পড়ছে। বরফগুলো পড়ে গলে পানি হচ্ছে না। তুষারপাতের সময় যুবকের হাতে মস্ত এক চায়ের মগ। মগ থেকে গরম ধোঁয়া বাতাসে ছড়াচ্ছে। ডেনসিটি দেখে মনে হলো মগ ভর্তি কফি। যুবক কফিতে চুমুক দিচ্ছে। ছবির এই যুবক এক ধরনের বিষণœ আনন্দ নিয়ে তুষারপাত দেখছে। তার দু চোখ টলটল করছে। এক্সট্রিম ক্লোজে হোমারের গ্লিটারিং আইস। মজার ব্যাপার হলো সে কফির কাপে চুমুক দেয়ার আগে কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে কাপের ভেতর তাকাচ্ছে। যেন কাপে সে কিছু দেখতে পাচ্ছে। ম্যাক্সিকান এ ডিরেক্টর বেশ ভালো ম্যাজিক দেখিয়েছেন। ছবির একদম শুরুতে কফির কাপের ভিতরটার জন্য দর্শকদের আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছেন।

শিবাজির দার্র্জিলিং-এর চা পাতায় এক মগ গরম চা খেতে ইচ্ছে হলো। তার হাতে চায়ের কাপ থাকলে সে নিজেও এই কাজটা করত। ছবির মতো কিছুক্ষণ তাকাত মগের ভিতর। কিছুক্ষণ তুষারপাতের দিকে। নিজেকে গল্পের নায়ক ভেবে বাকি জীবনটা পার করে দিতো। এটা এক ধরনের খেলা। গল্প কবিতা নিয়ে নিজের সাথে খেলা। ছবি আঁকাজোকার ছলে খেলা। পাহাড়ি বনে গিয়ে বুনো জোছনায় নিজেকে নিয়ে খেলা। জলরং ছড়িয়ে গহিন বনে এলোমেলো ছবি বানিয়ে ছবিতে জোছনা নামিয়ে পাতায় পাতায় আলোর নাচন দেখাও তো খেলা। বড় মধুর সে খেলা!

শিবাজি চিরকুমার। গুরুদেবের চিরকুমার সভার সভ্য সে। সভ্য হলে কি হবে চা বানানো, ঠান্ডা খাবার গরম করা কিংবা গোসলের গরম পানি কিচেন থেকে বাথরুমের বালতিতে ঢালার মতো কাজগুলো তাকেই সারতে হয়।

শ্রীমান শিবাজি ভট্টাচার্য। দেশের সবচেয়ে বড় আর্টিস্ট। মহাশয় সবেমাত্র পঞ্চাশ পার করেছে। এরই মধ্যে শিবাজি কিংবদন্তির তকমা লাগিয়ে দিব্যি জিন্স-টিশার্ট ও লাল ফিতাওয়ালা স্যান্ডেল পরে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। মোড়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চুক-চুক করে লাল চা খায়।

ঘুম থেকে উঠে রুমের এসি বন্ধ না করে প্রায়ই সিগারেট ভেবে; হাতে বানানো বিশেষ চুরুটের পুটলা নিয়ে টাইম লাইনের প্রেসে উঠে যায়। কী ভুলো মন রে বাবা! এই মহামতি আপাত ভোলানাথ বাবু ফি বছর দেশের সতের হাজার বর্গমাইলের পুরো কাজ একা করে চলে। দেশ ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের হলে হিসাব তো ঠিকই আছে। এই নির্জন শিল্পী তার কাজ শেষ করে এক সময় ব্ল্যাক প্যান্থার মুভি দেখতে চলে যায়। আর বাকি কাজ সমগ্র জাতি মিলে উদ্ধার করতে সেকি হাবুডুবু খেলা!

শিবাজি জীবনবাবুর কবিতার মতো একা বলেই হয়তো তাঁর সদর দরজার পিছনে আর্ট পেপারে ছাপা থাকে; এই পৃথিবী একবার পায় তারে- পায় নাকো আর!

শিবাজি ভট্টাচার্য-এর সেই বিখ্যাত লেখার মাঝে কালো এক কাকের ছবি আঁকা। কাক ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে কিছু একটা ভাবছে। এক পায়ে দাঁড়িয়ে বিষণœ চোখে সে মানুষ দেখছে! বেশ জটিল চিত্রকর্ম। শিবাজির সাথে কাকের সম্পর্ক উদ্ধার করা হয়নি। মাঝে মাঝে দেখা পাওয়া দাঁড়কাকের সংসারধর্ম তাকে অনুপ্রাণিত করেছে বলে বাজারে বেশ কিছু জমাট গল্প চালু আছে। শিবাজির সেই গল্পগুলো এখন আর গল্প রইল না মিথ হয়ে গেল। এই হলো আর্টিস্ট শিবাজির গল্প।

নটে গাছ মুড়ালেও শিবাজির গল্প ফুরায় না। হারুকির সীমান্তের ওপারে কিংবা জিবরানের গভীর অন্ধকারে চলে জন্মগ্রহণের প্রস্তুতিপর্ব। আশ্বিনের কমলা রোদে ততক্ষণে নতুন গল্প শুরু হয়ে গেছে।

নতুন গল্প বলার সময় কিছু জিনিসপত্র চারদিকে ছড়িয়ে নিয়ে আয়োজন করে বসি। অদ্ভুত সে সব জিনিস। এখন আমার হাতে বৃন্দাবনের মাটি। পাশের গলি থেকে নিয়ে আসা এলেবেলে মাটি না। সত্যি সত্যি বৃন্দাবনের মাটি। কবিদের অপ্রকাশিত বিচিত্র সব গল্প বলার সময় রহস্য ব্যপারটা এড়িয়ে যেতে চাইলেও তা সবসময় হয়ে ওঠে না। শুরুতে কিছু জিনিসপত্র দেখাই এবং তারপর গল্পটা খুব আগ্রহ করে বলি। শ্রোতারা চোখ বড় বড় করে শোনে। তরুণরা গল্প শেষ হবার পর জিনিসপত্র নেড়ে চেড়ে দেখে। বিদায় বেলায় দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে হয়তো ভাবে, আহা; এমন জীবন যদি যাপন করা যেত!

গল্পটা বলি।

ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। অগ্রহায়ণ মাসের শেষে এমন বৃষ্টি ভালো না। এ নিয়ে বহু প্রচলিত দেশীয় প্রবাদ আছে। শীতকাল এখনও শুরু হয়নি। বৃষ্টির কারণে ধুম করে শীত নেমে গেছে। উত্তর দিক থেকে শীতের হিমেল হাওয়া উড়ে আসতে শুরু করেছে। মনে হয় শীত জেঁকে বসবে। তাছাড়া গত কয়েক বছর তেমন শীত পড়েনি।

মাধব কুমারের বাড়ির উঠানে বৃষ্টির পানি। শেষ বিকেলে বৃষ্টি কিছুটা ধরে এসেছিল। সন্ধ্যা মিলানোর পর পর এখন আবার জোরে নেমেছে। বৃষ্টির ফোঁটা বরফের চেয়ে শীতল। সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছে। মাধব কুমার কালো চাদর গায়ে পুকুর পাড়ে এসে বসেছে। আজ তার মন বেশ খারাপ। তার পৈত্রিক বসতভিটা বিক্রির আয়োজন প্রায় সম্পন্ন। সব টাকা একসাথে ভাঁজ করে ঢাকায় যাবে মাধব। এ সিদ্ধিরচর গ্রামে জীবদ্দশায় কখনো বুঝি আর ফিরে আসা হবে না। সবই নিয়তির খেলা।

কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে দোতারা হাতে বাবা উধাও হয়ে গেল। সংসার ধর্ম ভালো লাগে না। পুত্রকে রেখে সিদ্ধার্থ  যেমন অশোকগাছ খুঁজতে গৃহত্যাগী হলো; তেমনি বাবা হলো দেশান্তরী। ডেস্টিনেশন আসামের গভীর জঙ্গল। জঙ্গলে নাকি মঙ্গল। গভীর জঙ্গলে গভীর মঙ্গল। বাবার মাথায় নাকি কিঞ্চিত দোষ ছিল। এ সবই প্রচলিত উড়াকথা। উড়োকথায় কান না দিলেও শেষ পর্যন্ত বাবা আর ফিরলেন না। দরিদ্র মা তার পুত্রকে আগলে রাখলেন। তবে বেশি দিন পারলেন না। তিনি বলতে গেলে বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন। সারাক্ষণ চুপচাপ থাকতেন। প্রায় রাতেই উঠানে বসে কাঁদতেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবতেন। পাখি চলে গেলেও নাকি কিছু পালক রেখে যায়; বাবা অবশ্যি মায়ের জন্য রেখে গেলেন মাথার সেই কিঞ্চিত দোষ! মা মারা যাওয়ার আগে পুরোপুরি উম্মাদ হয়ে গেল। গায়ে কখনো জামা কাপড় রাখত না। খাবার দাবার ছিটিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত। ঘণ্টাখানেক পরে নিজের ফেলে দেওয়া খাবার কুড়িয়ে কুড়িয়ে মুখে গুজে দিত। সে বড় কঠিন সময়। দীর্ঘ দিবস। দীর্ঘ সে রজনী।

মাধব কুমারের এখন নিজেরই নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। অনেকদিন তো এই ভিটেমাটি আঁকড়ে থাকা হলো। প্রবেশিকা পরীক্ষার ব্যবহারিক শেষ হয়েছে তাও সপ্তাহ তিনেক হয়ে গেল। শিকড় ছিন্ন করে নিরুদ্দেশ হওয়ার এই তো সময়। মাধব প্রায়ই ভাবে। এক সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চা খাবে। চায়ের সঙ্গে বেনসন সিগারেট। তারপর ভালো একটা পাঞ্জাবির উপর কালো চাদর জড়িয়ে হাসি মুখে ঘর থেকে বের হওয়া এবং আর ফিরে না আসা।

মাধব ভাবে। কবিদের মতো করেই ভাবার চেষ্টা করে। কবিদের কখনও বয়স্ক বটবৃক্ষের মতো ডালপালা ছড়িয়ে ঝুরি নামিয়ে মাটি আঁকড়ে বসে থাকতে নেই। বরং প্রকৃতির সাথে ভেসে বেড়ানোর নিয়ম। তাদের বাড়ি ফেরার তাড়া নেই; পিছুটান বলে কিছু নেই। কবিদের নতুন করে শুরু করার আগে নাকি একবার মরতে হয়! এইসব আজগুবি নিয়মকানুন অবশ্যি তার নিজের বানানো। যেমনটা নিজের পিতৃপ্রদত্ত নাম মাওলানা মুহাম্মদ জালাল উদ্দিন সরকার থেকে কবি হওয়ার জন্য এক ধাক্কায় সে শ্রী মাধব কুমার চট্টোপাধ্যায় বনে গেল।

মাওলানা জালাল থেকে কবি শ্রীযুক্ত মাধব কুমার চট্টোপাধ্যায় হওয়ার গল্প তাকে বড়ই শিহরিত করে। সে বড় কবিদের মতো ভাবে। ভাবতে তার ভালো লাগে।

পুকুর পাড়ের হিমশীতল বাতাসে সে বসে আছে। বাতাসের কারণে পুকুরের জলে ঢেউয়ের মতো উঠছে। সে ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে। মাঝারি সাইজের পুকুরটাকেই তার মনে হলো আড়িয়াল খাঁর বংশনদী। এখন সবসময় সে; শুধু কবি মাধব কুমারের নতুন যাপিত জীবনের ভাবনায় আচ্ছন্ন। মাধব ঘোরের মধ্যে চলে যায়। তার জ্বর ছিল। এখন জ্বর কমেছে। দুপুরের পর একশ তিন ছিল, এখন একশ। ঘুমের ওষুধ খাওয়ার কারণে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমিয়েছে। সকাল থেকে সারাদিনে কিছু খায়নি। খেলেই বমি হচ্ছে। এখন নরম ভাত আর ডাবের পানি খেল। মাধবের মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। এক পিচ্চি মেয়ে তাকে গল্পের বই পড়ে শোনাচ্ছে। মাধবের গল্প শুনতে ভালো লাগছে না। এই ছোট্ট মেয়েটা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে পড়ছে। মাধবের মনে হলো এই মেয়েটা কিছুদিন আগেই এদিক সেদিক হামাগুড়ি দিত। এটা সেটা হাত বাড়িয়ে ধরত। আজ হঠাৎ করে এত বড় হয়ে গেছে। তার বাবা কবি। বাবার জ্বর এসেছে তাই গল্প পড়ে পড়ে বাবার জ্বর কমানোর চেষ্টা করছে।

ধরা যাক মেয়েটির নাম রূপকথা। ছোট্ট রূপকথা তোমার প্রসঙ্গ এই গল্পে আর আসবে না। কারণ তোমার গল্পের জন্য কেউ অপেক্ষায় থাকবে না। কল্পনায় বানানো মানুষ হলো মৃত মানুষ। তাদের ধরা ছোঁয়া যায় না। কল্পনার মানুষদের জন্য আমরা অপেক্ষা করি না। আমাদের সমস্ত অপেক্ষা জীবিতদের জন্য। এই চরম সত্যটি তোমার হয়তো কখনও জানা হবে না।

এখন বাতাসের সাথে হালকা বৃষ্টির ঝাপটা আসছে। মাধবের হঠাৎ মনে হলো কিছুক্ষণের মধ্যে এই পুকুর পাড়েই তার মৃত্যু হবে। মৃত্যুর সময় পাশে কেউ থাকবে না। পানির তৃষ্ণায় একা সে ছটফট করবে। তাকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এগিয়ে দেওয়ার কেউ থাকবে না।

গহিন বনে বুনো জোছনার খেলার মতোই আজব সে খেলা। তার মাথাটা এখন প্রায়ই ভারি ভারি লাগে। তীব্র ব্যথায় মাথার রগগুলো দাপাদাপি শুরু করে। অসহ্য যন্ত্রণা। এমন সময় জালালকে অচেনা কেউ শৈশব মনে করাতে চায়। কিন্তু সদ্যভূমিষ্ট মাধব কুমারের এখন কিছু মনে পড়ে না। তার মাথা শূন্য। মাথায় শুধু আর্নেস্ট হোমিংওয়ের ব্ল্যাঙ্ক ভার্স।

বড় আশ্চর্য কথা। তার মাথায় কবিতার লাইন উঠে আসছে। জুয়াড়ি ক্যাফেতে বসেছে মাধব কুমার। হাতে সুরার পাত্র। কবি এবার ধ্যানমগ্ন। এখানে সৃষ্টি হচ্ছে কবিতার নতুন নতুন পদ। একই সাথে মাতাল ট্রাম এগিয়ে আসছে। আহ্ কি অপূর্ব সেইসব পংক্তিমালা।

মাধব তার মেস থেকে বের হলো সকাল দশটায়। ভোরবেলায় একবার যখন চা-পরোটা খেতে বের হয়েছিল তখন চারদিকে চনমনে রোদ খেলা করছে। আকাশ এখন মেঘে মেঘে ঢাকা। এই আকাশ কেমন অচেনা লাগছে। এত মেঘ হঠাৎ কোথা থেকে উড়ে এল কে জানে! এখন হুড়মুড় করে বৃষ্টি নামলে খুব বিপদ হবে।

এমনিতে বৃষ্টিতে ভিজতে তার খারাপ লাগে না। বরং বৃষ্টির সাথে এলোমেলো বাতাস তার ভীষণ পছন্দ। পছন্দ হলে কী হবে; আজ বৃষ্টিতে ভেজা যাবে না। পকেটে তিন তিনটি গরম কবিতা। কবিতা ভিজে যাবে। সারারাত জেগে লেখা বলে কবিতা এখনও গরম। রাস্তায় বের হয়ে কোনো একটা ফার্মেসি বা হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করা ভয়াবহ। বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করলে বৃষ্টি বাড়তে থাকবে− এটা পৃথিবীর চিরন্তন সত্যগুলোর মধ্যে একটি। অবশ্য মহাপুরুষ ফ্রিদেল রোজারিও-এর কথা ভিন্ন। ফ্রিদেল হলো পৃথিবীর একমাত্র মহাপুরুষ যে ধ্যান করে বৃষ্টি থামাতে পারে। সে এক রহস্য গল্প।

মাধব সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে ঢাকায় এসেছে তা প্রায় বছর তিনেক হতে চলল। বসতবাড়ি সব বিক্রি করলে বাড়ি ফেরার তাড়না মরে যায় এ কথাটা বোধ হয় মাধবের ক্ষেত্রে পুরোপুরি সত্য নয়। তার মাঝে মাঝে মনে হয় সে সবকিছু ছুঁড়ে ফেলে আবারও গ্রামের নির্জনতায় হারিয়ে গেছে। বুকটা হু হু করে। শেষে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়। মাধবের ফিরে যাওয়া হয় না।

গত তিনবছর সে পথে পথে হেঁটেছে। প্রথমদিকে পরিকল্পনা করে হাঁটত। কবিতা বুক পকেটে নিয়ে হয়তো হাজার কিলোমিটার হাঁটা হয়ে গেছে। মাসিক-দৈনিক পত্রিকার অফিস, বাংলাবাজারের প্রকাশকদের দুয়ার, বড় বড় প্রেসের মালিকদের সাথে তার দেখা হয়েছে। বই বাইন্ডার-টাইপ রাইটার থেকে শুরু করে দেশের বড় বড় বাজারি লেখকদের সাথে তার কথা হয়েছে। সবসময়ই তার চোখ ভিজে গেছে। কখনও তীব্র অপমানে কষ্ট-হতাশায়; কখনও প্রচ্ছন্ন প্রগাঢ় ভালবাসায়। এত কিছুর পরে সে কিছু বন্ধু পেল। মাধব কুমারের নিজস্ব কিছু বন্ধু।

মাধব হয়ে গেল মাধবদা। বাকি জীবনে গল্প লেখার মতো হাজারটা ঘটনা রয়ে গেল। প্রতিদিন রাতে কবিতা লিখে সারাদিন কবি হওয়ার সংগ্রাম করার সময়টা বড় মধুর। সারাদিন উপোস থেকে দুই মুঠ চিড়া আর এগারো গ্লাস পানি খেয়ে পথে পথে হাঁটতে বেশ ক্লান্ত লাগে। ফুটপাতে কোথাও হেলান দিয়ে বসলে ঝিমুনি মতো লাগে। এ সময় বড় রাস্তায় শশব্যস্ত মানুষজন দেখতে বড় ভালো লাগে।

এমন সময়ও কবিতা মাথায় হাঁটাহাঁটি করা শুরু করল। যন্ত্রণার সময় মাধব একা একা হাসে। তাহলে কি শেষ পর্যন্ত সত্যি সত্যি সে কবি হয়ে গেল। দেশের সব লোক না জানুক, সে তো নিজে জেনেছে; এই আনন্দের সীমা-পরিসীমা নেই। এভাবে হাসতে দেখে রাস্তার লোকজন আড়চোখে তাকায়। তারা মনে মনে কি ভাবছে কে জানে।

বাংলাবাজারের এক টাইপ রাইটারের টাইপিস্টের সাথে তার ভালো বন্ধুত্ব হলো। অনির্বাণ দেব। বন্ধুবর। বাকিতে তার কবিতা টাইপ করে দেয়। কাজ শেষে প্রায়ই তারা দুজন নদীর ওপারে ঘুরতে বের হয়। প্রতি সপ্তাহে নতুন কবিতা নিয়ে মাধব অনির্বাণের কাছে আসে। অনির্বাণ কবিতা টাইপ করে। মাধব তখন সামনে বসে থাকে। মাধবের চোখে পানি চলে আসে। ইদানিং তার চোখ অল্পতেই ভিজে যায়। চোখের সমস্যা হয়েছে কিনা কে জানে। নিজের কবিতা টাইপ হচ্ছে এটা দেখে চোখ ছলছল হওয়ার কারণ তো কিছু দেখি না।

অনির্বাণ প্রায়ই জিজ্ঞেস করে; মাধবদা আপনার চোখে কি হয়েছে? কবির উত্তর তৈরি থাকে। সারাদিন হাঁটাহাঁটি করি। চোখে ধুলোবালি পড়েছে। ওহ্ কিছু না।

টাইপিস্ট অনির্বাণ কম্পোজে মন দেয়। মাধবদা রামমন্দির নিয়ে আপনার কবিতাটা বেশ হয়েছে। দাদা, আমি সামনের মাসে বৃন্দাবন যাব। বৃন্দাবন গিয়ে সেখানকার পবিত্র ধুলা আপনারে এনে দিব। দেখবেন মাধবদা ভগবান একদিন আপনাকে বড় কবি বানিয়ে ছাড়বেন। আপনি কবিতা লেখা কখনো বন্ধ করবেন না। যতদিন এই অনির্বাণ দেব বেঁচে থাকবে আপনার সব কবিতা− সে নিজে টাইপ করবে! অন্য কেউ না।

মাধবদা আজ আপনার চোখে ধুলা বুঝি একটু বেশি পড়েছে। পানি দিয়ে চোখ ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। মাধব বেরিয়ে আসে।

আজ হাবিবুর রহমানের কাছে যেতে হবে। হাবিব ভাই মাসিক অনল প্রবাহ-এর সম্পাদক। তিনি থাকেন শাঁখারি বাজার। মিনিট পনের বৃষ্টি হলেই তাঁর বাড়ির সামনের গলিতে প্রায় কোমর পর্যন্ত পানি জমে যায়। সেই পানি কুচকুচে ঘন কালো। এই পানির ঘনত্ব বেশি। অনেকটা সেমিসলিড। কারণ এতে বিভিন্ন কিছু ভাসতে দেখা যায়। যেমন− মরা কুকুর, মরা মুরগি কিংবা গরুর ভুড়ি। পুরান ঢাকার অন্যসব গলির মতো এখানেও বেশ কয়েকটা ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল আছে। অনেকের ধারণা ম্যানহোল গুলোর মধ্যে কোনো একটা জীবন্ত। মাঝে মাঝে সে জায়গা বদলায়। কখনও হাবিব ভাইয়ের বাসার গলির মাঝামাঝি, কখনোবা আবার সাইডে চলে যায়। রহস্য গল্পের মতো শোনালেও তা সত্যি। কারণ এখানে পানি উঠলে কেউ না কেউ সেই ম্যানহোলে পড়বেই।

মাধব ম্যানহোলে না পড়েই হাবিবুর রহমানের বাসায় পৌঁছে গেল। সম্পাদক সাহেব বের হয়ে এলেন। ভুড়িওয়ালা     গাঁট্টাগোট্টা মানুষ। ক্লিন সেভ। চেহারায় সরলতার ছাপ স্পষ্ট। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। এই বৃষ্টি বাদলার দিনে খালি গায়ে চারহাতি একটা গামছা ঘাড়ে জড়িয়ে দরজা খুললেন। তিনি স্বভাব সুলভ বিরক্তি নিয়ে বললেন,

ও মাধব নাকি। তা এত দিন পর। খবর কী?

মাধব যতটুকু বিনয় করা সম্ভব তার থেকে কিছু বেশি বিনয়ী হয়ে বলল, কেমন আছেন; হাবিব ভাই? আপনার শরীর কেমন? মাধব যতটা সম্ভব মুগ্ধ হওয়ার ভঙ্গি করল। মনে হলো সে মহামানবের সামনে দাঁড়িয়ে।

হাবিব ভাই আপনার জন্য এই বোতলটা আনলাম। অরিজিনাল, হাবিব ভাই। ধরে দেখেন।

হাবিবুর রহমান সরকার চোখে মুখে আরও বিরক্তি নিয়ে বোতলটা হাতে নিলেন।

মুখ বাঁকিয়ে তিনি বললেন, এসো; ভিতরে এসে বোস।

হাবিব ভাই আপনার সময় নষ্ট করব না। আপনি নিশ্চয়ই কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত?

আজ বরং আমি চলে যাই। তিনি বললেন; বেশি ব্যস্ত না। চুপচাপ ভাবছিলাম। বসে বসে বৃষ্টি দেখছি আর ভাবছি। তোমরা এখন যারা কবিতা লেখ; তারা প্রকৃতি ভালোভাবে দেখ না। আরে ভাই না দেখলে লিখবে কিভাবে; বল শুনি। ট্রাক ড্রাইভারের মতো দেখা না। ট্রাক ড্রাইভারের মতো প্রকৃতি দেখলেও লোকে তোমাকে মনে রাখবে। শ্রীমান মাধব কুমার চট্টোপাধ্যায়; ট্রাক ড্রাইভার! হাবিব ভাই তার নিজের কথায় মুগ্ধ হয়ে নিজেই আপন মনে হাসছেন।

চা খেতে খেতে ততক্ষণে তার চেহারা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। চোখে মুখে হাসি হাসি ভাব ফুটে উঠেছে। মাধব ভালো করে জানে এটা ভয়াবহ দুঃসংবাদ। সাহিত্য বিষয়ক দীর্ঘ বক্তৃতা দেওয়ার আগে চোখে মুখে তাঁর এমন দৈব পরিবর্তন হয়।

মাধব মুখ শুকনো করে তার প্রস্তুতি নিলো। হাবিব ভাইয়ের লেকচার থামল পাক্কা দুই ঘণ্টা আটচল্লিশ মিনিট পর। থামার কারণ সম্ভবত তিনি কথা বলতে বলতে ক্লান্ত।

মাধব এগিয়ে এসে হাবিব ভাইকে সিগারেট ধরিয়ে দিলেন। হাবিব মাধবের ভদ্রতায় মুগ্ধ হয়ে গেল।

তা মাধব; তুমি ইদানিং নতুন কিছু লিখছ নাকি?

কাল রাতে হাবিব ভাই আপনার জন্য তিনটা নতুন কবিতা লিখলাম।

তা কবিতার নাম কি দিয়েছ; হাবিব ভাইয়ের জন্য কবিতা?

উত্তরের অপেক্ষা না করে তিনি আবারও হো হো করে হাসছেন।

নাহ্ হাবিব ভাই। কবিতার নাম ‘কবি যা ভেবেছিল’। একটা শিরোনাম দিয়ে কবিতা তিনটির ১, ২, ৩ নাম্বার দিয়েছি। আপনি যদি চান পরের দুটি কবিতার নতুন নাম ঠিক করে দিবেন।

হাবিব এবার ঘনীভূত হলো।

এখনকার কবিদের কোনো কবিতা হয় না। প্রচুর কাটাকাটি করতে হবে। রেখে যাও। দেখি কিছু করতে পারি কিনা।

মাধব তার বুক পকেট থেকে কবিতা বের করে রাখল।

আপনি যদি অনল প্রবাহের এই সংখ্যায় একটু ছাপার ব্যবস্থা করে দেন। আপনার হাত ধরে কবিতা ছাপানো একটা বিশাল ঘটনা− হাবিব ভাই।

দেখি, তোমাদের জন্য কিছু করতে পারি নাকি।

আজ আমি তাহলে উঠি− হাবিব ভাই।

হুম্ যাও। ভালো কথা বৃষ্টির কারণে বাইরে বেরুতে পারব না। মোড়ের দোকান থেকে দুই প্যাকেট বিফ খিচুড়ি এনে দিয়ে যাও। টাকা এনে দিচ্ছি নিয়ে নাও।

এখন দিতে হবে না। টাকা কিছু আছে হাবিব ভাই। পরে দেখা হলে দিয়ে দিবেন।

আচ্ছা মাধব আমি এই সংখ্যাতেই তোমার জন্য কিছু একটা করে ফেলব। ভেবো না। ম্যানহোলে সাবধানে পা ফেলবে; কেমন।

গরম বিফ খিচুড়ির প্যাকেট বুঝিয়ে দিয়ে হাবিব ভাইকে মনে মনে পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত গালি দিয়ে মাধব বের হয়ে এল। আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালও।

আকাশ এখনো ঘন কালো। আবার মেঘ জমতে শুরু করেছে।

টাইমলাইন প্রেসের মালিক আহমেদ মাওলা মুখ গোমড়া করে বসে ছিলেন। তাঁর মন খারাপের অনেকগুলো কারণ ছিল। মাধবের আজ আসার কথা; এখনও দেখা নেই। মেশিনম্যান হাত পা গুটিয়ে বসে পাপড় ভাজা খাচ্ছে। তাছাড়া আকাশের অবস্থা এখন ভালো না। গুড় গুড় ডাকছে। শক্ত বৃষ্টি বাদলা হতে পারে। সেরকম হলে তাকে ফুলবানুর সাথে দেখা না করেই বাড়ি ফিরে যেতে হবে। বাড়িতে আজ কেউ নেই। এমনিতে ফুলবানু বাড়তি কোনো ঝামেলা করে না। কিন্তু বাড়িতে নিতে চাইলে বেঁকে বসবে। যাবে না। এই মেয়েটার এটাই একটা সমস্যা। কাস্টমার হচ্ছে ভগবান। ভগবানের ভালো মন্দ, সুবিধা অসুবিধা দেখবে; তা না! তার পরেও মেয়েটাকে মাওলা সাহেবের বড় ভালো লাগে। বড় ভালো মেয়ে!

সন্ধ্যা সময় সত্যি সত্যি বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মাধব প্রেসে এসে উপস্থিত।

মাধব এই প্রেসে পার্টটাইম প্রুফ দেখে। মাওলা সাহেবের কাজগুলো বলতে গেলে সে এমনিতেই করে দেয়। সাহেব চায়ের সাথে মাঝে মধ্যে ভালো মন্দ খাওয়ায়। এত আগ্রহ নিয়ে কাজ করার কারণ তিনি আশ্বাস দিয়েছেন মাধবের কবিতাগুলো তিনি তার প্রেসে ছাপানোর ব্যবস্থা নেবেন। অতি শীঘ্রই নেবেন। গত ছয়মাস হলো তিনি একই কথা বারবার বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন। মাধব দাঁতে দাঁত চেপে কাজ করে যায়। কি কবি; এগোচ্ছে কেমন। আজ রাতের মধ্যেই সব শেষ করে দিতে হবে। শেষ করতে না পারলে পার্টি সকালে এসে আমার টুটি চিপে ধরবে। কবি সাহিত্যিকদের তো সে টেনশান নেই। অন্য ভাবনাও নেই। ইচ্ছে হলো কবিতা লিখে; এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে বেড়াও। ইচ্ছে হলো না; দরজা জানালা বন্ধ করে নিজের মতো ঘুমাও। কবিরা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ।

বুঝলে মাধব; এইজন্যেই কবিদের অন্য সবার এত হিংসা। কবিরা এত আলাদা! অন্য কিছু না।

কাজ করতে করতে মাধব এক ফাঁকে তার কবিতার বই ছাপানোর কথা মনে করিয়ে দেয়। আহমেদ মাওলা ঝিম মেরে বসে থাকে। পা দোলায়। বলেছি তো করে দেবো। কবিতা লিখতে থাক; কবি। চিন্তা আমার। তোমার কবিতার বই হবে না। প্রথম ধাক্কাতেই সব কবিতা নিয়ে আস্ত একটা কবিতা সমগ্র করে দিব। এই তোরা কে আছিস কবি সাবরে চা দে। ভলিয়ম বাড়ায়ে চা দে। দুধ চিনি বেশি পড়লে কবিদের মাথা খোলে ভাল। তোমার জানার কথা অবশ্যি।

মাধব গভীর মনোযোগ দিয়ে প্রুফ দেখে। আর মনে মনে তার প্রথম কবিতা সংগ্রহের নাম খুঁজতে থাকে। তার বিষণœতা কেটে যায়। আহমেদ মাওলা বিষণ্ন চোখে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকে। সে প্রায়ই ভাবে তার বিশেষ সুখের দিনগুলোতেই কিছু না কিছু একটা ঝামেলা শুরু হবে। সেই দিনগুলো অন্যদিনের মতো হবে না। তবু সেদিনের ঝামেলাগুলো অন্যদিনের মতো অসহ্য মনে হবে না। এই বয়সেও আশু বুনো সুখের কথা ভেবে তার শরীরে কাঁপন ওঠে। তার মানব জনম সার্থক মনে হয়।

ফুলবানু মেয়েটা অসম্ভব মমতাময়ী। ছলাকলা জানে। ডাগর দুটো চোখ। শরীরের সাথে মেলালে বুকটা একটু যেন বেশি উঁচু। এত সুন্দর বুক শুধু কল্পনাতে ভাবা যায়। কবি সরবিন্দু দাশগুপ্ত কবিতায় এই রূপের বর্ণনায় দিয়েছিলেন: ভেজা চুলের পানি যখন তার স্তন যুগলে পড়ে তখন কী অপরূপ সৌন্দর্য যে খেলা করে! ঠিক যেন নতুন রাজকুমারের অভিষেক পর্ব। এই প্রথম মাধবের মনে হলো আহমেদ মাওলার পড়াশোনার পরিধি শুধু বিশালই নয়; কত গভীর। কবি মাধব কুমার সরবিন্দু দাশগুপ্তের কবিতার মাধুর্যে ভাসমান বরফ পিন্ডের মতো ধীরে ধীরে দ্রবীভূত হতে শুরু করলো। ফুলবানুর কবিতায় আজ কবি কালিদাস ও সরবিন্দু দাশগুপ্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

ফুলবানু সবসময় পরিপাটি থাকে। সেজেগুজে মাথায় সিঁদুর দিয়ে বসে থাকে। কি সুন্দর বেণি করা চুল! ভাবতে ভাবতে তার চোখ হঠাৎ আচ্ছন্ন হয়ে যায়। তিনি চোখ বন্ধ করেন। বুঝলে কবি; তোমায় একদিন ফুলবানুর কাছে নিয়ে যামুনে মিয়া। এই জিনিস এ জনমে দেখার কথা না। এরা হইল মিয়া হুর-পরি। এদের থাকনের কথা দলবেঁধে। এই মেয়েটা দলছুট। পরে পথ ভুলে স্বর্গ থেকে সরাসরি এই শহরে এসে পড়েছে। এদের কাছে মাঝে মধ্যে গেলে মাথা খুলব কবি। কবি হবা আর মজুমা বুঝবা না; তা কেন হবে। মন দিয়া কাজ কর। কবিতা লিখে যাও। এসবের ব্যবস্থা তোমার জন্য মিয়া; আমি নিজ হাতে করবও। এইসব নিয়ে কখনো ভাববা না।

তবু মাধব ফুলবানুকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে। সে আজ রাতে এই নিশিকন্যা নিয়ে একটা কবিতা লিখবে। মাধবের কবি হৃদয় আজ আনন্দে পরিপূর্ণ!

আজ মাসের ১৮ তারিখ। অনল প্রবাহের নতুন সংখ্যা বের হয়েছে। তার কবিতা ছাপার কথা। সে একটা সংখ্যা কিনে ফেলল। রাতে মেসে গিয়ে আরাম করে নিজের ছাপা কবিতা দেখা যাবে। এখনই এত তাড়াহুড়ার কিছু দেখি না।

অনল প্রবাহ হাতে নিয়ে আজ সে সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াল। তার হাঁটতে ভালো লাগছে। উদ্দেশ্যহীন হাঁটার যে এত সুখ সে আগে এভাবে বোঝেনি। হঠাৎ করেই তার এই বাউন্ডুলে জীবন বর্ণময় হয়ে উঠল। সে মনে মনে ভাবল বাহ্ জীবন তো আনন্দময়।

সন্ধ্যার পর মেসে গিয়ে মাধব হিম শীতল পানিতে গোসল করল। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে অনল প্রবাহ নিয়ে বসল।

হাবিব ভাই তার কবিতা ছাপেনি। একজন মানুষ কি করে এত অকৃতজ্ঞ হয় মাধব নিজে ভেবে পায় না। সে মনে মনে বলল, প্রিয় হাবিব ভাই আমি আপনার মার সাথে আদিম ক্রিয়া করি! এরপর সে অনল প্রবাহ ছুঁড়ে ফেলে কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। এখন সে শাঁখারি বাজারে হাবিব ভাইয়ের দরজায় কড়া নাড়বে। তিনি দরজা খুলবেন। মাধব কোন কথা না বলে তার বাম গালে পরপর তিনটা চড় মারবে। তারপর খুব শান্ত পায়ে মেসে চলে এসে হাতমুখ ধুয়ে রাতের খাবার খাবে। ফুলবানুকে নিয়ে কবিতার একটা খসড়া তৈরি করে ঘুমাতে যাবে।

মাধব সত্যি সত্যি শাঁখারি বাজার পর্যন্ত চলে এসেছে। এইতো সামনের গলিতেই হাবিব ভাইয়ের বাসা দেখা যায়। ঘটনা যে আজ ঘটবে এতে মাধবের নিজের কোন সন্দেহ রইল না। মূল দরজা খোলা। দেখা গেল হাবিবুর রহমান সরকার বাড়ির দরজায় বসে অঝোরে কাঁদছে। মাধবকে দেখে বহুদিন পর আপনজন দেখার মতো তার চোখ জংলা-পুকুরের জলের মতো টলটল করে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তের হাবিবকে দেখে, এতদিনপর আবার মাধবের; হারানো- বাবার ছবি হঠাৎ করেই যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। মায়ার এই পৃথিবীতে মাধবের মৃত বাবা আর বৃদ্ধ হাবিব একাকার হয়ে গেল। মাধব এগিয়ে গেল। কি হয়েছে হাবিব ভাই? মাধব তোমার ভাবি স্ট্রোক করেছে। তাকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিতে হবে। যেমন করে হোক, মাধব! তুমি তাকে বাঁচিয়ে দাও। আমার রাহেলাকে তুমি বাঁচিয়ে দাও মাধব! মাধব মনে মনে বলে, হাবিব ভাই; আমি অতি সাধারণ মাধব। প্রেরিত পুরুষের মতো এত ক্ষমতা দিয়ে আমাকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়নি।

হাবিব ভাই আপনি শান্ত হোন। রাহেলা ভাবির কিচ্ছু হবে না। আপনি বাসাতেই অপেক্ষা করেন। আমি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে এসে আপনাকে নিয়ে যাব। হাবিব মাধবের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটাকে তার নিজের অনেক কিছু বলার ছিল। সে সুযোগ কি এখন আর হবেÑ হয়তো কথাগুলি কোনদিন তাকে বলা হবে না। এখন মাধব চট্টোপাধ্যায়কে আর মানুষ বলে মনে হয় না! হাবিব মুখে কিছু বলে না। তাকে অপেক্ষা করতে হবে। আবারও অপেক্ষার দীর্ঘ দিবসÑ দীর্ঘ রজনী।

মাধব বৃদ্ধ রাহেলাকে দুহাতে তুলে ছুটতে শুরু করল। তাকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে। হাবিব কান্না থামিয়ে হঠাৎ স্বপ্নের ঘোরে মিশে গেল। সে যে দৃশ্য দেখেছে তা বাস্তবের দৃশ্য হবার কথা নয়।

গত সাড়ে তিন বছরে মাধবের অনেকগুলো কবিতা জমা হয়ে গেল। কিছু কবিতা ছাপা হতে লাগল। বেশির ভাগ কবিতাই দুর্বোধ্য। আহমেদ মাওলা দেশের নাম-করা এক প্রকাশনা সংস্থা থেকে কবিতার বই প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন। কবিতা বাছাই করা শুরু করেছে অনির্বাণ দেব। প্রুফ রিডার ইব্রাহিম হাওলাদার; কবি মাধব চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার প্রুফ দেখল। সত্তর বছরের ইব্রাহিমের কাছে শ তিনেক কবিতা জমা দেওয়া ছিল। বেশির ভাগ কবিতা মৃত্যু বিষয়ক। কিছু আছে মরমি ও সুফিবাদের কবিতা। মাধবের বেশির ভাগ কবিতার পান্ডুলিপি জমা থাকে সেই প্রুফরিডার ইব্রাহিমের কাছে। পৃথিবী বড়ই রহস্যময়। বৃদ্ধ প্রুফরিডার কেন মাধব চট্টোপাধ্যায়কে এত মায়া করে তার কোনো মীমাংসা মাধব করতে পারেনি। মাধবের কাছে জগতের অমীমাংসিত রহস্যের সংখ্যা ধীরে ধীরে শুধু বাড়তে থাকে।

কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ করার জন্য পান্ডুলিপি পাঠানো হয়েছে শিবাজির কাছে। শিবাজি সব বইয়ের প্রচ্ছদ করে না। অনেক বইয়ের প্রচ্ছদ মাসের পর মাস আটকে থাকে। এ ব্যাপারে তাকে চাপ দেওয়ার সাহস কারো নেই। সিজনের সময় কথাবার্তা নেই শিল্পী উধাও। সপ্তাহ খানেক পরে লামার গহিন জঙ্গলে তার চলাফেরা লোকেট করা গেল। পরদিন ঢাকায় ফিরে কিছুই হয়নি এমনভাব করে শিবাজি আবার নিজের জগতে ডুবে গেল। শিবাজির গল্প তো জানা গল্প।

মাধব পান্ডুলিপির পাশাপাশি শিল্পী শিবাজি ভট্টাচার্যকে এক দীর্ঘ চিঠি লিখে ফেলে। তাঁর মতো কিংবদন্তি শিল্পী এক অচেনা দরিদ্র কবির চিঠি পড়বে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। না পড়লেও অসুবিধা কিছু নেই। শিবাজি কেবল কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ করে দিলেই তো সব পাওয়া হয়ে যায়।

শিবাজি ফোন ব্যবহার করে না। তার ফোন সবসময় অফ মুডে থাকে। কেবলমাত্র তিনি নিজে কথা বলতে চাইলে ফোন খুলে সবুজ ডায়াল বাটন চাপেন। একসময় কথাবর্তা শেষ হয়। সাথে সাথে ফোনের সুইচও অফ হয়।

একদিন রাত্রিবেলা আটচল্লিশ পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ কবিতা শিবাজি পড়ে ফেলে। কবিতার নাম- হঠাৎ মৃত। কবির নাম শ্রী মাধব কুমার চট্টোপাধ্যায়। হঠাৎ মৃত কবিতা পড়ার পর থেকেই তার মধ্যে একধরনের অস্থিরতা শুরু হলো। একজীবনে অনেক বারই তার আত্মহত্যা করার কথা মনে হয়েছে। চারতলার ছাদে খুব স্বাভাবিকভাবে সে হাঁটছে। পাশে কেউ নেই। সন্ধ্যা নেমে আসছে। আর তখনই তার ছাদ থেকে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। ঠিক অন্ধ বাদুড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়া।

আজ আবারও কবির কবিতা পড়ে শিবাজির মন বিষণœ হলো। পুরোনো ব্যথা মাথা চাড়া দিল। একা রুমের মধ্যে শিবাজি চিৎকার করতে লাগল। গতকাল সে ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। পরদিন সকাল সাড়ে এগারটায় তার ঘুম ভাঙল। সে স্বাভাবিক হয়ে প্রতিদিনের মতো কাজে চলে গেল। এই হলো শিবাজির প্রথম মাধব দর্শন। সে ঠিক করে আজ বুধবার রাতে হঠাৎ মৃত কবিতা আবারো পড়বে এবং মাতাল হবে। অনেক কবি কবিতা দিয়ে পাঠকদের মাতাল করে। শুধু একজন কবি কবিতা দিয়ে অন্য সবাইকে মাতাল করেছিল; একই সাথে নিজের লেখা কবিতায় স্বয়ং নিজে মাতাল হয়ে পড়েছিল। মানুষের জীবন ছেড়ে ছুঁড়ে পথহারা বুনো ফড়িং এর জীবন যাপন করেছিল; সেই কবি। মাধব কি তবে সেই গোত্রের কেউ নাকি!

পৃথিবী বড় রহস্যময়। স্বর্গ ও পৃথিবীতে অনেক প্রশ্ন আছে যার কোনো উত্তর নেই। থাক না কিছু রহস্যময়তা। থাক্ না কিছু সুইসাইডাল মাতাল কবিতা।

শিবাজির কাছে এরপর কবি মাধব কুমার চট্টোপাধ্যায় রচিত একের পর এক কবিতার পান্ডুলিপি আসতে থাকে। শিবাজি পরম মমতায় কবির মাতাল সেইসব কবিতার প্রচ্ছদ আঁকতে থাকে। যে-শিল্পী বিশ হাজার বইয়ের প্রচ্ছদ করছে সেই শিল্পীর কাছে এক নামগোত্রহীন অপরিচিত কবির আলাদা হওয়া রীতিমত অসম্ভব। বিস্ময়কর ঘটনা। জীবনবাবুকে আঁকড়ে ধরে যাদের পথচলা তারা অন্য কোনো কবির কবিতায় সহজে দ্রবীভূত হয় না; হবার কথাও না। তবে মাধব কি তার কবিতায় জীবনবাবুর মতো মাদকতা ছড়িয়ে ছিল! তার কবিতা কি জীবনবাবুর মতো মাতাল অনুভূতি ধারণ করে চলে। মাধব কুমারের ‘হঠাৎ মৃত’ পড়ে রেলিং বিহীন ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার যেহেতু অদ্ভুত অনুভূতি হয়, সেহেতু কবির কবিতায় মাতাল হওয়া নেশা জাতীয় অন্য কিছু তো আছে। অবশ্যই আছে। হোক না সে নিষিদ্ধ শুকনো কোন ফুল কিংবা ৮ নম্বর বাগানের সুরার নহর!

আজ শিবাজির জানতে ইচ্ছে হলো; মাতাল কবিতার সেই কবিরও কি ‘হঠাৎ মৃত’ লিখার পর জন্মান্ধ বাদুড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে হয়েছিল। কখনও কি হয়েছিল। নাকি এখনও শিবাজির মতো ইচ্ছে হয়। শিবাজি প্রায়ই ভাবে কবির সাথে কথা বলা দরকার। এক সন্ধ্যায় দুজন একসাথে ঝাঁপাতে পারলে কেমন হয়। বেশ ভালো হয়!

আজ বুধবার। শিবাজি আজ ঘোষণা দিল; আজ শুধু সে কবি মাধব চট্টোপাধ্যায়-এর প্রচ্ছদ করবে। অন্য কারও নয়। সারা দিনে কবির পনেরটি নতুন বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরি হলো। শিবাজির বুঝি অদৃশ্য এক দায়মুক্তি ঘটল। কাজ শেষে− টাইম লাইন প্রেসের প্রুফ রিডার ইব্রাহিম হাওলাদারকে শিবাজি তার নতুন কাজ দেখতে দিল। এমনিতে শিবাজি কখনও তার কাজ অন্য কাউকে ডেকে নিয়ে দেখায় না।

বুড়ো ইব্রাহিম কাজগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল কিন্তু বিশেষ কিছু বলল না। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। সবগুলোই কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ। শিবাজি আজ মাতাল কবিতার কবির ফোন নাম্বার নিল। যদি কখনও কথা বলতে ইচ্ছে হয়। এরপর শিবাজি তার ভাবের জগতে ডুবে গেল। বুধবার রাত এগারটায় শিবাজির ফোন ওপেন হলো। নাম্বার টিপে ডায়াল করা হলো। কবির সাথে কথা শুরু হলো।

আমি শিবাজি। শিবাজি ভট্টাচার্য।

আজ আপনার বইয়ের প্রচ্ছদ করলাম। প্রচ্ছদ গুলো টাইম লাইনের প্রেসে আছে। এসে দেখে যেতে পারেন। অনেকদিন পর মাধব; আপনার কাজগুলো আবেগ নিয়ে করলাম। শেষ করে বেশ রিলিফ পেলাম। মাথাভর্তি জমাটবাঁধা পাথর ছিল। আজ সব নেমে গেল। নামগোত্রহীন কবি শ্রীমাধব কুমার চট্টোপাধ্যায় বাকরুদ্ধ!

সে এতক্ষণ কোন কথাই বলল না। আসলে বলতে পারল না। শিবাজির মতো কিংবদন্তির ফোন কল পাওয়া জীবনের দুর্লভ স্মৃতি। ৩০ জুন ২০১০ ইং বুধবার। কবির জীবনে আজ রেড লেটার ডে।

মাধব; একদিন সন্ধ্যায় চলে আসেন বাসায়। চা খেতে খেতে কবিতা ও ছবি নিয়ে কিছুক্ষণ গল্প করা যাবে।

মাধব ফোন রেখে হাফ ছেড়ে বাঁচল। তারপর সেদিন কবি বেশ কিছুক্ষণ কেঁদেছিল। তার মতো অন্য কবিদেরও কী সময়ে অসময়ে আনন্দ বেদনায় দু চোখে শ্রাবণ নামে। মাধবের খুব ভাবনা হয়। কবিতা পড়লে কবিদের এত আপন কেন মনে হয় তা মাধব জানে না। বুকটা শুধু হাহাকার করে। আহা রে কবিদের জীবন!

এরপর বহু বছর বুধবার পড়ন্ত বিকেলে শিবাজির সাথে কবির দেখা হতো। মুখোমুখি বসে কথা হতে লাগল। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। নির্জন শিল্পী এক এক করে তার জীবনের গল্প শোনায়। বলতে শুরু করে তাঁর হাজারো কিংবদন্তি প্রচ্ছদ কাহিনি। তাঁর প্রগাঢ় অনুভূতি ও বিশ্বাস- অবিশ্বাসের বড় গল্প।

মাধব নিশ্চুপ শুনে গেল। কবির যেন মৌনব্রত চলছে। শিবাজি একসময় কবির হাতে গরম চায়ের পেয়ালা তুলে দিলো। ধীরে ধীরে সুরা পাত্র থেকে অমৃত সুরা।

এক হাতে সুরা পাত্র অন্য হাতে নতুন কবিতা। জালালউদ্দিন রুমির কবিতার আসর। জিবরান, ওমর খৈয়াম, গুরুদেব কিংবা জীবনবাবুর আত্মা একে একে ভর করে প্রতি বুধসন্ধ্যায়। তখন এলোমেলো রুমটাকে আর পৃথিবীর অংশ বলে মনে হয় না। নিজেদেরকেও পৃথিবীর কেউ মনে হয়নি। মহাকালের অংশ ছিল সেইসব দিনরাত্রি।

তারপর ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে। শিবাজির বন্ধুর দল হানা দেয়। মাধব নিশ্চুপ বেরিয়ে চলে যায়। হঠাৎ ক্রান্তিকালে অল্প কিছুদিন বন্ধুহীন হয়ে পড়ে শিবাজি। সে সময় মাধব শিবাজির ডার্করুমে শঙ্খমালা ও আট বছর আগের একদিন কবিতা দুটি আবৃত্তি করে চলে।

অমাবশ্যা কেটে যায়। আবার হাজারটা বন্ধুতে ঘিরে থাকে শিবাজি ভট্টাচাযর্কে। দূরে সরে যায় মাধব চট্টোপাধ্যায়। শিবাজির শুধু কবির শেষ কথাই কানে বাজে বার বার। দাদা; আমি আত্মহত্যা থেকে বাঁচতে শুধু কবিতা লিখি। প্রাণপণে লিখে যাই। কবিতা যেন শেষ জীবনীশক্তি। এখনও কবিতা ভালোভাবেই আমার গ্রিপে। মনে হয় কোনো একদিন সে আর কবির গ্রিপে থাকবে না। সেদিন দেখা গেল জন্মান্ধ পাখির মতো কবিকে শূন্য থেকে ঝাঁপাতে হলো।

আজ বুধবার। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। কার্তিকের বুধসন্ধ্যা। মাতাল কবিতার কবি শ্রী মাধব কুমার চট্টোপাধ্যায় আজও আসেনি। শিবাজি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার হাতের ডান পাশের জানালা খোলা। শীতের পড়ন্ত বিকেলে রোদ এসে পড়েছে মেঝেতে। ঠিক যেখানটায় মাতাল কবি বসতো। বহু সপ্তাহ হলো মাধব আসে না। আজকের মতো এত সুন্দর রোদও অনেকদিন ঘরের ভিতরে আসেনি। তবে মাতাল কবি কি আজ হেমন্তের কমলা রোদ হয়ে ফিরল নাকি!

সামনে ওয়াইন, টাকিলা, ভদকা আর কিছু বিয়ারের ক্যান থরে থরে সাজানো। যেন শিবাজি বার। নির্জন ঘরে দুটি শূন্য গ্লাস। মাতাল কবির ‘শূন্য দুটি গ্লাস’ নামে চমৎকার একটা কবিতাও আছে। একদিন তার চারটে লাইন সে শুনিয়েছিল।

শিবাজি ওয়াইনের বোতল হাতে নিয়েছে। শূন্য গ্লাস দুটিতে এক সময় ওয়াইন ঢালা হলো। শিবাজি একটি গ্লাস ডানপাশে এগিয়ে রাখে। অন্যটি তার হাতের কাছে। অনেকদিন পর তার মাথার যন্ত্রণা আবার ফিরে এসেছে। মাথা ভোঁতা লাগছে। পুরোনো অসুখ মাথা চাড়া দিয়েছে। কলকির ধোঁয়ায় পুরো ঘর আছন্ন। মেঝেতে বিভিন্ন রঙ এলোমেলো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। শ্রী শিবাজি ভট্টাচার্য তার সাদা ক্যানভাসে রঙের খেলা খেলতে শুরু করে। প্রথমে হলুদ রঙে পুরো ক্যানভাস ভরে গেল। তারপর কমলা সুন্দর। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যানভাস রক্তপলাশে মাখামাখি হয়ে গেল। শিবাজি আজ তার ক্যানভাস জুড়ে মাতাল কবিকে খুঁজে ফেরে। একের পর এক ওয়াইনের ঠান্ডা গ্লাস ভর্তি হতে থাকে। শিবাজি ডানে থাকা ওয়াইনের ভর্তি গ্লাসের দিকে একবার ফিরে তাকাল। বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। শিবাজি ছবি আঁকছে। আজ নিজের হাতে রঙ মাখিয়ে শিবাজি খালি হাতেই শূন্য ক্যানভাস ভরে তুলছে। মাতাল কবির ওয়াইনের চারদিক সিক্ত হয়ে শিশিরের মতো জমেছে। ধীরে ধীরে কমলা আলো দূরে সরে যাচ্ছে।

শিবাজির ডার্করুমে সন্ধ্যায় আলো জ্বালানোর বিধান নেই। ক্রমেই অন্ধকার যেন সেই মাতাল ওয়াইন গিলে খেয়ে ফেলে। শিল্পী তা দেখে আপন মনে আঁকছে। মাতাল কবির বোতল দেখে তার প্রতিকৃতি! এ তো আর্টের সুররিয়ালিজম। কবির চেনা চোখদুটো ক্যানভাসে চলে এসেছে!

সন্ধ্যা দ্রুত ঘনিয়ে আসে। শিবাজি আজও মাতাল পেইন্টিং শেষ করতে পারেনি। মাধব তার মাতাল কবিতা শেষ না করে চলে গিয়েছে। কবি কি জানে না; কবিদের কবিতা শেষ না করে কখনো হারিয়ে যেতে নেই।

শ্রী মাধব কুমার চট্টোপাধ্যায়কে কেন একগাদা অপ্রকাশিত কবিতার পান্ডুলিপি ফেলে এভাবে হঠাৎ করে নিখোঁজ হতে হবে। শিবাজি কিছুতেই ভেবে পায় না।

শিবাজি একাকি প্রায়ই ভাবে। মাঝে মাঝে অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি নেড়ে চেড়ে দেখে। ঐ মাতাল কবি কি জানে তার কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ গুলো শিবাজি কতটুকু আবেগ নিয়ে করেছে। তাকে কি কখনও জানানো সম্ভব হবে।

বিষণœ শিবাজির সেই ক্যানভাসে এখন পথহারা বুনো রঙের মাখামাখি। তারপর বহু শীতকাল যায়। শিবাজির অসমাপ্ত ক্যানভাস আর সমাপ্ত হয়নি। আজও প্রতি বুধবার সন্ধ্যায় সেই ছবি আর ওয়াইনের বোতল নিয়ে নিঃসঙ্গ শিবাজি কিছুক্ষণ বসে। হয়তো মাতাল কবির আবারও ফিরে আসার প্রতীক্ষা।

কিংবদন্তি শিল্পী; কবির এই অসমাপ্ত ছবি নিয়ে প্রায়ই ভাবে। তাঁর জীবনের সব ছবি যে শেষ করতে হবে এমনটা ভাবার কিছু নেই। ছবি আঁকা শেষ হলেই তো ছবির মৃত্যু। মাতাল কবির ছবিটি এখনও অসমাপ্ত বলেই ছবি এত জীবন্ত। কবির সাথে কথা বলা যায়। কঠিন ব্যক্তিগত বোঝাপড়া হয়। শিবাজির মাথাটা আবার একসময় এলোমেলো হয়ে যায়। তাঁকে এখন নিয়ম করে সাইকোথেরাপি নিতে হয়। প্রতি সপ্তাহে একবার। শিবাজির শূন্য ওয়াইন গ্লাস আর তার অসমাপ্ত ছবির গল্প এভাবেই পাশাপাশি হাত ধরে চলতে থাকে। মাতাল কবির হিম ওয়াইনের আর্দ্রতা শিবাজির বিষণœ চোখে কখনও ভর করেছিল কিনা তা জানা যায়নি।

আজও দেবীপ্রসাদ চট্ট্যোপাধ্যায়ের গল্পের মতো এ গল্পেরও শেষ হয়নি। সব গল্পের যে শেষ হবে এমন না। তবে বুধসন্ধ্যা শেষ হয়। এক সময় রাত গভীর হয়। কিংবদন্তি আর্টিস্ট শিবাজির বন্ধুর দল একে একে আসতে থাকে। চারদিক কোলাহলে ভরে যায়। শিবাজি তখন মাতাল কবিকে ভুলে ডুবে যায় নিজের আপন ভুবনে। হয়তো অপেক্ষা পরের বুধসন্ধ্যার। ভাবি পরের সন্ধ্যায় মাতাল কবি নতুন কবিতা নিয়ে ঠিক ঠিক ফিরে আসবে। বুধবারের জন্য শিবাজি আবারও ওয়াইনের বোতল আলাদা করে রাখে।

শিবাজির বন্ধুমহল উদ্বিগ্ন। কিছুদিন হলো সম্পূর্ণ অজানা কারণে প্রতি বুধসন্ধ্যায় শিবাজির বাসায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। তখন সবার প্রবেশ নিষেধ। শ্রী শিবাজি ভট্টাচার্যকে তখন কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

শিবাজির একটা করে শীতকাল যায়; আশ্চর্য সন্ধ্যা একটাও আর যায় না। শিবাজি মাতাল হয়ে অপেক্ষা করে। যেকোনো মুহূর্তে মাতাল কবি ফিরে আসবে। অপেক্ষা। কেন জানি এখন অপেক্ষা করতে তাঁর বড় ভালো লাগে।

লেখক : কবি ও সাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares