রক্তপাতের মৌসুমে জনৈক বাউল : স্বকৃত নোমান

গল্প

রক্তপাতের মৌসুমে জনৈক বাউল

স্বকৃত নোমান

চৈত্রের হাওয়া-ওড়া একতপ্ত দুপুরে লোকটির সঙ্গে ওমর তাজেলের প্রথম দেখা হয় পদ্মার দ্বীপচর ভেওলার কাফেনশাহর মাজারে। বহু বছর আগে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত অজ্ঞাতনামা এক যুবককে চর ভেওলাবাসী পদ্মাতীরের যে কাশবনে মাটিচাপা দিয়েছিল সেখানেই এখন কাফেনশাহর মাজার। কাফেনশাহ নামে পৃথিবীতে কেউ ছিল কিনা, থাকলেও সে এই পদ্মার চরে এসেছিল কিনা, এলেও মরার পর তার লাশটি পদ্মাতীরের এই কাশবনে দাফন করা হয়েছিল কিনা, তার কোনো পাত্তা নেই। সাত-আট বছর আগের কথা, কাশবনে তখন আর কাশ নেই, ডুমুর কড়ই শিমুল আর নানা আগাছার ঘন জঙ্গল। চর ভেওলার মুহুরিবাড়ির ছোটমিয়া একদিন সেই বনে গোলাইল দিয়ে বক শিকারে গেলে হঠাৎ তার দৃষ্টি যায় একটা গর্তের দিকে। গর্তের চারদিকটা শুকনো লতাপাতায় ঢাকা। ছোটমিয়া ভাবল সাপখোপ ইঁদুর বা শিয়ালের গর্ত বুঝি। কাছে গিয়ে দেখে আস্ত একটা কবর। ছাদের মাটি ধসে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ভয়ে তার গা ছম ছম করে। এই জঙ্গলে কাউকে কোনোদিন কবর দেওয়া হয়েছে তার মনে পড়ে না। তার কালে তো নয়ই, তার বাপ-দাদার কালেও এখানে কবর ছিল না, এখন তবে এল কোথা থেকে! শুধু কবর নয়, ছোটমিয়া ভালো করে ঠাওর করে দেখে, গর্তের ভেতরে কাফনের কাপড়ের মতো ধবধবে সাদা কী একটা জিনিস। সাপের ছোলম বুঝি! কিন্তু সাপের ছোলম তো এত চওড়া হওয়ার কথা নয়।

বক শিকারের কথা ভুলে লুঙ্গিতে কাছা মেরে ছোটমিয়া বাড়ির দিকে ছুট দেয়। তখন দুপুর। ভাদ্রের গনগনে সূর্য মাথার ওপর। পুরুষেরা ক্ষেতে-খামারে আর মহিলারা রসুইঘরে। ছোটমিয়ার হাঁকডাকে কাজকর্ম ফেলে মহুরিবাড়ির পুকুরঘাটে জড়ো হয় একদল মানুষ। হাঁফাতে হাঁফাতে ছোটমিয়া জঙ্গলে আজগুবি কবরটার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়। উৎসুক জনতা আর কি দেরি করে? সবাইকে নিয়ে ছোটমিয়া আবার ছুটে যায় জঙ্গলে। লতাপাতার জঞ্জাল সাফ করে দেখে সত্যি সত্যি একখানা কবর। মাটি ধসে সৃষ্টি হওয়া গর্ত দিয়ে দেখা যাচ্ছে ধবধবে সাদা কাফন। ভাঁজ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কাফনের ভেতরে মানুষের দুটি পা। উপস্থিত জনতার কলিজায় কি আর পানি থাকে! বিড়বিড় করে সবাই দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করে। এই ঘোর জঙ্গলে কবর এল কোত্থেকে ভেবে পায় না তারা। ভিনগ্রামের কেউ কাউকে খুন করে গোপনে এখানে দাফন করেনি তো? বহু বছর আগে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত অজ্ঞাতনামা একটি মানুষকে এখানে মাটিচাপা দেওয়ার কথা এতদিনে সবাই ভুলে গেছে। ছোটমিয়ার মনে পড়ে হঠাৎ। দুই হাত তুলে সে বিহ্বল কণ্ঠে বলে, বুঝেছি, নিশ্চয়ই সেই ডাকাতটার কবর। কিন্তু পরক্ষণে তার মনে পড়ে, মাটিচাপা দেওয়ার সময় ডাকাতটাকে তো কাফন পরানো হয়নি। না, এটি তার কবর হতে পারে না। গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ লোকটি বলে, এমনও তো হতে পারে, যেদিন গণপিটুনিতে নিহত লোকটিকে মাটিচাপা দেওয়া হয় সেদিন রাতে গ্রামের কেউ সওয়াবের আশায় মাটি খুঁড়ে তার লাশ বের করে কাফন পরিয়ে দিয়েছে। লোকজন মাথা দোলায়, হ্যাঁ, হতেও পারে, বিচিত্র কিছু নয়। কিন্তু ছোটমিয়া মানতে নারাজ। কাফন না হয় কেউ পরিয়ে দিল, কিন্তু লোকটাকে মাটিচাপা দেওয়া হয় সেই কত বছর আগে, এতদিন কি কবরে কোনো লাশ অক্ষত থাকে?

ছোটমিয়ার যুক্তির কাছে সবাইকে হেরে যেতে হয়। বটে, এতদিন তো লাশ অক্ষত থাকার কথা নয়। সাদা কাপড়টা সরালেই চামড়ার পা দুটি স্পষ্ট দেখা যাবে। আদনা কোনো মানুষের নয়, এটি নিশ্চয়ই কোনো পির-আউলিয়ার কবর। এই বঙ্গভূমি তো পির-আউলিয়ার দেশ। আরব মুলুক থেকে কত পির কত আউলিয়া এ দেশে এসেছে তার তো কোনো শুমার নেই। কে জানে কোন দেশের আল্লার কোন পেয়ারা বান্দা এখানে শুয়ে আছে! পির-আউলিয়াদের তো মৃত্যু নেই। কবরে তাদের দেহ পচে না, মাটির ক্ষমতা নেই তাদের দেহ নষ্ট করে, কেয়ামততক অক্ষত থাকে। কে জানে কী নাম এই পীরের। যে নামই হোক, যেহেতু পির-আউলিয়া, সেহেতু তার কবর রক্ষা করা প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের ইমানি দায়িত্ব।

আর কি, গোটা গ্রাম ভেঙে পড়ল আজগুবি কবরটা দেখতে। হেঁদিপেদি আণ্ডাবাচ্চারা তো বটেই, পর্দানশীন জেনানারাও না এসে পারে না। বাতাসে সওয়ার হয়ে খবর চলে যায় উত্তরে দক্ষিণে পুবে পশ্চিমে। মধুর আশায় বাগানে যেমন ঝাঁকে ঝাঁকে মধুপ আসে তেমনি মানুষ আসতে থাকে দলে দলে। ওয়াহাবি সুন্নি ব্রাহ্মণ শূদ্র বাউল ফকির সাধু সন্ন্যাসি কেউ বাদ থাকে না। সবার হাতে হাতে মোমবাতি আগরবাতি আর গোলাপজল। কেউবা পাতিল ভরে শিরনিও নিয়ে আসে। দুদিন পর শরিয়তপুর থেকে আসা জটাধারী এক ফকির অজ্ঞাতনামা পীরের কবর জিয়ারতে আসা লোকজনদের কাছে বলে বেড়ায় যে, এ কবর নিশ্চয়ই কাফেনশাহর। ফকির নাকি তার দাদার মুখে শুনেছে, বড় কামেল পির ছিলেন হযরত কাফেনশাহ। অর্ধেক জীবন কাটিয়ে দেন দিল্লির নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজারে। হামেশা কাফনের কাপড় পরে থাকতেন। কেননা মৃত্যু তো মানুষের ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে, যে-কোনো মুহূর্তেই গলাটা চেপে ধরতে পারে, সে কারণেই মৃত্যুর জন্য তিনি সদা প্রস্তুত থাকতেন। বয়স চল্লিশ থেকেই গেরুয়া লুঙ্গি-ফতুয়া ছেড়ে কাপনের কাপড় পরা ধরেন। শেষ বয়সে দিল্লি থেকে জন্মভূমি শরিয়তপুর ফিরে যখন চিশতিয়া তরিকার প্রচার শুরু করলেন, হাজি শরিয়তউল্লাহর শিষ্যরা তাকে মারধর করে গ্রামছাড়া করে। কে জানত, এই চর ভেওলার মাটি দিয়েই সৃজন হয়েছিল তার পাক বদন। নইলে দুনিয়ার এত জায়গা থাকতে এই পদ্মার চরে এসে মরবেন কেন? এখানেই বা তার দাফন হবে কেন? কত বছর হলো মরেছে, খোদার কী লীলাখেলা, অথচ এখনও কাফনের কাপড়টি তো নয়ই, শরীরখানাও পচেনি। একেই বলে কামেল পীরের কেরামতি। আল্লাহ মেহেরবান!

চর ভেওলার মানুষ তো এমনিতেই পির-দরবেশের ভক্ত, বছরে দুবার বড় বড় নৌকা ভাড়া করে পদ্মা পাড়ি দিয়ে চলে যায় হযরত শাহ মাখদুম আর শাহ ফরিদের মাজারে, তারা কি আর কাফেনশাহর কবরের কথা অবিশ্বাস করে? অবিশ্বাস কি করা যায়? হতেও তো পারে। অতীতে কি হয়নি? হযরত শাহজালালের মোকাম কোথায় ছিল? অথচ তার মাজার কোথায়? বদরপীরের নিবাস কোথায় ছিল? অথচ তার দরগাহ কোথায়? অতএব এই অক্ষত লাশ নিশ্চয়ই কাফেনশাহর। কাফেনশাহর না হোক, কোনো না কোনো পির-আউলিয়ার যে হবে, তাতে অবিশ্বাস করা চলে না।

আর কি দেরি করা যায়? গ্রামবাসী লেগে গেল জঙ্গল পরিষ্কারের কাজে। কথিত কাফেনশাহর কবরের আশপাশের গাছগাছড়া কেটে জায়গাটা ফাঁকা করে কবরের ওপর দাঁড় করিয়ে দিল বাঁশ আর শনের একটা দোচালা। বছর না গড়াতেই শন পচে নষ্ট হয়ে গেলে ছোটমিয়া ইউপি চেয়ারম্যানকে ধরে চার বান টিনের ব্যবস্থা করে দেয়। সেই ঘরে এখন একজন খাদেম থাকে, রোজ সন্ধ্যায় মোম জ্বলে, আগরবাতির গন্ধে সারা ঘর মৌ মৌ করে, প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে জিয়ারতে আসে মানুষ, প্রতি পূর্ণিমারাতে আসে বাউল-ফকিরেরা, রাতভর চলে গানের আসর। গায় লালনের, হাছনের আর মুর্শিদি গান।

পির-দরবেশের মাজারে ভক্তি রাখেন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ওমর তাজেল। ভক্তি আগে ছিল না। তার বাবা ছিলেন ওয়াহাবি তরিকার মানুষ। শেষ বয়সে তাবলিগে চিল্লার পর চিল্লা লাগাত। তার বিশ্বাসও ছিল বাবার তরিকায়। কিন্তু যতই দিন গড়িয়েছে ততই টলে গেছে সেই বিশ্বাস। বিশেষ করে দেশে যখন জঙ্গিবাদের ভয়াবহ উত্থান ঘটে, শায়খ রহমান ও বাংলাভাইর নেতৃত্বে সারাদেশে যখন সিরিজ বোমা হামলা হয়, তিনি খুঁজতে শুরু করেন এই গুরুতর সমস্যার সমাধানের পথ। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগ আন্দোলনের পর সারাদেশে যখন ব্লগার লেখক ইমাম পুরোহিত আর বাউল-ফকির হত্যাকা- শুরু হয়, চাপাতির আতঙ্কে খোদ র‌্যাব-পুলিশও যখন তটস্থ, একদিন তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক জরুরি সভায় স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, এ দেশ পির-দরবেশের দেশ। তরবারির মাধ্যমে নয়, এদেশে ইসলাম কায়েম হয়েছিল সুফিদের প্রেমের ফল্গুধারার মাধ্যমে। এই তের শত নদীর দেশের ইসলাম হচ্ছে সমন্বয়বাদী, উদার ও মানবিক। এই ইসলাম কোনো কট্টরপন্থাকে সমর্থন করে না। ক্রসফায়ারে দিয়ে জঙ্গিদের সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখা যাবে, কিন্তু সমূলে উৎপাটন করা যাবে না। জঙ্গিবাদের বীজ সমূলে উৎপাটনের জন্য জাগিয়ে দিতে হবে মরমিবাদকে, বাংলার উদার সমন্বয়বাদী সহজিয়া ইসলামের সিলসিলাকে। পির-দরবেশদের মাজার হচ্ছে বহুত্ববাদ চর্চার কেন্দ্র। সর্বমানবের সম্মিলন ঘটে এসব মাজারে। নারী নয়, পুরুষ নয়, হিন্দু নয়, মুসলিম নয়, বৌদ্ধ নয়, খ্রিষ্টান নয়; সব লিঙ্গের, সব ধর্মের মানুষের জন্য মাজারের দরজা সবসময় খোলা। যতদিন পির-আউলিয়াদের মাজার থাকবে ততদিন এদেশ আফগানিস্তান-পাকিস্তানের মতো জঙ্গিদের আখড়া হবে না। দেশে যত পির-দরবেশের মাজার আছে-শাহজালাল, শাহপরান, খানজাহান, মাইজভাণ্ডারি, আটরশি, সুরেশ্বরী, চন্দ্রপুরি, খাজাবাবা, জিন্দাবাবা, নেংটাবাবা-যত বাবা, মামা আর শাহর মাজার আছে সব মাজারের পরিচালনা কমিটির সঙ্গে বসতে হবে, সরকারিভাবে তাদের সহায়তা করতে হবে এবং জঙ্গিবাদ দমনে চাইতে হবে তাদের সহায়তা। দেখবেন, জঙ্গিদের তারা পেঁদিয়ে পগার পার করে দেবে। তখন আর র‌্যাব-পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের দরকার হবে না।

ওমর তাজেল নিজে নামাজ পড়েন না, দুই ঈদ ছাড়া মসজিদেও যান না, মাজারে এসে জেয়ারতও করেন না, তবু তার ইচ্ছা, রিটায়ারের পর ঘরে বসে না থেকে দেশের আনাচে-কানাচে ছোট-বড় যত মাজার আছে সব কটি তিনি ঘুরে দেখবেন এবং ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করবেন মাজারসংস্কৃতি নিয়ে একটি বই। নামও ঠিক করে রেখেছেন, ‘বাংলার পির-দরবেশ ও মাজার সংস্কৃতি।’ মূলত এ কাজেই তার কাফেনশাহার মাজারে যাওয়া।

লোকটি সেদিন কাফেনশাহর মাজারের সামনে জারুল গাছটার বেদিতে বসে একতারা বাজিয়ে লালনের গান গাইছিল : ‘ক্ষ্যাপা তুই না জেনে তোর আপন খবর যাবি কোথায়/ আপন ঘর না বুঝে বাহিরে খুঁজে পড়বি ধাঁধায়।’ ওমর তাজেল তো লালনসংগীতের চিরকালের ভক্ত। রোজ ঘুম থেকে উঠে ল্যাপটপটা ওপেন করে বাজিয়ে দেন রবীন্দ্রনাথ ও লালনের গান। তার শখের আইফোন-১০ মোবাইলটিতে নানা শিল্পীর গাওয়া লালন-রবীন্দ্রনাথের কত গান যে আছে তার হিসাব নেই। সুযোগ পেলেই হেডফোনটি কানে লাগিয়ে গান চালিয়ে দেন। গান শেষ করে লোকটি শুরু করে ভেদকথা। শ্রোতাদের উদ্দেশে বলে যে, গান গাওয়াই তার পেশা। কুড়ি বছর বৃন্দাবনে ছিল, সেখানে গান গেয়েই রোজগার করত। সাত বছর ধরে দেশে। থাকে ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়ায়। হাতে টাকা-পয়সা এলে ঘুরে বেড়ায় মাজারে আর মেলায়। পরনে গেরুয়া ফতুয়া-লুঙ্গি, গলায় একতারা ঝোলানো। মাথায় জটা চুল, মুখে কাশের মতো সাদা লম্বা দাঁড়িগোঁফ, মুখখানা তামাটে, তার উপর সারামুখে গুটিবসন্তের দাগ, কপালে পদ্মার ঢেউয়ের মতো মোটা কয়েকটি ভাঁজ, খালি পা দুখানার দিকে তাকালে মনে হয় জীবনে কখনও পা দুটি জুতার ভেতর ঢোকেনি। ডান কাঁধে চকচকে একটা লাঠি, বাঁ-কাঁধে একটা কাপড়ের থলে। বাঁশের লাঠিটার এক মাথায় একটা হারিকেন, অন্য মাথায় একটা মুকুট। হারিকেনটা মনে করিয়ে দেয় বিশ শতকের কথা। বিশ শতকের মধ্যভাগে এমনকি শেষভাগেও রেল স্টেশনের লাইনম্যানদের হাতে এমন হারিকেন দেখা যেত। চাররঙা চিমনি-লাল হলুদ সাদা কালো। একুশ শতকের এই কালে সারাদেশ ঢুঁড়েও এমন হারিকেন পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। কত হবে হারিকেনটির বয়স? দেখেই বোঝা যায় অন্তত কুড়ি বছর। কে জানে, পঁচিশ-তিরিশও হতে পারে। একটা সময় রাতে তো বটেই, দিনের বেলাতেও সে হারিকেনটা জ্বালিয়ে রাখত। সে তো হাটে-বাজারে-শহরে- বন্দরে-মেলায়-আখড়ায় গান গেয়ে বেড়ায়, গান শুনে খুশি হয়ে লোকে পাঁচ-দশ টাকা বখশিশ দেয়। তা আর কত? রোজ বড়জোর দেড় দুইশ’। হলোই না হয় তিনশ’। গান গেয়ে যা রোজগার করত তার অর্ধেকটা উড়িয়ে দিত কেরোসিন জ্বালিয়ে। কেন সে দিনে-দুপুরে হারিকেনটা জ্বালিয়ে রাখত? আসরে একতারা বাজিয়ে পরপর দুটি বা তিনটি গান গেয়ে যখন দর্শক-শ্রোতাদের উদ্দেশে ভেদকথা শুরু করত, তখন সে হারিকেনটা জ্বলিয়ে রাখার কারণ নিজেই বর্ণনা করত, ‘কোথায় দিন-দুপুর? আমি তো দেখি রাত! চারিদিকে অমাবশ্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভূত-পেত্নীরা নেচে বেড়াচ্ছে। এই অন্ধকারে কি পথ ঠাওর করা যায়? এমন অন্ধকারে হারিকেন না হলে কি চলে?’ দর্শক-শ্রোতারা তার কথা শুনে হাসত। পাগলে কি না বলে! কেউ কেউ আবার মাথা দোলাত। তার ভেদকথার ভেদ বুঝি তারা বুঝত।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যেদিন সর্বশেষ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীটির মৃতুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন সেদিন বাগেরহাট খানজাহান আলীর মাজারের সামনের রাস্তায় একটা আসরে গান গাইছিল লোকটি। হঠাৎ গান থামিয়ে হারিকেনটা হাতে নিয়ে চাকতি ঘুরিয়ে সলতেটা কমিয়ে আলোটা নিভিয়ে দেয়। তারপর ঘোষণা দেয়, সাধুগণ, এই হারিকেন আর কোনোদিন জ্বলবে না। কারণ অন্ধকার কেটে গেছে। চারদিকে এখন আলোর বান। আমার এই তুচ্ছ হারিকেনের আলো বড্ড বেমানান।

হারিকেনের কথা থাক। বাউল-ফকিরদের কত গুপ্ত কারবার থাকে, কত গুপ্ত কথা থাকে, সব কি আর সবাই বোঝে! কিন্তু লাঠির মাথায় মুকুটটা কিসের? এই মুকুটের ভেদ কী? সিল্কের কাপড় আর রঙিন পুঁতির তৈরি ময়ুরের পালকশোভিত অনিন্দ্য একটি মুকুট। রাজা-বাদশারা মাথায় যে মুকুট পরতেন মুকুটটি দেখতে সেরকম নয়। বিয়ের আসরে বরেরা যে মুকুট পরে ঠিক সেরকমও নয়। এমন মুকুট বাংলাদেশের কোথাও দেখা যায় না, মথুরা-বৃন্দাবন অঞ্চলে এসব মুকুট সস্তায় কিনতে পাওয়া যায়। মুকুটটি সে বৃন্দাবন থেকেই এনেছে বটে, তবে কিনে নয়, সে জানায় যে, তার এই মুকুট কিনতে পাওয়া যায় না, শ্রী জগৎজ্যোতি দাস তাকে উপহার দিয়েছিল মুকুটটি। জগৎজ্যোতি সাধু কোথায় পেয়েছিল? কোথায় আবার? জোছনারাতে বৃন্দাবনের গহন কুসুম কুঞ্জে যখন রাসলীলা চলছিল, যখন ভাবের ঘোরে বিভোর ছিল ভক্ত-শিল্পীরা, তখন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হয়ে জগৎজ্যোতির মাথায় টুপ করে এই শিরোভূষণটা পরিয়ে দেন। জগৎজ্যোতির স্বজন-পরিজন কেউ ছিল না, গোটা জীবন কৃষ্ণধামেই কাটিয়ে দেয়, মৃত্যুর আগে মুকুটটা উপহার দেয় তার এই শিষ্য সাধুকে।

কাফেনশাহর মাজারের বুড়ো খাদেম ভেতর থেকে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার এনে ওমর তাজেলকে বসতে দেয়। লোকটি একতারা বাজিয়ে নেচে নেচে গান গায় : ‘ওরে ভাব না জেনে করলে পীরিত দু-কুলই হারায়/ কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে রাধা বৃন্দাবনে যায়।’ তাজেলের ভাবনাদৃশ্যের পরিবর্তন ঘটে। স্মৃতিতে ভেসে ওঠে বহু বছর আগের একটি দৃশ্য : কোনো এক থানাহাজতের মলিন দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে এক রিমান্ডের আসামি গাইছে, ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে রাধা বৃন্দাবনে যায়।’ কী নাম ছিল সেই আসামির? না, ঠিক মনে পড়ে না। এতদিনে চেহারাখানাও ভুলে গেছেন। মুহূর্তে দৃশ্যটি অদৃশ্য হয়। তিনি আবার চোখ বুজে গানের সুরে ডুব দেন। একতারার বোলের সঙ্গে তার মাথাটি এদিক-ওদিক দোলে। বোজা চোখে স্বপ্নের মতো হাজির হয় শাহজাহান ডাকু। সহসা তার মনে পড়ে, যে আসামি থানাহাজতের দেওয়ালে হেলান দিয়ে গানটি গেয়েছিল তার নাম শাহজাহান ডাকু, পরবর্তীকালে যার নাম হয় শাহজাহান জল্লাদ। তিনি ভাবেন, তবে কি গেরুয়া বসন পরা এই শিল্পীর নাম ভুবন সাধু? কুখ্যাত হন্তারক এরশাদ শিকদারের মৃত্যুদ- কার্যকরের পর এই সাধুর কথাই কি শাহজাহান তাকে বলেছিল? পরক্ষণে আবার ভাবেন, তা কী করে হয়? কেবল ভুবন সাধু গাইবে বলে তো কোন গান লেখা হয় না, একটি গান কত শিল্পীই তো গায়।

লোকটি গান থামায়। গামছায় মুখ মুছে যথারীতি শুরু করে ভেদকথা। প্রথমে বলে রামায়ণরচয়িতা বাল্মীকির কথা। সাধুগণ, প্রথম জীবনে বাল্মীকি কি ডাকাত ছিলেন না? রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে কী লেখা আছে? বাল্মীকির দস্যুবৃত্তির কথা কি লেখা নেই? রাজপথের দস্যু ছিল রত্নাকর, দুস্যুবৃত্তি করেই সংসার চালাত। একদিন হলো কী? দেবর্ষি নারদকে লুণ্ঠন করতে গেল রত্নাকর। নারদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন তার পাপের ভাগী তার পরিবার হতে চায় কিনা। রত্নাকর চমকে উঠল। এমন প্রশ্ন তো কেউ তাকে কোনোদিন করেনি! রত্নাকর ছুটল বাড়ির দিকে। স্ত্রী-সন্তানের কাছে জানতে চাইল তারা তার পাপের ভাগী হতে চায় কিনা। কী উত্তর দিল তারা? তারা উত্তর দিল, তোমার পাপের ভাগীদার আমরা কেন হব? রত্মাকরের কলিজা ফেটে যায়। আহা, তবে কার জন্য সারা জীবনের এই দস্যুবৃত্তি? কেন এত হত্যা, এত লুণ্ঠন, এত মহাপাপ? মর্মাহত রত্নাকর ছুটে গেল নারদের কাছে, পায়ে পড়ে চাইল ক্ষমা ভিক্ষা। মহর্ষি নারদ তো দয়ার সাগর। তিনি তাকে শেখালেন রাম নামের জপ। দস্যু রত্নাকর বসে গেল সাধনায়। আহা, এমনই গভীর সাধনা, তার শরীরখানা ঢেকে গেল বল্মীকের স্তূপে। ছয় হাজার বছর ধরে রাম নাম জপার পর ব্রহ্মা দেখা দিলেন তার সামনে। ব্রহ্মার বরে সে লাভ করল কবিত্বশক্তি। দস্যু রত্নাকর হয়ে গেলেন কবি বাল্মীকি। দেখুন, মানুষ কী করে বদলে যায়! দেখুন, দস্যু কীভাবে জগৎশ্রেষ্ঠ কবি বনে যায়! বাল্মীকি যদি ডাকাত থেকে সাধু হতে পারেন, তার মতো আর কেউ কি হতে পারবে না? অবশ্যই পারবে। নিজাম ডাকাত কি পারেনি? সেই যে নিজাম ডাকাত, যে কিনা রোজ নিরানব্বইটি মানুষ খুন করত। দুর্ধর্ষ ডাকাত নিজাম একদিন দেখা পেল বাবা শেখ ফরিদের। তার অছিলায় নিজাম ডাকাত হয়ে গেলেন নিজাম আউলিয়া। দেখুন ভগবানের কী মহিমা! দেখুন মানুষ কীভাবে বদলে যায়!

কথা বলতে বলতে ওমর তাজেলের সামনে দাঁড়ায় লোকটি। খানিকটা ঝুঁকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, আপনিই বলুন স্যার, ডাকাত কি সাধু হতে পারে না?

অবশ্যই পারে। মানুষ যেমন মরণশীল, তেমনি পরিবর্তনশীলও। বললেন ওমর তাজেল।

কেউ যদি ডাকাত থেকে সাধু হয় তাকে কি ক্ষমা করে দেওয়া উচিত নয়?

নিশ্চয়ই।

সত্যি বলছেন তো স্যার?

ওমর তাজেল হেসে মাথা কাৎ করেন।

লোকটি একতারায় টঙ্কার তোলে। আবার গাইতে শুরু করে, ‘সে কি সামান্য চোরা/ ধরবি কোনা কানচিতে/ ধরো চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে…।’ ওমর তাজেল উঠে দাঁড়ান। রোদ পড়ে গেছে। সন্ধ্যার আগে পদ্মাপাড়ি দিয়ে তাকে হরিরামপুর পৌঁছতে হবে। হারিরামপুর ঘাটে গাড়ি নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে ড্রাইভার। এখুনি রওনা করা না গেলে ঢাকায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে।

প্রায় পনেরো দিন পর মিরপুর শাহ আলীর মাজারে লোকটির সঙ্গে ওমর তাজেলের আবার দেখা। মাজারের পাকুড়গাছের বেদিতে বসে ভেদকথা বলছিল লোকটি। চারদিকে দর্শক-শ্রোতাদের ভিড়। ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে বুকে হাত মুড়ে দাঁড়ান তাজেল। লোকটির হাতে সেই মুকুট। মুকুটটা হাতে নিয়ে সে কোনো এক কারাবন্দি আসামির কথা বলছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ দ-প্রাপ্ত বন্দি। লোকটি বলতে থাকে, বাল্মীকি কি ডাকাত থেকে সাধু হননি? নিজাম ডাকাত কি আউলিয়া হননি? এই মুকুট আমি তাকে পরাতে চাই। তেত্রিশজন খুনির ফাঁসি কার্যকর কি যেন-তেন কথা! সেসব ফাঁসির আসামি কি যেন-তেন আসামি? বড় বড় সব রাঘব-বোয়াল। তাদের একজনার হাঁ-এর ভেতর আমি-আপনি তো কোন ছার, এই মাজারে হাজির সব মানুষ নিমিষেই ঢুকে যাবে। সেই রাঘব-বোয়ালদের ফাঁসি দিয়ে কি পুণ্যের কাজ করেনি সে? এজন্য মুক্তি কি সে পেতে পারে না? মুক্তির অধিকার কি তার নেই? নিশ্চয়ই আছে। আমি তার মুক্তি চাই। সাধুগণ, আপনারাও তার মুক্তির দাবি তুলুন। সরকার আমার একার কথা শুনবে না, কিন্তু সবাই যদি ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি তুলি, সরকার কি মুক্তি না দিয়ে পারবে? পারবে না।

লোকটি থামে। গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মোছে। মুকুটটি দুহাতে ধরে দর্শক-শ্রোতাদের দিকে বাড়িয়ে বলে, সাধুগণ, আমার বড় সাধ, যেদিন সে মুক্তি পাবে সেদিন জেলগেটে গিয়ে তাকে আমি এই মুকুট পরাব। এই মুকুটের নাম কি জানেন? কৃষ্ণমুকুট। হা হা কৃষ্ণমুকুট। স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমার গুরুর মাথায় এই মুকুট পরিয়ে দিয়েছিলেন। আমি এর নাম দিয়েছি মায়ামুকুট। তাকে পুরস্কৃত করব সেই সাধ্য কি আমার আছে? আমি পথের কাঙাল, মনের সুখে গান গাই, আপনারা দয়া করে দু-চার টাকা দিলে খাই, নইলে উপোস থাকি, দেওয়ার মতো আমার তো আর কিছু নেই, আমি তাকে এই মুকুটটা পরিয়ে দিতে চাই।

ওমর তাজেল ভাবেন, কার কথা বলছে লোকটি? সর্বোচ্চ দ-প্রাপ্ত বন্দিটির নাম কি শাহজাহান? লোকটি কি শাহজাহান জল্লাদের কথা বলছে? যে বর্ণনা দিচ্ছে তাতে শাহজাহান ছাড়া অন্য কেউ তো হওয়ার কথা নয়। এরশাদ শিকদারকে তো শাহজাহানই ফাঁসি দিয়েছিল। শায়খ রহমান, বাংলাভাই, বঙ্গবন্ধুর খুনি এবং শীর্ষ সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসিও তো শাহজাহানই দিয়েছিল। লোকটি নিশ্চয়ই শাহজাহানের কথাই বলছে। সে কী করে শাহজাহানকে চেনে? তবে কি তার নাম ভুবন সাধু?

আমি কি একটা প্রশ্ন করতে পারি? হাত তুলে বললেন তাজেল।

লোকটি অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়ায়। হট্টগোলের মধ্যে হয়ত প্রশ্নটি শুনতে পায় না। মুকুটটি বেদিতে নামিয়ে একতারার তারে আঙুল রেখে চোখ বুজে গান ধরে : ‘পুণ্য কর্ম করে যেজন/ তারে বলে সাধু/ জেলখানাতে বইসা আছে/ তারে লোকে বলে ডাকু।’ তাকে থামিয়ে প্রশ্নটি আবার করতে পারতেন তাজেল; কিন্তু ঠিক তখুনি তার মোবাইল ফোনটি বেজে ওঠে। তার স্ত্রীর কল। সন্ধ্যার ফ্লাইটে তার শ্যালককে রাজশাহী থেকে ঢাকায় আনা হচ্ছে। হার্টে তিনটি ব্লক ধরা পড়েছে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট বা বেসরকারি কোনো হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে রিং পরাতে হবে।

ওমর তাজেল মাজার-প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে দ্রুত গাড়িতে চড়ে বসেন। গাড়ি যখন মিরপুর এক নম্বর গোল চক্কর ক্রস করে টেকনিকেলের দিকে আগায় তখন প্রথমবারের মতো তার মনে হয়, সত্যি তো, শাহজাহানের তো মুক্তি দরকার। তেত্রিশজন কুখ্যাত আসামিকে ফাঁসি দিয়েছে সে, মুক্তি তো তার আগেই পাওয়ার কথা। কত ফাঁসির আসামিই তো রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে মুক্তি পেয়ে যায়। শাহজাহানকে তো রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু তার হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার আবেদন করবে কে? এমন কেউ তো নেই।

কল্যাণপুর-শ্যামলী-আসাদগেট পার হয়ে গাড়ি ধানমণ্ডি সাতাশের রাস্তায় ঢোকে। শাহজাহানের মুক্তির ব্যাপারটা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। যে করেই হোক, মুক্ত তাকে করতেই হবে। প্রয়োজনে তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করবেন, প্রয়োজনে শাহজাহানের হয়ে ভালো একজন উকিল দিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করবেন। তিনি ছাড়া শাহজাহানের পাশে দাঁড়ানোর মতো আর কে আছে? তার মুক্তির পক্ষে গান গেয়ে লোকটি জনমত তৈরি করছে বটে, কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গাগুলোতে যাওয়ার মতো ক্ষমতা তো তার নেই। সুতরাং দাঁড়াতে হবে তাকেই।

প্রায় সপ্তাহখানেক পরের কথা। ঘুম থেকে জেগে ল্যাপটপে গান শুনতে শুনতে কফি খাচ্ছিলেন ওমর তাজেল। রোজ ভোরে উঠে এককাপ ব্ল্যাক কফি তাকে খেতেই হয়, বহুদিনের অভ্যেস। কফি খেতে খেতে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলান। বাংলা ও ইংরেজি দুটি পত্রিকা রাখেন বাসায়। বাংলা দৈনিকটি হাতে নিলেন তিনি। প্রথম পাতার শিরোনমাগুলোতে চোখ বুলান। চোখ বুলান, কিন্তু তার মন অন্যদিকে। রাতে দেখা স্বপ্নটির আবেশ এখনও লেগে আছে মনে। শেষরাতে আবার দেখেছেন বহু বছর আগে দেখা সেই পুরনো স্বপ্ন। সূর্যে গ্রহণ লেগেছে, চারদিকে ধূসর অন্ধকার, আষাঢ়ের প্রমত্তা যমুনার রূপ নিয়েছে এক অচেনা নদী। যুদ্ধমাঠের সুদক্ষ সৈন্যের মতো তির হাতে ধনুক হাতে মনুষ্য চেহারার একদল কুকুর তার দিকে তাক করে রেখেছে অসংখ্য তির। ঢালধারী একদল মানুষ প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে যায় তার সামনে। তাদের গা থেকে ভেসে আসছে গোলাপের ঘ্রাণ। ঢাল ঠেকিয়ে দক্ষ হাতে তারা ফিরিয়ে দিতে থাকে তিরগুলো। ধীরে ধীরে পিছু হটতে লাগল কুকুরদল। এক যোদ্ধা তার উদ্দেশে চিৎকার করে বলল, পেছনে তাকান স্যার। তাজেল পেছনে তাকিয়ে দেখেন, হাজার হাজার গোলাপ, গাঁদা ও রজনীগন্ধার তৈরি আসমানের দিকে চলে যাওয়া বিশাল একটা সিঁড়ির ধাপ বেয়ে উপরের দিকে উঠছে শাহজাহান জল্লাদ। পত্রিকার শিরোনামে চোখ বুলাতে বুলাতে তার মনে হয় এই স্বপ্ন তিনি আগেও দেখেছেন। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারেন না। প্রথম পাতার সর্বশেষ শিরোনামটিতে চোখ রাখতেই তিনি নিশ্চিত হন, হ্যাঁ, এই স্বপ্ন তিনি আরও একবার দেখেছিলেন, বহু বছর আগে, যখন তিনি এ.সি. ছিলেন। তার অবাক লাগে। একই স্বপ্ন মানুষ দুবারও দেখে!

কফির মগটা টেবিলে রেখে পত্রিকার শেষের পাতায় গেলেন তাজেল। শেষপাতার শীর্ষ শিরোনাম : ‘এবার বাউল হত্যা’। শিরোনামের নিচে নিহতের গলাকাটা লাশের ছবি, ছবির নিচে ছোট্ট ক্যাপশন : ‘নিহত বাউল বিভুরঞ্জন সরকার প্রকাশ ভুবন সাধু।’ তাজেল আঁতকে ওঠেন। বুকটা কেমন ভারী হতে থাকে, ছল ছল করতে থাকে চোখ দুটো। সংবাদের বিস্তারিত পড়তে শুরু করেন তিনি। পুলিশের বরাত দিয়ে সাংবাদিক লিখেছে, মানিকগঞ্জের হারেজ আলি সরকারের দরবারের অদূরে চৌরাস্তার মোড়ে দুর্বৃত্তরা মধ্যরাতে বিভুরঞ্জন সরকার প্রকাশ ভুবন সাধুর মাথায় ও ঘাড়ে চাপতি দিয়ে উপর্যুপরি কুপিয়ে হত্যা করে। এক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে সাংবাদিক আরও লিখেছে, হামলার আগে একটা খেজুরপাতার পাটিতে বসে হারিকেন জ্বালিয়ে সাধু লিখছিলেন, ‘অন্ধকার এখনও কাটেনি।’

লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares